যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন–এর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন একাধিক প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধনকুবের। সম্প্রতি তার মামলার প্রায় ৩০ লক্ষাধিক নথি আদালত প্রকাশ করার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। সেই ধারাবাহিকতায় তদন্তের মুখে পড়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। হাউস ওভারসাইট কমিটির সামনে জবানবন্দি এপস্টেইনের প্রভাববলয় ও সম্ভাব্য সহযোগী নেটওয়ার্ক নিয়ে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটি–এর সামনে হাজির হবেন ক্লিনটন দম্পতি। তাদের শপথপূর্বক জবানবন্দি নেওয়া হবে। সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের চ্যাপাকুয়ায়, যেখানে ক্লিনটন দম্পতি বসবাস করেন। অধিবেশনটি রুদ্ধদ্বার হলেও তা ভিডিও আকারে ধারণ এবং লিখিত প্রতিলিপি সংরক্ষণ করা হবে। মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। ‘কংগ্রেসনাল ডিপজিশন’ কী? কংগ্রেসনাল ডিপজিশন হলো আদালতের বাইরে শপথ নিয়ে দেওয়া আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্য। এখানে সাক্ষীকে কমিটির আইনজীবী ও তদন্তকারীরা প্রশ্ন করেন। পুরো প্রক্রিয়া রেকর্ড করা হয় এবং ভবিষ্যতে তা প্রকাশ বা আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সমন জারি শুরুতে ক্লিনটন দম্পতি সাক্ষ্য দিতে আপত্তি জানান। তাদের দাবি ছিল, তদন্তটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা অভিযোগ করেন, এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ। তবে হাউস কমিটি তাদের বিরুদ্ধে ‘কন্টেম্পট অব কংগ্রেস’ প্রস্তাব আনার ইঙ্গিত দিলে পরিস্থিতি বদলায়। দ্বিপাক্ষিক ভোটের মাধ্যমে অবমাননার অভিযোগ আনা হলে তা ফৌজদারি মামলার দিকে গড়াতে পারত। শেষ পর্যন্ত তারা সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন। কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমা বলেন, “কেউ ক্লিনটন দম্পতিকে কোনো অন্যায়ের জন্য অভিযুক্ত করছে না। আমাদের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে—আমরা শুধু সেগুলোর উত্তর চাই।” সাক্ষ্যগ্রহণের সময়সূচি হিলারি ক্লিনটন স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সাক্ষ্য দেবেন এবং পরদিন শুক্রবার বিল ক্লিনটন সাক্ষ্য দেবেন। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে এ ধরনের অধিবেশন শুরু হয়, যদিও নির্দিষ্ট সময় আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। এর আগে একাধিকবার সমন জারি করা হলেও তারা হাজির হননি। বিল ক্লিনটনের সাক্ষ্য প্রথমে ২০২৫ সালের অক্টোবরে নির্ধারিত হয়েছিল, পরে ডিসেম্বরে পিছিয়ে দেওয়া হয়। হিলারি ক্লিনটনের ক্ষেত্রেও একাধিকবার তারিখ পরিবর্তন করা হয়। অতীতের স্মৃতি: ১৯৯৮ সালের সাক্ষ্য এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ১৯৯৮ সালের সেই বহুল আলোচিত সাক্ষ্যগ্রহণের কথা, যখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিল ক্লিনটন পউলা জোনসের মামলায় প্রায় ছয় ঘণ্টার ভিডিও সাক্ষ্য দেন। সে সময় তাকে মনিকা লিউইনস্কি–এর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। পরবর্তীতে মিথ্যা সাক্ষ্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। হাউস কমিটি কী তদন্ত করছে? বর্তমানে কমিটি এপস্টেইন এবং তার সহযোগীদের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখছে। এপস্টেইন ছিলেন এক বিত্তশালী অর্থদাতা, যিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি যৌন পাচার চক্র পরিচালনার অভিযোগে দণ্ডিত হন। তার মৃত্যুর পরও তার যোগাযোগের পরিধি ও সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। প্রকাশিত নথি নতুন করে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—যার উত্তর খুঁজতেই কংগ্রেসনাল তদন্ত এগিয়ে চলছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের তিনটি শহরে আফগানিস্তান থেকে ড্রোন হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও পাকিস্তান সরকার দাবি করেছে, সব ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তাতার জানিয়েছেন, আফগানিস্তান থেকে ড্রোন উড়ে আসে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের অ্যাবোটাবাদ, সোয়াবি ও নোসেরা এলাকায়। তবে প্রতিরক্ষা বাহিনীর ড্রোন বিধ্বংসী ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হয়ে সব ড্রোন ধ্বংস করে দেয়। পাল্টা দাবি আফগানিস্তানের এর আগে আফগান তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করে, তাদের বিমানবাহিনী পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি সামরিক স্থাপনাসহ একাধিক স্থানে সফল হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, ইসলামাবাদের ফয়জাবাদ, নোসেরার একটি সেনা ক্যাম্প, জামরুদের একটি সেনা ঘাঁটি এবং অ্যাবোটাবাদের একটি সামরিক কমপ্লেক্সে আঘাত হানা হয়েছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের রাজধানী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এই পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়েছে। সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় আফগান বাহিনী। এরপর পাকিস্তান পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে, যা শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। যদিও উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে দাবি করছে, তবুও সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও সংকটময় করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে বারবার সংঘর্ষ এবং ড্রোন ও বিমান হামলার অভিযোগ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের অভাব পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। এদিকে, আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। সীমান্ত পেরিয়ে সহিংসতা বিস্তৃত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশ দুটি। বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ একাধিক বড় শহরে বিমান হামলা চালানোর পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন, পরিস্থিতির অবনতিতে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, “চীন সংঘাতের উত্তেজনা বৃদ্ধিতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছি। যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে আরও রক্তপাত এড়ানো উচিত।” মাও নিং আরও জানান, চীন নিজস্ব কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বিরোধ নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং উত্তেজনা প্রশমনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত রয়েছে। এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে অবস্থিত চীনা দূতাবাসগুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলেও জানান তিনি। রাশিয়ার অবস্থান রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএয়ের খবরে বলা হয়, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে অবিলম্বে সীমান্তবর্তী হামলা বন্ধ করে কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে। মস্কো বলেছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উভয় পক্ষের সংযম অত্যন্ত জরুরি। ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাব প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সংঘাত নিরসনে সংলাপ আয়োজনের মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে “ভালো প্রতিবেশীর মতো সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য সমাধান” করার আহ্বান জানান। এর আগেও সীমান্ত উত্তেজনা বৃদ্ধির সময় একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জাতিসংঘের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক। বার্তা সংস্থা বিবিসির খবরে বলা হয়, গুতেরেস উভয় দেশকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অন্যদিকে, ভলকার তুর্ক সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। সংঘাতের পটভূমি বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সীমান্তে পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে তালেবান বাহিনী হামলা চালায়। জবাবে তালেবানের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করে শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোরে পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালায়। এ পর্যন্ত উভয়পক্ষের অন্তত ১৮০ জন নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে এই সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকিতে রূপ নিতে পারে।
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬
ফারজানা আক্তার: আত্মহত্যা একটি নীরব মানসিক ব্যাধি। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, এর পিছনে লুকিয়ে আছে হাজারো নীরব আর্তনাদের বাস্তবতা। একটি অল্পবয়সী জীবন, যার বয়সটা রঙিন ফানুশের ওড়ানোর সময়, হাজার স্বপ্নের জাল বোনার কথা সেই মানুষটাই সাদাকালো পৃষ্ঠার মলাটে নিজেকে চিরবিদায় জানানোর ঘোর নেশায় মত্ত। প্রতিদিন নানা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়া আত্মহত্যার বার্তা যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এই নীরব আত্মঘাতক হাহাকার একটি নক্ষত্রের আলোকে অন্ধকারে ধাবিত করে। মানুষটি বুঝে ওঠার আগেই জীবনের ধ্বংসাত্মক খেলার কাছে হার মানে। আর পৃথিবীকে বিনিময়ে দিয়ে যায় তার নিথর সমাধি। আত্মহত্যার পিছনে সবচেয়ে দায়ী ভূমিকা রাখে মানসিক যত্নের অবহেলা তথা আত্মসচেতনতার অভাব। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে আমরা যেন ভুলতে চললাম মানসিক যত্নের গুরুত্ব কতটুকু! আমরা মানসিক যত্ন নিয়ে ততটা তৎপর নই, অথচ মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখাটা সহজ নয়। নেতিবাচকতা একজন মানুষকে নীরবে আত্মহত্যার মতো সর্বনিকৃষ্ট কাজের সম্মুখীন করে। ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তি বোঝার পূর্বেই জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়। তাই মনের যত্নের বিকল্প নেই। মনের যত্ন নেওয়ার অর্থ হলো শারীরিক যত্নের ন্যায় মানসিকভাবে নিজেকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা। আত্মহত্যার কারণ বহুবিধ এবং জটিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্রতিরোধযোগ্য। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে প্রায় ১৩ হাজার ৪৯১ জন। গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ জনে। ডিসেম্বর মাসের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনও প্রস্তুত না হওয়ায় সর্বশেষ চিত্র পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপ (২০২২-২৩) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছেন ২০ হাজার ৫০৫ জন। পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯২০ জন। আত্মহত্যা ব্যক্তিগত, পারবারিক, সামাজিক নানা কারণে হয়ে থাকে। WHO অনুমান করে যে ২০% মানুষ আত্মহত্যা করে তারা কীটনাশক বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশের বিবরণীতে ফাঁস, বিষপান, গায়ে আগুন, রেললাইনে ঝাঁপ ও অন্যান্যÑ এই পাঁচভাবে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা। এরপর ব্যবহৃত পদ্ধতি বিষপান। কেবল ব্যক্তির জীবনই নিঃশেষ করে না, বরং সেই ব্যক্তির পরিবারেও আজীবনের কুপ্রভাব পড়ে। তা ছাড়াও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষরা আত্মহত্যা করা ব্যক্তিকে অনুসরণ করে। এর ঝুঁকি বর্তমান সমাজে বেড়েছে। ফলে এই বিষয়ে উদ্দীপনা হয় এমন বিষয়গুলোর প্রতি সচেতন হতে হবে। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস একটি সচেতনতামূলক দিন, যেটি বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দেশে ২০০৩ সাল থেকে পালন করা হয়। এই দিবসটি পালন করতে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন একসঙ্গে কাজ করে। ২০১১ সালে অনুমনিক ৪০টি দেশ এই দিবসটি উদ্যাপন করে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করা মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের নিম্ন আয়ের কোনো দেশেই আত্মহত্যা প্রতিরোধে কোন কৌশল বা কর্মপন্থা ঠিক করা নেই, যেখানে নিম্ন মধ্য-আয়ের দেশসমূহের ১০% এবং উচ্চ আয়ের সব দেশেই এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করা হয়। তবে তা যেন বাস্তবায়িত হয় সে বিষয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি যেন তৎপর চলতে থাকে। মনে রাখতে হবে মানসিক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ। এটি নিরাময়ে আমাদের তাদের প্রতি সহনশীল, বন্ধুত্বপরায়ণ হতে হবে। আমরা যদি সকলে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নির্মম তিক্ততা অনুধাবন করে সহনশীল হই এবং সরকার মানসিক ব্যাধির প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পেইন ও নানা সৃজনশীল পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হই, তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে। সামষ্টিক সচেতনতা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আত্মহত্যার প্রবণতা ও হার তুলনামূলক হ্রাস পাবে। ফারজানা আক্তার শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
চা-বাগান মানেই চোখ জুড়ানো সবুজ, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি ঢাল, সারি সারি চা-গাছ আর সেই গাছের ফাঁকে ফাঁকে নীরবে নুয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষ গজিয়ে ওঠা সবুজ কচি পাতা তুলছে। কি অপূর্ব এক দৃশ্য। এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসÑ যেখানে চা-শ্রমিকদের জীবন আজও অচল হয়ে এক জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অবহেলা ও বৈষম্যের প্রতীক হয়ে। আমাদের দেশের চা-চাষের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ এবং পুরাতন। ১৮৫৪ সালে সিলেটে যখন ব্রিটিশরা চায়ের বাগান তৈরি করে চা উৎপাদন শুরু করে তখন সিংহভাগের দখলে ছিল ব্রিটিশ বণিকরা। মাইলের পর মাইল বিশাল এই চা-বাগানে কাজ করবার জন্য দরকার ছিল বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কর্মহীন, শিক্ষাহীন, ভিন্ন ভাষাভাষী ও শ্রমিকশ্রেণির হিন্দু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনকে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চা-বাগান এলাকাগুলোতে নিয়ে আসা হয়। বাগানের মাঝে ছোট মাটির ঘরে চা-শ্রমিকদের বসবাস শুরু হয়। প্রতিশ্রুতি ছিল কাজ, বাসস্থান ও নিরাপদ জীবনের। বাস্তবে তারা পেয়েছে শোষণ, বন্দিত্ব আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা দরিদ্রতা। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু চা-শ্রমিকদের ভাগ্য কার্যত বদলায়নি। তাদের ঘরে রাত্রে ঘুমানোর খাট নাই, তাদের থাকার ঘরে বৃষ্টির রাতে তিন-চারবার ঘুমের স্থান বদলাতে হয়, কারণ বৃষ্টি বেশি হলে ওপরের ছাদ থেকে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় পানি পড়ে। এই হচ্ছে তাদের নিয়তি। চা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত চা-বাগানের সংখ্যা ১৭১টি। এই বাগানগুলোর মালিক হচ্ছে জেমস ফিনলে, ডানকান ব্রাদারস, নেশনেল টি কোম্পানি, দেউন্দি টি কোম্পানি, এম আহমদ টি অ্যান্ড ল্যান্ড। তার মধ্যে প্রায় ১০টি চা-বাগান সম্পূর্ণ অসুস্থ। এই বাগানগুলোতে চা-পাতা তোলা হয় না কর্মচারী/বাবুগণ বিগত ৪৮ মাস যাবৎ কোনো বেতন পান না। সবাই বাগানে থেকেই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে জীবন চালাচ্ছেন। বাগানের শ্রমিকরা দৈনিক ভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন, কেউবা তাদের বাগানের কাছে অবস্থিত খাসিয়াপুঞ্জিতে খাসিয়া মেয়েদের সঙ্গে পানগাছ থেকে পান তুলতে সাহায্য করেন। আবার অনেক বেকার শ্রমিক পাশের শহরে রিকশা, ঠেলাগাড়ি চালান অথবা দিনমজুরের কাজ করে থাকেন। এই বাগানগুলো মূলত সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড় ও রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত। সবচেয়ে বেশি চা-বাগান রয়েছে মৌলভীবাজারে ৯৬টি। বাগানগুলোতে শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। তবে, পরিবারসহ চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ বা তার বেশি। যাদের বেশিরভাগ নারী। জানা গেছে, প্রায় ৬৪ শতাংশই নারী, যাদের প্রায় সবাই খুব ছোটবেলা থেকেই চা-বাগানে কাজ করতে বাধ্য হন। মৌলভীবাজার তথা পুরো সিলেটের চায়ের রাজ্যে আমার নিজের পর্যবেক্ষণের আলোকে বলছি, দেশে যখন শহুরে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি যেন রাষ্ট্রীয় বিবেকের কাছে অদৃশ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দোলনের পর মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা এখনও ন্যূনতম মানবিক জীবনের জন্য যথেষ্ট নয়। দৈনিক কয়েকশ টাকায়Ñ যেখানে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক সবই জোগাড় করতে হয় সেখানে চা-শ্রমিক পরিবারগুলো দিনের পর দিন অপুষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। আসলে একজন চা-শ্রমিকের কাজ শুধু চা-পাতা তোলা নয়। পাহাড়ি ঢালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করা, নির্দিষ্ট কোটা অর্থাৎ জনপ্রতি আড়াই কেজি কাঁচাপাতা প্রতিদিন বিকাল ৫টার মধ্যে তোলা পূরণ না হলে মজুরি কাটা যায়, সব মিলিয়ে এ এক কঠিন শ্রমযাপন। অথচ সেই শ্রমের ন্যায্যমূল্য তারা পান না। বেশিরভাগ চা-শ্রমিক আজও বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া কুঁড়েঘরে বসবাস করেন। জরাজীর্ণ ঘর, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশনের ভয়াবহ অবস্থাÑ এসব যেন চা-বাগানের নিত্যচিত্র। আধুনিক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতির গল্প চা-শ্রমিকদের ছুঁতে পারেনি। ৭ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরে পুরো পরিবারের বাস, শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে সুযোগই নেই। উপরন্তু দ্রব্যমূল্য পাল্লা দিয়ে বাড়লেও তাদের বেতন সেভাবে বাড়ে না। এভাবে নানা বঞ্চনা নিয়ে দুর্দশার জীবন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের চা-শ্রমিকরা। দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন হলেও চা-বাগান যেন এখনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এখানে পৌঁছে না আধুনিকতার আলো, মেলে না জীবনধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। দেশের চা-বাগানের মধ্যে ৯৬টির অবস্থান মৌলভীবাজারে। আর এখানকার চা-শ্রমিকদের বিশেষ করে নারীদের দুর্দশা-বঞ্চনা আর ক্রীতদাসের মতো জীবনের যেন শেষ নেই। চা-বাগানের নিজস্ব হাসপাতাল বা ডিসপেনসারিগুলোতে চিকিৎসা সীমিত। গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে শহরে যাওয়ার সামর্থ্য অনেকের নেই। মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টিÑ সব মিলিয়ে চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠী আজও এক প্রান্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। বাংলাদেশের কোনো শিল্পাঞ্চলে কোনো মদের দোকান নেই শুধু ব্যতিক্রম চা-বাগান। প্রতিটি চা-বাগানে একাধিক মদের দোকান আছে। স্থানীয় ভাষায় মদের পাটটা বলে। প্রায় সব চা-শ্রমিকই মদপানে আসক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত আছে ৮৪টি মদের পাটটা। আধো আলো আর আধো ছায়ার মধ্যে চা-বাগানগুলো তাদের উপস্থিতি টিকিয়ে রাখে। জানা গেছে, সেখানে চা-চাষে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ভূমির পরিমাণ ১,১৪,০১৪ হেক্টর কিন্তু বাস্তবে চাষ হচ্ছে ৫০,৪৭০ হেক্টরে। চা-বাগানে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হচ্ছে, তাই বন্যপ্রাণীও চা-বাগান এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়কর সত্য হলো চাশিল্প ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান, সেখানে চা-শ্রমিকের উপস্থিতি নেই। শিক্ষাই পারে দারিদ্র্যের শিকল ভাঙতেÑ এই সত্যটি চা-শ্রমিকদের জীবনে বারবার প্রমাণিত হয়নি। বাগানের ভেতরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা আর ঝরে পড়ার হার অত্যন্ত বেশি। শিশুরা অল্প বয়সেই কাজে নেমে পড়েÑ কারণ পরিবার চালাতে অতিরিক্ত আয়ের দরকার। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-শ্রমিক হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে। একজন চা-শ্রমিকের সন্তান চা-শ্রমিক ছাড়া অন্য কিছু হতে পারবেÑ এই স্বপ্ন এখনও অনেকের কাছে বিলাসিতা। চা-শ্রমিকদের বড় একটি অংশ আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা সামাজিকভাবেও বৈষম্যের শিকার। জাতীয় মূলধারার রাজনীতি, প্রশাসন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ভোটের সময় তারা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভোটের পরে তাদের দাবিদাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া হয়। নাগরিক অধিকার থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা-শ্রমিকদের আন্দোলন দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছে। মজুরি বৃদ্ধি, রেশন সুবিধা, চিকিৎসা ও শিক্ষা উন্নয়নের দাবি তুলেছেন তারা। সরকার ও মালিকপক্ষ আলোচনায় বসেছে, কিছু প্রতিশ্রুতিও এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের গতি ধীর, অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ। এ কথা সত্য যে, বিগত সরকারের আমলে চা-শ্রমিকদের বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তাদের দুর্দশাকে রাষ্ট্রীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। যদিও এসব উদ্যোগ প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত। সবচেয়ে আলোচিত অবদান ছিল চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি। দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২২ সালে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। সরকারের মধ্যস্থতায় মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত আসে। এতে চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের একটি তাৎক্ষণিক সুরাহা হলেও মজুরি এখনও ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে। তৎকালীন সরকার চা-শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা কিছুটা অর্থ বাড়ায়। ভিজিডি, ভিজিএফ, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিতে চা-শ্রমিক পরিবারের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি চা-বাগানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র উন্নয়ন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকার ‘চা-শ্রমিক উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রণয়নের কথা বললেও তার পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই এসব দায়িত্ব মালিকপক্ষের ওপরই ন্যস্ত রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকার চা-শ্রমিকদের সমস্যা স্বীকার করছে, তবে কাঠামোগত বৈষম্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর সংস্কার দরকার ছিল, তা এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে। আমি মনে করি, চা-শ্রমিকদের জন্য দয়া নয়, প্রয়োজন অধিকারভিত্তিক নীতি। তাই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মানবিক জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবাকে বাগান কর্তৃপক্ষের দয়ার ওপর না রেখে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। তাদের নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। চায়ের কাপ হাতে আমরা যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, তখন খুব কমই মনে রাখি এই চায়ের পেছনে রয়েছে নিঃস্ব মানুষের ঘাম, ক্লান্তি আর অদৃশ্য কান্না। বাংলাদেশের চা-শিল্প টিকে আছে চা-শ্রমিকদের শ্রমে। অথচ তারাই আজ সবচেয়ে অবহেলিত। মনে রাখতে হবে, চা-শ্রমিকদের উন্নয়ন মানে কেবল একটি শ্রমগোষ্ঠীর উন্নয়ন নয়Ñ এটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার এক অপরিহার্য শর্ত। আমি বলতে চাই, সবুজ চা-বাগানের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই সবুজের ভেতর থাকা মানুষগুলোর জীবনেও সবুজতা ফিরে আসবে। মতি লাল দেব রায় কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক
ড. মাহরুফ চৌধুরী: গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের একটি যান্ত্রিক মাধ্যম নয়; এটি সমাজের দর্পণ, রাষ্ট্রচিন্তার বাহক এবং নাগরিক চেতনা ও মূল্যবোধ নির্মাণের এক অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই কারণেই গণমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যে স্তম্ভ রাষ্ট্রের নির্বাহী ও আইন প্রণয়নকারী ক্ষমতার পাশাপাশি নিরপেক্ষ সত্তা হিসেবে জনস্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে গণমাধ্যম জনমত গঠন, সত্য উন্মোচন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা যেমন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বর্তমান সময়েও তা প্রশ্নাতীত। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক পেশাজীবীর, বিশেষ করে সাংবাদিক, সম্পাদক, কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে কলাম লেখক পর্যন্ত সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, নৈতিকতা ও সৌজন্যবোধ চর্চা করা একটি নৈতিক দায়। কারণ গণমাধ্যমে ব্যক্তিগত আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি সরাসরি প্রভাব ফেলে জনচিন্তা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক মূল্যবোধের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতায় এই পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চা এখনও ব্যতিক্রম, নিয়মনীতি হয়ে ওঠেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যম একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার বদলে ক্ষমতা, সুবিধা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঘেরাটোপে আবদ্ধ এক অপরিণত পেশার জগতে পরিণত হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে অভিযুক্ত করা, আক্রমণ করা কিংবা খাটো করার উদ্দেশ্য নেই। বরং সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে গণমাধ্যমের যে নিরন্তর ও অপরিহার্য ভূমিকা, সেই ভূমিকাকে গভীরভাবে স্বীকার করেই কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে পেশাদারত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্নগুলো সামনে আনার একটি আন্তরিক প্রয়াস মাত্র। সমালোচনার লক্ষ্য এখানে ব্যক্তি নয়, বরং কাঠামো, সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ যেগুলো শক্তিশালী না হলে গণমাধ্যম তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না ও জনমনে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। লেখক হিসেবে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং অন্য লেখকদের কাছ থেকে শোনা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই নিবন্ধে গণমাধ্যমে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত কিছু মৌলিক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব সমস্যা একদিকে লেখকদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে লেখালেখির পরিবেশ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মান আরও সুসংহত ও বলিষ্ঠ করার প্রয়োজনীয়তার কথাই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে, সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় পর্ষদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে এই লেখার মূল আবেদন। পত্রপত্রিকার পক্ষ থেকে লেখকদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন, পেশাগত সৌজন্য বজায় রাখা এবং দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্ব নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেওয়া। প্রথমত, লেখকদের সঙ্গে সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের সৌজন্যবোধ ও পেশাগত শিষ্টাচারের ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়। একজন লেখক যখন কোনো সংবাদপত্রে লেখা পাঠান বা ই-মেইলের মাধ্যমে সম্পাদকীয় দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন সেই লেখার প্রাপ্তি স্বীকার করা ন্যূনতম পেশাগত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। এটি কোনো অতিরিক্ত সৌজন্য নয় বরং আধুনিক পেশাগত যোগাযোগের একটি স্বীকৃত নীতি। একজন লেখকের ন্যায্য প্রত্যাশা থাকে তার লেখা গ্রহণ করা হয়েছে কি না, সেটি প্রকাশযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে কি না, কিংবা আদৌ তা পড়া হয়েছে কি নাÑ এই ন্যূনতম তথ্য জানার। যদি লেখা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে আনুমানিক কবে নাগাদ তা প্রকাশিত হতে পারে, সেই ধারণা দেওয়া পেশাগত স্বচ্ছতারই অংশ। আবার লেখা প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট অনলাইন লিংক কিংবা ই-পেপারের কপি লেখককে পাঠানো কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়; এটি পেশাগত সৌজন্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের স্বাভাবিক পরিধির মধ্যেই পড়ে। দ্বিতীয়ত, লেখকের লেখায় সম্পাদনার নামে অতিরিক্ত বা অযাচিত হস্তক্ষেপ একটি গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। গণমাধ্যমের নীতিমালার অংশ হিসেবে বানান, শব্দচয়ন কিংবা বাক্যগঠনের ত্রুটি সংশোধন করা সম্পাদকীয় দায়দায়িত্বের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বরং এই ধরনের সম্পাদনাই একটি পত্রিকার পেশাগত মানের উৎকর্ষ সাধন এবং তাকে দৃশ্যমান করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এসব সীমার বাইরে গিয়ে লেখার অংশ বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেটেছেঁটে ফেলা তথা বক্তব্য, কাঠামো বা অন্তর্নিহিত অর্থে প্রভাব পড়ে এমন কোনো পরিবর্তন, সংকোচন কিংবা সংযোজন করা হয়, অথচ তা প্রকাশের আগে লেখককে অবহিত করা হয় না। এটা সম্পূর্ণ পেশাগত নীতির পরিপন্থী, অনৈতিক, বেআইনি ও লেখকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ। মনে রাখা জরুরি, একটি লেখা কেবল কিছু শব্দ বা বাক্যের যান্ত্রিক সমষ্টি নয়; এটি লেখকের চিন্তা, শ্রম, মেধা, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে লেখার বিষয়বস্তু, দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের নৈতিক ও আইনি দায়ভারও বহন করেন লেখক নিজেই। সে কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও নীতিমালায় লেখকের এই অধিকারকে কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কোনো লেখায় লেখকের সম্মতি ছাড়া মৌলিক পরিবর্তন আনা শুধু অনৈতিকই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা বিদ্যমান আইনি কাঠামোরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অতএব, লেখকের অনুমতি বা অন্তত অবহিতকরণ ছাড়া লেখার বক্তব্যগত পরিবর্তন করা মানে ব্যক্তিগত লেখককে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে পেশাগত নীতিনৈতিকতা, সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই খাটো করা। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে সম্পাদক ও লেখকের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহযোগিতামূলক ও সম্মান-নির্ভর, যেখানে সম্পাদনা হবে মানোন্নয়নের উপায়, কর্তৃত্ব আরোপের অস্ত্র নয়। তৃতীয়ত, লেখকের সম্মানী বা পারিশ্রমিক প্রদানের প্রশ্নটি এখনও আমাদের দেশের গণমাধ্যম জগতে এক ধরনের উপেক্ষিত ও অনানুষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, বহু গণমাধ্যম মালিকের বিরুদ্ধেই নিয়মিতভাবে সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে, যা আমাদের সংবাদপত্র জগতের একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। তা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিক, সম্পাদক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের শ্রম, সময় ও মেধার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এই স্বীকৃত বাস্তবতার আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে যে লেখকরা সেই পত্রিকার জন্য নিয়মিতভাবে লেখা পাঠান, কনটেন্ট সমৃদ্ধ করেন এবং পাঠক তৈরিতে ভূমিকা রাখেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নীতির ব্যতিক্রম কেন ঘটবে? লেখালেখি কোনো শখের কাজ মাত্র নয়; এটি সময়, শ্রম, মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি পেশাগত কর্মকাণ্ড। এর জন্য প্রচুর সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় করতে হয়। সুতরাং লেখকের পারিশ্রমিক প্রদান বা সময়মতো তা পরিশোধ করা কোনো দয়া বা সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি একটি স্পষ্ট নৈতিক ও পেশাগত দায়। একজন পেশাজীবী হিসেবে এই প্রশ্নটি প্রতিদিন নিজেকে করা সাংবাদিক ও সম্পাদকদের নৈতিক দায়িত্ব। স্বৈরাচারমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করতে হলে পেশাজীবীদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। নিজেরা বৈষম্যমূলক ও স্বৈরাচারী আচরণ করে অন্যের কাছ থেকে ন্যায্য ও অস্বৈরাচারী আচরণ আপনি কীভাবে আশা করেন? কারণ গণমাধ্যমে নৈতিকতা কেবল প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়; তা প্রতিফলিত হয় পেশাগত আচরণ, শ্রমের মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বোধের মধ্য দিয়েও। মূলত, আমরা যে সমাজ কল্পনা করি এবং যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি, সেই মূল্যবোধ যদি আমাদের নিজ নিজ আচার-আচরণ, পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চার ভেতরে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা অন্যের কাছে কিংবা বৃহত্তর সমাজের কাছে প্রত্যাশা করাই অবাস্তব। ব্যক্তিগত ও পেশাগত আচরণের সঙ্গে ঘোষিত আদর্শের এই বিচ্ছিন্নতাই রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের অন্যতম মৌলিক সংকট। গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক পেশাজীবীর দায়িত্ব কেবল লেখা প্রকাশ বা সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং মানবিক ‘সোনালি নীতি’ তথা ‘আপনি আচরি ধর্ম, অপরে শিখাও’, পেশাগত সৌজন্য ও নৈতিক নীতিমালা মেনে চলার মাধ্যমেই তারা একটি কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক এবং দায়িত্বশীল সমাজ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি শব্দে নয়, বরং সেই শব্দের পেছনে থাকা নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় নিহিত। প্রকৃতপক্ষে, আমরা যে সমাজ কল্পনা করি বা যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি, সেই মূল্যবোধ যদি আমাদের নিজেদের আচার-আচরণ, পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চার ভেতরে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা অন্যের কাছে কিংবা বৃহত্তর সমাজের কাছে প্রত্যাশা করাই অবাস্তব। নৈতিকতা কখনোই কেবল দাবি বা উপদেশের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলনের মধ্য দিয়েই অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাই প্রতিটি পেশাজীবীর বিশেষ করে, গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্তদের মানবিক ‘সোনালি নীতি’র পাশাপাশি নিজ নিজ পেশাগত নীতিনৈতিকতা আন্তরিকভাবে অনুসরণ করা অপরিহার্য। একটি কাঙ্ক্ষিত কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণ কোনো একক গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এটি সম্মিলিত নৈতিক অনুশীলনের ফল। সেই অনুশীলনের সূচনা হওয়া উচিত নিজের জায়গা থেকে। নিজ নিজ দায়িত্বের ক্ষেত্রে যদি আমরা পেশাদারত্ব, সৌজন্য ও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমাদের গণমাধ্যমগুলো সত্যিকার অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের অব্যাহত নির্মাণের অগ্রদূত হিসেবে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হবে। ড. মাহরুফ চৌধুরী ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
