বিবাহবিচ্ছেদের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?


ড. জেসান আরা: বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্পর্ক এবং সুখী পারিবারিক জীবনকে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই বাস্তবতা এখন পরিবর্তিত হচ্ছে। কয়েক বছরে বিবাহবিচ্ছেদের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন কারণে এই পরিবর্তন ঘটছে, যা আধুনিক সমাজে নতুন সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যান দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ডিএনসিসি এবং ডিএসসিসি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিনই নতুন বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে এবং এর মধ্যে নারীদের উদ্যোগে দাখিলকৃত আবেদনের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ।
গ্রামীণ এলাকায় এই হার তুলনামূলক কম হলেও ধীরে ধীরে তা বাড়ছে। শহরাঞ্চলে নারীদের উদ্যোগে বিবাহবিচ্ছেদ বেশি হচ্ছে, আর গ্রামে পুরুষদের উদ্যোগে কিছুটা বেশি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২০ সালে শুধুমাত্র একটি সিটি কর্পোরেশনে ৬,৩৪৫টি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ আবেদন করেছেন নারীরা।
২০২১ সালে এই সংখ্যা আরও ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যেখানে প্রায় ৬৫ শতাংশ আবেদনকারী ছিলেন নারী। ২০২২ সালেই ঢাকা শহরে ১৩,০০০-এর বেশি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ে। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে মোট ৭,৯১৩টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৫,৭৬৪টি স্ত্রীর আবেদনে এবং ২,১৪৯টি স্বামীর আবেদনে হয়েছে। শিক্ষিত ও কর্মজীবী দম্পতিদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিবাহবিচ্ছেদের পর ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন ঘটে তা হলো মানসিক ভাঙন। একাকীত্ব, দুঃখবোধ, উদ্বেগ ও হতাশা খুব দ্রুত বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) জানিয়েছে, সাত বছরে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন প্রায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহী বিভাগে সর্বাধিক সংখ্যক বিবাহবিচ্ছেদ লক্ষ্য করা গেছে, যা একটি জাতীয় সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ছয় বছরে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই প্রায় ৫০,০০০ আবেদন জমা হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় প্রতি ঘণ্টায় একটি করে মামলা দায়ের হয়েছে। এটি স্পষ্ট যে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সমাজে বিবাহ ভাঙনের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে বিবাহবিচ্ছেদ এখন আর কেবল শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয় বরং এটি সমগ্র দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে। অতএব, দ্রুততম সময়ে সমাজকে এই সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নিতে হবে।
বিবাহবিচ্ছেদের কারণসমূহ—
বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে, যা অনেক সময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে মিলে দাম্পত্য জীবনের ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো—
১. যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার অভাব: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আবেগ প্রকাশ, সমস্যার সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে খোলামেলা যোগাযোগ না থাকলে দাম্পত্য সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে ভুল বোঝাবুঝি ও মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে, যা বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যায়।
২. বিশ্বাসঘাতকতা ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক: দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে অনেকেরই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক দাম্পত্য জীবন ধ্বংস করে দেয় এবং মুহূর্তেই সাজানো সংসার ভেঙে ফেলে। এতে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, সন্তানের মানসিক স্থিতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. নির্যাতন ও আসক্তি (অ্যালকোহল, ড্রাগ, জুয়া ইত্যাদি): শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন অনেক নারীর জন্য বিবাহবিচ্ছেদের প্রধান কারণ। বিশেষ করে যৌতুক, আসক্তি (মাদক/জুয়া) এবং লিঙ্গ বৈষম্য পরিবারে অশান্তি বাড়ায়। আর অ্যালকোহল, ড্রাগ বা অন্য আসক্তিতে ভোগা ব্যক্তিরা প্রায়ই সম্পর্কগুলো ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। আসক্তির কারণে মেজাজের অস্থিরতা, হঠাৎ আচরণের পরিবর্তন, ঘুম ও ক্ষুধার ব্যাঘাত, দায়িত্বে অবহেলা, অর্থের অপচয়, সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দেখা যায়। সব মিলিয়ে দাম্পত্য জীবনে অসন্তোষ ও অশান্তি তৈরি হয়, যা অনেক সময় বিচ্ছেদে গিয়ে শেষ হয়।
