ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এলজিইডি)-এর এক উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাস্তা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি এবং বিল উত্তোলনে অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় রয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ—সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ।
তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগগুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. ঘুষ ও বিল বাণিজ্য
ঘুষের হার: অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি টাকা ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। ঠিকাদারদের কাছ থেকে ওয়ার্ক অর্ডারে ৩-৫%, বিল পাসে ৫-৭% এবং জামানত ফেরত দিতে ৩-১৫% পর্যন্ত কমিশন বা ঘুষ দাবি করেন বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে ।
বকেয়া বিল: টাকা না দেওয়ায় অনেক ঠিকাদারের বিল আটকে রাখা এবং জামানতের টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
২. উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা ও ভোগান্তি
অর্ধসমাপ্ত প্রকল্প: উপজেলায় এলজিইডির অধীনে বাস্তবায়নাধীন একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প (যেমন- রাস্তা ও সেতু) দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে । কাজ শুরু করে মাঝপথে ফেলে রাখা বা ড্রেন ও অ্যাপ্রোচ রোড তৈরি না করার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
অনিয়ম: নিম্নমানের কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার পেছনে তার গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে ।
৩. প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিযোগ
কর্মস্থলে অনুপস্থিতি: তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকেন না এবং দিনের অধিকাংশ সময় ঝালকাঠি জেলা শহরে কাটান বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায়ই দুপুর ১২টার আগে তাকে অফিসে পাওয়া যায় না ।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা: স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি এখনো বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাদের পরামর্শে কাজ পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি একটি খাল খনন কমিটি গঠনে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়ায় এলাকায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে । এই সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দারা তার বিরুদ্ধে মানববন্ধনও করেছেন বলে জানা গেছে ।
রাজাপুর উপজেলার এলজিইডি প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. দুদকের গণশুনানিতে অভিযোগ
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক গণশুনানিতে আব্দুল হাকিম নামে এক ব্যক্তি অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগের মূল বিষয় ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে দীর্ঘসূত্রতা ও বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়া ।
২. ৪ কোটি টাকার ঝুলে থাকা প্রকল্প
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজাপুর মডেল মসজিদ থেকে মঠবাড়ীয়া ইউপি অফিস হয়ে নাপিতের হাট পর্যন্ত ৩১ মিটারের দুটি আরসিসি গার্ডার ব্রিজের জন্য ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার ১৬৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় । গণশুনানিতে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী:
বরাদ্দ দেওয়ার দেড় বছর পার হলেও প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়নি ।
এলাকার আরও একাধিক উন্নয়ন কাজ এভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ।
৩. অনিয়ম ও হয়রানির মাত্রা
প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয় অভিযোগ থেকে প্রাপ্ত আরও কিছু তথ্য:
হয়রানি: ঠিকাদারদের অভিযোগ, বিল বা জামানতের টাকার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং কমিশন না দিলে নানা অজুহাতে ফাইলে ত্রুটি ধরা হয় ।
আচরণগত সমস্যা: অনেক সময় সেবাগ্রহীতা বা ঠিকাদারদের সঙ্গে তিনি খারাপ আচরণ করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে তাকে পাওয়া যায় না বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন ।
উল্লেখ্য যে, সারাদেশে এলজিইডির বিভিন্ন দপ্তরে দুদকের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে রাজাপুর এলজিইডি অফিসের কার্যক্রমও নজরদারিতে রয়েছে ।
রাজাপুর উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী তার অফিস করার চিত্রটি নিম্নরূপ:
দেরিতে উপস্থিতি: অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি অধিকাংশ দিন বেলা ১২টার আগে অফিসে উপস্থিত হন না ।
কর্মস্থলে রাত্রিযাপন না করা: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মস্থলে থাকার কথা থাকলেও, তিনি নিয়মিত সেখানে থাকেন না। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি ঝালকাঠি জেলা শহরে কাটান বলে জানা গেছে ।
জনসাধারণের ভোগান্তি: তিনি নিয়মিত অফিসে না থাকায় এবং সময়মতো তাকে না পাওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ঠিকাদারদের বিভিন্ন জরুরি কাজের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং তারা হয়রানির শিকার হন ।
অফিস চলাকালীন অনুপস্থিতি: স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে তাকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেন না অথবা অফিস ছুটির আগেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন ।এই অনিয়মিত উপস্থিতির প্রতিবাদে এবং তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয়রা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেছেন ।
রাজাপুর উপজেলার এলজিইডি প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও, এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (যেমন বরখাস্ত বা স্থায়ী অপসারণ) নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে তার বিরুদ্ধে কিছু প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে:
দুদকের তদন্ত: ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক গণশুনানিতে তার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ উত্থাপন করা হয় । দুদক বর্তমানে এসব অভিযোগ তদন্ত করছে। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, গণশুনানিতে তাকে ডাকা হয়েছিল।