এ এইচ এম ফারুক: ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনী তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর নামে রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ চালায়, তা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এবং আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং অসংখ্য নারীকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এমএসএফ-এর পরিসংখ্যান বলছে, অভিযানের প্রথম এক মাসেই অন্তত ৯,৪০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৭৩০ জনই ছিল শিশু। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো একে মানবাধিকারে চরম বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করেছে এবং তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলো এই সংকটকে মুসলিম উম্মাহর ওপর এক পরিকল্পিত জাতিগত নিধন হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে। এই ভয়াবহ হামলা ও নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা আজ আর কেবল মানবিক সংকট নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম বাস্তব হুমকি। বিভিন্ন তথ্যমতে প্রায় ১০ লক্ষ নিবন্ধিতসহ প্রায় ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্থানীয় কোনো কোনো সংস্থার ধারণা এ সংখ্যা আরও বেশি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অঞ্চল ঘেঁষে কক্সবাজারে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান আমাদের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জনতাত্ত্বিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং পরিবেশকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। এই ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ মোকাবিলায় এবং একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে এখন দল-মতনির্বিশেষে ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য এবং সরাসরি সরকার প্রধান তথা নির্বাচন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর অধীনে একটি ‘বিশেষ কমিশন’ বা বিশেষ সেল গঠন করা সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের প্রথাগত ও মন্থর কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে এখন আমাদের ‘বাস্তব সক্ষমতা’ এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। এই সংকটের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭ সালে যে মানবিকতাকে কেন্দ্র করে আমরা সীমান্ত খুলে দিয়েছিলাম, সেই সংকটের সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছে। নির্যাতনের আগুনের মুখ থেকে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীর এই বোঝা এখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকির এক চরম বাস্তব পরীক্ষা। এ বিষয়ে দেশি বিদেশী সংস্থা কাজ করছে। এই সংকটের বহুমাত্রিক ঝুঁকি এবং সমাধানের নতুন কৌশলগুলো নিয়ে সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল স্টাডিজ (আইআইজিএস) রাজধানী ঢাকায়— ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শিরোনামে আয়োজন করে এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার। উক্ত সেমিনারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব একমত হয়েছেন যে, রোহিঙ্গা সংকট এখন বাংলাদেশের অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমহ্রাসমান সহায়তার প্রেক্ষাপটে এই উপস্থাপনাটি স্পষ্ট করে যে, বিদ্যমান গৎবাঁধা উপায়ে আর সমাধান সম্ভব নয়। সেমিনারে উত্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেবল শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখার দিন শেষ; একে এখন জাতীয় নিরাপত্তার এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার নতুন সমন্বয় প্রয়োজন। গবেষণা ও সেমিনারের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর একটি অসহনীয় ও ক্রমবর্ধমান বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের পরিমাণ বছরে ১০০ কোটি ডলারের (১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ইউক্রেন বা ফিলিস্তিন সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ (জেআরপি)-এর তহবিল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। ২০১৭ সালে যেখানে তহবিলের জোগান ছিল ৭৩%, ২০২৩-২৪ সালে তা ৫০%-এর নিচে নেমে এসেছে। ফলে এই বিপুল ব্যয়ের সিংহভাগ এখন বাংলাদেশের নিজস্ব রাজস্ব বাজেট এবং সাধারণ করদাতার ওপর চাপ হিসেবে জেঁকে বসছে, যা দেশের জাতীয় উন্নয়ন বাজেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনৈতিক এই রক্তক্ষরণের সমান্তরালে কক্সবাজার ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে চলছে অপূরণীয় পরিবেশগত বিপর্যয়। সেমিনারে আলোচিত তথ্যানুযায়ী, রোহিঙ্গাদের আবাসনের জন্য উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ৮ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ইতিমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। পাহাড় কাটার ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে এবং বর্ষাকালে পাহাড় ধসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়েছে। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর চিত্র হলো ভূ-গর্ভস্থ পানি নিয়ে। অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় কৃষিজমিকে মরুভূমিতে রূপান্তর করতে পারে। গবেষকদের মতে, এটি এখন আর স্থানীয় সমস্যা নেই, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি ‘ইকোলজিক্যাল সিকিউরিটি থ্রেট’ বা পরিবেশগত নিরাপত্তাহীনতায় পরিণত হয়েছে। এই বিপুল পরিবেশগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক উত্থাপিত এই প্রস্তাবে ১০৫টি দেশ সমর্থন জানালেও গত আট বছরে প্রত্যাবাসনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ আর ১৩ লাখ রোহিঙ্গার এই বিশাল বোঝা বহন করতে পারছে না। গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি, যা বৈশ্বিক কূটনীতির এক চরম ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক লবিং যখন লক্ষ্য অর্জনে ধীরগতি সম্পন্ন হয়, তখন রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশল ও ‘হার্ড পাওয়ার’ ব্যবহারের কথা ভাবতে হয়। রোহিঙ্গা সংকটের চলমান স্থবিরতার মধ্যে সম্প্রতি এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল, যা এখন অনেকটা ধূম্রজালে পরিণত হতে চলেছে। পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মিয়ানমার জান্তা সরকার কিংবা আরাকান আর্মির (এএ) অসহযোগিতামূলক মানসিকতা এবং রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের সংকট। তবে ড. ইউনুসের যে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব রয়েছে, তা ব্যবহার করে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগের এক অনন্য সুযোগ তাঁর ছিল এবং আছে। সাধারণ কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়েও ড. ইউনুস অনেক বেশি সাহসিকতা ও ক্ষমতা নিয়ে এই ইস্যুতে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতেন। যেখানে বিশ্বনেতারা তাঁর একটি ডাকে সাড়া দেন, সেখানে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে না পারাটা এক ধরণের ব্যর্থতা হিসেবেই রয়ে যাবে। যদি রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ঈদ করতে পারতেন, তবে আন্তর্জাতিক মহলে ড. ইউনুসের এই আশ্বাস কেবল একটি ‘রাজনৈতিক অলঙ্কার’ হিসেবেই নাথেকে বরং মর্যাদার হয়ে উঠতে পারতো। পাশাপাশি বাস্তবিক অর্থে এটি স্পষ্ট যে, কেবল ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং সেই প্রভাবকে ‘বাস্তব সক্ষমতা’ (Hard Power) ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষিতে রূপান্তর করতে না পারলে এই মানবিক ট্র্যাজেডির অবসান সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের দেওয়া এই বিশাল আশ্বাসের বাস্তবায়ন না হওয়া বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক নৈতিক অবস্থানকেও দুর্বল করে দিতে পারে। উপরন্তু নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য এক বিশাল পরীক্ষা হিসেবে তোলা রেখে গেলেন এই বিষফোড়াবিবেচ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি। সেমিনারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও এই জাতীয় ঐক্যের সুরে সংহতি প্রকাশ করেন। মামুনুর রশিদ খান (বিএনপি অঙ্গসংগঠন কৃষক দল), এ কে এম রফিকুন নবী (জামায়াতে ইসলামী), হুমায়রা নূর (এনসিপি), আবু হানিফ (গণ অধিকার পরিষদ), শামসুল আলম (ইসলামী ঐক্যজোট), অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এবং সামরিক-বেসামরিক বিশেষজ্ঞগণ প্রত্যেকেই সংকটের বহুমাত্রিকতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে ইস্পাতকঠিন ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন। আইআইজিএস আয়োজিত সেমিনারে অংশগ্রহণকারী নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ এতদিন যে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করেছে, তা এখন অকার্যকর। এই সংকট সমাধানে সামরিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক—তিনটি ফ্রন্টেই নতুন ও সাহসী কৌশল প্রণয়ন জরুরি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ প্রস্তাব করেন যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ‘ডেস্ক’ দিয়ে ১১ লাখ মানুষের এই বিশাল ও জটিল সংকট সমাধান সম্ভব নয়। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে একটি ‘বিশেষ রোহিঙ্গা কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে ২৪ ঘণ্টা কেবল এই ইস্যু নিয়ে কাজ করার মতো একটি ডেডিকেটেড বিশেষজ্ঞ দল থাকবে। আইআইজিএস-এর চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান সামরিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সঠিক ও যুগোপযোগী ‘নিরাপত্তা নীতি’ (Security Policy) প্রণয়নের ওপর জোর দেন। এফএসডিএস-এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না হলে ‘বাস্তব সক্ষমতা’ ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পথে এগোতে হবে। তিনি সরকারের জন্য একটি আলাদা ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের পরামর্শ দেন। তিনি সতর্ক করেন যে, ক্যাম্পে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশু যুক্ত হচ্ছে, অথচ আন্তর্জাতিক অর্থায়নে এক ধরণের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির এবং মিয়ানমারে বাংলাদেশ মিশনে দায়িত্বপালনকারি মেজর (অব) এমদাদুল ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘রিয়েলিটি চেক’-এর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রক এখন ‘আরাকান আর্মি’ (এএ)। সুতরাং, কেবল নেপিডো বা জান্তা সরকারের সাথে আলোচনা করে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না; যারা মাঠ পর্যায়ে ভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের সাথে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি’ স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ও সাহসী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। যেমন- আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা: আলোচকরা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বিষয়টি পুনরায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জোরালোভাবে উত্থাপন এবং নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে প্রয়োজনে মিয়ানমারের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। কৌশলগত বিভ্রান্তি নিরসন: বাংলাদেশের বিদ্যমান নীতিতে ‘কৌশলগত বিভ্রান্তি’ চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেন যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশটির ওপর বাংলাদেশের যে ধরণের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ ছিল, তা আমরা যথাযথভাবে নিতে পারিনি। তাঁরা ‘ধীরে চলো’ নীতির পরিবর্তে আরও সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক কূটনীতি গ্রহণের তাগিদ দেন। অপরাধ দমনে প্রযুক্তি: রোহিঙ্গা সংকটকে বর্তমানে বাংলাদেশের ‘নম্বর ওয়ান ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ হিসেবে অভিহিত করে সতর্ক করা হয় যে, ক্যাম্পগুলো এখন ‘ট্রান্স-ন্যাশনাল ক্রাইম’ বা আন্তর্জাতিক অপরাধের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা দমনে কেবল প্রথাগত পুলিশি ব্যবস্থা নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। আইআইজিএস-এর ভাইস চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আখতার শহীদ এ ক্ষেত্রে দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তথ্যসূত্র: ১. ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পথেই এগোতে হবে’, প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬। ২. ‘রোহিঙ্গাসংকট সমাধানে বিশেষ কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব’, কালের কণ্ঠ, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬। ৩. ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গৃহীত’, বাসস, ২০ নভেম্বর ২০২৫। ৪. ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারের কার্যবিবরণী, আইআইজিএস, জানুয়ারি ২০২৬। ৫. ‘ড. ইউনুস ও জাতিসংঘ মহাসচিবের রোহিঙ্গা শিবির সফর এবং প্রত্যাবাসন প্রতিশ্রুতি’, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ২০২৫-২৬। সেমিনারের আলোচকদের সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতে এই সংকট উত্তরণে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ বিবেচনা করা যেতে পারে: ১. ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অন রোহিঙ্গা: প্রস্তাবিত বিশেষ কমিশন ও টাস্কফোর্সকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অন রোহিঙ্গা’ গঠন করা। ২. নিরাপত্তানীতি পুনর্মূল্যায়ন: মিয়ানমার ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা। ৩. আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক লবিং: প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনা তথা নিবিড় লবিং চালিয়ে যাওয়া। ৪. জাতীয় ঐক্য সনদ: সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সনদ’ তৈরি করা, যাতে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থানে কোনো পরিবর্তন না ঘটে। পরিশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের ওপর এক গভীর ক্ষত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের গতানুগতিক প্রস্তাবনাগুলো যে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, ২০ নভেম্বরের সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন ও পরবর্তী আট বছরের স্থবিরতা তার বড় প্রমাণ। আইআইজিএস সেমিনারের আলোচকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং এই সংকট সমাধানে কালক্ষেপণ করার অর্থ হলো জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বিপন্ন করা। এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে কেবল সুবিধাই দিচ্ছে। তাই সময় এসেছে ঘরের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তিকে এক টেবিলে বসে একটি 'জাতীয় ঐক্য সনদ' তৈরি করার। একইসাথে, প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিশেষ কমিশন’ বা টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার সমন্বিত প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৪ লক্ষাধিক মানুষের এই বিশাল বোঝা চিরস্থায়ী করার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশের উচিত তার বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্বকে এই স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে—আমরা আর এই বোঝা বয়ে বেড়াতে চাই না। এখন যদি আমরা কঠোর ও কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ‘জাতীয় ঐক্য’ ও ‘বিশেষ কমিশন’ গঠনই এখন আমাদের সামনে একমাত্র কার্যকরী বিকল্প। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। [email protected]
ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ: একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জনস্বাস্থ্যের টেকসই উন্নয়ন। বর্তমানে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যখন সরগরম, তখন অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয়—নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH)— নির্বাচনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসা অপরিহার্য ছিল। সম্প্রতি ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস’ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাদের ৮ দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে। ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (MICS) অনুযায়ী, দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ বেসিক স্যানিটেশনের আওতায় এলেও গুণগত মান, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও বৈষম্যহীন প্রাপ্যতা এখনও একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও মানবিক পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা। সরাসরি ‘ওয়াশ’ শব্দটির কারিগরি ব্যবহার এখানে কম হলেও, এর সংস্কার প্রস্তাবগুলো পানি ও স্যানিটেশন অধিকার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। সনদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার কথা (পয়েন্ট ১৮ ও ১৯) বলা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) বা ওয়াসার মতো সংস্থাগুলোর মাঠ পর্যায়ের কাজ যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অধীনে থাকে, তবে বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আসবে। গবেষণায় দেখা যায়, ‘বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে’ (World Bank, 2021)। সনদে মৌলিক অধিকারের তালিকা সংশোধন ও সম্প্রসারণের কথা ((পয়েন্ট ৯) বলা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে যদি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে এটি রাষ্ট্রের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে। নেটওয়ার্কের অন্যতম দাবি ছিল জাতীয় বাজেটে ওয়াশ খাতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ভৌগোলিক বৈষম্য কমাতে একটি ‘WASH Equity Index’ তৈরি করা। বিএনপি তাদের ইশতেহারে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য উন্নত পানি ও স্যানিটেশনের কথা বলেছে। এবি পার্টি প্রান্তিক পর্যায়ে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে জুলাই সনদের মূল সুর —বৈষম্যহীন সাম্য— অনুসরণ করে কোনও দলই সুনির্দিষ্ট ‘ইক্যুইটি ইনডেক্স’ বা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন জিডিপির ১ শতাংশ) ওয়াশ খাতের জন্য বরাদ্দের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ এসডিজি ৬ অর্জনে বাংলাদেশের জন্য বর্ধিত বিনিয়োগ অপরিহার্য। নেটওয়ার্ক আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও বন্যারোধী টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সনদে (পয়েন্ট ৬.১) জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করেছে। জামায়াতে ইসলামী উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি প্রবেশ রোধে শক্তিশালী টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কথা বলেছে, যা ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে। এটি ‘ওয়াটার স্ট্রেস’ মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নেটওয়ার্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারী ও কিশোরীদের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্মত মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী নিশ্চিত করা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান দলগুলোর ইশতেহারে এই বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি কেবল একটি নারী স্বাস্থ্য ইস্যু নয়, এটি কিশোরীদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রায় ৪১ শতাংশ কিশোরী মাসিকের সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে (World Bank, 2018)। এই ‘পিরিয়ড পভার্টি’ নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা হতাশাজনক। নেটওয়ার্ক ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছিল। বিএনপি ‘সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ প্রবর্তন এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও সার উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সিপিবি শহরগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য করতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সকল শিল্পকারখানায় ইটিপিস্থাপন বাধ্যতামূলক করার অঙ্গীকার করেছে। এটি জলাশয়ের দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ একটি উচ্চফলনশীল পদক্ষেপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ওয়াশ পরিষেবাগুলিতে বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে স্বাস্থ্য খরচ হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ৪.৩ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক লাভ ফিরে আসে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে এই অর্থনৈতিক লাভজনক দিকটি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ওয়াশকে কেবল একটি ‘সামাজিক সেবা’ হিসেবে দেখেছে, যা আদতে একটি ‘অর্থনৈতিক বিনিয়োগ’। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর মূল চেতনা হলো বৈষম্যহীনতা। বাংলাদেশে বর্তমানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার বিশাল ফারাক বিদ্যমান। জুলাই সনদের ৯ নম্বর পয়েন্টের আলোকে যদি ‘নিরাপদ পানির অধিকার’ মৌলিক অধিকারে উন্নীত হয়, যা ইতোমধ্যেই হাইকোর্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে, তবে রাষ্ট্র এই বৈষম্য দূর করতে বাধ্য থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও জুলাই সনদের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, দলগুলো ভৌত অবকাঠামো (নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ) নিয়ে যতটা সচেতন, গুণগত মান ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা (মাসিক স্বাস্থ্যবিধি, ইক্যুইটি ইনডেক্স) নিয়ে ততটাই উদাসীন। জুলাই সনদের সংস্কার অনুযায়ী স্থানীয় সরকারকে ওয়াশ বাজেটের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে। পিরিয়ড পভার্টি দূর করতে করছাড় ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় অংশ উপকূলীয় ওয়াশ অবকাঠামোতে বরাদ্দ করতে হবে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (WASH) সবার মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হবে এবং শহর–গ্রাম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে কথা দিয়েছে এনসিপি তাদের ইশতেহারে। তারা আরও বলেছে যে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য জেন্ডার–সংবেদনশীল WASH ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হবে। আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের উচিত হবে জুলাই সনদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রার্থীদের প্রশ্ন করা—আপনার উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমার নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা কোথায়? রাজনৈতিক অঙ্গীকার যখন কেবল কাগজের ইশতেহার থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই কেবল আমরা একটি প্রকৃত ‘মানবিক রাষ্ট্র’ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো। লেখক: আইনজীবী এবং উন্নয়নকর্মী
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম এবং দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ দুই নেত্রীকে (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) ছাড়া প্রথম নির্বাচন—যেটি ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে বলে একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস—সেই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। আপনি যখন লেখাটি পড়ছেন, ততক্ষণে অনেকেই ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামীকাল অর্থাৎ শুক্রবার দুপুরের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়া যাবে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও আধুনিক অটোমেশন সিস্টেম ও একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। যদিও দুর্গম কিছু এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে ফলাফল পেতে সামান্য বিলম্ব হতে পারে, তবে কোনোভাবেই তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনি পরিবেশ অনেক বেশি চমৎকার ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে। একই দিনে দুই ভোট এবারের নির্বাচনে ফলাফল হবে দুটি। কারণ এবার একই দিনে দুটি নির্বাচন হচ্ছে। একটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্যটি জুলাই সনদ প্রশ্নে গণভোট। ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে। একটিতে তিনি জাতীয় নির্বাচনে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। আরেকটি জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় তার সম্মতি আছে কিনা, সেই প্রশ্নে হ্যাঁ বা না সিল মারবেন। যদিও এই গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ও সংশয়ের অন্ত নেই। এমনকি বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য সরকারের তরফে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া কাঙ্ক্ষিত ছিল, তাও চোখে পড়েনি। বরং ব্যালট পেপারে হ্যাঁ ও না দুটি অপশন থাকলেও সরকার শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রধান উপদেষ্টা নিজে এবং তার উপদেষ্টাগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর সাফাই গেয়েছেন, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের হ্যাঁ বা না ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোকে আইনত দণ্ডনীয় বলেছে। তার মানে হ্যাঁ-না ভোটের প্রশ্নে সরকারের মধ্যেই দ্বিধা ও বিভ্রান্তি ছিল, আছে। বাংলাদেশে অতীতের তিনটি গণভোটের অভিজ্ঞতা বলছে, গণভোটের ফলাফল আসলে পূর্বনির্ধারিতই থাকে। অর্থাৎ হ্যাঁ না ভোটে সাধারণত হ্যাঁ জয়ী হয়। কারণ ‘হ্যাঁ’ জিতলেই কেবল সরকার তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারে বা নিজের কর্মকাণ্ডে জনগণের বৈধতা বা সম্মতি আদায় করতে পারে। তবে এবারের গণভোট যেহেতু হচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এবং একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, সুতরাং এবার গণভোটের ফলাফল নির্ধারিত নয় বা গণভোটের জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে, এটিই প্রত্যাশিত। যেসব প্রশ্নে গণভোট হচ্ছে, আশা করা যায় দেশের অধিকাংশ মানুষই সেসব সংস্কারের পক্ষে। সংস্কার মানে যদি হয় ইতিবাচক পরিবর্তন, তাহলে সেই পরিবর্তন কে না চায়? কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই সংস্কারের পক্ষে জনগণের মতামত নেওয়া হচ্ছে সেটি ত্রুটিপূর্ণ। অথচ এই ত্রুটি এড়িয়ে আগে নির্বাচন, তারপর সংসদে সংস্কার প্রস্তাবগুলো পাস করে গণভোটে দিলে এই বিতর্ক এড়ানো যেতো। তার আগে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে জনগণকে সুস্পষ্টভাবে জানানো এবং এগুলো যে সত্যিই দেশের কল্যাণের জন্য করা হচ্ছে, সেই বিশ্বাস জনমনে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত ছিল। কেননা অধিকাংশ মানুষের কাছেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো পরিষ্কার নয়। উপরন্তু এই ধারণাও জনমনে আছে যে, জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য মুক্তিযেুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানকে পাল্টে দেওয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। জুলাইযোদ্ধাদেরকে মুক্তিযাদ্ধাদের সমান করে তোলার চেষ্টা ইত্যাদি। সেইসাথে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ফ্যাক্টগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা গত দেড় বছর ধরে চলছে, সেটির আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোট নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণাও জনমনে আছে। কিন্তু সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে জুলাই সনদ বা গণভোটের ব্যাপারে মানুষের মনে পরিষ্কার ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এটা ধারণা করাই যায় যে, বিপুল সংখ্যক মানুষ না বুঝেই গণভোটে হ্যাঁ বা না দেবেন। অনেকে পরিচিতজনের কথায় হ্যাঁ বা না দেবেন। অর্থাৎ সেখানে তার নিজের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে না। অনেকে হয়তো জটিলতা এড়ানোর জন্য গণভোটে অংশই নেবেন না। কেবল জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটে সিল দেবেন। এবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট নেওয়ার পেছনে সরকারের হয়তো এরকম একটি উদ্দেশ্য ছিল যে, জাতীয় নির্বাচনের পরে আবার একটি গণভোটে খুব বেশি মানুষ সাড়া দেবে না। তাই যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের মানুষ ভোট দিতেই যাবে অতএব একই দিনে গণভোটের ব্যপারেও তাদের মতামত নেওয়া যায়। কিন্তু কাজটা সহজ করতে গিয়ে একটা বড় ধরনের ত্রুটি জিইয়ে রাখা হলো যা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে। তারপরও দেশ ও মানুষের কল্যাণেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে—এই বিশ্বাস থেকে প্রত্যাশা করা যায় যে, প্রধান উপদেষ্টার ভাষায় এবার ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ না হলেও অন্তত একটা ভালো নির্বাচন হবে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ভবনে উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য আয়োজিত ব্রিফিং শেষে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলারও বলেছিলেন, ‘এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন।’ ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন বলতে আসলে কী বুঝায়—সেটি অনেক বড় তর্ক। সেই তর্কে না গিয়েও এটা বলা যায় যে, ভালো নির্বাচন মানে হলো তফসিল ঘোষণার পর আগ্রহী সব প্রার্থী নির্বিঘ্নে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা রাজনৈতিক কারণ বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত হবেন না। প্রতীক বরাদ্দের পরে প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে প্রচার-প্রচারণা চালাবেন এবং সেখানে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে যা নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন। কোনও প্রার্থীকে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে সরকারের কোনও বাহিনী চাপ প্রয়োগ করবে না। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোটের একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে। ভোটের দিন ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্ভয়ে ফিরবেন। জাল ভোট, কেন্দ্রদখল বা সহিংসতা হবে না। ভোট গণনায় কোনও ধরনের কারচুপি হবে না। কোনও নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জয়ী করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা উৎসাহ দেখাবেন না বা এ বিষয়ে তাদের ওপর কোনও ধরনের রাষ্ট্রীয় চাপ থাকবে না। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী সেটি মেনে নেবেন। অনেক সময় ভোট সুষ্ঠু বা শান্তিপূর্ণ হলেও সেখানেও কারচুপি হতে পারে। ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। সুতরাং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন মানেই সেটি গ্রহণযোগ্য ভোট নাও হতে পারে। একটি নির্বাচনকে তখনই ভালো নির্বাচন বলা যায় যখন সেটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে বিগত দিনে হওয়া ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া আর কোনও নির্বাচনই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। ওই তিনটি নির্বাচন নিয়েও পরাজিত দলের পক্ষ থেকে কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু ভালো নির্বাচনের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেগুলো ছিল গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। গত তিনটি নির্বাচনে যে মানুষেরা ভোট দিতে পারেনি বা ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি, তারা এবার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে কোনও ধরনের ভয়-ভীতি ও চাপমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারলেই খুশি হবে। কেননা সংবিধান যে জনগণকে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক বলে ঘোষণা করেছে, সেই মালিকানা প্রয়োগের প্রধান উপায় যে ভোট—সেই ভোট দিতে না পারার ক্ষোভও যে আওয়ামী লীগের পতনের পেছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। অতএব এবারও যদি মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারে বা এবারও যদি সরকার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে এবং কোনও একটি দল বা জোটকে জিতিয়ে আনার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে—তাহলে দেশ যে সংকটের ভেতরে ছিল, তার চেয়ে বড় সংকটে পতিত হবে। নির্বাচন কমিশন যতই নিরপেক্ষ থাকুক, নির্বাচন কেমন হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে ডিসি-এসপিদের ওপরেই। বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব কিনা—সেটি অনেক পুরনো তর্ক। কেননা নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতই দলনিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী ও যোগ্য হোন না কেন; মাঠ প্রশাসন যদি না চায়, তাহলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভোট কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে যে সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে; তারা কেমন ভোট চায়, তার ওপর। মাঠ প্রশাসন যেহেতু সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের অধীন এবং নির্বাচন কমিশনের কথা না শুনলে যেহেতু তাদের কোনও শাস্তির ভয় নেই কিংবা শাস্তি হলেও নির্বাহী বিভাগ থেকে তার ‘সুরক্ষা’ ব্যবস্থার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে; মাঠ প্রশাসন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশের বাইরে যাবে না। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কী নির্দেশনা দিল, তার চেয়ে বড় কথা- সরকার বা নির্বাহী বিভাগ তাকে কী বলছে? নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। ভোট পরিচালনায় যে বিপুল সংখ্যক জনবল দরকার, সে পরিমাণ লোক তার নেই। ফলে তাকে পুরো নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্ভর করতে হয় নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের ওপর। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ বলছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ভোট পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে যে সহায়তা চাইবে, সরকার সেটি দিতে বাধ্য। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কর্মী নন। বরং তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োজিত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিরা যা বলবেন, যে নির্দেশনা দেবেন, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে ভয়-ভীতি ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন, তার ওপর নির্ভর নির্বাচনটি কেমন হবে। অর্থাৎ মাঠ প্রশাসন যদি ইসিকে সহায়তা না করে; তারা যদি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর মতো আচরণ করে; মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ না থাকে বা থাকতে না পারে— তাহলে খুব ভালো নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ধরা যাক, সিইসি ও কমিশনার হিসেবে দেশের সবচেয়ে মেধাবী, যোগ্য, সৎ ও সাহসী মানুষেরাই নিয়োগ পেলেন। কিন্তু একটি নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। পুরো সিস্টেম যদি ভালো নির্বাচনের সহায়ক না হয়, তাহলে একজন সিইসি এবং চারজন কমিশনারের পক্ষে কিছুই করার নেই। তাদের নিয়ত যদি ‘সহিহ’ হোক না কেন, পুরো সিস্টেম যদি তাদেরকে সহযোগিতা না করে তাহলে তাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়। যদি সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি সহযোগিতা না দেয়; যদি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে শুধুমাত্র পুলিশিং বা বিচার করে নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব নয়। বিগত তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত খারাপ নির্বাচন হয়েছে, এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। কিন্তু এই খারাপ নির্বাচনের দায় শুধু ওই তিন সিইসির নয়। এটা পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার ত্রুটি। মনে রাখতে হবে, পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ হওয়ার পরও সেই ভোট গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। যেমন- একটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফল ঘোষণা পর্যন্ত কোনও হানাহানি হলো না, কোনও প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়া হলো না, কাউকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হলো না; কিন্তু দেখা গেলো মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি বা ভোটার উপস্থিতি খুবই কম। যেহেতু সংবিধানে ন্যূনতম ভোটের বিধান নেই, অর্থাৎ নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পেতে হবে এবং প্রাপ্ত ভোটের কত শতাংশ না পেলে জয়ী বলা যাবে না—এমন কোনও বিধান যেহেতু সংবিধানে বা নির্বাচনি আইনে (আরপিও) নেই, ফলে অনেক সময় দেখা গেছে ১০ শতাংশ ভোট পেয়েও অনেকে এমপি বা মেয়র নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটিকে সুষ্ঠু ভোট বলা হলেও কোনও অর্থেই ভালো নির্বাচন বলা যায় না। আবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলে সেখানে কোনও ভোটই হয় না। ভোট না হলে সেখানো কোনও সংঘাত হয় না। তাতে ওই ভোটটি শান্তিপূর্ণ বা সংঘাতমুক্ত হলো বটে, কিন্তু এটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নয়। পরিশেষে, ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন প্রয়োজন নেই, বরং অন্তর্বর্তী সরকার যদি নির্বাচনে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে বা করতে না পারে; সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করে—তাহলেই একটা ভালো নির্বাচন করা সম্ভব এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ যাদেরকে চাইবে তারা যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে দেশ ও জাতির জন্য বিরাট পাওয়া। লেখক: সাংবাদিক
