ইত্তেহাদ এক্সক্লুসিভ

মিল্টন সমাদ্দার মুখোশের আড়ালে ভয়ংকর চেহারা

milton
print news

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্কমিল্টন সমাদ্দার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কাছে পরিচিত একটি নাম। মানবতার সেবক হিসেবে তার পাঁচটি ফেসবুক পেজে অনুসারী (ফলোয়ার) সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। অসহায় মানুষের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ নামের বৃদ্ধাশ্রম। রাস্তা থেকে অসুস্থ কিংবা ভবঘুরেদের কুড়িয়ে সেখানে আশ্রয় দেন। সেসব নারী, পুরুষ ও শিশুকে নিয়ে ভিডিও তৈরি করে প্রায়ই তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতে দেখা যায়। মানুষের অসহায়ত্ব তুলে ধরে তাদের জন্য বিত্তবানদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। তার আবেদনে সাড়াও মেলে প্রচুর। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ১৬টির বেশি নম্বর এবং তিনটি ব্যাংক হিসাবে প্রতি মাসে প্রায় কোটি টাকা জমা হয়। এর বাইরে অনেকেই তার প্রতিষ্ঠানে সরাসরি অনুদান দিয়ে আসেন। মানবিক কাজের জন্য এখন পর্যন্ত তিনটি রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছেন মিল্টন সমাদ্দার।

এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু এটাই মিল্টনের আসল চেহারা নয়। মানবিকতার আড়ালে তিনি যা করেন, তা গা শিউরে ওঠার মতো। যেই প্রতিষ্ঠানের জন্য এত পরিচিতি, সেই আশ্রম ঘিরেই ভয়াবহ প্রতারণার জাল বিস্তার করেছেন মিল্টন। প্রকৃতপক্ষে যে কয়জনকে লালন-পালন করছেন, প্রচার করছেন তার চেয়ে কয়েক গুণ। লাশ দাফন করার যে হিসাব দিচ্ছেন, তাতেও আছে বিরাট গরমিল। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, মিল্টনের বিরুদ্ধে রয়েছে অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার নামে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির অভিযোগ।

মিল্টন সমাদ্দারের ব্যক্তি জীবনেও নৈতিকতা বা মানবিকতার বালাই নেই। কিশোর বয়স থেকেই ছিল অর্থের লোভ। প্রতিবেশী, চিকিৎসক কিংবা সাংবাদিকরা বিভিন্ন সময় তার কাছে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এমনকি নিজের জন্মদাতা পিতাকেও বেধড়ক মারধরের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

হিসাব মেলে না মরদেহের, অভিযোগ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চুরির:

মিল্টন সমাদ্দারের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে দেখা যায়, তার আশ্রমে সব সময় আড়াইশ থেকে তিনশ অসুস্থ রোগী থাকেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় যারা মারা যান, তাদের দাফন করেন মিল্টন। আবার তার আশ্রমে অবস্থানকালেও অনেকে মারা যান। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মরদেহ দাফন করেছেন বলে মিল্টন দাবি করেন।

মিল্টন জানান, যাদের দাফন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৬০০ জন তার আশ্রমে মারা গেছেন। আর বাকি ৩০০ মরদেহ রাস্তা থেকে এনে তিনি দাফন করেছেন। এসব মরদেহ রাজধানীর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বলে দাবি তার।

তবে কালবেলার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সরেজমিন মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়ে জানা যায়, মিল্টন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে সেখানে সব মিলিয়ে ৫০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এসব মরদেহের ডেথ সার্টিফিকেট কালবেলার হাতে রয়েছে।

এ ছাড়া রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫টির মতো মরদেহ দাফনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে আজিমপুর কবরস্থানে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কোনো মরদেহের দাফন হয়নি বলে  নিশ্চিত করেছেন সেখানকার দায়িত্বরতরা। তাহলে মিল্টন সমাদ্দারের দাবি অনুযায়ী ৯০০ মরদেহ দাফন করা হলে বাকি ৮৩৫টি মরদেহ কোথায় গেছে?

‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ আশ্রমে অবস্থানকালে কারও মৃত্যু হলে তার সার্টিফিকেট দেন মাহিদ খান নামের একজন চিকিৎসক। তবে তার স্বাক্ষর এবং সিলের সঙ্গে বিএমডিসির নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ নেই। বিএমডিসির বিধি অনুযায়ী চিকিৎসকের স্বাক্ষর এবং সিলে নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।

বিস্তারিত জানার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে মোহাম্মদ আব্দুল মাহিদ খান নামে একজন চিকিৎসকের সন্ধান পাওয়া যায়। কমফোর্ট হাসপাতালে তার চেম্বার রয়েছে। তবে সরেজমিন ওই হাসপাতালে গিয়ে উল্লেখিত চিকিৎসকের দেখা মেলেনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিল্টন সমাদ্দারের দক্ষিণ পাইকপাড়া আশ্রমের কাছেই বায়তুর সালাম জামে মসজিদ। এই মসজিদে এক সময় তার প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসা মরদেহ বিনামূল্যে গোসল করানো হতো। তার মানবিক কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে মসজিদ কর্তৃপক্ষ তাকে এই সুবিধা দিয়েছিল। তবে গোসল করানোর সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রায় প্রতিটি মরদেহের বিভিন্ন স্থানে কাটাছেঁড়ার দাগ শনাক্ত করেন। করোনার সময় এ বিষয়ে মিল্টন সমাদ্দারকে প্রশ্ন করে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এরপর তিনি ওই মসজিদে মরদেহ পাঠানো বন্ধ করে দেন।

মিল্টন সমাদ্দারকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন স্থানীয় একটি মাদ্রাসার পরিচালক তোফাজ্জল হোসেন। তিনি  বলেন, ‘মিল্টন এক সময় বাসা ভাড়া শোধ করতে পারতেন না। এখন তিনি এগুলো করে কোটি কোটি টাকার মালিক। দামি গাড়িতে চড়েন। আড়ালে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চুরি করেন। আমাদের বায়তুর সালাম মসজিদে ওর মরদেহ ফ্রি গোসল করিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিছু মরদেহ গোসল করানোর পর দেখা যায়, সবগুলোর শরীরে কাটা দাগ। এ বিষয়ে মিল্টনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি মরদেহ পাঠানো বন্ধ করে দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাস্তা থেকে মানুষ তুলে আনার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। যাদের কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ভালো থাকে, তাদের যথাযথ চিকিৎসা করানো হয়। তাদের জন্য ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এরপর সুস্থ হলে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেওয়া হয়। সুস্থ মানুষ কিন্তু কিছুদিন পরে দেখি মারা যান।’

তিনি আরও বলেন, ‘বারেক চাচা মরদেহ গোসল করাতেন। চাচা বলেছেন, তিনি একবার ওর আশ্রমে গিয়ে এক ব্যক্তিকে সুস্থ সবল দেখে এসেছেন। এর দু-তিন দিন পরই মসজিদে গোসল করানোর জন্য ওই ব্যক্তির মরদেহ আসে। ওই লাশের শরীরেও পেটের দিক দিয়ে কাটা দেখা যায়। এরপর বারেক চাচাও মরদেহ গোসল করাতে অস্বীকৃতি জানান।’

অনেক খোঁজাখুঁজির পর দক্ষিণ পীরেরবাগ আমতলা বাজারে গিয়ে সন্ধান মেলে সেই বারেক চাচার। মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তাকে ফোন করা হলে তিনি নিচে নামছেন জানিয়ে বাসার নিচে অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু এরপরই ফোন বন্ধ করে দেন। কয়েক ঘণ্টা পর ইন্টারকমে ফোন করে একজন লোক মারা গেছেন বলা হলে তিনি নিচে নামেন। তবে আশ্রম থেকে আসা মরদেহ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি।

বারেক নামের এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি আগে তার মরদেহ গোসল করাতাম। এখন করাই না।এর কারণ জানতে চাইলে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি বয়স্ক মানুষ। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই।

‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’-এ কাজ করেছেন—এমন একজন বলেন, ‘কোনো রোগী অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় না। এখানে রেখেই চিকিৎসা করা হয়। কারণ, তিনি চান না কেউ পুরোপুরি সুস্থ হোক। এটা তার ব্যবসা।

ওই ব্যক্তির কথার মিল পাওয়া যায় মৃতদের ডেথ সার্টিফিকেটেও। যতজনকে দাফন করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ারের প্যাডে।

একটি আশ্রমে এত মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি অবহিত করে মন্তব্য চাওয়া হলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহাবুব  বলেন, ‘এত মানুষ মারা যাওয়া অস্বাভাবিক। তার মানে উনার এখানে প্রোপার চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। তা ছাড়া উনি কতজনকে হাসপাতালে রেফার করেছেন, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। উনার এখানে তো সবাই মারা যেতে পারে না। কেউ বেশি অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে, চিকিৎসা করাতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আশ্রম হসপিটালাইজড হলে সেখানে স্পেশালাইজড চিকিৎসক কে আছেন, সেটা দেখতে হবে। থাকলেও তিনি নিয়মিত যান কি না, সেটাও দেখতে হবে। প্রোপার চিকিৎসা হলে এত মানুষ মারা যাওয়ার কথা নয়।’

আর্থিক হিসাবে চরম অস্বচ্ছতা:

সাধারণ মানুষের দানের টাকায় পরিচালিত অলাভজনক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয় সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরে আওতাধীন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়। মিল্টন সমাদ্দারও তার চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের অনুমোদন সমাজসেবা থেকে নিয়েছেন। তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে অডিট এবং দুই বছর পরপর নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি নবায়নের কথা থাকলেও তিনি সেটি করেন না।

মিল্টন সমাদ্দারের পাঁচটি ফেসবুক পেজে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের ১৬টি নম্বর দেওয়া রয়েছে। এ ছাড়া তিনটি বেসরকারি ব্যাংকে খোলা হিসাবের মাধ্যমে চলে আর্থিক লেনদেন। এসব মোবাইল ব্যাংকিং এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরে লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে  দেখা যায়, প্রতি মাসে কোটি টাকার মতো জমা হয়। তবে মিল্টনের আশ্রমে থাকা সর্বসাকল্যে ৫০ জন মানুষের দেখাশোনার জন্য এই বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় হয় কি না—সেই প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিন মিল্টনের আশ্রম পরিদর্শন করে দেখা যায়, বিভিন্ন বিষয় প্রচার-প্রচারণার জন্য মিল্টনের রয়েছে ১৬ জনের একটি দল। এরা বিভিন্ন মানবিক গল্পের ভিডিও তৈরি করেন। এরপর সেসব ভিডিও ফেসবুকে দিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেন।

শুধু তাই নয়, তার পাঁচটি ফেসবুক পেজ নিয়মিতভাবে ডলার খরচ করে বুস্ট করা হয়। এজন্য গত এক সপ্তাহেই ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে হিসাব পাওয়া গেছে।

একাধিক ব্যক্তিকে মারধর, জমি দখলের অভিযোগ:

মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে মারধরের প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে। তার আশ্রমের ভেতরে রয়েছে নিজস্ব বন্দিশালা। সেখানে আছে লাঠিসোটা, পাইপসহ মারধরের নানা উপকরণ। চুন থেকে পান খসলেই তার লাঠিয়াল বাহিনী হামলে পড়ে। সর্বশেষ গত ঈদুল ফিতরের আগের দিন ১০ এপ্রিল সাভারের কমলাপুর এলাকার বাহেরটেকে নিজের কেনা জমি দেখতে গিয়ে বেধড়ক মারধরের স্বীকার হন মো. সামসুদ্দিন চৌধুরী নামের ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেয়ে এবং মেয়ের জামাই। বাধা দিতে গিয়ে মারধরে স্বীকার হন তারাও। মারধরে মেয়ের জামাই ফয়েজ আহমেদের হাতের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায় এবং সামসুদ্দিন চৌধুরীর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। সামসুদ্দিনের মেয়ে সেলিনা বেগমও মারধরের হাত থেকে রক্ষা পাননি। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে প্রায় এক ঘণ্টা পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে ভুক্তভোগী সেলিনা বেগম  জানান, ‘আমাদের জমি সে কম দামে ক্রয় করতে চেয়েছে। জমি না বিক্রি করায় সে আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। মিল্টন সরকারি রাস্তায় বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে রেখেছে। যে কারণে আমাদের গাড়ি যাচ্ছিল না। পরে সরকারি রাস্তায় বেড়া দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তার লোকজন আমাদের ওপর হামলা চালায়। প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন লোক লাঠিসোটা নিয়ে এসে বেধড়ক মারধর করে। এরপর আমার বাবা আর স্বামীকে মিল্টনের আশ্রমের ভেতরে নিয়ে একটি রুমের মধ্যে আটকে রাখে। সেখানে অনেক লাঠিসোটা, পাইপ ও ছুরি ছিল। পাইপ দিয়ে একজনের পর একজন করে পেটাতে থাকে। মিল্টন নিজেও একটু পরপর এসে মারধর করে। আমি তখন মিল্টনের পায়ে ধরে আমার স্বামী ও বাবাকে ছেড়ে দিতে বললে আমাকেও বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে লোকজন এগিয়ে এলে আমাদের ছেড়ে দেয়।’

