পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি অবকাঠামো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু; পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার হুঁশিয়ারি তেহরানের ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভান্ডার এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো। তবে সামরিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার আলোচনা চললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত হামলার অনুমোদন দেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক ও তীব্র হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। এ সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে—দেশটির ওপর নতুন করে হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে আরও তীব্রভাবে। প্রয়োজনে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন সামরিক অভিযান কি ইরানকে আলোচনার টেবিলে ছাড় দিতে বাধ্য করবে, নাকি তা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে? হামলার প্রস্তুতি, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর একাধিকবার ইরানে বড় ধরনের হামলার প্রস্তাব সামনে এলেও ট্রাম্প সেগুলো অনুমোদন করেননি। অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাহিনী সম্ভাব্য অভিযানের জন্য প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হামলাটি স্থগিত করা হয়। নভেম্বরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার হওয়ার পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সম্ভাব্য প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, হাজারো মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিশেষ বাহিনীর উপস্থিতি। তবে সামরিক শক্তি মোতায়েনের অর্থ এই নয় যে হামলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। রাজনৈতিক অনুমোদন, সম্ভাব্য পাল্টা আঘাত, সামরিক সরঞ্জামের মজুত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব—সবকিছু বিবেচনা করেই ওয়াশিংটনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তীব্র হামলায় কি নতি স্বীকার করবে তেহরান? কিছু মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীর ধারণা, টানা তিন দিন ইরানে ব্যাপক পরিসরে হামলা চালিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করার কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আগের সামরিক অভিযান প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরও ইরানের সরকার টিকে রয়েছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের চাপও তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্টো সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নড়বড়ে হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, সামরিকভাবে বড় আঘাত হানার সক্ষমতা থাকলেও সেই আঘাত থেকে রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করা আলাদা বিষয়। ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেই দেশটির নেতৃত্ব আলোচনায় নতি স্বীকার করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পারমাণবিক স্থাপনা ও ‘মাদার অব অল বম্বস’ সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। এর মধ্যে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত ‘পিক্যাক্স’ নামে উল্লেখ করা একটি কেন্দ্রের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প সেখানে ২২ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভূমির ওপর বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য তৈরি এ ধরনের বোমা গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এখানে সামরিক পরিকল্পনার একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। কোনো স্থাপনায় আঘাত হানা এবং তার ভেতরে থাকা সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা এক বিষয় নয়। ভূগর্ভস্থ স্থাপনার গভীরতা, সুরক্ষা, অবকাঠামোর ধরন এবং বিকল্প স্থাপনা ব্যবহারের সক্ষমতা অভিযানের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বড় বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা আলোচনায় থাকলেও তা দিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করা সম্ভব হবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব ও মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্ভাব্য হামলার সময় নির্ধারণে সামরিক বিবেচনার পাশাপাশি রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন যুদ্ধে জড়াতে অনাগ্রহী ট্রাম্প অক্টোবরের একটি পরিকল্পিত অভিযান স্থগিত করেছিলেন। নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। প্রতিবেদনে ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নেতানিয়াহু পরাজিত হলে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সম্ভাব্য ইরান-সংকটকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে জরুরি ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু—এমন ধারণাও দিয়েছেন কিছু বিশ্লেষক। ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাজাল মুয়ালেমের মতে, নেতানিয়াহু পরিস্থিতিকে জরুরি সরকার গঠনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সন্দেহ ও অবিশ্বাসও বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে। জ্বালানির দামই কি ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরির হাতিয়ার? ইরান-সংঘাতের একটি বড় দুর্বলতা হলো, এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে এবং জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তেহরানের বিশ্লেষক পেইমান সালেহির বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে তেল ও জ্বালানির দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর উপায় হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। ইরানের কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নতুন হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ, জ্বালানি অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলও হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ধরনের হুমকি বাস্তবায়িত হলে সংকট শুধু তেলবাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল সেবা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিবেদনে হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরব থেকে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন—এমন মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনার সঙ্গে সম্ভাব্য ইরান-অভিযানের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের মহড়া: উসকানি, নাকি প্রতিরোধের বার্তা? ইরানে নতুন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসার একটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বুধবার, ২১ অক্টোবর, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর বরাত দিয়ে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানায়, গত সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী এ অভিযান চালায়। কয়েকটি যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও এতে অংশ নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানগুলো সিরিয়া ও ইরাকের আকাশসীমা পেরিয়ে ইরানের সীমান্তের কাছে পৌঁছালেও ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ না করে ইসরায়েলে ফিরে যায়। মার্কিন সূত্রের বরাতে চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইসরায়েল হয়তো আশা করেছিল, সীমান্তের কাছে যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি দেখে ইরানি বাহিনী গুলি চালাবে। তেমন ঘটনা ঘটলে সেটিকে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারত। তবে এটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি দাবি; ইসরায়েলের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে নেই। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অভিযানটিকে ইরানকে প্রতিরোধের বার্তা দেওয়ার সামরিক মহড়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অক্টোবরের শুরুতে নেতানিয়াহু ইরানে কয়েক দিনব্যাপী বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের আপত্তির কারণে ১০ অক্টোবরের পরিকল্পিত হামলা বাতিল করা হয় বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, সামরিক প্রস্তুতি, প্রতিরোধের বার্তা এবং বাস্তব হামলার সিদ্ধান্ত—তিনটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না। তবে সীমান্তের কাছে সামরিক তৎপরতা ও পাল্টাপাল্টি হুমকি ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক অচলাবস্থা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আলোচনার অগ্রাধিকার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান চায়, প্রথমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত একটি সমঝোতা হোক। এরপর পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চায়। এই মতপার্থক্য কূটনৈতিক সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পক্ষ যেখানে নৌ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্য পক্ষ সেখানে পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার প্রশ্নকে সামনে রাখছে। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউলের মতে, মধ্যপ্রাচ্য যখন আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, তখন নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে পরিস্থিতির কী উন্নতি হবে, তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু দিতে পারেননি। ইরানি আলোচক দলের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদিও তিন দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার ধারণাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর হুঁশিয়ারি, ইরানের পাল্টা হামলা হবে আরও তীব্র, সৃজনশীল ও ভিন্ন ধরনের। দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংকট? যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত রাজনৈতিক ফল অর্জনের প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু আগের সংঘাতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যতটা সহজ, তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা ততটা সহজ নয়। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা বা সামরিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত হানা হলেও তেহরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল কতটা নিরাপদ থাকবে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর নেই। আরেকটি ঝুঁকি হলো, সীমান্তে সামরিক তৎপরতা বা কোনো বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ থেকে বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেমন নতুন সামরিক ব্যয়ের মুখে পড়বে, তেমনি ইরান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সামরিক হামলা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সেই চাপকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপান্তর করা আলাদা চ্যালেঞ্জ। কূটনৈতিক আলোচনার বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি না হলে নতুন অভিযান আগের সংকটেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ওয়াশিংটন, তেল আবিব ও তেহরানের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে সামরিক প্রস্তুতি ও কঠোর অবস্থানের বার্তা, অন্যদিকে জ্বালানির বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি—সবকিছুই ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সত্যিই নতুন হামলা চালাবে কি না, তা নয় শুধু; বরং হামলা চালালে তার শেষ কোথায় এবং সেই সংঘাত থামানোর কার্যকর কূটনৈতিক পথ আদৌ প্রস্তুত আছে কি না।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের উত্তরে তিনটি ড্রোন প্রতিহত করে ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হলেও ড্রোনগুলো কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, কারা সেগুলো পাঠিয়েছে কিংবা সেগুলোর লক্ষ্যবস্তু কী ছিল—তা প্রকাশ করা হয়নি। আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে এই ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনায় কোনো হতাহত বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি এ ঘটনার খবর প্রকাশ করেছে। নিরাপত্তা শঙ্কায় প্রাসাদ বদলাচ্ছেন সৌদি যুবরাজ? ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুবরাজকে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে স্থানান্তর করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব প্রাসাদে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি বাংকারের সুবিধাও রয়েছে। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুবরাজের নিরাপত্তায় তাঁর পছন্দের একটি বিশেষ দল নিয়োজিত রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রাসাদ পরিবর্তনের প্রতিটি ঘটনা, এর সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে এসব স্থানান্তরের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জনসমক্ষে অনুপস্থিতি ঘিরে আলোচনা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ৪১ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন সালমানকে সর্বশেষ ৬ অক্টোবর জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। ওই দিন তিনি সৌদি আরবের একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে রক্ত দেন। এরপর থেকে তাঁকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে জনসমক্ষে অনুপস্থিতি একাই নিরাপত্তা শঙ্কা কিংবা সম্ভাব্য হামলার প্রমাণ নয়। যুবরাজের অবস্থান পরিবর্তন ও তাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের স্বাধীন যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। হুতি হামলা ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন নয়। এই সংঘাতে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সৌদি আরবের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। প্রদত্ত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, রিয়াদে ধারাবাহিক হামলার মুখে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে বিমানবন্দর বন্ধের কারণ, সময়সীমা এবং ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। রিয়াদের উত্তরে তিনটি ড্রোন ধ্বংসের দাবি তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ঘটনার বিবরণ নয়; বরং আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের আকাশসীমা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিবৃতিতে ড্রোনের উৎস, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু কিংবা হামলার পেছনে কারা ছিল—এসব বিষয়ে তথ্য না থাকায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ড্রোনগুলো কোন এলাকা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল? এগুলোর লক্ষ্যবস্তু কি রিয়াদের কোনো সামরিক বা বেসামরিক স্থাপনা ছিল? ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না? যুবরাজের প্রাসাদ পরিবর্তনের সঙ্গে সাম্প্রতিক হামলার কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বিবৃতি এবং স্বাধীন সূত্রের যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, রিয়াদের উত্তরে তিনটি ড্রোন ধ্বংসের দাবি এবং যুবরাজের নিরাপত্তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আলোচনায় এনেছে। তবে ড্রোন হামলার উৎস, যুবরাজের অবস্থান পরিবর্তনের কারণ এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকার তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করা সমীচীন নয়।
অক্টোবর ১৪, ২০২৬
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় সৌদিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে গভীর শোক ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। বিবৃতিতে বলা হয়, বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী এই হামলায় মোট ১২ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক এবং দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন। এছাড়া বাকি নিহতদের মধ্যে একজন করে আমেরিকান, মিসরীয়, জর্ডানীয়, সিরীয়, ফিলিস্তিনি ও সুদানি নাগরিক রয়েছেন। তবে নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় বা বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ। উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে মারাত্মক এই হামলার দায় স্বীকার করেছেন হুথিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। ইয়েমেনে সামরিক অভিযান ও অবকাঠামো ধ্বংসের জবাবেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি তাঁর। এদিকে বিমানবন্দরটিতে বর্তমানে উদ্ধার অভিযান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও স্থানীয় প্রশাসন নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উদ্যোগ নিচ্ছে।
অক্টোবর ১১, ২০২৬
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবার কাছে এক রকম নয়। কারও কাছে ভ্রমণ মানে দর্শনীয় স্থান দেখা, কারও কাছে নতুন খাবারের স্বাদ নেওয়া। আবার কারও কাছে অপরিচিত মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা। সোমালি-আমেরিকান ট্রাভেল ভ্লগার মারিয়ান আবদির ভ্রমণকনটেন্টে এই তিনটি বিষয়ই উঠে আসে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একা ঘুরে বেড়ানো এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর সম্প্রতি এসেছেন বাংলাদেশে। ঢাকার যানজট, ফুটপাতের খাবার এবং কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের আন্তরিকতা নিয়ে তাঁর প্রকাশিত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে মারিয়ান আবদির পরিচিতি শুধু ভ্রমণকাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালে আফগানিস্তান সফরের সময় তালেবান সদস্যদের সঙ্গে তাঁর হাসিমুখে তোলা ছবি ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। সেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কোনো দেশের মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আতিথেয়তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সময় সেই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত? বাংলাদেশে তাঁর সাম্প্রতিক ভ্রমণ তাই শুধু একজন বিদেশি পর্যটকের ঢাকার অভিজ্ঞতা নয়; একই সঙ্গে এটি ভ্রমণকনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং মানুষের জীবনযাপনের বাস্তবতা উপস্থাপনের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ২০১৯ সালে শুরু, ভ্রমণই পরিচিতির ভিত্তি মারিয়ান আবদি ২০১৯ সাল থেকে ইনস্টাগ্রামে ভ্রমণবিষয়ক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন। পরে ইউটিউবেও তাঁর ভ্রমণভিত্তিক কনটেন্ট জনপ্রিয়তা পায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, স্থানীয় খাবার, মানুষের জীবনযাপন এবং ব্যক্তিগত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তাঁর কনটেন্টের প্রধান বিষয়। একজন কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নারী হিসেবে বিভিন্ন দেশে একা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা তাঁর কনটেন্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অপরিচিত পরিবেশে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় খাবার চেখে দেখা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য ধারণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অনুসারীদের সামনে তুলে ধরেন। তবে ভ্রমণকনটেন্টের জনপ্রিয়তা শুধু নতুন জায়গা দেখানোর ওপর নির্ভর করে না। কোনো স্থানের মানুষকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, স্থানীয় বাস্তবতার কোন দিকগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে এবং কোন বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যাচ্ছে—এসব প্রশ্নও এ ধরনের কনটেন্টের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার ফুটপাতে হালিম, যানজটে নতুন অভিজ্ঞতা সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখছেন মারিয়ান আবদি। তাঁর ভ্রমণকনটেন্টে উঠে এসেছে ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাতের খাবার এবং নগরজীবনের পরিচিত নানা দৃশ্য। রাস্তার পাশে বসে হালিম খাওয়ার একটি ভিডিও প্রকাশ করে তিনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই খাবারের প্রশংসা করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, মাংস, ডাল, গম ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করা হালিমের স্বাদ ছিল অসাধারণ। একজন বিদেশি ভ্রমণকারীর কাছে স্থানীয় খাবার শুধু স্বাদের অভিজ্ঞতা নয়; সেটি কোনো দেশের খাদ্যসংস্কৃতি সম্পর্কে জানারও একটি উপায়। বাংলাদেশের হালিম নিয়ে মারিয়ানের উচ্ছ্বাস সেই পরিচিত অভিজ্ঞতাকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে। ঢাকার যানজট নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। রিকশা, টুকটুক, গাড়ি, পথচারী আর চারদিকের হর্ন—সব মিলিয়ে রাজধানীর সড়ককে তাঁর কাছে মনে হয়েছে একেবারেই ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। যানজটে আটকে থাকার ভিডিওর সঙ্গে তিনি রসিকতা করে লেখেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটি টাইলেনল খেতে হবে। তাঁর এই মন্তব্যে ঢাকার যানজটের প্রতি বিস্ময় ও বিরক্তির প্রকাশ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভ্রমণকারীর নিজস্ব রসবোধ। স্থানীয় মানুষের কাছে প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্য বিদেশি পর্যটকের চোখে কীভাবে নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, তাঁর ভিডিওতে সেটিও স্পষ্ট। কড়াইল বস্তিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা জানালেন ঢাকা ভ্রমণের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে রাজধানীর কড়াইল বস্তি। সেখানে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন মারিয়ান। বস্তির ভেতরের কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করে তিনি স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তার প্রশংসা করেন। একটি ভিডিওর সঙ্গে তিনি লেখেন, ঢাকার কড়াইল বস্তি ঘুরে দেখার সময় শিশুরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পেরে ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিল। কঠিন জীবনযাপন ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা তাঁকে হাসিমুখে স্বাগত জানিয়েছে। জীবনের এই সুন্দর মুহূর্ত তিনি কখনো ভুলবেন না বলেও উল্লেখ করেন। অন্য একটি ভিডিওর বর্ণনায় মারিয়ান জানান, কড়াইলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একটি পরিবার তাঁকে নিজেদের ঘরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কঠিন জীবনযাপন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সেখানকার মানুষের আন্তরিকতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। পরিবারের আতিথেয়তাকেও তিনি অসাধারণ বলে বর্ণনা করেন। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগের একটি দিক সামনে এসেছে। নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে সাধারণ দর্শকদের আগ্রহ তৈরির ক্ষেত্রেও এমন ভিডিও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো বস্তির মানুষের হাসিমুখ, অতিথিপরায়ণতা কিংবা একজন বিদেশি পর্যটকের প্রতি উচ্ছ্বাসই তাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার পূর্ণ চিত্র নয়। আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের মতো বিষয়গুলোও বস্তিবাসীর বাস্তবতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা মানুষের আন্তরিকতা তুলে ধরতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার পূর্ণাঙ্গ চিত্র দিতে হলে প্রয়োজন আলাদা অনুসন্ধান ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। আফগানিস্তান সফর: স্বপ্নপূরণ থেকে বিতর্ক মারিয়ান আবদি ২০২৪ সালে আফগানিস্তান সফর করে নতুন করে আলোচনায় আসেন। কাবুল, বামিয়ানসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সেখানকার সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপন নিয়ে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। নিজের কাছে এই সফরকে বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেন। একটি পোস্টে আফগানিস্তান ভ্রমণকে ‘স্বপ্নপূরণ’ বলেও বর্ণনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সফরের কিছু ছবি প্রকাশের পরই শুরু হয় সমালোচনা। সশস্ত্র তালেবান সদস্যদের সঙ্গে তাঁর হাসিমুখে তোলা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকে তাঁর ভ্রমণকনটেন্টের উপস্থাপনাপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আফগান নারী অধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, তালেবান সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক ও ইতিবাচক মুহূর্ত তুলে ধরার ফলে দেশটির শাসনব্যবস্থার কঠোর বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিয়ে তালেবান সরকারের নীতির প্রেক্ষাপটে ছবিগুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। নারী অধিকারকর্মী নিলুফার নাঈমিও মারিয়ানের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সমালোচনা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিতর্কটির মূল জায়গা ছিল না কেবল একজন ভ্রমণকারীর ছবি তোলার অধিকার। বরং প্রশ্ন উঠেছিল, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কোনো দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সময় ব্যক্তিগত আতিথেয়তা ও মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতের মুহূর্তগুলো কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। মারিয়ানের জবাব: ছবি তোলা মানেই সমর্থন নয় সমালোচনার জবাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন মারিয়ান আবদি। তাঁর দাবি, তালেবান সদস্যদের সঙ্গে ছবি তোলার অর্থ তাঁদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা নয়। তিনি যা দেখেছেন এবং তাঁর সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হয়েছে, সেটিই নিজের কনটেন্টে তুলে ধরেছেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, তিনি নারীদের অধিকার ও শিক্ষার পক্ষে। তালেবান সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় আফগান মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর পড়াশোনা করতে না পারার বিষয়টিও জানতে চেয়েছিলেন বলে তাঁর বক্তব্য। তাঁর এই ব্যাখ্যা বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। কোনো ভ্রমণকারী একটি দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তাঁদের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারেন এবং সেই অভিজ্ঞতা প্রকাশও করতে পারেন। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক সমর্থনের সমতুল্য ধরে নেওয়া সব সময় যথাযথ নয়। একইভাবে, একজন পর্যটক নিজের সফরে যে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, সেটিকে একটি দেশের সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্বকারী চিত্র হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। ভ্রমণকনটেন্টে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বনাম বৃহত্তর বাস্তবতা মারিয়ান আবদির আফগানিস্তান সফর ঘিরে বিতর্ক এবং বাংলাদেশে তাঁর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা পাশাপাশি রাখলে ভ্রমণকনটেন্টের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। ক্যামেরায় ধারণ করা মুহূর্তগুলো বাস্তব হতে পারে, কিন্তু সেগুলো পুরো বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে না। কড়াইল বস্তিতে শিশুদের উচ্ছ্বাস, একটি পরিবারের আতিথেয়তা কিংবা ফুটপাতের খাবারের স্বাদ—এসবই ঢাকার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সত্যিকারের অংশ হতে পারে। একইভাবে, আফগানিস্তানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা স্থানীয় সংস্কৃতির অভিজ্ঞতাও একজন পর্যটকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আফগানিস্তানের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে নারী অধিকার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোও প্রাসঙ্গিক। একটি ইতিবাচক ছবি বা ভিডিও দিয়ে এসব বাস্তবতার মূল্যায়ন করা যায় না; আবার কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তোলার ঘটনাকে একাই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবেও দেখা উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণকারীরা প্রায়ই অল্প সময়ের ভিডিও, ছবি ও সংক্ষিপ্ত ক্যাপশনের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ফলে একটি জটিল সমাজের নানা দিক সংক্ষিপ্ত কনটেন্টে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা কঠিন। দর্শকেরও তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যাচাই করা তথ্য এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। মারিয়ান আবদির বাংলাদেশ সফর স্থানীয় খাবার, নগরজীবন এবং মানুষের আন্তরিকতার পরিচিত দৃশ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরছে। আর তাঁর আফগানিস্তান সফর মনে করিয়ে দেয়, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যতই ব্যক্তিগত হোক, কোনো দেশের বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভ্রমণ মানুষকে নতুন সংস্কৃতি ও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যায়। কিন্তু কোনো দেশকে বোঝার জন্য শুধু সুন্দর মুহূর্তের ছবি যথেষ্ট নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হয়। মারিয়ান আবদির ভ্রমণকে ঘিরে আলোচনার তাৎপর্য সেখানেই।
মামুনুর রশীদ নোমানী | বরিশাল অফিস: বরিশাল নগরীকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীর সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পরিষ্কার, সুপেয় পানির সংকট নিরসন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং তরুণদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত বরিশালকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নিতে তাঁর এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাধারন মানুষ, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাঁদের মতে, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি এসেছে। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। সে হিসাবে অক্টোবরের মাঝামাঝি তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কাল সাত মাসের কাছাকাছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীর উন্নয়ন উদ্যোগ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েছেন। দখলমুক্ত ফুটপাত ও সড়ক: স্বস্তি ফেরানোর উদ্যোগ: বরিশাল নগরীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও ফুটপাত দখল, যানজট এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করছে সিটি করপোরেশন। হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধ স্থাপনা অপসারণের কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানের লক্ষ্য শুধু ফুটপাত খালি করা নয়; পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, যানবাহনের গতি স্বাভাবিক রাখা এবং নগরীর বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ: বরিশালের নাগরিক দুর্ভোগের অন্যতম কারণ জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত না হওয়া, ড্রেনের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং খাল ও জলাশয়ের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তি তৈরি হয়। এই সমস্যা মোকাবিলায় নগরীর খাল এবং গুচ্ছগ্রাম এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খাল, জলাশয় ও ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। প্রশাসক শিরিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নগরীর ২২টি প্রাকৃতিক খাল সংস্কার ও খনন, সীমানা নির্ধারণ এবং খালের দুই পাড় সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে। সুপেয় পানির সংকট নিরসন'র উদ্যোগ নগরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসন প্রশাসক শিরিনের উন্নয়ন পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে প্রায় আট কোটি টাকা বরাদ্দে একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট মেরামত ও সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।পানি শোধনাগারটি চালু করা হলে নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে। কীর্তনখোলা নদীর তীরের সড়ক ও নগর অবকাঠামো বরিশালের যোগাযোগব্যবস্থা ও নগর সৌন্দর্য বাড়াতে কীর্তনখোলা নদীর তীরসংলগ্ন অসম্পূর্ণ সড়কের কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন সড়ক নির্মাণ, বিদ্যমান রাস্তা প্রশস্ত করা এবং বিভিন্ন সংযোগ সড়কের উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সহজ হবে। এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। নগর উন্নয়নের সুফল টেকসই করতে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সড়ক, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনপরিসরের উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে করে যাচ্ছেন শিরিন। কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন: নগর উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার উদ্যোগের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসক শিরিনের উদ্যোগের মধ্যে হকারদের পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত স্টল নির্মাণ, নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ এবং নাগরিক চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ ও পরিকল্পিত ব্যবসার স্থান তৈরি করা গেলে তা নগরীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হবে। তরুণদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড: নগরীর তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে ‘বিসিসি প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউসেপ স্কুল মাঠ পরিষ্কার করে শিশুদের খেলাধুলার উপযোগী করা হয়েছে। খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো তরুণদের সুস্থ বিনোদন, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং শারীরিক সক্ষমতা বিকাশে ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে নগরীর যেসব এলাকায় শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, সেখানে বিদ্যমান মাঠ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সম্মান: প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে নতুন বার্তা: প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর মধ্য দিয়ে নগর পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে যুক্ত কর্মীদের অবদানকে সম্মান জানানোর একটি প্রতীকী বার্তা দেওয়া হয়েছে। নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মীদের ওপর। তাঁদের কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, নিয়মিত বেতন-ভাতা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে কাজ করে যাচ্ছেন প্রশাসক শিরিন। তাই সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি কর্মীদের বাস্তব কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন তিনি। প্রশাসক শিরিনের রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয়: অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । বরিশালে জন্ম নেওয়া শিরিনের বাবা নাসির আহমেদ এবং মা জাহানারা বেগম। তিনি বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ব্রজমোহন কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং বরিশাল ল' কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন আইনজীবী। পাশাপাশি বরিশাল সিটি কলেজে প্রায় ১০ বছর অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন । ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত শিরিন ১৯৮৭ সালে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক এবং ১৯৯০ সালে সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পান। ১৯৯৬ সালে বরিশাল জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হন এবং ২০১১ সালে বিএনপির বরিশাল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর সংসদ সদস্যপদের মেয়াদ ছিল ১ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন । বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে শিরিন হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মতে, তাঁর নেতৃত্বে বরিশালে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য আরও জোরদার হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সমর্থন ও সাংগঠনিক অবস্থানের বাইরে নগর প্রশাসক হিসেবে তাঁর সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি নাগরিক সেবার মান, উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। আধুনিক নগরীর পরিকল্পনা: সামনে পাঁচটি বড় লক্ষ্য প্রশাসক শিরিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বরিশালকে পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও নাগরিকবান্ধব নগরীতে রূপান্তরে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন তিনি।। এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নগরীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ১. ২২টি খালের সংস্কার ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান: নগরীর প্রাকৃতিক খালগুলো চিহ্নিত করা, সীমানা নির্ধারণ, খনন এবং দুই পাড় সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়বে। ২. যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কব্যবস্থার আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কীর্তনখোলা নদীর তীরসংলগ্ন সড়কসহ সংযোগ সড়কগুলোর কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য যানবাহন চলাচল, পথচারী নিরাপত্তা ও পার্কিং ব্যবস্থাকেও পরিকল্পনার আওতায় আসবে। ৩. শতভাগ নিরাপদ পানি ও উন্নত ড্রেনেজ প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিশোধিত পানি সরবরাহ এবং নতুন ও বর্ধিত এলাকাগুলোতে উন্নত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪. আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব পার্ক কীর্তনখোলা নদী ও নগরীর পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্য শোধনব্যবস্থা আধুনিকায়ন, ময়লা ফেলার স্থান উন্নত করা এবং নদীর তীর ঘেঁষে পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র ও পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হবে। ৫. ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও জবাবদিহি ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিকদের ভোগান্তি কমবে। বরিশাল নগরীর উন্নয়নে প্রশাসক শিরিনের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে নাগরিক সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত দখলমুক্ত করা, খাল ও ড্রেন পরিষ্কার, সুপেয় পানির সংকট নিরসন এবং সড়ক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পুরন হবে। বরিশালকে আধুনিক নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসক শিরিনের সামনে তাই একদিকে রয়েছে চলমান উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাগরিক প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ।
বরিশাল অফিস : সরকারি চাকরি অনেকেই করেন। কিন্তু দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম। বরিশালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ সেই ব্যতিক্রমী মানুষদের একজন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অসহায়, দুস্থ ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আসছেন। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বরিশাল-এর অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে সাজ্জাদ পারভেজকে। তার এই পদায়নের খবর প্রকাশের পর সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন সামাজিক মহলে আনন্দ ও সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে তিনি সমাজসেবা অঙ্গনে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বরিশাল বিভাগের শ্রেষ্ঠ সহকারী পরিচালক হিসেবে সম্মাননাও অর্জন করেছেন। সরকারি দায়িত্বের বাইরেও মানবিক উদ্যোগ সাজ্জাদ পারভেজের সহকর্মীরা জানান, সমাজসেবা অফিসে সহযোগিতা চাইতে এসে তার কাছ থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে গেছেন—এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সরকারি নীতিমালার কারণে কোনো ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা দেওয়া সম্ভব না হলে, অনেক সময় তিনি নিজের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়েও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বরিশালের বিভিন্ন হতদরিদ্র পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সহায়তায় নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সহযোগিতা হয়েছে নীরবে, প্রচারের বাইরে। সমাজসেবাকে দেখেন মানবিক দায়িত্ব হিসেবে ১৯৯৭ সালে বরিশাল সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সাজ্জাদ পারভেজ। এরপর দীর্ঘ সময় বরিশাল জেলা সমাজসেবা অফিসের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুনামের সঙ্গে। সহকর্মীদের মতে, সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। সাংবাদিকদের প্রতিও তিনি সহযোগিতাপরায়ণ ও ইতিবাচক মনোভাবের জন্য পরিচিত। বন্ধুদের সঙ্গে মানবিক উদ্যোগ সরকারি সহায়তার বাইরে ব্যক্তিগতভাবেও সামাজিক উদ্যোগ পরিচালনা করে আসছেন সাজ্জাদ পারভেজ। তিনি এসএসসি ১৯৮৪ ব্যাচের বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন '৮৪ ইভেন্ট' নামে একটি সামাজিক উদ্যোগ। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসহায়, অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা প্রদান করা হয়। বন্ধুদের ভাষ্য, যেখানেই কোনো অসহায় মানুষের খবর পান, সেখানেই সহযোগিতার চেষ্টা করেন সাজ্জাদ পারভেজ। নতুন দায়িত্ব নিয়ে প্রত্যাশা সমাজসেবা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বরিশালের অধ্যক্ষ হিসেবে তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণকে সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখছেন।তাদের প্রত্যাশা, তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে এবং সমাজসেবা খাতের মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। একটি ছোট সহায়তা, বড় মানবিকতা সাজ্জাদ পারভেজের মানবিকতার মতোই সমাজে আরও অনেক নীরব মানবিক গল্প রয়েছে। এমনই একটি ঘটনার কথা জানালেন তার এক পরিচিত ব্যক্তি। প্রতিদিন ভোরে একটি পত্রিকা বাসায় পৌঁছে দিতে আসতেন এক সংবাদপত্র পরিবেশক। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি জানান, পুরোনো মোটরসাইকেল চালাতে প্রতিদিন অতিরিক্ত খরচ ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাই তিনি একটি নতুন সাইকেল কিনতে চান। নিজের সঞ্চয় ছিল ৩ হাজার টাকা, কিন্তু আরও ৬ হাজার টাকার অভাবে তা সম্ভব হচ্ছিল না। স্ত্রী অনার্সে অধ্যয়নরত এবং দুই ছেলে স্কুলে পড়ায় সংসারের ব্যয় সামলে অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। তার প্রয়োজন বিবেচনায় একটি দূরন্ত সাইকেল কিনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সহায়তাটি পাওয়ার পর তিনি জানান, নতুন সাইকেল তার কর্মজীবনকে অনেক সহজ করে দেবে। মানবিকতার বার্তা সাজ্জাদ পারভেজের বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা মনে করেন, সমাজে যদি আরও বেশি মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে সামাজিক বৈষম্য অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। তাদের ভাষায়, মানবিকতা কেবল একটি শব্দ নয়—এটি দায়িত্ববোধের একটি বাস্তব প্রয়োগ। আর সেই প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হয়ে উঠেছেন সমাজসেবা কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর বাজার এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ ড্রাগন ফলের পাইকারি বিপণনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই বাজারে চলে জমজমাট বেচাকেনা। স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত ড্রাগন ফলের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকার চাষিরাও এখানে নিয়ে আসেন তাদের ফল। একসময় যেখানে ড্রাগন ফল বিক্রির জন্য কৃষকদের দূরের বাজারে যেতে হতো, সেখানে এখন নিজ এলাকাতেই তৈরি হয়েছে বড় পাইকারি বাজার। ফলে কমেছে পরিবহন খরচ, বেড়েছে বিক্রির সুযোগ এবং কৃষকরাও পাচ্ছেন তুলনামূলক ভালো দাম। সরেজমিনে গৌরীনাথপুর বাজারে দেখা যায়, সারি সারি আড়তে সাজানো রয়েছে লাল, গোলাপি ও হলুদ জাতের ড্রাগন ফল। ভোরের আলো ফুটতেই ভ্যান, পিকআপ ও ট্রাকে করে কৃষকরা ফল নিয়ে আসতে শুরু করেন। এরপর শুরু হয় ফল বাছাই, ওজন, প্যাকেটজাতকরণ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি। শতাধিক আড়তে কোটি টাকার বাণিজ্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গৌরীনাথপুর বাজারে বর্তমানে প্রায় ১০০টি আড়তে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি ড্রাগন ফল কেনাবেচা হচ্ছে। মৌসুমের সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি এই বাজারে এসে ফল কিনে নিয়ে যান। এই বাজার থেকে ড্রাগন ফল সরবরাহ করা হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফলের আকার, রং ও মান অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি কেজি ড্রাগন ফল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত। বাজার তৈরি হওয়ায় লাভবান কৃষক স্থানীয় চাষি আব্দুল হক জানান, আগে ড্রাগন ফল বিক্রির জন্য দূরের বাজারে যেতে হতো। এতে সময় ও পরিবহন খরচ দুটোই বাড়ত। তিনি বলেন, “এখন গৌরীনাথপুরেই বড় বাজার হওয়ায় খরচ কমেছে। একই সঙ্গে উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্যও পাচ্ছি।” আরেক কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, ড্রাগন চাষে তুলনামূলক কম খরচে ভালো লাভ পাওয়া যায়। বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি থাকায় প্রতিবছরই তিনি বাগানের পরিধি বাড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, “ড্রাগন চাষে ঝুঁকি কম এবং বাজারে চাহিদা ভালো। তাই নতুন করে জমিতে চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি।” কৃষক থেকে ভোক্তা—একটি নতুন সরবরাহ চেইন গৌরীনাথপুর বাজারের আড়তদার সাইদুর রহমান বলেন, মৌসুমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ড্রাগন ফল বাজারে আসে। দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এখান থেকে সরাসরি ফল সংগ্রহ করেন। তার ভাষ্য, “কৃষক ভালো দাম পাচ্ছেন, আবার ব্যবসায়ীরাও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল সরবরাহ করতে পারছেন। ফলে পুরো বাজার ব্যবস্থার পরিধি বাড়ছে।” পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম জানান, গৌরীনাথপুরের ড্রাগন ফলের মান ভালো হওয়ায় দেশের বাজারে এর চাহিদা বাড়ছে। তিনি বলেন, “প্রতিদিন কয়েকটি ট্রাক ভর্তি ড্রাগন ফল দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।” নিরাপদ উৎপাদনে নজরদারি কৃষি বিভাগের মহেশপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইয়াসমিন সুলতানা জানান, ড্রাগন ফলের নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ক্ষতিকর রাসায়নিকের অপব্যবহার রোধে কৃষি বিভাগ নজরদারি করছে। পাশাপাশি গৌরীনাথপুর বাজারের সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও কাজ করা হচ্ছে। অনুসন্ধানের সারাংশ ঝিনাইদহের গৌরীনাথপুর বাজার শুধু একটি ফলের বাজার নয়; এটি এখন একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র। ড্রাগন ফলকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বাজারে কৃষক, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। স্থানীয় উৎপাদন, বড় পাইকারি বাজার এবং দেশব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে গৌরীনাথপুর ধীরে ধীরে দেশের ড্রাগন ফল বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করছে।
বাংলা ট্রিবিউন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও এবং মানহানিকর কনটেন্ট ঠেকাতে সাইবার আইনে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে সরকার। সরকারের যুক্তি, ভুয়া তথ্য এখন শুধু ব্যক্তির সুনামহানি করছে না—কখনও কখনও তা সামাজিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জনআস্থার সংকটও তৈরি করছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়। গুজব দমনের নামে আইনটি ভিন্নমত, রাজনৈতিক সমালোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তির্যক মন্তব্য, কিংবা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে কিনা। গুজব প্রতিরোধ বা সাইবার অপরাধ ঠেকাতে করা এই আইন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা নতুন নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইন, এরপর সাইবার সুরক্ষা আইন—নাম পাল্টেছে একাধিকবার। কিছু ধারা বাতিল হয়েছে, পুরোনো কয়েকটি অপরাধে দায়মুক্তির কথাও এসেছে। কিন্তু সাংবাদিক, আইনজীবী ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ—আগের বিতর্কিত ধারাগুলোর অনেক বিষয়ই নতুন আইনের অন্য ধারায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ফলে আইন বদলালেও ভয় পুরোপুরি কাটছে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গুজব, অপপ্রচার, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হবে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিধান যুক্ত করার কথাও আলোচনায় এসেছে। সরকারের ভাষ্য, ডিজিটাল পরিসরকে নিরাপদ রাখতে হলে অনলাইন অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতেই হবে। তবে আইনটির সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ আছে সচেতন মহলে। কারণ বাংলাদেশে অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলার অসংখ্য নজির রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলার চূড়ান্ত বিচার হওয়ার আগেই গ্রেফতার, রিমান্ড, কারাবাস ও সামাজিক হয়রানি অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে নতুন আইন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে— গুজব বা অপরাধ দমন হবে, নাকি মত প্রকাশের ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হবে? প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘‘গুজব, পরিকল্পিত অপতথ্য এবং এআইভিত্তিক বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দমনে কার্যকর আইন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, আইনটি যেন ভিন্নমত, রাজনৈতিক সমালোচনা বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়।’’ তার মতে, এ জন্য আইনে অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া, স্বাধীন বিচারিক তদারকি এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। কোনও কনটেন্ট অপসারণ বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ জানানো, আপিলের সুযোগ রাখা এবং নিয়মিত স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে আইনের প্রয়োগ নিয়ে জনআস্থা বাড়বে। তিনি বলেন, ‘‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। তবে একইসঙ্গে সংবিধানসম্মত মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে সুরক্ষা দিতে হবে। এই দুইয়ের ভারসাম্যই আধুনিক, মানবাধিকার-সম্মত ও জবাবদিহিমূলক সাইবার আইন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।’’ সাইবার সুরক্ষা আইন ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে আছে কয়েকটি ধারা। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৮ ধারার বিষয় নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে প্রায় একইভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বরং নতুনভাবে আরও একটি উপধারা যুক্ত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। সমালোচকদের আশঙ্কা, “বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে” এ ধরনের বিস্তৃত ভাষা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়াতে পারে। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ ও প্রকাশের বিষয় ছিল। নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে একই ধরনের অপরাধের বিষয় ২৩ ধারায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে। অন্যদিকে নতুন আইনের ২৫ ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড আলাদাভাবে যুক্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নারীর সুরক্ষা এবং অনলাইন ব্ল্যাকমেইলিং ঠেকাতে এ ধরনের বিধান জরুরি হলেও ‘মানহানিকর’, ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘ভীতি প্রদর্শক’ কনটেন্টের ব্যাখ্যা অস্পষ্ট থাকলে— তা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে ২৬ নম্বর ধারাটি। ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ এবং ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’-এর ২৮ ধারার সংশোধিত রূপ হিসেবে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এর ২৬ ধারা এসেছে। আগের আইনে ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত’ করার অভিযোগে মামলা করার সুযোগ ছিল। নতুন আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ শব্দটি না থাকলেও ‘ধর্মীয় বা জাতিগত বিষয়ে সহিংসতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশ’ সংক্রান্ত অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে। এই ধারায় সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শব্দ পাল্টালেও ঝুঁকির জায়গা রয়ে গেছে। কারণ কোন বক্তব্য ঘৃণা, কোনটি তীব্র সমালোচনা, কোনটি রাজনৈতিক মতামত আর কোনটি সহিংসতায় উসকানি—এসবের স্পষ্ট সীমারেখা না থাকলে অপব্যবহারের সুযোগ থেকেই যায়। বিশেষ করে ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, রাষ্ট্র, সরকার বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সমালোচনার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যাখ্যাই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে পড়বে। আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে সরকার জাতীয় সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এর ২৮ ধারার কথা বলেছে। এই ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়েরকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিধান রয়েছে। সরকারের বক্তব্য, সাংবাদিক, ব্লগার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার মামলা করতে পারবে। একইসঙ্গে ১২ ধারায় ২৩ সদস্যের জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে, যার চেয়ারম্যান হবেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিথ্যা মামলা প্রতিরোধের বিধান থাকলেই কি অপব্যবহার বন্ধ হবে? কারণ বাস্তবে একটি মামলার পরপরই গ্রেফতার, ডিভাইস জব্দ, সামাজিক অপবাদ, পেশাগত ক্ষতি এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া একজন নাগরিককে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই শুধু পরবর্তী প্রতিকার নয়, মামলা গ্রহণের আগেই প্রাথমিক যাচাই, স্বাধীন তদন্ত তদারকি, বিচারিক অনুমোদন এবং গ্রেফতারের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত থাকা জরুরি। তারা বলছেন, গুজব দমনে সরকার চাইলে কয়েকটি নীতিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রথমত, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘ভুয়া তথ্য’, ‘মানহানিকর কনটেন্ট’ ও ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য’— প্রতিটি শব্দের আইনগত সংজ্ঞা স্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জনস্বার্থে করা সাংবাদিকতা, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, মতামত, ব্যঙ্গ, কার্টুন ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপরাধের বাইরে রাখার সুরক্ষা ধারা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ জানানো এবং দ্রুত আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, কতটি কনটেন্ট সরানো হলো, কতটি মামলা হলো, কতজন গ্রেফতার হলো এবং কতটি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। গুজব প্রতিরোধে কাজ করতে গিয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে পুলিশ কীভাবে ভূমিকা রাখে—এমন প্রশ্নে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি সানা শামিনুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আইনে বিভিন্ন ধারা রয়েছে। সিআইডির সার্বক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে যেসব অভিযোগ আসে, সেগুলো আগে যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর আইন অনুযায়ী যেসব বিষয়ে আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে, সেসব ক্ষেত্রেই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আইনের বাইরে গিয়ে বা যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।” গত ৮ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানান, সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্টের সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণের পাশাপাশি এসবের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান যুক্ত করা হবে। আইনে মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিধান রাখা হবে। বর্তমানে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে বিটিআরসি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুরোধেও মেটা দ্রুত ব্যবস্থা নেয় না বলে জানান মন্ত্রী। সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাইবার সুরক্ষা সংস্থা, বিটিআরসি ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। গত ২৭ জুন সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইনের বিল উত্থাপন করা হয়। পরে ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সাইবার সুরক্ষা সংশোধন বিলটি সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে পাস হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, কিন্তু একইসঙ্গে সংবিধানসম্মত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমানভাবে সুরক্ষা দেওয়া। কারণ গুজব যেমন সমাজের জন্য ক্ষতিকর, তেমনই ভয়ভীতির পরিবেশও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। আইন যদি শুধু অপরাধীকে ঠেকায়, সেটি সুরক্ষা। কিন্তু আইন যদি প্রশ্নকারী নাগরিক, সাংবাদিক বা সমালোচককে চুপ করিয়ে দেয়, সেটি সুরক্ষা নয়—সেটি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণ বা কণ্ঠরোধ। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “গুজব আর অসত্য তথ্য—এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। গুজব হলো পরিকল্পিতভাবে কোনও কথা রটিয়ে দেওয়া, যাতে যিনি বা যে গোষ্ঠী সেটি রটাচ্ছেন, তাদের কোনও লাভ হয়। আর অসত্য তথ্য হলো— কেউ হয়তো বিষয়টি জানতেন না, কিন্তু শোনা কথা হিসেবে তা প্রচার করেছেন। ‘‘সুতরাং, গুজব ও অসত্য তথ্যের পার্থক্য নির্ণয় করতে না পারলে সব ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি হয়। সরকার বলছে গুজবের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু গুজব আর অসত্য তথ্যের পার্থক্য আগে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। তা না হলে দেখা যাবে গুজবের অভিযোগে মানুষকে এমনভাবে হয়রানি করা হবে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে।’’ তিনি বলেন, ‘‘সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রেও যৌক্তিক সমালোচনা ও অযৌক্তিক সমালোচনার পার্থক্য বুঝতে হবে। আমি যদি সরকারের কার্যক্রম নিয়ে যৌক্তিকভাবে সমালোচনা করি, তাহলে সেটির জন্য আমাকে আইনের মুখোমুখি করা হলে, তা হবে আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ। কিন্তু কেউ যদি আজগুবি কথাবার্তা বলে সরকারকে হেনস্থা করতে চায়, কিংবা কোনও গোষ্ঠীকে বিপদগ্রস্ত করতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।” স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা কেন জরুরি? বিশেষজ্ঞদের মতে, গুজব দমনে কার্যকর আইন প্রয়োজন হলেও কিছু নীতিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে: ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘ভুয়া তথ্য’, ‘মানহানিকর কনটেন্ট’ ও ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য’-এর স্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা নির্ধারণ; জনস্বার্থে করা সাংবাদিকতা, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, মতামত, ব্যঙ্গ, কার্টুন ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপরাধের বাইরে রাখার সুরক্ষা ধারা; কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ জানানো এবং দ্রুত আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা; কতটি কনটেন্ট সরানো হলো, কতটি মামলা হলো, কতজন গ্রেফতার হলো এবং কতটি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা। ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ গুজব ও অপতথ্য সমাজের জন্য ক্ষতিকর—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিস্তর ঐকমত্য রয়েছে। তবে একইসঙ্গে ভয়ভীতির পরিবেশও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। আইন যদি প্রকৃত অপরাধীকে ঠেকায়, সেটি সুরক্ষা; কিন্তু আইন যদি প্রশ্নকারী নাগরিক, সাংবাদিক বা সমালোচককে চুপ করিয়ে দেয়, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ বা কণ্ঠরোধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ভুয়া তথ্য ও অনলাইন অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা এবং সংবিধানসম্মত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
আব্দুর রহমান: বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে—শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির চাহিদা বেড়েই চলেছে। কিন্তু এই চাহিদার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের মাধ্যমে। বৈশ্বিক বাজারে দামের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি—সব মিলিয়ে এই নির্ভরতা এখন বড় এক কৌশলগত প্রশ্নের মুখে ফেলেছে দেশকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনীতি, পরিবেশ রক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি উৎস বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে। সূর্যের আলোয় শক্তির সম্ভাবনা বাংলাদেশে বছরের অধিকাংশ সময়ই সূর্যালোক পাওয়া যায়—এই প্রাকৃতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সৌর শক্তি হতে পারে জ্বালানি রূপান্তরের প্রধান ভরকেন্দ্র। গ্রামাঞ্চলে ঘরের ছাদে ছোট সোলার সিস্টেম, শহরে রুফটপ সোলার, এমনকি বড় আকারের সোলার ফার্ম—সবই এখন আলোচনায়। সেচের জন্য সৌরচালিত পাম্পও কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রেইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এর নেতৃত্বে বাস্তবায়িত সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই সাফল্যকে কীভাবে শিল্প ও নগর পর্যায়ে বড় আকারে সম্প্রসারণ করা যাবে? উপকূলে বাতাসের শক্তি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল—বিশেষ করে কক্সবাজার, কুয়াকাটা এবং চট্টগ্রাম—বায়ু শক্তির জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এখানে গড় বাতাসের গতি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় উইন্ড টারবাইন বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। তবে এখনো বড় পরিসরে এই খাতের উন্নয়ন সীমিত। গবেষকরা বলছেন, সঠিক ডেটা সংগ্রহ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে বায়ু শক্তি দেশের জ্বালানি মিশ্রণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। গ্রামে গ্রামে বায়োগ্যাস গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি উৎস হলো বায়োগ্যাস। গবাদিপশুর গোবর, কৃষি বর্জ্য ও জৈব বর্জ্য থেকে উৎপন্ন এই গ্যাস রান্নার কাজে যেমন ব্যবহারযোগ্য, তেমনি ছোট পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কাজে লাগানো যায়। এটি শুধু জ্বালানির বিকল্প নয়—বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কৃষির জন্য জৈব সার উৎপাদনের ক্ষেত্রেও কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষিভিত্তিক শক্তি: বায়োমাস ধানের তুষ, খড়, আখের বর্জ্য বা কাঠের অবশিষ্টাংশ—যা একসময় অপচয় হতো—সেগুলোই এখন শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে বায়োমাস শক্তি বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ। তবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশে বড় নদী থাকলেও উচ্চতার তারতম্য কম হওয়ায় বড় আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সীমিত। বর্তমানে Kaptai Dam থেকেই মূল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট আকারের মিনি ও মাইক্রো হাইড্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ এখনো কাজে লাগানো হয়নি পুরোপুরি। শহরের বর্জ্য থেকেই জ্বালানি প্রতিদিন ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এই বর্জ্যকে সমস্যা না দেখে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা থেকেই ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ প্রযুক্তির বিকাশ। ল্যান্ডফিল গ্যাস বা কঠিন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন—এই খাতটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি নগর ব্যবস্থাপনার একটি বড় সমাধান হতে পারে। ভবিষ্যতের দিকচিহ্ন: সবুজ হাইড্রোজেন বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য শক্তির পরবর্তী ধাপ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে সবুজ হাইড্রোজেন। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা যায়, যা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশে এখনো এই খাত প্রাথমিক পর্যায়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি কৌশলগত বিনিয়োগের একটি ক্ষেত্র হতে পারে। বাস্তবতা বনাম সম্ভাবনা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প জ্বালানি হলো সৌর শক্তি, বায়োগ্যাস, বায়োমাস, বায়ু শক্তি এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি। তবে বড় প্রশ্ন হলো—নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই চারটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া কি এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ পাবে? বাংলাদেশ যদি এই খাতগুলোকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে শুধু আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোই নয়—বরং একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং নিরাপদ জ্বালানি ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।
আলম রায়হান: বর্তমান সরকারের প্রধান কর্মসূচির মধ্যে একটি হচ্ছে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন। কাগজপত্রের হিসাবে এ কাজ অতীব সহজ। বেকু দিয়ে কাটলেই হলো! উল্লেখ্য জনশক্তির ওপর নির্ভর করে এ কাজের সূচনা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বলা হয়, এটি নিছক কোনো কাজ নয়, একটি আন্দোলন। বিপ্লবও বলা চলে। দেশকে স্বনির্ভর করাই ছিল তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য। গভীরে আরও অনেক বিষয় ছিল। পানি নিয়ে ভাবতেন প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রেসিডেন্ট জিয়া পানি নিয়ে ভাবতেন। যে ভাবনা থেকেই ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্সার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানি রক্ষায় নানান উদ্যোগ নিয়েছেন। এ উদ্যোগেরই আলোচিত ও আলোকিত দিক হচ্ছে খাল খনন। কয়েক দশক আগে সূচিত কাজটিই নতুন উদ্যমে হাতে নিয়েছেন জিয়াপুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু মাঝখানে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। ফলে জিয়াউর রহমানের পক্ষে যা বাম হাতের খেলা ছিল, তারেক রহমানের পক্ষে তা কতটা সহজ-এ নিয়ে অনেকেই ভাবছেন। সঙ্গে আরও অনেক প্রসঙ্গ নিয়ে নানান আলোচনা আছে। কিন্তু মূল কথাটি সম্ভবত এখনো তেমন আলোচনায় আসেনি। তা হচ্ছে, খাল কাটা হবে কোথায়, কীভাবে। এ প্রসঙ্গে কারও মনে পড়তেই পারে হাসন রাজার গান, ‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার।’ এ প্রসঙ্গে অতীতের একটি ঘটনার অবতারণা করা যাক। এবং বলে রাখা ভালো, কোনো বিচারেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় নদী কমিশনের চেয়ারম্যানের তুলনা চলে না। তবে অনুমান করা যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ তো আনুপাতিকভাবে আসতেই পারে। শেখ হাসিনার দিকে ফিরেও তাকাননি উল্লেখ্য শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও বেশ পরিচিত। এরপরও মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। যামিনী না পোহাতেই জাগাবার মতো ঘটনা ঘটেছে। যদিও অন্য রকম আকুতি আছে বরীন্দ্রনাথের গানে, ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হলো মরি লাজে।’ নদী কমিশনের উল্লিখিত চেয়ারম্যান নদী-পানি রক্ষায় নিজেকে ক্ষমতাধর মনে করেছিলেন, রথের মতো। যেটাকে সরকারের ঘনিষ্ঠ ‘নদীখোর’ সাঙাতরা খুব বেশি বাড়াবাড়ি বলে বিবেচনা করেছিলেন। মনে রাখা প্রয়োজন, সব সরকারের আমলেই একদল সাঙাত জুটে যায়। এরা খুবই ক্ষমতাধর হয়। সরকারের সঙ্গে এদের সম্পর্কটা অনেকটা পরকীয়ার আদলে। ফলে সাঙাতদের বদনখানি মলিন হলেই সরকারের কেন্দ্রে এক প্রকার ঝাঁকুনি লাগে। যদিও নিদানকালে এসব সাঙাত কোনোই কাজে লাগে না। এটি শেখ হাসিনার পরিণতিতে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যাঁরা চিরকাল থাকার সংকল্প করেছিলেন, এমনকি একত্রে কবরেও যাওয়ার কথা বলেছিলেন তাঁরা ইউটার্ন করেছেন নিমেষে। শেখ হাসিনার দিকে ফিরেও তাকাননি। কবরে যাওয়া তো অনেক দূরের বিষয়। কবর থেকে উঠতেই চাচ্ছিলেন না মোশতাক কবর প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ করা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর বাবা ইন্তেকাল করেন। তাঁকে শেষবিদায়পর্বে যাঁরা কবরে নামিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে খোন্দকার মোশতাকও ছিলেন। কিন্তু তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে কবর থেকে আর উঠতেই চাচ্ছিলেন না। কিন্তু নির্মম ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবার কবরে পাঠানোর ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এই মোশতাক। বলাবাহুল্য এরকম অনেক বাস্তবতা আছে। কিন্তু কেউ তেমন বিবেচনায় নেন না। শিক্ষা নেওয়া তো অনেক দূরের বিষয়। ওয়ান-ইলেভেনের পরিণতি কি কেউ বিবেচনায় নিয়েছেন? অন্তত আওয়ামী লীগ নেয়নি। যদিও হাসপাতাল থেকে অচল অবস্থায় কর্মীদের কাঁধে চড়ে বের হওয়ার সময় ওবায়দুল কাদের ওয়ান-ইলেভেনকে ‘একটি শিক্ষা’ হিসেবে উচ্চারণ করেছিলেন আবেগঘন নাটকীয়তায়। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি এবং তাঁর সরকার কী করেছে? আসলে এটি হচ্ছে দেশের সরকারগুলোর ইনবিল্ড প্রবণতা। আর আমাদের রাজনীতিকরা যতটা না সরকার গঠন করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দৈন্যে সরকার কাঠামোতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে এই কাঠামোবলয়ে আশ্রিত হয়ে যান এবং সরকার কাঠামোকেই সুরক্ষার বর্ম হিসেবে বিবেচনার বিভ্রমে আক্রান্ত হন। হেলাল হাফিজের কবিতার প্রিয়ার গালে মাছিকে তিল ভেবে ভুল করার মতো। ফলে সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার অবস্থায় তারা থাকেন না। শিরোমণি ছিলেন অতিবাচাল এক নারী কাজেই সরকার কাঠামোতে নদী-পানির বিষয়ে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান তো নস্যি, মন্ত্রীও একপ্রকার তেজপাতা। কাজেই নদী কমিশনের চেয়ারম্যান যতই শেখ পরিবারঘনিষ্ঠ ও দক্ষ হন না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। ফলে নদী কমিশনের চেয়ারম্যানের সক্রিয় ভূমিকা বড় বেশি বাড়াবাড়ি মনে করা হয়েছিল ক্ষমতাকেন্দ্রের সাঙাতদের কাছে। তাঁর সবচেয়ে ‘বড় অপরাধ’ ছিল, তিনি ঢাকার চারদিকের চারটি নদী পরিষ্কার রাখার জন্য গোঁ ধরেছিলেন। যাকে বরিশালের স্থানীয় বয়ানে বলা হয়, ‘ছাগলের ঠেনি।’ চেয়ারম্যান এমনও বলেছিলেন, ‘নদীর পানি এমন স্বচ্ছ হবে যে ঝিনুক ফিরে আসবে, মাছ ধরার জন্য নদীর তীরে ধ্যানের মতো অপেক্ষায় থাকবে মাছরাঙা।’ কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি। উল্টো খোদ প্রধানমন্ত্রীর রোষানলে অপমানিত হয়েই বিদায় নিয়েছেন। তবে এ অপকর্মের জন্য খুব ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের গলদঘর্ম হতে হয়নি। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদী দখল করে ডকইয়ার্ড নির্মাণকরী এক ব্যবসায়ী মূল খেলা খেলে দিয়েছেন। এর প্রেক্ষাপট প্রস্তুত করার জন্য সক্রিয় ছিল পরিবেশবাদীর ছদ্মাবরণে কতিপয় ভুঁইফোঁড় এনজিও। আর এদের শিরোমণি ছিলেন নাটকীয় বচনের অতিবাচাল এক নারী। পরে তিনি ইউনূস সরকারের উপদেষ্টার আসন অলংকৃত করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালে তাঁর অনেক অপকর্মের ফিরিস্তি এর মধ্যেই বেশ চাউর হয়েছে। এরপরও তিনি বাচালপ্রবণতা ত্যাগ করতে পারেননি। কয়েক দিন আগে সংসদ নির্বাচনের সময় তাঁদের তৎপরতা প্রশ্নে বচন দিয়ে জামায়াতের হাতে একটি বড় ইস্যু তুলে দিয়েছেন, সরকারকে ফেলেছেন বিব্রতকর অবস্থায়। তিনি এমনই এক জিনিস। হাসিনার প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন ‘নদীখাদক’ এই অদম্য নারীর সঙ্গে যদি হাসিনা সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী যুক্ত হন তাহলে আর কিছু লাগে! প্রসঙ্গত এই প্রতিমন্ত্রীও ‘নদীখাদক’ হিসেবে কুখ্যাত। শুরুর দিকেই বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো কমিশন চেয়ারম্যানের তুলনা না চললেও অনুমান করা যায়। এই আলোকেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার অনুকরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল কাটা উদ্যোগ পানির মতো সোজা মনে হচ্ছে না। প্রসঙ্গত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুরুতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন একক ক্ষমতাধর। তাঁর হাতে ‘ডান্ডা’ ছিল। আর সেই সময়ে রাজনীতি ততটা কলুষিত হয়নি, যতটা হয়েছে পরবর্তী সময়ে ক্রমাগতভাবে। দ্রুত অধোগতির ধারায় রাজনীতির জার্সি গায়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের অপরাধী ও ধান্ধাবাজরা রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছেন। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে রাজনীতিতে ঠগ বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হতে পারে। রাষ্ট্রকাঠামোতে নানান কিসিমের অপরাধীতে গিজগিজ করে রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর দিকের বিভিন্ন স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নানান কিসিমের অপরাধীতে গিজগিজ করে। এরা নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কিছুকে বিবেচনায় নেয় না। এই অপশক্তি বিভিন্ন দলে সংযুক্ত। তাদের বাহারি পরিচয় ‘নেতা’। কথিত এই নেতারা সুযোগ পেলে পাবলিকের খাতা ধরে টানাটানি করে। বস্ত্র হরণের একাধিক খবর তো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অনেক খবর অপ্রকাশিতই থেকে যায়। কাজেই খাল খনন করতে গিয়ে যখন উচ্ছেদ প্রসঙ্গ আসবে তখনই হবে জটিল খেলা। এ প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী প্রকারান্তরে আগাম ধারণা দিয়ে রেখেছেন। তিনি ৮ মার্চ বলেছেন, ‘খাল এবং নদীর অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় পলি জমে ছিল, অনেক জায়গায় দোকানপাট বাড়িঘর গড়ে উঠেছিল। আমরা সব বাধাবিপত্তি দূর করে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।’ প্রশ্ন হচ্ছে, যারা দখল করেছে তারা কি সহায়তা করার জন্য মুখিয়ে আছেন? এদের তো উচ্ছেদ করতে হবে। এটি মোটেই সহজ নয়, বরং খুবই কঠিন কাজ। পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পর্কে মন্ত্রীর সম্যক ধারণা আছে? প্রশ্ন আছে, খাল কাটার উদ্দেশ্য কী? এ ব্যাপারে আগিলা সময়ের একটি পাঠ্য রচনা প্রসঙ্গে আসা যাক। সেই সময় রচনাবলির মধ্যে একটি ছিল, ‘যদি লাখ টাকা পাই’। শিশুতোষ রচনায় লাখ টাকা পেলে নানা পরিকল্পার কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সব ভাত গুড় দিয়ে খাওয়ার ভাবনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খাল কাটার প্রধান উদ্দেশ্যগুলো কী কী? আতা গাছে তোতা পাখির মতো সরকারি বয়ান নিশ্চয়ই প্রস্তুত, ‘বর্ষাকালের পানি ধারণ, শুষ্ক মৌশুমে কৃষিতে সেচের ব্যবহার এবং জলাবদ্ধতা দূর করা।’ খুবই ভালো কথা। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করার দৃঢ়তা কি সরকারের বখেদমতে হুজুরেআলাদের আছে? এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এদিকে মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে খাল কাটা কাজ হচ্ছে। কিন্তু যতটুকু জানা গেছে, খাল খননের মাঠের কাজটি করবে প্রধানত তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএডিসি। কিন্তু নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পর্কে মন্ত্রীর কী সম্যক ধারণা আছে? বলা কঠিন! প্রয়োজনে ক মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি হাসিনা সরকারের পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন। আবার উপমন্ত্রী বলে অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না। কারণ এনামুল হক শামীম খুবই ক্ষমতাধর ছিলেন। এরপরও তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছুই করতে পারেননি। আরও অনেক কঠিন বাস্তবতা আছে। এসব অতিক্রম করেই খাল কাটা কর্মসূচি সফল করতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। যা পাহাড় লঙ্ঘনের মতোই কঠিন কাজ। যত জটিলতাই হোক না কেন, খাল কাটায় প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য কামনা করি। কারণ দেশ বাঁচানোর প্রাণভোমরা কিন্তু পানি। আর পানির প্রথম ধাপটিই হচ্ছে খালবিল-পুকুর, পরে নদী। খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সহযোগিতা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ—উভয়ের জন্যই জরুরি। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতার ব্যবধান কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মাসুদ করিম: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যুদ্ধ এখন আর শুধু ভূখণ্ড দখল বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি অর্থনীতি, জ্বালানি এবং বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক জটিল প্রতিযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা—বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত—এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পরও ইরানে সরকার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জ্বালানি: যুদ্ধের আসল কেন্দ্রবিন্দু? বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংঘাতগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি ও বাণিজ্য পথ। বিশেষ করে: হরমুজ প্রণালি কৃষ্ণসাগর অঞ্চল বৈশ্বিক তেল সরবরাহ চেইন বিশ্বের প্রায় ২০% তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। এলএনজি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হয়। এর ফলে: যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক ইউরোপ স্পট মার্কেটে বেশি দামে গ্যাস কিনতে শুরু করে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি পায় তবে এই লাভের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয়ও করতে হয়েছে। লাভ বনাম ঝুঁকি: জটিল সমীকরণ যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানিকারকরা লাভবান, তবুও বড় কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে জোট রাজনীতিতে চাপ বাড়ে সামরিক ব্যয় বাড়তে থাকে এছাড়া, কাতারের মতো দেশ যদি হরমুজ প্রণালির ঝুঁকির কারণে রপ্তানি কমায়, তাহলে বিশ্ববাজারে এলএনজি দাম আরও বাড়তে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ: নতুন ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতগুলো আসলে তিনটি বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই: জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) সমুদ্রপথ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার সহজ হয়। বাংলাদেশ: চাপের মুখে অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন: জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে ফলে বৈশ্বিক সংঘাতের সরাসরি অংশীদার না হয়েও বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। নিরাপত্তা বনাম নির্ভরতা দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু যদি সেই নির্ভরতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা শুধু সামরিক নয়—একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শেষ কথা: যুদ্ধের শেষ কোথায়? বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় পরিষ্কার— এই যুদ্ধের কোনো সহজ সমাপ্তি নেই। এটি: আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে জ্বালানি বাজারকে পুনর্গঠন করছে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করছে অতএব, প্রশ্নটি এখন আর শুধু “কে জিতবে?” নয়— বরং “এই যুদ্ধ থেকে কে কতটা লাভবান হবে, আর তার মূল্য কে দেবে?”
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং ২ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার টাকা আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ঢাকার আদালতে শুরু হয়েছে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মামলার বিচারিক কার্যক্রম। মামলার আসামি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. সোহেলউদ্দিন প্রিন্স। বাদী মোসা. তানজিনা সাথী একজন সাময়িক বরখাস্ত সহকারী কর কমিশনার। দুজনই বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা। আরও পড়ুন: দুর্নীতি মামলায় কর কর্মকর্তা তানজিনা সাময়িক বরখাস্ত মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের আশ্বাস ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বাদীর কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন সোহেলউদ্দিন প্রিন্স। পরে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান এবং নেওয়া অর্থও ফেরত দেননি বলে অভিযোগ করেছেন তানজিনা সাথী। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। আদালত আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ গঠন করেছেন। আসামিপক্ষের অব্যাহতির আবেদনও নাকচ করা হয়েছে। ফলে মামলাটি এখন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তির পর্যায়ে এগোচ্ছে। বিসিএসের পরিচয় থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তানজিনা সাথীর সঙ্গে সহকর্মী ক্যাডার কর্মকর্তা সোহেলউদ্দিন প্রিন্সের পরিচয় হয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ও প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয় বলে বাদীর অভিযোগ। তানজিনা সাথীর দাবি, একপর্যায়ে সোহেলউদ্দিন তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়ার পাশাপাশি বাদীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই সম্পর্ক এবং পারিবারিক বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজন ও অজুহাত দেখিয়ে সোহেলউদ্দিন তাঁর কাছ থেকে একাধিকবার অর্থ গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সময়ে নেওয়া অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার টাকা। বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থ দেওয়ার পেছনে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ও পারস্পরিক বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সোহেলউদ্দিন বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। একই সঙ্গে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তানজিনা। তবে অর্থ গ্রহণের প্রতিটি ঘটনার উদ্দেশ্য, লেনদেনের প্রকৃতি এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক কী ছিল—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নির্ভর করবে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর। ২ কোটি ৩২ লাখ টাকার লেনদেন, আদালতে মামলা অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অর্থ ফেরত না পাওয়া এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আইনের আশ্রয় নেন তানজিনা সাথী। ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন তিনি। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের দায়িত্ব দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। এরপর সিআইডি মামলার আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং ব্যক্তিদের বক্তব্য সংগ্রহ করে তদন্ত চালায় বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে আসামির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিকভাবে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের পক্ষে তথ্য থাকার অর্থ এই নয় যে আসামির অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফৌজদারি মামলায় অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই করা এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর নির্ভর করে। অব্যাহতির আবেদন নাকচ, অভিযোগ গঠন মামলার পরবর্তী ধাপে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার ইভার আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রদত্ত মামলার বিবরণ অনুযায়ী, শুনানির দিন ছিল মঙ্গলবার, ৯ জুন। এ সময় আসামি সোহেলউদ্দিন প্রিন্স আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষ মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করলেও আদালত তা নাকচ করেন। পরে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়। দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের শাস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে ৪২০ ধারা প্রতারণার মাধ্যমে অসাধুভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচিত করার অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আদালত মামলাটিকে বিচারিক পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তবে অভিযোগ গঠন কোনোভাবেই আসামির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা আদালত সূত্রের বরাতে মামলার বিবরণে আরও বলা হয়েছে, সোহেলউদ্দিন প্রিন্সের বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রীর দায়ের করা একটি যৌতুক মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। সরকারি কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আইনি দায় এই মামলার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয়—ব্যক্তিগত সম্পর্কে আর্থিক বিশ্বাসের ব্যবহার এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি। বাদী ও আসামি উভয়েই ক্যাডার কর্মকর্তা হওয়ায় ঘটনাটি প্রশাসনিক অঙ্গনেও আগ্রহ তৈরি করেছে। প্রতারণা কিংবা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, লেনদেনের প্রমাণ, অর্থ দেওয়ার কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অভিযুক্তের অভিপ্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মামলার বাস্তব পরিস্থিতি ও উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত নির্ধারণ করবেন, অভিযোগের আইনগত উপাদানগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না। এ ধরনের মামলায় ব্যাংক লেনদেনের নথি, লিখিত চুক্তি, অর্থ গ্রহণের স্বীকারোক্তি বা যোগাযোগের রেকর্ড প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে কোন প্রমাণ কতটা গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য, তা নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের। ব্যক্তিগত সম্পর্কে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন: সতর্কতার প্রয়োজন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে বিরোধ তৈরি হলে অনেক সময় অর্থ দেওয়ার প্রকৃতি—ঋণ, উপহার, বিনিয়োগ, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দেওয়া—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। ফলে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণ এবং ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার ভবিষ্যতে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়ক হতে পারে। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে অর্থ লেনদেন হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতারণা বা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট আইনের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নির্ভর করে ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং প্রমাণের ওপর। তানজিনা সাথীর অভিযোগে অর্থের পরিমাণ ও বিয়ের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনো বিচারাধীন। তাই মামলার প্রতিটি ধাপের তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি। এখন নজর সাক্ষ্যগ্রহণে ২ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার টাকার আর্থিক লেনদেন, বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং প্রতারণার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাটি এখন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অভিযোগ গঠন ও অব্যাহতির আবেদন নাকচ হওয়ার পর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সাক্ষ্যগ্রহণ। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত নির্ধারণ করবেন, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না। সেই সিদ্ধান্তের আগে মামলার অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার যেমন জরুরি, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ই নির্ধারণ করবে এই মামলায় আইনগত দায় কার ওপর কতটা বর্তায়।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদায়ন কি প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়, নাকি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) দরপত্র, নিয়োগ ও নির্মাণকাজের অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? আর অধিদপ্তরের প্রধানের দায়িত্বই বা কতটা কার্যকর? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা একাধিক অভিযোগ এসব প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, দরপত্র অনুমোদনে কথিত পার্সেন্টেজ আদায়, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তার এবং অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগে অনিয়ম এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বদলি ও পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তারেক আনোয়ার জাহেদী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় থেকেই বদলি ও পদায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি বদলি আদেশে কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি এবং কয়েকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ওই আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতার অভিযোগ সামনে আসে। সে সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেও এই গোষ্ঠী বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সুযোগে দ্রুতগতিতে বড় অঙ্কের বদলি-বাণিজ্য হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকা, তাঁদের আগের ও পরের কর্মস্থল, বদলির আবেদন, আদেশ জারির সময় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর দাবি, উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি এসব নথি পর্যালোচনা করলে বদলি ও পদায়ন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বদলি ও পদায়নের কারণে কর্মকর্তারা বিভিন্ন বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়ন ঘিরে প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলেও তাঁরা দাবি করেছেন। ওই নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে একই ধরনের প্রশ্ন বদলি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ২০২৫ সালের নভেম্বরেও সামনে আসে। সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশ বাস্তবায়নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে বাধা তৈরির অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তখন একটি বদলি-সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথা বলেছিল। ওই সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীর সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বদলি ও পদায়ন ঘিরে বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, আদেশ বাস্তবায়নের নথি এবং কর্মকর্তাদের কর্মস্থল পরিবর্তনের পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। নিচের সারির কর্মীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরাসরি অর্থ গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে নিচের পর্যায়ের কর্মীদের ব্যবহার করে অর্থ আদায় করা হতো। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত জসিম নামের এক কর্মচারীকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্ত্রীর নামে লাইসেন্স খুলে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা এবং নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁদের আরও দাবি, বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর নজরে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি এ ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগে অনিয়মের প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কারা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার ফল, নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন, অভিযোগের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নির্মাণকাজে বিলম্ব, নিম্নমানের উপকরণ ও অর্থ পরিশোধের অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যেসব প্রকল্পের কাজ নয় মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, সেগুলোর কোনো কোনোটি চার বছরেও শেষ হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই চিঠির জবাবে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও তাঁদের অভিযোগ। এসব দাবি যাচাইয়ের জন্য প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, কার্যাদেশ, নির্ধারিত সময়সীমা, ঠিকাদারকে দেওয়া বিল, কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন, গুণগত মান পরীক্ষার ফল এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠিপত্র পর্যালোচনা করা জরুরি। প্রকল্পের কাজ দেরিতে শেষ হওয়া কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা থেকেই দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না। তবে দীর্ঘদিন কাজ অসমাপ্ত থাকা এবং অগ্রগতির তুলনায় অর্থ পরিশোধের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। অধিদপ্তরের অতীতের নিয়োগ ও দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত একটি সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। অধীনস্থদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ: নথিতে যা আছে তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের নথিও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন চাওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অধিদপ্তরের অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের বিপরীতে অন্তত একটি ঘটনায় তাঁর স্বাক্ষরিত তদন্ত-নির্দেশের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ভিডিও, তদন্ত কমিটিতে প্রধান প্রকৌশলী ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের দপ্তরে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওতে টেবিলের ওপর টাকা রাখা দেখা যায় এবং একজনকে ‘স্যারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা রেখে যান’ বলতে শোনা যায়। হাসান শওকত অর্থগুলো ঠিকাদারদের বলে দাবি করেন এবং এ ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয় অতিরিক্ত সচিব ড. সরদার মো. কেরামত আলীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এবং উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানকে। অর্থাৎ, অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলীর দপ্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান সেই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, যাঁকে ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে তদন্তটি পক্ষপাতদুষ্ট—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও অবকাশ নেই। কমিটির কার্যপরিধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ভূমিকা এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। হাসান শওকতের দপ্তরের অর্থ লেনদেনের ভিডিও নিয়ে তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেছিলেন, ভিডিওটি তখনও তাঁর নজরে আসেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্রে ঘুষের অভিযোগ ২০২৬ সালের আগস্টে সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে বাড্ডার রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার উন্নয়নকাজের দরপত্র ঘিরে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রে ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স ২ কোটি ২ লাখ ৮ হাজার ৬১ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পায়। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী ঠিকাদারের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ঘটনায়ও তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে। দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্র আহ্বান নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। এ জন্য দরপত্র বাতিলের লিখিত কারণ, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, পুনঃদরপত্রের শর্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। এই ঘটনাগুলো থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে তারেক আনোয়ার জাহেদীর নেওয়া তদন্তের নির্দেশগুলো কি কার্যকর অনুসন্ধান ও জবাবদিহিতে রূপ নিচ্ছে, নাকি অভিযোগগুলো তদন্তের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে?এর উত্তর পেতে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, গৃহীত ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ বা যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পদ নিয়ে অভিযোগ তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পদে বহাল থাকার চেষ্টা করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের পদ ধরে রাখতে তিনি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তদবির করেছেন। তাঁর নিজ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্যের বরাত দিয়ে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর পরিবার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল এবং ওই সময়ে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন। তাঁর নামে-বেনামে সম্পদ এবং বিদেশে সম্পদ থাকার দাবিও করেছেন অভিযোগকারীরা। আরেক কর্মকর্তার দাবি, তারেক আনোয়ার জাহেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি বা পদায়ন পেয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে প্রত্যাশা তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একজন দুদক কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিষয়েও অভিযোগ পাওয়া গেলে অনুসন্ধানের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। জবাবদিহির প্রশ্নে যে নথিগুলো জরুরি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়ন, নিয়োগ, দরপত্র ও নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তাই শুধু প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর মানও জড়িত। তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে অন্তত কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: বদলি ও পদায়নের পূর্ণাঙ্গ নথি, কথিত অর্থ লেনদেনের আর্থিক প্রমাণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও লাইসেন্স, নিয়োগপ্রক্রিয়ার কাগজপত্র, প্রকল্পের অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের হিসাব এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এসব নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রশ্নটি তাই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহির: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ ও দরপত্রপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? অভিযোগের তদন্তগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? আর অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তরই নির্ধারণ করবে, অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অনিয়মের ইঙ্গিত।
