পিআর পদ্ধতি ইসলামের মূল নীতি-আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থি


শীর্ষনিউজ : জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বা ‘প্রপোরশনাল রিপ্রেজেনটেশন) পদ্ধতির ব্যবহার ইসলামের মূল নীতি-আদর্শের সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বা পরিপন্থি, বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইসলামী থিংকট্যাঙ্কের বিশেষজ্ঞরা। এর কারণ ইসলাম সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে না। ব্যক্তির গুণাগুণ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়। এবং এটাই ইসলামে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একমাত্র ক্রাইটেরিয়া হিসেবে নির্ধারিত আছে।
অথচ অবাক ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রভাবশালী কয়েকটি ইসলামী দল এই পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। যদিও এদের সবারই স্ব স্ব দলের ঘোষিত লক্ষ্য হিসেবে ‘ইসলামী রাষ্ট্র এবং সমাজ ব্যবস্থা কায়েম’ করার কথা বলা আছে। কিন্তু আলোচিত এই পিআর পদ্ধতি ইসলামের বা তাদের দলের মূল নীতি-আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, এ ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা নেই তাদের কাছে। পিআর পদ্ধতির সমর্থক একাধিক ইসলামপন্থি রাজনৈতিক নেতাকে এ বিষয়ে শীর্ষ নিউজ ডটকম’র পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হলে তারা অত্যন্ত বিব্রতকরভাবে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। এবং গণমাধ্যমে তাদের নাম উল্লেখ না করারও অনুরোধ জানান।
যতদূর জানা যায়, বাংলাদেশে পিআর ধারণাটির প্রথম আমদানিকারক কমিউনিস্ট পার্ট অব বাংলাদেশ (সিপিবি), যেটিকে সম্পূর্ণ ইসলাম বিরোধী এমনকি ধর্ম বিরোধী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এখন থেকে দেড় দশক আগে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ধর্ম বিরোধী এই প্রধান রাজনৈতিক দলটি তাদের প্রস্তাবে পিআর বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে। তবে তাদের ওই প্রস্তাব তখন ‘হালে পানি’ পায়নি। প্রথমত, দেশের রাজনীতিতে সিপিবির প্রভাব বা জনসমর্থন তেমন একটা নেই। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জন্য এটি একেবারেই নতুন। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে পিআর পদ্ধতিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু আছে। তবে তা বিচ্ছিন্নভাবে। একটি দেশের সঙ্গে অন্যটির মোটেই মিল নেই।
বস্তুত, পিআর পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট কোনো একক পদ্ধতি নয়। এই পদ্ধতির আরো নানাবিধ অসুবিধা রয়েছে। পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কী গতি হবে, এ ব্যাপারেও কোনো ফয়সালা নেই। এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হলে তৃণমূল থেকে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠা এবং সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়নের সুযোগও কমে যাবে। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অসততা এবং তেলবাজদের প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে যারা নৈতিক-অনৈতিক নানাভাবে খুশি করতে পারবে তারাই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। কালো টাকার বিনিময়ে জনপ্রতিনিধির টিকেট ক্রয়েরও সুযোগ তৈরি হবে। এতে জনসাধারণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্যই থাকবে না। তাছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের পিআর পদ্ধতির বিষয়ে কোনো ধারণাও নেই।
২০০৮ সালে সিপিবির প্রস্তাবিত এই পিআর পদ্ধতিটি নিয়ে তখন যেহেতু কোনো আলোচনা হয়নি তাই এটা তখনই চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্টের পরে অনেকটা হঠাৎ আলোচনায় আসে এ ইস্যুটি। জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস, চরমোনাইর ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল এই পদ্ধতির দাবি জানাতে থাকে। গত ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতের বি-টিম হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হওয়ার পর এই দলটিও একই দাবিতে সোচ্চার হয়। পাশাপাশি এনজিওগুলোও শুরু থেকে জোরালোভাবে একই সূরে কথা বলছে। যদিও এনজিওগুলোর নীতি-আদর্শের সঙ্গে ইসলামী দলগুলোর নীতি-আদর্শের মোটেই মিল নেই। তারপরও কেন এবং কীভাবে বিপরীতমুখী এই দুটি পক্ষের ‘বক্তব্য’ এক হয়ে গেলো তা অবশ্যই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে রহস্যজনক বলে আখ্যায়িত করছেন। বাংলাদেশের এসব এনজিও সাধারণতঃ ধর্ম বিরোধী হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে জামায়াত, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলন ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে নিজেদের দাবি করে থাকে। ইসলামী দলগুলোর মূল স্লোগান হলো- সৎ লোকের শাসন চাই। নির্বাচনের সময় সৎ ও যোগ্য লোককে ভোট দেয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি এরা আহ্বান জানায়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শও সৎ লোকের শাসন। কিন্তু জামায়াতসহ এই ইসলামপন্থি দলগুলো কেন এই মুহূর্তে হঠাৎ তাদের নীতি-আদর্শ থেকে সরে এলো- এট অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব তাদের কাছে নেই।
চরমোনাইর ইসলামী আন্দোলন শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রকে এ দলটি দীর্ঘকাল ধরেই সমর্থন দিয়ে এসেছে। বরিশালের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মার খেয়ে দাঁত হারানোর পর থেকে নির্বাচনে আর যাননি পীর ফজরুল করিম। সেই থেকে বিরোধীদলে থাকার ঘোষণা দেয় দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পর থেকে এই দলগুলোর মূল লক্ষ্য হলো, যে কোনো মূল্যে নির্বাচন এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে ঠেকিয়ে রাখা। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান সরকারের সুবিধাভোগী হলো জামায়াত-এনসিপি এবং এনজিওগুলো। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে এসব সুযোগ-সুবিধা তাদের হাত থেকে পুরোপুরিই হাতছাড়া হয়ে যাবে, এটা তারা ভালো করেই জানে। অন্যদিকে ‘যদি কিছু পাওয়া যায়’ এ চিন্তা থেকেই চরমোনাই এদের সঙ্গে একই সুরে মাঠে নেমেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দলগুলোর কোনো উদ্দেশ্যই আদতে পূরণ হবে না। নির্বাচন বয়কটের যে চিন্তা তারা করছেন তা হয়তো শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে। এবং সেই সম্ভাবনাই এখন প্রবল হয়ে দেখা দিচ্ছে।
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায় ।