অনুসন্ধানী সংবাদ

ঘাসচাষের নামেও টাকা ভাগাভাগি : বড় অনিয়মের অভিযোগ দরপত্রে ও কেনাকাটায়

ও ডেইরি উন্নয়ন.jpg
print news

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়নের ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বলা যায়, লুটপাটের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি)’। সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে দরপত্রে ও কেনাকাটায়।

আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও ডেইরি পণ্য উৎপাদনে খামারিদের সহায়তার জন্য কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও তা প্যাকেটবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ৯২ শতাংশ খামারি যন্ত্রপাতি পায়নি। ঘাসচাষের নামেও টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়েছে।

প্রকল্পভুক্ত ৪৬৫টি উপজেলায় ঘাসচাষের জন্য প্রতি বছর ৬৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কোথায়ও নামেমাত্র ঘাসচাষ হয়। বাকি উপজেলাগুলোতে ঘাসচাষের টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া হচ্ছে। একজন ডিপিডি প্রতি উপজেলা থেকে ঘাসচাষ বাবদ ৫ হাজার টাকা নেন। প্রায় ২৩ লাখ টাকা এ খাত থেকেই আত্মসাৎ করা হচ্ছে। সরেজমিনে বেশিরভাগ উপজেলাতেই ঘাসচাষের প্রমাণ মিলবে না।

প্রকল্পের ইমার্জেন্সি অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী করোনায় প্রকল্প-এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও খামারি সংগঠনের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৬০০টি হস্তচালিত (ঘণ্টায় ৬০ লিটার উৎপাদনক্ষম), ৫০০টি মেশিনচালিত (ঘণ্টায় ১৬৫ লিটার উৎপাদনক্ষম) ও ৪০০টি মেশিনচালিত (ঘণ্টায় ৫০০ লিটার উৎপাদনক্ষম) মিল্ক ক্রিম সেপারেটর মেশিন কেনা হয়েছে ১০ কোটি ৮২ লাখ টাকায়। মেশিনগুলো ২০২১ সালের আগস্টে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার অফিসে পাঠানো হয়। এখনো অনেক মেশিন বিতরণ করা হয়নি। মানসম্পন্ন না হওয়ায় ৮০ শতাংশ মেশিন অকেজো হয়ে আছে।

এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় ৩৬০টি ডিজিটাল আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন কেনা হয়েছে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে। নিম্নমানের হওয়ায় তা চালু হয়নি, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার অফিসেই পড়ে আছে। খামারে ভ্যাকসিনেশনের জন্য সিরিঞ্জ, নিডল, কুলবক্সসহ নানা জিনিসপত্র কেনার ২ কোটি ১০ লাখ ৬১ হাজার টাকার আদেশ হয়েছে এবং বিল মেটানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর বড় অংশ মাঠপর্যায়ে সরবরাহ না করে কালোবাজারে বেচে দেওয়া হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে ল্যাবরেটরির জন্য হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের কাজের জন্য ৭৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়েছে কি না কেউ বলতে পারে না। ওইসব ল্যাবে আগেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বায়োরেক্টর, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার ছিল। প্রকল্পের আওতায় ৩০০ লিটার ক্যাপাসিটির ৫২৪টি ডিপ ফ্রিজ কেনা হয় ১ কোটি ৯৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে। ডিপ ফ্রিজগুলো সরবরাহের দুই বছর পরেই খামারে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

এলডিডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং সাপোর্ট অব ডিএলসির জন্য ৩০টি ল্যাপটপ ও কম্পিউটার (প্রিন্টার, স্ক্যানার ও অনুষঙ্গিক জিনিসপত্র) কেনা হয় ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার ৫৮০ টাকা ব্যয়ে। কিন্তু সেগুলো সংশ্লিষ্টদের না পাঠিয়ে সরাসরি প্রকল্প থেকে গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি ল্যাপটপের দাম দেখানো হয় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলো বাজারে কোনো অবস্থাতেই ৮০ হাজার টাকার বেশি হবে না।

