Brand logo light

অনুসন্ধানী সংবাদ

পিরোজপুর এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে'র বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার ভুয়া বিল ও দুর্নীতির অভিযোগ

 ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পিরোজপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-এর বিরুদ্ধে কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার বিল অনুমোদন, ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন, ঘুষ-বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক আদেশ উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় একই পদে বহাল থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের কারণে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও তিনি এখনও আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন। একই সঙ্গে পুনর্বহালের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে। যোগদানের পরই অভিযোগের সূত্রপাত অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ জুন রঞ্জিত দে পিরোজপুরে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং তার পূর্বসূরি আব্দুস সাত্তারের সময়কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড় করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, এসব বিলের একটি বড় অংশ বাস্তব কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। প্রধান প্রকৌশলী, মন্ত্রণালয় ও দুদকে লিখিত অভিযোগ মঠবাড়িয়া উপজেলার শিংগা গ্রামের বাসিন্দা হরিদাশ হাওলাদার শিপন রঞ্জিত দে'র বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী— ৬ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলীর কাছে, ২৬ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিবের কাছে, এবং ৫ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না হলেও পছন্দের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় শত কোটি টাকার বিল প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ইফতি ইটিসিএল নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই ৮৯ কোটি টাকা বিল দেওয়ার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়। বদলির আদেশ, স্থগিতাদেশ এবং পুনর্বহাল নিয়ে প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৪ নভেম্বর রঞ্জিত দে-কে কুড়িগ্রামে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। তবে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই, ২৮ নভেম্বর তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই আদেশ স্থগিত করাতে সক্ষম হন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ৪ ফেব্রুয়ারি পুনরায় তার বদলির নির্দেশ জারি হলেও তিনি দীর্ঘ সময় স্বপদে বহাল ছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলজিইডির ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সাময়িক বরখাস্তের পর নিঃশব্দে পিরোজপুর ত্যাগ একাধিক সূত্র জানায়, দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে পৌঁছানোর পর রঞ্জিত দে-কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তের পর তিনি অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই রাতের আঁধারে পিরোজপুর ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পিরোজপুর ছাড়ার পর রঞ্জিত দে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করেছিলেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। পরে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে এসে নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে দলটির কয়েকজন নেতার মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।   পুনর্বহালের চেষ্টার অভিযোগ বর্তমানে রঞ্জিত দে ঢাকায় এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পুনর্বহালের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।   ঠিকাদারদের অভিযোগ পিরোজপুরের একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, রঞ্জিত দে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ বণ্টন করতেন। স্থানীয় ঠিকাদার মো. মামুন মিয়া বলেন, "নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। বদলির আদেশ হলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে তিনি বহাল ছিলেন। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।" পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ঠিকাদার বলেন, "তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ না করলেও শত কোটি টাকার বিল পেয়েছে। আমার বৈধ বিলও দীর্ঘদিন আটকে ছিল। প্রকাশ্যে কিছু বললে সমস্যা হতে পারে।" ১২২ কোটি টাকার বিলের অভিযোগ আরেকটি সূত্রের দাবি, নেছারাবাদ উপজেলার ঠিকাদার শফিক সুমন-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো কাজ সম্পন্ন না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১২২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।   স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ বলেন, "কাজ না হলেও ঠিকাদার টাকা পেয়েছেন—এমন অভিযোগ আমরা শুনছি। এসব প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।" স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধ করা যায়। বক্তব্য পাওয়া যায়নি এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রঞ্জিত দে'র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ৩০, ২০২৬ 0
সিলেট গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদকে ঘিরে ঘুষ, অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সিলেট গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা চলমান রয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি। চলমান ফৌজদারি মামলা অভিযোগকারী সূত্রের দাবি, ইলিয়াস আহম্মেদ একটি ফৌজদারি মামলার (সি.আর. নং-১১৮/২০২৫) ১১০ নম্বর আসামি। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৭, ১৪৮, ৩২৬, ৩০৭, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় বিচারাধীন। সরকারি চাকরিতে বিচারাধীন কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক দায়িত্বে রাখার বিষয়ে বিভিন্ন বিধান থাকলেও, এই মামলার প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্বে বহাল থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। দীর্ঘ সময় ঢাকায় দায়িত্ব প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী, তিনি ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে রয়েছে— ২২ এপ্রিল ২০১৫: ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬: নড়াইল গণপূর্ত বিভাগ ১৮ জানুয়ারি ২০১৭: ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭: আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩: গণপূর্ত সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩: সিলেট গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঠিকাদারি প্রভাব ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে সরকারি কাজ বণ্টন, বিল অনুমোদন এবং কমিশন গ্রহণের অভিযোগ ছিল। কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, প্রকল্প অনুমোদন এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে কমিশন দাবি করা হতো। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হয়নি। আজিমপুর প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, পছন্দের ঠিকাদার নির্বাচন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কমিশনের বিনিময়ে বিল অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প নিয়ে সরকারের কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় বিতর্ক আজিমপুর এলাকায় একটি নির্মাণকাজ চলাকালে শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, নিহত শিশুর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং তার ভাইকে চাকরি দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।   সিলেট গণপূর্তে টেন্ডার সিন্ডিকেটের অভিযোগ সিলেট গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ, দরপত্র ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম ব্যবহারের অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে সিলেট গণপূর্ত সার্কেলের একাধিক এপিপিভুক্ত প্রকল্পে এলটিএম (LTM) পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এভাবে দরপত্র আহ্বান করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং কমিশনের বিনিময়ে কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে যেসব দরপত্র আইডির উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো— ১০৯৯১০৪, ১০৮৭৩৪৩, ১০৫৫৫৯৮, ১০৩৮৬৬৫, ১০৩৮২৯৮, ১০৩৭৪৭৯, ১০২৯৯৯০, ১০২৯১৬৭, ১০২৮০৮৫, ১০২৭৬৯৯, ১০২৭৫৮৯, ১০২৫৩২২, ১০১৩০৭৬ এবং ১০১১৬৬৩।   'সিন্ডিকেট' গঠনের অভিযোগ অভিযোগে বলা হয়েছে, সিলেটে যোগদানের পর ইলিয়াস আহমেদ কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এতে সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু জাফর, হবিগঞ্জের সাকিবুর রহমান, মৌলভীবাজারের মাহামুদুল হাসান এবং সুনামগঞ্জের নাজমুল হাসান হিরার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র অনুমোদনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছে। ডিপিপির বাইরে দরপত্রের অভিযোগ সিলেট ক্যান্সার, হার্ট ও কিডনি হাসপাতাল প্রকল্পে প্রায় ১৮ কোটি টাকার একটি দরপত্র (আইডি: ১০৯০৬৬১) ডিপিপির বাইরে আহ্বান করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাঁচ প্যাকেজ একত্র করে সীমিত প্রতিযোগিতার অভিযোগ বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের রিজিওনাল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি পৃথক প্যাকেজ একত্রিত করে একটি বড় দরপত্র (আইডি: ১০৮৯০২১) আহ্বান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দরপত্রে সাব-স্টেশন, জেনারেটর, এসি, বৈদ্যুতিক কেবল, ইন্টারনেট, টেলিফোন নেটওয়ার্ক এবং সিসিটিভিসহ এমন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব। এতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। অবৈধ সম্পদের অভিযোগ একাধিক সূত্রের দাবি, ইলিয়াস আহম্মেদ তার সরকারি চাকরির সময় অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তার রয়েছে— ঢাকার ধানমন্ডিতে দুটি ফ্ল্যাট বরিশালে ব্যয়বহুল একটি মসজিদ বিদেশে একটি বাড়ি আত্মীয়দের নামে ব্যাংক হিসাব বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ তবে এসব সম্পদের বিষয়ে দুদক বা অন্য কোনো সংস্থার তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ সূত্রগুলোর দাবি, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীন সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। সিলেটেও একই অভিযোগ? স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, সিলেটে দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রকল্প অনুমোদন ও কাজ বণ্টনে কমিশন ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দুদকের তদন্তের দাবি অভিযোগে বলা হয়েছে, আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে টেন্ডার বাণিজ্য এবং অগ্রিম বিল পরিশোধের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলছে।   প্রতিক্রিয়া মেলেনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইলিয়াস আহম্মেদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন রয়ে যায় ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই গুরুতর। তবে এগুলোর অনেকগুলোই এখনও তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়াধীন, অথবা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—বিশেষ করে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সুশাসন বিশ্লেষকরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২৯, ২০২৬ 0
প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রকৌশলী বদরুল আলম খানকে ঘিরে ক্ষমতার প্রভাব, বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানকে ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন গ্রহণ এবং ঠিকাদারি ব্যবসায় অংশীদার হওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ উঠেছে।  বর্তমানে তিনি ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদার বাইরে গিয়ে তাঁর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে প্রধান প্রকৌশলীর সমপর্যায়ের, এমনকি তারও বেশি। ক্ষমতার উত্থান সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বদরুল আলম খান তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন এবং বড় প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেন। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নতুন ক্ষমতার বলয়ে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে আবার নিজেকে অন্য রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। বদলি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোতে দায়িত্ব পালনকালে বদরুল আলম খান বদলি ও পদায়নে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের অনুকূলে প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকটি প্রকল্পে কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। ঠিকাদারি ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, "আসিফ" নামের এক ঠিকাদারের সঙ্গে বদরুল আলম খানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করে ওই ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের কয়েকটি থানা ভবন নির্মাণ এবং অন্যান্য সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পেও এই প্রভাব খাটানো হয়েছে।  মিরপুর আবাসিক প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মিরপুর পাইকপাড়া আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আরবরিকালচার কাজ সংশ্লিষ্ট বিভাগে না দিয়ে অন্য বিভাগের মাধ্যমে টেন্ডার করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তখন প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বদরুল আলম খান। অতীত কর্মস্থল নিয়েও অভিযোগ ভোলা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালেও তাঁর বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, অনিয়ম এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। ময়মনসিংহে কর্মরত অবস্থায় ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে ওএসডি করা হয়েছিল বলেও কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।  যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, বদরুল আলম খানের নির্দেশ অমান্য করলে বদলি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক কর্মকর্তা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করেন বলে অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।  

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২৯, ২০২৬ 0
কাজী ওয়াছি উদ্দিন
গুলশানের ৩০০ কোটি টাকার সরকারি প্লট: ৪৭ বছরের পুরোনো রায়, হারানো নথি ও রহস্যজনক সিদ্ধান্তের অনুসন্ধান

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সরকারি জমি বা প্লটসংক্রান্ত মামলায় রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত অবস্থান হলো—সরকারি স্বার্থ রক্ষায় মামলাটি আদালতের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পরিচালনা করা। নিম্ন আদালত বা হাইকোর্টে সরকার পরাজিত হলে আপিল এবং প্রয়োজন হলে আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধেও রিভিউ আবেদন করা হয়ে থাকে। অতীতে রাজউক ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক মামলায় এমন নজিরও রয়েছে, যেখানে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পরও সরকারি সংস্থাগুলো সম্পত্তির দখল ছাড়েনি এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালিকানা বা হস্তান্তর নিয়ে নতুন বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গুলশানের সিইএন (সি) ব্লকের ৯৮ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর প্লটের ক্ষেত্রে পাওয়া সরকারি নথিপত্র একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে হাইকোর্টের একটি রিট মামলায় সরকারের বিপক্ষে রায় হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ আর কোনো আপিল করেনি। অথচ সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। প্রশ্ন উঠেছে—কেন ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়নি? ১৯৭২ সালের গেজেট বনাম ১৯৭৬ সালের রায় সরকারি নথি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির আদেশ (পি.ও-১৬/৭২) অনুসারে ১৯৭২ সালে প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আদেশে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু একই সময় দায়ের হওয়া রিট পিটিশন নং-২৫১/১৯৭৩-এর রায়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে হাইকোর্ট মন্তব্য করেন যে সংশ্লিষ্ট প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত নয়। মন্ত্রণালয়ের নথি বিশ্লেষণে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই মামলায় সরকার পক্ষ পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেট প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ নথি আদালতে উপস্থাপন করেনি। ফলে রায় সরকারের বিপক্ষে যায়। এরপরও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল না করায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রায়ের পরও কেন হয়নি বাস্তবায়নের আবেদন? নথি অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর মামলার বাদীও প্লটের দখল বুঝে নিতে আদালতের দ্বারস্থ হননি। আদালত অবমাননার (Contempt) আবেদন কিংবা রায় বাস্তবায়নের জন্যও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় গেলে সরকারি গেজেটসহ অন্যান্য নথি আদালতের সামনে আসার সম্ভাবনা ছিল। এ কারণেই আদালতের বাইরে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে নতুন মোড় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুনে তৎকালীন সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্লটটি বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, এ সিদ্ধান্তের আগে বিষয়টি তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন ছিল বলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে আলোচনা শুরু হয় এবং সংশ্লিষ্ট নথি খুঁজে না পাওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে সেটি সচিবের সংরক্ষিত আলমারি থেকে উদ্ধার করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। হারিয়ে যাওয়া একটি চিঠি অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ২০১০ সালে রাজউকের তৎকালীন সচিব মোহাম্মদ মোস্তফার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে প্লটটিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। চিঠিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল এবং নথিতে সংরক্ষিতও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই চিঠি নথি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান মূল্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমান বাজারমূল্যে প্লটটির মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। অভিযোগকারীদের মতে, এত উচ্চমূল্যের সম্পত্তিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় নেই—এমন যুক্তি দেখিয়ে বেসরকারি মালিকানায় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যদিও সরকারি বিভিন্ন নথিতে এর বিপরীত তথ্য রয়েছে। যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি এই পুরো ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— ১৯৭৬ সালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার কেন আপিল করেনি? পরিত্যক্ত সম্পত্তির গেজেট আদালতে কেন উপস্থাপন করা হয়নি? ২০১০ সালের রাজউকের চিঠি নথি থেকে কীভাবে হারিয়ে গেল? ২০২৩ সালের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রচলিত অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি? সরকারি সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়েছে কি? ভারসাম্যের স্বার্থে এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারী পক্ষের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযোজন করলে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২৮, ২০২৬ 0
রাজশাহীর আরসি ফুড কায়ছার আলীকে খুঁজছেন খাদ্য কর্মকর্তারা, ঘুষের টাকা ফেরত চান

