ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সুযোগ পেলে তিনি ভবিষ্যতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। এমন এক সময়ে তিনি এই আগ্রহ প্রকাশ করলেন, যখন মোজতবা খামেনিকে ঘিরে ইরান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্টের ‘পড ফোর্স ওয়ান’ পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, এখন পর্যন্ত মোজতবা খামেনির সঙ্গে তার সরাসরি কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। তবে চলমান কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের জনগণের একটি বড় অংশ মোজতবা খামেনিকে সম্মানের চোখে দেখে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য সঠিক হলে নতুন ইরানি নেতা গুরুতর শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়ে থাকতে পারেন। মোজতবা খামেনিকে ঘিরে এই মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, তাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণার পর থেকে জনসমক্ষে তার উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। বিভিন্ন লিখিত বার্তা প্রচারিত হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সাম্প্রতিক ছবি, ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রকাশিত হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে শুরু হওয়া হামলার ঘটনা। সে সময় দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন বলে দাবি করা হয়। তবে সেই হামলা থেকে বেঁচে যান তার ছেলে মোজতবা খামেনি। পরবর্তীতে ৮ মার্চ তেহরান কর্তৃপক্ষ তাকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তিনি। তবে তার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং জনসমক্ষে অনুপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকা সাধারণত অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে মোজতবা খামেনিকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনাকে আরও জোরদার করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সাক্ষাতের আগ্রহ কেবল একটি কূটনৈতিক বার্তা নয়, বরং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়েও নতুন প্রশ্ন সামনে আনছে। তবে সম্ভাব্য কোনো বৈঠক কবে, কোথায় বা কোন প্রেক্ষাপটে হতে পারে—সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি। মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব, তার প্রকৃত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন আগামী মাসগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ইরানকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে কিছু মতভেদের কথা স্বীকার করেছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই মতপার্থক্য বৃহত্তর কৌশলগত ঐক্যের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। মঙ্গলবার রাতে ‘আমেরিকান ফ্রেন্ডস অফ লিকুদ’ গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এ মন্তব্য করেন সার। এ তথ্য প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথ। বৈঠকে সার জানান, গত বছরের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরান নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করেনি—যদিও এ বিষয়ে ট্রাম্প ভিন্ন দাবি করে আসছিলেন। ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে টানা হামলা চালায়। ওই হামলায় দেশটির কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীসহ শতাধিক মানুষ নিহত হন। সার বলেন, ইসরায়েল নতুন যুদ্ধ শুরু করতে চায়নি। তবে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি মাটির গভীরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, যা ভবিষ্যতে সামরিকভাবে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারত। এ কারণেই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, “আমরা দেখেছিলাম তারা কর্মসূচিটি এমন স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে, যেখানে পৌঁছানো কঠিন। তাই আমাদের সামনে কার্যকর বিকল্প খুব সীমিত ছিল।” তবে এই বক্তব্য ইসরায়েলি ও মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা হয়, ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হামলার জন্য চাপ দিয়েছিল। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আবারও ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পরে ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, যা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্প্রসারিত হয়। সার আরও বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন এই সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য ছিল না। তবে ইসরায়েল এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শাসন পরিবর্তনের দিকে যেতে পারে। তিনি স্বীকার করেন, এই ধরনের পরিবর্তন কেবল ইসরায়েলের একার পক্ষে সম্ভব নয় এবং শেষ পর্যন্ত তা নির্ভর করবে ইরানের জনগণের ওপর। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কোনো অংশ ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার সম্ভাবনাও নাকচ করেন সার। তার মতে, এমন পদক্ষেপ ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। সবশেষে, ট্রাম্পের সঙ্গে মতপার্থক্যের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও সার বলেন, “সামগ্রিকভাবে আমাদের লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন।”
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য অস্থিরতা বাড়তে থাকায় সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প স্থল ও পাইপলাইনভিত্তিক বাণিজ্য করিডোর গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরাকের বহুল আলোচিত ২৪ বিলিয়ন ডলারের ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’ প্রকল্পকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরাকের ডেভেলপমেন্ট রোড: নতুন ভূরাজনৈতিক করিডোর মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুম বলছেন, পরিকল্পনাটি ইরাকের গ্র্যান্ড ফাও বন্দর থেকে শুরু হয়ে তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পরিবহন করিডোর তৈরির দিকে এগোচ্ছে। তার মতে, “যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা।” এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বসরা অঞ্চলের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহন বৃদ্ধি পাবে এবং ইরান-নিয়ন্ত্রিত জলপথ এড়িয়ে বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইরাকের ওপর তেহরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাবও হ্রাস পেতে পারে। উপসাগরজুড়ে বিকল্প অবকাঠামোর বিস্তার ইরাকের বাইরে পুরো অঞ্চলে জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি করতে একাধিক বড় প্রকল্প এগোচ্ছে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পেট্রোলাইন বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল পরিবহন সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং এর সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডিসিওপি পাইপলাইনও পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দ্বিতীয় একটি লাইন চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তুরস্কের জাঙ্গেজুর ও তথাকথিত মিডল করিডোর প্রকল্পও ইরানকে পাশ কাটিয়ে ককেশাস অঞ্চলের মাধ্যমে ইউরোপমুখী নতুন বাণিজ্য পথ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রকল্প পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। হরমুজ: এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র নয় বিশ্লেষক সেলুমের মতে, হরমুজ প্রণালি এখনো বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে আর একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তার ভাষায়, চলমান সংঘাত ও আঞ্চলিক ঝুঁকির কারণে “এই পরিবর্তন স্থায়ী হতে পারে” এবং জ্বালানি রুটের বৈচিত্র্য আরও বাড়বে। ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক উত্তেজনা এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে কঠোর বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের তেল অবকাঠামো বা স্থাপনায় হামলা হলে, সেই হামলাকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব ইসফাহানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, কোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব “সমপরিমাণ নয়, বরং চারগুণ” আকারে দেওয়া হবে। তার ভাষায়, “যদি আমাদের একটি তেল শোধনাগারে হামলা হয়, আমরা চারটি শোধনাগারে হামলা চালাব।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য ও অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত এই উত্তেজনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির কারণে দেশটির জ্বালানি সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ট্রাম্প আরও বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে ইরানের তেল পরিবহন ব্যবস্থা কয়েক দিনের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তার এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের রাজনৈতিক মহল থেকে পাল্টা বক্তব্য আসে, যেখানে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলার সক্ষমতার কথা তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক বার্তা ও বাজারের চাপ ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্স-এ এক পোস্টে জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নিয়ে একটি প্রতীকী সমীকরণ তুলে ধরেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, হরমুজ, বাব এল-মান্দেব ও বিভিন্ন পাইপলাইনকে কাজে লাগিয়ে ইরান বিশ্ববাজারে চাপ তৈরি করতে সক্ষম। তিনি সতর্ক করে বলেন, আসন্ন গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে জ্বালানি চাহিদা বাড়বে এবং তখন হরমুজে অস্থিরতা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর রাজনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্য হরমুজ সংকট ঘিরে এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডোর গড়ে ওঠার চেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা—দুই প্রবণতা একসঙ্গে এগোচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছর এই অঞ্চল শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য মানচিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব এতদিন সৌদি আরবের হাতে থাকলেও কখনো কখনো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। তবে সারা বিশ^কে অবাক করে দিয়ে উপসাগরীয় এলাকায় নতুন বস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান। পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছে ইসলামি দেশটির সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ নেতারা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে ইরান। জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালীতে কর্তৃত্ব ধরে রেখে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে ইসলামিক দেশটি, তেল-গ্যাসের সংকটে ইরানের কাছে নতজানু তাবৎ দুনিয়া। ন্যাটো এবং ইউরোপীয় বন্ধুদেশগুলোর সমর্থন না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র একা হয়ে পড়েছে রণাঙ্গনে, দখলদার ইসরায়েলের প্ররোচনোয় ইরান আক্রমণ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারিয়ে এখন একেকবার একেক কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা করে পাকিস্তান পক্ষ-প্রতিপক্ষ সব রাষ্ট্রের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ক’টনৈতিক চাপ, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কঠিন প্রতিরোধ আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয়েছে গণহত্যায় অভিযুক্ত ইসরায়েল। আর হরমুজ প্রণালীতে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নেতৃত্বে এখন ইরান। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে কারিগরি আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল সোমবার বা মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় বসার কথা। সূত্রগুলো বলছে, দুই পক্ষের কারিগরি দল ইসলামাবাদে মিলিত হবে। তাদের লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সপ্তাহব্যাপী চলা সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান চূড়ান্ত করা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তারা একবার চুক্তির খসড়া তৈরি করে ফেললে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধান চুক্তি সই করতে ইসলামাবাদে উড়ে আসবেন। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের পাশাপাশি আঞ্চলিক আরও কয়েকটি দেশের নেতারাও এই চুক্তি সই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। সূত্রগুলো আরও জানায়, ১১-১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে প্রথম দফার বৈঠকের পর থেকেই বিবদমান দুই পক্ষ ইসলামাবাদের মাধ্যমে একে অপরের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার আগেই তারা একটি ‘সর্বোচ্চ বোঝাপড়ায়’ পৌঁছাতে চাইছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী ইরানের হাতে কাগজে-কলমে বিশ্বেরর জ্বালানির ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হওয়ার তথ্য থাকলেও বাস্তবে এই প্রণালীর গুরুত্ব আরো বেশি। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত, ইরাক ছাড়াও ইরানের নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানি হয় এই পথ দিয়ে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশগুলো থেকে সার রপ্তানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ইরান থেকে অঘোষিতভাবে জ্বালানি এই পথ ধরে যায় চীনসহ অনেক গন্তব্যে। এই হরমুজ প্রণালী কর্তৃত্ব পুরো ইরানের হাতে। ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে হরমুজ অবরোধ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের আশপাশে ১৫টি যুদ্ধ জাহাজ এবং তিনটি বৃহৎ বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে। তারপরও ইরানের আধিপত্য ভাঙতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ইরান তার ইচ্ছামতো একবার হরমুজ খুলছে, একবার বন্ধ করছে। ইরানে মার্কিন হামলার শুরু পরেই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। বিপাকে পড়ে মার্কিন মিত্র সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাক। এসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে আটকে পড়ে বহু দেশের জাহাজ ও নাবিকরা। যুদ্ধের সময় এসব নাবিক ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারানোর শঙ্কায় ছিল। এইসব গুলো দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটির হাজার হাজার সেনাও মহাবিপদে পড়ে। অনেক হুমকি দিয়েও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী চালু করতে পারেনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রই হরমুজ অবরোধ করে বসে। এর মধ্যেই কিছু জাহাজ এই প্রণালী পার হয়। লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পরপরই হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান। তারপরও মার্কিন অবরোধ বন্ধ না হওয়ায় পরে শনিবার আবার এই প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও সেসবে অবস্থানকারী নাবিকরা আবারো বিপদে পড়লো, মধ্যপ্রাচ্যের ৭টি দেশে অবস্থানকারী ৫০ হাজার মার্কিন সেনাও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকটের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়। একটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। দুটি গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, গানবোটগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ‘সম্পৃক্ত’। অর্থাৎ হরমুজের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে। এই শনিবারই ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকায় ক্ষুব্ধ তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘আগের অবস্থায়’ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইরানের এ ঘোষণায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ এক বিবৃতিতে মার্কিন এ অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ কারণেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এখন থেকে এই কৌশলগত নৌপথটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হলেও হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ইরান। ছোট নৌযান ও দ্রুতগামী বোট ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে চাপে রাখছে তেহরান। উপকূলের গোপন কোনো স্থান বা এসব নৌকা থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে আইআরজিসি। এগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্রণালীর কোথাও কোথাও ইরান মাইন পুঁতে রেখেছে বলে খবর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো। জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এজেন্সি জানায়, যুদ্ধ চলাকালীন অন্তত ২০টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছিল। গার্ডস নৌবাহিনী এই হামলাগুলোর দায় খুব কমই স্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলাগুলো সম্ভবত স্থলভাগ থেকে ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে ছোড়া ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল, যা শনাক্ত করা কঠিন। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, বোটগুলো প্রায়শই এতটাই ছোট যে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায় না এবং এগুলো পাথুরে উপকূল বরাবর খনন করা গভীর গুহার ভেতরের জেটিতে নোঙর করা থাকে। এগুলো মিনিটের মধ্যে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তাদের অস্ত্রশস্ত্র উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য একটি বড় হুমকি। ইরান আক্রমণকারী নৌকার জন্য কমপক্ষে ১০টি অত্যন্ত গোপন ও সুরক্ষিত ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। শীর্ষ সব নেতাদের হারানোর পরও আজ ইরান এক আত্মবিশ্বাসী দেশ, সব হারানোর প্রস্তুতি নিয়ে দেশটি মার্কিন আধিপত্য ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসতেও ইরান এখনো রাজি হয়নি। বিশ্বের পরাক্রমশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তারা বলছে, শর্তের পর শর্ত দিয়ে কোনো আলোচনা সফল হবে না, শুধুই সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশি কথা বলেন বলে অভিযোগ করে ইরান জানিয়েছে, অন্তত সাত বার তিনি মিথ্যা বলেছেন। সারা বিশে^র নজর এখন পাকিস্তানের দিকে ইরান সভ্যতা ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েও ৮ এপ্রিল ইরানের ওপর পূর্বঘোষিত বড় ধরনের ‘বোমাবর্ষণ ও হামলা’ অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে রাজি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য তিনি স্থগিতে রাজি হন। ট্রাম্পের এই নাটকীয় ঘোষণার পেছনে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতা বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবশ্য যুদ্ধবিরতির তিন দিনের মাথায় ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কোনও সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। ২১ ঘণ্টা ধরে চলা প্রথম দফার আলোচনায় কোনো সাফল্য না এলেও দুপক্ষের মধ্যে অনেকটা অস্বস্তি কেটেছে। পাকিস্তান প্রবল প্রচেষ্টা চালানোর কারণেই আবারও নতুন বৈঠক হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদে। একদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সফর করেন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে। আর দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির ছুটে যান ইরানে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারসহ পাকিস্তানের সামরিক- বেসামরিক প্রশাসনের আপ্রাণ চেষ্টার ফলেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি বৈঠক হতে যাচ্ছে। প্রথম দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান আলী আকবর আহমাদিয়ান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুল নাসের হেমমাতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। দ্বিতীয় দফা আলোচনার মধ্য দিয়ে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা করতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ঝটিকা সফরে যান সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্কে। ইরানে গিয়ে আসিম মুনিরও অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন দ্বিতীয় দফার আলোচনা। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে গত ১১ এপ্রিল শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আসা ইরানি কূটনীতিক দলকে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী নিরাপত্তা পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দিয়েছিল। সেদিন ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়া মার্কিন কূটনীতিক দল একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলন শেষে দ্রুত ইসলামাবাদ ছাড়ে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যর্থ আলোচনার পর ইরানের কূটনীতিকদের আশঙ্কা ছিল, দেশে ফেরার পথে ইসরায়েল তাদের হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। এরপর পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর একটি বড় বহর ইরানি কূটনীতিকদের বহন করা উড়োজাহাজটিকে পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুদের না পেলেও ইরানের পাশে ছিলো চীন-রাশিয়া ইরান গোপনে একটি চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট সংগ্রহ করেছে। এটি সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে শক্তিশালী সক্ষমতা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক অনুসন্ধানে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাত দিয়ে এফটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, টিইই-০১বি নামের এই স্যাটেলাইট ২০২৪ সালের শেষের দিকে চীন থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। সময়, স্থানাঙ্ক তালিকা, স্যাটেলাইট চিত্র ও কক্ষপথ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, ইরানি সামরিক কমান্ডাররা পরবর্তী সময়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারি করতে এই স্যাটেলাইট কাজে লাগিয়েছিলেন। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে ওই সব জায়গার ছবি তোলা হয়েছিল। সিআইএর চীনবিষয়ক সাবেক প্রধান ডেনিস ওয়াইল্ডার বলেন, চীন ঐতিহাসিকভাবেই ইরানকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করে আসছে। বর্তমানে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানকে চীনের দেওয়া অন্যান্য সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা, যেমন কাঁধে রেখে চালানো যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও উদ্বিগ্ন। কাঁধে রেখে চালানো যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সম্প্রতি একটি মার্কিন এফ-১৬ বিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো চীনা কোম্পানি এভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পারে না। চীন ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। তবে নিজেদের সম্পৃক্ততা লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। আবার রাশিয়া নিয়মিতভাবেই ইরানে ড্রোন সরবরাহ করছে বলে খবর রয়েছে, যেমনটা রাশিয়ার ইউক্রেন হামলায় ইরান বিপুল সংখ্যাক শাহেদ ড্রোন পাঠিয়ে গেছে কয়েক বছর। সেই শাহেদ ড্রোনের আরো উন্নত সংস্করণ রাশিয়া এখন ইরানকে দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, মার্কিন চাপেও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ইরান যুদ্ধে সামিল হয়নি, যেমনটা তারা যুক্ত হয়েছিল ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমনে। অথচ ইউরোপে মাত্র ছয় সপ্তাহের জেট জ্বালানি মজুত আছে। স্পেন তো সরাসরি ইরানে মার্কিন হামলার বিরোধীতা করেছে। ইতালি ইসরায়েলের সঙ্গে করা সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করেছে। যুক্তরাজ্য থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র পরিবহন করার সময় একটি ফ্লাইট আটকে দিয়েছে বেলজিয়াম। জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া যুদ্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছে, যারা বহু বছর ধরে মার্কিন সেনা ও অস্ত্রে সুরক্ষিত হয়ে আসছে। যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছিলেন এবং অন্যদিকে দাবি করছিলেন, তেহরান নিজেই বাঁচার জন্য শান্তিচুক্তি ভিক্ষা চাচ্ছে। কিন্তু পর্দার আড়ালের হোয়াইট হাউসই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের ওপর চাপ দিচ্ছিল, যাতে তারা ইরানকে বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর ব্যবস্থা করে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ এবং প্রতিবেশী হওয়ার কারণে ওয়াশিংটন মনে করেছিল, তাদের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠালে ইরান সেটা সহজে মেনে নেবে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এই গোপন তৎপরতা চালান। যার ফলে ৮ এপ্রিল রাতে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। আসলে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এ ছাড়া ইরান যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তা-ও তাঁকে অবাক করে দিয়েছিল। ২১ মার্চ থেকেই ট্রাম্প মনে মনে যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন। আরো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘আমি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে চমৎকার আলোচনা করেছি। তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।’ এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ‘স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচেষ্টার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান লেবাননের প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও; আর ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ঘোষণা দিয়েছেন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম মুসাবি। লেবাননে নির্বিচার মানুষ হত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল। এখন পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে বহু জনপদ, হাজার হাজার ভবন। ইসরায়েল একাধারে জল-স্থল ও আকাশ থেকে আক্রমন চালিয়ে মেরে ফেলেছে দুই হাজারের বেশি মানুষ। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি নারী ও শিশুরাও। ইসরায়েলের আক্রমণে প্রাণ গেছে লেবানিজ সেনাসদস্য, এমনকি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদেরও। ইন্দোনেশিয়ার শান্তিরক্ষীরা মারা গেছে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের মধ্যে আর গত শনিবার যুদ্ধবিরতি মাঝে ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ফ্রান্সের একজন শান্তিরক্ষী। এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই প্রতিরোধ চালাচ্ছে ইরানপন্থি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তারা লেবানন দখলকারী সেনাদের ওপর যেমন হামলা চালাচ্ছে, তেমনি রকেট ছুড়ছে ইসরায়েলের ভূখন্ডেও। ট্রাম্প লেবানন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর লেবানিজরা তাদের বাড়ি-ঘরে ফিরতে শুরু করে সেদিনই। ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতেই তারা ফিরছে, কারণ সেটাই তাদের দেশ, জন্মভূমি। এমনকি লেবাননের সেনাবাহিনীর সতর্ক বার্তাও তাদের থামাতে পারেনি। লেবানন দখলকারী ইসরায়েলকে যেমন গুনায় ধরছে লেবানিজরা, তেমনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল- লেবানন যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলকে ডাকা হয়নি। দুটিই ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যে কারণে দেশের ভেতরেই রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। আঞ্চলিক নেতৃত্বের পরিবর্তন? বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট: ইরান সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে সীমাবদ্ধতা অনুভব করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান নতুন কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে রেখে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ পৌঁছেছে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতে তারা সেখানে পৌঁছায় বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং কয়েকজন আইনপ্রণেতা। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিতে ইতিমধ্যে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার আলোচনায় অংশ নেবেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির আপডেট জানতে চোখ রাখুন আমাদের সঙ্গে।
ইরানে আগ্রাসন শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত ফলাফল—প্রথম দিনেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যা করা গেলে সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে এবং সরকার পতনের পথ সুগম হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই হিসাব মেলেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অব্যাহত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরও ইরানের শাসন ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে টিকে আছে। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় একপর্যায়ে স্থল হামলার চিন্তা করা হলেও, মার্কিন সেনাদের পক্ষে তা সম্ভব নয়—এমন উপলব্ধি থেকে নতুন কৌশল হিসেবে ইরানের সীমান্তবর্তী ইরাকের কুর্দি যোদ্ধাদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার দাবি করতে থাকেন যে, কুর্দিরা ইরানে আক্রমণ চালিয়ে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের মুখ দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র—যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই এই ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সমর্থনেও ভাটা পড়েছে। এর মধ্যেই ইরাকের কুর্দি বাহিনী পেশমারগার শীর্ষ কর্মকর্তা সিরওয়ান বারজানি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় অংশ নেবেন না। তিনি বলেন, হামলা শুরুর পর থেকে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল প্রায় ৪৩০টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। উত্তর ইরাকে আইএসবিরোধী ফ্রন্টলাইনের দায়িত্বে থাকা বারজানি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা তো তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করিনি। আমরা প্রতিবেশী। আমাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও ঐতিহাসিক বন্ধন রয়েছে—তাহলে কেন প্রতিদিন আমাদের ঘাঁটিতে হামলা চালানো হচ্ছে?” একই দিনে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পেশমারগা বাহিনীর ৬ সদস্য নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন। এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ হিসেবে আখ্যা দেন বারজানি। বিশ্লেষকরা বলছেন, কুর্দিদের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনায় বড় ধরনের ধাক্কা। এতে করে ইরানের বিরুদ্ধে বহুমুখী চাপ সৃষ্টির যে পরিকল্পনা ছিল, তা এখন অনেকটাই ভেঙে পড়ার মুখে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছে।
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী ঘিরে আবারও তীব্র হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। ইরানের সামরিক বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সরাসরি সতর্ক করে দিয়েছে—তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যদি ইরানের নিয়ন্ত্রিত দ্বীপগুলোর বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণ চালানো হয়, তাহলে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। এই হুঁশিয়ারি শুধু দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার ইঙ্গিতই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে, যার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। কী ঘটেছে? ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে অবস্থিত আবু মুসা এবং গ্রেটার তুনব দ্বীপের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আগ্রাসন হলে তা সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী: সংযুক্ত আরব আমিরাত যদি তাদের ভূখণ্ড থেকে এই দ্বীপগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানোর অনুমতি দেয়, তাহলে ইরান পাল্টা হামলা চালাবে। এই হুঁশিয়ারিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে রাস আল খাইমাহ অঞ্চলের কথা, যা আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বিতর্কিত দ্বীপ: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? আবু মুসা ও গ্রেটার তুনব—এই দুটি দ্বীপ দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্র। মূল তথ্য: বর্তমানে দ্বীপগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে আমিরাত এগুলোর মালিকানা দাবি করে অবস্থান: হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখ এই দ্বীপগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ: 👉 বিশ্বের প্রায় ২০% তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয় 👉 আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট 👉 সামরিক নিয়ন্ত্রণ মানে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার আঞ্চলিক যুদ্ধ: উত্তেজনার পেছনের বড় কারণ এই উত্তেজনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটেছে বলে দাবি করছে তেহরান। ইরানের অভিযোগ: উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিচ্ছে মার্কিন বাহিনী সেখান থেকে হামলা চালাচ্ছে এসব দেশের ভেতরে “মার্কিন স্বার্থ” লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে ইরান ইতোমধ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বলে