ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন:
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। লটারির মাধ্যমে পদায়নের নামে ক্যাটাগরি নির্ধারণে অনিয়ম, গ্রেডিং শিটে কারসাজি, আগে থেকে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পাঠানো এবং প্রায় ১২০ কোটি টাকার কথিত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিযোগকারী।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগসহ রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগ। এসব বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের বাসভবন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের মতো দায়িত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলী রেজা তৈমুর মালিক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৫ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনে তাঁর পদায়ন করা হয় বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর পদায়নকে ঘিরে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব বণ্টনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রশাসনিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে লটারির ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও গ্রেডিং শিট তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ‘এ প্লাস’, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’—এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয়নি বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তাদের নাম একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে রেখে লটারির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগের জন্য আগে থেকেই কয়েকজন কর্মকর্তাকে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, রেজা তৈমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও পদায়নপ্রক্রিয়া তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রভাব ও পছন্দের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ বণ্টন করা হয়ে থাকতে পারে।
লটারির আগে গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব), নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব, সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত মাজহার এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়ার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন ও প্রকল্প বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ পদায়নে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিজে থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ নয়; এ ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদায়ন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত নথিই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২-এ দায়িত্ব পালনের পর শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে তাঁর পদায়নের যোগ্যতা, অনুমোদন এবং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নকে কেন্দ্র করে তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় ও আগের কর্মস্থল নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, রেজা তৈমুর মালিকের বাবা মো. রেজাউল হক মালিক, যিনি মুকুল নামে পরিচিত ছিলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি মারা যান। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বাজারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রেজাউল হক মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পরিচিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রেজাউল হক মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাবে ছেলে রেজা তৈমুর মালিকের চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে আকর্ষণীয় কর্মস্থলে পদায়নেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, রেজা তৈমুর মালিক নিম্নমানের একটি কোম্পানিকে পিডব্লিউডি সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নাম, সিডিউল অন্তর্ভুক্তির নথি, আর্থিক লেনদেনের দলিল কিংবা নিরীক্ষা প্রতিবেদন ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তাঁর বর্তমান পদায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই, প্রশাসনিক বিধি এবং পেশাগত যোগ্যতা যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সরবরাহ করা তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসান, সুব্রত বিশ্বাস এবং রেজা তৈমুর মালিকের বিরুদ্ধে। তাঁদের কয়েকজনের ছবি ফেসবুকে প্রকাশ এবং অন্য কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তাদের আবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের চাকরির রেকর্ড, আগের পদায়ন, কর্মদক্ষতা এবং বর্তমান দায়িত্বের জন্য প্রশাসনিক যোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
এর আগে উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোশ ওজাকে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পদায়ন করা হয়েছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে বদলি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা এ ঘটনাকে সামনে রেখে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নও পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ পদায়নের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন এবং সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় কাজে লাগিয়ে নগর গণপূর্ত বিভাগে প্রথম পদায়ন বাগিয়ে নেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নিয়োগের নথি, কোটার বৈধতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল সরবরাহ করা হয়নি।
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর দায়িত্বের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণকাজ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর-সংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্ব নিয়েও এ বিভাগের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এত গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পেশাগত যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড এবং প্রশাসনিক অনুমোদন যাচাই করা জরুরি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলি ও পদায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাসের ব্যবধানে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে।