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : চট্টগ্রামের সাবেক আরসি ফুড (বর্তমানে যিনি রাজশাহীর আরসি ফুড) এস. এম. কায়ছার আলীকে খুঁজছেন খাদ্য কর্মকর্তারা। গত মার্চ মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম থেকে রিলিজ হওয়ার প্রাক্কালে তড়িঘড়ি করে তিন দিনে ১৪ জন খাদ্য কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন পদায়ন করেন এস. এম. কায়ছার আলী। এদের প্রায় প্রত্যেকের কাছ থেকেই পদায়নের গুরুত্ব অনুযায়ী ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা করে অগ্রিম ঘুষ নেন তিনি। এরপর বদলির আদেশ জারি করেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী নিজের বদলির আদেশ জারির পর কোনো কর্মকর্তা অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ রকমের বদলির আদেশ জারি করতে পারেন না। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলির ব্যাপারে তখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে সবুজ সংকেত ছিল না। এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বেপরোয়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এস. এম. কায়ছার আলী বদলিগুলো করেন। বিনিময়ে হাতিয়ে নেন মোট প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুষ।   কিন্তু আরসি ফুড (আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক) কায়ছার আলীর এ অপকর্মের খবর ফাঁস হয়ে গেলে মন্ত্রণালয় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়। অবৈধ এ বদলির আদেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব নির্দেশ দেন। মন্ত্রণালয়ের চাপে পড়ে বদলির আদেশগুলো বাতিল করতে বাধ্য হন এস. এম. কায়ছার আলী। পরবর্তী কর্মস্থল খুলনায় যোগ দেন তিনি। তবে চট্টগ্রামের খাদ্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া ঘুষের টাকাগুলো আর ফেরত দেননি। এই খাদ্য কর্মকর্তাদের ‘আশ^াস’ দেন, শিগগিরই আবার চট্টগ্রামে ফিরে আসছেন। যদিও খাদ্য কর্মকর্তারা বুঝতে পারছিলেন এটা অসম্ভব। কিন্তু এটাও ভাবছিলেন, দুর্নীতিবাজ কায়ছার আলীর পক্ষে সবই সম্ভব। কায়ছার আলী ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ আমলে এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এ রকমের অনেক অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন। এদিকে গত সপ্তায় কায়ছার আলী খুলনা থেকে রাজশাহীর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা পদে পদায়ন নিয়ে চলে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের খাদ্য কর্মকর্তারা এস. এম. কায়ছার আলীকে খুঁজছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তার কাছ থেকে ঘুষের টাকাগুলো ফেরত চাচ্ছেন। তবে প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না, যেহেতু ঘুষের বিষয়। তাছাড়া, দুর্নীতিবাজ কায়ছার আলীর হাত অনেক লম্বা- যে কোনো সময়, যে কারো ক্ষতি করতে পারেন তিনি। চট্টগ্রাম থেকে অবমুক্তির আগে তড়িঘড়ি যেভাবে দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেন চলতি বছরের মার্চ মাসে এস. এম. কায়ছার আলীকে চট্টগ্রামের আরসি ফুড (আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক) থেকে খুলনার আরসি ফুড পদে বদলি করা হয়। ১৫ মার্চ এই বদলির আদেশ জারি হয়। কিন্তু তিনি খুলনায় যেতে চাননি, যেহেতু সেখানে অবৈধ আয়ের সুযোগ কম। ব্যাপক দেনদরবার করছিলেন, বড় অংকের ঘুষ নিয়েও ঘুরছিলেন। এর আগেও গত বছরের আগস্টে এক দফায় তাকে চট্টগ্রামের আরসি ফুড থেকে খুলনার আরসি ফুড পদে বদলি করা হয়েছিল। তবে এক দিনের মাথায় সেই বদলির আদেশ বাতিল করিয়েছেন। বিনিময়ে তৎকালীন উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার এবং সচিব মাসুদুল হাসানকে দুই কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন।   এস. এম. কায়ছার আলীর চট্টগ্রামের আরসি ফুড পদে পদায়ন হয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চে। ২০২৫ সালের মার্চে দুই বছর পূর্ণ হয় অর্থাৎ নীতিমালা অনুযায়ী নতুন পদায়নের সময় আসে। কিন্তু তখনকার উপদেষ্টা ও সচিবকে ম্যানেজ করে চট্টগ্রামেই থাকার ব্যবস্থা করেন তিনি। বিশেষ প্রয়োজনে কোনো কর্মকর্তাকে আরও এক বছর অতিরিক্ত অর্থাৎ তিন বছর পর্যন্ত একই পদায়নে রাখা যায়। নীতিমালার এই সুযোগটি কায়ছার আলীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। তবে নিম্নমানের ও পঁচাচাল গুদামজাতকরণ-সহ নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর আগস্টে তাকে খুলনায় বদলি করতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। ওই সময় চট্টগ্রামের অধীনস্থ খাদ্য কর্মকর্তাদের ওপর ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি, ঘুষ বাণিজ্য ছাড়াও বদলি বাণিজের মাধ্যমে তড়িঘড়ি বড় অংকের টাকা যোগাড় করেন তিনি। ঢাকায় এসে উপদেষ্টা ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাত করে বদলির আদেশ বাতিলের ব্যবস্থা করেন। বদলির আদেশ জারি হয়েছিল ১৭ আগস্ট, ২০২৫ এবং পরদিনই তা বাতিল করা হয়। সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজ ডটকমে তখন এ নিয়ে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী যেহেতু অতিরিক্ত এক বছর থাকার মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের মার্চ মাসে। তাই এই সময় পর চট্টগ্রামে পদায়নে থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। সেই হিসেবে গত ১৫ মার্চ, ২০২৬ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এস. এম. কায়ছার আলীকে খুলনার আরসি ফুড পদে বদলি করা হয়। কিন্তু কায়ছার আলী খুলনায় যাবেন না। বড় অংকের ঘুষ নিয়ে তিনি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মহলে আবারও তদবির শুরু করেন। আগেরবার খুলনায় বদলি ঠেকিয়েছেন, এবারও ঠেকাবেন- এমন ঘোষণা দেন নিজ দপ্তরে বসে। তবে অনেক চেষ্টা করেও এবার আর বদলি ঠেকাতে পারেননি। মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব জানিয়ে দেন, বদলিস্থলে যেতেই হবে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শেষ মুহূর্তে বেপরোয়া হয়ে উঠেন কায়ছার আলী। ৩১ মার্চ, ২০২৬ ছিল চট্টগ্রাম থেকে রিলিজ (অবমুক্ত) হওয়ার দিন। চলেই যেহেতু যেতে হবে, তাই রিলিজের আগ মুহূর্তে নেমে পড়েন বেপরোয়া বদলি ও ঘুষ বাণিজ্যে। ২৮ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত এই তিন দিনে মোট ১৪টি স্মারকে ১৪ জন খাদ্য কর্মকর্তাকে ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) পদে নতুন পদায়ন দেন। ২৮ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ২৮৬ (ম), ২৮৮ (ম), ২৮৯ (ম), ২৯০(ম), ২৯১(ম) নং স্মারকে, ২৯ মার্চ ২৯৩(ম), ২৯৪ (ম), ২৯৫(ম), ২৯৬(ম), ২৯৭(ম) নং স্মারকে এবং ৩০ মার্চ ৩১৫(ম), ৩১৬ (ম), ৩১৭(ম), ৩১৮ (ম) নং স্মারকে বদলির আদেশগুলো জারি করেন তিনি।   এই পদায়নগুলোর বিনিময়ে হাতিয়ে নেন প্রায় দুই কোটি টাকা। অগ্রিম টাকা আদায়ের পরই আদেশ জারি করা হয়। এসব ঘুষের টাকা লেনদেন হয় চট্টগ্রামস্থ আরসি ফুড অফিসে বসেই। এ সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে তার অফিসের টেবিলে একটি পিস্তলও দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। উক্ত ১৪ জনের বাইরে আরও বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে তিনি অগ্রিম ঘুষের টাকা নিয়েছেন। পরের দিন অর্থাৎ শেষ কর্মদিবসে পেছনের তারিখ দিয়ে এদের পদায়নের আদেশ জারি করার কথা ছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সচিবের নির্দেশের কারণে তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। বরং যেসব বদলির আদেশ জারি করেছেন তিনি ২৮, ২৯ এবং ৩০ মার্চ- ওই অবৈধ আদেশগুলো বাতিলের নির্দেশ দেন সচিব। ৩০ মার্চ রাতেই এস. এম কায়ছার আলী বাধ্য হন সবগুলো বদলির আদেশ বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করতে। তখনকার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস. এম. কায়ছার আলী স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “অত্র দপ্তরের ২৮/০৩/২০২৬ তারিখের ২৮৬ (ম), ২৮৮ (ম), ২৮৯ (ম), ২৯০(ম), ২৯১(ম) নং স্মারকে, ২৯/০৩/২০২৬ তারিখের ২৯৩(ম), ২৯৪ (ম), ২৯৫(ম), ২৯৬(ম), ২৯৭(ম) নং স্মারকে এবং ৩০/০৩/২০২৬ তারিখের ৩১৫(ম), ৩১৬ (ম), ৩১৭(ম), ৩১৮ (ম) নং স্মারকে জারীকৃত প্রজ্ঞাপন এতদ্বারা বাতিল করা হলো। এ আদেশ জনস্বার্থে জারী করা হলো।” প্রজ্ঞাপনের তারিখ ছিল ৩০ মার্চ, ২০২৬। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলেও ছিলেন ক্ষমতার শীর্ষে ফ্যাসিস্ট-লুটেরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এস. এম. কায়ছার আলী ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাবান। আলোচিত ক্ষমতাবান খাদ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। দুর্নীতিবাজ আওয়ামী মন্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে যখন যেটা ইচ্ছে করেছেন সেটিই হয়েছে, অনিয়মের মধ্যে হলেও। বদলি-পদায়নের নীতিমালায় অতিরিক্ত এক বছরসহ সর্বোচ্চ তিন বছর একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ আছে। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এস. এম. কায়ছার আলী কুমিল্লা ডিসি ফুড-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে একনাগাড়ে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন, যারমাধ্যমে অতীতের অনিয়মের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। তাঁর টার্গেট ছিল কুমিল্লার ডিসি ফুড থেকে সরাসরি চট্টগ্রামের আরসি ফুড হওয়া, যদিও তার জন্য এটা বৈধ নয়। প্রথমত, কায়ছার আলীর বাড়ি চট্টগ্রাম শহরে। দ্বিতীয়ত, আরসি ফুড পদে প্রথম পদায়ন হয়ে থাকে সাধারণত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে। কায়ছার আলীর ক্ষেত্রে এ নিয়মগুলোর তোয়াক্কা করা হয়নি। তাঁর চাহিদা অনুযায়ীই পদায়ন করা হয়েছে।   এখনও ক্ষমতাবান! অবাক ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী এবং ক্ষমতাবান কর্মকর্তা কায়ছার আলী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন টাকার জোরে, এ মুহূর্তে আবার নতুন করে তার ক্ষমতার নজির সৃষ্টি হয়েছে রাজশাহীর আরসি ফুড পদে পদায়ন বাগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। কম গুরুত্বপূর্ণ খুলনা বিভাগে যোগদানের মাত্র দুই মাসের মাথায় রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের আরসি ফুড পদ বাগিয়ে নিলেন। অবশ্য: এরজন্য তাকে নগদ দুই কোটি টাকা ঘুষ পরিশোধ করতে হয়েছে বলে চাউর আছে। যদিও কায়ছার আলী নানা নাটকীয় প্রচার-প্রচারনার মাধ্যমে ঘুষের এই অপকর্ম ঢাকার চেষ্টা করেছেন তা সফল হয়নি। মন্ত্রণালয়ের সংস্থা প্রশাসন-২ শাখার উপসচিব মো. আবু নাসার উদ্দিনের স্বাক্ষরিত গত ১৪ মে তারিখের এক প্রজ্ঞাপনে খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (চ.দা.) ইকবাল বাহার চৌধুরীকে রাজশাহীর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে পদায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই প্রজ্ঞাপনের পর পরই অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেন দুর্নীতিবাজ কায়ছার আলী। তিনি এর আগে খুলনায় যোগদানের সময়ই ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে থাকবেন না। তাকে খুলনায় রাখা যাবে না। মন্ত্রণালয়সহ প্রভাবশালী মহলে ব্যাপক তদবির চালিয়ে ইকবাল বাহার চৌধুরীর রাজশাহীতে যোগদান ঠেকিয়ে দেন তিনি। এর পরিবর্তে রাজশাহীর আরসি ফুড পদে নিজের পদায়নের ব্যবস্থা করেন। গত ২ জুন মন্ত্রণালয়ের একই উপসচিব আবু নাসার উদ্দিন নতুন প্রজ্ঞাপনে কায়ছার আলীকে আরসি ফুড পদে পদায়ন করেন। এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হওয়ার পর পরই কায়ছার আলী সর্বত্র প্রচার করতে থাকেন, তিনি রাজশাহীতে যেতে চান না, খুলনায়ই থাকতে চান। এমনও বলা হয় যে, ডিজি বরাবর দরখাস্ত করেছেন, রাজশাহী যেত চান না। এমনকি তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে, এমন কথাও প্রচার করেছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে আদৌ এ রকমের কোনো দরখাস্ত বা স্ট্যান্ড রিলিজের হদিস পাওয়া যায়নি। আদতে তিনি যে, দুই কোটি টাকার বিনিময়ে রাজশাহীর আরসি ফুড পদে পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন তা আর গোপন থাকেনি। অধিদপ্তরের অনেকেই এখন একথা জানেন। তবে এ বিষয়ে চট্টগ্রামের খাদ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, কায়ছার আলী যা খুশি করুক, তাদের অগ্রিম ঘুষের টাকাটা যাতে ফেরত পাওয়া যায় এই ব্যবস্থা করা হোক। খাদ্য অধিপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান একই সঙ্গে স্ত্রী শারমিন আক্তার এবং স্ত্রীর আপন ভাগ্নী দু’জনকেই বিয়ে করেছেন। খালা-ভাগ্নী উভয়ে জহিরুলের স্ত্রী। বিভিন্ন সময়ে দু’জনকেই একাধিকবার তালাকও দিয়েছেন তিনি। তালাকের পরে তাদের নিয়ে আবার সংসারও করছেন। পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার এ ধরনের অনাচার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড খাদ্য অধিদপ্তরে মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিপীড়ন-নির্যাতনের অভিযোগ এনে শারমিন আক্তার পর পর ৪টি মামলা করেন জহিরুলের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে তিনটি মামলায় চার্জশিটও হয়েছে। এ কারণে গত সপ্তায় পরিচালক জহিরুল ইসলামকে সাসপেন্ড করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। স্ত্রীর বড় বোনের মেয়ে শাহানা আক্তার স্বর্ণার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে গোপন পরকীয়া সম্পর্কে জড়ান জহিরুল ইসলাম খান। এক পর্যায়ে শাহানা আক্তার স্বর্ণাকে গোপনে বিয়েও করেন। একই সঙ্গে দু’জনের সঙ্গেই সংসার করছিলেন। ঘটনা ধরা পড়ে গেলে স্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হয়। স্ত্রীর ওপর শারীরিক নিপীড়ন-নির্যাতনও চালান। এসব ঘটনা তুলে ধরে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ঢাকার ১৩ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন জহিরুল ইসলাম খানের স্ত্রী শারমিন আক্তার। মামলায় মোট চার জনকে আসামী করা হয়। এরমধ্যে এক নম্বর আসামি হলেন জহিরুল ইসলাম খান, ২ নং শাহানা আক্তার স্বর্ণা (বোনের মেয়ে), ৩ নং আসামি সাইদ হাসান শাকিল (আপন বোনের ছেলে) এবং ৪ নং আসামি (আপন বোন) সাইফুন আরা। নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় পরবর্তীতে একে একে আরও তিনটি মামলা দায়ের করেন শারমিন আক্তার। শারমিন আক্তারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে শারমিন আক্তারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং অবশেষে গত সপ্তায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২৬, ২০২৬ 0
গৌরনদীতে খাল পুনঃখনন: অবৈধ স্থাপনা বহাল, সরকারি গাছ কাটার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে প্রকল্প