মামুনুর রশীদ নোমানী, ইত্তেহাদ নিউজ : বরিশাল নগরীর বগুড়া রোডে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশের এলাকায় সিটি সুপার মার্কেট নির্মাণ বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে করা রিট খারিজ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার শুনানি শেষে বিচারপতি শেখ আউয়াল রিটটি খারিজ করে দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) নিজস্ব জমিতে উন্নয়নকাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের এই সিদ্ধান্ত নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। সিটি করপোরেশন সূত্রের দাবি, নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বগুড়া রোড এলাকায় অবস্থিত ৯ দশমিক ৯ শতাংশ জমির রেকর্ডীয় মালিক বিসিসি। দীর্ঘদিন ধরে জমিটি কয়েকটি পরিবার ভোগদখল করে আসছিল। সরকারি জমি উদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে জমিটি পুনরুদ্ধার করে সেখানে ড্রেন নির্মাণ ও একতলা মার্কেট তৈরির কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। তবে জমিটি উদ্ধারের পর থেকেই উন্নয়নকাজ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। মার্কেট নির্মাণ বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টে রিটের ঘটনা জমিটির ব্যবহার, দখল ও নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে। রিট খারিজ, কী বলছে সিটি করপোরেশন? সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিটি সুপার মার্কেট নির্মাণ বন্ধের আবেদনসংক্রান্ত রিট পিটিশন নম্বর ১৪৪৪৪। মামলাটি ১৮ নম্বর কোর্টের ১৭ নম্বর আইটেম হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিসিসির সম্পত্তি কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান শাকিলের দাবি, জমিটি সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সম্পত্তি। এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এককভাবে ভোগদখল করার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধের কেন্দ্রে থাকা জমিটি ড্রেন শ্রেণিভুক্ত এবং বিবাদী পক্ষ জমিটি সিটি করপোরেশনকে ব্যবহারের জন্য অনাপত্তি দিয়েছিল। রিট খারিজের আদেশে নির্মাণকাজে বাধা, আপত্তি বা মামলা করার সুযোগ থাকবে না—এমন বক্তব্যও সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্ট সূত্রে তুলে ধরা হয়েছে। ৯.৯ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া রোডের এসএ দাগ নম্বর ৪০৪৪ এবং ৩ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ৯ দশমিক ৯ শতাংশ জমির রেকর্ডীয় মালিক বিসিসি। সংস্থাটির দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত জমিটির খাজনাও পরিশোধ করা হয়েছে। জমিটি মূল সড়ক ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি পরিবার তা ভোগদখল করে আসছিল বলে দাবি করেছে সিটি করপোরেশন। ২০২৫ সালে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। একই সঙ্গে উদ্ধার করা জমিতে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে সেগুলো আবারও বেদখল হয়ে না যায়। বগুড়া রোডের জমিটিও ওই উদ্যোগের আওতায় আনা হয়। এরপর সেখানে ড্রেন ও একতলা মার্কেট নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হলে জমিটির পেছনে থাকা কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয় বলে বিসিসি সূত্রের দাবি। অধিগ্রহণের উদ্যোগ থেকে মানববন্ধন সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিটি নিজেদের দখলে রাখার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো প্রথমে পাশের বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জমিটি অধিগ্রহণ করা হবে—এমন মর্মে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। তবে সিটি করপোরেশনের বক্তব্য, নগরীর ভেতরে কোনো দপ্তরের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন। এরপর বিরোধের বিষয়টি রাজনৈতিক পরিসরে গড়ায় বলে অভিযোগ উঠেছে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনের কাছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো রাজনৈতিক সহযোগিতা চেয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নাসরিনের নেতৃত্বে কয়েকজন সমর্থক নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন করেন বলে ওই সূত্রের ভাষ্য। তাঁদের বক্তব্যে উন্নয়নকাজ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হয়। ফলে ঘটনাটিকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও নথি পর্যালোচনা জরুরি। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত: সিটি করপোরেশনের অভিযোগ, নিজস্ব জমিতে উন্নয়নকাজ শুরু করলেই একটি পক্ষ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সংস্থাটির দাবি, সরকারি জমি পুনরুদ্ধার করে নাগরিকদের ব্যবহারের উপযোগী করা এবং সেখানে স্থাপনা নির্মাণের লক্ষ্যেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জমিটি নিয়ে বিরোধের প্রকৃতি নির্ধারণে কেবল মালিকানার দাবি বা রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। জমির খতিয়ান, দাগ, নকশা, দখলসংক্রান্ত নথি, অনাপত্তিপত্র এবং আদালতের আদেশ এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবী নারীদের জন্য মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন জানিয়েছেন, নগরীর প্রাণকেন্দ্র বগুড়া রোডের উদ্ধার করা জমিতে কর্মজীবী নারীদের জন্য মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কর্মজীবী নারীদের জন্য ব্যবসার সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির স্বচ্ছতা, বরাদ্দপ্রক্রিয়া, নির্মাণমান ও জনসাধারণের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। রাজনৈতিক বিরোধের আড়ালে জমির স্বার্থ? জমি উদ্ধারের পর মানববন্ধন, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা এবং আদালতে রিট—ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা নিয়ে সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ধারণা, জমিটি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নকাজের ফলে দীর্ঘদিনের ভোগদখল থেকে সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিরোধ তৈরি হয়েছে। সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান শাকিলের বক্তব্য, সরকারি জমি নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য; কোনো ব্যক্তি এককভাবে তা ভোগদখল করতে পারেন না। অন্যদিকে, প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের ভাষ্য, নগর উন্নয়নের উদ্যোগে বাধা এলেও কর্মজীবী নারীদের জন্য মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হবে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আদালতের আদেশ অনুযায়ী নির্মাণকাজের আইনগত অবস্থান নিশ্চিত করা, জমির নথি জনসমক্ষে স্পষ্ট করা এবং ড্রেনেজ ও নাগরিক সুবিধা অক্ষুণ্ণ রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। এতে একদিকে সরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে জমি নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধ ও জনমনে বিভ্রান্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপব্যবস্থাপক এবং একসময় চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. আহম্মদুল্লাহকে ঘিরে সম্পদ অর্জন, প্রভাব খাটানো, নিয়োগে অনিয়ম এবং আর্থিক সুবিধা গ্রহণের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিজের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ গঠন, পরিবারের সদস্যদের নামে স্থাবর সম্পত্তি নিবন্ধন, সরকারি সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, বিভিন্ন ফাইল আটকে আর্থিক সুবিধা আদায় এবং ব্যাংক আমানত ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিপিসি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, তাদের কাছে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তপত্র পৌঁছেনি। সম্পদের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দলিল, ভূমি রেকর্ড এবং স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ফ্ল্যাট ও প্লটসহ একাধিক স্থাবর সম্পদের সঙ্গে আহম্মদুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে সাড়ে তিন কাঠার একটি প্লটে আটতলা ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। দলিল অনুযায়ী জমিটির মূল্য দেখানো হয়েছে ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। তবে স্থানীয়ভাবে জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য দলিলে উল্লেখিত মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। এই মূল্যায়ন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে নুসরাত জেবিন সিনথী বলেন, জমিটি তাঁর নামে রয়েছে এবং ভবন নির্মাণে ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পত্তি অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, আদাবরের একটি প্লট প্রথমে আহম্মদুল্লাহর শ্বশুরের নামে নিবন্ধিত হলেও পরে সেটি তাঁর স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া বরিশালের ঝালকাঠী জেলার গ্রামের বাড়িতে একটি ডুপ্লেক্স ভবন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিজমি এবং বরিশাল শহরেও একটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি দায়িত্ব ও অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, বিপিসি চেয়ারম্যানের পিএস থাকাকালে বিভিন্ন ক্রয়সংক্রান্ত অনুমোদনের ফাইল তাঁর মাধ্যমে চেয়ারম্যানের দপ্তরে যেত। একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখে আর্থিক সুবিধা আদায় করা হতো। বাংকার, রিফাইনারি ও বিল অনুমোদন একাধিক সূত্র দাবি করেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি সরবরাহকারী বাংকার ডিলার এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারির বিল দ্রুত অনুমোদনের বিনিময়ে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগে প্রভাবের অভিযোগ বিপিসির কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার দাবি, ২০১৯ সালের পর নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ২০২১ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ আহম্মদুল্লাহকে চট্টগ্রামে বদলির আদেশ দেন। তবে সেই আদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি পুনরায় পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান তাঁকে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে সংযুক্ত করেন। ব্যাংক আমানত নিয়ে অভিযোগ চেয়ারম্যানের সাবেক পিএস কে এম রিয়াজ রহমান গত ১ মার্চ জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে দেওয়া এক আবেদনে অভিযোগ করেন, আহম্মদুল্লাহর দায়িত্বকালে বিপিসির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এফডিআর ও এসএনডি হিসাব তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে রাখা হয়েছিল। আবেদনে আরও দাবি করা হয়, এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান আর্থিক ঝুঁকিতে পড়লেও ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিপিসির বক্তব্য বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, "আমি এখানে যোগদানের পর থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাইনি। দুদকেরও কোনো চিঠি আসেনি।" তিনি আরও বলেন, কোন ব্যাংকে কত এফডিআর বা এসএনডি রাখা হয়েছে, সে তথ্য জানতে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করতে হবে। বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে আহম্মদুল্লাহর বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোন বন্ধ থাকায় প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে কীভাবে একের পর এক ইয়াবার চালান ভেতরে প্রবেশ করছে—এই প্রশ্ন এখন শুধু কারা প্রশাসনের নয়, আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি নারী বন্দি সুবর্ণার কাছ থেকে ২১৫ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনার পর কারাগারের অভ্যন্তরে একটি সংঘবদ্ধ মাদক চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। এর কয়েকদিন আগেই আরেক বন্দির কাছ থেকেও ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল। এসব ঘটনায় কারাগারের দুই ডেপুটি জেলারসহ কয়েকজন কারারক্ষীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেননি এবং প্রশাসন বলছে, বিষয়টি তদন্তাধীন। এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা কারা সূত্র বলছে, ১০ জুন নারী বন্দি সুবর্ণার কাছ থেকে ২১৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এর আগে ৬ জুন কীর্তনখোলা-২ ভবনে বন্দি সুমন খানের কাছ থেকে আরও ১০টি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় ঘটনাটিসহ একাধিক মাদক উদ্ধারের ঘটনা অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রশাসন আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কারাগারের ভেতরে কীভাবে পৌঁছায় মাদক? বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুস্তরবিশিষ্ট। ফলে প্রশ্ন উঠছে—একাধিক তল্লাশি ও নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করে কীভাবে ইয়াবার মতো নিষিদ্ধ মাদক বন্দিদের হাতে পৌঁছায়? কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়ায় শুধু নিচু স্তরের কারারক্ষীরা নন, প্রশাসনের দায়িত্বশীল কিছু কর্মকর্তাও জড়িত থাকতে পারেন। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, দুই ডেপুটি জেলার সুমাইয়া ও আনন্দ শীল ছাড়াও কয়েকজন কারারক্ষী ও নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা সদস্য এই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। '২০ হাজার টাকায় আপস'—অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কারাগারের এক দায়িত্বশীল সূত্র দাবি করেছে, ৬ জুন বন্দি সুমন খানের কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত না করে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে আপস করা হয়। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল দুই ডেপুটি জেলার নির্দেশনায় এবং এতে কারাগারের গোয়েন্দা দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কারারক্ষী ভূমিকা রাখেন। অভিযোগের মুখে কর্মকর্তারা ডেপুটি জেলার আনন্দ শীলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। অপরদিকে ডেপুটি জেলার সুমাইয়া ফোনে বলেন, তিনি ব্যস্ত আছেন এবং পরে কথা বলবেন। পরে আর যোগাযোগ করেননি। কারাগারের সর্বপ্রধান রক্ষী গাজী রশিদের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। জেল সুপার যা বললেন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা বন্দিদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, নারী বন্দি সুবর্ণার বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কারারক্ষী মৌ ও শারমিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কারাগারের ভেতরে মাদক প্রবেশ এবং কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বিষয়টি তদন্তাধীন। কারাগারকে মাদকমুক্ত করতে এবং অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।" ডিআইজি প্রিজনের নীরবতা কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) অসীম কান্ত পালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে ফোন রিসিভ করলেও বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের মাদককাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুরোনো অভিযোগ, নতুন প্রশ্ন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এর আগেও একাধিকবার ইয়াবা ও স্মার্টফোন উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। কারা প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে অতীতেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ঘটনাগুলো আবারও প্রশ্ন তুলেছে—কঠোর নিরাপত্তার আওতায় থাকা একটি কারাগারে বারবার মাদক প্রবেশের নেপথ্যে কেবল বিচ্ছিন্ন অনিয়ম, নাকি সংঘবদ্ধ কোনো চক্র কাজ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে চলমান তদন্তের ফলাফলের ওপর। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত বলে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকা, দাপ্তরিক কার্যক্রমে বিলম্ব সৃষ্টি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকিতে ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং কার্যালয়ের কিছু কর্মচারী এমন অভিযোগ করলেও, এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অফিসে গিয়ে যা দেখা গেল সম্প্রতি ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়ে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর উপস্থিতি যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। সোমবার (২২ জুন) সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে তাঁর দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, কক্ষটি তালাবদ্ধ। দায়িত্বরত এক কর্মচারী জানান, ওই সময় পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী অফিসে আসেননি। কার্যালয়ের অন্যান্য কক্ষে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত থাকলেও নির্বাহী প্রকৌশলীর অবস্থান সম্পর্কে তারা নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। কয়েকজন বলেন, তিনি কখন অফিসে আসবেন—সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। যোগাযোগের চেষ্টা, সাড়া মেলেনি অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ঠিকাদারদের অভিযোগ কী? নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার দাবি করেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ফাইল অনুমোদন, কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা, মাপজোক সংক্রান্ত নথি যাচাই এবং বিল অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় এসব কাজ আটকে যাচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন। একজন ঠিকাদার বলেন, "আমরা কাজ শেষ করার পরও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। অফিসে এসে প্রধান কর্মকর্তাকে না পেলে স্বাভাবিকভাবেই কাজের গতি কমে যায়। এতে শুধু ঠিকাদার নয়, সরকারের প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।" আরেকজনের দাবি, জরুরি ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচিও প্রভাবিত হচ্ছে। বিল পরিশোধেও বিলম্বের অভিযোগ কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, কাজ শেষ করার পর বিল অনুমোদন ও পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় তারা আর্থিক চাপে পড়ছেন। তাদের ভাষ্য, নির্মাণসামগ্রী কেনা, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নির্বাহে নিয়মিত অর্থপ্রবাহ প্রয়োজন হয়। বিল আটকে গেলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হয়। কর্মচারীদের সতর্ক অবস্থান কার্যালয়ের কয়েকজন অধস্তন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। একজন কর্মচারী বলেন, "তিনি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি কখন অফিসে আসবেন বা যাবেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করার এখতিয়ার আমাদের নেই।" আরেকজন বলেন, "এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাই না।" তদারকি নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয় কয়েকজন পর্যবেক্ষক মনে করেন, জেলার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পদটি সরকারি ভবন নির্মাণ, সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তার অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে অনেক সময় মাঠপর্যায়ের কাজের নিয়মিত তদারকি ব্যাহত হয়। তবে কোনো প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ হয়েছে বা নির্দিষ্ট অনিয়ম ঘটেছে—এমন প্রমাণ অভিযোগকারীরা উপস্থাপন করতে পারেননি। তারা মূলত নিয়মিত তদারকির অভাবের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন। যোগাযোগ নিয়েও অভিযোগ কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অনেক সময় নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোনে পাওয়া যায় না। বিধিমালা কী বলছে? সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন এবং কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা প্রত্যাশিত। তবে কোনো কর্মকর্তা নির্দিষ্ট দিনে অফিসে অনুপস্থিত থাকলে তার পেছনে সরকারি দায়িত্ব, দাপ্তরিক সফর, অনুমোদিত ছুটি বা অন্য প্রশাসনিক কারণ থাকতে পারে। চলমান প্রকল্পের অবস্থা ফরিদপুরে বর্তমানে সরকারি ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে এসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, কিংবা নির্বাহী প্রকৌশলীর উপস্থিতির সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তদন্তের দাবি অভিযোগকারীদের মতে, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের বক্তব্য, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, যাতে বিভ্রান্তির অবসান ঘটে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠের বাইরেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তবে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেখানে ফুটবল-সমর্থনের প্রসঙ্গও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বেতমোর ইউনিয়নের এক প্রবাসীর স্ত্রীর বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির সঙ্গে ১২ দিনের ভ্রমণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্বামী বিদেশে অবস্থানকালে ওই নারী এক ব্যক্তির সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আইনগত কোনো সিদ্ধান্ত বা তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তিকে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা শুরু হয়। পরে ছবিটি সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট নারী তার সঙ্গে ওই ব্যক্তির সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, পরিবার যদি তাকে স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বলে, তাহলে তিনি ডিভোর্সের পর ওই ব্যক্তির সঙ্গে সংসার করার বিষয়ে বিবেচনা করবেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ঘটনাটি পারিবারিক ও সামাজিক দুই দিক থেকেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এবং আইনগত অবস্থান বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর নকআউট পর্বে আর জয়ের দেখা পায়নি স্পেন। দীর্ঘ ১৬ বছরের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্প্যানিশরা। লস অ্যাঞ্জেলেসের ইনগেলউডে সোফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে উঠেছে তারা। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে স্পেন। সেই চাপের ফল আসে ৩১তম মিনিটে। পেদ্রির পরিবর্তে একাদশে সুযোগ পাওয়া ফাবিয়ান রুইজ দলের হয়ে প্রথম গোলটি করেন। ডান প্রান্ত দিয়ে লামিন ইয়ামালের কাটব্যাক থেকে বল পান দানি অলমো। তার নেওয়া শট প্রথমে ঠেকিয়ে দেন বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। তবে ফিরতি বলে বক্সে থাকা রুইজ নিখুঁত শটে জাল খুঁজে নেন। গোল হজমের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় বেলজিয়াম। ৪০তম মিনিটে ডান দিক থেকে আসা একটি ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে সমতাসূচক গোল করেন শার্ল ডি কেটেলারা। আগের ম্যাচেও জোড়া গোল করা এই ফরোয়ার্ড আবারও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের হয়ে অবদান রাখেন। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়। দ্বিতীয়ার্ধে বেলজিয়ামের জন্য বড় ধাক্কা আসে ৭০তম মিনিটে। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। তার পরিবর্তে গোলপোস্টের দায়িত্ব নেন সিন লেমেন্স। এর কিছুক্ষণ পরই গোল হজমের বড় ঝুঁকিতে পড়েছিল স্পেন। গোলরক্ষক উনাই সিমন বক্সের বাইরে চলে আসার সুযোগে অ্যালেক্সান্ডার সালমেকার্স রোমেলু লুকাকুর উদ্দেশে বিপজ্জনক ক্রস বাড়ান। তবে সময়মতো হস্তক্ষেপ করে নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দেন এইমেরিক লাপোর্তে। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই আসে নির্ণায়ক মুহূর্ত। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে পাউ কুবারসির শট বদলি গোলরক্ষক সিন লেমেন্স ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বলে মিকেল মেরিনো কোনো ভুল করেননি। কাছ থেকে নেওয়া শটে স্পেনকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। আগের ম্যাচে পর্তুগালের বিদায় নিশ্চিত করা মেরিনো এবারও স্পেনের জয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন। তার গোলেই দীর্ঘদিনের নকআউট হতাশা কাটিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে স্পেন। অন্যদিকে, লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে বেলজিয়ামকে। আর স্পেনের জন্য এই জয় শুধু একটি সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেনি, ২০১০ সালের পর নকআউট পর্বে জমে থাকা দীর্ঘ অপেক্ষারও অবসান ঘটিয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : প্রথমার্ধে এক গোলে পিছিয়ে পড়া, পেনাল্টি থেকে গোলের সুযোগ হাতছাড়া, প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের একের পর এক অসাধারণ সেভ—সব মিলিয়ে শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয়ার্ধে আরও একটি গোল হজম করার পর বিদায়ের শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রত্যাবর্তনের গল্পই বড় হয়ে ওঠে। শেষ ১৫ মিনিটে নাটকীয়ভাবে ম্যাচে ফিরে এসে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় লিওনেল স্ক্যালোনির দল। শুরু থেকেই ধাক্কা বল দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও ম্যাচের ১৫ মিনিটেই পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। শর্ট কর্নার থেকে আতিয়ার ক্রসে নিখুঁত হেডে গোল করেন ইব্রাহিম। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হারের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে গোল হজম করল আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি মিস, তবুও থামেনি আক্রমণ ২১ মিনিটে সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার সামনে। পেনাল্টি আদায় করলেও স্পট কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন লিওনেল মেসি। তার শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মিসরের গোলরক্ষক শোবাইর। এরপরও একের পর এক আক্রমণ চালায় আর্জেন্টিনা। ২৮ মিনিটে রদ্রিগো ডি পলের ক্রস থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড এবং ৩৯ মিনিটে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর কাটব্যাক থেকে হুলিয়ান আলভারেজের শট—দুটিই অসাধারণ সেভে রুখে দেন শোবাইর। ফলে ১-০ ব্যবধানের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় মিসর। দ্বিতীয় ধাক্কা, তারপর বদলে যায় ম্যাচ দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে জিকোর গোলে ব্যবধান ২-০ হলে আর্জেন্টিনার বিদায় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ম্যাচের শেষভাগে বদলে যায় দৃশ্যপট। ৭৯ মিনিটে লিওনেল মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে শক্তিশালী হেডে ব্যবধান কমান ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। সেই গোল নতুন করে আত্মবিশ্বাস জোগায় আর্জেন্টিনাকে। চার মিনিটে মেসি ম্যাজিক ৮৩ মিনিটে মিসরের ডিফেন্ডারদের ভুলের সুযোগ কাজে লাগান মেসি। গনসালো মন্তিয়েলের পাস পেয়ে প্রথম ছোঁয়ায় জোরালো শট নেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। শোবাইর বল স্পর্শ করলেও সেটি ক্রসবারে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। চার মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল শোধ করে ২-২ সমতায় ফেরে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। শেষ হাসি এনসো ফার্নান্দেসের নাটকীয়তার শেষ অধ্যায় লেখা হয় যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে। এনসো ফার্নান্দেসের গোলে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত সেই লিড ধরে রেখে অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচের পরিসংখ্যান বলছে, বল দখল ও আক্রমণে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তবে প্রথমার্ধে গোলরক্ষক শোবাইরের দুর্দান্ত নৈপুণ্য এবং মেসির পেনাল্টি মিস ম্যাচটিকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পরও আর্জেন্টিনার ধৈর্য, আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার ক্ষমতাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়।
ব্রাজিলের বিদায়ে অবাক নয় আর্জেন্টিনা, ‘কোনো ম্যাচই সহজ নয়’: পারেদেস ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেছে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের পরাজয়ে। টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ের মধ্য দিয়ে টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দলটিকে। তবে ব্রাজিলের এই বিদায়ে বিস্মিত নয় আর্জেন্টিনা। দলের মিডফিল্ডার Leandro Paredes মনে করছেন, বর্তমান বিশ্বকাপে কোনো দলকেই সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পারেদেস বলেন, “গতকাল ব্রাজিল বাদ পড়ায় আমরা অবাক হইনি। কারণ আমরা জানি, প্রতিটি জাতীয় দলই এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এই বিশ্বকাপে যে কেউ যে কাউকে হারাতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “ব্রাজিলের বাদ পড়া অবশ্যই বড় খবর। কিন্তু এখানে কোনো ম্যাচই সহজ নয়।” মিশরের বিপক্ষে সতর্ক আর্জেন্টিনা শেষ আটের লড়াইয়ে মঙ্গলবার আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ Egypt national football team। ম্যাচটির আগে প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন পারেদেস। তিনি বলেন, “কেপ ভার্দে আমাদের শিখিয়েছে, কোনো ম্যাচই সহজ হবে না। আমরা এটা আগে থেকেই জানতাম। মিশর নিশ্চিতভাবেই খুব কঠিন প্রতিপক্ষ হবে।” আর্জেন্টিনা মিডফিল্ডারের মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচেই চাপ থাকে এবং সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলা সম্ভব নয়। “আমরা সেরা পারফরম্যান্স দিতে চাই। সব সময় ভালো খেলা যায় না, সব সময় নিজেদের চাওয়া অনুযায়ী সবকিছু হয় না। মাঝেমধ্যে কষ্ট করতে হয়। তবে জয় পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ, আর এভাবে জেতাটাও গুরুত্বপূর্ণ।” একাদশে থাকার অপেক্ষায় পারেদেস Leandro Paredes কেপ ভার্দের বিপক্ষে ভালো পারফরম্যান্স দেখানোর পর মিশরের বিপক্ষে শুরুর একাদশে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নিজের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, “আমি সব সময় নিজেকে একাদশে দেখতে চাই। প্রতিদিন অনুশীলনে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে কোচের বিবেচনায় থাকতে পারি।” তবে দলের সিদ্ধান্তের বিষয়টিও মেনে নিচ্ছেন তিনি। পারেদেস বলেন, “আমরা মোট ২৬ জন খেলোয়াড়। কোচকে ১১ জন বেছে নিতে হয়। তাই অপেক্ষা করাটাই এখন আমার কাজ।” শেষ আটের পথে আর্জেন্টিনা-মিশর লড়াই মঙ্গলবার আটলান্টা স্টেডিয়ামে শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা ও মিশর।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আগেই জানিয়েছিলেন, এটাই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ। ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা আর পূরণ হলো না। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে রোনালদোর পর্তুগাল। ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন সেই জয়ে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে দীর্ঘ সময় গোলের দেখা পায়নি কোনো দল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ৯০তম মিনিটে মিকেল মেরিনোর করা একমাত্র গোলই নির্ধারণ করে দেয় দুই দলের ভাগ্য। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক স্পেন, সুযোগ নষ্ট পর্তুগালের ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল স্পেন। অষ্টম মিনিটে দানি অলমোর দুর্দান্ত থ্রু পাস থেকে মিকেল ওইয়ারজাবাল একা গোলরক্ষকের সামনে চলে যান। তবে তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর ১২ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে সুযোগ আসে পর্তুগালের সামনে। বক্সের ডান দিকে বল পেয়ে জোরালো শট নিয়েছিলেন রোনালদো। কিন্তু স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন তা সহজেই রুখে দেন। ১৬ মিনিটে পর্তুগালকে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেন গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। প্রথমে ইয়ামালের শট ঠেকানোর পর ফিরতি বলে বায়েনার প্রচেষ্টাও প্রতিহত করেন তিনি। প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবারও গোলের কাছাকাছি পৌঁছেছিল পর্তুগাল। জোয়াও ফেলিক্সের পাস থেকে রোনালদোর বাইসাইকেল কিক গোলমুখে যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্দান্ত ঝাঁপিয়ে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন উনাই সিমন। গোলশূন্য অবস্থাতেই শেষ হয় প্রথমার্ধ। দ্বিতীয়ার্ধে চাপ বাড়ায় স্পেন, চোটে ধাক্কা খায় পর্তুগাল বিরতির পর আক্রমণের ধার বাড়ায় দুই দলই। বক্সের বাইরে থেকে নুনো মেন্দেসের নেওয়া শট গোলের পথে থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ৫৫ মিনিটের দিকে চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন নুনো মেন্দেস। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই ঘটনা পর্তুগালের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। ৭২ মিনিটে ফ্রি কিক থেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। ইয়ামালের নেওয়া শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন দিয়োগো কস্তা। শেষ মুহূর্তে মেরিনোর গোলে স্বপ্নভঙ্গ রোনালদোর ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই আসে নির্ধারণী মুহূর্ত। ৯০ মিনিটে ফ্রি কিক থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগায় স্পেন। ফেরান তরেসের বাড়ানো বল পেয়ে নিচু ও শক্তিশালী শটে জালে পাঠান মিকেল মেরিনো। শেষ মুহূর্তে সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েছিল পর্তুগাল। বের্নার্দো সিলভার হেডার অল্পের জন্য বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় স্পেন। আর বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নেয় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে রোনালদোর বিশ্বজয়ের স্বপ্ন শেষ হলো নকআউট পর্বেই।
নেইমার-রোনালদোর বিদায়ে বিশ্বকাপে শেষ হলো এক যুগের গল্প ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বিশ্ব ফুটবলের আকাশে যে দুই নাম গত দুই দশক ধরে আলো ছড়িয়েছে, তাদের একজন ব্রাজিলের নেইমার, অন্যজন পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সময়ের নিয়মে এবার সেই অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা লেখা হয়ে গেল। বিশ্বকাপের মঞ্চে এটাই যে তাদের শেষ উপস্থিতি হতে যাচ্ছে, তা আগেই পরিষ্কার ছিল। নেইমার ও রোনালদো—দুজনেই জানতেন, এই আসর হতে পারে জাতীয় দলের জার্সিতে তাদের শেষ বড় সুযোগ। কিন্তু বিদায়ের মঞ্চে দুজনের ভাগ্যই হয়েছে একই রকম। শিরোপা তো দূরের কথা, শেষ বিশ্বকাপ থেকেও খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাদের। নেইমারের শেষ অধ্যায়: “সব শেষ” ব্রাজিলের হয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপ ট্রফি জয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না নেইমারের। নরওয়ের বিপক্ষে হারের পরই আসে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় ঘোষণা। ম্যাচ শেষে নেইমার জানান, জাতীয় দলের হয়ে তার পথচলা এখানেই শেষ। নেইমার বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি। আমি চেষ্টা করেছি। মেট লাইফ স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ হলো। এখন সব শেষ।” এই কথার মধ্য দিয়ে যেন শেষ হয়ে গেল ব্রাজিলের এক প্রজন্মের প্রতীকী অধ্যায়। যিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা ছিলেন, সেই নেইমার বিদায় নিলেন অপূর্ণতা নিয়েই। রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপেও অপূর্ণতা নেইমারের বিদায়ের পর নজর ছিল আরেক কিংবদন্তির দিকে—ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আগেই জানিয়েছিলেন, এটাই হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ। ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসাটাই ছিল এক অনন্য অধ্যায়। কিন্তু শেষবারের মতো বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়িয়েও নিজের দলকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে পারেননি তিনি। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোলে বিদায় নেয় পর্তুগাল। মিকেল মেরিনোর গোল শেষ করে দেয় পর্তুগালের লড়াই। তবে ম্যাচে নিজের ছাপ রেখেছিলেন রোনালদো। দুর্দান্ত এক বাইসাইকেল কিক দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমনের অসাধারণ দক্ষতায় সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। মেসি-নেইমার-রোনালদো যুগের সমাপ্তি এক সময় বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তিনটি নাম—লিওনেল মেসি, নেইমার ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এই তিন তারকাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পগুলোর একটি। তারা শুধু ম্যাচ জেতাননি, বদলে দিয়েছেন ফুটবল দেখার ধরন। কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল তাদের নাম। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই যুগও এখন শেষের পথে। নতুন তারকাদের হাতে ভবিষ্যতের ফুটবল নেইমার ও রোনালদোর বিদায়ের পর বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চ এখন নতুন প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে আছে। তরুণ প্রতিভাদের মধ্যে লামিন ইয়ামাল, আর্লিং হালান্ডের মতো খেলোয়াড়রা ইতোমধ্যে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। তাদের ঘিরেই তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের নতুন গল্প। নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নতুন নায়ক এবং নতুন ফুটবল দর্শনের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ব। বিশ্বকাপের বাকি গল্প হবে নতুন মুখদের নিয়ে নেইমার ও রোনালদো ছাড়া বিশ্বকাপের পরবর্তী পথ কেমন হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। যে দুই তারকা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলেন, তাদের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে তৈরি করবে এক ধরনের শূন্যতা। তবে ফুটবলের ইতিহাস বলে, একজন কিংবদন্তির বিদায়ের পরই জন্ম নেয় নতুন কোনো তারকার গল্প। বিশ্বকাপের পরবর্তী অধ্যায় এখন অপেক্ষা করছে নতুন মুখদের হাতে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি ক্রয়চুক্তি ঘিরে স্বজনপ্রীতি, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ। নথি অনুযায়ী, নৌবাহিনী পরিচালিত ডিইডব্লিউয়ের সঙ্গে চুক্তির পর বেসরকারি অংশীদারদের মধ্যে মুনাফা বণ্টনের ব্যবস্থা; আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী সংস্থা এসজিএসের পরীক্ষায় হুইলচেয়ারের চালান ‘মানদণ্ডবহির্ভূত’ হিসেবে চিহ্নিত। ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি কেনাকাটায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি, বাজারদরের তুলনায় বেশি মূল্য নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী সংস্থার পরীক্ষায় ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পণ্য আমদানির অভিযোগ উঠেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি বড় ক্রয়চুক্তি ঘিরে। চুক্তি দুটির মোট মূল্য ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। নথিপত্রের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের (ডিইডব্লিউ) মাধ্যমে ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট এবং ২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিন কেনার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য, সরবরাহকারীদের সক্ষমতা এবং সরকারি অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্ন। বিশেষ করে ট্যাবলেট সরবরাহের সরকারি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ডিইডব্লিউ, স্যালস্ট্রা লিমিটেড ও বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ত্রিপক্ষীয় ব্যবসায়িক চুক্তি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ওই চুক্তির বর্ণনা অনুযায়ী, সরকারি কাজ এনে দেওয়ার বিনিময়ে ডিইডব্লিউ চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ পাবে। অন্যদিকে, পণ্য সরবরাহের ব্যয় ও নির্ধারিত খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট মুনাফা পাওয়ার কথা বুরাক ব্রেকের। বুরাক ব্রেকের মালিকানায় রয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বকুলের ভাই সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকতের ছেলে ও মেয়ে। ফলে সরকারি ক্রয়চুক্তির আর্থিক সুবিধা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি পরিবারের প্রতিষ্ঠানের কাছে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। চুক্তির পর গোপন ব্যবসায়িক সমঝোতা নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ডিইডব্লিউয়ের মধ্যে ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার একটি চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় প্রতিটি ৪৮ হাজার টাকা দরে ৬৬ হাজার ৮১৫টি অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট সরবরাহের দায়িত্ব পায় ডিইডব্লিউ। চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন, ২৪ আগস্ট, ডিইডব্লিউ, ঢাকাভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্যালস্ট্রা লিমিটেড এবং বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে ছয় পৃষ্ঠার একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির বিবরণ অনুযায়ী, ডিইডব্লিউ কোনো মূলধন বিনিয়োগ করবে না, পরিচালন ব্যয় বহন করবে না এবং ব্যবসার লাভ-ক্ষতির দায়ও নেবে না। সরকারি চুক্তি এনে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি মোট চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ পাওয়ার কথা—যার পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ট্যাবলেট আমদানি ও সরবরাহের জন্য স্যালস্ট্রা লিমিটেডের বরাদ্দ ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সব কর, নির্ধারিত পরিশোধ ও ব্যাংক চার্জ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট মুনাফা বুরাক ব্রেক লিমিটেডের দুটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার কথা বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ২০ শতাংশ করের একটি আনুমানিক হিসাব ধরে বুরাক ব্রেকের সম্ভাব্য আয় দেখানো হয়েছে ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে এটি চূড়ান্ত নিরীক্ষিত মুনাফা নয়; প্রকৃত আয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব, ব্যয়, কর ও ব্যাংক লেনদেন যাচাই প্রয়োজন। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, সরকারি ক্রয়চুক্তিতে ডিইডব্লিউয়ের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, বেসরকারি অংশীদার নির্বাচনের ভিত্তি কী এবং সরকারি কাজ এনে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থাটি প্রযোজ্য ক্রয়বিধি ও চুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল মুনাফার সুযোগ? বুরাক ব্রেক লিমিটেড নিবন্ধিত হয় ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর। নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে—অ্যাপার্টমেন্ট সি-২, বাড়ি ১-এ, রোড ৭৯, গুলশান-২, ঢাকা। নিবন্ধনের সময় প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালক সরদার রাফিন এস এ হোসেন ও অনিকা রাইদা লিয়ার বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ২৩ বছর ছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বকুলের ভাতিজা ও ভাতিজি। তাঁদের বাবা সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকত নরসিংদী জেলা বিএনপির সহসভাপতি এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছোট ভাই। আইটি সরঞ্জাম বা ট্যাবলেট সরবরাহে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব অভিজ্ঞতা, নিজস্ব ওয়েবসাইট কিংবা আগের কাজের রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানী তথ্যে দাবি করা হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য শতকোটি টাকার সরকারি ক্রয়চুক্তি থেকে বিপুল মুনাফা পাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা সীমিত থাকা নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে, তার কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং চুক্তির আর্থিক শর্তগুলো অনুমোদিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। সরকারি দপ্তরে লিয়াকতের উপস্থিতি, বৈঠকের ছবি চুক্তি ও ক্রয়নথিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুল বা তাঁর ভাই লিয়াকতের নাম সরাসরি নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। তবে ক্রয়প্রক্রিয়া চলাকালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ এবং নৌবাহিনীর পোশাক পরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে লিয়াকতকে একই টেবিলে বসে আলোচনা করতে দেখা গেছে—এমন ছবি সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের আগে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের দপ্তরেও লিয়াকতের বৈঠকের ছবি রয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি দপ্তরে তাঁর উপস্থিতি এবং ক্রয়চুক্তিতে পরিবারের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি একই সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ওই বৈঠকগুলোর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল কি না। লিয়াকত চুক্তিতে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুলও এ প্রক্রিয়ায় নিজের প্রত্যক্ষ প্রভাব বা সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও সচিবের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তাঁদের বক্তব্য, অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার দায়িত্ব বণ্টন পরীক্ষা করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা কি উপেক্ষিত হয়েছে? অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে ৪০টিরও বেশি মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থায় একটি গোপন চিঠি পাঠানো হয়। এতে সশস্ত্র বাহিনী বা সামরিক বাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সরকারি কেনাকাটায় যুক্ত করার আগে প্রধানমন্ত্রীর পূর্বানুমোদন নেওয়ার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও নৌবাহিনী প্রধানের কাছে পাঠানো ওই নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ, অভিযোগ অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইমপ্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং’ বা এসপিআইআরআইটি (SPIRIT) প্রকল্পের ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার ট্যাবলেট চুক্তি এবং প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিনের চুক্তির ক্ষেত্রে ওই পূর্বানুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি। নির্দেশনার প্রকৃত ভাষা, প্রযোজ্যতার পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির অনুমোদন-নথি পরীক্ষা ছাড়া একে নিশ্চিতভাবে নির্দেশনা লঙ্ঘন বলা যায় না। তবে প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন না থাকলে তা ক্রয়প্রক্রিয়ার বৈধতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে পারে। বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ট্যাবলেট? সরকারি চুক্তিতে প্রতিটি এক্সট্রা এক্সটি ওয়ান (Xtra XT1) ট্যাবলেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা। কীবোর্ড ও স্টাইলাসসহ ট্যাবলেটটির জন্য এই মূল্য ধরা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ডিইডব্লিউ, স্যালস্ট্রা ও বুরাক ব্রেকের মধ্যকার যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তিতে স্যালস্ট্রার সরবরাহমূল্য দেখানো হয়েছে প্রতিটি ২৬ হাজার ৮২৮ টাকা। প্রতিবেদনে তুলনার জন্য আরও দুটি মডেলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—কীবোর্ডসহ স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব এ৯ প্লাসের দাম ৩৪ হাজার টাকা এবং লেনোভো ট্যাব এম১১-এর দাম ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। এই তুলনার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের ব্যবধান প্রায় ৯৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট মডেল, কনফিগারেশন, ওয়ারেন্টি, সফটওয়্যার, সিম-সুবিধা, জিও-ট্যাগিং, আমদানি ব্যয়, কর ও সরবরাহ-পরবর্তী সেবার খরচ এক কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও সরকারি চুক্তিমূল্য ও যৌথ চুক্তিতে উল্লেখিত সরবরাহমূল্যের ব্যবধান কেন এত বেশি, তার ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি অর্থে কেনা প্রতিটি ডিভাইসের প্রকৃত ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রাপ্য অর্থ এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগীদের হিসাব প্রকাশ করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। হুইলচেয়ারের দাম নিয়েও প্রশ্ন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ডিইডব্লিউয়ের মাধ্যমে মোট ২৬ হাজার হুইলচেয়ার সরবরাহের কার্যক্রম নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২১ হাজার প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের জন্য বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি হুইলচেয়ারের নির্ধারিত মূল্য ৮ হাজার ১৭৫ টাকা। অন্যদিকে, অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, ঢাকার খুচরা বাজারে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি ফোল্ডিং হুইলচেয়ার ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। চীনের বিভিন্ন কারখানা থেকে ১০টির বেশি হুইলচেয়ার একসঙ্গে অর্ডার করলে প্রতিটির দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। এই ব্যবধান থেকে সরকারি কেনাকাটায় অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি সরবরাহের হুইলচেয়ারের উপকরণ, ধারণক্ষমতা, মান, ওয়ারেন্টি, পরিবহন, আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য সেবা খুচরা পণ্যের সঙ্গে তুলনীয় কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। একই ক্রয়কার্যক্রমে ২ হাজার পা-চালিত সেলাই মেশিন কেনা হয়েছে প্রতিটি ১৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে। পণ্যের বিবরণে প্রতি মিনিটে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার সেলাইয়ের গতির দাবি করা হলেও উল্লেখিত সিঙ্গার ১৫সিএইচ১ মডেলের সর্বোচ্চ গতি ১ হাজার বলে অনুসন্ধানী তথ্যে দাবি করা হয়েছে। মডেলের প্রকৃত কারিগরি বিবরণ, প্রস্তুতকারকের স্পেসিফিকেশন এবং সরবরাহকৃত মেশিনের পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করলে এই অসামঞ্জস্যের প্রকৃতি বোঝা যাবে। ছয় দিনের মধ্যে কার্যাদেশ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৪ মার্চের নির্দেশনার পরও হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিন কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। ডিইডব্লিউ ৪ জুন প্রস্তাব জমা দেয় এবং মাত্র ছয় দিনের মাথায়, ১০ জুন সরবরাহের কার্যাদেশ পায়। এত অল্প সময়ে প্রস্তাব যাচাই, পণ্যের মান মূল্যায়ন, মূল্য বিশ্লেষণ, অনুমোদন ও চুক্তির শর্ত নির্ধারণ কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দ্রুত কার্যাদেশ দেওয়া নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়; কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া না থাকা এবং পণ্যের মান নিয়ে পরবর্তী অভিযোগের সঙ্গে সময়রেখাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় হুইলচেয়ার ‘মানদণ্ডবহির্ভূত’ হুইলচেয়ার কেনাকাটার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে আন্তর্জাতিক মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান এসজিএসের (SGS) পরীক্ষার প্রতিবেদন থেকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর এসজিএস ১ হাজার ৫৪৮টি হুইলচেয়ারের একটি চালান থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ১২৫টি নমুনা পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় ১২৫টির মধ্যে ৩০টিতে গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ত্রুটির মধ্যে ছিল অনিরাপদ চাকা ও ব্রেক। এ ছাড়া পরীক্ষার সময় ৬৮ শতাংশ হুইলচেয়ারের আসন ও পেছনের অংশে লোহার তারের উন্মুক্ত অংশ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে। নমুনাগুলোর আসনের কিনারায় ধারালো ও বিপজ্জনক ধাতব অংশও ছিল, যা ব্যবহারকারীদের আঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাকার মান পরীক্ষা করতে কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধা দেয় এবং ডিইডব্লিউ পণ্যের স্পেসিফিকেশন সরবরাহ করেনি। এসজিএসের প্রতিবেদনে নমুনাগুলোতে উন্মুক্ত ধাতব অংশের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ রয়েছে। ক্রয়সংক্রান্ত মানদণ্ড অনুযায়ী, ১২৫টি নমুনার মধ্যে সাতটির বেশি ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেলে চালান বাতিল করার কথা বলে অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই মানদণ্ড প্রযোজ্য হলে ৩০টি গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ নমুনা পাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসজিএস ওই ১ হাজার ৫৪৮টি হুইলচেয়ারের চালানকে ‘Not-Conform’ বা নির্ধারিত মানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে ইমেইলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ কপি, নমুনা নির্বাচনের পদ্ধতি, পরীক্ষার মানদণ্ড এবং এসজিএসের ইমেইল সরাসরি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা ডিইডব্লিউকে পরীক্ষার ফলাফলের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। অভিযোগ অনুযায়ী, এসজিএসের ছাড়পত্র না থাকা সত্ত্বেও ত্রুটিপূর্ণ চালানের হুইলচেয়ার বাংলাদেশে আনা হয়েছে এবং শাহীনবাগে নৌবাহিনীর একটি ভবনের নিচে রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য কেনা পণ্যের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল আর্থিক অনিয়মের বিষয় নয়; ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। পুরোনো বিধিমালার ধারা, এক দিনে মূল্যায়ন ট্যাবলেট কেনার চুক্তিতে ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮’-এর ৫৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে বলে নথিতে দাবি করা হয়েছে। একই তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫ কার্যকর হওয়ায় আগের বিধিমালা বাতিল হয়েছিল। এখানে দুটি বিষয় যাচাই করা জরুরি: সংশ্লিষ্ট তারিখে কার্যকর বিধিমালার সঠিক নাম ও কার্যকারিতা এবং চুক্তিতে উল্লিখিত ৫৪ ধারার প্রকৃত প্রয়োগ। বিধিমালার কার্যকর হওয়ার তারিখ বা ধারা ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকলে তা নথি প্রস্তুত ও আইনি যাচাইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে শুধু ধারার উল্লেখ দেখে পুরো চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করা যায় না। নথিতে আরও বলা হয়েছে, ১০ আগস্ট সকাল ১১টায় মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এরপর এক দিনের মধ্যে একক উৎস থেকে দরপ্রস্তাব খোলা, মূল্যায়ন এবং প্রস্তাবিত ৪৯ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪৮ হাজার টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। এক হাজার টাকা কমানোর এই পদক্ষেপকে অনুসন্ধানী তথ্যে লোকদেখানো মূল্যছাড় বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি, বাজার যাচাই, কারিগরি মূল্যায়ন ও অনুমোদনের নথি পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে, এই ছাড় প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়নের ফল ছিল, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা। সরকারি টেশিসের প্রস্তাব বাতিল কেন? সরকারি টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) ৯ জুলাই সরাসরি ট্যাবলেট সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সেই প্রস্তাব বাতিল করে ডিইডব্লিউ ও তার বেসরকারি অংশীদারকে সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রস্তাব বাতিলের কারণ কী ছিল—তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য, কারিগরি সক্ষমতা, সময়মতো সরবরাহ, ওয়ারেন্টি এবং প্রকল্পের শর্তের ভিত্তিতে তুলনামূলক মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, সেই নথি প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা যাচাই করা সম্ভব হবে। ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়েও অস্বাভাবিকতা সরকারি চুক্তিতে ডিইডব্লিউ সরবরাহকারী হিসেবে থাকলেও চুক্তি স্বাক্ষরের চার দিন আগে, ১৯ আগস্ট, স্যালস্ট্রার অনুরোধে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকার পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দেয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। হুইলচেয়ার চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলামার্ক লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নৌবাহিনীর পক্ষ হয়ে ২ কোটি ২০ লাখ টাকার গ্যারান্টি দেয় বলেও দাবি করা হয়েছে। এই দুই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি, গ্যারান্টির শর্ত, সুবিধাভোগী, দায় বহনের কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ক্রয়চুক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা প্রচলিত নিয়মের বাইরে ছিল কি না, তা নির্ধারণে প্রযোজ্য বিধি ও মূল ব্যাংক নথি অপরিহার্য। নতুন ক্রয়বিধিতে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকানার তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ডিইডব্লিউ সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তার সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি অংশীদারদের প্রকৃত মালিকানা ও আর্থিক সুবিধাভোগীর তথ্য সরকারি নথিতে যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চুক্তিতে নাম থাকা সরবরাহকারী এবং বাস্তবে পণ্য সরবরাহ, অর্থ গ্রহণ ও মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক পরিষ্কার না হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ট্যাবলেট সরবরাহে বিলম্ব ৬৬ হাজার ৮১৫টি ট্যাবলেটের মধ্যে মাত্র ৯ হাজারটি সরবরাহ করা হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি ট্যাবলেটে সিম কার্ড, জিও-ট্যাগিং, গ্রামীণফোনের স্টিকার এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার সংযোজন করতে প্রায় ২২ মিনিট সময় লাগছে বলে দাবি করে ডিইডব্লিউ সরবরাহের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। এই অগ্রগতি প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা জানতে কার্যাদেশের সময়সীমা, সরবরাহের ধাপ, বিলম্বের কারণ এবং সময় বাড়ানোর আবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীদের কাছে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা পৌঁছে দেওয়া। তাই সময়মতো পণ্য সরবরাহ না হলে বা যন্ত্রের মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে সরকারি ব্যয়ের প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ১০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফার অভিযোগ অনুসন্ধানী নথির ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকার দুটি ক্রয়চুক্তিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা অন্তত ১০০ কোটি টাকা হতে পারে। এর মধ্যে বুরাক ব্রেক লিমিটেডের সম্ভাব্য অংশ প্রায় ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, কর-ভ্যাট-সংক্রান্ত অনু
উপপরিচালক ছালেহ উদ্দিনকে ঘিরে লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টে অর্থ আদায়, কেনাকাটায় অনিয়ম, বিল আটকে রাখা এবং বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ; ডায়েরিতে কোডে হিসাব রাখার দাবি- ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের। অথচ এই অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী এক কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠেছে ঘুষ, কমিশন, সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের একাধিক অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিন। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর দায়িত্বকালে লাইসেন্স প্রদান ও ফায়ার রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কেনাকাটার ব্যয় দেখানো, জ্বালানি ও বিভিন্ন বিল আটকে রাখা, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে কথিত একটি ডায়েরিতে কোড ব্যবহার করে অর্থের হিসাব সংরক্ষণের বিষয়টি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরাসরি টাকার অঙ্ক না লিখে বিভিন্ন কোডে হিসাব রাখা হয়। পরে দিন শেষে সেই হিসাব মিলিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। ডায়েরিটি ছালেহ উদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে পরিচিত জাকিরের কাছে থাকে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে উপপরিচালক ছালেহ উদ্দিন কোনো মন্তব্য করেননি। কোডে অর্থের হিসাব, দিন শেষে ‘সেটেলমেন্ট’ অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ আদায়ের হিসাব সরাসরি টাকায় না লিখে কোডের মাধ্যমে একটি ডায়েরিতে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি কোডের বিপরীতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হিসাব ধরা হয় বলে তাঁদের অভিযোগ। এই হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্বে পিএ জাকির রয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত অর্থের হিসাব দিনের শেষে মিলিয়ে নেওয়া হয়। এরপর কোড অনুযায়ী অর্থ বুঝে নেওয়ার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় ছালেহ উদ্দিনের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। কেউ কেউ গাড়িতে করে ওই অর্থ নিয়ে যান বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টে নির্দিষ্ট ‘রেট’ থাকার অভিযোগ অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স প্রদান ও ফায়ার রিপোর্ট-সংক্রান্ত কার্যক্রম। অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি ১০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর সংযোজনের জন্য ৫ হাজার টাকা নেওয়ার একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া ফায়ার রিপোর্টের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রত্যাশিত অর্থ না পেলে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে গড়িমসি করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের একজনের দাবি, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়। লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টের মতো জননিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সেবায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগ গুরুতর। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন নয়, অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত সেবার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। পদোন্নতি ও ঢাকা বিভাগে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন ছালেহ উদ্দিনের পদোন্নতি এবং ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক পদে পদায়ন নিয়েও অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের ভাষ্য, সরকারি গেজেট অনুযায়ী তিনি সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক বা সমমানের পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে পদোন্নতির আগে তাঁর বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন ছিল এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এ ছাড়া পদোন্নতির পর ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক পদে আসার ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত নুর উদ্দিন আনিসের নামও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ৪০–৫০ লাখ টাকার কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ ছালেহ উদ্দিনের দায়িত্বকালে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার কেনাকাটা নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্টেশনারি এবং গাড়ির পাম্পসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় অন্য খাতে দেখানো হয়েছে। এসব ব্যয় ‘আসবাবপত্র’ কেনার হিসাবের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। সরকারি কেনাকাটায় এ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ক্রয়প্রস্তাব, দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, পণ্য গ্রহণের নথি এবং স্টক রেজিস্টার পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোন খাতে কত অর্থ বরাদ্দ ছিল, বাস্তবে কী কেনা হয়েছে এবং হিসাবের খাত পরিবর্তনের অনুমোদন ছিল কি না—এসব তথ্য যাচাই ছাড়া অভিযোগের আর্থিক দায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিল নিয়ে সংকট ঢাকা বিভাগের কয়েকটি ফায়ার স্টেশনে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গাড়ির নিবন্ধন এবং খাবারের বিল নিয়ে সমস্যার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিভিন্ন খাতের বিল সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় অধীনস্থ স্টেশনগুলোকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বারিধারা ফায়ার স্টেশনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সরবরাহ ও যানবাহনের কার্যক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। এসব খাতে বিল বকেয়া থাকলে তার প্রভাব জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতায় পড়তে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোর বকেয়ার পরিমাণ, বিল আটকে থাকার কারণ কিংবা জ্বালানি সরবরাহ বাস্তবে বন্ধ হয়েছিল কি না—এসব তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিল পরিশোধে বিলম্বের পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা, বাজেটসংকট, নথিগত ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট হিসাব ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া পরীক্ষা করা জরুরি। ‘মাসোহারা’ না দিলে ছুটি আটকে দেওয়ার অভিযোগ অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগকারীদের দাবি, সিনিয়র স্টেশন অফিসার ও ডিএডিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ না পেলে ছুটি আটকে দেওয়া হয় অথবা প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সিনিয়র স্টেশন অফিসারদের সাপ্তাহিক ছুটি নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের ভাষ্য। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অধীনস্থদের ওপর প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের চাপ তৈরি করা হয়। এসব অভিযোগ যাচাই করতে হলে ছুটির আবেদন ও অনুমোদনের নথি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং একই ধরনের পরিস্থিতিতে বিভিন্ন স্টেশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত তুলনা করে দেখা প্রয়োজন। বদলি ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অতীতেও বদলি-বাণিজ্য ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠার কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সহকারী পরিচালক আনিসের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আর্থিক লেনদেন পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদবির এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। জবাবদিহির প্রশ্ন: তদন্ত ছাড়া মিলবে না প্রকৃত চিত্র ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কয়েকটি পৃথক ক্ষেত্রকে সামনে এনেছে—লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টে কথিত কমিশন, কোডে অর্থের হিসাব সংরক্ষণ, সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম, জ্বালানি ও বিভিন্ন বিলের জটিলতা, অধীনস্থদের ছুটি নিয়ে চাপ এবং বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই, কথিত ডায়েরির অস্তিত্ব ও বিষয়বস্তু পরীক্ষা, কেনাকাটার বিল-ভাউচার নিরীক্ষা এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টের ক্ষেত্রে কোনো অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সরকারি অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে এবং জ্বালানি ও অন্যান্য বিল কেন আটকে আছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নথিভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করা সম্ভব।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন কোনো মন্তব্য করেননি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্ত, আর্থিক নথি যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের ফল ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে জননিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর যথাযথ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ভারতে একটি আলোচিত গণপিটুনি মামলায় ১৪ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান অনলাইন হুমকি ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ঘটনার পর তাঁর বিদ্যমান পুলিশি নিরাপত্তা অব্যাহত রাখতে নির্দেশ দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি চলমান মামলার শুনানিতে আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি আমলে নেয়। বিচারপতি বিবেক আগরওয়াল এবং বিচারপতি অবনীন্দ্র কুমার সিং-এর ডিভিশন বেঞ্চ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তলব করে। রায়, প্রতিক্রিয়া এবং উত্তেজনা গত ১২ জুন দেওয়া এক রায়ে বিচারক তাবাসসুম খান ২০২২ সালের একটি সহিংস গণপিটুনি মামলায় ১৪ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রে গবাদি পশু পরিবহনের সময় ট্রাক চালক শেখ লালা নাজির আহমেদকে হত্যা করা হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অভিযুক্তরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে একটি বেআইনি জমায়েত গড়ে তুলে হামলা চালায়। রায় ঘোষণার পরপরই নিজেদের ‘গো-রক্ষক’ দাবি করা একাধিক গোষ্ঠী প্রকাশ্যে বিক্ষোভে নামে। আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিচারকের কুশপুতুল দাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে। অনলাইন হুমকি ও ভাইরাল ভিডিও ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে এক ব্যক্তি বিচারকের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করেন এবং দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তি না দিলে রাজ্যজুড়ে সহিংসতার হুমকি দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়ে। আদালতের কঠোর অবস্থান হাইকোর্ট এই ঘটনাকে “গুরুতর উদ্বেগজনক” আখ্যা দিয়ে জানায়, এ ধরনের আচরণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে, বিচারিক সিদ্ধান্ত কেবল আইনি প্রক্রিয়া—আপিল বা রিভিশনের মাধ্যমেই চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানায়, কোনো সামাজিক গোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণে বিচারকের বিরুদ্ধে হুমকি বা সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতের মতে, এটি বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও নির্ভীক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নির্দেশ অন্তর্বর্তী নির্দেশে হাইকোর্ট জানায়, নর্মদাপুরমের পুলিশ সুপারের (এসপি) অধীনে বিচারক তাবাসসুম খানের বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে। এছাড়া, হুমকির পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা বিস্তারিতভাবে হলফনামা আকারে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবকেও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নীতিমালা সম্পর্কে ব্যক্তিগত হলফনামা জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি শুনানিতে ডেপুটি অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতকে জানান, ঘটনায় ইতিমধ্যে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে ভারতের বিচার বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অনলাইন বিদ্বেষের প্রভাব। বিশেষ করে সংবেদনশীল ফৌজদারি মামলার রায়ের পর বিচারকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কতটা জরুরি—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত কূটনৈতিক আলোচনায় ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার। একই সময়ে, দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা থাইল্যান্ডের ১১টি বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে ১০টি নিরাপদে জলসীমা অতিক্রম করেছে, যা সামুদ্রিক বাণিজ্য স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, দোহায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কাতারি এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আলোচনায় অংশ নেওয়া পক্ষগুলো সংলাপ অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দোহায় অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোকে ‘খুব ভালো’ বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও আলোচনার নির্দিষ্ট অগ্রগতি বা সম্ভাব্য সমঝোতা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পর্যটন সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে আবাসন ও হোটেল প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহের পরও এক দশক পেরিয়ে নির্ধারিত প্লট বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সেঞ্চুরি গ্রুপের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, 'সেঞ্চুরি কুয়াকাটা মডেল টাউন', 'সেঞ্চুরি গোল্ড কোস্ট হোটেল অ্যান্ড স্পা' এবং 'সেঞ্চুরি ট্রেজার আইল্যান্ড অ্যান্ড বাটার ফ্লাই পার্ক'—এই তিন প্রকল্পে জমি, হোটেলের মালিকানা ও ভবিষ্যৎ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগ নেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমজিআর নাসির মজুমদার। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—প্লটের পুরো মূল্য পরিশোধের পরও নির্দিষ্ট জমি বুঝিয়ে না দেওয়া, সরকারি ফি'র তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়, চুক্তির বাইরে ভিন্ন মৌজার জমি দলিলে অন্তর্ভুক্ত করা এবং দফায় দফায় নতুন অর্থ দাবির মতো একাধিক অভিযোগ। পুরো টাকা পরিশোধের ১০ বছর পরও প্লট নেই ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহকদের কাছে কাঠাপ্রতি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫০ টাকা দরে পাঁচ কাঠার প্লট বিক্রির ঘোষণা দেয় সেঞ্চুরি গ্রুপ। ২০১১ সালের মে মাসে গ্রাহকদের হাতে চুক্তিপত্র তুলে দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, মাসে ১১ হাজার ২৫ টাকা করে ৭২ কিস্তিতে ২০১৬ সালের জুন মাসে মোট ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ টাকা পরিশোধ করেন ক্রেতারা। কিন্তু ২০২৬ সালেও অধিকাংশ ক্রেতা তাদের নির্ধারিত প্লট বুঝে পাননি। কিস্তিতে সামান্য দেরি, এরপর জরিমানা ও ঘুষের অভিযোগ একাধিক গ্রাহক জানিয়েছেন, কিস্তি পরিশোধে সামান্য বিলম্ব হলেই বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হতো। একজন ভুক্তভোগীর দাবি, জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে কোম্পানির এক কর্মকর্তাকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এরপরও তার কাছ থেকে ৩১ হাজার ১৬৩ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। উন্নয়ন ও রেজিস্ট্রেশনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ২০১৬ সালে প্লটের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের পরও ২০২১ সালে গ্রাহকদের কাছ থেকে ডেভেলপমেন্ট চার্জ হিসেবে প্লট মূল্যের ১৫ শতাংশ হারে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭০ টাকা নেওয়া হয়। এরপর ২০২৪ সালে জমির রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হয় ২ লাখ ৩০ হাজার ৯১২ টাকা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিলে উল্লেখিত মূল্যের ভিত্তিতে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন ফি সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ হওয়ার কথা। সেই হিসাবে সরকারি ফি দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ হাজার ৮৭৫ টাকা। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দুই লাখ টাকা বেশি আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ। রেজিস্ট্রেশনের পর সামনে আসে নতুন জালিয়াতির অভিযোগ রেজিস্ট্রেশনের পর অনেক গ্রাহক জানতে পারেন, চুক্তিতে উল্লেখ করা প্লট বাস্তবে দেখাতে পারছে না কোম্পানি। ভুক্তভোগী আনিসুর রহমান (ছদ্মনাম) জানান, তাকে গঙ্গামতি মৌজার নির্দিষ্ট একটি প্লট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দলিল পাওয়ার পরও সেই প্লট আজ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, "২০১৬ সালে পুরো টাকা পরিশোধ করেছি। ২০২৪ সালে দলিল পেয়েছি। কিন্তু ২০২৬ সালেও প্লট পাইনি। উল্টো বিভিন্ন অজুহাতে এখনো টাকা দাবি করা হচ্ছে।" তার অভিযোগ, কিস্তিতে বিলম্বের কারণে প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং জরিমানা কমানোর জন্য প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। প্লট নেই, তবু নতুন করে অর্থ দাবি ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এখন জমির নামজারি করার জন্য প্রতিটি প্লটের বিপরীতে ৬০ হাজার টাকা দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ সরকারি হিসাবে পাঁচ কাঠা জমির নামজারির ব্যয় প্রায় ১ হাজার ১৩০ টাকা। এ ছাড়া সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। মাঠে গিয়ে মিলল না বিজ্ঞাপনের প্রকল্প সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে আধুনিক আবাসন প্রকল্পের কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামো পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞাপনে দেখানো রাস্তা, পরিকল্পিত প্লট, নাগরিক সুবিধা কিংবা আধুনিক টাউনশিপের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। প্রকল্পের বড় অংশ এখনও কৃষিজমি হিসেবেই রয়েছে। হোটেল প্রকল্পেও প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক সেঞ্চুরি গোল্ড কোস্ট হোটেল অ্যান্ড স্পা প্রকল্পে শুরুতে ৫০ শতাংশ জমির ওপর ১৬ তলা ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হলেও বর্তমানে ১৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি— ৫০ শতাংশ নয়, বাস্তবে ভবন নির্মাণ হয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ জমিতে। অবশিষ্ট জমি কার পার্কিং হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২১ ও পরে ২০২২ সালে হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০২৬ সালেও প্রকল্প শেষ হয়নি। বিনিয়োগকারীরা এখনো সাব-কবলা বা দলিল পাননি। শেয়ারের দাম বেড়েছে, কিন্তু প্রকল্প এগোয়নি ২০১৬ সালে প্রতি শেয়ারের মূল্য ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। পরবর্তীতে তা ধাপে ধাপে বেড়ে— ২০১৮ সালে ১.৯৯ লাখ টাকা, ২০২১-২২ সালে ৩.৫০ লাখ টাকা, ২০২৬ সালের শুরুতে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠে। পরে তা কমিয়ে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। দ্বিতীয় হোটেল প্রকল্পেও একই অভিযোগ সেঞ্চুরি ট্রেজার আইল্যান্ড অ্যান্ড বাটার ফ্লাই পার্ক প্রকল্পে ৮১ শতাংশ জমির ওপর ১৪ তলা হোটেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেয়ার বিক্রি করা হলেও অনুসন্ধানে প্রকল্পের বাস্তব কোনো নির্মাণকাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বর্তমানে প্রতিটি শেয়ার ৭ লাখ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক জমির শেয়ার দুই প্রকল্পে বিক্রির অভিযোগ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গোল্ড কোস্ট হোটেলের বাইরে থাকা ৩৩ শতাংশ কার পার্কিংয়ের জমির শেয়ার একই সঙ্গে দুটি পৃথক প্রকল্পে বিক্রি করা হয়েছে। পরে দুই প্রকল্পের সংযোগ ঘটিয়ে এক শেয়ারে দুই হোটেলের মালিকানার অফার দেওয়া হয়। এ ছাড়া শুরুতে প্রচারপত্রে বছরে পাঁচ রাত ছয় দিন বিনামূল্যে থাকার সুবিধা উল্লেখ থাকলেও পরে সেই সুবিধা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ যা বলছেন কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো. সবুজ হোসাইন বলেন, হোটেল বা রিসোর্ট প্রকল্পের নামে নির্দিষ্ট জমি বা চৌহদ্দি ছাড়া ক্ষুদ্র অংশের জমির শেয়ার বিক্রির কোনো আইনগত সুযোগ নেই। তার ভাষায়, "এ ধরনের কার্যক্রম প্রতারণার শামিল।" তিনি আরও বলেন, কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন ছাড়া কোনো কোম্পানি সাধারণ জনগণের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রি করে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে না। সেঞ্চুরি গ্রুপের বক্তব্য অভিযোগ অস্বীকার করে সেঞ্চুরি গ্রুপের ডিজিএম তৌফিক চৌধুরী বলেন, "এসব মিথ্যা কথা।" অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমজিআর নাসির মজুমদার প্রথমে ফোনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় তিনি লেখেন, "আপনি যা বলছেন বা ভাবছেন, আমি বা আমরা সে রকম খারাপ মানুষ না। আমি অসুস্থ। দোয়া করবেন, মৃত্যুর আগে যেন মানুষের পাওনা বুঝিয়ে দিতে পারি।"
পরাজয়ের পর তৃণমূলে অস্থিরতা: নেতৃত্ব, আই-প্যাক ও দলত্যাগের শঙ্কায় গভীর সংকটে মমতার দল ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পশ্চিমবঙ্গের সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস এখন গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিজেদের প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা দলটি এবার ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই প্রকাশ্য বিভক্তির লক্ষণ দেখাতে শুরু করেছে। দলের ভেতরের অসন্তোষ, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং আই-প্যাক নির্ভর রাজনৈতিক কৌশল—সব মিলিয়ে তৃণমূলের অন্দরমহলে এখন চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। ‘মা, মাটি, মানুষ’ থেকে বিচ্যুতির অভিযোগ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে দলের প্রবীণ নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। দলের ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট সুব্রত বক্সীর কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি শুধু দল ছাড়ার ঘোষণা দেননি; বরং দল পরিচালনায় পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই বক্তব্য মূলত নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণকারী সংস্থা আই-প্যাকের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে পরোক্ষ প্রতিবাদ। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের সাফল্যের পেছনে আই-প্যাককে বড় কৃতিত্ব দেওয়া হলেও, এখন দলের ভেতর থেকেই অভিযোগ উঠছে—সংগঠন ও নেতৃত্বের জায়গা দখল করে নিয়েছে একটি করপোরেট রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো। কাকলি ঘোষ দস্তিদার তার চিঠিতে দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিযোগে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও সামনে এনেছেন। তৃণমূলের একাধিক নেতা মনে করছেন, দল তার মূল আদর্শ ‘মা, মাটি, মানুষ’ থেকে অনেকটাই সরে গেছে। প্রকাশ্যে নেতাদের বিরোধ দলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন তৃণমূলের আরেক প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের সমালোচনায় নামেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৃণমূল ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করেছে। এরই মধ্যে দলের মুখপাত্র ঋজু দত্তকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক মহলে দলের অভ্যন্তরীণ ‘ক্লিন-আপ অপারেশন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো মূল সংকট মোকাবিলার বদলে বরং দলের অস্থিরতাকেই সামনে নিয়ে আসছে। শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ, বাড়ছে দলত্যাগের জল্পনা সংকটের মধ্যে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি প্রশাসনিক বৈঠকে তৃণমূলের তিন কাউন্সিলর—আনিসুর রহমান, বীণা মণ্ডল ও মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের উপস্থিতি নতুন রাজনৈতিক জল্পনার জন্ম দিয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, তৃণমূলের একটি অংশ এখন বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান খুঁজছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জনপ্রতিনিধি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এর পাশাপাশি দুই তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠকও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও তারা এটিকে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে দাবি করেছেন, তবে দিল্লির বেঙ্গল গভর্নমেন্ট গেস্ট হাউজে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শুভেন্দুর বৈঠকের খবর নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। আড়ালে চলে গেছেন ঘনিষ্ঠ মন্ত্রীরা একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বলয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন নেতা—ইন্দ্রনীল সেন, শশী পাঁজা, ব্রাত্য বসু, মলয় ঘটক ও অরূপ বিশ্বাস—সম্প্রতি জনসমক্ষে অনেকটাই অনুপস্থিত। দলের ভেতরের নেতারা বলছেন, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না, আবার কেউ নীরবে দূরত্ব বজায় রাখছেন। এর মধ্যে গত ১১ মে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী সুজিত বসুকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) গ্রেফতার করায় তৃণমূল আরও চাপে পড়ে। পরাজয় মানতে নারাজ মমতা? নির্বাচনের ফল ঘোষণার প্রায় তিন সপ্তাহ পার হলেও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো ফল মেনে নিতে পারেননি বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। সম্প্রতি এক ফেসবুক লাইভে তিনি দাবি করেন, কারচুপির মাধ্যমে তাদের প্রায় ১৫০টি আসন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বিগত চার দশকের মধ্যে এই প্রথম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদ বা বিধানসভার কোনো কক্ষের সদস্য নন। বর্তমানে তিনি মূলত ঘরোয়া বৈঠকের মাধ্যমে দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তবে ভোট-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সহায়তা দিতে কলকাতা হাইকোর্টে গেলে তাকে বিরোধীদের বিক্ষোভ ও স্লোগানের মুখোমুখি হতে হয়, যা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আই-প্যাক, টিকিট বাণিজ্য ও সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, দল এখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে। স্থানীয় পর্যায় থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলেও তাদের দাবি। সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে আই-প্যাককে ঘিরে। পঞ্চায়েত পদ থেকে শুরু করে বিধায়ক মনোনয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘আই-প্যাকের নামে’ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এখন দলীয় অন্দরেই উচ্চারিত হচ্ছে। তৃণমূলের একাধিক পুরোনো কর্মী মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দলের রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সামনে কোন পথে তৃণমূল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে সাংগঠনিক ভাঙন এবং দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে দলটি বড় ধরনের পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এতদিন যেসব অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নির্বাচনী জয়ের আড়ালে চাপা ছিল, পরাজয়ের পর সেগুলো এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলকে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন কি না, নাকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের দীর্ঘ আধিপত্যের অবসানের সূচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
বরিশাল শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্স—যা সাধারণ মানুষের কাছে গুঠিয়া মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত। এটি বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও আকর্ষণীয় মসজিদ কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়, এটি এখন ধর্মীয় ও পর্যটন—দুই দিক থেকেই এক অনন্য গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশ থেকেও পর্যটকরা ছুটে আসছেন এই নয়নাভিরাম স্থাপনাটি দেখতে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি শবে বরাত, শবে মেরাজসহ বড় বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিশেষ করে ঈদের সময় এখানে আয়োজিত হয় বিশাল জামাত, যেখানে হাজারো মুসল্লির সমাগম ঘটে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত এই বিশাল প্রকল্পের উদ্যোক্তা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৬ সালে এর কাজ সম্পন্ন হয়। প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার শ্রমিকের শ্রমে গড়ে ওঠে এই স্থাপত্যকর্ম। প্রায় ১৪ একর জমির ওপর নির্মিত এই কমপ্লেক্সে রয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিকল্পনা ও নান্দনিক সাজসজ্জা। মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই ডান পাশে চোখে পড়ে একটি বড় পুকুর, যা এমনভাবে খনন করা হয়েছে যাতে পানিতে পুরো মসজিদের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট দেখা যায়—যা দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পুকুরটির চারপাশ সাজানো হয়েছে নানা রঙের ফুল ও ফলজ গাছ দিয়ে। এছাড়া রয়েছে মোজাইক করা শান বাঁধানো ঘাট, যা পুরো পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পুকুরের বিপরীতে মসজিদের প্রবেশমুখে স্থাপন করা হয়েছে দুটি ফোয়ারা, যা স্থাপনাটির সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সব মিলিয়ে গুঠিয়ার এই মসজিদ কমপ্লেক্সটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক জনপদ রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় অবস্থিত প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন বাঘা শাহী জামে মসজিদ আজও ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নান্দনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এই প্রাচীন মসজিদটি দেখতে ছুটে আসেন। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৫২৩-১৫২৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার হুসেন শাহী বংশের শাসক সুলতান নসরত শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তারও আগে হজরত শাহ দৌলাহ (রহ.) এ অঞ্চলে এসে ইসলাম প্রচার করেন এবং বাঘা এলাকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরে এ অঞ্চলকে ঘিরেই গড়ে ওঠে একটি সমৃদ্ধ জনপদ। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও দৃষ্টিনন্দন। এতে আছে ১০টি গম্বুজ, চার কোণায় চারটি মিনার এবং অভ্যন্তরে একাধিক মজবুত স্তম্ভ, যা পুরো কাঠামোকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রেখেছে। মসজিদের দেওয়ালজুড়ে টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকাজ মধ্যযুগীয় শিল্পরীতির এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে ফুল-লতা ও জ্যামিতিক নকশার অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। মসজিদটির চারপাশের পরিবেশও অত্যন্ত মনোরম। বিস্তীর্ণ পুকুর, সবুজ বৃক্ষরাজি এবং শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঈদ, ছুটির দিন ও শীত মৌসুমে এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পায়। স্থানীয়দের কাছে এ মসজিদ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয় বরং এটি তাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রতিদিন এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয় এবং ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যা স্থাপনাটিকে একটি জীবন্ত ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ধরে রেখেছে। সচেতন মহল মনে করেন, এত প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আরও কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বাঘা শাহী জামে মসজিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘এই মসজিদ আমাদের গর্ব। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এখানে আসে। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, আমাদের ইতিহাসের অংশ।’দর্শনার্থী সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘প্রথমবার এসে মসজিদের টেরাকোটার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। এত পুরোনো স্থাপনা হয়েও এখনো এত সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এটি সত্যিই বিস্ময়কর।’
সেদিন মক্কা সিটি ট্যুর ছিল। আমরা মসজিদে নামিরা থেকে আরাফাতের ময়দানে গেলাম। আরাফাতের ময়দান ঘুরে মুজদালিফা হয়ে মিনা যাওয়ার পথে পুরাতন স্থাপনা লক্ষ্য করি। স্থাপনাগুলো ড্রেনের মতো, পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে দৃষ্টিসীমার বাইরে। মনে প্রশ্ন জাগে, এগুলো কী? গুগলে সার্চ দিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম। এই হলো নহরে জুবাইদা! নহরের সমার্থক সরু, স্রোতস্বিনী, জলধারা, খাল, নালা। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী জুবাইদা বিনতে জাফর মক্কায় হজযাত্রীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির খাল খনন করেছিলেন। যা হজের সময় পানির অভাব দূর করে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। খালটি তায়েফের কাছের ঝরনা থেকে পানি এনে মক্কা পর্যন্ত পৌঁছে দিতো। জুবাইদা নিজে এই বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করে ব্যয়ভারও বহন করেন। নহরে জুবাইদা ইসলামি প্রকৌশল ও মানব সেবার বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে বিদ্যমান। জুবাইদা অত্যন্ত বিদুষী, ধর্মপরায়ণ ও পরোপকারী একজন নারী ছিলেন। জুবাইদা জাফর ইবনুল মানসুরের মেয়ে। জাফর ইবনুল মানসুর খলিফা হারুনুর রশিদের চাচা। জুবাইদার আসল নাম ছিল আমাতুল আজিজ। তার দাদা আল-মানসুর তাকে আদর করে ‘জুবাইদা’ (ছোট মাখনের টুকরা) ডাকতেন। কালক্রমে তিনি ‘জুবাইদা’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী জুবাইদা বিনতে জাফর মক্কায় হজযাত্রীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির খাল খনন করেছিলেন। যা হজের সময় পানির অভাব দূর করে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। খালটি তায়েফের কাছের ঝরনা থেকে পানি এনে মক্কা পর্যন্ত পৌঁছে দিতো। জুবাইদা নিজে এই বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করে ব্যয়ভারও বহন করেন। নহরে জুবাইদা ইসলামি প্রকৌশল ও মানব সেবার বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে বিদ্যমান। জুবাইদা অত্যন্ত বিদুষী, ধর্মপরায়ণ ও পরোপকারী একজন নারী ছিলেন। জুবাইদা জাফর ইবনুল মানসুরের মেয়ে। জাফর ইবনুল মানসুর খলিফা হারুনুর রশিদের চাচা। জুবাইদার আসল নাম ছিল আমাতুল আজিজ। তার দাদা আল-মানসুর তাকে আদর করে ‘জুবাইদা’ (ছোট মাখনের টুকরা) ডাকতেন। কালক্রমে তিনি ‘জুবাইদা’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন।নহরে জুবাইদা কঠিন ভূখণ্ডে সুড়ঙ্গ ও জলপ্রণালি তৈরি করে, বিশাল প্রকৌশল কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। এর নির্মাণে বেশ বাধা অতিক্রম করতে হয়েছিল। কঠিন শিলা কেটে খাল তৈরি করা এর অন্যতম। এটি একটি জটিল প্রকৌশল, যেখানে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, খালের অংশ এবং জলাধার নির্মাণ করা হয়েছিল, যা পানিকে বাষ্পীভবন থেকে রক্ষা করতো। সে সময় মক্কায় জমজম ছাড়া পানির উৎস ছিল না। হজে প্রচুর মানুষের ভিড়ে পানির তীব্র সংকট দেখা দিতো। উচ্চ মূল্যে পানি ক্রয় করতে হতো। খলিফা হারুনুর রশিদের আমলে পানির অভাব বেশ তীব্র ছিল। তখন এক বালতি পানি বিক্রি হয় ২০ দিরহামে। ১৯৩ হিজরিতে খলিফার মৃত্যুর পর রানি জুবাইদা হজ পালন করতে মক্কা যান। পানির সমস্যা দেখে তিনি একটি খাল কাটার সিদ্ধান্ত নেন। নহরে জুবাইদা খননে আনুমানিক ১৭ লাখ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ হয়। জুবাইদার খাল খননের ফলে হাজিদের জন্য বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত হয়। এই ব্যবস্থা মক্কা ও আশেপাশের এলাকার কৃষকদেরও উপকৃত করেছিল। তারা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে খালের পানি ব্যবহার করতো। তিনি মক্কা ও মদিনার পথে মুসলিম হজযাত্রীদের জন্য কূপ, জলাধার এবং কৃত্রিম পুল তৈরি করেন। ‘দারব জুবাইদা’ (জুবাইদার পথ) নামে পরিচিত পথটির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। খালটি শুধু পানিই সরবরাহ করতো না বরং বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত ‘দারব জুবাইদা’কে (হজ্জ্বযাত্রার পথ) সুগম করে তোলে। হজযাত্রীদের সুবিধার জন্য পথে বিশ্রামস্থল, কূপ, পুকুর ও বাতিঘর স্থাপন করা হয়। নহরে জুবাইদা কেবল মক্কার হাজিদের পানির সংকট দূর করেনি বরং শত শত বছর ধরে মুসলিম উম্মাহর সেবা ও নারীর দূরদর্শিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আজকের যুগেও অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম নারীরা অবহেলিত। সেই সময় রানী জুবাইদা কি চিন্তা করেছিলেন! এর ফলপ্রসূ বাস্তবায়নও বাকি রাখেননি। নারী জাগরণের ইতিহাসে তাকে উদাহরণ হিসেবে বলাই যায়। তিনি অনেক নারীর অনুপ্রেরণা। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে রানী জুবাইদার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নহরে জুবাইদা শুধু একটি জলধারা ছিল না, এটি রানী জুবাইদার প্রজ্ঞা, উদারতা এবং মুসলিমদের প্রতি ভালোবাসার বহিপ্রকাশ ছিল। বর্তমানে এটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত। একটি কালজয়ী স্থাপনা, যা ছিল প্রকৌশল ও মানবতার অপূর্ব মেলবন্ধন। নহরে জুবাইদার ভগ্নাবশেষ এখনো আরাফাতের ময়দান, মুজদালিফা ও মিনার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নহরটি এখন আর পুরোপুরি সক্রিয় জলধারা না হলেও আমার মতো অনেক পর্যটক ও হাজি নহরে জুবাইদা দেখতে মিনা ও আরাফাতের ময়দানে ছুটে যান। নহর দেখার পরে তারা অভিভূত হয়ে যান এবং মহীয়সী নারী জুবাইদার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে থাকেন।
উত্তরবঙ্গের ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে ৪২২ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ঈদগাহ মসজিদ অন্যতম। স্থাপনাটি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের ভাবকি গ্রামে অবস্থিত। ছোট আকৃতির এ মসজিদে এখনো নামাজ আদায় করা হয়। দেশি-বিদেশি মানুষ এখনো মসজিদটি দেখতে ছুটে আসেন। শালবন ঘেরা মনোরম পরিবেশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদের শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১০১০ বঙ্গাব্দ বা ১৬০৪ সালে নির্মিত হয় এটি। ১২ ফুট দৈর্ঘ ও প্রস্থের মসজিদের উচ্চতা মিনারসহ প্রায় ৩০ ফুট। একসময় নিয়মিত নামাজ আদায় করা হতো। বর্তমানে নিয়মিত না হলেও মাঝে মধ্যে দেখতে আসা পর্যটকেরা নামাজ আদায় করেন। এ ছাড়া দুই ঈদের নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।স্থানীয়রা জানান, মসজিদটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয় বরং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকে থাকবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগই পারে এই শতাব্দী প্রাচীন স্থাপনাটিকে রক্ষা করতে। যদিও বা অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে মসজিদটি রক্ষা পেলেও অনেকটা নিদর্শন হারিয়ে ফেলেছে।মসজিদটি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ইউসুফ আলী জানান, তার পূর্বপুরুষরাই মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে আমলে জনবসতি এবং জনসংখ্যা কম থাকায় ছোট পরিসরে নির্মিত হয় মসজিদটি। মাত্র ৮ থেকে ১০ জন মুসল্লি দুই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। এখন চারপাশে গড়ে উঠেছে জনবসতি। সেই গভীর জঙ্গলের অস্তিত্ব নেই।তিনি জানান, মসজিদটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো টিকে আছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার ফলে এটি প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। ২০১১ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে সংস্কার করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংস্কার করলে বাইরের নকশা এবং কারুকাজ ঠিক রাখা সম্ভব হতো। এতে মসজিদটি জৌলুস হারাতো না। পুরোনো নকশার আদলে নতুন করে ৪টি মিনার ও ১টি গম্বুজ নির্মাণ করলেও বর্তমানে ২টি মিনার ও ১টি গম্বুজ টিকে আছে। স্থানীয় শিক্ষাবিদ মাহাতাব উদ্দীন বলেন, ‘কালের বিবর্তনে মসজিদের ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। আমরা শুনেছি, অতীতে এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হতো। এখন পর্যটকেরা এসে আত্মতৃপ্তির জন্য নামাজ আদায় করেন। তবে দুই ঈদের জামাতের জন্য ব্যবহৃত হয়। অতীতের সেই জঙ্গলঘেরা নির্জন পরিবেশ আর নেই। ঈদগাহ মসজিদটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।’২০১১ সালে সংস্কার কাজের মিস্ত্রি নুর আলম বলেন, ‘মসজিদটি ব্যবহারের উপযুক্ত ছিল না। মসজিদটির ওপরে বটগাছসহ জঙ্গলে ভরে গিয়েছিল। চুন, সুরকির পলেস্তারা খসে ইটগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। চেষ্টা করেছি পূর্বের নকশা অনুযায়ী সংস্কার করার। যদি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংস্কার করা যেত, তাহলে উন্নতমানের প্রযুক্তি ও মেডিসিন ব্যবহার করে আগের অবস্থায় আনা যেতো।’
জামালপুর : বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলমানদের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে মসজিদ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এসব মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর একেকটি অনন্য নিদর্শন। তেমনই এক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার মালঞ্চ জামে মসজিদ। জেলা শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মসজিদটি তার সুউচ্চ মিনার, মনোরম নকশা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশের কারণে ইতোমধ্যেই একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মুসল্লি ও দর্শনার্থী এখানে ভিড় জমাচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৪০ সালে ধর্মপ্রাণ মুসলিম আব্দুল গফুর মণ্ডল সুরকি ও পাথর দিয়ে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে তার নাতি, শিল্পপতি হাসান মাহমুদ রাজা পারিবারিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ইসলামের প্রতি ভালোবাসা থেকে মসজিদটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। তখন মসজিদটিকে তিন গম্বুজ থেকে সাত গম্বুজে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে মসজিদটি ১১ তলা বিশিষ্ট এক চমৎকার স্থাপনা—এর মধ্যে সাত তলা মূল মসজিদ ভবন এবং চার তলা সুউচ্চ মিনার রয়েছে। মোগল ও পারসিক স্থাপত্যরীতির সমন্বয়ে নির্মিত এই মসজিদের ভেতর ও বাহিরে সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং রঙিন টাইলসের ব্যবহার একে করেছে দৃষ্টিনন্দন। মসজিদের মূল ভবনে একসঙ্গে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৪০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। রমজান মাসে এখানে নিয়মিত ইফতারের আয়োজন করা হয় এবং ঈদের নামাজও যথাযথ মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদের চারপাশে সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। সামনে রয়েছে একটি বড় দিঘি, যা মুসল্লিদের অজু ও গোসলের জন্য ব্যবহৃত হয়। ছুটির দিনগুলোতে এখানে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। মসজিদটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি এতিমখানা, নুরানি মাদরাসা, হাফেজিয়া মাদরাসা, একটি কামিল মাদরাসা এবং একটি দাতব্য চিকিৎসালয়। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসিক ব্যবস্থা। জানা যায়, আব্দুল গফুর মণ্ডল ছিলেন এই অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট ধর্মপ্রাণ ও জনহিতৈষী ব্যক্তি। তার নাতি হাসান মাহমুদ রাজাও একইভাবে দানশীলতার পরিচয় দিয়ে সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণ ও পরিচালনা করে আসছেন। সব মিলিয়ে, মালঞ্চ জামে মসজিদ শুধুমাত্র একটি ইবাদতের স্থান নয়—এটি স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট চুয়াডাঙ্গার বড় মসজিদ। স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর কাছে এটি গর্বের একটি নাম। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো মসজিদটি স্থাপিত হয় ১২০৮ হিজরি, আনুমানিক ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। দীর্ঘ সময় ধরে এটি শুধু ইবাদতের স্থানই নয় বরং সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। মসজিদের মুসল্লিদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মসজিদটি এলাকায় ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও মসজিদটি তার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ১৭৮৬ সালে কুসুম বিবি নামের এক মহীয়সী নারী ৭৩ শতক জমির ওপর নিজ অর্থায়নে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা শহরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম মসজিদ। এ মসজিদ থেকেই চুয়াডাঙ্গায় প্রথম আজানের সুর ধ্বনিত হয়েছিল। বর্তমানে মসজিদটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও কিছু কিছু অংশে সংস্কারের প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মসজিদের নাম অনুসারেই মহল্লাটির নামকরণ হয়েছে মসজিদপাড়া। চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণকেন্দ্র একাডেমি মোড় সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদটি। শুরুর দিকে মসজিদের ভেতরে দুটি কাতার ও বারান্দায় একটি কাতারে নামাজ আদায় করা যেত। সেই সময় প্রায় ৭০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারতেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়। ১৪৩৫ হিজরি ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে মূল অবকাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে মসজিদটির সংস্কার কাজ করা হয়। সংস্কারের মাধ্যমে এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নামাজের জায়গা সম্প্রসারণ এবং নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। ফলে বর্তমানে এটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি বৃহৎ জামে মসজিদ হিসেবে মুসল্লিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বড় মসজিদ বা মিনার মসজিদ নামেও মসজিদটি পরিচিত। এর সুউচ্চ মিনার অনেক দূর থেকেই দেখা যায়। তবে বর্তমানে মসজিদের মিনারের তৃতীয় তলার বেলকনির অংশ ভেঙে গেছে। মসজিদের মিনারটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।মসজিদের পাশেই আছে একটি কবরস্থান। এই বড় মসজিদে রেলপাড়া, মসজিদপাড়া, একাডেমি মোড়, জোয়ার্দ্দার পাড়া, বাগানপাড়া, মাঝেরপাড়া, মল্লিকপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি জুমার নামাজে বিপুল সংখ্যক মুসল্লির সমাগম ঘটে। এ ছাড়া ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মিলাদ মাহফিল ও কোরআন তিলাওয়াতের আসরেও মসজিদ প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে।মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ইবরুল হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা বড় মসজিদের ইতিহাসে কুসুম বিবির নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এ মসজিদের জমির মূল মালিক ছিলেন পরোপকারী ও ধর্মপ্রাণ নারী কুসুম বিবি। তিনি ৭৩ শতক জমি আল্লাহর ঘর নির্মাণের জন্য দান করেন।’ প্রচলিত আছে, কুসুম বিবি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন। লোককথা অনুযায়ী, নিজের বাড়ি নির্মাণের সময় তিনি মাটির নিচে পাঁচ থেকে ছয় কলসি মোহর খুঁজে পান। বিপুল সম্পদ পেয়ে তিনি ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে না গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরামর্শ করেন এ মোহর কী কাজে ব্যয় করা যায়। তখন এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষ তাঁকে পরামর্শ দেন, এই অর্থ দিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করলে তা হবে সদকায়ে জারিয়া, যার সওয়াব চিরকাল প্রবাহিত হবে। সেই পরামর্শ হৃদয়ে ধারণ করে কুসুম বিবি নিজের অর্থায়নে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শোনা যায়, সে সময় নির্মাণকাজে ডিমের কুসুম ও সুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করে মসজিদের ভিত্তি ও দেওয়াল তৈরি করা হয়। যা সেই যুগের নির্মাণশৈলীর একটি অনন্য উদাহরণ। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ধর্মীয় অনুরাগের ফলস্বরূপ নির্মিত হয় চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদ। প্রথমদিকে এ মসজিদে একসঙ্গে তিন কাতারে দাঁড়িয়ে প্রায় ৭০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। সময়ের পরিবর্তন ও মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। পরে ২০০০ সালে মসজিদটি পুনরায় সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। আধুনিকায়নের মাধ্যমে বর্তমানে এ মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৭০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মোহাম্মদ জামির হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি নির্মিত হয়। দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি এলাকাবাসীর ইবাদত বন্দেগি ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কুসুম বিবি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় মসজিদের জন্য জমি দান করেছিলেন। বর্তমানে মসজিদের নামে মোট ৭৩ শতক জমি আছে। বর্তমান সভাপতির পূর্বপুরুষরা ছিলেন এ মসজিদের প্রধান দাতা ও পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের অবদান ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় মসজিদটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত টিকে আছে এবং ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে।’তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মসজিদটি সংস্কার করা হয়। সে সময় মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নামাজের স্থান সম্প্রসারণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা হয়। তবে এখনো কিছু কাজ বাকি আছে, যেমন- মিনারের উন্নয়ন, অজুখানার আধুনিকায়ন ও সীমানা প্রাচীরের সংস্কার। ধীরে ধীরে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা হবে। ভবিষ্যতে মসজিদটিকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে।’মসজিদ কমিটির সাবেক সেক্রেটারি মোহাম্মদ রিপন মণ্ডল বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা বড় মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক ও ঐতিহাসিক যাত্রার সাক্ষী। সময়ের পরিক্রমায় নানা পরিবর্তন, সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে এ মসজিদ। প্রাচীন স্থাপত্যধারা ও আধুনিক নির্মাণশৈলীর সমন্বয়ে এটি এলাকাবাসীর গর্বের প্রতীক। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরের ইবাদতখানা। যেখানে স্থানীয় মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। ক্রমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ফলে পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ, দান ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এর সম্প্রসারণ সম্পন্ন হয়।’ মসজিদের মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘আমি ২০১২ সাল থেকে এ মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি আমাদের এলাকার ইবাদত ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পেছনে কুসুম বিবির অবদান অত্যন্ত মহৎ। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তিনি যে জমি দান করেছিলেন, তারই ফলস্বরূপ আজ আমরা এখানে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করতে পারছি।’মসজিদপাড়ার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব খলিলুর রহমান বলেন, ‘ছোটবেলায় এ মসজিদ প্রাঙ্গণেই অনেক খেলাধুলা করেছি। আমার ছেলেবেলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ মসজিদ। আগে মসজিদটির নকশা ছিল টালির মতো সরল, কিন্তু এখন এটি আধুনিকতার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়েছে। মসজিদটি মোগল আমলের মসজিদের আদলে নির্মিত। এর চুন-সুরকির গাঁথুনি সেই সময়ের নান্দনিক স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। যেখানে সংস্কারের মাধ্যমে আগের সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। এভাবেই মসজিদটি যুগের পর যুগ টিকে থাকবে এবং নতুন প্রজন্ম এর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।’
বরিশাল অফিস : বরিশালে শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের চলমান বৃহৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ৬ তলা প্রশাসনিক ভবন। আসন্ন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে ভবনটির কাজ দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে সম্প্রতি ভবনটির চলমান নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন সহকারী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। গুণগত মান বনাম সময়সীমার চাপ পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন—প্রতিটি নির্মাণকাজ অবশ্যই অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। ভবনের অসম্পূর্ণ কাজ, ফিনিশিং, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্যানিটারি ব্যবস্থা, রং, দরজা-জানালা স্থাপন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ দ্রুত শেষ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ এবং কাজের গুণগত মান বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের মতে, সময়মতো কাজ শেষ করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভবনের টেকসই ও মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করা। কঠোর মনিটরিংয়ের বার্তা পরিদর্শন শেষে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল ইসলাম জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। কাজের মান খারাপ হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করার জন্য একাধিক স্তরে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। বরিশালে ৭০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল জেলায় বর্তমানে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। এছাড়া ১১টি বড় প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ এবং উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ চলছে। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প ইতোমধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক প্রকল্প বরিশালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের জন্য নির্মিত ১০ তলা ভবনের কাজও এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে দুটি ফ্লোরে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রকল্পের আওতায় সাতটি ভবনের মধ্যে তিনটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি চারটির কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রত্যাশা স্থানীয় শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, এসব অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বরিশালের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। জরাজীর্ণ ভবনের জায়গায় আধুনিক বহুতল ভবন তৈরি হওয়ায় শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বড় চিত্র: উন্নয়ন নাকি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ? যদিও প্রকল্পের পরিমাণ ও অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক, তবে মাঠপর্যায়ে গুণগত মান বজায় রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একাধিক স্তরের মনিটরিং ও কঠোর নির্দেশনার মধ্যেও বাস্তবায়ন তদারকি জোরদার করা হয়েছে। বরিশালের শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে চলমান এই বিশাল কর্মযজ্ঞ'র মান এবং স্বচ্ছতা রয়েছে।।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে দৃশ্যটি আলাদা করে চোখে পড়ে। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের ভিড়ের মধ্যে এক শিক্ষার্থী ডান পা দিয়ে খাতায় লিখে পরীক্ষা দিচ্ছেন—নাম কলি রানী। জন্ম থেকেই দুই হাতের আঙুলবিহীন কলি শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বাধা হিসেবে নয়, বরং চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। এইচএসসি পরীক্ষার হলে অন্যদের মতোই স্বাভাবিকভাবে বসে তিনি ডান পা ব্যবহার করে উত্তর লিখছেন, যেন প্রতিটি অক্ষরই তার সংগ্রামের গল্প। কলি রানী কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের মৃত মনোরঞ্জন রায়ের মেয়ে। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারানোর পর পরিবারে আর্থিক ও সামাজিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট এই মেয়েটি কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও থেমে থাকেননি। তার মা রূপালী রানী জানান, জন্মগত প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কলি কখনো পড়ালেখা ছাড়েনি। বরং শৈশব থেকেই নিজের মতো করে পা দিয়ে লেখা শিখে ধীরে ধীরে একাডেমিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্থানীয় শিক্ষকদের মতে, কলির সবচেয়ে বড় শক্তি তার আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত অনুশীলন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার মৃত্যু তার জীবনে বড় ধাক্কা হলেও শিক্ষাজীবন থেমে যায়নি। শুধু পড়ালেখাই নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় কলি রানী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে তিনি একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে ডান পা ব্যবহার করে মোবাইল ও কম্পিউটার পরিচালনাতেও দক্ষতা অর্জন করেছেন তিনি। কলি রানীর স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া এবং মানুষের সেবা করা। তার ভাষায়, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না।” এর আগে পা দিয়ে লিখেই প্রাথমিক সমাপনী ও এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, নিয়ম অনুযায়ী তার জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও কলি নিজ ইচ্ছায় সাধারণ পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ৩০২ নম্বর কক্ষে পরীক্ষা দেন। তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময়ও দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা শেষে সহপাঠীদের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, কলির উপস্থিতি শুধু সহানুভূতির নয়, বরং অনুপ্রেরণারও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : শিক্ষাছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া এবং পৃথকভাবে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন ও পিএইচডি স্কলারশিপ-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) ১৭ শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রোববার (২৮ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. এনামউজ্জামান স্বাক্ষরিত পৃথক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এতে বলা হয়, গত ২৩ জুন অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম রিজেন্ট বোর্ড সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশ অনুযায়ী, বিদেশে শিক্ষাছুটিতে থাকা শিক্ষকদের একাধিকবার লিখিতভাবে কর্মস্থলে ফিরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও ১৬ শিক্ষক সেই আহ্বানে সাড়া দেননি। প্রশাসনের ভাষ্য, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে তাদের স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আমিরুল ইসলাম ও আশরাফুল হোসেন হাওলাদার, সহকারী অধ্যাপক পান্থ প্রতিম সরকার, প্রভাষক মো. আহসানউল্লাহ, মো. খায়রুল বাশার ও উপমা দাস; পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাকলী খাতুন; কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক ময়মুনা বেগম কলি; রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দেবব্রত পাল; আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ রুবাইয়াৎ রহমান; লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান; ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসনিয়া নাহিয়ান জুলফিকার; সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক অধরা তাহসিন; অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা ইয়াসমিন; ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. উজ্জল হুসাইন এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাবিয়া খাতুন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছে, শিক্ষাছুটিকালীন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রহণ করা সব আর্থিক সুবিধা ও অর্থ প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ফেরত দিতে হবে। পৃথক তদন্তে আরও একজন শিক্ষক বরখাস্ত একই দিনে প্রকাশিত আরেকটি অফিস আদেশে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফাতেমা খাতুনকে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন, নৈতিক স্খলন এবং পিএইচডি স্কলারশিপ-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তার চাকরিচ্যুতি ২৩ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাতেমা খাতুনের বিরুদ্ধে গঠিত সত্যানুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন এবং শৃঙ্খলা বোর্ডের সুপারিশ পর্যালোচনা করে রিজেন্ট বোর্ড অভিযোগগুলোকে "সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত" বলে মত দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে পিএইচডি স্কলারশিপ-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, শিক্ষা ছুটি শেষে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করলেও তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের তারিখ, থিসিস ডিফেন্স-সংক্রান্ত সুপারভাইজারের প্রত্যয়নপত্র এবং ফেলোশিপ ট্রাস্টের ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, এসব নথি জমা দেওয়ার জন্য একাধিকবার লিখিতভাবে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তদন্তে যে বার্তা একই বৈঠকে ১৭ শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষায় পাঠানো শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযোজন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রহণ করা আর্থিক সুবিধা বিধি অনুযায়ী ফেরত দেওয়ার নির্দেশও বহাল রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি—বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ। সেই দাবিকে সামনে রেখে এবার জাতীয় সংসদে নতুন করে আশ্বাস দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে ১৩তম গ্রেডে থাকা শিক্ষকদের সরাসরি ৯ম গ্রেডে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় মোকাবিলায় প্রস্তাবিত বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দও রাখা হয়েছে। তবে এই ঘোষণা এখনই কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। সংসদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখনও নীতিগত আলোচনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পর্যায়ে রয়েছে। সংসদে কী বললেন প্রতিমন্ত্রী? রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মওলানা নুরুল আমিন প্রাথমিক শিক্ষকদের বর্তমান ১৩তম গ্রেড থেকে অন্তত ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার দাবি উত্থাপন করেন। এর জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ১০ম গ্রেড নয়, শিক্ষকদের ৯ম গ্রেডে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। বাজেটে কী রয়েছে? প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বাবদ ২০ হাজার ৪২৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, শিক্ষকদের ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা হলে অতিরিক্ত প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সেই সম্ভাব্য ব্যয় বিবেচনায় রেখেই বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, সরকার সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব মূল্যায়ন করে আগাম পরিকল্পনা করছে। তবে বাজেটে অর্থের সংস্থান রাখা হলেও গ্রেড উন্নীতকরণ কার্যকর করতে আলাদা প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘোষণা? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, তাদের দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান বেতন গ্রেডের সামঞ্জস্য নেই। বিশেষ করে সরকারি চাকরির অন্যান্য সমপর্যায়ের পদের সঙ্গে বেতন বৈষম্যের বিষয়টি শিক্ষক সংগঠনগুলো নিয়মিতভাবে তুলে ধরছে। ফলে ৯ম গ্রেডে উন্নীত করার সম্ভাব্য উদ্যোগ শিক্ষকদের জন্য আর্থিক ও পেশাগত—উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এখন কী অপেক্ষা? প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের ইতিবাচক অবস্থানের ইঙ্গিত মিললেও এখনও— ৯ম গ্রেড কার্যকরের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা হয়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রিসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান বেতন কাঠামো বহাল থাকবে। অর্থাৎ, সংসদে দেওয়া বক্তব্যকে নীতিগত অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা গেলেও এটি এখনো বাস্তবায়িত সিদ্ধান্ত নয়। শিক্ষা খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতকে আধুনিক ও কার্যকর করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। আগামী পাঁচ বছর একই ধারায় সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মূল তথ্য এক নজরে প্রাথমিক শিক্ষকদের ৯ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষকদের বেতনের জন্য বরাদ্দ ২০,৪২৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ৯ম গ্রেড কার্যকর হলে অতিরিক্ত প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। বিষয়টি এখনও নীতিগত আলোচনা পর্যায়ে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ঢাকা কলেজের কর্মচারী মনিরের বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পদ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকা কলেজের একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে মনিরুজ্জামান মনিরের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র, অভিযোগকারী এবং এলাকাবাসীর দাবি—দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে তিনি নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি এবং মনিরুজ্জামান মনিরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। পরিচয়ের আড়ালে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে ঢাকা কলেজে কর্মরত থাকলেও বিভিন্ন সময়ে মনির নিজেকে সাংবাদিক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা কিংবা শিক্ষা অফিসের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরিচয় ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতেন। শিক্ষা বিভাগের ভেতরেও তাকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পদের অভিযোগ স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর কালশী এলাকায় একটি বহুতল ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে মনিরের। এছাড়া মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১,৭৮০ বর্গফুট আয়তনের একটি অভিজাত ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর সরকারি বেতনের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য পাওয়া যায় না। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তার নামে-বেনামে আরও সম্পদ থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস ও বৈধতা যাচাইয়ে সরকারি তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ব্যাংকে কোটি টাকার আমানতের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন ব্যাংকে মনিরের প্রথম স্ত্রী রিমান নামে কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র, এফডিআর এবং ব্যাংক আমানত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং অস্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে এসব অর্থের উৎস তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিংবা মনিরের পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। চুয়াডাঙ্গায় ‘সম্পদের সাম্রাজ্য’ নিজ জেলা চুয়াডাঙ্গাতেও মনিরের বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। শহরের মুসলিমপাড়ায় প্রায় ১৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত একটি বাগানবাড়ি নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এছাড়া শহরের লিনার মোড় এলাকায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার সম্পত্তির মালিকানা থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, চুয়াডাঙ্গা শহরে দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে একটি চারতলা ভবনও নির্মাণ করেছেন তিনি। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—সরকারি চাকরিজীবীর সীমিত আয়ে এত বিপুল সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব? ভয়ভীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মনিরের বিরুদ্ধে শুধু সম্পদ অর্জনের অভিযোগই নয়, রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষা বিভাগের ভেতরে তিনি একটি প্রভাবশালী চক্রের সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত বিরোধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মারধরের মতো ঘটনাতেও তার নাম এসেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, এক ভ্যানচালকের স্ত্রীকে জোরপূর্বক নিজের কাছে রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানালে ওই ভ্যানচালককে মারধরের অভিযোগও ওঠে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের রায় বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। এছাড়াও নারী কেলেঙ্কারি, অনৈতিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে। তদন্ত দাবি এলাকাবাসীর মনিরুজ্জামান মনিরের সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব, জমি, ফ্ল্যাটের মালিকানা এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল। তাদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “একজন সাধারণ কর্মচারীর পক্ষে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া অস্বাভাবিক। তাই তার সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা জরুরি।” তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত মনিরুজ্জামান মনিরের ব্যক্তিগত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) স্থাপন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার এই উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং প্রকল্পের সাবেক পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, অতিমূল্যে ফার্নিচার ক্রয়, দ্বৈত টিএ/ডিএ বিল উত্তোলন, কমিশন বাণিজ্য, অবৈধ অগ্রিম উত্তোলন এবং সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত বাসার আসবাব কেনাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যেভাবে শুরু হয় প্রকল্প “রাবিপ্রবি স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত)” প্রকল্পের আওতায় একটি একাডেমিক ভবন, একটি প্রশাসনিক ভবন এবং ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি তিনতলা আবাসিক হল নির্মাণকাজ চলছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান আবদুল গফুর। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। ফার্নিচার ক্রয়ে ‘অস্বাভাবিক’ ব্যয় প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফার্নিচার কেনার ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এ খাতে অন্তত ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে একটি টেবিলের প্রকৃত মূল্য প্রায় ৮০ হাজার টাকা হলেও বিল ভাউচারে সেটির দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একই ধরনের আসবাবপত্র স্থানীয় বাজারে যে দামে পাওয়া যায়, প্রকল্পে তার দ্বিগুণ-তিনগুণ মূল্য দেখানো হয়েছে।” টিএ/ডিএ বিলেও অনিয়মের অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টিএ/ডিএ বিল গ্রহণের পরও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সফরের নামে দ্বিতীয়বার অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। নথিপত্রে দেখা যায়, এভাবে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, একই সফরের জন্য একাধিক খাত দেখিয়ে বিল সমন্বয় করা হয়েছে। টেন্ডারে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ চারটি ভবনের নির্মাণ টেন্ডার অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে এক শতাংশ হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এভাবে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। কয়েকজন ঠিকাদার এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন বলেও জানা গেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক নির্মাণের নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৩৭ লাখ টাকা উত্তোলন এবং পরিকল্পিত বনায়নের নামে ছবি উপস্থাপন করে আরও ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা উত্তোলনের তথ্যও মিলেছে। সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত বাসার আসবাব? আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে নিজের বাসার জন্য আসবাবপত্র কেনা। অভিযোগে বলা হয়েছে, জয়নাল নামে এক ঠিকাদারের মাধ্যমে তার বাসার জন্য আলমিরা, ফাইল কেবিনেট, চেয়ার-টেবিল এবং খাটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কেনা হয়। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো রসিদ বা সরবরাহ নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অগ্রিম উত্তোলনে অনিয়ম প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে বড় অঙ্কের অগ্রিম টাকা উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে, যদিও প্রকল্প নীতিমালায় এ ধরনের অগ্রিম গ্রহণের বিধান নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী— মার্শাল চাকমার নামে উত্তোলন করা হয় ১৪ লাখ ৭ হাজার ৩২৮ টাকা নিশান চাকমার নামে ১২ লাখ ৯ হাজার টাকা সেকশন অফিসার আবদুল হকের নামে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫০ টাকা মঞ্জুরুল ইসলামের নামে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৮ টাকা এছাড়া আবদুল গফুর নিজের নামেও ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫২২ টাকা উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি নথিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি বলেও জানা গেছে। নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন ২০১৭ সালে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন আবদুল গফুর। তার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, বয়সসীমা অতিক্রম এবং নন-টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও তিনি ওই পদে নিয়োগ পান। এছাড়া তার শিক্ষাজীবনে দুটি তৃতীয় বিভাগ ছিল এবং এর আগে কোনো সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতাও ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, তৎকালীন রেজিস্ট্রার অঞ্জন কুমার চাকমার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করা হয়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ? অভিযোগ রয়েছে, এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পাহাড় কাটার অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় আসামিও হন আবদুল গফুর। সাময়িক বরখাস্ত ও পাল্টা অভিযোগ চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের জরুরি সভায় আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত আদেশে তার বিরুদ্ধে আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়। বরখাস্তের পরদিনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) চিঠি দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। ওই চিঠিতে তিনি নিজেকে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। পরে বরখাস্ত আদেশ স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করলেও আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। উপাচার্যের বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমান বলেন, “রাবিপ্রবি স্থাপন প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আবদুল গফুরকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সতর্ক না হয়ে বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করেন।” তিনি আরও বলেন, “বহিষ্কারের পরও আবদুল গফুর ব্যাংক থেকে প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবদুল গফুরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল এবং খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্পষ্ট হতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: স্বাস্থ্য খাতে সরকারি কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। এবার বরিশালের মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ, কেমিক্যাল রি-এজেন্ট ও মেডিকেল ফার্নিচার কেনার তিনটি দরপত্র ঘিরে কোটি টাকার জালিয়াতি ও যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে দাখিল করা ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট (ডিভিসি), ট্যাক্স সার্টিফিকেট, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট/বিআইএন, কাজের অভিজ্ঞতার সনদ, ব্যাংক সলভেন্সি ও এফিডেভিটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, কিছু নথি জাল বা ভুয়া, আবার কিছু অন্য প্রতিষ্ঠানের। এসব নথি যাচাই না করেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) রিভিউতে ধরা পড়েছে। রিভিউ প্যানেল-৫ গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের এক আদেশে সংশ্লিষ্ট নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ), কার্যাদেশ ও সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করে দরপত্রগুলো যথাযথভাবে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছে। তবে অভিযোগের গুরুত্বের তুলনায় এখন পর্যন্ত জালিয়াতির উৎস শনাক্ত, মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ভূমিকা নির্ধারণ কিংবা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাস্থ্য খাতে জনগণের অর্থ ব্যয়ের যথার্থতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তিন টেন্ডারে কী ঘটেছিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য নন-ইডিসিএল ওষুধ, কেমিক্যাল রি-এজেন্ট এবং মেডিকেল ফার্নিচার কেনার উদ্দেশ্যে তিনটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রগুলোর আইডি যথাক্রমে ১৩১৯০৯৮, ১৩১৯১০২ ও ১৩১৯১০৪। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, তিনটি দরপত্রে মোট নয়টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ‘নন-রেসপনসিভ’ বা শর্ত পূরণে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। বিপরীতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ‘রেসপনসিভ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অনুকূলে এনওএ ও কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়নের এই সিদ্ধান্ত নিয়েই আপত্তি তুলেছেন সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, যুক্তিসংগত সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দিয়ে প্রাক্কলিত মূল্যের প্রায় ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশের কাছাকাছি দর দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। সরকারি কেনাকাটায় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না; দরপত্রের শর্ত, কারিগরি যোগ্যতা, নথিপত্রের সত্যতা এবং প্রযোজ্য বিধি অনুসারে মূল্যায়ন করতে হয়। কিন্তু যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি অসত্য নথি গ্রহণ করা হয় এবং অন্য দরদাতাদের অযৌক্তিকভাবে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মুলাদীর তিনটি দরপত্রে ঠিক এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫-এর বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। ৪১টি শর্ত পূরণের দাবি, কিন্তু যাচাই কোথায়? দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি উঠেছে নথি যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দরপত্রে অংশ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটি ৪১টি শর্তের সব কটিই পূরণ হয়েছে বলে উল্লেখ করে। অথচ অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় অনলাইন যাচাইপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বিপিপিএর রিভিউ শুনানিতে ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষের উপস্থাপিত নথি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রিভিউ প্যানেলের কাছে প্রয়োজনীয় ই-জিপি রেকর্ড ও যথাযথ নথিপত্র উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির দায়িত্ব শুধু কাগজপত্র জমা নেওয়া নয়; বরং দরদাতার যোগ্যতা ও দাখিল করা নথির সত্যতা যাচাই করে বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিশেষ করে যেসব নথির সত্যতা অনলাইনে যাচাই করা সম্ভব, সেগুলোর ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই না হলে পুরো মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মুলাদীর ঘটনায় অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ৪১টি শর্ত পূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি শর্তের পক্ষে থাকা নথি কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল? যাচাই করা হয়ে থাকলে সেই প্রমাণ রিভিউ প্যানেলের সামনে উপস্থাপন করা গেল না কেন? এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, যাচাইয়ের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ই-জিপি নথির স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন। ডিভিসি থেকে ব্যাংক সলভেন্সি—নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রিভিউ প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা অডিট রিপোর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। একই সঙ্গে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট বা ডিভিসি নম্বর অনলাইনে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, দরপত্রে দাখিল করা কিছু নথি প্রকৃতপক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের। একটি নথিতে কেডিএফ করপোরেশনের ডিভিসি নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই ডিভিসি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ডিভিসি কোনো প্রতিষ্ঠানের নথির সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বা নথির সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের ডিভিসি ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তার কারণ, উৎস ও দায় নির্ধারণ করা জরুরি। শুধু ডিভিসি নয়, ট্যাক্স সার্টিফিকেট, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট/বিআইএন, কাজের অভিজ্ঞতার সনদ, ব্যাংক সলভেন্সি ও এফিডেভিটসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগে যেসব নথিকে জাল বা ভুয়া বলা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটির সত্যতা সংশ্লিষ্ট ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই এবং প্রয়োজন হলে ফরেনসিক পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া দরকার। রিভিউ প্যানেলের পর্যবেক্ষণ, অভিযোগকারীদের বক্তব্য এবং চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত জালিয়াতি—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। নেক্সট জেন ইন্টারন্যাশনাল: অল্প সময়ের ব্যবসায়িক ইতিহাস, অভিজ্ঞতার দাবি কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নেক্সট জেন ইন্টারন্যাশনালের নথি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্সের তারিখ ২ জুলাই ২০২৬, টিআইএন নিবন্ধনের তারিখ ২৪ মার্চ ২০২৬ এবং বিআইএন নিবন্ধনের তারিখ ১৭ মে ২০২৬ উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ নথিতে উল্লিখিত তারিখ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে। এর আগে টিআইএন ও বিআইএন নিবন্ধনের তথ্য থাকলেও দরপত্রে অংশগ্রহণের সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মেয়াদ, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। এখানেই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার শর্ত পূরণের পক্ষে কী ধরনের নথি দাখিল করেছিল? ওই অভিজ্ঞতার সনদ কোন প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ ইস্যু করেছে? সেগুলোর সত্যতা কি সংশ্লিষ্ট উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছিল? কোনো প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নতুন হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য হয়ে যায় না। তবে দরপত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদের অভিজ্ঞতা বা পূর্ববর্তী কাজ সম্পাদনের শর্ত থাকলে সেই যোগ্যতা গ্রহণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য নথির মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়। অতএব, নেক্সট জেন ইন্টারন্যাশনালের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন প্রতিষ্ঠানের বয়স নয়; বরং দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী তার যোগ্যতা প্রমাণিত হয়েছিল কি না এবং মূল্যায়ন কমিটি কীসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটিকে রেসপনসিভ ঘোষণা করেছিল। আপিল চলাকালে কার্যাদেশ, পরে বাতিলের নির্দেশ প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রতিকার না পেয়ে অভিযোগকারী পক্ষ বিপিপিএর রিভিউ প্যানেলে আপিল করে। অভিযোগকারীদের দাবি, আপিলের শুনানি চলার সময়ই ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। চিকিৎসাসেবা ও জনস্বার্থের বিষয়টি সামনে রেখে মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে এনওএ ও কার্যাদেশ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, কেমিক্যাল রি-এজেন্ট ও মেডিকেল ফার্নিচার কেনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জনস্বার্থের যুক্তি দেখিয়ে কোনো ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা করা যায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা যেমন বাস্তব, তেমনি সরকারি অর্থে কেনা পণ্যের মান, মূল্য, সরবরাহকারীর যোগ্যতা এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার বৈধতাও জনস্বার্থের অংশ। অভিযোগের পর নথি পর্যালোচনা করে বিপিপিএর রিভিউ প্যানেল-৫ গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট এনওএ, কার্যাদেশ ও সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করে দরপত্রগুলো পুনরায় যথাযথভাবে মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। এ আদেশ ক্রয়প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে কার্যাদেশ ও চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেওয়ার অর্থই সব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। নথি জালিয়াতি হয়েছে কি না, কে বা কারা এতে জড়িত এবং মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল—সেগুলো পৃথক তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য: ‘কেনাকাটা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে’ এ বিষয়ে মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ ফজলে রাব্বী বলেন, “দরপত্র যাচাই প্রক্রিয়া যথাসম্ভব স্বচ্ছভাবে করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও ভুল থাকতে পারে।” বিপিপিএর রিভিউ প্যানেল-৫ কার্যাদেশ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে—এ বিষয়ে তাঁর করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কেনাকাটা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এখন চাইলেও সেটি বাদ দেওয়া যাবে না। আমরা বিপিপিএ রিভিউ প্যানেলে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানাব।” তাঁর বক্তব্যে ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে রিভিউ প্যানেলের নির্দেশের পর ইতোমধ্যে শুরু হওয়া কেনাকাটার ক্ষেত্রে কী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সরবরাহ করা পণ্য গ্রহণ বা মূল্য পরিশোধের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে এবং চুক্তি বাতিলের নির্দেশ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কার্যাদেশ বাতিলের নির্দেশের পরও ক্রয়প্রক্রিয়া চলমান থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে আদেশের পরিধি ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে লিখিতভাবে অবস্থান পরিষ্কার করা। ‘অবহেলা, নাকি কাউকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা?’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ বলেন, রিভিউ প্যানেলের কার্যাদেশ বাতিলের নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে ভুয়া ডিভিসি, অন্য প্রতিষ্ঠানের নথি, জাল অডিট রিপোর্ট কিংবা অসত্য অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করা হয়ে থাকলে শুধু দরপত্র বাতিল করেই দায়িত্ব শেষ করা যায় না। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট নথির উৎস শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি দরপত্র যাচাই ও মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। পুরো বিষয়টি নিছক অবহেলা, নাকি কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এই বক্তব্যে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক দিক উঠে এসেছে। কোনো অনিয়মের অভিযোগে কার্যাদেশ বাতিল করা হলে তা তাৎক্ষণিক প্রতিকার হতে পারে; কিন্তু নথি জালিয়াতির অভিযোগের উৎস ও দায়ীদের শনাক্ত না করা গেলে একই ধরনের অনিয়ম অন্য ক্রয়প্রক্রিয়ায়ও পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যায়। একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম, সিন্ডিকেটের অভিযোগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্রের বরাতে আরু করপোরেশন, জাজ করপোরেশন ও কেডিএফ করপোরেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। একই সূত্রে জাজ এন্টারপ্রাইজ, এনএস ট্রেডিং করপোরেশন, আর এস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আরএম ট্রেডার্স, পিকেএস ট্রেডার্স, নেক্সট জেন ইন্টারন্যাশনাল, এনএস ট্রেডিং, কেডিএফ ইন্টারন্যাশনাল ও আয়মান করপোরেশনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্রটির দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং অতীতে একটি প্রভাবশালী টেন্ডার চক্রের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম কোনো সূত্রের বক্তব্যে উঠে আসা বা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা মানেই মুলাদীর তিনটি দরপত্রে প্রত্যেকটির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়া নয়। কোন প্রতিষ্ঠান কোন দরপত্রে অংশ নিয়েছে, কোন নথি দাখিল করেছে, তাদের মধ্যে মালিকানা বা প্রতিনিধিত্বের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ আছে—এসব পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তিনটি দরপত্রের ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া এখন জরুরি: ১. যেসব নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছিল কি না? ২. ৪১টি শর্ত পূরণের সিদ্ধান্ত কী কী নথি ও যাচাইপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল? ৩. অভিযোগ অনুযায়ী, অন্য প্রতিষ্ঠানের ডিভিসি বা নথি ব্যবহার করা হয়ে থাকলে সেগুলো দরপত্রে কারা সংযুক্ত করেছে এবং কে বা কারা যাচাই করেছে? ৪. রিভিউ প্যানেলের আদেশের পর এনওএ, কার্যাদেশ ও চুক্তি বাতিলের নির্দেশ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? ৫. মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ভূমিকা তদন্ত করা হবে কি না এবং সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতি নিরূপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না? ৬. অভিযোগে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোনো যোগসাজশ বা সমন্বিতভাবে দরপত্রে অংশ নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর নথিভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু কার্যাদেশ বাতিল নয়, জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তিনটি দরপত্র ঘিরে ওঠা অভিযোগ সরকারি কেনাকাটার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে। বিপিপিএর রিভিউ প্যানেলের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট এনওএ, কার্যাদেশ ও চুক্তি বাতিল এবং পুনর্মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির জন্য নথির সত্যতা যাচাই, মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা এবং দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ অপরিহার্য। এখানে মূল বিষয় কেবল কে কাজ পেয়েছে, তা নয়। বরং যোগ্যতার শর্ত কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সরকারি অর্থে কেনাকাটার প্রতিযোগিতা কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থে কেনাকাটার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে অভিযোগের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রত্যেকের বক্তব্য ও নথি যাচাইয়ের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। মুলাদীর এই ঘটনায় এখন দেখার বিষয়—রিভিউ প্যানেলের নির্দেশ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, অভিযোগে উল্লিখিত নথিগুলোর সত্যতা যাচাই করে কী পাওয়া যায় এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়।
রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় আলোক হাসপাতালের তিন শাখায় ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন—রোগীদের কাছ থেকে উচ্চমূল্য নেওয়ার অভিযোগ ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় পাশাপাশি একাধিক ভবন জোড়া দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির আলোক হেলথকেয়ার শাখায় একটি ভবনের সঙ্গে আরেকটি ভবন যুক্ত করে রোগী ও স্বজনদের চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই এলাকার প্রতিষ্ঠানটির অন্য দুটি শাখা—আলোক হাসপাতাল লিমিটেড এবং আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার—নিয়েও ভবন নির্মাণ বিধিমালা ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিন পরিদর্শনে অন্তত দুটি হাসপাতালে জরুরি বহির্গমনের পৃথক ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। কয়েকটি স্থানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও দেখা যায়নি। ফলে কোনো ভবনে আগুন বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে রোগী ও স্বজনদের নিরাপদে বের করে আনা কতটা সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি সিজারিয়ান, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, কেবিনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তুলনামূলক বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, হাসপাতালে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং ভবনগুলোর সংযুক্তি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, অভিযোগগুলো সরেজমিন যাচাই করে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিন হাসপাতাল, প্রশ্ন ভবনের কাঠামো নিয়ে গত ৪ ও ৬ অক্টোবর মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেলের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে অবস্থিত আলোক হাসপাতালের তিনটি শাখা সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো— আলোক হাসপাতাল লিমিটেড আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার আলোক হেলথকেয়ার এর মধ্যে দুটি হাসপাতালে জরুরি বহির্গমনের পৃথক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। আলোক হেলথকেয়ারে দুটি ভবন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় রয়েছে। এক ভবন থেকে অন্য ভবনে যাওয়ার জন্য নিচতলা ও চতুর্থ তলায় সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি ভবন সাততলা এবং অন্যটি পাঁচতলা। অন্যদিকে আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের ভবনটি নয়তলা এবং আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালটি ১০ তলা ভবনে অবস্থিত। ভবনের এই কাঠামো বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালকর্মীদের নিরাপদে বের হওয়ার পথ কতটা কার্যকর—সেটিই এখন অন্যতম প্রশ্ন। অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কোথায়? ৪ অক্টোবর আলোক হাসপাতাল লিমিটেড ও আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতাল ঘুরে বিভিন্ন বিষয় চোখে পড়ে। আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের ছাদের এক পাশে একটি ক্যান্টিন রয়েছে। সেখান থেকে রোগী ও স্বজনদের খাবার সরবরাহ করা হয়। হাসপাতালের সপ্তম তলায় কেবিন রয়েছে। এর পরের অংশে আইসিইউ, চিকিৎসকদের চেম্বার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। রোগী ওঠানামার জন্য পৃথক র্যাম্প দেখা যায়নি। দুইটি লিফটই রোগী ও স্বজনদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চোখে পড়েনি। আগুন লাগলে নিচে নামার ক্ষেত্রে খাড়া সিঁড়িই প্রধান ভরসা বলে দেখা গেছে। পৃথক জরুরি বহির্গমন পথও চোখে পড়েনি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অগ্নিকাণ্ড হলে বিশেষ করে আইসিইউ, কেবিন কিংবা শয্যাশায়ী রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ১০ তলা ভবনে কেবিন বেশি, শয্যা ১৭ আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালটি ১০ তলা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। দশম তলায় নামাজের কক্ষ ও হিসাব বিভাগ রয়েছে। ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা ১৭টি। অন্য ফ্লোরগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন কেবিন। রোগীর স্বজনদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কেবিনে রোগী রাখলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে কেবিনের সংখ্যা ও শয্যার অনুপাতের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ‘নকশায় আছে বলেই ভবন জোড়া লাগানো’ অভিযোগের বিষয়ে আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের উপপরিচালক মনির খান বলেন, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। হয়তো আপনার চোখে তা পড়েনি। আপনি একসময় আসেন। আপনাকে আমি নিজে ঘুরিয়ে দেখাব।’ ভবন দুটি জোড়া লাগানোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘নকশায় আছে বলেই ভবনগুলো একটির সঙ্গে অপরটির জোড়া লাগানো অবস্থায় রয়েছে।’ হাসপাতালের সেবার মূল্য নিয়ে অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানটির মানের বিষয়টি তুলে ধরেন। মনির খান বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান। আমাদের প্রতিষ্ঠানও স্কয়ার, আজগর আলীর মানের। এরপরও তুলনায় অন্যদের চেয়ে খরচ আমাদের এখানে কম।’ সিজারিয়ানে ৯০ হাজার টাকা, কেবিনে আরও বাড়তি আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের খরচ জানতে কাস্টমার কেয়ার কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়। ওই কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালের যেকোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে সিজারিয়ান করালে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সাধারণ শয্যায় খরচ হবে ৯০ হাজার টাকা। কেবিনে থাকলে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লাগবে। আর রোগী নিজের পছন্দের বিশেষ কোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করাতে চাইলে আরও ৫ হাজার টাকা দিতে হবে। ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় এর বাইরে। অন্যদিকে রাতে একজন সহকর্মী একই হাসপাতালে ফোন করে স্বাভাবিক প্রসব ও সিজারিয়ানের খরচ জানতে চাইলে হাসপাতাল থেকে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়। তখন জানানো হয়, স্বাভাবিক প্রসবের খরচ ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে একদিন হাসপাতালে থাকতে হবে এবং ওষুধপত্রের খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। সিজারিয়ানের জন্য ওষুধ ছাড়া ৭০ হাজার টাকা এবং হাসপাতালে দুই থেকে তিন দিন থাকার কথা জানানো হয়। অর্থাৎ একই হাসপাতাল থেকে সিজারিয়ানের খরচ সম্পর্কে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে—একবার ৯০ হাজার টাকা এবং অন্যবার ৭০ হাজার টাকা। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতেও দামের পার্থক্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে রঙিন আল্ট্রাসনোগ্রাফির খরচ ১ হাজার ২০০ টাকা। একই পরীক্ষার জন্য আলোক ডায়াগনস্টিক ও জেনারেল হাসপাতালে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এসি কেবিনের দৈনিক ভাড়া ১ হাজার ৭০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আলোক হাসপাতালে একই ধরনের কেবিনের ভাড়া ৫ হাজার টাকা। এ বিষয়ে মনির খান বলেন, ‘আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট। আমাদের মানের সঙ্গে আদ্-দ্বীনের তুলনা করলে হবে না।’ সাতটি পরীক্ষায় ৬ হাজার ৬০০ টাকা রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে রাকিবুল হাসান (৩১) ডেঙ্গু সন্দেহে আলোক হাসপাতালে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আসেন। চিকিৎসক হারুন-উর-রশিদের পরামর্শে তাঁকে সাতটি পরীক্ষা দেওয়া হয়। পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ছিল ইউরোফ্লুমেট্রি, র্যানডম গ্লুকোজ, ক্রনিক আনপ্রেডিকটেবল স্ট্রেস র্যান্ডম, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইউরিন আর/ই, এক্স-রে কিউইউবি ডিজিটাল ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি। এসব পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ তাঁর কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হয়। পরে কমিশন হিসেবে ৮৭০ টাকা ফেরত দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। অন্যদিকে মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা ইমরান হোসেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে আলোক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ইমরান হোসেনের দাবি, তাঁকে প্রথমে আল্ট্রাসনোগ্রাফির ফি ৩ হাজার টাকা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ টাকা রাখা হয়। ‘র্যাম্প আছে’, দেখানো হলো লিফটের পাশের পথ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ম্যানেজার সোহেল দাবি করেন, হাসপাতালে র্যাম্প রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে অবশ্যই র্যাম্প আছে।’ এরপর তিনি লিফটের পূর্ব পাশে একটি র্যাম্প দেখান। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, সেটি মূলত লিফট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কেন দেখা যাচ্ছে না—এ প্রশ্নের জবাবে সোহেল বলেন, ‘আমাদের সবই আছে। কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চুরি হওয়ার কারণে লাগানো হয় না।’ হাসপাতালের বিভিন্ন তথ্য জানতে তিনি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দেন এবং এ বিষয়ে উপপরিচালক মনির খানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন হাসপাতালের বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফি ১০০ টাকার পরিবর্তে ৪০০ টাকা আদায় করছে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া ডেলিভারি বা সিজারিয়ানে কোনোভাবেই ৯০ হাজার টাকা বিল হতে পারে না।’ তাঁর মতে, রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, একটি স্বাভাবিক প্রসবে ১২ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়ার সুযোগ নেই। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যে চিকিৎসক ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, কেবিন, হাসপাতালের অবস্থান, অবকাঠামো ও অন্যান্য সেবার পার্থক্য থাকতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর: অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা আলোক হাসপাতালের এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে আগে আরও একজন সাংবাদিকের কাছ থেকেও অভিযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আলোক হাসপাতাল নিয়ে আরও একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করেছিলেন। সেখানে যেসব অসঙ্গতি রয়েছে, তা আমি সরেজমিন পরিদর্শন করব। এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অর্থাৎ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরেজমিন পরিদর্শনেই অভিযোগগুলোর বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা। ফায়ার সেফটি নিয়ে আইনি জটিলতার কথাও বলছে ফায়ার সার্ভিস আলোক হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বলেন, রাজধানীর বিপুলসংখ্যক ভবনেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, রাজধানীর প্রায় ৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কোনো না কোনো অসঙ্গতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং ফায়ার আইনের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফায়ার আইনে সাত তলার ওপরে ভবন হলে ফায়ার সেফটি বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিল্ডিং কোডে ১০ তলার ওপরে হলে সেফটি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। রোগীর নিরাপত্তা কার কাছে? একাধিক ভবন জোড়া দিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা, জরুরি বহির্গমন পথের অনুপস্থিতি, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র সরেজমিনে না দেখা যাওয়া, র্যাম্প নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ নিয়ে অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে আলোক হাসপাতালের তিনটি শাখার অবকাঠামো ও সেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং ভবনগুলো অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত ও সংযুক্ত। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিযোগগুলো সরেজমিনে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তাই মূল প্রশ্ন এখন একটাই—কাগজে-কলমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার দাবি আর বাস্তবে রোগী ও স্বজনদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো—দুটির মধ্যে মিল কতটা? বিশেষ করে হাসপাতালের মতো স্থাপনায়, যেখানে অনেক রোগী নিজেরা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেন না, সেখানে অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বহির্গমন, কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা এবং নিরাপদ সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত—তার উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের পরই এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের তালশারি এলাকায় প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি এক দশক পার করেও কার্যক্রমে আসেনি। ফলে দেশের অন্যতম ব্যস্ত স্থলবন্দর এলাকার হাজারো শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের প্রধান স্থলবন্দরগুলোর একটি। এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক পণ্য লোড-আনলোডসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকেন। কিন্তু দুর্ঘটনা বা জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে তাদের ভরসা নাভারন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, যা ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। গুরুতর রোগী বা প্রসূতি মায়েদের অবস্থা জটিল হলে তাদের প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের যশোর সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি হাসপাতালে নেওয়ার পথে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র অব্যবহৃত পড়ে থাকায় এটি এখন “রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার প্রতীক” হয়ে উঠেছে। বর্তমানে কেন্দ্রটিতে একজন উপজেলা সহকারী মেডিকেল অফিসার, একজন পিডব্লিউবি কর্মী এবং একজন ফিল্ড অফিসারসহ মোট আটজন কর্মরত রয়েছেন। তবে তাদের কাজ মূলত মাঠপর্যায়ে মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ। চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি। ফিল্ড অফিসার আবু বকর জানান, গত দুই বছর ধরে কেন্দ্রটির জন্য কোনো বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। পূর্বের সীমিত বরাদ্দ দিয়েও প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম বা আসবাবপত্র সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। ফলে কার্যত কেন্দ্রটি নামমাত্র কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন ও মানিক মিয়াসহ সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, শুধু ১০ শয্যার কেন্দ্র চালু করাই যথেষ্ট নয়। তাদের দাবি, এটি দ্রুত ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে উন্নীত করা প্রয়োজন। তাদের আরও অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন একটি জায়গায় ট্রাক টার্মিনাল থাকায় হাসপাতালের জায়গা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওই জমি অধিগ্রহণ করে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বাড়ানো গেলে বেনাপোল ও আশপাশের এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসা পেতে পারে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক দশক ধরে সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনটি অব্যবহৃত পড়ে থাকায় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটছে। একই সঙ্গে বন্দর এলাকায় জরুরি চিকিৎসা না থাকায় শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এখন স্থানীয়দের একটাই দাবি—অচল পড়ে থাকা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হোক এবং বেনাপোলে একটি ১০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলা হোক।
শীর্ষনিউজ: আওয়ামী আমলে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেনাকাটায় কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। সে সময়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাইন্স হাউজের বিরুদ্ধে হাসপাতালের ১০৫ কোটি টাকার কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। তারপরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৭৬ কোটি টাকার আরেকটি কাজ এই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ছক সাজিয়েছিল একই দুর্নীতিবাজ চক্র। তবে কারসাজি করে সাইন্স হাউজকে কাজ দেওয়া হচ্ছেÑ এমন তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। একই লটে ৭০৩ ধরনের পণ্য বিএনপি আমলে এবার বাতিল হওয়া সেই দরপত্রের একই কারসাজিতে আবারও নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ক্রয় তালিকায় একই লটে অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে টেলিভিশন, ঘড়িসহ ৭০৩ ধরনের পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) পরিপন্থি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এই বিষয়ে প্রথমবার দরপত্র আহবান করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণির পণ্য একত্রে রাখার কারণে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। একাধিক প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগে নিম্নমানের স্পেসিফিকেশন, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেল উল্লেখ, মাত্র দুই বছরের ওয়ারেন্টি এবং উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বদলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন গ্রহণযোগ্য করার মতো শর্তের কথা বলা হয়। এই পটভূমিতে তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর দরপত্রটি বাতিলের সিদ্ধান্ত দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ নতুন আহ্বান করা দরপত্রে আগের একই ধরনের শর্ত বহাল রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত মাসের ৬ এপ্রিল দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল। এতে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। দরপত্রে নেই গুণগত মান, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত দরপত্রের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একই লটে তালিকায় সিসিইউ বেড, কার্ডিয়াক মনিটর, হিমোডায়ালাইসিস মেশিন, অ্যানেসথেশিয়া যন্ত্র, এক্স-রে ইউনিটের পাশাপাশি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, জেনারেটর, এমনকি টেলিভিশন ও ঘড়িও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এত বৈচিত্র্যময় পণ্য এক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে কোনো একক প্রতিষ্ঠান সব সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে না। এতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া দরপত্রে অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে গুণগত মান, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত নেই। ভারী ও সংবেদনশীল চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যেখানে সাধারণত পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি চাওয়া হয়, সেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র দুই বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত না থাকলে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সরবরাহ ও স্থাপনের পরপরই ওয়ারেন্টি কার্যকর হওয়ায় দক্ষ জনবল না থাকলে অনেক যন্ত্র ব্যবহার না করেই ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে পারে, যা সরকারি অর্থের অপচয়। অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, দরপত্রে কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, মডেল, উৎপত্তিস্থল ও কোড উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অন্যান্য যোগ্য সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হয়। দেশের অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেখানে পরীক্ষিত উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে কম পরিচিত ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক কেন, তা স্পষ্ট নয়। ‘পিপিআর’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ হাসপাতালের কারিগরি কমিটির দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিটির অদক্ষতা বা সীমাবদ্ধতার কারণে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনার পথ সুগম হয়েছে। ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেইন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের সহকারী প্রকৌশলী মাইনুর শুভ বলেন, এক লটে ৭০৩ ধরনের পণ্য কেনা পিপিআরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাতিল হওয়ার পর নতুন করে বিধি মেনে দরপত্র আহ্বান করা উচিত। এর আগে ব্লাড ব্যাংক ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি কেনায় প্রায় ৯৬ কোটি টাকার ৯টি দরপত্র আহবান করা হয়। সব কাজ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে পরে অভিযোগ ওঠে, নিম্নমানের পণ্যে বিদেশি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়া উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। এতে ভবিষ্যতে নিরীক্ষা আপত্তি ও দুর্নীতির মামলার ঝুঁকি রয়েছে। তাদের পরামর্শ, প্রয়োজনভিত্তিক আলাদা লটে বিভাজন করে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা না হলে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হবে। প্রকল্প পরিচালক এস এম কবির হোসেন বলেন, দরপত্র আহবান করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। বাতিল হওয়া দরপত্রের শর্তেই কেন নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলো- জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। হাসপাতালটিকে জিম্মি করে রেখেছে আওয়ামী দুর্নীতিবাজ চক্র পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পে আওয়ামী সরকারের আমলে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। ৯টি প্যাকেজে প্রায় ১০৫ কোটি টাকার কেনাকাটা হয়। নানা রকমের অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ৯টি প্যাকেজেরই কার্যাদেশ দেওয়া হয় বহুল আলোচিত, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজকে। কিন্তু দুই বছর আগে বিল পরিশোধ করলেও সেইসব মালামাল এখনো পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে, তাতে ইউরোপ-আমেরিকার স্টিকার ও সিল ব্যবহার করেছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই একই ঠিকাদারকে আবারও ৭৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছিল। টেন্ডারের শুরুতেই ভয়াবহ রকমের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। পিপিআর-এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা এক্ষেত্রে চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়। টেন্ডারের এসব গুরুতর অনিয়মকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ দেওয়া হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখিত নির্দেশও দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু তারপরও দুর্নীতিবাজচক্রের তৎপরতা থামেনি। এর কারণ হলো, তদন্তের পরে টেন্ডার বাতিল হলেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রত্যেকেই বহাল-তবিয়তে রয়ে গেছেন।
বরিশাল অফিস : বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) ডা. মুস্তফা লুৎফুল আজিজের বিরুদ্ধে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের সঙ্গে সরাসরি আর্থিক সংশ্লিষ্টতা এবং সরকারি হাসপাতালের রোগীদের সেখানে পাঠিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ‘হামিদ মেমোরিয়াল’ নামে একটি ক্লিনিকে ডা. মুস্তফার প্রায় ৩০ শতাংশ অংশীদারত্ব রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তিনি রোগীদের সেখানে না রেখে ওই বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে উৎসাহিত করেন—বিশেষ করে অপারেশন-সংক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে। রোগী রেফার নিয়ে অভিযোগ হাসপাতালের ভেতরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার সচল থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বোঝানো হয় সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে রোগীরা বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে যান। স্থানীয়দের ভাষ্য, “সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও নানা অজুহাতে রোগীদের বাইরে পাঠানো হচ্ছে।” দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টতার দাবি তদন্তে জানা গেছে, ২০০৮ সালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন ডা. মুস্তফা এবং দীর্ঘ সময় সেখানে কর্মরত ছিলেন। ওই সময়েই হাসপাতালের পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয় হামিদ মেমোরিয়াল ক্লিনিক, যেখানে শুরু থেকেই তিনি শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ। অন্যদিকে, স্থানীয়দের দাবি—ক্লিনিকটির মূল মালিকানা একসময় অর্পন হাওলাদার ও তার পরিবারের হাতে থাকলেও পরবর্তীতে শেয়ার বিক্রির সুযোগে ডা. মুস্তফা এবং আরেক চিকিৎসক ডা. হাফিজুর রহমান শাকিল বড় অংশ কিনে নেন। পূর্ববর্তী প্রশাসনের সঙ্গে তুলনা হাসপাতালের একাধিক কর্মীর মতে, ২০২০ সালের দিকে তৎকালীন ইউএইচও ডা. এসএম কবির হোসেন অধিকাংশ অপারেশন সরকারি হাসপাতালেই সম্পন্ন করতেন। তার সময়ে প্রায় ২,২০০টি অপারেশন সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. মুস্তফা দায়িত্বে থাকাকালে হাসপাতালের অপারেশন কার্যক্রম কমে যায় এবং রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এ নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল এবং এক পর্যায়ে তাকে বদলির সুপারিশ করা হয়। পুনরায় যোগদানের পর অভিযোগ ২০২৩ সালে পদোন্নতির পর ডা. কবির হোসেন অন্যত্র বদলি হন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুনরায় বানারীপাড়ায় ইউএইচও হিসেবে যোগ দেন ডা. মুস্তফা। এরপর থেকেই আবারও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে—তিনি তার সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকে অপারেশন কার্যক্রম জোরদার করেছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ের কিছু সূত্রের দাবি, ক্লিনিকটির ব্যবসায়িক তদারকি এবং লভ্যাংশ সংগ্রহেও তিনি সরাসরি জড়িত। স্বীকারোক্তি ও অস্বীকার স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের কাছে ডা. মুস্তফা ক্লিনিকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হলেও, গণমাধ্যমে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, “আমার কোনো ক্লিনিকের মালিকানা নেই, এমনকি আমার কোনো স্বজনও সেখানে জড়িত নন।” তবে একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে তাকে ক্লিনিকের সঙ্গে শেয়ারভিত্তিক সম্পৃক্ততার কথা বলতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে সরকারি চাকরির পাশাপাশি ক্লিনিক ব্যবসা করা সম্ভব। আইন ও নীতিমালার প্রশ্ন বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারেন না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া এ বিষয়ে বরিশাল জেলার সিভিল সার্জন ডা. এসএম মঞ্জুর এ এলাহী বলেন, “সরকারি হাসপাতালে কর্মরত কোনো চিকিৎসক বেসরকারি ক্লিনিকের ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারেন না। এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সাধারণ মানুষের ভোগান্তি স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে তারা বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, এবং তদারকি ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে। এই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল : বরিশালের ব্যস্ত সদর রোডে প্রতিদিন বিকেলের পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে একটি চেম্বারের সামনে। অপেক্ষায় থাকা মানুষদের চোখে এক ধরনের অদৃশ্য আশ্বাস—দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা। এই আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. ডি. বি পাল। দীর্ঘ পেশাজীবনে তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, বরং বরিশাল অঞ্চলে চক্ষু চিকিৎসার এক নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন তার পেশাগত অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। সহকর্মীরা বলছেন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত—দুই ক্ষেত্রেই তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার পরিধি চিকিৎসা শিক্ষায় এমবিবিএস, ডিও এবং এমএস (চক্ষু) ডিগ্রির পাশাপাশি উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা তাকে আধুনিক চক্ষুবিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছানি (ক্যাটারাক্ট), গ্লুকোমা, চোখের সংক্রমণ এবং জটিল দৃষ্টিশক্তি সমস্যার ক্ষেত্রে তার নির্ণয় ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে নিখুঁত। ফ্যাকো সার্জারির মতো আধুনিক পদ্ধতিতে তার দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রোগীদের অনেকেই জানিয়েছেন, জটিল বলে ফিরিয়ে দেওয়া কেসেও তিনি চিকিৎসার সম্ভাবনা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। রোগীদের অভিজ্ঞতা: আস্থার পেছনের গল্প চেম্বারের বাইরে অপেক্ষমাণ এক রোগীর ভাষায়, “ডা. ডি. বি পালের কাছে গেলে তিনি সময় নিয়ে কথা শোনেন। শুধু প্রেসক্রিপশন দেন না, বুঝিয়েও দেন।” এই ‘সময় দেওয়ার’ বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে রোগীদের অভিজ্ঞতায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেখানে সময়ের চাপ একটি বড় বাস্তবতা, সেখানে তার এই পদ্ধতি তাকে আলাদা করেছে বলে মনে করেন অনেকে। একটি আলো ফিরে পাওয়ার গল্প আলোচিত একটি ঘটনার কথা — সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহর দু চোখে ছানি পড়ে।কোন ডাক্তার সাহস করেনি ছানি অপারেশনের । ডা.ডি.বি পাল অত্যান্ত সাহসিকতার সাথে দুটো চোখের ছানি অপারেশন করেন। ফলে যেই মাসুম বিল্লাহ দীর্ঘদিন পৃথিবীর আলো বহু বছর দেখেনি সেই মাসুম বিল্লাহ ফিরে পায় চোখের আলো। দেখতে পেয়েছিল পৃথিবী। পৃথিবীর আলো দেখতে দেখতে তিনি ইন্তেকাল করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অপারেশনটি ছিল জটিল এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সফল অস্ত্রোপচারের পর মাসুম বিল্লাহ আবারও দেখতে সক্ষম হন। তার ঘনিষ্ঠদের মতে, “বহু বছর পর তিনি আবার পৃথিবী দেখেছিলেন। জীবনের শেষ সময়টুকু তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন—যা তার পরিবারের কাছে এক বড় স্বস্তি হয়ে থাকে। এ ভাবে অনেকেই মাসুম বিল্লাহর মত চোখের আলোতে পৃথিবী দেখার জন্য আজও নিরলস ভাবে মানুষের চোখের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ডা. ডি.বি পাল। চিকিৎসার পরিধি ও বর্তমান কার্যক্রম বর্তমানে বরিশালের দুটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রোগী দেখছেন তিনি—সদর রোডের ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং পলিটেকনিক রোডের বিশেষায়িত এশিয়ান আই কেয়ারে । প্রতিদিন সন্ধ্যা ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তার চেম্বারে রোগী দেখার নির্ধারিত সময়, শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিন তিনি সেবা দিয়ে থাকেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তার ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি সম্পর্কে সহকর্মীরা বলছেন, তিনি নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী এবং নিজেকে নিয়মিত আপডেট রাখেন। মানবিকতা বনাম পেশাদারিত্ব চিকিৎসা দক্ষতার পাশাপাশি তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও আলোচনায় আসে। রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের ধরন—সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা, ধৈর্য নিয়ে শোনা—এসব বিষয় তাকে অনেকের কাছে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ করে তুলেছে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক আস্থা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বৃহত্তর বাস্তবতাও তুলে ধরে—যেখানে মানসম্মত চিকিৎসা সেবার অভাব অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসকের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে চক্ষু চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনও গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। বরিশালের মতো অঞ্চলে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে ডা. ডি. বি পালের কাজকে অনেকেই একটি বৃহত্তর স্বাস্থ্য বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখছেন—যেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও দক্ষতা অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাকে আংশিকভাবে পূরণ করে। বরিশালের এই চক্ষু বিশেষজ্ঞের চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জন্য তিনি কেবল একজন ডাক্তার নন—বরং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনার একটি প্রতীক। আর সেই প্রতীকের পেছনে রয়েছে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, এবং এক ধরনের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা—যা প্রতিদিন সন্ধ্যায় আবারও নতুন করে পরীক্ষা দিতে বসে। ডা. ডি. বি পালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি রোগীদের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কথা বলেন, তাদের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সহজভাবে চিকিৎসা ব্যাখ্যা করেন। এই গুণাবলিই তাকে শুধু একজন দক্ষ চিকিৎসক নয়, বরং একজন সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবেও আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। চক্ষু চিকিৎসা ক্ষেত্রে ডা. ডি. বি পালের অবদান বরিশালের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং নিষ্ঠা মানুষের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ভারতের টেলিভিশন অঙ্গনে অভিনেত্রী সঞ্চিতা উগালের অকাল মৃত্যু নতুন করে আলোচনায় এনেছে বিনোদন জগতের কর্মপরিবেশ, মানসিক চাপ এবং শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই ঘটনার পর অভিনেত্রী আঁচল খুরানা সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির নানা অপ্রকাশিত বাস্তবতা তুলে ধরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ করেছেন। ভিডিওতে আঁচল দাবি করেন, টিআরপি-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা, বাজেট সংকোচন এবং কাজ ধরে রাখার অনিশ্চয়তা শিল্পীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি করছে। তার মতে, পর্দার আড়ালে চলা এই চাপ অনেক সময় শিল্পীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। টিআরপি ও বাজেটের চাপে শিল্পীরা কতটা নিরাপদ? আঁচল খুরানার ভাষ্য অনুযায়ী, টেলিভিশন শিল্পে চ্যানেলগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকে দর্শকসংখ্যা ও টিআরপি বৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমানোর চাপে থাকে। এই দুইয়ের মাঝখানে শিল্পীরা প্রায়ই অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে কাজ করতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সামান্য কারণ দেখিয়েও অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কখনও কাজের দিন কমিয়ে দেওয়া হয়, আবার কখনও তাদের পেশাগত অবস্থান দুর্বল করে দেওয়া হয়। ‘আপত্তিকর প্রস্তাব’ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ভিডিও বার্তায় আঁচল আরও দাবি করেন, কিছু শিল্পী কাজ পাওয়ার বা কাজ ধরে রাখার লড়াইয়ে অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তার অভিযোগ, কেউ যদি কোনও ধরনের শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি না দেন অথবা আত্মসম্মান রক্ষার জন্য প্রতিবাদ করেন, তাহলে তাকে কাজ থেকে বাদ দেওয়ার কিংবা কাজের সুযোগ সীমিত করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতে পারে। তবে তিনি তার বক্তব্যে কোনও ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা প্রযোজনা সংস্থার নাম উল্লেখ করেননি। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এসব অভিজ্ঞতা তিনি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেছেন। ‘আত্মহত্যার পেছনের চাপ কি বোঝা হয়?’ ভিডিওতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে মানসিক স্বাস্থ্য প্রসঙ্গও সামনে আনেন আঁচল খুরানা। তার প্রশ্ন, আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া অভিনেতা, অভিনেত্রী বা সামাজিকমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতারা কী ধরনের মানসিক ও পেশাগত চাপের মধ্যে থাকেন, তা নিয়ে সমাজ বা শিল্পখাত কতটা আন্তরিকভাবে ভাবছে? আঁচলের মতে, পর্দায় সফলতা ও জনপ্রিয়তার আড়ালে অনেক শিল্পী একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা এবং পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে লড়াই করেন, যা সাধারণ দর্শকের চোখে খুব কমই ধরা পড়ে। সঞ্চিতার মৃত্যু ঘিরে নতুন বিতর্ক সঞ্চিতা উগালের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও, এই ঘটনা ঘিরে বিনোদন জগতে কর্মপরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং শিল্পীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সহজলভ্য করা এখন সময়ের দাবি। সঞ্চিতার মৃত্যুর পর আঁচল খুরানার এই বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে তার উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা শিল্প সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অনলাইন ট্রলিং, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা। এই বাস্তবতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাদিয়া জাহান প্রভা। প্রায় ১৬ বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, কটূক্তি ও মানসিক হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে সম্প্রতি প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নিজের দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সমাজের সেই প্রবণতা নিয়ে, যেখানে অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। ‘কিছু জ্বালাময়ী সত্যি কথা বলব’ ভিডিও বার্তার শুরুতেই প্রভা জানান, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তিনি সাধারণত প্রকাশ্যে কথা বলেন না। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় কথা বলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। তবে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নীরব থাকা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক বিচার, ট্রলিং ও অপমানের পেছনে প্রায়ই ব্যক্তিগত অনিরাপত্তাবোধ বা ‘ইনসিকিউরিটি’ কাজ করে। প্রভার ভাষ্য অনুযায়ী, মনোবিজ্ঞান ও মানব আচরণবিষয়ক গবেষণায়ও এমন প্রবণতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যারা নিজেদের জীবন, যোগ্যতা বা অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নন, তাদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যকে হেয় করে আত্মতৃপ্তি খোঁজেন। ‘আমাকে বুলিং করা হচ্ছে প্রায় ১৬ বছর’ ভিডিও বার্তায় নিজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে প্রভা বলেন, প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ধারাবাহিকভাবে অনলাইন বুলিংয়ের শিকার হয়ে আসছেন। তার দাবি, অনেকেই তাকে আক্রমণ করে ব্যক্তিগত আনন্দ পান। তবে এই একই শক্তি যদি প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত ও সামাজিকভাবে জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য ব্যয় করা হতো, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। ভুক্তভোগী নয়, কেন নয় অপরাধী? প্রভার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সংস্কৃতি নিয়ে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি প্রকাশ এবং কারও ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়া যখন আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ, তখন সমাজের বড় অংশ কেন অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর দিকে আঙুল তোলে? তার মতে, অপরাধীর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠার বদলে ভুক্তভোগীকে বছরের পর বছর ট্রল ও অপমানের মুখে পড়তে হয়। সাইবার বুলিংয়ের সামাজিক প্রভাব ডিজিটাল অধিকার কর্মীদের মতে, সাইবার বুলিং শুধু ব্যক্তিগত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে না; এটি দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাস, পেশাগত জীবন এবং সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন হয়রানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক সমাজেই ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা এখনও দৃশ্যমান। ফলে অপরাধীরা প্রায়ই দায়মুক্তির সুযোগ পায়। প্রভার বার্তার তাৎপর্য দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে প্রভার এই বক্তব্য শুধু তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। তার বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানের লক্ষ্যবস্তু হওয়া ব্যক্তি, নাকি সেই অপরাধী, যিনি প্রথমে অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভেঙেছিলেন—কাকে সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত?
