তরুণদের ক্ষোভ, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও ভোটার তালিকা বিতর্ক—মোদিবিরোধী রাজনীতিতে নতুন করে সক্রিয় রাহুল গান্ধী-
ইত্তেহাদ নিউজ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। একের পর এক নির্বাচনি পরাজয়, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার মধ্যেও বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। এবার তরুণদের অসন্তোষ, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার বিতর্ককে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক কৌশলে এগোচ্ছেন রাহুল।
তার লক্ষ্য শুধু সরকারের সমালোচনা নয়; বরং তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করা, বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে কংগ্রেসকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তরুণদের অসন্তোষ ও সরকারের বিরুদ্ধে জনমতকে কাজে লাগিয়ে তিনি কি সত্যিই মোদির কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে উঠতে পারবেন? নাকি প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে সাংগঠনিক দুর্বলতা, নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধী জোটের মতপার্থক্য তার পথ আটকে দেবে?
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর প্রপৌত্র, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নাতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই জড়িয়ে আছে নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারের প্রশ্ন। কিন্তু সেই ঐতিহ্যকে নির্বাচনি সাফল্য ও স্বতন্ত্র নেতৃত্বে রূপান্তর করা তার জন্য সহজ হয়নি।
এখন সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে তরুণদের সমস্যা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে সামনে আনছেন তিনি।
এক দশকের বেশি সময় ধরে বিজেপির কাছে একাধিক নির্বাচনে পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে কংগ্রেস। এসব পরাজয় রাহুলের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি হয়েও সাধারণ ভোটারের আস্থা অর্জন এবং দলকে নির্বাচনি সাফল্যের পথে ফিরিয়ে নেওয়া তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই পরিস্থিতি বদলানোর লক্ষ্য নিয়ে দেশব্যাপী পদযাত্রা শুরু করেন রাহুল। ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ নামে পরিচিত কর্মসূচিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মাইল পথ অতিক্রম করেন তিনি। ১৩৬ দিন ধরে চলা এই পদযাত্রার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং রাজনীতির বাইরে থাকা মানুষের কাছেও নিজেকে সহজে পৌঁছানো যায়—এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরা।
কর্মসূচিটি তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জনসংযোগ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সংবিধান রক্ষার বক্তব্যের মাধ্যমে কংগ্রেসের রাজনীতিকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন তিনি।
এরপর ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বাড়ে। অন্যদিকে, বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে জোটের সমর্থনে সরকার গঠন করতে হয় দলটিকে। নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পান রাহুল।
এই ফলাফল তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন মাত্রা দেয়। তবে কংগ্রেসের আসন বৃদ্ধি এবং বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোকে রাহুলের স্থায়ী জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে এই সমর্থন ধরে রাখা এবং তা আরও বিস্তৃত করাই হবে তার জন্য বড় পরীক্ষা।
রাহুলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতার অন্যতম প্রধান বিষয় ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা। মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগ তোলেন তিনি। বিহারের নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আনেন।
তার দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলেছে এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা সুবিধা পেয়েছে।
তবে এই অভিযোগের বিপরীতে ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। ফলে বিষয়টি এখন শুধু রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিজেপিবিরোধী হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে এমন অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার তথ্য, বাদ পড়া ভোটারদের পরিচয় ও পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রাহুলের রাজনৈতিক কৌশলে এই বিতর্কের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে তিনি নির্বাচনি ফলাফলের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও আলোচনার কেন্দ্রে আনতে চাইছেন।
তবে অভিযোগ তোলা আর অনিয়মের প্রমাণ হাজির করা এক বিষয় নয়। অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি ও যাচাইযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে পারলে রাহুলের বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেতে পারে।
ভারতের তরুণদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রাহুলের রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মতো ঘটনা নিয়ে সরকারের সমালোচনা করছেন তিনি। এসব বিষয়কে তরুণদের ন্যায্য সুযোগ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছেন কংগ্রেস নেতা।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নীরজা চৌধুরীর মতে, সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ এবং রাজনীতিতে নতুন উদ্দীপনার অভাব রাহুলের বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে রাহুলের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে।
তবে তরুণদের অসন্তোষকে সরাসরি কংগ্রেসের পক্ষে ভোটে রূপান্তরিত হবে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ একজন শিক্ষার্থী সরকারের সমালোচনা করলেও তিনি কোন দলকে ভোট দেবেন, তা নির্ভর করতে পারে কর্মসংস্থান, স্থানীয় নেতৃত্ব, সামাজিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রত্যাশা এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির ওপর।
অর্থাৎ, ক্ষোভ তৈরি হওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনা তৈরি করে; কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে নির্বাচনি সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন সংগঠন, বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক যোগাযোগ।
এই জায়গাটিই রাহুলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তরুণদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে চেন্নাইয়ের এক জনসভায় তাদের মঞ্চে উঠে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ দেন রাহুল। ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ বা ‘তরুণদের কণ্ঠস্বর’ নামের প্রচারণার অংশ হিসেবে এই আয়োজন করা হয়। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বৈষম্য ও রাজনৈতিক জবাবদিহির দাবিকে সামনে আনতে গত জুনে কর্মসূচিটি শুরু করেন তিনি।
সভায় এক তরুণী তার বোনের আত্মহত্যার ঘটনা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেডিকেল কলেজে ভর্তির কঠিন পরীক্ষার চাপের মধ্যে তার বোন আত্মহত্যা করেছিলেন। আরেক বক্তা মুসলিম ও নারী হিসেবে বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথা জানান।
এসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম বা বৈষম্যকে শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় হিসেবে না দেখে, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাও সামনে আসে।
তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৃহত্তর সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে এককভাবে সমস্যার ব্যাপকতা বা কোনো নির্দিষ্ট নীতির দায় নির্ধারণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য, পরীক্ষাব্যবস্থার নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।
রাহুলের রাজনৈতিক উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই—তিনি তরুণদের নিজেদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক আলোচনার অংশ করতে চাইছেন।
তার ‘পিতৃতন্ত্র ধ্বংস করো’ স্লোগানও সভায় উপস্থিত তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮ বছর বয়সী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ঋতিকা র্যাচেল প্রবীণের মতে, ভারতের মতো দেশে কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখে পিতৃতন্ত্র ভাঙার কথা শোনা নতুন ও উৎসাহব্যঞ্জক অভিজ্ঞতা।
এ ধরনের বক্তব্য তরুণ নারী ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর কাছে রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। কিন্তু বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দলীয় রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটে, তার ওপর।
রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমর্থকেরা তাকে সংবিধান, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন তার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, নির্বাচনি কৌশল এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তরের সক্ষমতা নিয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব, যিনি ২০০৭ সাল থেকে রাহুলকে চেনেন এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন প্রচারণায় কাজ করেছেন, তাকে বই ও নতুন ধারণার প্রতি আগ্রহী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে যাদবের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাহুল কিছুটা লাজুক এবং সহজাত বক্তা নন। জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাকে অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়।
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে রাহুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় হয়েছেন। সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে হাস্যরসের সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরছেন তিনি। সাধারণ পোশাক, শরীরচর্চা এবং ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত পোস্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের আরেকটি দিক সামনে আনছেন।
আগস্টে ইনস্টাগ্রামের ‘আস্ক মি এনিথিং’ পর্বে নিজের শরীরচর্চার রুটিন নিয়ে কথা বলেন রাহুল। মার্শাল আর্ট, সাঁতার, দৌড়, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম ও যোগব্যায়ামের পাশাপাশি উচ্চ প্রোটিন ও কম শর্করাযুক্ত খাবার গ্রহণের কথা জানান তিনি।
এই ধরনের যোগাযোগের লক্ষ্য হতে পারে তরুণদের কাছে আরও পরিচিত ও সহজে পৌঁছানো যায়—এমন একজন নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনে ভোট পাওয়ার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অনলাইনে সাড়া কতটা বাস্তব রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ নিচ্ছে, তা যাচাইয়ের জন্য আরও বিস্তৃত তথ্য প্রয়োজন।
সরকারবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও সাম্প্রতিক সময়ে রাহুলের উপস্থিতি আলোচনায় এসেছে।
জুলাইয়ে বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে মোদির সরকারি বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। ওই সময় পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে—এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি মাসেও পুলিশের বাধার মুখে তার প্রতিবাদ এবং ব্যারিকেডের ওপর উঠে যাওয়ার দৃশ্য আলোচনায় আসে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি বিশ্লেষক আশুতোষ ভার্শনির মতে, এ ধরনের দৃশ্য রাহুলকে মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে সহায়তা করেছে।
প্রতিবাদের এসব দৃশ্য রাজনৈতিক যোগাযোগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এগুলোর মাধ্যমে রাহুল নিজেকে শুধু সংসদীয় বিতর্কে অংশ নেওয়া বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নয়, রাজপথে সক্রিয় প্রতিবাদী হিসেবেও উপস্থাপন করছেন।
তবে প্রতিবাদে উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে পড়া কিংবা জনসভায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস—কোনোটিই এককভাবে নির্বাচনি সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। এসব কর্মকাণ্ড ভোটারের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে এবং তা কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াচ্ছে কি না, সেটিই হবে মূল বিবেচ্য বিষয়।
ভার্শনির মূল্যায়নেও এই অনিশ্চয়তা রয়েছে। এসব তৎপরতা রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থানকে দৃশ্যমান করলেও মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে তা যথেষ্ট হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তরুণদের সমর্থন অর্জনের পাশাপাশি বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিপরীতে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরছেন রাহুল।
বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ভারতের সংবিধানের একটি কপি হাতে নিয়ে অংশ নেওয়াও তার রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কংগ্রেসের স্বাধীনতাসংগ্রামের ঐতিহ্য তুলে ধরে তিনি সংবিধানের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলছেন।
এখানে রাহুলের কৌশল দুটি ধারায় এগোচ্ছে। একদিকে শিক্ষার্থী, নারী ও বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে সামনে আনা হচ্ছে; অন্যদিকে এসব ইস্যুকে সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি বিজেপিবিরোধী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে আনার চেষ্টা করছেন। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে সমর্থন পাওয়া এবং সেই সমর্থনকে নির্বাচনি জোটের মধ্যে কার্যকরভাবে ধরে রাখা এক বিষয় নয়।
বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নেতৃত্ব, আসন ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ফলে রাহুলের রাজনৈতিক সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নয়, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রক্ষার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।
নীরজা চৌধুরীর মতে, রাহুল এখন শুধু বিরোধী দলের নেতা নন; মোদির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই ‘মোদি বনাম রাহুল’ রূপ নিচ্ছে।
বিরোধী জোটের শরিক একটি দলের নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যও মনে করেন, বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে জাতীয় পর্যায়ে কংগ্রেসের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিজেপি রাজনৈতিক পরিসরে এমনভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে যে পুরো ব্যবস্থার ওপরই দলটির প্রভাব তৈরি হয়েছে।
রাহুলের বক্তব্যেও এই রাজনৈতিক সংঘাতের ধারণা স্পষ্ট। ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয় হুমকির মুখে বলে দাবি করেছেন তিনি। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল বলেন, জনমত, মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সংঘাত চলছে। তার দাবি, কংগ্রেস এসব ক্ষেত্রেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং অগ্রগতি অর্জন করছে।
তবে ‘মোদি বনাম রাহুল’ রাজনৈতিক বয়ানটি কতটা বিস্তৃত জনসমর্থনের প্রতিফলন, তা নির্ধারণ করতে ভোটের ফলাফল, জনমত জরিপ এবং বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে জাতীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি আঞ্চলিক দল, স্থানীয় ইস্যু এবং রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুতরাং, রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়া মানেই বিজেপির আধিপত্যের অবসান—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
রাহুলের বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতার জবাবে বিজেপি নেতারা সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। তাদের মতে, তরুণদের একটি অংশের সমর্থন পেলেও রাহুলের অতিরঞ্জিত বক্তব্য অন্য ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, দলটি বড় ধরনের পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছে এবং নেতিবাচক রাজনীতি কংগ্রেসের কোনো কাজে আসবে না।
এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে মূল প্রশ্নটি হলো, রাহুলের বর্তমান রাজনৈতিক সক্রিয়তা কংগ্রেসের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনে কতটা ভূমিকা রাখছে।
প্রথমত, তরুণদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মতো বিষয়েও তাদের প্রত্যাশা রয়েছে। এসব প্রশ্নে বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত অবস্থান তুলে ধরতে না পারলে প্রতিবাদী রাজনীতির প্রভাব সীমিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও রাজ্যভিত্তিক নেতৃত্বের শক্তি বাড়ানো জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে রাহুলের বক্তব্য আলোচনায় এলেও ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনি ব্যবস্থাপনা ছাড়া সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন।
তৃতীয়ত, বিরোধী জোটের ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থান থাকলেও বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক স্বার্থ ও নির্বাচনি কৌশল এক নয়। এই পার্থক্য সামাল দিতে না পারলে বিরোধী ভোটের কার্যকর সমন্বয় বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চতুর্থত, ভোটার তালিকা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথি উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ; কিন্তু অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জরুরি।
২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাহুল গান্ধীর বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতা কংগ্রেসের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তরুণদের অসন্তোষ, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বৈষম্য এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক—এসব বিষয় বিরোধী রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
কিন্তু রাজনৈতিক সুযোগ আর নির্বাচনি বিজয় এক নয়।
রাহুলের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ: তরুণদের ক্ষোভকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করা, কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কার্যকর ঐক্য বজায় রাখা।
একই সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর অবস্থান এবং বিকল্প নীতির স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরতে হবে। শুধু মোদিবিরোধী অবস্থান নয়, ক্ষমতায় গেলে কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, নাগরিক অধিকার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির উন্নতি ঘটানো হবে—সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে কংগ্রেসকে।
রাহুলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাকে পরিচিতি দিয়েছে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেই পরিচিতিকে জনআস্থা ও নির্বাচনি সাফল্যে রূপান্তর করতে হবে।
ভারতের রাজনীতিতে তিনি মোদির কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠবেন কি না, তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত। আপাতত তরুণদের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনা, সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে অবস্থান নেওয়া এবং রাজপথের প্রতিবাদকে রাজনৈতিক বার্তায় রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই বিকল্প হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন রাহুল গান্ধী।
শেষ পর্যন্ত তার সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু তিনি কত জোরে সরকারের সমালোচনা করছেন, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হাজির করতে পারছেন এবং সেই বিকল্পের পক্ষে কত বিস্তৃত জনসমর্থন সংগঠিত করতে পারছেন, তার ওপর।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
তরুণদের ক্ষোভ, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও ভোটার তালিকা বিতর্ক—মোদিবিরোধী রাজনীতিতে নতুন করে সক্রিয় রাহুল গান্ধী- ইত্তেহাদ নিউজ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। একের পর এক নির্বাচনি পরাজয়, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার মধ্যেও বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। এবার তরুণদের অসন্তোষ, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার বিতর্ককে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক কৌশলে এগোচ্ছেন রাহুল। তার লক্ষ্য শুধু সরকারের সমালোচনা নয়; বরং তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করা, বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে কংগ্রেসকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তরুণদের অসন্তোষ ও সরকারের বিরুদ্ধে জনমতকে কাজে লাগিয়ে তিনি কি সত্যিই মোদির কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে উঠতে পারবেন? নাকি প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে সাংগঠনিক দুর্বলতা, নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধী জোটের মতপার্থক্য তার পথ আটকে দেবে? ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর প্রপৌত্র, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নাতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই জড়িয়ে আছে নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারের প্রশ্ন। কিন্তু সেই ঐতিহ্যকে নির্বাচনি সাফল্য ও স্বতন্ত্র নেতৃত্বে রূপান্তর করা তার জন্য সহজ হয়নি। এখন সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে তরুণদের সমস্যা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে সামনে আনছেন তিনি। নির্বাচনি পরাজয় থেকে নতুন রাজনৈতিক অবস্থান এক দশকের বেশি সময় ধরে বিজেপির কাছে একাধিক নির্বাচনে পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে কংগ্রেস। এসব পরাজয় রাহুলের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি হয়েও সাধারণ ভোটারের আস্থা অর্জন এবং দলকে নির্বাচনি সাফল্যের পথে ফিরিয়ে নেওয়া তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই পরিস্থিতি বদলানোর লক্ষ্য নিয়ে দেশব্যাপী পদযাত্রা শুরু করেন রাহুল। ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ নামে পরিচিত কর্মসূচিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মাইল পথ অতিক্রম করেন তিনি। ১৩৬ দিন ধরে চলা এই পদযাত্রার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং রাজনীতির বাইরে থাকা মানুষের কাছেও নিজেকে সহজে পৌঁছানো যায়—এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরা। কর্মসূচিটি তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জনসংযোগ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সংবিধান রক্ষার বক্তব্যের মাধ্যমে কংগ্রেসের রাজনীতিকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন তিনি। এরপর ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বাড়ে। অন্যদিকে, বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে জোটের সমর্থনে সরকার গঠন করতে হয় দলটিকে। নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পান রাহুল। এই ফলাফল তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন মাত্রা দেয়। তবে কংগ্রেসের আসন বৃদ্ধি এবং বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোকে রাহুলের স্থায়ী জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে এই সমর্থন ধরে রাখা এবং তা আরও বিস্তৃত করাই হবে তার জন্য বড় পরীক্ষা। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক: গণতান্ত্রিক অধিকার, নাকি রাজনৈতিক মেরুকরণ? রাহুলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতার অন্যতম প্রধান বিষয় ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা। মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগ তোলেন তিনি। বিহারের নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আনেন। তার দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলেছে এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা সুবিধা পেয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিপরীতে ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। ফলে বিষয়টি এখন শুধু রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিজেপিবিরোধী হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে এমন অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার তথ্য, বাদ পড়া ভোটারদের পরিচয় ও পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। রাহুলের রাজনৈতিক কৌশলে এই বিতর্কের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে তিনি নির্বাচনি ফলাফলের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও আলোচনার কেন্দ্রে আনতে চাইছেন। তবে অভিযোগ তোলা আর অনিয়মের প্রমাণ হাজির করা এক বিষয় নয়। অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি ও যাচাইযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে পারলে রাহুলের বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেতে পারে। তরুণদের ক্ষোভ: রাহুলের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ ভারতের তরুণদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রাহুলের রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মতো ঘটনা নিয়ে সরকারের সমালোচনা করছেন তিনি। এসব বিষয়কে তরুণদের ন্যায্য সুযোগ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছেন কংগ্রেস নেতা। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নীরজা চৌধুরীর মতে, সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ এবং রাজনীতিতে নতুন উদ্দীপনার অভাব রাহুলের বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে রাহুলের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। তবে তরুণদের অসন্তোষকে সরাসরি কংগ্রেসের পক্ষে ভোটে রূপান্তরিত হবে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ একজন শিক্ষার্থী সরকারের সমালোচনা করলেও তিনি কোন দলকে ভোট দেবেন, তা নির্ভর করতে পারে কর্মসংস্থান, স্থানীয় নেতৃত্ব, সামাজিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রত্যাশা এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির ওপর। অর্থাৎ, ক্ষোভ তৈরি হওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনা তৈরি করে; কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে নির্বাচনি সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন সংগঠন, বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক যোগাযোগ। এই জায়গাটিই রাহুলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ‘তরুণদের কণ্ঠস্বর’: মঞ্চে শিক্ষার্থী, সামনে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট তরুণদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে চেন্নাইয়ের এক জনসভায় তাদের মঞ্চে উঠে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ দেন রাহুল। ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ বা ‘তরুণদের কণ্ঠস্বর’ নামের প্রচারণার অংশ হিসেবে এই আয়োজন করা হয়। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বৈষম্য ও রাজনৈতিক জবাবদিহির দাবিকে সামনে আনতে গত জুনে কর্মসূচিটি শুরু করেন তিনি। সভায় এক তরুণী তার বোনের আত্মহত্যার ঘটনা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেডিকেল কলেজে ভর্তির কঠিন পরীক্ষার চাপের মধ্যে তার বোন আত্মহত্যা করেছিলেন। আরেক বক্তা মুসলিম ও নারী হিসেবে বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথা জানান। এসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম বা বৈষম্যকে শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় হিসেবে না দেখে, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাও সামনে আসে। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৃহত্তর সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে এককভাবে সমস্যার ব্যাপকতা বা কোনো নির্দিষ্ট নীতির দায় নির্ধারণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য, পরীক্ষাব্যবস্থার নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। রাহুলের রাজনৈতিক উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই—তিনি তরুণদের নিজেদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক আলোচনার অংশ করতে চাইছেন। তার ‘পিতৃতন্ত্র ধ্বংস করো’ স্লোগানও সভায় উপস্থিত তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮ বছর বয়সী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ঋতিকা র্যাচেল প্রবীণের মতে, ভারতের মতো দেশে কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখে পিতৃতন্ত্র ভাঙার কথা শোনা নতুন ও উৎসাহব্যঞ্জক অভিজ্ঞতা। এ ধরনের বক্তব্য তরুণ নারী ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর কাছে রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। কিন্তু বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দলীয় রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটে, তার ওপর। রাহুলের নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা কতটা কাটল? রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমর্থকেরা তাকে সংবিধান, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন তার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, নির্বাচনি কৌশল এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তরের সক্ষমতা নিয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব, যিনি ২০০৭ সাল থেকে রাহুলকে চেনেন এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন প্রচারণায় কাজ করেছেন, তাকে বই ও নতুন ধারণার প্রতি আগ্রহী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে যাদবের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাহুল কিছুটা লাজুক এবং সহজাত বক্তা নন। জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাকে অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে রাহুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় হয়েছেন। সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে হাস্যরসের সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরছেন তিনি। সাধারণ পোশাক, শরীরচর্চা এবং ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত পোস্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের আরেকটি দিক সামনে আনছেন। আগস্টে ইনস্টাগ্রামের ‘আস্ক মি এনিথিং’ পর্বে নিজের শরীরচর্চার রুটিন নিয়ে কথা বলেন রাহুল। মার্শাল আর্ট, সাঁতার, দৌড়, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম ও যোগব্যায়ামের পাশাপাশি উচ্চ প্রোটিন ও কম শর্করাযুক্ত খাবার গ্রহণের কথা জানান তিনি। এই ধরনের যোগাযোগের লক্ষ্য হতে পারে তরুণদের কাছে আরও পরিচিত ও সহজে পৌঁছানো যায়—এমন একজন নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনে ভোট পাওয়ার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অনলাইনে সাড়া কতটা বাস্তব রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ নিচ্ছে, তা যাচাইয়ের জন্য আরও বিস্তৃত তথ্য প্রয়োজন। রাজপথের প্রতিবাদ: রাজনৈতিক বার্তা, নাকি প্রতীকী উপস্থিতি? সরকারবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও সাম্প্রতিক সময়ে রাহুলের উপস্থিতি আলোচনায় এসেছে। জুলাইয়ে বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে মোদির সরকারি বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। ওই সময় পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে—এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি মাসেও পুলিশের বাধার মুখে তার প্রতিবাদ এবং ব্যারিকেডের ওপর উঠে যাওয়ার দৃশ্য আলোচনায় আসে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি বিশ্লেষক আশুতোষ ভার্শনির মতে, এ ধরনের দৃশ্য রাহুলকে মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে সহায়তা করেছে। প্রতিবাদের এসব দৃশ্য রাজনৈতিক যোগাযোগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এগুলোর মাধ্যমে রাহুল নিজেকে শুধু সংসদীয় বিতর্কে অংশ নেওয়া বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নয়, রাজপথে সক্রিয় প্রতিবাদী হিসেবেও উপস্থাপন করছেন। তবে প্রতিবাদে উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে পড়া কিংবা জনসভায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস—কোনোটিই এককভাবে নির্বাচনি সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। এসব কর্মকাণ্ড ভোটারের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে এবং তা কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াচ্ছে কি না, সেটিই হবে মূল বিবেচ্য বিষয়। ভার্শনির মূল্যায়নেও এই অনিশ্চয়তা রয়েছে। এসব তৎপরতা রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থানকে দৃশ্যমান করলেও মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে তা যথেষ্ট হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি বনাম হিন্দু জাতীয়তাবাদ তরুণদের সমর্থন অর্জনের পাশাপাশি বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিপরীতে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরছেন রাহুল। বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ভারতের সংবিধানের একটি কপি হাতে নিয়ে অংশ নেওয়াও তার রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কংগ্রেসের স্বাধীনতাসংগ্রামের ঐতিহ্য তুলে ধরে তিনি সংবিধানের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলছেন। এখানে রাহুলের কৌশল দুটি ধারায় এগোচ্ছে। একদিকে শিক্ষার্থী, নারী ও বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে সামনে আনা হচ্ছে; অন্যদিকে এসব ইস্যুকে সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি বিজেপিবিরোধী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে আনার চেষ্টা করছেন। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে সমর্থন পাওয়া এবং সেই সমর্থনকে নির্বাচনি জোটের মধ্যে কার্যকরভাবে ধরে রাখা এক বিষয় নয়। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নেতৃত্ব, আসন ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ফলে রাহুলের রাজনৈতিক সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নয়, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রক্ষার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে। ‘মোদি বনাম রাহুল’: রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন সমীকরণ? নীরজা চৌধুরীর মতে, রাহুল এখন শুধু বিরোধী দলের নেতা নন; মোদির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই ‘মোদি বনাম রাহুল’ রূপ নিচ্ছে। বিরোধী জোটের শরিক একটি দলের নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যও মনে করেন, বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে জাতীয় পর্যায়ে কংগ্রেসের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিজেপি রাজনৈতিক পরিসরে এমনভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে যে পুরো ব্যবস্থার ওপরই দলটির প্রভাব তৈরি হয়েছে। রাহুলের বক্তব্যেও এই রাজনৈতিক সংঘাতের ধারণা স্পষ্ট। ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয় হুমকির মুখে বলে দাবি করেছেন তিনি। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল বলেন, জনমত, মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সংঘাত চলছে। তার দাবি, কংগ্রেস এসব ক্ষেত্রেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং অগ্রগতি অর্জন করছে। তবে ‘মোদি বনাম রাহুল’ রাজনৈতিক বয়ানটি কতটা বিস্তৃত জনসমর্থনের প্রতিফলন, তা নির্ধারণ করতে ভোটের ফলাফল, জনমত জরিপ এবং বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে জাতীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি আঞ্চলিক দল, স্থানীয় ইস্যু এবং রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুতরাং, রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়া মানেই বিজেপির আধিপত্যের অবসান—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিজেপির পাল্টা বক্তব্য ও রাহুলের সামনে চ্যালেঞ্জ রাহুলের বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতার জবাবে বিজেপি নেতারা সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। তাদের মতে, তরুণদের একটি অংশের সমর্থন পেলেও রাহুলের অতিরঞ্জিত বক্তব্য অন্য ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, দলটি বড় ধরনের পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছে এবং নেতিবাচক রাজনীতি কংগ্রেসের কোনো কাজে আসবে না। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে মূল প্রশ্নটি হলো, রাহুলের বর্তমান রাজনৈতিক সক্রিয়তা কংগ্রেসের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনে কতটা ভূমিকা রাখছে। প্রথমত, তরুণদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মতো বিষয়েও তাদের প্রত্যাশা রয়েছে। এসব প্রশ্নে বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত অবস্থান তুলে ধরতে না পারলে প্রতিবাদী রাজনীতির প্রভাব সীমিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও রাজ্যভিত্তিক নেতৃত্বের শক্তি বাড়ানো জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে রাহুলের বক্তব্য আলোচনায় এলেও ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনি ব্যবস্থাপনা ছাড়া সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন। তৃতীয়ত, বিরোধী জোটের ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থান থাকলেও বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক স্বার্থ ও নির্বাচনি কৌশল এক নয়। এই পার্থক্য সামাল দিতে না পারলে বিরোধী ভোটের কার্যকর সমন্বয় বাধাগ্রস্ত হতে পারে। চতুর্থত, ভোটার তালিকা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথি উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ; কিন্তু অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জরুরি। ২০২৯ সালের নির্বাচন: সুযোগ আছে, নিশ্চয়তা নেই ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাহুল গান্ধীর বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতা কংগ্রেসের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তরুণদের অসন্তোষ, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বৈষম্য এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক—এসব বিষয় বিরোধী রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। কিন্তু রাজনৈতিক সুযোগ আর নির্বাচনি বিজয় এক নয়। রাহুলের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ: তরুণদের ক্ষোভকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করা, কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কার্যকর ঐক্য বজায় রাখা। একই সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর অবস্থান এবং বিকল্প নীতির স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরতে হবে। শুধু মোদিবিরোধী অবস্থান নয়, ক্ষমতায় গেলে কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, নাগরিক অধিকার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির উন্নতি ঘটানো হবে—সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে কংগ্রেসকে। রাহুলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাকে পরিচিতি দিয়েছে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেই পরিচিতিকে জনআস্থা ও নির্বাচনি সাফল্যে রূপান্তর করতে হবে। ভারতের রাজনীতিতে তিনি মোদির কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠবেন কি না, তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত। আপাতত তরুণদের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনা, সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে অবস্থান নেওয়া এবং রাজপথের প্রতিবাদকে রাজনৈতিক বার্তায় রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই বিকল্প হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন রাহুল গান্ধী। শেষ পর্যন্ত তার সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু তিনি কত জোরে সরকারের সমালোচনা করছেন, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হাজির করতে পারছেন এবং সেই বিকল্পের পক্ষে কত বিস্তৃত জনসমর্থন সংগঠিত করতে পারছেন, তার ওপর।
