ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ইসলামাবাদের এক অভিজাত হোটেলের নীরব করিডর, বন্ধ দরজার ভেতরে উঁচুস্বরে তর্ক, আর বারবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা মধ্যস্থতাকারীদের পদচারণা—সব মিলিয়ে গত শনিবারের রাতটি যেন ছিল এক অসমাপ্ত চুক্তির নাট্যমঞ্চ। Serena Hotel Islamabad-এ আয়োজিত সেই গোপন বৈঠক শেষ পর্যন্ত কোনো বড় সমঝোতা ছাড়াই ভেঙে গেলেও, ভেতরের গল্প বলছে—দুই পক্ষ আসলে ইতিহাসের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। বন্ধ দরজার কূটনীতি বৈঠকটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে কাঠামোবদ্ধ। হোটেলের দুটি আলাদা উইংয়ে অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল। মাঝখানে একটি কমন এরিয়া—সেখানেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মুখোমুখি বসে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা। মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ থাকায় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে প্রতিনিধিদের কক্ষ ছেড়ে বাইরে গিয়ে যোগাযোগ করতে হয়েছে নিজ নিজ রাজধানীর সঙ্গে। এই আলোচনায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার Mohammad Bagher Ghalibaf। সঙ্গে ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Abbas Araghchi। পাকিস্তানের পক্ষে ছায়ার মতো সক্রিয় ছিলেন সেনাপ্রধান Asim Munir ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী Ishaq Dar। “৮০ শতাংশ” সমঝোতা—তারপর ভাঙন একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আলোচনার মাঝামাঝি সময়ে একটি চুক্তির খসড়া প্রায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল—প্রায় ৮০ শতাংশ অগ্রগতি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনটি ইস্যুতে মতবিরোধ চূড়ান্ত আকার নেয়: * হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ * ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি * আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও জব্দ সম্পদের পরিমাণ ওয়াশিংটন চাইছিল সীমিত, লক্ষ্যভিত্তিক চুক্তি—বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে তেহরান চাইছিল বিস্তৃত সমঝোতা, যেখানে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত আলোচনাকে অচল করে দেয়। উত্তেজনার বিস্ফোরণ রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার পরিবেশও কঠিন হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়েও উচ্চস্বরে তর্ক শোনা যাচ্ছিল। সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে যখন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। সেই সময় Abbas Araghchi-র কণ্ঠ ভেসে আসে—অস্বাভাবিকভাবে কঠোর। তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল: “আলোচনার সময় হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তা ভঙ্গ করলে—আমরা কীভাবে বিশ্বাস করব?” এই ক্ষোভের পেছনে ছিল সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা—জেনেভায় বৈঠকের মাত্র দুই দিনের মাথায় ইরানে যৌথ হামলার ঘটনা, যা ইরানের মনে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে। পাকিস্তানের রাতভর দৌড়ঝাঁপ পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার হস্তক্ষেপ করেন Asim Munir ও Ishaq Dar। কখনো চা-বিরতি, কখনো আলাদা কক্ষে নিয়ে গিয়ে আলোচনা—সব চেষ্টা ছিল উত্তেজনা কমানোর। এক পর্যায়ে প্রতিনিধিদের আলাদা করে দেওয়া হয়, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। শেষ প্রস্তাব, কিন্তু শেষ নয় প্রায় ২০ ঘণ্টা টানা আলোচনার পর রোববার সকালে বৈঠক শেষ ঘোষণা করেন JD Vance। তার বক্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ: > “এটাই আমাদের চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব। এখন সিদ্ধান্ত ইরানের।” এই ঘোষণায় একদিকে যেমন অচলাবস্থার ইঙ্গিত ছিল, অন্যদিকে দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি—এমন বার্তাও স্পষ্ট। মূল সংকট: বিশ্বাসের ঘাটতি এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের চেয়েও বড় সমস্যা পারস্পরিক অবিশ্বাস। ইরান নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া এগোতে রাজি নয়, আর যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। ফলে কাগজে-কলমে কাছাকাছি পৌঁছেও বাস্তবে দূরত্ব রয়ে গেছে। সূত্র বলছে, আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং নতুন কাঠামোয় আবার সংলাপ শুরু করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই রাতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে শুধু কৌশলগত ইস্যু নয়, বিশ্বাসের সংকটও কাটাতে হবে। ইসলামাবাদের সেই রাত তাই কেবল ব্যর্থ বৈঠকের গল্প নয়—এটি এক অসমাপ্ত চুক্তির, অদৃশ্য সন্দেহের, এবং ভঙ্গুর কূটনীতির প্রতিচ্ছবি।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : চলমান যুদ্ধে ইরানের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছে দেশটি। তবে সরকারের একজন মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, এটি কেবল প্রাথমিক হিসাব এবং চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে। ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার আরআইএ নভোস্তি এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফাতেমে মোহাজেরানি এই হিসাব তুলে ধরেন। মোহাজেরানি বলেন, ‘আমাদের আলোচনাকারী দল যেসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে এবং ইসলামাবাদ বৈঠকেও যা গুরুত্ব পেয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ। সাধারণত ক্ষয়ক্ষতি বেশ কয়েকটি স্তরে পরীক্ষা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের বর্তমান ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২৭০ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মনে করেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি এখনো সম্ভব। তবে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনায় তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগে অনিচ্ছুক থাকায় শেষ প্রস্তাব দিয়েই আলোচনা ছেড়ে আসেন তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা আলোচনার এই সারসংক্ষেপ জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া ভ্যান্স মনে করেন, ইরান আলোচনায় নিজেদের প্রভাব বা ‘লেভারেজ’ কতটা—তা সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। ২১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই আলোচনায় ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের দলে আরও ছিলেন বিশেষ দূত স্টেভ উইটকফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার। মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। এসব ইস্যুর মধ্যে ছিল—ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করা, আঞ্চলিক মিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিস্তৃত শান্তি কাঠামো তৈরি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার এমন একটি সমাধান যেখানে কোনো টোল আরোপ করা হবে না। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা প্রায় সব বিষয়েই সমঝোতায় পৌঁছেছিলাম, শুধু তারা তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’ বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
প্রায় ২১ ঘণ্টার টানা আলোচনার পরও ইসলামাবাদ-এ অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। গত ৫০ বছরের মধ্যে এটি ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সংলাপগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে আলোচনায় অংশ নেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। রোববার সকালে আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, আলোচনা অচল হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বেশি ক্ষতিকর। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম’ প্রস্তাব দিয়েছে, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা ইরানের। ভ্যান্স বলেন, আলোচনার পুরো সময়জুড়ে তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগে ছিলেন। তবে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি হোক বা না হোক, এতে তার বিশেষ কিছু যায় আসে না। আলোচনায় প্রধান মতবিরোধের বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালী-এর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ত্যাগে অস্বীকৃতি। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিক যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, তারা আলোচনায় ‘যৌক্তিক প্রস্তাব’ দিয়েছে এবং এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের। ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও সংঘাতের কারণে এক দফা আলোচনায় সমঝোতা হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই জানান, কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ অগ্রগতি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও ইরানের বৈধ অধিকার স্বীকৃতির ওপর। এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এবং যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এখনো পরবর্তী দফার বৈঠকের সময় বা স্থান নির্ধারণ করা হয়নি।