বরিশাল অফিস :   বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর থেকে চন্দ্রহার খাল পুনঃখনন প্রকল্পকে ঘিরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, খাল পুনঃখননের নামে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে না। একদিকে খালের গভীরতা বাড়ানো হচ্ছে না, অন্যদিকে সরকারি রাস্তার গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র বলছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় বাটাজোর ইউনিয়ন থেকে সরিকল ইউনিয়নের সাকোকাঠী (আগরপুর) পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল খালের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন। তবে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ‘পুনঃখনন’ নাকি শুধু খালের পাড় ঘষামাজা? স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকৃত অর্থে খালের গভীরতা বৃদ্ধি না করে দুই পাড়ে সীমিত পরিসরে মাটি কাটার কাজ চলছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণক্ষমতা বাড়বে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। একাধিক কৃষক জানান, দীর্ঘদিন ধরে খালটি নাব্যতা হারিয়েছে। পুনঃখননের মাধ্যমে তারা কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের আশা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যে কাজ হচ্ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না বলে তাদের আশঙ্কা। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ‘বাছাই নীতি’? স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, খালের দক্ষিণ পাড়ে থাকা কিছু ব্যক্তিগত গাছ ও স্থাপনা অপসারণ করা হলেও রাস্তার পাশের বেশ কয়েকটি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা অক্ষত রাখা হয়েছে। তাদের দাবি, খালের উভয় পাড় থেকে সমানভাবে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ না করলে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে না এবং পুনঃখননের কার্যকারিতাও সীমিত থাকবে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “যেখানে সাধারণ মানুষের স্থাপনা সরানো হয়েছে, সেখানে রাস্তার পাশের অবৈধ দোকানগুলো কেন বহাল রয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না।” সরকারি গাছ কাটার অভিযোগ প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সরকারি রাস্তার গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের দাবি, খননকাজে ব্যবহৃত ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে দিনের বেলায়ই রাস্তার পাশের সরকারি গাছ কেটে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব গাছ অপসারণের ক্ষেত্রে কোনো প্রকাশ্য নিলাম, টেন্ডার বা সরকারি অনুমোদনের তথ্য স্থানীয়রা জানেন না। কয়েকজন প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী অভিযোগ করেন, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকলে তা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাদের মতে, সরকারি গাছ অপসারণের ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা প্রয়োজন। খালের পাড় ভাঙনের আশঙ্কা স্থানীয়দের আরেকটি উদ্বেগ খনন পদ্ধতি নিয়ে। তাদের দাবি, ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে খননকাজ পরিচালনার ফলে খালের দক্ষিণ পাড়ের বিভিন্ন অংশে মাটি ধসে পড়তে শুরু করেছে। এতে ভবিষ্যতে পাড় রক্ষা, ভূমিক্ষয় এবং খালের স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রকৌশলগত মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মেলেনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য নিতে স্থানীয় ইউনিয়ন সদস্য মোহাম্মদ রেজাউল শেখের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অন্যদিকে বাটাজোর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রব হাওলাদার অসুস্থ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।   তদন্তের দাবি স্থানীয়দের দাবি, খাল পুনঃখনন প্রকল্পে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বৈষম্য, সরকারি গাছ অপসারণের বৈধতা এবং খননকাজের মান যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রকল্পটি যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২৩, ২০২৬ 0
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় এলজিইডি বরিশাল বিভাগ বরিশাল
বরিশাল এলজিইডির নিয়ন্ত্রক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা রহমত-ই-খুদা!

বরিশাল অফিস :   স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর বরিশাল বিভাগ, অঞ্চল এবং জেলা কার্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ঘিরে আলোচনায় উঠে এসেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রহমত-ই-খুদার নাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানোর সুযোগ তৈরি করেছেন।   দুই দশকের বেশি সময় বরিশালে অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, যশোর জেলার বাসিন্দা মোঃ রহমত-ই-খুদা বর্তমানে এলজিইডি বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বরিশাল জেলায় প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে বরিশাল অঞ্চলের এলজিইডি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় একই অঞ্চলে কর্মরত থাকার ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ঠিকাদার মহলের সঙ্গে তার বিস্তৃত যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, যা পরবর্তীতে তার প্রভাব বিস্তারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বরিশালের প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন রহমত-ই-খুদা। বিশেষ করে তৎকালীন বরিশাল অঞ্চলের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বলয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল । অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বরিশালের মাহফুজ খান, কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ, ভোলার পিটার এবং পটুয়াখালীর মহিউদ্দিনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে অংশীদারিত্বের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।   বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নিজেকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর  সংগঠনটির ১০১ সদস্যের কমিটিতে তার সদস্য নম্বর ৫৭ বলে জানা গেছে। কমিটির অনুমোদনপত্রে সংগঠনের সভাপতি প্রফেসর ড. প্রকৌশলী মোঃ হাবিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মোঃ নুরুজ্জামানের স্বাক্ষর রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই সাংগঠনিক পরিচয়ের পর থেকেই তিনি বরিশাল অঞ্চলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। বদলি ও পদায়নে প্রভাবের অভিযোগ সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ। একাধিক সূত্রের দাবি, বিভাগীয়, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি, পদায়ন এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগ রয়েছে, কোনো বদলির আদেশ জারি হলে তা পরিবর্তন বা বাতিলের জন্য তিনি প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করতেন। এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখার একটি সূত্রও এমন অভিযোগের ইঙ্গিত দিয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। যদিও এ বিষয়ে প্রশাসন শাখার কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সিনিয়রদের উপেক্ষা করে দায়িত্ব? আরও একটি অভিযোগ ঘুরে ফিরে এসেছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বরিশাল অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ শূন্য হলে একাধিকবার রহমত-ই-খুদা ওই দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একই কার্যালয়ে তার চেয়ে সিনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি ওই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাদের মতে, প্রশাসনিক প্রভাবের কারণেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার প্রশ্ন সরকারি চাকরি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট সময় পর কর্মকর্তাদের বদলির বিধান থাকলেও বরিশাল অঞ্চলে অনেক কর্মকর্তা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের কারণে বদলির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলিসংক্রান্ত কোনো আদেশ জারি হলে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রহমত-ই-খুদা প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর আদেশ পরিবর্তন বা বাতিলের জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখার একটি সূত্রও বিষয়টির ইঙ্গিত দিয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।   পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বিতর্ক স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় রয়েছেন। তাদের দাবি, রহমত-ই-খুদাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তাদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় রয়েছেন। তাদের মতে, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা মোঃ রহমত-ই-খুদাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।   সুশাসনের প্রশ্ন? প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি, পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে রহমত-ই-খুদার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যদি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করা হয়, তাহলে শুধু একজন কর্মকর্তার ভূমিকা নয়, বরিশাল অঞ্চলের এলজিইডির প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতাও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ১৫, ২০২৬ 0
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মো. সরোয়ার হোসেন
এনবিআর কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেনকে ঘিরে অবৈধ সম্পদ, ঘুষ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মো. সরোয়ার হোসেনকে ঘিরে সম্প্রতি দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলে ঘুরে বেড়ানো অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, সরকারি চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন।  ফলে অভিযোগ এবং প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রশাসনিক ও আইন বিশেষজ্ঞরা। চাকরিজীবনের শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মো. সরোয়ার হোসেন ২০১৮ সালে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মোংলা কাস্টমস, ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেট এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমন অবস্থানে ছিলেন, যেখানে ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ ছিল। তাদের ভাষ্যমতে, এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে তিনি একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আর্থিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।   অভিযোগের কেন্দ্রে সম্পদের প্রশ্ন সরোয়ার হোসেনকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো তার সম্পদের পরিমাণ এবং সম্পদের উৎস। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। তবে অভিযোগপত্রে ফ্ল্যাটটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান, নিবন্ধন নথি, মালিকানা দলিল কিংবা ক্রয়ের অর্থের উৎস সংক্রান্ত কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযোগের বাস্তবতা যাচাইয়ের জন্য ভূমি রেকর্ড, রেজিস্ট্রেশন তথ্য এবং আয়কর নথি বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বরগুনায় বিলাসবহুল বাড়ির অভিযোগ অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নিজ জেলা বরগুনায় তার একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের দাবি থাকলেও অভিযোগের সঙ্গে কোনো প্রকৌশল মূল্যায়ন প্রতিবেদন, জমির রেকর্ড বা সরকারি নথি সংযুক্ত করা হয়নি। ফলে বাড়িটির প্রকৃত মূল্য, মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। স্ত্রীর নামে সম্পদ ও বিলাসবহুল গাড়ির অভিযোগ অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সরোয়ার হোসেনের স্ত্রীর নামেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও স্থাবর সম্পদ রয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, শ্বশুরবাড়ি এলাকায় কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গাড়িটির নিবন্ধন তথ্য, মালিকানা, ক্রয়মূল্য বা সম্পদের উৎস সম্পর্কে কোনো নথিপত্র প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এসব দাবিও এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। ঘুষ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সম্পদের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপের ভয় দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।   বদলি ও পদায়নে প্রভাবের অভিযোগ অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, তিনি প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করতেন এবং কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগকারীদের মতে, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায়ও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।   একজন কর্মকর্তার সম্পদ কতটা অস্বাভাবিক? সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে সম্পদ অর্জন নিজেই কোনো অপরাধ নয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশ্নটি সম্পদের পরিমাণ নয়; বরং সেই সম্পদের উৎস বৈধ কি না। যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার সম্পদ তার বৈধ আয়, কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেটি আইনি সমস্যা নয়। অন্যদিকে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে তা দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে। এই কারণে অভিযোগকারীরা বিষয়টি তদন্তের দাবি তুলেছেন। তদন্ত হলে কী কী যাচাই করা হতে পারে? দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্য কোনো তদন্ত সংস্থা অভিযোগগুলো অনুসন্ধান করলে সাধারণত কয়েকটি বিষয় যাচাই করা হয়— আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণী ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন ভূমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা রেকর্ড গাড়ির নিবন্ধন তথ্য পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ ঘোষিত আয় ও সম্পদের সামঞ্জস্য সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। অভিযুক্তের বক্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? ন্যায়সঙ্গত তদন্তের অন্যতম শর্ত হলো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, মো. সরোয়ার হোসেনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।   স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন সরোয়ার হোসেনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ যাচাই, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে সাংবাদিকতা ও আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, কোনো অভিযোগকে তদন্ত বা আদালতের রায়ের আগে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। সেই কারণে অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তার নির্ধারণ কেবলমাত্র নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সুনাম পুনরুদ্ধার—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ৫, ২০২৬ 0
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.)–এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমির
খানজাহান আলীর মাজারের শেষ কুমির সরানো হলো কেন? শিশুমৃত্যু, অব্যবস্থাপনা ও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের অনুসন্ধান

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুমিরের উপস্থিতি শুধু একটি প্রাণীর অস্তিত্ব নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং পর্যটন সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় সেই ঐতিহ্যের শেষ জীবন্ত প্রতীকটিকেও সরিয়ে নিতে হলো প্রশাসনকে। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল জননিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত, নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার পরিণতি? শিশুমৃত্যুর পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপ গত সোমবার মাজারের সংরক্ষিত মহিলা ঘাট এলাকায় আনুমানিক সাত থেকে আট বছর বয়সী ফাতেমা নামের এক শিশুকে পানিতে টেনে নেয় কুমিরটি। পরদিন ভোরে দিঘির পূর্ব পাড়ে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। ঘটনার পর জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয় জননিরাপত্তার স্বার্থে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার। বুধবার সকাল থেকে অভিযান শুরু হয়। দুপুরের দিকে খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে কুমিরটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং পরে বিশেষ ব্যবস্থায় খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কুমিরটির ভবিষ্যৎ আবাস কোথায় হবে, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ক্ষুব্ধ খাদেমরা: ‘একটি দুর্ঘটনায় ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না’ কুমির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাজারের প্রধান খাদেম ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর ধরে তাঁদের পরিবার মাজার ও দিঘির দেখভাল করে আসছে। দুর্ঘটনা দুঃখজনক হলেও এর জন্য ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা সমাধান হতে পারে না। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে। তাই বলে কুমিরটি নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। এটি বাগেরহাটের মানুষের সম্পদ।” খাদেমদের মতে, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বেষ্টনী এবং প্রশাসনিক নজরদারির মাধ্যমে কুমিরটিকে আগের স্থানে রাখা সম্ভব ছিল। দর্শনার্থীদের একাংশের ভিন্ন মত তবে সাধারণ দর্শনার্থীদের বড় একটি অংশ প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। মোল্লাহাট থেকে পরিবার নিয়ে মাজারে আসা শাহিদা বেগম বলেন, “কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। আজ যদি আমার পরিবারের কারও এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে কী হতো? আপাতত কুমির সরানো ঠিক হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে নিরাপদ বেষ্টনী দিয়ে আবার প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।” এই মতামতই এখন স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত—ঐতিহ্যও থাকবে, আবার মানুষের জীবনও নিরাপদ থাকবে। শতাব্দীপ্রাচীন কুমির ঐতিহ্যের ইতিহাস লোককথা অনুযায়ী, দিঘি খননের পর খানজাহান আলী (রহ.) নিজ হাতে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন—‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে পরিচিত সেই কুমির যুগল পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে একটি প্রতীকী ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, খানজাহান আলীর মৃত্যুর পরও খাদেম ও ভক্তরা কুমিরগুলোর যত্ন নিতেন। ক্রমান্বয়ে তাদের বংশবিস্তার ঘটে এবং শত শত বছর ধরে দিঘিতে কুমিরের অস্তিত্ব বজায় ছিল। তবে প্রাকৃতিক মৃত্যু, পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় একের পর এক কুমির মারা যেতে থাকে। সবশেষে ২০১৫ সালে ‘ধলা পাহাড়’ নামে পরিচিত শতবর্ষী কুমিরটির মৃত্যু হলে খানজাহান আমলের বংশধারার সমাপ্তি ঘটে। ভারতের কুমির এনে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল ঐতিহ্য ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যে ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির আনা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর বেশিরভাগই মারা যায় বা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। ২০২৩ সালে শেষ পুরুষ কুমিরটির মৃত্যুর পর দিঘিতে একমাত্র জীবিত কুমির হিসেবে টিকে ছিল সাম্প্রতিক সময়ে সরিয়ে নেওয়া প্রাণীটি। অর্থাৎ দিঘিতে থাকা শেষ কুমিরটি ছিল ঐতিহ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে আনা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। ‘হঠাৎ আক্রমণাত্মক’ হয়ে উঠল কেন? বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুমির প্রকৃতিগতভাবেই শিকারি প্রাণী। তবে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থানের পরিবেশে তাদের আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। সুন্দরবনের করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবিরের মতে, খাদ্যসংকট একমাত্র কারণ নয়। তিনি জানিয়েছেন, পর্যটকদের সামনে কুমির প্রদর্শনের জন্য খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মেশানো, নিয়মিত কৃত্রিমভাবে খাবার দেওয়া, সামনে জীবিত প্রাণী এনে দেখানো এবং পরে সরিয়ে নেওয়ার মতো কার্যক্রম কুমিরের স্বাভাবিক আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া দিঘিতে জাল ফেলে মাছ ধরা এবং মানুষের অতিরিক্ত উপস্থিতিও প্রাণীটির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত করেছে বলে মনে করেন তিনি। অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ শিশুমৃত্যুর ঘটনার পর নতুন করে সামনে এসেছে মাজার এলাকায় দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, তাবিজ ও মানতের নামে বাণিজ্য, কুমিরকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বহুবার প্রশ্ন উঠেছে—লোকালয়ের মধ্যে থাকা উন্মুক্ত দিঘিতে একটি পূর্ণবয়স্ক কুমির রেখে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া পর্যটকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক? প্রশ্নটি আরও জোরালো হয় প্রায় দুই মাস আগে একটি কুকুরকে কুমিরের আক্রমণের ঘটনার পর। তবে তখনও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় এক প্রজাতির ভবিষ্যৎ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০০০ সালে ঘোষণা করেছিল যে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে মিঠাপানির কুমির কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় খানজাহান আলীর মাজারের কুমিরগুলো ছিল এক ধরনের জীবন্ত সংরক্ষণ ঐতিহ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিঘির বিস্তৃত জলাশয়কে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে সেখানে একটি নিয়ন্ত্রিত কুমির সংরক্ষণ ও প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং বাহ্যিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা গেলে ভবিষ্যতে এখানেই একটি মিঠাপানির কুমির সংরক্ষণ প্রকল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। ঐতিহ্য বনাম জননিরাপত্তা: এখন কোন পথে বাগেরহাট? খানজাহান আলীর মাজারের কুমিরকে ঘিরে বিতর্ক মূলত দুটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও পর্যটন ঐতিহ্য। অন্যদিকে রয়েছে মানুষের জীবন ও জননিরাপত্তা। ফাতেমার মৃত্যু সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আপাতত দিঘি কুমিরশূন্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—যদি আগে থেকেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বাবধান এবং সুশাসন নিশ্চিত করা হতো, তাহলে কি এই মৃত্যুও এড়ানো যেত, আর ঐতিহ্যও টিকে থাকত? বাগেরহাটের মানুষের সামনে এখন সেই উত্তর খোঁজার সময়। কারণ কুমিরটি শুধু একটি প্রাণী ছিল না; এটি ছিল ইতিহাস, বিশ্বাস, পর্যটন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ববোধের এক জটিল পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ৪, ২০২৬ 0
এনবিআরের কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম
৫৩ ফ্ল্যাট থেকে শতকোটি টাকার জমি: এনবিআরের কর্মকর্তা সহিদুল ইসলামের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের আয়-ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনপরিসরে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব, শুল্ক, কাস্টমস এবং ভ্যাট প্রশাসনের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তাদের সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা প্রায়ই জনমনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা সহিদুল ইসলামের সম্পদ নিয়ে এমনই এক বিস্তৃত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য, যার বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, জমির খতিয়ান, ফ্ল্যাট মালিকানার তথ্য, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি এবং কয়েকজন নিকট আত্মীয়ের নামে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সম্পদের অস্তিত্ব রয়েছে। বসুন্ধরায় বহুতল ভবন: সম্পদের কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকে অবস্থিত একটি ১০তলা ভবন অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ‘শেল কবিতা’ নামের এই ভবনটি সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রতি তলায় দুটি করে প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট নিয়ে গড়ে ওঠা ভবনটিতে মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও সম্পত্তি মূল্যায়ন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি ফ্ল্যাটের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। সেই হিসাবে কেবল ভবনের ফ্ল্যাটগুলোর মূল্যই প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। তবে জমির বর্তমান বাজারমূল্য, নির্মাণ ব্যয় এবং এলাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিবেচনায় পুরো ভবনের মূল্য আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফ্ল্যাট সাম্রাজ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বসুন্ধরার বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী এবং আত্মীয়স্বজনদের নামে আরও অন্তত ৩৩টি ফ্ল্যাট রয়েছে। বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারে সহিদুল ইসলামের নিজ নামে দুটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে তার স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিরপুরের রূপনগর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় ফাহমিদা রাব্বির নামে থাকা একটি ছয়তলা ভবনে ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থানীয় সম্পত্তি বাজারের হিসাবে ভবনটির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে সম্পদের বিস্তার মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্পে আরও একটি ছয়তলা ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রথমে সহিদুল ইসলামের স্ত্রীর নামে ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরে ভবনটি চার শ্যালকের নামে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মালিকানা কাগজপত্রে কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান এবং কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনানের নাম রয়েছে। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী এবং এই চার আত্মীয়ের নামে থাকা ৫৩টি ফ্ল্যাট ও দুটি দোকানের সম্মিলিত বাজারমূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকা হতে পারে। জমি ও শিল্পকারখানার বিনিয়োগ শুধু আবাসিক সম্পত্তিই নয়, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জমিতেও বড় ধরনের বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। মিরপুরের আগুন্দা এলাকায় প্রায় ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত স্থাপনায় প্লাস্টিক কারখানা ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে গড়ানচটবাড়ি মৌজায় ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা বলে স্থানীয় সম্পত্তি সংশ্লিষ্টরা ধারণা দিয়েছেন। নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে দোকান রাজধানীর দুই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রেও সহিদুল ইসলামের সম্পদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের একটি দোকান এবং নিউমার্কেটের আরেকটি দোকানের মালিকানা তার নামে রয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়। দুটি দোকানের সম্মিলিত বাজারমূল্য চার কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাভারে বাংলোবাড়ি সাভারের মধুমতি মডেল টাউনে ‘সেঁজুতি’ নামের একটি বাংলোবাড়ি স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ৩৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি সহিদুল ইসলামের নামে রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে এবং সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত। বর্তমান বাজারদরে কেবল জমির মূল্যই প্রায় ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। মধুমতিতে আরও বিস্তৃত জমি মালিকানা অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, মধুমতি মডেল টাউন এলাকায় সহিদুল ইসলামের মালিকানায় একাধিক প্লট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত জমি, পশু খামার হিসেবে ব্যবহৃত বড় প্লট এবং ভারী যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের জন্য ভাড়া দেওয়া জমি। সব মিলিয়ে প্রায় ৩২০ কাঠা জমির বাজারমূল্য ৯০ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে বিভিন্ন সূত্রের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। পূর্বাচলে জমির পর জমি পূর্বাচল ও আশপাশের এলাকায় সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে অন্তত ছয়টি প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে। ডুমনি, পিতলগঞ্জ, দিঘলিয়া, বাড়িয়াছনি, মুশুরীগ্রাম এবং কামতা মৌজায় অবস্থিত এসব জমির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৬২ কোটির বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাজীপুরের কালীগঞ্জেও তার নামে জমির মালিকানার নথি পাওয়া গেছে। শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগ স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি অস্থাবর সম্পদের দিক থেকেও সহিদুল পরিবারের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। তথ্য অনুযায়ী, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক হিসাবেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সন্তানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহিদুল ইসলামের ছেলে হাসিন ফারহানের নামেও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। বসুন্ধরার একটি বাণিজ্যিক ভবনে অফিস নিয়ে তিনি আর্কিটেকচার, ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও মার্কেটিং খাতে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে কয়েক কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি চাকরি বনাম সম্পদের হিসাব একাধিক অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন কাস্টমস বা এনবিআর কর্মকর্তার পুরো চাকরিজীবনের বৈধ আয়—বেতন, ভাতা, পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য সুবিধাসহ—মোটামুটি কয়েক কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় বাদ দিলে সঞ্চয়ের পরিমাণ খুব বেশি হলে তিন কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। এই হিসাবের সঙ্গে অনুসন্ধানে উঠে আসা কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের অঙ্কের ব্যাপক পার্থক্য প্রশ্ন তৈরি করেছে। সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন সহিদুল ইসলাম কর্মজীবনে এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অন্তর্ভুক্ত। নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তার নামে থাকা অধিকাংশ সম্পদ ২০১০ সালের পর অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই সম্পদগুলোর উৎস কী এবং সেগুলো আয়কর নথিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি না—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা অভিযোগ ও সম্পদের উৎস সম্পর্কে বক্তব্য জানার জন্য সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে হয়েছে।সহিদুল ইসলাম ফোনকল কিংবা বার্তার জবাব দেননি। তার স্ত্রীও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। জবাবদিহির দাবি সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, সম্পদের উৎস সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান পরিচালনা করা। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। কারণ জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তদন্তের নতুন পর্যায়? সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে এবং ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা, সম্পদের উৎস যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছে। এখন নজর থাকবে—উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কী ধরনের তদন্ত চালায়, সম্পদের উৎস সম্পর্কে কী ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত আইনগত প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়। কারণ কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের এই প্রশ্ন কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, সুশাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার কার্যকারিতারও একটি বড় পরীক্ষা। দুর্নীতি প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তার এই পরিমাণ সম্পত্তি অর্জনের ঘটনা প্রমাণ করে যে কাস্টমস বিভাগের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কতটা অভাব রয়েছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে এবং অবৈধ সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা না হলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির এই মরণব্যাধি থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে ।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ১, ২০২৬ 0
খুরশীদ আলম
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ খুরশীদ আলম: পুরনো অভিযোগ, নতুন দায়িত্ব

 ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে এম খুরশীদ আলমের নিয়োগ ব্যাংকিং খাতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জোবায়দুর রহমান-এর পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের পরপরই ব্যাংকটির একাংশ গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ দেখা দেয়। ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের উদ্যোগে মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীর মতিঝিলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, অতীতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকের নেতৃত্বে বসানো হয়েছে। যে অভিযোগগুলো ঘুরে ফিরে আসছে ব্যাংকিং খাতের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্রয় ও সংস্কার কাজের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় অভিযোগ ওঠে যে, বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট তদন্তে অন্তত ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়। তদন্তে আরও উঠে আসে, প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার বিভিন্ন কাজের মধ্যে নির্মাণ ও আসবাবপত্র ক্রয়ে বড় ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি ছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। তদন্তের পরও পদোন্নতি বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুটি পৃথক তদন্তে অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পর খুরশীদ আলমকে একসময় বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। তবে পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি পদোন্নতি পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে আসীন হন। সমালোচকদের অভিযোগ, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডেপুটি গভর্নর হিসেবে বিতর্ক ২০২৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে খুরশীদ আলমকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সময় দেশের ব্যাংকিং খাত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণসংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে তিনি এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন। বিশেষ করে S Alam Group-কে ঘিরে আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারি ও ব্যাংকিং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে।   ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে শুরু হওয়া আন্দোলনের মুখে কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হন। আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের একাংশ তাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শাসনের সহযোগী এবং দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন। খুরশীদ আলমও সেই পদত্যাগকারী কর্মকর্তাদের অন্যতম ছিলেন। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির কিছু গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহল আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, অতীতের অভিযোগগুলো ব্যাংকের ভাবমূর্তি ও গ্রাহক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিক্রিয়া মেলেনি প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম খুরশীদ আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান-এর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন রয়ে গেছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও আস্থার সংকটে ভুগছে। এমন বাস্তবতায় অতীতে অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত কোনো কর্মকর্তাকে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের নেতৃত্বে বসানো কতটা যৌক্তিক—সে প্রশ্ন এখন ব্যাংকপাড়া ছাড়িয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে জনমনে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা।   খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। তিন বছরের জন্য তাকে এ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হন।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ১, ২০২৬ 0
বরিশাল এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ নুরুল ইসলাম
সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বরিশাল এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ভয়াবহ অনিয়ম, ভুয়া স্কিম এবং কাগুজে কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে বাস্তব কাজের তুলনায় কাগজে-কলমে ব্যয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে কয়েকগুণ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজই না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এলজিইডি বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান, দাপ্তরিক নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া, নাজিরপুর ও সদর উপজেলায় একাধিক প্রকল্পে সংঘবদ্ধভাবে আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। ‘ভূতুড়ে স্কিম’ দেখিয়ে টাকা উত্তোলন তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, IBRP, CAFDARID, PDRIDP এবং BDIRWSP প্রকল্পের আওতায় শত শত ভুয়া ও কল্পিত স্কিম দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই ছাড়াই বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ১২৮টি ভুয়া বা অস্তিত্বহীন স্কিম দেখিয়ে প্রায় ২৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট ও আয়কর বাদ দিয়ে প্রায় ২০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্প—CAFDARID-এর আওতায় আরও ৬৯টি ভুয়া স্কিম দেখিয়ে প্রায় ২০ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বিল উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রকল্পের বড় অংশের কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কোনো কাজের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি, অথচ কাগজে প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়িত দেখানো হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে যে সিন্ডিকেট দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই অর্থ লোপাটের সঙ্গে এলজিইডির একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ মদদে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম এবং হিসাব রক্ষণ ও নিরীক্ষা বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা সরকারি অর্থ আত্মসাতে অংশ নেন। তদন্ত সূত্র জানায়, কর্মকর্তাদের আত্মীয়-স্বজন কিংবা বেনামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ ভাগিয়ে দেওয়া হতো। নিয়ম অনুযায়ী কাজের পরিমাপ বই (Measurement Book বা এমবি) প্রস্তুত ছাড়াই বিল অনুমোদনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে কি না তা যাচাই না করেই কোটি কোটি টাকার বিল ছাড়ের অনুমোদন দেন শেখ নুরুল ইসলাম। অনুসন্ধানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ তার কাছেও পৌঁছাত। দুদকের পৃথক অনুসন্ধান এদিকে, এলজিইডির জলবায়ু প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালেও শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক স্বাক্ষরিত ২৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের এক অফিস আদেশে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর কাছে শেখ নুরুল ইসলামের সামগ্রিক তথ্য চাওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, জলবায়ু প্রকল্পে জনবল নিয়োগে অনিয়ম, কেনাকাটায় স্বচ্ছতার অভাব এবং আর্থিক লেনদেনে অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক পৃথক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ সময়জুড়ে শেখ নুরুল ইসলাম প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সক্রিয় নেতৃত্বে থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান বজায় রেখেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলজিইডির ভেতরের কয়েকজন প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আর্থিক অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। তবে প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে সেসব অভিযোগ দৃশ্যমান তদন্তে রূপ পায়নি। মামলা, কিন্তু পদে বহাল দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পিরোজপুর ইতোমধ্যে শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামসহ ২১ জন কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও ২০১ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে গুরুতর এসব অভিযোগ ও মামলার পরও শেখ নুরুল ইসলাম এখনও স্বপদে বহাল থাকায় এলজিইডির অভ্যন্তরে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষের করের টাকা লুটপাটের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতি জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হবে। এখন নজর দুদকের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে—এই অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদৌ দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না।   আস্থার সংকটে উন্নয়ন ব্যবস্থা বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এ ধরনের অনিয়ম শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও জনআস্থার জন্যও বড় হুমকি। কারণ, যেসব প্রকল্প গ্রামীণ সড়ক, অবকাঠামো ও দুর্যোগ পুনর্বাসনের জন্য নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অর্থ আত্মসাৎ হলে ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষই। এখন নজর আইনি প্রক্রিয়ার দিকে—দুদকের অনুসন্ধান ও মামলার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদৌ কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটিই দেখার অপেক্ষা।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৭, ২০২৬ 0
ডিএসসিসিতে ২২ বছর ‘অবৈধ’ দায়িত্বে সিরাজুল ইসলাম
ডিএসসিসিতে ২২ বছর ‘অবৈধ’ দায়িত্বে সিরাজুল ইসলাম, তদন্তে মিলল নিয়োগ জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) একজন কর্মকর্তা কীভাবে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদ দখলে রেখে দুই দশকের বেশি সময় প্রভাব বিস্তার করেছেন— স্থানীয় সরকার বিভাগের এক তদন্তে উঠে এসেছে সেই প্রশ্নই। মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, যার মূল পদ ‘স্থপতি’, তিনি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ‘প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ’ পদে বহাল আছেন। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী এই দায়িত্ব পাওয়ার মতো গ্রেড, যোগ্যতা কিংবা প্রশাসনিক অনুমোদন— কোনোটিই তার ছিল না বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব ড. মো. মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত তদন্তে বলা হয়েছে, ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও সিরাজুল ইসলামকে ৪র্থ গ্রেডের পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা বিদ্যমান বিধি-বিধানের সুস্পষ্ট ব্যত্যয়। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২০১১ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর ডিএসসিসিতে তার দায়িত্ব বহালের কোনো লিখিত আদেশ বা প্রশাসনিক অনুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “মৌখিক আদেশে প্রদত্ত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই।” নিয়োগের শুরুতেই প্রশ্ন তদন্তে উঠে এসেছে, ১৯৯৭ সালে ‘স্থপতি’ পদে নিয়োগ পাওয়ার সময়ও সিরাজুল ইসলামের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল না। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে বলা হয়েছে, তিনি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি প্রতিষ্ঠানের ডিপ্লোমা সনদ দাখিল করেন, যা বাংলাদেশের স্নাতক ডিগ্রির সমমান কিনা সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কোনো প্রত্যয়ন পাওয়া যায়নি। এছাড়া নিয়োগের সময় তার পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাও ছিল না। তদন্ত অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তিনি চাকরিতে যোগ দেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তার জীবনবৃত্তান্তে অভিজ্ঞতার দাবি থাকলেও প্রয়োজনীয় সনদপত্র নথিতে পাওয়া যায়নি। ‘সাময়িক দায়িত্ব’ থেকে ২২ বছরের ক্ষমতা ২০০৪ সালে তৎকালীন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের মৃত্যুর পর সাময়িকভাবে সিরাজুল ইসলামকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ‘সাময়িক’ দায়িত্বই স্থায়ী রূপ নেয়। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত এ ধরনের অতিরিক্ত দায়িত্ব কয়েক মাসের বেশি স্থায়ী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম প্রায় ২২ বছর ধরে একই পদে বহাল রয়েছেন। ২০১১ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নতুন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দিলেও দক্ষিণ সিটিতে আর কোনো নিয়োগ হয়নি। বরং সিরাজুল ইসলামই দায়িত্বে থেকে যান। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভক্তির পর নতুন করে দায়িত্ব প্রদানের কোনো নথি পাওয়া যায়নি। এমনকি ডিএসসিসির প্রতিনিধিও তদন্তে স্বীকার করেছেন, “তৎকালীন মেয়রের মৌখিক নির্দেশে” তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। একসঙ্গে পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে সিরাজুল ইসলাম শুধু প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; একই সঙ্গে একাধিক বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব নিয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তিনি অন্তত তিনটি বড় প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে— ৮৫০ কোটি টাকার ঢাকা সিটি নেবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্প নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্প ঢাকা নগর মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রকল্প সরকারি নীতিমালায় একজন কর্মকর্তাকে সাধারণত একটি প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও, বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুটি প্রকল্পে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পর্যাপ্ত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সিরাজুল ইসলামের ক্ষেত্রে এসব শর্ত মানা হয়নি। দুর্নীতির অভিযোগ ও দুদক তদন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতেই স্থানীয় সরকার বিভাগের এই তদন্ত শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের মতো প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তদন্তে কয়েক কোটি টাকা অনিয়মের তথ্য উঠে এলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু সিরাজুল ইসলামের ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং ডিএসসিসির প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে “মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয়নি” সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়নের এই সময়ে একটি বৃহৎ নগরীর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দায়িত্বে দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তার উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকায় নগর ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্তে অনিয়মের একাধিক দিক উঠে এলেও এখন পর্যন্ত সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে— দুই দশকের বেশি সময় ধরে কীভাবে একজন কর্মকর্তা প্রশাসনিক নিয়ম উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকলেন? আর এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তাকে কারা রক্ষা করেছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৬, ২০২৬ 0
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী
ইআরডি সচিব শাহ্‌রিয়ার কাদেরের বিরুদ্ধে পদোন্নতি কারসাজির অভিযোগ: ২০১৭ সালের সেই ‘কচুকাট’ বিতর্ক ফের আলোচনায়

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রদবদল হলেও এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে বহাল রয়েছেন সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠে আসে ২০১৭ সালের অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সুপারিশে হস্তক্ষেপ করে রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে বাদ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা এবং তৎকালীন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে বিএনপি-ঘরানার বা ছাত্রজীবনে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন কর্মকর্তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অনেক কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়াকে আখ্যা দিয়েছেন “কচুকাট” হিসেবে। এসএসবির সুপারিশে ‘হস্তক্ষেপ’ ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর ১৩৩ জন যুগ্মসচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই পদোন্নতির পেছনের প্রক্রিয়া নিয়ে তখন থেকেই প্রশাসনে তীব্র বিতর্ক ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে এসএসবির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক দফা যাচাই-বাছাই শেষে বোর্ড ১৭২ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনার জন্য আরও ১৯ জন কর্মকর্তার একটি পৃথক তালিকাও তৈরি করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই সুপারিশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রতিমন্ত্রীর পিএস হিসেবে শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী সেই ফাইলে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। তৎকালীন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, এসএসবির সুপারিশকৃত ফাইলটি তিনি প্রায় এক মাসের বেশি সময় নিজের নিয়ন্ত্রণে আটকে রাখেন। ওই সময় তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার নাম বাদ দেওয়া হয় এবং নতুন কিছু নাম যুক্ত করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এসএসবির সুপারিশে থাকা প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। বাদ পড়াদের বড় অংশকে বিএনপি-জামায়াত ঘরানার অথবা “অতিরিক্ত নিরপেক্ষ ও সৎ” কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যায়নি মূল তালিকা তৎকালীন সময়ে প্রশাসনে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী পদোন্নতির তালিকায় আপত্তি জানিয়ে তা ফেরত পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বাস্তবে ফাইলটি প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েই পাঠানো হয়নি। বরং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই তালিকায় কাটাছেঁড়া করা হয়। পরে সংশোধিত তালিকা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় এবং এক দিনেরও কম সময়ে সেটি অনুমোদন পায়। প্রশাসনের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা বলছেন, এসএসবির মতো সাংবিধানিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি বাছাই প্রক্রিয়ায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ ছিল নজিরবিহীন। তাদের ভাষ্য, মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার এসএসবির সুপারিশে এভাবে কাটাকাটি করার আইনি এখতিয়ার নেই। কারণ বোর্ডের সুপারিশ চূড়ান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানোর কথা। ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ হয়ে ওঠা তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী তখন এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন যে তিনি প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর নির্দেশনাকেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যত নিয়ন্ত্রণ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের অনুগত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে সক্রিয় ছিলেন এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মকর্তাদের প্রশাসনে পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল নেন। প্রশাসনের ভেতরে তখনকার ক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল—এসএসবির সুপারিশে থাকা বহু কর্মকর্তার নাম বাদ পড়লেও সেই বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক অবস্থান বদলের অভিযোগ প্রশাসনের ১১তম ব্যাচের কর্মকর্তা শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার প্রবণতা। তার সম্পর্কে প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, বিএনপি-জামায়াত আমলে তিনি নিজেকে জামায়াতঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতার ভারসাম্য বদল হলে তিনি সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন। এমনকি সম্প্রতি তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার একটি প্রজ্ঞাপন জারি হলেও এক দিনের মধ্যে সেটি স্থগিত করা হয় এবং তিনি ইআরডির সচিব হিসেবেই বহাল থাকেন। এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—প্রভাবশালী এই কর্মকর্তার অবস্থান এখনো কেন অটুট? বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ক্ষোভ ২০১৭ সালের সেই পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের অন্তত ২৫৫ জন কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অন্যান্য ক্যাডার মিলিয়ে সংখ্যাটি ৩০০ ছাড়িয়ে যায়। তৎকালীন বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো মনে করেন, রাজনৈতিক বিবেচনা এবং ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের স্বাভাবিক পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যকে যোগ্যতার ওপরে স্থান দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী ছিলেন তার অন্যতম কার্যকর বাস্তবায়নকারী। বর্তমান সরকার প্রশাসনে সংস্কার ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার কথা বললেও, বিতর্কিত অতীতের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা সেই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0
বিপিসির সাবেক পিএস আহম্মদুল্লাহর শত কোটি টাকার সম্পদ, বদলি-বাণিজ্য ও নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা মো. আহম্মদুল্লাহকে চলতি মাসের ১৩ তারিখে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ঢাকা লিয়াজোঁ অফিসে কর্মরত। তবে তার বদলিকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে বিপিসিজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং দুর্নীতির বিস্তৃত অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র সাত বছরের চাকরি জীবনে মো. আহম্মদুল্লাহ এবং তার পরিবারের সদস্যরা শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিপিসি বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করেনি। কেবল বদলির আদেশ দিয়েই বিষয়টি থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। বিতর্কিত নিয়োগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার উত্থান ২০১৯ সালে বিপিসিতে উপ-ব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন মো. আহম্মদুল্লাহ। তবে তার নিয়োগ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমানের ব্যক্তিগত আশীর্বাদেই তিনি চাকরি পান। আহম্মদুল্লাহ একসময় সামছুর রহমানের মেয়ের গৃহশিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক যোগাযোগও তাকে এগিয়ে দেয়। ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার দিবাকরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি চাকরিতে যোগ দেন ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে। অভিযোগ রয়েছে, এ জন্য তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় পরিচয়পত্রও ব্যবহার করেন। একটি প্রত্যয়নপত্রে তাকে ঝালকাঠির নথুল্লাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে তার পরিবারের সদস্যদেরও আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী বলা হয়। অভিযোগকারীরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় এবং ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়েই বিপিসিতে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন আহম্মদুল্লাহ। নিয়ম ভেঙে পিএস পদে বহাল বিপিসির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব পদটি সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) সমমানের হলেও, উপ-ব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) পদে থেকেও দীর্ঘদিন ওই দায়িত্ব পালন করেছেন আহম্মদুল্লাহ। এমনকি বদলির আগের দিন পর্যন্তও তিনি একই পদে বহাল ছিলেন। ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর তাকে চেয়ারম্যানের পিএস পদ থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম কার্যালয়ের হিসাব বিভাগে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে সেই আদেশ বাতিল করিয়ে তিনি পুনরায় আগের পদে ফিরে আসেন। বিপিসির নীতিমালা অনুযায়ী তিন বছর পরপর বদলির বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি সাত বছরের বেশি সময় একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। সম্পদের পাহাড় ও কেরানীগঞ্জের ‘রহস্যময়’ প্লট মো. আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ অবৈধ সম্পদ অর্জন। তার স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে সাড়ে তিন কাঠার একটি প্লট কেনার তথ্য মিলেছে। ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর সম্পাদিত একটি সাফ কবলা দলিল অনুযায়ী, প্লটটি বিক্রি করেন চট্টগ্রামভিত্তিক বাশার গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক আবুল বশর আবু। দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয় ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই প্লটে ইতোমধ্যে আটতলা ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভবনে ঝুলানো সাইনবোর্ডে এখনো লেখা রয়েছে—“বাশার গ্রুপ অব কোম্পানি, আলহাজ আবুল বশর (আবু)”। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি নথিতে মালিকানা নুসরাত জেবিন সিনথীর হলেও বাস্তবে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই এলাকায় প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য ৪২ থেকে ৪৭ লাখ টাকা। সে হিসেবে শুধু জমির বর্তমান মূল্যই দেড় কোটি টাকার বেশি। টেন্ডার, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ বিপিসির বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আহম্মদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে বিপিসির টেন্ডার, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন কোম্পানি ও ডিপো থেকে অর্থ আদায় করতেন। বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউসে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীকে বিটুমিন, ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আমদানির অনুমোদন পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া বিপিসির অধীন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, বদলির ভয় দেখিয়ে ডিপো ইনচার্জদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা হতো। ব্যাংক হিসাব ও এফডিআর ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাব পরিচালনায়ও প্রভাব খাটিয়েছেন আহম্মদুল্লাহ। তার পছন্দের ব্যাংকগুলোতে বিপিসির বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা রাখা হতো বলে অভিযোগ। এমনকি এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতেও বিপিসির হাজার হাজার কোটি টাকা জমা রাখার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব হিসাবের মধ্যে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা এখনো উদ্ধার করা যায়নি। ব্যাংকিং সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আত্মীয়-স্বজনদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ‘নিজস্ব বলয়’ গঠনের অভিযোগ বিপিসির বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে, আহম্মদুল্লাহ নিজের জেলা বরিশালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করতেন। চেয়ারম্যান, পরিচালক ও রেস্ট হাউস সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তার ঘনিষ্ঠদের বসানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের বিপিসির বিভিন্ন ডিপো ও অফিসে চাকরি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত উপ-ব্যবস্থাপক (ডিএলও) মো. আশিক শাহরিয়ারকেও নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আশিক শাহরিয়ারকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ডিপো ও পার্টির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। দুদকের অনুসন্ধান ও সম্পদ বিবরণী অভিযোগ রয়েছে, মো. আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। যদিও সেই অনুসন্ধানের অগ্রগতি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি দুদকে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে মো. আহম্মদুল্লাহর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব, ভয়ভীতি এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাননি। এখন প্রশ্ন উঠেছে—শুধু বদলি করেই কি শেষ হবে অভিযোগের পর্ব, নাকি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তে নামবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0
আওয়ামী দোসর খ্যাত শিপলু কর্মকার
ঝালকাঠি এলজিইডির শতকোটি টাকার টেন্ডার বিতর্কে আওয়ামী দোসর খ্যাত শিপলু কর্মকার : কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

বরিশাল অফিস :   স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঝালকাঠি জেলার শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার মূল্যায়ন নিয়ে অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী দোসর খ্যাত সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে পছন্দসই ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করা হয়েছে। যদিও তাকে সম্প্রতি বরিশাল এলজিইডিতে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে, তবে এখনো তিনি ঝালকাঠিতেই দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঝুলে থাকা ১২টি টেন্ডার ঝালকাঠি এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জেলার প্রায় ৩০টি গ্রুপের টেন্ডারের মধ্যে অধিকাংশের মূল্যায়ন শেষ হলেও এখনো ১২টি টেন্ডারের মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়নি। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে— আইবিআরপি প্রকল্পের গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ জেপি (ঝালকাঠি-পিরোজপুর) প্রকল্প ভিআরআরপি গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন বিডিআইআরডব্লিউএসপি প্রকল্প বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প সাইক্লোন আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প (সিএএফডিআরআইআরপি) প্রায় ১০০ কোটি টাকার এসব প্রকল্পের দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৬ জানুয়ারি ২০২৬। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যের কারণে তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এনওএ জারি, কার্যাদেশ আটকে এদিকে ১৮টি গ্রুপের টেন্ডারের মূল্যায়ন শেষে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) জারি করা হলেও এখনো কোনো কার্যাদেশে স্বাক্ষর করেননি ঝালকাঠি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম সাহাবুদ্দিন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনিকভাবে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। পিপিআর বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এলজিইডি সূত্র বলছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) বিধি ৪৮ অনুযায়ী প্রকিউরমেন্ট প্রসেসিং ও অনুমোদন কার্যক্রম চার সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু শিপলু কর্মকারের দায়িত্বে থাকা টেন্ডারগুলোতে সেই সময়সীমা বহু আগেই অতিক্রম করেছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ১২টি গার্ডার ব্রিজের টেন্ডারে অভিজ্ঞতার স্থানে অন্য ধরনের কাজের সনদ গ্রহণ করে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যদের বিভিন্ন অজুহাতে অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে শিপলু কর্মকার একক প্রভাব বিস্তার করছেন এবং পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। “কমিশন ছাড়া কাজ সম্ভব নয়” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, এনওএ জারি থেকে শুরু করে কার্যাদেশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কমিশন ছাড়া কাজ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদের ভাষ্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে কমিশন দিতে হবে—এমন কথা বলেও অর্থ দাবি করা হয়েছে। মূল্যায়নে বিলম্বের কারণে বেশ কয়েকটি প্যাকেজের টেন্ডারের কার্যকারিতা মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে ঝালকাঠিতে যোগদানের পর থেকেই শিপলু কর্মকার টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তিনি ছাড়া অন্য কাউকে কার্যত সম্পৃক্ত রাখা হয়নি। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ঝালকাঠির প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে আওয়ামী লীগের সময়কার প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন শিপলু কর্মকার। আগৈলঝাড়া ও ভোলায়ও ছিল বিতর্ক এলজিইডির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তিনি বিতর্কের মুখে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে অনুগত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো। পরবর্তীতে ভোলা সদর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানেও ঠিকাদার সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। “অদক্ষ ও অর্থলোভী কর্মকর্তা” এলজিইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, “শিপলু কর্মকারের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, কাজের তদারকিতে ঘাটতি এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়নের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।” তৎকালীন ভোলা জেলার দায়িত্বশীল এক প্রকৌশলীর ভাষ্য, “তিনি মূলত অদক্ষ ও অর্থলোভী কর্মকর্তা। ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থেকে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন।” এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের একজন প্রকল্প পরিচালকও অভিযোগের সুরে বলেন, “আওয়ামী সরকারের সময় গড়ে ওঠা বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।” আরেকজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “শিপলু কর্মকার একজন চরম বিতর্কিত প্রকৌশলী। ঠিকাদারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং কৌশলে অর্থ আদায়ই তার মূল লক্ষ্য।” বদলি নিয়েও প্রশ্ন সম্প্রতি বরিশাল বিভাগীয় শহরের নির্বাহী প্রকৌশল কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে তার পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বিতর্কিত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। শিপলু কর্মকার যা বললেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকার। তিনি বলেন, “এসব কাজের এস্টিমেট ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের। আমি যোগদানের পর টেন্ডারগুলো আহ্বান করায় একটি সিন্ডিকেটের আক্রোশের শিকার হয়েছি। তারা সমঝোতার মাধ্যমে ব্রিজের কাজ নিতে চেয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালের পিপিআর অনুযায়ী কাউকে কাজ দেওয়ার সুযোগ নেই। মূল্যায়নের সময়সীমা ১৫০ দিন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে কারিগরি আপত্তি থাকায় মূল্যায়নে বিলম্ব হয়েছে। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষ হবে।” বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, “শুনেছি আমাকে বরিশালে বদলি করা হয়েছে। তবে এখনো অফিসিয়াল চিঠি হাতে পাইনি। আমার বদলির সঙ্গে এই টেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই।” প্রশাসনের অবস্থান ঝালকাঠি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম সাহাবুদ্দিন বলেন, “মূল্যায়নের পুরো দায়িত্ব সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর। তিনি বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।” তিনি আরও জানান, “সমস্যা নিরসনে জেলা প্রশাসকের সহায়তা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে মিডিয়ার উপস্থিতিতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চিন্তাভাবনা চলছে, যাতে কোনো সন্দেহ বা দ্বিধা না থাকে।” অন্যদিকে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ঝালকাঠি জেলা থেকে ত্রুটিযুক্ত কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে পুনরায় প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকিউরমেন্ট ইউনিটের যাচাই শেষে তা আবার জেলায় ফেরত পাঠানো হবে। এ কারণেই কিছুটা সময় লাগছে বলে তিনি দাবি করেন। প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, ঝালকাঠির টেন্ডার প্রক্রিয়া ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা, মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২২, ২০২৬ 0
জুলিয়া রহমান-আনিকা রহমান - রিফাত
এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : তদন্তে দুদক ও ভ্যাট গোয়েন্দা

বরিশাল অফিস : একসময় দেশের শিল্পখাতে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল বরিশাল ভিত্তিক অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড। খান সন্স ভবন, ৫১ কাঠপট্টি রোডে করপোরেট অফিস এবং রূপাতলীতে কারখানা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বিদশে অর্থ পাচারের কারনে এখন ভয়াবহ আর্থিক সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ এবং ব্যাংক ঋন খেলাপী,বিদ্যুৎ বিল বকেয়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন,কর্মকর্তাদের বেতন বকেয়ায় কর্ম বিরতি, ৩ দেশে অর্থপাচার করে সম্পদের পাহাড় বানানো,৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি,সরকার থেকে অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা নেয়া,ঈদুল আজহার পরে স্থায়ী ভাবে বন্ধ করে দেয়ার পায়তারা,ডিলার, রিটেইলারদের থেকে অতিরিক্ত কমিশন দেয়ার নামে অগ্রীম টাকা নিয়ে সিমেন্ট না দেয়া,পাওনাদারদের পাওনা টাকা না দেয়াসহ গুরুতর অভিযোগে আলোচনায় এসেছে।   ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ,তদন্তে ভ্যাট গোয়েন্দা   ৪০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি ও অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা নেয়ায় কাগজপত্রসহ অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড এর কর্তৃপক্ষকে তলব করেছে কাস্টমস,ও ভ্যাট বিভাগ। ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বিষয়টি আমলে নিয়ে এ্যাংকর সিমেন্টের  শুল্ক ফাঁকি, ভ্যাট জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের বিষয়ে নজরধারী ও তদন্ত শুরু করেছে।  বিদেশে নাগরিত্ব গ্রহন, বাংলাদেশের অর্থ বিদেশে পাচার এবং জ্ঞাত আয় বহির্ভুত অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলাসহ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করেছে।সম্প্রতি অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডকে দুদক নোটিশ প্রদান করেছে। বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা   অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড এর অর্থ বিদেশে পাচার এবং বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা,দুদকের অনুসন্ধান,ভ্যাট ফাঁকি ও সরকার থেকে অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা নেয়ার ফলে ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বিষয়টি আমলে নেয়ায়,ব্যাংক ঋন বকেয়া, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া,কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা বকেয়া, ডিলার, রিটেইলারদের থেকে অতিরিক্ত কমিশন দেয়ার নামে অগ্রীম টাকা নিয়ে সিমেন্ট না দেয়া,পাওনাদারদের পাওনা টাকা না দেয়ার চাপ বাড়তে থাকায় অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড এর চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান ,ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমান ও পরিচালক রিফাত বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড এর একটি বিশ্বস্ত সুত্র নিশ্চিত করেছে। দুবাই,আমেরিকা ও লন্ডনে তাদের বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে।তারা এই তিন দেশের কোন এক দেশে যাবেন বলে সুত্র জানায়।   জুলিয়া রহমান-আনিকা রহমান - রিফাত                                                                                                                                                        ছবি- ইত্তেহাদ নিউজ   পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে লিখিত অভিযোগ   সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে এক প্রবাসী লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়,অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মরহুম মজিবুর রহমান খানের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেন তার স্ত্রী জুলিয়া রহমান, মেয়ে আনিকা রহমান এবং জামাতা রিফাত। এরপর থেকেই কোম্পানির অর্থ বিদেশে পাচার এবং অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু  করেন। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, জুলিয়া রহমান হুন্ডির মাধ্যমে ও আন্ডার ইন ভয়েসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে একাধিক ডুপ্লেক্স বাড়ি ও ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অর্থ এসেছে অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের তহবিল ও ব্যাংক ঋণ থেকে। একইসঙ্গে জুলিয়া রহমান অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। তার বিদেশি ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—৫১ চার্চ স্ট্রিট, সেন্ট জন’স, অ্যান্টিগুয়া।   কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ অন্যদিকে আনিকা রহমান ও তার স্বামী রিফাতের বিরুদ্ধে দুবাই, শারজাহ এবং নিউইয়র্কে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে স্থানান্তরে সহায়তা করেছেন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাদের মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএস নিলুফা ,পরিচালকের পিএস জুয়েল ইসলাম,সিওও শাহেদ উদ্দিন,মার্কেটিং প্রধান ইমাম ফারুকী,সেলস মার্কেটিং ম্যানেজার মেহেদী হাসান,ভ্যাট ব্যবস্থাপক মোস্তফা ও রিয়াজসহ আরো অনেকে। সহায়তা করার জন্য এসব কর্মকর্তারা হয়েছেন ক্রোড়পতি।গড়েছেন নামে বেনামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সহায় সম্পদ। বন্ধ রয়েছে এ্যাংকর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী ও ব্যাগ ফ্যাক্টরী                                                                                                                            ছবি- ইত্তেহাদ নিউজ              ব্যাংক ঋণ  সংকটে ও উৎপাদন বন্ধ   জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার সময় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি এবং ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ঋণের অর্থ উৎপাদনে ব্যবহার না করে বিদেশে সরিয়ে নেওয়ায় বর্তমানে কোম্পানিটি মারাত্মক ঋণ সংকটে পড়েছে। বর্তমানে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। কাঁচামালের সংকট, এলসি খুলতে অক্ষমতা এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে তাদের মধ্যে অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে। একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বেতন বকেয়া থাকায় এখন কর্ম বিরতি চলছে।   নতুন ঋণের জন্য জাল কাগজ তৈরির অভিযোগ   এদিকে অভিযোগ রয়েছে, নতুন করে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু জমির জাল কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজও চলছে। এ কাজে স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।   বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,আটকের দাবি   সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমান এবং পরিচালক রিফাত এর বিদেশ গমনের পথ বন্ধ করে  তাদের আটক করে এবং অভিযোগগুলো সঠিকভাবে দুদক ও ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তদন্ত করলে বড় ধরনের অর্থপাচার ও ব্যাংক জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযুক্তদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা ।   আরও পড়ুন: এ্যাংকর সিমেন্টে ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ : বন্ধ হতে যাচ্ছে এ্যাংকর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী বরিশালে এ্যাংকর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী বন্ধ হতে যাচ্ছে : বাড়ছে পাওনাদারদের ভিড়,গা ঢাকা দিয়েছে  এ্যাংকর সিমেন্টের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, আর্থিক সংকট,উৎপাদন বন্ধ , তদন্তের দাবি   তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত দাবি করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের শিল্প ও ব্যাংক খাতকে রক্ষা করতে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি দেশের শিল্পখাত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। এ্যাংকর সিমেন্টের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট নয়; বরং এটি করপোরেট সুশাসন, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে আনছে। এক কথায় এই অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের গল্প শুধুমাত্র একটি ব্যবসার পতনের নয়, বরং নৈতিকতার, প্রজ্ঞার, এবং দেশপ্রেমের চূড়ান্ত পরীক্ষা।   এ্যাংকর সিমেন্টে ভয়াবহ কেলেঙ্কারি! বিদেশে সম্পদের পাহাড়, তদন্তে দুদক বরিশালের সিমেন্ট সাম্রাজ্যে ধস: ব্যাংক ঋণ থেকে বিদেশে বিলাসবহুল বাড়ি! ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি? এ্যাংকর সিমেন্ট নিয়ে তোলপাড় বেতন নেই, উৎপাদন বন্ধ, বিদেশে সম্পদ—সংকটে এ্যাংকর সিমেন্ট হুন্ডিতে অর্থপাচারের অভিযোগ, বিদেশে পালানোর শঙ্কা কোম্পানি কর্তাদের সিমেন্ট কোম্পানি নাকি অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক? তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য দুবাই-লন্ডন-নিউইয়র্কে সম্পদ, দেশে বন্ধ কারখানা! প্রশ্নের মুখে এ্যাংকর সিমেন্ট ডিলারদের কোটি টাকা আটকে, তদন্তে ভ্যাট গোয়েন্দা ও দুদক     আগামী পর্বে থাকছে ------ ▪️অযোগ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নেপথ্যে করপোরেটে নিলা ও ফ্যক্টরীতে শাহেদ উদ্দিন।  ▪️ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে অলিম্পিক সিমেন্ট, অলিম্পিক ফাইবার,অলিম্পিক শিপিং লাইনস লিমিটেড।  ▪️সহায় -সম্পত্তি জামানতের চেয়ে ব্যাংক ঋন পরিমান কত?।  ▪️কোম্পানী ধ্বংসের কারিগর  এমডি,ডিরেক্টর,এমডির পিস,ডিরেক্টরের পিএস,সিওও,সিএমও,ভ্যাট কর্মকর্তাসহ একাধিক কর্মকর্তা। ▪️অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড থেকে অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনসহ টাকার পাহাড় গড়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএস নিলুফা ,পরিচালকের পিএস জুয়েল ইসলাম,মার্কেটিং প্রধান ইমাম ফারুকী,সেলস মার্কেটিং ম্যানেজার মেহেদী হাসান,ভ্যাট ব্যবস্থাপক মোস্তফা ও রিয়াজসহ একাধিক কর্মকর্তারা। এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে  ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অর্থ আত্মসাতে সহায়তাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন।  

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২১, ২০২৬ 0
দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ির রেণুপোনা পাচার: টুলু সিন্ডিকেট
দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ির রেণুপোনা পাচার: টুলু সিন্ডিকেট, কোটি টাকার এই অবৈধ বাণিজ্যের নেপথ্যে যারা

মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল : উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করে দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলছে নিষিদ্ধ চিংড়ির রেণুপোনা পাচার। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বরিশালকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রতিরাতে কোটি টাকার অবৈধ রেণুপোনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করছে। স্থানীয় সূত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, প্রশাসনিক পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, অসাধু ব্যবসায়ী,  সাংবাদিক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশ থাকার অভিযোগ রয়েছে।   ‘টুলু সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত একটি নেটওয়ার্ক অনুসন্ধানে জানা যায়, গোপালগঞ্জের টুলু নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বাণিজ্যের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দক্ষিণাঞ্চলের রেণুপোনা বাণিজ্যে একক আধিপত্য গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।  অভিযোগের বিষয়ে টুলুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। সূত্র বলছে, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত এই সিন্ডিকেটে সিপন, হারুন, বিপ্লব, রনি, জিন্নাত ডাক্তার, নিও, সুমনরাজ, সকেট জামাল, রহিমসহ প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উপকূল থেকে নগর—রাতভর পাচারের রুট তদন্তে উঠে এসেছে, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, ভোলার উপকূলীয় অঞ্চল ও মেহেন্দিগঞ্জ এলাকার নদী মোহনা থেকে অবৈধভাবে চিংড়ির রেণুপোনা সংগ্রহ করা হয়। পরে ড্রামভর্তি করে ট্রাক, ট্রলার ও স্পিডবোটে করে সেগুলো বরিশাল হয়ে খুলনা ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রশাসনের নজর এড়াতে প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে এই চক্র। কখনও মাছবাহী ট্রাক, কখনও সাংবাদিক স্টিকার লাগানো প্রাইভেটকার ব্যবহার করা হচ্ছে পরিবহনে।   ‘সাংবাদিক স্টিকার’ ব্যবহার করে নিরাপদ রুটের অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে পোর্ট রোড এলাকার এক মৎস্য ব্যবসায়ী রনির বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটকে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, গভীর রাতে প্রাইভেটকারে ‘Press’ বা ‘সাংবাদিক’ স্টিকার ব্যবহার করে তারা রেণুপোনার চালান নিরাপদে পার করে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন চেকপোস্ট এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানী দলের হাতে এমন কয়েকটি ভিডিও এসেছে, যেখানে সাংবাদিক স্টিকারযুক্ত গাড়ির গতিবিধি সন্দেহজনক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।  ‘ম্যানেজ বাজেট’: ৪৪ লাখ টাকার সমঝোতার অভিযোগ স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রেণুপোনা পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও কিছু সংবাদকর্মীকে ‘ম্যানেজ’ করার জন্য একটি বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়। বরিশাল নগরীর কয়েকটি অভিজাত হোটেলে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে প্রথমে ৩৬ লাখ টাকার একটি সমঝোতা বাজেট নির্ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেটি বাড়িয়ে ৪৪ লাখ টাকা করা হয় বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।   কনস্টেবল  মেহেদি হাসানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ সাম্প্রতিক এক ঘটনায় বরিশাল আইনশৃংখলা বাহিনীর এক তদন্তকারী সংস্থার কনস্টেবল মেহেদি হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিকারপুর ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় তিনি নিজেকে ‘এসআই’ পরিচয় দিয়ে রেণুপোনা ভর্তি একটি ট্রাক ও একটি সিএনজি আটক করেন। পরে ব্যবসায়ীদের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়। দরকষাকষির একপর্যায়ে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। এ ঘটনায় ভোর থেকে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকায় ড্রামে থাকা প্রায় ৯০ হাজার রেণুপোনা মারা যায় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। এতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।তবে মেহেদি হাসান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।   নোমরহাট ব্রিজে ‘সরাসরি উপস্থিতি’ অনুসন্ধানী দল চাঁদপাশা–সায়েস্তাবাদ সংযোগস্থলের নোমরহাট ব্রিজ এলাকায় অবস্থান নিয়ে স্পিডবোট, ট্রলার ও ট্রাকে রেণুপোনা পরিবহনের দৃশ্য ধারণ করে।সেখানে কয়েকজনকে রেণুপোনাভর্তি ড্রাম ট্রাকে তুলতে দেখা যায়। স্থানীয়দের প্রশ্ন—মৎস্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট থানাকে না জানিয়ে কারা এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে, এবং কোন ক্ষমতাবলে তা হচ্ছে? এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।   প্রশাসনের অভিযান, তবু থামছে না পাচার র‌্যাব-৮, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও জেলা মৎস্য অধিদপ্তর একাধিক যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ রেণুপোনা, ইলিশ ও সামুদ্রিক মাছ জব্দ করেছে। বরিশালের রূপাতলী, দপদপিয়া সেতু ও বিভিন্ন প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসিয়ে বেশ কয়েকবার ট্রাকচালক, শ্রমিক ও সিন্ডিকেটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটক করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা।   জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করতে গিয়ে নদী ও মোহনায় শত শত প্রজাতির অন্যান্য মাছের পোনা ও জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ শিকার চলতে থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতি।   রেণু আহরণের সময়  নষ্ট করা হচ্ছে রেণু ও লার্ভি,দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ বিলুপ্তির শঙ্কা মৎস্য গবেষকরা বলছেন, নদী থেকে একটি চিংড়ি রেণু আহরণের সময় মাছ, জুপ্লাংকটনসহ বিভিন্ন জলজ প্রজাতির সাড়ে ৭৭৮টি রেণু ও লার্ভি নষ্ট করা হচ্ছে। মাছের রেণু রক্ষা করা না গেলে জীববৈচিত্র নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ বিলুপ্তির শঙ্কা রয়েছে।প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ২০০২ সালে গলদা চিংড়িসহ সব ধরনের মাছের রেণু পোনা আহরণ নিষিদ্ধ করে সরকার।চরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানেও নিয়মিত চোখে পড়ে এমন দৃশ্য। গোধূলী লগ্ন থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এই নিষিদ্ধ কার্যক্রম। মূলত মশারি জাল দিয়ে তৈরিকৃত এক ধরনের বিশেষ জাল (ঠেলা জাল) দিয়ে নদী থেকে চিংড়ির রেণু আহরণ করে থাকে জেলেরা। এসময় চিংড়ির পাশাপাশি নদীতে থাকা সকল ধরনের মাঝের পোনা ও লার্ভি উঠে আসে জালে। পরে সেগুলো থেকে বাছাই করে গলদা চিংড়ির রেণুগুলো সংরক্ষণ করলেও নির্বিচারে নষ্ট হচ্ছে অন্যান্য মাছের পোনা। জেলে তাজুল ইসলাম বলেন, চিংড়ির রেণু ধরে প্রতিদিন পাঁচশ থেকে ১২শ টাকা আয় হচ্ছে আমাদের। যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলেরজেলাগুলোর মাছের ঘেরে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে গলদা চিংড়ির রেণুর। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পঞ্চাশ পয়সা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত প্রতি পিস রেণু বিক্রি করা হয়ে থাকে।জেলে রূপম ইসলাম বলেন, চিংড়ি’র রেণু ধরা যে অবৈধ তা আমরা জানিনা। সংসার চালাতে পেটের দায়ে রেণু আহরণ করি আমরা। রেণু ধরতে গিয়ে হয়তো কিছু পোনা মারা যায়। তবে গলদা চিংড়ির রেণু বেছে বাকি মাছের রেণু আমরা নদীতে ফেলে দেই।   রেণু নিধণের ফলে নদীতে সংকট দেখা দিয়েছে মাছ উৎপাদনে,প্রভাব পড়ছে বাজারে চিংড়ি গবেষক আব্দুল বারী বলেন, প্রতিনিয়ত মাছের রেণু নিধণের ফলে নদীতে সংকট দেখা দিয়েছে মাছ উৎপাদনে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। আগে নদীতে বড় সাইজের চিংড়ি মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন আর তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। চিংড়ির দামও অনেক বেশি। নদীতে মাছের রেণু সংরক্ষণ করা না গেলে আগামীতে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি হয়ে যাবে।   রেণু আহরণ পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও চিংড়ি গবেষক ড. মো. হারুনর রশিদ বলেন, কোনো অবস্থাতেই মাছের রেণু আহরণ করা ঠিক নয়। এতে করে পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তিনি জানান, চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, নদী থেকে একটি চিংড়ির রেণু ধরার জন্য মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রজাতির প্রায় ৭৭৮টি পোনা ও লার্ভি নষ্ট করা হয়। প্রতি বছর প্রাকৃতিক উৎস হতে রেণু আহরণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে জলাশয়ের জীববৈচিত্র বিনষ্ট হওয়াসহ অনেক মাছ বিলুপ্তি আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে কৃত্রিমভাবে গলদা চিংড়ির রেণু উৎপাদন করার পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা প্রয়োজন।    নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। তাই পুরো সিন্ডিকেট, তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, প্রশাসনিক যোগসাজশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে, তবে তা শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থাই নষ্ট করবে না, বরং উপকূলীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্যও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২০, ২০২৬ 0
প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান
সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, কমিশন বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

সওজে ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’: মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডার জালিয়াতি, কমিশন বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন দপ্তরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সওজের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মনিরুজ্জামান কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাবশালী অবস্থান গড়ে তোলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে উপস্থাপন করে প্রশাসনিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ বর্তমানে সওজের জনবল নিয়ন্ত্রণ ও বদলি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখায় তাঁর অদৃশ্য প্রভাব বজায় রয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধাজনক পোস্টিং ও বদলির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। সওজের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণেই তিনি দীর্ঘদিন এই প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হন বলে তাঁদের দাবি। কক্সবাজারে ১৫০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রাক্কলন দেখিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়। সেখানে সমুদ্র উপকূলীয় ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুয়া বিল-ভাউচার ও অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো ছিল নিয়মিত চর্চা। পরবর্তীতে রাজশাহী জোনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ‘কোর সিন্ডিকেট’ গঠনের অভিযোগ রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালে ৪ থেকে ৫ জন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত কমিশন বা ‘পার্সেন্টেজ’ নিশ্চিত না করলে কোনো ঠিকাদারের পক্ষে টেন্ডারে অংশ নেওয়া কিংবা কাজ পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নির্দিষ্ট কয়েকটি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ আর্থিক সম্পর্কের তথ্য দুদকে জমা পড়া অভিযোগেও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে “আমিনুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কথাও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। নিম্নমানের কাজ ও পুনঃসংস্কারের চক্র মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত বা সংস্কার করা সড়ক বর্ষা শুরুর আগেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনভিত্তিক প্রকল্প অনুমোদনের সংস্কৃতি সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অন্যতম কারণ। ফলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক পুনরায় সংস্কারের তালিকায় চলে আসে। কমিশন ছাড়া ফাইল নড়ত না—অভিযোগ সওজের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বিভিন্ন প্রকল্পের প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল অনুমোদন হতো না। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন নেওয়ার কারণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার হলেও চূড়ান্ত বিল অনুমোদনে বাধা থাকত না। টিআইবির পর্যবেক্ষণ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় সড়ক খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে গড়ে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট কাজ করছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো কর্মকর্তার পক্ষে এত দীর্ঘ সময় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।” তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও টেন্ডার জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।” অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, ফরিদপুরে আদি বাড়ি থাকা মনিরুজ্জামান গত এক দশকে ঢাকা, ফরিদপুর ও রাজশাহীতে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফরিদপুরে কৃষি ও অকৃষি জমি, রাজশাহীতে বাণিজ্যিক প্লট ও ফ্ল্যাট, এবং ঢাকার বনানী, গুলশান, বসুন্ধরা ও নিকেতন এলাকায় তাঁর ও আত্মীয়স্বজনদের নামে একাধিক মূল্যবান সম্পত্তি রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের তথ্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন সরকারি গ্রেড-২ বা গ্রেড-৩ কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এই সম্পদের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, হুন্ডির মাধ্যমে তাঁর বিপুল পরিমাণ অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দুবাইয়ে পাচার করা হয়েছে। দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, তাঁর ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে।” সওজের ভেতরে অসন্তোষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা নিজস্ব সিন্ডিকেট ও অবৈধ অর্থের জোরে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।” তিনি আরও বলেন, “ই-জিপি ব্যবস্থায় কারিগরি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে অনেক ঠিকাদারকে প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে রাখা হচ্ছে।” বক্তব্য পাওয়া যায়নি এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মনিরুজ্জামানের দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, “কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি বা অবৈধ সম্পদের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করবে।” তিনি বলেন, “দুদক বা অন্য কোনো তদন্ত সংস্থা তথ্য চাইলে মন্ত্রণালয় পূর্ণ সহযোগিতা করবে।”

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ১৮, ২০২৬ 0
নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিকুল ইসলাম
গণপূর্ত অধিদপ্তরে টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ: নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের দাবি

গণপূর্তের সম্পদ বিভাগে টেন্ডার কারসাজি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়ি এলাকায় অবস্থিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের সম্পদ বিভাগে টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিকুল ইসলাম। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও আর্থিক সুবিধা বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে। ‘সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে টেন্ডার’ অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুশান্ত দত্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের ভাষ্য, টেন্ডারের শর্ত ও প্রাক্কলন এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা কার্যত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারে। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের বড় একটি অংশ নিজেদের “জিম্মি অবস্থায়” পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ঠিকাদারদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারকারী কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে ‘মা এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক জামাল হোসেনকে কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন টেন্ডারের শর্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা ও কারিগরি শর্ত যুক্ত করা হয় যা কেবল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানই পূরণ করতে পারে। ‘সংস্কারের নামে কোটি টাকার অনিয়ম’ সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি বাসভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রায় আট কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে কাজ সম্পন্ন না হলেও বিল উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে।  সুইমিং পুল সংস্কার টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন চলতি মাসে আহ্বান করা কয়েকটি টেন্ডার নিয়েও ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দুটি টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়। এতে প্রায় ২৫ জন ঠিকাদার কার্যত প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে ৪ মে আহ্বান করা একটি সুইমিং পুল সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাজটি পূর্বনির্ধারিত একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এলেনবাড়ি এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ১ নম্বর ও ২ নম্বর ভবনের সংস্কারের নামে প্রায় ৬০ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, গত দুই বছরে সেখানে দৃশ্যমান কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। আউটসোর্সিং নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ ১২ মে প্রকাশিত আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগসংক্রান্ত টেন্ডার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিতভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ঠিকাদার মহলের অভিযোগ, নিবন্ধিত ঠিকাদারদের মধ্যে যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের কাজ দেওয়া হয় না—even প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য মেলেনি এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তদন্তের দাবি সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ১৮, ২০২৬ 0
বরিশাল গণপূর্তের প্রকৌশলী মানিক লাল দাস
বরিশাল গণপূর্তের প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের কোটি টাকার টেন্ডার ও দুর্নীতির অভিযোগ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : খান ট্রেডার্স, খান বিল্ডার্স, রাতুল এন্টারপ্রাইজ ও ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটারকে নিয়ে গঠন করেছেন ঠিকাদারি সিন্ডিকেট। অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মানিক লাল দাস ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন অমান্য করে এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ভোলা গণপূর্ত বিভাগের ৮০% ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের অনুমতি প্রদান করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর পরিচয়ে আওয়ামী সরকারের শেষ সময়ে গোটা দক্ষিণাঞ্চল দাবড়িয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। হাসনাতের প্রভাবে বরিশাল গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়ে বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসা, টেন্ডার বাণিজ্যসহ নির্মাণ মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ কাজগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দের মোটা অংকের অর্থ প্রতিবছর লোপাট করে আসছেন তিনি। অবৈধ উপায়ে আয়কৃত অর্থের একটি অংশ তিনি আ’ লীগের বিতর্কিত একতরফা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ও তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহর মেয়র নির্বাচনী কাজে ব্যয় করেছেন অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ভোলা বরিশাল ও পটুয়াখালীতে স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-জনাতার আন্দোলন দমাতে ফ্যাসিস্ট লীগের মাধ্যমে অনেক টাকা খরচ করেছেন তিনি। এখনো ফ্যাসিস্ট লীগের লোকজনকে কাজ দেয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীদের চাপ দেন। তার অধীনস্থ বিভাগগুলোতে ঝালকাঠির নাসির খানের মালিকানাধীন খান বিল্ডার্স, ভোলা সদরের ফ্যাসিস্ট লীগের সহ সভাপতি হাসান মিয়ার রাতুল এন্টারপ্রাইজ, ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার ও বরিশালের কাশিপুরের বাসিন্দা মিজানের খান ট্রেডার্স এর মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়ে সেই টাকা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিলে লোক জোগান দিতে ব্যয় করান বলে অভিযোগ উঠেছে। ,প্রত্যেক এক্সেনকে ডিসেম্বরের আগেই এই চার ফার্মের নামে মিনিমাম ৮ টি কাজ দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানাগেছে। মানিক লাল দাস ২০২২ সালে যখন যশোর গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তখন মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন কাজের দরপত্র সীমিত পদ্ধতিতে আহবান করার কথা থাকলেও তার নির্দেশের কারণে কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগ উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করে মানিক লালের পছন্দের ঠিকাদারদের কে কাজ পাইয়ে দিতে বাধ্য হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনিময়ে মানিক লাল দাস মোটা কমিশন হাতিয়ে নেন। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী কৃষি আবহওয়া অফিসের সিভিল স্যানিটারী ও বৈদ্যুতিক মেরামত কাজ। তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেলের স্মারক নং ১৫৯৮ তারিখ ২১/০৩/২০২২ মাধ্যমে প্রাক্কলন অনুমোদন উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের পত্র প্রদান করেন যার দরপত্র আইডি নং৬৭৯২১১। কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ও পরিদর্শন বাংলোর সিভিল স্যানেটারী মেরামত কাজ। তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেলের স্মারক নং ১৫৯৭ তারিখ ২১/০৩/২০২২ খ্রিঃ মাধ্যমে প্রাক্কলন অনুমোদন উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের পত্র প্রদান করেন যার দরপত্র আইডি নং- ৬৭৯০১১। কুষ্টিয়া ম্যাটস্ এর বাউন্ডারী ওয়াল, গেট, গার্ডরুম ও বাথরুম সিভিল ও বৈদ্যুতিক মেরামত কাজ। তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেলের স্মারক নং ১৪৯৫ তারিখ ০৬/০৩/২০২২ মাধ্যমে প্রাক্কলন অনুমোদন উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের পত্র প্রদান করেন যার দরপত্র আইডি নং৬৭৬৪৫৩। কুষ্টিয়া ম্যাটস্ এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে সিভিল, স্যানেটারী ও বৈদ্যুতিক মেরামত কাজ। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেলের স্মারক নং ১৪৯৭ তারিখ ০৬/০৩/২০২২ মাধ্যমে দরপত্র অনুমোদন উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের পত্র প্রদান করেন যার দরপত্র আইডি নং ৬৭৫৯৭ এবং কুষ্টিয়া ম্যাটস্ এর ছাত্রী হোষ্টেলের ২য় তলায় সিভিল, স্যানেটারী ও বৈদ্যুতিক মেরামত কাজে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছেন। অন্যদিকে তত্তাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেলের স্মারক নং ১৪৯৩ তারিখ ০৬/০৩/২০২২খ্রিঃ মাধ্যমে দরপত্র অনুমোদন উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের পত্র প্রদান করেন যার দরপত্র আইডি নং৬৭৬৩৬৬। ৬) কুষ্টিয়া ম্যাটস্ এর প্রশাসনিক ভবনের গ্যালারী মেরামত, রুম, জানালা মেরামতসহ বৈদ্যুতিক মেরামত কাজ। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেলের স্মারক নং ১৪৯৬ তারিখ ০৬/০৩/২০২২ মাধ্যমে প্রাক্কলন অনুমোদন ও উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের পত্র প্রদান করেন যার দরপত্র আইডি নং৬৭৬৪১৫। এই সকল মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন কাজের দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রধান প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের দৃষ্টি গোচর হতে পারে বলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েব সাইটে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন কাজ সীমিত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করার কথা থাকলেও উন্মক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের নির্দেশনা সম্বলিত পত্র ও প্রাক্কলন অনুমোদন দেন যশোর গণপূর্ত সার্কেলের তত্তাবধায়ক প্রকৌশলী মানিক লাল দাস। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে প্রধান প্রকৌশলীর জুলাই মাসের অফিস আদেশ অমান্য করে এক দিনের নোটিশে দরপত্র ওপেনিং দিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার জন্য ততকালীন কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম কে জোর জবরদস্তি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বিধি বহির্ভুতভাবে সময় বর্ধন অনুমতি দিয়েছেন যেটা দিতে পারবেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী করবেন অনুমোদন সেটা নিজেই অনুমোদন দিয়েছেন। ঝিনাইদহ পাসপোর্ট অফিস, কুষ্টিয়া সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ স্মৃথি মিউজিয়াম, মাগুরা চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মান প্রকল্প ও শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠি বাড়ি সম্প্রসারিত উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের এছাড়া যশোর সার্কেলের সকল ডিভিশনের নিয়ম বহির্ভূতভাবে সময় বর্ধন, ভেরিয়েশন ও প্রাক্কলন অনুমোদন দিয়েছেন। এছাড়া কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প এর কাজের সময়েও এই মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিলো যে দীর্ঘদিন ধরে উক্ত কাজের সাথে থাকলেও তিনি সাইট পরিদর্শনে আসেন না বললেই চলে। সারাদিন অফিসে বসে বসে ঠিকাদারদের অপেক্ষায় থাকেন কখন কোন ঠিকাদার অফিসে এসে তার কমিশন দিয়ে যাবে। এসময় ভবন নির্মাণ কাজের অবহেলায় ছাদ ধসের ঘটনায় অনেকের শাস্তি হলেও তিনি থেকে যান ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া, সে সময় অন্য ঠিকাদারদের যেখানে কাজের মেয়াদ শেষ, সেখানে ঠিকাদার জহুরুল ইসলামের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ২০২২ সাল পর্যন্ত। অথচ এই জহুরুলের নির্মাণাধীন কাজের অংশেই ২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি হাসপাতাল ভবনের গাড়ি বারান্দার ছাদ ধসে পড়ে। পরে এ প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী, এসডি, এসওসহ চারজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং দুইজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও দায়িত্বে অবহেলা ও সাইট পরিদর্শনে অলসতার অভিযোগ যেই মানিক লালের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। মানিক লাল দাস ভোলা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন ২০১৪ সালের নির্বাচনকালীন সরকারের ৩ মাসের তোফায়েল আহমেদের গণপূর্ত মন্ত্রী থাকাকালীন ফ্যাসিবাদ সরকারের অন্যতম দোসর ভোলার সাবেক চালচোর চেয়ারম্যান হাসান মিয়া ও তার ভাই হোসেন মিয়ার প্রভাবে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ -১ পদায়ন পেয়েছিলেন। তিনি ঢাকার একটি ডিভিশন ঠিকমতো চালাতে পারেন নি। তাই সে সময় তাকে দীর্ঘ দিন ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাখা হয়। পরে পদোন্নতি পেয়ে যশোর গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন। যশোর গণপূর্ত সার্কেলের আওতাধীন ঝিনাইদহ, মেহেরপুর , যশোর, কুষ্টিয়া, নড়াইল ও মাগুরা গণপূর্ত বিভাগের ৮০% ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান অনুমতি দিয়ে তিনি কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানাগেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২১, ২০২৬ 0
Popular post
ফারুকীর সম্পদ কমেছে, তিশার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি: সম্পদ বিবরণী ঘিরে আলোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

সংসার সামলাতে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন রোজিনা

বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।

বাংলাদেশে ঐতিহাসিক নির্বাচন: বিএনপি এগিয়ে, জামায়াতের উত্থান ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

গাজায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ।  ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী।    ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে,  স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ  বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”

কুড়িগ্রামের তাজু ভাই ২.০: ‘সরকারি রেটে জিলাপি’ প্রশ্নে ভাইরাল এক নির্মাণশ্রমিকের গল্প

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে।  কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে।  কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।  কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি।  মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।

অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংক,

ইসলামী ব্যাংকে আস্থা সংকট কেন কাটছে না?: দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২২, ২০২৬ 0




অপরাধ

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে ৩০ বিলিয়ন ডলার জালিয়াতি ও অর্থপাচার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0




কৃষি ও জলবায়ু

ধান

শেরপুরে বোরো ধানের দাম কমে লোকসানে কৃষকরা, উৎপাদন খরচও উঠছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৬, ২০২৬ 0