নির্বাচিত সংবাদ

নতুন বাংলাদেশ: ভিন্ন মত-পথের দমন, মবের পালন?

26d55e85eca4609e13ecd4fd491576fb 68b27917d2a31
print news

ডয়চে ভেলে: মাজার ভেঙেছে অনেক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক৷ এবার ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক আলোচনাস্থলেও বিনা বাধায় চালানো হলো হামলা৷ হামলাকারীরা মুক্ত, অথচ হামলার শিকার ১৬ জন কারাগারে!

বৃহস্পতিবার ঢাকায় যারা মবের শিকার হয়ে পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলেন. পুলিশ তাদেরই আটক করে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। অন্যদিকে যারা মব তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা তো দূরের কথা এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ ১৬ জন সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টর্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘মঞ্চ ৭১’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে এক গোলটেবিল আলোচনায় গিয়ে মবের শিকার হন। তার ২০ ঘণ্টা পর আদালতের মাধ্যমে তাদের ঠাঁই হয় কারাগারে।

অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন ওই সংগঠনের প্রধান অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেয়ার কথা ড. কামাল হোসেনের। দুজনই ওই অনুষ্ঠানে শেষ পর্যন্ত যাননি।

হামলার শিকার ১৬ জনকে পুলিশ প্রথমে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তখন নিরাপত্তার জন্য নেয়ার কথা বলা হলেও রাতে তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়। এরপর শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাদের আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনকে যখন আদালতে তোলা হচ্ছিল, তার এক হাতে ছিল হাতকড়া আরেক হাতে বাংলাদেশের সংবিধান৷ সেই সংবিধান উঁচু করে ধরে তিনি বলছিলেন, ৩০ লাখ শহিদের বিনিময়ে, পাঁচ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এই সংবিধান। এই সংবিধান আমরা রক্ষা করবো। বাংলাদেশকে আমরা রক্ষা করবো। মুক্তিযুদ্ধ আমরা রক্ষা করবো।

সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না তার এক হাতের হাতকড়া তুলে দেখিয়ে বলেন, দেখেন, আপনারা দেখেন, এই হাত দিয়ে আমরা লিখি। মানুষ কী লিখবে? সাংবাদিকরা কী লিখবে? কার পক্ষে লিখবে সাংবাদিকরা? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বলি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলি।

কাছ থেকে কেউ একজন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেন, আপনাদের মনে হয় আমরা সন্ত্রাস করতে পারি? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলা- এগুলো সন্ত্রাস করা? দেশের সূর্য সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধ করে এদেশ স্বাধীন করেছেন। তাদের সঙ্গে থাকা সন্ত্রাস করা?

সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত সাবেক সাংসদ, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ ১৬ জনকে শুক্রবার সকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে হাজির করা হলে লতিফ সিদ্দিকী ছাড়া বাকি সবার পক্ষে জামিনের আবেদন জানানো হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করলে তাদের জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

লতিফ সিদ্দিকী ‘আদালতের প্রতি আস্থা নেই’ জানিয়ে এবং এ আদালতে তিনি বিচার পাবেন না- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে আইনজীবী নিয়োগ করেননি। তার আইনজীবী হতে ওকালতনামায় সই নেয়ার চেষ্টা করেন অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম সাইফ। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সই না করে জানান, আদালতের প্রতি তার কোনো আস্থা নেই৷ এ আদালতে তিনি বিচার পাবেন বলে মনে করেন না, এ কারণে তিনি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেবেন না। তখন আইনজীবী জানতে চান, তিনি নিজে আদালতে কোনো কথা বলতে চান কিনা৷ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, তিনি আদালতের কাছে কোনো বক্তব্যও দেবেন না।বক্তব্য না দিলেও আদালতে তিনি হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন।

১৬ জনকেই হাতকড়া, হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেটি পরিয়ে আদালতে নেয়া হয়। লতিফ সিদ্দিকী, শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও মঞ্জুরুল আলম পান্না ছাড়া অন্যরা হলেন আব্দুল্লাহ আল আমিন (৭৩), কাজী এটিএম আনিসুর রহমান (৭২), গোলাম মোস্তফা (৮১), মহিউল ইসলাম (৬৪), জাকির হোসেন (৭৪), তৌছিফুল বারী খান (৭২), আমির হোসেন সুমন (৩৭), আল আমিন (৪০), নাজমুল আহিসান (৩৫), সৈয়দ শাহেদ হাসান (৩৬), শফিকুল ইসলাম (৬৪), দেওয়ান মোহাম্মদ আলী (৫০) এবং আব্দুল্লাহীল কাইয়ুম (৬১)।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, ১৬ জনের মধ্যে দুজন পথচারী।

কেন, কার বিরুদ্ধে, কী অভিযোগ?

শাহবাগ থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, তারা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. শামসুদ্দোহা সুমন ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেন, তারা ইউনূস সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তারা যে সংগঠনের ব্যানারে কাজ করছেন মঞ্চ ৭১, ওই সংগঠনটি করাই হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে। এই কারণেই এই বছরের ৫ আগস্ট সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিল গত বছরের ৫ আগষ্ট।

তারা সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছেন তার কোনো প্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা হয়েছে। এখন তদন্ত করলে প্রমাণ পাওয়া যাবে। বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারেও একইরকম একটি ষড়যন্ত্র হয়েছে এর আগে। সে বিষয়ে মামলা ও আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। তার সঙ্গে এটার যোগসূত্র আছে।

অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমীন রাখি ডয়চে ভেলেকে বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হতে হলে আসামিদের প্রথমে একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হতে হবে। কিন্তু তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নাই। তারা কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য নয়। তাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন আইনের অধ্যাপক, একজন সাংবাদিক। তাদের কেউ কেউ জুলাই আন্দোলনে ছিলেন। তাদের ওপর মব করা হয়েছে। তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। কিন্তু মবকারীদের আটক না করে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে উল্টো যারা ভিকটিম তাদের আটক করে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো। এতে দেশে মব আরো বাড়বে। মানুষ আরো নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। এটা খুব খারাপ দৃষ্টান্ত হলো।

আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমীন রাখির অভিযোগ, আসামীদের আইনি সুবিধা দেয়া হয়নি। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি। তাদের ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটক রেখে শুক্রবার ছুটির দিন সকালেই আদালতে পাঠানো হয়েছে, যাতে তারা আইনি সহায়তা না নিতে পারেন।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালিদ মনসুর বলেন, তথ্য-প্রমাণ কী পাওয়া গেছে তা এখন বলা যাবে না। মামলার তদন্ত চলছে। আগামীকাল তাদের রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হবে।” যারা মব করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” না, কোনো মামলা হয়নি। এটা নিয়েও আমরা তদন্ত করছি। তদন্তের পরে দেখা যাবে।

বাংলাদেশে মব সন্ত্রাস ও তার বিকাশ

বৃহস্পতিবার ঢাকায় যখন এই মবের ঘটনা, তখন দিনাজপুরে ‘জীবন মহল’ নামে একটি বিনোদন পার্কে ‘অসামজিক কাজের’ অভিযোগে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ধারীরা। তারা আগুন দেয় একটি স্থাপনায়, দুইটি মাইক্রোবাস ও পাঁচটি মোটরসাইকেলও ভাঙচৃর করে। ওই ঘটনায় সংবাদকর্মীসহ ১২জন আহত হন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে সারাদেশের নানা স্থানে নানাভাবে নানা নামে চলছে মব ভায়োলেন্স। কখনো চলছে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে, কখনো ‘জুলাই যেদ্ধা’ বা অন্য কোনো নামে। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অনেক মাজার, স্থাপনা, ভাস্কর্য এই মব হামলার শিকার হয়। কিন্তু যারা হামলা চালায় তাদের প্রতিরোধ বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়নি।

গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব সুফি সংস্থা অভিযোগ করে, তার আগের ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮০টির বেশি মাজার শরিফ ও দরবার শরিফে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। তাপরও এই হামলা থামেনি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই- এই সাত মাসে সারাদেশে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির শিকার হয়ে ১০৩ জন মারা গেছেন। মব সন্ত্রাসের শিকার ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চ- ৫১ জন।

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার্স কারখানার ছয়তলা ভবনে লুটপাট করে আগুন লাগানো হয়৷ সেই ঘটনায় অন্তত ১৮২ জন নিখোঁজ বলে দাবি করেন স্বজনেরা। সরকারি তদন্তেও এ দাবির সত্যতা উঠে আসে। তবে এক বছর পার হলেও এখনো ১৮২ জনের কাউকেই উদ্ধারের কোনো তৎপরতা চালায়নি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের বেশ কিছু স্থানে মুক্তিযোদ্ধারাও হামলার শিকার হয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই ওরফে কানুকে জামায়াতে ইসলামীর দুই সদস্যের নেতৃত্বে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘুরানো হয়।

বিএনপি নেতা, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ২৫ আগস্ট অভিযোগ করেন বিদেশে অবস্থানরত দুই ইউটিউবার তাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে।

আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী। নিজের ও স্ত্রী–সন্তানের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, হে বাংলাদেশের মানুষ, আমি তো আজ থেকে ৫৪ বছর আগে আপনাদের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম। আজকে যে সন্তানেরা আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়, তোমাদের জন্য একটি স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করার জন্য আমি যুদ্ধ করেছিলাম। তোমাদের কাছ থেকে কি অপমৃত্যুটা আমার কাম্য?

ফজলুর রহমান আরো বলেন, যদি আমার কোনো কথায় তোমরা মনে করো, আমি দেশের বিরুদ্ধে কথা বলছি বা তোমাদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলছি, আমার বিরুদ্ধে মামলা করো, আমাকে গ্রেপ্তার করো, আমাকে শাস্তি দাও। কিন্তু আমাকে হত্যা করার জন্য আমার বাসা পর্যন্ত মব সৃষ্টি করো গিয়া, যেটা গত এক বছর যাবৎ বাংলাদেশে (চলছে), এই পৃথিবীতে এবং বাংলাদেশে সবচেয়ে কুখ্যাত নাম মব, সেই মব জাস্টিস আমার ওপর চলতে পারে কিনা এবং চলবে কিনা, সেটা আমি বাংলাদেশের মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করতে চাই।

এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে অবস্থিত ল রিপোর্টার্স ফোরামের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ স্ত্রী ও ছেলেকে পাশে রেখে ফজলুর রহমান আরো বলেন, বাংলাদেশের মানুষ, আপনারা জেনে রাখুন, আমার জীবন বড় শঙ্কায় আছে। আমি মুক্তিযুদ্ধ ভালোবাসি, দেশের মানুষকে ভালোবাসি।…আমি একজন মানুষ। আমার অধিকার আছে বেঁচে থাকার।

এর আগে ফজলুর রহমানের নামে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে বিএনপি। কিন্তু লিখিত জবাব দলের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি। তাই দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের সদস্যপদসহ সব পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে বিএনপি৷

এর আগে ১৬ আগস্ট প্রায় ৩০ জন সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিনেতা ও সাংবাদিককে ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ অপবাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের ছবিতে জুতা ছোঁড়ে কিছু লোক ।

গত এক বছরে দেশের নানা স্থানে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ভাস্কর্য ও স্থাপনার ওপর হামলা চালানো হয়েছে মব সৃষ্টি করে। এতে ধ্বংস হয় মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মারক৷ ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট শুধু মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সেই ভাঙা হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছয় শতাধিক ভাস্কর্য৷

এমন মবের হামলা থেকে রাজধানীও বাদ যায়নি৷ দু-দিন ধরে হামলা চালিয়ে ভাঙা হয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বার৷ দু মাস আগে, গত জুনেও রাজধানীতে ভাঙা হয় চারটি প্রাচীন স্থাপনা।

‘সরকার উগ্রপন্থাকে উসকে দিচ্ছে’

মানবাধিকার কর্মী নূর খান দেশের এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ ১৬ জনকে সন্ত্রাস দমন মামলায় কারাগারে প্রেরণ সম্পর্কে তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা নিয়ে আলোচনা কীভাবে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র হয় তা আমি বুঝতে পারছি না। সরকার এখন ছায়াকেও ভয় পেতে শুরু করেছে। সরকার ফ্যাসিজমকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

যারা মবের শিকার হলেন, তাদের পুলিশ রক্ষা না করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠালো আর যারা মব তৈরি করলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো না। সরকার উগ্রপন্থাকে উসকে দিচ্ছে। এখানে আইনের শাসন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, বলেন তিনি।

তিনি মনে করেন, সরকারের সদিচ্ছা নেই বলেই মব নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিজম পালিয়ে যায়, এখন দেখছি তা আবার নতুন রূপে ফিরে আসছে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে দেখেছি জাময়াতের দুইজন লোক কোনো রেষ্টুরেন্টে বসে চা খাচ্ছে, পুলিশ গিয়ে তাদের ধরে আনছে। অভিযোগ- তারা রাষ্ট্রের বিরুযদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। বৃহস্পতিবারও তাই দেখলাম। একই কাজ এরাও করছে। একটি আলোচনা সভা থেকে ধরে নেয়া হলো। অভিযোগ- তারা আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। তাহলে সেই মামলা করেন। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা কেন?

আমরা তো ভিডিওতে সব দেখেছি৷ পরিকল্পিত মব তৈরি করে তাদেরকে ঘেরাও করা হলো। হ্যান্ডমাইক দিয়ে চিৎকার করে আলোচনা পণ্ড করা হলো। ব্যানার ছিড়ে ফেলা হলো। হ্যান্ড মাইক দিয়ে একজনকে আক্রমণ করা হলো। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলো না। যারা আক্রান্ত হলেন, তাদের জেলে পাঠানো হলো সস্ত্রাস দমন আইনে। এটা কি সারা বিশ্বের মানুষ বিশ্বাস করবে? তারা হাসবে, বলেন তিনি।

তার কথা, এখানে আসলে আওয়ামী লীগ বিষয় নয়, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ঠেকানো বিষয় নয়। তাদের জনগণই ঠেকাবে। এখানে টার্গেট হলো ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ। সংগঠনটির নাম মঞ্চ ৭১ না হয়ে যদি মঞ্চ ৪৭ হতো, যদি কায়েদে আজমের গুণকীর্তন করা হতো, তাহলে সমস্যা হতো না।

মাসুদ কামাল আরো বলেন, ড. ইউনূস সাহেব দায়িত্ব নেয়ার পর বলেছিলেন, আপনারা আমাকে প্রাণ খুলে সমালোচনা করেন। এখন হালকার ওপর ঝাপসা সমালোচনাই সহ্য করতে পারছেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. আব্দুন নূর তুযার ডয়চে ভেলেকে বলেন, যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি অযৌক্তিক এবং যেভাবে ঘটেছে সেটি আরো অযৌক্তিক। বিচার, সাম্য এবং বৈষম্যহীনতার যে ধারণা, সেটি সম্পূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, ঘটনা যা তার বাইরে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায় না। তারা হামলার শিকার হলেন আর তাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মামলা হলো। কারাগারে পাঠানো হলো। যে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হলো তার তো কোনো ভিত্তি দেখছি না।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

 

সর্বশেষ  গুরুত্বপূর্ণ  সব  সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের  ফেসবুক পেইজে  লাইক  দিয়ে  অ্যাকটিভ  থাকুন।  ভিজিট করুন : http://www.etihad.news

অনলাইন  নিউজ পোর্টাল  ইত্তেহাদ নিউজে  লিখতে  পারেন  আপনিও। লেখার বিষয়  ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন  [email protected] ঠিকানায় ।

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.