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢালিউডে একসময় সম্ভাবনাময় নায়িকাদের তালিকায় অন্যতম নাম ছিল চিত্রনায়িকা ববি হক। ‘খোঁজ: দ্য সার্চ’ চলচ্চিত্রে অনন্ত জলিলের বিপরীতে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেকের পর তিনি দ্রুতই আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে দেশের শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। তবে যে গতিতে তার ক্যারিয়ার এগোচ্ছিল, সেই ধারাবাহিকতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত ববির ক্যারিয়ার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তী সময়ে একাধিক সিদ্ধান্ত তার পেশাগত অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। সম্ভাবনার শুরু, কিন্তু ধারাবাহিকতার অভাব ক্যারিয়ারের শুরুতে ববি এমন কিছু সিনেমায় অভিনয় করেন, যা তাকে মূলধারার দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে। শাকিব খান ও বাপ্পী চৌধুরীর মতো জনপ্রিয় অভিনেতাদের সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি আলোচনায় আসেন। সেই সময় অনেকেই তাকে ঢালিউডের সম্ভাবনাময় মুখ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, সফলতার সেই ধারাকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী গল্প, বাছাই করা চরিত্র এবং পরিকল্পিত ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনা—যেখানে ববি কাঙ্ক্ষিত ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। বিতর্ক ও সিদ্ধান্তের প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ববি অভিনয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত নানা বিতর্ক এবং আলোচনায় বেশি জায়গা পেয়েছেন। চলচ্চিত্রে নিয়মিত উপস্থিতি থাকলেও তার বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। বিশেষ করে অভিনেতা ও প্রযোজক ডি এ তায়েবের সঙ্গে একাধিক সিনেমায় জুটি বেঁধে কাজ করলেও সেগুলো দর্শক কিংবা বক্স অফিসে উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলতে পারেনি। ফলে তার ক্যারিয়ারে নতুন গতি সৃষ্টির পরিবর্তে স্থবিরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘তছনছ’ বিতর্ক: নতুন প্রশ্নের জন্ম সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তছনছ’ সিনেমাকে ঘিরেও ববি আলোচনায় আসেন। নবাগত অভিনেতা ও প্রযোজক মুন্না খানের বিপরীতে অভিনীত এই সিনেমা মুক্তির আগেই তিনি প্রযোজক-নায়কের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ঘটনায় বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। তবে কয়েকদিন পরই একটি প্রিমিয়ার শোতে মুন্না খানের পাশে দাঁড়িয়ে সিনেমার প্রশংসা করতে দেখা যায় ববিকে। এই অবস্থান পরিবর্তন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। সমালোচকদের মতে, এমন ঘটনাগুলো একজন শিল্পীর পেশাগত অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভক্তদের হতাশা একসময় শাকিব খানসহ দেশের শীর্ষ তারকাদের সঙ্গে অভিনয় করে আলোচনায় থাকা একজন নায়িকাকে ‘তছনছ’-এর মতো বিতর্কিত ও সমালোচিত প্রজেক্টে দেখতে অনেক ভক্তই হতাশ হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের মতে, ববির অভিনয় দক্ষতা নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার প্রজেক্ট নির্বাচন এবং ব্যক্তিগত বিতর্ক। সামনে কোন পথে ববি? ঢালিউডে এখনও ববির পরিচিতি ও দর্শকভিত্তি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ক্যারিয়ারে নতুন মোড় আনতে হলে তাকে আরও সতর্কভাবে সিনেমা নির্বাচন করতে হবে এবং বিতর্কের পরিবর্তে কাজের মাধ্যমে আলোচনায় ফিরতে হবে। একসময় যে সম্ভাবনার আভাস তিনি দিয়েছিলেন, সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী চিত্রনাট্য এবং পেশাদার সিদ্ধান্ত। অন্যথায় ঢালিউডে তার অবস্থান আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : দীর্ঘ আট বছরের আইনি লড়াই শেষে বড় স্বস্তি পেয়েছেন বিশ্বখ্যাত কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা। স্পেনের উচ্চ আদালত তাকে কর ফাঁকির অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার কাছ থেকে আদায় করা প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৭৬৫ কোটি টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেনের কর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, ২০১১ সালে শাকিরা দেশটিতে ১৮৩ দিনের বেশি সময় অবস্থান করেছিলেন। স্পেনের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এক বছরে ১৮৩ দিন বা তার বেশি সময় সেখানে অবস্থান করলে তাকে দেশটির কর আইনের আওতায় আসতে হয়। তবে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, কর কর্মকর্তারা তাদের দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। আদালতের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই বছর শাকিরা স্পেনে মোট ১৬৩ দিন অবস্থান করেছিলেন, যা কর দেওয়ার নির্ধারিত সীমার চেয়ে ২০ দিন কম। এ কারণে তার বিরুদ্ধে আনা কর ফাঁকির অভিযোগ এবং আরোপিত জরিমানাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফেরতযোগ্য অর্থের মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৪ মিলিয়ন ইউরো আয়কর এবং প্রায় ২৫ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা। রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় শাকিরা বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছে। তার অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া তার ব্যক্তিগত জীবন, স্বাস্থ্য এবং পরিবারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার দাবি, তিনি কখনো কর ফাঁকি দেননি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও তা প্রমাণ করতে পারেনি। বিশ্বজুড়ে আলোচিত এই মামলার রায়ে শেষ পর্যন্ত স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন জনপ্রিয় এই সংগীত তারকা।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ২০১৫ সালে বজরঙ্গী ভাইজানের পর আর একসাথে দেখা যায়নি বলিউডের জনপ্রিয় জুটি সালমান-কারিনা কে। ১১ বছর পর ফের আলোচনায় এলেন তারা দু’জন। বলিউডে নতুন করে চর্চায় সালমান খান–এর আসন্ন সুপারহিরো প্রজেক্ট। পরিচালক জুটি রাজ ও ডিকে–র সঙ্গে এই ছবিকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল আগেই, এবার সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিল নায়িকা নির্বাচন নিয়ে নতুন আপডেট। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ছবির নারী প্রধান চরিত্রে এখন সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন করিনা কাপুর খান। যদি সব কিছু ঠিক থাকে, তবে বহুদিন পর আবারও পর্দায় একসঙ্গে দেখা যেতে পারে সালমান ও করিনাকে। এর আগে এই চরিত্রে দক্ষিণী তারকা সামান্থা রুথ প্রভুর নামও শোনা গিয়েছিল। তবে নতুন আপডেটে জানা যাচ্ছে, নির্মাতারা এখন করিনাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে এগিয়ে রেখেছেন এবং তার সঙ্গে আলোচনা চলছে। ছবিটি নিয়ে ইতিমধ্যেই বলিউডে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। কারণ, এটি হবে সালমান খানের ক্যারিয়ারের একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ—একজন সুপারহিরো চরিত্রে তাকে দেখা যেতে পারে, যা তার জন্য নতুন ঘরানার অভিজ্ঞতা। এদিকে জানা গেছে, ছবির গল্প, শুটিং শিডিউল ও অন্যান্য বিস্তারিত এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। তবে প্রি-প্রোডাকশনের কাজ এগিয়ে চলছে এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন সময়ের অপেক্ষা। সব মিলিয়ে, সালমান-করিনা জুটি আবারও ফিরবে কি না—এটাই এখন বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি।
বাংলাদেশের আলোচিত মডেল ও চিত্রনায়িকা হুমাইরা সুবাহ জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। সম্প্রতি তিনি নীরবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন নিজেই। এতদিন বিয়ের বিষয়টি গোপন থাকলেও সম্প্রতি এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তা প্রকাশ করেন এই অভিনেত্রী। সুবাহ জানান, বেশ কিছুদিন আগেই তাদের বিবাহ নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা এবং নির্বাচনি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার কারণে বিষয়টি আগে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সুবাহর স্বামী পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তবে তার পারিবারিক শিকড় ঢাকায়। বিয়ে নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সুবাহ বলেন, শিগগিরই আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমে ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ইতোমধ্যে স্বামীর সঙ্গে তোলা কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন তিনি। ওই পোস্ট ঘিরে ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভেচ্ছায় ভরে উঠেছে মন্তব্যের ঘর। নতুন এই পথচলায় সুবাহ ও তার জীবনসঙ্গীর জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন বিনোদন অঙ্গনের সহকর্মীসহ ভক্তরা।
ইফতারে রুহ আফজার শরবত যেমন শরীর ঠান্ডা রাখে, তেমনি দূর করে দেয় রোজা ও গরমের ক্লান্তিও। ঘরেই কেমিক্যালবিহীন সিরাপ বানিয়ে নিতে পারেন শরবত তৈরির জন্য। জেনে নিন কীভাবে বানাবেন।তাজা গোলাপ ফুলের পাপড়ি আলাদা করে ধুয়ে নিন। ১ কাপ পানি ও গোলাপের পাপড়ি চুলায় বসান। ১ ফোঁটা লাল ফুড কালার দেবেন। মাঝারি আঁচে রেখে দিন প্যান। ফুটে উঠলে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন। কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নামিয়ে ছেঁকে নিন।এক বাটি ফলের টুকরা ব্লেন্ড করে ছেঁকে রস আলাদা করুন। আপেল, আঙুর, তরমুজ, আনারস, কলা বা যেকোনো ধরনের ফল ব্যবহার করতে পারেন এখানে। চুলায় প্যান বসিয়ে ফলের রস দিয়ে দিন। গোলাপ থেকে বের হওয়া পানি ও স্বাদ মতো চিনি দিয়ে নাড়তে থাকুন। মিশ্রণটি ঘন হয়ে গেলে নামিয়ে নিন। নামানোর আগে ২ চা চামচ গোলাপজল দিয়ে নেবেন। ঠান্ডা হলে মুখবন্ধ বয়ামে রেখে দিন নরমাল ফ্রিজে। এক মাস পর্যন্ত রেখে খেতে পারবেন এই রুহ আফজা।
রূহ আফজা: রমজানের জনপ্রিয় পানীয়ের এক শতাব্দীর ইতিহাস রমজান মাস এলেই মুসলিম সমাজে বদলে যায় প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। সেহরি ও ইফতারকে ঘিরে শুরু হয় নানা প্রস্তুতি, বাজারে বাড়ে বিশেষ খাবার ও পানীয়ের চাহিদা। পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা-মুড়ি কিংবা খেজুরের পাশাপাশি ইফতার টেবিলে আরেকটি পরিচিত নাম হলো লাল রঙের শরবত—রূহ আফজা। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে রমজানের সময় এই পানীয়ের জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে অনেক পরিবারের মাসিক বাজারের তালিকায় এটি প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই পানীয় শুধু একটি শরবত নয়; এটি উপমহাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লির একটি ছোট ইউনানি ক্লিনিক থেকে শুরু হওয়া এই পানীয় আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লির গলি থেকে শুরু ১৯০৬ সালের গরমের এক দিনে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজধানী দিল্লির পুরনো এলাকা লাল কুয়ান বাজারে একটি ক্লিনিকের সামনে অস্বাভাবিক ভিড় জমে। স্থানীয় মানুষজন বাতাসে ভেসে আসা গোলাপের সুবাসে আকৃষ্ট হয়ে জানতে পারেন, একজন ইউনানি চিকিৎসক একটি বিশেষ পানীয় তৈরি করেছেন। লাল রঙের সেই পানীয়ের স্বাদ নিতে ভিড় বাড়তেই থাকে। দিনের শেষে তৈরি প্রথম ব্যাচ শেষ হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই অনেকে রূহ আফজার জন্মমুহূর্ত বলে মনে করেন। এই পানীয়ের উদ্ভাবক ছিলেন ইউনানি চিকিৎসক হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ। পুরনো দিল্লিতে তার ক্লিনিকের নাম ছিল হামদর্দ দাওয়াখানা। ‘হামদর্দ’ শব্দটির অর্থ—দুঃখ কষ্টের সময়ের সঙ্গী। ১৯০৭ সালের দিকে এই ক্লিনিক থেকেই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয় এই অ্যালকোহলমুক্ত ভেষজ পানীয়ের। কেন তৈরি হয়েছিল রূহ আফজা শুরুর দিকে এটি তৈরি করা হয়েছিল মূলত চিকিৎসা উদ্দেশ্যে। দিল্লির প্রচণ্ড গরমে অনেক মানুষ ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যায় ভুগতেন। রোগীদের সতেজতা ফিরিয়ে দিতে গোলাপ, ভেষজ উপাদান ও ফলের নির্যাস দিয়ে এই পানীয় তৈরি করেন হাকিম মজিদ। গোলাপের সুবাস এবং সতেজ স্বাদের কারণে দ্রুতই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর তিনি এই পানীয়ের নাম দেন রূহ আফজা। উর্দু ভাষায় “রূহ” অর্থ আত্মা বা প্রাণ এবং “আফজা” অর্থ সতেজ করে এমন কিছু। অর্থাৎ নামের অর্থ দাঁড়ায়—“যা আত্মাকে সতেজ করে।” নামের পেছনের গল্প ইতিহাস বিষয়ক ম্যাগাজিন হেরিটেজ টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, এই নামের অনুপ্রেরণা আসে একটি উর্দু কাব্যগ্রন্থ থেকে। উর্দু কবি পণ্ডিত দয়া শঙ্কর নাসিমের বিখ্যাত কাব্য “মসনবি গুলজার-ই-নাসিম”-এ রূহ আফজা নামে এক রাজকন্যার চরিত্র ছিল। সেখান থেকেই এই নাম গ্রহণ করেন হাকিম মজিদ। হাতে তৈরি বোতল থেকে শিল্প উৎপাদন প্রথমদিকে রূহ আফজা হাতে তৈরি করা হতো। ১৯২০ সালের মধ্যে কাঁচের বোতলে হাতে করে শরবত ভরা হতো এবং লেবেলও লাগানো হতো হাতে। দিল্লির শিল্পী মির্জা নূর আহমদ তৈরি করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী লেবেল ডিজাইন, যা এখনো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। চাহিদা বাড়তে থাকলে দিল্লির বাইরে গাজিয়াবাদে একটি কারখানায় এর বড় আকারে উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যু ও নতুন অধ্যায় ১৯২২ সালে হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের মৃত্যু হয়। তখন তার বড় ছেলে আবদুল হামিদ মাত্র ১৪ বছর বয়সে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বে হামদর্দ ধীরে ধীরে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং রূহ আফজার উৎপাদন ও বাজার বিস্তৃত হতে থাকে। ভারত ভাগ ও তিন দেশের ব্র্যান্ড ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর হামদর্দও বিভক্ত হয়ে যায়। বড় ছেলে আবদুল হামিদ ভারতে থেকে যান ছোট ছেলে হাকিম মোহাম্মদ সৈয়দ পাকিস্তানে চলে যান এর ফলে প্রতিষ্ঠিত হয় দুইটি প্রতিষ্ঠান: হামদর্দ ইন্ডিয়া হামদর্দ পাকিস্তান দুই দেশেই রূহ আফজার উৎপাদন অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশে রূহ আফজার যাত্রা ১৯৫০-এর দশকে হামদর্দ পাকিস্তান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) তাদের কার্যক্রম শুরু করে। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিক্রয় কেন্দ্র খোলা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ নামে কার্যক্রম চালিয়ে যায়। পরে ইউসূফ হারুন ভুঁইয়া নামের এক উদ্যোক্তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে রূহ আফজার উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণ শুরু হয়। রমজানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূহ আফজা শুধু পানীয় নয়, রমজানের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। অনেক পরিবারে ইফতার মানেই রূহ আফজার শরবত। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একসময় একটি জনপ্রিয় মন্তব্য ছিল— “ছোটবেলায় মনে করতাম রূহ আফজা শরবত খেলে সওয়াব হয়।” এটি অনেকটাই মজার মন্তব্য হলেও এটি দেখায় যে পানীয়টির সঙ্গে মানুষের আবেগ কতটা গভীর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাকিস্তানি লেখক আজির হাসান রিজভী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, রমজানে এশীয় মুসলমানদের কাছে রূহ আফজার গুরুত্ব ঠিক যেমনটা কার্টুন চরিত্র পোপাই-এর কাছে পালং শাকের। অন্যদিকে মারিয়া সারতাজ নামের এক ব্যবহারকারী বলেন, রমজান ও রূহ আফজা একে অপরের পরিপূরক। দুধ না পানি—চলমান বিতর্ক রূহ আফজা কীভাবে খাওয়া উচিত তা নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেন এটি দুধের সঙ্গে খেলে স্বাদ সবচেয়ে ভালো। অন্যরা বলেন ঠান্ডা পানির সঙ্গে মিশিয়েই আসল স্বাদ পাওয়া যায়। কেউ কেউ আবার ফল, বেসিল সিড বা আইসক্রিম মিশিয়ে নিজস্ব রেসিপি তৈরি করেন। স্বাস্থ্য নিয়ে সমালোচনা তবে সবাই যে এই পানীয়ের ভক্ত তা নয়। সমালোচকদের মতে এতে চিনির মাত্রা বেশি। এছাড়া রঙ ও প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, ঘরে তৈরি শরবত বা ফলের জুস বেশি স্বাস্থ্যকর। যুদ্ধ ও সংকটের সাক্ষী একটি পানীয় যে এত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে পারে, সেটি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। ভারত ভাগ, পাকিস্তান সৃষ্টি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই টিকে আছে এই ব্র্যান্ড। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় আফগান শরণার্থীদের ত্রাণ হিসেবে রূহ আফজা পাঠানো হয়েছিল। পরে দেখা যায়, অনেক শরণার্থী এটি পানি বা দুধ ছাড়াই সরাসরি পান করতেন। ২০১৯ সালের সংকট ২০১৯ সালে ভারতে হঠাৎ করেই বাজারে রূহ আফজা সংকট দেখা দেয়। কোম্পানি জানায়, কিছু ভেষজ উপাদান সহজলভ্য না হওয়ায় উৎপাদন কমে গিয়েছিল। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেক ভারতীয় ব্যবহারকারী হতাশা প্রকাশ করেন। পাকিস্তানি ব্যবহারকারীরা মজা করে ভারতকে রূহ আফজা পাঠানোর প্রস্তাবও দেন। আদালত পর্যন্ত গড়ানো বিতর্ক ২০২২ সালে দিল্লি হাই কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজনকে পাকিস্তানে তৈরি রূহ আফজা ভারতের বাজারে বিক্রি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভারতীয় প্রস্তুতকারকেরা অভিযোগ করেছিলেন, পাকিস্তানি সংস্করণ অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশে জরিমানা বিতর্ক বাংলাদেশেও একবার আইনি জটিলতায় পড়েছিল এই ব্র্যান্ড। ২০১৮ সালে ঢাকার একটি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত অননুমোদিত উপাদান ব্যবহারের অভিযোগে হামদর্দকে চার লাখ টাকা জরিমানা করে। পরে আপিলের মাধ্যমে সেই রায় বাতিল হয়ে যায়। শতাব্দীর পানীয় আজ রূহ আফজা শুধু উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার এশীয় দোকানেও এটি পাওয়া যায়। অনেক প্রবাসী মুসলিমের জন্য এটি রমজানের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পানীয়। স্বাদ, স্বাস্থ্য বা বিতর্ক—সবকিছুর বাইরে রূহ আফজা এখন এক শতাব্দীর ইতিহাসের অংশ। একটি লাল শরবত, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রমজানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অ্যাসিডিটি (গ্যাস্ট্রিক/অম্লতা) সাধারণত পেটে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হলে বা খাবার ঠিকমতো হজম না হলে হয়। নিচে সহজ ও কার্যকর উপায়গুলো দিলাম: 🥛 ঘরোয়া উপায় ১) ঠান্ডা দুধ এক গ্লাস ঠান্ডা দুধ অ্যাসিডকে নিরপেক্ষ করতে সাহায্য করে ও বুকজ্বালা কমায়। ➡️ চিনি না মিশিয়ে খাওয়াই ভালো। ২) কলা পাকা কলা প্রাকৃতিক অ্যান্টাসিডের মতো কাজ করে। ➡️ খালি পেটে বা হালকা নাস্তা হিসেবে খেতে পারেন। ৩) জিরা পানি এক চা চামচ জিরা ভেজে পানিতে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন। ➡️ হজমে সাহায্য করে, গ্যাস কমায়। ৪) আদা আদা চা বা কাঁচা আদা অল্প পরিমাণে চিবিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। 🍽️ যেসব খাবার এড়াবেন অতিরিক্ত ঝাল ও ভাজাপোড়া টক খাবার (লেবু, আচার বেশি পরিমাণে) কোমল পানীয় অতিরিক্ত চা/কফি খুব দেরি করে রাতের খাবার ✅ জীবনযাত্রায় পরিবর্তন অল্প অল্প করে বারবার খাবার খান খাওয়ার পর সাথে সাথে শোবেন না (কমপক্ষে ২ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন) ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন টাইট পোশাক এড়িয়ে চলুন 💊 কখন ডাক্তার দেখাবেন? প্রায়ই বুকজ্বালা/বমি ভাব হয় খাবার গিলতে কষ্ট হয় রক্তবমি বা কালো পায়খানা ওজন অকারণে কমে যায় এগুলো থাকলে গ্যাস্ট্রো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ইফতারে ঠান্ডা কোনো পানীয় না থাকলে যেন জমেই না। অনেকেই বাইরে থেকে কেনা ইনস্ট্যান্ট শরবত বানিয়ে পান করেন। এতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি ও স্বাদ মিললেও নিয়মিত খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তার বদলে ঘরে থাকা উপকরণ দিয়েই সহজে পুষ্টিকর স্মুদি তৈরি করা যায়। এতে যেমন তৃপ্তি মিলবে, তেমনি শরীরও থাকবে সুস্থ। চলুন জেনে নেওয়া যাক ইফতারের জন্য খেজুরের স্মুদি বানানোর সহজ রেসিপি- যা যা লাগবে খেজুর ১০-১২টি দুধ ২ কাপ পাকা কলা ২টি দই ২ টেবিল চামচ দারুচিনি গুঁড়া ২ চা চামচ মধু ২ চা চামচ বরফ প্রয়োজনমতো প্রস্তুত প্রণালি প্রথমে খেজুর ভালো করে ধুয়ে গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে নরম করে নিন। এরপর পানি ঝরিয়ে খেজুরের সঙ্গে টুকরো করা কলা মেশান। সব উপকরণ ব্লেন্ডারে দিয়ে মসৃণ হওয়া পর্যন্ত ব্লেন্ড করুন, যাতে কোনো দানা না থাকে। তৈরি হয়ে গেলে গ্লাসে ঢেলে ওপর থেকে বরফ দিন। ইফতারের ঠিক আগে বানিয়ে পরিবেশন করলে স্বাদ বেশি ভালো থাকবে। দীর্ঘক্ষণ রেখে দিলে স্বাদের পরিবর্তন হতে পারে।
রমজানে ইফতার শুধু রোজা ভাঙার সময় নয়, বরং সারাদিনের দীর্ঘ উপবাসের পর শরীরকে পুনরায় শক্তি ও পুষ্টি জোগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সঠিকভাবে ইফতার মেনু নির্বাচন করলে ক্লান্তি কমে, হজম সহজ হয় এবং সারাদিনের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই ইফতারে প্রয়োজন সচেতন খাদ্যাভ্যাস। 🥤 তরল খাবার দিয়ে ইফতার শুরু ইফতার শুরু করা উচিত হালকা তরল খাবার দিয়ে। প্রথমে পানি মুখে নিয়ে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড বিরতিতে ধীরে ধীরে পান করা ভালো। খুব তাড়াহুড়া করে বা গড়গড় করে পানি পান করা ঠিক নয়। তরল হিসেবে যা রাখা যেতে পারে— লাচ্ছি তাজা ফলের রস ডাবের পানি তোকমার শরবত আখের গুড়ের শরবত লেবু পানি শরবত তৈরিতে তাল মিছরি, গুড়, মধু বা ব্রাউন সুগার ব্যবহার করলে তা তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত হয়। 🌴 খেজুর: সুন্নতি ও পুষ্টিকর খাদ্য ইফতারে ২-৩টি খেজুর খাওয়া সারাদিনের ক্লান্তি দ্রুত দূর করতে সাহায্য করে। খেজুরে রয়েছে প্রাকৃতিক চিনি, ফাইবার, কার্বোহাইড্রেট ও অল্প পরিমাণ প্রোটিন—যা শরীরকে দ্রুত শক্তি জোগায়। পুষ্টিগুণ বাড়াতে খেজুরের সঙ্গে চিনাবাদাম ও সামান্য মাখন মিশিয়ে পরিবেশন করা যেতে পারে। 🍎 মৌসুমি ফল: প্রাকৃতিক ভিটামিনের উৎস যেকোনো মৌসুমি ফল ইফতার মেনুতে রাখা জরুরি। ফল শরীরে ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। মিক্সড ফ্রুটস, ফলের সালাদ বা ফল দিয়ে তৈরি হালকা ডেজার্ট খাওয়া যেতে পারে। 🥗 সবজি: হালকা ও সহজপাচ্য বিকল্প সবজি দিয়ে স্বাস্থ্যকর রেসিপি তৈরি করলে তা শরীরের জন্য উপকারী হয়। যেমন— সবজি স্যুপ (বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য উপযোগী) সবজি স্যান্ডউইচ সবজি নুডলস সবজি রোল সবজি পাকোরা (কম তেলে) খেয়াল রাখতে হবে, রান্নায় যেন অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না হয়। 🧆 ছোলা: প্রোটিনের সহজ উৎস ছোলা প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে অতিরিক্ত তেল ও মসলায় ভুনা ছোলা উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করে। স্বাস্থ্যকরভাবে ছোলা খাওয়ার উপায়— সারারাত ভিজিয়ে রেখে সিদ্ধ করা সিদ্ধ ছোলার সঙ্গে পেঁয়াজ, মরিচ, শশা ও টমেটো মিশিয়ে সালাদ তৈরি সামান্য তেলে হালকা ভাজা কাঁচা ভেজানো ছোলাও খাদ্য আঁশ ও প্রোটিনের ভালো উৎস। 🍮 মিষ্টান্ন: পরিমিত থাকাই উত্তম ইফতারে স্বাস্থ্যকর মিষ্টান্ন পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। জিলাপি বা বুন্দিয়া তেলে ভেজে সিরায় ডুবানো হয়, যা বেশি খেলে ক্ষতিকর। বিকল্প হিসেবে রাখা যেতে পারে— ফালুদা কাস্টার্ড পুডিং ফিরনি দুধজাত খাবার শরীরে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন সরবরাহ করে। 🍽️ অন্যান্য উপকারী খাবার ইফতারের জন্য চিড়া-দই খুবই ভালো একটি খাবার। এতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। এ ছাড়া রাখা যেতে পারে— দই বড়া নুডলস স্যান্ডউইচ রুটি-কাবাব মম শশা রমজানে ইফতার শুধু খাবার গ্রহণের সময় নয়, বরং সুস্থ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টিজাত খাবার পরিহার করে পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করলে শারীরিকভাবে ভালো থাকা সম্ভব। সচেতন খাদ্যাভ্যাসই হতে পারে সুস্থ ও কর্মক্ষম রমজানের মূল চাবিকাঠি।
ডেস্ক রিপোর্ট: শুরু হয়েছে সংযমের মাস পবিত্র রমজান। আত্মিক পরিশুদ্ধির পাশাপাশি এই মাস হতে পারে শরীরকে সুস্থ ও ফিট রাখারও সেরা সময়। তবে ইফতারের টেবিলে বাহারি ভাজাপোড়া, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত পদ অনেক সময় ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সারাদিন উপোস থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার খেলে ওজন বেড়ে যাওয়া, অস্বস্তি ও হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু সঠিক খাবার নির্বাচন, পরিমিত আহার ও নিয়মিত হালকা ব্যায়াম—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে রোজার মাসেও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক, রমজানে কোন খাবারগুলো আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে— শাকসবজি: কম ক্যালরি, বেশি পুষ্টি শাকসবজি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্যতম প্রধান সহায়ক। এতে ক্যালরি কম, কিন্তু আঁশ বেশি। আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়। যেভাবে খাবেন: ইফতারে শসা, টমেটো, গাজর, লেটুস দিয়ে সালাদ সেহরিতে কম তেলে রান্না করা সবজি ডাল বা স্যুপে মিশ্র সবজি কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়ক ফলমূল: প্রাকৃতিক মিষ্টির স্বাস্থ্যকর বিকল্প ইফতারে মিষ্টিজাতীয় খাবারের বদলে ফল হতে পারে আদর্শ পছন্দ। ফলে থাকে প্রাকৃতিক চিনি, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। ইফতারে রাখতে পারেন: তরমুজ আপেল পেয়ারা কমলা পেঁপে খেজুর খেজুরে প্রাকৃতিক গ্লুকোজ দ্রুত শক্তি জোগায়। তবে অতিরিক্ত না খাওয়াই ভালো। প্রোটিন: দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তির উৎস রোজার সময় শক্তি ধরে রাখতে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পেশি গঠনে সহায়ক এবং দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে। খাদ্যতালিকায় রাখুন: গ্রিল বা সেদ্ধ মুরগি মাছ ডিম ডাল ছোলা ভাজা খাবারের বদলে গ্রিল বা সেদ্ধ প্রোটিন গ্রহণ করলে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমা কমে। পূর্ণ শস্য: স্থিতিশীল শক্তির জোগান সাদা ভাত বা পরিশোধিত ময়দার রুটি দ্রুত হজম হয়ে যায়। এর বদলে পূর্ণ শস্য গ্রহণ করলে শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়। উপকারী শস্য: ব্রাউন রাইস আটার রুটি ওটস লাল চাল এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। বাদাম ও বীজ: অল্পতেই তৃপ্তি এক মুঠো বাদাম শক্তি জোগায় এবং অতিরিক্ত স্ন্যাকিং কমায়। তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। খেতে পারেন: কাঠবাদাম আখরোট কাজুবাদাম চিয়া বীজ তিসি বীজ পর্যাপ্ত পানি: মেটাবলিজম সচল রাখুন রোজায় ডিহাইড্রেশন হলে শরীর অনেক সময় ক্ষুধা ও পানিশূন্যতার সংকেত গুলিয়ে ফেলে। পরামর্শ: ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ৮–১০ গ্লাস পানি একবারে বেশি না খেয়ে বিরতি দিয়ে পান অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত এড়িয়ে চলুন পানি বিপাকক্রিয়া সচল রাখে এবং হজমে সহায়তা করে। যেসব অভ্যাস মানলে ওজন বাড়বে না ✔️ ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলুন ✔️ ধীরে ধীরে খাবার খান ✔️ সেহরি কখনো বাদ দেবেন না ✔️ ইফতারের পর ২০–৩০ মিনিট হালকা হাঁটা ✔️ পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন রমজান শুধু আত্মশুদ্ধির মাস নয়, এটি হতে পারে সুস্থ জীবনযাপনের নতুন সূচনা। খাবারের পরিমাণ নয়, গুণগত মানের দিকে নজর দিন। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত আহার ও নিয়মিত হালকা ব্যায়াম—এই তিন অভ্যাস মেনে চললে মাস শেষে নিজেকে আরও হালকা, ফিট ও প্রাণবন্ত অনুভব করবেন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও গণমাধ্যমবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং বার কাউন্সিলের আদলে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “সরকার স্বাধীন, দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।” তিনি বলেন, “মোবাইল জার্নালিজমের নামে অনুমোদনহীন, অপেশাদার বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সরকার সমর্থন করে না।” তথ্যমন্ত্রী জানান, প্রেস কাউন্সিল আইন যুগোপযোগী করার প্রস্তাবে সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, বার কাউন্সিলের আদলে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং মিথ্যা, হয়রানিমূলক বা নীতিবিরোধী সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানার বিধান যুক্ত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ডিজিটাল সম্প্রচার ব্যবস্থার বিস্তার, অনলাইন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচারসংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।” এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনের সদস্য আরিফা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী জানান, পডকাস্ট, ব্লগ এবং ইনফ্লুয়েন্সারভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্টের প্রচার ও প্রকাশ বর্তমানে প্রচলিত আইন ও নীতিমালার আওতায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনস্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন নীতিগত কাঠামো তৈরির বিষয়েও কাজ চলছে। অন্যদিকে যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলীর প্রশ্নের জবাবে জহির উদ্দিন স্বপন জানান, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত পত্রিকার সংখ্যা ৩ হাজার ৩৩৮টি। এর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৪৩৬টি দৈনিক, ১ হাজার ২৩১টি সাপ্তাহিক, ৪৫২টি মাসিক, ২১৫টি পাক্ষিক এবং অর্ধসাপ্তাহিক, দ্বিমাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক মিলিয়ে আরও ৫৪টি প্রকাশনা। কেন এই উদ্যোগ? গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকদের জন্য নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে পেশাদার সাংবাদিকতার মান ও জবাবদিহিতা বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং নিবন্ধন ব্যবস্থার অপব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা তৈরি হতে পারে। প্রস্তাবিত আইন সংশোধনী চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের তৃণমূল সাংবাদিকদের সংগঠন সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ (এসএসপি)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচনে সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন গোলাম ফারুক মজনু এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মুহাম্মদ আবু আবিদ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রতিনিধিরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি জেলা কমিটি থেকে দুই থেকে তিনজন প্রতিনিধি ভোটগ্রহণে অংশ নেন। নবনির্বাচিত সভাপতি গোলাম ফারুক মজনু দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক বিপ্লবী জনতা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে সাংবাদিকতায় যুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে মুহাম্মদ আবু আবিদ বর্তমানে মোহনা টিভির চিফ এডিটর (প্ল্যানিং, অনলাইন ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকার কারণে নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে। সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি হলে অতীতেও তারা সরব ছিলেন বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন মো. নেছার উদ্দিন, মো. ফজলে নেওয়াজ ও মো. আনোয়ারুজ্জামান আজাদ। যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট হাসান আলম সুমন ও মো. হাবিবুর রহমান। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মো. কামরুল ইসলাম, মো. মিরাজ হোসেন, মো. জামাল শিকদার ও মো. শহিদুল ইসলাম। এছাড়া কোষাধ্যক্ষ পদে শুভঙ্কর সেন শুভ, দপ্তর সম্পাদক পদে মীম আক্তার, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে আব্দুল মান্নান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে মো. জাকির হোসেন, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে নিপা আক্তার, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে আর কে রিপন এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে আব্দুল্লাহ আল নোমান নির্বাচিত হয়েছেন। কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এনায়েত হোসেন খান রিমন, শরিফুল ইসলাম, মোকাম্মেল হোসেন চৌধুরী, রঞ্জন লোদ রাজু, সুমা রানী কর্মকার ও মো. ফারুক হোসেন বাপ্পি। নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সভাপতি গোলাম ফারুক মজনু ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আবু আবিদ সংগঠনের সদস্য, প্রতিনিধি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তারা বলেন, তৃণমূল সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় এসএসপি ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশে এপ্রিল মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। মঙ্গলবার (৫ মে) প্রকাশিত সংগঠনটির মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাসজুড়ে অন্তত ৭৫ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। মোট ৪০টি ঘটনায় সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৭ জন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং ১০ জন হুমকির মুখে পড়েন। এছাড়া তিনজন সাংবাদিককে আটক করা হয় এবং চারটি মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, একই সময়ে দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৪৪টি ঘটনায় ২২ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়। রাজনৈতিক সহিংসতাও এপ্রিলে অব্যাহত ছিল। ৯৮টি ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং ৫৩৩ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি এসব ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সাতটি জনসভা ও সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ৪৯ জন আহত এবং দুজন আটক হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক হিসেবে উঠে এসেছে। এপ্রিল মাসে ২৯৪ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৮টি ধর্ষণ এবং ৭৯টি যৌন হয়রানির ঘটনা রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতায় মারা গেছেন ৬৪ জন নারী। শ্রম খাতেও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র পাওয়া গেছে। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা ও অনিরাপদ পরিবেশে ১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের হলে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকেই শুরু হয় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতন। এ সময়ে চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মগোপনে রয়েছেন অনেকেই। দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জানিয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ২৬৬ জনকে অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা বা সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে। গত বছরের ৪ আগস্ট এ তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটি। এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া চার সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে। আসক বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কমবেশি নির্যাতন বা হয়রানি করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিমানবন্দর থেকে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপাকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ফজলুল করিম নামের একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ছাড়া রাজধানীর আদাবরে পোশাকশ্রমিক রুবেল হত্যা মামলাতেও তাদের দুইজনকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তারা কারাগারে আছেন, এখনো জামিন পাননি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া কয়েকটি হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ গ্রেপ্তার হন। তিনি বর্তমানে কারাগারে। গত বছরের এপ্রিলে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হয়। দলটির চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক যুবককে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। এসব সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়ে মাসের পর মাস কারাগারে বিনা বিচারে কারাবন্দি রয়েছেন। বারবার জামিনের জন্য আবেদন করলেও সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে। সাংবাদিকদেরই অনেকে বলছেন, সাংবাদিকেরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তাদের লেখালেখি বা বক্তব্যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে তার আইনি প্রতিকার রয়েছে। এমনকি কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। কিন্তু ঢালাওভাবে হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে নাম ধরে ধরে আসামি করা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ বিষয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যদি আইনের শাসনের কথা বলি, তাহলে বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা এবং দিনের পর দিন জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমরা নোয়াবের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বলেছি। শিগগিরই বিষয়টির সুরাহা হবে বলে আশা রাখছি।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বঙ্গভবনের প্রধান ফটকের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন। সেখান থেকেই তিনি লাইভ সম্প্রচার করেন। অন্য টেলিভিশনেও সেই সম্প্রচারের দৃশ্য দেখা গেছে, যার তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। কিন্তু একই দিন বিকেলে মিরপুরের ভাষানটেক এলাকায় এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁকেও আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন এসব তথ্য উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর প্রশ্ন, একই ব্যক্তি একসঙ্গে দুই জায়গায় থাকেন কীভাবে? এখন বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শাহনাজ শারমীনের ঘটনাটিই একমাত্র ঘটনা নয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে করা বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছিল। বিভিন্ন পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ সাংবাদিক এখনো মামলার বোঝা বহন করছেন এবং কারাবন্দীদের অনেকেই জামিন পাচ্ছেন না। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৪ মার্চ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যায়ামাগার থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও পরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও সদস্য। গত বছরের আগস্টে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিতে গিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম (পান্না)। মাস তিনেক পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এসব ঘটনায় অন্যদের মধ্যেও কিছুটা আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই, মামলাগুলোর দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের ক্ষেত্রে আদালত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেবেন। এর আগে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের জামিন পাওয়ারও প্রত্যাশা করছেন তারা। কারাবন্দি সাংবাদিকদের জামিন বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো সংবেদনশীল। প্রতিটি মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখছে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে দায় পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করছেন। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির একটি চিত্র তুলে ধরে। বিষয়টি সংবেদনশীল এবং এতে নানা পক্ষের দাবি–পাল্টা দাবি আছে। সংক্ষেপে এবং বিশ্লেষণ করে বললে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে: ১. সংখ্যাগত চিত্র * Transparency International Bangladesh (টিআইবি) অনুযায়ী: * ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার * ২৬৬ জন হত্যা/সহিংসতার মামলায় আসামি * Ain o Salish Kendra (আসক): * এক বছরে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন/হয়রানির শিকার * Manabadhikar Sangskriti Foundation: * ২৬৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা * অন্তত ১৪ জন গ্রেপ্তার অর্থাৎ, বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়—সংখ্যা ভিন্ন হলেও “বড় আকারে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও চাপ” একটি বাস্তব প্রবণতা হিসেবে উঠে এসেছে। ২. মামলার ধরন নিয়ে বিতর্ক * অধিকাংশ মামলাই **হত্যা বা সহিংসতা সংক্রান্ত**, যা খুব গুরুতর অভিযোগ * অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ: * একই ঘটনায় বহুজনকে আসামি করা হয়েছে * কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঘটনাস্থলে ছিলেন না—এমন দাবিও এসেছে * আইনজীবীদের মতে, এসব মামলার “প্যাটার্ন প্রায় একই” এতে প্রশ্ন উঠছে—আইন কি নির্দিষ্ট অপরাধ বিচারের জন্য ব্যবহার হচ্ছে, নাকি কখনো কখনো **রাজনৈতিক বা প্রতিশোধমূলক চাপের হাতিয়ার** হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? ৩. দীর্ঘদিন জামিন না পাওয়া * অনেক সাংবাদিক: * মাসের পর মাস, এমনকি দেড়–দুই বছর কারাগারে * এখনো চার্জশিট হয়নি * অভিযোগ: * জামিন শুনানিতে বারবার সময় নেওয়া * হাইকোর্টে জামিন পেলেও স্থগিত হয়ে যাচ্ছে এটি **ন্যায়বিচারের গতি ও প্রক্রিয়া** নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। ৪. রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট * গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু গোষ্ঠী সাংবাদিকদের “পূর্ববর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ” হিসেবে চিহ্নিত করেছে * বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ এসেছে * ফলে বিষয়টি শুধু রাষ্ট্র বনাম সাংবাদিক নয়, বরং **বহুমাত্রিক চাপের পরিবেশ** তৈরি হয়েছে ৫. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া * Committee to Protect Journalists (CPJ) * Reporters Without Borders * Article 19 এসব সংগঠন বলছে: * অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই * সাংবাদিকতার কারণে টার্গেট করা হতে পারে * মুক্তি ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে ৬. মূল দ্বন্দ্ব: আইন বনাম স্বাধীনতা এই পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে: **একদিকে:** * কেউ অপরাধ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি **অন্যদিকে:** * ঢালাও মামলা, দীর্ঘ আটক, প্রমাণহীন অভিযোগ → এগুলো হলে তা **মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের ওপর চাপ** হিসেবে দেখা হয় ৭. সারসংক্ষেপ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলো হলো: * মামলার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা * দীর্ঘ প্রি-ট্রায়াল আটক * সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে “গণহারে” অভিযোগ * বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আইন কি সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, নাকি কখনো তা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে?** আইন যেন নিপীড়নের হাতিয়ার না হয়' গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল অভিযোগ সাংবাদিকদের অনেকের। সংবাদমাধ্যমের অফিসে হামলা, শত শত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং তিন দফায় সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে এমন মামলা ও গ্রেফতারের সমালোচনা করছেন মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবীরা। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, আর্টিকেল ১৯, রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস এর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও এ ঘটনার সমালোচনা করে আসছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) এর আগে এক বিবৃতিতে, সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং হত্যা মামলার আসামি করা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে সম্প্রতি চারজন সাংবাদিকের মুক্তি দাবি করেছে- তারা হলেন, মোজাম্মেল হক বাবু, শ্যামল দত্ত, ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ। সিপিজের চিঠিতে বলা হয়েছে, নথিপত্র, স্বজনদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা বলছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। কোনো অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়নি। ”আটক রাখার ধরন দেখে মনে হয় মূলত সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তাদের এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে”- লিখেছে সিপিজে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের সময়েও এরকম ঢালাও মামলা করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছিল। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানবাধিকারকর্মী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, "আইন যেন নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেবে, কিন্তু যাতে কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত না করা হয় এবং মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া না হয়। আইনের অবশ্যই নিরপেক্ষ, সুষ্ঠ এবং সৎ প্রয়োগ হতে হবে।" বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের এই উপদেষ্টা বলছেন, "মানবাধিকারকর্মী হিসেবে স্বাধীন মত প্রকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় এরকম কাজের বিরোধিতা করি।" এদিকে, নোয়াবের সভাপতি ও সাংবাদিক নেতা মতিউর রহমান চৌধুরী জানান, নির্বাচিত এই বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের এই প্রসঙ্গে ইতিবাচক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাংবাদিক নেতাদের জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের মামলাগুলো এই সরকারের আমলে দায়ের হয়নি কিংবা কেউ গ্রেফতারও হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সুরাহা করার আশ্বাস দিয়েছেন উল্লেখ করে মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক বলেন, "আমরা আশা করি যেহেতু পুরোনো মামলা, এই মামলাগুলো সরকার রিভিউ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে"।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। অপতথ্য ছড়ানো নিয়ে চলমান জাতীয় আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ, নাকি সংবাদমাধ্যমকে শৃঙ্খলায় আনার প্রয়াস? বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যম নিবন্ধনের বিষয়টি কয়েক বছর ধরেই বিতর্কিত। তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিবন্ধনের জন্য আবেদন আহ্বান করা হলে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানই অনুমোদন পায়। সমালোচকদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে এবং অনেক পেশাদার প্ল্যাটফর্ম নিবন্ধন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় নিবন্ধন ব্যবস্থা জরুরি। তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—অপতথ্য কি কেবল নিউজ পোর্টালেই সীমাবদ্ধ, নাকি সামাজিক মাধ্যমেও সমানভাবে বিস্তার লাভ করছে? সামাজিক মাধ্যমের ক্ষেত্রে যেখানে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা নেই, সেখানে শুধু নিউজ পোর্টালকে লক্ষ্যবস্তু করা কতটা কার্যকর—সে প্রশ্নও সামনে আসছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে সহজলভ্য প্রযুক্তির কারণে যে কেউ অনলাইন পোর্টাল চালু করতে পারছে, যা পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে খাতটিকে একটি নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন—তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য। এদিকে, অনেক অনিবন্ধিত পোর্টালে কর্মরত সাংবাদিকদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আকস্মিকভাবে এসব প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হলে বহু সংবাদকর্মী কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরির জন্য প্রয়োজন ব্যাপক পর্যালোচনা, স্বচ্ছ যাচাই প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নিবন্ধিত গণমাধ্যমের জন্য সুযোগ-সুবিধা এবং দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোও স্পষ্ট করা জরুরি। সামগ্রিকভাবে, সিলেটে জারি হওয়া এই নির্দেশনা দেশের অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের আরও গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লেবাননের সাংবাদিক আমাল খলিল নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাংবাদিকরা কি পর্যাপ্ত সুরক্ষা পাচ্ছেন, নাকি তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন? লেবাননের দৈনিক আল-আখবার-এর প্রতিবেদক খলিল বুধবার এক হামলায় নিহত হন। তিনি তখন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী জেইনাব ফারাজের সঙ্গে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। লেবাননের কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে “যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে চলতি বছরে লেবাননে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জনে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় অন্তত ২৯৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে লক্ষ্যবস্তু করা নিয়ে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, একাধিক ঘটনায় সন্দেহ দেখা যাচ্ছে—সাংবাদিকদের কি তাদের পেশাগত পরিচয়ের কারণেই টার্গেট করা হচ্ছে? কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, “এই ঘটনার অনেক প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন রয়ে গেছে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, হামলার পর কেন উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। তার মতে, চিকিৎসা সহায়তা বাধাগ্রস্ত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। ইসরায়েলের অবস্থান ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্তাধীন এবং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের “বৈধ সামরিক লক্ষ্য” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সিপিজে ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব দাবির পক্ষে অনেক সময় পর্যাপ্ত বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় না। বিতর্কিত উদাহরণ ২০২৫ সালের আগস্টে গাজার আল-শিফা হাসপাতালের কাছে এক হামলায় আল জাজিরার সাংবাদিক আনাস আল-শরিফ নিহত হন। পরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তিনি হামাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সিপিজে বলছে, তারা যে তথাকথিত প্রমাণ পেয়েছে তা ছিল একটি স্প্রেডশিটে নামের পাশে একটি লোগো—যা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত নয়। একইভাবে, সাংবাদিক আলি শোয়েইবের ক্ষেত্রেও একটি ছবি প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হয়, যা পরে বিকৃত বলে জানা যায়। আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন জাতিসংঘ বলছে, আন্তর্জাতিক আইনে কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করতে হলে কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানান, শুধুমাত্র “সম্পৃক্ততা”র অভিযোগ যথেষ্ট নয়—এটি স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। প্রবেশাধিকার ও আটক গাজায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশ দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধ। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সংগঠনগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আদালতে গেলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এদিকে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের আটক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২০০-র বেশি সাংবাদিক আটক হন, যাদের মধ্যে কয়েক ডজন তখনও হেফাজতে ছিলেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, আটক থাকা কিছু সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন ঘটনায় তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হলেও সেগুলোর ফলাফল খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকাশিত হয়—এমন অভিযোগ তুলেছে সিপিজে। জাতিসংঘ বলছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কার্যকর প্রয়োগ নির্ভর করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর। তথ্যপ্রবাহে প্রভাব বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিক নিহত হওয়া, প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধতা এবং আটক—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। সংঘাতের বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য যেখানে নিরপেক্ষ তথ্য জরুরি, সেখানে প্রতিটি সাংবাদিকের মৃত্যু একটি সম্ভাব্য তথ্যসূত্র হারিয়ে যাওয়ার সমান।
ত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : সৌদি আরবে পবিত্র জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখা গেছে। রবিবার (১৭ মে) দেশটির আকাশে এই চাঁদ দেখা যায়। সেই অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার (১৮ মে) থেকে হিজরি ১৪৪৭ সনের জিলহজ মাস শুরু হবে। ইসলামি চন্দ্র ক্যালেন্ডারের সর্বশেষ মাস জিলহজের ১০ম দিনে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপিত হয়। সেই হিসাবে আগামী ২৭ মে সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। এর আগের দিন অর্থাৎ ২৬ মে পবিত্র আরাফাহ দিবস পালিত হবে।এর আগে, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, তিউনিসিয়াও ২৭ মে ঈদুল আজহা উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে।
রমজানের শেষ দশ রাত মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ। এ সময়টিকে ইবাদত, দোয়া ও নেক আমলে ভরিয়ে তুলতে পরিবারকেও সম্পৃক্ত করা জরুরি। কীভাবে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এই সময়কে আরও অর্থবহ করা যায়, সে বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরা হলো। রমজানের শেষ দশ রাত সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনে কাইয়্যিম বলেন, সব মাসের মধ্যে রমজান সর্বোত্তম এবং রমজানের রাতগুলোর মধ্যে শেষ দশ রাত সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। এই সময়ে বেশি বেশি নেক আমল করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। পাশাপাশি পরিবারকে নিয়ে এই সময় কাটালে সন্তানদের মধ্যেও ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে ওঠে এবং পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। নিচে পরিবারের জন্য শেষ দশ রাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরা হলো— নিয়ত ঠিক করা ইসলামে প্রতিটি কাজের আগে নিয়ত ঠিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রমজানের শেষ দশ রাত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত করা উচিত। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও দোয়া করতে হবে এবং সন্তানদেরও দোয়া করতে উৎসাহিত করতে হবে। পরিবারের সঙ্গে তাহাজ্জুদ তারাবি ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। চেষ্টা করা উচিত পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসব নামাজ আদায় করার। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বন্ধন তৈরি হয়। যদি সন্তানরা ছোট হয় তবে সপ্তাহান্তে তাদের মসজিদে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এতে তারা মসজিদের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হবে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শিখবে। একসঙ্গে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত রমজানজুড়ে প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। তবে শেষ দশ রাতে তা আরও বাড়ানো ভালো। পরিবারে একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে সবাই মিলে কোরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যরা পালা করে সুরা পড়তে পারেন। চাইলে এটিকে আনন্দময় করতে ছোট একটি প্রতিযোগিতাও রাখা যেতে পারে, যাতে দেখা যায় কে বেশি তিলাওয়াত করতে পারে। এতে শিশুদের কোরআনের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। দোয়ার তালিকা তৈরি করা রমজান রহমত ও বরকতের মাস। এ সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও বিভিন্ন কল্যাণ কামনার জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। শেষ দশ দিনে সন্তানদের সঙ্গে বসে একটি দোয়ার তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এতে তারা বুঝতে শিখবে যে আল্লাহ সব দোয়া শোনেন। সন্তানদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শেখানো একটি বিখ্যাত দোয়াও শেখানো যেতে পারে—হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন। বেশি বেশি সদকা করা সদকা শুধু অর্থ দানেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার মিলে রান্না করে আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের ইফতারে দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে। সন্তানদের তাদের অপ্রয়োজনীয় খেলনা বা ছোট হয়ে যাওয়া কাপড় গরিবদের দান করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। পরিবারের সবাই মিলে পার্কে গিয়ে পাখিদের খাবার দেওয়া বা আশপাশের বৃদ্ধ প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়াও সদকার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত। যদি সামর্থ্য থাকে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দান করা যেতে পারে। সন্তানদেরও তাদের হাতখরচের কিছু অংশ দান করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এতে তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও উদারতার মানসিকতা গড়ে উঠবে। পরিবারকে সময় দেওয়া রমজানের শেষ দশ রাতকে পরিবারকেন্দ্রিক সময় হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। সন্তানদের বোঝানো দরকার কেন এই রাতগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে বাবা-মা বা আত্মীয়দের সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার ও ইবাদতে সময় কাটানো যেতে পারে। এতে পরিবারে ভালোবাসা বাড়ে এবং সন্তানরা অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও সাহায্যের মানসিকতা শিখে। রমজান খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাই শেষ দশ রাতকে অবহেলায় কাটিয়ে না দিয়ে যতটা সম্ভব ইবাদত ও ভালো কাজে ব্যয় করা উচিত।
পটুয়াখালীতে ১১০ দিনেই পুরো পবিত্র কুরআন মুখস্থ করে সবার দৃষ্টি কেড়েছে ১২ বছর বয়সী শিশু দ্বীন ইসলাম। সে সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের মধ্য ধরান্দী এলাকার জামিয়া রহিমীয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী। অল্প সময়ে কুরআন হিফজের এই বিরল কৃতিত্বে আনন্দিত তার পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী এবং এলাকাবাসী। দ্বীন ইসলাম অত্যন্ত মেধাবী, মনোযোগী ও পরিশ্রমী একজন ছাত্র। মাত্র ১১০ দিনের মধ্যেই সে পুরো কুরআন হিফজ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলা করত, তখন সে কুরআন শরীফ নিয়ে পড়াশোনায় মন দিত। অনেক সময় সে একদিনে ১০ পৃষ্ঠা এমনকি এক পারা পর্যন্ত সবক দিয়েছে। দ্বীন ইসলাম পটুয়াখালী সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের মধ্য ধরান্দী এলাকার একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান। তার বাবার নাম ইয়াকুব শিকদার। স্থানীয়রা জানান, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানকে সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প ছিল ইয়াকুব শিকদারের। সেই স্বপ্নেরই উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখা গেছে দ্বীন ইসলামের এই অর্জনে। অল্প বয়সেই তার এই সাফল্য এখন এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
জেরুজালেম: ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে শুক্রবারের জুমা নামাজ বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানি হামলার আশঙ্কা দেখিয়ে এই নিরাপত্তামূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দেশটি জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ‘আল মুনাসিক’ প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক বিবৃতিতে বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিশাম ইব্রাহিম জানান, ইরানের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জেরুজালেমের ওল্ড সিটির সব পবিত্র স্থান শুক্রবার বন্ধ থাকবে। এর মধ্যে আল-আকসা মসজিদ, ওয়েস্টার্ন ওয়াল (আল-বোরাক দেয়াল), টেম্পল মাউন্ট এবং চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকার অন্তর্ভুক্ত। কোনো ধর্মাবলম্বী বা দর্শনার্থীকে এসব স্থানে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। ইসরায়েলি শাসক সংস্থার প্রধান সাফ জানিয়েছেন, এই নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদার ছাড়া সকলের জন্য প্রযোজ্য। গত শনিবার ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যেই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ওল্ড সিটিতে প্রবেশ সীমিত করেছে। আল-আকসার সিনিয়র ইমাম শায়খ ইকরিমা সাবরি এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, "দখলদার কর্তৃপক্ষ যেকোনো অজুহাতে আল-আকসা বন্ধ করার চেষ্টা করছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।" যদিও ইসরায়েল বর্তমান যুদ্ধকে এই নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে, রমজান মাসের শুরু থেকেই তারা আল-আকসায় নামাজ আদায়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছিল। এই সংঘাতের ফলে ইতিমধ্যেই দুই দেশে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে ১০ জন নিহত হয়েছেন, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে অন্তত ১,২৩0 জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ হল মসজিদ আল-হারাম। জীবনে একবার হলেও এ মসজিদ পরিদর্শন করা কোটি মুসলিমের লালিত স্বপ্ন। মহান আল্লাহর এ ঘর নিয়ে মুসলিমদের মনে রয়েছে নানান কৌতুহল। অন্যতম হল, এ ঘরে কতটি গেট রয়েছে ? মসজিদুল হারামের মোট গেট সংখ্যা হল ২৬২। অসংখ্য দরজাসমূহ থেকে মসজিদে হারামের গুরুত্বপূর্ণ ৪৫টি দরজা। ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মসজিদ হারাম নির্মাণ করিয়েছেন। এরপর আদম, ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.) ঘরটি পুনঃনির্মাণ করেছেন। দীর্ঘ সময় মসজিদটির কোনো দরজা ছিল না। মক্কা বিজয়ের পর এ মসজিদে প্রথম দরজা তৈরি করা হয়। এ দরজার নাম হল ‘বাব বনি শায়বাহ’। এরপর ধীরে ধীরে নির্মিত হয়েছে বাকি দরজাগুলো, যা নিচে উল্লেখ করা হয়েছে। হারাম শরীফে প্রবেশের ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ দরজা বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য হাজি উমরাহ হজ করতে হারাম শরীফে যান। মসজিদুল হারামে তাদের চলাচল সহজ করার জন্য নিচে মসজিদে হারামের গুরুত্বপূর্ণ ৪৫টি দরজা সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হল। ১. বাব মালিক/কিং আব্দুল আজিজ গেট- (গেট নং ০১) বাব মালিক, যা কিং আব্দুল আজিজ গেট নামেও পরিচিত। মসজিদুল হারামের আধুনিক এবং প্রধান চারটি দরজার মধ্যে এটি একটি। সৌদি আরবের সাবেক বাদশাহ আব্দুল আজিজের নামে এ গেটের নামকরণ করা হয়। হারাম কমপ্লেক্সের ইয়েমেণি কর্ণার এবং আজিয়াদ স্ট্রিটের ঠিক বিপরীতে দরজাটি অবস্থিত। বাব মালিক গেট থেকে সরাসরি কাবা দেখা যায়। দরজাটি দিয়ে প্রতিবন্ধী ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা সরাসরি মাতাফে (কাবা তওয়াফ করার স্থান) প্রবেশ করতে পারেন। সৌদি আরবের সাবেক বাদশাহ আব্দুল্লাহ হারাম শরীফ সম্প্রসারণের সময় এ দরজা সংস্কার করেছিলেন। ২. বাব আজিয়াদ/আজিয়াদ গেট-(গেট নং ০৫) মসজিদ আল- হারামের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আজিয়াদের দুটি উপত্যকার নামে এ গেটের নামকরণ করা হয়েছে। এটি হারাম কমপ্লেক্সের ছোট দরজা হলেও মসজিদে হারামের ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ দরজার একটি। এ দরজা দিয়ে বৈদ্যুতিক সিঁড়ির সাহায্যে হারামের উপরের তলায় উঠা যায়। গেট ৭ ও ৮ আজিয়াদ গেটের পাশেই অবস্থিত। তাই আজিয়াদ গেট ব্যবহার করে মসজিদ হারামের উপরে উঠলেও সহজেই গেট ৭ ও ৮ দিয়ে নিচে চলে আসা যায়। ৩. বাব বিলাল/বিলাল গেট-(গেট নং ০৬) মসজিদে হারামের ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ দরজার একটি হল বাব বিলাল বা বিলাল গেট। এটি হারাম শরীফের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এটি সাহাবী ও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মুয়াযযিন বিলাল ইবন রাবাহ (রা.) এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। হাবশা তথা বর্তমান আবিসিনিয়ার বাসিন্দা হওয়ায় বিলাল হাবশী নামেও পরিচিত এ সাহাবি। ৪. বাব হুনাইন/হুনাইন গেট-(গেট নং ০৯) বাব হুনাইন বা হুনাইন গেট মসজিদুল হারামের দক্ষিণে বাব বিলার ও ইসমাইলের মধ্যে অবস্থিত। তায়েফের নিকটবর্তী হুনাইন শহরের নামানুসারে গেটটির নামকরণ করা হয়েছে। বাব আজইয়াদের চলন্ত সিঁড়িগুলো গেটটির সামনে অবস্থিত হওয়ায়, বর্তমানে গেটটির কিছু অংশ দেখা যায়। গেটটি পুরোপুরি দেখা না গেলেও মসজিদে হারামের গুরুত্বপূর্ণ ৪৫টি দরজার একটি এটি। ৫. বাব ইসমাইল/ইসমাইল গেট-(গেট নং ১০) মসজিদ হারামের দক্ষিণ দিকে বাব হুনাইন ও হামযাহ এর মধ্যে বাব ইসমাইল বা ইসমাইল গেট অবস্থিত। ইবরাহিম (আ.) এর পুত্র নবি ইসমাইল (আ.)-র সম্মানে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। আপেক্ষিকভাবে এ দরজাটি বায়তুল্লাহর অন্য দরজার চেয়ে ছোট হলেও মসজিদে হারামের ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ দরজার অন্যতম এটি। এ গেট দেখলে ইবরাহিম, ইসমাইল ও হাজেরা (আ.) মক্কায় আল্লাহর জন্য যে ত্যাগ করেছেন তা স্মরণ হয়ে যায়। ৬. বাব সাফা/আল সাফা গেট-(গেট নং ১১) বাব সাফা যা আল সাফা গেট নামেও পরিচিত। মসজিদুল হারামের ৫টি প্রধান ফটকের মধ্যে এটি একটি। ফটকটি হারাম শরীফের উত্তর দিকে অবস্থিত। এ গেট দিয়ে সায়ী করার স্থানে প্রবেশ করা যায় এবং উপরে যেতে চাইলে গেটটিতে থাকা সিঁড়ি ব্যবহার করে হারামের উপরে যাওয়া যায়। বয়স্ক ও অসুস্থ হাজিগণ সায়ী করার জন্য গাড়ির সহযোগিতা নিতে পারেন এখান থেকে। ৭. বাব হামযাহ-(গেট নং ১২) মসজিদুল হারাম কমপ্লেক্সের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত বাব হামযাহ। বাইতুল্লায় প্রবেশের অন্যতম পয়েন্ট হল এ দরজা। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর চাচা হামযাহ (রা.) এর নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। গেটটি দেখলে উহুদ যুদ্ধে হামযাহ (রা.) এর ত্যাগ ও শাহাদাতের কথা স্মরণ হয়ে যায়। ৮. বাব কুবাইস-(গেট নং ১৩) মসজিদ আল-হারাম কমপ্লেক্সের ১৩ নং গেটটি বাব কুবাইস নামে পরিচিত। কুবাইস পাহাড়ের নামে দরজাটির নামকরণ করা হয়েছে। সাফা ও কুবাইস পাহাড়ে প্রবেশ করতে চাইলে এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। বলা হয় যে, কুবাইস পাহাড় আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট প্রথম পাহাড়। ৯. বাব নাবি/আল নাবি গেট-(গেট নং ১৪) এ দরজাটি মসজিদের পূর্ব দিকে সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী বাব কুবাইস ও আলীর মাঝে অবস্থিত। নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নামে এ গেটের নামকরণ করা হয়েছে। এ দরজা ব্যবহার করে হারাম কমপ্লেক্সের উপরে ওঠা যায়। ১০. বাব নাবী ব্রিজ/আল নাবী ব্রিজ গেট-(গেট নং ১৫) মসজিদে হারামের গুরুত্বপূর্ণ ৪৫টি দরজার একটি হল বাব নাবী ব্রিজ/আল নাবী ব্রিজ গেট। এ ব্রিজটি উপরের তলাগুলোর সাথে সংযুক্ত। এটি দিয়ে মসজিদের উপরে উঠে মসজিদ পরিদর্শন করা বা ইবাদত করা যায়। ব্রিজটি দিয়ে সহজেই সাফা পাহাড়ে পৌঁছানো এবং সাফা এরিয়ায় চলাচল করা যায়। রসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। ১১. বাব দারুল আরকাম-(গেট নং ১৬) এ গেটটি মাসআ’র (সায়ী করার স্থান) পূর্বদিকে এবং বাব আলির (রা.) ডানদিকে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাহাবা আরকাম বিন আবি আরকাম (রা.) এর বাসস্থান ছিল এটা। এজন্য তার নামানুসারেই এ গেটের নামকরণ করা হয়।এই গেট দিয়ে সরাসরি সায়ী করার স্থানে পৌঁছা যায়। এছাড়াও হারাম কমপ্লেক্সের উপরে যেতে চাইলে এই দরজা দিয়ে যাওয়া যায়। ১২. বাব আলী/ আলী গেট-(গেট নং-১৭) মসজিদে হারামের গুরুত্বপূর্ণ ৪৫টি দরজার একটি হল বাব আলী বা আলী গেট। যে দশজন সাহাবা দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন তাদের একজন হলেন আলী (রা.)। তাঁর নামেই এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। দরজাটি বাব নবি ও আব্বাসের মাঝে এবং সায়ী করার স্থানের পূর্বদিকে অবস্থতি। সায়ী করার সময় যে স্থানে ‘রমল’ করতে হয়, দরজাটি এ স্থানের সঙ্গে সংযুক্ত। ১৩. বাব আব্বাস-(গেট-২০) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর চাচা ও সাহাবা আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিবের নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। দরজাটি হারাম কমপ্লেক্সের পূর্বদিকে বাব আলী ও বনি শায়বার মাঝে অবস্থিত। এ দরজা দিয়ে হাজি সাহেবগণ সায়ী করার স্থানে প্রবেশ করে থাকেন। ১৪. বাব বনি হাশেম-(গেট নং ২১) বাব বনি হাশেম মসজিদ হারাম কমপ্লেক্সের নতুন ও অত্যাধুনিক গেটগুলোর একটি। এটি পবিত্র কা’বার নিকটেই অবস্থিত। এ দরজা দিয়ে সায়ী করার স্থানে খুব সহজেই প্রবেশ করা যায়। মক্কার সম্ভ্রান্ত গোত্র বনু হাশেমের নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। ১৫. বাব বনি শাইবা/শাইবা গেট-(গেট নং-২২) বাব বনি শাইবা, যেটি বনু শায়বাহ নামেও উচ্চারণ করা হয়। এর অর্থ হল শায়বার পুত্রদের দরজা। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে এবং মারওয়া পাহাড়ের কাছে গেটটি অবস্থিত। মক্কার চাবি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ইসলাম আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই বনু শায়বাহ গোত্রের কাছে ছিল এবং এখনও তাদের কাছেই আছে। গোত্রটিকে সম্মানিত করতেই তাদের নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। ১৬. বাব আল মারওয়া/মারওয়া গেট-(গেট নং ২৩) মক্কার প্রসিদ্ধ মারওয়া পাহাড়ের নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। মসজিদ আল-হারাম কমপ্লেক্সের বড় দরজাগুলোর একটি হল বাব আল মারওয়া বা মারওয়া গেট। এ গেটে বৈদ্যুতিক সিঁড়ি রয়েছে, যা দিয়ে সহজেই হারাম শরীফের উপরে ওঠা যায়। যেসব হাজিগণ দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় সায়ী করেন, খুব সহজেই তারা এ গেট ব্যবহার করে নিচে চলে আসতে পারেন। মসজিদুল হারামে প্রবেশের প্রধান দরজাগুলোর মধ্যে বাব আল মারওয়া দরজা অন্যতম। ১৭. বাব আল-মুদা’আ/আল মু’দা’আ গেট-(গেট নং ২৫) উসমানীয় যুগে মসজিদ আল-হারামের উত্তরদিকে বাব সালামের পাশে গড়ে উঠেছিল মুদা’আ বাজার। এ বাজারের নামেই বাব আল-মুদা’আ/আল মুদা’আ গেটের নামকরণ করা হয়েছে। নিচতলায় সায়ী সম্পন্ন করে দরজাটি দিয়ে বাহিরে বেরিয়ে আসা যায়। ১৮. বাব কুরাইশ-(গেট নং ২৬-২৭) সায়ী করার স্থানের উত্তরপ্রান্তে বাব কুরাইশ বা কুরাইশ গেট অবস্থিত। এ গেট দিয়ে মারওয়া পাহাড়ে প্রবেশ করা যায়। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশের নাম উম্মতে মোহাম্মাদির মাঝে উজ্জ্বল রাখতেই কুরাইশ গোত্রের নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। ১৯. বাব আরাফা/আরাফা গেট-(গেট নং-৩৫) বাব আরাফা বা আরাফা গেট মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত। মক্কার বিখ্যাত আরাফা ময়দান বরাবর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে দরজাটি। এজন্য এ ময়দানের নামে দরজাটির নামকরণ করা হয়েছে। হজের আবশ্যকীয় কাজগুলোর একটি হল আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। ২০. বাব মুযদালিফা/মুযদালিফা গেট-(গেট নং ৩৬) বাব মুযদালিফা বা মুযদালিফা গেটও মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত। হজের সময় হাজিগণ মুযদালিফা নামক স্থানে অবস্থান করেন। দরজাটি এ স্থান বরাবর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এজন্য মুযদালিফার নামে দরজাটির নামকরণ করা হয়েছে। ২১. বাব ফাতাহ-(গেট নং ৪৫) আরবি ফাতাহ শব্দের অর্থ হল বিজয়। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা বিজয়ের দিন এ দিক দিয়ে কা’বায় প্রবেশ করেছিলেন। এজন্য এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে ফাতাহ বা বিজয়। হারাম কমপ্লেক্সের দক্ষিণ দিকে দরজাটি অবস্থিত। ২২. বাব ওমর ফারুক-(গেট নং ৪৯) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর গুরুত্বপূর্ণ সাহাবি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক (রা.) এর নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। যে দশজন সাহাব দুনিয়ায় থাকতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন ওমর (রা.) তাঁদের অন্যতম। ২৩. বাব আল কুদস-(গেট নং ৫৫) মসজিদে হারামের গুরুত্বপূর্ণ ৪৫টি দরজার একটি হল বাব আল কুদস। দরজাটি ইসলামের প্রথম ক্বিবলা ‘মসজিদুল আকসা’ অভিমুখী। এজন্য ‘আল কুদস’ নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। ইসলামের প্রথম কিবলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য মুসলিম উম্মাহর মনে করিয়ে দেয় দরজাটি। ২৪. বাব মদিনা-(গেট নং ৫৬) রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়েছিলেন। মসজিদুল হারাম কমপ্লেক্সের এ দরজাটি মদিনামুখী করে তৈরি করা হয়েছে। এজন্য দরজাটির নাম রাখা হয়েছে বাব মদিনা। ২৫. বাব উমরা-(গেট নং-৬৩) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনের শেষ উমরা করার জন্য এদিক দিয়ে কা’বায় প্রবেশ করেছিলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উমরার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য বাব উমরা নামে দরজাটির নামকরণ করা হয়েছে। এ দরজা দিয়ে সরাসরি মাতাফে (কা’বা তওয়াফ করার স্থান) প্রবেশ করা যায়। ২৬. বাব আম্মার বিন ইয়াসির-(গেট নং ৬৭) আম্মার বিন ইয়াসির (রা.) প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। তিনি এবং তাঁর বাবা-মা ইসলাম গ্রহণ করার জন্য মক্কার মুশরিকদের কাছে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। মর্যাদাবান এ সাহাবার নামে হারাম কমপ্লেক্সের এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। ২৭. বাব মুয়ায বিন জাবাল-(গেট নং ৬৮) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যে সাহাবারা প্রচুর জ্ঞান রাখতেন, তাঁদের একজন হলেন মুয়ায বিন জাবাল (রা.)। মসজিদ আল-হারামের ৬৮ নং দরজাটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। ২৮. বাব আমর বিন আল আস-(গেট নং ৬৯) মসজিদে হারামের ৬৯ নং দরজাটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আরেকজন সাহাবা আমর বিন আল আস (রা.) এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। আমর বিন আল আস (রা.) হলেন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বুদ্ধিমান সাহাবাদের একজন। বদর ও উহুদসহ অনেক যুদ্ধে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ইসলামের পক্ষে নিজের বীরত্ব প্রকাশ করেছেন। ২৯. বাব আয়িশা বিনত্ আবি বকর-(গেট নং ৭০) রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শেষ ও কনিষ্ঠ স্ত্রী আয়িশা বিনত্ আবি বকর (রা.) এর নামে হারাম কমপ্লেক্সের এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। দরজাটি দেখলে ও এটি দিয়ে প্রবেশ করলে আম্মাজান আয়েশা (রা.) এর ইসলামের জন্য ত্যাগ ও কুরবানির কথা স্মরণ হয়। ৩০. বাব আসমা বিনত আবি বকর-(গেট নং ৭১) আবু বকর (রা.) এর মেয়ে আসমা বিনত আবি বকর (রা.) এর নামে মসজিদ হারামের ৭১ নং গেটের নামকরণ করা হয়েছে। আসমা (রা.) এর বাবা আবু বকর, স্বামী যুবায়ের বিন আওয়াম, সন্তান আব্দুল্লা ইবন যুবায়েরসহ পরিবারে সবাই ছিলেন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাহাবা। ৩১. বাব আল ইয়ারমুক-(গেট নং ৭৩) আবু বকর (রা.) এর শাসনামলে মুসলিম ও রোমানদের মাঝে রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ইন্তেকালের পর সবচেয়ে বড় যে যুদ্ধ হয়েছে, এ যুদ্ধের নাম হল ইয়ারমুকের যুদ্ধ। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-র বীরত্বে এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় হয়েছিল। মসজিদুল হারাম কমপ্লেক্সের ৭৩ নং গেটটি ইয়ারমুক যুদ্ধের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ৩২. বাব আবু বকর-(গেট নং ৭৪) রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাহাবা হলেন আবু বকর (রা.)। এক বর্ণনায় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমার উপর আমার সাহাবাদের যত অনুগ্রহ রয়েছে তার কিছুটা হলেও আমি প্রতিদান দিতে পেরেছি। কিন্তু আবু বকরের অনুগ্রহ এমন যে তা পরিশোধ করতে আমি অক্ষম। আল্লাহেএর প্রতিদান দিবেন। আবু বকর (রা.) দুনিয়াতে জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া ১০ জন সাহাবার একজন। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা। তাঁর নামেই মসজিদ আল-হারামের ৭৪ নং গেটের নামকরণ করা হয়েছে। ৩৩. বাব আল-ফাহাদ-(গেট নং ৭৯) সৌদি আরবের সাবেক বাদশাহ ফাহাদের নামে এ গেটের নামকরণ করা হয়েছে। দরজাটি হারাম কমপ্লেক্সের পূর্বদিকে অবস্থিত। মসজিদের পূর্বপ্রান্ত দিয়ে ইবাদতের জন্য প্রবেশ করতে চাইলে এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। হারাম কমপ্লেক্সের থ্রি পোর্টাল দরজাগুলোর এটি একটি। সৌদি শাসকদের আমলে দ্বিতীয় সম্প্রসারণের সময় দরজাটিকে থ্রি পোর্টালে রূপ দেওয়া হয়। ৩৪. বাব জাবির বিন আব্দুল্লাহ-(গেট নং ৮৪) মসজিদে হারামের ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ দরজার একটি হল এটি। দরজাটি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাহাবি জাবির বিন আব্দুল্লাহর নামে নামকরণ করা হয়েছে। মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ৯৪ বছর বয়সে মদিনায় মারা যান জাবির বিন আব্দুল্লাহ এবং মদিনায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবি ছিলেন তিনি। ৩৫. বাব সাঈদ বিন যায়েদ-(গেট নং ৮৫) হারাম কমপ্লেক্সের ৮৫ নং গেটটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আরেকজন সাহাবা সাঈদ বিন যায়েদ (রা.) এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। সাঈদ বিন যায়েদ (রা.) ছিলেন উমর বিন খাত্তাব (রা.) এর চাচাতো ভাই এবং ভগ্নিপতি। উমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে এ সাহাবির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ৩৬. বাব যায়েদ বিন সাবিত-(গেট নং ৮৬) যায়েদ বিন সাবিত (রা.) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর গুরুত্বপূর্ণ একজন সাহাবি। আবু বকর (রা.) এর খিলাফতের সময় যায়েদ (রা.) কুরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সম্মানিত এ সাহাবার নামেই মসজিদ হারামের এ গেটটির নামকরণ করা হয়েছে। ৩৭. বাব উম্মে হানি-(গেট নং ৮৭) রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর চাচা আবু তালিবের মেয়ে হলেন উম্মে হানি (রা.)। তিনি আলী ও জাফর বিন আবি তালিব (রা.) বড় বোন। মিরাজ গমণের রাতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মে হানি (রা.) এর বাড়িতে কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন। এ সাহাবির নামেই মসজিদুল হারামের ৮৭ নং গেটটির নামকরণ করা হয়েছে। ৩৮. বাব মাইমুনা-(গেট নং ৮৮) মক্কার মসজিদুল হারামের ৮৮ নং গেটটি মাইমুনা (রা.) এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর একজন স্ত্রী এবং উম্মুল মু’মিনীন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর স্ত্রীদের মধ্যে মাইমুনা (রা.) ছিলেন সবচেয়ে বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। ৩৯. বাব হিজলাহ-(গেট নং ৮৯) মসজিদুল হারাম কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্রান্তে বেশ কয়েকটি গেট রয়েছে। এ দরজাগুলোর বাম দিকে বাব হিজলাহ এবং ডান দিকে বাব হাফসা আংশিকভাবে দৃশ্যমান। মক্কায় হিজলাহ নামের একটি পাহাড় রয়েছে। ধারণা করা হয়, এ পাহাড়ের নামেই দরজাটির নামকরণ করা হয়েছে। ৪০. বাব হাফসা-(গেট নং ৯০) হারাম কমপ্লেক্সের ৯০ নং গেটটি রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আরেকজন স্ত্রী হাফসা (রা.) এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। হাফসা (রা.) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবি ও ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর বিন খাত্তাব (রা.) এর মেয়ে। ৪১. বাব নাদওয়া-(গেট নং ৯২) দারুন নাদওয়া হল ঐতিহাসিক একটি ঘরের নাম যেখানে কুরাইশের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বিভিন্ন সময় মিটিং করতেন। মক্কা ও কুরাইশদের ইতিহাস মুসলিমদের স্মরণ করিয়ে দিতে এ ঘরের নামে হারাম কমপ্লেক্সের ৯২ নং গেটটির নামকরণ করা হয়েছে। ৪২. বাব খাদিজা-(গেট নং ৯৩) খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রথম স্ত্রী। নবুওতের আগে এবং পরে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন উম্মুল মু’মিনীন খাদিজা (রা.)। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নবুওতের বিষয়টি সর্বপ্রথম সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন খাদিজা (রা.)। তাঁর নামেই মক্কার মসজিদুল হারামের ৯৩ নং গেটটির নামকরণ করা হয়েছে। ৪৩. বাব ইবরাহিম-(গেট নং ৯৪) নবি ইবরাহিম খলিলুল্লাহ (আ.) এর নামে এ দরজার নামকরণ করা হয়েছে। কাবা ঘর মহান আল্লাহর নির্দেশে সর্বপ্রথম ফেরেশতারা নির্মাণ করেছিলেন। নুহ (আ.) এর সময়কালীন মহা প্লাবনে কাবা ঘর বালুর নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। এরপর মহান আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.) ঘরটি ৪ হাজার বছর আগে পুনঃনির্মাণ করেছিলেন। ৪৪. কিং আব্দুল্লাহ গেট-(গেট নং ১০০) মসজিদ আল হারামের গুরুত্বপূর্ণ ৪৫টি দরজার একটি কিং আব্দুল্লাহ গেট। হারাম কমপ্লেক্সের সবচেয়ে বড় দরজাগুলোরও একটি এটি। দরজাটি মসজিদের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এ গেটে দুটি চমৎকার মিনার রয়েছে। গেটটির সাথে রয়েছে একটি করিডোর , যে করিডোর দিয়ে সরাসরি মাতাফ বা তাওয়াফের স্থানে যাওয়া যায়। ৪৫. বাব সালাম গেট মসজিদ হারাম কমপ্লেক্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গেট হল বাব সালাম। সালাম অর্থ শান্তি অর্থাৎ এ দরজার নাম হল শান্তির দরজা। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে দরজাটি অবস্থিত। কা’বার কাছেই অবস্থান করতেন শাইবা বিন উসমান। অনেকে তাঁর গোত্রের দিকে ইঙ্গিত করে এ দরজাকে বাব বনি শাইবা বলে থাকেন। যদিও বনি শাইবা নামে হারাম কমপ্লেক্সে স্বতন্ত্র দরজাই রয়েছে।
শ্চিমবঙ্গের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বারাসাত শহরে এক বিরল সম্প্রীতির নজির গড়ে উঠেছে। হিন্দু পরিবারের বসতভিটায় অবস্থিত ‘আমানতি মসজিদ’ শুধু নামেই নয়, বাস্তবেও হয়ে উঠেছে আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থানের এক অনন্য প্রতীক। আর এই সম্প্রীতির কেন্দ্রে রয়েছেন পার্থসারথি বোস—যিনি টানা ১৬ বছর ধরে পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখে আসছেন। হিন্দু পরিবারের তত্ত্বাবধানে মসজিদ মসজিদটি পার্থসারথি বোসদের বাড়ির ভেতরেই অবস্থিত। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে প্রায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো মসজিদ নেই। ফলে আশপাশের দোকান, বাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মুসলমানরা এখানে এসে নামাজ আদায় করেন। রমজান মাসে প্রতিদিন দেড় শতাধিক মুসল্লি ইফতার করেন এই মসজিদে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—মসজিদের দেখভাল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সার্বিক দায়িত্ব পালন করে আসছে একটি হিন্দু পরিবার। ইতিহাসের সূত্রপাত ১৯৬০ সালে ১৯৬০ সালে সম্পত্তি বিনিময় প্রথার মাধ্যমে খুলনার আলকা গ্রাম থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন পার্থসারথির দাদু নিরোধকৃষ্ণ বোস। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে বসতভিটায় উঠে তিনি দেখতে পান একটি জরাজীর্ণ মসজিদ। ধর্মীয় সম্মান বজায় রেখে সেটি আগলে রাখেন তিনি। পরবর্তীতে তার ছোট ছেলে দীপক বোস দায়িত্ব নেন মসজিদের। তখনই এর নামকরণ করা হয় ‘আমানতি মসজিদ’। বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন পার্থসারথি বোস। দুর্ঘটনা থেকে আত্মশুদ্ধির পথ পার্থসারথি জানান, ২০০৯ সালের আগে মসজিদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তেমন ছিল না। রমজান মাসে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় বাইক থেকে পড়ে গিয়ে ডান কাঁধের হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসকেরা জানান, হাড় জোড়া লাগা কঠিন। অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরদিন সকালে মসজিদে এসে ক্ষমা চান। নিজের ভুল স্বীকার করে মানত করেন—জীবিত থাকা পর্যন্ত রমজান মাসে রোজা রাখবেন। মসজিদের মাটি কাঁধে লাগিয়ে প্রার্থনা করেন সুস্থতার জন্য। তার দাবি, এরপর ধীরে ধীরে তার হাড় জোড়া লাগে। সেই থেকে টানা ১৬ বছর পুরো রমজান মাস রোজা রেখে আসছেন তিনি। এর আগেও রোজা রাখতেন, তবে পুরো মাস নয়। “মসজিদ আমাকে ভালো মানুষ বানিয়েছে” পার্থসারথি বলেন, “এই মসজিদ আমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে যে, খারাপ থাকার উপায় নেই। রোজা রাখলে মন পরিষ্কার থাকে। বাজে চিন্তা আসে না। মনে এক ধরনের ভয় কাজ করে—আবার যেন কোনো ভুল না করি।” তার পরিবারে অন্য কেউ রোজা না রাখলেও সবাই সহযোগিতা করেন। স্ত্রী সেহরির আয়োজন করেন, আর ইফতারে থাকে খেজুর, ফল ও হালকা খাবার। দান গ্রহণ নয় মসজিদের জন্য সরকারি বা স্থানীয় দান নেওয়া হয় কি না—এ প্রশ্নে পার্থসারথি স্পষ্ট জবাব দেন, “না, কোনো দান নেই। হারাম না হালাল বুঝি না। তাই দানবাক্সও রাখা হয়নি।” সম্প্রীতির বার্তা স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বারাসাতের ৮ নম্বর ওয়ার্ড পুরোপুরি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এখানে মুসলিম ভোটার নেই বললেই চলে। তবুও ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “এই মসজিদ আমাদের কাছে মন্দিরের মতোই পবিত্র।” অন্য এক বৃদ্ধা জানান, ভোরের আজান তার ঘুম ভাঙায় এবং মানসিক শক্তি জোগায়। ৯০ দশক থেকে দায়িত্বে থাকা মসজিদের ইমাম আক্তার বলেন, “বিশ্বে এমন নজির বিরল। মুসলমানরা এখানে নামাজ পড়ে চলে যান, কিন্তু দেখভাল করেন এক হিন্দু পরিবার। ইসলামে এমন কোনো নিষেধ নেই যে, অন্য ধর্মের মানুষ মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণে যুক্ত থাকতে পারবেন না।” ধর্ম নয়, মানবিকতা পার্থসারথি বোস বলেন, “মসজিদের দেখভাল করি, কিন্তু ইসলামের নিয়মে হস্তক্ষেপ করি না।” তার মতে, এটি ধর্মীয় নয়—মানবিক দায়িত্ব। রমজানের আত্মসংযম, আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা যেন নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে বারাসাতের ‘আমানতি মসজিদ’। যেখানে ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ হয়ে ওঠাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।