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারি: এলজিইডির সদর দপ্তর এবং বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় থেকে তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ ও বিল বাণিজ্যের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার মতো প্রাথমিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায় ।
বদলির সম্ভাবনা: তার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ এবং মানববন্ধন হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিকভাবে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ বা বদলি করার একটি গুঞ্জন বা প্রক্রিয়া জেলা পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে, যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত অফিস আদেশ প্রকাশিত হয়নি ।
বর্তমানে তিনি তার দায়িত্ব পালন করছেন, তবে ৪ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের উন্নয়ন প্রকল্পে স্থবিরতা এবং ঘুষের অভিযোগের কারণে তিনি চাপের মুখে রয়েছেন ।
মানববন্ধনের সংবাদ: গত বছর রাজাপুর উপজেলা সদরে স্থানীয় ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষ তার অপসারণ এবং দুর্নীতির বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেন। এই সংবাদটি বেশ কিছু অনলাইন পোর্টালে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল।
ভিডিও প্রতিবেদন: স্থানীয় সংবাদকর্মীরা মানববন্ধনের সময় তার বিরুদ্ধে ওঠা নির্দিষ্ট অভিযোগগুলো (যেমন- ৫% থেকে ১৫% কমিশন বাণিজ্য) নিয়ে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছিলেন ।
অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বহাল তবিয়তে থাকার পেছনে বেশ কিছু প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকার কথা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও জনগণের আলোচনায় উঠে এসেছে:
১. বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব: স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্যের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ আছে যে, তিনি এখনো সেই রাজনৈতিক বলয়ের পরামর্শ এবং আশীর্বাদ নিয়ে কাজ করছেন ।
২. ঊর্ধ্বতন মহলের যোগসাজশ: ঠিকাদারদের দাবি, তিনি যে ঘুষ ও কমিশনের টাকা আদায় করেন, তার একটি বড় অংশ এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই "কমিশন চেইন" বা সিন্ডিকেটের কারণেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করা হয় বলে মনে করা হয় ।
৩. প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র: তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও আইনি জটিলতা বা আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির সুযোগ নিয়ে তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ লোপাট করার মতো প্রশাসনিক শক্তিও তিনি ব্যবহার করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
৪. ঠিকাদার সিন্ডিকেট: উপজেলার কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদারের সাথে তার ব্যবসায়িক গোপন আঁতাত রয়েছে। এই সিন্ডিকেটটি নিজেদের স্বার্থেই তাকে ওই পদে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
সারসংক্ষেপে, রাজনৈতিক মদত এবং দাপ্তরিক দুর্নীতির সিন্ডিকেটই তার প্রধান শক্তির উৎস বা "জোড়" হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করা হয়।
রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযোগের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপডেট তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. দুদকের গণশুনানি ও প্রাথমিক পদক্ষেপ (অক্টোবর ২০২৫)
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত দুদকের ১৮৬তম গণশুনানিতে অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয় ।
অভিযোগের ধরণ: ৪ কোটি টাকার বেশি মূল্যের ব্রিজের কাজ দেড় বছরেও শুরু না করা, রাস্তা নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৫% থেকে ১৫% পর্যন্ত কমিশন দাবির বিষয়গুলো শুনানিতে উঠে আসে ।
তাৎক্ষণিক নির্দেশনা: শুনানিতে উপস্থিত দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবর আজিজী অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেন ।
২. এলজিইডিতে দুদকের বিশেষ অভিযান (এপ্রিল ২০২৫)
এর আগে ২০২৫ সালে অভিযান চালায় দুদক এই অভিযানের অংশ হিসেবে রাজাপুর এলজিইডি অফিসের বিভিন্ন প্রকল্পের নথিপত্র এবং ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হয়।
সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে যা বর্তমানে দুদকের কেন্দ্রীয় ল্যাবে বিশ্লেষণাধীন রয়েছে ।
৩. বর্তমান অবস্থা (মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত)
বর্তমানে অভিযোগগুলো অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী:
স্থবিরতা: ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের ফলে কমিশনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছুটা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে বড় ধরনের আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে ।
তদন্ত কার্যক্রম: তবে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (পিরোজপুর) থেকে নিয়মিত রুটিন তদন্ত ও তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে ।
ব্যক্তিগত জবাবদিহি: দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, গণশুনানিতে উপস্থাপিত অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে অভিজিৎ মজুমদারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব করা হয়েছে ।
দুদকের বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতির কারণে আনুষ্ঠানিক মামলার জন্য আরও কিছু সময় লাগতে পারে।
রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে অভিজিৎ মজুমদারের যোগদানের সুনির্দিষ্ট তারিখ দাপ্তরিক নথিতে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, বিভিন্ন সংবাদ এবং প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি প্রায় ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে (২০২২ সাল থেকে বর্তমান ২০২৬ পর্যন্ত) রাজাপুরে কর্মরত আছেন।
তার কর্মকাল নিয়ে প্রাপ্ত কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
২০২২ সাল থেকে অবস্থান: ঝালকাঠি জেলা এলজিইডির বিভিন্ন দাপ্তরিক সভায় ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকেই তার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকল্প: তার সময়েই ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বড় বড় প্রকল্পগুলো (যেমন- ৪ কোটি টাকার আরসিসি ব্রিজ) অনুমোদিত ও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে ।
