মীর খসরুজ্জামান হিল্লোল: যুদ্ধ বিস্তার লাভ করছে, আর বাংলাদেশের বাড়ছে বিপদ। বাংলাদেশ কি আগ্রাসনবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুতি নিচ্ছে? কোনো দেশ আগ্রাসন চালালে তা প্রতিহত করার মতো সামরিক সক্ষমতা কি আমাদের আছে? পৃথিবী আজ যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন বললে অবশ্য ভুল হবে। পাঠক, যুদ্ধটা এখন অনেকটাই রাশিয়া বনাম ইউরোপের লড়াই। যদিও আমেরিকা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছে। নিজেদের স্বার্থে ইউক্রেনের সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফাঁদ থেকে বের হতে না পারার কারণে আমেরিকার অস্ত্রের উৎপাদন আর চাহিদার মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও এখন শুধু ইরান, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সৌদি আরব-ইয়েমেন সংঘাতের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশের দিকে তাকালেও যুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়া ও ইথিওপিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ, বিদ্রোহ ও সশস্ত্র সংঘাত চলছে। লিবিয়ার আগুনও পুরোপুরি নেভেনি। সিরিয়া ও লেবাননও যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। পাকিস্তান ব্যস্ত আফগানিস্তানকে ঘিরে সংঘাত নিয়ে। মিয়ানমারেও যুদ্ধ চলছে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যুদ্ধে নেই। কিন্তু পৃথিবীর এই যুদ্ধের আগুনে পুরো পৃথিবীর মতো আমরাও পুড়ছি। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। অথচ এই অবস্থানই আমাদের অসহায় করে রেখেছে-এটাও একটি অপ্রিয় সত্য। সমুদ্রবাণিজ্যের বড় একটি অংশ কার্যত যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতি-সবকিছুতেই যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে। পুরো পৃথিবী আজ যেন এক অঘোষিত বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। ইউরোপ যদি ইউক্রেনের প্রক্সি ওয়ার থেকে সরে এসে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেই ঘোষণা আসতে কতক্ষণ? সময়ের হাতে তার উত্তর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আপাতত আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। তবে এতে বাংলাদেশের জন্য কী বিপদ দেখছি, সেটা এবার বলি। আমাদের দেশে কোনো দেশ সামরিক আগ্রাসন চালালে তা প্রতিরোধ করার মতো প্রস্তুতি কি আমাদের আছে? আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী একপ্রকার বিনা অস্ত্রে জীবন দেবে-কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ কি শুধু জীবন দিয়ে জেতা যায়? আকাশে আমাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। আমাদের বিমানবাহিনীতে আধুনিক যুদ্ধবিমানের ঘাটতি রয়েছে, নেই পর্যাপ্ত শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। যা আছে, তা দিয়ে বিজয় দিবসে কুচকাওয়াজ করা যাবে, কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের আকাশ প্রতিরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা যাবে? নেই পর্যাপ্ত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের ব্যবস্থা। আমরা মাত্র ড্রোনের যুগে প্রবেশ করেছি বলা যায়, এখনো শিশু। অথচ আধুনিক যুদ্ধের চিত্র বদলে গেছে। ড্রোন, পাল্টা ড্রোন ব্যবস্থা, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা এখন যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যতম প্রধান শক্তি। এই সবকিছু মাথায় রেখেই বলছি, সামরিক আগ্রাসন না চালালেও আগ্রাসনের আশঙ্কা বা সেই ভয় দেখিয়ে সরকারকে প্রতিবেশী দেশের অনেক অন্যায় আবদারের কাছে বাধ্য করা হতে পারে। সরকার এই জাল ছিঁড়ে বের হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিছু জায়গায় সফল হচ্ছে, কিছু জায়গায় চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। আর এই সুযোগে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদী সরকারের দলীয়করণ করা প্রশাসন-যা এখনো পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসেনি-পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। চীনের সঙ্গে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা ঝুলে আছে। বাংলাদেশের সামরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিকল্প নেই-এটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সামরিক আগ্রাসন প্রতিহত করতে চীন অস্ত্র, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে, যেখান থেকে বাংলাদেশের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকানোর আগে দুবার ভাববে। চীন ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও পর্দার আড়ালে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। তবে সবকিছু হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে। এই সব বিপদের ওপর আবার আপদের ভূমিকা হিসেবে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট। সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশী পালটানো যায় না; আবার তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, দুই পক্ষ এক হয়ে গেছে, এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে-তখন বিষয়টিকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কথাটা রাজনৈতিক বয়ান হলেও এর বাস্তবতা অনেকখানি থাকতে পারে। এই দুই পক্ষকে আমি যতটা না জামায়াত আর আওয়ামী লীগ হিসেবে দেখি, তার চেয়ে বেশি দেখি প্রতিবেশী দেশ এবং তাদের এদেশীয় পেইড-আনপেইড এজেন্টদের বোঝাপড়া হিসেবে। তারা কীভাবে মাঠে খেলবে, সরকারকে কীভাবে মোকাবিলা করবে সেই বার্তাও হয়তো প্রধানমন্ত্রী দিতে চেয়েছেন। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথেষ্ট প্রজ্ঞার সঙ্গে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করবেন। কিন্তু এই সংকটের জন্য বিএনপি দল হিসেবে বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেননি-এমনটা বলারও সুযোগ নেই। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, তারেক রহমানকে ঘিরে রাখা হয়েছে এমন কিছু লোক দিয়ে, যাঁরা হয়তো তাঁকে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত বাস্তবতা বুঝতে দিচ্ছেন না। বিএনপির মধ্যে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে দলের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের আগে তাঁরাই হয়তো বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, হিন্দু ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসবেন না, বিএনপিকে ভোট দেবেন না, বরং জামায়াতকে ভোট দেবেন। আর এই সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক নিজেদের পক্ষে পাকা করতে পার্শ্ববর্তী দেশের যোগসাজশে 'বাংলাদেশ মতুয়া বহুজন সমাজ' নামক একটি নতুন সংগঠন দাঁড় করানো হয়েছে-এমন অভিযোগও রয়েছে। সংগঠনটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এর নেতারাই সব হিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। আমার প্রশ্ন, এই সংগঠনের নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁরা আসলে কতটা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন? তাঁরা কি ধর্মীয় পণ্ডিত, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করছেন? এই সংগঠনের দুই ব্যক্তি কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল ও সোমনাথ একসঙ্গে ভারত সফরে গিয়ে এই পরিকল্পনা করেছিলেন-এমন অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা এবং আটক করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা কীভাবে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এলেন, সে প্রশ্নও রয়ে গেছে। এই দেশে প্রতিবেশী দেশের হাজারো এজেন্ট এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে-এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। যাহোক, সে কথা থাক। এবার মূল কথায় আসি। আমার বক্তব্য হলো, এই সংগঠনটিকে হিন্দু ভোট ধরে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে-এমন রাজনৈতিক হিসাব যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বিএনপি বড় ভুল করেছে। সংসদীয় আসন নিশ্চিতভাবে জেতার মতো জায়গায় দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে অন্যদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। শেখ হেলালের মতো মানুষের চোখে চোখ রেখে যাঁরা বিএনপির পতাকা ধরে রেখেছেন, তাঁদের এক নিমিষে মাইনাস করে দেওয়া হয়েছে-এমন অভিযোগ তৃণমূলের কাছে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকে দল পরিচালনা করার কারণে তারেক রহমানের কাছে মাঠপর্যায়ের সব তথ্য সঠিকভাবে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যখন শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ অনেক নেতা-কর্মী পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নেন এবং দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন বিএনপির সব নেতা-কর্মী হিন্দুদের মন্দির ও এলাকায় রাতের পর রাত জেগে পাহারা দিয়েছিলেন। তাঁরা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেছিলেন কাজের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে নয়। এবং তাতে ১০০% ফল বিএনপির ঘরে উঠতো। মাঠপর্যায়ের এই তথ্য কি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছেছিল? নাকি পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি? আমার মনে হয়, এই তথ্য তাঁর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায়নি। আর সেই ভুলের মাশুল এখন বিএনপিকে অনেক বড়ভাবে দিতে হচ্ছে। বিএনপি শুধু দুটি আসন হারায়নি; আমার দৃষ্টিতে, দলটি বাগেরহাটের পুরো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। দলের প্রতিটি ত্যাগী নেতা-কর্মীকে, বিশেষ করে বাগেরহাটে যাঁরা স্বার্থের জন্য নয়, পদ-পদবির জন্য নয়, একমাত্র আদর্শের টানে রাজপথে লড়াই করেছেন, তাঁদের আজ কোথায় পাওয়া যায়? সোজা উত্তর পাওয়া যায় না। তাঁরা বিএনপির কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেন না, তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায় না। কাউকে বহিষ্কার করা হয়েছে, কাউকে ক্ষমতাহীন করে রাখা হয়েছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের একের পর এক বলি দেওয়া হচ্ছে। আর সব সুযোগ-সুবিধা চলে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের লোকদের হাতে-এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে শোনা যাচ্ছে। এবং মাঠে গিয়ে সত্যতাও পাওয়া যাচ্ছে। বাগেরহাটে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে, কে ক্ষমতায়-উত্তর আসে, আওয়ামী লীগ। একজন জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধারক হিসেবে আমি আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে যতটুকু পেরেছি, ততটুকুই বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম। হয়তো সরকারের কারও চোখে পড়বে, হয়তো এই বিশ্লেষণ সরকারের কাজ কিছুটা সহজ করবে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, বিএনপির রাজনীতির মূল মেরুদণ্ড হচ্ছে জাতীয়তাবাদ। আগ্রাসনবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করা, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা-এটাই জাতীয়তাবাদের মূল কথা। বিএনপিকে এই দেশের মানুষ ভালোবাসে। কিন্তু আপস করতে করতে একদিন বিএনপি নিজেই ইতিহাস হয়ে না যায় এই ভয় পিছু ছাড়ে না। সময় থাকতে পদক্ষেপ নিন, প্লিজ। দেশের স্বার্থে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করুন। ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করুন। প্রশাসনের ভেতরে থাকা দুর্বলতা ও অনিয়ম দূর করুন। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ান। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখুন, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস নয়। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আপস নয়। আর দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি নয়। সময় থাকতে সতর্ক হোন। কারণ ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল শুধু একটি দলকে দিতে হয় না-কখনো কখনো পুরো দেশকে দিতে হয়। লেখক: মীর খসরুজ্জামান হিল্লোল
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।