ইত্তেহাদ নিউজ অনলাইন : অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি দল। বিষয়টি বরিশালসহ সারাদেশে বেশ আলোচিত হয়। দুদকের ওই অভিযানের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পরবর্তীতে স্মারকলিপি পর্যন্ত দেন চিকিৎসকরা।
দুদকের অভিযানের পর আর কোনো আইনি ব্যবস্থার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় দুদক টিমের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান, মামলা কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি।সুপারিশ ফাইলচাপা অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে ।
অথচ, অভিযানকালে কর্তব্যরত অধিকাংশ চিকিৎসককে হাসপাতালে পায়নি দুদক টিম। সেবার মান, ওষুধ ক্রয় ও নিয়োগ সংক্রান্ত অনেক অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতাও মেলে। কিন্তু বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন চিকিৎসকদের বায়োমেট্রিক হাজিরা রেকর্ড দুদক টিম দেখতে চায়। এরপরই দুদকের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ।
২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযানের দায়িত্ব পালন করেন দুদকের সহকারী পরিচালক রাজ কুমার সাহার নেতৃত্বে একটি টিম।
দুদকের অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছে:
সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় মেডিসিন ও নিউরোলজি বিভাগের ইউনিট- ২ বিভাগে উপস্থিত হয়। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. আনোয়ার হোসেন বাবলু ও সহযোগী অধ্যাপকসহ অন্যান্য চিকিৎসককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে সময় তাদের কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। অভিযানকালে হাসপাতালের মেডিসিন, অর্থোপেডিক বিভাগের দু-একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ব্যতীত অন্য কোনো চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। ওই সময় হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ ডা. মো. মনিরুজ্জামান শাহীনের অফিস কক্ষে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। টিম ১৪ চিকিৎসকের হাজিরা খাতা ও বায়োমেট্রিক হাজিরায় স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। যারা প্রত্যেকে ৯টার পর আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা দেরি করে অফিসে আসেন। ওই সময় ডা. মাসুম আহমেদসহ অনেকেই রূঢ় আচরণ করেন।
অভিযানকালে তৎকালীন অধ্যক্ষ ডা. মনিরুজ্জামান শাহীনকে মোবাইল ফোনে অভিযোগের বিষয়টি অবগত করলে তিনি সকাল সাড়ে ৯টায় নিজ চেম্বারে আসেন। এ সময় বায়োমেট্রিক হাজিরাসহ বিভিন্ন নথিপত্র চাইলে তা দিতে অস্বীকার করেন তিনি। অভিযানের প্রমাণস্বরূপ স্থিরচিত্র ধারণ করতে গেলে তিনি বাধা দেন এবং টিমের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। যা দুদক আইনকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের শামিল। টিমের সদস্যদের হুমকি-ধমকি দিয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এমনকি অভিযানের শেষ পর্যায়ে ডা. আনোয়ার হোসেন বাবলুকে নিজ কক্ষ, ক্লাস রুম এমনকি ওয়ার্ডেও পাওয়া যায়নি। ওই সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতির সময় ছিল সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিযানকালে বিভিন্ন মানুষের বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছে যে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ডা. মনিরুজ্জামান শাহীনের নামে ঢাকার পরীবাগে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ঢাকায় নিজ ও স্ত্রীর নামে একাধিক প্লট এবং ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে অফিস সরঞ্জাম ক্রয় না করে সরকারি অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে।
বছরভিত্তিক চুক্তিতে ১০০ জন করে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী অনুমোদনবিহীন মাস্টার রোল দেখিয়ে প্রতি মাসে ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ১২ হাজার ৫০০ টাকা হারে বেতন উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন ওই অধ্যক্ষ। এর বাইরে কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন তিনি।
