ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : ইরানের আকাশে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা মার্কিন বাহিনীর জন্য এক বিরল এবং বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম যুদ্ধের ময়দানে কোনও মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলো। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করছেন যে ইরানের সামরিক শক্তি ‘পুরোপুরি বিধ্বস্ত’ হয়ে গেছে, তখন এই ঘটনা তেহরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাকেই প্রমাণ করছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, শুক্রবার একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এতে থাকা দুজন ক্রু সদস্যের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্যজনের খোঁজে এখনও তল্লাশি চলছে। এ ছাড়া ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম দাবি করেছে, তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এ-১০ অ্যাটাক এয়ারক্রাফটও বিধ্বস্ত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউস্টন কান্টওয়েল জানান, এর আগে সর্বশেষ ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। তিনি বলেন, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র মূলত এমন সব বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে যাদের শক্তিশালী বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা ছিল না। ফলে এত দীর্ঘ সময় কোনও বিমান না হারানোটা ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো। তিনি উল্লেখ করেন, আমরা এখানে প্রতিদিন যুদ্ধের ময়দানে উড়ছি এবং তারা প্রতিদিন আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ সপ্তাহে ইরান যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী ১৩ হাজারের বেশি মিশন পরিচালনা করেছে এবং ১২ হাজার ৩০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। তবে রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র বলছে, ইরান এখনও একটি শক্তিশালী ও সংকল্পবদ্ধ প্রতিপক্ষ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বরং এটি এখনও সক্রিয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস-এর পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, একটি নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানেই ধ্বংস হওয়া ব্যবস্থা নয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মার্কিন বিমানগুলো নিচু দিয়ে ওড়ার কারণে সেগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া সহজ হয়েছে। মার্ক ক্যানসিয়ান নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল জানান, বিমানটি ভূপাতিত করতে সম্ভবত কাঁধে রেখে ছোড়া কোনও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটিই প্রমাণ করে যে ইরান দুর্বল হলেও এখনও প্রাণঘাতী। মার্ক ক্যানসিয়ান আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বিমানের ক্ষতির হার ছিল ৩ শতাংশ, যা এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রায় ৩৫০টি বিমানের সমান। সেই তুলনায় এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হলেও এর একটি রাজনৈতিক দিক রয়েছে। তার মতে, আমেরিকার সাধারণ মানুষ ‘রক্তপাতহীন’ যুদ্ধে অভ্যস্ত। দেশের একটি বড় অংশ এই যুদ্ধ সমর্থন করে না, তাই তাদের কাছে যেকোনও একটি ছোট ক্ষতিও অগ্রহণযোগ্য। পাইলটদের প্রশিক্ষণে শেখানো হয় বিমান থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়ার পর কীভাবে নিজেদের অবস্থান উদ্ধারকারীদের জানানো যায়। তবে শত্রু পক্ষ সব সময় সেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার বা ভুল অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করে। শুক্রবারের এই উদ্ধার অভিযানে মূলত হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে, যা অন্য বিমানের তুলনায় ধীরগতির হওয়ায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৮০ সালে তেহরান থেকে মার্কিন জিম্মি উদ্ধারের ব্যর্থ অভিযানেও হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে আটজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন।
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা ও কৌশল নিয়ে। বিশ্লেষকদের একাংশ এই যুদ্ধকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘স্বেচ্ছায় চাপিয়ে দেওয়া সংঘাত’ হিসেবে দেখছেন, যার আইনি ভিত্তি নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ওপর আসন্ন হামলার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এই সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কতটা বৈধ—তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিবিসির আন্তর্জাতিক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন তার বিশ্লেষণে ট্রাম্পের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য—বিশেষ করে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি—আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধনীতির দৃষ্টিতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক, এমনকি তা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি অনুযায়ী, যেকোনো সামরিক অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং হুমকির মাত্রা অনুযায়ী শক্তি প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্য ও পদক্ষেপে এই নীতিগুলোর প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা। তেহরান ও কারাজ সংযোগকারী একটি সেতুতে মার্কিন হামলার ঘটনাটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের নীতিতে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও নিয়ম-নীতির প্রতি অনীহা স্পষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকের মতে, তার কৌশল ‘জোর যার মুল্লুক তার’—এই দর্শনের প্রতিফলন। সম্প্রতি দেওয়া ট্রাম্পের ১৯ মিনিটের ভাষণেও তার অবস্থানের দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বোয়েনের ভাষায়, এটি ‘কৌশলগত অনিশ্চয়তা’র একটি উদাহরণ—যেখানে একদিকে তিনি পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন, অন্যদিকে কার্যকর কোনো সমঝোতার দিকেও এগোতে পারছেন না। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যদি যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী মোতায়েন করে, তবে তা উল্টো ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ, ইরান দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে প্রতিপক্ষকে জড়িয়ে ফেলতে আগ্রহী—যেখানে সময়ই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান শক্তি। রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, তুলনামূলক দুর্বল দেশও ‘অসম যুদ্ধে’ শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে চাপে রাখতে সক্ষম। এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী ইরানের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকস্মিক ইরানে বিমান হামলা শুরু করে এবং তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অনেক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত আগ্রাসনবাদী বাহিনী এক হাজার ৪০০ জনের মতো ইরানিকে হত্যা করেছে। ওই উসকানিমূলক হামলার জবাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে ইরান। একইসঙ্গে তারা বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এই হরমুজ প্রণালী ইরানের কব্জায় যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে বেকায়দায় পড়েছে। তাদের ওপর আরব ও ইউরোপীয় অঞ্চলের মিত্রদের চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী উদ্ধার করতে ইউরোপীয়দের যুদ্ধে ডাকলেও সাড়া পাচ্ছে না। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির মতো দেশগুলোর নেতারা বলছেন, এই যুদ্ধ তাদের নয়। এমনকি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কম কথা বলারও পরামর্শ দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে শুক্রবার ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আরও কিছুটা সময় পেলে আমরা খুব সহজেই হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে পারি। (সেখানকার) তেল দখল করে আমরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারি। এটি কি বিশ্বের জন্য একটি তেলের খনি হবে না?’
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তা বলয়ের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা ইসরাইল আজ এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। একের পর এক সামরিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান-এর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘাত, দেশটির অভ্যন্তরে এক নতুন ধরনের সংকট তৈরি করেছে—নাগরিকদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান দেশত্যাগের প্রবণতা। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই অদৃশ্য কিন্তু গভীর সংকটের চিত্র—যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু সীমান্তে নয়, মানুষের মনেও। যুদ্ধের ছায়ায় নাগরিক জীবন গাজা-কে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে যখন সরাসরি উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে তেহরান এবং তেল আবিবের মধ্যে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা ইসরাইলি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকে অস্থির করে তুলেছে। সাইরেন, বাঙ্কার আর জরুরি সতর্কতা—এসব এখন নিয়মিত বাস্তবতা। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটছে মানুষের সিদ্ধান্তে: “থাকা, না কি চলে যাওয়া?” দেশ ছাড়ার নীরব ঢল ইসরাইলি গণমাধ্যম এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশ ছাড়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে দলে দলে দেশ ছাড়ছেন ইসরাইলিরা। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চস্তরের মানুষও দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে মিসরের সীমান্তবর্তী তাবা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ “এস্কেপ রুট” হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১৫টি ফ্লাইট অধিকাংশই পূর্ণ যাত্রীদের বড় অংশ ইসরাইলি নাগরিক সীমান্ত পার হয়ে অনেকে আশ্রয় নিচ্ছেন সিনাই অঞ্চলে। কিন্তু এই পালানোর পথও সহজ নয়। পারাপার ফি দ্বিগুণ যানবাহন খরচ ৫ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি হোটেল ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেশি অর্থাৎ, নিরাপত্তা কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। অভ্যন্তরীণ “নিরাপদ অঞ্চল” খোঁজা সবাই দেশ ছাড়তে পারছে না। অনেকেই দেশের ভেতরেই তুলনামূলক নিরাপদ জায়গা খুঁজছেন। দক্ষিণের ছোট শহর মিৎসপে রামন এখন তেমনই এক আশ্রয়স্থল। জনসংখ্যা: প্রায় ৬,০০০ আশ্রয় নিয়েছে: অতিরিক্ত ~৩,০০০ মানুষ তুলনামূলক কম সাইরেন স্থানীয় প্রশাসন বলছে, শহরটি “অস্থায়ী নিরাপত্তা অঞ্চল” হিসেবে কাজ করছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এটি কতদিনের জন্য? ‘ব্রেইন ড্রেইন’—অদৃশ্য সংকট সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি উঠে এসেছে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়। মূল তথ্য: ২০২৩–২০২৪ সালে প্রায় ১ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে প্রতি বছর গড়ে ~৫০,০০০ ৯৫০ জন চিকিৎসক দেশত্যাগ করেছেন উল্লেখযোগ্য অংশ: পিএইচডিধারী গবেষক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রকৌশলী প্রযুক্তিবিদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল “জনসংখ্যা হ্রাস” নয়—এটি মানবসম্পদের ক্ষয়। ৪০ বছরের বেশি বয়সি অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশত্যাগ স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় আঘাত হতে পারে। অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিকদের দেশত্যাগ দীর্ঘমেয়াদে তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে: স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা প্রযুক্তি ও গবেষণায় স্থবিরতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা যে দেশটি নিজেকে “স্টার্টআপ নেশন” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই দেশই এখন মানবসম্পদ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বাস্তবতা বনাম রাষ্ট্রীয় বয়ান সরকারি বয়ানে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কথা বলা হলেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সীমান্তে যুদ্ধ আকাশে হুমকি ভেতরে অনিশ্চয়তা এই তিনের সংমিশ্রণ তৈরি করছে এক নতুন বাস্তবতা—যেখানে “নিরাপত্তা” আর নিশ্চিত নয়। এক নীরব সংকটের দিকে এগোচ্ছে ইসরাইল? ইসরাইলের বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি যুদ্ধের চেয়েও গভীর এক সংকটের ইঙ্গিত দেয়—মানুষের আস্থা হারানো। যখন একটি রাষ্ট্রের নাগরিকরা নিরাপত্তার জন্য নিজ দেশ ছেড়ে যেতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু সাময়িক আতঙ্ক নয়—এটি একটি কাঠামোগত সংকটের লক্ষণ। প্রশ্ন এখন একটাই: এই স্রোত কি সাময়িক, নাকি ইসরাইল একটি দীর্ঘমেয়াদি “মানবিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের” পথে হাঁটছে?
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক পদত্যাগ করেছেন বলে দাবি উঠেছে। মোহাম্মদ সাফা নামের ওই কর্মকর্তা সোমবার (৩০ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্ট এবং দীর্ঘ চিঠিতে তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি ২০১৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘প্যাট্রিয়টিক ভিশন’-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সংস্থাটি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে বিশেষ পরামর্শমূলক মর্যাদা পেয়ে থাকে। ২০১৬ সালে তিনি জাতিসংঘে এই সংস্থার স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন। কী অভিযোগ করেছেন তিনি? পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে মোহাম্মদ সাফা দাবি করেন, জাতিসংঘের শীর্ষ পর্যায়ে একটি “শক্তিশালী লবি” সক্রিয় রয়েছে, যারা এমন একটি পরিস্থিতির প্রস্তুতি নিচ্ছে যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তেহরানের একটি ছবি যুক্ত করে তিনি বলেন, “মানুষ পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। জাতিসংঘ ইরানে সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।” তিনি সতর্ক করে দেন, তেহরান কোনো জনশূন্য এলাকা নয়—এখানে প্রায় এক কোটি মানুষের বসবাস। একইসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের বড় শহরগুলোর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি হলে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কেমন হতো। কেন পদত্যাগ? নিজের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “এই তথ্য প্রকাশ করার জন্য আমি আমার কূটনৈতিক ক্যারিয়ার ত্যাগ করেছি। মানবতাবিরোধী কোনো ঘটনার অংশ বা নীরব সাক্ষী থাকতে চাই না।” তিনি সম্ভাব্য “নিউক্লিয়ার উইন্টার”-এর আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন, যা বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অভিযোগ মোহাম্মদ সাফা দাবি করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর ভিন্নমত প্রকাশ করায় তিনি সমালোচনা ও অভিযোগের মুখে পড়েন। তার অভিযোগ, গাজা যুদ্ধের পর একটি বিশেষ গোষ্ঠী নতুন বিশ্বব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তিনি ও তার পরিবার হত্যার হুমকি পেয়েছেন এবং তথ্য সেন্সরশিপের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং পদত্যাগের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি জাতিসংঘ। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে।
মধ্যপ্রাচ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, তাদের সামরিক চাপের মুখে মার্কিন যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন অঞ্চলটি থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দেশটির এক নৌ-কমান্ডার বলেছেন—মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য ইরান প্রস্তুত এবং তারা উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সুযোগ পেলে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। সম্প্রতি মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ ওঠে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় জ্বালানি ট্যাঙ্কারগুলো এই পথ ব্যবহার বন্ধ করে দেয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-এর নৌবাহিনীর উপস্থিতি, বিশেষ করে আরব সাগরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন, ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। এ অবস্থায় ইরান দাবি করছে, তাদের সামরিক তৎপরতার মুখে মার্কিন রণতরীটি শত শত মাইল দূরে সরে গেছে। এর ফলে এখন থেকে হরমুজ প্রণালি তারা “বাধাহীনভাবে” নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তবে এ দাবির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন হয়। ফলে এ অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রযুক্তির আরও উন্নত সংস্করণ সংবলিত ড্রোন ইরানে পাঠাচ্ছে—এমন দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একাধিক কর্মকর্তা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এই তথ্য জানিয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, ইরান গত এক মাসের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। যদিও তেহরানের নিজস্ব শাহেদ ড্রোন রয়েছে, তবে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব ড্রোনকে আরও উন্নত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নেভিগেশন ব্যবস্থা, জ্যামার প্রতিরোধী প্রযুক্তি এবং লক্ষ্যভেদ ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনা হয়েছে বলে দাবি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সূত্রগুলোর। একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি মাসেই রাশিয়া থেকে ইরানে ড্রোন সরবরাহ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সক্রিয় আলোচনা হয়েছে। চালান কত বড়, স্পষ্ট নয় মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এটি এককালীন চালান নাকি ধারাবাহিক সরবরাহের অংশ—তা এখনও পরিষ্কার নয়। ড্রোনের সংখ্যা বা এর সামরিক প্রভাব সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, সীমিত সংখ্যক ড্রোন যুদ্ধের গতিপথে বড় পরিবর্তন আনবে না। বরং এটি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের প্রতীকী পদক্ষেপও হতে পারে। পরিবহনের পথ নিয়ে জল্পনা ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়ার একটি ড্রোন চালান ইতোমধ্যে পথে রয়েছে। যদিও কীভাবে তা পরিবহন করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সম্প্রতি আজারবাইজান হয়ে ট্রাকে করে রাশিয়ার মানবিক সহায়তার কনভয় ইরানে প্রবেশ করেছে। এতে ড্রোন থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব ট্রাকে খাদ্য ও ওষুধ ছিল। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কী কী? বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া শাহেদ ড্রোনে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) উন্নত ক্যামেরা জ্যামার প্রতিরোধী ব্যবস্থা জেট ইঞ্জিন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগ (স্টারলিংক প্রযুক্তি) এই পরিবর্তনের ফলে ড্রোনগুলো আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, অন্য দেশ ইরানকে কী সরবরাহ করছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে বড় প্রভাব ফেলছে না। তার দাবি, মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ১০ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং ১৪০টিরও বেশি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ বিশেষজ্ঞদের মতে, জেট ইঞ্জিনচালিত দ্রুতগতির ড্রোনগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ধরনের ড্রোন প্রতিহত করতে উন্নত ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে, যার মজুদ সীমিত। রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের পটভূমি ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলারের ড্রোন চুক্তি হয়। পরবর্তীতে রাশিয়ার ভেতরেই ড্রোন উৎপাদন শুরু হয়। তবে দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে রাশিয়ার নিষ্ক্রিয়তায় তেহরান অসন্তুষ্ট হয়েছিল। এদিকে, ড্রোন সরবরাহের বিষয়ে রুশ ক্রেমলিনের মুখপাত্র এই দাবিকে “ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলমান এই অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বর্তমানে প্রণালির উভয় পাশে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইরানের অবরোধ, হুমকি এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় পারাপারের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে এখনো কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে ইরান। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে—ভৌগোলিক অবস্থান, অপ্রচলিত সামরিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। ভৌগোলিক সুবিধা পারস্য উপসাগরের এই প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২৪ মাইল প্রশস্ত। ফলে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সংকীর্ণ পথ ব্যবহার করতে হয়। এই ‘চোকপয়েন্ট’ পরিস্থিতি ইরানকে সহজে নজরদারি ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে বাড়তি সুবিধা দেয়। ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিও প্রতিরক্ষা এবং আক্রমণ—উভয় ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অন্যতম বড় শক্তি তার অপ্রচলিত সামরিক কৌশল। ড্রোন, দ্রুতগামী ছোট নৌযান, বিস্ফোরকবোঝাই মানববিহীন নৌযান এবং সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে তারা বড় নৌবাহিনীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া সাধারণ জাহাজ থেকেও মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা ইরানের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু জাহাজকে নিরাপদে পারাপারের জন্য অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বৈশ্বিক উদ্বেগ হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা দ্রুত সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেখারচি এ তথ্য জানিয়েছেন। শুক্রবার (২৭ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ দাবি তুলে ধরা হয়। শেখারচির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ১৭টি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল, যেগুলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইতোমধ্যে ধ্বংস করেছে। তিনি দাবি করেন, এসব ঘাঁটি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন বাহিনী। তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের ১৩ জুন শুরু হওয়া ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের পর ইরান তার প্রতিরক্ষামূলক নীতিতে পরিবর্তন এনে আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে। ইরানের এই সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেন, গত ৪৭ বছরে ইরান কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তবে দেশের ওপর কোনো হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে এবং শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করা হবে। তিনি বলেন, শত্রুর হুমকি সম্পূর্ণরূপে দূর না হওয়া পর্যন্ত ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে শেখারচি বলেন, গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে ও নিরাপত্তার নামে আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে ওয়াশিংটন। গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আর আগের মতো থাকবে না। যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে চলতে হবে। এছাড়া, আঞ্চলিক মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে আশ্রয় না দেয়। কোনো দেশ যদি তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাহলে তাকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শেখারচি আরও উল্লেখ করেন, ইরান ধারাবাহিকভাবে তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অটল রয়েছে।
চলমান মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র একটি ১৫ দফা প্রস্তাব তৈরি করেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, দুই বেনামি কর্মকর্তা জানিয়েছেন এই প্রস্তাব পাকিস্তান সরকারের মাধ্যমে ইরানকে পাঠানো হয়েছে। মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্তই এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, এই কাঠামো গৃহীত হলে দুই পক্ষ এক মাসের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে পারে। এরপর এই কাঠামোর ভিত্তিতে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির আলোচনা শুরু হবে। চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান সব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে এবং সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি হবে। এই ১৫ দফা প্রস্তাবে ইরানকে তার বিদ্যমান পারমাণবিক সক্ষমতা ভেঙে দিতে হবে, পারমাণবিক অস্ত্র কখনো না বানানোর প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, ইরানের মাটিতে কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থাকবে না এবং হরমুজ প্রণালি সর্বদা উন্মুক্ত রাখতে হবে। হরমুজ প্রণালির বিষয়ে কড়া শর্ত রাখার কারণ হলো ইরানের আংশিক অবরোধে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠে গেছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। আলোচনার নেতৃত্বে রয়েছেন ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জেরেড কুশনার। উল্লেখযোগ্য যে ইসরাইল এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে না। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না রাখতে রাজি হয়েছে এবং হরমুজ সংক্রান্ত একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ উপহার’ পাঠিয়েছে। তিনি জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, উইটকফ ও কুশনার এই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্প শাসন পরিবর্তনের বিষয়েও মন্তব্য করলেন। তিনি বলেন, ‘এটাই আমাদের কাছে আসল শাসন পরিবর্তন। কারণ নেতারা সবাই সেই পুরনোদের চেয়ে অনেক আলাদা যারা এসব সমস্যা তৈরি করেছিলেন।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে গুরুত্বপূর্ণ এক ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে অভিযানের যৌক্তিকতা বোঝান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গোপন এই আলোচনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-কে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা নেতৃত্ব ধ্বংসের পরিকল্পনা গুরুত্ব পায়। গোয়েন্দা তথ্য ও হামলার সুযোগ সূত্র অনুযায়ী, উভয় নেতা আগেই গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ে জানতে পারেন—খামেনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা তেহরানে একটি কমপ্লেক্সে বৈঠকে বসবেন। এতে তারা একসঙ্গে অবস্থান করায় হামলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েন। তবে পরবর্তীতে নতুন গোয়েন্দা তথ্য জানায়, বৈঠকের সময় এগিয়ে আনা হয়, যা হামলার সময় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। নেতানিয়াহুর কৌশলগত যুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকা নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝান—খামেনিকে হত্যার এমন সুযোগ আবার নাও আসতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে পূর্বে ইরানের কথিত হত্যাচেষ্টার প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত আইআরজিসি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি-এর ঘটনাও আলোচনায় উঠে আসে। ট্রাম্পের অবস্থান সূত্র বলছে, ট্রাম্প সামরিক অভিযানের ধারণায় সম্মতি দিলেও কখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও নেননি। তবে অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছিল, যা সম্ভাব্য অভিযানের ইঙ্গিত দেয়। অবশেষে ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। হামলা ও খামেনির মৃত্যু ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শুরু হয় প্রথম দফা বোমা হামলা। সেদিন সন্ধ্যায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, খামেনি নিহত হয়েছেন। হোয়াইট হাউস জানায়, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল— ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস নৌবাহিনী অকার্যকর করা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ রোধ যুদ্ধের বিস্তার ও প্রতিক্রিয়া এর আগে জুন মাসে ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়, পরে যুক্তরাষ্ট্র এতে যোগ দেয়। ১২ দিনের সেই অভিযানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করা হয়। তবে পরবর্তীতে নতুন করে বড় আকারের হামলার পরিকল্পনা করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ দুর্বল করা। সিদ্ধান্তে প্রভাবক ঘটনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে— ভেনেজুয়েলায় সফল মার্কিন অভিযান ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার হয়। ঝুঁকি ও পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সেন্টকম সতর্ক করেছিল—খামেনিকে হত্যা করলে আরও কট্টর নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে। এই আশঙ্কা আংশিক সত্যি হয়েছে। বর্তমানে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায়— মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হাজারো বেসামরিক হতাহত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি জ্বালানি সংকট বর্তমান পরিস্থিতি যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে। ইরানে রেভল্যুশনারি গার্ডের কড়া নিরাপত্তা জারি রয়েছে এবং সাধারণ মানুষ অনেকটাই ঘরবন্দি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে চায় ২০টিরও বেশি দেশ। যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতও রয়েছে। খবর ডনের। প্রতিবেদন বলছে, ২০টিরও বেশি দেশ হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরোধের নিন্দা করেছে। প্রধানত ইউরোপীয় দেশগুলোসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন মিলে ২২টি দেশ বলেছে, ‘আমরা পারস্য উপসাগরে নিরস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের সাম্প্রতিক হামলা, তেল ও গ্যাস স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং ইরানি বাহিনীর হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়ার তীব্র নিন্দা জানাই।’ ‘প্রণালীটি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে আমরা আমাদের প্রস্তুতি প্রকাশ করছি। যেসব দেশ প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনায় নিযুক্ত রয়েছে, আমরা তাদের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানাই।’ তারা একটি যৌথ বিবৃতিতে বলেছে। ‘তেল ও গ্যাস স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলায় অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থগিতাদেশের আহ্বান জানাচ্ছি।’ দেশগুলো আরও যোগ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন এক মোড়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক অভিযান গুটিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন, যা এই সংঘাতের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে ইরানি তেলের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ইরানের নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলছে। যুদ্ধ গুটিয়ে আনার ইঙ্গিত: কৌশলগত পরিবর্তন? শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৃহৎ সামরিক অভিযান গুটিয়ে আনার বিষয়টি এখন বিবেচনায় রয়েছে। এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। কারণ, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর এটিই প্রথমবারের মতো এত স্পষ্টভাবে সম্ভাব্য সমাপ্তির ইঙ্গিত দেওয়া হলো। তবে ট্রাম্প একইসঙ্গে জানিয়েছেন, তিনি যুদ্ধবিরতির পক্ষে নন। তার ভাষায়, “যখন প্রতিপক্ষকে কার্যত ধ্বংস করা হচ্ছে, তখন যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন নেই।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও তা কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নয়, বরং সামরিক সাফল্যের ভিত্তিতে করতে আগ্রহী। পেন্টাগনের পূর্বাভাস বনাম বাস্তবতা হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, এই সামরিক অভিযান সম্পন্ন করতে ৪৬ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে পূর্বাভাস ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই দাবি কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। কারণ, ইরান এখনও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ স্পষ্ট নয়। ইরানের পাল্টা আঘাত: যুদ্ধ থামার বদলে বিস্তারের ঝুঁকি যখন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ গুটিয়ে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন ইরান বিপরীত পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনায়: সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে ২০টিরও বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়, যা প্রতিহত করা হয়েছে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে কুয়েতের একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলায় আগুন লাগে কাতারের গ্যাস স্থাপনাও হামলার শিকার হয় এছাড়া জেরুজালেমের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর আশেপাশে হামলার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে সংঘাত কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান কার্যত এই প্রণালীতে চাপ সৃষ্টি করায়: তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই প্রণালী দীর্ঘ সময় অচল থাকে, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের বাজারে অস্থিরতা: মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারের বেশি হয়েছে। এর প্রভাব: পরিবহন খরচ বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়া বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির চাপ ওয়াল স্ট্রিটসহ বিভিন্ন শেয়ারবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। নিষেধাজ্ঞা শিথিল: বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত? এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে—ইরানি তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের আওতায়: ২০ মার্চের আগে জাহাজে লোড করা তেল ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ ও বিক্রি করা যাবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের মতে, এতে প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে আসবে, যা স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ সংকট কমাতে সাহায্য করবে। এই পদক্ষেপকে অনেকেই বাস্তববাদী হিসেবে দেখছেন। কারণ, যুদ্ধ চলমান থাকলেও বৈশ্বিক জ্বালানি স্থিতিশীল রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা বর্তমান সংঘাতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, বরং একাধিক আঞ্চলিক শক্তি জড়িয়ে পড়েছে: সৌদি আরব নিজেদের তেল স্থাপনা রক্ষায় সক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। ইসরাইল ইরানের হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে এবং লেবাননে অভিযান পরিচালনা করছে। তুরস্ক সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলার সমালোচনা করেছে, যা নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়। সিরিয়া এখনও সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ বার্তা: ‘আমরা জিতেছি’ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দাবি করেছেন, তারা শত্রুপক্ষকে বড় ধরনের আঘাত হেনেছেন। তার বক্তব্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে: জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর সামরিক সাফল্যের দাবি প্রতিপক্ষের বিভ্রান্তির কথা উল্লেখ এই ধরনের বক্তব্য সাধারণত অভ্যন্তরীণ সমর্থন ধরে রাখার কৌশল হিসেবে দেখা হয়। কূটনৈতিক শূন্যতা: আলোচনার পথ বন্ধ? ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী। তবে তিনি দাবি করেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে কার্যকর আলোচনার সুযোগ নেই। এই পরিস্থিতি কূটনৈতিক সমাধানের পথকে জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে: সরাসরি সংলাপের অভাব সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে পারে মধ্যস্থতাকারী দেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় শক্তিগুলোর উদ্যোগ প্রয়োজন মার্কিন সামরিক উপস্থিতি: কমছে না, বাড়ছে? যদিও ট্রাম্প সামরিক অভিযান গুটিয়ে আনার কথা বলেছেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত ২,২০০–২,৫০০ মেরিন সেনা পাঠানোর খবর প্রকাশ পেয়েছে। এতে দুটি সম্ভাবনা তৈরি হয়: কৌশলগত চাপ বজায় রাখা প্রয়োজনে দ্রুত আক্রমণের প্রস্তুতি এই দ্বৈত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি: তিনটি সম্ভাব্য পথ বর্তমান পরিস্থিতি থেকে ভবিষ্যতে তিনটি সম্ভাব্য পথ দেখা যাচ্ছে: ১. সীমিত যুদ্ধ ও ধীরে ধীরে সমাপ্তি যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে অভিযান গুটিয়ে নেবে, তবে সরাসরি যুদ্ধ এড়াবে। ২. আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার ইরান, ইসরাইল, সৌদি আরবসহ একাধিক দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। ৩. কূটনৈতিক সমাধান আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসতে পারে। বৈশ্বিক প্রভাব: শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয় এই সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে: জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা খাদ্য ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা ভূরাজনৈতিক জোটে পরিবর্তন বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন যুদ্ধের সমাপ্তির সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে নতুন সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে শান্ত করার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবতা এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। ইরানের ধারাবাহিক হামলা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয়তা এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে—এই সংঘাত কি ধীরে ধীরে থামবে, নাকি আরও বড় আকার ধারণ করবে?
ইরানের নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে তেহরান। দফায় দফায় ছুড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র। এমনকি ক্লাস্টার ওয়ারহেড বা গুচ্ছ বোমাযুক্ত মিসাইল নিক্ষেপ করছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এতে ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বেশ কয়েকটি এলাকার অনেক ভবন। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, উত্তর ইসরাইলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে এবং অন্য একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে আঘাত হেনেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর খবরটি সামনে আসে। এদিকে তেল আবিব জেলার গুরুত্বপূর্ণ শহর রামাত গানেও তাণ্ডব চালিয়েছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। এতে ধসে পড়েছে বেশ কয়েকটি ভবন ও স্থাপনা। এর আগে সোমবার (১৬ মার্চ) ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানিকে হত্যা করে ইসরাইল।একই সঙ্গে ইরানের বাসিজ বাহিনীর প্রধানকেও খুন করে অবৈধ ইহুদি ভূখণ্ডটি। পরে ইসরাইলি গণহত্যাকারীরা নিরাপত্তা কাউন্সিলের দ্বিতীয় প্রধানকেও হত্যা করেছে বলে জানায়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কি আদৌ জীবিত? মৃত নাকি আহত হয়েছেন? নেতানিয়াহু সুরক্ষিত কোনো জায়গায় রয়েছেন? গত কয়েক দিন ধরে নেতানিয়াহুকে নিয়ে এ-হেন বহু জল্পনা ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। কিন্তু এমন জল্পনার কারণ কী? কারণ, গত কয়েক দিন ধরে প্রকাশ্যে আসা একাধিক ভিডিও। নেতানিয়াহুর ওই ভিডিওগুলো পর পর পোস্ট হওয়ার কারণেই সন্দেহ দানা বেঁধেছে মানুষের মনে। দাবি উঠেছে, ওই ভিডিওগুলোতে নেতানিয়াহুকে ‘জোর করে জীবিত দেখানোর’ চেষ্টা চলছে। যদিও কোনো ভিডিওরই সত্যতা যাচাই করা যায়নি। কিন্তু ওই ভিডিওগুলো প্রকাশ্যে আসার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, কোথায় ‘বিবি’ (নেতানিয়াহুর ডাকনাম। রাজনৈতিক মহল এবং গণমাধ্যমেও নামটি বহুল স্বীকৃত)? পাশাপাশি জল্পনা ছড়িয়েছে, তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু সেই খবর যাতে প্রকাশ্যে না আসে, তাই ওই সব ভিডিওর মাধ্যমে তাকে জীবন্ত প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা করছে ইসরায়েল। আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রথম থেকেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে ইরান। এর পর পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করার পর গত কয়েক দিন ধরে দাবি উঠেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন নেতানিয়াহু। তার মধ্যেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে পর পর পোস্ট হওয়া ওই ভিডিওগুলো তার মৃত্যু-জল্পনার পালে হাওয়া দিয়েছে। দাবি উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ হিসাবে একাধিক ভিডিও প্রকাশ্যে এনে তার মৃত্যু সংক্রান্ত দাবিগুলো খণ্ডন করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ইসরায়েল। তবে সেই ভিডিও ক্লিপগুলো জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটানোর পরিবর্তে নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে ১৩ মার্চ, পরে ১৫ মার্চ নেতানিয়াহুর একটি করে ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। ১৫ মার্চের ভিডিয়োতে তাকে একটি কফি কাপ হাতে বক্তৃতা করতে দেখা যায়। সেই ভিডিওতে তার মৃত্যুর খবর গুজব বলেও দাবি করতে দেখা যায় খোদ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে। ১৫ মার্চের সেই ভিডিওতে নেতানিয়াহুকে কফির কাপ হাতে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘কফির জন্য আমি মরতে রাজি। আমি আমার দেশের মানুষকে ভালবাসি।’ এর পর তিনি দুই হাতের আঙুল তুলে ক্যামেরায় দেখাতে শুরু করেন। কারণ ১৩ মার্চ ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিভিন্ন সূত্রে দাবি উঠেছিল যে নেতানিয়াহুর ডান হাতে ছ’টি আঙুল রয়েছে। কিন্তু সেই ভিডিওতে ডান হাতের ছ’টি আঙুল দেখা যায়নি। ভিডিওটি সমাজমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত হতেই সেটি ভুয়ো বলে জল্পনা শুরু হয়। এক এক্স ব্যবহারকারী এক্সের চ্যাটবট গ্রোকের কাছে ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেন। সেই প্রশ্নের উত্তরে গ্রোক জানিয়েছে, এটি আসলে কৃত্রিম মেধা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও। ভিডিওটি ১০০ শতাংশ ডিপফেক। নেতানিয়াহু একটি ক্যাফেতে কফি খাচ্ছেন, বাস্তবে তেমন কিছু ঘটেনি। যেহেতু ভিডিওটি নেতানিয়াহুর নিজস্ব সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়েছিল, গ্রোকের প্রতিক্রিয়া বিতর্ক আরো উস্কে দেয়। এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয় যে ৭৬ বছর বয়সি ইহুদি নেতা এখনো তেল আবিবেই আছেন। কিন্তু ভিডিওগুলো প্রকাশ্যে আসার পর নেতানিয়াহুর অবস্থান বা নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করে। তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জল্পনা তৈরি হয়। জল্পনা আরো তীব্র হয় ১৬ মার্চ। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি নতুন ভিডিওতে দেখা যায়, জেরুজালেমের রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটছেন এবং পথচারীদের সঙ্গে কথা বলছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু সেই ভিডিওতেও বিস্তর গোলযোগ খুঁজে পান নেটাগরিকেরা। ভিডিওতে যখনই নেতানিয়াহুর দু’হাত দেখা যাচ্ছিল, তখনই তার হাতে থাকা একটি আংটি বারবার অদৃশ্য এবং দৃশ্যমান হতে দেখা যায়। ফলে সেই ভিডিওটির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নেতানিয়াহুর বেঁচে থাকাকে কেন্দ্র করে সংশয় আর জল্পনা মিলেমিশে যখন একাকার, ঠিক সেই সময় আবার নেতানিয়াহুর এক্স হ্যান্ডল থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেই ভিডিওতে ইরানবাসীদের উদ্দেশে ‘নওরোজ়’ উৎসবের শুভেচ্ছাবার্তা দিতে দেখা গিয়েছে। নেতানিয়াহু বলছেন, ‘ইরানের নির্ভীক জনগণকে আমার শুভেচ্ছা। প্রতি বছরই এই আলোর উৎসবে যেমন শুভেচ্ছাবার্তা পাঠাই, এ বার তেমন আপনাদের জন্য রইল অনেক শুভেচ্ছা।’ এর কয়েক ঘণ্টা পর এক্স হ্যান্ডল থেকে আরো একটি ভিডিও পোস্ট করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। শুধু তা-ই নয়, মৃত্যু-জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে, আবারও তাকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘আমি বেঁচে আছি।’ কিছুটা রসিকতার সুরেই এ কথাগুলো বলতে শোনা গিয়েছে তাকে। যে ভিডিওটি নেতানিয়াহু প্রকাশ করেছেন, সেখানে তার সঙ্গে দেখা যাচ্ছে আরো এক ব্যক্তিকে। তিনি আর কেউ নন, ইসরায়েলে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। যে ভিডিওটি প্রকাশ্যে এসেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু এবং হাকাবি পাশাপাশি হাঁটছেন। খুব হালকা চালে কথা বলছেন তারা দু’জনে। হাকাবিকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, আপনি সুরক্ষিত আছেন কি না তা খোঁজ নিতে প্রেসিডেন্ট (ডোনাল্ড ট্রাম্প) আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।’ তার উত্তরে নেতানিয়াহু হাসতে হাসতে বলছেন, ‘অবশ্যই, মাইক। আমি বেঁচে আছি এবং সুস্থ আছি।’ এ কথা শুনে হাকাবি বললেন, ‘আপনি সুরক্ষিত আছেন, এটা দেখে আমি খুবই খুশি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বার বার জানতে চাইছিলেন আপনার বিষয়ে।’ তবে এই ভিডিও ডিপফেক ব্যবহার করে তৈরি কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। দাবি উঠেছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলেই তাকে জীবন্ত প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা চলছে। প্রতি দিন নিত্যনতুন ভিডিও পোস্ট করা হচ্ছে। আর তা করতে গিয়ে ভুয়ো ভিডিও অবধি পোস্ট করে ফেলছে ইসরায়েলি প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা-সমালোচনার ঢেউ উঠেছে সমাজমাধ্যমে। নেতানিয়াহুর বেঁচে থাকা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। নানা মত প্রকাশ করেছেন নেটাগরিকেরা। জল্পনা অবশেষে এই দাবিতে পরিণত হয়েছে যে, নেতানিয়াহু বিমান হামলায় গুরুতর আহত বা নিহত হয়েছেন। তবে শুধু ভিডিও নয়, নেতানিয়াহু যে বেঁচে নেই, তেমনটা জল্পনা ছড়ানোর কারণ রয়েছে আরো। গত সপ্তাহ থেকে টিভিতে সরাসরি কোনো বার্তা দিতে দেখা যায়নি নেতানিয়াহুকে। আবার নেতানিয়াহুর পুত্র ইয়াইর নেতানিয়াহু সর্বক্ষণ সমাজমাধ্যমে সক্রিয় থাকেন। দিনে বহু পোস্ট করেন তিনি। রহস্যজনকভাবে ইয়াইরও একেবারে চুপ। সমাজমাধ্যমে গত ৯ মার্চ থেকে তিনি নিষ্ক্রিয়। আর সেই বিষয়টিও নেতানিয়াহুর মৃত্যু-জল্পনাকে আরো উস্কে দিয়েছে।
রানের স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনী বাসিজের প্রধান গোলামরেজা সোলেমানি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানের অর্ধসরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি-এর বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এই তথ্য জানিয়েছে। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, “আমেরিকান-জায়োনিস্ট শত্রুর হামলায়” সোলেমানি নিহত হয়েছেন। তবে হামলার সময়, স্থান বা বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ছয় বছর ধরে বাসিজ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সোলেমানি এবং তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তদারকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে বাসিজ বাহিনীর কাঠামো আধুনিকীকরণ, সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়। আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডকে “ন্যাক্কারজনক” উল্লেখ করে বলেছে, এটি প্রমাণ করে যে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতে বাসিজ বাহিনীর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে “আমেরিকান সন্ত্রাসী বাহিনী” ও “জায়োনিস্ট শাসন”-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছে। বাসিজ বাহিনী ইরানের একটি স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া সংগঠন, যা সরাসরি আইআরজিসির অধীনে পরিচালিত হয়। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, দারিদ্র্য হ্রাসে কাজ করা এবং বিপ্লবী আদর্শে জনগণকে প্রশিক্ষণ ও সচেতন করা। এই ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদ-এ অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। ইরাকি কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পর দূতাবাস প্রাঙ্গণ থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্রও কূটনৈতিক মিশনে হামলার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূতাবাসের ভেতরে থাকা একটি হেলিপ্যাড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, একটি ড্রোন সরাসরি দূতাবাস প্রাঙ্গণে আঘাত হানে। উত্তেজনার মধ্যেই হামলা খবরে বলা হয়, বাগদাদে ইরান-সমর্থিত দুই যোদ্ধা নিহত হওয়ার কিছুক্ষণ পরই এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত গ্রিন জোন এলাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস কমপ্লেক্সটি বিশ্বের বৃহত্তম কূটনৈতিক মিশনগুলোর একটি। অতীতে বহুবার ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর রকেট ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এই এলাকা। এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নেই হামলার বিষয়ে বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে সংবাদমাধ্যমকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য জানানো হয়নি। তবে এর একদিন আগে, শুক্রবার, দূতাবাসটি ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য ‘লেভেল-৪’ নিরাপত্তা সতর্কতা পুনরায় কার্যকর করে। সতর্কবার্তায় বলা হয়, ইরান এবং তাদের সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো অতীতে মার্কিন নাগরিক, স্বার্থ ও অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এমন হামলার ঝুঁকি থাকতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান ও হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আতঙ্কে ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে নিয়মিত সাইরেন বাজছে এবং মানুষ মুহূর্তের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনে একাধিকবার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজছে। সাইরেন শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষজন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন। কিছু সময় পর বিপদ কেটে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলে তারা আবার ঘরে ফিরলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই আবার নতুন করে সাইরেন বাজতে পারে—যা তাদের মধ্যে স্থায়ী উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং ঘুমের সমস্যা দ্রুত বাড়তে পারে। সাইরেন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আগত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন শনাক্ত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে সাইরেন ব্যবস্থা নিয়েও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কোনো হামলা না হলেও সাইরেন বেজে উঠছে। আবার কখনো প্রকৃত হামলার সময়ও সতর্ক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর মধ্যেও উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর বেশি প্রভাব বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষরা। নিয়মিত স্কুল কার্যক্রম এবং কর্মজীবনও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা, জরুরি খাদ্য ও পানীয় মজুত রাখা এবং নিরাপত্তা ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার দাবি এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার নির্দেশে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র Kharg Island-এ একটি বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “আমার নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং খার্গ দ্বীপের প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।” তবে তিনি জানান, মানবিক কারণে আপাতত দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খার্গ দ্বীপটি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি ইরানের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়, তাহলে পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন অংশীদারিত্ব থাকা তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এসব স্থাপনাকে “ছাইয়ের স্তূপে” পরিণত করা হবে। হামলার ভিডিও ও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রকাশিত একটি ভিডিওর ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এতে খার্গ দ্বীপের বিমানবন্দর ও রানওয়েসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দৃশ্য রয়েছে। ভিডিওতে বড় বিস্ফোরণ ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমটি নিশ্চিত করেছে যে হামলাগুলো দ্বীপটিতেই সংঘটিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন এদিকে সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাডার কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তথ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা ১২ দিনের চলমান সংঘাতে সামরিকভাবে বড় সাফল্য না পেলেও ইসরায়েল সরকার তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক পরিস্থিতি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল যৌথ হামলা ও পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ।কী আছে তাদের ভাগ্যে । ব্রেকিং নিউজ জানতে চোখ রাখুন ইত্তেহাদ নিউজে............................ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং সামরিক তৎপরতার কারণে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা করা হয়, তাহলে “পুরো অঞ্চল আধা ঘণ্টার মধ্যে অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে।” যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। লারিজানি বলেন, “যদি তারা এমন কিছু করে, তাহলে আধা ঘণ্টার মধ্যে পুরো অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যাবে এবং সেই অন্ধকারে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকা মার্কিন সেনাদের খুঁজে বের করা সহজ হয়ে যাবে।” এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল যৌথ হামলা ও পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের হুমকি: এক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস করা সম্ভব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে খুব দ্রুতই ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে। মারিল্যান্ডে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমরা চাইলে এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের পুরো বিদ্যুৎ সক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারি। এবং সেটি পুনর্গঠনে তাদের ২৫ বছর সময় লাগবে।” ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে “প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ” করে ফেলেছে। তার ভাষায়, “তাদের কোনো নৌবাহিনী নেই, কোনো বিমান বাহিনী নেই, কোনো কার্যকর বিমান প্রতিরক্ষা নেই। আমরা সেই আকাশে মুক্তভাবে চলাচল করছি।” যুদ্ধের সূচনা: ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্যেই এই অভিযান শুরু করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, গত ১২ দিনে ইরানে প্রায় ৬ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা হয়েছে। সেন্টকমের তথ্যমতে— ৯০টির বেশি ইরানি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এর মধ্যে ৬০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে ৩০টির বেশি মাইন বসানোর জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে এই তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার বার্তা এই সংকটের মধ্যেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম সরকারি বিবৃতি দেন। তিনি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান এবং বলেন, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা হবে। মোজতবা খামেনি বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের বুঝতে হবে, আমাদের প্রতিরোধ চলবে।” হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের কেন্দ্র বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে— “ইরানের শত্রুদের ওপর চাপ বজায় রাখতে আমরা এই পথ দিয়ে এক লিটার তেলও যেতে দেব না।” যদি এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তেলের বাজারে অস্থিরতা ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে— হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হবে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্পের মন্তব্য: তেলের দাম বাড়লে লাভ যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দাম বৃদ্ধিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ তিনি লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক। তাই তেলের দাম বাড়লে আমরা অনেক টাকা উপার্জন করি।” তবে তিনি আরও বলেন, মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। তার ভাষায়, “আমাদের বড় লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়া।” মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে— ইসরাইল লেবাননের হিজবুল্লাহ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া এই গোষ্ঠীগুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব শক্তিগুলোর উদ্বেগ এই সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও রাশিয়া। তাদের মতে, যুদ্ধ বিস্তৃত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। কূটনৈতিক মহলের মতে, দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সামনে কী হতে পারে? বিশ্লেষকদের মতে সামনে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে— ১. সীমিত যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমিত সামরিক হামলা চলতে পারে। ২. আঞ্চলিক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। ৩. কূটনৈতিক সমাধান আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পথ তৈরি হতে পারে। ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামান্য ভুল হিসাবও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি, হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। বিশ্ব এখন নজর রাখছে—এই সংঘাত কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে হবে—অন্যথায় এসব ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দায়িত্ব গ্রহণের পর দেওয়া তার প্রথম বিবৃতিতে এই অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। এই বক্তব্য এমন এক সময় এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলছে। নতুন নেতৃত্ব, নতুন বার্তা ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্বে আসেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বার্তায় তিনি বলেন— “ইরান তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলের অস্থিরতার প্রধান কারণ।” তিনি দাবি করেন, ইরানের লক্ষ্য কোনো প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। তার ভাষায়, “এই ঘাঁটিগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের উপস্থিতি সরিয়ে নেয়।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ইরানের নতুন নেতৃত্বের কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে। যুদ্ধের ১১ দিনে নতুন কৌশল মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত ১১ দিনে ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন— ইরান সরাসরি বড় সামরিক ঘাঁটিতে হামলা না করে গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করছে এবং ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত করছে। পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “ইরান এমন লক্ষ্যবস্তু বেছে নিচ্ছে, যেগুলোকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা বলে মনে করছে।” এরবিলে ড্রোন হামলা সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকের এরবিল শহরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে ড্রোন হামলার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন— ওই হোটেলে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা একাধিক ড্রোন দিয়ে হামলা চালায়। এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, “এই হামলা প্রমাণ করে যে ইরান জানত মার্কিন সেনারা ওই হোটেলে অবস্থান করছিল।” বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সামরিক উপস্থিতির দুর্বলতা তুলে ধরেছে। পেন্টাগনের হতাহতের হিসাব পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত— ৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন ১৪০ জন আহত হয়েছেন এর মধ্যে ১০৮ জন আহত সেনা আবার দায়িত্বে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরানের দাবি— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ১৩০০ জন ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানের হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে, কৌশলে এগোতে চাইছে ইরান মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে যে সরাসরি সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন। তবে তারা এখন “স্ট্র্যাটেজিক সারভাইভাল” কৌশল অনুসরণ করছে। এই কৌশলের মূল ধারণা হলো— যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা ছোট ছোট হামলার মাধ্যমে চাপ বাড়ানো এবং রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা। একজন মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক বলেন, “যদি ইরান টানা বোমাবর্ষণের মধ্যেও সরকার টিকিয়ে রাখতে পারে, তাহলে তেহরান এটিকেই বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে।” হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা মোজতবা খামেনির ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। বিশ্বের প্রায়— ২০ শতাংশ তেল গ্যাস পরিবহন এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে— বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে। ইরানের লক্ষ্য কি শুধু মার্কিন ঘাঁটি? খামেনি তার বক্তব্যে দাবি করেছেন— “ইরান তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাস করে।” তবে তিনি একইসঙ্গে বলেন— “মার্কিন ঘাঁটিগুলোই আমাদের লক্ষ্য।” মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক উপস্থিতি রয়েছে— কাতার বাহরাইন কুয়েত ইরাক সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব ঘাঁটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মার্কিন সামরিক অপারেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খামেনি পরিবারের মৃত্যু নিয়ে বিভ্রান্তি এদিকে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহ বাগেরজাদেহ নিহত হয়েছেন। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এই খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়— খামেনির স্ত্রী জীবিত আছেন এবং মৃত্যুর খবর সঠিক নয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্য নিহত? তবে স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যম দাবি করেছে— ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় খামেনি পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন— এক পুত্রবধূ জামাতা এক মেয়ে কয়েকজন নাতি-নাতনি তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। প্রতিশোধের অঙ্গীকার নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রথম বক্তব্যে মোজতবা খামেনি নিহত ইরানিদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিবৃতিতে তিনি বলেন— “যারা ইরানের জনগণের রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের জবাব দেওয়া হবে।” এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের ভবিষ্যৎ সামরিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে বড় সংঘাতের আশঙ্কা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হতে পারে। সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো হলো— হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ বাড়া জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি দশকের সবচেয়ে বড় মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে রূপ নিতে পারে। মোজতবা খামেনির প্রথম বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে নতুন নেতৃত্বের অধীনে ইরান তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, ইরানের প্রতিশোধের হুমকি এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা—এই তিনটি বিষয় এখন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে—তা এখন নজরে রাখছে পুরো বিশ্ব।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালীতে নৌমাইন বসানো শুরু করেছে। এই দুটি ঘটনা একত্রে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলাগুলো তাদের সামরিক অভিযানের অংশ, যার নাম “অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪”। হাইফার তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলার দাবি ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সশস্ত্র বাহিনীর সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নতুন সামরিক হামলায় ইসরায়েলের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল— হাইফা শহরের তেল ও গ্যাস শোধনাগার জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংক তেলআবিবের কাছাকাছি একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ইরানি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী এটি তাদের সামরিক অভিযানের ৩৩তম ধাপ। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কেন গুরুত্বপূর্ণ হাইফার জ্বালানি অবকাঠামো হাইফা ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি কেন্দ্র। এই অঞ্চলে রয়েছে— দেশের প্রধান তেল শোধনাগার পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে তা ইসরায়েলের জ্বালানি সরবরাহ ও শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। তেলআবিবের কাছে স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ধ্বংসের দাবি ইরান দাবি করেছে, তেলআবিবের কাছে একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রও তাদের হামলায় ধ্বংস হয়েছে। এই ধরনের কেন্দ্র সাধারণত ব্যবহৃত হয়— সামরিক যোগাযোগ স্যাটেলাইট ডেটা ট্রান্সমিশন গোয়েন্দা নজরদারি যদি সত্যিই এই স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে তা ইসরায়েলের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে। পাল্টা হামলার যুক্তি ইরানের সামরিক বাহিনী বলছে, তাদের তেল ডিপোতে ইসরায়েলের হামলার জবাব হিসেবেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে— “ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই প্রতিরোধমূলক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।” সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আরেকটি ঘটনা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিরুদ্ধে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত প্রায় ৩টা ১৫ মিনিটে এই ঘটনা ঘটে। এক বিবৃতিতে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে— দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে নাগরিক ও বিদেশি বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে সম্ভাব্য সব হুমকির বিরুদ্ধে প্রস্তুত রয়েছে দেশটি হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানোর অভিযোগ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে আরেকটি খবর। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে নৌমাইন বসানো শুরু করেছে। সংবাদমাধ্যমের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী— গত কয়েক দিনে কয়েক ডজন মাইন বসানো হয়েছে ইরানের মাইন স্থাপনকারী জাহাজের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে চাইলে হাজার হাজার মাইন বসানোর সক্ষমতা রয়েছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ। এই সংকীর্ণ জলপথ— পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে বিশ্বের তেল পরিবহনের প্রধান রুট বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলবাহী ট্যাংকার এই প্রণালী অতিক্রম করে। যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়? বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। সম্ভাব্য প্রভাব— ১. তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে ২. বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে ৩. শিপিং খরচ ও বীমা বেড়ে যেতে পারে ৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় বাধা তৈরি হতে পারে ইরানের নৌ কৌশল ইরানের নৌবাহিনী ও ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড যৌথভাবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কৌশলের মধ্যে রয়েছে— নৌমাইন ব্যবহার দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা উপকূলভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন বোট এই কৌশলকে সামরিক বিশ্লেষকেরা বলেন “অ্যাসিমেট্রিক নেভাল ওয়ারফেয়ার”। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের উদ্বেগ গালফ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে— বাহরাইনে মার্কিন নৌবহরের ঘাঁটি কাতারে বড় বিমানঘাঁটি সৌদি আরব ও আমিরাতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই কারণে হরমুজ প্রণালীতে কোনো সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বৈরিতা রয়েছে। মূল কারণগুলো হলো— আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব এই দ্বন্দ্ব সরাসরি যুদ্ধের রূপ না নিলেও প্রায়ই প্রক্সি সংঘাত হিসেবে দেখা যায়। সংঘাতের সাম্প্রতিক টাইমলাইন ধাপ ১ ইরানের তেল ডিপোতে হামলার অভিযোগ ধাপ ২ ইরানের সামরিক প্রতিশোধের ঘোষণা ধাপ ৩ ইসরায়েলের জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি ধাপ ৪ আমিরাত লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়ার অভিযোগ ধাপ ৫ হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানোর খবর তেলের বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন— সংঘাত বাড়লে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে গালফ অঞ্চলের শিপিং রুট ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু করেছে। বিশেষ করে— ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্র গালফ সহযোগিতা পরিষদ তারা উত্তেজনা কমাতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সামনে কী হতে পারে বিশ্লেষকদের মতে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে— ১. সীমিত সামরিক সংঘাত চলতে পারে ২. আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে ৩. বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হতে পারে ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। হাইফার জ্বালানি স্থাপনায় হামলার দাবি, আমিরাত লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়া এবং হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানোর অভিযোগ— এই তিনটি ঘটনা একত্রে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের জেরে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের দাবি— ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি তাদের সামরিক অভিযানের অংশ, যার নাম ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’। হাইফার তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলার দাবি ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সশস্ত্র বাহিনীর সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নতুন হামলায় ইসরায়েলের জ্বালানি অবকাঠামোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী হামলার লক্ষ্য ছিল— ইসরায়েলের হাইফা শহরের তেল ও গ্যাস শোধনাগার জ্বালানি মজুদ ট্যাংক তেলআবিবের কাছাকাছি একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ইরানি সামরিক বাহিনী বলছে, এই হামলা ছিল তাদের সামরিক অভিযানের ৩৩তম ধাপ। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে তা ইসরায়েলের শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পাল্টা হামলার যুক্তি ইরানের সামরিক বাহিনী বলছে, তাদের তেল ডিপোতে ইসরায়েলের হামলার জবাব হিসেবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে— “ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জবাব দিতেই এই প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযান।” ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোও দাবি করছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল কৌশলগত অবকাঠামো, বেসামরিক এলাকা নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আরেকটি ঘটনা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিরুদ্ধে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে এই ঘটনা ঘটে বলে জানানো হয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে— দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে নাগরিক ও অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে যেকোনো হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত দেশটি এখনো পর্যন্ত কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানোর অভিযোগ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে আরেকটি খবর। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ইরান হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানো শুরু করেছে। সংবাদমাধ্যম CNN-কে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী— গত কয়েক দিনে কয়েক ডজন নৌমাইন স্থাপন করা হয়েছে ইরানের মাইন স্থাপনকারী জাহাজের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে চাইলে হাজার হাজার মাইন বসানোর সক্ষমতা রয়েছে এই তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে— বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় প্রতিদিন কয়েক কোটি ব্যারেল তেল ও গ্যাস ট্যাংকার চলাচল করে যদি এখানে মাইন পাতা হয় বা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে— বৈশ্বিক তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিতে পারে গালফ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে বিপ্লবী গার্ডের হুঁশিয়ারি গত সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) এক সতর্কবার্তায় বলেছিল— “হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো শত্রু জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে ধ্বংস করা হবে।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য শুধু সামরিক হুমকি নয়, বরং আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে। ইরানের নৌ সক্ষমতা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌবাহিনী এবং বিপ্লবী গার্ড যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তাদের কাছে রয়েছে— নৌমাইন দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা উপকূলভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন বোট এই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে তারা খুব দ্রুত ওই অঞ্চলে বড় ধরনের নৌ অবরোধ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের উদ্বেগ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে— গালফে মার্কিন নৌবহর কাতার ও বাহরাইনে সামরিক ঘাঁটি সৌদি আরব ও আমিরাতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই কারণে হরমুজ প্রণালীতে কোনো সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। তেলের বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি হরমুজ প্রণালীতে সংঘাত বাড়ে, তবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো— আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি,জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত,শিপিং বীমা খরচ বেড়ে যাওয়া,গালফ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা? বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, উত্তেজনা দ্রুত বাড়লেও এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়নি। তবে তিনটি বিষয় পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে— সরাসরি ইরান-ইসরায়েল সংঘাত গালফ রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি যদি এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আলোচনার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে— ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্র গালফ সহযোগিতা পরিষদ তারা উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে— ১. সীমিত সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে পারে ২. কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে ৩. গালফ অঞ্চলে নৌ নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে তবে যদি হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান ‘বেআইনি হামলার’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। শুক্রবার তিনি সতর্ক করে বলেন, সংঘাত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। জাতিসংঘ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনী। ইরানও এর জবাবে ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন জানায়, তেহরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি ঠেকাতেই এই অভিযান। তবে এই হামলায় দেশটির সরকার কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করছেন। এদিকে গুতেরেস বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে চলমান সব বেআইনি হামলা ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ও ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে অসহায় মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এখন লড়াই থামানোর এবং গুরুত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করার সময়।’ জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার শুক্রবার বলেন, ‘আমরা দেখছি যে এই যুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ডলার অর্থাৎ রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ রাজনীতিবিদরা অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ করা সহায়তা তহবিল কাটছাঁট করার বড়াই করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তি ও বিচারহীনভাবে মানুষ হত্যার এক ভয়াবহ সমন্বয় দেখছি।’ ফ্লেচার বলেন, ‘মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি ও বেপরোয়া যুদ্ধ ঠেকাতে যে সব আইন ও ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোর ওপর এখন লাগাতার আঘাত করা হচ্ছে।’ যুদ্ধের অন্যান্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সতর্ক করেন, এই সংঘাতের ফলে বাজার ব্যবস্থা ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোই সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। Iran Israel War, Middle East Crisis, UN Warning, Global Economy Risk, Trump Iran Conflict
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।