বর্তমান সময়: তিনি এখনো (মার্চ ২০২৬) রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ।
সাধারণত উপজেলা পর্যায়ে একজন প্রকৌশলীর মেয়াদকাল ৩ বছর হয়ে থাকে, যা তিনি ইতিপূর্বেই পূর্ণ করেছেন। তার এই দীর্ঘ অবস্থানের কারণেই স্থানীয় ঠিকাদার ও জনগণের মধ্যে তার "প্রভাব" নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে যে প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুতর হলো বিআরবি (BRB) প্রকল্পের আওতাধীন উন্নয়ন কাজসমূহ। নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্প (সবচেয়ে আলোচিত)
প্রকল্পের স্থান: রাজাপুর মডেল মসজিদ থেকে মঠবাড়ীয়া ইউপি অফিস হয়ে নাপিতের হাট পর্যন্ত ৩১ মিটারের দুটি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ।
বরাদ্দের পরিমাণ: ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার ১৬৪ টাকা ।
অভিযোগ: ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই প্রকল্পটি অনুমোদনের দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। দুদকের গণশুনানিতে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ও বাস্তবায়নে চরম গাফিলতি এবং যোগসাজশ রয়েছে ।
২. রাস্তা ও কালভার্ট সংস্কার কাজ
অভিযোগ: উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ রাস্তা এবং ছোট কালভার্ট মেরামতের কাজে নিম্নমানের খোয়া, পাথর এবং বালু ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে তিনি কমিশন নিয়েছেন [১.৫.১]।
নির্দিষ্ট এলাকা: উপজেলার মঠবাড়ীয়া এবং বড়ইয়া ইউনিয়নের বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ রাস্তা সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ স্থানীয়রা তুলেছেন ।
৩. খাল খনন ও ড্রেনেজ প্রকল্প
অভিযোগ: সম্প্রতি রাজাপুরে একটি খাল খনন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার প্রকল্পের কমিটি গঠনে এবং কার্যাদেশে তিনি ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি অর্থের বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয় ।
৪. জামানত ও বিল অবমুক্তি
প্রক্রিয়াগত দুর্নীতি: কোনো সুনির্দিষ্ট একটি প্রকল্প নয়, বরং উপজেলার প্রায় প্রতিটি শেষ হওয়া প্রকল্পের ঠিকাদারদের জামানত (Security Deposit) ফেরত দেওয়ার সময় তিনি ৩% থেকে ১৫% পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে বিল আটকে রাখা বা নথিতে ত্রুটি দেখানোর অভিযোগও সুনির্দিষ্টভাবে সংবাদে এসেছে ।
বর্তমানে দুদক এই ৪ কোটি টাকার ব্রিজ প্রকল্প এবং অন্যান্য ছোট প্রকল্পের নথিপত্র তলব করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে ।
রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে আলোচিত প্রকল্পগুলোর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম এবং তদন্তের বর্তমান পর্যায় সম্পর্কে আপডেট তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য
অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে ওঠা ৪ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ব্রিজ প্রকল্পসহ (মডেল মসজিদ থেকে নাপিতের হাট পর্যন্ত) অন্যান্য কাজে বেশ কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচনায় এসেছে:
চয়ন অ্যাসোসিয়েটস: এই প্রতিষ্ঠানের মালিক আহলান সুমন তালুকদার-এর বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্র জমা দিয়ে দরপত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এটি সরাসরি রাজাপুরের এই নির্দিষ্ট ব্রিজের কাজ কিনা তা নিয়ে তদন্ত চলছে, তবে এলজিইডির বিভিন্ন বড় প্রকল্পে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে ।
স্থানীয় সিন্ডিকেট: সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজাপুরের অনেক কাজ স্থানীয় একটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে, যাদের সাথে প্রকৌশলীর বিশেষ সখ্যতা রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু না করে অর্থ লোপাট বা বিল তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে ।
২. তদন্তের বর্তমান পর্যায় (মার্চ ২০২৬ আপডেট)
প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে তদন্ত বর্তমানে কয়েকটি স্তরে চলমান:
দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান: ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত গণশুনানির পর দুদক তার বিরুদ্ধে একটি বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত (Special Inquiry) শুরু করেছে ।
নথিপত্র যাচাই: দুদকের পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে রাজাপুর এলজিইডি অফিসের নথিপত্র এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ৪ কোটি টাকার গার্ডার ব্রিজ প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং কাজ শুরু না হওয়ার কারণগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা: ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এলজিইডির নতুন প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের পর, সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত সেলকেও (Vigilance Cell) রাজাপুরের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।
বর্তমান অবস্থা: ২০২৬ সালের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন (Under Investigation) পর্যায়ে আছে। দুদক সূত্র জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড সংগ্রহের কাজ চলছে, যা শেষ হলে চার্জশিট বা মামলা দায়েরের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে ।
প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনি ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের বর্তমান অবস্থা নিম্নরূপ:
১. দুদকের আইনি প্রক্রিয়া
অনুসন্ধান শুরু: ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত দুদকের গণশুনানির পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান (Inquiry) শুরু হয়েছে ।
জিজ্ঞাসাবাদ: দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবে তাকে নথিপত্রসহ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে । বর্তমানে তার অর্জিত অবৈধ সম্পদের কোনো উৎস আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২. বিভাগীয় তদন্ত ও শোকজ
প্রাথমিক প্রতিবেদন: এলজিইডির বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় থেকে তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষের অভিযোগ ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে একটি প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে ।
শোকজ (Show Cause): নির্ভরযোগ্য সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কাজ শুরু না করা এবং আর্থিক অনিয়মের ব্যাখ্যা চেয়ে তাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করা হয়েছে।
৩. প্রশাসনিক অবস্থা
ওএসডি বা বদলির প্রস্তাব: তার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন ও তীব্র গণঅসন্তোষের কারণে তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি প্রশাসনিক সুপারিশ জেলা পর্যায় থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে । তবে ২০২৬ সালের মার্চের শুরু পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ওই পদেই বহাল আছেন বলে জানা গেছে।
কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। তাদের দাবি, কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই কাজ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়।
একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“টেন্ডার জমা দিলেও অনেক সময় কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে কে কাজ পাবে।”
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার টাকা ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না।
অভিযোগ অনুযায়ী কমিশনের হার:
ওয়ার্ক অর্ডারে ৩% থেকে ৫%
বিল পাসে ৫% থেকে ৭%
জামানত ফেরতের ক্ষেত্রে ৩% থেকে ১৫%
ঠিকাদারদের অভিযোগ, এসব কমিশন না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে বিল আটকে রাখা হয় বা নথিতে ত্রুটি দেখানো হয়।
একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, অনেক প্রকল্পের বিল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছে।
অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি:
তিনি অনেক দিন বেলা ১২টার আগে অফিসে আসেন না
অনেক সময় অফিস শেষ হওয়ার আগেই চলে যান
জরুরি প্রয়োজনে ফোন করলে অনেক সময় রিসিভ করেন না
অভিযোগ রয়েছে যে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মস্থলে থাকার কথা থাকলেও তিনি বেশিরভাগ সময় ঝালকাঠি জেলা শহরে অবস্থান করেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিল বা জামানতের টাকা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
কমিশন না দিলে:
বিল আটকে রাখা
নথিতে ত্রুটি দেখানো
অতিরিক্ত যাচাইয়ের নামে বিলম্ব করা
এসব কারণে অনেক ঠিকাদার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন।
অভিজিৎ মজুমদারের অপসারণের দাবিতে রাজাপুর উপজেলা সদরে স্থানীয় ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষ মানববন্ধন করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন:
উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম বন্ধ করতে হবে
প্রকৌশলীকে দ্রুত অপসারণ করতে হবে
দুর্নীতির তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে
এই কর্মসূচির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৫ সালে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম তদন্তে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন।
এর অংশ হিসেবে:
রাজাপুর এলজিইডি অফিসের নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়
প্রকল্পের ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে
বর্তমানে অভিযোগগুলো অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে।
বিভাগীয় তদন্ত
এদিকে এলজিইডির বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় থেকেও একটি প্রাথমিক তদন্ত করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে:
প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়িমসি
কর্মস্থলে অনুপস্থিতি
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
এর ভিত্তিতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বদলির আলোচনা
স্থানীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ এবং মানববন্ধনের পর প্রশাসনিকভাবে তাকে অন্যত্র বদলি করার প্রস্তাব জেলা পর্যায় থেকে পাঠানো হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
তবে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তিনি রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার বলেন,
“আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। সব প্রকল্প সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তদন্তে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে।”
দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর আর্থিক লেনদেন ও প্রকল্পের নথিপত্র বিশ্লেষণ শেষ হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রয়োজনে:
মামলা দায়ের
বিভাগীয় ব্যবস্থা
সম্পদের হিসাব যাচাই
এসব পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
স্থানীয় সরকার খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি:
বর্তমানে তিনি দুদকের নজরদারিতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি আমলাতান্ত্রিক স্তরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশেষ করে ৪ কোটি টাকার ব্রিজ প্রকল্পের গড়িমসির বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় বড় শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে ।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পিরোজপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-এর বিরুদ্ধে কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার বিল অনুমোদন, ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন, ঘুষ-বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক আদেশ উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় একই পদে বহাল থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের কারণে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও তিনি এখনও আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন। একই সঙ্গে পুনর্বহালের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে। যোগদানের পরই অভিযোগের সূত্রপাত অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ জুন রঞ্জিত দে পিরোজপুরে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং তার পূর্বসূরি আব্দুস সাত্তারের সময়কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড় করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, এসব বিলের একটি বড় অংশ বাস্তব কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। প্রধান প্রকৌশলী, মন্ত্রণালয় ও দুদকে লিখিত অভিযোগ মঠবাড়িয়া উপজেলার শিংগা গ্রামের বাসিন্দা হরিদাশ হাওলাদার শিপন রঞ্জিত দে'র বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী— ৬ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলীর কাছে, ২৬ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিবের কাছে, এবং ৫ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না হলেও পছন্দের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় শত কোটি টাকার বিল প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ইফতি ইটিসিএল নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই ৮৯ কোটি টাকা বিল দেওয়ার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়। বদলির আদেশ, স্থগিতাদেশ এবং পুনর্বহাল নিয়ে প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৪ নভেম্বর রঞ্জিত দে-কে কুড়িগ্রামে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। তবে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই, ২৮ নভেম্বর তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই আদেশ স্থগিত করাতে সক্ষম হন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ৪ ফেব্রুয়ারি পুনরায় তার বদলির নির্দেশ জারি হলেও তিনি দীর্ঘ সময় স্বপদে বহাল ছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলজিইডির ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সাময়িক বরখাস্তের পর নিঃশব্দে পিরোজপুর ত্যাগ একাধিক সূত্র জানায়, দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে পৌঁছানোর পর রঞ্জিত দে-কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তের পর তিনি অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই রাতের আঁধারে পিরোজপুর ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পিরোজপুর ছাড়ার পর রঞ্জিত দে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করেছিলেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। পরে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে এসে নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে দলটির কয়েকজন নেতার মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুনর্বহালের চেষ্টার অভিযোগ বর্তমানে রঞ্জিত দে ঢাকায় এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পুনর্বহালের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ পিরোজপুরের একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, রঞ্জিত দে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ বণ্টন করতেন। স্থানীয় ঠিকাদার মো. মামুন মিয়া বলেন, "নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। বদলির আদেশ হলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে তিনি বহাল ছিলেন। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।" পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ঠিকাদার বলেন, "তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ না করলেও শত কোটি টাকার বিল পেয়েছে। আমার বৈধ বিলও দীর্ঘদিন আটকে ছিল। প্রকাশ্যে কিছু বললে সমস্যা হতে পারে।" ১২২ কোটি টাকার বিলের অভিযোগ আরেকটি সূত্রের দাবি, নেছারাবাদ উপজেলার ঠিকাদার শফিক সুমন-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো কাজ সম্পন্ন না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১২২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ বলেন, "কাজ না হলেও ঠিকাদার টাকা পেয়েছেন—এমন অভিযোগ আমরা শুনছি। এসব প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।" স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধ করা যায়। বক্তব্য পাওয়া যায়নি এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রঞ্জিত দে'র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : চট্টগ্রামের সাবেক আরসি ফুড (বর্তমানে যিনি রাজশাহীর আরসি ফুড) এস. এম. কায়ছার আলীকে খুঁজছেন খাদ্য কর্মকর্তারা। গত মার্চ মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম থেকে রিলিজ হওয়ার প্রাক্কালে তড়িঘড়ি করে তিন দিনে ১৪ জন খাদ্য কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন পদায়ন করেন এস. এম. কায়ছার আলী। এদের প্রায় প্রত্যেকের কাছ থেকেই পদায়নের গুরুত্ব অনুযায়ী ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা করে অগ্রিম ঘুষ নেন তিনি। এরপর বদলির আদেশ জারি করেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী নিজের বদলির আদেশ জারির পর কোনো কর্মকর্তা অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ রকমের বদলির আদেশ জারি করতে পারেন না। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলির ব্যাপারে তখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে সবুজ সংকেত ছিল না। এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বেপরোয়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এস. এম. কায়ছার আলী বদলিগুলো করেন। বিনিময়ে হাতিয়ে নেন মোট প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুষ। কিন্তু আরসি ফুড (আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক) কায়ছার আলীর এ অপকর্মের খবর ফাঁস হয়ে গেলে মন্ত্রণালয় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়। অবৈধ এ বদলির আদেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব নির্দেশ দেন। মন্ত্রণালয়ের চাপে পড়ে বদলির আদেশগুলো বাতিল করতে বাধ্য হন এস. এম. কায়ছার আলী। পরবর্তী কর্মস্থল খুলনায় যোগ দেন তিনি। তবে চট্টগ্রামের খাদ্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া ঘুষের টাকাগুলো আর ফেরত দেননি। এই খাদ্য কর্মকর্তাদের ‘আশ^াস’ দেন, শিগগিরই আবার চট্টগ্রামে ফিরে আসছেন। যদিও খাদ্য কর্মকর্তারা বুঝতে পারছিলেন এটা অসম্ভব। কিন্তু এটাও ভাবছিলেন, দুর্নীতিবাজ কায়ছার আলীর পক্ষে সবই সম্ভব। কায়ছার আলী ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ আমলে এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এ রকমের অনেক অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন। এদিকে গত সপ্তায় কায়ছার আলী খুলনা থেকে রাজশাহীর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা পদে পদায়ন নিয়ে চলে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের খাদ্য কর্মকর্তারা এস. এম. কায়ছার আলীকে খুঁজছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তার কাছ থেকে ঘুষের টাকাগুলো ফেরত চাচ্ছেন। তবে