দুদকের অনুসন্ধানকালে আরও জানা যায়, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন ও নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন বাবলু হাসপাতালের রোগীদের ভালোভাবে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে বরিশালের মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস প্রাইভেট লি., পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবএইড হাসপাতালে গভীর রাত পর্যন্ত রোগী দেখেন। অকারণে রোগীদের তার মনোনীত ডায়াগনস্টিক সেন্টার হতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেন। সেখান থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করেন তিনি।
এছাড়া ডা. সুদীপ হালদারের বরগুনা সদর হাসপাতালে পোস্টিং হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেখানে দায়িত্বপালন না করে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সিন্ডিকেট তৈরি করে বিভিন্ন প্রকার অনৈতিক কাজে লিপ্ত রয়েছেন।
অভিযোগে যা ছিল:
ডা. আনোয়ার হোসেন বাবলু শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ও নিউরোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত থাকলেও সপ্তাহে দুই বা তিন দিন অফিস করেন। নির্ধারিত সময়ে অফিসে না এসে বেলা ১১টা বা ১২টায় আসেন। তিনি বরিশালের মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবএইড হাসপাতাল, সাউথ অ্যাপোলো মেডিকেল সার্ভিসেস কলেজ এবং প্রভৃতি মেডিকেল সেন্টার ও হাসপাতালের মাধ্যমে সপ্তাহের ভিন্ন ভিন্ন দিনে বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ২০০ থেকে ৩০০ রোগী দেখেন। হাসপাতালে আসা হতদরিদ্র ও দুস্থ রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন— এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য দুদকের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
দুদকের অভিযান:
সরকারি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করা, হাসপাতালের চেয়ে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী নিয়ে ব্যস্ত থাকাসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে অভিযান চালায় দুদক। সংস্থাটির বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রাজ কুমার সাহার নেতৃত্বে পাঁচজনের একটি টিম অভিযানে নামে। অভিযানকালে অভিযোগের সত্যতা পায় টিম। সেখানে তারা দেখতে পান, হাসপাতালের চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন বাবলু সরকারি দায়িত্ব পালন না করে ব্যক্তিগত চেম্বারে প্রতিদিন রোগী দেখেন। এমনকি সরকার নির্ধারিত সকাল ৮টার অফিসেও তারা আসেন না। ওইদিন সকাল সোয়া ৯টার দিকে তৎকালীন কলেজ অধ্যক্ষ ডা. মনিরুজ্জামান শাহিনের কক্ষে গেলে তাকে পায়নি দুদক টিম। এমনকি অফিসের একজন পিয়নও উপস্থিত ছিলেন না।
দুদক টিমের আসার খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে কার্যালয়ে আসেন কলেজ অধ্যক্ষ। দুদক টিম কলেজ তৎকালীন অধ্যক্ষের কাছে চিকিৎসকদের এক সপ্তাহের বায়োমেট্রিক হাজিরার তালিকা দেখতে চান। তা দিতে অস্বীকার করেন কলেজ অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান শাহিন। শুধু তা-ই নয়, দুদকের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। অভিযানকারী টিমের ছবি তুলে রাখার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান তৎকালীন অধ্যক্ষ।
অভিযানকালে সেবাপ্রত্যাশী রোগী ও ওয়ার্ডে চিকিৎসারত রোগীর স্বজনরাও হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কথা জানান। সরকারি দায়িত্ব পালনের চেয়ে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে সময় অতিবাহিত করা, ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক হাসপাতালে রোগী পাঠানো, কমিশন বাণিজ্যসহ আরও বেশকিছু অভিযোগ আনেন তারা।
ওই ঘটনায় অভিযান পরিচালনাকারী টিমের বিচার চেয়ে উল্টো আন্দোলনে নামেন চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মিছিলসহ ধর্মঘটের হুমকি দেয় তারা। এমনকি তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার আমিন-উল আহসানের কাছে স্মারকলিপিও দেন চিকিৎসকরা।
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায় ।
ইত্তেহাদ নিউজ, এয়ার পোর্ট রোড, আবুধাবী ,সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইমেইল: [email protected], web:www.etihad.news
এম এম রহমান, প্রধান সম্পাদক, ইত্তেহাদ নিউজ, এয়ার পোর্ট রোড, আবুধাবী, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত