অনুসন্ধানী সংবাদ

সাড়ে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিল চাকরি দেওয়ার নামে চক্রটি

jobs 20210206020953
print news

কখনো দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তা, আবার কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পরিচয়ে সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একটি চক্র সাড়ে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সম্প্রতি এক জনপ্রতিনিধির মধ্যস্থতায় ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হলেও ভুক্তভোগীদের কেউ তা পাননি।

ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, এই প্রতারক চক্রের হোতার নাম ওমর ফারুক। তিনি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বাছট গ্রামের বাসিন্দা। তাঁকে সহায়তা করেছেন তাঁর স্ত্রী পুলিশ কনস্টেবল নাজনীন আক্তার ও সিঙ্গাইরের ঘোনাপাড়া গ্রামের ছানোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি এবং একই এলাকার প্রবাসী হাবিবুর রহমানের স্ত্রী সুমা আক্তার।

সিঙ্গাইরের বায়রা গ্রামের ভুক্তভোগী তুহিন হোসেন বলেন, ‘বছর তিনেক আগে ছানোয়ার হোসেনের মাধ্যমে ওমর ফারুক ও তাঁর স্ত্রী নাজনীনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তখন তিনি (ওমর ফারুক) দুদকের উপসহকারী পরিচালক এবং তাঁর স্ত্রী নাজনীন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে কর্মরত থাকার কথা জানান। আলাপচারিতার একপর্যায়ে তাঁরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে জনবল নিয়োগ হচ্ছে বলে জানান। টাকার বিনিময়ে তাঁরা যেকোনো দপ্তরে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। তাঁদের কথায় আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবরক্ষক পদের জন্য ১৭ লাখ টাকা আর আমার স্ত্রী লায়লা আক্তারকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগের জন্য ১৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা দিই। ছানোয়ারের মাধ্যমে ওমর ফারুককে আমি ওই টাকা দিই। এরপর আমাদের দুটি নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু চাকরিতে যোগদান করতে গিয়ে জানতে পারি, নিয়োগপত্র দুটি ভুয়া। আমাদের টাকা ফেরত পাইনি।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির জন্য ছানোয়ারের মাধ্যমে ওমর ফারুককে ১৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা দিয়েছিলেন সিঙ্গাইরের আটকড়িয়া গ্রামের উমেশ মণ্ডল।

জানতে চাইলে উমেশ মণ্ডল বলেন, ‘আমার মতো আরও অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওমর ফারুক। চাকরি ও টাকা না পেয়ে ভুক্তভোগী লোকজন গত মার্চ মাসে সাটুরিয়া থেকে ওমর ফারুককে আটক করেন। তখন ওমর ফারুকের প্রতিবেশী সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের মধ্যস্থতায় পরিষদে সালিস হয়। সালিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওমর ফারুক ৭০ লাখ টাকা ফেরত দেন। কিন্তু ভুক্তভোগীরা কোনো টাকা পাননি।’

ওই সালিসের ‘আপসনামা’ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে ওমর ফারুক বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ছানোয়ার চাকরির জন্য ওমর ফারুককে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি করেন। সালিসে ১ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও ওমর ফারুক ফেরত দেন ৭০ লাখ টাকা।

জানতে চাইলে ভুয়া পরিচয় দেওয়ার কথা স্বীকার করে ওমর ফারুক বলেন, ‘চাকরি দেওয়ার কথা বলে ছানোয়ার হোসেন যে পরিমাণ টাকা এলাকা থেকে নিয়েছেন, তার অর্ধেক টাকা আমাকে দিয়েছেন, যার পরিমাণ ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৭০ লাখ টাকা আমি ছানোয়ারকে ফেরত দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলেছি।’

এ বিষয়ে ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে ওমর ফারুক তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। তিনি নিজেকে একেক সময় একেক দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তার পরিচয় দিতেন। তাঁর স্ত্রী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পরিচয় দিতেন। আমি চাকরির জন্য আত্মীয়স্বজন ও এলাকার লোকজনের কাছ থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দিই। পরে জানতে পারি ফারুক প্রতারক।’

সালিসের বিষয়ে ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মাত্র ৭০ লাখ টাকা আদায় করে দিয়েছেন, যা আমার এক পরিচিতজনের কাছে জমা আছে। সব টাকা না পেয়ে আমি চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাটুরিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি।’

চেয়ারম্যান আনোয়ার বলেন, ‘ছানোয়ারই বড় প্রতারক। তিনি ওমর ফারুককে ব্যবহার করে চাকরি দেওয়ার নামে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। পরে ওমর ফারুককে অর্ধেক টাকা দিয়ে বাকি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন। বিষয়টি আমার মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের মধ্যে আপস হয়ে গেছে। এখন আমার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়ে তিনি (ছানোয়ার) নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন।’

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ ডেস্ক :

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *