বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন করে রূপ দিতে পারে। এই নির্বাচন ঘিরে বেইজিং প্রভাব সুসংহত করতে চাইছে আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক টালমাটাল হয়ে উঠছে। এবারের এই ভোট ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর দেশের প্রথম নির্বাচন। খবর এএফপির। এএফপি লিখেছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় ভারতকে নিয়ে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। যে কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততা জোরদার করা হয়েছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিমপ্রধান এই দেশ শেখ হাসিনার শাসনামলে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লিই ছিল ঢাকার প্রধান অংশীদার, যে সমীকরণ এখন বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যৎ সরকার প্রকৃত অর্থেই চীনের দিকে ঝুঁকছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগর সম্পর্কিত চীনের কৌশলগত চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশ এই কৌশলে চীনপন্থী ভূমিকা পালন করবে—এ ব্যাপারে চীন ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসী।’ ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীনে; যা কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। গত জানুয়ারিতে দুই দেশ ভারতের কাছে প্রস্তাবিত একটি উত্তরাঞ্চলীয় বিমানঘাঁটির কাছে ড্রোন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার একটি অপরিবর্তনীয় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’ লাগামহীন বৈরিতা: এর বিপরীতে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে নিয়মিত টানাপোড়েন চলছে। গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম বৈরিতা’ চলছে অভিহিত করে এর নিন্দা জানায়। পুলিশ বলেছে, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ৭০ জন সদস্য নিহত হন। ঢাকা এই সহিংসতার মাত্রা অতিরঞ্জিত করার অভিযোগে ভারতকে দোষারোপ করেছে। তবে সম্পর্ক মেরামতের বিচ্ছিন্ন কিছু প্রচেষ্টাও হয়েছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য ঢাকায় আসেন। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে এগিয়ে আছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি জিতলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত খালেদা জিয়ার ৬০ বছর বয়সী ছেলে তারেক রহমানের প্রতিও সমবেদনা জানিয়ে বার্তা পাঠান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু ভারতের হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীদের বিক্ষোভের পর এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এর জেরে ভারতে চলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। অস্থিতিশীলতা নয়, স্থিতিশীলতায় প্রাধান্য: ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রবীণ দোন্থি বলেন, উভয় পক্ষেরই বাস্তববাদী অবস্থানের সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। তিনি বলেন, নয়াদিল্লি ও ঢাকা—দু’পক্ষই সম্পর্কের অবনতির সমাধান না করার মূল্য সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে ঢাকা। এক দশকের বেশি সময় পর জানুয়ারিতে দুই দেশের মাঝে পুনরায় সরাসরি ফ্লাইট চালু করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকার নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের আর অবনতি না ঘটিয়েই ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারা অব্যাহত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দোন্থি বলেন, নতুন প্রশাসন সম্ভবত অস্থিতিশীলতার চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেবে। তবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে—বিশেষ করে বিএনপি জিতলে, ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল হতে পারে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, একসময় ভারতের সঙ্গে তীব্র বিরোধে থাকা ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীও তাদের প্রচারে ‘এক ধরনের বাস্তববাদী বাস্তবতা’ তুলে ধরেছে। তীব্র বাগাড়ম্বরের পরও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি অটুট রয়েছে। বাণিজ্য স্থিতিশীল আছে এবং শেখ হাসিনা আমলের কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি—ভারতীয় টাগবোট সংক্রান্ত; বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক উপ-হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় কূটনীতিক দিলীপ সিনহা বলেন, চীন এমনভাবে অবকাঠামো সরবরাহ করছে; যা ভারত পারে না। তিনি বলেন, কিন্তু ভারত এমন কিছু জিনিস সরবরাহ করে; যা বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন, বিদ্যুৎ এবং পোশাকশিল্পের জন্য সুতা। বিশ্লেষকরা বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে বৈরিতা; বিষয়টি এমন নয়। হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এটি একটি না হলে আরেকটি’ ধরনের পরিস্থিতি নয়। দুই সম্পর্কই একই সঙ্গে বিকশিত হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতির পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থায়ও তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক তৎপরতা। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ টাকার প্রবাহ দ্রুত বাড়ছে। নির্বাচনি প্রচার, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের নানা ব্যয় মেটাতে প্রার্থীদের বড় একটি অংশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের পথে হাঁটছেন— যার স্পষ্ট প্রতিফলন মিলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসে— ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। নভেম্বরে যেখানে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা, জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই মাসেই নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সাম্প্রতিক সময়ে নগদ টাকা উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে। প্রার্থীরা প্রচার ব্যয় মেটাতে নগদ অর্থ ব্যবহার করছেন বলেই এই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, বড় ও সন্দেহজনক লেনদেন নজরদারির আওতায় রয়েছে এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সার্বক্ষণিকভাবে এসব লেনদেন পর্যবেক্ষণ করছে। হঠাৎ উল্টো স্রোত এই নগদ প্রবাহের ঊর্ধ্বগতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর আগের কয়েক মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই অঙ্ক প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা কমে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনি ব্যয়ের কারণেই হঠাৎ এই উল্টো স্রোত তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচনের আগে নগদ টাকার চাহিদা বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সন্দেহজনক লেনদেন হলে তা রিপোর্ট করার ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। কালোটাকার আশঙ্কা ও নজরদারি নগদ টাকার এই দ্রুত বিস্তার কালোটাকার ব্যবহার বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছে। সে কারণেই বিএফআইইউ নির্বাচন সামনে রেখে নজরদারি জোরদার করেছে। গত ১১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনও হিসাবে একদিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হলে তা বাধ্যতামূলকভাবে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) আকারে জমা দিতে হচ্ছে। রেমিট্যান্সে জোয়ার নির্বাচনের আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক— রেমিট্যান্সে দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক প্রবণতা। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। শুধু জানুয়ারিতেই এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা একক মাস হিসেবে দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি। ডলার কিনে টাকার তারল্য রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ায় ডলারের সরবরাহ ভালো থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে। চলতি ফেব্রুয়ারিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৯ কোটি ডলার কেনা হয়েছে, যার বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এতে টাকার বাজারে তারল্য বাড়লেও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের। ডিজিটাল লেনদেনে কড়াকড়ি নির্বাচনের আগে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে অর্থ স্থানান্তর সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘিরে নগদ অর্থের এই অদৃশ্য দাপট গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কঠোর নজরদারি ও ভোটারদের সচেতনতাই পারে এই দুষ্টচক্র ভাঙতে।
ঢাকা – দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, যখন দেশের প্রধান তিনটি বিরোধী দল—জাতীয় গণফ্রন্ট, উন্নয়ন পার্টি ও জননেতা পরিষদ—আজ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘গণঐক্য জোট’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই জোটের মুখ্য লক্ষ্য হলো আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করা, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি এবং একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট আয়োজন নিশ্চিত করা। জাতীয় গণফ্রন্টের সভাপতি শহীদুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “দেশে এখন গণতন্ত্র নেই, জনগণের ভোটাধিকার নেই। তাই আমাদের এই ঐক্য—সত্যিকার অর্থে একটি গণআন্দোলনের সূচনা।” জোটের কর্মসূচি জোট নেতারা জানান, আগামী মাস থেকে সারা দেশে বিক্ষোভ, গণঅবস্থান, মানববন্ধন এবং জেলা পর্যায়ে গণসংলাপ কর্মসূচি শুরু হবে। তারা বলেছেন, এই জোট শুধুমাত্র সরকারবিরোধী নয়, বরং এটি একটি ভবিষ্যত রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবেও কাজ করবে। সরকারের প্রতিক্রিয়া সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে অঘোষিতভাবে কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, “বিরোধীদের এই জোট জনভিত্তিহীন এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা।” বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব হাসান বলেন, “এই জোট নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, যদি তারা মাঠে বাস্তব আন্দোলন ও বিকল্প নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে সরকার যেভাবে শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখছে, তাতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।” আগামী সপ্তাহে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জোটের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক মহল এই জোটকে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবেও দেখছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব-২ গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর নামে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাগুলোতে তার বিরুদ্ধে ১৫০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। সোমবার (১৩ জানুয়ারি) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকাু১ এ সংস্থাটির উপপরিচালক মো. আহসানুর কবীর পলাশ বাদী হয়ে দুইটি, সহকারী পরিচালক মো. রাকিবলু হায়াত বাদী হয়ে একটি ও উপসহকারী পরিচালক মো. মনজুরুল ইসলামা মিন্টু বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় লিকুর স্ত্রী, ভাই, ভগ্নিপতি ও কেয়ারটেকারসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাগুলোতে লিকু ও তার স্বজনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ৩৮ কোটি ৫৭ লাখ ১২ হাজার ৯৬ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। চার মামলার মধ্যে লিকুকে প্রধান আসামি করে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ৫৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৮০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অপর মামলায় তার বিরুদ্ধে ৩৩টি ব্যাংক হিসাবে ১৪৪ কোটি টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। লিকুসহ এই মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেনু লিকুর স্ত্রী রহিমা আক্তার, ভগ্নিপতি শেখ মো. ইকরাম, লিকুর ভাইু গাজী মুস্তাফিজুর রহমান (দিপু), ভাগিনা তানভীর আহম্মেদ, ব্যবসায়িক অংশীদার মো. লিয়াকত হোসেন সবুজ ও মো. কালু সেখ, লিকুর বাসার কেয়ারটেকার হামিম শেখ, তার ম্যানেজার মিন্টু রহমান ও মো. আরাফাত হোসেন। মামলাগুলোর এজাহারসূত্রে জানা যায়, স্ত্রী রহিমা আক্তার তার ৯টি ব্যাংক হিসাবে ১২ কোটি ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৪৬ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেন। একইভাবে শেখ মো. ইকরাম তার ব্যক্তিগত ও যৌথ নামে পরিচালিত ৩টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনকভাবে ২১ কোটি ৫ লাখ ৭৩ হাজার ২৯৭টাকা, গাজী মুস্তাফিজুর রহমান (দিপু) তার ব্যক্তিগত ও যৌথ নামে পরিচালিত ৪টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনকভাবে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৯৬৩ টাকা, তানভীর আহম্মেদ ১৯ কোটি ৮৮ রাখ ৭৯ হাজার ৩৫৪ টাকা, মো. লিয়াকত হোসেন (সবুজ) ৩ কোটি ৪৪ লাখভ ৬০ হাজার ২৬৩ টাকা, আসামি মো. কালু সেখ তার ব্যক্তিগত ও যৌথ নামে পরিচালিত ৩টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনকভাবে ৫৬ কোটি ৫২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৪৯ ও লিকুর কেয়ারটেকার হামিম শেখ ৪টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৩০ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৭ টাকা লেনদেন করেন। এ ছাড়া, গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর স্ত্রী রহিমা আক্তারের বিরুদ্ধে ২৩ কোটি ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৮ টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলায় লিকুকেও আসামি করা হয়েছে। লিকুর ভগ্নিপতি শেখ মো. ইকরামের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অন্য একটি মামলায় তাকেও আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় ইকরামের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ৩৪৮ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সরকারের পরিবর্তন হলেও চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখানকার উপজেলা প্রকৌশলী জয়শ্রী দে’র বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। তাদের অভিযোগ, এই প্রকৌশলীর অনৈতিক চাহিদার কাছে তারা রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ভুক্তভোগীদের মতে, প্রকৌশলী জয়শ্রী দে প্রতিটি উন্নয়ন কাজের বিলে বাধ্যতামূলক ৫ শতাংশ কমিশন দাবি করেন। এই টাকা না দিলে তিনি ফাইলে সই করেন না। তার এই বেপরোয়া আচরণের কারণে অনেকেই তাকে এলজিইডির ‘দুর্নীতির মুকুটহীন রানী’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষ করার পর ঠিকাদারদের বিল পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রকৌশলী জয়শ্রী দে বিল আটকে রাখার জন্য ‘শতভাগ কাজ বুঝে নেওয়া’র অজুহাত তৈরি করেন। ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা জানান, এটি মূলত তার ঘুষ আদায়ের একটি কৌশল। কাজের মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশ অর্থ তাকে অগ্রিম কমিশন হিসেবে না দিলে ফাইলের কোনো অগ্রগতি হয় না। এমনকি এই কমিশন দেওয়ার পরেও বিলের চেকে সই করানোর সময় তাকে দিতে হয় বাড়তি ‘টেবিল মানি’। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি দপ্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার দাপট কমেনি। বর্তমানে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। নিজের খুঁটির জোর দেখিয়ে ঠিকাদারদের তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ঘুষ ছাড়া তার দপ্তরে কোনো কাজ হবে না। উপজেলা প্রকৌশলীর এমন প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি ও হয়রানির বিষয়ে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান আলীর কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তিনি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। দীর্ঘদিনের এই অনিয়মের কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় ঠিকাদারদের ধারণা, এই দুর্নীতির লভ্যাংশ হয়তো ওপর মহলেও পৌঁছে যায়। ঘুষ ছাড়া ফাইল না নড়ার কারণে হাটহাজারীর সড়ক ও অবকাঠামোগত বহু উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘুষের টাকা জোগাতে গিয়ে অনেক ঠিকাদার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। এতে সরকারের উন্নয়নকাজের গতি ও মান—উভয়ই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অঞ্চল ৩/৪৮-এ কর্মরত তিনি। পদবি পেশকার। সরকারি বেতন স্কেল অনুযায়ী মাসে সাকুল্যে পান সাড়ে ১২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। অথচ তার জীবনযাপন হার মানায় বড় বড় শিল্পপতি বা জাঁদরেল কর্মকর্তাদেরও। চড়েন বিলাসবহুল গাড়িতে, আর রাজধানীর বুকে রয়েছে ১০ তলা ভবনের মালিকানা। বলছিলাম টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ভেঙ্গুলা গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মেহেদী হাসান জুয়েলের কথা। মাত্র ছয় বছরের চাকরিজীবনে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পাওয়ার মতোই উত্থান হয়েছে তার। অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি এখন কোটিপতি। কোটা ও প্রভাবে পারিবারিক ‘নিয়োগ বাণিজ্য’: ২০১৯ সালে এনবিআরের পেশকার পদে যোগ দেন মেহেদী হাসান। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন এক সংসদ সদস্যের সুপারিশে তিনি এই চাকরিটি বাগিয়ে নেন। শুধু নিজের চাকরিই নয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহার করে তিনি তার ভাই সোহেল ও বোন ফাতেমাকেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাইয়ে দেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকলেও দলীয় বিবেচনায় তাদের পরিবারকে এই অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় আলিশান ভবন ও সম্পদের পাহাড়: অনুসন্ধানে মেহেদীর বিপুল অবৈধ সম্পদের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ৬০ ফিট সংলগ্ন পীরেরবাগ এলাকায় (হোল্ডিং নং- ২২০/২/১) ১৬ কাঠা জমির ওপর নির্মিত একটি ১০ তলা বিলাসবহুল ভবনের মালিকানায় রয়েছে তার নাম। ওই ভবনের ১৮ জন অংশীদারের একজন তিনি। নিজেকে আড়াল করতে অন্যের নামে রেজিস্ট্রেশন করা একটি দামি গাড়িতে তিনি চলাফেরা করেন। এছাড়া ঢাকা, টাঙ্গাইল সদর ও গোপালপুরে তার নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি ও প্লট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষের রাজত্ব: একজন সামান্য পেশকার হয়েও তিনি কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন? অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি দিতে সহায়তা করা এবং করদাতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘুষ আদায় করাই তার আয়ের মূল উৎস। সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করে তিনি নিজের পকেট ভারী করেছেন। দম্ভ ও হুমকি: গ্রামের বাড়িতে গেলে মেহেদী হাসান এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতো আচরণ করেন। সরকার পরিবর্তন হলেও তার দাপটে ভাটা পড়েনি। আয়ের উৎস নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে বা সাংবাদিকরা তথ্য জানতে চাইলে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা মারমুখী হয়ে ওঠেন। দম্ভ করে তিনি বলেন, “এসব নিউজ করে আমার কিছুই হবে না, আপনাদের দেখে নেব।” এ বিষয়ে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধ বা দুর্নীতির দায়ভার প্রতিষ্ঠান বহন করবে না। অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তা জানান, গণমাধ্যমে আসা দুর্নীতির খবরগুলো তারা পর্যালোচনা করছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ মিললে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকেও জানানো হয়েছে, যারা ভুয়া সনদে বা অবৈধ পন্থায় কোটা সুবিধা নিয়েছেন, তাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেহেদী হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন কর্মসূচি—‘সমগ্র বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’। প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটি ২০২০ সালে একনেকে অনুমোদন পায়। উদ্দেশ্য ছিল আর্সেনিক ও দূষণমুক্ত পানি সরবরাহের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এই প্রকল্প এখন পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, টেন্ডার জালিয়াতি এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের লুটপাটের আখড়ায়। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের এস্টিমেটর (প্রাক্কলনিক) প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সিকদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো প্রকল্পটিকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে। ডিপিএইচই সূত্রে জানা যায়, আনোয়ার হোসেন সিকদার ১০ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা। সরকারি বিধি অনুযায়ী তাঁর মূল বেতন প্রায় ১৬ হাজার টাকা। ইনক্রিমেন্ট ও ভাতা যোগ করে মাসিক আয় সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকার বেশি নয়। অথচ এই সীমিত আয়ের সরকারি কর্মকর্তা ঢাকায় তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি, গ্রামে বিপুল জমি ও বাড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগসহ এমন এক জীবনযাপন করছেন, যা অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিকেও হার মানায়। এই অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের পেছনে রয়েছে নিরাপদ পানি প্রকল্পসহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিরাপদ পানি প্রকল্পে এস্টিমেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে আনোয়ার সিকদার প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জায়গাটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। টেন্ডারের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ, প্যাকেজ তৈরি এবং কারিগরি শর্ত ঠিক করার ক্ষমতা থাকায় কার্যত তিনিই ঠিক করে দেন কোন ঠিকাদার কাজ পাবে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি টেন্ডারের গোপন ‘রেট’ আগেই নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের কাছে ফাঁস করে দেন। এর বিনিময়ে মোটা অংকের কমিশন নেওয়া হয়, যা পরে বিভিন্ন পথে বিনিয়োগ ও সম্পদে রূপ নেয়। ঢাকায় তাঁর সম্পদের বিবরণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া গেছে বিস্ময়কর তথ্য। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিংয়ের ‘খ’ ব্লকে তাঁর স্ত্রীর নামে একটি আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। ধানমন্ডি ৬ নম্বর এলাকায় ৭৮ নম্বর বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে রয়েছে একটি বড় ফ্লোর। এছাড়া সাভার পৌরসভা সংলগ্ন এলাকায় তাঁর স্ত্রীর নামে নির্মিত হয়েছে পাঁচতলা একটি ভবন। এসব সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৪০ লাখ টাকা দামের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, যা দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন তিনি। ঢাকার বাইরেও আনোয়ার সিকদারের বিপুল সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। টাঙ্গাইল জেলার টেংগুরিয়া উপজেলার আরোহ সালিনা গ্রামে তাঁর রয়েছে প্রায় ১০ বিঘা জমি ও একটি বিলাসবহুল বাড়ি। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছরের মধ্যেই এই বাড়ি ও জমির পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। শুধু তাই নয়, গোপালগঞ্জে অবস্থিত ‘মনির ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাইপ ফ্যাক্টরিতেও তাঁর বড় অংকের বিনিয়োগ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—সরকারি চাকরিতে থেকে ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত থাকা। সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা নিজে বা পরিবারের সদস্যের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন না। কিন্তু আনোয়ার সিকদার তাঁর স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে কার্যত নিজেই ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নিরাপদ পানি প্রকল্পের একাধিক কাজ তাঁর সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। গোপালগঞ্জ জেলার একটি টেন্ডার এই অনিয়মের বড় উদাহরণ। সম্প্রতি সেখানে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের একটি টেন্ডার আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ‘সালেক সোলার লিমিটেড’ নামের একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে অন্য ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে নির্দিষ্ট কোম্পানি ছাড়া অন্য কেউ যোগ্য বিবেচিত না হয়। একই জেলার আরেকটি টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা ‘মনির ইঞ্জিনিয়ারিং’কে প্রায় ৯ শতাংশ বেশি দরে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে সরকারকে অতিরিক্ত প্রায় চার কোটি টাকা গুণতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে পার্বত্য অঞ্চলেও। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় নিরাপদ পানি প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সরঞ্জাম ও অবকাঠামো নির্মাণের টেন্ডারে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানি ছাড়া অন্যদের কার্যত বাদ দেওয়া হয়েছে। বান্দরবানে ১৫০০ এফআরপি ভেসেল এবং খাগড়াছড়িতে ৩০০০ ব্যাসেলের টেন্ডারে ‘মনির ইঞ্জিনিয়ারিং’কে কাজ দেওয়ার জন্য আগেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। টেন্ডারের কারিগরি শর্ত, অভিজ্ঞতার মানদণ্ড এবং আর্থিক যোগ্যতা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সাধারণ বা স্থানীয় ঠিকাদাররা অংশ নিতে না পারেন। এই সিন্ডিকেটের দাপটে মাঠ পর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীরাও অসহায় হয়ে পড়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) অফিস থেকে যে নির্দেশনা আসে, সেটিই তাঁদের অনুসরণ করতে হয়। টেন্ডার আহ্বানের আগেই আনোয়ার সিকদার পছন্দের ঠিকাদারকে রেট দিয়ে দেন। ফলে দরপত্র খোলার সময় দেখা যায়, নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানই সব কাজ পেয়ে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। গোপালগঞ্জ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়েজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “পিডি অফিস যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, আমি সেভাবেই টেন্ডার করেছি। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা নেই।” তাঁর এই বক্তব্য থেকেই প্রকল্প পরিচালনার কেন্দ্রীভূত ও প্রভাবাধীন চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, আনোয়ার সিকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ রয়েছে এবং একটি মামলায় চার্জশিটও দাখিল করা হয়েছে। তবে রহস্যজনকভাবে এতসব অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডিপিএইচইর ভেতরে ‘অদৃশ্য হাত’ বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ‘আর্সেনিক প্রকল্প’ এবং ‘৩৭ পৌরসভা পানি সরবরাহ প্রকল্প’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবারই অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি তাঁকে। ফলে তাঁর সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ার হোসেন সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দম্ভভরে বলেন, “হ্যাঁ, আমার স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে। আমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কিছু কাজ করেছি। এটা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়েই করা যায়।” তবে তাঁর এই বক্তব্য সরকারি বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়াল স্পষ্টভাবে বলেন, “সরকারি চাকরি করে ঠিকাদারি করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি করে থাকে, তা চাকরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” যদিও বাস্তবে এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানি প্রকল্পের মতো একটি মানবিক ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি যদি দুর্নীতির কবলে পড়ে, তাহলে এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, যারা আজও বিশুদ্ধ পানির অভাবে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তারা প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে। অপরদিকে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় ও লুটপাটের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে। স্থানীয় ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, অবিলম্বে বিতর্কিত টেন্ডারগুলো বাতিল করে স্বচ্ছতার সঙ্গে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সিকদার ও তাঁর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় নিরাপদ পানি প্রকল্প শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর বাস্তবে তা পরিণত হবে একটি দুর্নীতির স্মারকে।
‘ঢাকায় টাকা উড়ে’-এমন প্রবাদ বাক্য গ্রামেগঞ্জের। তবে উড়তে না দেখা গেলেও রাজধানীতে ব্যাংক টু ব্যাংক বা বস্তায় লেনদেনের ঘটনা আছে। তেমনই লেনদেন ঘটেছে আগারগাঁও টু সচিবালয়ে। এ লেনদেন কাজ না করেই বিল পরিশোধ এবং পদায়নে ঘুষ হিসেবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ঢাকা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাচ্চুর নিয়ন্ত্রণে এ ঘটনার প্রমাণও মিলেছে। চাউর আছে, ওই পদ বাগাতে তিনি বিনিয়োগ করেছেন ৫ কোটি টাকা। আর ঢাকা জেলার এক্সেনের পদে বসেই স্বল্প সময়ে পকেটস্থ করেছেন সাড়ে ২২ কোটি টাকা। পানি যখন যে পাত্রে রাখা হয় তখন সে পাত্রের রং ধারণ করেন। বাচ্চুর গায়ের রং সাদা তবে চরিত্র পানির মতোই। যখন যে দল শাসন-শোষণ করেছে সে দলের জার্সি পড়ে ইউএনও, নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। রাতারাতি বদলি কিংবা নিজহাতে মারধর করার নজির স্থাপন করেছেন। শুধু ভুয়া বিল, বাউচার তৈরিই নয় মন্ত্রীর কণ্ঠস্বরও নকল করার সক্ষমতা আছে প্রকৌশলী বাচ্চুর। পতিত আওয়ামী লীগের অর্থ জোগানদাতা বাচ্চু বর্তমান সরকারের জন্য বিষফোড়া বলে খোদ তার বিভাগেরই কর্মকর্তাদের মন্তব্য। কর্মচারীদের টাকা আত্মসাৎকারী প্রকৌশলী বাচ্চুর স্ত্রী গৃহিণী আসমা পারভীনের নামে বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট, জমি এবং নগদ টাকার অঙ্ক কপালে চোখ উঠার মতো। এসব খতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছে দুদক, সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে টিম। টেকনিক্যাল বিষয়ে দুদক তাদের সহযোগিতা নিচ্ছে। এর আগে অভিযান পরিচালনা করেছে দুদক। নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। ঘুষের রেট ফাইলভেদে ৬-৪০% প্রকৌশল সেক্টরে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না-এ কথা নতুন নয়। তবে কালে-পাত্রে বদল হয়েছে ঘুষের রেট। দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত থাকাকালে এ অপকর্ম করেছেন প্রকৌশলী বাচ্চু। এলজিইডির একাধিক ঠিকাদার এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, এলজিইডি ভবন ঘুষের আঁতুড়ঘর। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতন ও প্রকৌশলী বাচ্চু যোগদানের পর চিত্র পাল্টেছে। ঘুষের নতুন রেট নির্ধারণ করেছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা। নিরাপত্তার স্বার্থে ঠিকাদারের নাম প্রকাশ করছি না। তারা অভিযোগ করেন, সঠিক ও স্বাভাবিকভাবে কাজ করার পর বিল উত্তোলনের জন্য পিসি দিতে হতো ৫%, এখন হয়েছে ৬%। কাজ না করেই অগ্রিম বিল উত্তোলনে গুনতে হয় ৪০%। মূল টাকার ১৫% চার্জ বাদে বাকি টাকার ওপর পিসি বসান প্রকৌশলী বাচ্চু গংরা। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে মিলেছে, ৬৫ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দিয়েছেন বাচ্চু মিয়া। ঠিকাদারদের অভিযোগ সঠিক হলে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন ২২ কোটি টাকা। এছাড়াও ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের মোবাইল মেইনটেনেন্সের কাজ না করেই ৫০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরিবারের সম্পত্তি: অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, বাচ্চু মিয়া ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরা, সেক্টর-১১-এ স্ত্রী আসমা পারভীনের নামে কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট, গাজীপুর সদর নিশাদনগরে এবং জয়দেবপুরে বাড়ি, পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় একটি প্লট এবং ২০২২ সালে আসমা পারভীনের নামে (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৫-২৯৫২) একটি মূল্যবান গাড়ি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বেনামি গাড়ি ও বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা রয়েছে। অগ্রিম বিল ও দুদকের অভিযান রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিল্ডিংয়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ ও ঢাকার নবাবগঞ্জে ইছামতী নদীর ওপর ২৭০ মিটার ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১০ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে দুদকের একটি দল ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর (এলজিইডি) কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় অভিযানে এলজিইডি ঢাকা জেলা কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে দুদক। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহর ও পূর্বাচলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পসহ (দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প) স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন- নামীয় প্রকল্পের আওতাধীন একটি প্রকল্প। এটির অফিসিয়াল নাম-ঢাকার মিরপুরে গাবতলী জিপিএস-এর ৬ তলা ভিত্তিসহ ৬ তলা ভবন নির্মাণ। এর আওতায় নির্মিতব্য ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। এ টিমে ছিলেন, দুদকের সহকারী পরিচালক-স্বপন কুমার রায়সহ তিনজন। সরেজমিন পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে দুদক কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির দুইটি ফ্লোরের কাজ সমাপ্ত হলেও চারটি ফ্লোরের নির্মাণ বিল ঠিকাদারকে প্রদান করা হয়েছে। আংশিক রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অনিয়ম/দুর্নীতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের নিমিত্ত অবশিষ্ট রেকর্ডপত্রের জন্য চাহিদাপত্র প্রদান করে দুদক টিম। এ নিয়ে যাচাই করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করবে দুদক। এছাড়াও আরেক অভিযানে ঢাকার নবাবগঞ্জে ইছামতী নদীর ওপর ২৭০ মিটার ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে পৃথক এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম প্রথমে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, এলজিইডি, ঢাকা, আগারগাঁও অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে। পরবর্তীতে নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট ব্রিজ নির্মাণ এলাকা ঘুরে দেখে। পরিদর্শনে দেখা যায়, বর্ণিত ব্রিজের ৯টি স্প্যানের মধ্যে ৮টি স্প্যানের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও ব্রিজের মাঝখানে দুই পাশের সংযোগ হিসেবে আর্চ স্প্যানের কাজ বাকী রয়েছে। তবে, অফিসে সংরক্ষিত ব্রিজের অগ্রগতি সংক্রান্ত নথিতে কাজের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ দেখিয়ে সর্বমোট প্রায় ৫০ কোটি ৮৪ লাখ ২৯ হাজার ৭৭ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সার্বিকভাবে টিমের পর্যালোচনায় সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ না হয়েও বিল পরিশোধ করায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায় দুদক। অভিযোগ রয়েছে প্রকৌশলী বাচ্চু গত জুন মাসে কাজ শেষ না করেই দৃষ্টিনন্দন স্কুল প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকা, কেরানীগঞ্জ প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকা এবং বান্দুরা ব্রিজে ৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল প্রদান করেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল মেইনটেনেন্সের কাজ না করেই ৫০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই প্রকৌশলী। সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিম দুদকের অভিযানের পর রেকর্ডপত্র যাচাই ও টেকনিক্যাল বিষয়াদি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিমের আহবায়ক করা হয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী (সেতু) মো. ইউসূফ হারুনকে, সদস্য সচিব করা হয়েছে-একই বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মোসা. তাসলিমা খাতুনকে। অপর সদস্য হলেন- বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী (সড়ক) মো. বুলবুল আহমেদ। টিম সদস্যরা ইছামতির ওপর সেতুর কাজের অগ্রগতি বিষয়ে প্রতিবেদন দিবেন। সরকারি চাকুরে কাম দলীয় ক্যাডার জন্মস্থান গাজীপুরের টঙ্গিতে। বাচ্চু লেখাপড়া শেষ করেছেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার মা ছিলেন জাতীয় পার্টির নেত্রী। জোট শরিক হওয়ায় আর আওয়ামী লীগ শোষণ আমলের পুরোটাই ভোগ ও প্রভাব বিস্তার করেছেন। মাঝে বিএনপি আমলে পরিচয় দিতেন বিএনপি কর্মী হিসেবে। ফের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুরো দস্তুর আওয়ামী লীগার। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদে নাম লিখিয়েছেন। শোক, সভা-সমাবেশের ডোনারের ভূমিকা পালন করেছেন। বদৌলতে নিয়েছেন সুবিধা। নিজ জেলা গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় (এলসিএস) মহিলা শ্রমিকদের বেতনের টাকা আত্মসাৎ ও ভুয়া প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কাজে বাধা সৃষ্টি করেন। ক্ষমতার প্রভাবে ওই কর্মকর্তাকেই বদলি করে দিয়েছিলেন বাচ্চু মিয়া। ময়মনসিংহ জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিত করার নজির স্থাপন করেছেন তিনি। এছাড়াও কিশোরগঞ্জ, পাবনায় তার অপকর্মের ছোঁয়ায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। যেখানেই তিনি চাকরি করেছেন সেখানেই বাচ্চু মিয়া ভুয়া বিল, এলসিএস কর্মীদের অর্থ আত্মসাৎ, সহকর্মীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেছেন। এসব নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি পার পেয়ে গেছেন। প্রশ্ন ছিল-এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে ঢাকা জেলার মত খুবই গুরত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন কেনো? জবাবে জানা গেছে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেনের এ পদে বসতে মাত্র পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন ডুয়েটিয়ান বাচ্চু। বাধা উপেক্ষা করেই বিদায় বেলায় বদলির প্রস্তাব প্রেরণ করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জন। বিভাগীয় ব্যবস্থাতেও দমেনি বাচ্চু গত বছর নেত্রকোনায় কর্মরত অবস্থায় বাচ্চু মিয়া এক মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করে বিভিন্ন দফতরে তদবির বাণিজ্য করতেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই একটি দৈনিক পত্রিকায় ৩০০ প্রকৌশলীর তালিকা উঠে আসে। তদন্ত করে যে তালিকা করেছিল এনবিআর। বিস্তর অভিযোগে যথাযথ প্রমাণ দিয়ে গত ৬ আগস্ট মোহাম্মদ খাজা মহিউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে মো. শিকদার হোসেন নামের আরেক ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে, বাচ্চু মিয়া ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি কাজে প্রভাব খাটাতেন। এ প্রসঙ্গে অভিযান পরিচালনাকারী দুদকের সহকারী পরিচালক স্বপন কুমার রায় জানান, নথিপত্র আংশিক সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও চাওয়া হয়েছে। টিমের সকলে মিলে একসঙ্গে বসে কমিশনে প্রাথমিক রিপোর্ট দিব। কমিশনের যেভাবে অনুমোদন দিবেন সেভাবেই পরবর্তী রিপোর্ট দেয়া হবে। প্রকৌশলী বাচ্চুর বক্তব্য অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়াকে মোবাইলে কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি। পরে হোয়াট্স অ্যাপে অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। তিনি ফোন ব্যাক করে বলেন, আপনার প্রশ্নগুলো দেখেছি। আমার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে তাই কোনো বক্তব্য দিব না। তিনি বলেন, সঠিক খবর হলে আমার আপত্তি নেই।
সরকারি চাকরি জীবনের ইতি টেনেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়া ছাড়তে পারেননি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন। বরাবরই নিজেকে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করতেন, চাকরি জীবনের প্রথমদিকে মোটামুটি রয়েসয়ে চলতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে অধঃপতন ঘটে তথাকথিত এই সৎ কর্মকর্তার। এক নাগাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। এই মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব পদের পাশাপাশি প্রভাব খাটিয়ে একটি বড় প্রকল্পেরও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখে দেন। এই সময় তলে তলে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। গুরুতর অনিয়ম-অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবেও এই অনিয়মের ধারা অব্যাহত থাকে তার। এই সময় এক নারী ঠিকাদারের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গণপূর্তের সচিব হওয়ার পরে এক পর্যায়ে ওই নারী ঠিকাদারকে বিয়েও করেন। তাকে নিয়ে উঠেন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন বেইলী রোডের একটি বিশেষ বাংলোয়। নিয়ম অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া ৫০ হাজার টাকা তার বেতন থেকে কেটে রাখার কথা। কিন্তু এর পরিবর্তে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মাত্র চার হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা করেন তিনি পূর্ত সচিব পদে থেকে। শুধু তাই নয়, ওয়াছি উদ্দিনের পিআরএল শেষ হয়েছে ৯ মার্চ, ২০২৫। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারি ওই বাংলোটি দখলে রেখেছেন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না তার বিরুদ্ধে। যদিও ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দের মামলায় কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলায়। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে মূলতঃ এটিই ছিল ওয়াছি উদ্দিনের খুঁঁটির জোর। এই পরিচয়েই তিনি ২০২০ সালের আগস্টে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে পদায়ন পান। ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তাকে গণপূর্ত সচিব করা হয়। চাকরির বয়স শেষে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও ভোগ করেন। গণপূর্তের সচিব পদে থাকাকালে শেখ সেলিম, ঢাকার পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ গোপালগঞ্জের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালীর সমন্বয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সিন্ডিকেটের হয়ে সরকারি বাড়ি দখল, প্লট বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ-বদলি, অনিয়ম, চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। তার সময়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়কেন্দ্রীক নতুন একটি দালাল শ্রেণিও গড়ে উঠে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সচিবের দপ্তর থেকেই ভুয়া এক ডিজিএফআই কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ব্যক্তি আদতে ছিল সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের দালাল। ওয়াছি উদ্দিনের নানাবিধ এসব অনিয়ম-অপকর্মের তথ্য বিস্তারিতভাবে পরবর্তীতে তুলে ধরা হবে। সরকারি বাংলোয় নামেমাত্র ভাড়া পরিশোধ এবং এখনও অবৈধ দখলে রেখে সরকারের যে বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি করেছেন চলতি প্রতিবেদনে এ তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের পিআরএল শুরু হয়েছে ২০২৪ এর ১০ মার্চ। ফলে নিয়ম অনুযায়ী ২০২৫ এর ৯ মার্চ পর্যন্ত তিনি সরকারি বাসায় থাকতে পারবেন। এরপরেও অতিরিক্ত দুই মাস এবং বিশেষ বিবেচনায় সর্বোচ্চ আরও চার মাস পর্যন্ত থাকা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোন ক্ষমতার বলে সরকারি এ বাংলোটি দখল করে রেখেছেন, পূর্ত মন্ত্রণালয়ও তাকে কোন বিবেচনায় এ অবৈধ সুযোগ দিচ্ছে- সংশ্লিষ্টরা জবাব দিতে পারছেন না। উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, কাজী ওয়াছি উদ্দিন রাজধানীর বেইলী রোডের মিনিস্টার্স এপার্টমেন্ট-৩ সংলগ্ন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত সরকারি ভবনটি ছাড়েননি। সরকারি নথিতে এটি একটি সাব-স্টেশন ভবন হিসেবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে ডুপ্লেক্স বাংলোতে রূপান্তর করা হয়েছে। কাজী ওয়াছি উদ্দিন এই বাংলোটিতে সরকারের বিপুল অংকের অর্থ খরচ করেছেন শুধু নিজে থাকার সুবিধার জন্যই। বর্তমানে ভবনটি ‘বেইলী রোড মন্ত্রীপাড়া ৪০ নম্বর বাড়ি’ হিসেবেই পরিচিত। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ার একটি ডুপ্লেক্স বাংলোর জন্য তিনি মাত্র ৪ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করছেন। বরাদ্দ নেওয়ার সময় নিজের প্রভাব খাটিয়ে বাসাটিকে ‘সাব-স্টেশন ভবন’ হিসেবে দেখিয়ে মূল বেতনের মাত্র ৭.৫ শতাংশ হারে ভাড়া নির্ধারণ করান তিনি। বরাদ্দের আগে একই বাসায় বসবাস করতেন নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) তরিকুল ইসলাম। তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী তার বেতন থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া পরিশোধ করতেন। অথচ কাজী ওয়াছি উদ্দিন সেই একই বাসায় বসবাস করা সত্ত্বেও এমনকি ইতিমধ্যে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করে বাসাটির উন্নয়ন সত্ত্বেও মাত্র চার হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কাজী ওয়াছি উদ্দিন অত্যন্ত কৌশলে সাব-স্টেশন উল্লেখপূর্বক ভবনটি বরাদ্দ নেন এবং পরবর্তীতে সাব-স্টেশন কার্যক্রম পাশ কাটিয়ে পুরো ভবনটিকে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাংলোতে রূপান্তর করেন। নিচতলা ও দোতলা মিলিয়ে প্রায় ৮টি কক্ষবিশিষ্ট এই বাংলোটি আধুনিক রিনোভেশন ও দামী ফার্নিচারে সাজানো হয়। সূত্র বলছে, ভবনটির সংস্কার ও আসবাবপত্র কেনায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সরকারি অর্থের এমন অপ্রয়োজনীয় বিপুল ব্যয় কীভাবে এবং কোন বিধিবলে করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন করে রূপ দিতে পারে। এই নির্বাচন ঘিরে বেইজিং প্রভাব সুসংহত করতে চাইছে আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক টালমাটাল হয়ে উঠছে। এবারের এই ভোট ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর দেশের প্রথম নির্বাচন। খবর এএফপির। এএফপি লিখেছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় ভারতকে নিয়ে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। যে কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততা জোরদার করা হয়েছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিমপ্রধান এই দেশ শেখ হাসিনার শাসনামলে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লিই ছিল ঢাকার প্রধান অংশীদার, যে সমীকরণ এখন বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যৎ সরকার প্রকৃত অর্থেই চীনের দিকে ঝুঁকছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগর সম্পর্কিত চীনের কৌশলগত চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশ এই কৌশলে চীনপন্থী ভূমিকা পালন করবে—এ ব্যাপারে চীন ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসী।’ ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীনে; যা কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। গত জানুয়ারিতে দুই দেশ ভারতের কাছে প্রস্তাবিত একটি উত্তরাঞ্চলীয় বিমানঘাঁটির কাছে ড্রোন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার একটি অপরিবর্তনীয় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’ লাগামহীন বৈরিতা: এর বিপরীতে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে নিয়মিত টানাপোড়েন চলছে। গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম বৈরিতা’ চলছে অভিহিত করে এর নিন্দা জানায়। পুলিশ বলেছে, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ৭০ জন সদস্য নিহত হন। ঢাকা এই সহিংসতার মাত্রা অতিরঞ্জিত করার অভিযোগে ভারতকে দোষারোপ করেছে। তবে সম্পর্ক মেরামতের বিচ্ছিন্ন কিছু প্রচেষ্টাও হয়েছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য ঢাকায় আসেন। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে এগিয়ে আছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি জিতলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত খালেদা জিয়ার ৬০ বছর বয়সী ছেলে তারেক রহমানের প্রতিও সমবেদনা জানিয়ে বার্তা পাঠান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু ভারতের হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীদের বিক্ষোভের পর এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এর জেরে ভারতে চলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। অস্থিতিশীলতা নয়, স্থিতিশীলতায় প্রাধান্য: ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রবীণ দোন্থি বলেন, উভয় পক্ষেরই বাস্তববাদী অবস্থানের সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। তিনি বলেন, নয়াদিল্লি ও ঢাকা—দু’পক্ষই সম্পর্কের অবনতির সমাধান না করার মূল্য সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে ঢাকা। এক দশকের বেশি সময় পর জানুয়ারিতে দুই দেশের মাঝে পুনরায় সরাসরি ফ্লাইট চালু করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকার নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের আর অবনতি না ঘটিয়েই ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারা অব্যাহত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দোন্থি বলেন, নতুন প্রশাসন সম্ভবত অস্থিতিশীলতার চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেবে। তবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে—বিশেষ করে বিএনপি জিতলে, ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল হতে পারে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, একসময় ভারতের সঙ্গে তীব্র বিরোধে থাকা ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীও তাদের প্রচারে ‘এক ধরনের বাস্তববাদী বাস্তবতা’ তুলে ধরেছে। তীব্র বাগাড়ম্বরের পরও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি অটুট রয়েছে। বাণিজ্য স্থিতিশীল আছে এবং শেখ হাসিনা আমলের কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি—ভারতীয় টাগবোট সংক্রান্ত; বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক উপ-হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় কূটনীতিক দিলীপ সিনহা বলেন, চীন এমনভাবে অবকাঠামো সরবরাহ করছে; যা ভারত পারে না। তিনি বলেন, কিন্তু ভারত এমন কিছু জিনিস সরবরাহ করে; যা বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন, বিদ্যুৎ এবং পোশাকশিল্পের জন্য সুতা। বিশ্লেষকরা বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে বৈরিতা; বিষয়টি এমন নয়। হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এটি একটি না হলে আরেকটি’ ধরনের পরিস্থিতি নয়। দুই সম্পর্কই একই সঙ্গে বিকশিত হতে পারে।
ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সেখানকার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শংকর মুখার্জীকে গত ২৭শে ডিসেম্বর নিজ বাড়ি থেকে সাদা পোশাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। এর একদিন পর ২০২২ সালে দায়ের করা এক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।অভিযোগ করা হয়, তিনি বিএনপি অফিস হামলা-ভাঙচুরের সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে পরিবারের দাবি, বাজারে থাকা তাদের জমি-জমা দখল ও খামারের দখল নিতেই তার বিরুদ্ধে ওই মামলা দেওয়া হয়েছে। কারণ, ২০২২ সালে যখন মামলাটি করা হয় সেখানে মি. মুখার্জীর নাম ছিল না। কেবল শংকর মুখার্জীই নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বিচার আটক যেমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তা জারি থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ – এইচআরডব্লিউ'র বার্ষিক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থককে সন্দেহভাজন হত্যা মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, যাদের মধ্যে আছেন অভিনয়শিল্পী, আইনজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীরাও। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে এবিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা যাবে না। তারপরও পরিস্থিতি না বদলের কারণ হিসেবে 'মব সহিংসতা করে বিচার ব্যবস্থাকে জিম্মি' এবং সরকারের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার দিকেই আঙ্গুল তুলছেন আইনজ্ঞরা। বিনা বিচারে একজন ব্যক্তিকে কতক্ষণ আটক রাখা যেতে পারে? শংকর মুখার্জীর মামলাটি পরিচালনা করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। 'মিথ্যা মামলা' উল্লেখ করে আদালতের কাছে দুইবার জামিন চাওয়া হলেও তা মঞ্জুর করা হয়নি বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা দিক নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন – ২০২৬'এ বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিংবা প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। জোরপূর্বক গুমসহ ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি কমে এলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজার হাজার ব্যক্তিকে নির্বিচারে আটক করেছে এই সরকার। অথচ বাংলাদেশের আইনে বিচার ছাড়া কাউকে 'এক মুহূর্তও' আটকে রাখা যায় না বলে বিবিসি বাংলাকে জানান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। প্রয়োজন মনে হলে কাউকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রেও ২৪ ঘণ্টার বেশি হলে তাকে আদালতে পাঠাতে হবে। "এমনিতে কাউকে আটক করার কোনো ক্ষমতা নাই তার বিরুদ্ধে মামলা না থাকলে বা আদালতের কোনো নির্দেশনা না থাকলে," বলেন মি. মোরসেদ। বাংলাদেশের সংবিধানে আইন বহির্ভূতভাবে কাউকে আটকে রাখাকে স্পষ্টভাবে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৩ ধারায় বলা আছে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতারের কারণ না জানিয়ে আটক রাখা এবং তাকে তার আইনজীবীর সাথে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। গ্রেফতার কিংবা আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং ম্য্যাজস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া তাকে আটক রাখা যাবে না। কিন্তু বিদেশি শত্রু এবং নিবর্তনমূলক আইনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না। তবে সেক্ষেত্রেও আবার এমন ব্যক্তিকে ছয় মাসের বেশি আটকে রাখতে হলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদমর্যাদার দুইজন এবং প্রবীণ সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদের অনুমতি প্রয়োজন হবে। এছাড়াও সংবিধানের ১০২ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী, আইনের বাইরে কিছু হলে সুপ্রিম কোর্ট নিজে অথবা কেউ যদি নিজে কোনো আবেদন নিয়ে আসে – উভয় ক্ষেত্রেই যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে কোনো ব্যক্তির মুক্তি নিশ্চিতের ক্ষমতা আদালতকে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার হবার পর আইন অনুযায়ী ব্যক্তির জামিন পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু "সেটা অহরহ ভঙ্গ হচ্ছে, আগেও ভঙ্গ হয়েছে, এখন ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে", বলছিলেন মি. মোরসেদ। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবিকভাবে তার বিপরীত দৃশ্যই সামনে আসছে। বরং পতিত আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। দেদারসে চলছে মামলা বাণিজ্য সংবিধান সমুন্নত রাখার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। ফলে সংবিধানে উল্লিখিত মানবাধিকার লঙ্ঘন হলেও 'সুপ্রিম কোর্ট এবিষয়ে যথেষ্ট সক্রিয় নয়' বলেই মনে করছেন আইনজীবীরা। মামলা নিয়ে গেলে বিচারকদের তা শুনতে অনীহা প্রকাশ এবং "হাজার হাজার মামলা হলেও লিস্টে আসছে অল্প কিছু সংখ্যক, এ ব্যবস্থাটা করা হয়েছে – যার ফলে এই দায় বা দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর দেওয়া হয়েছে, সেই বিচার বিভাগও এখানে ব্যর্থ হয়েছে এই মানুষগুলোর অধিকার রক্ষা করার জন্য", বলছিলেন মনজিল মোরসেদ। তার কারণ হিসেবে 'মব' আর সরকারের ভূমিকা – এই দুইটি বিষয়কেই সামনে আনছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তারা অভিযোগ করছেন, ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে। একদিকে সরকার হস্তক্ষেপ করছে, অন্যদিকে "মব করে বিচারকদের ওপরে আক্রমণ করা হয়েছে। বিচারকদের অপসারণ করা হয়েছে", বলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। একই কথা বলছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকও। "বিচারকদের যে এত বরখাস্ত করা হলো, বিচারকরদের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে"। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে ছোটো কোনো ঘটনাতেও যেমন আশেপাশের বিএনপির একশো-দুশো নেতা কর্মীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো "বর্তমান আমলে এসে সেটা আরও বেড়ে গেছে। কারণ পুলিশ অজ্ঞাতনামায় ফাঁসিয়ে দিয়ে বলবে এই মামলায় আপনার নাম ঢুকায় দেবো, আমাকে পয়সা দেন"। আর এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল যে, একটি অপরাধের অভিযোগ করতে গিয়ে অনেক বেশি মানুষের নাম যখন মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই 'এবসার্ড' বা অর্থহীন কাজকে না থামানো। শাহদীন মালিকের মতে, পুলিশের দায়িত্ব ছিল 'প্রিলিমিনারি প্রবাবিলিটি যাচাই করা। "ওইটা পুলিশ করে নাই কারণ নাম বাদ দিয়ে দিলে তো তার ব্যবসা কমে যাবে"। মামলা বাণিজ্যে ভুক্তভোগীদের হয়রানির কথা বলছিলেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনও। তার মতে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছে, জনগণের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন না"। তার ওপর পাঁচই অগাস্টের পর যে মব সন্ত্রাস দেখা গেছে, যার ফলে কিছু মানুষ কাউকে বা কোনো দলকে আটক করে পুলিশের হাতে দিচ্ছে, "এবং পুলিশ তখন বাধ্য হচ্ছে মবের কাছে নতি শিকার করে মামলা নিতে বা তাদের আটক করতে"। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের যে ধরনের বার্তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে বলেও মনে করেন মি. লিটন। তবে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের এসব অভিযোগের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা দিক নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন – ২০২৬'র তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের ধারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও নারী ও ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে আশঙ্কাজনক হারে রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরের গোষ্ঠীর মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহতের খবর উঠে এসেছে। 'অপারেশন ডেভিল হান্ট' অভিযানের আওতায় অন্তত আট হাজার ৬০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং মতপ্রকাশ দমনে অতীতে ব্যবহৃত দমনমূলক দুটি আইন—বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনেও আরও বহু মানুষ গ্রেপ্তার হয়ে থাকতে পারেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে ঘটা সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হন। এরপর পুলিশ নির্বিচারে শত শত কথিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করে এবং আট হাজার ৪০০'র বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করে, যাদের বেশিরভাগই অজ্ঞাতনামা। যদিও সরকার এই 'গণগ্রেফতার'-এর অভিযোগ অস্বীকার করে। অক্টোবরে প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বরাত দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে নির্যাতনের ফলে ১৪ জনের মৃত্যু হবার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন প্রায় আট হাজার মানুষ আর নিহত হয়েছেন ৮১ জন।
অন্তর্বর্তী সরকার শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের চলমান আন্দোলনের মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হলো। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, যত দ্রুত সম্ভব এই মামলার তদন্তের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এ হত্যাকাণ্ডে পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অটল এবং যেকোনো আন্তর্জাতিক তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। এর আগে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার তদন্তের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ইনকিলাব মঞ্চ ও হাদির পরিবার। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে তারা সেখানে জড়ো হন। রাতে প্রেস সচিবের ঘোষণার সময়ও হাদি হত্যার বিচার দাবিতে যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখে ইনকিলাব মঞ্চ। সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে সংগঠনটির একাধিক সদস্য যমুনার দিকে অগ্রসর হন। এ সময় তারা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, “সরকার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে ইনকিলাব মঞ্চ। কিন্তু ইনকিলাব মঞ্চ সহযোগিতা চাইলে বারবার সবাই হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হাদি হত্যার তদন্তের দাবিতেই আমরা যমুনার সামনে অবস্থান নিয়েছি।” উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুর্বৃত্তরা শহিদ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মাথা ও ডান কানের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক সপ্তাহ পর, ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতির পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থায়ও তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক তৎপরতা। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ টাকার প্রবাহ দ্রুত বাড়ছে। নির্বাচনি প্রচার, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের নানা ব্যয় মেটাতে প্রার্থীদের বড় একটি অংশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের পথে হাঁটছেন— যার স্পষ্ট প্রতিফলন মিলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসে— ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। নভেম্বরে যেখানে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা, জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই মাসেই নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সাম্প্রতিক সময়ে নগদ টাকা উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে। প্রার্থীরা প্রচার ব্যয় মেটাতে নগদ অর্থ ব্যবহার করছেন বলেই এই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, বড় ও সন্দেহজনক লেনদেন নজরদারির আওতায় রয়েছে এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সার্বক্ষণিকভাবে এসব লেনদেন পর্যবেক্ষণ করছে। হঠাৎ উল্টো স্রোত এই নগদ প্রবাহের ঊর্ধ্বগতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর আগের কয়েক মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই অঙ্ক প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা কমে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনি ব্যয়ের কারণেই হঠাৎ এই উল্টো স্রোত তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচনের আগে নগদ টাকার চাহিদা বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সন্দেহজনক লেনদেন হলে তা রিপোর্ট করার ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। কালোটাকার আশঙ্কা ও নজরদারি নগদ টাকার এই দ্রুত বিস্তার কালোটাকার ব্যবহার বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছে। সে কারণেই বিএফআইইউ নির্বাচন সামনে রেখে নজরদারি জোরদার করেছে। গত ১১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনও হিসাবে একদিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হলে তা বাধ্যতামূলকভাবে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) আকারে জমা দিতে হচ্ছে। রেমিট্যান্সে জোয়ার নির্বাচনের আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক— রেমিট্যান্সে দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক প্রবণতা। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। শুধু জানুয়ারিতেই এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা একক মাস হিসেবে দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি। ডলার কিনে টাকার তারল্য রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ায় ডলারের সরবরাহ ভালো থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে। চলতি ফেব্রুয়ারিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৯ কোটি ডলার কেনা হয়েছে, যার বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এতে টাকার বাজারে তারল্য বাড়লেও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের। ডিজিটাল লেনদেনে কড়াকড়ি নির্বাচনের আগে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে অর্থ স্থানান্তর সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘিরে নগদ অর্থের এই অদৃশ্য দাপট গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কঠোর নজরদারি ও ভোটারদের সচেতনতাই পারে এই দুষ্টচক্র ভাঙতে।
১২ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হলে বিএনপি সরকার গঠন করে দক্ষিণাঞ্চলে খাল খননসহ কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করবেন—এমন ঘোষণায় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বরিশালের এক জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে অনেকেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার বাসিন্দা সুলতান হাওলাদার বলেন, “কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা শোনার পরই মনে হয়েছে—তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের সন্তান। আর যখন খাল খননের ঘোষণা দিলেন, তখন আর কোনো সন্দেহই রইল না।” তিনি আরও বলেন, ছোটবেলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সারা দেশে খাল খননের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা দীর্ঘদিন ধরে কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুফল বয়ে এনেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে খালগুলো ভরাট হওয়ায় সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, দখল ও পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে কৃষিকাজে সংকট তৈরি হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা ফাতেহা খানম বলেন, “উন্নয়ন দরকার, কিন্তু নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী-খাল দখল মেনে নেওয়া যায় না। ধান-নদী-খালের বরিশাল তার ঐতিহ্য হারাক, সেটাও চাই না।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমান বাবার শুরু করা জনবান্ধব কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বরিশাল নগরের বেলস পার্ক মাঠে বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনের বিএনপি ও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের নিয়ে জনসভা করেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি বলেন, “১৩ তারিখ থেকে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে। দক্ষিণাঞ্চলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেই কাজ আবার শুরু করব।” তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, “কে কে আমার সঙ্গে খাল খনন করতে যাবেন?” জনসভায় উপস্থিত হাজারো মানুষ হাত তুলে সমর্থন জানান। তারেক রহমান আরও বলেন, “এই বাংলাদেশ জনগণের বাংলাদেশ। দেশ চলবে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে। আগামী ১২ তারিখ মানুষ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে, যারা জনগণের কাছে জবাবদিহিতার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করবে।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলেই বরিশাল বিভাগ ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমরা অনেক কাজ করেছি, তবে এখনও অনেক কাজ বাকি। বিএনপির রাজনীতির মূল কথা একটাই—জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।”
এরশাদের পতনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় অনুষ্ঠিত প্রায় সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন। তবে সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না দলটি। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে দলীয় প্রতীক নৌকাও বাতিল করা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে— নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকলে তাদের বিপুল ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে এবং এর প্রভাবই বা কতটা পড়বে ফলাফলে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দলগুলোর চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে দলটির কার্যক্রম স্থগিত এবং একই দিনে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক পথ বন্ধ হয়ে যায়। ‘ভোট নেই, ব্যালট নেই’— শেখ হাসিনার নির্দেশ ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠকে নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে নিরুৎসাহিত করেছেন। পাশাপাশি ‘ব্যালট নেই, ভোট নেই’— এই বার্তা সাধারণ ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেন তিনি। তার মতে, নৌকা প্রতীক ছাড়া ভোটে অংশ নেওয়া মানেই অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া। ভোটের সমীকরণ ও রাজনৈতিক কৌশল নৌকা প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টানতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল নানা কৌশল নিচ্ছে। কেউ নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে, কেউ সহানুভূতির ভাষায় কথা বলছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পাশে দাঁড়ানো তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের নেতারাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্যের পেছনে মূলত ভোটের অঙ্কই কাজ করছে। জরিপে কী উঠে এসেছে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে— আগে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাদের ৪৮.২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দিতে চান নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭.৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ২৭ শতাংশ বিএনপি, ১৭ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন ১৮.৬ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন এই জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটার অংশ নেন। বিশ্লেষকদের মত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। যারা যাবেন, তাদের ভোট বিভক্ত হতে পারে— কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াত কিংবা অন্য প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে পারেন। সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দনের মতে, আওয়ামী লীগের একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনে প্রভাব পড়বে কি? রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকলেও নির্বাচন স্বাভাবিক হবে। আবার কেউ মনে করছেন, দলটির অনুপস্থিতি ভোটের চরিত্র বদলে দিতে পারে। বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ভীতি না থাকলে আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক ভোট দিতে যাবেন। অন্যদিকে জামায়াত নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকলেও ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। সব মিলিয়ে, নৌকাবিহীন এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে— সেটিই এখন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইজারা নিয়ে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়েছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। ফের রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বন্দর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি, ১৬ কর্মচারীর বদলিসহ শাস্তি প্রত্যাহার, বন্দরের স্বার্থ-বিরোধী কোনো চুক্তি না করা এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড নামের প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে আনা যাবে না দাবি এমন দাবি জানিয়ে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এ সময় বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ রয়েছে, থেমে আছে পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রমও।এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি কোম্পানিকে চট্টগ্রামের নিউমোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা থেকে আপাতত সরে আসছে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তবে চুক্তির আলোচনা চলমান থাকবে। অন্যদিকে এম সাখাওয়াত হোসেন রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, লাগাতার কর্মবিরতি দমনে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে। ন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তি হচ্ছে না বলে জানিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) জানিয়েছেন, এই সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তি হচ্ছে না। তারা আমাদের কাছে একটু সময় চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের হাতে মাত্র ২টি কার্যদিবস বাকি আছে। তাই এ সময়ের মধ্যে হচ্ছে না। আশিক চৌধুরী বলেন, ‘প্রজেক্টটা ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল। গত এক মাসে ফাইনাল বোঝাপড়ার ধাপটা শুরু হয়েছিল। যা এখনো চলমান। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন তাদের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। যা চলমান থাকবে। এটা সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় লাগবে।’ আশিক চৌধুরী জানান, এনসিটি ইজারা প্রসঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তারা একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে তারা আলোচনা বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করতে তাদের আরো কিছু সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে আলোচনা চলমান থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনো সময় সাপেক্ষ। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, যেহেতু আমাদের হাতে আর দুই কার্যদিবস সময় আছে। তাই আশা করছি এ আলোচনা এ সরকার পার হয়ে, নির্বাচন পার হয়ে আগামী দিনেও চলমান থাকবে এবং পর্যায়ক্রমে এটি ফলপ্রসূ হবে। এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট চলতে দেওয়া যায় না উল্লেখ করে নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, এ বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে। কতিপয় লোক পুরো বন্দরকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। আর কয়েকদিন পরে রোজা। আমরা প্রতিনিয়ত নদীতে অভিযান চালাচ্ছি। বহির্নোঙরে পড়ে আছে ছোলা, ডাল ও তেল। ১৮ কোটি মানুষকে তারা (ধর্মঘটকারীরা) জিম্মি করেছে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। সরকার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে ধরা হয়েছে, বাকিদেরও ধরা হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দাবি করেন, সেখানকার অবস্থা স্বাভাবিক। শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনি ব্যবস্থা নেবে। তবে সরেজমিনে দেখা যায়- রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করেছেন। বিভিন্ন জেটিতে সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ রয়েছে, থেমে আছে পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রমও। সকাল থেকে বন্দরের ভেতরে কোনো ধরনের ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন প্রবেশ করেনি। আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন আন্দোলন দমাতে ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে। বন্দর ও আশেপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ, সেনাবাহিনীর সদস্য মোতয়েন রয়েছে। সংগ্রাম পরিষদের দুজনকে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন বলেন, সকাল থেকেই আমাদের ধর্মঘট চলছে, কোথাও কোনো কাজ হচ্ছে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে শতভাগ সমর্থন দিয়ে কাজে যোগ দেননি। আন্দোলন দমাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, শামসু মিয়া ও আবুল কালাম আজাদ নামে আমাদের দুজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়েছে বলে খবর পেয়েছি। এনসিটি পরিচালনার ভার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতির ডাক দেয় বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। পরে তারা বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন চালিয়ে যান। গত মঙ্গলবার থেকে সংগ্রাম পরিষদ লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেন। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। তার সঙ্গে বৈঠকের পর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ দুইদিনের জন্য তাদের কর্মবিরতি স্থগিত ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা নিয়ে আবারও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ)। ইউরোচ্যাম জানিয়েছে, বর্তমানে ১৩ হাজার কনটেইনারে আনুমানিক ৬৬০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় আট হাজার কোটি টাকা) মূল্যের পণ্য আটকে আছে। ফলে রপ্তানিসূচি ভেঙে পড়ছে, পণ্য সময়মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না এবং লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোচ্যাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় চালু করার আহবান জানিয়েছে। এর আগে গত শনিবার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা। প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর নেতারা এ উদ্বেগের কথা জানান।
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ যখন অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন, তখন পূবালী ব্যাংক থেকে একটি রুগ্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ কিনে নিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে ওই ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি টাকা। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ঋণ বেড়ে ৩০ কোটি হয়েছে। ঋণের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। খেলাপি হয়ে পড়ায় দুইবার ঋণ নবায়ন করিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়নি। বর্তমানে আবু নাসের বখতিয়ার অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এখন আবার তিনি মেসার্স চৌধুরী এন্ড কোম্পানী নামের হিমায়িত মৎস্য রফতানিকারী প্রতিষ্ঠানটিকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দিতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের ইচ্ছা আর নিজের সুবিধার বাস্তবায়নে কাজ করছেন চট্টগ্রামের সার্কেল মহাব্যবস্থাপক এ কে এম শামীম রেজা। জানা গেছে, দীর্ঘ একদশক ধরে চট্টগ্রামের এ প্রতিষ্ঠানটির রফতানি কার্যক্রম বন্ধ। এমন প্রতিষ্ঠানকেই ঋণ দিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন অগ্রণী ব্যাংকের নয়া চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মেসার্স চৌধুরী এন্ড কোম্পানিকে ঋণ দিতে। এমনকি নিজ হাতে ফাইলে কাটাকাটি করে ঋণের টাকার পরিমাণ বাড়িয়েছেন। আর এসব অভিযোগ নিজ মুখে স্বীকারও করে নিয়েছেন চেয়ারম্যান। আপন দেশকে তিনি জানিয়েছেন, সববাধা ভেদ করেই এ খেলাপি প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ দিতে চান তিনি। অগ্রণী ব্যাংকে চৌধুরী এন্ড কোম্পানী লিমিটেডের বর্তমাণ ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। গত ১৭ বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলেও ঋণের টাকা পরিশোধ করেনি। উল্টো নতুন করে ৪০ কোটি টাকা ঋণ পেতে তোরজোর চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ঋণটি পাইয়ে দিতে খেলাপি ঋণকে নিয়োমিত দেখানো হয়েছে চেয়ারম্যানের নির্দেশে। এটি ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী গুরুতর অনিয়ম। এছাড়া ডিএমডি সহ কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গেলে অন্য মালিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নিজের ব্যবসা হিসেবে দেখিয়েছেন। পরিদর্শক দলের একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য স্বীকার করেছেন। এমনকি চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি স্বীকার করেন, চৌধুরী এন্ড কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ থাকায় এখানে ভাড়ায় অন্য প্রতিষ্ঠান চলছে। অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট শাখার কোন সুপারিশ বা প্রস্থাব ছাড়াই চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রামের সার্কেল জিএম মিলে এ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অথচ রফতানির মাধ্যমে চৌধুরী এন্ড কোম্পানির অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ( দুদক) তদন্ত করছে। অগ্রণী ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, নতুন ঋণের জন্য ১৯৭৫ সালে নির্মিত ভবন ও ব্যবহার অযোগ্য যন্ত্রপাতি জামানত হিসেবে দিচ্ছে এ গ্রাহক। যেভাবে অগ্রণী ব্যাংকে ঢুকল চৌধুরী এন্ড কোম্পানী অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি’র আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখায় চৌধুরী এন্ড কোম্পানী (বিডি) লিমিটেডের অনুকূলে সর্বপ্রথম ২০০৭ সালের ২৪ জানুয়ারি ১২ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। এ ঋণের মধ্যে পূবালী ব্যাংক থেকে প্রতিষ্ঠানটির দায়দেনা টেক-ওভার করা হয় ৮ কোটি টাকার। বাকি ৪ কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসাবে বিতরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি পূবালী ব্যাংকে থাকা অবস্থায় রুগ্ন ছিল। পূবালী ব্যাংক থেকে ঋণটি টেক-ওভারের সময় বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন। তার তত্বাবধানেই রুগ্ন গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছিল। এদিকে অগ্রণী ব্যাংকে এ ঋণের সীমা দিন দিন বেড়েছে। ঋণগ্রহীতার আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল ১২ কোটি টাকার ঋণসীমা ১৮ কোটি টাকায় বর্ধিত করা হয়। যা সর্বশেষ ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর মেয়াদে নবায়ন করা হয়েছিল। বর্ধিত ৬ কোটি টাকা ঋণ দ্বারা ওই গ্রাহক মাত্র ৩ কোটি টাকার মাছ রফতানি করে। বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছিল বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। বন্ধ প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্ কোং লিমিটেডের অনুকূলে ২৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঋণ প্রদানের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়েছিল দুদকে। ২০১৫ সালেল ৩১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য উপান চাওয়া হয় ব্যাংকের কাছে। এ ঋণটি অনুমোদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যাতে অনিয়মের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। এরপরও সর্বশেষ ২০১৫ সালের ৭ মে ১৮ কোটি টাকা ঋণসীমা ২৫ কোটি টাকায় বর্ধিত করা হয়। পূবালী ব্যাংক থেকে টেক-ওভার করার চৌধুরী এন্ড কোম্পানির অনুকূলে তিন দফায় মোট ১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা চলতি মূলধন ঋণ বিতরণ করা হয়। ঋণগ্রহীতা ঋণের টাকা যথাযথভাবে ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে ফান্ড ডাইভার্টের মাধ্যমে আত্মসাৎ করে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায় মর্মে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি নথি গেছে। এতে বলা হয়েছে, মেসার্স চৌধুরী এন্ড কোম্পানী একটি ১০০% হিমায়িত মৎস্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। মঞ্চজুরীকৃত ১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার হিমায়িত মৎস্য রফতানি করা হলে রফতানি মূল্য বা এক্সপোর্ট প্রসিড আসেনি। ঋণগ্রহীতা ফান্ড ডাইভার্ট করে টাকা আত্মসাৎ করায় বর্তমানে ঋণ হিসাবে ২৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা দায়স্থিতি রয়ে গেছে। এদিকে নতুন করে ৪০ কোটি টাকা ঋণের জন্য গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধান কার্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট ডিভিশন-২ এর প্রকৌশলীরা কারখানা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের ভিত্তিতে গত ৩ অক্টোবর একটি রিপোর্ট দিয়েছেন তারা। উক্ত রিপোর্টে কারখানার যন্ত্রপাতি ১৭ বছরের পুরাতন এবং প্রায় ব্যবহারের অযোগ্য মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ এবং বর্তমানেও ঋণগ্রহীতার ব্যবসা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ আছে মর্মে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। পরিদর্শন টিমের ‘না’, চেয়ারম্যানের ‘হ্যা’ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানীকে নতুন ঋণ দেয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখার কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন সার্কেল জিএম শামিম রেজা। শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফয়ছল মোর্শেদ, চট্টগ্রাম সার্কেলের উপ-মহাব্যবস্থাপক সফিউল আজম ও আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখার এসপিও মোহাম্মদ শাহজাহানকে দুই বার প্রধান কার্যালয়ে ডেকে এনে রীতিমতো শাসিয়েছেন তিনি। এদিকে গত ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ক্রেডিট কমিটির সভায় শাখার প্রস্তাব ছাড়াই ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার এ মেমো কাটাকাটি করে ৫ কোটির পরিবর্তে ৮ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করেন৷ অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, পরিচালনা পর্ষদের কোন চেয়ারম্যান নিজ হাতে কাটাকাটি করে ক্রেডিট কমিটির মেমো সংশোধন করেছেন- এমন নজির অগ্রণী ব্যাংকের ইতিহাসে নাই। অথচ বর্তমান চেয়ারম্যান ঋণগ্রহীতাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণসুবিধা প্রদানের জন্য নিজ হাতে কাটাকাটি করে ক্রেডিট কমিটির মেমো সংশোধন করেছেন। কর্মকর্তা বলেন, দ্রুততার সঙ্গে একটি মৃত প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন প্রচেষ্ঠার রহস্য কি? কোনো ভালো গ্রাহকের ঋণ প্রস্তাবও এত দ্রুততার সঙ্গে পর্ষদ সভায় উপস্থাপিত হয় না। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বক্তব্য এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, আমি চৌধুরী এন্ড কোং লিমিটেডকে টেকওভার করতে সহায়তা করেছি। তখন আমি এ ব্যাংকের এমডি ছিলাম। তিনি বলেন, ব্যাংক চাইলে একটি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে আবার চাইলে পথেও বসাতে পারে। গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠানকে বেকায়দায় ফেলা হয়েছে। তারমধ্যে মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড কোং লিমিটেডে একটি। তিনি সাফ বললেন, যে যাই বলুক আমি এ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে চাই। রাজনৈতিক কারণে বিগতদিনে আরও যেসব প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়েছে তাদেরকেও ঋণ দেব। এ সময় তিনি পারটেক্স বেভারেজ-এর এমডি রুবেল আজিজের নাম উল্লেখ করে বলেন, উনিও খেলাপি, তারপরও তাকে আমি ঋণ দেব…।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ব্যালট প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার জন্য ২০ লাখ ডলার অনুদান দিচ্ছে কানাডা। এজন্য রোববার ইসির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনার অজিত সিং। রাজধানীর নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনে এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- নির্বাচন কমিশন সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ও ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফান লিলার। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে অজিত সিং বলেন, আমি বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের অগ্রগতিতে গর্বিত। কানাডা অবশ্যই বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার এবং বন্ধু। আমরা আপনাদের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। তিনি বলেন, বর্তমানে ১ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি-কানাডিয়ান দুই দেশের সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কী ঘটে তা কানাডা এবং বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফান লিলার বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য জাতিসংঘের এ কনসোর্টিয়ামকে সমর্থন দেওয়ায় আমি কানাডার করদাতাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি বলেন, গত এক বছর ধরে ইউনেস্কো, জাতিসংঘ নারী, ইউএনওডিসি এবং ইউএনডিপি-এই চারটি সংস্থা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে আসছে। কানাডার এ নতুন তহবিল সেই প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করবে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতয়ি নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য ইউএনডিপির সহায়তায় ব্যালট নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইসি। সেখানে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে কানাডা।
জানুয়ারি মাসে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। এদিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশে, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কঞ্জুমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। চাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে গ্রামে খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এছাড়া সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তবে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। এদিকে জানুয়ারি মাসে শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এছাড়া সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বিবিএস বলেছে, জানুয়ারি মাসে মজুরি হার খুব সামান্যই বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। কৃষি খাতে মজুরি হার কমে হয়েছে ৮ দশমিক ১২ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। শিল্প খাতে মজুরি হার কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। সেবা খাতে মজুরি হার স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। জানুয়ারিতে হয়েছে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ, ডিসেম্বরে মাসেও একই রয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ উপলক্ষে চারদিনের জন্য মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেনে নতুন সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লেনদেনের নতুন এই সীমা আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে কার্যকর হবে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই সময়ে বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার গ্রাহকরা দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন; এর বেশি লেনদেন করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমা অনুযায়ী লেনদেন পরিচালনা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, নির্বাচন কমিশনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অর্থ পাচার ঠেকাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক তথ্য প্রদানে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালা যথাযথভাবে প্রতিপালনের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি নির্দেশনামূলক চিঠি দেশের সব রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১৬ অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে চাইলে প্রার্থী, তার নির্বাচনি এজেন্ট বা দলের পক্ষ থেকে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ সব শনাক্তকরণ তথ্য প্রচারণা শুরুর আগেই রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে। এছাড়া বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ২২-এর উপবিধি (২) অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন, বুস্টিং ও স্পন্সরশিপসহ সব ধরনের ব্যয় নির্বাচনি ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। এসব ব্যয়ের হিসাব সামগ্রিক নির্বাচনি ব্যয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে নির্বাচন কমিশনের কাছে দাখিল করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে যে ব্যয় হবে তা অবশ্যই নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে এবং রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালায় উল্লিখিত সব নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করতে রিটার্নিং অফিসারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে কোন রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী কোন কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, সে সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ শাখায় প্রেরণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় গোষ্ঠীগত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মুস্তাকিম মিয়া (১৪) নামে এক স্কুল শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৬টার দিকে উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়দাবাদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।নিহত মুস্তাকিম ওই এলাকার সৌদি প্রবাসী মাসুদ রানার ছেলে এবং স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চরাঞ্চল সায়দাবাদ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এসব বিরোধকে কেন্দ্র করে এর আগেও একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর জেরে উভয়পক্ষের নারীসহ অন্তত আটজন আহত হন এবং বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এলাকার এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন হানিফ মাস্টার এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে আছেন এরশাদ মিয়া। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় বুধবার সকালে এরশাদ মিয়ার অনুসারীরা দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হানিফ মাস্টারের অনুসারীদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে এরশাদ গ্রুপের সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ মিয়ার ভাতিজা মাসুম ওরফে চাইনা গুলি ছোড়েন। এতে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থী মুস্তাকিম গুলিবিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে দাবি পরিবারের। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে সায়দাবাদ এলাকার রফিকুল ইসলাম (৩৭), সোহান (২৬) ও রোজিনা বেগম (৩৫) গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য আহতদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। নিহতের মা শাহানা বেগম বলেন, সকালে আমার ছেলে ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে ছিল। তখন হঠাৎ গুলি এসে লাগে। আমরা কোনো দলের সঙ্গে জড়িত নই। যারা আমার বুক খালি করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বিমল চন্দ্র ধর বলেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মুস্তাকিম নামে এক কিশোরকে হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায় তার শরীরের বাম পাশে গুলির চিহ্ন রয়েছে এবং গুলিটি শরীর ভেদ করে বের হয়ে গেছে। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। রায়পুরা থানার ওসি মো. মুজিবুর রহমান নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। আহতের সঠিক সংখ্যা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে তার চলতি দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সরকার। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মো. সাইফুজ্জামান লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পের মূলধন অংশের ‘অনাবাসিক ভবন’ খাতে কাজ (W-1) প্যাকেজের সিভিল কাজ অনুমোদিত DPP, RDPP বা HOPE ছাড়াই বিধি-বহির্ভূতভাবে বাস্তবায়ন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি প্যাকেজকে ৮টি প্যাকেজে বিভাজন করে ই-জিপির মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান করেন এবং এতে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এছাড়া, ৮টি প্যাকেজের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে পরিশোধিত বিলের বিপরীতে বাস্তবে কোনো কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের জন্য নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ব্যতীত অন্য ৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে কাজ না করেই বিল পরিশোধ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির শামিল। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী মো. সাইফুজ্জামানকে ৩ ফেব্রুয়ারি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী ভাতা প্রাপ্য হবেন।
গত কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মটিতে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও ট্রেন্ডের মধ্যে একদিকে বিনোদনের ছোঁয়া থাকলেও, অন্যদিকে কিছু কিশোর সদস্য একটি গ্যাং আকারে সংগঠিত হয়ে ঐ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসদুপায়ে প্রবেশ করে। এদিকে, আজ সকালের এক সংঘর্ষের ফলশ্রুতি হিসেবে খবর আসে যে, এই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সংঘর্ষে এক কিশোর নিহত হন। ঘটনার সূত্রে জানা যাচ্ছে, দুটি প্রতিপক্ষের মধ্যে মূলত টিকটকের মাধ্যমে প্রচারিত চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতার জগতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শত্রুতা ও দ্বন্দ্ব শুরু হয়। প্রতিপক্ষ দলগুলো নিজেদের মধ্যে অনলাইনে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতায় জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকে। প্রতিবেশি এলাকায় একরাশে ছড়িয়ে পড়া এই দ্বন্দ্ব প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারায় অবশেষে মাটি ও গ্যাসে প্রাণের ধারা ছোঁয়াতে দেখা যায়। প্রথম রিপোর্টে জানানো হয় যে, সংঘর্ষটি শহরের এক জনপ্রিয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে ঘটেছিল, যেখানে একাধিক কিশোর একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, কিন্তু সংঘর্ষের মধ্যে একটা কিশোর গুরুতর আঘাতগ্রস্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসকের তথ্য অনুসারে, আহত কিশোরটি রক্তক্ষয়নের কারণে প্রাণ হারানোর মুখে পড়েছিল। পুলিশ একটি বিশেষ তদন্ত শুরু করে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন মোবাইল ফোন, টিকটকের ভিডিও ফুটেজ ও কথোপকথনের রেকর্ড সংগ্রহ করেছে। সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও আইনপ্রয়োগ সংস্থার হস্তক্ষেপ ঘটনার পরক্ষবর্তী সময়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিক্রিয়া চটকদার। পিতামাতা, শিক্ষাবিদ এবং সামাজিক কর্মীরা সক্রিয়ভাবে সামাজিক মাধ্যম ও প্রচলিত গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। একাধারে অভিযোগ উঠছে, টিকটকের মাধ্যমে প্রচারিত অনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা ক্ষতির কারণ হিসেবে কাজ করছে। পুলিশ বিভাগের তরফ থেকে বলেছে, “এই ধরনের অনলাইন প্রতিযোগিতা ও চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অনেক সময় অ-আবশ্যক উত্তেজনা ও হিংসাত্মক প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়। আমাদের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি নিয়ে কঠোর তদন্ত চলমান। যারা এ ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” উচ্চ ব্যবস্থাপনা থেকে নির্দেশ এসেছে, টিকটকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নজরদারি বাড়ানো হবে এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে, যুব সমাজে অনলাইনে সৃষ্ট এই ধরনের প্রতিযোগিতা ও সংঘর্ষের প্রভাব দূর করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পিতামাতা ও কমিউনিটি নেতাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে। সামাজিক গবেষণা ও নারী সমাজবিদরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি ইন্টারনেট সমস্যা নয়, বরং এটি সমাজের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও যুব সমাজের চেতনা সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই দাবী করছেন, সরকারকে এবং টিকটকের নীতিনির্ধারকদের উচিত, এ ধরনের অনৈতিক ও উত্তেজক বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যাতে ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এর পাশাপাশি, স্কুল, কলেজ ও কোচিং সেন্টারগুলিতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে অনলাইন চ্যালেঞ্জের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে, তাদেরকে বৈধ ও সঠিক বিনোদনের মাধ্যম খুঁজে পেতে উৎসাহিত করা হবে। অপরাধ তদন্ত বিভাগের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, “আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে চোখে পড়া সব প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে যাচ্ছি। সংঘর্ষের আসল কারণ, ঘনিষ্ঠ অনলাইন প্রতিযোগিতা থেকে উদ্ভূত উত্তেজনা ও বাস্তব জীবনে আক্রমণের মর্মস্পর্শী প্রভাব স্পষ্ট। যারা এই কার্যক্রমে লিপ্ত রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনী প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।” শহরের আইন প্রয়োগ সংস্থা ও প্রবাসী সংগঠনগুলিও একাত্মভাবে কাজ করছে, যাতে ভবিষ্যতে অনলাইন প্রতিযোগিতা ও চ্যালেঞ্জ থেকে উদ্ভূত হত্যাকাণ্ড বা আক্রমণ রোধ করা যায়। তরুণ সমাজে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সবাই মিলে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা ও সমাজসেবী।
দেশজুড়ে অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের সাইবার ইউনিট। বিশেষ করে চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে এই চক্র নতুন কৌশলে প্রতারণা চালাচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এই চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের ডিজিটাল অপরাধ দমন শাখা (Cyber Crime Investigation Division)। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম (যেমন: টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ) এবং ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। সাইবার ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার তানভীর হাসান বলেন, “এই চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরীক্ষার্থীদের মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও প্রতারণা আইনে মামলা হয়েছে।” ‘গ্যারান্টি’ দিয়ে বিক্রি হতো ভুয়া প্রশ্নপত্র প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি মূলত দুটি ধাপে কাজ করত—প্রথমে তারা ফেসবুকে ‘ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন’ বা ‘সরকারি চাকরি প্রশ্ন ফাঁস’ নামে কিছু গ্রুপ চালু করত। সেসব গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করত, পরীক্ষার আগেই তারা “আসল প্রশ্নপত্র” দিতে পারবে। দ্বিতীয় ধাপে, আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে গোপন চ্যাটে কথা বলে বিকাশ/নগদে টাকা সংগ্রহ করত। অনেক সময় তারা আগের বছরের প্রশ্ন বা সাজানো প্রশ্ন ‘নমুনা’ হিসেবে পাঠিয়ে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করত। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বেশ কিছু ফেক অ্যাকাউন্টের তথ্য, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মাহবুবা হোসেন বলেন, “ভয়াবহ বিষয় হলো—তরুণ প্রজন্ম এখন অনলাইন প্রতারণাকে সহজলভ্য করে দেখছে। প্রশ্ন ফাঁসের গুজবের পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বড় কারণ।” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হুঁশিয়ারি ও পরামর্শ পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে ধরা পড়া ব্যক্তিরা অন্তত তিনটি বড় পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শতাধিক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করেছে। শুধু গত দুই মাসেই তারা প্রায় ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি পুলিশের। ডিজিটাল অপরাধ দমন শাখা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নামে কোনো ধরনের লেনদেনে জড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি। এমন প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সাইবার হেল্পলাইনে (৯৯৯ বা সাইবার পোর্টাল) জানাতে বলা হয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের চক্রকে প্রতিরোধ করতে হলে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অনেক সময় পরীক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়ে শর্টকাট খুঁজতে গিয়ে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যায়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ইতোমধ্যে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, “প্রশ্নপত্র ফাঁস বলে কোনো ব্যবস্থা বা সংযোগ বাস্তবে নেই। কেউ এ ধরনের গুজবে কান দেবেন না। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করুন।” পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চক্রটি আরও বড় পরিসরে বিস্তার লাভ করছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় আরও কিছু সদস্যের খোঁজ চলছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেল থেকে গোপনে ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগী তরুণীর করা মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে শনিবার গভীর রাতে আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত যুবক দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে তোলে। পরে কৌশলে তাদের হোটেল বা ভাড়া বাসায় নিয়ে গিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণ করত। সেই ভিডিও পরে ভুক্তভোগীদের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় বা বিভিন্ন অনৈতিক দাবির চেষ্টা করত সে। ভুক্তভোগী তরুণী জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর এক পর্যায়ে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। তিনি জানান, তার অজান্তেই ঘরে গোপনে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে সামাজিকভাবে হেয় করার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয় এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করলে, পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তার মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ থেকে একাধিক নারীর গোপন ভিডিও ও ছবি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই ধরনের ঘটনা সমাজে ভয়াবহ বার্তা দেয়। বিশেষ করে তরুণীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অপরিচিত কারো সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক না হলে এমন ঘটনার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে এবং ব্ল্যাকমেইলের ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গোপনে ভিডিও ধারণ এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া জরুরি। সাইবার অপরাধের এই ধারা রোধে প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগ, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে মনিটরিং এবং ভুক্তভোগীদের সহজে আইনি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এর প্রধান শিকার হয়ে উঠেছে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেম কিংবা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার—এইসব প্রযুক্তিনির্ভর দৈনন্দিন অভ্যাসই এখন তাদের ঝুঁকিতে ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়লেও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়েনি। ফলে প্রতারণা, ফিশিং, হ্যাকিং, ভুয়া লিংকে ক্লিক করে তথ্য চুরি, ব্ল্যাকমেইলিং, ফেক আইডি তৈরি করে হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ অহরহ ঘটছে। বিশেষ করে টিনএজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সহজেই টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের ফাঁদে পড়ে অনেকেই নিজেদের তথ্য দিয়ে দিচ্ছে। এরপরে শুরু হয় প্রতারণা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছাত্রীদের ছবি বা ভিডিও এডিট করে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে, যা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ভুক্তভোগীদের। শুধু সামাজিক হয়রানি নয়, আর্থিক প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ইনকাম বা স্কলারশিপের প্রলোভনে পড়ে ভুয়া ওয়েবসাইটে তথ্য দিয়ে দিচ্ছে কিংবা অর্থ জমা দিচ্ছে—যার মাধ্যমে তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে। অপরদিকে, গেমিং অ্যাডিকশন বা ডার্ক ওয়েব নিয়ে আগ্রহী হয়ে অনেক তরুণই নিজেই জড়িয়ে পড়ছে সাইবার অপরাধে। এটি শুধু তাদের ভবিষ্যতের জন্যই হুমকি নয়, বরং দেশের সাইবার নিরাপত্তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তারা সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে এসব অপরাধ চিহ্নিত ও দমন করার চেষ্টা করছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদেরও হতে হবে সচেতন। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা, অপরিচিত লিংক বা অ্যাপ এড়িয়ে চলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমিত তথ্য শেয়ার করা এবং সন্দেহজনক বার্তা পেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এই কিছু সাধারণ পদক্ষেপই অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার সচেতনতা বিষয়ক কর্মশালা চালু করা, অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর কৌশল তৈরি করাও জরুরি হয়ে উঠেছে। কেননা, তরুণ প্রজন্ম যদি ভয় বা অনিরাপত্তায় ভোগে, তাহলে তা দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক অদৃশ্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। প্রযুক্তির জগতে এগিয়ে যেতে হলে শুধু প্রযুক্তি জানলেই হবে না—নিরাপদ থাকা ও অন্যকে নিরাপদ রাখা, দুটোই একসঙ্গে শিখতে হবে। তরুণদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখনই সময় সম্মিলিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ১৪ হাজার ৩৮৫ পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) এ ফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলায় সর্বাধিক ২ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর কুমিল্লা থেকে ২ হাজার ৫৬৪ জন, কুড়িগ্রাম থেকে ২ হাজার ৪৬০ জন, দিনাজপুর থেকে ২ হাজার ৪২১ জন, গাইবান্ধা থেকে ২ হাজার ২৯৫ জন, সিরাজগঞ্জ থেকে ২ হাজার ১২৩ জন এবং সুনামগঞ্জ থেকে ২ হাজার ৬০ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল গত ২১ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়। এতে মোট ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। একই সঙ্গে জেলাভিত্তিক উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়। গত বছরের ৫ ও ১২ নভেম্বরের বিজ্ঞাপনের আলোকে ৬১টি জেলায় (তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা ১ হাজার ৪০৮টি কেন্দ্রে গত ৯ জানুয়ারি একযোগে অনুষ্ঠিত হয়। সহকারী শিক্ষকের ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদের বিপরীতে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৯৫টি আবেদন জমা পড়ে এবং মোট ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন।
দেশে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘শিক্ষা আইন, ২০২৬’ এর খসড়া প্রকাশ করেছে সরকার। প্রস্তাবিত এই আইনে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার এবং নোট-গাইড বইয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জনগণের মতামতের জন্য এ সংক্রান্ত খসড়া আইন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন, ২০২৬ (খসড়া) এর উপর নির্ধারিত [email protected] ইমেইলে মতামত পাঠাতে বলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত আইনকে ১১টি অধ্যায় এবং ৫৫টি ধারায় বিন্যস্ত করা হয়েছে। জনগণের মতামতের পর তা চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত আইন বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) বাসসকে জানিয়েছেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে শিক্ষাকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আইন কখনোই খুব বিস্তারিত হয় না। এটি মূলত দিকনির্দেশনা দেয়। ভবিষ্যতে বিধিমালা ও নীতির মাধ্যমে একে আরও কার্যকর করা হবে।’ শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এই আইনটি দীর্ঘ আলোচনার ফল। মাঠপর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন জেলার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এটি শিক্ষা আইন, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে। খসড়া আইনের ১৫ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সকল প্রকার বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার, গাইড বই এবং নোট বইয়ের কার্যক্রম দেশে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধের কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। শিক্ষার্থীদের মূল পাঠ্যবইমুখী করতে ধারাবাহিকভাবে এসব কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা হবে। আইনে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খসড়া আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সকল প্রকার বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার, গাইড বই এবং নোট বইয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। সরকার বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে এবং শিক্ষার্থীদের মূল পাঠ্যবইমুখী করতে ধারাবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করবে। তবে সরকার অনুমোদিত ‘সহায়ক পুস্তক’ এর ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না। প্রস্তাবিত খসড়া আইনে প্রথমবারের মতো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সমান গুরুত্ব দিয়ে ডিপ্লোমা পর্যায় পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি ও মানসিক নিপীড়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে খসড়া আইনে। ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিক আঘাত বা মানসিক নির্যাতন করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া র্যাগিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খসড়া আইনে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’ এর ভূমিকা জোরদার এবং স্নাতক পর্যায়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসি কর্তৃক নির্ধারিত অভিন্ন ন্যূনতম যোগ্যতা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে ‘জাতীয় গবেষণা পরিষদ’ এবং ‘কেন্দ্রীয় গবেষণাগার’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিধান বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি ইউনিক আইডি বা স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর থাকবে, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে, সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা ইজারা দিতে পারবে না, ই-লার্নিং ও দূরশিক্ষণ জনপ্রিয় করতে দেশব্যাপী একটি সাধারণ অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হবে। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এই আইন আপাতত বলবৎ অন্য যেকোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে। যদি অন্য কোনো আইনের সঙ্গে এই আইনের বিরোধ দেখা দেয়, তবে এই আইনটিই কার্যকর হবে বলে প্রস্তাবিত আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট আরও প্রকট। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে করে পাঠদানের মান যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহও কমে যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যালয়েই শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি বিদ্যালয়ে তিন থেকে চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কোনো স্কুলে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষককে একসঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান করতে হয়, যা কোনোভাবেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। একজন শিক্ষক যখন একই সময় একাধিক শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পড়ান, তখন স্বাভাবিকভাবেই কোনো শ্রেণির উপর পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়। এইভাবে ধাপে ধাপে শিখনের ঘাটতি তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভবিষ্যত শিক্ষাজীবনেও। শুধু পাঠদানের ক্ষেত্রেই নয়, একজন শিক্ষককে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, মিডডে মিল, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হিসাব রাখা, নানা রিপোর্ট প্রস্তুত করাসহ আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক যতই আন্তরিক হোন না কেন, সীমিত জনবল ও অপ্রতুল সময়ের কারণে শিক্ষার মান উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরাও এই সংকটের কারণে দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে। একজন শিক্ষক একসঙ্গে দুই-তিনটি শ্রেণির ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমি সৃষ্টি হয় এবং তারা ধীরে ধীরে স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে। সরকার শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সংকট কাটছে না। অনেক সময় নিয়োগপ্রাপ্তরাও দুর্গম এলাকায় যোগদান করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, ফলে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতেই সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা দরকার। বিশেষ করে দুর্গম ও গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, স্থায়ী পদ সৃষ্টি, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রণোদনা প্রদান এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যাতে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ গ্রহণ করতে পারে। প্রাথমিক স্তরেই যদি শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা না পায়, তবে তা পুরো শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এখনই সময় কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার, যেন একজন শিক্ষককে আর একা একাধিক শ্রেণির ভার বইতে না হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারে।
দেশে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প নির্ভর অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে শুধু সাধারণ শিক্ষায় নয়, বাস্তবভিত্তিক ও হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সেই বিবেচনা থেকেই সরকার এবার কারিগরি শিক্ষার প্রসারে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি অঞ্চলের যুবসমাজকে দক্ষ করে তোলা এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো। বর্তমানে দেশে কারিগরি শিক্ষার পরিসর সীমিত। অধিকাংশ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জেলা বা বিভাগীয় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ। ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার তরুণরা এই ধরনের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। তবে নতুন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপিত হবে, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে করে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে দক্ষ জনবল গড়ে উঠবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেও নতুন দ্বার খুলবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে মূলত বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি মেরামত, ফ্রিজ ও এসি রিপেয়ারিং, কম্পিউটার ও আইটি, ফ্যাশন ডিজাইন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সৌরবিদ্যুৎ এবং রোবোটিক্সের মতো চাহিদাসম্পন্ন কোর্স চালু করা হবে। এসব কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখে চাকরি বা আত্মকর্মসংস্থানের উপযোগী হয়ে উঠবে। প্রশিক্ষণের শেষে তাদের সার্টিফিকেটও প্রদান করা হবে, যা চাকরির ক্ষেত্রেও মূল্যায়িত হবে। তাছাড়া অনেকে নিজের উদ্যোগেও ব্যবসা শুরু করতে পারবে, যার ফলে বেকারত্ব হ্রাস পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হয়। প্রশিক্ষকেরাও হবেন অভিজ্ঞ ও দক্ষ, যারা যুগোপযোগী পদ্ধতিতে পাঠদান করবেন। কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে বিশেষায়িত করাও হবে, যেমন কোনো এলাকায় কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণ বেশি, আবার অন্য এলাকায় আইটি নির্ভর প্রশিক্ষণ বেশি দেওয়া হবে। এইভাবে স্থানীয় চাহিদা ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের ধরন নির্ধারণ করা হবে। এই উদ্যোগ শুধু কর্মসংস্থানের দিক থেকেই নয়, সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে নারী ও প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে, যাতে কারিগরি শিক্ষা সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ঋণ সুবিধা, উদ্যোক্তা পরামর্শ ও চাকরির সংযোগও দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, যা প্রকল্পকে বাস্তবিক ও দীর্ঘমেয়াদি সফলতায় রূপান্তর করবে। সার্বিকভাবে বললে, প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের এই উদ্যোগ গ্রামীণ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজ আরও দক্ষ, আত্মনির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী হয়ে উঠবে, যা স্মার্ট বাংলাদেশের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
করোনা মহামারির সময় থেকেই দেশে অনলাইন ক্লাসের প্রচলন শুরু হয়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির এই প্রয়োগ অনেকটাই জরুরি অবস্থা মোকাবিলার অংশ ছিল। শুরুতে শিক্ষার্থীরা নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে বিষয়টি গ্রহণ করলেও ধীরে ধীরে এর প্রতি আগ্রহ কমতে শুরু করে। এখন দেখা যাচ্ছে, অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতির হার বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন ক্লাস কার্যকর হতে হলে নির্দিষ্ট অবকাঠামো, উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখার কৌশল প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে, দেশের অনেক শিক্ষার্থী এখনো নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা পায় না। আবার অনেকের বাড়িতে নেই প্রয়োজনীয় ডিভাইস, কিংবা থাকলেও তা পরিবারের একাধিক সদস্যের মাঝে ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়। ফলে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ হারানোর অন্যতম কারণ। শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যাই নয়, অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সরাসরি যোগাযোগ করতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না। অনেক সময় তারা বুঝেও না বোঝার ভান করে ক্লাস শেষ করে দেয়। এতে করে বিষয়বস্তুর প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং শিখনে ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস অনেক সময় একঘেয়েমি ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বেশি সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, ফলে শেখার গতি ব্যাহত হয়। শিক্ষকদের একাংশ মনে করেন, অনলাইন ক্লাসে পাঠদানের পদ্ধতি এখনও যথাযথভাবে মানসম্মত হয়নি। অধিকাংশ শিক্ষকই শুধু পাঠ্যবই পড়ে শোনান, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করে না। অপরদিকে, অনেক শিক্ষক নিজেরাও প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ নন, ফলে ক্লাস পরিচালনায় তারা দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসে সম্পৃক্ততা কমে যায় এবং তারা পড়াশোনা থেকে ধীরে ধীরে বিমুখ হয়ে পড়ে। অভিভাবকরাও বলছেন, শিশুদের ঘরে বসে অনলাইনে পড়াশোনায় আগ্রহ ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় তারা মোবাইল বা ল্যাপটপে ক্লাসের নাম করে অন্য কিছুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যা পড়াশোনার ক্ষতি করে। এছাড়া দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে সমস্যা, মানসিক অস্থিরতা ও একাকীত্বও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন হাইব্রিড লার্নিং পদ্ধতি—যেখানে অফলাইন ও অনলাইন উভয় মাধ্যমকে ভারসাম্যের সঙ্গে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া অনলাইন ক্লাসের কনটেন্টকে আরও ইন্টারেক্টিভ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তোলা, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবারও আগ্রহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নয়তো এই ধারাবাহিক শিখন ঘাটতি আগামী দিনে একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও দক্ষতার মানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইউনিফর্ম ও উপবৃত্তি প্রদান দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক স্কুলেই শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে অনুপস্থিতির হার দিন দিন বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম ও উপবৃত্তি না পাওয়া এক ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, অনেক স্কুলেই বছরের শুরু থেকেই ইউনিফর্ম সরবরাহ হয়নি। আবার উপবৃত্তির টাকা এখনো পৌঁছায়নি শিক্ষার্থীদের হাতে। এতে করে দরিদ্র পরিবারগুলো শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। অনেক অভিভাবকই বলছেন, পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে সন্তানদের ইউনিফর্ম কেনা বা অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রী সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সাথে উপবৃত্তির অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া কমে গেছে। এতে করে ঝরে পড়ার আশঙ্কা আরও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও ইউনিফর্ম একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এই সুবিধা নিয়মিতভাবে না পৌঁছালে তাদের স্কুলে উপস্থিতি ব্যাহত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, একই পোশাক বারবার পরার ফলে তা নষ্ট হয়ে যায় এবং নতুনটি কেনার সামর্থ্য না থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। অন্যদিকে, উপবৃত্তির টাকায় তারা যাতায়াত খরচ, খাতা-কলম কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে থাকে। এই অর্থ না পেলে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনেকে জানিয়েছেন, বাজেট বরাদ্দে বিলম্ব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ইউনিফর্ম ও উপবৃত্তি সরবরাহে দেরি হচ্ছে। তবে তারা আশ্বস্ত করেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই সমস্যার সমাধান হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য সুবিধা যথাসময়ে পৌঁছে যাবে। তবে অভিভাবক ও শিক্ষকদের দাবি, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। শিশুদের নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত রাখার জন্য তাদের মৌলিক চাহিদাগুলোর দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যারা সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির, তাদের জন্য শিক্ষা যেন বিলাসিতা না হয়ে যায়। সরকারের উচিত বরাদ্দ, বণ্টন ও বাস্তবায়নে আরও জোর দেওয়া, যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতভাবে পায়। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার আরও কমে যেতে পারে এবং জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হতে পারে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ময়মনসিংহের ভালুকায় রাহিমা খাতুন (৩৬) নামে এক গৃহবধূকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার (৬ ফেব্রয়ারি) রাত সাড়ে ১০টায় উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও গ্রামের গাংগাটিয়াপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতের স্বামীর নাম বিল্লাল হোসেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহতের মেয়ে সোমাইয়া আক্তারকে (১৭) পুলিশ আটক করেছে। এলাকাবাসীর ধারণা মেয়ের প্রেমকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় মা খুন হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার রাতে রাহিমা খাতুন ও তার মেয়ে সোমাইয়া খাতুন রাতের খাবার খাওয়া শেষে একই ঘরের দুই রুমে ঘুমাতে যান। এরপর কে বা কারা তার মাকে হত্যা করেছে তার মেয়ে কিছুই বলতে পারে না। সে শুধু জানায় ঘরের ভেতরে বিড়াল ঢুকলে যেমন শব্দ হয়ে সে তেমনি একটা শব্দ শুনেছেন। কতক্ষণ পরে পাশের রুমে গিয়ে দেখে তার মায়ের বিছানা রক্তে ভেসে গেছে। রাহিমার গলা কাটার পর তিনি বাঁচার জন্য ঘর থেকে বাইরে আসার চেষ্টা করলে বারান্দা এসে পড়ে যায় এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ঘটনার সময় রাহিমার স্বামী বিল্লাল হোসেন সিডস্টোর বাজারে ছিলেন। বিল্লাল হোসেন সিডস্টোর বাজারে লেপতোষকের ব্যবসা করেন। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য সিআইডি পুলিশের ক্রাইম সিন নিহতের লাশের আঘাতের চিহ্ন, ঘটনাস্থলের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করেছেন। স্থানীয় লোকজন জানায়, সোমাইয়ার সঙ্গে এক ছেলের প্রেম ছিল, সেই প্রেম তার পরিবার মেনে নেয়নি। এ নিয়ে তার মায়ের সঙ্গে সোমাইয়ার বিবাদ চলছিল। কয়েক দিন পূর্বে সোমাইয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সব কারণেই রাহিমা খুন হতে পারেন। সোমাইয়ার ডান হাতে রক্তাক্ত জখম রয়েছে। তারা আরও জানায়, সোমাইয়ার হাতে কাটার আঘাত, অসংলগ্ন কথা-বার্তার কারণে সন্দেহ হওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাকে আটক করে। ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদুল ইসলাম জানান, খুন হওয়ার সময় নিহতের মেয়ে পাশের রুমেই ছিল। তারপারও সে তেমন কিছুই জানে না বলে আমাদেরকে জানালে তার কথাবার্তায় সন্দেহ হয়। তাই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে থানায় আনা হয়েছে। সিআইডি পুলিশের একটি টিম কাজ করছে। তদন্ত শেষে খুনের কারণ বলা যাবে। মামলার প্রস্তুতি চলছে।
কাঁচা খেজুরের রস পান করে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নওগাঁয় এক নারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে মৃত ওই নারীর বাড়ির সঠিক তথ্য জানা যায়নি। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শানি সুলতানা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চলতি বছর দেশে নিপাহ ভাইরাসে এটিই প্রথম মৃত্যু। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত রোগী ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সি এক নারী। ২১ জানুয়ারি থেকে তার শরীরে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা এবং শ্বাসকষ্টের মতো প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেয়। ২৭ জানুয়ারি অবস্থার অবনতি হলে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে এবং ওই দিনই উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন তার গলা থেকে শ্লেষ্মা এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। পরীক্ষার ফলাফলে তার শরীরে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। গত ২৮ জানুয়ারি ওই নারীর মৃত্যু হয়। সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, আজকে আইইডিসিআর থেকে গণমাধ্যমকে তথ্যটি জানানো হয়েছে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে আমাদের লিখিতভাবে এখনো বিষয়টি জানানো হয়নি। লিখিতভাবে জানানোর পরই ওই রোগীর বিষয়ে আমরা বিস্তারিতভাবে জানাতে পারব। তবে তিনি অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন।
রংপুর সামাজিক বন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করা একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ, টেন্ডারবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী ঠিকাদার ও সচেতন মহলের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে বিভাগটি কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার কাজি পাড়া এলাকার বাসিন্দা, মৃত হেমন্ত চন্দ্র মহন্তের ছেলে গোপাল চন্দ্র মহন্ত। তিনি ১৯৯৫ সালে রংপুর সামাজিক বন বিভাগ কার্যালয়ে কাম কম্পিউটার পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ ২০ বছর একই অফিসে চাকরির পর অফিস সহকারী পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় ট্রেজারার (কোষাধ্যক্ষ) পদে নিয়োগ পেয়ে খুলনার বাগেরহাট জেলায় যোগদানের কথা থাকলেও, অভিযোগ অনুযায়ী তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে রংপুর অফিসেই বহাল থাকেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, গোপাল চন্দ্র মহন্ত গত প্রায় ৩১ বছর ধরে একই অফিসে কর্মরত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের দাবি, নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী কাজের বিল ছাড় করতে প্রতি সিডিউলে অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা আদায় করা হয়। পাশাপাশি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি করে নিজস্ব পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এই অনিয়মের পেছনে একই অফিসের প্রধান সহকারী মর্জিয়ানা বেগমের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে একই অফিসে কর্মরত। এছাড়াও শাহ আলম মন্ডল ও উচ্চমান সহকারী ইসারুল হককে সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। সচেতন মহলের প্রশ্ন, কোন আইন বা বিধিমালার আওতায় গোপাল চন্দ্র মহন্ত, মর্জিয়ানা বেগম, ইসারুল হক ও শাহ আলম মন্ডল এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই অফিসে কর্মরত রয়েছেন। তাদের মতে, এই সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ঠিকাদাররা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং রংপুর সামাজিক বন বিভাগ কার্যত একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অভিযুক্তদের কর্মজীবনের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার পাঠানোসা গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল কুদ্দুস মন্ডলের ছেলে শাহ আলম মন্ডল ১৯৯৫ সালে রাঙ্গামাটিতে কাম কম্পিউটার পদে যোগদান করেন। পরে ২০০০ সালে বগুড়া সার্কেল হয়ে সরাসরি রংপুরে যোগ দেন এবং তখন থেকে প্রায় ২৬ বছর ধরে রংপুরেই কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে ইসারুল হক ১৯৯৫ সালে ফরিদপুর জেলায় ইউডিএ পদে চাকরি শুরু করেন। ২০০৮ সালে তিনি রংপুরে যোগদান করেন এবং চলতি ২০২৬ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত আছেন। সরকারি চাকরিতে সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর পরপর বদলির বিধিমালা থাকলেও, নিরবচ্ছিন্নভাবে ২০ বছর বা তার বেশি সময় একই কর্মস্থলে চাকরি করার কোনো সুনির্দিষ্ট সাধারণ নিয়ম নেই। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একই স্থানে দীর্ঘদিন চাকরি করাকে নিরুৎসাহিত করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষ বদলি না করায় তারা একই কর্মস্থলে রয়েছেন এবং এতে তাদের কোনো ব্যক্তিগত দায় নেই। এ বিষয়ে রংপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ নুরুল ইসলাম বলেন, “আমার বদলি করার ক্ষমতা নেই। তবে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।” তবে গাছ লাগানো ও গাছের টেন্ডার সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। সচেতন মহলের দাবি, রংপুর সামাজিক বন বিভাগে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বদলি নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ না হলে দুর্নীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় গভীর রাতে একটি আবাসিক হোটেলের জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী হোটেল মালিক ও কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এমএ মোতালেব শরীফ। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তার নিজ ভাগিনা কুয়াকাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সহকারী বাইতুলমাল সম্পাদক মো. শাহাবুদ্দিন ফরাজির নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন লোক দেশীয় অস্ত্রসহ তার মালিকানাধীন কুয়াকাটা গেস্ট হাউস সংলগ্ন জমিতে প্রবেশ করে। এ সময় হোটেলের পেছনের দিকের সীমানা প্রাচীর ভেঙে টিনের বেড়া দিয়ে ঘর নির্মাণের মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা চালানো হয়। বাধা দিলে হোটেল কর্তৃপক্ষকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলে ঘটনাস্থলে মহিপুর থানা পুলিশের একটি টিম গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মহিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। শুক্রবার কুয়াকাটা প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমএ মোতালেব শরীফ লিখিত বক্তব্যে জানান, কুয়াকাটা গেস্ট হাউস সংলগ্ন ১২৬৪/১২৬২ ডি নং খতিয়ানের জমি তার পিতার মৃত্যুর পর ৫৬/১৪ বণ্টন মোকদ্দমার মাধ্যমে আদালতের রায়ে ভাই-বোনদের মধ্যে বণ্টন হয় এবং ২০১৮ সালে তিনি ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়ে জমির দখল বুঝে নেন। পরবর্তীতে আত্মীয় ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে সাহেদা, জাহানারা ও শাহীনুর ৩৮৫/২৩ নং ডিক্রি রদের মামলা দায়ের করলে ২০২৪ সালে ওই মামলায় আদেশ হয়। তা সত্ত্বেও চলতি মাসের ৩ ফেব্রুয়ারি মামলার পক্ষগণ তার হোটেল সংলগ্ন জমিতে ঘর নির্মাণের হুমকি দেয়। বিষয়টি নিয়ে তিনি আগেই মহিপুর থানায় অভিযোগ করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার বাবার মৃত্যুর পর বোনদের প্রাপ্য জমির অধিকাংশ বিক্রি ও অর্থ পরিশোধ করা হলেও এখনো দলিল হস্তান্তর করা হয়নি। দলিল না দিয়েই জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা মো. শাহাবুদ্দিন ফরাজি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনো জমি দখল করতে যাইনি। এখানে আমার মা ও খালাদের ন্যায্য অংশ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা আমাদের জায়গা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছি। অন্যায় কিছু করা হয়নি।” এ প্রসঙ্গে মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহব্বত খান বলেন, “৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠাই। বিষয়টি জমি সংক্রান্ত বিরোধ। এটি আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে। আপাতত উভয় পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।”
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা প্রদানের সময় মাত্র ৩০০ টাকা ঘুষ গ্রহণ এবং সেই তথ্য গোপন রাখতে সাংবাদিককে ২৯ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শুধাংশু কুমার সাহাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শুধাংশু কুমার সাহা কুমিল্লায় অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালে এক সেবাগ্রহীতার এনআইডি সংশোধনের জন্য অবৈধভাবে ৩০০ টাকা গ্রহণ করেন। ওই সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা তার ঘুষ গ্রহণের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি প্রচার রোধ করার জন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ২৯,০০০ টাকা ঘুষ প্রদানের প্রস্তাব দেন। ঘটনাটি তদন্তের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণের’ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন আইডিইএ দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক মো. ফরিদুল ইসলাম। দীর্ঘ তদন্ত শেষে অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করলেও তার জবাব সন্তোষজনক ছিল না। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তাকে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশনের এই কঠোর অবস্থান জিরো টলারেন্স নীতির অংশ। বরখাস্তের আগে তিনি আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়, রংপুরে সংযুক্ত ছিলেন।
খুলনায় দুর্বৃত্তের গুলিতে রাকিব হোসেন (২২) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে মহানগরীর লবণচরা থানাধীন কোপা মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রাকিব হোসেন লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে রাকিব কোপা মসজিদের সামনে একটি সেলুনে বসে ছিলেন। এ সময় হঠাৎ দুই যুবক সেলুনে প্রবেশ করে তাকে টেনে বাইরে নিয়ে যায়। পরে রাস্তায় নিয়ে রাকিবের মাথায় পরপর দুইটি গুলি করে তারা। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাকিব মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা হেঁটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় রাকিবকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খুলনা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) তাজুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে দুইটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নিহত রাকিব একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিল। তার বিরুদ্ধে মাদকসহ মোট তিনটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনের নাম ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। খুব দ্রুতই আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করেছে।