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ফরিদপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জামানুর রহমান সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে স্বপদে ফিরে আসায় বর্তমানে প্রশাসনিক ও জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ, যেমন আর্থিক অনিয়ম, নারী সহকর্মীদের প্রতি অসদাচরণ এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার—এসব বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আরথিক অনিয়মের অভিযোগ: অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, পাবনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জামানুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে, সুজানগরের ‘আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি সরবরাহ ও পাইপড ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন’ প্রকল্পের কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন এবং আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এ সংক্রান্ত তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। নারী সহকর্মীদের প্রতি অসদাচরণ ও অনৈতিক আচরণের অভিযোগ: ২০২৩ সালে রাজশাহীতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে জামানুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয় (নম্বর: ১৪২/২০২৩)। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে অনৈতিক আচরণ, নারী সহকর্মীদের হয়রানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। পুনরায় স্বপদে ফিরে আসা এবং কর্মকর্তাদের ক্ষোভ: অর্থ ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে, তদন্ত শেষে তাঁকে পুনরায় স্বপদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, যার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি, ফরিদপুর সার্কেলে তাঁর প্রভাব আগের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। খুলনায় যৌন হয়রানির অভিযোগ: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামানুর রহমানের বিরুদ্ধে খুলনায় তাঁর পূর্ববর্তী দায়িত্বকালীন সময়ে একাধিক নারী কর্মচারী যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন। তিনি ফরিদপুরে পদায়িত থাকলেও খুলনায় অবস্থান করে কর্মচারীদের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করতেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকৌশলী মো. জামানুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি, এবং এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। একইভাবে, প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল-এর মন্তব্যও পাওয়া যায়নি। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি: প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর, ফরিদপুর ও অন্যান্য অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি দ্রুত এবং আইনানুগ তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছেন। তাঁরা আশাবাদী যে, এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে এগোতে পারবে প্রশাসন।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক) গভর্নর পদে আহসান এইচ মনসুরকে সরানোর প্রক্রিয়ার সময় তার উপদেষ্টা ও কয়েকজন কর্মকর্তাকে ‘মব’ বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বের করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনা সূত্রপাত হয় মনসুরের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মকর্তাদের অসন্তোষ এবং প্রতিবাদ সভার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিস্থিতি গভর্নর থাকার সময় মনসুরের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ কয়েকজন কর্মকর্তার সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন গভর্নর তিনজন কর্মকর্তাকে বদলির নোটিশ দেন। অভিযোগ, প্রতিবাদ সভার একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তারা মনসুরের পিএস ও অন্য দুই কর্মকর্তাকে জোর করে অফিস থেকে বের করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ধাক্কা, বাঁধা, অশ্লীল ভাষার মাধ্যমে কর্মকর্তাদের বের করা হয়েছে। পরে নতুন গভর্নর নিয়োগের পর তিন কর্মকর্তার বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। সাবেক গভর্নরের পিএস কামরুল ইসলামকে হেড অফিস থেকে সদরঘাট শাখায় বদলি করা হয়েছে। বরিশালে আদালতে বিশৃঙ্খলা বরিশাল জেলা আদালতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের জামিন দেয়ায় হট্টগোল এবং আদালতের এজলাসে ঢুকে ভাঙচুর ও বিক্ষোভের অভিযোগ ওঠে। বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিএনপিপন্থী আইনজীবী সাদিকুর রহমান লিংকনসহ একাধিক আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। লিংকনকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হয়। হাইকোর্টও ওই ঘটনায় মামলার পাশাপাশি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে এবং ১১ মার্চ শুনানির জন্য নির্দেশ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে হামলা ও ভাঙচুর বরিশালের ঘটনায় মানববন্ধন পালনকারী আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের কক্ষে হামলা চালানো হয়। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ২০-২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যদিও বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী নেতা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাসসেও অস্থিরতা নতুন সরকারের শপথের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসে অস্থিরতা দেখা দেয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদকে সরানোর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ ওঠে, কর্মকর্তারা মব সৃষ্টি করে তাকে সরানো হয়। বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মন্তব্য অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “মবের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সরকার এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।” মানবাধিকার কর্মী সাইদুর রহমান উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক, বরিশাল আদালত, সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের কক্ষে হামলা—সবই মবের অন্যরূপ।” তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের সরকারকে মব প্রতিরোধে সতর্ক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বরিশালের ঘটনায় আইন প্রয়োগের উদাহরণ অন্য ক্ষেত্রেও অনুসরণীয়। মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসেবে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এই ধরনের ঘটনার বৃদ্ধি এবং আইনের দ্রুত প্রয়োগে তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা ও আইনগত পদক্ষেপই মব নিয়ন্ত্রণে মূল চাবিকাঠি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: বরিশাল নগরীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বরিশাল জিলা স্কুল-এর প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াত হয়ে সর্বশেষ বিএনপির ছায়াতলে যাওয়ার অভিযোগে তাকে ঘিরে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। দলবদলের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, গত সতেরো বছর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি নিজেকে শেখ মুজিবুর রহমান-এর আদর্শের সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একাধিক বই রচনা করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি প্রকাশ্যে নিজেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বরিশাল সদর পাঁচ আসনে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার-এর বাসভবনে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে গেলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সরকারি প্রটোকল ভঙ্গের অভিযোগ বরিশালে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নবনির্বাচিত এমপিকে এভাবে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা জানাননি। অভিজ্ঞ মহলের মতে, শপথ গ্রহণের আগে এ ধরনের শুভেচ্ছা প্রটোকলবিরোধী। সমালোচকদের অভিযোগ, আগেভাগেই রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন নুরুল ইসলাম। অতীতের বিতর্ক বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জিলা স্কুল মাঠে বিএনপির সমাবেশ ঠেকাতে তিনি কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট অভিযোগটি করা হয়েছিল বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানা-য়। যদিও নুরুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, তিনি কখনো বিএনপির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষিত আছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। দুর্নীতি ও বদলির ইতিহাস স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে নিজেকে বঙ্গবন্ধুর অনুসারী পরিচয় দিয়ে বরিশাল জিলা স্কুলে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। পরবর্তীতে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে বদলি করে পাঠানো হয় ঝালকাঠি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়-এ। সেখানেও অনিয়ম ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুনরায় বরিশাল জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। জামায়াত ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ‘রেটিনা কোচিং সেন্টার’-কে জিলা স্কুলের কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দেন পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। বিষয়টি নিয়ে তখন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিএনপি নেতার বক্তব্য এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, “স্বৈরাচারি আমলে সুযোগ-সুবিধা নেওয়া কেউ যদি খোলস পাল্টে অবৈধ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে। এরা শিক্ষক রূপে ব্যবসার ধান্দা করে, না হলে সবসময় ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয় খুঁজত না।” আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতা, জামায়াত সমর্থন এবং সর্বশেষ বিএনপি নেতাকে ফুলেল শুভেচ্ছা—এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগে নুরুল ইসলাম এখন বরিশাল নগরীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার সুস্পষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সময়ে প্রশাসনিক ও শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা। কে এই বিতর্কিত প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বরিশালের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন বহুল সমালোচিত ও বিতর্কিত শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে জড়িত এই শিক্ষকের নিয়োগে শিক্ষার্থী-অভিভাবক মহলে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নারী কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির অভিযোগ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পরিবর্তে তিনি সবসময় সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ বাণিজ্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে তৎপর ছিলেন। ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় আলোচিত হয়ে পড়েন তিনি। এমনকি এক অভিজাত হোটেলে নারীসহ ধরা পড়ার ঘটনাও তাকে বদলির মুখে ঠেলে দেয়। ক্ষমতার প্রভাব খাটানো বিভিন্ন সময়ে তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় টিকে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, মাদারীপুরে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান ও ঝালকাঠিতে আমির হোসেন আমুর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নানা অনিয়ম আড়াল করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বই লিখে তিনি ‘মুজিববাদী প্রচারক’ হিসেবে পরিচিতি নিলেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ঘরানার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বরিশাল জিলা স্কুলে যোগদানের পরপরই তিনি তিনটি ক্লাস বন্ধ রেখে রোদে দাঁড় করিয়ে সংবর্ধনা নেন। অডিটরিয়াম থাকা সত্ত্বেও এমন আয়োজন করায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। এর আগে ঝালকাঠিতেও একইভাবে শিক্ষার্থীদের দিয়ে সংবর্ধনা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বরিশাল জিলা স্কুলে ছাত্রদের কাছ থেকে আইসিটি বাবদ মাসিক টাকা নেওয়ার পাশাপাশি এককালীন অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও স্কুল উন্নয়নের নামে ভুয়া বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার প্রমাণ মিলেছে। নিয়োগ পরীক্ষার সম্মানী আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার তৈরিসহ নানা অভিযোগে বারবার সমালোচিত হয়েছেন তিনি। আন্দোলন দমনে ভূমিকা ২০২৪ সালের আগস্টে যখন দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন চলছিল, তখন ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনরত নুরুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশ নিতে না দিতে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে জোর করে বিদ্যালয়ে আটকে রাখেন। সমালোচনার ঝড় বিগত আওয়ামী সরকারের দালাল খ্যাত নুরুল ইসলাম দলীয় প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিয়ম-নীতির কোনরুপ তোয়াক্কা না করে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খান এর সাথে গোপনে স্ব-পরিবারে হজ পালন করেন। এমনকি দেশের বাইরে অবস্থানকালীন সময়ে অর্ধ বেতন এর নিয়ম-নীতিকে লঙ্ঘন করে তুলেছেন পুরো মাসের বেতন। সরকারের অনুমতি ছাড়া হজ পালন করার বিষয়ে ইসলামের ধর্মীয় ব্যাখ্যা জানতে চাইলে জিলা স্কুলের পেশ ইমাম ও খতিব মুফতি আব্দুল কাদের কাশেমী বলেন, সরকারি চাকুরীজীবিরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিত হজ পালন করলে স্পষ্টতই গুনাহের কাজে শামিল হবেন। এমনকি হজের তথ্য গোপন করে বেতন-ভাতা উত্তোলন করলে সেই টাকাও হারাম বলে গন্য হবে। এদিকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর দূর্নীর্তির তথ্য রয়েছে নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বিনা টেন্ডারে বিক্রি করেছেন স্কুল কম্পাউন্ডের শতবর্ষী গাছ। এছাড়াও দেড় লক্ষ টাকার কম্পউিটার, অত্যাধুনিক টেলিভিশন আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নুরুল ইসলাম বলেন, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের সাথে দলীয় কার্যক্রমে অংশ গ্রহন করতে হয়। এছাড়া কতিপয় মানুষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে। উল্লেখ্য, জিলা স্কুলের নতুন ছয়তলা ভবন করার জন্য সীমানা নির্ধারনী সভা হয়। ওই সভায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনিতা রানি হালদার, সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুর রব, মিজানুর রহমান খান ও সিনিয়র শিক্ষক ফারুক আলম অভিযোগ করেন সাবেক প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম স্কুল কম্পাউন্ডের পিছনের শতবর্ষী ৩ টি রেইনট্রি গাছ বিনা টেন্ডারে বিক্রি করেন। জানা গেছে, ২০২৩ সালে রমজান মাসের ছুটি চলাকালীন সময়ে এক লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় ওই গাছ তিনটি বিক্রি করে দেন। এ বিষয়ে স্কুলের অফিস সহায়ক (নৈশ প্রহরী/দাড়োয়ান) আঃ জব্বার জানান, প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের সময়ে গাছগুলো কাঁটা হয়েছে। শুনেছি টেন্ডার ছাড়াই গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ২০২২ সালের জুলাই মাসে স্কুলের ফান্ড থেকে লাখ টাকা মূল্যের স্যামসাং ব্রান্ডের একটি টেলিভিশন ক্রয় করার কিছুদিন পর মেরামতের কথা বলে টিভিটি বাসায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্কুল থেকে বদলি হয়ে গেলেও টিভি আর ফেরত দেয়নি তিনি। এছাড়াও স্কুলের ফান্ড থেকে ১টি ল্যাপটপ কম্পিউটার, ১টি ডেক্সটপ কম্পিউটার ও একটি প্রিন্টার মোট একলাখ বায়ান্ন হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করে কিন্তু ল্যাপটপ ও ডেক্সটপ কম্পিউটার দুইটি আর স্কুলে জমা দেয়নি নুরুল ইসলাম। অন্যদিকে স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিফিন বাবদ খরচেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টিফিনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে কম দামে টিফিন সরবরাহ করা হতো এবং মাস শেষে নিজের ইচ্ছামত বাড়িয়ে টিফিনের বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাত করারও অভিযোগ রয়েছে। প্রসঙ্গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ঝালকাঠি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল তাকে। এর আগে ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখানেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি নারী কেলেঙ্কারির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ঝালকাঠীর এক অভিজাত হোটেলে নারীসহ ধরা পড়লে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পালিয়ে এসে বরিশাল জেলা শিক্ষা অফিসে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। পরে তাকে বরগুনা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু বরগুনাতেও তিনি একই ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে তাকে দুই দিন অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হয়েছিল। বরগুনাতে নানা অঘটনের জন্ম দিয়ে কয়েক মাস পরই বদলি হন মাদারীপুর ইউনাইটেড সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। মাদারীপুরে অবস্থানকালে, নুরুল ইসলামের দুর্নীতি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা শাজাহান খানের সাথে পারিবারিক সখ্যতা গড়ে তুলে নাম ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন। তবে তার এই অনিয়ম ও দুর্নীতি স্থানীয় জনগণের চোখ এড়াতে পারেনি। তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে তাকে বরিশালে বদলি করা হয়। এরপর ২০২১ সালে বরিশাল জিলা স্কুলে যোগদান করেন। বরিশাল জিলা স্কুলে যোগদানের পর সুচতুর নুরুল ইসলাম সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ও সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর জাহিদ ফারুকের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। এরপরই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নানা অনিয়য়ে জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষকসহ সিন্ডিকেট করে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু করেন। স্কুলের ছাত্রদের কাছ থেকে প্রতি মাসে আইসিটি বাবদ ২০ টাকা করে আদায় করার পরেও এককালীন ছাত্র প্রতি ২৪০ টাকা আদায় করতেন যা সম্পূর্ণরূপে আইন পরিপন্থী এবং এই টাকার হিসাব কোন শিক্ষকই তখন জানতেন না। এছাড়াও ভুয়া বিল করে স্কুলের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন ফান্ডের লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাত করেছেন তিনি। সরকারি বিধি অনুযায়ী খরচ করার বিধান থাকলেও তিনি ওই বিধানের তোয়াক্কা না করে লোক দেখানো কিছু কাজ করে বেশিরভাগ টাকা পকেটস্থ করেছিলেন এবং শিক্ষকদের জোরপূর্বক ভাউচারে স্বাক্ষর নিয়েছিলেন। স্কুলের ক্রীড়া ফান্ড থেকে নিজের ও পরিবারের জন্য মোটা অংকের টাকাও হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এমনকি বেসরকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের কারনে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ২০২৩ সালের মাসে বরিশাল-২ আসনের (উজিরপুর-বানারীপাড়া) সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহে আলম তালুকদারের নির্দেশে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত রাখায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন তিনি। যা বিভিন্ন পত্রিকায় খবরের শিরোনাম হয়েছিল। এছাড়াও বেসরকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অসংখ্য অভিযোগও রয়েছে নুরুল ইসলমের বিরদ্ধে । এছাড়াও স্কুলে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বেসরকারী স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী না রেখে তাদের সম্মানী নিজেই আত্মসাত করতেন। এসব অপকর্ম আড়াল করতে নিজের ফেসবুক আইডিতে হরহামেসাই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের গুনকীর্তন চালিয়ে যেতেন এই শিক্ষক। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নামে কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালে ‘চেনায় মুক্তিযুদ্ধ অন্তরে বঙ্গবন্ধু’ ও ‘মার্চের চেতনা জন্ম-ভাসন স্বধীনতা’ নামে দুটি বই লিখে বরিশাল জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাদারীপুর ইউনাইটেড সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে নিজ খরচায় শেখ মুজিবের মুরাল নির্মান করেন। এছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকায় ৭ মার্চের ভাষন, ১৫ আগষ্ট, শেখ মুজিবের জন্মদিনে নিয়মীত কলামও লিখেতেন এই শিক্ষক। শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলছেন, দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত একজন শিক্ষককে বরিশাল জিলা স্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক করা দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তার পদোন্নতি ও পুনঃনিয়োগ নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে। শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি বরিশাল জিলা স্কুলের মূল ফটকে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম কারো সাথে আলোচনা না করেই ওই ছবির ওপরে নিজের স্বাক্ষর দিয়ে রেখেছেন। এর বিরোধিতা করলে তিনি সকলের সাথে খারাপ আচরন করেছেন।বঙ্গবন্ধুর ছবিতে সই করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জিলা স্কুলে আমিই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়েছি। এজন্য বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে একটি সই করেছি।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
জিএম কাদের এবং ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে। জিএম কাদের ২৪৩ আসনে প্রার্থী দিলেও একটি আসনেও জিততে পারে নি। অন্যদিকে জাপার অপর অংশ ২৮টি আসনে প্রার্থী দিলেও একটি আসনেও জিততে পারে নি। কেন এই পরাজয়? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্ব সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা, জোটনির্ভর রাজনীতি এবং ভোটারদের আস্থাহীনতাই এ পরাজয়ের অন্যতম কারন। বৃহত্তর রংপুরের জাতীয় পার্টির দুর্গ ভেঙ্গে খানখান হয়েছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। সূত্রমতে, মতে রাজনীতিতে টিকে থাকতে শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠন অপরিহার্য। কিন্তু জাতীয় পার্টির অনেক জেলা ও উপজেলা কমিটি কাগুজে অবস্থায় রয়েছে। নিয়মিত কর্মসূচি, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও জনসংযোগ কার্যক্রমে ঘাটতি থাকায় দলটি ভোটারদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেনি। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার মতো নতুন নেতৃত্ব ও বার্তাও দৃশ্যমান ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টি বড় দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করেছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু আসন পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। ভোটারদের একটি অংশ দলটিকে ‘কিংমেকার’ বা ক্ষমতাসীনদের সহযোগী হিসেবেই দেখে, বিকল্প শক্তি হিসেবে নয়। ফলে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় সমর্থন কমেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে জাপা নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে মন্ত্রিসভায় থাকে, আবার বিরোধী দলেরও ভূমিকা পালন করে জাতীয় পার্টি। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও সমঝোতার মাধ্যমে আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দল হয়। এরপর ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও জাপা মাত্র ১১ আসন পেয়েছিল। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির কেন ভরাডুবি এ বিষয়ে পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে জনকণ্ঠ থেকে একাধিক বার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। যার ফলে পার্টির কোন প্রতিক্রিয়া জানা যায় নি। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির অপর অংশের নির্বাহী চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চুন্নু জনকণ্ঠকে বলেন, জিএম কাদেরের একরোখার কারণে এমন ভরাডুবি হয়েছে। আমরা বলেছিলাম নির্বাচনে না যেতে। তিনি আমাদের কথা শুনলেন না। দল থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। ঐক্যবদ্ধ থাকলে নির্বাচনে ভরাডুবি হতো না। এ দায়-দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। নির্বাচনে পার্টির ভরাডুবির বিষয়ে আমরা বসে আলোচনা করবো। এই অংশের অপর নেতা সুনীল শুভ রায় বলেন, এই পরাজয়ের দায় দায়িত্ব জিএম কাদেরের। কারণ তিনিই দলকে ভেঙেছেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের ভোট বিএপির প্রার্থীকে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে সমঝোতার ভিত্তিতে বিএনপি প্রার্থী ভোট পেয়েছেন। আমাদের জাপা ছোটখাটো জোট ছিল। সম্মিলিত জাতীয় জোট নির্বাচনে ২৮ প্রার্থী দিয়েছিল। কিন্ত কোনো প্রার্থীই জয়লাভ করতে পারেনি। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাত ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল জাতীয় পার্টির। ওই বছরের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে দলটি। এর দুই বছরের মধ্যে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল বর্জন করলে জাপা ২৫১ আসনে জয়লাভ করে। তবে ওই সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে এরশাদ শাসনের। এরপর আর ক্ষমতায় যাওয়া হয়নি দলটির। পরবর্তীতে যত নির্বাচন হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদন্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে। জাতীয় পার্টির জন্ম হয়েছে সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটি গণতান্ত্রিক ধারায় সক্রিয় থাকলেও বিরোধীরা অতীতের শাসনামলকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে। তরুণ প্রজন্মের কাছে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে ইতিবাচক বর্ণনা তুলে ধরতে না পারাও একটি কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে স্থানীয় জনপ্রিয়তা বড় ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি এমন প্রার্থী দিয়েছে, যাদের এলাকায় সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল ছিল। আবার কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ভোট বিভক্ত হয়েছে। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল না থাকায় ফলাফল নেতিবাচক হয়েছে। কয়েকটি নির্বাচন বিশ্লেষণ করেল দেখা যায় জাতীয় পার্টি একক ভাবে নির্বাচন করে কোন আশানুরূপ ফল অর্জন করতে পারেনি। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি সারাদেশে ৩৫টি আসনে জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও এককভাবে অংশ নিয়ে সারাদেশে ৩২টি আসনে জয়লাভ করে জাতীয় পার্টি। ২০০১ সালের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে জোট করে জাতীয় পার্টি পায় মাত্র ১৪টি আসন। ২০০৬ সালে জাতীয় পার্টি যোগ দেয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে। আর এই মহাজোটে গিয়েই ধস নামতে শুরু করে জাতীয় পার্টির। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট থেকে ২৯টি আসন ছাড় পায় এরশাদের জাপা। ২০০৯ সালে গঠিত হাসিনা সরকারের মন্ত্রী ছিলেন জিএম কাদের। এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভমি ধস হয়েছে জাতীয় পার্টির। পাটিৃর চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর–৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে তৃতীয় হয়েছেন। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিন্দ্বী বিএনপির শামসুজ্জামান শামু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। অন্যদিকে জিএম কাদের পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট। জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসনে নির্বাচন করে নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে। দলের ‘দুর্গ’খ্যাত কুড়িগ্রামে একটি আসনেও জয় পাননি জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীরা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জেলার চারটি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে লাঙ্গল প্রতীকে দলটির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনোটিতেই বিজয়ী হতে পারেননি। বরং চারটি আসনের তিনটিতেই জামানত হারিয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতেগড়া দল জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বারবার ভাঙনের মুখে পড়ে। এর মধ্যে নব্বইয়ের গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর প্রথমবারের মতো ভাঙন ধরে জাতীয় পার্টিতে। দ্বিতীয় দফার ভাঙন হয় ১৯৯৭ সালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও শেখ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে। কাজী জাফর ও শাহ মোয়াজ্জেমের নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে, ২০০১ সালে নাজিউর রহমানের নেতৃত্বে চতুর্থ দফা এবং ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে জাপায় পঞ্চমবারের মতো ভাঙন ধরে। ২০১৯ সালে এরশাদ মারা যাওয়ার পর সবশেষ ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল তার স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি অংশ ভাগ হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০(ক) ধারায় দলের চেয়ারম্যানকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কোনো ধরনের শোকজ কিংবা কারণ দর্শনোর নোটিস ছাড়াই যে কাউকে বহিষ্কার করতে পারবেন। এর আগে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে মহাসচিব থেকে বহিষ্কার করে মুজিবুল হক চুন্নুকে মহাসচিব করা করেছিলেন জিএম কাদের। দলের গঠনতন্ত্রের ‘বিতর্কিত’ ২০(ক) ধারাকে কেন্দ্র করে ফের ভাঙতে যাচ্ছে জাপা। একই সঙ্গে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরকে শীর্ষপদ থেকে সরাতে জোট বাঁধে। অবশেষে রুহুল আমিন হাওলাদার ও ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন আরেকটি জাপার সৃষ্টি হয়। কাউন্সিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সপ্তম বারের মতো ভেঙে যায় জাতীয় পার্টি। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চেয়ারম্যান ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার জাতীয় পার্টির মহাসচিব নির্বাচিত হন।
দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-৩ আসন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা দলটির দখলেই ছিল আসনটি। কখনও কোনো নির্বাচনে এখানে জয় পায়নি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ইতিহাস বদলে গেছে। এই প্রথমবারের মতো আসনটি দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি সমর্থিত জোট। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও জোট প্রার্থী নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। যদিও তিনি সরাসরি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেননি, তবুও জোট সমঝোতার মাধ্যমে আসনটি বিএনপির ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটের ফলাফল এবারের নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে ৯৬ হাজার ৭৬৬ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। ঘোড়া প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৭৬ ভোট। আসনটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অতীত নির্বাচনের ইতিহাস পটুয়াখালী-৩ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আনওয়ার হোসেন হাওলাদার এবং ১৯৮৮ সালে একই দল থেকে মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে একে এম জাহাঙ্গীর হোসাইন বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন গোলাম মাওলা রনি। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন এস এম শাহজাদা। তবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি থেকে শাহজাহান খান জয়ী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচন আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই আসনে এবার পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় ইস্যু, জোট সমঝোতা এবং তরুণ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নুরুল হক নুরের বিজয়ের মাধ্যমে শুধু একটি আসন পরিবর্তন হয়নি, বরং দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনের এ ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে বিএনপি সমর্থিত জোটের এই বিজয় আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশলে প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চলমান আসরে সবার আগে সুপার এইটে জায়গা নিশ্চিত করল দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দল। ডি গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিউজিল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দলকে ৭ উইকেটে হারিয়ে ৩ ম্যাচে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে পরের পর্বে উঠেছে প্রোটিয়ারা। শনিবার ভারতের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে নিউজিল্যান্ড ৭ উইকেট হারিয়ে তোলে ১৭৫ রান। নিউজিল্যান্ডের লড়াকু সংগ্রহ কিউইদের হয়ে সর্বোচ্চ ৪৮ রান করেন Mark Chapman। এছাড়া ৩২ রান যোগ করেন Daryl Mitchell। তবে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় বড় সংগ্রহ গড়া সম্ভব হয়নি তাদের। মার্করামের ব্যাটে জয়ের বন্দনা ১৭৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা কিছুটা সতর্ক ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। কিন্তু অধিনায়ক Aiden Markram ক্রিজে সেট হওয়ার পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রোটিয়াদের হাতে। ৪৪ বলে ৮টি চার ও ৪টি ছক্কায় ৮৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন মার্করাম। তার ব্যাটিং নৈপুণ্যে ১৭ বল হাতে রেখেই ৭ উইকেটের বড় জয় নিশ্চিত করে দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচে রানের রেকর্ড এই ম্যাচে দুই দল মিলে মোট ৩৫৩ রান করে, যা চলতি আসরের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মিলিত রান। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে গড়ে ওঠে আরও একটি ব্যক্তিগত রেকর্ড। ডি ককের নতুন মাইলফলক দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান Quinton de Kock টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ডিসমিসালের রেকর্ড গড়েন। তিনি ছাড়িয়ে যান ভারতের কিংবদন্তি অধিনায়ক MS Dhoniকে। ডি ককের ডিসমিসালের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩-এ। ডি গ্রুপ থেকে টানা তিন জয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা এখন সুপার এইট পর্বের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেবে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে বাঁচা-মরার লড়াই।
ব্যাটার শেরফানে রাদারফোর্ড ও স্পিনার গুদাকেশ মোতির কল্যাণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসর টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গতরাতে ‘সি’ গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩০ রানে হারিয়েছে ইংল্যান্ডকে। ব্যাট হাতে রাদারফোর্ড ৪২ বলে অনবদ্য ৭৬ এবং স্পিনার মোতি ৩ উইকেট নেন। মুম্বাইয়ে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৮ রানে দুই ওপেনারকে হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তৃতীয় উইকেটে ২৮ বলে ৪৭ রান যোগ করে শুরুর ধাক্কা সামাল দেন শিমরোন হেটমায়ার ও রোস্টন চেজ। দলীয় ৭৭ রানের মধ্যে বিদায় নেন তারা। হেটমায়ার ২৩ ও চেজ ৩৪ রান করেন। এরপর রোভম্যান পাওয়েলকে নিয়ে ২৯ বলে ৫১ এবং জেসন হোল্ডারের সাথে ৩২ বলে ৬১ রানের জুটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৯৬ রানের সংগ্রহ এনে দেন রাদারফোর্ড। পাওয়েল ১৪ ও হোল্ডার ১৭ বলে ৩৩ রান করেন। ২টি চার ও ৭টি ছক্কায় ৪২ বলে ৭৬ রানে অপরাজিত থাকেন রাদারফোর্ড। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিংয়ের সামনে বড় ইনিংস খেলতে পারেনি ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা। ১৯ ওভারে ১৬৬ রানে গুটিয়ে যায় তারা। দলের হয়ে স্যাম কারান ৪৩, জ্যাকব বেথেল ৩৩ ও ফিল সল্ট ৩০ রান করেন। মোতি ৩৩ রানে ৩টি ও চেজ ২৯ রানে ২ উইকেট নেন। ম্যাচ সেরা হন রাদারফোর্ড।
আগামী মাসের নারী এশিয়ান কাপের শিরোপা জিতে “নতুন ইতিহাস” গড়তে চায় জাপান, এমনটাই জানিয়েছেন দলের কোচ নিলস নিয়েলসেন। বৃহস্পতিবার ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেছেন নিয়েলসেন। যেখানে তিনি ইংল্যান্ডভিত্তিক ১৬ জন খেলোয়াড়কে দলে রেখেছেন। জাপান এশিয়ার একমাত্র দেশ যারা নারী বিশ্বকাপ জিতেছে, তবে এ পর্যন্ত খেলা ২০ আসরের এশিয়ান কাপে তারা মাত্র দু’বার শিরোপা জিতেছে। সর্বশেষ শিরোপা আসে ২০১৮ সালে। জাপান নারী দলের প্রথম বিদেশী কোচ গ্রিনল্যান্ডে জন্ম নেওয়া নিয়েলসেন মনে করেন, আগামী ১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হওয়া টুর্নামেন্টে এবারই জাপানের সামনে সেরা সুযোগ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেয়া ৫৪ বছর বয়সী এই কোচ বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে এই টুর্নামেন্ট জাপানের জন্য সহজ ছিল না। আমরা নতুন ইতিহাস গড়তে চাই। আমাদের এমন একটি দল আছে যারা শিরোপা জিততে সক্ষম। তাই ট্রফি না জেতা পর্যন্ত আমরা সন্তুষ্ট হতে পারছি না।” ২৬ সদস্যের দলে জায়গা পেয়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হিনাতা মিয়াজাওয়া, যিনি ২০২৩ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। এছাড়া ম্যানচেস্টার সিটির ইউই হাসেগাওয়া ও আওবা ফুজিনোও রয়েছেন। ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য এবং ১৬৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ডিফেন্ডার সাকি কুমাগাই এখনও দলে আছেন। জাপানের ঘরোয়া ডব্লিউই লিগ থেকে মাত্র চারজন খেলোয়াড় দলে সুযোগ পেয়েছেন। নিয়েলসেন জানান, চোট-আঘাতের সমস্যা না থাকায় চূড়ান্ত দল নির্বাচন খুব কঠিন ছিল না। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি দল পেয়েছি যেখানে সব ধরনের বৈচিত্র্য আছে। প্রায় সব পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুত। একই ধরনের অনেক খেলোয়াড় আমরা নেইনি। কারণ মাঠে কাউকে বদলি করলে আমরা ভিন্ন কিছু যোগ করতে চাই।” প্রথম রাউন্ডে তাইওয়ান, ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে একই গ্রুপে থাকা জাপান ফেবারিট হিসেবেই মাঠে নামবে। নিয়েলসেন বলেন, “প্রতিপক্ষ যে কৌশল নিয়ে আসুক না কেন, আমাদের স্কোয়াডে তার জবাব দেওয়ার মতো সমাধান আছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।”
উৎসবমুখর পরিবেশে জীবনের প্রথমবারের মত ভোট দিতে পেরে উচ্ছসিত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও দেশ সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। আজ বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একটি বুথে ভোট প্রদান করেন তামিম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের তামিম ইকবাল বলেন, ‘জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। খুবই এক্সাইটেড। পরিবেশ খুবই ভাল লাগছে। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি।’ পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের ভেরিফাইড পেজে ভোট দেওয়ার ছবি দিয়ে তামিম লিখেন, ‘ভোট আমার নাগরিক অধিকার। নিজে ভোট দিলাম এবং দেখলাম স্বতস্ফূর্ত উৎসাহে অনেকেই ভোট দিচ্ছেন। সুশৃঙ্খল ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সবাইকে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’ যে কেন্দ্রে তামিম ভোট দিয়েছেন, সেটি চট্টগ্রাম-৯ আসন। কোতোয়ালি থানার এ আসনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, ১১ দলীয় জোটের এ কে এম ফজলুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুস শুক্কুর, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ, গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ, বাসদের মো. শফি উদ্দিন কবির, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন, নাগরিক ঐক্যের মো. নুরুল আবছার মজুমদার, জনতার দলের মো. হায়দার আলী চৌধুরী ও জেএসডির আবদুল মোমেন চৌধুরী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের ভেরিফাইড পেজে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ক্রিকেটাররা। ঢাকা-৯ আসনে দক্ষিণ বনশ্রী মডেল হাই স্কুলে ভোট দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও জাতীয় দলের বর্তমান ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। ভোট দেওয়ার ছবি আপলোড করে ফেসুবকে আশরাফুল লিখেছেন, ‘সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আজ ভোট দিলাম। দায়িত্ববোধ শেখানো শুরু ঘর থেকেই।’ রংপুরে নিজ এলাকায় প্রথমবার ভোট দিয়েছেন ২০২০ সালে আইসিসি যুব বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক আকবর আলি। নিজ এলাকার মানুষদের সাথে ভোট দেওয়ার ছবি আপলোড করেছেন তিনি। ছবির ক্যাপশনে আকবর লিখেছেন, ‘প্রথম ভোট।’ আকবরের মত প্রথমবার ভোট দিয়েছেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার উইকেটরক্ষক-ব্যাটার নুরুল হাসান সোহান। নিজ এলাকা দৌলতপুরে ভোট দিয়েছেন তিনি। ভোট কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তোলা ছবি ফেসবুকে দিয়েছেন সোহান। ছবির ক্যাপশনে সোহান লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমবার ভোট দিলাম।’ জীবনের প্রথম ভোট দিয়ে আনন্দিত জাতীয় দলের ব্যাটার মাহমুদুল হাসান জয়। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘দিয়ে আসলাম, জীবনের প্রথম ভোট।’ ফেনিতে ভোট দিয়েছেন জাতীয় দলের পেস বোলিং অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন। ভোট দেওয়ার ছবি ফেসবুকে আপলোড করে সাইফুদ্দিন লিখেছেন, ‘অবশেষে ভোট দিলাম। যেখানে আমার শৈশব কেটেছে, মাটির গন্ধে বড় হওয়া সেই চেনা জায়গাতেই। এটা শুধু একটা ভোট নয়, এটা নিজের শিকড়কে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি, নিজের দায়িত্বকে অনুভব করার এক নীরব গর্ব। ছোটবেলার স্মৃতি, আজকের সিদ্ধান্ত- এই দুটো একসাথে মিলেই আজকের দিনটা আমার কাছে আলাদা।’ ভোট দিয়েছেন জাতীয় দলের হার্ডহিটার ব্যাটার সাব্বির রহমানও। ফেসবুকে এই ডান-হাতি ব্যাটার লিখেছেন, ‘আমার ভোটটা কিন্তু দিয়ে দিলাম।’ সবমিলিয়ে এবার সারাদেশে ভোটার রয়েছেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) আবারও অস্বস্তি, আবারও দুর্নীতির গন্ধ। দুর্নীতি ও ফিক্সিং- সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিতর্কিত বিসিবি পরিচালক মোখলেছুর রহমান শামীম দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোয় নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। মাঠের ক্রিকেটে শুদ্ধতার কথা বলা বোর্ডের অন্দরেই যখন অনিয়মের অভিযোগ ঘুরপাক খায়, তখন সেটি শুধু একজন পরিচালকের বিষয় থাকে না- পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই টালমাটাল হয়ে ওঠে। বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, শামীমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ একদিনের নয়। স্বার্থের সংঘাত, আর্থিক অনিয়ম এবং ফিক্সিং- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বোর্ডের ভেতরে আলোচনায় ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিযোগ নতুন তথ্য ও নথির সঙ্গে জড়িত হয়ে সামনে আসায় আর চুপ থাকার সুযোগ ছিল না বিসিবির সামনে। পরিস্থিতির চাপে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি, আর দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে অভিযুক্ত পরিচালককে। এ ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়েছে- বাংলাদেশ ক্রিকেটে দুর্নীতি শুধু মাঠের খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরেও তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত সত্য উন্মোচন করবে, নাকি এটি পরিণত হবে আরেকটি চাপা পড়ে যাওয়া অধ্যায়ে। অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) মোখলেছুর রহমান শামীমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সূত্রপাত হঠাৎ করে নয়। বিসিবি ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বোর্ডের অভ্যন্তরে আলোচনায় ছিল। তবে এতদিন এসব অভিযোগ নির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে গড়ায়নি। পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে, যখন কিছু অভ্যন্তরীণ নথি, সন্দেহজনক যোগাযোগের তথ্য এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত প্রশ্ন সামনে আসে। সূত্রগুলো বলছে, এসব তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়- একাধিক ঘটনায় স্বার্থের সংঘাত এবং নিয়ম বহির্ভূত যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিষয়টি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগে সীমাবদ্ধ না থেকে ধারাবাহিকভাবে সামনে আসায় বিসিবির ভেতরেই উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বোর্ডের এক দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষায়, “অভিযোগগুলো যদি বিচ্ছিন্ন হতো, তাহলে হয়তো অভ্যন্তরীণভাবেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যেত। কিন্তু যখন একই ধরনের প্রশ্ন বারবার উঠতে থাকে এবং নতুন নতুন তথ্য সামনে আসে, তখন বোর্ডের ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।” এই প্রেক্ষাপটেই বিষয়টি আর উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না বিসিবির সামনে। শেষ পর্যন্ত অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড, যার ধারাবাহিকতায় তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত পরিচালকের দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা ঘটে। কী ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ মোখলেছুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো কয়েকটি স্তরে বিভক্ত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রথম এবং সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো স্বার্থের সংঘাত। অভিযোগ রয়েছে, বিসিবির পরিচালক পদে থাকার সময় তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্তে যুক্ত ছিলেন, যেগুলোতে ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা ঘনিষ্ঠ মহলের সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বোর্ডের নীতিমালায় স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, কিছু সিদ্ধান্ত সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। দ্বিতীয় স্তরের অভিযোগগুলো আর্থিক অনিয়ম ঘিরে। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকল্প, চুক্তি ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিসিবির ভেতরেই প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা ও নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়া এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। তৃতীয় এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগটি ফিক্সিং-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে। যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবে অভিযোগের গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার কারণে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। এ কারণেই বিসিবি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা যায়। দায়িত্ব ছাড়লেন কেন বিসিবির আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চলমান তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত রাখতে মোখলেছুর রহমান শামীম সাময়িকভাবে তার পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বোর্ডের ভাষায়, এটি একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত, যাতে তদন্ত কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং কোনো ধরনের প্রভাব বা স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ না ওঠে। তবে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন বলে মনে করছেন বিসিবির ভেতরের একাধিক সূত্র। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত একান্তই স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়নি। অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসার পর খুব দ্রুতই বিষয়টি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ক্রিকেট বিশ্লেষক, সাবেক খেলোয়াড় ও সমর্থকদের একাংশ বিসিবির ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে থাকেন। বিশেষ করে ফিক্সিং-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ সামনে আসার পর বোর্ডের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও সমালোচনার মাত্রা বাড়তে থাকে, যা বিসিবির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে। বোর্ডের এক দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষায়, “এই চাপ উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতেই তাকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।” ফলে তদন্তের স্বার্থের পাশাপাশি বোর্ডের ভাবমূর্তি রক্ষাই দায়িত্ব ছাড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত কমিটি- কতটা স্বাধীন? মোখলেছুর রহমান শামীমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পরিণতি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে বিসিবি গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের ওপর। বোর্ড সূত্র জানায়, কমিটির মূল দায়িত্ব হলো অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সুপারিশ করা। কাগজে-কলমে এই দায়িত্বগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী মনে হলেও, বাস্তবে তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ, তদন্ত কমিটির সদস্যদের বড় একটি অংশই বিসিবির বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে ‘নিজেদের লোক দিয়ে নিজেদের তদন্ত’- এই সমালোচনা জোরালো হচ্ছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এতে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এক ক্রীড়া বিশ্লেষক বলেন, “বোর্ডের অভ্যন্তরীণ কমিটি যতই সদিচ্ছা দেখাক না কেন, বাইরের নিরপেক্ষ নজরদারি ছাড়া আস্থা তৈরি করা কঠিন।” সমালোচকদের আশঙ্কা, যদি তদন্ত প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে প্রতিবেদন যাই হোক না কেন- তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। ফলে এই তদন্ত শুধু শামীম ইস্যু নয়, বিসিবির সামগ্রিক সুশাসন পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিসিবিতে দুর্নীতির অভিযোগ- নতুন নয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ইতিহাসে বিতর্ক ও অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতেও একাধিকবার দুর্নীতির অভিযোগে বিসিবিকে বিব্রত পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ছিল ফিক্সিং কেলেঙ্কারি, যেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কঠিন সময় পার করেছে এবং একাধিক খেলোয়াড়কে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে। এর পাশাপাশি আর্থিক অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। কখনো টিকিট বিক্রি, কখনো অবকাঠামো উন্নয়ন, আবার কখনো লিগ পরিচালনা- প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে। যদিও বিসিবি প্রায়শই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে বা অভ্যন্তরীণ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধান পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মোখলেছুর রহমান শামীম ইস্যুকে অনেকেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। বরং এটিকে বিসিবির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। সমালোচকদের মতে, বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠা প্রমাণ করে- সমস্যা ব্যক্তি নয়, বরং ব্যবস্থার ভেতরেই রয়ে গেছে। খেলোয়াড় বনাম পরিচালক: দ্বিমুখী মানদণ্ড? শামীম ইস্যু ঘিরে সবচেয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে- খেলোয়াড় ও পরিচালকদের ক্ষেত্রে বিসিবির আচরণ কি সমান? সমালোচকদের দাবি, এখানে স্পষ্ট একটি দ্বিমুখী মানদণ্ড কাজ করছে। অতীতে ফিক্সিং বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছেন, কারও ক্রিকেট ক্যারিয়ার কার্যত শেষ হয়ে গেছে। অথচ পরিচালনা পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও, সেসব ক্ষেত্রে তদন্ত দীর্ঘায়িত হয় এবং সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি দেখা যায়- এমন অভিযোগ বহুদিনের। শামীমের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও তিনি পদে বহাল ছিলেন, পরে চাপের মুখে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ান। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্য ক্রিকেট প্রশাসনের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে দেয়। একজন সাবেক খেলোয়াড়ের মন্তব্য, “খেলোয়াড়রা যদি নিয়ম ভাঙে, শাস্তি নিশ্চিত। কিন্তু পরিচালকের ক্ষেত্রে নিয়ম যেন নমনীয় হয়ে যায়।” এই প্রশ্নের সঠিক জবাব না মিললে, বিসিবির নৈতিক অবস্থান আরও প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভিন্ন সুর শামীমের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোখলেছুর রহমান শামীম। তার দাবি, তাকে জড়িয়ে যে অভিযোগগুলো তোলা হয়েছে, সেগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত অপপ্রচার। গণমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আমি কোনো ধরনের দুর্নীতি বা ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত নই। তদন্তেই সত্য বেরিয়ে আসবে।” তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগগুলোর নির্দিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা তথ্যভিত্তিক জবাব প্রকাশ্যে আনেননি তিনি। সমালোচকদের মতে, শুধু অস্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত ও যোগাযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। বিসিবির ভেতরের একটি সূত্র জানায়, তদন্ত চলাকালীন শামীম প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা না বলার কৌশল নিয়েছেন। তার ঘনিষ্ঠদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দেবেন। তবে ততদিনে জনমত কোন দিকে যায়, সেটাই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রতিক্রিয়া শামীমকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ও ইউটিউবে বিসিবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অসংখ্য ক্রিকেটপ্রেমী। অনেকেই মনে করছেন, বোর্ড নিজেই যখন স্বচ্ছ নয়, তখন ক্রিকেটের উন্নয়ন শুধু স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকে। “বোর্ড আগে নিজেকে শুদ্ধ করুক”- এমন মন্তব্য বারবার উঠে আসছে। কেউ কেউ আবার লিখেছেন, “দুর্নীতি যদি প্রশাসনেই থাকে, ক্রিকেট এগোবে কীভাবে?” এই প্রতিক্রিয়াগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বিসিবির প্রতি আস্থার জায়গাটি কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটভক্তদের মধ্যে ক্ষোভ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের মতে, খেলোয়াড়দের কাছ থেকে নৈতিকতা আশা করা হলেও, প্রশাসনের ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড প্রয়োগ না হওয়া হতাশাজনক। এই জনমত বিসিবির জন্য একটি সতর্ক বার্তা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তির প্রশ্ন বিসিবির কোনো পরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বরাবরই সদস্য বোর্ডগুলোর সুশাসন ও স্বচ্ছতার ওপর নজর রাখে। অতীতে বিভিন্ন বোর্ডে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে আইসিসি হস্তক্ষেপের নজিরও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শামীম ইস্যু যদি সঠিকভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে বিসিবির ওপর বাড়তি নজরদারি আসতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে এবং বিভিন্ন সহযোগিতা ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকের ভাষায়, “ক্রিকেট এখন শুধু মাঠের খেলা নয়, প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাও বড় বিষয়।” এই কারণেই তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামনে কী অপেক্ষা করছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী শামীম ইস্যুতে কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার পরিচালক পদ বাতিলসহ বিসিবির অভ্যন্তরীণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। গুরুতর অপরাধের প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থার পথও খোলা থাকবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিসিবিতে তদন্ত প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘায়িত হয়। ফলে দ্রুত ও দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের বড় প্রত্যাশা- এবার যেন তদন্ত শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ইস্যুর পরিণতি শুধু একজন পরিচালকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং বিসিবি আদৌ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পথে হাঁটতে চায় কি না, সেই পরীক্ষাও দেবে।
দেশের পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে বাস, ট্রাক, সিএনজি, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং অন্যান্য যানবাহন থেকে নানা নামে এই অর্থ আদায় করা হয়। চাঁদাবাজির পেছনে মালিক-শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই অর্থের বেশিরভাগই ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা হয়। কোথাও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পার্কিং বা পৌর টোলের নামে জোরপূর্বক টাকা নেওয়া হয়। অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সদস্যও এই চাঁদার অংশ গ্রহণ করে। ফলে পরিবহন চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর এসব চাঁদা পরিশোধ করতে বাধ্য হন। চাঁদাবাজির ফলে পরিবহন ভাড়া বাড়ছে, পণ্যমূল্যও আকাশছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। সমঝোতা সিস্টেমের নামে এই অতিরিক্ত অর্থের বোঝা পড়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের বদল হলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না। টিআইবি-এর ২০২৪ সালের ৫ মার্চের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এর ভাগ পান রাজনৈতিক নেতা, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং পৌর/সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি। গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনায় রাজনীতিবিদরা জড়িত, যার ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। যাত্রীকল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, ঢাকা শহরে সিটি বাস থেকে দৈনিক ৬৪ লাখ টাকা, সিএনজি অটোরিকশা থেকে ২৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম থেকে ১২ লাখ টাকা, এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে দৈনিক প্রায় ৫৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করা হয় ট্রাক থেকে; দেশজুড়ে দৈনিক ৪ লাখ ট্রাক থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতে কিছু টাকা মালিকরা স্বেচ্ছায় প্রদান করছেন যা ব্যবস্থাপনা খরচ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তবে তার বাইরেও সড়কে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় হচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা দাবি করেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবু কিছু টার্মিনালকেন্দ্রিক অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধে ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ এবং ক্যামেরার মাধ্যমে মামলা করার ব্যবস্থা জরুরি বলে মনে করেন যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকারের উচিত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা এবং প্রমাণ মিললে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের নেতারা জানান, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে জনপ্রতিনিধিদের আসনও স্থায়ী হবে না। মালিক ও চালকরা বিভিন্ন জেলায় পণ্য আনা-নেওয়ার সময় অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় পৌরসভার বা অন্যান্য সংস্থার নামে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাঁদাবাজি বন্ধ ও স্বচ্ছ হিসাব প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় ভাড়া বৃদ্ধি, পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব অব্যাহত থাকবে।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে দায়িত্ব পালনের ১৮ মাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ঢাকার দৈনিক পত্রিকা দৈনিক কালের কণ্ঠ-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, তাকে অসাংবিধানিক উপায়ে অপসারণের একাধিক চেষ্টা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। “দেড় বছর আমাকে আড়ালে রাখা হয়েছিল” প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের পুরো সময়জুড়েই তাকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থেকে দূরে রাখা হয়। অথচ তার বিরুদ্ধে চলেছে নানা পরিকল্পনা ও পাঁয়তারা। তিনি বলেন, একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করার অপচেষ্টা চলছিল। তার দাবি—এক পর্যায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন হলেই তাকে অপসারণ করা হবে এবং মনোবল ভেঙে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে—এমন পরিকল্পনাও ছিল। গণঅভ্যুত্থানের চাপ ও রাজনৈতিক বিভাজন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অংশও সেই সুরে সুর মেলায়। তবে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দুইটি গ্রুপ তৈরি হয়। বিভিন্ন দল ও জোটের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। বিএনপির ভূমিকা ও তারেক রহমান সম্পর্কে মন্তব্য প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠিন সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিল। তারা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি আরও বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তার কৌতূহল ছিল। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, তারেক রহমান আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ। প্রেসিডেন্টের দাবি—বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের কারণেই অপসারণের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ড. ইউনূসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখেননি। তার বক্তব্য অনুযায়ী: বিদেশ সফর শেষে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অবহিত করার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। ১৪-১৫ বার বিদেশ সফরের পরও কোনো লিখিত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। তার আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হলেও এ বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়নি। দুইবার তার বিদেশ সফর আটকে দেওয়া হয়। বঙ্গভবনে প্রধান উপদেষ্টা কখনো যাননি। প্রেস উইং কার্যত অচল করে দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি একাধিকবার কেবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ও জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কার্যকর সাড়া পাননি। বিদেশি কূটনীতিকদের অবস্থান সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের বড় একটি অংশ তাকে অপসারণের বিপক্ষে ছিলেন এবং সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। “আমি সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম” প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন বলেন, সব চাপ ও চক্রান্তের মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তার মতে, সংবিধান বহির্ভূত কোনো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের উদ্যোগ দেশের জন্য বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করত। ১৮ মাসের দায়িত্বকাল নিয়ে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ভেতরের টানাপোড়েন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সাংবিধানিক সংকটের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। তার এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব কতদূর গড়ায়।
বরিশালের পরিবহন সেক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও, চাঁদাবাজির দৃশ্যপট অপরিবর্তিত। দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নথুল্লাবাদ ও রুপাতলী বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন ঘাট এখন স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কবজায়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন এসব খাত থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। নথুল্লাবাদে মোশাররফ গ্রুপের রাজত্ব দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদ এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন বরিশাল সদর -৫ আসনের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ারের ভাই মোশাররফ হোসেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন কয়েকশো বাস থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। মোশাররফ হোসেন অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি নিয়ম মেনেই কমিটির সদস্য হয়েছেন এবং কোনো চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত নন। তবু সাধারণ মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। রুপাতলীতে জিয়াউদ্দিন সিকদারের বলয় মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার রুপাতলী বাসস্ট্যান্ডের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ আছে, তিন বছরের মেয়াদি কমিটি ভেঙে তিনি নিজের পছন্দের লোক দিয়ে নতুন বলয় গঠন করেছেন। এখান থেকে প্রতিদিন অর্ধ লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় হয়। মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাছরিনও অভিযোগ করেছেন, জিয়াউদ্দিন সিকদার পোর্ট রোড ও স্পিড বোট ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে দখল বাণিজ্য চালাচ্ছেন। শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ দলের শীর্ষ নেতাদের দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির কারণে বিএনপির সাধারণ কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র। তারা মনে করছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালীরা তা তোয়াক্কা করছেন না। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে দলের ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছে। মালিক সমিতির অবস্থান মালিক সমিতির সভাপতি জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, “টার্মিনালে যারা কাজ করে, যেমন কাউন্টার কর্মচারী, বাসের সিরিয়াল ঠিক রাখাসহ অন্যান্য স্টাফদের বেতন দেওয়ার জন্য মালিকরা নির্দিষ্ট অর্থ দেন। তার সব হিসাব অফিসেই আছে। এর বাইরে যদি কেউ প্রমাণ দিতে পারে যে অবৈধভাবে চাঁদা নেওয়া হয়েছে, আমি পদত্যাগ করব।” অব্যাহত চাঁদাবাজি স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দুই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন চাঁদা বাবদ প্রায় দুই লাখ টাকা আদায় হয়। এছাড়া পর্দার আড়ালে বিভিন্ন পদ্ধতিতে চাঁদাবাজি চলছেই। এর পরিমাণ বছরে কোটি টাকারও বেশি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন, “সরকার বদলায়, ক্ষমতার হাতবদল হয়, কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্য বদলায় না। শুধু চাঁদা আদায়ের মুখগুলো পরিবর্তিত হয়।” এই অব্যাহত চক্র সাধারণ মানুষ ও বাসযাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। কেউ কেউ বলছেন, সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই অবৈধ অর্থের চক্র বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা বাঁওড় এলাকায় নবনির্মিত সেতুর সংযোগ রাস্তা ধসে যাওয়ায় কোমলপুর ও ঝাঁপা গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে বাঁওড় সেতুর উত্তর পাড়ে কোমলপুর অংশের প্রায় ১০০ মিটার রাস্তা ধসে গেছে। উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের তত্ত্বাবধানে গত বছরের মে মাসে নির্মিত এই সেতুর দৈর্ঘ্য ১৩.২০ মিটার এবং নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল এক কোটি ৯২ লাখ ৮ হাজার ২১১ টাকা। সেতুর দুই পাশে ৫২৩ মিটার হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) রাস্তার জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, তদারকির অভাব এবং ঠিকাদারের দায়সারা কাজের কারণে বৃষ্টি ছাড়া রাস্তা ধসে গেছে। আগের জরাজীর্ণ সেতুটি ভেঙে নতুনটি অনেক উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে সংযোগ সড়ক মেলাতে প্রচুর মাটি ভরাট করা হয়। ঝাঁপা ইউনিয়নের কোমলপুর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য খালেদুর রহমান টিটু বলেন, “বাঁওড়ের ভিতরে আগের রাস্তা মাটি ফেলে সেতু বরাবর উঁচু করে ইটের সলিং বসানো হয়েছে। মাটি বসার সুযোগ না দিয়ে সলিং বসিয়ে রাস্তাটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে রাস্তা ধ্বসে গেছে। মাটির পরিবর্তে বালু ফেলে রাস্তা করলে এমনটি ঘটত না।” সেতুর কাজের ঠিকাদার নিশীত বসু বলেন, “কাজে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। রাস্তাটি ধসে যাওয়ার খবর শুনে আমি ঘটনাস্থলে এসেছি। নিচে পলি জমেছিল, তাই লোড ধরে রাখতে পারেনি। আমরা লোকসান দিয়ে সেতু ও রাস্তার কাজ করেছি।” ঝাঁপা বাঁওড়ের সেতু ও সংযোগ রাস্তার কাজ দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা প্রকৌশলী দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান। তিনি বলেন, “বৃহস্পতিবার রাতে ঝাঁপা বাঁওড়ের সেতুর সংযোগ রাস্তা ধসে যাওয়ার খবর পেয়েছি। রাস্তা ধসে যাওয়ার কারণ নির্ণয় করা হয়েছে। শনিবার থেকে রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হবে।” স্থানীয়দের অভিযোগ এবং ঠিকাদারের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সঠিক তদারকি ও নির্মাণ প্রক্রিয়ার অভাবে রাস্তা ধসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন যে, 'মব কালচারের দিন শেষ'। কিন্তু দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ঠেকানো সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের প্রশ্ন উঠছে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই আলোচনায় ছিল 'মব ভায়োলেন্স' বা 'দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা' সৃষ্টির নানা ঘটনা। এর বিরুদ্ধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। মব তৈরি করে কখনও নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, চাঁদাবাজি যেমন হয়েছে, তেমনি মারপিট করা হয়েছে ভিন্ন মতের রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের। এমনকি দলবদ্ধভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্স ' ডমিনেন্ট অ্যান্ড ডেডলি ট্রেন্ড বা প্রকট এবং প্রাণঘাতী ট্রেন্ড ' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল বলে মনে করে অনেক মানবাধিকার সংগঠন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে ৪৬০ জনকে মব জাস্টিস এবং ম্যাস বিটিং এর মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস এবং 'মব ভায়োলেন্স' দমনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্লিপ্ততা অপরাধিদের উৎসাহ জুগিয়েছে। দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে সংগঠিত একের পর এক অপরাধের ঘটনা ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুপ থেকেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। উল্টো তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার "মব ভায়োলেন্স বলতে কোনো কিছু নেই" এমন বক্তব্য নানা আলোচনা- সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশে ‘মব কালচার’ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ভয়াবহতা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। নতুন সরকারের ঘোষিত কঠোর অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষতা এবং দৃশ্যমান আইন প্রয়োগ ছাড়া ‘মব ভায়োলেন্স’ বন্ধ করা সম্ভব নয়— এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে নতুন সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ঠেকানো বিএনপি সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামলানো "চ্যালেঞ্জিং হবে, তবে অসম্ভব নয়," বলে মনে করেন মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন। তিনি বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব। তবে বিচারের নামে কেবল ভিন্ন মত দমন, নিজ দলের সমর্থকদের সব দোষ মাফ কিংবা দলবদ্ধভাবে ভিন্ন মতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পুরনো সংস্কৃতি চলতে থাকলে কোনো লাভ হবে না বলে মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। বাংলাদেশে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক স্বার্থে 'মব ভায়োলেন্স' বা 'দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার' ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও ন্যায্য বা অন্যায্য দাবি আদায় কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হয়েছে এটি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মব জাস্টিস এবং ম্যাস বিটিংয়ে ২১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ১২৮ জনের। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৫ সালের হিসেবে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দুইশো। 'মব ভায়োলেন্স' কেন এভাবে বৃদ্ধি পেল? এমন প্রশ্নের জবাবে দেশের বিশেষ পরিস্থিতি এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততাকে দায়ি করেছেন বিশ্লেষকরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে স্বৈরাচারের দোসর কিংবা এ ধরনের 'তকমা' দিয়ে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। 'তৌহিদী জনতা' বা এ ধরনের ব্যানারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু মব সৃষ্টির ঘটনাও ঘটেছে। ব্যক্তির ওপর হামলার পাশাপাশি মাজার কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে। অনেক সময় যেখানে কট্টরপন্থি ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতেও দেখা গেছে। দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে সংগঠিত একের পর এক অপরাধের পরও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর "মব ভায়োলেন্স বলতে কোনো কিছু নেই" এমন বক্তব্য নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। এছাড়া সরকারের দায়িত্বশীলদের কারো করো মধ্যে দলবদ্ধ অপরাধকে কিছু ক্ষেত্রে 'রাজনৈতিক বৈধতা' দেওয়ার চেষ্টা ছিল, যা এই ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলছেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, এটা যেমন ঠিক তেমনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন পক্ষের সামনে সরকারের নমনীয়তা অপরাধীদের সুযোগ করে দিয়েছিল। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "দৃশ্যমান মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গত সরকারের যথেষ্ট ঘাটতি ছিল, যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল। এর পেছনে এটার প্রেক্ষাপটটাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।" এছাড়া একটি পক্ষ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলেও মনে করেন মি. লিটন। এই অপরাধ কী থামবে? জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৬ই ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জে সিলযুক্ত ব্যালট উদ্ধারের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দলবদ্ধভাবে হেনস্তা ও গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ এটি বলা যায় যে, দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার উদাহরণ সঙ্গী করেই, পট পরিবর্তনের দেড় বছর পর বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে রাজনৈতিক সরকার। এসব কারণে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির চাকা সচল করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এই সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। যেখানে 'মব কালচার' পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। বুধবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রথম কর্মদিবসে মি. আহমদ বলেন, "মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না। তবে যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য মিছিল ও সমাবেশ করা যাবে, স্মারকলিপিও দেওয়া যাবে।" স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিশ্লেষকরা। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে, সে সন্দেহ রয়েছে অনেকের। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলছেন, মব সহিংসতার পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়া নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা- এই দুটি বিষয়ের ওপর। বিবিসি বাংলাকে মি. লিটন বলছেন, "নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এখন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা নিয়েছেন। অতীতে এই ধরনের সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।" তবে বিচারের ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে, এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত তিনজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা নির্বাচন বিলম্বিত করার এক নানামুখী কৌশলে লিপ্ত ছিলেন—এমন অভিযোগ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক ভাবনা থাকলেও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। দ্রুত নির্বাচন থেকে সরে আসা: চাপ নাকি কৌশল? সূত্র বলছে, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে অধ্যাপক ইউনূস স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা বিবেচনা করছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রয়োজন—এই যুক্তি সামনে আনা হয়। সমালোচকদের মতে, এসব সংস্কারের আড়ালে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়নের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল ছিল। তিন উপদেষ্টার যুক্তি ছিল—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক, প্রশাসন অস্থিতিশীল, দ্রুত নির্বাচন দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তির পেছনে ছিল বিশেষ উদ্দেশ্য: সময়ক্ষেপণ করে নিজেদের পছন্দের শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করা। ‘মব সন্ত্রাস’ কৌশলের হাতিয়ার? একাধিক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও মব সন্ত্রাস পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব অস্থিরতা ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক পরিবেশ অনিশ্চিত রাখতে। বিশেষ করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে অগ্নিসংযোগের ঘটনার দিন প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করে। কে বা কারা সেই নির্দেশ দিয়েছিল—তা এখনো অজানা। অধ্যাপক ইউনূস পরে এক সিনিয়র সাংবাদিককে জানান, ঘটনার সময় তিনি অবগত ছিলেন না। এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। আঞ্চলিক শক্তির চাপ ও ‘লন্ডন বৈঠক’ রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি দ্রুত নির্বাচন চেয়েছিল। তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নেতৃত্বে পরিবর্তন নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক চাপ ও নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হন অধ্যাপক ইউনূস। লন্ডন বৈঠক ছিল সেই প্রক্রিয়ার অংশ। তবে নির্বাচনবিরোধী উপদেষ্টারা বৈঠকের আগেই নানা অপপ্রচার চালান। তারা বিদেশি কূটনীতিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, নির্বাচন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রশাসন কবজায় নেওয়ার চেষ্টা সন্ধ্যাকালীন গোপন বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক শক্তির প্রভাব এবং প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা—সব মিলিয়ে এক সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অধ্যাপক ইউনূস কার্যত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু উপদেষ্টা বিদেশ সফরেও কূটকৌশলে যুক্ত ছিলেন। একজন উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে সফরকালে সাময়িকভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। ফরমায়েশি জনমত জরিপ? আরেকটি অভিযোগ—জনমত জরিপকে ব্যবহার করা হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে। টেবিলে বসে তৈরি করা জরিপ বিদেশি দূতাবাসে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। সেখানে বলা হয়েছে, দ্রুত নির্বাচন হলে অপ্রত্যাশিত শক্তির উত্থান ঘটবে। পরিকল্পনা ‘প্ল্যান ২’ কী ছিল? নির্বাচনের দিন পর্যন্ত কিছু উপদেষ্টার তৎপরতা ছিল নির্দিষ্ট কিছু আসনকেন্দ্রিক। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তারা ‘প্ল্যান ২’ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসেন বলে জানা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিকল্পনাটি ছিল— নির্বাচন ভণ্ডুলের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, অথবা প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে জরুরি অবস্থা সদৃশ কাঠামো জোরদার করা, অথবা নেতৃত্বে পরিবর্তনের পথ সুগম করা। তবে জনচাপ, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতা কি সত্যিই নিরপেক্ষ হাতে ছিল, নাকি আড়ালে চলছিল একাধিক শক্তির সমান্তরাল খেলা? নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভবিষ্যৎ গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
শরীয়তপুরে মসলা জাতীয় ফসল ধনিয়া চাষের সুনাম বহু বছর ধরে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে ধনিয়ার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলাজুড়ে ধনিয়ার আবাদ বেড়ে চলেছে। উৎপাদন খরচ কম এবং বাজার মূল্য ভালো হওয়ায় কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে ধনিয়া চাষ করছেন। ভালো লাভের আশায় চাষিরা সার ও কীটনাশকের দাম কমানোর দাবি জানাচ্ছেন। জেলার কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৬টি উপজেলায় কমবেশি ধনিয়ার আবাদ হয়। রবিশস্য হিসেবে ধনিয়া ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এবং বাজারে চড়া দামের কারণে কৃষকরা ঝুঁকি নিয়েও ধনিয়া চাষ করছেন। দিন দিন জেলায় ধনিয়া চাষের জমির পরিমাণ বেড়ে চলেছে। গত মৌসুমে ধনিয়া চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ৫৬ হেক্টর। বাস্তবে আবাদ হয়েছে ৬ হাজার ২৮০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ২৮০ হেক্টর, তবে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩২০ হেক্টরে। সরেজমিনে দেখা যায়, শস্যের মাঠগুলো ধনিয়া ফুলের সাদা চাদরে আবৃত। ফুলের মিষ্টি গন্ধে মৌমাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কৃষকরা জমিতে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে ফলন ভালো হয়েছে। বাজার মূল্যও ভালো থাকায় চাষিরা চড়া দামে বিক্রির আশায় রয়েছেন। তবে সরকারিভাবে সার ও কীটনাশকের দাম কমানোর দাবি তারা পুনরায় জানাচ্ছেন। সদর উপজেলার রুদ্রকর এলাকার কৃষক হরে রাম কুলু জানিয়েছেন, ‘প্রত্যেক শতাংশে ধনিয়ায় খরচ হয় দেড়শ টাকা, আর বিক্রি করলে পাই তিন থেকে চারশ টাকা। বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় আমরা ধনিয়া চাষে লাভবান হচ্ছি।’ অপর কৃষক ধীরেন মজুমদার বলেন, ‘একসময় ধনিয়ার বাজারে চাহিদা কম থাকায় বাড়িতে ফেরত আনতাম। কিন্তু এখন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ কৃষক অন্যান্য রবিশস্যের তুলনায় ধনিয়া বেশি আবাদ করছেন।’ তবে বাজারে ভালো দাম থাকা সত্ত্বেও সার ও কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধিতে কৃষকরা হতাশ। নেছার শিকদার নামের এক কৃষক বলেন, ‘সরকার যদি সার ও কীটনাশকের দাম কমায়, তাহলে লাভ আরও বৃদ্ধি পেত। আমরা এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা চাই।’ জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শরীয়তপুরের মাটি ধনিয়া চাষের জন্য উপযুক্ত। খরচ কম এবং বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় দিন দিন কৃষকরা ধনিয়া চাষে ঝুঁকছেন। আমরা তাদের পরামর্শ এবং সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে থাকি।’ শরীয়তপুরে ধনিয়া চাষ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। কৃষি বিভাগের সহায়তা ও বাজারের চাহিদার কারণে চাষিরা আশা করছেন, আগামী মৌসুমগুলোতেও ধনিয়া তাদের প্রধান আয়ের উৎস থাকবে।
মুকুলে ভরা আম্রকাননে নেমেছে ঋতুরাজের নীরব উৎসব। সোনালি-সবুজ আভায় মোড়া ডালপালা আর মিষ্টি ঘ্রাণে মুখর চারপাশ যেন জানান দিচ্ছে মধুমাসের আগমনী বার্তা। প্রকৃতির এই রঙিন আয়োজনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা যশোর-এর শার্শা উপজেলা এখন জেগে উঠেছে নতুন প্রত্যাশায়। আম গাছের ডালে ডালে ফুটেছে মুকুল, আর সেই সুবাসে ভরে উঠেছে গ্রামবাংলার পথঘাট। বসন্তের আগমনী সুরে কৃষকের চোখে ভাসছে সম্ভাব্য সমৃদ্ধির স্বপ্ন। ৯০ শতাংশ গাছে মুকুল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক বাগান থেকে শুরু করে বাড়ির আঙিনার গাছেও ব্যাপকভাবে মুকুল এসেছে। বড় গাছের তুলনায় ছোট ও মাঝারি আকারের গাছে তুলনামূলক বেশি মুকুল দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার প্রায় ৯০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। মৌমাছির আনাগোনা ও কোকিলের কুহুতানে মুখর হয়ে উঠেছে বাগান এলাকা। দেশি জাতের পাশাপাশি এখানে হিমসাগর, আম্রপালি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, মল্লিকা, বুম্বাই, কাটিমন ও বারি জাতের আমের চাষ হচ্ছে। ১,০৬০ হেক্টরে বাণিজ্যিক আবাদ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, শার্শা উপজেলায় মোট ১ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আমের আবাদ হচ্ছে এবং নিবন্ধিত আমচাষির সংখ্যা ৪ হাজার ৬৬৮ জন। চাষকৃত জাতভিত্তিক জমির পরিমাণ নিম্নরূপ— হিমসাগর — ৩৩৭ হেক্টর আম্রপালি — ২১৫ হেক্টর ল্যাংড়া — ১৫৫ হেক্টর গোপালভোগ — ১৫৫ হেক্টর গোবিন্দভোগ — ৬০ হেক্টর মল্লিকা — ৩৫ হেক্টর বুম্বাই — ৫৯ হেক্টর কাটিমন — ৯ হেক্টর বারি-৪ — ২০ হেক্টর বারি-১১ — ১ হেক্টর দেশি জাত — ৩৪ হেক্টর জেলার মধ্যে শার্শা ছাড়াও ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমের চাষ হয়ে থাকে। চাষিদের প্রত্যাশা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের আমচাষি আব্দুল মান্নান বলেন, “মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। কুয়াশা বা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত না থাকায় গাছে স্বাভাবিকভাবে মুকুল এসেছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পোকার আক্রমণও দেখা যায়নি। সামনে ঝড় বা শিলাবৃষ্টি না হলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।” আরেক চাষি ইসমাইল হোসেন জানান, “গাছের অবস্থা বেশ ভালো। আমরা নিয়মিত বাগান পর্যবেক্ষণ করছি এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করছি। মুকুলের পরিমাণ দেখে ফলন সন্তোষজনক হবে বলে আশা করছি।” কৃষি বিভাগের সতর্কবার্তা শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার শাহা বলেন, “এ অঞ্চলের দোআঁশ মাটি ও জলবায়ু আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে রয়েছে। ফলে গাছে মুকুলের পরিমাণ সন্তোষজনক। তবে ছত্রাকজনিত রোগ বা হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। চাষিদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে বলা হচ্ছে।” বাম্পার ফলনের আশা সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে শার্শায় আমের বাম্পার ফলন হবে—এমনটাই প্রত্যাশা চাষি ও কৃষি বিভাগের। মুকুলের এই সুবাস তাই শুধু প্রকৃতির রূপ নয়, হাজারো কৃষকের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জিরো টিলেজ বা বিনা চাষে আবাদ পদ্ধতি। জমি চাষ না করে কিংবা স্বল্প চাষে ফসল উৎপাদনের এই কৌশল কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জিরো টিলেজ পদ্ধতিতে জমি চাষ না করে আগের ফসলের অবশিষ্টাংশ রেখেই সরাসরি বীজ বপন করা হয়। এতে উৎপাদন খরচ কমে, সময় ও শ্রম সাশ্রয় হয়। নবীনগরে সরিষা, মসুর, খেসারি ও রসুনে এই পদ্ধতিতে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া হালকা বালুমাটিতে বাদামও জিরো টিলেজ পদ্ধতিতে আবাদ করা হয়েছে। রাজস্ব অর্থায়নে কুমিল্লা অঞ্চলের টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল রিকভারি ইমার্জেন্সি প্রিপারেডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্রকল্প (বি-স্ট্রং) এর আওতায় চলতি বোরো মৌসুমে নবীনগর উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের শতাধিক স্থানে বাদাম, সরিষা ও ডালজাতীয় ফসলের আবাদ করা হয়েছে। শ্রীরামপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন বলেন, ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেনের পরামর্শে তিনি বিনা চাষে সরিষা আবাদ করেন। উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে বি-স্ট্রং প্রকল্পের আওতায় একটি প্রদর্শনীর উপকরণ পান। তিনি জানান, আগে জমি চাষ, মই দেওয়া ও প্রস্তুত করতে বেশি সময় ও খরচ হতো, কিন্তু জিরো টিলেজ ব্যবহারে খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকায় সেচের প্রয়োজনও কম হয়েছে। বিদ্যাকুট ইউনিয়নের কৃষক কুলসুম আক্তার জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গৌতম ভৌমিকের উৎসাহে তিনি প্রথমবারের মতো বিনা চাষে সরিষা আবাদ করেছেন। তার জমির ফসল অন্যদের তুলনায় দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও এ পদ্ধতিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান কাটার আগে রিলে পদ্ধতিতে ও বিনা চাষে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি মসুর ২৫ বিঘা, রসুন ১০ বিঘা এবং বাদাম ২৫ বিঘা জমিতে বিনা চাষে ও স্বল্প চাষে আবাদ হয়েছে। নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন জানান, জিরো টিলেজ পদ্ধতি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি পায়, উপকারী অণুজীব সক্রিয় থাকে এবং মাটির ক্ষয় কম হয়। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কম হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে কৃষকদের সময় ও অর্থ—দুটোই সাশ্রয় হয়। তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লটে সরিষা, মসুর ও খেসারি সহজভাবে এবং নির্দিষ্ট শর্তে বাদাম জিরো টিলেজ পদ্ধতিতে আবাদ করে আশাব্যঞ্জক ফলন পাওয়া যাচ্ছে। সঠিক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত যন্ত্রপাতি ও কৃষক সচেতনতা বাড়ানো গেলে নবীনগরে জিরো টিলেজ আবাদ আরও বিস্তৃত হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষকের লাভ বাড়বে এবং অঞ্চলটি টেকসই কৃষির পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
লিফলেট থেকে জন্মাবে গাছ, এমনটা শুনে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন কি অবান্তর কথা বলছি! একদমই না। নিশ্চয়ই সিড পেপার দিয়ে কলম, ক্যালেন্ডার তৈরির কথা জানেন। যে কাগজ দিয়ে কলম তৈরি করে ব্যবহারের পর মাটিতে ফেলে দিলে গাছ জন্মায়। সেই কাগজের কথাই বলছিলাম। যা পরিচিত ‘বন-কাগজ’ বা ‘সিড পেপার’ নামে। এবার বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্ত হলো এক অভিনব ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা ও প্রার্থী প্রচারণায় ব্যবহার করছেন এই বিশেষ ধরনের বীজযুক্ত কাগজের লিফলেট, যা মাটিতে পড়লেই পরিণত হতে পারে সবজির চারা গাছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু নির্বাচনী বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। প্রচারণার কাগজ মাটিতে পড়ে নষ্ট না হয়ে যদি গাছ হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি হবে ‘জিরো ওয়েস্ট’ ভাবনার বাস্তব উদাহরণ। এটি কিন্তু একেবারেই নতুন কোনো উদ্ভাবন নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে বীজযুক্ত কাগজ বা পোস্টার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় নির্বাচনসহ নানা সামাজিক ও সচেতনতামূলক প্রচারণায় সিড পেপার ব্যবহৃত হচ্ছে। কীভাবে তৈরি হয় বন-কাগজ? বন-কাগজ তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিও পরিবেশবান্ধব। এটি মূলত পরিত্যক্ত বা ব্যবহৃত কাগজ থেকে তৈরি করা হয়। প্রথমে কাগজগুলো ছোট টুকরো করে প্রায় ৪২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়, যাতে কাগজ পুরোপুরি গলে যায়। এরপর সেই গলিত কাগজ থেকে মণ্ড তৈরি করে নির্দিষ্ট ফ্রেমের মধ্যে বসানো হয়। পরবর্তী ধাপে বিশেষ পদ্ধতিতে কাগজের মণ্ডের সঙ্গে বীজ যুক্ত করা হয়, যাতে কাগজ শুকানোর পরও বীজের কার্যকারিতা নষ্ট না হয়। সবশেষে কাগজ শুকিয়ে লিফলেট বা পোস্টারের আকার দেওয়া হয়। জানেন কি, কীভাবে বন-কাগজ থেকে গাছ জন্মায়? বন-কাগজ মূলত এমন এক ধরনের কাগজ, যার ভেতরে বিভিন্ন সবজি বা ভেষজ উদ্ভিদের বীজ সংযুক্ত থাকে। এই লিফলেট পুরোটা বা ছিঁড়ে ছোট টুকরো করে মাটিতে পুঁতে বা ফেলে দিলে, মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই বীজ অঙ্কুরোদ্গম শুরু হয়। মাটি যদি শুষ্ক হয়, তবে কাগজটি মাটির ওপর রেখে হালকা পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতে হয়। উপযুক্ত পরিবেশে একটি বন-কাগজ থেকে চারা গজিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই গাছে পরিণত হয়। এই কাগজ এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে মাটিতে ফেললে সেখান থেকে গাছ জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে। কোন ধরনের গাছের বীজ ব্যবহা করা হয় এই সিড পেপারে? সাধারণত ভেষজ উদ্ভিদ ও ফলের বীজ দিয়ে এই কাগজ তৈরি করা হলেও এবারের নির্বাচনে পাঁচ ধরনের দেশি সবজির বীজ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বেগুন, টমেটো, মরিচ, লালশাক ও ডাঁটাশাক। এগুলো সহজে জন্মায় এবং ঘরোয়া পরিবেশে পরিচর্যাও তুলনামূলক কম লাগে। তাই লিফলেট পেলে বারান্দায় টবে লাগিয়ে দিন। কিছুদিনের মধ্যে সবজির চারা পাবেন। মাসখানিক পর পাবেন সবজি। এই পরিবেশবান্ধব লিফলেট তৈরির খরচ সাধারণ কাগজের তুলনায় কিছুটা বেশি। প্রতিটি বন-কাগজের লিফলেট তৈরিতে খরচ পড়ছে প্রায় ৮ টাকা। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, পরিবেশের জন্য এর সুফল বিবেচনায় এই ব্যয় যুক্তিসংগত। পরিবেশ দূষণ কমানো এবং ‘জিরো ওয়েস্ট’ লক্ষ্য অর্জনের পথে এই ধরনের উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখছেন পরিবেশবিদরা।
নেদারল্যান্ডসের কোনো আবাসিক এলাকায় সন্ধ্যার সময়ে ঘরে আলো জ্বলে উঠলে মানুষের বসার ঘর, সোফা, ল্যাম্প, ডাইনিং টেবিল, এমনকি পরিবারের একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া অনেক সময় বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। ভিনদেশি দর্শনার্থীদের কাছে এটি অবাক করা বা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে অন্ধকার নামলেই জানালার পর্দা টানা হয়। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে প্রায় সব জানালা। শুধু রাতেই নয়, দিনের বেলাতেও জানালাগুলো প্রায়ই পর্দাহীন দেখা যায়।এই অভ্যাস বহু বছর ধরে চলে আসছে। খোলা জানালার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। সবচেয়ে আলোচিত ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো ক্যালভিনিজম, যা একটি প্রোটেস্ট্যান্ট ঐতিহ্য এবং ডাচ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ক্যালভিনিজম বিনয়, সততা এবং স্বচ্ছতাকে মূল্য দেয়। এই ঐতিহ্য অনুসারে খোলা জানালা সততা ও স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে ধরা হতে পারে। এই ধারণা অনুযায়ী, খোলা পর্দা বোঝায় যে, ঘরে লুকানোর কিছু নেই, জীবনযাপন সৎ ও শালীন। তবে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি যথেষ্ট নয়। আধুনিক ডাচ সমাজ অনেকটাই ধর্মনিরপেক্ষ, তবুও এই অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এই অভ্যাসকে প্রভাবিত করেছে, যদিও সরাসরি কারণ নয়। জার্মান দখলের সময় সময় কঠোর ‘ব্ল্যাকআউট’ নিয়ম চালু ছিল। রাতে ঘর থেকে কোনো আলো বাইরে বের হতে না দেওয়ার জন্য জানালায় মোটা পর্দা বা ঢাকনা ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিল। বাইরে আলো দেখা গেলে জরিমানা হতো। যুদ্ধ শেষে মানুষ আবার পর্দা সরিয়ে আলো উন্মুক্ত করতে স্বস্তি বোধ করেছিল। যদিও এই অভিজ্ঞতা আলো ও স্বাধীনতার প্রতি মনোভাব গঠনে ভূমিকা রেখেছিল, তবুও এটি একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। জলবায়ুও এর একটি ভূমিকা রাখে। নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে শরৎ ও শীতকালে সূর্যালোক কম থাকে। ছোট দিন, মেঘলা আকাশ এবং দীর্ঘ সন্ধ্যা দিনের আলোকে মূল্যবান করে তোলে। সম্ভব প্রাকৃতিক আলো ঘরে ঢুকতে দেওয়া মানুষ পছন্দ করে, এতে ঘর উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত লাগে। সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য কারণটি সামাজিক আচরণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ ও পারস্পরিক আস্থাভিত্তিক সম্প্রদায়ের লোকেদের পর্দা খোলা রাখার প্রবণতা বেশি। খোলা জানালা বাসিন্দাদের রাস্তা ও আশেপাশের জীবন সম্পর্কিত সচেতন রাখে। তারা দেখতে পারে কে পাশ দিয়ে যাচ্ছে, বাইরে কী ঘটছে, এবং সবকিছু নিরাপদ কিনা। এইভাবে খোলা পর্দা আস্থার অনুভূতিকে সমর্থন করে। জানালাটি তখন ভেতর ও বাইরের মাঝে কঠিন দেয়াল নয়, বরং নরম এক সীমানা হিসেবে কাজ করে। ডাচ বাড়িগুলো অনেক সময় সরু হয়, কিন্তু সামনের জানালা বড়। পর্দা টানলে আলো কমে যায়, ঘর ছোট ও গুমোট লাগে। তাই অনেকেই খোলামেলা, আলো ভরা পরিবেশ পছন্দ করেন। এমনকি ঘরের সাজসজ্জাও অনেক সময় এমনভাবে করা হয়, যেন তা আংশিকভাবে বাইরে থেকে দৃশ্যমান থাকবে এ বিষয়টি মাথায় রেখেই। খোলা জানালা মানে ডাচরা অপরিচিতদের আমন্ত্রণ জানায় না। বাইরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকানো এখনও অভদ্র বলে বিবেচিত। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক ঝলক দেখা স্বাভাবিক, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ তাকানো নয়। এক নীরব সামাজিক বোঝাপড়া। এখানে গোপনীয়তা রক্ষা হয় কাপড়ের পর্দায় নয় বরং সামাজিক শিষ্টাচারে।
একসময় বাঙালি বিয়ে মানেই ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, কমিউনিটি সেন্টার, শত শত অতিথি আর কয়েক দিনব্যাপী আয়োজন। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ভ্রমণপ্রিয় মানসিকতা আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব সব মিলিয়ে বিয়ের ধারণাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের নাম ডেস্টিনেশন ওয়েডিং। আজ এটি আর শুধু অভিজাতদের বিলাসিতা নয়, বরং মধ্যবিত্ত তরুণ তরুণীদের কাছেও হয়ে উঠছে কাঙ্ক্ষিত এক অভিজ্ঞতা। ডেস্টিনেশন ওয়েডিং কী? ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বলতে বোঝায় নিজের শহর বা বসবাসের জায়গা ছেড়ে অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থান বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপূর্ণ এলাকায় সীমিত অতিথি নিয়ে বিয়ের আয়োজন করা। সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, রিসোর্ট, হেরিটেজ প্রপার্টি বা বিদেশের কোনো শহর সবই হতে পারে এই ধরনের বিয়ের গন্তব্য। এই ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের উৎপত্তি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোতে। ইউরোপ ও আমেরিকায় ১৯৮০-৯০-এর দশকে ছোট পরিসরে বিয়ে করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। সেই সময় থেকেই সমুদ্র সৈকত বা রিসোর্টে বিয়ের ধারণা জনপ্রিয় হয়। পরে বলিউড তারকাদের হাত ধরে ভারতে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। রাজস্থান, গোয়া, উদয়পুর কিংবা বিদেশে ইতালি, থাইল্যান্ড এই সব জায়গায় তারকাদের বিয়ের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়। বাংলাদেশে এই ধারণা তুলনামূলক নতুন। ২০১০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এটি পরিচিত হতে শুরু করে। শুরুতে ধনী ব্যবসায়ী পরিবার বা শোবিজ অঙ্গনের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই আয়োজন। তবে গত পাঁচ-সাত বছরে মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজের মধ্যেও ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের চাহিদা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। কক্সবাজার, সাজেক, বান্দরবান, সিলেট কিংবা দেশের বিভিন্ন রিসোর্ট এখন বিয়ের জনপ্রিয় গন্তব্য। ডেস্টিনেশন ওয়েডিং জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, সীমিত অতিথি। প্রচলিত বিয়েতে আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত-অপরিচিত মিলিয়ে অতিথির সংখ্যা কয়েক শ’ ছাড়িয়ে যায়। ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ে সাধারণত কাছের মানুষদের নিয়েই আয়োজন করা হয়, ফলে খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে বিয়ে ও ভ্রমণ। বিয়ে উপলক্ষে বর–কনে ও অতিথিরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান। এতে আয়োজনের ক্লান্তি কমে, আনন্দ বাড়ে। তৃতীয়ত, ভিন্নতা ও ব্যক্তিগত ছোঁয়া। পাহাড়, সমুদ্র বা ঐতিহাসিক প্রাসাদের মাঝে বিয়ে এই অভিজ্ঞতা প্রচলিত কমিউনিটি সেন্টারের বিয়ের চেয়ে আলাদা এবং স্মরণীয়। ডেস্টিনেশন ওয়েডিং জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে বিয়ের ভিডিও ও ছবির ঝলক মানুষকে আকৃষ্ট করছে। ‘পারফেক্ট ওয়েডিং ফটো’ বা ‘ড্রিম ওয়েডিং’ এই ধারণাগুলো তরুণদের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। অনেকে মনে করেন ডেস্টিনেশন ওয়েডিং মানেই আকাশছোঁয়া খরচ। বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। অতিথি সংখ্যা কম হওয়ায় খাবার, হল ভাড়া ও অন্যান্য খরচ অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে যাতায়াত, থাকা ও সাজসজ্জার খরচ যোগ হওয়ায় বাজেট পরিকল্পনা না করলে ব্যয় বাড়তে পারে। বাংলাদেশে একটি মাঝারি মানের ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের খরচ ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব বলে জানান ইভেন্ট প্ল্যানাররা। তবে এই ট্রেন্ডের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের অনেকেই এখনো ডেস্টিনেশন ওয়েডিংকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেন না। আত্মীয়স্বজন বাদ পড়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। এছাড়া দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও অভিজ্ঞ ওয়েডিং প্ল্যানারের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এতসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী দিনে বাংলাদেশে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং আরও জনপ্রিয় হবে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন, রিসোর্ট ও হোটেলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তরুণদের জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারা আরও বিস্তৃত হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়–এর কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম–এর দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ না করে নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কল্যাণ তহবিল থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন উপাচার্য। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কল্যাণ তহবিলের উদ্দেশ্য কী? সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফান্ড মূলত কর্মরত, অবসরপ্রাপ্ত ও মৃত সরকারি কর্মচারী (এবং তাদের পরিবার)-এর আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গঠিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই তহবিলের মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের— গুরুতর অসুস্থতায় চিকিৎসা সহায়তা দুর্ঘটনা বা মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ বিশেষ অনুদান প্রদান করা হয়ে থাকে। নীতিমালা অনুযায়ী— গুরুতর অসুস্থতায় চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা চরম আর্থিক সংকটে মূল বেসিকের দ্বিগুণ পর্যন্ত সহায়তা চাকুরিরত অবস্থায় মৃত্যু হলে মাসিক ২ হাজার টাকা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ৩ হাজার টাকা লাশ পরিবহনে ২ হাজার টাকা প্রদানের বিধান রয়েছে। কারা কত টাকা নিয়েছেন? সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার কল্যাণ তহবিল থেকে এক লাখ টাকারও বেশি অর্থ উত্তোলন করেছেন— ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫: আমিনুল ইসলাম টিটু – ১,৪২,০০০ টাকা (মায়ের অসুস্থতা) ১১ জানুয়ারি ২০২৬: শরীফ মেহেদী – ১,১৭,০০০ টাকা (নিজের অসুস্থতা) ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫: আবু বক্কর – ১,৩৩,০০০ টাকা (ছেলের অসুস্থতা) ২৮ মে ২০২৫: মো. শাহজালাল – ১,২৭,০০০ টাকা (সন্তানের অসুস্থতা) বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র দাবি করছে, এরা প্রত্যেকেই বর্তমান উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। প্রশ্নের মুখে নীতিমালা নীতিমালায় গুরুতর অসুস্থতায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা প্রদানের বিধান থাকলেও, একাধিক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে লক্ষাধিক টাকা বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন— “স্বচ্ছল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যদি এভাবে কল্যাণ তহবিলের অর্থ উত্তোলন করেন, তবে তা নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভবিষ্যতে যে যার ইচ্ছামতো তহবিল থেকে অর্থ নিতে চাইবে।” অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারি বেতন স্কেল ও বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে মাসে প্রায় এক লক্ষ বা তার বেশি টাকা আয় করেন। ফলে তাদের ‘চরম আর্থিক সংকট’ দাবির যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কী বলছেন অভিযুক্তরা? অর্থ উত্তোলনকারী কর্মকর্তা শরীফ মেহেদী বলেন— “আমি অনেক আর্থিক সংকটে ছিলাম। যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করেই কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ নিয়েছি। প্রয়োজনে অর্থ ও হিসাব শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন।” উপাচার্যের বক্তব্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন— “আমি যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী কল্যাণ তহবিলের অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। এখানে কোনো অনিয়ম হয়েছে বলে মনে করি না। তারা লিখিত আবেদনে চরম আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানা সবসময় সম্ভব নয়।” ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনা ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও নীতিমালা পর্যালোচনা না হলে ভবিষ্যতে কল্যাণ তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসেনি।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান ও সহকারী প্রধানের মোট ১৩ হাজার ৫৫৯টি শূন্যপদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করেছেন ৭৮ হাজার ৭১১ জন শিক্ষক। এ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে অনলাইনে আবেদন শুরু হয়, যা চলবে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত। ফি জমা দেওয়া যাবে ২৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত। এবারই প্রথমবারের মতো বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। আবেদন ও বিজ্ঞপ্তির তথ্য গত ২৯ জানুয়ারি এনটিআরসিএ এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থীদের কাছ থেকে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আবেদন করার সময় এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। পদভিত্তিক আবেদন পরিসংখ্যান এনটিআরসিএর তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে। 🔹 সহকারী প্রধান শিক্ষক (মাধ্যমিক) শূন্যপদ: ৩,৮৭২টি আবেদন: ২৬,৮২৬ জন 🔹 প্রধান শিক্ষক (মাধ্যমিক) শূন্যপদ: ৩,৯২৩টি আবেদন: ১৯,৮৩৮ জন 🔹 উপাধ্যক্ষ (ডিগ্রি কলেজ) শূন্যপদ: ৬২৭টি আবেদন: ৬,০৮২ জন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদ পদ শূন্যপদ আবেদন ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ২০২ ১,২৩৩ কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ৩৪ ৫৩৩ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ২১৯ ১,৫১৮ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ৫৮৪ ৫৫০ উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ ৫১১ ৫,৬৩০ উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের অধ্যক্ষ ২৫৭ ৩,১৮০ বিএম কলেজের অধ্যক্ষ ১১০ ৭১২ দাখিল মাদ্রাসার সুপার ৮৯৯ ২,৬৪৫ দাখিল মাদ্রাসার সহকারী সুপার ১,০০৪ ২,৯৮৭ নিম্নমাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ৫০৪ ৪,৩৭৫ পরীক্ষার পদ্ধতি এনটিআরসিএ জানিয়েছে, মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। নম্বর বণ্টন: লিখিত (MCQ) পরীক্ষা – ৮০ নম্বর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ – ১২ নম্বর মৌখিক পরীক্ষা – ৮ নম্বর লিখিত পরীক্ষার কাঠামো: সময়: ১ ঘণ্টা প্রশ্ন: ৮০টি প্রতিটি সঠিক উত্তরে ১ নম্বর ভুল উত্তরে কাটা যাবে ০.২৫ নম্বর প্রতিটি অংশে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। প্রশ্নের বিষয়সমূহ: বাংলা ইংরেজি আইসিটি মানসিক দক্ষতা ও গাণিতিক যুক্তি সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক) প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আর্থিক ব্যবস্থাপনা শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও বিষয়ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞান আবেদন প্রক্রিয়া আগ্রহী প্রার্থীরা অনলাইনে http://ngi.teletalk.com.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করতে পারছেন। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড। শতভাগ অটোমেশন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর এবং প্রতিষ্ঠানের পছন্দক্রমের ভিত্তিতে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মেধা অনুযায়ী চূড়ান্ত নিয়োগের সুপারিশ করা হবে। এনটিআরসিএ জানিয়েছে, কোনো ধরনের তদবির প্রমাণিত হলে তা অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট গত ২৭ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ পরিপত্র জারি করে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহপ্রধান নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএকে প্রদান করে। এর আগে ২০১৫ সাল থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএর মাধ্যমে হলেও প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহপ্রধান নিয়োগ দিত সংশ্লিষ্ট গভর্নিং বডি বা পরিচালনা পর্ষদ। নানা অ
ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পেরিয়ে গেলেও পিরোজপুর জেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী শহীদ মিনার। ফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। সচেতন মহলের আশঙ্কা, শিক্ষা জীবনেই শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ না পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও দেশপ্রেম থেকে বিমুখ হতে পারে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার সদর উপজেলায় ৩৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২৪টি মাদরাসা ও ৮টি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিজ ও সরকারি উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। বাকিগুলোতে নেই স্থায়ী কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। অপরদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র থেকে জানা যায়, এ উপজেলায় ১৩৪টি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে যার অধিকাংশে নেই স্থায়ী শহীদ মিনার। এমপিওভুক্ত ২৪ টি মাদরাসা ও ৮ টি কলেজে নেই কোনো স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ। সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার পিরোজপুর টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, করিমুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ, আব্দুস সালাম তালুকদার অ্যাকাডেমিসহ অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনার না থাকায় ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে আগামী প্রজন্ম শহীদদের সম্মান করতে ভুলে যাবে, যা ভাষা শহীদদের জন্য অসম্মানজনক বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। পিরোজপুর টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমরান শেখ ও কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির হিমেল ইসলাম তাদের আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের স্কুলে শহীদ মিনার না থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা ফুল দিয়ে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে পারি না। আমাদের দাবি, প্রতিটি স্কুলে যেন দ্রুত শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। সদর উপজেলার করিমুন্নেসা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহিদ হোসেন বলেন, এটা সত্যিই দুঃখজনক। আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, তারা জানিয়েছে, ‘একটি বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে আমাদের শহীদ মিনার নিশ্চিত করবে’। আমরা আশা করছি, এ বছর সম্ভব না হলেও আগামী বছর নিজস্ব বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার নির্মাণ এবং শহীদদের স্মরণে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফুল দিতে সক্ষম হব। কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. কাবিরুল মুক্তাদির জানান, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনায় শহীদ মিনার অন্তর্ভুক্ত আছে, তবে বর্তমানে তারা শিক্ষার্থীদের নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রশীদ বলেন, বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি। শহীদ মিনার ভাষার জন্য, নতুন প্রধানের জন্য তাদের কাছে অনেক তাৎপর্য বহন করে। যে সব প্রতিষ্ঠানে এখনো শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষা খাতে তিন অগ্রাধিকারের কথা জানিয়েছেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সেগুলো হলো শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় কারিকুলাম রিভিউ ও পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন। পাশাপাশি ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া ১৮০ দিনের রোডম্যাপের মাধ্যমে কোন পর্যায়ে কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অগ্রাধিকারের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ উপস্থিত ছিলেন। এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে মনিটরিং জোরদার করা হবে। শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় নৈতিকতা, জবাবদিহি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শিক্ষকদের দলীয়করণ ও শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষকতার মূল দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের পাঠদান। দাবিদাওয়া থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে, কিন্তু ক্লাস ফেলে রাজপথে নামা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ও দাবি বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের পথেই অগ্রসর হবে। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি নীতিমালার আওতায় আনার বিষয়ে পর্যায়ক্রমে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি বিধি-বিধানের বাইরে থেকে পরিচালিত হতে পারবে না। মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, যত্রতত্র অনিবন্ধিত বা অস্থায়ী অবকাঠামোয় স্কুল পরিচালনা গ্রহণযোগ্য নয়। নিবন্ধন ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ থাকবে না। বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়ে মন্ত্রী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এই ট্রাস্ট দ্রুত পুনর্গঠন এবং বকেয়া ভাতা পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি সরকারের তাত্ক্ষণিক অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে সব বিষয়ের জন্য নির্ধারিত অভিন্ন ৪৫ মিনিটের ক্লাস কাঠামো থেকে সরে আসার সুপারিশ করেছে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কনসালটেশন কমিটি। সুপারিশ অনুযায়ী, প্রতিটি বিষয়ের জন্য এক সপ্তাহে নির্ধারিত মোট সময় অপরিবর্তিত রেখে দৈনিক ক্লাসের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো যেতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কনসালটেশন কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সব বিষয়ের জন্য নির্ধারিত অভিন্ন ৪৫ মিনিটের পাঠদান পিরিয়ডে আবদ্ধ না থেকে একটি বিষয়ের জন্য এক সপ্তাহের মোট সময় ঠিক রেখে দিনের পাঠদান পিরিয়ড দীর্ঘতর করা যেতে পারে। এছাড়া পিছিয়ে থাকা শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ের মধ্যে অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য অভিভাবকদের থেকে সীমিত ফি নেওয়া যেতে পারে। এতে আরও বলা হয়, প্রতি বিদ্যালয়ে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং এলাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষকদের বা অন্য বিশেষ সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের শিক্ষণ-শিখন পরিকল্পনা ও শিক্ষার্থীর দক্ষতা অর্জনের মাত্রা যাচাই করতে হবে। এটি যাচাইয়ের ভিত্তিতে পরবর্তী এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত শিক্ষণ-শিখনের মান উন্নয়নের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। কমিটি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞান বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা সীমিত রাখতে বলেছে। আর অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি ইত্যাদি) বাতিল করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা বাদ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন শিক্ষাক্রমের আলোকে পড়িয়ে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখায় বিভাজন করারও সুপারিশ করেছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ১৪ হাজার ৩৮৫ পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) এ ফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলায় সর্বাধিক ২ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর কুমিল্লা থেকে ২ হাজার ৫৬৪ জন, কুড়িগ্রাম থেকে ২ হাজার ৪৬০ জন, দিনাজপুর থেকে ২ হাজার ৪২১ জন, গাইবান্ধা থেকে ২ হাজার ২৯৫ জন, সিরাজগঞ্জ থেকে ২ হাজার ১২৩ জন এবং সুনামগঞ্জ থেকে ২ হাজার ৬০ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল গত ২১ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়। এতে মোট ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। একই সঙ্গে জেলাভিত্তিক উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়। গত বছরের ৫ ও ১২ নভেম্বরের বিজ্ঞাপনের আলোকে ৬১টি জেলায় (তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা ১ হাজার ৪০৮টি কেন্দ্রে গত ৯ জানুয়ারি একযোগে অনুষ্ঠিত হয়। সহকারী শিক্ষকের ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদের বিপরীতে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৯৫টি আবেদন জমা পড়ে এবং মোট ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন।
ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঈশ্বরগঞ্জ বিশ্বেশ্বরী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়-এর ছয়জন সাবেক শিক্ষার্থী ৪৮তম (বিশেষ) বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি স্ব-স্ব কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। তাদের এই সাফল্যে বিদ্যালয় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে। যারা যোগদান করেছেন ২০০৯ ব্যাচের আনোয়ার রহমান ইমন, ২০১২ ব্যাচের নির্জনা রাউত তন্বী, ২০১৩ ব্যাচের অনন্যা সরকার, ২০১৪ ব্যাচের আনিসুর রহমান রিয়াদ, নিশাত ফারহানা ও জয়িতা দাস—এই ছয় কৃতী শিক্ষার্থী এখন বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের গর্বিত সদস্য। আনিসুর রহমান রিয়াদ নেত্রকোনার মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে যোগ দিয়েছেন আনিসুর রহমান। তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামের ফজলুর রহমান ও রওশন আরা বেগম দম্পতির ছোট ছেলে। তিনি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। আনিসুর রহমান জানান, স্কুলজীবন শেষ করার আগেই তার বাবা আকস্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন। বাবার স্বপ্ন পূরণে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন। আজ তিনি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারলেও তার বাবা এই দিনটি দেখে যেতে পারেননি—এ কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। নিশাত ফারহানা কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে যোগদান করেছেন নিশাত ফারহানা। তিনি পৌর শহরের ধামদী গ্রামের বাসিন্দা, বড়ভাগ হাইস্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিন মাস্টার ও রায়হানা আক্তার দম্পতির কন্যা। তিনি গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। জয়িতা দাস ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেন্টাল সার্জন হিসেবে যোগদান করেছেন জয়িতা দাস। তিনি ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের দত্তপাড়া এলাকার সঞ্জিত কুমার দাস ও বীণা রানী দাসের মেয়ে। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ-এর ডেন্টাল ইউনিট থেকে বিডিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। অনন্যা সরকার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অনন্যা সরকার। তিনি উপজেলার জাটিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অমরেশ সরকার ও মাকরঝাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বন্দনা রানী পাল দম্পতির কন্যা। তিনিও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। নির্জনা রাউত তন্বী হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেন্টাল সার্জন হিসেবে যোগ দিয়েছেন নির্জনা রাউত তন্বী। তিনি ঈশ্বরগঞ্জ পৌর সদরের চরহোসেনপুর গ্রামের হোমিও চিকিৎসক তাপস চন্দ্র রাউত ও প্রতিমা রাণী রাউতের কন্যা। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ-এর ডেন্টাল বিভাগ থেকে বিডিএস সম্পন্ন করেন। মেয়ের এই সাফল্যে তার বাবা-মা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত। আনোয়ার রহমান ইমন কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে যোগদান করেছেন আনোয়ার রহমান ইমন। তিনি ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার দত্তপাড়া থানা রোডের মজিবুর রহমান ও মমতাজ রহমানের সন্তান। তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। এর আগে তিনি মেডিকেল অফিসার (মা ও শিশু স্বাস্থ্য) হিসেবে পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়া বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ কে এম মোস্তফা কামাল বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের ছয়জন সাবেক শিক্ষার্থী একই বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। এটি আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন।” এই সাফল্য শুধু বিদ্যালয়ের নয়, পুরো ঈশ্বরগঞ্জবাসীর জন্য গৌরবের বিষয়। ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থী যেন এভাবে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
শহরে অ্যালার্জি রোগের হার গত কয়েক দশকে বেড়েছে। শিশু ও বড়দের মধ্যে নাক বাফ, হাঁপানি, চুলকানি, চোখের লাল ভাব এবং খাদ্য অ্যালার্জি বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক শহরের জীবনধারা, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন- এ তিনটিই এর মূল কারণ। দূষণ ও শহরের জীবনধারা শহরে গাড়ি, ট্রাফিক ও কারখানার ধোঁয়া, ধুলো ও পলিনের কারণে শ্বাসনালী জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা হয়। ঘরের ভেতরও ধুলো, পোকামাকড়, নরম খেলনা, ভারি পর্দা ও তেলের ল্যাম্প বা ঘ্রাণদ্রব্য শ্বাসনালীকে সংবেদনশীল করে তোলে। অনেক মানুষ এখন দীর্ঘ সময় ঘরে থাকেন, এয়ার কন্ডিশনার বা ফ্যানের নিচে বসে থাকেন। এতে ধুলো ও অ্যালার্জেন জমে যায় এবং সমস্যা বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উচ্চ তাপমাত্রা ও বায়ুর কার্বন ডাই অক্সাইডের বৃদ্ধি উদ্ভিদকে বেশি পলিন উৎপাদনে প্ররোচিত করছে। পলিনের মরশুম দীর্ঘ হচ্ছে, ফলে মানুষের নাক, চোখ ও ফুসফুসে অ্যালার্জি হওয়ার দিন বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শহরে। কারণ শহরে বৃক্ষের সংখ্যা কম, সেখানে সমস্যা আরও তীব্র। খাবার, স্বাস্থ্য ও জীবনধারা আধুনিক খাবারে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চিনির বেশি ব্যবহার এবং কম ফাইবার থাকার কারণে খাদ্য অ্যালার্জি বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে, কিছু খাবার দেরিতে খাওয়ানোর পদ্ধতিও অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রতিরোধ ও সচেতনতা ডাক্তাররা বলছেন, অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সেগুলো হলো- • পরিচিত অ্যালার্জেন যেমন ধুলো, পলিন, পশুর লোম বা নির্দিষ্ট খাবার এড়িয়ে চলা। • ধুলোমুক্ত রাখা, বিছানাপত্র নিয়মিত গরম পানি দিয়ে ধোয়া। • বেশি দূষিত বা পলিনের দিন মাস্ক ব্যবহার। • ঘরের ভেন্টিলেশন ঠিক রাখা এবং শীত-গরমের সময় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া। • গুরুতর অ্যালার্জির ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগও জরুরি। শহরের বায়ু মান উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, খোলা জায়গা বৃদ্ধি ও শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণ করলে ভবিষ্যতে অ্যালার্জির ঘটনা কমানো সম্ভব। শহরের বাসিন্দাদের উচিত নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সাবধানতা নেওয়া। তথ্যসূত্র : ওয়ান ইন্ডিয়া।
রাজধানীর কড়াইল বস্তির তালতলা এলাকার বাসিন্দা মশুরা বেগম, বয়স ৫০। তিনি একজন কবিরাজ। আগে জন্ডিসসহ নানা রোগের ঝাড়ফুঁক দিতেন। তার স্বামী বিটিসিএলে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করেন। তাদের তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল একটি সাধারণ জীবন। তবে একসময় তার স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। প্রথমদিকে মশুরা মনে করেছিলেন, স্বামীর ওপর জিন ভর করেছে। তাই ঝাড়ফুঁক দেন। তাতে কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে শ্যামলীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান। সেখানে দুই বছরের চিকিৎসায় স্বামী সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে ছেলে ও মেয়ের ক্ষেত্রেও একই উপায় অবলম্বন করেন। তাদেরও হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান। এখন তারা তিনজনই অনেকটা সুস্থ। মশুরার অভিজ্ঞতা তাকে বদলে দেয়। এখন তিনি নিজেই অন্যদের হাসপাতালে যেতে উৎসাহ দেন। যারা যেতে চান না, তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যান। কড়াইল বস্তির ভেতরেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে মশুরার মতো আরও ১৫৩ জন মানুষ সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।এই পরিবর্তন এসেছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইএইচআরের অর্থায়নে পরিচালিত চার বছর মেয়াদি ‘ট্রান্সফর্মিং একসেস টু কেয়ার ফর সিরিয়াস মেন্টাল ডিজঅর্ডারস ইন স্লাম’ (ট্রান্সফর্ম) প্রকল্পের কারণে। বাংলাদেশে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে টেলিসাইকিয়াট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক লিমিটেড (টিআরআইএন)। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বস্তিবাসীদের মধ্যে গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রথাগত নিরাময়কারী, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধ বিক্রেতাদের দুটি দলে ভাগ করে মোট ১৫৩ জনকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে তারা মানসিক রোগ চিহ্নিত করতে এবং রোগীকে সঠিক জায়গায় রেফার করতে সক্ষম হন। বেলতলা এলাকার ফার্মেসি পরিচালনাকারী লিমা আক্তার বলেন, আগে মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না; কিন্তু এখন মানুষ চিকিৎসা নিতে আগ্রহী। তিনি জানান, রোগীর উপসর্গ দেখে প্রয়োজন হলে ট্রান্সফরম প্রকল্পের রেফারাল স্লিপ দিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠিয়ে দেন। তবে আগের মতো সচেতনতামূলক কার্যক্রম এখন আর নেই। তার মতে, লিফলেট, পোস্টার ও ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রচারের মাধ্যমে আরও রোগীকে উৎসাহ দেওয়া সম্ভব। তমিজ মিয়া, বয়স ৭০। একজন প্রথাগত নিরাময়কারী ছিলেন। আগে ঝাড়ফুঁক দিতেন, ভাবতেন রোগীকে ‘জিন ধরেছে’। ট্রেনিং নেওয়ার পর এখন তিনি রোগীদের হাসপাতালে পাঠান। বলেন, ‘এই রোগের চিকিৎসা আছে, হাসপাতালে গেলে ভালো হয়, খরচও লাগে না।’ প্রকল্পের আগে বছরে ৩৩ জন বস্তিবাসী মানসিক রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। সচেতনতা বৃদ্ধির পর এক বছরে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫৭ জন। প্রকল্পটি আরও কয়েক বছর চালিয়ে নেওয়ার দাবি বস্তিবাসীর। টিআরআইএনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. তানজির রশিদ বলেন, কড়াইল বস্তিতে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ মানুষের বসবাস; কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ছিল প্রচণ্ড ঘাটতি। মানুষ মূলত কবিরাজ, ফার্মেসি বা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর কাছেই যান। তাই তাদেরই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর তারা সচেতনতা ছড়িয়ে দেন। এক বছরেই চিকিৎসা নেওয়ার হার প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, প্রকল্পটি চার বছরের জন্য ছিল। আরও কিছুদিন চালানো গেলে মানসিক রোগ নিয়ে কুসংস্কার কমবে এবং বস্তিবাসী নিয়মিত সঠিক চিকিৎসার পথ বেছে নেবে। এই প্রকল্পের সফলতায় শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৫৩ জন নন, সুস্থ হওয়া পরিবারের সদস্যরাও এখন সচেতনতায় অংশ নিচ্ছেন। ফলে কড়াইল বস্তির ভেতরেই মানসিক রোগ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।
বিশ্বে ৯ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ ছানি রোগে ভুগছেন, কিন্তু তাদের অর্ধেকই প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের সুযোগ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। খবর এএফপির। ডব্লিউএইচও জানায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে চোখের লেন্স ঘোলা হয়ে যাওয়াকে ছানি বলা হয়। চিকিৎসা না হলে এটি অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। অথচ ছানি অপারেশন মাত্র ১৫ মিনিটের একটি সহজ ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা, যা দ্রুত ও স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে পারে। সংস্থাটির চোখের যত্ন বিষয়ক কারিগরি প্রধান স্টুয়ার্ট কিল বলেন, বিশ্বের অর্ধেক মানুষের ছানি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলেও তারা সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। আফ্রিকা অঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর; সেখানে যাদের অপারেশন দরকার, প্রতি চার জনের মধ্যে তিন জনই চিকিৎসা পান না। তিনি জানান, কেনিয়ায় ছানি অপারেশন প্রয়োজন এমন ৭৭ শতাংশ মানুষের দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা বা অন্ধত্ব নিয়েই মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে পুরুষদের তুলনায় নারীরা কম চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন। ডব্লিউএইচও বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে ২০ শতাংশের কম সম্পূর্ণ অন্ধ হলেও অধিকাংশ মানুষ দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগছেন।
শিশুর মলদ্বারে পলিপ অনেক সময় অবহেলিত একটি সমস্যা। পলিপ হলো অন্ত্রের ভেতরের আবরণী থেকে উৎপন্ন ছোট, নরম, মাংসল বৃদ্ধি, যা সাধারণত বৃহদান্ত্রের শেষাংশ বা মলদ্বারের কাছাকাছি অংশে দেখা যায়। শিশুর ক্ষেত্রে অধিকাংশ পলিপই জুভেনাইল ধরনের এবং সাধারণত নিরীহ প্রকৃতির হলেও উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। অনেকের ধারণা, শক্ত পায়খানার কারণেই পলিপ হয়। তবে বাস্তবে শক্ত মল পলিপ সৃষ্টি করে না। যেসব শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে, তাদের শক্ত মল পলিপের গায়ে ঘর্ষণ লেগে রক্তপাত ঘটাতে পারে, ফলে সমস্যাটি ধরা পড়ে। শিশুর মলদ্বারের পলিপের সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হলো মলত্যাগের পর টাটকা লাল রক্ত পড়া। রক্ত সাধারণত মলের সঙ্গে মিশে না গিয়ে আলাদা করে পড়ে বা মলের ওপর লেগে থাকে। অনেক সময় শিশুর তলপেটে ব্যথা, মলদ্বারে জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় ছোট মাংসপিণ্ডের মতো কিছু বাইরে বের হয়ে আবার ভেতরে ঢুকে যেতে দেখা যায়। যদি দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে রক্তপাত চলতে থাকে, তাহলে শিশুর রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এতে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে, খাওয়ার রুচি কমে যায় এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা, প্রয়োজন হলে প্রোক্টোস্কপি বা কোলনোস্কপির মাধ্যমে পলিপ শনাক্ত করেন। পলিপ সাধারণত ওষুধে সম্পূর্ণ সেরে যায় না; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পলিপ অপসারণ করতে হয়, যাকে পলিপেকটমি বলা হয়। পলিপের আকার ও অবস্থান অনুযায়ী এটি সরাসরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বা কোলনোস্কপির সাহায্যে অপসারণ করা যায়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় এ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং অভিজ্ঞ সার্জনের মাধ্যমে করালে ঝুঁকি খুবই কম। যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতো সামান্য রক্তপাত বা সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকতে পারে, তবে সেগুলো সাধারণত নিয়ন্ত্রণযোগ্য। চিকিৎসা না করালে বারবার রক্তপাতের কারণে রক্তশূন্যতা বাড়তে পারে এবং শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে পারে। তাই মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতকে কখনই স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। অপারেশনের পরও কিছু ক্ষেত্রে পুনরায় পলিপ হতে পারে, বিশেষ করে যাদের একাধিক পলিপ হওয়ার প্রবণতা থাকে। এজন্য নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাও জরুরি। শিশুকে পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার, যেমন- শাকসবজি, ফলমূল এবং পর্যাপ্ত পানি খাওয়ালে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে এবং মল নরম থাকে। ফলে ভবিষ্যতে জটিলতার ঝুঁকি কমে। সার্বিকভাবে বলা যায়, সময়মতো সঠিক রোগনির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস- এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে শিশুর মলদ্বারের পলিপ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাংলাদেশ-এর স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে বড় ধরনের দুর্যোগের মুখে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, জনবল সংকট ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দুর্নীতির অভিযোগ: কেনাকাটা থেকে পদোন্নতি স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে কেনাকাটা, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে—এমন অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। তাদের দাবি, বিগত সময়ে এসব ক্ষেত্রে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে খালি বাক্সের বিপরীতেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কেনা যন্ত্রপাতির বড় অংশ স্টোরে বাক্সবন্দি পড়ে আছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব অনিয়মের সুবিধাভোগী হয়েছেন বলে দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত সরকার, বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমানে ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারে এলে এই সংকট মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সরকারি সেবায় সীমিত কাভারেজ, বেসরকারিতে নির্ভরতা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ সরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পান। বাকি ৮৫ শতাংশ মানুষকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে সেবা নিতে হয়। চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পকেট থেকে খরচের হার বাংলাদেশে প্রায় ৭৪ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ভুটানে ১৩ শতাংশ, ভারতে ৬৩ শতাংশ, মালদ্বীপে ২১ শতাংশ, নেপালে ৫১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৫১ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জনবল সংকট ও বৈষম্যপূর্ণ বণ্টন কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ডা. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য মানুষের আয়ু ও কর্মক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবে সেবার মান ও কাভারেজ—দুটিই সন্তোষজনক নয়। তার ভাষায়, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই, আর যাঁরা আছেন তাঁদের বণ্টন অসম। অধিকাংশ চিকিৎসক শহরকেন্দ্রিক; গ্রামে গেলেও অনেক সময় থাকেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট—অপথালমোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, নেফ্রোলজিস্ট ও ডায়াবেটোলজিস্টের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, বিশেষ করে পেরিফেরি পর্যায়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম এলাকায় ডাক্তার-নার্স রাখতে হলে ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ভাতা দিতে হবে। WHO মানদণ্ডে ঘাটতি World Health Organization (WHO)-এর সুপারিশ অনুযায়ী ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিকের অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩:৫। বর্তমানে দেশে প্রায় ৯০ হাজার চিকিৎসক থাকলেও নার্স রয়েছেন প্রায় ১ লাখ। অথচ এই সংখ্যায় নার্স থাকার কথা ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার এবং প্যারামেডিক সাড়ে ৪ লাখ। সরকারি হিসাবে প্যারামেডিক রয়েছেন মাত্র ২০ হাজার। ডাক্তারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং নার্স ও প্যারামেডিকের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য। এসব পদ দ্রুত পূরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করলে সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি পর্যায়ে চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মেডিকেল শিক্ষার মান তলানিতে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, মেডিকেল শিক্ষা হচ্ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু এই ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে গেছে। মানহীন ডাক্তার, নার্স ও টেকনোলজিস্ট তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতে বড় সংকট ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার করতে হলে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন আনতে হবে। বাজেট সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৭৪ শতাংশ, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৫ শতাংশ। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দ কম এবং তার একটি বড় অংশ দুর্নীতিতে নষ্ট হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার মান নিম্নমুখী। করণীয়: সমন্বিত পরিকল্পনা ও রোগপ্রতিরোধে গুরুত্ব জনস্বাস্থ্যবিদ রাশেদ রাব্বি বলেন, দেশের জনসংখ্যা, ঘনবসতি ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। চিকিৎসার চেয়ে রোগপ্রতিরোধ ও সুস্থতা নিশ্চিতকরণে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— দলীয় বিবেচনা বাদ দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি প্রাথমিক থেকে টারশিয়ারি পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেবার মূল্য নির্ধারণ ও মান নিয়ন্ত্রণ পৃথক স্বাস্থ্য প্রশাসন ও বেতন কাঠামো সময়োপযোগী ও জনমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছরে স্বাস্থ্যখাতে যে লুটপাট ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না করলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন বড় ধরনের ধাক্কার মুখে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, দক্ষ জনবল নিয়োগ, বাজেট বৃদ্ধি, প্রাথমিক সেবা জোরদার এবং স্বাস্থ্যনীতি সংস্কার—সব ক্ষেত্রেই একযোগে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় স্বাস্থ্যখাতের এই সংকট আরও গভীর হয়ে বৃহত্তর মানবিক দুর্যোগে রূপ নিতে পারে।
লাইমলাইটে থাকতে কীভাবে নজর কাড়তে হয়, তা ভালো করেই জানেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও টেলিভিশন অভিনেত্রী উরফি জাভেদ। কোনো বড় বাজেটের সিনেমায় নিয়মিত অভিনয় না করেও আজ তিনি বলিউডের পরিচিত মুখ। তার সাহসী ও ব্যতিক্রমী ফ্যাশন স্টেটমেন্টই তাকে বারবার এনে দিয়েছে শিরোনামে। স্টাইল নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা উরফির কাছে নতুন কিছু নয়। কখনও রিসাইকেল করা উপকরণ, কখনও অদ্ভুত ডিজাইনের পোশাক—সবকিছুতেই তিনি চমক দিতে ভালোবাসেন। তবে এবার যেন নিজেকেও ছাপিয়ে গেলেন এই অভিনেত্রী। কেকে তৈরি পোশাকে নজরকাড়া উপস্থিতি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে কালো রঙের অভিনব একটি পোশাক পরে হাজির হন উরফি। প্রথম দর্শনে অনেকেই ভেবেছিলেন, পোশাকটিতে কেকের নকশা করা হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায়, সেটি আসলে সত্যিকারের কেক দিয়ে তৈরি বিশেষ কস্টিউম। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি নিজের পোশাক থেকেই কেক কেটে উপস্থিত অতিথিদের পরিবেশন করতে শুরু করেন। মুহূর্তেই সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। এমন অভিনব প্রচারণা বা স্টাইল স্টেটমেন্ট আগে খুব কমই দেখা গেছে। সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি ভাইরাল হতেই নেটিজেনদের মধ্যে শুরু হয় নানা প্রতিক্রিয়া। কেউ তার সৃজনশীলতার প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ সমালোচনায় সরব হয়েছেন। একজন মন্তব্য করেন, “এই কেকটা কেউ খাবেন না, ওর গ্যাসের সমস্যা রয়েছে।” আরেকজন লেখেন, “আজ আমার জন্মদিন, আর আজকেই উনি এমন ড্রেস পরে এলেন!” অন্য এক নেটিজেনের ভাষ্য, “আমি জানি না কীভাবে উনি এমন জামা পরে এলেন! আর এরাও বা কেমন মানুষ যে কেকটা খেয়েও নিচ্ছেন। ভীষণ নোংরা লাগছে।” কটাক্ষকে তোয়াক্কা নয় সমালোচনা উরফির জীবনের নতুন কিছু নয়। বরং বিতর্ক যেন তার ক্যারিয়ারেরই অংশ। তবে এসব কটাক্ষকে বরাবরই উপেক্ষা করে নিজের শর্তে চলেন তিনি। ফ্যাশনকে তিনি দেখেন আত্মপ্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে—যেখানে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজস্বতা তুলে ধরাই তার লক্ষ্য। সব মিলিয়ে, আবারও প্রমাণ হলো—ভাইরাল হতে হলে আলাদা কিছু করতেই হয়, আর সেই জায়গায় উরফি জাভেদ নিঃসন্দেহে এক ধাপ এগিয়ে। তার এই কেক-পোশাক বিতর্কিত হলেও বিনোদন দুনিয়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন দক্ষিণী চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা জুটি দেবেরাকোন্ডা ও রাশমিকা মান্দানা। রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী শহর উদয়পুরে রাজকীয় আয়োজনে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। দুই রীতিতে সম্পন্ন বিয়ে উদয়পুরে প্রথমে তেলেগু রীতিতে বিয়ে সেরেছেন এই তারকা যুগল। দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা, মন্ত্রোচ্চারণ ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিবাহ। এরপর বিকেলে রাশমিকার পরিবারের কর্ণাটকের কোডাভা সম্প্রদায়ের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় দফা বিয়ের আয়োজন করা হয়। দুই পরিবারের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে অনন্য ও বর্ণাঢ্য। খাঁটি দক্ষিণী আমেজে আয়োজন বিয়ের প্রতিটি আয়োজনে ছিল দক্ষিণী সংস্কৃতির ছোঁয়া। অতিথিদের স্বাগত জানানো হয় নারিকেল পানির মাধ্যমে। ভোজের আয়োজন ছিল কলাপাতায় পরিবেশিত ঐতিহ্যবাহী খাবার দিয়ে। মেনুতে স্থান পেয়েছিল তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটকের বিভিন্ন জনপ্রিয় পদ। সাজপোশাকেও ফুটে উঠেছে নিজ নিজ শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা ও গর্ব। প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিয়ে উপলক্ষে আগের দিনই শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তায় নবদম্পতির নতুন জীবনের জন্য আন্তরিক শুভকামনা জানানো হয়। পাশাপাশি দুই পরিবারকেও অভিনন্দন জানিয়ে সুখী ও সফল দাম্পত্য জীবনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। হায়দরাবাদে বসছে সংবর্ধনা উদয়পুরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শোবিজ অঙ্গনের বন্ধু ও সহকর্মীদের জন্য হায়দরাবাদে আগামী ৪ মার্চ বিবাহোত্তর সংবর্ধনার আয়োজনের পরিকল্পনা করেছেন বিজয়-রাশমিকা। দক্ষিণী চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এই বিয়ে নিঃসন্দেহে বছরের অন্যতম আলোচিত আয়োজন হয়ে থাকবে। ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও পারিবারিক আবেগের মেলবন্ধনে নতুন জীবনের পথচলা শুরু করলেন এই জনপ্রিয় তারকা জুটি।
কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেত্রী কৌশানী মুখার্জি। ক্যারিয়ারে অনেক চড়াই-উৎরাই পার করেছেন। কঠিন সময় পার করেছেন। তবুও ভেঙে পড়েননি কৌশানী। সম্প্রতি সে বিষয় টেনেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি জীবনে সমস্ত রকম খারাপ দেখে ফেলেছি। ক্যারিয়ারের গ্রোথ একেবারে তলানিতে গিয়েও ঠেকতে দেখেছি। ওই সময়েই মা’কে হারিয়েছি। তারপর থেকে ভয়টা একেবারে চলে গেছে। অনেক সময় এমনও এসেছে, যখন ভিড়ের মাঝে সবাই শুধু বনির সঙ্গে সেলফি তুলতে চেয়েছেন, কিন্তু আমাকে কেউ লক্ষ্য পর্যন্ত করেননি। তখন নিজের আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতো। সে কঠিন সময় পার করা প্রসঙ্গে কৌশানী বলেন, বনির আগে আমার একটা সম্পর্ক ছিল এবং খুব সিরিয়াস রিলেশনশিপেই ছিলাম আমরা। সেই সময়ে আমার ক্যারিয়ারের শুরু। ইন্ডাস্ট্রির চাকচিক্য, কাজ, প্রতিষ্ঠা, সঙ্গে ইমম্যাচুরিটি- সবটা মিলিয়েই ওই সম্পর্কটা সাসটেন করেনি। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি বলতে পারেন। কাজটা কাজের জায়গায়, আর সম্পর্কটা সম্পর্কের মতো। মাঝেমধ্যে আমি বনিকে বলতাম ‘তুমি এত ভালো ভালো কাজ করছো, আমাকে কেন কোথাও রিকমেন্ড করো না? সত্যি কথা বলতে কাজ চাইতে আমার কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। আমি যত বড় অভিনেত্রী হয়ে যাই না কেন, কাজ চাইতে আমার কোনো লজ্জা নেই। কারণ আমি কাউকে কাজের জন্যই প্রস্তাব দিচ্ছি, অন্যায় কিছু না। এখন সময় হয়তো বদলেছে। এ পর্যায়ে এসে কাজই আমার কাছে আসছে। আমার যেতে হচ্ছে না। খারাপ সময় না পার করলে ভালো সময়ের মর্ম বোঝা যায় না আসলে।
সম্প্রতি দেশের কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক খবরে দাবি করা হয়, বিদেশ থেকে অবৈধভাবে মদ আনার সময় বিমানবন্দরে আটক হয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী নির্মাতা আদনান আল রাজীব এবং চলচ্চিত্র পরিচালক শঙ্খ দাসগুপ্ত। প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়, রহস্যজনক কারণে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে তাদের ছেড়ে দেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। তবে এ বিষয়ে শুরুতে মেহজাবীন কিংবা রাজীবের কোনো বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয় এবং গুঞ্জন আরও বাড়তে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে অভিনেত্রীর বক্তব্য আজ দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন মেহজাবীন চৌধুরী। তিনি লিখেছেন, “কিছুদিন ধরে আমি লক্ষ্য করছি, আমাকে নানা বিষয়ে টার্গেট করা হচ্ছে। আপনারা অনেকেই জানেন, কিছুদিন আগেও একটি মিথ্যা মামলায় আমাকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। বিজ্ঞ আদালত সেই মামলা থেকে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছেন, সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” অভিনেত্রীর দাবি, তিনি যখন নতুন করে কাজে মনোনিবেশ করেছেন, ঠিক তখনই আবারও তার মানহানির চেষ্টা করা হচ্ছে। এআই অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ মেহজাবীন তার বক্তব্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, “সাম্প্রতিক সময়ে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিওর কারণে আমার মতো অনেক শিল্পী বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যা একেবারেই কাম্য নয়।” তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নারীরা সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। কারা এর পেছনে রয়েছে তা তিনি জানেন না, তবে তিনি কেবল নিজের কাজ নিয়েই আলোচনা চান। নীরব স্বামী রাজীব এদিকে এ ঘটনায় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি নির্মাতা আদনান আল রাজীব। ফলে বিষয়টি নিয়ে অনলাইনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সমালোচনা বনাম সমর্থন খবরটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে একদিকে যেমন সমালোচনা দেখা গেছে, অন্যদিকে অনেক ভক্ত ও সহকর্মী মেহজাবীনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রকাশ ও শেয়ার করার প্রবণতা অনেক সময় ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নতুন ধরনের বিভ্রান্তি ও মানহানির ঝুঁকি তৈরি করছে। বিমানবন্দর বিতর্ক ঘিরে প্রকৃত ঘটনা কী, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে মেহজাবীন চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত মানহানির অপচেষ্টা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা অভিযুক্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্টীকরণ আসে কি না।
ছোট পর্দার জনপ্রিয় মুখ জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকমহলে পরিচিতি পেলেও গানের প্রতিও রয়েছে তার আলাদা ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটল এবারে। প্রকাশিত হয়েছে তার নতুন মৌলিক গান ‘দু’জন দু’জনার’। নব্বই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের গানের আবহে নির্মিত এই গানটি প্রকাশের পর থেকেই ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন হিমি। বর্তমান সময়ের আধুনিক বিট বা সমসাময়িক মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টের বাইরে গিয়ে সচেতনভাবেই কিছুটা পুরনো ধাঁচের আমেজ রাখা হয়েছে গানে। ফলে অনেক শ্রোতাই গানটি শুনে নব্বই দশকের বিশেষ ফ্লেভারের কথা স্মরণ করছেন। হিমির ভাষ্য, দর্শকদের এমন প্রতিক্রিয়া তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছে। তিনি বলেন, “আমি তো গানের মানুষ না। গান গাইতে সব সময় ভয়ে থাকি—মানুষ ট্রল না করে দেয় কিংবা যদি পছন্দ না করে! এই গান শ্রোতারা পছন্দ করেছেন, এটা আমার জন্য বড় পাওয়া।” অভিনয়ের বাইরে গান গাওয়া নিয়ে এক ধরনের জড়তা কাজ করে বলেও স্বীকার করেন এই অভিনেত্রী। তবে শ্রোতাদের ভালোবাসা তাকে সাহস জুগিয়েছে। যদিও আপাতত গান নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা নেই তার। হিমির সব মনোযোগ ও পরিকল্পনা এখনো অভিনয়কেন্দ্রিক। ছোট পর্দায় নিজের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি শখের জায়গা থেকে গান প্রকাশ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করলেন হিমি। নব্বই দশকের সুর-স্মৃতিকে ধারণ করা ‘দু’জন দু’জনার’ গানটি ভালোবাসা দিবসের আবহে শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
গত দেড় দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ও সফল নায়িকা মাহিয়া মাহি। রূপালি পর্দায় সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে বারবার শিরোনামে এসেছেন তিনি। তবে এবার খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে তার যুক্তরাষ্ট্র অধ্যায়। গ্রিনকার্ড জটিলতায় বিপাকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন মাহি। স্বামী-সন্তানসহ নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু সম্প্রতি কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতায় তার আবেদন বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও তিনি পুনরায় আবেদন করার চেষ্টা করছেন, তবুও প্রক্রিয়াটি তার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাচ্ছেন এই অভিনেত্রী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার স্বামী রকিব সরকার ও পুত্র অবস্থান করছেন ভারতে। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে সন্তানের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি মাহির। কাজী মারুফের বাসায় অবস্থান জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে তিনি থাকছেন চিত্রনায়ক কাজী মারুফ-এর বাসায়। সেখান থেকে মারুফের স্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত ছবি শেয়ার করতেও দেখা গেছে তাকে সামাজিক মাধ্যমে। সিনেমা থেকে রাজনীতি ২০১২ সালে জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত ‘ভালোবাসার রঙ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে মাহির। এরপর একই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে একাধিক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দেন। নায়ক বাপ্পীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়ালেও তা স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জনও শোনা যায়। দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে অন্য ব্যানারে কাজ শুরু করেন তিনি। বিয়ে, বিচ্ছেদ ও নতুন অধ্যায় ২০১৬ সালে মাহমুদ পারভেজ অপুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মাহি। তবে দাম্পত্যে অমিলের অভিযোগে ২০২১ সালে ডিভোর্স দেন। একই বছর গাজীপুরের আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা রকিব সরকারকে বিয়ে করেন তিনি। দুই বছর পর রাজনীতিতে সরব হন মাহি। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট-এর কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও পাননি দলীয় সমর্থন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেখানেই কার্যত ইতি ঘটে তার রাজনৈতিক অধ্যায়ের। আড়ালে যাওয়া ও কর্মহীনতা ২০২৫ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর অনেকটাই আড়ালে চলে যান মাহি। চলচ্চিত্রেও কাজ কমতে থাকে। একপ্রকার কর্মহীন অবস্থায় পড়েন তিনি। নির্বাচনের আগে রকিব সরকারের সঙ্গে বিচ্ছেদের ঘোষণা দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েই জানান মাহি। গত বছরের অক্টোবরে অনেকটা নীরবে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। অনিশ্চয়তার প্রহর যুক্তরাষ্ট্রে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, সবমিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মাহি। একদিকে গ্রিনকার্ড জটিলতা, অন্যদিকে স্বামী-সন্তান থেকে দূরত্ব—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন তিনি। আওয়ামী ট্যাগ থাকায় দেশে ফেরার বিষয়েও দ্বিধায় আছেন বলে জানা গেছে। রূপালি পর্দার ঝলমলে জীবন পেরিয়ে বাস্তবের চড়াই-উতরাই এখন যেন হার মানাচ্ছে সিনেমাকেও। সামনে কী অপেক্ষা করছে মাহিয়া মাহির জীবনে—সেই উত্তরই খুঁজছে তার ভক্ত-অনুরাগীরা।
অ্যাসিডিটি (গ্যাস্ট্রিক/অম্লতা) সাধারণত পেটে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হলে বা খাবার ঠিকমতো হজম না হলে হয়। নিচে সহজ ও কার্যকর উপায়গুলো দিলাম: 🥛 ঘরোয়া উপায় ১) ঠান্ডা দুধ এক গ্লাস ঠান্ডা দুধ অ্যাসিডকে নিরপেক্ষ করতে সাহায্য করে ও বুকজ্বালা কমায়। ➡️ চিনি না মিশিয়ে খাওয়াই ভালো। ২) কলা পাকা কলা প্রাকৃতিক অ্যান্টাসিডের মতো কাজ করে। ➡️ খালি পেটে বা হালকা নাস্তা হিসেবে খেতে পারেন। ৩) জিরা পানি এক চা চামচ জিরা ভেজে পানিতে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন। ➡️ হজমে সাহায্য করে, গ্যাস কমায়। ৪) আদা আদা চা বা কাঁচা আদা অল্প পরিমাণে চিবিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। 🍽️ যেসব খাবার এড়াবেন অতিরিক্ত ঝাল ও ভাজাপোড়া টক খাবার (লেবু, আচার বেশি পরিমাণে) কোমল পানীয় অতিরিক্ত চা/কফি খুব দেরি করে রাতের খাবার ✅ জীবনযাত্রায় পরিবর্তন অল্প অল্প করে বারবার খাবার খান খাওয়ার পর সাথে সাথে শোবেন না (কমপক্ষে ২ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন) ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন টাইট পোশাক এড়িয়ে চলুন 💊 কখন ডাক্তার দেখাবেন? প্রায়ই বুকজ্বালা/বমি ভাব হয় খাবার গিলতে কষ্ট হয় রক্তবমি বা কালো পায়খানা ওজন অকারণে কমে যায় এগুলো থাকলে গ্যাস্ট্রো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ইফতারে ঠান্ডা কোনো পানীয় না থাকলে যেন জমেই না। অনেকেই বাইরে থেকে কেনা ইনস্ট্যান্ট শরবত বানিয়ে পান করেন। এতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি ও স্বাদ মিললেও নিয়মিত খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তার বদলে ঘরে থাকা উপকরণ দিয়েই সহজে পুষ্টিকর স্মুদি তৈরি করা যায়। এতে যেমন তৃপ্তি মিলবে, তেমনি শরীরও থাকবে সুস্থ। চলুন জেনে নেওয়া যাক ইফতারের জন্য খেজুরের স্মুদি বানানোর সহজ রেসিপি- যা যা লাগবে খেজুর ১০-১২টি দুধ ২ কাপ পাকা কলা ২টি দই ২ টেবিল চামচ দারুচিনি গুঁড়া ২ চা চামচ মধু ২ চা চামচ বরফ প্রয়োজনমতো প্রস্তুত প্রণালি প্রথমে খেজুর ভালো করে ধুয়ে গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে নরম করে নিন। এরপর পানি ঝরিয়ে খেজুরের সঙ্গে টুকরো করা কলা মেশান। সব উপকরণ ব্লেন্ডারে দিয়ে মসৃণ হওয়া পর্যন্ত ব্লেন্ড করুন, যাতে কোনো দানা না থাকে। তৈরি হয়ে গেলে গ্লাসে ঢেলে ওপর থেকে বরফ দিন। ইফতারের ঠিক আগে বানিয়ে পরিবেশন করলে স্বাদ বেশি ভালো থাকবে। দীর্ঘক্ষণ রেখে দিলে স্বাদের পরিবর্তন হতে পারে।
রমজানে ইফতার শুধু রোজা ভাঙার সময় নয়, বরং সারাদিনের দীর্ঘ উপবাসের পর শরীরকে পুনরায় শক্তি ও পুষ্টি জোগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সঠিকভাবে ইফতার মেনু নির্বাচন করলে ক্লান্তি কমে, হজম সহজ হয় এবং সারাদিনের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই ইফতারে প্রয়োজন সচেতন খাদ্যাভ্যাস। 🥤 তরল খাবার দিয়ে ইফতার শুরু ইফতার শুরু করা উচিত হালকা তরল খাবার দিয়ে। প্রথমে পানি মুখে নিয়ে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড বিরতিতে ধীরে ধীরে পান করা ভালো। খুব তাড়াহুড়া করে বা গড়গড় করে পানি পান করা ঠিক নয়। তরল হিসেবে যা রাখা যেতে পারে— লাচ্ছি তাজা ফলের রস ডাবের পানি তোকমার শরবত আখের গুড়ের শরবত লেবু পানি শরবত তৈরিতে তাল মিছরি, গুড়, মধু বা ব্রাউন সুগার ব্যবহার করলে তা তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত হয়। 🌴 খেজুর: সুন্নতি ও পুষ্টিকর খাদ্য ইফতারে ২-৩টি খেজুর খাওয়া সারাদিনের ক্লান্তি দ্রুত দূর করতে সাহায্য করে। খেজুরে রয়েছে প্রাকৃতিক চিনি, ফাইবার, কার্বোহাইড্রেট ও অল্প পরিমাণ প্রোটিন—যা শরীরকে দ্রুত শক্তি জোগায়। পুষ্টিগুণ বাড়াতে খেজুরের সঙ্গে চিনাবাদাম ও সামান্য মাখন মিশিয়ে পরিবেশন করা যেতে পারে। 🍎 মৌসুমি ফল: প্রাকৃতিক ভিটামিনের উৎস যেকোনো মৌসুমি ফল ইফতার মেনুতে রাখা জরুরি। ফল শরীরে ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। মিক্সড ফ্রুটস, ফলের সালাদ বা ফল দিয়ে তৈরি হালকা ডেজার্ট খাওয়া যেতে পারে। 🥗 সবজি: হালকা ও সহজপাচ্য বিকল্প সবজি দিয়ে স্বাস্থ্যকর রেসিপি তৈরি করলে তা শরীরের জন্য উপকারী হয়। যেমন— সবজি স্যুপ (বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য উপযোগী) সবজি স্যান্ডউইচ সবজি নুডলস সবজি রোল সবজি পাকোরা (কম তেলে) খেয়াল রাখতে হবে, রান্নায় যেন অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না হয়। 🧆 ছোলা: প্রোটিনের সহজ উৎস ছোলা প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে অতিরিক্ত তেল ও মসলায় ভুনা ছোলা উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করে। স্বাস্থ্যকরভাবে ছোলা খাওয়ার উপায়— সারারাত ভিজিয়ে রেখে সিদ্ধ করা সিদ্ধ ছোলার সঙ্গে পেঁয়াজ, মরিচ, শশা ও টমেটো মিশিয়ে সালাদ তৈরি সামান্য তেলে হালকা ভাজা কাঁচা ভেজানো ছোলাও খাদ্য আঁশ ও প্রোটিনের ভালো উৎস। 🍮 মিষ্টান্ন: পরিমিত থাকাই উত্তম ইফতারে স্বাস্থ্যকর মিষ্টান্ন পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। জিলাপি বা বুন্দিয়া তেলে ভেজে সিরায় ডুবানো হয়, যা বেশি খেলে ক্ষতিকর। বিকল্প হিসেবে রাখা যেতে পারে— ফালুদা কাস্টার্ড পুডিং ফিরনি দুধজাত খাবার শরীরে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন সরবরাহ করে। 🍽️ অন্যান্য উপকারী খাবার ইফতারের জন্য চিড়া-দই খুবই ভালো একটি খাবার। এতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। এ ছাড়া রাখা যেতে পারে— দই বড়া নুডলস স্যান্ডউইচ রুটি-কাবাব মম শশা রমজানে ইফতার শুধু খাবার গ্রহণের সময় নয়, বরং সুস্থ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টিজাত খাবার পরিহার করে পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করলে শারীরিকভাবে ভালো থাকা সম্ভব। সচেতন খাদ্যাভ্যাসই হতে পারে সুস্থ ও কর্মক্ষম রমজানের মূল চাবিকাঠি।
ডেস্ক রিপোর্ট: শুরু হয়েছে সংযমের মাস পবিত্র রমজান। আত্মিক পরিশুদ্ধির পাশাপাশি এই মাস হতে পারে শরীরকে সুস্থ ও ফিট রাখারও সেরা সময়। তবে ইফতারের টেবিলে বাহারি ভাজাপোড়া, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত পদ অনেক সময় ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সারাদিন উপোস থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার খেলে ওজন বেড়ে যাওয়া, অস্বস্তি ও হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু সঠিক খাবার নির্বাচন, পরিমিত আহার ও নিয়মিত হালকা ব্যায়াম—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে রোজার মাসেও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক, রমজানে কোন খাবারগুলো আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে— শাকসবজি: কম ক্যালরি, বেশি পুষ্টি শাকসবজি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্যতম প্রধান সহায়ক। এতে ক্যালরি কম, কিন্তু আঁশ বেশি। আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়। যেভাবে খাবেন: ইফতারে শসা, টমেটো, গাজর, লেটুস দিয়ে সালাদ সেহরিতে কম তেলে রান্না করা সবজি ডাল বা স্যুপে মিশ্র সবজি কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়ক ফলমূল: প্রাকৃতিক মিষ্টির স্বাস্থ্যকর বিকল্প ইফতারে মিষ্টিজাতীয় খাবারের বদলে ফল হতে পারে আদর্শ পছন্দ। ফলে থাকে প্রাকৃতিক চিনি, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। ইফতারে রাখতে পারেন: তরমুজ আপেল পেয়ারা কমলা পেঁপে খেজুর খেজুরে প্রাকৃতিক গ্লুকোজ দ্রুত শক্তি জোগায়। তবে অতিরিক্ত না খাওয়াই ভালো। প্রোটিন: দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তির উৎস রোজার সময় শক্তি ধরে রাখতে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পেশি গঠনে সহায়ক এবং দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে। খাদ্যতালিকায় রাখুন: গ্রিল বা সেদ্ধ মুরগি মাছ ডিম ডাল ছোলা ভাজা খাবারের বদলে গ্রিল বা সেদ্ধ প্রোটিন গ্রহণ করলে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমা কমে। পূর্ণ শস্য: স্থিতিশীল শক্তির জোগান সাদা ভাত বা পরিশোধিত ময়দার রুটি দ্রুত হজম হয়ে যায়। এর বদলে পূর্ণ শস্য গ্রহণ করলে শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়। উপকারী শস্য: ব্রাউন রাইস আটার রুটি ওটস লাল চাল এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। বাদাম ও বীজ: অল্পতেই তৃপ্তি এক মুঠো বাদাম শক্তি জোগায় এবং অতিরিক্ত স্ন্যাকিং কমায়। তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। খেতে পারেন: কাঠবাদাম আখরোট কাজুবাদাম চিয়া বীজ তিসি বীজ পর্যাপ্ত পানি: মেটাবলিজম সচল রাখুন রোজায় ডিহাইড্রেশন হলে শরীর অনেক সময় ক্ষুধা ও পানিশূন্যতার সংকেত গুলিয়ে ফেলে। পরামর্শ: ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ৮–১০ গ্লাস পানি একবারে বেশি না খেয়ে বিরতি দিয়ে পান অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত এড়িয়ে চলুন পানি বিপাকক্রিয়া সচল রাখে এবং হজমে সহায়তা করে। যেসব অভ্যাস মানলে ওজন বাড়বে না ✔️ ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলুন ✔️ ধীরে ধীরে খাবার খান ✔️ সেহরি কখনো বাদ দেবেন না ✔️ ইফতারের পর ২০–৩০ মিনিট হালকা হাঁটা ✔️ পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন রমজান শুধু আত্মশুদ্ধির মাস নয়, এটি হতে পারে সুস্থ জীবনযাপনের নতুন সূচনা। খাবারের পরিমাণ নয়, গুণগত মানের দিকে নজর দিন। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত আহার ও নিয়মিত হালকা ব্যায়াম—এই তিন অভ্যাস মেনে চললে মাস শেষে নিজেকে আরও হালকা, ফিট ও প্রাণবন্ত অনুভব করবেন।
ঘুম না আসা শুধু এক সাধারণ সমস্যা নয়, এটি আমাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। ঘুমের অভাব স্মৃতি, একাগ্রতা এবং মেজাজকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে এবং হতাশা, স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তবে কিছু সহজ ও প্রাকৃতিক উপায় ঘুম ভালো করতে সাহায্য করতে পারে। পানীয় উষ্ণ দুধ বা ক্যামোমাইল চা রাতে পান করলে ঘুমে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। যদিও এ ধরনের পানীয়ের কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ প্রমাণিত নয়, তবু এগুলো নিরাপদ। উষ্ণ দুধে ট্রিপটোফ্যান থাকে, যা মস্তিষ্কে সেরোটোনিন বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে। ক্যামোমাইল চায়ে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড মস্তিষ্কের ঘুম-জাগরণের সঙ্গে যুক্ত রিসেপ্টরের সঙ্গে কাজ করতে পারে। ব্যায়াম মাঝারি ধরনের অ্যারোবিক ব্যায়াম ঘুমের মান বাড়াতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম না করাই ভালো, কারণ এতে এন্ডোরফিন নিঃসরণের কারণে ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে। শীতল পরিবেশ ঘুমের জন্য ঘর যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখা উচিত। সুতি বা আরামদায়ক কাপড় পড়লে ঘুম আরও আরামদায়ক হয়। যারা এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করেন, তাদের সুবিধা বেশি; যারা পারেন না, তাদের ঘর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করা উচিত। ঘর অন্ধকার রাখা স্মার্টফোন বা অন্য আলো ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। রাতে যদি ঘুম থেকে ওঠার প্রয়োজন হয়, তবে টর্চ বা নরম আলো ব্যবহার করুন, যাতে চোখের ক্ষতি বা ঘুম ভাঙা কম হয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠার পর অনেকের বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, এটি খালি পেটে থাকার কারণে হয়, আবার কেউ কেউ গ্যাস বা অ্যাসিডজনিত সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান, যা সব সময় ঠিক নয়। চিকিৎসকদের মতে, বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে সকালে বমি হতে পারে। রাতে দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকার ফলে পাকস্থলীতে অ্যাসিড জমা হয়। অতিরিক্ত অ্যাসিড সকালে বমি ভাব, বুক জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। যারা আগেই অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা গ্যাসের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা বেশি দেখা দেয়। হঠাৎ উঠে বসা বা ঝুঁকে পড়লেও এ ধরনের অস্বস্তি বৃদ্ধি পায়। ডিহাইড্রেশন বা শরীরে পানি কম থাকার কারণে অনেক সময় সকালে বমি হতে পারে। রাতে পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া বা অতিরিক্ত চা-কফি পান করলে সমস্যা বেশি দেখা দেয়। এছাড়া হরমোনের পরিবর্তনও সকালের বমির একটি সাধারণ কারণ। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রথম ত্রৈমাসিকে ‘মর্নিং সিকনেস’ দেখা দেয়। থাইরয়েড সমস্যা বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতাও সকালের বমির পেছনে দায়ী হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অনিয়মিত স্লিপ সাইকেল বা মানসিক চাপও সকালে বমি ভাব বাড়াতে পারে। সাময়িক স্বস্তির জন্য সকালে প্রথমে সামান্য উষ্ণ পানি পান করা উচিত। খালি পেটে ভারী বা ঝাল খাবার এড়ানো এবং হালকা খাবার খেয়ে দিন শুরু করা ভালো। রাতে ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে খাবার শেষ করা, তেল-মশলাযুক্ত খাবার কম খাওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা শরীরকে সাহায্য করবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ২০২৫ সালে কাজের সময় রেকর্ড ১২৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের প্রাণ গেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন Committee to Protect Journalists (সিপিজে)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সংবাদকর্মীদের প্রাণহানির রেকর্ড হয়েছে। ২০২৪ সালের মতো গত বছরও নিহত সাংবাদিকদের বড় একটি অংশের মৃত্যুর জন্য ইসরায়েল দায়ী। গাজা ও ইয়েমেনে ব্যাপক প্রাণহানি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে ৮৬ জন সাংবাদিক নিহত হন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন Gaza Strip-এর ফিলিস্তিনি সাংবাদিক। এছাড়া ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী Houthis পরিচালিত একটি গণমাধ্যম কার্যালয়ে ইসরায়েলি হামলায় ৩১ জন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হন। সিপিজে জানায়, সাংবাদিকদের হতাহতের সংখ্যা নথিভুক্ত করার ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। সিপিজে যে ৪৭টি হত্যাকাণ্ডকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা বা ‘হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার ৮১ শতাংশের জন্যও ইসরায়েল দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গাজায় প্রবেশাধিকারে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় সাংবাদিকদের হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি। অতীতে তারা দাবি করেছে, গাজায় তাদের সেনারা কেবল যোদ্ধাদের লক্ষ্য করেছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি থাকে। গত সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের ওই গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার দায় স্বীকার করে ইসরায়েল। সে সময় সেটিকে হুথিদের প্রচারণা শাখা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। কিছু ঘটনায় ইসরায়েল দাবি করেছে, গাজায় নিহত কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে Hamas-এর যোগাযোগ ছিল। তবে এ দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সিপিজে ইসরায়েলের এমন অভিযোগকে ‘ভয়াবহ অপবাদ’ বলে উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, গাজায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেয় না ইসরায়েল। ফলে সেখানে নিহত সব গণমাধ্যমকর্মীই ছিলেন ফিলিস্তিনি। অন্যান্য দেশে পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ১২৯ সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত ১০৪ জন সংঘাত-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। গাজা ও ইয়েমেনের বাইরে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী দেশগুলোর একটি ছিল Sudan, যেখানে ৯ জন নিহত হন। এছাড়া Mexico-তে ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। Ukraine-এ রুশ বাহিনীর হাতে চারজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে Philippines-এ তিন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের নিশানা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং উল্টো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তুলেছে। যদিও কিয়েভ এ অভিযোগ নাকচ করেছে। প্রতিবেদনের বিষয়ে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাশিয়ার দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তিন দশকের তথ্যসংগ্রহ সিপিজে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হতাহতের তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করছে। সংস্থাটির মতে, বর্তমানে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী যেকোনও দেশের সামরিক বাহিনীর তুলনায় সর্বোচ্চসংখ্যক নিশানাভিত্তিক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। বিশ্বব্যাপী সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সাংবাদিকদের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে—এমন উদ্বেগও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ঢাকা, সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি): রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-এ মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সংবাদকর্মীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অন্তত তিনজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন বাংলানিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তোফায়েল আহমেদ, আকাশ (এনপিবি নিউজ) এবং কাওসার আহমেদ রিপন (আজকের পত্রিকা)। গুরুতর আহত তোফায়েল আহমেদ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। লাইভ সম্প্রচারের সময় হামলার অভিযোগ জানা যায়, সোমবার রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক নির্মূলে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। অভিযানের দৃশ্য জনসমক্ষে তুলে ধরতে সাংবাদিকরা ফেসবুক লাইভে সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন। এ সময় একদল পুলিশ সদস্য তাদের ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ‘আজকের পত্রিকা’র মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার কাওসার আহমেদ রিপন জানান, নিজেদের পরিচয় বারবার দেওয়ার পরও পুলিশ কোনো তোয়াক্কা না করে বেধড়ক লাঠিচার্জ শুরু করে। তোফায়েল আহমেদকে মারধর করা হলে তাকে উদ্ধার করতে গেলে অন্য সাংবাদিকদেরও পেটানো হয়। গুরুতর আহত তোফায়েল, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের আশঙ্কা সহকর্মীরা জানান, মাথা ও পিঠে আঘাতের ফলে তোফায়েলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়েছে। রক্তক্ষরণ ও তীব্র ব্যথা শুরু হলে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে তার শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি রয়েছে। বাংলানিউজের নিন্দা ও বিচার দাবি বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এর ক্রাইম বিট প্রধান সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট আবাদুজ্জামান শিমুল বলেন, এর আগেও রমনা পার্ক এলাকায় পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান দায়িত্বশীলভাবে লাইভ সম্প্রচার করা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ দমন কার্যক্রম ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই সচেষ্ট। তিনি অভিযোগ করেন, একই ধারাবাহিকতায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তোফায়েলের ওপর বেপরোয়া হামলা চালানো হয়, যার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান তিনি। ডিএমপির আশ্বাস এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-এর রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, “ভিডিও ফুটেজ যেহেতু রয়েছে, তা পর্যালোচনা করে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” জনগুরুত্বপূর্ণ অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার এই ঘটনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান Press Institute of Bangladesh (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পিআইবি থেকে অবসর গ্রহণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের পাওনা সংক্রান্ত বিষয় ঝুলিয়ে রেখে মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং তারা অভিযোগ করছেন যে তাদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা নিষ্পত্তি না করে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা চলছে। এছাড়া অভিযোগ উঠেছে যে, প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৪ জনকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নীতিমালার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। অভিযোগের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে পিআইবির কর্মচারী ফরিদ আহমেদ-এর সঙ্গে অমানবিক আচরণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবি, তার সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এই অনিয়ম দুর্নীতি অবৈধ নিয়ম বিষয়ে কথা বলায়,মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে পিআইবির সিনিয়র পরীক্ষক পারভীন সুলতানা রাব্বিকে যড়যন্ত্র ও কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে বদলি করা হয়েছে এবং আলী হোসেনের সুনিশ্চিত কারণ ছাড়া অবসর দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান করা হয়েছে বলেও জানা যায়। এভাবে অবসরপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গেই তিনি অনুরূপ আচরণ করে থাকেন। এছাড়াও, তিনি প্রায় ৩৪ জন লোককে পিআইবিতে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন। ডিজি ফারুক ওয়াসিফ'র অপসারন দাবী: বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের অনিয়মের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে মহাপরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অনিয়ম ও লুটপাটের মহোৎসবে পরিণত করেছেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন মহলে উত্থাপিত হয়েছে। তাই দ্রুত তাকে অপসারনের দাবী জানিয়েছে সাংবাদিক সমাজ। তিনি ডিজি পদে টিকে থাকার লক্ষ্যে তিনি নানামুখী তৎপরতা ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বলেও জানা যাচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি রাখে।তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে, বিষয়টির প্রতি যাতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
দৈনিক দিনকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশকের পদ ছেড়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে যোগ দিয়েছেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন। সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলা হয়েছে, সাংবাদিক, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’–এর আহ্বায়ক ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে যোগদান করেছেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হয় বিখ্যাত সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। চলতি বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন ও অনলাইন বিজ্ঞাপন থেকে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কোম্পানিটি। গত বুধবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির সমন্বিত পরিচালন মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ২৬ দশমিক ১ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে ৪ লাখ ৬০ হাজার ডিজিটাল-অনলি সাবস্ক্রাইবার যুক্ত করেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিন মাসে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। গ্রাহকদের জন্য ‘মাল্টি-প্রোডাক্ট বান্ডেল সাবস্ক্রিপশন’ কৌশল সফল হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। বর্তমানে মোট গ্রাহকের অর্ধেকের বেশি একাধিক পণ্যের সাবস্ক্রিপশন ব্যবহার করছেন। নিউজ রিপোর্ট, কুকিং, গেমস, অয়্যারকাটার ও দ্য অ্যাথলেটিকসহ বিভিন্ন সেবায় নিউইয়র্ক টাইমসের মোট গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজারে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মেরিডিথ কপিত লেভিয়েন বলেন, ব্যবহারকারী ও গভীরভাবে যুক্ত গ্রাহক বাড়ানোর সক্ষমতার বিষয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী। তিনি আরও জানান, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ গ্রাহকসংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজস্ব ও মুনাফার চিত্র মোট রাজস্ব: ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭০ কোটি ৮ লাখ ডলার পরিচালন মুনাফা: সমন্বিত পরিচালন মুনাফা ১৩ কোটি ১৪ লাখ ডলার বিজ্ঞাপন আয়: আগের বছরের তুলনায় ২০ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৮১ লাখ ডলার অ্যাফিলিয়েট ও লাইসেন্সিং আয়: মূলত অয়্যারকাটার থেকে আয় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার ডিজিটাল এআরপিইউ: গ্রাহকপ্রতি গড় আয় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৭৯ ডলার—যার পেছনে মূল্য সমন্বয় ও প্রচারমূলক মূল্যের অবসান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ডিজিটাল কনটেন্টে গ্রাহক ঝুঁকে পড়ায় প্রিন্ট সাবস্ক্রিপশন কমছে। তৃতীয় ত্রৈমাসিকে প্রিন্ট গ্রাহক ৫০ হাজার কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭০ হাজারে। এ খাত থেকে প্রতিষ্ঠানের আয় কমেছে ৩ শতাংশ, যা এখন ১২ কোটি ৭২ লাখ ডলার। ২০২২ সালে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে কেনা দ্য অ্যাথলেটিক বহুদিন লোকসানে থাকলেও ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রথমবারের মতো লাভজনক হয়। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এর পৃথক আর্থিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে পরিচালন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। সেপ্টেম্বর শেষে নিউইয়র্ক টাইমসের হাতে নগদ অর্থ ও দ্রুত বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটিজ মিলে ছিল ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে সংবাদপত্রের প্রচলন ক্রমেই কমছে। সর্বশেষ কয়েক বছরে অঞ্চলটিতে সংবাদপত্রের সার্কুলার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত বৃদ্ধি ও সরকারী সহায়তার অভাব একসময়ের সমৃদ্ধশালী খাতটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একসময় যা একটি প্রাণবন্ত ক্ষেত্র ছিল, আজ তা কম পাঠকসংখ্যা ও খরচ বৃদ্ধির কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বিক্রেতা ও প্রকাশকরা জানিয়েছেন যে, সেই শিল্পখাতটি যা দশকের পর দশক ধরে হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা নিশ্চিত করত, এখন তার আগের পাঠকসংখ্যার কেবল এক ভগ্নাংশের ওপর টিকে আছে। যারা দীর্ঘ সময় ধরে এই পেশায় কাজ করেছেন, তাদের মতে, করোনা মহামারির পর থেকে এ শিল্পের পতন শুরু হয়। তখন কাগজের দাম কয়েকগুন বৃদ্ধি ও সরবারহ ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় সংবাদপত্রের দাম বেড়ে যায়। সরকারের কাছে এ খাতটি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অনুদান চেয়েও কোন সাড়া মিলেনি।ফলে কর্মীরা আর্থিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে বলেন, তাদের দৈনন্দিন আয় এখন আগের আয়ের চতুর্থাংশের থেকেও কমে গেছে। সংকটের কারণ হিসেবে জম্মু-কাশ্মীরের গণমাধ্যমকর্মীরা বলছেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্য। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এখন সংবাদপত্রের স্ক্যান করা কপি বিনামূল্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুদ্রিত সংস্করণের পাঠক সংখ্যা সীমিত হয়ে গেছে। বাকি পাঠকের বেশিরভাগই ৫০ বছরের ওপরে, আর সরকারি অফিসগুলো একমাত্র বড় প্রতিষ্ঠানগত গ্রাহক হিসেবে টিকে আছে। সার্কুলেশন কমার বিষয়টি সংবাদপত্র বিক্রেতাদের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, শিক্ষার খরচ এবং স্বাস্থ্যসেবা এখন বিলাসিতা হয়ে গেছে, এমনকি মাসিক ভাড়া জোগাতেও পরিবারগুলো হিমশিম খাচ্ছে। মুজাফফরাবাদ ও আশেপাশের অঞ্চলের কয়েকজন পত্রিকা বিক্রেতা জানিয়েছেন, তারা বারবার সংবাদপত্র ব্যবসা চালু রাখতে প্রেস সহায়তা তহবিলের জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু এখনও এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ পত্রিকা সরবারহ কমে গেছে। কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, জরুরি সংস্কার ছাড়া শিল্পটি টিকে থাকতে নাও পারে।
শ্চিমবঙ্গের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বারাসাত শহরে এক বিরল সম্প্রীতির নজির গড়ে উঠেছে। হিন্দু পরিবারের বসতভিটায় অবস্থিত ‘আমানতি মসজিদ’ শুধু নামেই নয়, বাস্তবেও হয়ে উঠেছে আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থানের এক অনন্য প্রতীক। আর এই সম্প্রীতির কেন্দ্রে রয়েছেন পার্থসারথি বোস—যিনি টানা ১৬ বছর ধরে পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখে আসছেন। হিন্দু পরিবারের তত্ত্বাবধানে মসজিদ মসজিদটি পার্থসারথি বোসদের বাড়ির ভেতরেই অবস্থিত। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে প্রায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো মসজিদ নেই। ফলে আশপাশের দোকান, বাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মুসলমানরা এখানে এসে নামাজ আদায় করেন। রমজান মাসে প্রতিদিন দেড় শতাধিক মুসল্লি ইফতার করেন এই মসজিদে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—মসজিদের দেখভাল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সার্বিক দায়িত্ব পালন করে আসছে একটি হিন্দু পরিবার। ইতিহাসের সূত্রপাত ১৯৬০ সালে ১৯৬০ সালে সম্পত্তি বিনিময় প্রথার মাধ্যমে খুলনার আলকা গ্রাম থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন পার্থসারথির দাদু নিরোধকৃষ্ণ বোস। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে বসতভিটায় উঠে তিনি দেখতে পান একটি জরাজীর্ণ মসজিদ। ধর্মীয় সম্মান বজায় রেখে সেটি আগলে রাখেন তিনি। পরবর্তীতে তার ছোট ছেলে দীপক বোস দায়িত্ব নেন মসজিদের। তখনই এর নামকরণ করা হয় ‘আমানতি মসজিদ’। বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন পার্থসারথি বোস। দুর্ঘটনা থেকে আত্মশুদ্ধির পথ পার্থসারথি জানান, ২০০৯ সালের আগে মসজিদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তেমন ছিল না। রমজান মাসে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় বাইক থেকে পড়ে গিয়ে ডান কাঁধের হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসকেরা জানান, হাড় জোড়া লাগা কঠিন। অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরদিন সকালে মসজিদে এসে ক্ষমা চান। নিজের ভুল স্বীকার করে মানত করেন—জীবিত থাকা পর্যন্ত রমজান মাসে রোজা রাখবেন। মসজিদের মাটি কাঁধে লাগিয়ে প্রার্থনা করেন সুস্থতার জন্য। তার দাবি, এরপর ধীরে ধীরে তার হাড় জোড়া লাগে। সেই থেকে টানা ১৬ বছর পুরো রমজান মাস রোজা রেখে আসছেন তিনি। এর আগেও রোজা রাখতেন, তবে পুরো মাস নয়। “মসজিদ আমাকে ভালো মানুষ বানিয়েছে” পার্থসারথি বলেন, “এই মসজিদ আমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে যে, খারাপ থাকার উপায় নেই। রোজা রাখলে মন পরিষ্কার থাকে। বাজে চিন্তা আসে না। মনে এক ধরনের ভয় কাজ করে—আবার যেন কোনো ভুল না করি।” তার পরিবারে অন্য কেউ রোজা না রাখলেও সবাই সহযোগিতা করেন। স্ত্রী সেহরির আয়োজন করেন, আর ইফতারে থাকে খেজুর, ফল ও হালকা খাবার। দান গ্রহণ নয় মসজিদের জন্য সরকারি বা স্থানীয় দান নেওয়া হয় কি না—এ প্রশ্নে পার্থসারথি স্পষ্ট জবাব দেন, “না, কোনো দান নেই। হারাম না হালাল বুঝি না। তাই দানবাক্সও রাখা হয়নি।” সম্প্রীতির বার্তা স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বারাসাতের ৮ নম্বর ওয়ার্ড পুরোপুরি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এখানে মুসলিম ভোটার নেই বললেই চলে। তবুও ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “এই মসজিদ আমাদের কাছে মন্দিরের মতোই পবিত্র।” অন্য এক বৃদ্ধা জানান, ভোরের আজান তার ঘুম ভাঙায় এবং মানসিক শক্তি জোগায়। ৯০ দশক থেকে দায়িত্বে থাকা মসজিদের ইমাম আক্তার বলেন, “বিশ্বে এমন নজির বিরল। মুসলমানরা এখানে নামাজ পড়ে চলে যান, কিন্তু দেখভাল করেন এক হিন্দু পরিবার। ইসলামে এমন কোনো নিষেধ নেই যে, অন্য ধর্মের মানুষ মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণে যুক্ত থাকতে পারবেন না।” ধর্ম নয়, মানবিকতা পার্থসারথি বোস বলেন, “মসজিদের দেখভাল করি, কিন্তু ইসলামের নিয়মে হস্তক্ষেপ করি না।” তার মতে, এটি ধর্মীয় নয়—মানবিক দায়িত্ব। রমজানের আত্মসংযম, আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা যেন নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে বারাসাতের ‘আমানতি মসজিদ’। যেখানে ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ হয়ে ওঠাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ঢাকা: ১৪৪৭ হিজরি সনের রমজান মাস উপলক্ষে সাদাকাতুল ফিতরার হার নির্ধারণ করেছে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতরা নির্ধারণ কমিটি। এ বছর জনপ্রতি ফিতরার সর্বনিম্ন হার ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ হার ২ হাজার ৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় সাদাকাতুল ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মাওলানা আবদুল মালেক। এতে দেশের বিশিষ্ট মুফতি ও আলেমরা অংশগ্রহণ করেন। সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে ফিতরার হার ঘোষণা করেন কমিটির সদস্য সচিব ড. মোহাম্মদ হারুনূর রশীদ। তিনি জানান, ফিতরার হার নির্ধারণের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় কার্যালয়সমূহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উন্নতমানের গম, আটা, যব, খেজুর, কিসমিস ও পনিরের খুচরা ও পাইকারি বাজার দর যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই এবারের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। 📌 কোন পণ্যে কত ফিতরা? গম বা আটা: অর্ধ ‘সা’ বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম। প্রতি কেজি ৬৫ টাকা হিসাবে মোট ১১০ টাকা। যব: এক ‘সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। প্রতি কেজি ১৮০ টাকা হিসাবে মোট ৫৯৫ টাকা। খেজুর: এক ‘সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা হিসাবে মোট ২,৪৭৫ টাকা। কিসমিস: এক ‘সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। প্রতি কেজি ৮০০ টাকা হিসাবে মোট ২,৬৪০ টাকা। পনির: এক ‘সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। প্রতি কেজি ৮৫০ টাকা হিসাবে মোট ২,৮০৫ টাকা। কমিটি জানায়, কেউ চাইলে উল্লেখিত খাদ্যদ্রব্য দিয়ে অথবা তার বাজারমূল্য অনুযায়ী নগদ অর্থে ফিতরা আদায় করতে পারবেন। তবে সামর্থ্য অনুযায়ী উচ্চ হার প্রদান করাই উত্তম। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বোর্ড অব গভর্নরসের গভর্নর মাওলানা মাহফুজুল হক, মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, মুহাদ্দিস ড. ওয়ালিয়ুর রহমান খান, মুফাসসির ড. মাওলানা মো. আবু সালেহ পাটোয়ারী, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল কাশেম মো. ফজলুল হক, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, পেশ ইমাম মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী এবং রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মহিউদ্দিন। রমজান মাসে রোজাদারদের পক্ষ থেকে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে ঈদের আনন্দ পৌঁছে দিতে সাদাকাতুল ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। প্রতি বছর বাজারদরের ভিত্তিতে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতরা নির্ধারণ কমিটি ফিতরার হার ঘোষণা করে থাকে।
শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার নাগেরপাড়া ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামে অবস্থিত ‘জ্বীন মসজিদ’খ্যাত তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে আজও জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে যেমন ধর্মীয় স্থাপনা, তেমনি রহস্যঘেরা ঐতিহাসিক নিদর্শন। নির্মাণ ইতিহাস ঘিরে রহস্য মসজিদটি ঠিক কবে এবং কে নির্মাণ করেছিলেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মসজিদ সংলগ্ন তালুকদার পরিবারের বংশ পরম্পরায় জানা যায়, এর বয়স প্রায় ৪০০ বছর। অন্য মত অনুযায়ী মসজিদটির বয়স প্রায় ৪৫০ বছর হতে পারে। ‘জ্বীন মসজিদ’ নামকরণের পেছনের লোককথা মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা ও মিথ। প্রচলিত আছে, স্থানীয় এক ব্যক্তি মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু করলেও কাজ শেষ হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর এক রাতের মধ্যেই জ্বীনেরা বাকি কাজ সম্পন্ন করে দেয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এখানে জ্বীনেরা নামাজ, জিকির-আসকার ও ইবাদত-বন্দেগী করতেন। এই বিশ্বাস থেকেই মসজিদটি ‘জ্বীন মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি মূলত ‘তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ’ হিসেবেই পরিচিত। স্থাপত্যশৈলী ও বর্তমান অবস্থা মাত্র ৪ শতাংশ জমির উপর নির্মিত চতুর্ভুজাকৃতির এ মসজিদটি কালের বিবর্তনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। মসজিদটির রয়েছে একটি প্রধান গম্বুজ এবং চারপাশে চারটি চিকন খুঁটির ওপর ছোট খিলানাকৃতির গম্বুজ। ভেতরের দেয়ালে মোগল স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়। মসজিদের চারদিকে পাকা মেঝে রয়েছে এবং মূল ভবনে চারটি প্রবেশপথ আছে। একসাথে প্রায় ৩০ জন মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এখানে জুমা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও ঈদের জামাত আদায় করে আসছেন। মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর। পুকুরের পাকা ঘাট এখনো অক্ষত রয়েছে, যা স্থানীয়দের মতে জ্বীনেরাই নির্মাণ করেছিল। সংস্কারের অভাবে ক্ষয় মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক সালাম তালুকদার জানান, “আমাদের পূর্বপুরুষদের মুখে শুনেছি, এটি এক রাতে জ্বীনেরা তৈরি করেছে। এই বিশ্বাস থেকেই সবাই একে জ্বীন মসজিদ বলে। তবে আমাদের কাছে এটি তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “৪০০ বছর পেরিয়ে গেলেও মসজিদটি সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অনেকে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেও পরে আর খোঁজ নেয় না। টেলিভিশন ও পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলেও বাস্তব কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।” মসজিদের ইমাম নূর ইসলাম বেপারী জানান, “আমি ১৭ বছর ধরে এখানে ইমামতি করছি। এটি ৪০০ বছরের পুরোনো মসজিদ। সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান, প্রাচীন এই স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কার করে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হোক।” সংরক্ষণের দাবি স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় মসজিদটিকে সরকারি তালিকাভুক্ত করে যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কার করা জরুরি। অন্যথায় অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যেতে পারে শতাব্দী প্রাচীন এই ঐতিহ্য। ঐতিহ্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরবেষ্টিত জনপদ দিরাই ও শাল্লা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্যও সমাদৃত। হাওর-বাওরের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ—যা ভাটি অঞ্চলের মুসলিম ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। অবস্থান ও পরিচিতি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের ভাটিপাড়া গ্রামে অবস্থিত। পিয়ান নদীর তীরে, প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ স্থানীয়ভাবে “ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি মসজিদ” নামে পরিচিত। অনেকের কাছে এটি ‘সাব বাড়ি’ বা ‘সাহেব বাড়ি’ নামেও পরিচিত। নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে মতভেদ স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমিদার ফতেহ মোহাম্মদ আলিফাত্তাহর উদ্যোগে ১৭ শতকের শেষ দিকে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তবে স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, ১৮৩০ সালের দিকে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এটি ভাটি অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ভাটিপাড়া জমিদারদের জমিদারিত্ব বর্তমান দিরাই, জামালগঞ্জ, শাল্লা ও তাহিরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। দিল্লির আদলে নির্মিত স্থাপত্য মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদের আদলে। চুন-সুরকির তৈরি এই স্থাপনাটির ওপর রয়েছে বিশাল তিনটি গম্বুজ এবং ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬টি মিনার। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে সাদা মার্বেল ও সিরামিক পাথরে ফুল, লতাপাতা ও প্রকৃতির নান্দনিক নকশা খোদাই করা হয়েছে। মসজিদের সামনের অংশে রয়েছে সাতটি প্রবেশদ্বার। বারান্দা, পিলার, গম্বুজ, ছাদ ও মেঝে—সবখানেই শৈল্পিক নির্মাণশৈলীর পরিচয় ফুটে উঠেছে। সামনে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর, যার স্বচ্ছ পানিতে ভেসে ওঠে মসজিদের প্রতিচ্ছবি। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এই পুকুরের পানিতেই অযু করেন। নির্মাণ কৌশল ও উপকরণ মসজিদ নির্মাণে কোনো ধরনের রড বা আধুনিক পাথর ব্যবহার করা হয়নি। কেবল ইট ও চুনাপাথরের আস্তরণ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। নির্মাণকাজের সময় নদীর তীরে তিনটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে ইট প্রস্তুত করে ব্যবহার করা হতো। স্থানীয়দের মতে, ভারত থেকে হাতির পিঠে করে পাথরের আস্তরণ আনা হয়েছিল। নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল। পরে সিমেন্ট আবিষ্কারের পর পুরোনো চুনসুরকির আস্তর তুলে নতুন আস্তর দেওয়া হয়। সে সময় কলকাতা থেকে জাহাজে করে সিমেন্ট আনা হয়েছিল বলে জানা যায়। ধর্মীয় ও নান্দনিক গুরুত্ব মসজিদটিতে প্রতিদিন শতাধিক মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। মুসল্লিদের মতে, ভাটি অঞ্চলে এটি একমাত্র প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন কারুকাজসমৃদ্ধ মসজিদ। এখানে নামাজ আদায় করলে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। সংরক্ষণের দাবি বিশিষ্ট আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এ ধরনের স্থাপত্য নিদর্শন বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের অংশ। জাতীয় সম্পদ হিসেবে এর সংরক্ষণ জরুরি। সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এসব ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারণ এগুলো আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওর ও পিয়ান নদীর তীরঘেঁষা ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ কেবল একটি উপাসনালয় নয়; এটি ভাটি অঞ্চলের মুসলিম ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও সামাজিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। সময়ের বিবর্তন সত্ত্বেও তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে—ভাটি বাংলার গৌরবের প্রতীক হয়ে।
মাহে রমজান রহমত, বরকত ও ক্ষমার মাস। এটি জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস, ধৈর্য ও সহমর্মিতার মাস এবং নেক আমলে প্রতিযোগিতার মাস। রমজান হলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম সময়। এ মাসে রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি। যে ব্যক্তি রমজানকে যথাযথভাবে কাজে লাগায়, সে সত্যিকার অর্থেই সফল। তাই আমাদের উচিত এই মহিমান্বিত মাসকে অবহেলা না করে ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে আলোকিত করা। 🌙 রোজার মূল উদ্দেশ্য: তাকওয়া অর্জন রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং আত্মসংযমের মাধ্যমে আল্লাহভীতি অর্জন করা। তাকওয়া মানে হলো নিজের ইচ্ছা-প্রবৃত্তির ওপর স্রষ্টার বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকা। একজন সচেতন মুসলমানের জন্য প্রয়োজন— নিজের ফরজ দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা হারাম বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীনের নির্দেশনা অনুসরণ করা ⚠️ রোজাদারের জন্য যেসব কাজ মাকরূহ ও নাজায়েজ রমজানে রোজা অবস্থায় কিছু কাজ রয়েছে যা সরাসরি গুনাহ, আবার কিছু কাজ রোজাকে মাকরূহ করে দেয়। নিচে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো— গুনাহ ও নাজায়েজ কাজ রোজাদারের জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য— মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া গীবত ও চুগলখুরী করা মিথ্যা কসম খাওয়া অশ্লীল কাজ ও অশালীন কথাবার্তা জুলুম করা ও শত্রুতা পোষণ করা বেগানা নারী-পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা সিনেমা দেখা বা মোবাইলে অশালীন ছবি দেখা এসব কাজ করলে রোজা ভঙ্গ না হলেও রোজা মাকরূহ হয়ে যায় এবং সওয়াব কমে যায়। অপ্রয়োজনে কিছু চিবানো বা চেখে দেখা রোজা অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে কিছু চিবানো বা স্বাদ গ্রহণ করা মাকরূহ। তবে পারিবারিক বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন—স্বামীর কঠোরতার আশঙ্কা) খাদ্য জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে চেখে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিলে অবকাশ রয়েছে। পবিত্রতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ততা পায়খানার রাস্তা অতিরিক্ত পানি দ্বারা ধৌত করা, যাতে ভিতরে পানি প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে—এটি মাকরূহ। ওজুর সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার নাকে অতিরিক্ত পানি টানা কুলি করার সময় গড়গড়া করা এসবের ফলে পানি কণ্ঠনালীতে চলে যেতে পারে, তাই রোজা অবস্থায় সতর্ক থাকা জরুরি। কামভাবসহ দাম্পত্য আচরণ রোজা অবস্থায় কামভাব নিয়ে স্ত্রীকে চুম্বন বা আলিঙ্গন করা মাকরূহ। তবে কামভাব না থাকলে তা মাকরূহ নয়। সুবহে সাদেকের পর গোসল রাতে সহবাসের পর সুবহে সাদেকের পূর্বে গোসল না করে পরে গোসল করলে রোজা নষ্ট হয় না এবং মাকরূহও নয়। তবে পূর্বেই গোসল সম্পন্ন করা উত্তম। দুর্বল মুসাফিরের রোজা যদি সফর অবস্থায় রোজা রাখলে অতিরিক্ত কষ্ট হয়, তবে রোজা রাখা তার জন্য মাকরূহ হতে পারে। চুল বা নখ কাটা রোজা অবস্থায় চুল বা নখ কাটলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। সফরে নিয়ত করে মুকিম হওয়া কোনো ব্যক্তি সফর অবস্থায় রোজার নিয়ত করে এবং সেদিনই মুকিম হয়ে গেলে, তার জন্য ওই দিনের রোজা ভাঙা জায়েজ নয়। চোখে সুরমা বা ঔষধ ব্যবহার চোখে সুরমা লাগানো বা ঔষধ প্রয়োগ করলে রোজা ভাঙে না এবং মাকরূহও হয় না। 🌟 রমজানকে সফলতার সোপান বানাই রমজান আমাদের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। এই মাসে ধৈর্য, সহমর্মিতা ও নেক আমলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারি। আসুন, রমজানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করি, গুনাহ থেকে দূরে থাকি এবং তাকওয়ার আলোয় জীবনকে আলোকিত করি। তাহলেই এই মহিমান্বিত মাস আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই সফলতার বার্তা বয়ে আনবে।
পবিত্র মাহে রমজানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইফতার। সারাদিন সংযম, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির পর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর নির্দেশে রোজা ভাঙাই হলো ইফতার। এটি কেবল খাবার গ্রহণের বিষয় নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং প্রিয়নবী (সা.)-এর সুন্নত। ইফতারের ফজিলত, সময় এবং আদব সম্পর্কে বহু হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। নিচে ইফতার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হাদিস তুলে ধরা হলো— ১. রোজাদারকে ইফতার করানোর ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ (তিরমিজি ৮০৭, বায়হাকি) ২. সামান্য খাবারেও পূর্ণ সওয়াব সামান্য খাবার দিয়েও ইফতার করালে সওয়াব পাওয়া যায়। দীর্ঘ এক হাদিসে এসেছে— عَنْ سَلْمَانَ الْفَارِسِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي آخِرِ يَوْمٍ مِنْ شَعْبَانَ، فَقَالَ «يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ مُبَارَكٌ، شَهْرٌ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، جَعَلَ اللَّهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ، وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ، وَشَهْرٌ يُزَادُ فِيهِ رِزْقُ الْمُؤْمِنِ، مَنْ فَطَّرَ فِيهِ صَائِمًا كَانَ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ، وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ، وَكَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْءٌ» قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَيْسَ كُلُّنَا يَجِدُ مَا يُفَطِّرُ الصَّائِمَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «يُعْطِي اللَّهُ هَذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا عَلَى تَمْرَةٍ، أَوْ شَرْبَةِ مَاءٍ، أَوْ مَذْقَةِ لَبَنٍ» সাহাবি সালমান ফারসি (রা.) বলেন, শাবান মাসের শেষ দিনে রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বললেন— ‘হে মানুষ! তোমাদের কাছে একটি মহান ও বরকতময় মাস উপস্থিত হয়েছে। এই মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন এবং রাতের নামাজ নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নেক কাজ করে, সে অন্য সময় একটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব পায়। আর যে ব্যক্তি একটি ফরজ আদায় করে, সে অন্য সময় সত্তরটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব পায়। এ মাস ধৈর্যের মাস এবং ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত। এটি সহমর্মিতার মাস এবং এ মাসে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়। যে ব্যক্তি এই মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তার গুনাহ মাফ করা হয়, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পায়, অথচ রোজাদারের সওয়াব কমানো হয় না। আমরা বললাম— হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের সবার পক্ষে তো ইফতার করানো সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন— ‘আল্লাহ এই সওয়াব সেই ব্যক্তিকেও দান করেন, যে একটি খেজুর, এক চুমুক পানি অথবা সামান্য দুধ দিয়েও রোজাদারকে ইফতার করায়।’ (ইবনে মাজাহ ১৬৪২, ইবনে খুযাইমা ১৮৮৭, বায়হাকি) ৩. দ্রুত ইফতার করার ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ ‘মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।’ (বুখারি ১৯৫৭, মুসলিম ১০৯৮) ৪. সময়মতো ইফতার আল্লাহর কাছে প্রিয় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّ أَحَبَّ عِبَادِي إِلَيَّ أَعْجَلُهُمْ فِطْرًا ‘আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই বান্দা, যে দ্রুত ইফতার করে।’ (তিরমিজি ৭০০) ৫. সূর্যাস্ত হলেই ইফতার রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْلُ مِنْ هَا هُنَا وَأَدْبَرَ النَّهَارُ مِنْ هَا هُنَا وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ ‘যখন পূর্ব দিক থেকে রাত আসে, পশ্চিম দিক থেকে দিন চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন রোজাদার ইফতার করবে।’ (বুখারি ১৯৫৪, মুসলিম ১১০০) ৬. খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِذَا أَفْطَرَ أَحَدُكُمْ فَلْيُفْطِرْ عَلَى تَمْرٍ فَإِنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَى مَاءٍ فَإِنَّهُ طَهُورٌ ‘তোমাদের কেউ ইফতার করলে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। তা না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে, কারণ পানি পবিত্র।’ (তিরমিজি ৬৯৪, আবু দাউদ ২৩৫৫) ৭. ইফতারের সময় রোজাদারের আনন্দ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে— একটি ইফতারের সময় এবং অন্যটি তার প্রভুর সাক্ষাতের সময়।’ (বুখারি ১৯০৪) ৮. ইফতারের সময় দোয়া কবুল রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ دَعْوَةً لَا تُرَدُّ ‘রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় এমন একটি দোয়া রয়েছে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।’ (ইবনে মাজাহ ১৭৫৩, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব) ৯. রোজাদারের দোয়া কবুল হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ لَا تُرَدُّ: دَعْوَةُ الصَّائِمِ وَدَعْوَةُ الْإِمَامِ الْعَادِلِ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না— রোজাদারের দোয়া, ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া।’ (ইবনে মাজাহ ১৭৫২) ১০. রোজাদারকে পানি পান করানোর ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে পানি পান করায়, আল্লাহ তাকে জান্নাতে এমন পানীয় পান করাবেন যার পর সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।’ (কানযুল উম্মাল ২৩৬৬০) ইফতারের দোয়া ইফতারের আগে বা পরে এ দোয়া পড়া মুস্তাহাব— اللَّهُمَّ إِنِّي لَكَ صُمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্য রোজা রেখেছি, আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনার ওপর ভরসা করেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়েই ইফতার করছি।’ রমজানে ইফতার শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক সুন্দর নিদর্শন। সময়মতো ইফতার করা এবং অন্যকে ইফতার করানো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আমাদের উচিত সুন্নত অনুযায়ী ইফতার করা, বেশি বেশি দোয়া করা এবং অসহায় ও রোজাদারদের ইফতার করিয়ে রমজানের বরকত লাভ করা।
আজ সোনা কিনলে কত কমে পাবেন ? নাকি রাজ্যে বাড়ল রেট ?
ইজরায়েলের রাস্তায় রয়্যাল এনফিল্ডের দাপট ! মোদি-নেতানিয়াহুর সামনে নজর কাড়ল 'গোয়ান ক্লাসিক ৩৫০'
মাসে ১০,০০০ টাকা দিয়ে পান ৫ কোটি, জানুন ম্যাজিক ফর্মুলা
মুক্তি পেলেন কেজরিওয়াল, অবশেষে ফিরলেন বাড়ি!
দাম বাড়ল সোনা ও রুপোর, কোথায় দাঁড়াল আজ?
স্যামসাংয়ের বড় চমক ! নতুন ফোন আসতেই এক ধাক্কায় ২৫,০০০ টাকা সস্তা হল Galaxy S25 Plus
রেনোর নতুন ডাস্টার, হতেই পারে আপনার স্বপ্নের ফ্যমিলি কার!
ওলা ইলেকট্রিকের স্টকে ভরাডুবি, ১৫৭ টাকা থেকে ২৫ টাকায় শেয়ার, ৫৭,০০০ কোটি টাকা লোকসান