গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে অধিকারের বিবৃতি


অনলাইন ডেস্ক : ৩০ অগাস্ট গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ’ (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দি প্রোটেকশন অফ অল পারসনস্ ফ্রম এনফোর্সড ডিসএপিয়ারেনস্) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তিকে সুরক্ষার জন্য এই কনভেনশন এমন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা অনুস্বাক্ষর করা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রতিটি রাষ্ট্রের কর্তব্য। কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৯ অগাস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সনদ অনুমোদন করে। অধিকার দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই সনদ অনুমোদনের জন্য সংগ্রাম করেছে।গুম বা এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কর্তৃত্ববাদী সরকার রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করেছে।
পতিত হাসিনা সরকারের শাসনামলে দেশে বেআইনি আটক কেন্দ্র বা গোপন বন্দিশালা গড়ে তোলা হয়। এই সব অবৈধ বন্দিশালায় বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং তথাকথিত “জঙ্গিদের” আটক করে রাখা হতো। আলোচিত গোপন বন্দিশালাগুলোর মধ্যে ছিল ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার এবং র্যাবের বন্দিশালা। এই বন্দিশালাগুলোতে যাঁরা হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতেন কিংবা ভারতের স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিতেন তাঁদেরই গুম করে নির্যাতন করা হতো। অনেক গুমের শিকার ব্যক্তি এখনও ফিরে আসেনি। যারা ফিরেছেন তাঁদের অনেক মিথ্যা মামলায় জড়িত করা হয়েছে, কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে এবং কেউ কেউ এখনো কনডেমড সেলে বন্দি আছেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রায় ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের পতনের পর গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে অভিযোগ দাখিল করতে শুরু করলে জনগণ এর ব্যাপকতা সম্পর্কে অবগত হয়। গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “তিন স্তরের পিরামিড”-এর মাধ্যমে গুম কার্যকর করা হতো এবং এর সর্বোচ্চ স্তরে ছিল “কৌশলগত নেতৃত্ব”— যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামী সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে পরিচালিত এক গোপন ও বেআইনি বন্দি বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমেও বহু গুমের শিকার ব্যক্তিকে ভারতে নিয়ে আটক রাখা হতো।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নতুন করে গুমের ঘটনা না ঘটলেও গুমের ঘটনাগুলো বিচার প্রক্রিয়া যেন ধীরভাবে চলছে। যদি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করা না হয় এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আবার গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ চালু হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাক। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের যে কার্যক্রম চলছে, যা “জুলাই সনদ” নামে পরিচিত, তা বাস্তবায়নের জন্য দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে এগিয়ে নেয়ার আহব্বান জানাচ্ছে অধিকার।
সরকারের কাছে অধিকারের দাবি:
১. সব গুমের ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে;
২. গুম অবস্থা থেকে ফেরত না আসা ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের জন্য নীতিমালা প্রণয়ণ করে একটি জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী বিষয়
৩. গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা বা সাজানো মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে;
৪. গুম অবস্থা থেকে ফেরত না আসা ব্যক্তিদের পরিবার যেন ভুক্তভোগীর ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও সম্পত্তি পরিচালনা করতে পারে সে জন্য Certificate of Absence প্রদান করা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিধান রাখতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;
৫. বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ণ করতে হবে;
৬. সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা সংশোধন করতে হবে;
৭. গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জড়িত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কে বিলুপ্ত করতে হবে;
৮. গুমের প্রমান ধ্বংসের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে;
৯. ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি বন্ধে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে; এবং
১০. আইসিপিপিইডি (ICPPED) বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান অনুযায়ী ফরেনসিক, আইনগত ও তদন্তে সক্ষমতা উন্নত করতে বাংলাদেশ সরকারের কারিগরি ব্যবস্থা উন্নত করা।
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায় ।