ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ—হরমুজ প্রণালি—এ ইসরায়েল-সংযুক্ত একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এই ঘটনার পরই আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত বহুগুণে বেড়ে গেছে, যার প্রভাব এখন শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ নেই—পৌঁছে গেছে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার কেন্দ্রেও। হরমুজে হামলা: কৌশলগত বার্তা না সরাসরি যুদ্ধঘোষণা? ইরানের দাবি অনুযায়ী, “জায়নবাদী শাসনের সঙ্গে যুক্ত” একটি জাহাজকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং ডাটাবেজ অনুযায়ী, “MSC Ishika” নামের জাহাজটি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী হলেও এর মালিকানা ইসরায়েলি স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। এই হামলার গুরুত্ব তিনটি কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: অবস্থানগত ঝুঁকি: হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০% তেল পরিবাহিত হয়। এখানে যেকোনো সামরিক ঘটনা বৈশ্বিক বাজারে ধাক্কা দিতে পারে। টার্গেট নির্বাচন: সরাসরি ইসরায়েলি মালিকানাধীন সম্পদকে আঘাত করা মানে প্রক্সি যুদ্ধ থেকে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার ইঙ্গিত। ড্রোন প্রযুক্তি: কম খরচে উচ্চ কার্যকারিতা—ইরানের ড্রোন কৌশল এখন একটি বড় সামরিক সমীকরণ। আকাশে সংঘর্ষ: তথ্যযুদ্ধ নাকি বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি? ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা মার্কিন একাধিক যুদ্ধযানে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে F-15 Eagle, A-10 Thunderbolt II, এবং UH-60 Black Hawk। তবে এই দাবিগুলোর স্বতন্ত্র যাচাই এখনো হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন: এটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হতে পারে অথবা আংশিক সত্যকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিমান দুর্ঘটনার ঘটনাও এই বর্ণনার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ওয়াশিংটনে অস্থিরতা: সামরিক বনাম বেসামরিক ক্ষমতা এই সংঘাতের সবচেয়ে নাটকীয় দিকটি ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ স্থল অভিযানের নির্দেশ দিলেও, একাধিক জ্যেষ্ঠ জেনারেল তা মানতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরিণতিতে: জয়েন্ট চিফস অব স্টাফসহ ১২ জন শীর্ষ কর্মকর্তা বরখাস্ত হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব মার্কিন ইতিহাসে বিরল সাংবিধানিক সংকট মূল প্রশ্ন: এই অস্বীকৃতি কি— আইন রক্ষার চেষ্টা? (অবৈধ আদেশ মানতে অস্বীকৃতি) নাকি বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের প্রতি অবাধ্যতা? সামরিক ক্ষয়ক্ষতি: বাস্তবতা বনাম বর্ণনা বিভিন্ন ঘটনায় মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র উঠে এসেছে: একাধিক যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত (যেমন KC-135 Stratotanker) কুয়েত ও সৌদি আরবের ঘাঁটিতে হামলা E-3 Sentry ধ্বংসের দাবি F-35 Lightning II ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তবে এগুলোর অনেকগুলোরই স্বাধীন যাচাই সীমিত—যা তথ্যযুদ্ধের জটিলতা বাড়াচ্ছে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: বিশ্ব কি নতুন যুদ্ধে প্রবেশ করছে? এই সংকটের প্রভাব বহুমাত্রিক: ১. জ্বালানি বাজার হরমুজে অস্থিরতা মানেই তেলের দাম অস্থির হওয়া ২. আঞ্চলিক জোট ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ব্লক আরও দৃঢ় হচ্ছে ৩. সামরিক নীতির পরিবর্তন ড্রোন, সাইবার ও অসম যুদ্ধ কৌশল প্রধান হয়ে উঠছে ৪. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সামরিক নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা সংঘাতের দিক কোনদিকে? বর্তমান পরিস্থিতি তিনটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে: নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা – সীমিত হামলা ও পাল্টা হামলা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ – বহু দেশ জড়িয়ে পড়বে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ – আন্তর্জাতিক চাপের ফলে উত্তেজনা হ্রাস তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সংকট এখন আর শুধু ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি গ্লোবাল নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : মার্কিন সাংবাদিক শেলি কিটলসনকে বাগদাদে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান-সমর্থিত একটি ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির মধ্যে এ ঘটনা ঘটল। কিটলসন দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল ও ইরাক-সিরিয়ার গোত্রভিত্তিক বাস্তবতা নিয়ে গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পরিচিত। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তাকে যত দ্রুত সম্ভব মুক্ত করার জন্য তারা কাজ করছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গ্লোবাল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডিলান জনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরান-ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়া গোষ্ঠী কাতায়েব হিজবুল্লাহর সঙ্গে জড়িত একজনকে এই অপহরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ইরাকি কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ইরাকেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার এসব গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালিয়েছে, আর মিলিশিয়ারা ইরাকে মার্কিন দূতাবাস ও সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করেছে। ইরাক জানিয়েছে, সন্দেহভাজনরা পালানোর সময় একটি গাড়ি উল্টে গেলে সেটি আটক করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘নিরাপত্তা বাহিনী একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে এবং অপরাধে ব্যবহৃত একটি গাড়ি জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।’ মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ‘জড়িত অন্যান্যদের খুঁজে বের করা এবং অপহৃত সাংবাদিককে মুক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।এক ইরাকি নিরাপত্তা সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, অপহরণের ঘটনা বাগদাদেই ঘটেছে। তবে ইরাকি কর্তৃপক্ষ অপহরণকারী বা ভুক্তভোগীর পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এক বিবৃতিতে কিটলসনের অপহরণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তার নিরাপদ ও দ্রুত মুক্তি দাবি করেছে। তারা বলেছে, ‘আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার পাশে আছি এবং তাকে দ্রুত ফিরে এসে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাই।’ ইরাকের পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বেসামরিক পোশাক পরা চারজন ব্যক্তি তাকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, বাগদাদের রাস্তায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।তারা আরও জানান, অপহরণকারীদের গাড়ি রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের দিকে যাওয়ায় সেখানেই তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। একসময় অপহরণ ও অপহরণের চেষ্টার জন্য কুখ্যাত ছিল বাগদাদ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এসব ঘটনা কমে আসে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং মিলিশিয়াদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্তির ফলে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর শক্তিও কিছুটা কমেছে। তবে ইরান যুদ্ধ নতুন করে এসব মিলিশিয়া ও ইরাকি রাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালে বাগদাদে ইসরায়েলি-রুশ গবেষক এলিজাবেথ সুরকভ অপহৃত হন। তাকে দুই বছর আটকে রাখা হয় এবং গত বছর মুক্তি দেওয়া হয়। আটক অবস্থায় তিনি গুরুতর নির্যাতনের শিকার হন, যার ফলে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরাকে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলার পর ইরাকে ঝুঁকি বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর ইরানের প্রভাব রয়েছে। ডিলান জনসন বলেন, সাংবাদিককে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই সতর্ক করার মাধ্যমে পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের দায়িত্ব পালন করেছে এবং তিনি আবারও মার্কিন নাগরিকদের ইরাক ত্যাগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্র দপ্তর সাংবাদিকসহ সব মার্কিন নাগরিককে সব ভ্রমণ সতর্কতা মেনে চলার জন্য জোরালোভাবে পরামর্শ দিচ্ছে।’
মাসুদ করিম: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যুদ্ধ এখন আর শুধু ভূখণ্ড দখল বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি অর্থনীতি, জ্বালানি এবং বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক জটিল প্রতিযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা—বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত—এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পরও ইরানে সরকার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জ্বালানি: যুদ্ধের আসল কেন্দ্রবিন্দু? বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংঘাতগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি ও বাণিজ্য পথ। বিশেষ করে: হরমুজ প্রণালি কৃষ্ণসাগর অঞ্চল বৈশ্বিক তেল সরবরাহ চেইন বিশ্বের প্রায় ২০% তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। এলএনজি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হয়। এর ফলে: যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক ইউরোপ স্পট মার্কেটে বেশি দামে গ্যাস কিনতে শুরু করে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি পায় তবে এই লাভের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয়ও করতে হয়েছে। লাভ বনাম ঝুঁকি: জটিল সমীকরণ যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানিকারকরা লাভবান, তবুও বড় কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে জোট রাজনীতিতে চাপ বাড়ে সামরিক ব্যয় বাড়তে থাকে এছাড়া, কাতারের মতো দেশ যদি হরমুজ প্রণালির ঝুঁকির কারণে রপ্তানি কমায়, তাহলে বিশ্ববাজারে এলএনজি দাম আরও বাড়তে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ: নতুন ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতগুলো আসলে তিনটি বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই: জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) সমুদ্রপথ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার সহজ হয়। বাংলাদেশ: চাপের মুখে অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন: জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে ফলে বৈশ্বিক সংঘাতের সরাসরি অংশীদার না হয়েও বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। নিরাপত্তা বনাম নির্ভরতা দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু যদি সেই নির্ভরতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা শুধু সামরিক নয়—একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শেষ কথা: যুদ্ধের শেষ কোথায়? বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় পরিষ্কার— এই যুদ্ধের কোনো সহজ সমাপ্তি নেই। এটি: আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে জ্বালানি বাজারকে পুনর্গঠন করছে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করছে অতএব, প্রশ্নটি এখন আর শুধু “কে জিতবে?” নয়— বরং “এই যুদ্ধ থেকে কে কতটা লাভবান হবে, আর তার মূল্য কে দেবে?”
গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ঈদের দিন সন্তানকে কাঁধে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হওয়া এক তরুণকে আটক করার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে তার ২১ মাস বয়সী শিশুকে পরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—যার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিখোঁজ ওই তরুণের নাম ওসামা আবু নাসের (২৫)। তার শিশুপুত্র জাওয়াদ আবু নাসারকে গত ১৯ মার্চ গাজার কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে বাবার সঙ্গে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের বাড়ি, জীবিকা ও নিরাপত্তা হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন ওসামা। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তিনি সকাল ১০টার দিকে শিশুকে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হন। ওসামার বাবা মুহাম্মদ হুসনি আবু নাসার জানান, প্রতিবেশীরা ফোন করে তাকে জানান, তার ছেলে শিশুকে কাঁধে নিয়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছে—যেখানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে। গাজার মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের কাছে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক সীমারেখা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই এলাকায় পৌঁছানোর পর ইসরাইলি বাহিনী সরাসরি গুলি না চালিয়ে তার আশেপাশে গুলি ছোড়ে। এতে বিভ্রান্ত হলেও ওসামা থামেননি। পরে একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন তার কাছে এসে ভেসে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এরপর তাকে শিশুকে নামিয়ে রেখে সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে এবং কাপড় খুলে ফেলতে বলা হয়। ওসামার বাবা বলেন, “সে শুধু অন্তর্বাস পরে ছিল এবং শান্ত ছিল, কোনো আক্রমণাত্মক আচরণ করেনি।” ওসামা আটক হওয়ার পর তার বাবা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিতে থাকেন এবং আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নিজের যোগাযোগ নম্বর দিয়ে আসেন। প্রায় ১০ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়, তার নাতিকে তারা পেয়েছে। পরে মাঘাজি বাজার এলাকায় আইসিআরসি কর্মকর্তারা শিশুটিকে পরিবারের হাতে তুলে দেন। শিশুটিকে কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় ফেরত দেওয়া হয়। কম্বল খুলে তার প্যান্টে রক্তের দাগ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। আইসিআরসি জানায়, তারা শিশুটিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে শিশুটির শারীরিক বা মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। পরিবারের দাবি, বাড়িতে আনার পর শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হাঁটুর চারপাশে পোড়া দাগ এবং ধারালো বস্তু দিয়ে করা গভীর ক্ষত ছিল। শিশুটি সারারাত ব্যথা ও আতঙ্কে কেঁদেছে এবং ঘুমাতে পারেনি। পরদিন হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, এসব আঘাত গোলাবারুদের কারণে নয়—বরং নির্যাতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটির হাঁটু ফুলে গেছে এবং সেখানে সিগারেটের দাগের মতো ক্ষত রয়েছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হামাসের প্রচারণার অংশ। এদিকে, আটক হওয়ার পর থেকে ওসামা আবু নাসারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলমান এই অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বর্তমানে প্রণালির উভয় পাশে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইরানের অবরোধ, হুমকি এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় পারাপারের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে এখনো কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে ইরান। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে—ভৌগোলিক অবস্থান, অপ্রচলিত সামরিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। ভৌগোলিক সুবিধা পারস্য উপসাগরের এই প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২৪ মাইল প্রশস্ত। ফলে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সংকীর্ণ পথ ব্যবহার করতে হয়। এই ‘চোকপয়েন্ট’ পরিস্থিতি ইরানকে সহজে নজরদারি ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে বাড়তি সুবিধা দেয়। ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিও প্রতিরক্ষা এবং আক্রমণ—উভয় ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অন্যতম বড় শক্তি তার অপ্রচলিত সামরিক কৌশল। ড্রোন, দ্রুতগামী ছোট নৌযান, বিস্ফোরকবোঝাই মানববিহীন নৌযান এবং সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে তারা বড় নৌবাহিনীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া সাধারণ জাহাজ থেকেও মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা ইরানের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু জাহাজকে নিরাপদে পারাপারের জন্য অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বৈশ্বিক উদ্বেগ হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা দ্রুত সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেখারচি এ তথ্য জানিয়েছেন। শুক্রবার (২৭ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ দাবি তুলে ধরা হয়। শেখারচির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ১৭টি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল, যেগুলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইতোমধ্যে ধ্বংস করেছে। তিনি দাবি করেন, এসব ঘাঁটি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন বাহিনী। তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের ১৩ জুন শুরু হওয়া ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের পর ইরান তার প্রতিরক্ষামূলক নীতিতে পরিবর্তন এনে আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে। ইরানের এই সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেন, গত ৪৭ বছরে ইরান কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তবে দেশের ওপর কোনো হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে এবং শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করা হবে। তিনি বলেন, শত্রুর হুমকি সম্পূর্ণরূপে দূর না হওয়া পর্যন্ত ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে শেখারচি বলেন, গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে ও নিরাপত্তার নামে আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে ওয়াশিংটন। গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আর আগের মতো থাকবে না। যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে চলতে হবে। এছাড়া, আঞ্চলিক মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে আশ্রয় না দেয়। কোনো দেশ যদি তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাহলে তাকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শেখারচি আরও উল্লেখ করেন, ইরান ধারাবাহিকভাবে তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অটল রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপের পরিকল্পনা করছে ইরান। এ লক্ষ্যে দেশটির পার্লামেন্টে একটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ফার্স ও তাসনিম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সংসদের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে একটি খসড়া আইন ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই আইনসভা দলের মাধ্যমে সেটি চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, “এই পরিকল্পনার আওতায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান ফি আদায় করবে।” তার মতে, বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি বলেন, “বিশ্বের অন্যান্য বাণিজ্য করিডোর ব্যবহার করলে যেমন শুল্ক দিতে হয়, তেমনি হরমুজ প্রণালীও একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। আমরা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, তাই জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর শুল্ক প্রদান স্বাভাবিক।” বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে টোল আরোপের সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেলবাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরান যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে, তার একটি হলো—হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মাঝেই ইসরাইলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেলআবিবের আকাশে দেখা গেল এক বিরল ও ভয়ার্ত দৃশ্য। হঠাৎ করেই হাজার হাজার কালো কাকের ঝাঁক শহরের আকাশ ঢেকে ফেলে, যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। বিশেষ করে শহরের অন্যতম আইকনিক স্থাপনা আজরিয়েলি টাওয়ারের ওপর দিয়ে যখন এই বিশাল পাখির দল ঘূর্ণায়মানভাবে উড়তে থাকে, তখন অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকের কাছে মনে হয়েছে, যেন পুরো শহর এক অদৃশ্য কালো চাদরে ঢেকে যাচ্ছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কেউ কেউ একে ‘অশুভ লক্ষণ’ বা আসন্ন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার) এ অনেক ব্যবহারকারী ইতিহাসের উদাহরণ টেনে দাবি করেছেন, বড় কোনো বিপর্যয়ের আগে প্রকৃতি এমন অস্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে সংকেত দেয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যাও উঠে এসেছে আলোচনায়। অনেকেই বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’-এর ১৯:১৭ নম্বর আয়াতের কথা টেনে এনে বলছেন, বিশাল যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের আগে আকাশের পাখিরা এভাবে একত্রিত হওয়ার কথা সেখানে বলা আছে। এ ধরনের ঘটনা ঘিরে মানুষের ভীতি নতুন নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, প্রাচীন রোমানরা পাখির আচরণ বিশ্লেষণের জন্য ‘অগার’ নামে বিশেষ পুরোহিত নিয়োগ করত। তারা পাখির গতিবিধি দেখে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দিতেন। একইভাবে টাওয়ার অব লন্ডনের দাঁড়কাকদের নিয়েও রয়েছে কিংবদন্তি—যদি তারা টাওয়ার ছেড়ে চলে যায়, তবে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের পতন ঘটবে বলে বিশ্বাস করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছেন। পক্ষীবিদদের মতে, ইসরাইল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাখির পরিযায়ন পথ। প্রতিবছর বসন্তকালে কোটি কোটি পাখি এই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হুডেড ক্রো’ নামের এক ধরনের কাক এই অঞ্চলে খুবই সাধারণ। মার্চ মাসে এদের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় তারা দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। শহরের উঁচু ভবন ও সহজলভ্য খাদ্যও বড় ঝাঁক তৈরিতে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো অলৌকিক বা অশুভ ঘটনা নয়; বরং ঋতুভিত্তিক স্বাভাবিক আচরণ। পরিবেশগত চাপ, শব্দ বা শিকারির উপস্থিতিতেও পাখিরা এমন আচরণ করতে পারে। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান সংঘাত এবং সামরিক উত্তেজনার কারণে অনেকেই এই দৃশ্যকে ‘যুদ্ধের পূর্বাভাস’ হিসেবে কল্পনা করছেন। সব মিলিয়ে, বিজ্ঞান যেখানে যুক্তি দিচ্ছে, সেখানে মানুষের মনে ভয় ও কল্পনার জায়গা এখনো দখল করে আছে এই রহস্যময় ‘কালো আকাশ’।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন জাহাজে বিপুল পরিমাণ ইরানি অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে, যা যেকোনো সময় বাজারে প্রবেশ করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইরানি অপরিশোধিত তেল (ক্রুড) সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় মজুদ রয়েছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় এবার বাজারে আসতে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন জাহাজে থাকা প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল। শনিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছেন বিশ্ব জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা। তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের সিনিয়র ম্যানেজার ইমানুয়েল বেলোস্ট্রিনো বলেন, ‘বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনের জলসীমা পর্যন্ত বিভিন্ন জাহাজে প্রায় ১৭ কোটি (১৭০ মিলিয়ন) ব্যারেল ইরানি তেল মজুদ রয়েছে।’ অন্যদিকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি এসপেক্ট গত ১৯ মার্চের এক মূল্যায়নে জানায়, সমুদ্রে থাকা ইরানি তেলের পরিমাণ ১৩০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল, যা মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান উৎপাদন ঘাটতির তুলনায় ১৪ দিনেরও কম সরবরাহের সমান। এশিয়া অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৬০ শতাংশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে এবং জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তেল শোধনাগারগুলো। ফলে জ্বালানি রপ্তানিও হ্রাস পাচ্ছে। এ অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলছে। তেল কিনতে যাচ্ছে যেসব দেশ ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে চীন ছিল ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা। গত বছর চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলো প্রতিদিন গড়ে ১৩ দশমিক ৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে। চীন ছাড়াও আগে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, গ্রিস, তাইওয়ান ও তুরস্ক ছিল ইরানি তেলের প্রধান আমদানিকারক। কেপলার জানায়, চীন গত বছর দৈনিক প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে। যা নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক দেশ এই তেল এড়িয়ে চলার সুযোগে সম্ভব হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর ভারত রুশ তেল সংগ্রহ করেছিল। অন্যান্য বড় এশীয় আমদানিকারকদের তুলনায় ভারতের তেলের মজুদ কম হওয়ায় দেশটি ইরানি তেল কেনার পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভারতের শোধনাগারের তিনটি সূত্র বলছে, তারা ইরানি তেল কিনতে আগ্রহী। এ বিষয়ে বর্তমানে সরকারের নির্দেশনা ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পেমেন্ট শর্তাবলির মতো বিষয়গুলোর স্বচ্ছতার অপেক্ষায় রয়েছে তারা। আমদানিতে যে জটিলতা তবে ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তেল ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো—কিভাবে অর্থ প্রদান করা হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা এবং সমুদ্রে থাকা তেলের একটি বড় অংশ পুরোনো ‘শ্যাডো ফ্লিট’ জাহাজে বহন করা হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু পূর্ববর্তী ক্রেতা ইরানি তেল কম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল বলে দুটি শোধনাগার সূত্র জানিয়েছে। তবে ২০১৮ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে ইরানি তেলের বড় একটি অংশ তৃতীয় পক্ষের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে চায় ২০টিরও বেশি দেশ। যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতও রয়েছে। খবর ডনের। প্রতিবেদন বলছে, ২০টিরও বেশি দেশ হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরোধের নিন্দা করেছে। প্রধানত ইউরোপীয় দেশগুলোসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন মিলে ২২টি দেশ বলেছে, ‘আমরা পারস্য উপসাগরে নিরস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের সাম্প্রতিক হামলা, তেল ও গ্যাস স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং ইরানি বাহিনীর হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়ার তীব্র নিন্দা জানাই।’ ‘প্রণালীটি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে আমরা আমাদের প্রস্তুতি প্রকাশ করছি। যেসব দেশ প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনায় নিযুক্ত রয়েছে, আমরা তাদের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানাই।’ তারা একটি যৌথ বিবৃতিতে বলেছে। ‘তেল ও গ্যাস স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলায় অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থগিতাদেশের আহ্বান জানাচ্ছি।’ দেশগুলো আরও যোগ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের প্রতিশোধমূলক সামরিক অভিযান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’-এর ৭০তম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিয়ন্ত্রিত ৫৫টিরও বেশি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। শনিবার প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আইআরজিসি এই হামলাকে “ক্রমিক ক্ষয়সাধন কৌশলের অংশ” হিসেবে উল্লেখ করে। এতে বলা হয়, হামলার ফলে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় ব্যাপক বিস্ফোরণ, আগুন এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত বহন করে। লক্ষ্যবস্তু: কোথায় আঘাত হানা হয়েছে? আইআরজিসির বিবৃতি অনুযায়ী, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি: সৌদি আরবের আল-খারজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা কুয়েতের আলী আল-সালেম ইরাকের ইরবিল (কুর্দিস্তান অঞ্চল) বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এছাড়া ইসরাইলের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানও হামলার আওতায় এসেছে বলে দাবি করা হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: হাইফা বন্দর তেল আবিবের কৌশলগত অঞ্চল হাদেরা কিরিয়াত ওনো সাভিয়ন বেন আমি বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে সামরিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায়। ব্যবহৃত অস্ত্র: উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি আইআরজিসি জানিয়েছে, হামলায় বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘কিয়াম’ ক্ষেপণাস্ত্র ‘এমাদ’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশাহ-৪’ ‘কদর’ মাল্টি-ওয়ারহেড সিস্টেম এই অস্ত্রগুলো দীর্ঘ পাল্লার এবং উচ্চ ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে মাল্টিপল ওয়ারহেড প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা তুলনামূলক সহজ হয় বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আধুনিক যুদ্ধের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে—কম খরচে নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা। কৌশলগত বার্তা: “ক্রমিক ক্ষয়সাধন” আইআরজিসি তাদের এই অভিযানকে “ধাপে ধাপে ক্ষয় করার কৌশল” হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে: শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে ফেলা অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দেওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিবর্তে “নিয়ন্ত্রিত সংঘাত” বজায় রাখার একটি পদ্ধতি। সময় নির্বাচন: রমজান ও ঈদের প্রেক্ষাপট আইআরজিসির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, এই হামলার সময় নির্বাচন করা হয়েছে রমজান মাসের শেষ সময়ে, ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে। তারা এটিকে “নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার ভিন্ন এক ভোর” হিসেবে বর্ণনা করেছে। এটি একটি প্রতীকী বার্তা হতে পারে: মুসলিম বিশ্বে সমর্থন অর্জনের চেষ্টা ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক কৌশলে ব্যবহার সংঘাতকে আদর্শিক রূপ দেওয়া আঞ্চলিক প্রভাব: উত্তেজনার বিস্তার এই হামলার দাবির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো: ১. যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তাদের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে পাল্টা হামলার ঝুঁকি রয়েছে। ২. ইসরাইলের অবস্থান ইসরাইল বরাবরই ইরানের সামরিক কার্যক্রমকে হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে এই ঘটনার পর তাদের সামরিক প্রস্তুতি বাড়তে পারে। ৩. উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ সৌদি আরব, ইউএই এবং কুয়েতের মতো দেশগুলো সরাসরি হামলার আওতায় আসায় তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: নীরবতা নাকি প্রস্তুতি? এই ধরনের বড় হামলার দাবির পর সাধারণত আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রতিক্রিয়া আসে। সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে: জাতিসংঘে জরুরি বৈঠক কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি নতুন নিষেধাজ্ঞা তবে অনেক সময় সরাসরি নিশ্চিত তথ্য না থাকলে দেশগুলো অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নেয়। তথ্য যাচাই: দাবি বনাম বাস্তবতা এই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আইআরজিসির দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। বর্তমানে: যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই স্যাটেলাইট বা ওপেন সোর্স বিশ্লেষণ প্রয়োজন ফলে এই ধরনের পরিস্থিতিতে “তথ্য যুদ্ধ” একটি বড় উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভাব্য ঝুঁকি: পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ কি সামনে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের হামলা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে তা বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ঝুঁকিগুলো হলো: সরাসরি ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিশ্লেষণ: কৌশল না সংকেত? আইআরজিসির এই ঘোষণা কয়েকটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নির্দেশ করতে পারে: মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলানো ভবিষ্যৎ আলোচনায় প্রভাব বিস্তার ইরানের আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’-এর ৭০তম ধাপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। তবে এই ঘটনার বাস্তবতা, প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ভর করছে পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া, তথ্য যাচাই এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর। বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি অনিশ্চিত ও সংবেদনশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে একটি ছোট ঘটনা বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
শুক্রবার দিবাগত রাত। সময় তখন ১টা ৩৫ মিনিট। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে ধীরে ধীরে অবতরণ করে একটি বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইট। বিমানের ভেতরে থাকা ১৮৬ জন বাংলাদেশির জন্য এটি ছিল শুধু একটি যাত্রার শেষ নয়—বরং অনিশ্চয়তা, ভয় ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ইরানে চলমান অস্থিরতার মধ্যে আটকে পড়া এই বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এক জটিল ও বহুস্তরীয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুধু একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম ছিল না, বরং এটি ছিল মানবিক দায়বদ্ধতা, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি বাস্তব উদাহরণ। প্রত্যাবাসনের দীর্ঘ পথ: তেহরান থেকে ঢাকা সূত্র অনুযায়ী, ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সরাসরি বিমানে আনা সম্ভব ছিল না। ফলে বিকল্প পথ বেছে নিতে হয়। প্রথম ধাপে, তেহরান থেকে সড়কপথে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় আজারবাইজান সীমান্তে। এই যাত্রা ছিল ক্লান্তিকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সীমান্ত পার হওয়ার পর আবার সড়কপথে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বাকু শহরে। বাকুতে পৌঁছানোর পর শুরু হয় অপেক্ষার আরেক অধ্যায়—চার্টার্ড ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুতি। অবশেষে বিশেষ বিমানে করে তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধাপেই ছিল সমন্বয়, নিরাপত্তা এবং সময় ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ। বিমানবন্দরে স্বস্তির মুহূর্ত ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। তারা প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশিদের স্বাগত জানান এবং তাদের খোঁজখবর নেন। অনেকের চোখে তখন জল—স্বস্তির, কৃতজ্ঞতার, আবার কিছুটা ভয় কাটার আনন্দের। একজন প্রবাসী বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম হয়তো আর দেশে ফিরতে পারব না। প্রতিদিন আতঙ্কে কাটছিল। এখন মনে হচ্ছে নতুন জীবন পেয়েছি।” কূটনৈতিক তৎপরতা: পর্দার আড়ালের গল্প এই প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছে একাধিক দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে। বিশেষ করে তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম. আমানুল হকের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন এবং বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এছাড়া, ঢাকা থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা বাকুতে অবস্থান করে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সরাসরি সহায়তা করেন। এটি দেখায় যে, আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যৌথ উদ্যোগ: দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এই সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কেন আটকে পড়েছিলেন বাংলাদেশিরা? ইরানে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বিদেশি শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। অনেকেই কাজ হারান, আবার কেউ কেউ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে দ্রুত তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আগের অভিজ্ঞতা: ২০২৪ সালের প্রত্যাবাসন এটি প্রথম নয়। গত বছরের জুন মাসেও ইরান থেকে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তখন পরিস্থিতি আরও জটিল ছিল। বাংলাদেশিরা ইরান থেকে সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আরও দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা: ভয়, অনিশ্চয়তা ও বেঁচে ফেরার গল্প প্রত্যাবাসিতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দিন কাটিয়েছেন ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। একজন শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা রাতে ঘুমাতে পারতাম না। বাইরে কী হচ্ছে জানতাম না। পরিবারও চিন্তায় ছিল।” আরেকজন শ্রমিক জানান, “কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।” এই অভিজ্ঞতাগুলো শুধু একটি সংকটের চিত্র নয়, বরং প্রবাসীদের বাস্তব জীবনের সংগ্রামের প্রতিফলন। সরকারের ভূমিকা: কতটা কার্যকর? এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রমকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় ছিল এই সাফল্যের মূল কারণ। তবে তারা এটিও বলছেন যে, ভবিষ্যতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা এই ঘটনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে নিয়ে এসেছে: সংকটের সময় দ্রুত তথ্য সংগ্রহ জরুরি কূটনৈতিক যোগাযোগ শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন প্রবাসীদের জন্য জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা থাকা দরকার বিকল্প রুট পরিকল্পনা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা উচিত আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিপুল সংখ্যক নাগরিক বিদেশে কর্মরত। অর্থনৈতিক প্রভাব প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস। ফলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা শুধু মানবিক বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক প্রভাব প্রবাসীদের পরিবারগুলোও এই সংকটে মানসিক চাপের মধ্যে ছিল। অনেক পরিবার দিনরাত উদ্বেগে কাটিয়েছে। তাদের জন্য এই প্রত্যাবাসন শুধু একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়, বরং একটি আবেগঘন মুহূর্ত। ইরান থেকে ১৮৬ বাংলাদেশির প্রত্যাবাসন একটি সফল কূটনৈতিক ও মানবিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এটি একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও—বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। এই ঘটনাটি দেখিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে জটিল পরিস্থিতিও সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি উদ্ধার অভিযান নয়—বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান ও হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আতঙ্কে ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে নিয়মিত সাইরেন বাজছে এবং মানুষ মুহূর্তের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনে একাধিকবার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজছে। সাইরেন শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষজন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন। কিছু সময় পর বিপদ কেটে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলে তারা আবার ঘরে ফিরলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই আবার নতুন করে সাইরেন বাজতে পারে—যা তাদের মধ্যে স্থায়ী উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং ঘুমের সমস্যা দ্রুত বাড়তে পারে। সাইরেন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আগত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন শনাক্ত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে সাইরেন ব্যবস্থা নিয়েও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কোনো হামলা না হলেও সাইরেন বেজে উঠছে। আবার কখনো প্রকৃত হামলার সময়ও সতর্ক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর মধ্যেও উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর বেশি প্রভাব বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষরা। নিয়মিত স্কুল কার্যক্রম এবং কর্মজীবনও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা, জরুরি খাদ্য ও পানীয় মজুত রাখা এবং নিরাপত্তা ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার দাবি এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার নির্দেশে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র Kharg Island-এ একটি বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “আমার নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং খার্গ দ্বীপের প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।” তবে তিনি জানান, মানবিক কারণে আপাতত দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খার্গ দ্বীপটি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি ইরানের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়, তাহলে পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন অংশীদারিত্ব থাকা তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এসব স্থাপনাকে “ছাইয়ের স্তূপে” পরিণত করা হবে। হামলার ভিডিও ও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রকাশিত একটি ভিডিওর ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এতে খার্গ দ্বীপের বিমানবন্দর ও রানওয়েসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দৃশ্য রয়েছে। ভিডিওতে বড় বিস্ফোরণ ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমটি নিশ্চিত করেছে যে হামলাগুলো দ্বীপটিতেই সংঘটিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন এদিকে সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাডার কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তথ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা ১২ দিনের চলমান সংঘাতে সামরিকভাবে বড় সাফল্য না পেলেও ইসরায়েল সরকার তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক পরিস্থিতি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় অবস্থিত সাতটি স্বাধীন প্রদেশের একটি সংগঠন। একসময় এই প্রদেশগুলো চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্র বা ট্রুসিয়াল স্টেটস নামে পরিচিত ছিল।পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে প্রদেশগুলোর নিজস্ব স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা লাভ করে। তবে এখনও প্রদেশগুলো একটি কেন্দ্রীয় শাসনের আওতাভুক্ত রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় শাসনকর্তার পদবী আমির। আরব আমিরাতের মোট আয়তন ৮৩,৬০০ বর্গ কিলোমিটার বা ৩২,৩০০ বর্গ মাইল। ২০১৭ সালের হিসেব অনুযায়ী আরব আমিরাত এর আনুমানিক জনসংখ্যা ৯,৪০০,০০০। সংযুক্ত আরব আমিরাত এর রাজধানীর নাম আবুধাবি এবং দেশটির বৃহত্তম শহর দুবাই। সংযুক্ত আরব আমিরাত এর সাতটি প্রদেশ এর নাম হলো: আবু ধাবি, আজমান, দুবাই, আল ফুজাইরাহ, রাআস আল খাইমাহ, আশ শারজাহ্ এবং উম্ম আল ক্বাইওয়াইন। আরব আমিরাত এ প্রচলিত মুদ্রার নাম আমিরাতি দিরহাম।এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত ব্যতিক্রমধর্মী এই দেশটি পুরোপুরি মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা। এই দেশের শিল্প, সংস্কৃতি, নাগরিকের জীবনব্যবস্থা সব কিছুর সাথেই ইসলামিক কালচার পুরোপুরি জড়িত। এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল দেশ বলে বিবেচিত। আরব আমিরাতে আছে বিশ্বের উচ্চতম স্থাপনাগুলো, যা পুরো বিশ্বের সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আরব আমিরাত এর ভৌগোলিক অবস্থান: সংযুক্ত আরব আমিরাত এশিয়া মহাদেশের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থিত একটি দেশ। এটি পুরোপুরি একটি মরুভূমি রাষ্ট্র। মধ্য প্রাচ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের সীমানায় সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত। ওমান ও সৌদি আরবের মধ্যবর্তী স্থানে দেশটি অবস্থান করছে। দেশটির মোট আয়তনের পুরোটাই স্থলভাগ, তবে খুবই সামান্য পরিমানে জলাভূমি রয়েছে। আরব আমিরাত এর পশ্চিমে কাতারের সাথে সীমানা রয়েছে। পশ্চিম, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বে সৌদি আরবের সাথে আন্তর্জাতিক সীমানা বিদ্যমান। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরপূর্বে ওমানের সাথে আরব আমিরাত এর আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। তবে সৌদি আরবের সাথে আরব আমিরাত এর সীমানা নিয়ে এখনও বিভিন্ন মতবিরোধ রয়েছে। ফলে দেশটির সঠিক আয়তন নির্ণয় করাটা সহজসাধ্য নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত এর ইতিহাস : ১,২৭,০০০ বছর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রথম আফ্রিকার মানুষের বসতি স্থাপন করার নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে বিরূপ আবহাওয়ার কারনে এবং পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের অভাবে এই অঞ্চলগুলোতে কোনো জনপদই বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ লোকজনই তাবু খাটিয়ে বসতি নির্মাণ করে থাকতো। ঘরবাড়ি তৈরি হলেও তা হতো খুবই সাধারণ মানের। এখানকার জনগণ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে একদমই মানবেতর জীবনযাপন করতো। ১৯৫৮ সালে এই অঞ্চলে আমেরিকান শাসন আমল শুরু তবে তখন প্রতিটি প্রদেশই একটি আরেকটির থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং আমেরিকান আইনের আওতাধীন ছিল। পরবর্তীতে আমেরিকান শাসক গোষ্ঠীর এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি উত্থাপিত হলে প্রদেশগুলোর একত্রিত হয়ে নতুন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২রা ডিসেম্বর ব্রিটিশ শাশনামলের অবসান ঘটে এবং আলাদা আলাদা সাতটি প্রদেশ একত্রিত হয়ে গঠিত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। এটি বর্তমানে বিশ্ব দরবারেএকটি স্বাধীন ও সার্বভোম ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। সংযুক্ত আরব আমিরাত এর জাতীয় পতাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত এর পতাকায় চারটি রঙ রয়েছে।যথা: লাল, সাদা, সবুজ এবং কালো। পতাকা দন্ডের দিকে একটি উলম্ব লাল অংশ এবং পুরো পতাকা সবুজ, সাদা এবং কালো অনুভূমিক ডোরা দিয়ে নকশা করা হয়েছে। আরব আমিরাত এর জাতীয় পতাকার বৈচিত্র্যময় এই রঙ দিয়ে আলাদা আলাদা প্রদেশের মধ্যে ঐক্য ও মেলবন্ধনকে তুলে ধরা হয়েছে। পতাকাটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ২:১। আরব আমিরাত এর জাতীয় পতাকা নকশা করেন মোহাম্মদ আল মাইনাহ এবং তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর।১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাত এর পতাকার নকশা গ্রহণ করা হয়। আরব আমিরাত এর প্রচলিত ভাষা: সংযুক্ত আরব আমিরাত এর সরকারি ভাবে ব্যবহৃত ভাষা আরবি। পাঠ্যপুস্তক, খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সব ধরনের নথিপত্র এবং অনলাইন মাধ্যমে সব যোগাযোগ আরবি ভাষায় পরিচালিত হয়।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মার্জিত ভাষাও আরবি। তবে প্রধান শহরগুলো বাদে আসেপাশের ছোটখাটো অঞ্চলগুলোতে অন্যান্য ভাষাভাষী লোকজনও বসবাস করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আরবি ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি, হিন্দি, মলয়ালম, উর্দু ও ফিলিপিনো ভাষা প্রচলিত আছে৷ আরব আমিরাতে বসবাসকারী নাগরিকদের ধর্ম: সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি মুসলিম প্রধান দেশ। সরকারি ভাবে ইসলামকে জাতীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেশের অধিকাংশ লোকজন ইসলাম ধর্মের অনুসারী এবং তাদের জীবনধারার সাথে ইসলামিক সংস্কৃতি সম্পূর্ণ মিশে আছে। ইসলাম ধর্ম ছাড়াও দেশটিতে অল্প কিছু সংখ্যক হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর লোকজন রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এর মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৬ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন । শতকরা ৯ শতাংশ জনগণ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর, শতকরা ৮ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীর এবং বাকি শতকরা ৭ শতাংশ লোকজন বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারী। সংযুক্ত আরব আমিরাত এর অর্থনীতি: বিশ্বের ধনী দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি। আরব আমিরাত এর অর্থনীতির মূল চাকা সচল রেখেছে খনিজ তেল। ৭০ বছর আগে আরব আমিরাতে তেলের সন্ধান মিললে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটে অল্প সময়ের মধ্যেই। বর্তমানে আরব আমিরাত এর নাগরিকদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৪৫,৭১৬ মার্কিন ডলার। সেই হিসেবে দেশটি নিঃসন্দেহে একটি ধনী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে পারে। তেল ছাড়াও সেবা খাত, শিল্প খাত ও পর্যটন খাতেও আরব আমিরাত এর অর্থনীতি নির্ভরশীল। আরব আমিরাত এর অর্থনীতিতে কৃষিখাতেরও সামান্য অবদান রয়েছে। বিশ্বের আশ্চর্যমন্ডিত স্থাপনাগুলোর বেশ কিছু এই দেশে অবস্থিত,ফলে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক এই দেশে ভ্রমনের উদ্যেশ্যে আসে। এই পর্যটন কেন্দ্র গুলো আরব আমিরাত এর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে আরব আমিরাতে একদমই রমরমা পরিবেশ বিদ্যমান । মূলত চীন, আমেরিকা ও ভারত থেকে দেশটির প্রধান আমদানি পন্যগুলো আসে৷ অন্যদিকে আরব আমিরাত এর সাথে রপ্তানি খাতে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত দেশ হলো ভারত, ইরান ও জাপান। তবে খনিজ তেলের কারনে বিশ্বমঞ্চে আরব আমিরাত নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ভাবে সফলতার শীর্ষে পৌছাতে পেরেছে। আরব আমিরাত এর আবহাওয়া ও জলবায়ু: সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি শুষ্ক মরুভূমির জলবায়ু রয়েছে। এই দেশে প্রধানত দুইটি ঋতুর আনাগোনা লক্ষ করা যায়। একটি শীত ঋতু এবং অন্যটি গ্রীষ্ম ঋতু। তবে তুলনামূলকভাবে বছরের বেশিরভাগ সময় জুড়েই গ্রীষ্ম ঋতুর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত আরব আমিরাতে শীত ঋতু বিদ্যমান থাকে। শীতের এই সময়টাতে দেশটির গড় তাপমাত্রা থাকে ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বছরের বাকি সময়টা থাকে পুরোপুরি গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মকালে আরব আমিরাত এর গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৫ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কখনও কখনও আরও বেশি তাপমাত্রা লক্ষ করা যায়। শুষ্ক মৌসুমে প্রায়ই এখানে বালুর ঝড় হয়। মৌসুমি বাতাস মরুভূমির বালু উড়িয়ে নিয়ে এসে লোকালয়ে প্রবেশ করে। দেশটিতে খুব সামান্য পরিমাণে বৃষ্টিপাত হতে দেখা যায়। দেশটির বার্ষিক বৃষ্টিপাত এর মাত্রা ১০০ মিমি এরও কম। সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়াই দেশটির জলবায়ুর মূল বৈশিষ্ট্য। আরব আমিরাত এর সংস্কৃতি: আরব আমিরাত এর সংস্কৃতিতে পুরোপুরি আরবি সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছে। তবে আরবি সংস্কৃতির পাশাপাশি পারস্য সংস্কৃতির, পূর্ব আফ্রিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির প্রভাবও আমিরাতি সংস্কৃতিতে লক্ষ করা যায়। ইসলামিক রীতিনীতি ও কালচার খুব কঠোরভাবে মেনে চলা হয় এই দেশটিতে। তাইতো সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসলামিক সংস্কৃতির রাজধানী নামেও পরিচিত। দেশটির স্থানীয় স্থাপত্য, সঙ্গীত, পোশাক, রন্ধনপ্রণালী এবং জীবনধারায় পুরোপুরি ইসলামিক কালচার এর প্রভাব রয়েছে। আরব আমিরাত এর নাগরিকদের মধ্যে বেশ মিশুকে স্বভাব লক্ষ করা যায়। যে কোনো মজলিসে প্রবেশের সময় আগত মেহমানগন ডানদিক থেকে সকল অতিথিদের সালাম দিয়ে প্রবেশ করে। মজলিসের শুরুতেই বিশেষ এক ধরনের আমিরাতি কফি পরিবেশন করা হয়। এবং পরিবেশনের ক্ষেত্রেও ডানদিক থেকে শুরু করে ঘরের বা দিকে চলে যেতে দেখা যায়। তবে মুরুব্বি এবং সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে আগে প্রাধান্য দেয়া হয়। আরব আমিরাত এর সাধারণ মানুষ এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কান্দুরা এবং আবায়া পড়তে ভালোবাসেন। তবে সবধরনের পোশাকই এমন ভাবে তৈরি করা হয় যাতে পুরো শরীরে আবৃত থাকে। এতে ইসলামিক পোশাকের নিয়মও কক্ষা করা হয় এবং উত্তপ্ত আবহাওয়া থেকেও ত্বকও আরাম পায়। বিয়ের পরে আমিরাতের মহিলারা তার পরিবারের পরিচয়ই বহন করে এবং ছেলে মেয়েরা তাদের বাবার পরিচয়ে পরিচিত হয়। আরব আমিরাত এর নাগরিকদের খাদ্যাভ্যাস: আরব আমিরাত এর নাগরিকদের প্রধান খাদ্য উপাদান হলো ভাত,মাছ, মাংস, রুটি এবং সবজি। তবে ইসলামে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এমন পশুর মাংস খাওয়ার প্রচলন একদমই নেই বললেই চলে। আরব আমিরাতে সাধারণত মাটন এবং ভেড়ার মাংস খাওয়ার প্রচলন সবথেকে বেশি। এছাড়াও সামুদ্রিক মাছ ও সবজি এদেশের খাদ্য তালিকায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। প্রধান খাবার হিসেবে বেশিরভাগ সময়েই সুগন্ধি চালের সাথে মাংসের সংমিশ্রণে রান্না করা খাবার খেতে দেখা যায়। আর প্রতিদিনের খাবার তালিকায় খেজুর তো থাকবেই। আমিরাতের জনপ্রিয় পানীয় হলো কফি এবং চা, যা এলাচ, জাফরান বা পুদিনা পাতা দিয়ে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়। আরব আমিরাত এর জনপ্রিয় খাবার: ১. আল জাবাব রুটি ২. বালালেত ৩.বাথিথ ৪.হারিস ৫.জামি ৬.জাশেদ ৭.কাবসা ৮.খবিস ৯. খানফ্রুশ ১০.খামির রুটি ১১.মাচবুস ১২. মাদ্রুব ১৩. মার্কাউকা ১৪.মাকলুবা ১৫. মুহলা রুটি ১৬ কুজি ১৭.সালোনা ১৮.থারিদ ১৮ ওয়াগাফি রুটি ১৯.উটের দুধ ২০. লাবান ২১.আরবি কফি ২২.আরবি চা (ইত্যাদি) সংযুক্ত আরব আমিরাত এর আমিরাত সমূহ এবং এদের দর্শনীয় স্থান: মোট সাতটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত সংযুক্ত আরব আমিরাত এর প্রতিটি প্রদেশেই আছে জনপ্রিয় বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। পৃথিবীর সবথেকে উঁচু স্থাপনা বুর্জ খলিফাও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত। এছাড়াও সামুদ্র সৈকত, মরুভূমির উদ্যান, পাহাড় সহ আরও অনেক আকর্ষণীয় বিষয় আছে এই দেশে পরিদর্শন করার জন্য। আবুধাবির দর্শনীয় স্থান – ১. লুভর মিউজিয়াম আবুধাবির সবথেকে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান লুভর মিউজিয়াম। এই জাদুঘরে নিওলিথিক যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সকল সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন এর এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। জাদুঘরটিতে মোট ১২ টি গ্যালারির একটি স্থায়ী প্রদর্শনী তো রয়েছেই তার পাশাপাশি প্রতি বছর বিভিন্ন অকেশনে আরও জমকালো ভাবে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ২. শেখ জায়েদ মসজিদ সংযুক্ত আরব আমিরাত এর সবথেকে বড় মসজিদ শেখ জায়েদ মসজিদ। এই মসজিদে একসাথে চল্লিশ হাজার মুসুল্লি জামাতে নামাজ আদায় করতে পারবে। অসাধারণ নির্মাণশৈলী মসজিদটিকে এতো বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে। ৩. ফেরারি ওয়ার্ল্ড থিম পার্ক আবুধাবির ইয়াস দ্বীপে অবস্থিত একটি জনপ্রিয় থিম পার্ক ফেরারি ওয়ার্ল্ড থিম পার্ক। ড্রাইভিং পছন্দ করে এমন টুরিস্টদের জন্য একদম উপযুক্ত একটি পর্যটন কেন্দ্র এটি। ৪. আল হোসন ফোর্ট আল হোসন ফোর্ট আবুধাবির হামদান বিন মোহাম্মদ স্ট্রিটে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসিক নিদর্শন। আরব আমিরাত এর প্রাচীন জনপদের বিভিন্ন নিদর্শন এই ভবনে সংরক্ষিত আছে। ৫. ফ্যালকন হাসপাতাল আবুধাবির অফ সোয়েহান রোডে অবস্থিত ফ্যালকন হাসপাতাল একটি পশুচিকিৎসা হাসপাতাল। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি সহ হাসপাতাল সংলগ্ন জাদুঘর পরিদর্শন করতে পারবেন। আজমান এর দর্শনীয় স্থান ১. ইতিসালাত টাওয়ার ইতিসালাত টাওয়ার হলো ১৭ তলা বিশিষ্ট একটি বিলাসবহুল ভবন। এখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সহ থাকার অভিজ্ঞতা ও বিলাসবহুল শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। ২. আজমান ধো ইয়ার্ড এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি ব্যোটিং এর চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। ৩. আজমান জাতীয় জাদুঘর ১৮ শতকে নির্মিত ভাবনটিতে শহরের প্রাচীন নিদর্শন গুলো দেখতে পাবেন৷ একজন ইতিহাস প্রেমীর জন্য আজমান জাতীয় জাদুঘর খুবই উপযুক্ত একটি দর্শনীয় স্থান। ৪. আল জোরাহ ন্যাচারাল রিজার্ভ এই স্পটে অবস্থানকালে আপনি কিছুসময়ের জন্য ভুলে যেতে বাধ্য হবেন যে আপনি মরুভূমিতে আছেন। অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে প্রায় ৬০ প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে এখানে। ৫. আল মুরাব্বা ওয়াচটাওয়ার এটি আজমান শহরের একটি জনপ্রিয় ঐতিহাসিক নিদর্শন। ১৯৩০ এর দশকে শহরের নিরাপত্তার জন্য এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। দুবাই এর দর্শনীয় স্থান – ১. বুর্জ খলিফা দুবাই শহরের সবথেকে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান বুর্জ খলিফা।এটি পৃথিবীর সবথেকে উঁচু ভবন। শহরের যে কোনো প্রান্ত থেকে বুর্জ খলিফার দেখা মিলবে। ২. বুর্জ আল আরাব পৃথিবীর সবথেকে বিলাসবহুল হোটেল ও রেস্তোরাঁর সন্ধান চাইলে চলে যেতে হবে বুর্জ আল আরাবে এটি নৌকার পালের মতো দেখতে একটি ভবন যা একটি দ্বীপের ওপর নির্মিত। ৩. মিরাকল গার্ডেন পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর প্রাকৃতিক ফুলের বাগান মিরাকল গার্ডেন, যা একেক ঋতুতে একেক রঙের ফুলে নিজেকে রাঙিয়ে নেয়। ৪. অ্যাকোয়াভেঞ্চার ওয়াটারপার্ক দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ এর ক্রিসেন্ট রোডে অবস্থিত একটি চমৎকার ওয়াটার পার্ক অ্যাকোয়াভেঞ্চার ওয়াটারপার্ক। ৫.দুবাই ডেজার্ট কনজারভেশন রিজার্ভ মরুভূমির টিলা এবং খাদে ট্রেকিং এর এক চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাইলে চলে যেতে হবে দুবাই ডেজার্ট কনজারভেশন রিজার্ভে। আল ফুজাইরাহ এর দর্শনীয় স্থান ১. ফুজাইরাহ ফোর্ট ফুজাইরাহ ফোর্ট সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রাচীনতম দুর্গ হিসাবে বিবেচিত। এটি একটি মাটির ইটের তৈরি প্রাচীন ভবন। ২. স্নুপি দ্বীপ স্নুপি দ্বীপে চমৎকার সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি ডাইভিং এবং সুইমিং এর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। চাইলে দ্বীপের বিভিন্ন রিসোর্ট ও ভিলা গুলোতে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। ৩. আল বিদিয়া মসজিদ শহরের প্রাচীন মসজিদ গুলোর মধ্যে অন্যতম আল বিদিয়া মসজিদ যা অটোমান মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটির আশেপাশে আরও অনেকগুলো প্রাচীন ভবন ও চারটি ওয়াচ-টাওয়ার রয়েছে। ৪. বিথনাহ দুর্গ ফুজাইরাহ শহর থেকে ১৩ কিমি দূরে প্রধান মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বিথনাহ দুর্গ ফুজাইরাহ এর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। ৫. কালবা কর্নিচ পার্ক পরিবার পরিজন নিয়ে পিকনিক অথবা বারবিকিউ পার্টি করার জন্য একটি আদর্শ স্পষ্ট কালবা কর্নিচ পার্ক। শিশুদের খেলার জন্য সুন্দর মাঠ ও বসার জন্য উপযুক্ত জায়গা রয়েছে পার্কটিতে। রাআস আল খাইমাহ এর দর্শনীয় স্থান – ১. জেবেল জাইস সংযুক্ত আরব আমিরাতের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জেবেল জাইস। এই পাহাড়চূড়া থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দারুণ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। ২. জাজিরাত আল হামরা আরব আমিরাতে তেল আবিষ্কারের আগে গ্রামগুলির অবস্থা কেমন ছিল তার নিদর্শন মিলবে জাজিরাত আল হামরা নামক গ্রামে। গ্রামটিতে এখনও প্রাচীন যুগের সকল নিদর্শন বিদ্যমান আছে। ৩. রাআস আল খাইমাহ জাতীয় জাদুঘর জাদুঘরের ভবনটি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের শাসকদের বাসভবন ছিল। বর্তমানে ভবনটি শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত যেখানে প্রাচীন যুগের অসংখ্য নিদর্শন সংগৃহীত আছে। ৪. আল হামরা মল সুবিশাল এলাকা নিয়ে গঠিত আল হামরা মল বিনোদন, কেনাকাটা ও খাওয়াদাওয়ার একটি পারফেক্ট পয়েন্ট। শপিং মলটিতে ১২০ টিরও বেশি দোকান, অসংখ্য ফুড কোর্ট, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ ও কিডস জোন রয়েছে। ৫. হাজর পর্বত রাআস আল খাইমাহ এর অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত পর্যটন এলাকা হাজর পর্বত। পর্বতমালার নজরকাড়া সৌন্দর্য যে কোনো পর্যটককে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। শারজাহ এর দর্শনীয় স্থান ১. শারজাহ ডেজার্ট পার্ক প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য শারজাহ ডেজার্ট পার্ক একটি উপযুক্ত দর্শনীয় স্থান। তিনটি শ্রেনিতে এই পার্কটির ডেকোরেশন করা হয়েছে।যথা: প্রাকৃতিক ইতিহাস যাদুঘর, আরবীয় বন্যপ্রাণী কেন্দ্র এবং শিশু খামার। ২. আল কাসবা শারজাহ এর একটি জনপ্রিয় শপিং কমপ্লেক্স আল কাসবা। এখানে একই সাথে রেস্তোরাঁ, থিয়েটার এবং কিডস ফান জোন সহ আরও অনেক সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। ইনডোর এবং আউটডোর বিনোদন কেন্দ্র চলমান থাকে সব সময়। ৩. শারজাহ মিউজিয়াম অফ ইসলামিক সিভিলাইজেশন বিশাল জলরাশির তীর ঘেসে ইসলামিক ইতিহাসের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে স্বগর্বে বিদ্যমান শারজাহ মিউজিয়াম অফ ইসলামিক সিভিলাইজেশন। ইসলামিক নিদর্শন ছাড়াও আরব আমিরাত এর বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ৪. শারজাহ অ্যাকুরিয়াম এটি একটি আর্টিফিশিয়াল সামুদ্রিক পরিবেশ। বিশাল আকৃতির অনেকগুলো ট্রান্সপারেন্ট ট্যাংক এর ভেতর কৃত্রিম সামুদ্রিক পরিবেশ তৈরি করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ৫. শারজাহ ন্যাশনাল পার্ক ছয় লক্ষ ত্রিশ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে শারজাহ ন্যাশনাল পার্ক নির্মিত হয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে নিবিড় ভাবে কিছুটা সময় কাটানো যায় শারজাহ ন্যাশনাল পার্কে উম্ম আল কোয়াইন এর দর্শনীয় স্থান : ১. ড্রিমল্যান্ড অ্যাকোয়া পার্ক দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ড্রিমল্যান্ড অ্যাকোয়া পার্ক এই অঞ্চলের সবথেকে বড় এবং জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। অন্যান্য আমিরাত থেকে এখানে আসার পথও একদম সহজ বলে এখানে পর্যটকদের ভীড় তুলনামূলক বেশি থাকে। ২. UAQ জাতীয় জাদুঘর জাদুঘরের ভবনটি ২৫০ বছরের পুরোনো। এখানে আগে এই অঞ্চলের শাসনকর্তাগন বসবাস করতেন।বর্তমানে আরব আমিরাত এর প্রতিটি প্রদেশ থেকেই অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে ভীড় জমায় । ৩. আল সিন্নিয়াহ দ্বীপ চমৎকার সমুদ্র সৈকত এবং দ্বীপের মধ্যকার ম্যানগ্রোভ বনের জন্য প্রচুর দর্শনর্থীদের দ্বীপটি আকর্ষণ করে। ৪. ফালাজ আল মুআল্লা ফালাজ আল মুআল্লা এই আমিরাত এর একটি প্রাচীন শহর। চারটি সুপরিচিত বৃহৎ স্থাপনা ও তিনটি ওয়াচ টাওয়ার এর জন্য এই শহরটি পুরো আমিরাত জুড়ে বিখ্যাত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিটি প্রদেশই নিজস্ব স্বকীয়তা ও সমৃদ্ধিতে ভরপুর। অর্থনৈতিক অবস্থান, দক্ষ জনশক্তি, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি সব মিলিয়ে দেশটিকে একটি উন্নত দেশে পরিনত করেছে। একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে দেশটি নিজেদের গর্বিত মনে করে এবং বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে। মরুভূমির ছোট ছোট জনপদ থেকে আধুনিক নগররাষ্ট্রে রূপান্তরের এক অনন্য উদাহরণ সংযুক্ত আরব আমিরাত। উন্নত অবকাঠামো, শক্তিশালী অর্থনীতি, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রের কারণে দেশটি আজ বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
তেলের অফুরান সম্পদ, আভিজাত্যপূর্ণ নগরজীবন এবং আধুনিক স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি আজ উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও পর্যটনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠা এই দেশটি গত কয়েক দশকে অভূতপূর্ব উন্নয়নের নজির স্থাপন করেছে। গগনচুম্বী অট্টালিকা, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শহর পরিকল্পনা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিশ্বে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। সাত আমিরাতের ফেডারেশন সংযুক্ত আরব আমিরাত মূলত সাতটি স্বাধীন আমিরাত নিয়ে গঠিত একটি ফেডারেশন। এগুলো হলো আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, উম্ম আল ক্বাইওয়াইন, রাস আল খাইমাহ এবং ফুজাইরাহ। ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর ছয়টি আমিরাত একত্র হয়ে ফেডারেশন গঠন করে। পরে ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাস আল খাইমাহ এতে যোগ দেয়। দেশটির রাজধানী আবুধাবি এবং সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় শহর দুবাই। রাজধানী আবুধাবির প্রাধান্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৃহত্তম আমিরাত হলো আবুধাবি। দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৮৭ শতাংশই এই আমিরাতের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট আমিরাত হলো আজমান, যার আয়তন প্রায় ২৫৯ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যায় এগিয়ে দুবাই যদিও আয়তনের দিক থেকে আবুধাবি সবচেয়ে বড়, তবে জনসংখ্যা ও পর্যটনের দিক থেকে দুবাই অনেক এগিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক ও কর্মজীবীরা এখানে বসবাস করেন। ফলে দুবাইকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আন্তর্জাতিক শহর বলা হয়। ভিনদেশিদের আধিক্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যার বড় অংশই বিদেশি নাগরিক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ ভারতীয়, প্রায় ১২ শতাংশ পাকিস্তানি এবং প্রায় ৭ শতাংশ বাংলাদেশি নাগরিক। স্থানীয় আমিরাতিদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম। বিলাসবহুল পুলিশের গাড়ি দুবাই পুলিশের বহরে রয়েছে বিশ্বের কিছু বিলাসবহুল ও দ্রুতগতির গাড়ি। এর মধ্যে ল্যাম্বরগিনি, বেন্টলি এবং ফেরারির মতো সুপারকার রয়েছে, যা পুলিশের টহল কার্যক্রমেও ব্যবহৃত হয়। গোল্ড এটিএম দুবাইয়ের অন্যতম বিস্ময়কর প্রযুক্তি হলো গোল্ড এটিএম। এই মেশিনে টাকা প্রবেশ করালে সোনা, স্বর্ণালংকার বা সোনার ঘড়ির মতো মূল্যবান পণ্য পাওয়া যায়। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন দুবাইয়ে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফা। এই ভবনের উচ্চ তলায় বসবাসকারীদের রমজান মাসে ইফতার করতে নিচের তলার বাসিন্দাদের তুলনায় দুই থেকে তিন মিনিট বেশি অপেক্ষা করতে হয়, কারণ তারা সূর্যাস্ত কিছুটা পরে দেখতে পান। পরিবেশবান্ধব মাসদার শহর আবুধাবিতে গড়ে উঠেছে মাসদার সিটি নামে একটি পরিবেশবান্ধব শহর। এটি মূলত সৌরশক্তি ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এখানে ব্যক্তিগত জ্বালানিচালিত গাড়ি নিষিদ্ধ এবং পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয় বৈদ্যুতিক যানবাহন। বুর্জ খলিফার নামকরণ বুর্জ খলিফা নির্মাণের সময় এর নাম ছিল বুর্জ দুবাই। পরে আবুধাবির আর্থিক সহায়তার স্বীকৃতিস্বরূপ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের নামে ভবনটির নাম পরিবর্তন করা হয়। বিশ্বের বৃহত্তম ইনডোর পার্ক আবুধাবিতে অবস্থিত ফেরারি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইনডোর থিম পার্ক হিসেবে পরিচিত। এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। নির্মাণে ব্যস্ত দুবাই দুবাইকে প্রায়ই “নির্মীয়মাণ শহর” বলা হয়। বিশ্বের কর্মরত ক্রেনের প্রায় ২৫ শতাংশই একসময় দুবাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এটি দেশটির দ্রুত উন্নয়ন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রতীক।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিমান চলাচল ব্যাহত হলে দুবাইয়ের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি বন্ধ থাকলে প্রতি মিনিটেই বিপুল অর্থ হারাতে পারে শহরটি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইল মেইল এক প্রতিবেদনে বলেছে, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকলে প্রতি মিনিটে প্রায় ১০ লাখ ডলার (প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড) ক্ষতি হতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি বিমানবন্দরটি টানা ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকে, তাহলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় এক দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১০৭ কোটি পাউন্ড। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সংযোগের ক্ষেত্রে এটি একটি প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে বা আকাশপথে বিধিনিষেধ আরোপ হলে দুবাইয়ের মতো বৈশ্বিক এভিয়েশন হাবের জন্য তা বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বাধীন সরকারকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে উৎখাত করার লক্ষ্য থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ব্যাপক বোমা হামলা সত্ত্বেও ইরানের অভ্যন্তরে প্রত্যাশিত গণ-অভ্যুত্থানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পরও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ অপরিবর্তিত রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের আশা পূরণ হয়নি সংঘাতের শুরুতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, সামরিক চাপ ইরানের জনগণকে তাদের ভাগ্য নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগ করে দেবে। তবে সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে তার অবস্থান অনেকটাই নরম হয়েছে। তিনি এখন বলছেন, ইসরায়েলের ভূমিকা কেবল ইরানি জনগণকে “সহায়তা করা”, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য পরিবর্তন আসলে বাস্তবতার প্রতিফলন—যেখানে সামরিক হামলার পরও ইরানে কোনো গণবিদ্রোহ দেখা যায়নি। নতুন নেতৃত্বেও টিকে আছে শাসনব্যবস্থা যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হওয়ার পরও দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনি -এর নেতৃত্বে ক্ষমতার কেন্দ্র দ্রুত পুনর্গঠিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যুদ্ধ দ্রুত শেষের ইঙ্গিত ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trumpও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সংঘাত দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ওয়াশিংটন এখনো যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। উপসাগরীয় ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলার “৩৮তম ধাপ” শুরু করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে— কুয়েতের আদিরি হেলিকপ্টার ঘাঁটিতে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে আহত শতাধিক মানুষকে আল জাবের ও আল মুবারাক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে কুয়েতের দুটি নৌঘাঁটি ও মার্কিন সেনাদের আবাসন লক্ষ্য করে হামলা করা হয়েছে বাহরাইনের মিনা সালমান বন্দরে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে আইআরজিসি বলেছে, শত্রুর “পূর্ণ পরাজয়” না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান চলবে। জাতিসংঘে ইরানবিরোধী প্রস্তাব এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। তবে Russia ও China ভোটদান থেকে বিরত থাকে। প্রস্তাবে ইরানকে অবিলম্বে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানের ওপর হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ে উদ্বেগ প্রস্তাবে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমুদ্রপথ— Strait of Hormuz Bab el-Mandeb Strait এগুলোতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়া ও ইরানের আপত্তি জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রস্তাবটি “অসম ভারসাম্যহীন”, কারণ এতে ইরানের ওপর হামলার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি প্রস্তাবটিকে “পক্ষপাতদুষ্ট” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, এতে আগ্রাসনকারীদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তেহরানের একটি ব্যাংকে বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাংক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এদিকে বিভিন্ন দেশে হামলার খবর পাওয়া গেছে— দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন ভূপাতিত সৌদি আরবের শায়বাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে ড্রোন কাতারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা প্রতিহত ইরাকে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন হামলা লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে দেশটিতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী, শিশু ও স্বাস্থ্যকর্মীও রয়েছেন। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে উল্লেখযোগ্য আঘাত হানলেও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে— হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ থামানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
ইরানের ধারাবাহিক ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার আশঙ্কায় নিরাপদ আশ্রয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে লাখ লাখ ইসরাইলি নাগরিককে। শুক্রবার (৬ মার্চ) মধ্যরাত থেকে ইসরাইলের বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে অন্তত পাঁচটি ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে ইরান। এর ফলে দেশজুড়ে সতর্কতা সাইরেন বাজতে থাকে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে রাতভর বোম্ব শেল্টারে অবস্থান নিতে হয়। ইসরাইলি গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলাগুলো একসঙ্গে না করে ভিন্ন ভিন্ন সময় ব্যবধানে চালানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কৌশলের লক্ষ্য হলো সাধারণ নাগরিকদের দীর্ঘ সময় ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে বাধ্য করা এবং এর মাধ্যমে ইসরাইল সরকারের ওপর মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। আতঙ্কে স্থবির জনজীবন ধারাবাহিক মিসাইল সতর্কতার কারণে ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে রাতভর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু পরিবার তাদের ঘর ছেড়ে নিরাপদ বাঙ্কার বা বোম্ব শেল্টারে আশ্রয় নেয়। স্থানীয় প্রশাসন নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং জরুরি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় কম হামলা এর আগে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক করে জানিয়েছিল, সংঘাতের প্রথম সপ্তাহে ইরান থেকে প্রায় ১,০০০ মিসাইল হামলা হতে পারে। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০টি মিসাইল ছোড়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইসরাইলি সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, প্রত্যাশার তুলনায় কম সংখ্যক হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, ইসরাইলি বাহিনীর ধারাবাহিক “অপারেশনাল সাকসেস” বা সফল সামরিক অভিযানের কারণে ইরান বড় আকারের হামলা চালাতে পারছে না। উত্তেজনা বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে এদিকে চলমান এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংঘাত দ্রুত প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে প্রতিহত করছে, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরে তীব্র যুদ্ধ, তেহরান ছেড়ে যাচ্ছে লক্ষাধিক মানুষ ,ইরান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার জবাবে কঠোর পাল্টা হুমকি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক হামলার পর ইরান যুদ্ধ ত্যাগের অঙ্গীকার জোরদার করেছে। খাতাম আল আম্বিয়া কেন্দ্রীয় দপ্তরের ডেপুটি কমান্ডার জেনারেল কিওমারস হেইদারি বলেন, তার দেশ লক্ষ্য পূরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তীব্র আঘাত না হানা পর্যন্ত যুদ্ধ ত্যাগ করবে না। ২৮শে ফেব্রুয়ারি হামলার পর তেহরান প্রতিশোধমূলক অভিযান শুরু করে। ইরান এখন পর্যন্ত ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিব ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ ইরানের পাশে সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে। উভয়ে মিলে তেল আবিবে হামলা চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত মহাসাগরে যুদ্ধের ছড়িয়ে পড়া ভূমধ্যসাগরের উত্তেজনা ভারত মহাসাগরে পৌঁছেছে। সাইপ্রাসে ফ্রান্স রণতরী মোতায়েন করেছে, যুক্তরাজ্য অ্যান্টি-মিসাইল সরঞ্জাম পাঠিয়েছে, এবং জার্মানি মৌন সমর্থন দিয়েছে। বুধবার ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত ইরানের জাহাজে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা হিসেবে ইরান একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের সমর্থিত কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হতে পারবে না। এদিকে যুদ্ধের তীব্রতায় স্কুল ও হাসপাতালেও ক্ষতি হচ্ছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত অন্তত ১০৫টি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে তেহরান ছাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দুইদিনে লক্ষাধিক মানুষ দেশ ছাড়েছে। ইরানের তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় পরিবর্তন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করার মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন। তবে, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয়নি। উল্টো, ইরান ও হিজবুল্লাহ পাল্টা আঘাত চালাচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু হলে ইরান আলোচনায় যেতে রাজি নয়। আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তার মতে, তথ্য বিকৃতি পরমাণু আলোচনাকে ব্যর্থ করেছে। হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত ইরানে ১২৩০ জন নিহত হয়েছেন। মিনাবে স্কুলে হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলে ১১ জন, যুক্তরাষ্ট্রে ৬ জন, কুয়েতে দুই সেনা নিহত হয়েছেন। লেবাননে ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনজন ও ওমান উপকূলের কাছে এক জন নিহত হয়েছেন। ট্রাম্পের যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ মার্কিন কংগ্রেসের সিনেটে ট্রাম্পের সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রস্তাব ৪৭-৫২ ভোটে খারিজ হয়েছে। রিপাবলিকানরা প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর ফলে ট্রাম্পের সামরিক আকাঙ্ক্ষা কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণে আনা ব্যর্থ হলো এবং যুদ্ধ পরিচালনায় প্রেসিডেন্টের সমর্থন স্পষ্ট হলো।
দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ভবন সংলগ্ন একটি পার্কিং লটে ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এ ঘটনায় পার্কিং এলাকায় আগুন ধরে যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, একটি ড্রোন দূতাবাসের চ্যান্সারি ভবনের পাশে অবস্থিত পার্কিং লটে আঘাত হানে। এর ফলে সেখানে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। সব কর্মী নিরাপদ মার্কো রুবিও আরও জানান, দূতাবাসের সব কর্মী নিরাপদে রয়েছেন। তিনি বলেন, সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন কূটনৈতিক স্থাপনা থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে তিনি দাবি করেন, মার্কিন দূতাবাসগুলো একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সরাসরি হামলার মুখে পড়েছে। যদিও এ হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। জনবহুল এলাকায় দূতাবাস মার্কিন দূতাবাসটি দুবাইয়ের জনবহুল এলাকায় অবস্থিত। এর নিকটেই রয়েছে ব্রিটিশ ও সৌদি দূতাবাস। কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদারের আহ্বান উঠেছে। পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট জানার জন্য আমাদের সঙ্গেই থাকুন।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব গ্যাস বাজার এবার ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়লে ২০২২ সালের পর প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে এই রুটটি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় এলএনজির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাতার থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর থেকে এসব দেশ হন্যে হয়ে বিকল্প রুটের সন্ধান শুরু করেছে। গত শনিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস-এর মেজর জেনারেল ইব্রাহিম জাবারি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে সোমবার (২ মার্চ) বাজার খোলার সাথে সাথে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।