ড. মোঃ মাসুদ রানা:
দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, বরং অর্থনীতি ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। ইলিশ মূলত পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ প্রভৃতি নদীতে প্রজনন ও বংশবিস্তার করে। সাগর থেকে নদীতে এসে ডিম ছাড়ে এবং পরবর্তীতে জাটকা (ইলিশের পোনা) নদীতে বেড়ে ওঠে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ (প্রায় ১২%) এবং জিডিপিতে অবদান এক শতাংশ। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী থেকে। ইলিশ শুধু জাতীয় অর্থনীতির জন্য নয়, উপকূলীয় জেলে, মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠী এবং উপকূলের সাধারণ মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ছয় লক্ষ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত, আর পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা কার্যক্রমে আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে। ইলিশে উচ্চমাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠা পানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একইসঙ্গে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে এবং ইলিশ আহরণে প্রথম স্থান দখল করে আছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশ মাছকে ভৌগোলিক নির্দেশক (এও) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয়।
গত এক দশকে সরকার জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প কর্মসংস্থান কার্যক্রমের মাধ্যমে উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করেছে। গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে, ইলিশের ডিমের অর্ধেক যদি নিষিক্ত হয় এবং তার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেঁচে থাকে, তাহলে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি পোনা ইলিশ জন্ম নিতে পারে। ইলিশের ডিম পাড়ার মৌসুম শেষ হলেও ছোট ইলিশের বৃদ্ধি হওয়ার জন্য কিছু সময় থাকে। তাই জাটকা ধরা দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখলে ইলিশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মা-ইলিশকে রক্ষা করলে তারা ডিম পাড়ার সুযোগ পায় এবং সেই ডিম থেকে জন্ম নেয়া জাটকা পরবর্তীতে বড় ইলিশে পরিণত হয়। একটি মা-ইলিশ সাধারণত চার থেকে পাঁচ লাখ ডিম দেয়। মা-ইলিশ দেশের নদী ও নদীর মোহনায় ডিম ছাড়লেও এই ডিম থেকে ইলিশ সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ কোনো পরিচর্যা ছাড়াই ইলিশ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং সাগর ও নদীর বিশাল জলরাশিকে পরিপূর্ণ করে। সাধারণত মাঝ অক্টোবরে, যখন সাগর ও নদীর পানি উত্তাল থাকে, তখন মা-ইলিশ পদ্মা ও মেঘনার দিকে ডিম ছাড়ার জন্য আসে। এই সময় মা-ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে নদীর জলরাশি ইলিশের ডিমে পরিপূর্ণ হয়। প্রায় ৫ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে, বিশেষ করে আশ্বিন মাসের ভরা পূর্ণিমার পাঁচ দিন আগে ও পরে, মা-ইলিশ সাগরের গভীর থেকে মিঠা পানিতে নির্দিষ্ট এলাকায় জড়ো হয় এবং পুরুষ মাছও তাদের অনুসরণ করে। কখনও কখনও ডিম ছাড়ার সময় আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পরও জেলেদের হাতে প্রচুর ডিমওয়ালা ইলিশ ধরার সুযোগ আসে। কিন্তু ইলিশের প্রধান প্রজননস্থল ও বিচরণক্ষেত্র পদ্মা-মেঘনার পানির প্রবাহ হ্রাস এবং পানিদূষণের কারণে ইলিশের বংশবিস্তার হ্রাস পাচ্ছে। উপরন্তু নৌকার যান্ত্রিকায়ন ব্যাহত করছে রূপালী ইলিশ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা। বেড়ে ওঠার আগেই জাটকা ধরে ফেলার কারণে ইলিশ উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ ছাড়াও, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, অতিরিক্ত আহরণ, অকাল প্রজনন ধরা, দূষণ এবং আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে ইলিশের উৎপাদন এক সময় হুমকির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার, গবেষক ও জেলেদের সহযোগিতায় আধুনিক প্রযুক্তি, নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম গ্রহণের ফলে ইলিশ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারা বজায় রাখতে ও ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ করতে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা অপরিহার্য।
ইলিশের কৃত্রিম প্রজনন ও হ্যাচারি প্রযুক্তি
ইলিশ মূলত প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত হলেও বর্তমানে কৃত্রিম প্রজনন ও হ্যাচারিতে ইলিশ পোনা উৎপাদনের গবেষণা চলছে। হরমোন প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রজননের মাধ্যমে ইলিশ চাষের পথ সুগম করা হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঋজও) এ বিষয়ে বিশেষ গবেষণা করছে। সফল হলে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত ইলিশ প্রাকৃতিক মজুদের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
জেনেটিক উন্নয়ন ও নির্বাচনী প্রজনন
ডিএনএ বারকোডিং ও আণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলিশের ভিন্ন ভিন্ন জনসংখ্যা শনাক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রজননগোষ্ঠী সংরক্ষণ করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচনী প্রজনন কর্মসূচি ইলিশের বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং টিকে থাকার হার উন্নত করতে পারে।
আবাসস্থল পুনরুদ্ধার প্রযুক্তি
ইলিশ প্রজনন ও পোনা বিকাশের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও প্রবাহমান নদী ব্যবস্থা। এজন্য নদী খনন, মাছ-বান্ধব বাঁধ ও ফিশ পাস নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে ইলিশের অভিবাসন নির্বিঘœ হয়। পাশাপাশি মেঘনা, পদ্মা ও তেতুলিয়া নদীতে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে বৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহার করে। এসব উদ্যোগ ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজননচক্র টিকিয়ে রাখতে সহায়ক।
ভূতথ্য ব্যবস্থা ও রিমোট সেন্সিং
উপগ্রহ চিত্র ও এওঝ প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের আবাসস্থল, অভিবাসন পথ ও মাছ ধরার হটস্পট নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফিশিং ভেসেলে ভিএইচএফ রেডিও, জিপিএস, ফিশ ফাইন্ডার প্রভৃতি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। নদীর প্রবাহ, পলি জমা এবং পানির মান পর্যবেক্ষণ করা হয়, যা ইলিশের প্রজননের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
ডিজিটাল মনিটরিং
ইন্টারনেট অব থিংস ডিভাইস দিয়ে নদীর পানির তাপমাত্রা, দ্রবীভূত অক্সিজেন, লবণাক্ততা ও ঘোলাটে ভাব পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গবেষকরা এসব তথ্য ব্যবহার করে ইলিশের অভিবাসনের সময় পূর্বাভাস দিতে পারেন। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য জেলেদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছ।
মৎস্য কো-ম্যানেজমেন্ট ও ই-গভর্নেন্স
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাছ ধরার লাইসেন্স, নিবন্ধন ও নিষিদ্ধ মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। স্মার্টকার্ড ও ই-মনিটরিং সিস্টেম জেলেদের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা (যেমন চাল বিতরণ) সময়মতো পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইলিশ চাষ
প্রায়োগিক পর্যায়ে ইলিশকে আধা-ক্যাপটিভ বা আবদ্ধ পরিবেশে চাষের চেষ্টা চলছে। নদীর মতো পরিবেশ তৈরি করে খাঁচা বা আধা-নোনা পানির পুকুরে ইলিশ চাষের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। সফল হলে এটি বাংলাদেশের চাষভিত্তিক মৎস্য খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি
ইলিশ পোনার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য তৈরি করার গবেষণা চলছে। প্রোটিন, লিপিড ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ খাদ্য দ্রুত বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার বাড়ায়। প্রোবায়োটিক ও সিনবায়োটিক সমৃদ্ধ খাদ্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক।
কোল্ড চেইন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি
পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি কমাতে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি যেমন আইস স্লারি, রেফ্রিজারেটেড ট্রান্সপোর্ট ও ভ্যাকুয়াম প্যাকেজিং ব্যবহার হচ্ছে। সৌরশক্তি চালিত কোল্ডস্টোরেজও কিছু এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে।
প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি প্রযুক্তি
আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টে ফ্রিজিং, ফিলে তৈরি ও প্যাকেজিং করা হচ্ছে। বোনলেস ইলিশ, ক্যানড ইলিশ ও রেডি-টু-কুক ইলিশের মতো পণ্য জনপ্রিয় হচ্ছে। এতে রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ছে।
আগাম সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস ব্যবস্থা
বন্যা, ঝড় ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। পূর্বাভাস ব্যবস্থা ইলিশের অভিবাসনের উপযুক্ত সময় জানাতে সহায়ক।
টেকসই জাল ও মাছ ধরার পদ্ধতি
বাই-ক্যাচ কমাতে এবং জাটকা সংরক্ষণে পরিবেশবান্ধব জাল ও নির্ধারিত ফাঁস ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে। জাটকা ধরা বন্ধ রাখতে নির্দিষ্ট সময়ে (১ নভেম্বর ৩০জুন) জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সৌরচালিত নৌকা ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী ইঞ্জিন ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণও কমানো হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে জেলেদের ভিজিএফ কার্ড, খাদ্য সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
জাটকা ও মা-ইলিশ সংরক্ষণে আইনের কঠোর প্রয়োগ
ইলিশ আহরণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করতে হবে। জাটকা ও মা-ইলিশ ধরা রোধে নিয়মিত নজরদারি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসাথে জেলেদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারকরণ
নিষিদ্ধ মৌসুমে জেলেদের জীবিকা রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান জরুরি। হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আয়ের উৎস বহুমুখী করা যেতে পারে। এ ছাড়া খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থভাতা ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।
নদী দখল ও দূষণ রোধ
ইলিশের প্রধান আবাসস্থল নদী দখল ও দূষণের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বজায় রাখা ও শিল্প-নগর বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত খনন ও ড্রেজিং কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক হবে।
গবেষণায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
ইলিশের প্রজনন, অভিবাসন ও আবাসস্থল ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ জরুরি। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, জিপিএস ও জিআইএস ব্যবহার করে ইলিশের গতিপথ নির্ধারণ করা সম্ভব। জেনেটিক গবেষণা, ডিএনএ বারকোডিং ও বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে ইলিশের জৈববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের আবাসস্থলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানির তাপমাত্রা পরিবর্তন ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এসব প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনমূলক কৌশল যেমন আবাসস্থল সংরক্ষণ, টেকসই নীতি প্রণয়ন, ঝুঁকিপূর্ণ জেলে সম্প্রদায়ের জন্য দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু একটি খাদ্য নয়, বরং এটি জাতির পরিচয়, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে, যার ফলে উৎপাদনে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, অভয়ারণ্য সৃষ্টি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, জেনেটিক গবেষণা ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ইলিশ উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তবে টেকসই উৎপাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা ও জেলেদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এভাবে বাংলাদেশ জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে সক্ষম হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বরিশালে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর যেন পাহাড়সম ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি)। পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে অতীতে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর এই চটে থাকা বলে জানা গেছে। বর্তমানে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় 'নির্বাচনী কার্ড' ইস্যু করাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। কার্ড ইস্যু নিয়ে চলছে টালবাহানা ভুক্তভোগী সংবাদকর্মীদের দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরেও কার্ড দিতে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে। মূলত ডিসির ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেই মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বরিশালের সাংবাদিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রভাব পেশাগত কাজে উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে এই জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়। সেই থেকে সাংবাদিকদের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ, এখন সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার হরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিশেষে বলা যায়, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ কাম্য নয়। নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক লিখেছেন, বৌ পেটানো নিউজ করার মাসুল দিচ্ছে বরিশালের সাংবাদিকরা। আরেক সাংবাদিক প্রশাসনের এই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে লিখেছেন, ডিসি তার ক্ষমতা দেখাইছে, এখন আমাদের বরিশালের সাংবাদিকদের উচিত সবাই এক হয়ে ক্ষমতা দেখানো। কার পাশা যাবে কার টেবিলে, খেলা যে চলছে কোন লেভেলের! নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্ড একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি। কিন্তু কার্ড পেতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, সঠিক কারণ ছাড়াই আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বরিশালের সংবাদকর্মী মহলে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন ‘ব্যক্তিগত রোষ’ এবং ‘ক্ষমতার দাপট’ রুখতে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো কঠোর কর্মসূচির কথা ভাবছে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অবিলম্বে সাংবাদিকদের কার্ড প্রদানের দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। কে এই ডিসি খাইরুল আলম সুমন যৌতুক সংক্রান্ত মামলায় কারাবাসের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে বিস্ময় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বরিশালের ডিসি খায়রুল আলম সুমন ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা, ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমিসংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করা—যেখানে ব্যক্তিগত সুনাম ও নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, যাদের ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, এমন কর্মকর্তাকে ডিসি পদে বসানো ইমেজ ও আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে। আদালত ও মামলার তথ্য সূত্র অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ওই মামলায় খায়রুল আলম সুমন ও তার মা খোদেজা বেগমকে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার এসআই শাহ আলম আদালতে তাদের হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন—উভয় আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবাসে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৫ জুন বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ রাতে ঢাকার ওয়ারী এলাকায় খায়রুলের বাসায় তার মায়ের মাধ্যমে গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হয় এবং এ সময় খায়রুল আলম সুমন ভুক্তভোগীর হাত চেপে ধরেন। পরদিন ওয়ারী থানায় মামলা করা হয়। বিভাগীয় মামলা ও পদোন্নতি স্ত্রীর করা মামলার পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ দেওয়া হলে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এর ফলে নিয়মিত পদোন্নতি ব্যাহত হয় বলে জানা গেছে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উপসচিব পদে তার পদোন্নতির আদেশ জারি হলেও সেখানে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ (ব্যাকডেটেড) পদোন্নতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজেকে পদোন্নতিতে বঞ্চিত দাবি করে তিনি ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিসির বক্তব্য খায়রুল আলম সুমনের ‘ব্যক্তিগত ডাটা শিটে’ (পিডিএস) বর্তমানে তাকে ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খায়রুল আলম সুমন বলেন, “এসব আমার ব্যক্তিগত তথ্য। আমার নামে বিভাগীয় মামলা ছিল—সবই কর্তৃপক্ষ জানে এবং জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মত জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা প্রশাসক পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়—এটি নৈতিক নেতৃত্বেরও প্রতীক। একজন ডিসির ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ থাকলে জেলার আইনশৃঙ্খলা ও ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশ্ন ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাদের ভাষ্য, “ডিসির সুনামটাই সবচেয়ে জরুরি।” সূত্র জানায়, খায়রুল আলম সুমন প্রবেশনার হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাকরি শুরু করেন। সে সময়ের ডিসি মো. আবদুল মান্নানের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম ডিসি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নাঙ্গলকোট, নিকলি ও বাজিতপুরে এসিল্যান্ড এবং ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশালের ডিসি হিসেবে তার নিয়োগ প্রশাসনে নৈতিকতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও অবস্থান প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ড. মোঃ মাসুদ রানা: দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, বরং অর্থনীতি ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। ইলিশ মূলত পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ প্রভৃতি নদীতে প্রজনন ও বংশবিস্তার করে। সাগর থেকে নদীতে এসে ডিম ছাড়ে এবং পরবর্তীতে জাটকা (ইলিশের পোনা) নদীতে বেড়ে ওঠে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ (প্রায় ১২%) এবং জিডিপিতে অবদান এক শতাংশ। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী থেকে। ইলিশ শুধু জাতীয় অর্থনীতির জন্য নয়, উপকূলীয় জেলে, মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠী এবং উপকূলের সাধারণ মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ছয় লক্ষ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত, আর পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা কার্যক্রমে আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে। ইলিশে উচ্চমাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠা পানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একইসঙ্গে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে এবং ইলিশ আহরণে প্রথম স্থান দখল করে আছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশ মাছকে ভৌগোলিক নির্দেশক (এও) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয়। গত এক দশকে সরকার জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প কর্মসংস্থান কার্যক্রমের মাধ্যমে উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করেছে। গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে, ইলিশের ডিমের অর্ধেক যদি নিষিক্ত হয় এবং তার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেঁচে থাকে, তাহলে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি পোনা ইলিশ জন্ম নিতে পারে। ইলিশের ডিম পাড়ার মৌসুম শেষ হলেও ছোট ইলিশের বৃদ্ধি হওয়ার জন্য কিছু সময় থাকে। তাই জাটকা ধরা দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখলে ইলিশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মা-ইলিশকে রক্ষা করলে তারা ডিম পাড়ার সুযোগ পায় এবং সেই ডিম থেকে জন্ম নেয়া জাটকা পরবর্তীতে বড় ইলিশে পরিণত হয়। একটি মা-ইলিশ সাধারণত চার থেকে পাঁচ লাখ ডিম দেয়। মা-ইলিশ দেশের নদী ও নদীর মোহনায় ডিম ছাড়লেও এই ডিম থেকে ইলিশ সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ কোনো পরিচর্যা ছাড়াই ইলিশ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং সাগর ও নদীর বিশাল জলরাশিকে পরিপূর্ণ করে। সাধারণত মাঝ অক্টোবরে, যখন সাগর ও নদীর পানি উত্তাল থাকে, তখন মা-ইলিশ পদ্মা ও মেঘনার দিকে ডিম ছাড়ার জন্য আসে। এই সময় মা-ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে নদীর জলরাশি ইলিশের ডিমে পরিপূর্ণ হয়। প্রায় ৫ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে, বিশেষ করে আশ্বিন মাসের ভরা পূর্ণিমার পাঁচ দিন আগে ও পরে, মা-ইলিশ সাগরের গভীর থেকে মিঠা পানিতে নির্দিষ্ট এলাকায় জড়ো হয় এবং পুরুষ মাছও তাদের অনুসরণ করে। কখনও কখনও ডিম ছাড়ার সময় আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পরও জেলেদের হাতে প্রচুর ডিমওয়ালা ইলিশ ধরার সুযোগ আসে। কিন্তু ইলিশের প্রধান প্রজননস্থল ও বিচরণক্ষেত্র পদ্মা-মেঘনার পানির প্রবাহ হ্রাস এবং পানিদূষণের কারণে ইলিশের বংশবিস্তার হ্রাস পাচ্ছে। উপরন্তু নৌকার যান্ত্রিকায়ন ব্যাহত করছে রূপালী ইলিশ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা। বেড়ে ওঠার আগেই জাটকা ধরে ফেলার কারণে ইলিশ উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ ছাড়াও, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, অতিরিক্ত আহরণ, অকাল প্রজনন ধরা, দূষণ এবং আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে ইলিশের উৎপাদন এক সময় হুমকির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার, গবেষক ও জেলেদের সহযোগিতায় আধুনিক প্রযুক্তি, নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম গ্রহণের ফলে ইলিশ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারা বজায় রাখতে ও ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ করতে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা অপরিহার্য। ইলিশের কৃত্রিম প্রজনন ও হ্যাচারি প্রযুক্তি ইলিশ মূলত প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত হলেও বর্তমানে কৃত্রিম প্রজনন ও হ্যাচারিতে ইলিশ পোনা উৎপাদনের গবেষণা চলছে। হরমোন প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রজননের মাধ্যমে ইলিশ চাষের পথ সুগম করা হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঋজও) এ বিষয়ে বিশেষ গবেষণা করছে। সফল হলে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত ইলিশ প্রাকৃতিক মজুদের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে। জেনেটিক উন্নয়ন ও নির্বাচনী প্রজনন ডিএনএ বারকোডিং ও আণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলিশের ভিন্ন ভিন্ন জনসংখ্যা শনাক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রজননগোষ্ঠী সংরক্ষণ করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচনী প্রজনন কর্মসূচি ইলিশের বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং টিকে থাকার হার উন্নত করতে পারে। আবাসস্থল পুনরুদ্ধার প্রযুক্তি ইলিশ প্রজনন ও পোনা বিকাশের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও প্রবাহমান নদী ব্যবস্থা। এজন্য নদী খনন, মাছ-বান্ধব বাঁধ ও ফিশ পাস নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে ইলিশের অভিবাসন নির্বিঘœ হয়। পাশাপাশি মেঘনা, পদ্মা ও তেতুলিয়া নদীতে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে বৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহার করে। এসব উদ্যোগ ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজননচক্র টিকিয়ে রাখতে সহায়ক। ভূতথ্য ব্যবস্থা ও রিমোট সেন্সিং উপগ্রহ চিত্র ও এওঝ প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের আবাসস্থল, অভিবাসন পথ ও মাছ ধরার হটস্পট নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফিশিং ভেসেলে ভিএইচএফ রেডিও, জিপিএস, ফিশ ফাইন্ডার প্রভৃতি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। নদীর প্রবাহ, পলি জমা এবং পানির মান পর্যবেক্ষণ করা হয়, যা ইলিশের প্রজননের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ডিজিটাল মনিটরিং ইন্টারনেট অব থিংস ডিভাইস দিয়ে নদীর পানির তাপমাত্রা, দ্রবীভূত অক্সিজেন, লবণাক্ততা ও ঘোলাটে ভাব পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গবেষকরা এসব তথ্য ব্যবহার করে ইলিশের অভিবাসনের সময় পূর্বাভাস দিতে পারেন। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য জেলেদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছ। মৎস্য কো-ম্যানেজমেন্ট ও ই-গভর্নেন্স ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাছ ধরার লাইসেন্স, নিবন্ধন ও নিষিদ্ধ মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। স্মার্টকার্ড ও ই-মনিটরিং সিস্টেম জেলেদের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা (যেমন চাল বিতরণ) সময়মতো পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইলিশ চাষ প্রায়োগিক পর্যায়ে ইলিশকে আধা-ক্যাপটিভ বা আবদ্ধ পরিবেশে চাষের চেষ্টা চলছে। নদীর মতো পরিবেশ তৈরি করে খাঁচা বা আধা-নোনা পানির পুকুরে ইলিশ চাষের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। সফল হলে এটি বাংলাদেশের চাষভিত্তিক মৎস্য খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি ইলিশ পোনার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য তৈরি করার গবেষণা চলছে। প্রোটিন, লিপিড ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ খাদ্য দ্রুত বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার বাড়ায়। প্রোবায়োটিক ও সিনবায়োটিক সমৃদ্ধ খাদ্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক। কোল্ড চেইন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি কমাতে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি যেমন আইস স্লারি, রেফ্রিজারেটেড ট্রান্সপোর্ট ও ভ্যাকুয়াম প্যাকেজিং ব্যবহার হচ্ছে। সৌরশক্তি চালিত কোল্ডস্টোরেজও কিছু এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টে ফ্রিজিং, ফিলে তৈরি ও প্যাকেজিং করা হচ্ছে। বোনলেস ইলিশ, ক্যানড ইলিশ ও রেডি-টু-কুক ইলিশের মতো পণ্য জনপ্রিয় হচ্ছে। এতে রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ছে। আগাম সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস ব্যবস্থা বন্যা, ঝড় ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। পূর্বাভাস ব্যবস্থা ইলিশের অভিবাসনের উপযুক্ত সময় জানাতে সহায়ক। টেকসই জাল ও মাছ ধরার পদ্ধতি বাই-ক্যাচ কমাতে এবং জাটকা সংরক্ষণে পরিবেশবান্ধব জাল ও নির্ধারিত ফাঁস ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে। জাটকা ধরা বন্ধ রাখতে নির্দিষ্ট সময়ে (১ নভেম্বর ৩০জুন) জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সৌরচালিত নৌকা ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী ইঞ্জিন ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণও কমানো হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে জেলেদের ভিজিএফ কার্ড, খাদ্য সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। জাটকা ও মা-ইলিশ সংরক্ষণে আইনের কঠোর প্রয়োগ ইলিশ আহরণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করতে হবে। জাটকা ও মা-ইলিশ ধরা রোধে নিয়মিত নজরদারি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসাথে জেলেদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারকরণ নিষিদ্ধ মৌসুমে জেলেদের জীবিকা রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান জরুরি। হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আয়ের উৎস বহুমুখী করা যেতে পারে। এ ছাড়া খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থভাতা ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। নদী দখল ও দূষণ রোধ ইলিশের প্রধান আবাসস্থল নদী দখল ও দূষণের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বজায় রাখা ও শিল্প-নগর বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত খনন ও ড্রেজিং কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক হবে। গবেষণায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইলিশের প্রজনন, অভিবাসন ও আবাসস্থল ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ জরুরি। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, জিপিএস ও জিআইএস ব্যবহার করে ইলিশের গতিপথ নির্ধারণ করা সম্ভব। জেনেটিক গবেষণা, ডিএনএ বারকোডিং ও বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে ইলিশের জৈববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের আবাসস্থলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানির তাপমাত্রা পরিবর্তন ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এসব প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনমূলক কৌশল যেমন আবাসস্থল সংরক্ষণ, টেকসই নীতি প্রণয়ন, ঝুঁকিপূর্ণ জেলে সম্প্রদায়ের জন্য দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু একটি খাদ্য নয়, বরং এটি জাতির পরিচয়, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে, যার ফলে উৎপাদনে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, অভয়ারণ্য সৃষ্টি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, জেনেটিক গবেষণা ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ইলিশ উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তবে টেকসই উৎপাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা ও জেলেদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এভাবে বাংলাদেশ জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে সক্ষম হবে। লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তবে ক্ষমতায় আসার পরপরই দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্থবির অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাড়তে থাকা বেকারত্ব। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি পেয়ে বিজয়ী হয় বিএনপি। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। 📉 অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও প্রবৃদ্ধির ধীরগতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩.৭ শতাংশে, যেখানে আগের বছর ছিল ৪.২ শতাংশ এবং ২০২৩ অর্থবছরে ছিল ৫.৮ শতাংশ। চলতি ও পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মন্দার প্রভাবেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। অথচ গত কয়েক দশক ধরে প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে ছিল। 🎯 কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বড় অগ্রাধিকার এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘বাংলাদেশ আফটার দি ভোট: ডেমোক্রেসি, রিফর্ম, ফরেন পলিসি’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে নতুন সরকারের সাফল্যের প্রধান সূচক। ‘কাউন্টার পয়েন্ট’-এর সম্পাদক জাফর সোবহান বলেন, তরুণদের চাকরির অভাবই আন্দোলনের অন্যতম কারণ ছিল, যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পথ তৈরি করে। তিনি আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার, টাকার মান স্থিতিশীল রাখা এবং খেলাপি ঋণ কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। 💼 নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানর অভিজ্ঞতা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে। স্পেন, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদ আখতার বলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ ও তরুণ প্রজন্মের সমন্বয় রয়েছে এবং মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়েছে। 🏭 এলডিসি উত্তরণ ও রপ্তানি ঝুঁকি অক্সফোর্ড ইকোনমিকস মনে করছে, উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকলেও বিএনপি বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি বজায় রাখবে। সংস্থাটির মতে, আগামী নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে রপ্তানি আয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে এলডিসি মর্যাদার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারসহ নানা সুবিধা পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার পর ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা বাড়বে। এদিকে মোডি’স জানিয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন অবনতি এবং পোশাক খাতে বিক্ষোভ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার এবং বিনিময় হার আরও নমনীয় করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 🌏 পররাষ্ট্রনীতি ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং উভয় দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ঢাকা ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছে এবং একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য শত্রুতার লক্ষণ নেই এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে পারে। 🔎 ভবিষ্যৎ রাজনীতির নির্ধারক চার ক্ষেত্র বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের রাজনীতি নির্ভর করবে চারটি বিষয়ে— অর্থনৈতিক সংস্কার বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি নতুন সরকার প্রাথমিকভাবে জনসমর্থনের সুবিধা পেলেও, তা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখাতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক চাপ দ্রুত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট প্রেক্ষাপটে এই নীতিমালা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। মুদ্রানীতিতে রেপো রেট আগের মতো ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হারও মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এতে ঋণের খরচ আগের মতোই থাকবে, যার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর কিছুটা চাপ অব্যাহত থাকবে। এই নীতিমালায় মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা শিথিল করে ৭ থেকে ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। যদিও আগের মুদ্রানীতিতে তা ৬ দশমিক ৫ শতাংশের আশপাশে রাখা হয়েছিল। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও বৈশ্বিক বাজারে খাদ্য, জ্বালানি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি তা কঠিন করে তুলছে। ফলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাস্তবভিত্তিক বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। নতুন নীতিমালায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগে কিছুটা মন্থরতা থাকতে পারে, যদিও সরকারের বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে ব্যাংক খাতের সম্পৃক্ততা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিদেশি মুদ্রার বাজারে চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যবস্থাপনা নির্ভর ভাসমান বিনিময় হার’ (managed floating exchange rate) নীতিতে অটল থাকবে বলে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করবে এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে উৎসাহ দেবে। রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা অব্যাহত রাখা, এবং রেমিট্যান্স উৎসাহে প্রবাসীদের ব্যাংক চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনবিএফআই তথা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা সম্প্রসারণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনো নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই মুদ্রানীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হলেও স্বল্পমেয়াদে কিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। উচ্চ সুদের পরিবেশে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমে যেতে পারে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষায় স্বচ্ছতা, স্থিতিশীল নীতিমালা ও নিয়মিত তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত জরুরি। এই মুহূর্তে বাজারে প্রতিটি সিদ্ধান্তকেই গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। মুদ্রানীতির বাস্তব প্রয়োগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় তদারকি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক গতি-প্রবাহ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।