ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্পের কেনাকাটা, দরপত্র প্রক্রিয়া, যন্ত্রপাতির মান এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. ইব্রাহিম খলিল। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন কেনাকাটায় নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং বিল-ভাউচার নিয়ে প্রশ্নের কারণে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কিছু কেনাকাটায় পণ্যের উৎস, সরবরাহকারীর অভিজ্ঞতা এবং দরপত্রের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের আরও অভিযোগ, বিএডিসি চেয়ারম্যানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। প্রকল্পের মূল নথি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, সরবরাহ ও গ্রহণসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আর্থিক নিরীক্ষার তথ্য পর্যালোচনা করেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রকল্পটির আর্থিক পরিসর যেমন বড়, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—উন্নত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ। ফলে কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ শুধু সরকারি অর্থের হিসাব-নিকাশের প্রশ্ন নয়; মাঠপর্যায়ে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা এবং বীজের গুণগত মান নিয়েও তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে ফিউমিগেশন শিট কেনার অভিযোগ প্রকল্পের ফিউমিগেশন শিট কেনাকাটা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে পণ্যের উৎস ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়া থেকে উচ্চমানের ফিউমিগেশন শিট আমদানির কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে চীন থেকে শিট সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘জাহানারা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার সনদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির দাখিল করা নথিপত্রের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই কাজ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে দরপত্রে দাখিল করা অভিজ্ঞতার সনদ, সংশ্লিষ্ট কাজের পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং নথির সত্যতা যাচাই জরুরি। এসব নথি পরীক্ষা ছাড়া অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে হারভেস্টার নিয়ে ভোগান্তি, ধান অপচয়ের অভিযোগ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বীজ খামারে সরবরাহ করা কম্বাইন হারভেস্টারের কার্যকারিতা নিয়েও অসন্তোষের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক চিঠিতে যন্ত্রের কর্মক্ষমতা, ধান অপচয় এবং বীজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঝিনাইদহের সাধুহাটি খামারে সরবরাহ করা ‘বাংলামার্ক’ ব্র্যান্ডের MARKSAN Model MS-1000 কম্বাইন হারভেস্টারটি নিয়ে অভিযোগ বিশেষভাবে গুরুতর। সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক আবেদনে বলা হয়েছে, যন্ত্রটি ব্যবহারের সময় খড়ের সঙ্গে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ধান অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি, যন্ত্রের ট্যাংকে সংগৃহীত ধানের একটি অংশের খোসা ভেঙে চাল বেরিয়ে আসার অভিযোগও রয়েছে। আবেদনে উল্লিখিত তথ্য সঠিক হলে, বিষয়টি শুধু যন্ত্রের কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না; বীজ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য সংগৃহীত ধানের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে অপচয়ের হার, যন্ত্রের ত্রুটির ধরন এবং বীজের মানের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা, উৎপাদন ও অপচয়ের পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিবেদন প্রয়োজন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাধুহাটি খামারের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আবদুল হাই তাঁর আবেদনে যন্ত্রটি পরিবর্তন করে নতুন, সচল ও কার্যকর হারভেস্টার সরবরাহের সুপারিশ করেছেন। ওই আবেদনের মূল কপি, তারিখ, স্মারক নম্বর এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা গেলে সমস্যাটির ব্যাপ্তি ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। হবিগঞ্জেও হারভেস্টার সচল না হওয়ার অভিযোগ হবিগঞ্জের ইটাখোলা খামারেও সরবরাহ করা হারভেস্টার নিয়ে একই ধরনের সমস্যার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বারবার মেরামতের পরও যন্ত্রটি সচল করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা চেয়েছেন খামারটির সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. ওসমান গনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাধুহাটি ও ঠাকুরগাঁও খামারে সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির ত্রুটি এবং হারভেস্টারের চালকের আসনে বসে কার্যকরভাবে যন্ত্র চালাতে অসুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। বিএডিসির অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (খামার) ড. মো. রফিকুল ইসলাম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। একাধিক খামারে যন্ত্রপাতি নিয়ে অভিযোগ উঠে থাকলে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সরবরাহ করা সব হারভেস্টারের কার্যকারিতা পরীক্ষা, ক্রয়াদেশের কারিগরি শর্তের সঙ্গে বাস্তব যন্ত্রের সামঞ্জস্য যাচাই এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সিড ড্রায়ার কেনার দরপত্রে তিন প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ার অভিযোগ বীজের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র সিড ড্রায়ার কেনার দরপত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টেন্ডার আইডি 1178841 ও 1178840-এর আওতায় অভিজ্ঞ তিনটি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোন শর্তের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল এবং দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সব অংশগ্রহণকারীর জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতার নথি, কারিগরি মূল্যায়ন, অযোগ্য ঘোষণার কারণ এবং কার্যাদেশের তথ্য পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। একই সঙ্গে ই-জিপি ব্যবস্থায় দরপত্র আটকে রাখার যে অভিযোগ উঠেছে, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের ডিজিটাল রেকর্ড, সময়সীমা এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়ার তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্যভাবে বাদ দেওয়া হয়ে থাকলে তা প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। বিপরীতে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান বাদ পড়লে তার পক্ষে নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। ২০০ কোটি টাকার বিল-ভাউচার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়েও বড় অঙ্কের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। তাঁদের দাবি, ই-জিপি ব্যবস্থায় দরপত্র আটকে রাখা এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের এই অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নথি রয়েছে, কোন কোন বিল বা ভাউচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে এবং অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক কী—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত আর্থিক অপরাধ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের অনুমোদিত বরাদ্দ, ক্রয় পরিকল্পনা, দরপত্র ও কার্যাদেশ, সরবরাহের চালান, পণ্য গ্রহণের প্রতিবেদন, বিল পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মধ্যে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যেসব পণ্য সরবরাহের বিপরীতে অর্থ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছিল কি না এবং নির্ধারিত মান পূরণ করেছিল কি না, সেটিও যাচাইয়ের অংশ হওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের হিসাব, সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য এবং কার্যাদেশের বিপরীতে পরিশোধিত অর্থের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। প্রকল্প পরিচালককে ঘিরে অভিযোগ, প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের প্রকল্প পরিচালক মো. ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ। অভিযোগকারীদের দাবি, বিএডিসি চেয়ারম্যানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রকল্পের কিছু কেনাকাটায় নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং নথিতে থাকা প্রমাণ পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিএডিসি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও দাপ্তরিক নথির ভিত্তিতে অনুসন্ধান জরুরি। একটি নিরপেক্ষ তদন্তে অন্তত চারটি বিষয় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন: দরপত্রের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সরবরাহ করা যন্ত্রপাতি নির্ধারিত মান পূরণ করেছে কি না, বিল-ভাউচার ও অর্থ পরিশোধের হিসাব সঠিক কি না এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা গেলে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্রয়প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী ও দুদকের কাছে অভিযোগ, তদন্তের দাবি অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিএডিসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দরপত্র, যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হোক। তাঁরা আরও দাবি জানিয়েছেন, তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাপ্তিস্বীকার, তদন্ত শুরুর অবস্থা এবং এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কৃষি খাতে সরকারি বিনিয়োগের উদ্দেশ্য হলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, উন্নত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে সহায়তা করা এবং কৃষকের জন্য মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। সে কারণে একটি বড় প্রকল্পে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত কারিগরি ও প্রশাসনিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন বিএডিসির ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির জন্য কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ: ফিউমিগেশন শিটের ক্রয়চুক্তিতে উৎপত্তি দেশ ও পণ্যের মান সম্পর্কে কী শর্ত ছিল? ‘জাহানারা এন্টারপ্রাইজ’-এর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সনদ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না? সাধুহাটি, ইটাখোলা ও ঠাকুরগাঁও খামারে সরবরাহ করা হারভেস্টারগুলো কারিগরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল কি না? টেন্ডার আইডি 1178841 ও 1178840-এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার কারণ কী ছিল? প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে কী আর্থিক নথি বা নিরীক্ষা-প্রমাণ রয়েছে? অভিযোগ পাওয়ার পর বিএডিসি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দুদক কোনো তদন্ত শুরু করেছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে দাপ্তরিক নথি, স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা, আর্থিক নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য জরুরি। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আর অভিযোগের কোনো অংশের পক্ষে প্রমাণ না মিললে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।