ইত্তেহাদ স্পেশাল

দুর্নীতি প্রমাণের পরেও বহাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার

অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী
print news

অনলাইন ডেস্ক : জুলাই ছাত্র-জনতা হত্যা অপরাধে পতিত আওয়ামী সরকারের বিচারের দাবীতে অন্দোলন হচ্ছে দেশজুড়ে। কিন্তু এই পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে সুবিধাভোগী, আওয়ামী ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, এমনকি জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা হত্যার জন্য অর্থ যোগানদাতা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য কোনো আন্দোলন হচ্ছে না। এসব কর্মকর্তারা হত্যা মামলার আসামী হয়েও এখনো বহাল তবিয়তেই আছেন। এমনই এক কর্মকর্তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার। আওয়ামী সরকারের আমলে নিজের সর্বোচ্চ আওয়ামী ক্ষমতা দেখিয়ে এখনো সরকারের উচ্চপদস্থ আমলাদের ম্যানেজ করে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ আছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নিজের কুক্ষিগত করে রাখা থেকে শুরু করে ক্ষমতার দাপট তিনি অবাধেই দেখিয়ে যাচ্ছেন।

শামীম আখতারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকবার তদন্ত কমটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটি দুর্নীতির সত্যতা পেয়ে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে দাখিলও করেছে। কিন্তু শামীম আখতার সেই তদন্ত প্রতিবেদনগুলো টাকা ও ক্ষমতার প্রভাবে ধামাচাপা দিয়েছেন বলে গণপূর্ত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে খোঁজ নিয়ে সত্যতাও পাওয়া যায়। আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী, তৎকালীন আমলাদের ম্যানেজ করেই এসব প্রমানিত তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দিয়েছেন শামীম আখতার।

জানা যায়, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দীতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চারটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ কাগজে-কলমে সেখানে সাতটি আয়োজন দেখিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এ সাতটি ভিভিআইপি অনুষ্ঠান বাবদ ২৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। ‘ভুয়া’তিনটি অনুষ্ঠানের টাকা তুলে ভাগবাটোয়ারা করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ভিভিআইপি প্রোগ্রামের নামে এই অর্থ লোপাটের মূলহোতা প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার, যার একক শাসনে চলছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের দুই তারিখ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় শামীম আখতারের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অডিট অনু বিভাগ) শাহনাজ সামাদকে আহ্বায়ক, উপসচিব (বাজেট অধিশাখা-৪) মো. মাহবুবুর রহমান সদস্য সচিব এবং যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন অধিশাখা-১৪) মো. জহিরুল ইসলাম খান সম্বলিত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ নূর মোহাম্মাদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করে সুস্পষ্ট মতামতসহ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এছাড়া শামীম আখতার হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক থাকাকালীন তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংডম বিল্ডার্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে কার্যাদেশ দেওয়াসহ কোটি কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মনিটরিং) মো. আশফাকুল ইসলাম বাবুলকে আহ্বায়ক করে দুজন যুগ্ম সচিবকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি অভিযোগগুলোর মধ্যে তিনটি অভিযোগের প্রমাণ পায়। সেই তদন্ত প্রতিবেদন তৎকালীন সচিবের কাছে জমা দিলেও বিগত সরকারের একাধিক মন্ত্রীকে দিয়ে তদবির করিয়ে প্রতিবেদনটি ধামাচাপার ব্যবস্থা করেন প্রকৌশলী শামীম আখতার।

গত বছর মোহাম্মদপুর থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শাহ কামালকে ৩ কোটি টাকাসহ আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সূত্র বলছে, কিংডম বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস থেকে আটক হন সাবেক ওই সচিব। কিংডম কনস্ট্রাকশন, কিংডম হাউজিং এবং কিংডম বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান শাহ কামাল। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুসরাত হোসেন। উভয়েই শামীম আখতার সিন্ডিকেটের সদস্য। এদের মধ্যে নুসরাত হোসেন মূলত গণপূর্তের সব রকম ঠিকাদারি কাজের ব্যবস্থাপনা, বণ্টন এবং কমিশন আদায় করতেন। গণপূর্তের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় শতকোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে নুসরতের কিংডম বিল্ডার্সের। গত চার বছরে এই কোম্পানি অন্তত ২০০ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করেছে।

লাখ টাকা বেতনে প্রকল্পের পরামর্শক, কর্মকর্তা-প্রকৌশলী থেকে বাবুর্চি-মালির মতো পদগুলোয় নিয়োগের ক্ষেত্রেও ছিল একই অবস্থা। শামীম আখতারের আরেক ঘনিষ্ট অনুসারী মোহাম্মদ ইয়ামীন। ক্যামিকন গ্রুপ নামে একটি কেমিক্যাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। এইচবিআরআইয়ের মহাপরিচালক থাকাকালে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা বেতনে ইয়ামীনকে স্যান্ড সিমেন্ট ব্লক তৈরির কাজে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন শামীম আখতার। কোনো টেন্ডার ছাড়াই আড়াই কোটি টাকার কাজ দেন ইয়ামীনকে। নিযুক্ত করেন গবেষণার কাজে। এইচবিআরআইয়ের টাকায় গবেষণা করে উৎপাদন করা কেমিক্যাল এইচবিআরআইয়ের কাছেই বিক্রি করেছেন ইয়ামীন। নিয়মবহির্ভূতভাবে ঠিকাদারি কাজ পাওয়া ছাড়াও রিসার্চ আর্কিটেক্ট, সিনিয়র ড্রাফটসম্যান, সহকারী মেকানিক, পেইন্টার, বাবুর্চি, মালিসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেয়েছেন শামীম আখতার অনুসারীরা। মোহাম্মদ শামীম আখতারের বিরুদ্ধে নিয়োগ- বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে এইচবিআরআই ও দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক চিঠিও দিয়েছেন এইচবিআরআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

জানা গেছে, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং গুলশানে তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে। বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণ করে উপহার দিয়েছেন শামীম আখতার। টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির কাজটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সকে দিয়ে করানো হয়।

শামীম আখতারের আরেক অনুসারী পাবনার সাজিন কনষ্ট্রাকশন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ঠিকাদার শাহাদত হোসেন। গত চার বছরে নিয়ম না মেনে এই প্রতিষ্ঠানকে অসংখ্য কাজ দিয়েছেন তিনি। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আলোচিত বালিশকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল এই প্রতিষ্ঠান। সিন্ডিকেট করে ইন্টেরিয়রের কাজ করে প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স। টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে এমন সব শর্ত আরোপ করা হয়, যাতে প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করতে না পারে।

প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চার বছর দায়িত্ব পালনকালে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি, পুনঃবদলি ও পদায়ন করেছেন শামীম আখতার। উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী-বাদ যায়নি কেউই। বদলি-পদায়ন স্বাভাবিক বিষয় হলেও গণপূর্তে এ নিয়ে চলেছে তুঘলকি কাণ্ড। আক্রোশের শিকার হয়েছেন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও সাবেক গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের আমলে তৈরি হওয়া একটি সিন্ডিকেটকে এখনো বহাল রেখেছেন শামীম আখতার। সর্বোচ্চ দরদাতাকে বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সালমান এফ রহমানের মনোনীত ব্যক্তিকে রমনা পার্কের ভেতরের চায়নিজ রেস্টুরেন্ট লিজ দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া শামীম আখতারের বিরুদ্ধে রয়েছে নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে উর্ধ্বতন পদে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, ফলাফল পাল্টে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে শামীম আখতারের আমলে।

এছাড়া বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কয়েকটি হত্যা মামলার আসামিও শামীম আখতারকে। তবে তিনি এখনো পুলিশের ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছেন।

 

সর্বশেষ  গুরুত্বপূর্ণ  সব  সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের  ফেসবুক পেইজে  লাইক  দিয়ে  অ্যাকটিভ  থাকুন।  ভিজিট করুন : http://www.etihad.news

* অনলাইন  নিউজ পোর্টাল  ইত্তেহাদ নিউজে  লিখতে  পারেন  আপনিও। লেখার বিষয়  ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন  [email protected] ঠিকানায় ।

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.