লেবেলে সুইটনারের তথ্য ছোট হরফে লেখার অভিযোগ | সংশ্লিষ্ট ব্যাচের বোতল প্রত্যাহারের আবেদন | ১৬ নভেম্বর আদালতে হাজিরার নির্দেশ ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষায় নির্ধারিত ছয়টি প্যারামিটারের মধ্যে তিনটিতে উত্তীর্ণ হতে না পারার অভিযোগ উঠেছে জনপ্রিয় কোমল পানীয় সেভেন-আপের একটি পণ্যের বিরুদ্ধে। ‘সেভেন-আপ (ন্যাচারাল লেমন ফ্লেভার এক্সট্রা ফিজ)’ নামের পানীয়টির প্রস্তুত ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় পণ্যটির মান, রাসায়নিক উপাদান এবং লেবেলিংসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ঢাকার বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সিমিন রহমানকে আগামী ১৬ নভেম্বর আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পরীক্ষায় তিন প্যারামিটারে ব্যর্থতার অভিযোগ মামলার নথি ও পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পানীয়টি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) নির্ধারিত মান বিডিএস ১১২৩:২০২২ অনুযায়ী রাসায়নিক পরীক্ষায় ছয়টি প্যারামিটারের মধ্যে তিনটিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। নথি অনুযায়ী, পরীক্ষায় পানীয়টিতে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পানীয়টির চিনির পরিমাণ বা সুগার কনটেন্ট নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মামলায় পানীয়টিকে নিরাপদ খাদ্য আইনের দৃষ্টিতে ‘নিরাপদ নয়’ এবং ‘মানসম্পন্ন নয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। লেবেলে সুইটনারের তথ্য নিয়ে আপত্তি মামলায় শুধু পানীয়টির রাসায়নিক মান নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়নি; পণ্যের লেবেল ও মোড়কজাতকরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও আনা হয়েছে।মামলার নথিতে বলা হয়েছে, সেভেন-আপের সংশ্লিষ্ট পণ্যের লেবেলে নন-নিউট্রিটিভ সুইটনার ব্যবহারের তথ্য এমনভাবে লেখা হয়েছে, যা খালি চোখে সহজে দেখা যায় না। তথ্যটি ছোট হরফে উল্লেখ করার কারণে ভোক্তারা বিভ্রান্ত হতে পারেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০১৭ এবং পণ্য মোড়কজাতকরণ বিধিমালা, ২০২১ লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।খাদ্যপণ্যের লেবেলে উপাদান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ভোক্তাদের সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিশু থেকে সব বয়সীর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা মামলার নথিতে দাবি করা হয়েছে, অভিযোগে বর্ণিত পানীয়টি গ্রহণের ফলে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাজার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের সেভেন-আপের সব বোতল প্রত্যাহারের আবেদনও আদালতে জানানো হয়েছে। তবে পরীক্ষায় পাওয়া উপাদানগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিচয়, মাত্রা, গ্রহণের পরিমাণ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কতটা, তা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষাগার প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাজারে থাকা পণ্যটির কোন ব্যাচ পরীক্ষার আওতায় এসেছে, সেই ব্যাচের উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ কী এবং বাজারে এর কত বোতল রয়েছে—এসব তথ্যও ভোক্তাদের ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে। আদালতে নালিশি মামলা, ১৬ নভেম্বর হাজিরার নির্দেশ বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকার বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এ আদেশ দেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগের নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মো. কামরুল হাসান বাদী হয়ে আদালতে নালিশি মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন। সমন অনুযায়ী, আগামী ১৬ নভেম্বর তাঁকে আদালতে হাজির হতে হবে। এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ মামলার অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি। পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া তিনটি প্যারামিটার কী, পরীক্ষাটি কোন তারিখে এবং কোন ব্যাচের নমুনার ওপর করা হয়েছে, পরীক্ষাগারের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কী বলছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাচের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের আবেদন সম্পর্কে আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন—এসব তথ্য মামলার অগ্রগতি ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : হকসে গ্রামের কিডনি বিক্রির পুরোনো ক্ষত এখনো শুকায়নি। এর মধ্যেই প্রচণ্ড গরমে বিদেশে কাজ করা নেপালি তরুণ শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে কিডনি বিকল হওয়ার ঘটনা। কিডনি পাচারের অভিযোগও সামনে আসছে নতুন করে। হিমালয়ের পাদদেশের নেপালের হকসে গ্রামকে এখন অনেকেই চেনেন ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে। দারিদ্র্যের চাপে একসময় এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই কেউ না কেউ কিডনি বিক্রি করেছিলেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। সেই পুরোনো ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। অস্ত্রোপচারের দাগ শরীরে বহন করছেন গ্রামের অনেক বাসিন্দা। কেউ এখনো ব্যথায় ভুগছেন, কেউ হারিয়েছেন স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সক্ষমতা। এর মধ্যেই নেপালে দেখা দিয়েছে কিডনি-সংক্রান্ত আরেক স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় যাওয়া তরুণ শ্রমিকদের অনেকে প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাজ, পর্যাপ্ত পানি না পাওয়া এবং বিশ্রামের অভাবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি (সিইএসএলএএম) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কিডনি পাচার ও বিদেশফেরত শ্রমিকদের কিডনি-সংকটের এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘কিডনি আবার গজাবে’—দালালদের সেই প্রতিশ্রুতি হকসে গ্রামের বাসিন্দা কাঞ্চা ও রাম অর্থের সংকটে নিজেদের একটি করে কিডনি বিক্রি করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের দাগ এখনো তাদের শরীরে স্পষ্ট। কাঞ্চা জানান, অস্ত্রোপচারের পরও তিনি নিয়মিত ব্যথায় ভুগছেন। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। গ্রামটিতে কত মানুষ কিডনি বিক্রি করেছেন, তার সঠিক হিসাব করা কঠিন বলে জানান তিনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে দালালরা অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে কিডনি বিক্রিতে রাজি করিয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তাদের বলা হয়েছিল—একটি কিডনি বিক্রি করলেও পরে সেটি আবার গজিয়ে উঠবে। বাস্তবে মানুষের কিডনি পুনরায় গজায় না। একটি কিডনি নিয়ে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলেও কিডনি অপসারণের অস্ত্রোপচার ঝুঁকিমুক্ত নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে গুরুতর শারীরিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে তাদের দাবি। দারিদ্র্য, তথ্যের অভাব এবং সহজে অর্থ পাওয়ার আশ্বাস—এই তিনটি বিষয়কে কাজে লাগিয়েই দালালদের একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে প্রলুব্ধ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সংকট: গরমে কাজ, দেশে ফিরে ডায়ালাইসিস নেপালের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলানোর অন্যতম পথ হয়ে উঠেছে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যাওয়া। বিপুলসংখ্যক তরুণ উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন। কিন্তু সেখানে অনেক শ্রমিককে দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে হয়। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত বিরতি এবং বিশ্রামের সুযোগ না থাকায় তাদের শরীরে পানিশূন্যতা ও তাপজনিত চাপ তৈরি হচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে কিডনিতে। ২৯ বছর বয়সি জিত বাহাদুর গুরুং সৌদি আরবে তিন বছর কাজ করেছেন। প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করার সময় পর্যাপ্ত পানি পান কিংবা বিশ্রামের সুযোগ খুব কমই পেতেন তিনি। একপর্যায়ে তার পা ফুলে যায়। হাঁটতেও সমস্যা হচ্ছিল। পরীক্ষার পর জানা যায়, তার কিডনি বিকল হয়ে গেছে। এখন দেশে ফিরে সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে জিত বাহাদুরকে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৩৪ বছর বয়সি ইশ্বর। তিনি দুবাইয়ে সাত বছর কাজ করেছেন। প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘণ্টা প্রচণ্ড গরমে কাজ করার পর তার শরীর ফুলে যেতে শুরু করে। বর্তমানে কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। তরুণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে নেপালের মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন কেন্দ্রের চিকিৎসক পুকার শ্রেষ্ঠের মতে, কিডনি রোগের চিত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে মূলত বয়স্ক রোগীদের কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে তরুণদের সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্ত কিডনি নিয়ে হাসপাতালে আসতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশফেরত শ্রমিকদের মধ্যে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক। চিকিৎসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালের মোট কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকরা যুক্ত। অথচ দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ বিদেশে কর্মরত। এই বৈপরীত্যই পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কিডনি ক্ষতির পেছনে শুধু গরম নয়—পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং বিশ্রামের ঘাটতিও ভূমিকা রাখতে পারে। সীমান্ত পেরিয়ে কিডনি পাচারের অভিযোগ কিডনি-সংকটের আরেকটি দিক হলো মানবপাচারের সঙ্গে অঙ্গ পাচারের যোগসূত্র। নেপাল-ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে কিডনি পাচারের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে সিইএসএলএএমের প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের একটি হোটেলে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সিন্ধুলির এক ব্যক্তিকে ভারতে নিয়ে যায় একটি চক্র। চণ্ডীগড়ে প্রায় এক মাস তাকে আটকে রাখা হয়। পরে রক্ত, প্রস্রাব ও এক্স-রে পরীক্ষার কথা বলে তাকে একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে জানানো হয়, তার একটি কিডনি অপসারণ করা হবে এবং বিনিময়ে তাকে ৬ লাখ রুপি দেওয়া হবে। তিনি আপত্তি জানালে অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে জোর করে অচেতন করা হয়। এরপর তার বাম কিডনি অপসারণ করা হয় বলে তিনি দাবি করেছেন। অস্ত্রোপচারের পর প্রতিশ্রুত অর্থও পাননি তিনি। মাত্র ১০ হাজার রুপি দিয়ে তাকে নেপালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ওই ব্যক্তি। এই ঘটনা কিডনি পাচারের ক্ষেত্রে প্রতারণা, মানবপাচার এবং জোরপূর্বক অঙ্গ অপসারণের গুরুতর ঝুঁকির দিকটি সামনে আনে। চাকরির প্রলোভন, তারপর পাচারের ফাঁদ নেপালের মানবপাচার তদন্ত ব্যুরোর এসএসপি কৃষ্ণ পাঙ্গেনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষকে বিদেশে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফাঁদে ফেলার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ভুক্তভোগী শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর অথবা প্রতিশ্রুত অর্থ না পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেন। অর্থাৎ, বিদেশে কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা শুধু শ্রমবাজারের ঝুঁকির সঙ্গে নয়, পাচারচক্রের ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ছে। সামনে আরও বড় ঝুঁকি? চিকিৎসকদের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের প্রচণ্ড গরমে কাজ করার সময় পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত বিরতি এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। তবে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করা শ্রমিকদের পর্যাপ্ত পানি, বিশ্রাম এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করা হলে শুধু ব্যক্তির সচেতনতা দিয়ে এই ঝুঁকি কমানো কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বাস্তবতা। উপসাগরীয় অঞ্চলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সেখানে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের কিডনি-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও বাড়তে পারে। হকসের মানুষের জন্য কিডনি একসময় ছিল দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার মরিয়া বিনিময়মূল্য। আজ সেই একই দেশের তরুণদের একটি অংশ বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে গিয়ে হারাচ্ছেন কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। একদিকে দালালের প্রলোভনে কিডনি হারানো মানুষ, অন্যদিকে প্রচণ্ড গরমে কাজ করে কিডনি বিকল হওয়া তরুণ শ্রমিক—দুই ভিন্ন বাস্তবতা যেন নেপালের একই সংকটের দুই মুখ। প্রশ্ন এখন শুধু কিডনি কেড়ে নেওয়ার নয়। প্রশ্ন হলো—দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে গিয়ে আর কত মানুষকে নিজের শরীরের বিনিময়মূল্য দিতে হবে?