এ ঘটনায় মিল্টন সমাদ্দারকে প্রধান আসামি করে সাভার মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিদর্শক (ইন্টেলিজেন্স) আব্দুল্লাহ বিশ্বাস বলেন, ‘মারধরের ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন। মামলার তদন্ত চলছে। আমরা মিল্টন সাহেবের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছি। এখনো দেয়নি।

গার্মেন্টসে চাকরি খোঁজার নাম করে গত শুক্রবার সারাদিন সাভারের বাহেরটেক এলাকা ঘুরে ভয়ংকর সব তথ্য পাওয়া গেছে। পুরো এলাকাজুড়ে মিল্টন সমাদ্দার এক আতঙ্কের নাম। তার ভয়ে নিজের বাড়িতে যান না স্থানীয় খ্রিষ্টানপাড়ার অনেক মানুষ। তাদের মধ্যে একজন হেমন্ত রোজারিও। মিল্টনের আশ্রমের পাশে তার একটি জমি রয়েছে। স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি ওই জমি ক্রয় করেছেন। পরে মিল্টন সমাদ্দার জমিটি কিনে নিতে চান। তবে তিনি বিক্রি করতে রাজি হননি। এক পর্যায়ে জটিমি জোর করে দখলে নিয়ে স্থাপনা তৈরি করেন মিল্টন। বাধা দিতে গিয়ে হেমন্ত রোজারিও মারধরের শিকার হন। মিল্টন নিজে তাকে মারধর করে। এরপর স্থানীয় লোকজনের বাধায় ওই স্থাপনা ভেঙে ফেলা হলেও এখনো ভয়ে-আতঙ্কে নিজের জমিতে যেতে পারেন না।

গত শুক্রবার দুপুরে হেমন্তের বাড়িতে গিয়ে তার চোখেমুখে ভয় ও আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়। তার মা, বোন ও স্ত্রীর অবস্থাও একই রকম।

হেমন্ত রোজারিও  বলেন, ‘আমি ওই জমি কিনেছি। আমি গরিব মানুষ। মিল্টন সাহেব আমার জমি কিনতে চাইছে। আমি বেচি নাই। আমার জমি জোর করে দখল করে একটা ঘর বানাইছে। বাধা দেওয়ায় আমারে ধইরা মারছে। পরে আমারে বলছে, তুই ওই জমিতে আসবি না। এলে তোরে মাইরালামু।’

নন্দন রোজারিও নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘উনাকে এখানে আশ্রম বানাতে আমরাই সাহায্য করেছি। উনি আমার জায়গায় জিনিসপত্র রেখে আশ্রমের কাজ করেছে। ভালো কাজ করে বলে আমরা কিছু বলি নেই। পরে দেখি এসবের আড়ালে তার অন্য উদ্দেশ্য। তিনি এখানকার খ্রিষ্টানদের জমি দখলের উদ্দেশ্যে এসেছেন। কেউ জমি বেচতে না চাইলেই তার উপরে নেমে আসে নির্যাতন। ওর লোকজন তাকে মারধর করে।’

এর আগে কল্যাণপুরের কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকেও মারধর করেছেন মিল্টন সমাদ্দার। এরপর উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজির মামলা করেন। এ ছাড়া নুর আলম মানিক নামের এক ব্যক্তি নিজের বোনকে আনতে গিয়ে মারধরের শিকার হন। নিরুপায় হয়ে তিনি জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে পুলিশ এসে তাকে আশ্রম থেকে উদ্ধার করে।

সেই সময়ের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশের সামনেই মিল্টন সমাদ্দার ওই ব্যক্তিকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করছেন।

নুর আলম মানিক বলেন, ‘আমার বোনের মানসিক সমস্যা ছিল। আমি ফেসবুকে আমার বোনের ভিডিও দেখে চিনতে পেরে তাকে আনার জন্য মিল্টনের আশ্রমে যাই। আমি জুতা পায়ে দিয়ে তার আশ্রমের ভেতরে ঢোকায় সে আমার গায়ে হাত তোলে। আমাকে তার লোকজন বেধড়ক মারধর করে। জুতা ছিল মূলত উসিলা। সে আসলে আমার বোনকে দিতে চাইছিল না। এটি তার একটা ব্যবসা।’

এ ছাড়া মিল্টনের বিরুদ্ধে একাধিকবার হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের মারধরেরও অভিযোগ রয়েছে।

মিল্টনের মারধরের হাত থেকে রক্ষা পায়নি তার জন্মদাতা পিতাও। ২০০১ সালে নিজের পিতাকে বেধড়ক মারধর করেন মিল্টন। সেই ঘটনার জেরে তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বলে এলাকাবাসীরা জানান।

বরিশালের উজিরপুরের বৈরকাঠি গ্রামের শাহাদাত হোসেন পলাশ  বলেন, ‘মিল্টন সমাদ্দার তার নবাবাকে বেধড়ক মারধর করে। এ কারণে তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে সে পালিয়ে ঢাকায় গিয়ে ওঠে। এখন শুনতাছি, উনি নাকি মানবতার ফেরিওয়ালা। এটা শুনে আমরা আশ্চর্য হয়েছি।’

সাংবাদিকদের সঙ্গে বেপরোয়া আচরণ:

সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীরাও একাধিকবার মিল্টনের তোপের মুখে পড়েছেন। গত ১১ এপ্রিল শ্যামলীর রিং রোডে সেন্ট্রাল মেডিকেলের গেটের সামনে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক মিল্টন সমাদ্দারকে বিষয়টি জানান। ফোন পেয়ে আসেন মিল্টন সমাদ্দার। এরপর ওই ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলার সময় নিউজ করার জন্য ভিডিও করতে গিয়ে মিল্টনের তোপের মুখে পড়েন একটি অনলাইন পোর্টালের প্রতিবেদক। সে সময় তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করা হয়।

পরে এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ফের তোপের মুখে পড়েন অন্য একটি নিউজপোর্টালের অপরাধ বিভাগের প্রধান। হোয়াটসঅ্যাপে তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল এবংহুমকি-ধমকি দিয়ে মেসেজ করেন মিল্টন সমাদ্দার।

আশ্রিতদের হিসাব অতিরঞ্জিত:

গত রোববার কল্যাণপুরের অফিসে মিল্টন সমাদ্দারের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। সে সময় তিনি জানান, তার আশ্রমে বর্তমানে ১৩০ জন নারী, ১২৬ জন পুরুষ, ৪২ জন প্রতিবন্ধী শিশু, মানসিক ভারসাম্যহীন মায়েদের ৬ জন সন্তান এবং তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া ৭টি শিশু রয়েছে। তার হিসাবে সব মিলিয়ে আশ্রিতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১১ জন। তবে পরিচয় করে গোপন গত শুক্রবার সাভার এবং রোববার পাইকপাড়ার আশ্রম এলাকা ঘুরে মিল্টন সমাদ্দারের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি।

গার্মেন্ট কারখানায় চাকরি খোঁজার কথা বলে সাভারের ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’-এর সামনের একটি চায়ের দোকানে ঘণ্টাখানেক অবস্থান করেন এ প্রতিবেদক। সে সময় আশ্রমের দ্বিতীয় তলায় ৩ জন, তৃতীয় তলায় ২ জন এবং চতুর্থ তলায় ৩ থেকে ৪ জনকে দেখা যায়।

স্থানীয়রা জানান, আশ্রমে সর্বোচ্চ ২৫-৩০ জন থাকতে পারেন। এ ছাড়া পাইকপাড়ার আশ্রমে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ২০ জনের মতো লোক আছেন।

বরিশালে চার্চ দখল:

বরিশালে ‘চন্দ্রকোনা খ্রিষ্টান মিশনারি চার্চ’ দখল চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে। দখলের উদ্দেশ্যে তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিল-স্বাক্ষর জাল করে চার্চের নতুন কমিটি গঠন করে বরিশাল জেলা প্রশাসকে একটি চিঠি দেন। ওই কমিটিতে সভাপতি করা হয় মিল্টন সমাদ্দারকে। কমিটির বাকি সদস্যদের প্রায় সবাই মিল্টনের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না চার্চের দায়িত্বরত যাজকরা। পরে তারা ধর্ম মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে মন্ত্রণালয় থেকে তাদের জানানো হয়, এ ধরনের কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি। এরপর তারা কোর্টে মামলা করলে কোর্ট জালিয়াতি করে চার্চ দখল করতে চাওয়া ব্যক্তিদের ওই চার্চের সীমানায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেন।

সরেজমিন বরিশালে গিয়ে ওই চার্চের যাজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিল্টন সমাদ্দার চার্চ দখল করে সেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানাতে চেয়েছিলেন। তাতে ব্যর্থ হওয়ায় যাজকদের মারধরের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছেন।

হেনসন দানিল হাজরা নামে আরেক সহকারী যাজক  বলেন, ‘চার্চ দখল করার জন্য আমাকে গুম করে যাজকদের নামে মামলা দিয়েছিল মিল্টন। মামলায় আমি গুম হয়ে গেছি দেখানো হয়। আসামি করা হয় আমার সহকর্মীকে। আমার বাবাকে ম্যানেজ করে মিল্টন এ কাজ করেন। তারা আমাকে গুম করে ফেলতে চেয়েছিল; কিন্তু পারেনি। পরে আমি পালিয়ে এসপি অফিসে হাজির হয়ে জানাই, আমি গুম হইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিল্টন ও তার বড় ভাই মোল্লা বাড়ির ব্রিজের ওপরে মসজিদের পাশে আমাকে একবার বেধড়ক মারধর করেন।’

অন্য আরেক যাজক বলেন, ‘এই চার্চ দখল করার জন্য মিল্টন সমাদ্দার আমাদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করেছেন। মারধর করেছেন। আমাদের নামে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন। যদিও সব মামলাই কোর্টে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।’

চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার নিয়ে নানা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সারা দেশে এমন ৬৯ হাজার সংগঠনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সবকিছু জানা আসলে সম্ভব হয় না। তবে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে আমরা খতিয়ে দেখব।’

সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য  বুধবার চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের চেয়ারম্যান মিল্টন সমাদ্দারকে ফোন করা হলে তিনি  বলেন, ‘সাভারে আমার আশ্রমে বর্তমানে ২৫৬ জন লোক আছে।

মরদেহ দাফনের হিসাবে গরমিল সম্পর্কে একাধিকবার প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।

আর্থিক হিসাবে অসংগতি, জমি এবং চার্চ দখলের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আমি চিনি না। আপনি সাংবাদিক কি না, সেটা আমি কীভাবে বুঝব?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন। আমার কোনো সমস্যা নাই, সারা দেশের মানুষ জানুক। তবে সেটা প্রোপার ইনভেস্টিগেশন করে করেন।

সৌজন্যে:কালবেলা

 

* সর্বশেষ  গুরুত্বপূর্ণ  সব  সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখা পেতে আমাদের  ফেসবুক পেইজে  লাইক  দিয়ে  অ্যাকটিভ  থাকুন।  ভিজিট করুন : http://www.etihad.news

* অনলাইন  নিউজ পোর্টাল  ইত্তেহাদ নিউজে  লিখতে  পারেন  আপনিও। লেখার বিষয়  ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন  [email protected] ঠিকানায়

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *