ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের প্রায় ১৭০ বছরের পুরোনো চা শিল্প এখন বহুমুখী সংকটের মুখে। একদিকে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে সেই তুলনায় বাড়েনি চায়ের নিলামমূল্য। বছরের পর বছর লোকসান, উচ্চ সুদের ঋণ, রপ্তানি কমে যাওয়া, পুরোনো বাগানের কম উৎপাদনশীলতা এবং শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম পুরোনো কৃষি ও শিল্পখাতটি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর সংস্কার ও আর্থিক সহায়তা না এলে যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে দেশের চা শিল্প।
এই পরিস্থিতিতে শিল্পটির আর্থিক সংকট কাটাতে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে চা শিল্পবিষয়ক টাস্কফোর্স। প্রস্তাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পুনর্গঠন, চা পুনরোপণের জন্য গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ এবং কারখানা আধুনিকায়নে সাত বছর মেয়াদি অর্থায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
চা শিল্পের সংকটের সবচেয়ে বড় চিত্রটি ফুটে ওঠে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানে।
বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছরই উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে চা বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও বা বাজারে চা এলেও বিক্রির অর্থ দিয়ে উৎপাদন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না।
২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২৬০ টাকা। বিপরীতে নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৮ টাকা ৮৮ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ৫১ টাকা ১২ পয়সা ঘাটতি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে চা উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু নিলামমূল্য সেই হারে বাড়েনি।
ফলে বাগান পরিচালনা, শ্রমিক মজুরি, সার, জ্বালানি, পরিবহন, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যাংকঋণের সুদ—সব মিলিয়ে আর্থিক চাপ বাড়ছে মালিকদের ওপর।
দেশীয় বাজারে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের ফারাকের পাশাপাশি চা শিল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা রপ্তানি বাজার।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের চা রপ্তানি প্রায় ৭৯ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে বছরে চা রপ্তানি থেকে আয় হয় মাত্র ২৫ লাখ থেকে ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার।
পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রপ্তানি বাজার। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশের কোনো শক্তিশালী জাতীয় চা ব্র্যান্ড এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতি এবং প্রিমিয়াম চায়ের বাজারেও বাংলাদেশের উপস্থিতি সীমিত।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ।
দেশের ১৭২টি চা বাগানে ২০২৫ সালে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এ শিল্পে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ২ হাজার স্থায়ী এবং ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন। চা বাগানকেন্দ্রিক এলাকায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ বসবাস করেন।
তবে উৎপাদনশীলতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে।
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। তুলনায় ভারতে প্রতি হেক্টরে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কেজি এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কেজি চা উৎপাদিত হয়।
চা বাগানের মোট জমির প্রায় ৪৫ শতাংশে সরাসরি চা উৎপাদন হয় না। এর মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ জমি নতুন চা চাষের জন্য ব্যবহারযোগ্য। বাকি জমি আবাসিক, পরিচালনাগত ও পরিবেশগত কাজে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের চা শিল্পের প্রধান কেন্দ্র মৌলভীবাজার।
জেলাটিতে দেশের ৯২টি চা বাগান রয়েছে। এছাড়া সিলেটে রয়েছে ২২টি এবং হবিগঞ্জে ২টি চা বাগান।
তবে পুরোনো চা গাছ, পুনরোপণে ধীরগতি, আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং আর্থিক সংকট উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চা শিল্পের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের মজুরি ও কল্যাণসংক্রান্ত দাবি।
মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে সময় সময় শ্রমিক আন্দোলন ও কর্মসূচি উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। মালিকপক্ষের দাবি, ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে শ্রমিক কল্যাণের ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়ছে না।
অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি চিকিৎসার বিষয়গুলোও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে শ্রমিক কল্যাণে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য সরকার পরিচালিত স্কুল, কার্যকর ডিসপেনসারি, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং বাগানের সড়ক উন্নয়নের সুপারিশ রয়েছে।
চলতি বছরের জুনের প্রথমার্ধে ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স চা শিল্প পুনরুদ্ধারে একাধিক সুপারিশ করে।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠন।
এই তহবিলের আওতায়—
দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের জন্য পৃথক বার্ষিক বাজেট বরাদ্দের সুপারিশও করা হয়েছে।
টাস্কফোর্স চা বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করার সুপারিশ করেছে।
বর্তমানে প্রায় ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয় বলে খাতসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে আসছেন। কৃষিখাতের আওতায় আনা হলে ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করা যেতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ সুদের ঋণের চাপ কমানো গেলে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটিয়ে পুনরোপণ, আধুনিকায়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
চা শিল্পকে লোকসানের চক্র থেকে বের করতে তিন স্তরের ন্যূনতম মূল্য কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী—
তবে এই মূল্য কাঠামো বাস্তবায়নে বাজার ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিলামব্যবস্থার সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাদেশের চা বাগানের বড় একটি অংশে পুরোনো গাছের কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে।
এ কারণে একটি জাতীয় ‘চা পুনরোপণ মহাপরিকল্পনা’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে টাস্কফোর্স।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রতিটি চা বাগানকে ১০ বছর মেয়াদি পুনরোপণ পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতি বছর বাগানের ২ থেকে ৩ শতাংশ চা গাছ প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে।
এর ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নত জাতের চা গাছ ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষায়িত চা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রপ্তানি পুনরুজ্জীবিত করতে পাকিস্তানের পাশাপাশি মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার বা জি-টু-জি বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি প্রণোদনা ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চা শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা, একটি ‘টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ গঠন এবং কৃষি প্রযুক্তি, সৌর অবকাঠামো ও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চা শিল্পকে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ থেকে বের করে আনতে সৌর অ্যাগ্রিভোল্টাইক, ব্যাটারি জ্বালানি সংরক্ষণ, সেচ এবং কারখানা আধুনিকায়নে বিশেষ অর্থায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ জন্য ‘বাংলাদেশ টি গ্রীন ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে ক্ষুদ্র চা চাষিদের জন্যও আলাদা পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। পঞ্চগড়ে ৮ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র চাষিকে কারিগরি সহায়তা ও মানোন্নয়ন সেবা দিতে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি স্থায়ী আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
সংস্কার বাস্তবায়নে টাস্কফোর্স ৯০ দিনের একটি রোডম্যাপও দিয়েছে।
প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে চা শিল্পের তথ্য যাচাই এবং আর্থিক সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণে আন্তমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
৬০ দিনের মধ্যে চা বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা, ভ্যাট সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি এবং ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আর ৯০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা চূড়ান্ত, বিডায় টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক চালু, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শুরু এবং পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
চা শিল্প টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক মামুন রশীদ বলেন, চা কোম্পানিগুলোর আয় না বাড়লে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
তার মতে, শ্রমিক পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন চারা রোপণ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, জি-টু-জি ব্যবস্থায় রপ্তানি বৃদ্ধি এবং গ্রিন ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের চা শিল্প শুধু একটি কৃষিপণ্যনির্ভর খাত নয়। এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা।
কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়ার বিপরীতে বিক্রয়মূল্য না বাড়া, রপ্তানি কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের ঋণ, কম উৎপাদনশীলতা এবং শ্রমিক কল্যাণের চাপ—সব মিলিয়ে শিল্পটি এখন এক জটিল সংকটে।
টাস্কফোর্সের ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার সহায়তা তহবিল, স্বল্পসুদের ঋণ, পুনরোপণ মহাপরিকল্পনা, ন্যূনতম মূল্য কাঠামো ও নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে শিল্পটি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
তবে প্রশ্ন হলো—এই সুপারিশগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৭০ বছরের পুরোনো বাংলাদেশের চা শিল্পকে নতুন করে টিকে থাকার পথ দেখানো হবে?
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের প্রায় ১৭০ বছরের পুরোনো চা শিল্প এখন বহুমুখী সংকটের মুখে। একদিকে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে সেই তুলনায় বাড়েনি চায়ের নিলামমূল্য। বছরের পর বছর লোকসান, উচ্চ সুদের ঋণ, রপ্তানি কমে যাওয়া, পুরোনো বাগানের কম উৎপাদনশীলতা এবং শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম পুরোনো কৃষি ও শিল্পখাতটি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর সংস্কার ও আর্থিক সহায়তা না এলে যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে দেশের চা শিল্প। এই পরিস্থিতিতে শিল্পটির আর্থিক সংকট কাটাতে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে চা শিল্পবিষয়ক টাস্কফোর্স। প্রস্তাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পুনর্গঠন, চা পুনরোপণের জন্য গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ এবং কারখানা আধুনিকায়নে সাত বছর মেয়াদি অর্থায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। আয় কমছে, ব্যয় বাড়ছে চা শিল্পের সংকটের সবচেয়ে বড় চিত্রটি ফুটে ওঠে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানে। বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছরই উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে চা বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও বা বাজারে চা এলেও বিক্রির অর্থ দিয়ে উৎপাদন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২৬০ টাকা। বিপরীতে নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৮ টাকা ৮৮ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ৫১ টাকা ১২ পয়সা ঘাটতি হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে চা উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু নিলামমূল্য সেই হারে বাড়েনি। ফলে বাগান পরিচালনা, শ্রমিক মজুরি, সার, জ্বালানি, পরিবহন, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যাংকঋণের সুদ—সব মিলিয়ে আর্থিক চাপ বাড়ছে মালিকদের ওপর। ২০০২ সালের পর রপ্তানি কমেছে ৭৯ শতাংশ দেশীয় বাজারে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের ফারাকের পাশাপাশি চা শিল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা রপ্তানি বাজার। তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের চা রপ্তানি প্রায় ৭৯ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে বছরে চা রপ্তানি থেকে আয় হয় মাত্র ২৫ লাখ থেকে ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার। পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রপ্তানি বাজার। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল। খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশের কোনো শক্তিশালী জাতীয় চা ব্র্যান্ড এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতি এবং প্রিমিয়াম চায়ের বাজারেও বাংলাদেশের উপস্থিতি সীমিত। বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম উৎপাদক, তবু উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। দেশের ১৭২টি চা বাগানে ২০২৫ সালে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এ শিল্পে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ২ হাজার স্থায়ী এবং ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন। চা বাগানকেন্দ্রিক এলাকায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ বসবাস করেন। তবে উৎপাদনশীলতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। তুলনায় ভারতে প্রতি হেক্টরে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কেজি এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। চা বাগানের মোট জমির প্রায় ৪৫ শতাংশে সরাসরি চা উৎপাদন হয় না। এর মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ জমি নতুন চা চাষের জন্য ব্যবহারযোগ্য। বাকি জমি আবাসিক, পরিচালনাগত ও পরিবেশগত কাজে ব্যবহৃত হয়। চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজার বাংলাদেশের চা শিল্পের প্রধান কেন্দ্র মৌলভীবাজার। জেলাটিতে দেশের ৯২টি চা বাগান রয়েছে। এছাড়া সিলেটে রয়েছে ২২টি এবং হবিগঞ্জে ২টি চা বাগান। তবে পুরোনো চা গাছ, পুনরোপণে ধীরগতি, আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং আর্থিক সংকট উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনেও বাড়ছে চাপ চা শিল্পের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের মজুরি ও কল্যাণসংক্রান্ত দাবি। মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে সময় সময় শ্রমিক আন্দোলন ও কর্মসূচি উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। মালিকপক্ষের দাবি, ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে শ্রমিক কল্যাণের ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়ছে না। অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি চিকিৎসার বিষয়গুলোও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে শ্রমিক কল্যাণে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য সরকার পরিচালিত স্কুল, কার্যকর ডিসপেনসারি, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং বাগানের সড়ক উন্নয়নের সুপারিশ রয়েছে। ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার সহায়তা তহবিলের প্রস্তাব চলতি বছরের জুনের প্রথমার্ধে ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স চা শিল্প পুনরুদ্ধারে একাধিক সুপারিশ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠন। এই তহবিলের আওতায়— উচ্চ সুদের বিদ্যমান ঋণ পুনর্গঠন; ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ; নতুন চা গাছ রোপণে গ্রেস পিরিয়ডসহ অর্থায়ন; কারখানা আধুনিকায়নে সাত বছর মেয়াদি ঋণ; সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ— দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের জন্য পৃথক বার্ষিক বাজেট বরাদ্দের সুপারিশও করা হয়েছে। কৃষিখাত হিসেবে স্বীকৃতি পেলে কী বদলাবে? টাস্কফোর্স চা বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করার সুপারিশ করেছে। বর্তমানে প্রায় ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয় বলে খাতসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে আসছেন। কৃষিখাতের আওতায় আনা হলে ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করা যেতে পারে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ সুদের ঋণের চাপ কমানো গেলে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটিয়ে পুনরোপণ, আধুনিকায়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। ন্যূনতম মূল্য কাঠামোর প্রস্তাব চা শিল্পকে লোকসানের চক্র থেকে বের করতে তিন স্তরের ন্যূনতম মূল্য কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী— দেশীয় মানের চায়ের জন্য প্রতি কেজি ন্যূনতম মূল্য ২৭৫ টাকা; রপ্তানিযোগ্য চায়ের জন্য প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা; প্রতি কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধা; প্রিমিয়াম ও বিশেষায়িত চায়ের ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ। তবে এই মূল্য কাঠামো বাস্তবায়নে বাজার ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিলামব্যবস্থার সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পুনরোপণ ছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কঠিন বাংলাদেশের চা বাগানের বড় একটি অংশে পুরোনো গাছের কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে। এ কারণে একটি জাতীয় ‘চা পুনরোপণ মহাপরিকল্পনা’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে টাস্কফোর্স। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রতিটি চা বাগানকে ১০ বছর মেয়াদি পুনরোপণ পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতি বছর বাগানের ২ থেকে ৩ শতাংশ চা গাছ প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নত জাতের চা গাছ ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষায়িত চা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নতুন বাজারের খোঁজে জি-টু-জি উদ্যোগ রপ্তানি পুনরুজ্জীবিত করতে পাকিস্তানের পাশাপাশি মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার বা জি-টু-জি বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি প্রণোদনা ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চা শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা, একটি ‘টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ গঠন এবং কৃষি প্রযুক্তি, সৌর অবকাঠামো ও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সবুজ অর্থায়ন ও ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য পরিকল্পনা চা শিল্পকে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ থেকে বের করে আনতে সৌর অ্যাগ্রিভোল্টাইক, ব্যাটারি জ্বালানি সংরক্ষণ, সেচ এবং কারখানা আধুনিকায়নে বিশেষ অর্থায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ জন্য ‘বাংলাদেশ টি গ্রীন ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে ক্ষুদ্র চা চাষিদের জন্যও আলাদা পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। পঞ্চগড়ে ৮ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র চাষিকে কারিগরি সহায়তা ও মানোন্নয়ন সেবা দিতে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি স্থায়ী আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। ৯০ দিনের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সংস্কার বাস্তবায়নে টাস্কফোর্স ৯০ দিনের একটি রোডম্যাপও দিয়েছে। প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে চা শিল্পের তথ্য যাচাই এবং আর্থিক সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণে আন্তমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। ৬০ দিনের মধ্যে চা বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা, ভ্যাট সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি এবং ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ৯০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা চূড়ান্ত, বিডায় টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক চালু, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শুরু এবং পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। ‘আয় না বাড়লে শ্রমিক কল্যাণও সম্ভব নয়’ চা শিল্প টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক মামুন রশীদ বলেন, চা কোম্পানিগুলোর আয় না বাড়লে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তার মতে, শ্রমিক পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন চারা রোপণ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, জি-টু-জি ব্যবস্থায় রপ্তানি বৃদ্ধি এবং গ্রিন ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সামনে বড় প্রশ্ন—সংস্কার হবে, নাকি সংকট আরও গভীর হবে? বাংলাদেশের চা শিল্প শুধু একটি কৃষিপণ্যনির্ভর খাত নয়। এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়ার বিপরীতে বিক্রয়মূল্য না বাড়া, রপ্তানি কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের ঋণ, কম উৎপাদনশীলতা এবং শ্রমিক কল্যাণের চাপ—সব মিলিয়ে শিল্পটি এখন এক জটিল সংকটে। টাস্কফোর্সের ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার সহায়তা তহবিল, স্বল্পসুদের ঋণ, পুনরোপণ মহাপরিকল্পনা, ন্যূনতম মূল্য কাঠামো ও নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে শিল্পটি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো—এই সুপারিশগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৭০ বছরের পুরোনো বাংলাদেশের চা শিল্পকে নতুন করে টিকে থাকার পথ দেখানো হবে?
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন, প্রভাব বিস্তার এবং শিক্ষা বোর্ডে তদবিরের অভিযোগ উঠেছে ইকবাল হোসেন তালুকদারের বিরুদ্ধে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা ইকবাল হোসেন তালুকদার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। এরপর তিনি স্থানীয়ভাবে দলটির কর্মী ও নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর বদলে যায় রাজনৈতিক অবস্থান? স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিছিল-মিটিংয়ে ইকবাল হোসেন তালুকদারের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি জামায়াত নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে দলটির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা বাড়ান। পরবর্তীতে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বাউফল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ইকবাল হোসেন তালুকদার স্থানীয় পর্যায়ে নিজের প্রভাব আরও বিস্তারের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করলেও পরবর্তীতে তিনি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন। এবার নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি পদ নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি পদকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে যে নামের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, সেখানে ইকবাল হোসেন তালুকদারের নাম দ্বিতীয় স্থানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, সভাপতি পদটি নিশ্চিত করতে তিনি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ও তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রধান শিক্ষককে ঘিরেও প্রশ্ন অনুসন্ধানে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কে এম নাসির উদ্দিন সবুজ খানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, প্রধান শিক্ষক সবুজ খানের সঙ্গে ইকবাল হোসেন তালুকদারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই তাকে এডহক কমিটির সভাপতি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদার পরিবারের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ইকবাল হোসেন তালুকদারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই যোগাযোগ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীর ন্যায়বিচারের দাবি এডহক কমিটির সভাপতি পদে ইকবাল হোসেন তালুকদারের নাম প্রস্তাবের পর বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইয়াকুব শরীফ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচন কি যোগ্যতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বিবেচনায় হবে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর। স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বদল এবং পরবর্তীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার চেষ্টা—পুরো বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশাল নগরীতে সরকারি খাসজমির ওপর থাকা প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি পুকুর বালু ফেলে ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রির প্রস্তুতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ শতাংশ আয়তনের জলাশয়টির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে ভরাট করা হয়েছে। তবে যাঁরা ভরাটের কাজ করছেন, তাঁদের দাবি—ওয়ারিশ সূত্রে জমিটির মালিকানা পাওয়া গেছে এবং বৈধ পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ভিত্তিতেই উন্নয়নকাজ চলছে। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ভূমি প্রশাসনের দাবি, এটি সরকারি খাসজমি। হাসপাতালের পাশের জলাশয় নগরীর মুন্সীবাড়ি এলাকায় বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে উত্তরমুখী সড়কের পাশে অবস্থিত পুকুরটি বরিশাল বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এবং উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালের ঠিক পাশেই অবস্থিত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পুকুরসহ আশপাশের জমি সরকারের মালিকানাধীন। পুকুরটি দখল ও ভরাট বন্ধে কাউনিয়া থানা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারা করছেন ভরাট? স্থানীয় সূত্রের দাবি, শহরের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম লিয়ন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব বাবুল তালুকদার, স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীর ও রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতারও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। তবে মহানগর বিএনপি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রাকিবুল ইসলাম লিয়ন বলেন, "ওয়ারিশ সূত্রে ওই জমির মালিক হেলাল আকন ও তাঁর বোন। আমরা চারজন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে জায়গাটি ভরাট করছি। পরে প্লট আকারে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে।" তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরকারি মালিকানার দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন। পুকুর ভরাটের ঠিকাদার মো. জুয়েল জানান, সাত লাখ টাকার চুক্তিতে তিনি বালু ফেলে ভরাটের কাজ করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য: "এটি সবসময় হাসপাতালের পুকুর হিসেবেই পরিচিত" এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের দাবি, বহু দশক ধরেই জলাশয়টি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুর হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, "৫০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা জানি, এটি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুর। কয়েক দিন আগে শুনলাম কেউ নাকি এটি কিনে ফেলেছে।" হাসপাতালের নথিতে কী আছে? হাসপাতালের অফিস সহকারীর দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট আনোয়ারা বেগম বলেন, হাসপাতালের মোট সাত একর ৪১ শতাংশ জমির পর্চা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী— দাগ নম্বর ১০৬৯ ভিটা, ১০৭০ ও ১০৭১ পুকুর হিসেবে রেকর্ডভুক্ত। এসব জমির মালিক হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টরের নাম উল্লেখ রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, "কাউনিয়া থানা ও এসিল্যান্ড অফিসে বহুবার গিয়েছি। কিন্তু জমি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।" "রাতের আঁধারে চলছে ভরাট" হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মাসুমা আক্তার বলেন, হাসপাতালের পুরোনো কর্মচারীরা সবাই জানেন এটি সরকারি সম্পত্তি। তাঁর দাবি, ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও এসিল্যান্ডকেও জানানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেড়া দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে দখলকারীরাই সেখানে বেড়া দিয়েছেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ গেলেও ভরাট বন্ধ হয়নি। বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা স্থানীয়দের হিসাবে, হাসপাতালসংলগ্ন ৬৯ শতাংশ আয়তনের এই পুকুরটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ভবনের পেছনে অবস্থান করায় মূল সড়ক থেকে জলাশয়টির বড় অংশ দেখা যায় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অবস্থানকেই কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে ভরাট চলছে। বিএনপির প্রতিক্রিয়া মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, "এ ঘটনায় বিএনপির কোনো নেতা জড়িত নন। কাগজপত্রে জালিয়াতি হয়েছে কিনা, সেটি ভূমি অফিস তদন্ত করবে।" ভূমি প্রশাসন কী বলছে? সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বলেন, পুকুরটি খাস খতিয়ানের জমি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ বছর আগে জরিপে বিএস রেকর্ডে এটি ব্যক্তি মালিকানার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি বলেন, "আমার ধারণা, এখানে বড় ধরনের অনিয়ম বা লেনদেন হয়েছে। একটি চক্র পুকুরটি দখল করেছে। কীভাবে খাসজমি ব্যক্তি মালিকানায় গেল, সেটি চ্যালেঞ্জ করে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে।" সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের বক্তব্য বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, "প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। মামলা করে জমি উদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তবে সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় আমার যা করণীয়, তা করব।" জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন যে প্রশ্নগুলো সামনে ঘটনাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে— সরকারি খাসজমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হলো কীভাবে? ওয়ারিশ ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ভিত্তি কতটা বৈধ? প্রশাসনের কাছে অভিযোগ যাওয়ার পরও ভরাট কেন বন্ধ হয়নি? ভূমি রেকর্ডে কোনো জালিয়াতি বা অনিয়ম ঘটেছে কি না? সরকারি সম্পত্তি দখলের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে ভূমি প্রশাসনের তদন্ত এবং সম্ভাব্য ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মামলার মাধ্যমে। এদিকে স্থানীয়দের দাবি, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুকুর ভরাট বন্ধ করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।