৪. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত ব্যাধি, বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা থাকলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া কমে যায়। একজন সঙ্গীর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার যথাযথ চিকিৎসা না হলে সম্পর্ক ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। স্ট্রেস থিওরি অনুযায়ী, অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব সম্মিলিতভাবে সম্পর্ককে দুর্বল করে, যা বিবাহবিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেয়।
৫. অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক: বিবাহের পর অনেক দম্পতির মধ্যেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। একে অপরের কাছ থেকে অবাস্তব প্রত্যাশা রাখা এবং তা পূরণ না হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়। এই মানসিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘমেয়াদে বিবাহবিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেয়।
৬. ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আত্মসম্মানহানি: পরিবারে কে বেশি প্রভাবশালী হবে, এ নিয়ে অনেক সময় ক্ষমতার লড়াই চলে। একজন যদি নিজেকে অবমূল্যায়িত মনে করেন বা আত্মসম্মানহানি ঘটে, তবে সম্পর্কের ভাঙন দ্রুত ত্বরান্বিত হয়। এছাড়াও স্বামী-স্ত্রীর আয়ের বৈষম্য, বেকারত্ব অথবা আর্থিক অস্থিতিশীলতা পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ফলে অসহিষ্ণু সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী হন এবং অসন্তুষ্টিকর সম্পর্ক বজায় রাখার পরিবর্তে তারা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
৭. শৈশব অভিজ্ঞতা : ছোটবেলায় যারা নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ পাননি বা সুস্থ পারিবারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে সম্পর্ক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শৈশবের ট্রমা ও নিরাপত্তাহীনতা দাম্পত্য জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৮. সামাজিক মাধ্যম ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা: ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক তৈরি, সন্দেহ এবং ভুল বোঝাবুঝি দাম্পত্য ভাঙনের অন্যতম কারণ।
বিবাহবিচ্ছেদ কেবল একটি সামাজিক বা আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি গভীরভাবে মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক বিনিময় তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ সম্পর্ককে দেখে লাভ-ক্ষতির হিসাবে। যদি দাম্পত্য জীবনে ক্ষতি বেশি মনে হয় এবং লাভ কম হয়, তখন সম্পর্ক ভাঙনের প্রবণতা বাড়ে।
বিবাহবিচ্ছেদ একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নেতিবাচক ছাপ রেখে যায়, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্যও একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে
অ্যাটাচমেন্ট তত্ত্বে বলা হয়েছে, শৈশবে নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ না পেলে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সম্পর্ক বজায় রাখতে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে অনেক বিবাহ ভেঙে যায়। আর কগনিটিভ ডিসোন্যান্স তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে অমিল দেখা দেয়, তখন মানসিক দ্বন্দ্ব বাড়ে। দীর্ঘদিন এ দ্বন্দ্ব চললে বিচ্ছেদ ঘটে। বিবাহবিচ্ছেদ ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১. ব্যক্তির মানসিক প্রভাব: বিবাহবিচ্ছেদের পর ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন ঘটে তা হলো মানসিক ভাঙন। একাকীত্ব, দুঃখবোধ, উদ্বেগ ও হতাশা খুব দ্রুত বেড়ে যায়। আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেকেই নতুন করে সম্পর্ক গড়তে ভয় পান। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের মানসিক চাপ ডিপ্রেশন বা উদ্বেগজনিত ব্যাধির জন্ম দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আত্মঘাতী চিন্তা বা আচরণও দেখা যায়।
২. সামাজিক প্রভাব: বিবাহবিচ্ছেদ কেবল দুইজন মানুষের সম্পর্কের সমাপ্তি নয় বরং একটি সামাজিক সংকটও বটে। পরিবারের ভাঙন সমাজে আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল করে দেয়। অনেক সময় বিবাহবিচ্ছিন্ন নারী বা পুরুষ সামাজিকভাবে বৈষম্য বা কলঙ্কের শিকার হন। সমাজে তাদের অবস্থান ও মর্যাদাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যা একদিকে তাদের মানসিক কষ্ট বাড়ায়, অন্যদিকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ত্বরান্বিত করে।
৩. অর্থনৈতিক প্রভাব: বিবাহবিচ্ছেদের ফলে অনেক ক্ষেত্রে একজনকে একাই সংসার চালাতে হয়, বিশেষত যদি সন্তান থাকে। এতে আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পায়। নারীরা প্রায়ই একক অভিভাবক হিসেবে সন্তানের শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের দায়িত্ব নিতে গিয়ে দারুণ সমস্যায় পড়েন। অন্যদিকে পুরুষদেরও নতুন সংসার শুরু করতে গিয়ে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।
