ঢাকা: সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-তে ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ উপলক্ষে মাত্র দুই দিনে প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনুষ্ঠানের নামে তৈরি করা বিল-ভাউচারের বড় অংশই ভুয়া, এমনকি অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় রয়েছে জাল স্বাক্ষর। পিআইবি আইন-২০১৮ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ সাংবাদিকতা বিষয়ে গবেষণা, প্রকাশনা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া। পাশাপাশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করে সংস্থাটি। আরও পড়ুন: পিআইবিতে মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের লুটপাট, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ কিন্তু সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছরের ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে ‘তারুণ্যের উৎসব’ উপলক্ষে চারটি অনুষ্ঠানের নামে প্রায় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। চারটি অনুষ্ঠানে প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয় পিআইবির নথি অনুযায়ী ব্যয়ের হিসাব ছিল— 1️⃣ সংগীতসন্ধ্যা তারিখ: ১৮–১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ স্থান: পিআইবি অডিটরিয়াম ব্যয়: ৫,৭৩,০০০ টাকা 2️⃣ জুলাই অভ্যুত্থানের চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, গ্রাফিতি ও ভিডিও প্রদর্শনী তারিখ: ১৮–১৯ ফেব্রুয়ারি ব্যয়: ৪,৬৭,৫০০ টাকা 3️⃣ সেমিনার: ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : সংহতি ও প্রত্যাশা’ তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্যয়: ৬,৯১,৫০০ টাকা 4️⃣ সেমিনার: ‘গণ-অভ্যুত্থানের দিশা ও দর্শন’ তারিখ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্যয়: ৬,৬৫,৫০০ টাকা সব মিলিয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। ভুয়া অংশগ্রহণকারী ও জাল স্বাক্ষর নথি অনুযায়ী দুটি সেমিনারে ২০০ জন করে মোট ৪০০ জন অংশগ্রহণকারীকে এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, তালিকায় থাকা বহু সাংবাদিকই জানিয়েছেন— তারা ওই সেমিনারে যাননি কোনো ভাতা নেননি নথিতে থাকা স্বাক্ষর তাদের নয় তালিকায় থাকা একাধিক সাংবাদিক ফোনে জানিয়েছেন, এমন কোনো সেমিনারের কথাই তারা জানেন না। অনেকেই নিজেদের প্রকৃত স্বাক্ষরের নমুনা পাঠিয়ে জালিয়াতির প্রমাণ দিয়েছেন। আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, তালিকায় থাকা একজন সাংবাদিক ২০২২ সাল থেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন, অথচ তার নামেও ভাতা তোলার স্বাক্ষর রয়েছে। আলোচকদের নামেও অসঙ্গতি সেমিনারের আলোচক হিসেবে যাদের নাম দেখানো হয়েছে তাদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন— তারা কখনো ওই সেমিনারে অংশ নেননি তাদের আমন্ত্রণও জানানো হয়নি নথিতে থাকা স্বাক্ষরও ভুয়া ভাউচারে জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে ভাউচার জালিয়াতির বিষয়। 📌 কিছু ক্ষেত্রে একই মেমো নম্বর দিয়ে দুটি বিল তৈরি করা হয়েছে দোকানের মালিকরা বলেছেন এই বিল তাদের নয় 📌 কিছু দোকান জানিয়েছে তাদের খালি ভাউচার কেউ নিয়ে পরে নিজেরা লিখে ব্যবহার করেছে। 