গাজায় টেকনোক্র্যাট প্রশাসন: শান্তি না কি নতুন আধিপত্য?

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিকল্পনার আওতায় ১৪ জানুয়ারি এই প্রশাসনিক কাঠামো চূড়ান্ত করা হয় বলে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী এক অন্তর্বর্তী সময়ে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য এই টেকনোক্র্যাট সরকার কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির নাজুক দ্বিতীয় ধাপ এগিয়ে নিতে এ পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই প্রশাসনিক কাঠামোর আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয়েছে “ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা”। এটি একটি অস্থায়ী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে, যার মূল লক্ষ্য দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের পর গাজায় স্থিতিশীলতা ফেরানো।
ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, টেকনোক্র্যাট সরকারটি একটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে “বোর্ড অব পিস”। বোর্ডটি গাজার প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি নিজেই এই বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং শিগগিরই অন্যান্য সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে।
গত অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাস নীতিগতভাবে এই কাঠামোর বিষয়ে সম্মতি দিলেও বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো রাজনৈতিক ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের পর থেকে অন্তত ৪৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০০ জনের বেশি শিশু। একই সময়ে তিনজন ইসরাইলি সেনাও নিহত হয়েছেন।
গাজা-মিসর সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় চালু করতে ইসরাইলের বিলম্ব, হামাসের অস্ত্র ত্যাগে অস্বীকৃতি এবং ইসরাইলি বন্দিদের মরদেহ সংক্রান্ত অমীমাংসিত ইস্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আলোচনার প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মাত্রা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মিসর, কাতার ও তুরস্ক হামাসের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মিসর, কাতার ও তুরস্কের যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, গাজার শাসন কমিটিতে ১৫ জন সদস্য থাকবেন। এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন আলি শাথ, যিনি পশ্চিমা সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী। তিনি পূর্বে শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি করেছেন এবং রাজনৈতিক দলনিরপেক্ষ একজন টেকনোক্র্যাট হিসেবেই পরিচিত।
তবে প্রস্তাবিত এই শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড বিদেশি বা ঔপনিবেশিক শাসনের রূপ নিতে পারে, যা ফিলিস্তিনিদের আত্মশাসনের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুস্পষ্ট কোনো কাঠামো না থাকাও সমালোচনার কারণ হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে ৬০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পুরো গাজা উপত্যকায় ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। একাধিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের তদন্তে এই অভিযানের চরিত্রকে গণহত্যার শামিল বলা হলেও ইসরাইল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে টেকনোক্র্যাট প্রশাসন কিছুটা শৃঙ্খলা আনতে পারলেও তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক স্বাধিকারকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিনিধিত্বের বিশ্বাসযোগ্য পথ নিশ্চিত না হলে এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায় ।