ঘুম শরীর ও মনের পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের ভেতরে শুরু হয় নানা জটিলতা, যা ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেকেই ঘুমকে অবহেলা করেন, অথচ সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি হচ্ছে ভালো ঘুম। যখন ঘুম ঠিকমতো হয় না, তখন শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে সহজেই সর্দি-কাশি বা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ঘুমের ঘাটতি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, ফলে ক্ষুধা বেড়ে যায়, যা অতিরিক্ত খাওয়া ও ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। শুধু তাই নয়, নিয়মিত কম ঘুম মানে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যাওয়া। মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও এর প্রভাব ভয়াবহ। ঘুম কম হলে মন খারাপ লাগে, মনোযোগে ঘাটতি আসে, কাজের উদ্যম কমে যায়। অনেক সময় হতাশা, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি হয়। শিক্ষার্থী বা কর্মজীবীদের ক্ষেত্রে এটি সরাসরি কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয়। তবে সুস্থ থাকার জন্য ঘুম ঠিক রাখার কিছু সহজ উপায় অনুসরণ করা যায়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং জেগে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। রাতে ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা উচিত — মোবাইল, টিভি বা ল্যাপটপের আলো ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের ক্ষরণে বাধা দেয়। শোবার ঘরকে ঠান্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখা ঘুমের মান বাড়ায়। কফি বা চা রাতের বেলা এড়িয়ে চলাই ভালো। দিনের বেলা হালকা ব্যায়াম ও সকালের রোদে কিছুক্ষণ সময় কাটানো ঘুমে সহায়তা করে। আর ঘুমানোর আগে ভারী খাবার না খাওয়াও জরুরি। ঘুমকে যদি গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে শরীর একসময় সিগন্যাল দিতে শুরু করবে — মাথা ভার, মেজাজ খারাপ, স্মৃতিশক্তি দুর্বল ইত্যাদি নানা রকম সমস্যা দেখা দেবে। তাই সুস্থ থাকতে হলে শুধু খাদ্য, ব্যায়াম বা ওষুধ নয় — একটি পরিপূর্ণ ঘুমই হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
বাংলাদেশে আবারও শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের নতুন সংকট। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরে একটানা লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, এমনকি হাসপাতালের রোগীরাও অসহায় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তীব্র গরম ও অসহনীয় তাপদাহের মধ্যে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই ভুগছেন। শহরাঞ্চলে ফ্যান, এসি ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গরমে হাঁসফাঁস করছেন মানুষ। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে পানির পাম্প চলতে না পারায় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, দিনে প্রায় ৬-৮ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর ফিরে আসছে না। বিশেষ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ছোট কারখানাগুলো এই বিদ্যুৎ সংকটে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ছোট দোকানদাররা জানাচ্ছেন, দীর্ঘ সময় ফ্রিজ বন্ধ থাকায় খাবারদাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আইটি ও অনলাইনভিত্তিক কাজেও সমস্যা হচ্ছে, কারণ ইন্টারনেট রাউটার, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালাতে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আয়-রোজগারে বড় ধাক্কা লাগছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে জেনারেশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস সংকটের কারণে পুরো উৎপাদন করতে পারছে না। অন্যদিকে আমদানি নির্ভর কয়লা ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি সাময়িক এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে লোডশেডিং কমে আসবে। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কতদিন এমন দুর্ভোগ চলবে? বিশেষ করে যেসব এলাকায় দিনে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, তাদের জন্য এ আশ্বাস কতটা কার্যকর হবে — তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এবং এর সমাধানে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিকল্প জ্বালানি উৎস যেমন সৌর ও নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে গুরুত্ব না দিলে প্রতি বছরই এ ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি হবে। এ অবস্থায় মানুষ চায় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও দ্রুত সমাধান। বিদ্যুৎ বিভ্রাট যেন আর এক নিত্যকার দুর্ভোগে পরিণত না হয় — সেই প্রত্যাশাই করছে সারাদেশ।
প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবার দেশের স্কুল পর্যায়ে রোবটিক্স শিক্ষা চালু করতে উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শতাধিক স্কুলে এ পাঠ্যক্রম চালু করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষায় “ভূমিকা ভিত্তিক রোবটিক্স” শীর্ষক একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। এতে থাকবে সহজ প্রোগ্রামিং, সেন্সর ব্যবহার, অটোমেশন ধারণা, এবং ছোটখাটো রোবট তৈরি ও পরিচালনার হাতে-কলমে শিক্ষা। ভবিষ্যতের কর্মদক্ষতা গড়ে তুলতেই এই উদ্যোগ জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক হাফিজুর রহমান বলেন, “বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রযুক্তি-ভিত্তিক দক্ষতা সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্যই এই প্রস্তুতি।” তিনি আরও জানান, শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে যাতে তারা ক্লাসে রোবটিক্স বিষয়টি সহজভাবে তুলে ধরতে পারেন। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে ইতোমধ্যে কিছু বেসরকারি স্কুল পরীক্ষামূলকভাবে রোবটিক্স ক্লাব পরিচালনা করছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর একটি স্কুলের শিক্ষার্থী সানজিদা রহমান জানায়, “আমরা নিজেরাই ছোট একটি রোবট বানিয়েছি, সেটি চলতে পারে এবং নির্দেশ মানতে পারে—এটা ভীষণ রোমাঞ্চকর।” কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে দেশীয় স্টার্টআপ এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে একাধিক দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ‘টেকল্যাবস বাংলাদেশ’ নামের একটি স্টার্টআপ ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্কুলে লো-কোস্ট রোবটিক্স কিট সরবরাহ শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মত প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরে রোবটিক্স শিক্ষা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেকাট্রনিক্স এবং অটোমেশন সেক্টরে দক্ষ কর্মশক্তি গড়ার ভিত্তি তৈরি করবে।
শহুরে জীবনে গ্রিন লাইফস্টাইল: চাইলেই কি সম্ভব? শহর মানেই ব্যস্ততা, কংক্রিটের জঙ্গল, দূষিত বাতাস, এবং অনিয়ন্ত্রিত শব্দ। এই যান্ত্রিক পরিবেশে বসবাস করা মানুষ প্রতিদিন একটু সবুজ, একটু প্রশান্তি খোঁজে। তাই ‘গ্রিন লাইফস্টাইল’ বা পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের ধারণা শহরের মানুষদের মাঝেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শহুরে বাস্তবতায় আমরা কি সত্যিই গ্রিন লাইফস্টাইল মেনে চলতে পারি? গ্রিন লাইফস্টাইল মানে শুধু গাছ লাগানো নয়। এটি একটি সামগ্রিক জীবনধারা, যেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানের চেষ্টা থাকে। যেমন—প্লাস্টিক ব্যবহার না করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস ব্যবহার করা, গাছ লাগানো, অর্গানিক খাবার খাওয়া, কম দূষণ হয় এমন বাহনে চলাচল করা, বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয় করা, এমনকি নিজস্ব ছাদে সবজি চাষ করাও এর অংশ হতে পারে। কিন্তু শহরে এই সবকিছু কি সহজে করা যায়? উত্তরটা একদম সরল নয়। শহরের বাসিন্দাদের জন্য অনেক সময় জায়গার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফ্ল্যাটে থাকলে ছাদে বাগান করা যায় না, রান্নার সময় প্লাস্টিক প্যাকেট এড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে কারণ বাজারে সহজলভ্য জিনিসপত্রের বেশিরভাগই প্লাস্টিক মোড়ানো। তাছাড়া, ব্যস্ত জীবনযাপনের কারণে সময় বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আশার কথা হলো, ইচ্ছা থাকলে উপায় বের করা যায়। শহুরে জীবনে কিছু ছোট ছোট অভ্যাস বদলেই শুরু করা যায় সবুজ যাত্রা। যেমন ধরুন, কেউ যদি বাজারের ব্যাগ হিসেবে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করেন, বা পানির বোতল বারবার রিফিল করেন, তবুও তিনি পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখছেন। অফিসে যাওয়ার সময় যদি বাস বা সাইকেল ব্যবহার করা যায়, তাহলেও কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমে। অনেক শহরেই এখন কমিউনিটি গার্ডেন, ছাদ কৃষি, সোলার প্যানেল স্থাপন, কিংবা জিরো ওয়েস্ট মুভমেন্ট জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। মানুষ নিজেরাই উদ্যোগ নিচ্ছে। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরেও অনেকে নিজেদের ব্যালকনিতে টব বসিয়ে ছোট পরিসরে সবজি ফলাচ্ছেন, কেউ আবার সোলার লাইট ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছেন। তবে এই চর্চা টেকসই করতে হলে প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের সহায়তা। শহরের পরিকল্পনায় আরও বেশি সবুজ এলাকা, হাঁটার রাস্তা, বাইসাইকেল লেন, এবং রিসাইক্লিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি জরুরি। সরকার যদি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে ভর্তুকি দেয় বা সচেতনতা বাড়ায়, তাহলে মানুষ আরও সহজে গ্রিন লাইফস্টাইল গ্রহণ করতে পারবে। শহুরে জীবন যতই ব্যস্ত হোক না কেন, যদি সচেতনতা থাকে এবং ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ‘গ্রিন লাইফস্টাইল’ একেবারেই অসম্ভব নয়। বরং, এটি হতে পারে একটি শান্ত, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই জীবনের সূচনা। আমাদের সবারই উচিত নিজ নিজ জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব, পরিবেশবান্ধব পন্থায় জীবনযাপন করার চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃতি বাঁচলেই আমরা বাঁচব—এই সত্যটা আজ আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে।
সময় বদলেছে, বদলে গেছে আমাদের খাবারের অভ্যাসও। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে এখন খাবার মানেই যেন ফাস্টফুড—বার্গার, পিজ্জা, ফ্রাইড চিকেন, নুডলস বা কার্বনেটেড সফট ড্রিংকস। হেঁসেলে মায়ের রান্না করা ভাত-ডাল-সবজি কিংবা ফলমূলের প্রতি আগ্রহ অনেক কমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ প্রযুক্তি ও জীবনের গতি। স্মার্টফোনে স্ক্রল করতে করতে খাবারের অর্ডার দেওয়াটা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস কিংবা বন্ধুদের আড্ডা—সবখানেই ফাস্টফুড এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফাস্টফুডের কড়চা ফাস্টফুড খেতে যতটা আকর্ষণীয়, এর স্বাস্থ্যঝুঁকি ততটাই ভয়ের বিষয়। অতিরিক্ত তেল, চিনি ও প্রিজারভেটিভ থাকায় এসব খাবার নিয়মিত খেলে ওবেসিটি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। নিউট্রিশনিস্ট ডা. সাদিয়া রহমান বলেন, “নতুন প্রজন্মকে শুধু ফাস্টফুড থেকে বিরত রাখতে বললে হবে না, তাদেরকে স্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। খাবার যে শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং সুস্থ থাকার জন্য—এই বার্তাটা পৌঁছাতে হবে।” পুষ্টিকর খাবার কি হার মানছে? দেশি ফলমূল, ডাল, শাকসবজি, ডিম, দুধ—এসবই আমাদের খাবারের ঐতিহ্য। কিন্তু অনেক তরুণ এখন এসবকে 'বোরিং' মনে করেন। অথচ ঠিকমতো রান্না বা পরিবেশন করলে পুষ্টিকর খাবারও হতে পারে সুস্বাদু ও আকর্ষণীয়। শিশুদের খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকদের ভূমিকাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি না হলে শিশুরাও সহজেই ফাস্টফুডের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। সমাধান কী হতে পারে? ১. স্কুলে পুষ্টি শিক্ষা চালু করা। ২. মিডিয়ায় সচেতনতামূলক প্রচার। ৩. হোমমেড ফাস্টফুডের বিকল্প শেখানো। ৪. পরিবারে নিয়মিত ফল ও সবজি রাখা। ৫. সাপ্তাহিক ফাস্টফুড 'ডে' নির্ধারণ করে মাত্রা বজায় রাখা। খাদ্য শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং শরীর ও মনের বিকাশের জন্য। নতুন প্রজন্ম যদি এখনই নিজেদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে সচেতন না হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ হবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমান যুগে স্মার্টফোন কেবল যোগাযোগের একটি মাধ্যম নয়—এটি বিনোদন, শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, এমনকি আত্মপ্রকাশের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু যখন এই প্রযুক্তির ব্যবহার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে আসক্তি, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনে। 📉 কীভাবে স্মার্টফোন আসক্তি ক্ষতি করছে কিশোরদের? ১. ঘুমের ব্যাঘাত: রাতে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ঘুমের সময় হ্রাস করে এবং মানসিক অবসাদ তৈরি করে। ২. মনোযোগ কমে যাওয়া: পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ৩. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: ভার্চুয়াল জগতে ডুবে গিয়ে বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। 4. নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক অনুভূতি: সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের 'পারফেক্ট' জীবন দেখে হীনমন্যতা জন্ম নেয়। ৫. উদ্বেগ ও অবসাদ: প্রতি মিনিটে নোটিফিকেশন চেক করা, প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ে। ✅ কিশোর-কিশোরীদের জন্য করণীয় ১. ডিজিটাল ডিটক্স পরিকল্পনা করুন প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ফোন ছাড়া থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া বা হাঁটতে যাওয়া হতে পারে বিকল্প। ২. স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করুন স্মার্টফোনের সেটিংসে গিয়ে দৈনিক স্ক্রিন টাইম সীমাবদ্ধ করে দেওয়া যায়। ৩. সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সচেতনতা সব কিছু শেয়ার না করা, অনলাইন নেতিবাচকতা থেকে দূরে থাকা, এবং আত্মমর্যাদা বজায় রাখা জরুরি। ৪. শখ ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দিন ড্রইং, গান, লেখালেখি, খেলাধুলা বা কোনো নতুন দক্ষতা অর্জন স্মার্টফোনের বিকল্প হতে পারে। ৫. মাইন্ডফুলনেস ও মেডিটেশন অনুশীলন করুন মনের প্রশান্তি ও স্ট্রেস কমাতে ধ্যান বা মাইন্ডফুলনেস কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ৬. অভিভাবকদের সহযোগিতা জরুরি অভিভাবকদের উচিত কিশোরদের ফোন ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা, কিন্তু নজরদারির চেয়ে বন্ধুর মতো আচরণ করা আরও কার্যকর। 🧠 মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ? কিশোর বয়সে মানসিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে নাজুক থাকে। এই সময়টাই হলো আত্মপরিচয়ের গঠনকাল। স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিতে পারে, তৈরি করতে পারে বিচ্ছিন্নতা ও আত্মহীনতা। তাই প্রযুক্তিকে বন্ধুর মতো ব্যবহার করলেও, সেটির দাস না হওয়াই শ্রেয়। ✨ উপসংহার স্মার্টফোন আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোর-কিশোরীদের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, ভারসাম্য এবং বিকল্প অভ্যাস। কিশোরদের উচিত নিজেকে ভালোবাসা শেখা, বাস্তব জগতে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করা, আর স্মার্টফোনকে যেন "সহায়ক", কিন্তু "শাসক" না বানানো।
বিয়ে, বিয়ের কনে, লাল বেনারসি কিংবা পাশ্চাত্য দেশে সাদা গাউন-এই তো পরিচিত দৃশ্য। বিয়ে মানেই আমাদের চোখে ভাসে উজ্জ্বল লাল বা সাদা সাজ। দক্ষিণ এশিয়া ও পাশ্চাত্যে এই রংগুলো বিয়ের প্রতীক হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কনের পরনে লাল বেনারসি, ঝলমলে গয়না কিন্তু এর ঠিক বিপরীত একটা দৃশ্য দেখা যায় কিছু দেশে। বিশ্বের কিছু দেশে বিয়ের দিনে কনে কালো পোশাক পরেন। আমাদের চোখে কালো রং শোকের প্রতীক হলেও, কিছু সংস্কৃতিতে এই রংকে মর্যাদা, স্থায়িত্ব ও প্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। স্পেনের বিশেষ করে আন্দালুসিয়া অঞ্চলে কনেরা ঐতিহ্যগতভাবে কালো লেইস বা সিল্কের পোশাক পরতেন। এই পোশাককে বলা হয় ‘ট্রাজে নেগ্রো’, সঙ্গে থাকে লম্বা কালো ঘোমটা বা মান্থিল্লা, মাথায় ফুল বা অলঙ্কার। এখানে কালো রং বোঝায় ‘মৃত্যু পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকার’। আধুনিক দিনে সাদা গাউন বেশি জনপ্রিয় হলেও ঐতিহ্যবাহী পরিবার বা ফ্লামেঙ্কো সংস্কৃতিতে কালো পোশাক এখনো সম্মানের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে বিশেষ করে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডে, গ্রামীণ কনেরা ভারী উলের কালো পোশাক পরতেন। সূচিকর্মের সঙ্গে এই পোশাককে বুনান্ড বলা হয়। কালো রং স্থায়িত্ব, ধনসম্পদ এবং পরিণত জীবনের প্রতীক। এছাড়া কালো পোশাক সহজে নোংরা হয় না, তাই বিয়ের পরে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্যও এটি ব্যবহার করা যেত। ফ্রান্স ও ইতালির গ্রামীণ এলাকাতেও কনেরা কালো পোশাক পরতেন। ফ্রান্সে এটি পরিপক্বতা ও দায়িত্বের প্রতীক, আর ইতালিতে ব্যবহারিক কারণেই। কালো গাউনগুলোতে সূক্ষ্ম লেইস, হাতের কাজ এবং কখনো কখনো রুপালি অলঙ্করণ থাকত। কালো বিয়ের পোশাক মানেই একঘেয়ে নয়। সাধারণত লেইস ও সূচিকর্ম থাকে, লম্বা ঘোমটা, সিলভার বা সোনালি গয়না, এবং মাথায় ফুল বা অলঙ্কার। স্পেনে অনেক কনে কালো পোশাকের সঙ্গে লাল গোলাপ বা লিপস্টিক ব্যবহার করেন, যা প্রেম ও শক্তির প্রতীক। কালো পোশাক মানেই গম্ভীর বিয়ে নয়। স্পেনে বিয়েতে থাকে ফ্লামেঙ্কো নাচ, লাইভ গিটার সংগীত এবং রাতভর উৎসব। নরওয়ে ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় বিয়েতে থাকে লোকসংগীত, পারিবারিক ভোজ এবং খোলা আকাশের নিচে আনন্দ। যেখানে কনে বিয়েতে লাল নয়, কালো পোশাক পরে স্পেনে বিয়ের খাবারে থাকে সি-ফুড, পায়েলা, অলিভ অয়েল ও চিজ, এবং ওয়াইন। নরওয়েতে পরিবেশন করা হয় মাছ, মাংস, স্থানীয় রুটি এবং মধু বা বেরি দিয়ে তৈরি ডেজার্ট। এসব খাবার শুধু পেট ভরায় না, ঐতিহ্যকেও তুলে ধরে। আজকাল বিশ্বজুড়ে অনেক কনে ইচ্ছাকৃতভাবে কালো গাউন বেছে নিচ্ছেন। কেউ ঐতিহ্যের কারণে, কেউ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হিসেবে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় ‘ব্ল্যাক ওয়েডিং ড্রেস’ এখন সাহসী ও আধুনিক ট্রেন্ড। আসলে যে কোনো রংই সব জায়গায় একই অর্থ বহন করে না। কোথাও চিরন্তন ভালোবাসা, কোথাও দায়িত্ব ও মর্যাদা। বিশ্বজুড়ে বিয়ের রীতিগুলো শুধু উৎসব নয়, একেকটি সমাজের গভীর বিশ্বাসের প্রতিফলন। তাইতো কালো বিয়ের পোশাক আমাদের শেখায় যে ভালোবাসা শুধু রঙে বাঁধা নয়, সংস্কৃতি ও ইতিহাসও তার অংশ।
বাড়িতে তরুণীকে আটকে রেখে যৌন ও মানসিক নির্যাতন করার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন ভারতের কলকাতার সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবার শমীক অধিকারী। এ ঘটনায় করা মামলায় অভিযুক্তকে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা পর্যন্ত ভুক্তভোগী তরুণীকে ফ্ল্যাটে আটকে রাখেন শমীক। মারধরের পাশাপাশি তাকে একাধিকবার ধর্ষণও করেন, এমন অভিযোগ তরুণীর। এ ঘটনায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হেনস্তার অভিযোগ (জিডি) দায়ের করেন তরুণী। ৫ ফেব্রুয়ারি তার অভিযোগের ভিত্তিতে বেহালা থানায় শমীকের বিরুদ্ধে মামলার প্রথম পদক্ষেপ এফআইআর দায়ের করা হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১২৭ (২), ৭, ৪ এবং ৩৫১ (২) ধারায় মামলা করা হয়েছে। থানায় এফআইআর দায়েরের খবরে বাবা মাকে নিয়ে নিখোঁজ হন ইউটিউবার। এরপর পুলিশের চিরুনি অভিযানে তাকে দমদম থেকে গ্রেফতার করা হয়। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভারতের আলিপুর আদালতে শমীককে পেশ করা হলে শুনানীতে ভুক্তভোগীর সারা শরীরে একাধিক ক্ষতচিহ্ন পায় আদালত। শমীকের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকায় তাকে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। প্রসঙ্গত, ভুক্তভোগী তরুণী শমীক অধিকারীর পূর্ব পরিচিত, বান্ধবী। এ ঘটনার প্রকৃত সত্য খুঁজে পেতে থানায় ইনফ্লুয়েন্সারকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। এদিকে ভুক্তভোগী তরুণীও আদালতে গোপন জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছেন।
দক্ষিণী সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা ও অভিনেতা বিজয় দেবেরাকোন্ডার বিয়ে নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি উদয়পুরে রাজকীয় বিয়ের আয়োজন হতে চলেছে এ তারকা যুগলের, এমনটিই জানা গেছে। যদিও এর আগে একবার বিয়ে ঠিক হয় অভিনেত্রীর। বাগদানও হয়ে যায়। কিন্তু বছরখানেকের মাথায় সেই বিয়ে ভেঙে যায়। তিনিও দক্ষিণী সিনেমার অভিনেতা, নাম রক্ষিত শেঠি। অথচ এ অভিনেতার হাত ধরেই নাকি রাশমিকা মান্দানার সিনেমা জগতে অভিষেক হয়। কিন্তু কী কারণে ভাঙে সেই বিয়ে? এর আগে ২০১৬ সালে ‘কিরিক পার্টি’ সিনেমার মাধ্যমে বিনোদনজগতে পা রাখেন অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা। সেই সিনেমার প্রযোজক ছিলেন রক্ষিত শেঠি। সেই সিনেমার সেটেই একে অন্যের প্রেমে পড়েন এ তারকা জুটি। ২০১৭ সালে বাগদানও সারেন তারা। যদিও সম্পর্ক টেকেনি তাদের। ২০১৮ সালে রক্ষিত ও রাশমিকার প্রেমে ভাঙন ধরে। বাগদান ভেঙে বেরিয়ে আসেন দুই তারকা। তবে প্রেমভাঙলেও পরস্পরের প্রতি তিক্ততা পুষে রাখেননি কেউ-ই। যখন রাশমিকা মান্দানার সঙ্গে রক্ষিতের আংটিবদল হয়, তখন অভিনেত্রীর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। রক্ষিতের ৩৪। দুজনের মধ্যে বয়সের তফাত ১৩ বছরের হলেও সেই পার্থক্যকে বিশেষ আমলে নেননি তারা। আংটিবদলের অনুষ্ঠানে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাশমিকা মান্দানা এবং রক্ষিত শেঠি। আংটিবদলের পাশাপাশি কেকও কাটেন তারা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আড়াই হাজারের বেশি অতিথি। এদিকে ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গীতা গোবিন্দম’ সিনেমায় বিজয় দেবেরাকোন্ডার বিপরীতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন রাশমিকা মান্দানা। সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর বিজয় ও রাশমিকার সম্পর্কের রসায়ন মনে ধরে যায় দর্শকের। তারপরেই ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিয়ে ভেঙে যায় রাশমিকা ও রক্ষিত শেঠির। দুই তারকার বাড়ি থেকে আংটিও ফিরিয়ে দেওয়া হয়। রাশমিকা-বিজয়ের ‘ঘনিষ্ঠতা’ই নাকি রক্ষিতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার কারণ বলে শোনা যায়। তারপর থেকেই নানাভাবে কটাক্ষের শিকার হতে থাকেন অভিনেত্রী। যদিও এ নিয়ে সরাসরি কেউ কখনো কোনো মন্তব্য করেননি।
ঢাকাই সিনেমার এক সময়ের জনপ্রিয় খল-অভিনেত্রী রিনা খান। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই শোবিজ তারকা সম্প্রতি সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চাইতে রাজধানীর গুলশান এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন রিনা খান। প্রচারণার এক পর্যায়ে এই প্রত্যাশার কথা জানান তিনি। এদিন বিকালে গুলশান-১ পুলিশ প্লাজার আশপাশে প্রচারণাকালে এই অভিনেত্রী বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও ধানের শীষকে শক্তিশালী করতেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাইছেন। এ সময় রিনা খানের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন কণ্ঠশিল্পী মনির খান, রবি চৌধুরী, সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমন এবং অভিনেত্রী হুমায়রা সুবাহ। তিনি জানান, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিএনপিপন্থী সংগঠন জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠনের (জিসাস) সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়ার প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করে রিনা খান বলেন, ‘আমি সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য হতে চাই। আশা করছি, দল থেকে একটি আসন পাব। গত ১৭ বছরে অনেক শিল্পী দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আর যারা দেশে থেকেছেন, তারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।আমি নিজেও দেশে থেকে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছি।
দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনকে কোনো অনুষ্ঠানে ‘হ্যারি পটার’ স্রষ্টা জেকে রাউলিং আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন—এমন অভিযোগকে ‘একেবারেই হাস্যকর’ বলে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন তিনি। এডিনবরাভিত্তিক এ লেখক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, আমি বা আমার দলের কেউ কখনোই জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে দেখা করেনি, যোগাযোগ করেনি বা তাকে কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) সম্প্রতি এপস্টেইন সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি প্রকাশ করার পর এ আলোচনা নতুন করে শুরু হয়। প্রকাশিত নথিতে প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, এক লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও রয়েছে। এসব নথিতে প্রিন্স অ্যান্ড্রু, বিল গেটস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম এসেছে। জেকে রাউলিংয়ের নামও নথিতে পাওয়া গেলেও, সেখানে এপস্টেইনের সঙ্গে তার কোনো সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ নেই। বরং ২০১৬ সালের মে মাসে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি (যার পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে) এপস্টেইনকে ই-মেইল করে রাউলিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি বা যোগাযোগের প্রমাণ নথিতে নেই। নথি থেকে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালের এপ্রিলে ব্রডওয়েতে ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য কার্সড চাইল্ড’-এর প্রিমিয়ারে এপস্টেইন উপস্থিত থাকতে চেয়েছিলেন। উদ্বোধনের দুই দিন আগে তার জনসংযোগ প্রতিনিধি পেগি সিগাল থিয়েটার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান প্লেগ্রাউন্ড এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান কলিন ক্যালেন্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি একজন ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু’-এর জন্য টিকিট বা প্রবেশের অনুরোধ জানান, তবে প্রথমে ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করেননি। কলিন ক্যালেন্ডার সেই অনুরোধে সম্মতি দিলেও, নথিতে কোথাও জেকে রাউলিংয়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে, প্রকাশিত নথিতে রাউলিং ও এপস্টেইনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগের সত্যতা মেলে না—এটাই স্পষ্ট করেছে সংশ্লিষ্ট তথ্য।
মার্কিন অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন–সংক্রান্ত নতুন নথি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক। এই প্রেক্ষাপটে নড়েচড়ে বসেছে বলিউডও। কারণ, সদ্য প্রকাশিত নথিতে বলিউড নির্মাতা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ দীপক চোপড়ার নাম উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টেইন–সংক্রান্ত নতুন কিছু নথি প্রকাশ করে। এর আগেও প্রকাশিত নথিগুলোর মতো এবারও তালিকায় রয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রভাবশালী ও পরিচিত ব্যক্তিত্ব। উল্লেখযোগ্যভাবে ইলন মাস্ক, বিল গেটস, ভারতীয় নির্মাতা মীরা নায়ারসহ আরও অনেকের নাম এই নথিতে দেখা গেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে আইনগতভাবে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—এই নথিতে নাম থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ বা অভিযোগ নয়।নথিতে একজন ‘বলিউড গাই’ হিসেবে ‘অনুরাগ’ নামের একজনের উল্লেখ নিয়েও সামাজিকমাধ্যমে চলছে জল্পনা। কঙ্গনা রনৌতের প্রতিক্রিয়া এই বিষয়ে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে অভিনেত্রী কঙ্গনা রনৌত লেখেন, “অপরাধ সব জায়গাতেই হয়। কিন্তু এখানে অপরাধকে আলাদা করে দেখানো হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে যাদের শিল্পী হিসেবে দেখে এসেছি, তারা কীভাবে এমন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন—ভাবতেই কষ্ট হয়।” চিন্ময়ী শ্রিপাদার মন্তব্য কণ্ঠশিল্পী চিন্ময়ী শ্রিপাদা লেখেন, “এপস্টেইন ফাইলসে দীপক চোপড়ার নাম। ভাবছি, সামনে আরও কত প্রভাবশালী ভারতীয়ের নাম প্রকাশ পাবে।” পরবর্তী আরেকটি পোস্টে তিনি যৌন নির্যাতনের ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন অবিশ্বাস করার সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, “একজন মৃত মানুষের নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত হাজার জীবিত নারীর কথা মানুষ বিশ্বাস করে না—এতেই বোঝা যায়, কার কণ্ঠস্বরের মূল্য দেওয়া হয় আর কারটা দেওয়া হয় না।” স্বরা ভাস্করের উদ্বেগ অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর তার মানসিক অবস্থা ‘বিস্ফোরিত’ হয়ে যাচ্ছে। তিনি ক্ষমতা, অর্থ এবং জবাবদিহিহীনতার ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্যান্য প্রতিক্রিয়া এছাড়া ‘বিগ বস ১৯’-এর প্রতিযোগী মালতি চাহার এপস্টেইন ফাইলসকে ‘অমানবিক ও ভীষণ বিরক্তিকর’ বলে মন্তব্য করেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নথি প্রকাশ বিশ্বব্যাপী ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিচ্ছেন—নথিতে নাম থাকা আর অপরাধ প্রমাণ হওয়া এক বিষয় নয়। বিষয়টি আইন ও তদন্তের মাধ্যমেই চূড়ান্ত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে প্রকৃতি ও নির্ধারিত ঋতুচক্র। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি যেমন চাষাবাদের জন্য আশীর্বাদ, তেমনি এর অনিয়মিততা কৃষকের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বৃষ্টির আচরণে যে অনিয়ম দেখা যাচ্ছে, তাতে কৃষিজ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। আগে যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ে চাষাবাদ করা যেত নির্দ্বিধায়, এখন সেখানে কৃষকদের পড়তে হচ্ছে দোটানার মধ্যে। কখন বৃষ্টি হবে, কতটা হবে, কবে হবে—এই অনিশ্চয়তা কৃষকের পরিকল্পনা ভেস্তে দিচ্ছে বারবার। জুন-জুলাই মাসেই বর্ষাকাল শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন অনেক বছরেই দেখা যায়, বৃষ্টি শুরু হচ্ছে দেরিতে অথবা হচ্ছে অতিরিক্ত অল্প সময়ে। এতে করে রোপা আমনের মতো ফসল সময়মতো রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কখনো বৃষ্টি হচ্ছে হঠাৎ করে অতিরিক্ত, যা বীজতলা ধ্বংস করে দিচ্ছে বা সদ্য রোপণ করা চারা নষ্ট করে দিচ্ছে। আবার কখনো দীর্ঘদিন খরা বিরাজ করায় জমিতে ফাটল ধরছে, শুকিয়ে যাচ্ছে ফসল। এর ফলে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ যেমন কমছে, তেমনি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে চাষাবাদের চক্রে পরিবর্তন আসছে। অনেক কৃষকই নির্ধারিত সময়ে জমি প্রস্তুত করতে পারছেন না। কোনো কোনো অঞ্চলে আবার বৃষ্টি এসে প্রস্তুত জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে, যা চাষাবাদের উপযোগিতা নষ্ট করছে। আবার অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, ধান কাটা-মাড়াইয়ের সময়েই হঠাৎ বৃষ্টি নেমে ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে। এতে করে কৃষকদের শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হচ্ছে না, সাথে বাড়ছে মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা। এক সময়ের নির্ভরযোগ্য কৃষি মৌসুমগুলো এখন অনেকটাই অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থাও অনেক সময় যথাযথ তথ্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে কৃষকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এমন অবস্থায় অনেক কৃষকই বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন অথবা অন্য পেশায় ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিখাতের জন্য বড় হুমকি। এতে করে ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। বৃষ্টির অনিয়মিত আচরণ শুধু ধান বা গম নয়, শাকসবজি, তিল, আখ কিংবা মসুরের মতো ফসলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চাষের পর সঠিক সময়ে পানি না পাওয়ায় ফসল স্বাভাবিক বৃদ্ধি পাচ্ছে না। আবার বেশি পানি পেয়ে অনেক ক্ষেতেই গাছ পচে যাচ্ছে বা ফলন হচ্ছে অপূর্ণাঙ্গ। এতে কৃষকদের আয় দিনদিন কমছে, আর ঋণগ্রস্ততার হার বাড়ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল কৃষি পরিকল্পনা এবং কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। টেকসই চাষাবাদ পদ্ধতি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বীমা, এবং আবহাওয়া তথ্য সেবা সহজলভ্য করতে হবে। একইসাথে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু প্রকৃতির উপর নির্ভর না করে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদের দিকে এগিয়ে যেতে না পারলে এই অনিয়মিত বৃষ্টির চক্র আগামীতে আরও বড় সমস্যা তৈরি করবে। তাই এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
বাংলাদেশের কৃষি খাত আজ পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এক সময় যে চাষাবাদ ছিল কেবল কৃষকের অভিজ্ঞতা ও প্রাকৃতিক নির্ভরশীলতার উপর, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্মার্ট কৃষি যন্ত্রের প্রসারে দেশের গ্রামীণ চাষাবাদে এক বিপ্লব ঘটছে। পরিবর্তন আসছে কৃষকের চাষের ধরণ, উৎপাদনের পরিমাণ এবং খরচের পরিমিত ব্যবস্থাপনায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। উন্নত মানের পাওয়ার টিলার, স্মার্ট স্প্রেয়ার, স্বয়ংক্রিয় পানি সেচ যন্ত্র, ড্রোনের মাধ্যমে সার ও কীটনাশক ছিটানো, স্যাটেলাইট নির্ভর আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের স্মার্ট কৃষি যন্ত্র এখন অনেক গ্রামের মাঠে মাঠে দেখা যাচ্ছে। এর ফলে কৃষকের শ্রম ও সময় দুই-ই বাঁচছে, উৎপাদনও হচ্ছে আরও পরিকল্পিতভাবে। স্মার্ট যন্ত্র ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি উপকার পাচ্ছেন তরুণ কৃষকরা, যারা প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী এবং স্মার্টফোন বা অ্যাপ ব্যবহার করে চাষাবাদে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। মাটি পরীক্ষার জন্য পোর্টেবল যন্ত্র, মোবাইল অ্যাপ থেকে আবহাওয়ার আপডেট, এমনকি কৃষি পরামর্শও মিলছে এখন হাতের মুঠোয়। ফলে ফসল উৎপাদনের আগে থেকেই তারা জানেন কোন ফসল কবে লাগাতে হবে, কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, আর কখন ফসল ঘরে তুললে সর্বোচ্চ লাভ মিলবে। সবুজ প্রযুক্তির আরও একটি বড় দিক হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। প্রচলিত পদ্ধতিতে অধিক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির ক্ষতি হতো, কিন্তু এখন অনেকেই জৈব সার ও বায়োকন্ট্রোল পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে যেমন উৎপাদিত ফসল নিরাপদ হচ্ছে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতাও বজায় থাকছে দীর্ঘমেয়াদে। এ ছাড়া সৌরশক্তি চালিত সেচ পাম্প এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিও অনেক অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যা খরার সময়েও কৃষকদের সহায়তা করছে। তবে এই পরিবর্তনের পথ এখনো সহজ নয়। অনেক কৃষক এখনো প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হলেও তাদের দক্ষতা বা আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে এগিয়ে যেতে পারছেন না। স্মার্ট যন্ত্রের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রয়োজন সমবায় ভিত্তিক ব্যবহার, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং প্রযুক্তি বিষয়ক প্রশিক্ষণ। এই বিপ্লব সফল করতে হলে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে কৃষি প্রযুক্তি শিক্ষাকে উৎসাহিত করা, কৃষকদের জন্য সহজলভ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দিলে কৃষি আরও লাভজনক ও টেকসই হবে। স্মার্ট কৃষি শুধু কৃষকের জীবনে পরিবর্তন আনবে না, এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সবুজ প্রযুক্তির এই বিপ্লবই হতে পারে আগামী দিনের নিরাপদ ও আধুনিক কৃষির ভিত্তি।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে সবজি রপ্তানির মাধ্যমে। চলতি বছর সবজি রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি লাউ, কাঁচামরিচ, শিম, বেগুন, এবং মুলার চাহিদা বেড়েছে ব্যাপক হারে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সবজি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশেষ করে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, এবং যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কারণে দেশীয় সবজির চাহিদা বেশি দেখা গেছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জাহিদুল হাসান বলেন, “সরকার রপ্তানি-উপযোগী কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকদের সহায়তা করছে। নিরাপদ এবং রাসায়নিক মুক্ত উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। হিমাগার ও রপ্তানি মান অনুযায়ী প্যাকেজিং সুবিধাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।” ঢাকার সন্নিকটে সাভারের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানালেন, “আমি আগে শুধু স্থানীয় হাটে বিক্রি করতাম। এখন এলাকার একটি সংগঠনের মাধ্যমে আমাদের সবজি দুবাই পাঠানো হয়। দামও ভালো পাই, সময়মতো টাকা পেয়ে যাই।” বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে বছরব্যাপী সবজি উৎপাদনের ক্ষমতা থাকায় এই খাতে রপ্তানির অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা এটাও বলছেন যে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, সঠিক হিমায়ন ব্যবস্থা, ও সময়মতো পরিবহন নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা রপ্তানির জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চল ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যেমন—নরসিংদী, যশোর, রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলে সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য মানের ফসল উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরে দ্রুত সবজি পার্সেল হ্যান্ডলিংয়ের সুবিধা, কৃষিপণ্য পরীক্ষার জন্য আলাদা ল্যাব, এবং নতুন কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করলে এই রপ্তানি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববাজারে সবজি রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদাও যাতে পূরণ হয়, সে বিষয়েও নজর রাখছে সরকার। কৃষকদের জন্য ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক বাজার’ এবং ডিজিটাল মার্কেটিং অ্যাপও চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি খাত এখন শুধু দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। যদি অবকাঠামো ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ অচিরেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান সবজি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। এক সময়ের সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল কৃষিকাজ এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরও দক্ষ ও লাভজনক হয়ে উঠছে। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং কৃষি প্রযুক্তি কোম্পানির উদ্যোগে বর্তমানে কৃষকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে স্মার্ট কৃষি যন্ত্রপাতি, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, এবং মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক কৃষি পরামর্শ। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, রাজশাহী, ও বগুড়া অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে ‘স্মার্ট কৃষি প্ল্যাটফর্ম’ নামক একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে কৃষকরা মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার তথ্য, কীটনাশকের পরিমাণ, জমিতে পানির প্রয়োজনীয়তা, এবং বাজারে ফসলের বর্তমান দাম জানতে পারছেন। এতে করে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, এবং লাভজনকভাবে ফসল বিক্রি করতে পারছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট ধান উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪% বেশি। বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের ধান, গম, ভুট্টা এবং শাকসবজি চাষে এই উৎপাদন বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। জেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা এখন কৃষকদের শুধু সার আর বীজ দিচ্ছি না, আমরা তাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং ডিজিটাল টুলস ব্যবহারে সহায়তা করছি। কৃষির ভবিষ্যৎ এখন প্রযুক্তিনির্ভর, এবং আমাদের কৃষকরাও তা গ্রহণ করছেন।” অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি খাতে কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা দিচ্ছে। খরার সময় বৃদ্ধি, বন্যার প্রকোপ, এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলো জল-সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বিকল্প ফসল, এবং সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নওগাঁর এক কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, “আগে আমরা অনুমান করে কাজ করতাম। এখন মোবাইলে আবহাওয়ার খবর পাই, কখন বৃষ্টি হবে, কখন সেচ দেওয়া দরকার—সব জানা যায়। এইভাবে খরচও কমে, ফলনও বাড়ে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কৃষি যদি প্রযুক্তির সঙ্গে আরও দ্রুত যুক্ত হতে পারে, তবে ভবিষ্যতে দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না, বরং কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারবে। বাংলাদেশের কৃষি খাতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। এক সময়ের সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল কৃষিকাজ এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরও দক্ষ ও লাভজনক হয়ে উঠছে। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং কৃষি প্রযুক্তি কোম্পানির উদ্যোগে বর্তমানে কৃষকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে স্মার্ট কৃষি যন্ত্রপাতি, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, এবং মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক কৃষি পরামর্শ। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, রাজশাহী, ও বগুড়া অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে ‘স্মার্ট কৃষি প্ল্যাটফর্ম’ নামক একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে কৃষকরা মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার তথ্য, কীটনাশকের পরিমাণ, জমিতে পানির প্রয়োজনীয়তা, এবং বাজারে ফসলের বর্তমান দাম জানতে পারছেন। এতে করে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, এবং লাভজনকভাবে ফসল বিক্রি করতে পারছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট ধান উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪% বেশি। বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের ধান, গম, ভুট্টা এবং শাকসবজি চাষে এই উৎপাদন বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। জেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা এখন কৃষকদের শুধু সার আর বীজ দিচ্ছি না, আমরা তাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং ডিজিটাল টুলস ব্যবহারে সহায়তা করছি। কৃষির ভবিষ্যৎ এখন প্রযুক্তিনির্ভর, এবং আমাদের কৃষকরাও তা গ্রহণ করছেন।” অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি খাতে কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা দিচ্ছে। খরার সময় বৃদ্ধি, বন্যার প্রকোপ, এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলো জল-সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বিকল্প ফসল, এবং সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নওগাঁর এক কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, “আগে আমরা অনুমান করে কাজ করতাম। এখন মোবাইলে আবহাওয়ার খবর পাই, কখন বৃষ্টি হবে, কখন সেচ দেওয়া দরকার—সব জানা যায়। এইভাবে খরচও কমে, ফলনও বাড়ে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কৃষি যদি প্রযুক্তির সঙ্গে আরও দ্রুত যুক্ত হতে পারে, তবে ভবিষ্যতে দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না, বরং কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারবে।
শহরে গরমের তীব্রতা: গাছ কম, সমস্যা বেশি বর্তমান সময়ের শহরগুলোতে গরমের তীব্রতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর উঠে যাওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আমাদের মতো দ্রুত নগরায়িত দেশে, যেখানে গাছের সংখ্যা কমে আসছে, সেখানে গরমের সমস্যাও তীব্র হচ্ছে। শহরের গরম বৃদ্ধির পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রধানত, বাড়ি ও রাস্তার জন্য বন ও খোলা জায়গাগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। কংক্রিট ও অ্যাসফাল্টের বেশি ব্যবহার সূর্যের তাপ শোষণ করে, যা রাতে ধীরে ধীরে মুক্তি পায়। ফলে শহরগুলো “হিট আইল্যান্ড” হিসেবে পরিচিত। গাছ না থাকার কারণে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ছায়া ও বাষ্পীভবন কমে যায়। এ গরমে মানুষ যেমন শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি পরিবেশগত প্রভাবও বড়। গরমের তীব্রতায় বাড়ছে বায়ু দূষণ ও গ্যাস নির্গমন, যা শ্বাসকষ্ট, এলার্জি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। শহরের গ্রীন স্পেস কমে আসার ফলে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। গাছ ও গাছপালা তাপমাত্রা কমানোর পাশাপাশি বায়ু পরিশোধন ও মাটি রক্ষা করতেও সাহায্য করে। তাই শহরের পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে গাছ লাগানো অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন শহরে ইতোমধ্যে গাছ লাগানো, পার্ক ও গ্রীন জোন বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো উদ্যোগ যেমন বাড়ির ছাদে বাগান, কমিউনিটি গার্ডেন, সাইকেল লেন স্থাপনও গরম কমাতে সাহায্য করছে। তবে বড় রকমের পরিকল্পনা ও সরকারি সহযোগিতা ছাড়া ব্যাপক পরিবর্তন আসা কঠিন। শহরের বাসিন্দাদেরও প্রয়োজন সচেতন হওয়া। গাছ রক্ষা, প্লাস্টিক কম ব্যবহার, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, এবং গরমের সময় বাড়ির জানালা ও দরজা খোলা রেখে তাজা বাতাস প্রবাহিত করার মতো সাধারণ কাজগুলো গরমের প্রভাব কমাতে সহায়ক। সার্বিকভাবে, শহরে গাছের কমতি ও বেড়ে যাওয়া গরমের তীব্রতা আমাদের জীবনের জন্য বড় সংকেত। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া গেলে স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সবাই মিলে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই নগরায়নের পথ খুঁজে বের করা।
RSS-এর শতবর্ষ উদযাপনে চাঁদের হাট, হাজির বলিউডের তাবড় তারকা, সলমন খানের ভূয়সী প্রশংসা মোহন ভাগবতের
আজ বাজারে 'সেরা বাজি' হতে পারে এই ৫ স্টক, বিশেষজ্ঞরা দিচ্ছেন পরামর্শ
আজ বাজারে বড় খবর রয়েছে এই স্টকগুলিতে, না জেনে কিনলে লোকসান হতে পারে !
শেয়ার বাজারের দুরন্ত গতির দিনে পড়ল সোনার দাম ? আজ কিনলে কততে পাবেন ?
রেকর্ড গতি বাজারে ! ৭০০ পয়েন্টের ওপরে খুলল নিফটি, আজ মার্কেটে এই ২১ টি স্টক দেখুন
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব, আজ দুরন্ত ছুট দেবে বাজার ! এই ৮টি স্টকে নজর রাখুন
বাজেটের প্রভাব, এবার রকেট গতিতে ছুটবে এই ডিফেন্স স্টকগুলি ! বড় পূর্বাভাস গোল্ডম্যান স্যাকস-এর
ফেব্রুয়ারিতে ৯ দিন বন্ধ থাকবে ব্যাঙ্ক, এই ৪ পরিষেবা পাবেন না, দেখে নিন সম্পূর্ণ ছুটির তালিকা