৪. শিশুদের উপর প্রভাব: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবাহবিচ্ছেদের ফলে শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সন্তানদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়। তারা প্রায়ই ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, হতাশা এবং বিভ্রান্তিতে ভোগে। অনেক শিশু বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের জন্য নিজেকে দোষী মনে করে, যা তাদের মানসিক বিকাশে বাঁধা দেয়। শিক্ষাজীবনে মনোযোগের অভাব, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে তারা সুস্থ সম্পর্ক গড়তে সংকটে পড়ে।
৫. বৃহত্তর সামাজিক ও প্রজন্মগত প্রভাব: বিবাহবিচ্ছেদের প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ নয় বরং সমাজ ও প্রজন্মের ওপরও পড়ে। ভাঙা পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা ভবিষ্যতে দাম্পত্য সম্পর্ক গড়তে অসুবিধা অনুভব করে। সমাজে অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি এবং শিক্ষাগত ব্যর্থতার হার বৃদ্ধি পেতে পারে।
এক কথায়, বিবাহবিচ্ছেদ একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নেতিবাচক ছাপ রেখে যায়, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্যও একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এতে হতাশা, একাকীত্ব, উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধের হ্রাস, এমনকি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অনুভূতি তৈরি হয়। তাই এ সময়ে মানসিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। নিচে কয়েকটি কার্যকর কৌশল তুলে ধরা হলো—
১. আবেগ স্বীকার ও প্রকাশ: অনেক সময় মানুষ নিজের আবেগ দমন করে রাখে, যা মানসিক চাপ বাড়ায়। তাই কষ্ট, রাগ বা দুঃখকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে তা প্রকাশ করা মানসিক ভার কমাতে সহায়ক।
২. ইতিবাচক চিন্তা গড়ে তোলা: বিবাহবিচ্ছেদের পর অনেকেই নেতিবাচক চিন্তায় ভোগেন। “আমার জীবন শেষ”, “আমি আর কিছুই করতে পারবো না” এমন চিন্তা মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই নেতিবাচক চিন্তার বদলে নতুন সম্ভাবনা ও লক্ষ্য নিয়ে ভাবা জরুরি।
৩. আত্মযত্ন (Self-care): শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মেডিটেশন বা যোগাভ্যাস মানসিক শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
৪. সামাজিক সমর্থন ব্যবহার: মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন অপরিহার্য। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক উৎসাহ গ্রহণ করা মানসিক স্থিতিশীলতা আনে।
৫. বিয়ে-পূর্ব কাউন্সিলিং: দম্পতিদের মধ্যে প্রত্যাশা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করলে ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব কমতে পারে।
৬. নতুন লক্ষ্য ও পরিচয় গঠন: বিবাহবিচ্ছেদের পর নতুন জীবনধারা গড়ে তোলা প্রয়োজন। নতুন শখ, শিক্ষা বা ক্যারিয়ারের প্রতি মনোযোগ দেওয়া মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
৭. দাম্পত্য কাউন্সিলিং: যোগ্য মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সিলরের মাধ্যমে যোগাযোগ, সহমর্মিতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শেখানো যায়।
৮. স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম: অর্থনৈতিক বা পারিবারিক চাপ সামাল দিতে রাগ নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন।
৯. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহ ও পরিবার রক্ষার গুরুত্ব প্রচার করা দরকার।
১০. সন্তানদের জন্য কাউন্সিলিং: বিবাহবিচ্ছেদের পর শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষায়িত কাউন্সিলিং ও থেরাপি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ এখন এক বাস্তবতা, যা শুধু ব্যক্তিগত নয় বরং সামাজিক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপ, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব, পারিবারিক সহিংসতা ও সম্পর্কের অসঙ্গতি এই সমস্যার মূল কারণ।
মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন সম্পর্ক থেকে সন্তুষ্টি পায় না এবং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগে, তখন বিচ্ছেদ ঘটে। তবে সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, দাম্পত্য কাউন্সিলিং এবং সামাজিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করলে বিবাহবিচ্ছেদের হার হ্রাস করা সম্ভব। পাশাপাশি সরকার, এনজিও এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বিবাহবিচ্ছেদ শুধু দুই ব্যক্তির সম্পর্ক ভাঙন নয়; এটি একটি পারিবারিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। মনস্তাত্ত্বিক সমাধানের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ককে শক্তিশালী করে সমাজে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব।
ড. জেসান আরা, সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায় ।