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : সপ্তম সপ্তাহে গড়ানো এক ধ্বংসাত্মক সংঘাত—যেখানে হাজারো প্রাণহানি, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে—তার মাঝেই এক ঐতিহাসিক মোড়ে এসে মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে পাকিস্তান, আর আলোচনার মঞ্চ—ইসলামাবাদ—এখন বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এই সংলাপ শুধু একটি যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিকতা নয়; এটি কয়েক দশকের বৈরিতার পর সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের দরজা। ইতিহাসের ভার, বর্তমানের চাপ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-এর পর থেকে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক মূলত বৈরিতায় আটকে আছে। মাঝে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ হলেও, সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য উচ্চপর্যায়ের সংযোগ ছিল বারাক ওবামা ও হাসান রুহানি-এর ফোনালাপ এবং পরমাণু চুক্তি ঘিরে জন কেরি ও জাভেদ জারিফ-এর বৈঠক। সেই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের বর্তমান বৈঠক—যেখানে সরাসরি প্রতিনিধি দল বসেছে—একটি কূটনৈতিক ‘ব্রেকথ্রু’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আলোচনার টেবিলে কারা মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে আছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স—যিনি যুদ্ধের শুরু থেকেই সমালোচক এবং কঠোর অবস্থানের পক্ষে। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, যিনি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক কমান্ডার এবং কড়া ভাষণের জন্য পরিচিত। দুই পক্ষের এই নেতৃত্বই ইঙ্গিত দেয়—আলোচনা নরম হবে না, বরং কঠিন দর-কষাকষির দিকে যাবে। যুদ্ধবিরতি: শান্তির ছায়া, সংঘাতের বাস্তবতা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা অত্যন্ত ভঙ্গুর। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়েছে—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মানে হিজবুল্লাহ-র বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ নয়। দক্ষিণ লেবানন-এ সাম্প্রতিক হামলায় শতাধিক প্রাণহানি, বিশেষ করে বৈরুতে একদিনে ৩০০ জনের বেশি নিহত হওয়া, এই সংঘাতের ভয়াবহতাকে আরও প্রকট করেছে। এতে স্পষ্ট—এই যুদ্ধ কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি: বিশ্ব অর্থনীতির গলা চেপে ধরা বিশ্বের প্রায় ২০% তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এর ফলে: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৪ ডলার ছাড়িয়েছে ইউরোপে সম্ভাব্য বিমান জ্বালানি সংকট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালি খুলে দেওয়ার সামরিক উদ্যোগ শুরু হয়েছে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। দাবির পাল্টা দাবি: সমঝোতার ফাঁদ ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের মূল বিষয়: যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এই দুই সেট প্রস্তাবের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য স্পষ্ট—একটি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, অন্যটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির। ইসলামাবাদ: নতুন কূটনৈতিক মঞ্চ এই আলোচনায় সরাসরি না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চীন, সৌদি আরব, কাতার এবং মিসর। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে মধ্যস্থতার ভিত্তি তৈরি করেছেন। জাতিসংঘের সতর্ক বার্তা জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই আলোচনাকে “একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ” হিসেবে দেখছেন। তার মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক স্পষ্ট করে বলেছেন—এই সংলাপ শুধু যুদ্ধ থামানোর জন্য নয়, ভবিষ্যৎ সংঘাত ঠেকানোর জন্যও অপরিহার্য। সন্দেহের ভেতর আশার রেখা তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বৈত মনোভাব। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি তাদের বাস্তবতা, কিন্তু কূটনীতির ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রবল। ৬২ বছর বয়সী এক নাগরিকের কথায়, “শুধু শান্তি নয়, আমরা যা হারিয়েছি তার হিসাবও চাই।” এই আলোচনা সফল হলে: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমতে পারে জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে ব্যর্থ হলে: যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন ধাক্কা খাবে বড় শক্তিগুলোর সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে ইসলামাবাদের এই টেবিলে বসে থাকা প্রতিনিধিরা শুধু নিজেদের দেশের ভবিষ্যৎ নয়, বরং একটি অস্থির বিশ্বের দিকনির্দেশ ঠিক করছেন। কূটনীতি এখানে বিলাসিতা নয়—প্রয়োজন। এখন প্রশ্ন একটাই: এই সংলাপ কি ইতিহাস বদলাবে, নাকি আরেকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবে নথিভুক্ত হবে? এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সংলাপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে উভয় পক্ষকে গঠনমূলক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংকটের বিকল্প নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল হতে পারে। তবে ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।