করোনাকালে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরবরাহের জন্য প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ কোটি টাকার হেলথ সেফটি আইটেম (সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লোভস, অ্যান্টিসেপটিক, ব্লিচিং পাউডার প্রভৃতি) কেনা হয়। সেসব সরবরাহ করা হয়েছে কি না, তার প্রমাণ নেই।

প্রকল্পের আওতায় বিভাগীয় ও জেলা দপ্তরে ব্যবহার্য দ্রবাদি কেনার জন্য প্রতি কোয়ার্টারে ৩০ হাজার টাকা করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। অথচ একই কেনাকাটার জন্য রাজস্ব খাত থেকেও বরাদ্দ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বরাদ্দের অর্ধেক টাকা একজন ডিপিডির মাধ্যমে কমিশন হিসেবে নিয়ে নেওয়া হয়।

তবে উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) ড. এবিএম মুস্তানুর রহমান  বলেন, ‘দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ পৃথকভাবে করা হয়। একাধিক কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত থাকেন। কোনো ব্যাপারেই আমার ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। অনিয়মের সঙ্গেও আমি জড়িত নই।’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) গত জুনের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও অব্যস্থাপনার কথা। বলা হয়েছে, ৯২ শতাংশ খামারি প্রকল্প থেকে কোনো যন্ত্রপাতি পায়নি। প্রকল্প থেকে শুধু ক্রিম সেপারেটর মেশিন দেওয়া হয়েছে, যেসবের বেশিরভাগ খামারি ব্যবহার শুরু করতে পারেনি। খামারিদের মাত্র ৯.৪ শতাংশ প্রকল্প থেকে গবাদি পশুর জন্য ৫০ কেজি দানাদার সুষম খাদ্য পেয়েছে। ৭৯ শতাংশ খামারি গবাদি পশুর জন্য কৃত্রিম পদ্ধতির প্রজনন সেবা পায়। ৫০.৪ শতাংশ খামারে খুরারোগ, এফএমডি ও মুখের লালা রোগ দেখা দিয়েছে। ৯৮.২ শতাংশ খামারি স্বাস্থ্যসেবা, ৯৭.৫ শতাংশ খামারি কৃমিনাশক ও ৮৪.৭ শতাংশ খামারি ভ্যাকসিন পেয়েছে। জরিপকৃত খামারিরা প্রকল্প থেকে কোনো পোলট্রির খাদ্য পায়নি। ২৯.৮ শতাংশ খামারি প্রকল্প থেকে কভিড-প্রণোদনা পেয়েছে।

৪ হাজার ২৮০ কোটি ৩৬ লাখ টাকার এলডিডিপি প্রকল্প ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৭৩ লাখ ৭ হাজার টাকার অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক। সাড়ে চার বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি ৪৭.০৮ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ আরও ২২ মাস বাড়ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, মার্কেট লিংকেজ ও ভ্যালু-চেইন সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন এ প্রকল্পের লক্ষ্য। অনিয়মের কারণে লক্ষ্য অর্জন এখনো অনেক দূরে।

সূত্র জানায়, এলডিডিপি প্রকল্পের ডিপিপিতে অনুমোদিত প্যাকেজ ২৮৬টি। প্যাকেজ জি-৩৯-এর জন্য ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ১৭ কোটি ১২ লাখ ২৪ হাজার টাকায় দরপত্র পায় বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজেস। ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই প্যাকেজ-২৭-এর জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। প্রায় ৪ কোটি টাকায় কার্যাদেশ পায় এমএস মাসতুরা এন্টারপ্রাইজ। একই বছরের ১৫ জুলাই মাসতুরা এন্টারপ্রাইজ ১ কোটি ২৫ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৭ টাকায় প্যাকেজ ডব্লিউ ৮৮-এর কাজ পায়।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ ডেস্ক :

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *