জুলাই বিপ্লব পরবর্তী গণমাধ্যম: ত্রুটিবিচ্যুতি ভুলের মিছিল


সাইদুর রহমান রিমন :
(আমার নিজস্ব দুর্বল পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র বেরিয়ে এসেছে, আপনাদের অভিজ্ঞতায় হয়তো আরো নানা ত্রুটিবিচ্যুতি, ব্যর্থতার কাহিনী জানা রয়েছে। প্রয়োজনে যুক্ত করুন সে সব কথা, আমাদের সচেতনতা আরো বৃদ্ধি পাক)
জুলাই বিপ্লব বা অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের সাংবাদিকতা পেশায় যেভাবে নৈতিক বিচ্যুতি ও পেশাগত গাফিলতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ দায়িত্ব পালনের নানা ঘাটতি স্পষ্ট।
১. অতিমাত্রায় পক্ষপাতদুষ্টতা (Excessive Partisanship): বেশিরভাগ গণমাধ্যমই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মুখপত্রে পরিণত হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চেয়ে একপক্ষের প্রচার ও বিপক্ষের তীব্র সমালোচনা বা নিন্দা করাই এদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ পরিবেশনায় অতিমাত্রায় পক্ষপাতদুষ্টতা বেড়েছে। এমনকি সম্পাদকীয় স্তরেও নিরপেক্ষতার বদলে পক্ষ অবলম্বনের প্রবণতা বাড়ছে। এটি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
২. তথ্যের অভাব বা বিকৃতি (Inaccuracy or Distortion of Information): দ্রুত খবর প্রকাশের তাগিদ ও তথ্য যাচাই না করার প্রবণতা ভুল, অর্ধসত্য বা বিকৃত তথ্য প্রকাশের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সঠিক তথ্য অনুসন্ধানের চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক কিংবা টুইটার-এর তথ্যে ভর করে রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে, অথচ ফ্যাক্ট চেকিংয়ের বালাই নেই। এতে করে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে এবং বিভ্রান্তি বাড়ছে।
৩. সংবেদনশীলতা ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি (Sensationalism): রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ও নিজেদের ভিউ বাড়াতে খবরকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। গুজব ছড়ানো অথবা ঘটনার নাটকীয় ও অতি সংবেদনশীল উপস্থাপন চলছে যথেচ্ছা। সংবাদের ভাষা ও উপস্থাপনায় অতি নাটকীয়তা বস্তুনিষ্ঠতাকে গিলে খেয়েছে।
কিছু গণমাধ্যম জোরালো শব্দচয়ন করেও বিভ্রান্তিমূলক বার্তা দিচ্ছে—যেমন “দেশ রক্ষার যুদ্ধ”, “নেতাদের আত্মগোপন”, “জনগণের রায়” ইত্যাদি শব্দচয়নের মধ্যে নিজের অভিমতই চূড়ান্ত রায় আকারে প্রকাশ করছে, এতে নিরপেক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট। মূলত তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা সৃষ্টিই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
৪. ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কুৎসা (Personal Attacks and Defamation): যে কারো চরিত্র হনন করার জন্য বা ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার জন্য সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তথ্যের ভিত্তিতে সমালোচনা না করে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কুৎসা রটানো চলছে।
৫. শুধুই রাজনীতি নির্ভর সাংবাদিকতা (Only politically-based journalism): সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক (যেমন অর্থনীতি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, সামাজিক সমস্যা) প্রায়শই উপেক্ষিত হচ্ছে, কারণ পত্রিকার মূল মনোযোগ কেবলই রাজনৈতিক বাদানুবাদ, ক্ষমতার লড়াই ও দলগত প্রচারের উপর। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বড় বড় ঘটনার পেছনের বাস্তবতা খোঁজার চেষ্টা কমে গেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে যে-সব গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে বা হচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা কিংবা প্রভাব বিশ্লেষণ করার কাজও অনুপস্থিত।
৬. পেশাদারি নীতিমালার অভাব (Lack of Professional Ethics): হঠাৎ করে আসা স্বাধীনতাকে কীভাবে দায়িত্বশীলতার সাথে ব্যবহার করতে হয়, সেই বিষয়ে অভিজ্ঞতা বা সচেতনতার অভাবই বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। নির্দিষ্ট পেশাদারি নীতিমালার অনুপস্থিতিতে যা খুশি তাই প্রকাশের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
যা বলতে চাই
এসব ত্রুটিগুলো মূলত এই সময়ের চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, নতুন করে প্রাপ্ত স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক চাপের ফল। যদিও জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা হওয়ার কথা ছিল রাজনীতিসহ দেশের মৌলিক সংস্কার পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। অথচ গণমাধ্যমের ত্রুটিবিচ্যুতি, নৈতিকতাই উলটো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় বাকি সব ভেস্তে গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে গণমাধ্যমের উপর মানুষের আস্থা বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
দেশ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এমন সময় সাংবাদিকতা হওয়া উচিত সবচেয়ে দায়িত্বশীল, সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ। ভুলের ছায়া দূর করে আবারও গণমাধ্যমকে মানুষ যাতে নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দেখতে পারে—সেই প্রত্যাশাই থাকুক মনে প্রাণে।
লেখক: অনুসন্ধানী সাংবাদিক