Brand logo light

ভূরাজনীতি

মুসলিম দেশগুলো নিয়ে জোট গড়তে চায় ইরান
মুসলিম দেশগুলোর শক্তিশালী জোট গঠনের আহ্বান ইরানের প্রেসিডেন্টের, হরমুজে নিরাপদ নৌপথ চালুর উদ্যোগ ওমানের

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ইসলামী বিশ্বের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঐক্য জোরদারের লক্ষ্যে শক্তিশালী মুসলিম দেশগুলোর একটি কার্যকর জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এমন এক সময় এই আহ্বান এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সংকট, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। তার মতে, ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই মুসলিম দেশগুলোকে অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। পাকিস্তানকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে তেহরান বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের সরকার, জনগণ এবং সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিশেষ করে আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তেহরান-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও গভীর করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে এই সফর। পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপের মুখেও ইরানের সরকার, জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনী ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তার দাবি, এই ঐক্যই প্রতিপক্ষের কৌশলগত লক্ষ্য ব্যর্থ করেছে। ‘প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে কোনো আলোচনা নয়’ ইসলামাবাদে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতা করা হবে না। তার ভাষ্য, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। “যদি ইরান প্রতিরক্ষার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি না করত, তাহলে দেশটি গাজা উপত্যকার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারত,” বলেন তিনি। পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকার অবস্থানেরও সমালোচনা করেন এবং দাবি করেন, তাদের ঘোষিত নীতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ করিডোর: কেন গুরুত্বপূর্ণ? অন্যদিকে, বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ওমান। ওমানের ম্যারিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার জানিয়েছে, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সহযোগিতায় একটি অস্থায়ী ট্রানজিট করিডোর বা নিরাপদ নৌপথ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ এবং টোলমুক্ত ও নিরাপদ নৌপরিবহন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে ঘোষণায় ইরানের ভূমিকা বা অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা? বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের আহ্বান, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আপসহীন অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা উদ্যোগ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এই অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে ইরানের বার্তা স্পষ্ট—তেহরান একদিকে মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য চাইছে, অন্যদিকে নিজের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসতে রাজি নয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২৫, ২০২৬ 0
ফাটল ধরতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটে
দক্ষিণ লেবানন সংকট: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে বিভাজন তৈরির সুযোগ দেখছে ইরান

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দক্ষিণ লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ভল্ফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সীমান্ত সংঘাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ। আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশ্লেষণধর্মী সাক্ষাৎকারে পুস্তাই বলেছেন, তেহরানের প্রধান লক্ষ্য এখন দক্ষিণ লেবাননের সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করা। তার মতে, ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থানের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কোথায় দেখছেন সুযোগ? পুস্তাইয়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইরানের কৌশল শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্পর্ককে ঘিরে নয়। বরং এটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মধ্যকার সম্ভাব্য মতপার্থক্যকেও কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। তার মতে, তেহরান বিশ্বাস করে যে চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে দুই মিত্র দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে। আর সেই ব্যবধানই ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে। লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান থামানো কি সম্ভব? বিশ্লেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান অবশ্যই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি বলেন, তেহরান, বৈরুত, হিজবুল্লাহ, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র—সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই জানে যে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়। কারণ ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থে হামলার জবাবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নীতি দীর্ঘদিনের। ফলে সংঘাতের মাত্রা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থাকলেও ময়দানের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল বলে মনে করছেন তিনি। ট্রাম্পের কূটনীতি বনাম ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাব পুস্তাই মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েল এমন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করবে যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যায়, তাহলে ইসরায়েল প্রয়োজনীয় সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে দ্বিধা করবে না। অর্থাৎ কূটনৈতিক সমন্বয় বজায় রাখার চেষ্টা থাকলেও নিরাপত্তা প্রশ্নে তেল আবিবের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত সমীকরণ বিশ্লেষকের মূল্যায়নে, বর্তমান সংকটকে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে। কারণ সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে প্রতিপক্ষ জোটের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরত্ব সৃষ্টি করা তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কৌশল হতে পারে। তার মতে, তেহরানের বর্তমান মনোযোগ মূলত ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্কের ভেতরে সম্ভাব্য ফাটল তৈরি করার দিকে। আর দক্ষিণ লেবাননের চলমান পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।   মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কেবল সীমান্ত সংঘাত বা সামরিক অভিযানের প্রশ্ন নয়; এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তার, জোট রাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের লড়াইও। ভল্ফগ্যাং পুস্তাইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান এখন সরাসরি সংঘর্ষের চেয়ে প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে কাজে লাগানোর পথেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে শুধু নিরাপত্তা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২২, ২০২৬ 0
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি : নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতা, পারমাণবিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি সমঝোতার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার দাবি সামনে এলেও এখনো পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ যৌথ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ইউরোপের চার দেশের অবস্থান যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বাস্তব ও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলে তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। দেশগুলো বলেছে, ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখবে। এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সম্ভাব্য চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় সেটিকে সীমাবদ্ধ রাখা। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালির প্রশ্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে যে, সম্ভাব্য চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, কিন্তু আনুষ্ঠানিক নথি কোথায়? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যিনি নিজেকে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলোর একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, হোয়াইট হাউস কিংবা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে চুক্তির প্রকৃত কাঠামো, বাস্তবায়ন পদ্ধতি কিংবা আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। জেনেভায় স্বাক্ষরের সম্ভাবনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন, সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর উভয় পক্ষের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্ধারিত তারিখে স্বাক্ষর সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে কূটনৈতিকভাবে ‘চলমান আলোচনা’ হিসেবেই দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক। বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘ মহাসচিব এই সমঝোতাকে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিশেষভাবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও আঞ্চলিক শান্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগে যেকোনো উসকানিমূলক বক্তব্য বা সম্ভাব্য নাশকতা পুরো প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বার্তা অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেছেন, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা প্রয়োজন। তারা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দূর করতে হবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আশা প্রকাশ করেছেন যে, সম্ভাব্য চুক্তি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধ সমাধানে সহায়ক হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রচার বনাম বাস্তবতা ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং কয়েকটি দেশীয় সংবাদমাধ্যম চুক্তিটিকে ‘ইরানের বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের দাবি, দীর্ঘ কূটনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনে কোনো স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র, আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতি বা আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইকৃত নথি প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া ইরান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা এখনো সরাসরি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেননি। কী বলছেন বিশ্লেষকরা? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা। তাদের মতে, সম্ভাব্য চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর, চুক্তির শর্ত প্রকাশ এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য এই সমঝোতা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তবে এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের বড় অংশই রাজনৈতিক বক্তব্য, কূটনৈতিক ইঙ্গিত এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবির ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে কি না, নাকি আলোচনা এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে—সেই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, চুক্তির লিখিত নথি এবং আন্তর্জাতিক যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ১৫, ২০২৬ 0
৫৬ শতাংশ বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী ইসরাইল!
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বহুমাত্রিক প্রভাব: বেসামরিক মৃত্যুর ৫৬% ইসরাইলি হামলায়, চাপে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের ৫০ সামরিক ঘাঁটি

 ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতগুলোতে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘বিস্ফোরক অস্ত্র পর্যবেক্ষণ’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে বিস্ফোরক অস্ত্রের হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের মৃত্যুর জন্য ইসরাইল দায়ী। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে এমন বিস্ফোরক হামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। এসব ঘটনার প্রায় ৯০ শতাংশই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নথিভুক্ত হয়েছে। বেসামরিক জনগণই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা। বেসামরিক হতাহতের হার গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপক সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার একটি বিপজ্জনক প্রবণতায় পরিণত হচ্ছে। তার ভাষায়, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি চলতে থাকলে এটি বৈশ্বিক সংঘাতের একটি ‘স্বাভাবিক বাস্তবতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক আইন কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। যুদ্ধের অভিঘাত পৌঁছেছে ইউরোপের অর্থনীতিতেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশটির অর্থনীতি ০.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এর আগে মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ০.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস বলেন, সংঘাত শুরুর আগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল এবং মূল্যস্ফীতি কমছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব যুক্তরাজ্যের ওপরও পড়বে বলে তিনি স্বীকার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ভোক্তা উভয়ই চাপে পড়েছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে। স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এদিকে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলমান সংঘাতের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের অন্তত ৫০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সদরদফতর, বিমানঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র এবং নৌবাহিনীর বিভিন্ন অবকাঠামো। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একাধিক সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলায় ইরানের যুদ্ধবিমান, নৌযান এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধবিরতি, কিন্তু উত্তেজনা বহাল সাম্প্রতিক সময়ে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইসরাইল ও ইরানও একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায়। যদিও এক মাসের বেশি সময় ধরে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও আঞ্চলিক উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে ইরানকে পরাজিত করেছে। তবে বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ বলছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির টানেল প্রবেশপথ পুনর্নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্যাটেলাইট তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা। বিশ্লেষকদের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর অঞ্চলটির স্যাটেলাইট চিত্রের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্চ মাসে পেন্টাগন স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেটকে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলাকার নতুন ছবি প্রকাশ সীমিত করার অনুরোধ জানায়। প্ল্যানেটের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল যাতে স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে কোনো প্রতিপক্ষ শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বা ন্যাটো অংশীদারদের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে না পারে। সামনে কী অপেক্ষা করছে? সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট এখনো শেষ হয়নি। বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি, ইরানের সামরিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এই সংঘাতের প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ১৩, ২০২৬ 0
হরমুজ সংকট ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা: যুদ্ধ, কূটনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা

ইত্তেহাদনিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন এক অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ধারণা ছিল, সামরিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে দুর্বল করে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে আনা সম্ভব হবে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাস্তবতা তাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দ্রুত পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। বরং পরিস্থিতি এখন এমন এক দীর্ঘমেয়াদি ও ক্ষয়িষ্ণু সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, যা যেকোনো সময় বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইরানের সক্ষমতা নিয়ে নতুন হিসাব সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, প্রণালির কাছে একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি। এই ঘটনাকে অনেক পর্যবেক্ষক ওয়াশিংটনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যেও ইরান এখনও আঞ্চলিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। ইরানের দৃষ্টিতে, এই সংঘাতে টিকে থাকাই এক ধরনের বিজয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত নৌপথের ওপর প্রভাব বজায় রাখা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ট্রাম্পের সামনে কঠিন সমীকরণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে তাকে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত না করে কূটনৈতিক পথও খোলা রাখতে হচ্ছে। মার্কিন রাজনৈতিক মহলে যুদ্ধ নিয়ে সমর্থন আগের তুলনায় কমেছে বলেও বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে ট্রাম্প এমন একটি সমাধান খুঁজছেন, যা অভ্যন্তরীণভাবে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার পথও তৈরি করবে। তবে ইতিহাসের বহু সংঘাতের মতো এখানেও একটি বাস্তবতা সামনে এসেছে—যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, স্পষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ততটাই কঠিন। নেতানিয়াহুর কৌশল নিয়ে প্রশ্ন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে সামরিক শক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বারবার বলেছেন। তবে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেওয়ার যে লক্ষ্য ছিল, তা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোথায় ভুল হয়েছিল? ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ ধারণা করেছিলেন যে, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ইরান অভ্যন্তরীণভাবে ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং কয়েক দশক ধরে বহিরাগত চাপ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো এবং আদর্শিক ভিত্তির কারণে দেশটি এখনও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সহনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণ এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপে নতুন করে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তবে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজগান প্রদেশ এবং পারস্য উপসাগর উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। পাল্টাপাল্টি হামলা ও উত্তেজনা মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে উভয় পক্ষই হামলা বন্ধের ঘোষণা দেয়। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড সতর্ক করে জানিয়েছে, নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার জবাব আরও কঠোর হবে। আঞ্চলিক কূটনীতির তৎপরতা মার্কিন হামলার পর সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে টেলিফোনে কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে তেহরান। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সামনে কী? বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সংকট দ্রুত নিরসনের সম্ভাবনা সীমিত। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য নতুন নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়তে পারে। ফলে যুদ্ধ ও কূটনীতির মধ্যকার টানাপোড়েন এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইরান বা ইসরাইলের নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ১১, ২০২৬ 0
ওমান উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা ইরানের, নতুন যুদ্ধবিরতিতে লেবানন-ইসরায়েল

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক :  মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মোড় নিয়েছে। একদিকে ওমান উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান, অন্যদিকে নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে লেবানন ও ইসরায়েল। পরস্পর-সংযুক্ত এই দুই ঘটনাকে বিশ্লেষকরা বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন। ইরানের অভিযোগ, ওমান উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের দাবি কী? বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (৩ জুন) ইরানের নৌবাহিনী দাবি করে যে তারা ওমান উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানি নৌবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন, মার্কিন আগ্রাসী আচরণ এবং ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর জাহাজটিকে শনাক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ইরান আরও দাবি করেছে, তারা ওই জাহাজকে একটি “শত্রুতামূলক তৎপরতার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র” হিসেবে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ইরানের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের উপস্থাপিত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ নিরাপদ রয়েছে এবং নির্ধারিত কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, অঞ্চলে তাদের নৌ-উপস্থিতি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করার অংশ। কেন গুরুত্বপূর্ণ ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি? বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক অবস্থানগত সংঘাতের ঝুঁকি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। একই সময়ে যুদ্ধবিরতিতে লেবানন ও ইসরায়েল অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাতপূর্ণ ফ্রন্টে আপাতত উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, লেবানন ও ইসরায়েল নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। এ চুক্তির আওতায় দক্ষিণ লিতানি নদী অঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব গ্রহণ করবে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী। সংঘাতের পেছনের প্রেক্ষাপট গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে মার্চ মাসে দক্ষিণ লেবাননে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এর জবাবে হিজবুল্লাহও পাল্টা হামলা চালায়। সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এক হাজারেরও বেশি লেবাননি নিহত হয়েছেন। এছাড়া বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বহু মানুষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবকাঠামো। আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য কী বার্তা? মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি একটি দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে লেবানন-ইসরায়েল ফ্রন্টে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা কমতে পারে। তবে একই সময়ে ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৃহত্তর অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি কাটবে না। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং লেবাননকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আগামী সপ্তাহগুলোতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।  

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ৫, ২০২৬ 0
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ২০ মার্কিন সামরিক স্থাপনা, স্থগিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানী ইউনিট ‘বিবিসি ভেরিফাই’-এর এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে লেবানন ও ইসরাইলকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। স্যাটেলাইট ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কোথায় কী ধরনের ক্ষতি? বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদাদ বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন নজরদারি বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার বিমানের অবস্থানস্থলেও ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প আরিফজান এলাকায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ শনাক্ত করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে জ্বালানি সংরক্ষণ বাঙ্কার, হ্যাঙ্গার এবং আবাসিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। তবে এসব দাবির বিপরীতে হোয়াইট হাউস দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মার্কিন বাহিনীর কার্যক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। কূটনৈতিক যোগাযোগে বিরতি সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান এবং লেবাননের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করেছে তেহরান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যে যোগাযোগ চলছিল, তা আপাতত বন্ধ রাখা হবে। ইরানের অভিযোগ, গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। তেহরানের অবস্থান হলো—লেবাননে হামলা বন্ধ হওয়া যেকোনো আঞ্চলিক সমঝোতার মৌলিক শর্ত। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় খসড়া চুক্তি ও বার্তা বিনিময় কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ইরানের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ডেলিভারির ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের বেশি পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯২ ডলারের ওপরে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কুয়েতে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি উত্তেজনার মধ্যেই কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস অঞ্চলে মার্কিন হামলার জবাবে স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। হামলায় চার মার্কিন সেনা এবং তিনজন বেসামরিক ঠিকাদার আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে প্রতিহত করেছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এর আগে হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী সিরিক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবেও পাল্টা আঘাত হানার দাবি করেছিল তেহরান। লেবাননকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লেবাননে কার্যকর যুদ্ধবিরতি অপরিহার্য। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, সংঘাত বন্ধ না হলে কূটনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনে হিজবুল্লাহকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে তেহরান। অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতের উপকণ্ঠে নতুন করে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে ইসরাইলি বাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বোফোর্ট দুর্গ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে। নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সামরিক অভিযান আরও সম্প্রসারণ করা হবে। আঞ্চলিক সংঘাত কি আরও বিস্তৃত হচ্ছে? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর কেবল গাজা বা লেবাননে সীমাবদ্ধ নেই। সামরিক হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত, কূটনৈতিক আলোচনা স্থগিত হওয়া এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আরও বিস্তৃত সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইরানের অবস্থান এবং ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২, ২০২৬ 0
ইরাকের উত্তরাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইরান
ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আইআরজিসির বিমান ও স্থল অভিযান শুরু

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বিমান ও স্থল—দুই ধরনের সমন্বিত হামলা নিয়ে পরিচালিত এই অভিযানকে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোববার (৩১ মে) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির স্থল বাহিনী অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে অভিযানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, হামলার স্থান কিংবা কোন কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে—সেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ পর্যন্ত অভিযান থেকে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, সে সম্পর্কেও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। ফলে অভিযানের প্রকৃত ব্যাপ্তি এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি এখনও স্পষ্ট নয়। সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ইরান-বিরোধী সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী সীমান্তবর্তী এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে ইরানের ভেতরে নিরাপত্তা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা দেশটির জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় সংঘর্ষ, অনুপ্রবেশ এবং সশস্ত্র তৎপরতা বৃদ্ধির অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অভিযান? আইআরজিসির সর্বশেষ এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পরিচালিত সশস্ত্র কার্যক্রম তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এই অভিযান শুধু সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা দুর্বল করার প্রচেষ্টা নয়; একই সঙ্গে এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। এর মাধ্যমে তেহরান দেখাতে চাইছে যে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যেকোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির বিরুদ্ধে তারা প্রয়োজন হলে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্ন অভিযানটি ইরান-ইরাক সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। যদিও অভিযানের বিস্তারিত তথ্য এখনও সীমিত, তবু এটি স্পষ্ট যে সীমান্তবর্তী কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ও সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ে তেহরানের উদ্বেগ আগের মতোই বহাল রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিযানের পরবর্তী ধাপ, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং ইরাকের অবস্থান—এসব বিষয় আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ১, ২০২৬ 0
হরমুজ
হরমুজে গোপন সমঝোতার ইঙ্গিত, যুদ্ধের কিনারায় নতুন কূটনৈতিক হিসাব

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন মোড়ের ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া কাঠামো হাতে এসেছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। খসড়াটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কৌশলগত পথ হরমুজ প্রণালিতে আবারও যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা। বুধবার (২৭ মে) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য এই সমঝোতার আওতায় এক মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে তেহরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশে সামরিক উপস্থিতি কমাবে এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পথে এগোবে। তবে খসড়া কাঠামোয় সামরিক জাহাজ চলাচল অন্তর্ভুক্ত নয়। এতে ওমানের সহযোগিতায় হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইরান পালন করবে বলেও উল্লেখ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকর হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন ধরনের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। ‘চূড়ান্ত যাচাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নয়’ ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাস্তব যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা ছাড়া তারা কোনো ধরনের চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে না। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হলে সেটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাব হিসেবে অনুমোদনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে পরিস্থিতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে; অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায় এবং সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে বলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। আইআরজিসির কড়া হুঁশিয়ারি কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বাহিনীটির নৌবাহিনীর উপরাজনৈতিক প্রধান মোহাম্মদ আকবরজাদেহ ইরানের দক্ষিণ উপকূলকে “আগ্রাসনকারীদের কবরস্থান” বানানোর হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শত্রুর দুর্বলতার কারণে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।” ইরানের দীর্ঘ দক্ষিণ উপকূলের দুই প্রান্তের স্থান—চাবাহার থেকে মাহশাহর পর্যন্ত—উল্লেখ করে আকবরজাদেহ বলেন, “এই পুরো অঞ্চল আগ্রাসনকারীদের জন্য কবরস্থানে পরিণত হবে।” বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার বার্তা, অন্যদিকে সামরিক হুঁশিয়ারি—এই দ্বৈত কৌশলের মাধ্যমে ইরান আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখতে চাইছে। যুদ্ধবিরতিতে চীনের সক্রিয় কূটনীতি মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি রক্ষায় সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে চীনও। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বিতর্কে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়াকে দেওয়া বক্তব্যে ওয়াং ই বলেন, “আমরা আশা করি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে এবং পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাবে, যাতে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসে।” চীনের দাবি, তারা সংঘাত নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রধান পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রেখেছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী দক্ষিণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং মাইন পাতার চেষ্টা করা নৌকাগুলোর ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ইরান এটিকে যুদ্ধবিরতির পরিপন্থী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তেহরান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পাল্টা প্রতিশোধের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই পথের যেকোনো অস্থিতিশীলতা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বাস্তব রূপ পায়, তাহলে তা শুধু উপসাগরীয় নিরাপত্তা নয়, বরং বৈশ্বিক তেলবাজার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে এখনো চুক্তিটি আনুষ্ঠানিক নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই ভঙ্গুর শান্তি কতটা স্থায়ী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।  

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৮, ২০২৬ 0
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নয়
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নয়: সৌদি আরবের অনড় অবস্থান, বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র সৌদি আরব স্পষ্ট করে দিয়েছে—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না রিয়াদ।  ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি আরব তাদের পুরোনো অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি। বরং চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতা, ইরান ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার বাস্তবতায় রিয়াদ এখন আরও সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্পের আহ্বান, সৌদির ‘না’ সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে একটি বৃহৎ সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মুসলিম দেশ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে পারে। তবে সেই বক্তব্যের পরপরই সৌদি আরবের অবস্থান নতুন করে আলোচনায় আসে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অন্যতম কূটনৈতিক লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে আনা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে এক বৈঠকে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। জবাবে সৌদি যুবরাজ স্পষ্ট ভাষায় জানান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া রিয়াদ কোনো চুক্তিতে যাবে না। সৌদি যুবরাজ ওই আলোচনাকে “গঠনমূলক” বলে উল্লেখ করলেও তিনি পরিষ্কার করেন, দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের রূপরেখা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্নই আসে না। পাকিস্তানের কড়া অবস্থান সৌদি আরবের পাশাপাশি পাকিস্তানও ট্রাম্পের উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামা টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মুসলিম-প্রধান দেশগুলোকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত করার মার্কিন প্রচেষ্টা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ইসলামাবাদ কখনোই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না। পাকিস্তান স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইসরায়েল ভ্রমণও আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। ইরান যুদ্ধ বদলে দিয়েছে হিসাব আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত ও তার অর্থনৈতিক-নিরাপত্তাগত প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতায় ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের ধাক্কায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত নয়। বরং সংকটকালে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার ইসরায়েলকেই রক্ষা করা। লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগ করলেও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় ওয়াশিংটনের আচরণ তাদের হতবাক করেছে। তার ভাষায়, “আমরা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের শেষ সময় দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।” নতুন শান্তি উদ্যোগে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও নতুন সমঝোতার রূপরেখা তৈরিতে পাকিস্তান ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। গত সপ্তাহে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান ও বাহরাইনের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রথমবারের মতো সমন্বিতভাবে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটি আঞ্চলিক শান্তি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। টাইমস অব ইসরায়েল–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়, “ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে ইরান যুদ্ধ শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাইডলাইনে বসে যুদ্ধের সমাপ্তি দেখছে।” আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এখন চাপের মুখে ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এই উদ্যোগই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ নামে পরিচিত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। সূত্র বলছে, সম্প্রতি ট্রাম্প যখন আরও দেশকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, তখন অংশগ্রহণকারী নেতাদের অনেকেই নীরব থাকেন। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা সংকট, ইরান যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার কারণে এখন আরব বিশ্বে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো কূটনৈতিক সমীকরণ দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘মুসলিম ন্যাটো’ বনাম নতুন জোট রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের আলোচনা ইতোমধ্যে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরির আলোচনা চলছে, যেখানে তুরস্ক, কাতার ও মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ একে “মুসলিম ন্যাটো” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে গড়ে উঠছে আরেকটি কৌশলগত জোট, যা ‘I2U2’ নামে পরিচিত। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো এইচ এ হেলিয়ার মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে—তেহরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তার মতে, “উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এমন এক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের পাশে নাও থাকতে পারে।” বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্ন নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। তবে একটি বিষয় এখনো অপরিবর্তিত—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের অবস্থান। আর এই অবস্থানই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৭, ২০২৬ 0
নতুন সামরিক হুঁশিয়ারির নেপথ্যে কী
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি: হরমুজ, পারমাণবিক কর্মসূচি ও নতুন সামরিক হুঁশিয়ারির নেপথ্যে কী?

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে আলোচনার টেবিলে শান্তির ইঙ্গিত মিললেও, একইসঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করছে তেহরান। ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে তৈরি হয়েছে দ্বৈত বাস্তবতা—একদিকে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা, অন্যদিকে আরও ভয়াবহ সংঘাতের হুঁশিয়ারি। ইরানের সংবাদমাধ্যম ‘তাসনিম নিউজ’ জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে আলোচনা ভেস্তে গেলে সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত রয়েছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা আগেই বলেছিলেন, “ট্রিগারে হাত রেখেই” তারা আলোচনায় বসেছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও “জায়নবাদী শাসন” ইসরাইলের অতীত ভূমিকা এবং বর্তমান সামরিক অবস্থান বিবেচনায় রেখে তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রয়েছে। তাসনিমকে দেওয়া এক সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও “ভুল হিসাব” করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন বা “অপরাধমূলক পদক্ষেপ” নেয়, তাহলে তারা “ইরানের তৃতীয় ধাপের মোকাবিলা”র মুখে পড়বে। সূত্রটি দাবি করেছে, এই নতুন সামরিক কৌশল আগের দুই দফা সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। লক্ষ্য নির্বাচন, সামরিক পদ্ধতি, প্রযুক্তি এবং ব্যবহৃত সরঞ্জাম—সব ক্ষেত্রেই ভিন্ন মাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের। যুদ্ধবিরতির খসড়ায় কী থাকছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য চুক্তিতে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর অতিরিক্ত কোনো টোল আরোপ করা হবে না। এছাড়া ওই অঞ্চলে স্থাপন করা নৌ-মাইন সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও ইরান নিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কিছু বন্দর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং দেশটির তেল খাতে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ও বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা ইরানের বৈদেশিক তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ কমানোর বিনিময়ে ইরানের কাছ থেকে কৌশলগত ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমীকরণ সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। একইসঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রস্তাবনায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। যদিও তেহরান অতীতে বারবার দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে ওয়াশিংটন। একই ধরনের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগরেহিও দুই দেশের অবস্থান আগের তুলনায় “অনেক কাছাকাছি” এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত কার হাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি সর্বোচ্চ নেতাআলী খামেনি-এর অনুমতি ছাড়া চূড়ান্ত হবে না। তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “দেশে কোনো সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোর বাইরে এবং সর্বোচ্চ নেতার অনুমতি ছাড়া নেওয়া হবে না।” তিনি আরও বলেন, সমাজে বিভাজন তৈরি করে এমন যেকোনো বক্তব্য কার্যত “শত্রুর অবস্থানকে শক্তিশালী করে।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ থামলেও উত্তেজনা কি থামবে? সম্ভাব্য সমঝোতা কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ইরানের ধারাবাহিক সামরিক হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করছে, অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি কাটেনি। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পুরো সময়জুড়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকতে পারে। যদিও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা কার্যকর হলে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই আলোচনা কেবল যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণেরও একটি বড় পরীক্ষা।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৫, ২০২৬ 0
ইরান
ইরানকে ঘিরে নতুন যুদ্ধের শঙ্কা: ট্রাম্পের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভেদের অভিযোগ তেহরানের

 ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যে আবারও নতুন করে উত্তেজনা ঘনীভূত হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বে বিভেদ সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ভাষার হুমকি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইরানি প্রেসিডেন্টের দাবি, তেহরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করা এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া। পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও “জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী” ইরানে হামলার মাধ্যমে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল, যাতে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তার অভিযোগ, পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভাজন তৈরির কৌশল অনুসরণ করছে, যাতে আঞ্চলিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়। ‘পুনরায় হামলা হলে ভয়াবহ জবাব’ এদিকে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবোলফজল শেকারচি মার্কিন প্রশাসনকে সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে “নজিরবিহীন”। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন যদি আবারও ইরানে হামলার পথ বেছে নেয়, তবে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ “আকস্মিক ও তীব্র আঘাতের” মুখে পড়বে। শেকারচির ভাষায়, ইরান একটি দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা ও সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছে। শান্তি আলোচনা অচলাবস্থায় ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে তেহরান যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত কোনও বড় ছাড় দিতে রাজি হয়নি। বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ইরানকে মাত্র একটি পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখার অনুমতি এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদের সামান্য অংশও ছাড় করতে রাজি হয়নি। একই সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য কোনও ধরনের ক্ষতিপূরণ নিয়েও ওয়াশিংটনের আগ্রহ নেই বলে দাবি তেহরানের। ইরানের দৃষ্টিতে এসব শর্ত “শান্তির প্রস্তাব” নয়; বরং কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ। মেহর নিউজ এজেন্সিও একই ধরনের অভিযোগ তুলে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে, যা তারা সামরিকভাবে অর্জন করতে পারেনি। ইরানের পাল্টা প্রস্তাব কী ছিল তেহরানের প্রস্তাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছিল। বিশেষ করে, ইসরায়েলের লেবানন অভিযান বন্ধ, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানায় ইরান। এ ছাড়া বিদেশে অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ মুক্ত করার আহ্বানও ছিল ওই প্রস্তাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ যুদ্ধের শুরু থেকেই কার্যত সীমিত অবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্পের নতুন হুমকি এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে উদ্দেশ করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “সময় ফুরিয়ে আসছে। তাদের খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্যথায় আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।” একই পোস্টে বড় অক্ষরে তিনি লেখেন, “সময় অত্যন্ত মূল্যবান।” এর আগে ট্রাম্প নিজের একটি ছবি পোস্ট করে সেটির ক্যাপশনে লিখেছিলেন, “এটি ছিল ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থা।” ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ইরান। যুদ্ধবিরতির পর নতুন করে সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চীনের উদ্বেগ নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনার কয়েক দিন আগেই চীন সফর শেষ করেন ট্রাম্প। সফরকালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও শি সরাসরি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি, তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে। বেইজিংয়ের ভাষ্য, এটি এমন একটি যুদ্ধ “যা কখনও শুরু হওয়া উচিত ছিল না এবং যার অব্যাহত থাকারও কোনও যৌক্তিকতা নেই।”

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ১৮, ২০২৬ 0
ইসরাইল
গাজা যুদ্ধের পর বিশ্বে সবচেয়ে নেতিবাচক ভাবমূর্তির দেশ ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্রও নেমেছে ‘হুমকি রাষ্ট্র’ তালিকায়

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বের মানুষের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা দেশ ইসরাইল। এর পরেই রয়েছে উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরান। বিপরীতে সবচেয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তির দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ড, কানাডা, জাপান, সুইডেন ও ইতালির নাম। গণতন্ত্র ও বৈশ্বিক জনমত নিয়ে পরিচালিত নতুন আন্তর্জাতিক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ শীর্ষক এই সমীক্ষা পরিচালনা করেছে বৈশ্বিক জরিপ সংস্থা Nira Data। জরিপে বিশ্বের ১২৯টি দেশ ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নিয়ে ৪৬ হাজার ৬৬৭ জন উত্তরদাতা মতামত দিয়েছেন। একইসঙ্গে সংস্থাটির ‘গ্লোবাল ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ জরিপে ৯৮টি দেশের ৯৪ হাজার ১৪৬ জন নাগরিক নিজ নিজ দেশে গণতন্ত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। গাজা যুদ্ধের প্রভাব জরিপ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান, ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা, খাদ্য ও মানবিক সহায়তায় অবরোধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরাইলের ভাবমূর্তি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আদালতগুলোও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধ আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা অভিযানের পর বিশ্ব জনমতের পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান হয়। এতে বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, গাজার অধিকাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত অবস্থায় পড়েছে। জাতিসংঘের একাধিক বিশেষজ্ঞ ও গণহত্যা গবেষক পরিস্থিতিকে “গণহত্যাসদৃশ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতেও বড় পতন সমীক্ষায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার নাটকীয় অবনতি। জরিপ অনুযায়ী, বৈশ্বিক জনমতের বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা পাঁচ দেশের একটি। এমনকি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সূচকে দেশটি রাশিয়া ও চীনেরও নিচে অবস্থান করছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেট ইতিবাচক ধারণার স্কোর ছিল +২২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে -১৬ শতাংশে। মাত্র দুই বছরে ৩৮ পয়েন্ট পতনকে গবেষকেরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর পররাষ্ট্রনীতি, ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা, আগ্রাসী শুল্কনীতি, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে বিতর্কিত অবস্থান, ইউক্রেনকে সহায়তা কমানো এবং ইরানকে ঘিরে মার্কিন-ইসরাইল জোটের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া বহু উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে এখন “বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি” হিসেবে দেখছেন। এ তালিকায় রাশিয়া ও ইসরাইলের পরই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান উঠে এসেছে। ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ অভিযোগ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘে ইসরাইলকে জবাবদিহি থেকে রক্ষা করা, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং মানবাধিকার প্রশ্নে নির্বাচিত অবস্থান নেওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে মার্কিন নীতিকে “দ্বৈত মানদণ্ড” হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে অনেকের চোখে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শুধু একটি বৈশ্বিক শক্তি নয়; বরং আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত রাজনীতিরও প্রতীক হয়ে উঠছে। গণতন্ত্র মূল্যায়নের নতুন ধারা ‘গ্লোবাল ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক গণতন্ত্র জরিপ হিসেবে দাবি করেছে। বিশেষজ্ঞভিত্তিক রেটিংয়ের পরিবর্তে এই জরিপে সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গণতন্ত্রের মান মূল্যায়ন করা হয়। জরিপে যেসব সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নাগরিক শিক্ষা ক্ষমতার ভারসাম্য আইনের শাসন সরকারের স্বচ্ছতা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ এবং মানবাধিকার সংকট এখন শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; বরং দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ১৫, ২০২৬ 0
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি
মুজতবা খামেনিকে ঘিরে রহস্য, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় বদলাচ্ছে বৈশ্বিক কূটনীতি

মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, গুরুতর আহত অবস্থায় জনসমক্ষে না এলেও ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্তে এখনো প্রভাব রাখছেন মুজতবা খামেনি। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে উদ্বেগ বাড়ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের মধ্যে।                                                                                                                                               ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ইরানের প্রভাবশালী নেতা মুজতবা খামেনিকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি এখনো ইরানের যুদ্ধ ও কূটনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। শনিবার সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব কাঠামো আগের তুলনায় আরও জটিল ও অস্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মুজতবা খামেনির প্রভাব এখনো গুরুত্বপূর্ণ বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান অবশ্য এসব দাবি পুরোপুরি নাকচ করেছে। তেহরানের কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি সুস্থ আছেন এবং তার আঘাত দ্রুত সেরে উঠছে। জনসমক্ষে অনুপস্থিতি ঘিরে প্রশ্ন যুদ্ধ শুরুর দিকে ভয়াবহ হামলায় ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। ওই হামলায় মুজতবা খামেনিও গুরুতর আহত হন বলে দাবি মার্কিন গোয়েন্দাদের। এরপর থেকেই তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তার অবস্থান বা শারীরিক অবস্থা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবহার করছেন না। বরং সীমিত পরিসরে দূত বা সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখছেন। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব তথ্যের বড় অংশ অস্বীকার করেছে। সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, তিনি মুজতবা খামেনির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেছেন। যুদ্ধের পর এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রথম প্রকাশ্য বৈঠক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন আলোচনা এদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাবের বিষয়ে দ্রুত জবাব আসতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আজ রাতেই জবাব আসতে পারে। আমরা একটি চিঠির অপেক্ষায় আছি।” তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে কী রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। এর আগে ইরানের দুটি ট্যাংকার জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, নৌ-অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় ওই ট্যাংারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে বড় সামরিক সংঘাত শুরু হয়। প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা ওই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ে। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। যদিও যুদ্ধবিরতির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ইউরোপে বাড়ছে উদ্বেগ বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার চাপ পড়েছে ইউরোপের অর্থনীতিতে। একই সময়ে জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানোর ঘোষণা এবং ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের ইঙ্গিত দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছেন, ইউরোপীয় মিত্ররা নিজেদের নিরাপত্তা ব্যয়ের যথেষ্ট অংশ বহন করছে না। মিত্রদের মধ্যে আস্থার সংকট হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরান ইস্যুতে ইউরোপের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাশিত সহায়তা দেয়নি। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সক্রিয় হচ্ছে। যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, আঞ্চলিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপ পুরোপুরি আত্মনির্ভর হতে এখনো সময় লাগবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় নতুন হিসাব মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া অনেকের কাছে যথেষ্ট কঠোর মনে হয়নি। কিছু মিত্র দেশ আশঙ্কা করছে, ইরানের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতা হলে যা তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, তাহলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় মিত্ররাও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও জোটভিত্তিক কূটনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন তাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, তাইওয়ান ইস্যুতে ভবিষ্যতে বড় কোনো সংঘাত তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। সুযোগ নিচ্ছে চীন ও রাশিয়া আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে চীন ও রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে বেইজিং ও মস্কো নিজেদের প্রভাব আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে চীন নিজেকে আরও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ১০, ২০২৬ 0
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির সম্ভাবনা: চলছে দর–কষাকষি

 ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত মিলছে। এখন চূড়ান্ত সমঝোতার দর–কষাকষিতে রয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইরানের ইউরেনিয়াম। সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান তার সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করবে। তার বিনিময়ে ইরানের জব্দ করা দুই হাজার কোটি ডলার ফেরত দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এমন চুক্তিই হচ্ছে বলে দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে।   মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দর-কষাকষিতে পৌঁছেছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়া। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার ফেরত দিতে পারে—যদিও বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার অগ্রগতি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতে এপ্রিলের শুরু থেকে একটি অনানুষ্ঠানিক বিরতি চলছে। এরপর থেকে বিভিন্ন টানাপোড়েন সত্ত্বেও চলতি সপ্তাহে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চূড়ান্ত আলোচনার জন্য খুব শিগগিরই দ্বিতীয় দফার বৈঠক হতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই বৈঠক পাকিস্তানের ইসলামাবাদ-এ অনুষ্ঠিত হতে পারে, যেখানে পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ক মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে। ইউরেনিয়াম নিয়ে মূল বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। বিশেষ করে প্রায় ২০০০ কেজি ইউরেনিয়াম, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি রয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় ওয়াশিংটন। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান তার সব পারমাণবিক উপাদান যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিক। তবে ইরান এতে সম্মত নয়। বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে এখন আলোচনা চলছে—উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের একটি অংশ তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো এবং বাকি অংশ আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই কম সমৃদ্ধ করা। অর্থ ফেরত ও শর্ত নিয়ে টানাপোড়েন আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়া। শুরুতে খাদ্য ও ওষুধ কেনার জন্য ৬০০ কোটি ডলার ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও ইরান দাবি করে ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের একটি মধ্যবর্তী অঙ্ক নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, “কোনো অর্থ লেনদেন হবে না”—যা আলোচনার অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। সমঝোতার খসড়া ও সময়সীমা খসড়া সমঝোতা স্মারকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ২০ বছরের স্থগিতাদেশ চাইলে ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দেয়। এখন এই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা চলছে। সম্ভাব্য চুক্তি হলে ৩০ দিনের একটি পর্যবেক্ষণকাল শুরু হবে। এই সময়ে পারমাণবিক কার্যক্রম, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অর্থ ফেরত এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। হুমকি, সতর্কবার্তা ও কূটনৈতিক চাপ চুক্তি না হলে আবার সামরিক অভিযান শুরুর হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, “সমঝোতা না হলে বোমাবর্ষণ আরও তীব্র হবে।” অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে। ইরানি এমপি ইব্রাহিম রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করে যা অর্জন করতে পারেনি, আলোচনার মাধ্যমেও তা পাবে না। এছাড়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও গণমাধ্যমের চাপ ব্যবহার করে ইরানের ভেতরে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করছে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিক্রিয়া সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০, ডাও ও নাসডাক সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেলের বাজারে অস্থিরতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি এবং স্থায়ী শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৭, ২০২৬ 0
ক্ষেপণাস্ত্র বের করছে ইরান
যুদ্ধবিরতির সুযোগে ক্ষেপণাস্ত্র পুনরুদ্ধার জোরদার করছে ইরান, নতুন সামরিক পদক্ষেপ ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : যুদ্ধবিরতির মধ্যেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে ইরান—এমন দাবি করেছে মার্কিন কর্মকর্তারা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে তেহরান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। দুটি অবগত সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এবং আঘাতপ্রাপ্ত সামরিক ঘাঁটি থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে দ্রুত পুনরায় মোতায়েনযোগ্য অবস্থায় আনার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, যদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সামরিক অভিযান শুরু করেন, তাহলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে হামলা চালাতে পারে। এ কারণেই দেশটি তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠন করছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রেক্ষাপটে, গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সামরিক অবস্থা ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে ব্রিফিং দেন। আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার কৌশলও বিবেচনায় আসে। “দুটি পথ” সামনে ট্রাম্পের শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ইরান ইস্যুতে তার সামনে দুটি বিকল্প রয়েছে—সামরিক পদক্ষেপ বা কূটনৈতিক সমাধান। তিনি বলেন, “আমরা কি তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করব, নাকি একটি চুক্তির চেষ্টা করব—এই দুটি পথই খোলা রয়েছে।” তবে সরাসরি হামলার বিষয়ে তিনি অনিচ্ছার কথাও জানান। যুদ্ধবিরতি ও অচলাবস্থা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে এখন পর্যন্ত আলোচনায় কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সামরিক সক্ষমতা নিয়ে দ্বিমত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের দাবি, ইরানের অধিকাংশ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ বলেন, ইরান তাদের হারানো অস্ত্র পুনরুদ্ধার করলেও নতুন করে তা প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা নেই। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি দাবি করেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উৎপাদন কেন্দ্র এবং নৌবাহিনী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এনবিসি নিউজ জানায়, বাস্তবে ইরানের উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তি এখনও অক্ষত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি অংশ বিমানবাহিনীর অর্ধেকের বেশি বিমান ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌবাহিনীর বড় অংশ কৌশলগত বিভ্রান্তি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান হয়তো নকল বা ডামি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রকৃত অস্ত্রভাণ্ডার আড়াল করতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে এসব ছড়িয়ে রাখার মাধ্যমে আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার কৌশলও ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, যদিও তার দাবি—এর প্রায় ৮২ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরানের হাতে এখন “মাত্র অর্ধেক” ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তাদের সামরিক শিল্প কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সামনে কী? বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই ইরান দ্রুত অস্ত্র পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এদিকে, মে মাসে ট্রাম্পের চীন সফরও এই সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২, ২০২৬ 0
হরমুজ প্রণালি
হরমুজ সংকটের ছায়ায় নতুন বাণিজ্যপথ: ইউরোপমুখী বিকল্প করিডোরে জোর দিচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চল

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য অস্থিরতা বাড়তে থাকায় সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প স্থল ও পাইপলাইনভিত্তিক বাণিজ্য করিডোর গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরাকের বহুল আলোচিত ২৪ বিলিয়ন ডলারের ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’ প্রকল্পকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরাকের ডেভেলপমেন্ট রোড: নতুন ভূরাজনৈতিক করিডোর মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুম বলছেন, পরিকল্পনাটি ইরাকের গ্র্যান্ড ফাও বন্দর থেকে শুরু হয়ে তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পরিবহন করিডোর তৈরির দিকে এগোচ্ছে। তার মতে, “যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা।” এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বসরা অঞ্চলের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহন বৃদ্ধি পাবে এবং ইরান-নিয়ন্ত্রিত জলপথ এড়িয়ে বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইরাকের ওপর তেহরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাবও হ্রাস পেতে পারে। উপসাগরজুড়ে বিকল্প অবকাঠামোর বিস্তার ইরাকের বাইরে পুরো অঞ্চলে জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি করতে একাধিক বড় প্রকল্প এগোচ্ছে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পেট্রোলাইন বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল পরিবহন সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং এর সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডিসিওপি পাইপলাইনও পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দ্বিতীয় একটি লাইন চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তুরস্কের জাঙ্গেজুর ও তথাকথিত মিডল করিডোর প্রকল্পও ইরানকে পাশ কাটিয়ে ককেশাস অঞ্চলের মাধ্যমে ইউরোপমুখী নতুন বাণিজ্য পথ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রকল্প পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। হরমুজ: এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র নয় বিশ্লেষক সেলুমের মতে, হরমুজ প্রণালি এখনো বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে আর একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তার ভাষায়, চলমান সংঘাত ও আঞ্চলিক ঝুঁকির কারণে “এই পরিবর্তন স্থায়ী হতে পারে” এবং জ্বালানি রুটের বৈচিত্র্য আরও বাড়বে। ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক উত্তেজনা এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে কঠোর বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের তেল অবকাঠামো বা স্থাপনায় হামলা হলে, সেই হামলাকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব ইসফাহানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, কোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব “সমপরিমাণ নয়, বরং চারগুণ” আকারে দেওয়া হবে। তার ভাষায়, “যদি আমাদের একটি তেল শোধনাগারে হামলা হয়, আমরা চারটি শোধনাগারে হামলা চালাব।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য ও অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত এই উত্তেজনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির কারণে দেশটির জ্বালানি সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ট্রাম্প আরও বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে ইরানের তেল পরিবহন ব্যবস্থা কয়েক দিনের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তার এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের রাজনৈতিক মহল থেকে পাল্টা বক্তব্য আসে, যেখানে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলার সক্ষমতার কথা তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক বার্তা ও বাজারের চাপ ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্স-এ এক পোস্টে জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নিয়ে একটি প্রতীকী সমীকরণ তুলে ধরেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, হরমুজ, বাব এল-মান্দেব ও বিভিন্ন পাইপলাইনকে কাজে লাগিয়ে ইরান বিশ্ববাজারে চাপ তৈরি করতে সক্ষম। তিনি সতর্ক করে বলেন, আসন্ন গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে জ্বালানি চাহিদা বাড়বে এবং তখন হরমুজে অস্থিরতা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর রাজনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্য হরমুজ সংকট ঘিরে এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডোর গড়ে ওঠার চেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা—দুই প্রবণতা একসঙ্গে এগোচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছর এই অঞ্চল শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য মানচিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ২৮, ২০২৬ 0
ইরান
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: হরমুজ প্রণালী, জ্বালানি সংকট ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন শক্তির সমীকরণ