📌 একটি রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে দেখা গেছে পিআইবির জমা দেওয়া ভাউচার সাদা-কালো, অথচ রেস্তোরাঁর আসল ভাউচার লাল রঙের। ৫০০ টাকার লাঞ্চ প্যাকেট নিয়েও প্রশ্ন দুটি সেমিনারের জন্য ২৫০টি করে লাঞ্চ প্যাকেট ৫০০ টাকা দরে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রেস্তোরাঁর কর্মচারীরা জানান— তাদের এখানে সাধারণ প্যাকেটের দাম ১৫০–৩৫০ টাকার মধ্যে ৫০০ টাকার প্যাকেট কখনো বিক্রি হয়নি। ফেসবুক পেজে নেই সেমিনারের কোনো তথ্য পিআইবির ফেসবুক পেজে সাধারণত সব অনুষ্ঠান ও প্রশিক্ষণের ছবি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারির কথিত দুটি সেমিনারের কোনো ছবি বা প্রেস রিলিজ নেই পিআইবির ওয়েবসাইটেও নেই এ ধরনের কোনো তথ্য। এত বড় সেমিনারের জায়গা কোথায়? পিআইবি ভবনে রয়েছে— ২৩৮ আসনের একটি অডিটরিয়াম ৬০ আসনের দুটি সেমিনার কক্ষ ৩০ আসনের কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ তাই ২০০ জন অংশগ্রহণকারী নিয়ে একসঙ্গে সেমিনার আয়োজনের মতো কক্ষ নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা। ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৯ ও ৩০ জুন চারটি চেকের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে মোট ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়। চেকগুলোতে উত্তোলিত টাকার অঙ্ক চারটি অনুষ্ঠানের বিলে উল্লেখিত অঙ্কের সঙ্গে হুবহু মিলেছে। পিআইবি কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি অভিযোগের মুখে পিআইবির একজন কর্মকর্তা গোলাম মুর্শেদ জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি এসব বিল তৈরি করেছিলেন। মহাপরিচালকের বক্তব্য পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন— “একটি দুষ্টচক্র ভুয়া বিল তৈরি করেছিল। আমি সেটি অনুমোদন দিইনি এবং পরে বাতিল করেছি।” তবে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, প্রতিদিন অনেক ফাইলে স্বাক্ষর করতে হয়, তাই ভুলবশত কোনো ফাইলে স্বাক্ষর হয়ে থাকতে পারে। ১. ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ উপলক্ষে সংগীতসন্ধ্যা। নথিতে এটির তারিখ লেখা হয়েছে ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫; স্থান : পিআইবি অডিটরিয়াম। মোট ব্যয় : ৫,৭৩,০০০ টাকা। ২. ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, গ্রাফিতি ও ভিডিও প্রদর্শনী’, তারিখ : ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। মোট ব্যয় : ৪,৬৭,৫০০ টাকা। ৩. ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : সংহতি ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনার। তারিখ : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। মোট ব্যয় ৬,৯১,৫০০ টাকা। এর মধ্যে ২০০ জন অংশগ্রহণকারীর ভাতা এক হাজার টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা। তালিকায় ভাতার সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের ‘ট্রেনিংসামগ্রী প্রাপ্তি’ নামের ঘর করে সেখানে ‘ফোল্ডার, কলম, নোটবুক ইত্যাদি’ দেওয়া হয়েছে বলা আছে। প্রত্যেকের প্রাপ্তির ঘরে ১০ টাকার রাজস্ব স্ট্যাম্পও লাগানো হয়েছে। আরো আছে, ঢাকার বাইরে থেকে আসা ৫০ জন অংশগ্রহণকারীর যাতায়াত ভাতা দুই হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা। পাঁচজন আলোচকের সম্মানী ১০ হাজার টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা। ২৫০ প্যাকেট নাশতা ২০০ টাকা করে ৫০ হাজার টাকা। ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ ৫০০ টাকা করে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। বাকি খরচ ডেকোরেশনসহ নানা খাতের দেখানো হয়েছে। ৪. ‘গণ-অভ্যুত্থানের দিশা ও দর্শন’ শীর্ষক সেমিনার। তারিখ : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। মোট ব্যয় ৬,৬৫,৫০০ টাকা। এর মধ্যে ২০০ জন অংশগ্রহণকারীর ভাতা ১০০০ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা। এই তালিকায়ও ভাতার সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের ‘ট্রেনিংসামগ্রী প্রাপ্তি’ নামের ঘর করে সেখানে ‘ফোল্ডার, কলম, নোটবুক ইত্যাদি’ দেওয়া হয়েছে বলা আছে। ১০ টাকার রাজস্ব স্ট্যাম্প এখানেও আছে। আরো হিসাব দেখানো হয়েছে—ঢাকার বাইরে থেকে আসা ২৫ জন অংশগ্রহণকারীর যাতায়াত ভাতা ২০০০ টাকা করে ৫০,০০০ টাকা। পাঁচজন আলোচকের সম্মানি ১০,০০০ টাকা করে ৫০,০০০ টাকা। ২৫০ প্যাকেট নাশতা ২০০ টাকা করে ৫০,০০০ টাকা। ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ ৫০০ টাকা করে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। বাকি খরচ ডেকোরেশনসহ নানা খাতের। এভাবে চারটি অনুষ্ঠান বাবদ মোট প্রায় ২৪ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। সাংবাদিকরা বিস্মিত : পিআইবির নথিগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, চারটি অনুষ্ঠানেরই আলাদা করে খরচের খাত দেখানো হয়েছে। প্রথমে অনুষ্ঠানের দিন পনেরো আগে প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ অফিসার ও সমন্বয়কারী গোলাম মুর্শেদ নিজে স্বাক্ষর করে খরচের হিসাব মহাপরিচালক বরাবর দাখিল করেছেন। পরে মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ ওই দিনই হিসাবের নথিতে নিজে স্বাক্ষর করে দিয়েছেন। এরপর প্রতিটি খাতের খরচের বিপরীতে ভাউচার দাখিল করা হয়েছে, যার প্রতিটি পাতায় গোলাম মুর্শেদের স্বাক্ষর রয়েছে। পাকা হিসাব, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু নথি ঘাঁটতে গিয়ে আমাদের চোখ আটকে যায় একটি নামে। ১৯ ফেব্রুয়ারির সেমিনারে উপস্থিত থেকে এক হাজার টাকা ভাতা নিয়েছেন এস এম আজাদ, কালের কণ্ঠ, ঢাকা। কিন্তু আমাদের জানা আছে, কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার ও ক্রাইম বিভাগের সাবেক ইনচার্জ এস এম আজাদ ২০২২ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পর্তুগালে চলে গেছেন এবং সেখানেই আছেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সব শুনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমি মাসখানেক হলো দেশে এসেছি। গত বছর পিআইবির সেমিনারে যাওয়া বা ভাতা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। গত শনিবার তিনি সশরীরে কালের কণ্ঠের অফিসে এসে দেখেন, পিআইবির তালিকায় তাঁর নামে ভাতা তোলার যে স্বাক্ষর দেওয়া, সেটি তাঁর নয়, ভুয়া স্বাক্ষর। এই ঘটনার পর কালের কণ্ঠ ব্যাপক অনুসন্ধানে নামে। দুটি সেমিনারে ২০০ জন করে যে ৪০০ জনকে মোট চার লাখ টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে বলে পিআইবি বিল করেছে, সেই তালিকার বেশির ভাগই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৭০ জনকে ফোন করে জানতে চাওয়া হয়। প্রত্যেকেই বলেন, এ রকম কোনো সেমিনারের কথা তাঁরা জানেনই না; উপস্থিত থাকা বা ভাতা নেওয়া দূরের কথা। তালিকায় থাকা তাঁদের স্বাক্ষরের ছবি তুলে পাঠানো হলে প্রত্যেকেই নাকচ করে দেন; কেউ কেউ নিজেদের প্রকৃত স্বাক্ষরের নমুনা পাঠিয়ে দেন, যাতে পিআইবির স্বাক্ষর জালিয়াতির প্রমাণ স্পষ্ট। তালিকায় থাকা ঢাকা পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার জসিম উদ্দিন মাহির বলেন, ‘আমি এমন কোনো সেমিনারে অংশ নিইনি। কোনো ভাতাও তুলিনি। নথিতে যে স্বাক্ষর আছে, সেটি আমার নয়।’ দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জামিল খান বলেন, ‘আমার নাম ব্যবহার করে কে বা কারা এই কাজ করেছে, জানি না। আমি ওই সেমিনারে যাইনি, স্বাক্ষরও করিনি।’ তালিকায় থাকা দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক ফজলুর রহমান বলেন, ‘এভাবে আমার নাম ব্যবহার করে জালিয়াতি করা হয়েছে। এটা আমার জন্য অসম্মানের।’ খুলনার সাংবাদিক শামসুজ্জামান শাহীন নিজের স্বাক্ষরের নমুনা পাঠিয়ে বলেন, ‘ভুয়া স্বাক্ষর। আমি ওই সেমিনারের কথা জানিও না।’ তাঁর কাছে খুলনার আরো আটজন সাংবাদিকের নাম-স্বাক্ষর পাঠালে তিনি খোঁজ নিয়ে জানান, এখানকার কেউ ওই সেমিনারে যাননি। সব ভুয়া। আলোচকরা অবাক : পিআইবির কথিত সেমিনারের বিলে নাম ও স্বাক্ষর থাকা ‘শহীদুল্লাহ লিপন’ নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সহিদ উল্যাহর ডাকনাম লিপন। তিনি বিভিন্ন সময় পিআইবির অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকেন। তাঁকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েন। কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর কোনো সেমিনারেই অংশ নিইনি। এমনকি গত তিন-চার বছরেও পিআইবিতে আমার যাওয়া হয়নি। এ ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির পেছনে কারা, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ এ ছাড়া অধ্যাপক সহিদ উল্যাহর স্বাক্ষরের সঙ্গে পিআইবির নথিতে পাওয়া স্বাক্ষরের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। আমাদের অনুসন্ধানে পিআইবির তালিকা মতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে খান মোহাম্মদ বাহাদুর নামে কোনো শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়নি। ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর নামে একজন শিক্ষক আছেন, যিনি রসায়নবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, পিআইবির কোনো অনুষ্ঠানে এযাবৎকালে অংশগ্রহণ করেননি। এ ধরনের কোনো সেমিনারের কথা তিনি জানেনও না; আমন্ত্রণও কখনো পাননি। নাম থাকা আরেকজন শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পিআইবির কোনো সেমিনারে যোগ দেওয়ার কথা মনে পড়ছে না। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে মফস্বলের সাংবাদিকদের একটি কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু জুলাই ইস্যুতে পিআইবিতে কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েছি—এমন কথা মনে পড়ে না।’ অথচ দুটি সেমিনারের নামে ১০ জন আলোচককে ১০ হাজার করে মোট এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে পিআইবি। ভাউচারে ভুয়ামি : আলোকচিত্র ও গ্রাফিতি বাঁধাইয়ের জন্য বিল ধরা হয় ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে আল-আমীন আর্ট গ্যালারির নামে ৯ ফেব্রুয়ারি ১০০টি বাঁধাইয়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১১ ফেব্রুারির বিলেও সমপরিমাণ ছবি বাঁধাই ও ব্যয় ধরা হয়েছে। বিস্ময়কর হলো, দুটি বিলেই মেমো নম্বর একই—২৮১। এই বিলের সূত্র ধরে গত শনিবার সকালে ৩৬ পুরানা পল্টনের ঠিকানায় যাই। মাস তিনেক আগে ওই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন হয়ে এখন সেটি ‘বিসমিল্লাহ আর্ট গ্যালারি’। তবে মালিক ও কর্মচারী একই। নাঈম নামের একজন কর্মচারীকে বিলটি দেখালে তিনি কিছুক্ষণ ভাবেন। এরপর বলেন, ‘গত দুই-তিন বছরের মধ্যে কেউ এতগুলো ছবি বাঁধাই করেছে, এমন কিছু তো মনে পড়ছে না। এ ছাড়া বিলের হাতের লেখাও এখানকার কারো না।’ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার (নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক) বলেন, অনেকে একটি বা দুটি ছবি বাঁধাই করে একটি খালি ভাউচার চেয়ে অনুরোধ করেন। সম্ভবত খালি ভাউচার নিয়ে তাঁরা নিজেরা ইচ্ছামতো লিখে নিয়েছেন। একই ঠিকানায় আরেকটি প্রতিষ্ঠান সোহেল ফ্রেম গ্যালারির নামে ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি (মেমো নম্বর-১৩৮৮) ২০ হাজার টাকার বিল। তবে ওই ঠিকানায় নেই প্রতিষ্ঠানটি। খুঁজে খুঁজে নতুন ঠিকানা—১১ নম্বর পুরানা পল্টনের ইব্রাহিম ম্যানশনের নিচতলায় ৩৩ নম্বর দোকানটিতে যাই। বিলটি দেখালে মো. সোহেল রানা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকান। এরপর হেসে উঠে বলেন, ‘ভাই, আমার হাতের লেখা এত সুন্দর!’ সোহেল রানা বলেন, এই লেখার সঙ্গে তাঁদের ম্যানেজার সাব্বির স্যারের লেখারও মিল নেই। এটি ভুয়া। ‘তারুণ্যের উৎসব’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের নামে তিনটি ভাউচার তৈরি করা হয় ‘দ্য নিউ নূর অ্যান্ড কোং ডেকোরেটরস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে। পৃথক তিনটি ভাউচারে ৬০ হাজার, ৩০ হাজার ও ২৫ হাজার টাকার বিল দেখানো হয়েছে। খাত হিসেবে লেখা—ব্যানার, ফেস্টুন, গেট, টেবিল, ফুল দিয়ে সাজসজ্জা ইত্যাদি। এটি পাওয়া গেল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সুবাস্তু তাজ ভিলার ৯ নম্বর দোকানে। কিন্তু সেখানে ব্যানার-ফেস্টুন তৈরির কোনো যন্ত্রপাতি দেখা গেল না। নেই কম্পিউটার, প্রিন্টিং মেশিন বা ডিজাইন সেটআপ। দোকানের ম্যানেজার হেলাল মিয়া পিআইবির ভাউচারটি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘প্যাড দেখে মনে হচ্ছে আমাদের, কিন্তু লেখা বা সাইনও আমাদের না।’ তিনটি ভাউচারে কাশেম ও সহিদ নামে দুই স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু দোকানের বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের তালিকা ঘেঁটেও এমন নামের কাউকে পাওয়া গেল না। দোকানের মালিক রাজিব আহমেদ বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, কাজ শেষে কেউ খালি ভাউচার চায়। বলে, অন্য খরচ সমন্বয় করবে। ব্যবসার খাতিরে দিতে হয়। হয়তো কোনো সময় ভাউচার নিয়ে পরে নিজেরা কপি করেছে। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে পিআইবির সঙ্গে আমরা কোনো কাজ করিনি।’ আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিছু ভাউচারে একই সঙ্গে লাইটিং ও ব্যানার-ফেস্টুনের কাজ দেখানো হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট দুই দোকানই স্পষ্ট জানায়, তারা ব্যানার-ফেস্টুন বানায় না। আসলটা লাল, পিআইবিরটা কালো : রাজধানীর শান্তিনগর বাজার রোড এলাকার ‘বিসমিল্লাহ রেস্তোরাঁ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে দুটি বিল করা। প্রতিটিতে ৫০০ টাকা দামের লাঞ্চ প্যাকেট ২৫০টি; মোট এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। দুই বিলে আড়াই লাখ টাকা। ভাউচারে খাবারের ধরন উল্লেখ নেই; শুধু ‘লাঞ্চ প্যাকেট’ লেখা। সরেজমিনে গিয়ে দোকানের পুরনো হিসাবপত্র খতিয়ে দেখা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ওই সময়ে তাঁরা পিআইবি থেকে এমন কোনো বড় অর্ডার পাননি। দোকানের কর্মচারীরা বলেন, বড় অনুষ্ঠানে সাধারণত চিকেন বিরিয়ানি দেওয়া হয়, যার দাম ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা। সাদা ভাত, গরুর মাংস, ডাল-সবজি নিলে সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। ৫০০ টাকার প্যাকেট আমাদের এখানে নেই। এক কর্মচারী বলেন, ‘২৫০ জনের অনুষ্ঠানে ৫০০ টাকা দরের প্যাকেট এই প্রথম শুনলাম। এখানে বসে খেলে ৫০০ টাকা হতে পারে, কিন্তু প্যাকেট হিসেবে খুবই অস্বাভাবিক।’ এই হোটেলের ব্যবহৃত একটি ভাউচার সংগ্রহ করা হয়। সেটি হালকা লাল রঙের। কিন্তু পিআইবির জমা দেওয়া ভাউচারটি সাদাকালো। দোকানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ বিল মেশিনে হয়। হাতে লিখলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট আছে। সেটার সঙ্গে পিআইবিরটার কোনো মিল নেই। সাইনও জাল।’ তাঁর মতে, ‘কোনো একসময় হয়তো খালি ভাউচার নিয়ে ফটোকপি করে তারপর নিজেরা লিখে ব্যবহার করেছে।’ কথিত দুটি সেমিনারেই সকালের নাশতার বিল দেখানো হয় হক ব্রেড অ্যান্ড কনফেকশনারির নামে। রাজধানীর শান্তিনগর চৌরাস্তায় ১২৮ নিউ কাকরাইল রোডে এই বেকারিতে গত রবিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে ম্যানেজারকে মেমো দুটি দেখালে তিনি বলেন, তাঁদের হাতের লেখা মিলছে না। এমনকি ২০০ টাকা দামের ৫০০টি প্যাকেজ গত বছর তাঁদের বিক্রি হয়েছে কি না, তাও মনে পড়ছে না। এভাবে পিআইবির তারুণ্যের উৎসব বা সেমিনারের নামে যতগুলো বিল-ভাউচার আমাদের হাতে আছে; তার রেশির ভাগই আমরা সরেজমিনে যাচাই করেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দোকানের হিসাব খাতায় পিআইবির সঙ্গে লেনদেনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পিআইবির ডিজি ফারুক ওয়াসিফ দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা দাবি করলেও কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, পিআইবির কর্মকর্তারা চারটি অনুষ্ঠানের নামে তৈরি করা বিল আগেই পরিশোধ দেখিয়ে ২০২৫ সালের জুন মাসে বিলগুলো পাস করেন। পরবর্তী সময়ে পিআইবির ‘সম্পাদক নিরীক্ষা’ নামে সোনালী ব্যাংক ভিকারুননিসা নূন স্কুল শাখা, ঢাকা থেকে চারটি চেকে ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করেন গোলাম মুর্শেদ। পিআইবির ‘সম্পাদক নিরীক্ষা’ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (১৬৩৫০০১০০০৪৬৭) থেকে ২৯ জুন দুটি এবং ৩০ জুন দুটি চেকের মাধ্যমে এই টাকা উত্তোলন করা হয়। ওই ব্যাংকের চারটি চেকে যথাক্রমে ছয় লাখ ৯১ হাজার ৫০০ টাকা, চার লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা, ছয় লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এই টাকার অঙ্ক পিআইবির বিতর্কিত চারটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে অনুমোদিত বিলে উল্লেখিত টাকার অঙ্কের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তদন্তের দাবি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে এত বড় অঙ্কের ব্যয়, ভুয়া স্বাক্ষর এবং জাল ভাউচারের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশে ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছেন নতুন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে শপথ নেয়। নতুন এই মন্ত্রিসভার সদস্য জহির উদ্দিন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। বুধবার বেলা সোয়া একটার দিকে তিনি সচিবালয়ে আসেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। নিজের রাজনৈতিক জীবনের কথা উল্লেখ করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন। তিনি বলেন, তিনি নিজেও জানেন, ভয়ভীতির মধ্যে যাঁরা বাস করেন, তাঁদের কী ধরনের মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে গণমাধ্যমের মতো এ রকম পেশায় যাঁরা কাজ করেন। তাঁদের যদি সারাক্ষণ নজরদারির মধ্যে থাকতে হয়। জহির উদ্দিন আরও বলেন, ‘সমস্যা যেহেতু আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রী (তারেক রহমান) যেহেতু তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিকল্পনা দিয়েছেন, তাহলে আমরা বাংলাদেশে একটা ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করব, ইনশা আল্লাহ।’
