ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: ওয়াশিংটন: ইরানের বিরুদ্ধে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এমন অভিযান শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে কয়েকটি আরব উপসাগরীয় দেশকে প্রস্তুতি নেওয়ার বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোলাবারুদ ও যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখাসহ সামরিক তৎপরতা জোরদার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সরকারগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য হামলা নিয়ে আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে বুধবার (২৮ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ইরানে হামলার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা থাকতে পারে। তবে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথও এখনো খোলা রয়েছে। আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা নতুন করে সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালালেও আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সম্ভাব্য হামলা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রস্তুতি ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেক্সাস থেকে একটি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন সেনাদের গোলাবারুদের মজুত পুনরায় পূরণ করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য অভিযানের জন্য বোমারু ও যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী মাসে আরও একটি বিমানবাহী রণতরিনির্ভর আক্রমণকারী দল এবং মেরিন কোরের অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বর্তমানে ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা প্রায় ২০টি যুদ্ধজাহাজের বহরের সঙ্গে নতুন সামরিক শক্তি যুক্ত হতে পারে। তবে নতুন আসা কিছু জাহাজ আগে থেকে মোতায়েন থাকা জাহাজের স্থলাভিষিক্ত হলে মোট যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়বে না। এসব প্রস্তুতি সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও এগুলোকে ইরানে হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত এবং কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতিই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নেতানিয়াহুর বক্তব্যে ইরান প্রসঙ্গ, সংঘাত শেষ হয়নি ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সংঘাতের বিষয়টি সামনে এনেছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নিউজ-এর পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ভোরে নির্বাচনের পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যের শুরুতেই ইরান প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে অবস্থান করছিল। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের সমর্থন কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জোট নিশ্চিত করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে তাঁরা পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন, তবে পরিস্থিতি এখনো শেষ হয়নি। তাঁর ভাষায়, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করার সক্ষমতা ইসরায়েলের রয়েছে। নেতানিয়াহুর বক্তব্যে ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক নেতানিয়াহুর বক্তব্যের কিছুক্ষণ আগে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকট তাঁকে পদত্যাগের আহ্বান জানান। মঙ্গলবার রাতে তিনি নেতানিয়াহুকে একজন ‘তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তাঁর হাতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বা জনগণের আস্থা নেই। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাতভর বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাসে পরিবর্তন আসে। এতে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যার হিসাবও বদলে যায়। বিরোধী নেতাদের আশঙ্কা, ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারেন। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে জরুরি সরকারে যোগ দিতে চাপ দেওয়া হতে পারে। তবে এগুলো বিরোধী নেতাদের আশঙ্কা; নেতানিয়াহু এমন উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ব্যবহার করছেন—এমন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। আইজেনকট প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তাঁদের চ্যালেঞ্জ করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের দৃঢ় থাকতে হবে। নেতানিয়াহুকে সরাসরি সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করার দুঃসাহস দেখানো উচিত হবে না। কূটনীতির পথ খোলা, তবে বাড়ছে সংঘাতের ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি, ইসরায়েলি নেতৃত্বের কঠোর বক্তব্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল পুনর্বিন্যাসের খবর পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। তবে সামরিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনাও অব্যাহত রয়েছে। তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হলে নতুন সংঘাত এড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে। বিপরীতে আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা আরও জোরালো হতে পারে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিযান বেছে নেবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলাফলের ওপরই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করছে। সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ওয়াইনেট নিউজের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন করে সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তেহরানে বিস্ফোরণ, ‘পূর্ব-নির্ধারিত আক্রমণ’ দাবি ইসরায়েলের ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে একটি “পূর্ব-নির্ধারিত আক্রমণ” চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরানি গণমাধ্যম দাবি করেছে, রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের রিপাবলিক এলাকায় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দেশজুড়ে “বিশেষ ও স্থায়ী জরুরি অবস্থা” ঘোষণা করেছেন। সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েলজুড়ে সাইরেন বাজানো হচ্ছে। উভয় দেশের আকাশসীমা বন্ধ ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ শনিবার পর্যন্ত বেসামরিক বিমানের জন্য দেশটির আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে। একইভাবে Iran-ও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পূর্ণ আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে। অতীতের হামলা ও পারমাণবিক স্থাপনা গত বছর জুনে ইসরায়েল ইরানের একাধিক পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। তাদের দাবি ছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাই ছিল লক্ষ্য। ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। সেগুলো হলো—ফোর্দো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহান। এর মধ্যে ফোর্দো একটি পাহাড়ি অঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরান খুব শিগগিরই পারমাণবিক বোমা তৈরিতে সক্ষম হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও সামরিক মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক চুক্তিতে অগ্রগতি না হলে ইরানে হামলা চালানো হবে। এর মধ্যেই জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে তৃতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। ট্রাম্প একে “আর্মাডা” হিসেবে বর্ণনা করেন। এতে দুটি বিমানবাহী রণতরীসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি বহনকারী বিমান রয়েছে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সার্ভিস সেন্টার লক্ষ্যবস্তু রাষ্ট্রায়ত্ত বাহরাইন নিউজ এজেন্সির বরাতে জানানো হয়েছে, বাহরাইন-এ অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সার্ভিস সেন্টার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। তবে কারা হামলা চালিয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাহরাইনের রাজধানী মানামা -তে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বাহরাইনেই যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের অংশজুড়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইসরায়েলে ‘ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা’ দাবি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরায়েলের উপর “ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা” শুরু হয়েছে। তাদের দাবি, ইরানে সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই এই পাল্টা আক্রমণ চালানো হচ্ছে। কাতার ও বাহরাইনে মার্কিন দূতাবাসের সতর্কতা কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে ওই দেশগুলোতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দূতাবাসগুলো জানিয়েছে, তারা “সকল কর্মীদের জন্য আশ্রয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন” করছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে এই সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। আকাশসীমা বন্ধ, সামরিক মোতায়েন বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক আলোচনা স্থগিত হওয়ার ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মক চাপে পড়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।