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব এতদিন সৌদি আরবের হাতে থাকলেও কখনো কখনো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। তবে সারা বিশ^কে অবাক করে দিয়ে উপসাগরীয় এলাকায় নতুন বস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান। পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছে ইসলামি দেশটির সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ নেতারা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে ইরান। জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালীতে কর্তৃত্ব ধরে রেখে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে ইসলামিক দেশটি, তেল-গ্যাসের সংকটে ইরানের কাছে নতজানু তাবৎ দুনিয়া। ন্যাটো এবং ইউরোপীয় বন্ধুদেশগুলোর সমর্থন না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র একা হয়ে পড়েছে রণাঙ্গনে, দখলদার ইসরায়েলের প্ররোচনোয় ইরান আক্রমণ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারিয়ে এখন একেকবার একেক কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা করে পাকিস্তান পক্ষ-প্রতিপক্ষ সব রাষ্ট্রের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ক’টনৈতিক চাপ, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কঠিন প্রতিরোধ আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয়েছে গণহত্যায় অভিযুক্ত ইসরায়েল। আর হরমুজ প্রণালীতে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নেতৃত্বে এখন ইরান। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে কারিগরি আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল সোমবার বা মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় বসার কথা। সূত্রগুলো বলছে, দুই পক্ষের কারিগরি দল ইসলামাবাদে মিলিত হবে। তাদের লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সপ্তাহব্যাপী চলা সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান চূড়ান্ত করা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তারা একবার চুক্তির খসড়া তৈরি করে ফেললে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধান চুক্তি সই করতে ইসলামাবাদে উড়ে আসবেন। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের পাশাপাশি আঞ্চলিক আরও কয়েকটি দেশের নেতারাও এই চুক্তি সই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। সূত্রগুলো আরও জানায়, ১১-১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে প্রথম দফার বৈঠকের পর থেকেই বিবদমান দুই পক্ষ ইসলামাবাদের মাধ্যমে একে অপরের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার আগেই তারা একটি ‘সর্বোচ্চ বোঝাপড়ায়’ পৌঁছাতে চাইছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী ইরানের হাতে কাগজে-কলমে বিশ্বেরর জ্বালানির ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হওয়ার তথ্য থাকলেও বাস্তবে এই প্রণালীর গুরুত্ব আরো বেশি। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত, ইরাক ছাড়াও ইরানের নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানি হয় এই পথ দিয়ে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশগুলো থেকে সার রপ্তানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ইরান থেকে অঘোষিতভাবে জ্বালানি এই পথ ধরে যায় চীনসহ অনেক গন্তব্যে। এই হরমুজ প্রণালী কর্তৃত্ব পুরো ইরানের হাতে। ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে হরমুজ অবরোধ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের আশপাশে ১৫টি যুদ্ধ জাহাজ এবং তিনটি বৃহৎ বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে। তারপরও ইরানের আধিপত্য ভাঙতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ইরান তার ইচ্ছামতো একবার হরমুজ খুলছে, একবার বন্ধ করছে। ইরানে মার্কিন হামলার শুরু পরেই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। বিপাকে পড়ে মার্কিন মিত্র সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাক। এসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে আটকে পড়ে বহু দেশের জাহাজ ও নাবিকরা। যুদ্ধের সময় এসব নাবিক ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারানোর শঙ্কায় ছিল। এইসব গুলো দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটির হাজার হাজার সেনাও মহাবিপদে পড়ে। অনেক হুমকি দিয়েও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী চালু করতে পারেনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রই হরমুজ অবরোধ করে বসে। এর মধ্যেই কিছু জাহাজ এই প্রণালী পার হয়। লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পরপরই হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান। তারপরও মার্কিন অবরোধ বন্ধ না হওয়ায় পরে শনিবার আবার এই প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও সেসবে অবস্থানকারী নাবিকরা আবারো বিপদে পড়লো, মধ্যপ্রাচ্যের ৭টি দেশে অবস্থানকারী ৫০ হাজার মার্কিন সেনাও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকটের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়। একটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। দুটি গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, গানবোটগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ‘সম্পৃক্ত’। অর্থাৎ হরমুজের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে। এই শনিবারই ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকায় ক্ষুব্ধ তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘আগের অবস্থায়’ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইরানের এ ঘোষণায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ এক বিবৃতিতে মার্কিন এ অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ কারণেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এখন থেকে এই কৌশলগত নৌপথটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হলেও হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ইরান। ছোট নৌযান ও দ্রুতগামী বোট ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে চাপে রাখছে তেহরান। উপকূলের গোপন কোনো স্থান বা এসব নৌকা থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে আইআরজিসি। এগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্রণালীর কোথাও কোথাও ইরান মাইন পুঁতে রেখেছে বলে খবর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো। জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এজেন্সি জানায়, যুদ্ধ চলাকালীন অন্তত ২০টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছিল। গার্ডস নৌবাহিনী এই হামলাগুলোর দায় খুব কমই স্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলাগুলো সম্ভবত স্থলভাগ থেকে ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে ছোড়া ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল, যা শনাক্ত করা কঠিন। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, বোটগুলো প্রায়শই এতটাই ছোট যে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায় না এবং এগুলো পাথুরে উপকূল বরাবর খনন করা গভীর গুহার ভেতরের জেটিতে নোঙর করা থাকে। এগুলো মিনিটের মধ্যে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তাদের অস্ত্রশস্ত্র উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য একটি বড় হুমকি। ইরান আক্রমণকারী নৌকার জন্য কমপক্ষে ১০টি অত্যন্ত গোপন ও সুরক্ষিত ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। শীর্ষ সব নেতাদের হারানোর পরও আজ ইরান এক আত্মবিশ্বাসী দেশ, সব হারানোর প্রস্তুতি নিয়ে দেশটি মার্কিন আধিপত্য ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসতেও ইরান এখনো রাজি হয়নি। বিশ্বের পরাক্রমশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তারা বলছে, শর্তের পর শর্ত দিয়ে কোনো আলোচনা সফল হবে না, শুধুই সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশি কথা বলেন বলে অভিযোগ করে ইরান জানিয়েছে, অন্তত সাত বার তিনি মিথ্যা বলেছেন। সারা বিশে^র নজর এখন পাকিস্তানের দিকে ইরান সভ্যতা ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েও ৮ এপ্রিল ইরানের ওপর পূর্বঘোষিত বড় ধরনের ‘বোমাবর্ষণ ও হামলা’ অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে রাজি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য তিনি স্থগিতে রাজি হন। ট্রাম্পের এই নাটকীয় ঘোষণার পেছনে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতা বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবশ্য যুদ্ধবিরতির তিন দিনের মাথায় ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কোনও সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। ২১ ঘণ্টা ধরে চলা প্রথম দফার আলোচনায় কোনো সাফল্য না এলেও দুপক্ষের মধ্যে অনেকটা অস্বস্তি কেটেছে। পাকিস্তান প্রবল প্রচেষ্টা চালানোর কারণেই আবারও নতুন বৈঠক হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদে। একদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সফর করেন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে। আর দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির ছুটে যান ইরানে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারসহ পাকিস্তানের সামরিক- বেসামরিক প্রশাসনের আপ্রাণ চেষ্টার ফলেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি বৈঠক হতে যাচ্ছে। প্রথম দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান আলী আকবর আহমাদিয়ান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুল নাসের হেমমাতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। দ্বিতীয় দফা আলোচনার মধ্য দিয়ে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা করতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ঝটিকা সফরে যান সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্কে। ইরানে গিয়ে আসিম মুনিরও অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন দ্বিতীয় দফার আলোচনা। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে গত ১১ এপ্রিল শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আসা ইরানি কূটনীতিক দলকে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী নিরাপত্তা পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দিয়েছিল। সেদিন ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়া মার্কিন কূটনীতিক দল একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলন শেষে দ্রুত ইসলামাবাদ ছাড়ে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যর্থ আলোচনার পর ইরানের কূটনীতিকদের আশঙ্কা ছিল, দেশে ফেরার পথে ইসরায়েল তাদের হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। এরপর পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর একটি বড় বহর ইরানি কূটনীতিকদের বহন করা উড়োজাহাজটিকে পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুদের না পেলেও ইরানের পাশে ছিলো চীন-রাশিয়া ইরান গোপনে একটি চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট সংগ্রহ করেছে। এটি সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে শক্তিশালী সক্ষমতা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক অনুসন্ধানে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাত দিয়ে এফটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, টিইই-০১বি নামের এই স্যাটেলাইট ২০২৪ সালের শেষের দিকে চীন থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। সময়, স্থানাঙ্ক তালিকা, স্যাটেলাইট চিত্র ও কক্ষপথ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, ইরানি সামরিক কমান্ডাররা পরবর্তী সময়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারি করতে এই স্যাটেলাইট কাজে লাগিয়েছিলেন। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে ওই সব জায়গার ছবি তোলা হয়েছিল। সিআইএর চীনবিষয়ক সাবেক প্রধান ডেনিস ওয়াইল্ডার বলেন, চীন ঐতিহাসিকভাবেই ইরানকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করে আসছে। বর্তমানে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানকে চীনের দেওয়া অন্যান্য সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা, যেমন কাঁধে রেখে চালানো যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও উদ্বিগ্ন। কাঁধে রেখে চালানো যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সম্প্রতি একটি মার্কিন এফ-১৬ বিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো চীনা কোম্পানি এভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পারে না। চীন ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। তবে নিজেদের সম্পৃক্ততা লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। আবার রাশিয়া নিয়মিতভাবেই ইরানে ড্রোন সরবরাহ করছে বলে খবর রয়েছে, যেমনটা রাশিয়ার ইউক্রেন হামলায় ইরান বিপুল সংখ্যাক শাহেদ ড্রোন পাঠিয়ে গেছে কয়েক বছর। সেই শাহেদ ড্রোনের আরো উন্নত সংস্করণ রাশিয়া এখন ইরানকে দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, মার্কিন চাপেও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ইরান যুদ্ধে সামিল হয়নি, যেমনটা তারা যুক্ত হয়েছিল ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমনে। অথচ ইউরোপে মাত্র ছয় সপ্তাহের জেট জ্বালানি মজুত আছে। স্পেন তো সরাসরি ইরানে মার্কিন হামলার বিরোধীতা করেছে। ইতালি ইসরায়েলের সঙ্গে করা সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করেছে। যুক্তরাজ্য থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র পরিবহন করার সময় একটি ফ্লাইট আটকে দিয়েছে বেলজিয়াম। জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া যুদ্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছে, যারা বহু বছর ধরে মার্কিন সেনা ও অস্ত্রে সুরক্ষিত হয়ে আসছে। যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছিলেন এবং অন্যদিকে দাবি করছিলেন, তেহরান নিজেই বাঁচার জন্য শান্তিচুক্তি ভিক্ষা চাচ্ছে। কিন্তু পর্দার আড়ালের হোয়াইট হাউসই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের ওপর চাপ দিচ্ছিল, যাতে তারা ইরানকে বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর ব্যবস্থা করে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ এবং প্রতিবেশী হওয়ার কারণে ওয়াশিংটন মনে করেছিল, তাদের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠালে ইরান সেটা সহজে মেনে নেবে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এই গোপন তৎপরতা চালান। যার ফলে ৮ এপ্রিল রাতে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। আসলে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এ ছাড়া ইরান যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তা-ও তাঁকে অবাক করে দিয়েছিল। ২১ মার্চ থেকেই ট্রাম্প মনে মনে যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন। আরো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘আমি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে চমৎকার আলোচনা করেছি। তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।’ এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ‘স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচেষ্টার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান লেবাননের প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও; আর ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ঘোষণা দিয়েছেন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম মুসাবি। লেবাননে নির্বিচার মানুষ হত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল। এখন পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে বহু জনপদ, হাজার হাজার ভবন। ইসরায়েল একাধারে জল-স্থল ও আকাশ থেকে আক্রমন চালিয়ে মেরে ফেলেছে দুই হাজারের বেশি মানুষ। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি নারী ও শিশুরাও। ইসরায়েলের আক্রমণে প্রাণ গেছে লেবানিজ সেনাসদস্য, এমনকি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদেরও। ইন্দোনেশিয়ার শান্তিরক্ষীরা মারা গেছে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের মধ্যে আর গত শনিবার যুদ্ধবিরতি মাঝে ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ফ্রান্সের একজন শান্তিরক্ষী। এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই প্রতিরোধ চালাচ্ছে ইরানপন্থি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তারা লেবানন দখলকারী সেনাদের ওপর যেমন হামলা চালাচ্ছে, তেমনি রকেট ছুড়ছে ইসরায়েলের ভূখন্ডেও। ট্রাম্প লেবানন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর লেবানিজরা তাদের বাড়ি-ঘরে ফিরতে শুরু করে সেদিনই। ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতেই তারা ফিরছে, কারণ সেটাই তাদের দেশ, জন্মভূমি। এমনকি লেবাননের সেনাবাহিনীর সতর্ক বার্তাও তাদের থামাতে পারেনি। লেবানন দখলকারী ইসরায়েলকে যেমন গুনায় ধরছে লেবানিজরা, তেমনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল- লেবানন যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলকে ডাকা হয়নি। দুটিই ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যে কারণে দেশের ভেতরেই রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। আঞ্চলিক নেতৃত্বের পরিবর্তন? বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট: ইরান সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে সীমাবদ্ধতা অনুভব করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান নতুন কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ২২, ২০২৬ 0
হরমুজ প্রণালী
হরমুজ প্রণালি ঘিরে দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি : ইরান উত্তপ্ত, চীনের পাশে রাশিয়া—বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন নৌ অবরোধ, ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং চীন–রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ অবস্থান—সব মিলিয়ে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।  অবরোধের নেপথ্য ও সামরিক বাস্তবতা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের প্রধান বন্দরগুলো কার্যত অবরুদ্ধ। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ১৫টি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, একটি সুপার ক্যারিয়ার, ১১টি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ১০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি—ইতোমধ্যে অন্তত ছয়টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজকে পথ পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও কিছু সূত্র বলছে একটি জাহাজ অবরোধ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে সেটিও এখন প্রণালির ভেতরে আটকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০% এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২৫% এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—সংকট দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পরিবহন, খাদ্যপণ্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।  চীন-রাশিয়া ফ্যাক্টর চীন, যা ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা, এই অবরোধে সরাসরি চাপে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুযায়ী, বেইজিং আর ইরান থেকে তেল আমদানি করতে পারবে না। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বেইজিং সফরে ঘোষণা দিয়েছেন—রাশিয়া চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে প্রস্তুত এবং দুই দেশের সম্পর্ক অটুট থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কূটনৈতিক বার্তা নয়; বরং চীনা জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার প্রভাব বাড়ানোর কৌশল, যা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে আংশিকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।  ইরানের পাল্টা অবস্থান ইরান এই অবরোধকে সরাসরি ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দেশটির দাবি, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে; কেবল শত্রুপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। ইরানের তথ্যমতে, গত ৪০ দিনে তাদের ৩৯টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে এবং ২০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন—যা তারা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।  আইএমও বিতর্ক: নতুন কূটনৈতিক সংঘাত হরমুজ প্রণালিতে ‘নিরাপদ সামুদ্রিক করিডর’ তৈরির প্রস্তাব ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছেআন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্থাপিত এই প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। আইএমও লিগ্যাল কমিটির বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধি পুরিয়া কলিভান্দ বলেন, প্রস্তাবটি “আইনগতভাবে ভিত্তিহীন” এবং “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজে কোনো করিডর প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইরানের সম্মতি অপরিহার্য—কারণ এটি অঞ্চলের প্রধান উপকূলীয় রাষ্ট্র।  যুক্তরাষ্ট্র বনাম আঞ্চলিক বাস্তবতা ইরানের অভিযোগ—যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে এই অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি করেছে, এবং কিছু উপসাগরীয় দেশ তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এই আগ্রাসনে সহায়তা করছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এটি একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল—যার লক্ষ্য ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব বজায় রাখা।   বর্তমান পরিস্থিতি একাধিক সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে: * সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে * চীন–রাশিয়া জোট আরও শক্তিশালী হতে পারে * অথবা কূটনৈতিক সমঝোতার নতুন পথ তৈরি হতে পারে তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালির এই সংকট কেবল আঞ্চলিক নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আগামী দিনগুলোতে বেইজিং, মস্কো এবং তেহরানের সিদ্ধান্ত—এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ—নির্ধারণ করবে বিশ্ব কোন পথে এগোবে: সংঘাতের দিকে, নাকি সমঝোতার দিকে।  

নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ১৬, ২০২৬ 0
ইসরায়েলের হামলা
হরমুজে অবরোধ: অর্থনৈতিক চাপের নতুন অধ্যায়,ইরানকে দুটি নতুন শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে টানা কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎই ঘোষণা দিলেন—ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ “প্রায় শেষ”। ফক্স নিউজ–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে: সত্যিই কি যুদ্ধ শেষের পথে, নাকি এটি কৌশলগত বার্তা?  যুদ্ধের সূচনা: লক্ষ্য ছিল কী? গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও Iইসরায়েল–এর সমন্বিত অভিযানে ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয় ব্যাপকভাবে। ওয়াশিংটনের দাবি—এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা থামানো। ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, > “যদি আমরা পদক্ষেপ না নিতাম, ইরানের হাতে এখন পারমাণবিক অস্ত্র থাকত।” এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা কঠিন, কারণ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বলছেন—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আশঙ্কা থাকলেও তাৎক্ষণিক অস্ত্র প্রস্তুতির প্রমাণ স্পষ্ট ছিল না।  কৌশল নাকি বাস্তবতা? ট্রাম্পের “যুদ্ধ প্রায় শেষ” মন্তব্যকে বিশ্লেষকরা তিনভাবে দেখছেন:  মনস্তাত্ত্বিক চাপ:    ইরানকে দ্রুত আলোচনায় বসাতে চাপ তৈরি করা।  রাজনৈতিক বার্তা:    দেশীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী নেতৃত্বের ইমেজ তৈরি। বাস্তব সামরিক অগ্রগতি:    যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, তাদের ৬ সপ্তাহের পরিকল্পনার চেয়েও দ্রুত ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—যদি যুদ্ধ শেষের পথে হয়, তাহলে কেন এখনো নৌ অবরোধ চলছে?  হরমুজে অবরোধ: অর্থনৈতিক চাপের নতুন অধ্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ–অবরোধ জারি করেছে। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো জাহাজ এই অবরোধ ভাঙতে পারেনি বলে দাবি করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের তাৎপর্য বিশাল: * বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায় * ভারতসহ বহু দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে * ইরানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়বে  ভেঙে যাওয়া আলোচনা, আবার নতুন উদ্যোগ পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পরও আলোচনার দরজা বন্ধ হয়নি। নতুন করে বৈঠকের উদ্যোগ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স । তবে সমস্যা একটাই—অবিশ্বাস। ইরান শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি “পূর্ণ অনাস্থা” প্রকাশ করে আসছে। আর ভ্যান্স নিজেও স্বীকার করেছেন: > “এই অবিশ্বাস এক রাতে দূর করা সম্ভব নয়।”  যুদ্ধবিরতি: ভঙ্গুর শান্তি বর্তমানে দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলছে, যার মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। এই সময়ের মধ্যে: * নতুন বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা * শান্তি চুক্তির চেষ্টা * অথবা আবার সংঘাতের পুনরারম্ভ সবকিছুই অনিশ্চিত। মানবিক ও আঞ্চলিক প্রভাব সংঘাতের প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়: * লেবানন–এ হামলায় বহু হতাহত * ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি * মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা সংকট ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ইরান পুনর্গঠনে “২০ বছর” সময় লাগতে পারে—যা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক মূল্যকে সামনে আনে। আসল প্রশ্ন: যুদ্ধ শেষ, নাকি নতুন খেলা? ট্রাম্পের দাবি—“যেকোনো সময় চাইলে যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব।” কিন্তু বাস্তবতা বলছে: * সামরিক অভিযান পুরোপুরি থামেনি * অর্থনৈতিক অবরোধ চলছে * কূটনৈতিক অচলাবস্থা এখনো কাটেনি তাই বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুদ্ধের শেষ নয়—বরং নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ।   এই সংঘাত এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে— যেখানে যুদ্ধ, কূটনীতি এবং ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ট্রাম্পের “যুদ্ধ প্রায় শেষ” মন্তব্য হয়তো আশার ইঙ্গিত, কিন্তু মাটির বাস্তবতা বলছে— **শেষের আগে এখনো অনেক অধ্যায় বাকি।**    

নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ১৫, ২০২৬ 0
ইসরায়েলি জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলা
হরমুজ থেকে হোয়াইট হাউস—এক বিস্তৃত সংঘাতের অদৃশ্য রেখাচিত্র

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ—হরমুজ প্রণালি—এ ইসরায়েল-সংযুক্ত একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এই ঘটনার পরই আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত বহুগুণে বেড়ে গেছে, যার প্রভাব এখন শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ নেই—পৌঁছে গেছে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার কেন্দ্রেও। হরমুজে হামলা: কৌশলগত বার্তা না সরাসরি যুদ্ধঘোষণা? ইরানের দাবি অনুযায়ী, “জায়নবাদী শাসনের সঙ্গে যুক্ত” একটি জাহাজকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং ডাটাবেজ অনুযায়ী, “MSC Ishika” নামের জাহাজটি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী হলেও এর মালিকানা ইসরায়েলি স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। এই হামলার গুরুত্ব তিনটি কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: অবস্থানগত ঝুঁকি: হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০% তেল পরিবাহিত হয়। এখানে যেকোনো সামরিক ঘটনা বৈশ্বিক বাজারে ধাক্কা দিতে পারে। টার্গেট নির্বাচন: সরাসরি ইসরায়েলি মালিকানাধীন সম্পদকে আঘাত করা মানে প্রক্সি যুদ্ধ থেকে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার ইঙ্গিত। ড্রোন প্রযুক্তি: কম খরচে উচ্চ কার্যকারিতা—ইরানের ড্রোন কৌশল এখন একটি বড় সামরিক সমীকরণ। আকাশে সংঘর্ষ: তথ্যযুদ্ধ নাকি বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি? ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা মার্কিন একাধিক যুদ্ধযানে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে F-15 Eagle, A-10 Thunderbolt II, এবং UH-60 Black Hawk। তবে এই দাবিগুলোর স্বতন্ত্র যাচাই এখনো হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন: এটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হতে পারে অথবা আংশিক সত্যকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিমান দুর্ঘটনার ঘটনাও এই বর্ণনার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ওয়াশিংটনে অস্থিরতা: সামরিক বনাম বেসামরিক ক্ষমতা এই সংঘাতের সবচেয়ে নাটকীয় দিকটি ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ স্থল অভিযানের নির্দেশ দিলেও, একাধিক জ্যেষ্ঠ জেনারেল তা মানতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরিণতিতে: জয়েন্ট চিফস অব স্টাফসহ ১২ জন শীর্ষ কর্মকর্তা বরখাস্ত হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব মার্কিন ইতিহাসে বিরল সাংবিধানিক সংকট  মূল প্রশ্ন: এই অস্বীকৃতি কি— আইন রক্ষার চেষ্টা? (অবৈধ আদেশ মানতে অস্বীকৃতি) নাকি বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের প্রতি অবাধ্যতা?  সামরিক ক্ষয়ক্ষতি: বাস্তবতা বনাম বর্ণনা বিভিন্ন ঘটনায় মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র উঠে এসেছে: একাধিক যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত (যেমন KC-135 Stratotanker) কুয়েত ও সৌদি আরবের ঘাঁটিতে হামলা E-3 Sentry ধ্বংসের দাবি F-35 Lightning II ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তবে এগুলোর অনেকগুলোরই স্বাধীন যাচাই সীমিত—যা তথ্যযুদ্ধের জটিলতা বাড়াচ্ছে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: বিশ্ব কি নতুন যুদ্ধে প্রবেশ করছে? এই সংকটের প্রভাব বহুমাত্রিক: ১. জ্বালানি বাজার হরমুজে অস্থিরতা মানেই তেলের দাম অস্থির হওয়া ২. আঞ্চলিক জোট ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ব্লক আরও দৃঢ় হচ্ছে ৩. সামরিক নীতির পরিবর্তন ড্রোন, সাইবার ও অসম যুদ্ধ কৌশল প্রধান হয়ে উঠছে ৪. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সামরিক নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা সংঘাতের দিক কোনদিকে? বর্তমান পরিস্থিতি তিনটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে: নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা – সীমিত হামলা ও পাল্টা হামলা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ – বহু দেশ জড়িয়ে পড়বে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ – আন্তর্জাতিক চাপের ফলে উত্তেজনা হ্রাস তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সংকট এখন আর শুধু ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি গ্লোবাল নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ৫, ২০২৬ 0
Popular post
ফারুকীর সম্পদ কমেছে, তিশার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি: সম্পদ বিবরণী ঘিরে আলোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

সংসার সামলাতে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন রোজিনা

বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।

বাংলাদেশে ঐতিহাসিক নির্বাচন: বিএনপি এগিয়ে, জামায়াতের উত্থান ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

গাজায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ।  ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী।    ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে,  স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ  বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”

কুড়িগ্রামের তাজু ভাই ২.০: ‘সরকারি রেটে জিলাপি’ প্রশ্নে ভাইরাল এক নির্মাণশ্রমিকের গল্প

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে।  কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে।  কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।  কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি।  মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।

অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংক,

ইসলামী ব্যাংকে আস্থা সংকট কেন কাটছে না?: দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২২, ২০২৬ 0




অপরাধ

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে ৩০ বিলিয়ন ডলার জালিয়াতি ও অর্থপাচার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0




কৃষি ও জলবায়ু

ধান

শেরপুরে বোরো ধানের দাম কমে লোকসানে কৃষকরা, উৎপাদন খরচও উঠছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৬, ২০২৬ 0