প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না, যেহেতু ঘুষের বিষয়। তাছাড়া, দুর্নীতিবাজ কায়ছার আলীর হাত অনেক লম্বা- যে কোনো সময়, যে কারো ক্ষতি করতে পারেন তিনি। চট্টগ্রাম থেকে অবমুক্তির আগে তড়িঘড়ি যেভাবে দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেন চলতি বছরের মার্চ মাসে এস. এম. কায়ছার আলীকে চট্টগ্রামের আরসি ফুড (আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক) থেকে খুলনার আরসি ফুড পদে বদলি করা হয়। ১৫ মার্চ এই বদলির আদেশ জারি হয়। কিন্তু তিনি খুলনায় যেতে চাননি, যেহেতু সেখানে অবৈধ আয়ের সুযোগ কম। ব্যাপক দেনদরবার করছিলেন, বড় অংকের ঘুষ নিয়েও ঘুরছিলেন। এর আগেও গত বছরের আগস্টে এক দফায় তাকে চট্টগ্রামের আরসি ফুড থেকে খুলনার আরসি ফুড পদে বদলি করা হয়েছিল। তবে এক দিনের মাথায় সেই বদলির আদেশ বাতিল করিয়েছেন। বিনিময়ে তৎকালীন উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার এবং সচিব মাসুদুল হাসানকে দুই কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন। এস. এম. কায়ছার আলীর চট্টগ্রামের আরসি ফুড পদে পদায়ন হয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চে। ২০২৫ সালের মার্চে দুই বছর পূর্ণ হয় অর্থাৎ নীতিমালা অনুযায়ী নতুন পদায়নের সময় আসে। কিন্তু তখনকার উপদেষ্টা ও সচিবকে ম্যানেজ করে চট্টগ্রামেই থাকার ব্যবস্থা করেন তিনি। বিশেষ প্রয়োজনে কোনো কর্মকর্তাকে আরও এক বছর অতিরিক্ত অর্থাৎ তিন বছর পর্যন্ত একই পদায়নে রাখা যায়। নীতিমালার এই সুযোগটি কায়ছার আলীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। তবে নিম্নমানের ও পঁচাচাল গুদামজাতকরণ-সহ নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর আগস্টে তাকে খুলনায় বদলি করতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। ওই সময় চট্টগ্রামের অধীনস্থ খাদ্য কর্মকর্তাদের ওপর ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি, ঘুষ বাণিজ্য ছাড়াও বদলি বাণিজের মাধ্যমে তড়িঘড়ি বড় অংকের টাকা যোগাড় করেন তিনি। ঢাকায় এসে উপদেষ্টা ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাত করে বদলির আদেশ বাতিলের ব্যবস্থা করেন। বদলির আদেশ জারি হয়েছিল ১৭ আগস্ট, ২০২৫ এবং পরদিনই তা বাতিল করা হয়। সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজ ডটকমে তখন এ নিয়ে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী যেহেতু অতিরিক্ত এক বছর থাকার মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের মার্চ মাসে। তাই এই সময় পর চট্টগ্রামে পদায়নে থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। সেই হিসেবে গত ১৫ মার্চ, ২০২৬ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এস. এম. কায়ছার আলীকে খুলনার আরসি ফুড পদে বদলি করা হয়। কিন্তু কায়ছার আলী খুলনায় যাবেন না। বড় অংকের ঘুষ নিয়ে তিনি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মহলে আবারও তদবির শুরু করেন। আগেরবার খুলনায় বদলি ঠেকিয়েছেন, এবারও ঠেকাবেন- এমন ঘোষণা দেন নিজ দপ্তরে বসে। তবে অনেক চেষ্টা করেও এবার আর বদলি ঠেকাতে পারেননি। মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব জানিয়ে দেন, বদলিস্থলে যেতেই হবে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শেষ মুহূর্তে বেপরোয়া হয়ে উঠেন কায়ছার আলী। ৩১ মার্চ, ২০২৬ ছিল চট্টগ্রাম থেকে রিলিজ (অবমুক্ত) হওয়ার দিন। চলেই যেহেতু যেতে হবে, তাই রিলিজের আগ মুহূর্তে নেমে পড়েন বেপরোয়া বদলি ও ঘুষ বাণিজ্যে। ২৮ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত এই তিন দিনে মোট ১৪টি স্মারকে ১৪ জন খাদ্য কর্মকর্তাকে ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) পদে নতুন পদায়ন দেন। ২৮ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ২৮৬ (ম), ২৮৮ (ম), ২৮৯ (ম), ২৯০(ম), ২৯১(ম) নং স্মারকে, ২৯ মার্চ ২৯৩(ম), ২৯৪ (ম), ২৯৫(ম), ২৯৬(ম), ২৯৭(ম) নং স্মারকে এবং ৩০ মার্চ ৩১৫(ম), ৩১৬ (ম), ৩১৭(ম), ৩১৮ (ম) নং স্মারকে বদলির আদেশগুলো জারি করেন তিনি। এই পদায়নগুলোর বিনিময়ে হাতিয়ে নেন প্রায় দুই কোটি টাকা। অগ্রিম টাকা আদায়ের পরই আদেশ জারি করা হয়। এসব ঘুষের টাকা লেনদেন হয় চট্টগ্রামস্থ আরসি ফুড অফিসে বসেই। এ সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে তার অফিসের টেবিলে একটি পিস্তলও দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। উক্ত ১৪ জনের বাইরে আরও বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে তিনি অগ্রিম ঘুষের টাকা নিয়েছেন। পরের দিন অর্থাৎ শেষ কর্মদিবসে পেছনের তারিখ দিয়ে এদের পদায়নের আদেশ জারি করার কথা ছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সচিবের নির্দেশের কারণে তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। বরং যেসব বদলির আদেশ জারি করেছেন তিনি ২৮, ২৯ এবং ৩০ মার্চ- ওই অবৈধ আদেশগুলো বাতিলের নির্দেশ দেন সচিব। ৩০ মার্চ রাতেই এস. এম কায়ছার আলী বাধ্য হন সবগুলো বদলির আদেশ বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করতে। তখনকার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস. এম. কায়ছার আলী স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “অত্র দপ্তরের ২৮/০৩/২০২৬ তারিখের ২৮৬ (ম), ২৮৮ (ম), ২৮৯ (ম), ২৯০(ম), ২৯১(ম) নং স্মারকে, ২৯/০৩/২০২৬ তারিখের ২৯৩(ম), ২৯৪ (ম), ২৯৫(ম), ২৯৬(ম), ২৯৭(ম) নং স্মারকে এবং ৩০/০৩/২০২৬ তারিখের ৩১৫(ম), ৩১৬ (ম), ৩১৭(ম), ৩১৮ (ম) নং স্মারকে জারীকৃত প্রজ্ঞাপন এতদ্বারা বাতিল করা হলো। এ আদেশ জনস্বার্থে জারী করা হলো।” প্রজ্ঞাপনের তারিখ ছিল ৩০ মার্চ, ২০২৬। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলেও ছিলেন ক্ষমতার শীর্ষে ফ্যাসিস্ট-লুটেরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এস. এম. কায়ছার আলী ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাবান। আলোচিত ক্ষমতাবান খাদ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। দুর্নীতিবাজ আওয়ামী মন্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে যখন যেটা ইচ্ছে করেছেন সেটিই হয়েছে, অনিয়মের মধ্যে হলেও। বদলি-পদায়নের নীতিমালায় অতিরিক্ত এক বছরসহ সর্বোচ্চ তিন বছর একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ আছে। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এস. এম. কায়ছার আলী কুমিল্লা ডিসি ফুড-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে একনাগাড়ে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন, যারমাধ্যমে অতীতের অনিয়মের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। তাঁর টার্গেট ছিল কুমিল্লার ডিসি ফুড থেকে সরাসরি চট্টগ্রামের আরসি ফুড হওয়া, যদিও তার জন্য এটা বৈধ নয়। প্রথমত, কায়ছার আলীর বাড়ি চট্টগ্রাম শহরে। দ্বিতীয়ত, আরসি ফুড পদে প্রথম পদায়ন হয়ে থাকে সাধারণত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে। কায়ছার আলীর ক্ষেত্রে এ নিয়মগুলোর তোয়াক্কা করা হয়নি। তাঁর চাহিদা অনুযায়ীই পদায়ন করা হয়েছে। এখনও ক্ষমতাবান! অবাক ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী এবং ক্ষমতাবান কর্মকর্তা কায়ছার আলী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন টাকার জোরে, এ মুহূর্তে আবার নতুন করে তার ক্ষমতার নজির সৃষ্টি হয়েছে রাজশাহীর আরসি ফুড পদে পদায়ন বাগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। কম গুরুত্বপূর্ণ খুলনা বিভাগে যোগদানের মাত্র দুই মাসের মাথায় রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের আরসি ফুড পদ বাগিয়ে নিলেন। অবশ্য: এরজন্য তাকে নগদ দুই কোটি টাকা ঘুষ পরিশোধ করতে হয়েছে বলে চাউর আছে। যদিও কায়ছার আলী নানা নাটকীয় প্রচার-প্রচারনার মাধ্যমে ঘুষের এই অপকর্ম ঢাকার চেষ্টা করেছেন তা সফল হয়নি। মন্ত্রণালয়ের সংস্থা প্রশাসন-২ শাখার উপসচিব মো. আবু নাসার উদ্দিনের স্বাক্ষরিত গত ১৪ মে তারিখের এক প্রজ্ঞাপনে খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (চ.দা.) ইকবাল বাহার চৌধুরীকে রাজশাহীর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে পদায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই প্রজ্ঞাপনের পর পরই অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেন দুর্নীতিবাজ কায়ছার আলী। তিনি এর আগে খুলনায় যোগদানের সময়ই ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে থাকবেন না। তাকে খুলনায় রাখা যাবে না। মন্ত্রণালয়সহ প্রভাবশালী মহলে ব্যাপক তদবির চালিয়ে ইকবাল বাহার চৌধুরীর রাজশাহীতে যোগদান ঠেকিয়ে দেন তিনি। এর পরিবর্তে রাজশাহীর আরসি ফুড পদে নিজের পদায়নের ব্যবস্থা করেন। গত ২ জুন মন্ত্রণালয়ের একই উপসচিব আবু নাসার উদ্দিন নতুন প্রজ্ঞাপনে কায়ছার আলীকে আরসি ফুড পদে পদায়ন করেন। এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হওয়ার পর পরই কায়ছার আলী সর্বত্র প্রচার করতে থাকেন, তিনি রাজশাহীতে যেতে চান না, খুলনায়ই থাকতে চান। এমনও বলা হয় যে, ডিজি বরাবর দরখাস্ত করেছেন, রাজশাহী যেত চান না। এমনকি তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে, এমন কথাও প্রচার করেছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে আদৌ এ রকমের কোনো দরখাস্ত বা স্ট্যান্ড রিলিজের হদিস পাওয়া যায়নি। আদতে তিনি যে, দুই কোটি টাকার বিনিময়ে রাজশাহীর আরসি ফুড পদে পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন তা আর গোপন থাকেনি। অধিদপ্তরের অনেকেই এখন একথা জানেন। তবে এ বিষয়ে চট্টগ্রামের খাদ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, কায়ছার আলী যা খুশি করুক, তাদের অগ্রিম ঘুষের টাকাটা যাতে ফেরত পাওয়া যায় এই ব্যবস্থা করা হোক। খাদ্য অধিপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান একই সঙ্গে স্ত্রী শারমিন আক্তার এবং স্ত্রীর আপন ভাগ্নী দু’জনকেই বিয়ে করেছেন। খালা-ভাগ্নী উভয়ে জহিরুলের স্ত্রী। বিভিন্ন সময়ে দু’জনকেই একাধিকবার তালাকও দিয়েছেন তিনি। তালাকের পরে তাদের নিয়ে আবার সংসারও করছেন। পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার এ ধরনের অনাচার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড খাদ্য অধিদপ্তরে মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিপীড়ন-নির্যাতনের অভিযোগ এনে শারমিন আক্তার পর পর ৪টি মামলা করেন জহিরুলের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে তিনটি মামলায় চার্জশিটও হয়েছে। এ কারণে গত সপ্তায় পরিচালক জহিরুল ইসলামকে সাসপেন্ড করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। স্ত্রীর বড় বোনের মেয়ে শাহানা আক্তার স্বর্ণার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে গোপন পরকীয়া সম্পর্কে জড়ান জহিরুল ইসলাম খান। এক পর্যায়ে শাহানা আক্তার স্বর্ণাকে গোপনে বিয়েও করেন। একই সঙ্গে দু’জনের সঙ্গেই সংসার করছিলেন। ঘটনা ধরা পড়ে গেলে স্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হয়। স্ত্রীর ওপর শারীরিক নিপীড়ন-নির্যাতনও চালান। এসব ঘটনা তুলে ধরে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ঢাকার ১৩ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন জহিরুল ইসলাম খানের স্ত্রী শারমিন আক্তার। মামলায় মোট চার জনকে আসামী করা হয়। এরমধ্যে এক নম্বর আসামি হলেন জহিরুল ইসলাম খান, ২ নং শাহানা আক্তার স্বর্ণা (বোনের মেয়ে), ৩ নং আসামি সাইদ হাসান শাকিল (আপন বোনের ছেলে) এবং ৪ নং আসামি (আপন বোন) সাইফুন আরা। নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় পরবর্তীতে একে একে আরও তিনটি মামলা দায়ের করেন শারমিন আক্তার। শারমিন আক্তারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে শারমিন আক্তারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং অবশেষে গত সপ্তায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুমিরের উপস্থিতি শুধু একটি প্রাণীর অস্তিত্ব নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং পর্যটন সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় সেই ঐতিহ্যের শেষ জীবন্ত প্রতীকটিকেও সরিয়ে নিতে হলো প্রশাসনকে। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল জননিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত, নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার পরিণতি? শিশুমৃত্যুর পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপ গত সোমবার মাজারের সংরক্ষিত মহিলা ঘাট এলাকায় আনুমানিক সাত থেকে আট বছর বয়সী ফাতেমা নামের এক শিশুকে পানিতে টেনে নেয় কুমিরটি। পরদিন ভোরে দিঘির পূর্ব পাড়ে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। ঘটনার পর জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয় জননিরাপত্তার স্বার্থে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার। বুধবার সকাল থেকে অভিযান শুরু হয়। দুপুরের দিকে খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে কুমিরটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং পরে বিশেষ ব্যবস্থায় খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কুমিরটির ভবিষ্যৎ আবাস কোথায় হবে, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ক্ষুব্ধ খাদেমরা: ‘একটি দুর্ঘটনায় ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না’ কুমির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাজারের প্রধান খাদেম ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর ধরে তাঁদের পরিবার মাজার ও দিঘির দেখভাল করে আসছে। দুর্ঘটনা দুঃখজনক হলেও এর জন্য ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা সমাধান হতে পারে না। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে। তাই বলে কুমিরটি নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। এটি বাগেরহাটের মানুষের সম্পদ।” খাদেমদের মতে, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বেষ্টনী এবং প্রশাসনিক নজরদারির মাধ্যমে কুমিরটিকে আগের স্থানে রাখা সম্ভব ছিল। দর্শনার্থীদের একাংশের ভিন্ন মত তবে সাধারণ দর্শনার্থীদের বড় একটি অংশ প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। মোল্লাহাট থেকে পরিবার নিয়ে মাজারে আসা শাহিদা বেগম বলেন, “কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। আজ যদি আমার পরিবারের কারও এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে কী হতো? আপাতত কুমির সরানো ঠিক হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে নিরাপদ বেষ্টনী দিয়ে আবার প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।” এই মতামতই এখন স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত—ঐতিহ্যও থাকবে, আবার মানুষের জীবনও নিরাপদ থাকবে। শতাব্দীপ্রাচীন কুমির ঐতিহ্যের ইতিহাস লোককথা অনুযায়ী, দিঘি খননের পর খানজাহান আলী (রহ.) নিজ হাতে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন—‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে পরিচিত সেই কুমির যুগল পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে একটি প্রতীকী ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, খানজাহান আলীর মৃত্যুর পরও খাদেম ও ভক্তরা কুমিরগুলোর যত্ন নিতেন। ক্রমান্বয়ে তাদের বংশবিস্তার ঘটে এবং শত শত বছর ধরে দিঘিতে কুমিরের অস্তিত্ব বজায় ছিল। তবে প্রাকৃতিক মৃত্যু, পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় একের পর এক কুমির মারা যেতে থাকে। সবশেষে ২০১৫ সালে ‘ধলা পাহাড়’ নামে পরিচিত শতবর্ষী কুমিরটির মৃত্যু হলে খানজাহান আমলের বংশধারার সমাপ্তি ঘটে। ভারতের কুমির এনে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল ঐতিহ্য ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যে ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির আনা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর বেশিরভাগই মারা যায় বা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। ২০২৩ সালে শেষ পুরুষ কুমিরটির মৃত্যুর পর দিঘিতে একমাত্র জীবিত কুমির হিসেবে টিকে ছিল সাম্প্রতিক সময়ে সরিয়ে নেওয়া প্রাণীটি। অর্থাৎ দিঘিতে থাকা শেষ কুমিরটি ছিল ঐতিহ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে আনা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। ‘হঠাৎ আক্রমণাত্মক’ হয়ে উঠল কেন? বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুমির প্রকৃতিগতভাবেই শিকারি প্রাণী। তবে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থানের পরিবেশে তাদের আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। সুন্দরবনের করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবিরের মতে, খাদ্যসংকট একমাত্র কারণ নয়। তিনি জানিয়েছেন, পর্যটকদের সামনে কুমির প্রদর্শনের জন্য খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মেশানো, নিয়মিত কৃত্রিমভাবে খাবার দেওয়া, সামনে জীবিত প্রাণী এনে দেখানো এবং পরে সরিয়ে নেওয়ার মতো কার্যক্রম কুমিরের স্বাভাবিক আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া দিঘিতে জাল ফেলে মাছ ধরা এবং মানুষের অতিরিক্ত উপস্থিতিও প্রাণীটির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত করেছে বলে মনে করেন তিনি। অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ শিশুমৃত্যুর ঘটনার পর নতুন করে সামনে এসেছে মাজার এলাকায় দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, তাবিজ ও মানতের নামে বাণিজ্য, কুমিরকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বহুবার প্রশ্ন উঠেছে—লোকালয়ের মধ্যে থাকা উন্মুক্ত দিঘিতে একটি পূর্ণবয়স্ক কুমির রেখে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া পর্যটকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক? প্রশ্নটি আরও জোরালো হয় প্রায় দুই মাস আগে একটি কুকুরকে কুমিরের আক্রমণের ঘটনার পর। তবে তখনও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় এক প্রজাতির ভবিষ্যৎ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০০০ সালে ঘোষণা করেছিল যে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে মিঠাপানির কুমির কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় খানজাহান আলীর মাজারের কুমিরগুলো ছিল এক ধরনের জীবন্ত সংরক্ষণ ঐতিহ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিঘির বিস্তৃত জলাশয়কে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে সেখানে একটি নিয়ন্ত্রিত কুমির সংরক্ষণ ও প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং বাহ্যিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা গেলে ভবিষ্যতে এখানেই একটি মিঠাপানির কুমির সংরক্ষণ প্রকল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। ঐতিহ্য বনাম জননিরাপত্তা: এখন কোন পথে বাগেরহাট? খানজাহান আলীর মাজারের কুমিরকে ঘিরে বিতর্ক মূলত দুটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও পর্যটন ঐতিহ্য। অন্যদিকে রয়েছে মানুষের জীবন ও জননিরাপত্তা। ফাতেমার মৃত্যু সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আপাতত দিঘি কুমিরশূন্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—যদি আগে থেকেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বাবধান এবং সুশাসন নিশ্চিত করা হতো, তাহলে কি এই মৃত্যুও এড়ানো যেত, আর ঐতিহ্যও টিকে থাকত? বাগেরহাটের মানুষের সামনে এখন সেই উত্তর খোঁজার সময়। কারণ কুমিরটি শুধু একটি প্রাণী ছিল না; এটি ছিল ইতিহাস, বিশ্বাস, পর্যটন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ববোধের এক জটিল পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।