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান Press Institute of Bangladesh (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পিআইবি থেকে অবসর গ্রহণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের পাওনা সংক্রান্ত বিষয় ঝুলিয়ে রেখে মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং তারা অভিযোগ করছেন যে তাদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা নিষ্পত্তি না করে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা চলছে। এছাড়া অভিযোগ উঠেছে যে, প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৪ জনকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নীতিমালার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। অভিযোগের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে পিআইবির কর্মচারী ফরিদ আহমেদ-এর সঙ্গে অমানবিক আচরণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবি, তার সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এই অনিয়ম দুর্নীতি অবৈধ নিয়ম বিষয়ে কথা বলায়,মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে পিআইবির সিনিয়র পরীক্ষক পারভীন সুলতানা রাব্বিকে যড়যন্ত্র ও কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে বদলি করা হয়েছে এবং আলী হোসেনের সুনিশ্চিত কারণ ছাড়া অবসর দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান করা হয়েছে বলেও জানা যায়। এভাবে অবসরপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গেই তিনি অনুরূপ আচরণ করে থাকেন। এছাড়াও, তিনি প্রায় ৩৪ জন লোককে পিআইবিতে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন। ডিজি ফারুক ওয়াসিফ'র অপসারন দাবী: বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের অনিয়মের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে মহাপরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অনিয়ম ও লুটপাটের মহোৎসবে পরিণত করেছেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন মহলে উত্থাপিত হয়েছে। তাই দ্রুত তাকে অপসারনের দাবী জানিয়েছে সাংবাদিক সমাজ। তিনি ডিজি পদে টিকে থাকার লক্ষ্যে তিনি নানামুখী তৎপরতা ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বলেও জানা যাচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি রাখে।তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে, বিষয়টির প্রতি যাতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর খামেনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ এবং টাইমস অব ইসরায়েলসহ একাধিক গণমাধ্যমও সরকারি সূত্রের বরাতে জানায়, খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তবে, এই দাবি প্রকাশ পাওয়ার পর পরই ইরান সরকার কঠোর ভাষায় তার নেতার জীবিত থাকার দাবি করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আল-আলম জানিয়েছে, আয়াতুল্লাহ খামেনি এখনো বেঁচে আছেন এবং তিনি পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। আরও বলা হয়, তিনি দেশের সেনাবাহিনী এবং সরকারের নেতা হিসেবে দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। খামেনি বেঁচে আছেন, দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন:ইরানের গণমাধ্যমের দাবি এদিকে, এনবিসিতে সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, “ইরানের প্রায় সব কর্মকর্তা জীবিত, সুস্থ ও নিরাপদ স্থানে আছেন।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান আবারও তাদের নেতার বেঁচে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ইরানে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন বা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, তবে এখনো কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এর পাশাপাশি, ইরান সরকার তাদের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান নিয়ে প্রাথমিকভাবে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেয়নি। এ ঘটনার পর বিশ্বের নজর তেহরানে, এবং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।