দাবি করছে। হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়—এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। কেন গুরুত্বপূর্ণ? প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার জ্বালানি নির্ভরতা বিকল্প রুট প্রায় নেই বললেই চলে যদি এই রুটে বিঘ্ন ঘটে: তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগতে পারে সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে তেল বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনা যদি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়বে জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল। আমিরাতের অবস্থান: দ্বিধায় কূটনীতি সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন একটি জটিল অবস্থানে রয়েছে। একদিকে: তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ অন্যদিকে: ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগ্রহী এই পরিস্থিতিতে আমিরাতের যেকোনো সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। সামরিক ভারসাম্য: কার হাতে কত শক্তি? ইরান: শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ড্রোন যুদ্ধ সক্ষমতা আঞ্চলিক মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক আমিরাত: আধুনিক পশ্চিমা অস্ত্র উন্নত বিমান বাহিনী আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা তবে সরাসরি সংঘাতে ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা বেশি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষণ: কেন এখন এই হুঁশিয়ারি? বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই বার্তা তিনটি উদ্দেশ্যে দেওয়া: ভয় প্রদর্শন (Deterrence) আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করা মার্কিন প্রভাব কমানো এটি মূলত একটি কৌশলগত বার্তা—যুদ্ধের আগেই প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা। সামনে কী হতে পারে? বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট: ১. সীমিত সংঘাত ছোট আকারের হামলা ও পাল্টা হামলা ২. কূটনৈতিক সমাধান আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় উত্তেজনা প্রশমিত ৩. বৃহত্তর যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্তেজনা কেবল দুই দেশের বিরোধ নয়—এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে—এই উত্তেজনা কি কূটনীতির মাধ্যমে থামবে, নাকি নতুন এক সংঘাতের সূচনা করবে?
সৌদি আরবের দুটি তেল পরিশোধনাগারে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদ। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রিয়াদে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান। এ সময় তিনি জানান তাদের দুটি তেল পরিশোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইরান। তিনি ইরানের এই হামলাকে ‘ভুল হিসাব’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ইরানকে নিজেদের হিসাব করতে হবে। কারণ এসব হামলায় তাদের কোনো উপকারই হবে না। ইরানে হামলা চালানোর হুমকি সৌদি আরবের ইরান গত কয়েকদিন ধরে সৌদি আরবে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে বুধবার দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তেহরান। এমন পরিস্থিতিতে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদ বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাতে রিয়াদে সাংবাদিকদের বলেছেন, “ইরান তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলোচনাকে বিশ্বাস করে না। এর বদলে তারা প্রতিবেশীদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে। কিন্তু এসব চাপ কাজে দেবে না।” “সৌদি আরব চাপের কাছে হার মানবে না। এমনকি এসব চাপ হিতে বিপরীরতও হতে পারে… রাজনৈতিকভাবে, আমি বিশ্বাস করি নৈতিকভাবে এবং নিশ্চিতভাবে আমরা যেটি আগেও বলেছি, সামরিকভাবে। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আমাদের আছে।” এদিকে রাজধানী রিয়াদে একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখান থেকে বের হয়েই তিনি এমন হুমকি দিয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত হওয়ার আগে, এই অঞ্চলটি ব্রিটিশ সুরক্ষার সাথে ট্রাসিয়াল স্টেটস নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালে, ছয়টি আমিরাত নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠিত হয়, যার মধ্যে রাস আল খাইমা ১৯৭২ সালে পরে যোগদান করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বাধীনতার মাত্র কয়েকদিন আগে ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ইরান গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। ১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত হিসেবে পুনর্গঠনের আগে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ট্রুসিয়াল স্টেটস নামে পরিচিত করা হত, যা হরমুজ প্রণালী থেকে পশ্চিমে পারস্য উপসাগর বরাবর বিস্তৃত শেখ রাজ্যের একটি সমষ্টি ছিল। এটি কোনও দেশ ছিল না, বরং প্রায় ৩২,০০০ বর্গমাইল (৮৩,০০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিথিলভাবে সংজ্ঞায়িত উপজাতি গোষ্ঠীর একটি বিস্তৃত অঞ্চল ছিল, যা মেইন রাজ্যের আকারের সমান। আমিরাতের আগে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলটি স্থানীয় আমিরদের মধ্যে স্থলভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জর্জরিত ছিল, যখন জলদস্যুরা সমুদ্রে অভিযান চালাত এবং রাজ্যের তীরগুলিকে তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করত। ভারতের সাথে বাণিজ্য রক্ষার জন্য ব্রিটেন জলদস্যুদের উপর আক্রমণ শুরু করে । এর ফলে চুক্তিবদ্ধ রাজ্যের আমিরদের সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৮২০ সালে ব্রিটেন একচেটিয়াতার বিনিময়ে সুরক্ষা প্রদানের প্রস্তাব দেওয়ার পর এই সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়: ব্রিটেনের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করে আমিররা কোনও শক্তির কাছে কোনও জমি ছেড়ে না দেওয়ার বা ব্রিটেন ছাড়া অন্য কারও সাথে কোনও চুক্তি না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরবর্তী বিরোধ নিষ্পত্তি করতেও সম্মত হয়। অধীনস্থ সম্পর্কটি ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দেড় শতাব্দী স্থায়ী ছিল। ব্রিটেন হাল ছেড়ে দেয় ততক্ষণে, ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালে ব্রিটেন বাহরাইন , কাতার এবং সাতটি আমিরাত নিয়ে গঠিত ট্রাসিয়াল রাজ্যগুলিকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটেনের মূল লক্ষ্য ছিল নয়টি সত্তাকে একত্রিত করে একটি ঐক্যবদ্ধ ফেডারেশনে পরিণত করা। বাহরাইন এবং কাতার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, নিজেদের স্বাধীনতাকেই প্রাধান্য দেয়। একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, আমিরাত যৌথ উদ্যোগে সম্মত হয়, যদিও এটি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল: আরব বিশ্ব তখন পর্যন্ত কখনও বিভিন্ন ধরণের আমিরদের একটি সফল ফেডারেশনের কথা জানত না, এমনকি বালুকাময় ভূদৃশ্যকে সমৃদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট অহংকার সহ ঝগড়া-প্রবণ আমিরদের কথা তো দূরের কথা। স্বাধীনতা: ২রা ডিসেম্বর, ১৯৭১ ফেডারেশনে যোগদানের জন্য সম্মত হওয়া ছয়টি আমিরাত হল আবুধাবি, দুবাই , আজমান, আল ফুজাইরাহ, শারজাহ এবং কুয়েন। ১৯৭১ সালের ২রা ডিসেম্বর, ছয়টি আমিরাত ব্রিটেন থেকে তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং নিজেদেরকে সংযুক্ত আরব আমিরাত বলে অভিহিত করে। (রাস আল খাইমাহ প্রথমে অস্বীকৃতি জানায়, কিন্তু অবশেষে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেশনে যোগ দেয়)। সাতটি আমিরাতের মধ্যে সবচেয়ে ধনী আবুধাবির আমির শেখ জায়েদ বিন সুলতান ছিলেন ইউনিয়নের প্রথম সভাপতি, তার পরে ছিলেন দ্বিতীয় ধনী আমিরাত দুবাইয়ের শেখ রশিদ বিন সাঈদ। আবুধাবি এবং দুবাইতে তেলের মজুদ রয়েছে। বাকি আমিরাতগুলিতে তেলের মজুদ নেই। ইউনিয়ন ব্রিটেনের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং নিজেদেরকে আরব জাতির অংশ ঘোষণা করে। এটি কোনওভাবেই গণতান্ত্রিক ছিল না এবং আমিরাতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থামেনি। ইউনিয়নটি ১৫ সদস্যের একটি কাউন্সিল দ্বারা শাসিত হত, যা পরবর্তীতে সাতটিতে নামিয়ে আনা হয় - অনির্বাচিত আমিরদের প্রত্যেকের জন্য একটি করে আসন। ৪০ আসনের আইনসভার ফেডারেল জাতীয় কাউন্সিলের অর্ধেক সাত আমির দ্বারা নিযুক্ত হন; ২০ জন সদস্য ৬,৬৮৯ জন আমিরতি দ্বারা ২ বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন, যার মধ্যে ১,১৮৯ জন মহিলাও রয়েছেন, যাদের সকলেই সাতজন আমির দ্বারা নিযুক্ত হন। আমিরাতে কোনও অবাধ নির্বাচন বা রাজনৈতিক দল নেই। ইরানের পাওয়ার প্লে আমিরাত তাদের স্বাধীনতা ঘোষণার দুই দিন আগে, ইরানি সৈন্যরা পারস্য উপসাগরের আবু মুসা দ্বীপে এবং পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথে হরমুজ প্রণালীর উপর আধিপত্য বিস্তারকারী দুটি তুম্ব দ্বীপে অবতরণ করে। এই দ্বীপপুঞ্জগুলি রাস আল খাইমাহ আমিরাতের অন্তর্গত ছিল। ইরানের শাহ যুক্তি দিয়েছিলেন যে ব্রিটেন ১৫০ বছর আগে অন্যায়ভাবে আমিরাতকে দ্বীপপুঞ্জগুলি হস্তান্তর করেছিল। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রণালী দিয়ে ভ্রমণকারী তেল ট্যাঙ্কারগুলির দেখাশোনার জন্য তিনি সেগুলি পুনরায় দখল করছিলেন। শাহের যুক্তি যুক্তির চেয়ে বেশি সুবিধাজনক ছিল: আমিরাতের তেল পরিবহনকে বিপন্ন করার কোনও উপায় ছিল না, যদিও ইরানের তা ছিল। জটিলতার মধ্যে ব্রিটেনের স্থায়ী জটিলতা তবে, ইরানি সৈন্যদের অবতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল শারজা আমিরাতের শেখ খালেদ আল কাসেমুর সাথে নয় বছর ধরে ৩.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে এবং ইরানের প্রতিশ্রুতি ছিল যে যদি দ্বীপে তেল আবিষ্কৃত হয়, তাহলে ইরান এবং শারজা আয় ভাগ করে নেবে। এই ব্যবস্থার ফলে শারজার শাসকের জীবন নষ্ট হয়: শেখ খালিদ ইবনে মুহাম্মদকে একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টায় গুলি করে হত্যা করা হয়। ব্রিটেন নিজেই দখলদারিত্বে জড়িত ছিল কারণ তারা স্বাধীনতার একদিন আগে ইরানি সৈন্যদের দ্বীপটি দখল করতে দিতে স্পষ্টভাবে সম্মত হয়েছিল। ব্রিটেনের নজরদারিতে দখলদারিত্বের সময় নির্ধারণের মাধ্যমে, ব্রিটেন আশা করেছিল যে তারা আন্তর্জাতিক সংকটের বোঝা থেকে আমিরাতকে মুক্ত করবে। কিন্তু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ কয়েক দশক ধরে ইরান এবং আমিরাতের মধ্যে সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলেছিল। ইরান এখনও দ্বীপপুঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করে। সূত্র এবং আরও তথ্য আবেদ, ইব্রাহিম এবং পিটার হেলিয়ার। "সংযুক্ত আরব আমিরাত: একটি নতুন দৃষ্টিকোণ।" লন্ডন: ট্রাইডেন্ট প্রেস, ২০০১। ম্যাটেয়ার, থমাস আর. "তিনটি অধিকৃত সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বীপপুঞ্জ: টুনবস এবং আবু মুসা।" আবুধাবি: এমিরেটস সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ, ২০০৫। পটস, ড্যানিয়েল টি. "আমিরাতের ভূমিতে: সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রত্নতত্ত্ব এবং ইতিহাস।" লন্ডন: ট্রাইডেন্ট প্রেস, ২০১২। সাইদ জাহলান, রোজমেরি। "সংযুক্ত আরব আমিরাতের উৎপত্তি: সমঝোতা স্থিতির একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস।" লন্ডন: রাউটলেজ, ১৯৭৮।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান দাবি করেছে, কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক আগাম সতর্কীকরণ রাডার ব্যবস্থা নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস করা হয়েছে। তেহরানভিত্তিক একাধিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে বলা হয়, ইরানের সামরিক বাহিনীর এলিট ইউনিট Iইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা স্থাপনায় সফল হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে স্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের এএন/এফপিএস-১৩২ (AN/FPS-132) দীর্ঘ-পাল্লার রাডার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত নজরদারি সক্ষম এই শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা ২০১৩ সালে প্রায় ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছিল। এটি মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত ছিল। আইআরজিসি দাবি করেছে, হামলাটি ছিল “অত্যন্ত নির্ভুল ও কৌশলগতভাবে পরিকল্পিত” এবং এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানি সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, কাতারের কিছু কর্মকর্তা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ওয়াশিংটন নীরব থাকায় দাবিটির সত্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এ দাবি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর এর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ ঘটনা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক এই দাবিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামরিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা।পর্দার আড়ালে থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সক্রিয় থাকা মোজতবা খামেনি এখন দেশটির সর্বোচ্চ প্রধান। ব্রেকিং নিউজ জানতে চোখ রাখুন ইত্তেহাদ নিউজে............................ মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরান-এ বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-এর ছেলে মোজতবা খামেনি দেশটির নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দেশটির সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী এসেম্বলি অব এক্সপার্টস তাকে এ পদে নির্বাচিত করেছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচিত রয়েছে যে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর প্রভাব ও সমর্থন তার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জন্ম ও শিক্ষাজীবন ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেন মোজতবা খামেনি। তিনি ছিলেন ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির সন্তান। ১৯৮৭ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি আইআরজিসিতে যোগ দেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে কোম শহরের সেমিনারিতে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সেখানে শিক্ষকতাও করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উত্থান মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ‘অফিস অব দ্য সুপ্রিম লিডার’-এর একজন প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাবার দপ্তরে কাজ করার সুবাদে সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে তোলেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ছিলেন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘পাওয়ার ব্রোকার’। ২০০৫ ও ২০০৯ সালের নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ-এর বিজয়ে নেপথ্যে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসে। বিতর্ক ও সমালোচনা ২০২২ সালে জিনা মাহসা আমিনি-এর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তা দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ নিয়েও তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টে কোম সেমিনারির সংশ্লিষ্ট একটি মাধ্যমে তাকে ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সমালোচকদের মতে, প্রয়োজনীয় উচ্চতর ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও স্বীকৃতি ছাড়া এই উপাধি ব্যবহার ছিল তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পথ সুগম করার কৌশল। নতুন নেতৃত্ব, কঠিন সময় বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি এমন এক সময়ে দেশের দায়িত্ব নিলেন, যখন ইরান গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে তার সামনে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় থাকলেও, এবার তাকে প্রকাশ্য নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈদেশিক নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে আইআরজিসি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার সমন্বয়ের ওপর।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ‘১০ থেকে ১৫ দিনের’ আলটিমেটামকে ঘিরে কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা জোরদার করেছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নিয়মতান্ত্রিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নয়; বরং সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে তেহরানের শেষ মুহূর্তের কৌশলগত প্রয়াস। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের কড়া অবস্থানের প্রেক্ষিতে তেহরান এখন একযোগে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহল এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেছে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও সময়সীমা চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, একটি ‘অর্থবহ চুক্তিতে’ পৌঁছাতে ইরানের হাতে সর্বোচ্চ ‘১০ থেকে ১৫ দিন’ সময় রয়েছে। অন্যথায় ‘ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে’ বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। এই বক্তব্যের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও যুদ্ধ প্রস্তুতি দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তেহরানের জন্য বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের আগে ট্রাম্প ৬০ দিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন; ৬১তম দিনে শুরু হয়েছিল সামরিক সংঘাত। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এ তুলনা টানছেন না, দেশটির সংবাদমাধ্যমে সেই নজির নিয়ে আলোচনা চলছে। জাতিসংঘে ইরানের অভিযোগ জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি দিয়ে ‘সামরিক আগ্রাসনের বাস্তব ঝুঁকি’ নিয়ে সতর্ক করেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যকে জাতিসংঘ সনদের ‘নগ্ন লঙ্ঘন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, হামলা হলে ইরান ‘যথাযথ ও চূড়ান্ত’ জবাব দেবে। তার ভাষায়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাই তখন বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে। জেনেভা আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জেনেভায় মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার অবস্থান তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে ইরান। বিশেষ করে সৌদি আরব নতুন করে আঞ্চলিক যুদ্ধ ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চায় না। হরমুজ প্রণালিতে সামরিক বার্তা একদিকে যখন কূটনৈতিক টেবিলে ‘উইন-উইন’ চুক্তির খসড়া তৈরির চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে নৌ-মহড়া জোরদার করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। যুদ্ধ শুরু হলে এই পথ ব্যাহত করার সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে তেহরান। ‘ঝুলন্ত তলোয়ারের’ নিচে তেহরান ইরানি কৌশলবিদদের মতে, এখন লক্ষ্য কেবল সংঘাত এড়ানো নয়; বরং সংঘাত শুরু হলেও তার ব্যাপ্তি সীমিত রাখা এবং শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তেহরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘ঝুলন্ত তলোয়ারের নিচে বসবাস’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। ইরান একদিকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সীমিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বজায় রেখে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী, অন্যদিকে কোনো আলটিমেটামের মুখে সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতেও রাজি নয়। সম্ভাব্য পরিণতি বিশ্লেষকদের মতে, সামনের কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কূটনৈতিক নমনীয়তা ও সামরিক প্রস্তুতির সমন্বিত কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে তেহরান। এখন দেখার বিষয়—ওয়াশিংটন ও তেহরান কি আলোচনার টেবিলে সমাধানে পৌঁছাতে পারবে, নাকি অঞ্চলটি আবারও নতুন সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আপাতত অনিশ্চয়তার ঘন মেঘ।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।