এই বদলি ও পদায়নের মধ্যে সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এনএসআই ও দুদকের সদর দপ্তর এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীরা ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অর্থায়ন, আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধেও কমিশন ও দরপত্রসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী, যিনি টিপু মুন্সি নামে পরিচিত, তাঁর ভায়রা। টিপু মুন্সির সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে আবু নাসের চৌধুরী ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এ পদায়ন পেয়েছেন এবং এ জন্য ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এ অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আবু নাসের চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন দাবি করা হয়। ই-জিপি দরপত্রে পাঁচ শতাংশ কমিশন না দিলে টেকনিক্যাল অনুমোদন দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ অভিযোগের পক্ষে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪-এর কয়েকটি দরপত্রের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য এবং আবু নাসের চৌধুরীর ই-জিপি আইডিতে আটকে থাকা দরপত্রের কথা উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। সংশ্লিষ্ট ই-জিপি রেকর্ড, অনুমোদনপ্রক্রিয়া, দরপত্রের মূল্যায়ন এবং প্রত্যাখ্যানের কারণ যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) কাজ লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের (এলটিএম) পরিবর্তে ওপেন টেন্ডারিং মেথডে (ওটিএম) আহ্বানের অনুমতি দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের কাজ এবং এপিপিভুক্ত কয়েকটি দরপত্রের ক্ষেত্রে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দিয়ে তিনি ১০ শতাংশ কমিশন নিয়েছেন।
এ-সংক্রান্ত অভিযোগে যেসব দরপত্র আইডি উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো:
১১১১৭৮১, ১১১৯৩১৬, ১১১৩০৭৯, ১১১১৫৬৩, ১১১১৫৫৮, ১১১১৫৫৯, ১১১১৫৬০, ১১১১৫৭০, ১১১১৫৬৭, ১১১১৫৬৯, ১১১১৫৬১, ১১১১৫৬৪, ১১১১৫৬৫, ১১১১৫৬৬, ১০৮১৫৪৬, ১১০০৭৯০, ১১০২০২৮, ১০৯১৯৭৩, ১০৯১৯৭৪, ১০৯১৯৭৫, ১০৯১৯৭৬, ১০৯১৯৭৭, ১০৯১৯৭৮, ১০৯১৯৭৯, ১০৮২১৫৯, ১০৮০২৩৫, ১০৮০২৩৬, ১০৬৯১৩১, ১০৭০৮৭৪, ১০৭০৮৭৫, ১০৭০৮৭৬, ১০৭১২৬৫, ১০৪৩২৪৮, ১০২৯৫৯৬ এবং ১০১৮১৫৯।
এসব দরপত্রে পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রদানের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তন বা একাধিক দরপত্র আইডি উল্লেখ করাই কমিশন গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণ করে না।
অভিযোগে রাজিবুল ইসলামের পদায়নের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবার একই বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে, রাশেদ আহসান সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুর এবং পরে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে তাঁর পদায়নে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
এসব ক্ষেত্রে বদলি নীতিমালা, আগের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ, পদায়নের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতার নথি পর্যালোচনা জরুরি।
লটারির আওতায় কোন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং কারা বাদ পড়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও একই পদমর্যাদার কয়েকজন কর্মকর্তার নাম লটারিতে না রাখার অভিযোগ রয়েছে।
একই পর্যায়ের অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কারা লটারির আওতায় এসেছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন অভিযোগকারীরা।
এদিকে, লটারি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের সিন্ডিকেট প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁদের নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের উৎসও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং মন্ত্রীদের বাসভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক থাকলে তা সরকার ও প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে যথাযথ খোঁজখবর নেওয়া এবং পদায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থাকলেও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন:
১. নির্বাহী প্রকৌশলীদের পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করার লিখিত নীতিমালা ও অনুমোদনপত্র।
২. গ্রেডিং শিট, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং কর্মকর্তাদের এসিআর ও পেশাগত যোগ্যতার মূল্যায়ন।
৩. লটারিতে ব্যবহৃত বাক্স, নামের তালিকা, লটারির ভিডিও বা কার্যবিবরণী এবং চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ।
৪. ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে পদায়নের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদন এবং প্রযোজ্য নিরাপত্তা যাচাইয়ের নথি।
৫. অভিযোগে উল্লেখ করা ই-জিপি দরপত্রের মূল্যায়ন, টেকনিক্যাল অনুমোদন, প্রত্যাখ্যানের কারণ এবং প্রাক্কলন ও ভেরিয়েশন অনুমোদনের রেকর্ড।
৬. কথিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং অর্থের উৎস।
৭. নিয়োগ, বিশেষ বিসিএস, মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী পদায়নের বৈধতা-সংক্রান্ত নথি।
সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ শুধু প্রকৌশলগত দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনিক জবাবদিহি, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও জড়িত। তাই পদায়ন নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা অতীতের কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিযোগকে এককভাবে অনিয়ম বা নিরাপত্তাঝুঁকির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রামাণ্য নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
রেজা তৈমুর মালিকসহ যেসব কর্মকর্তার পদায়ন, গ্রেডিং বা দরপত্রপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি পর্যালোচনা, আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। লটারির মাধ্যমে পদায়নের নামে ক্যাটাগরি নির্ধারণে অনিয়ম, গ্রেডিং শিটে কারসাজি, আগে থেকে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পাঠানো এবং প্রায় ১২০ কোটি টাকার কথিত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিযোগকারী। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগসহ রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগ। এসব বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের বাসভবন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের মতো দায়িত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলী রেজা তৈমুর মালিক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৫ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনে তাঁর পদায়ন করা হয় বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পদায়নকে ঘিরে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব বণ্টনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রশাসনিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে লটারির ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও গ্রেডিং শিট তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে। লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ‘এ প্লাস’, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’—এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয়নি বলে তাঁদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তাদের নাম একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে রেখে লটারির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগের জন্য আগে থেকেই কয়েকজন কর্মকর্তাকে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, রেজা তৈমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও পদায়নপ্রক্রিয়া তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রভাব ও পছন্দের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ বণ্টন করা হয়ে থাকতে পারে। গ্রেডিং শিটে কারসাজির অভিযোগ লটারির আগে গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব), নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব, সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত মাজহার এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়ার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগে বলা হয়েছে, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন ও প্রকল্প বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ পদায়নে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিজে থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ নয়; এ ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদায়ন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত নথিই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২-এ দায়িত্ব পালনের পর শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে তাঁর পদায়নের যোগ্যতা, অনুমোদন এবং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। রেজা তৈমুর মালিকের পদায়ন ঘিরে বিতর্ক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নকে কেন্দ্র করে তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় ও আগের কর্মস্থল নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, রেজা তৈমুর মালিকের বাবা মো. রেজাউল হক মালিক, যিনি মুকুল নামে পরিচিত ছিলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি মারা যান। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বাজারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রেজাউল হক মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পরিচিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রেজাউল হক মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাবে ছেলে রেজা তৈমুর মালিকের চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে আকর্ষণীয় কর্মস্থলে পদায়নেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, রেজা তৈমুর মালিক নিম্নমানের একটি কোম্পানিকে পিডব্লিউডি সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নাম, সিডিউল অন্তর্ভুক্তির নথি, আর্থিক লেনদেনের দলিল কিংবা নিরীক্ষা প্রতিবেদন ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাঁর বর্তমান পদায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই, প্রশাসনিক বিধি এবং পেশাগত যোগ্যতা যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। আগের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন সরবরাহ করা তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসান, সুব্রত বিশ্বাস এবং রেজা তৈমুর মালিকের বিরুদ্ধে। তাঁদের কয়েকজনের ছবি ফেসবুকে প্রকাশ এবং অন্য কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তাদের আবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের চাকরির রেকর্ড, আগের পদায়ন, কর্মদক্ষতা এবং বর্তমান দায়িত্বের জন্য প্রশাসনিক যোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোশ ওজাকে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পদায়ন করা হয়েছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে বদলি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা এ ঘটনাকে সামনে রেখে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নও পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ মাসুম বিল্লাহর পদায়ন সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ পদায়নের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন এবং সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় কাজে লাগিয়ে নগর গণপূর্ত বিভাগে প্রথম পদায়ন বাগিয়ে নেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নিয়োগের নথি, কোটার বৈধতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল সরবরাহ করা হয়নি। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর দায়িত্বের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণকাজ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর-সংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্ব নিয়েও এ বিভাগের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এত গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পেশাগত যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড এবং প্রশাসনিক অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। ডিসেম্বরকে ঘিরে পরিকল্পনার অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলি ও পদায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাসের ব্যবধানে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। এই বদলি ও পদায়নের মধ্যে সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এনএসআই ও দুদকের সদর দপ্তর এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীরা ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অর্থায়ন, আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২: কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধেও কমিশন ও দরপত্রসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী, যিনি টিপু মুন্সি নামে পরিচিত, তাঁর ভায়রা। টিপু মুন্সির সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে আবু নাসের চৌধুরী ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এ পদায়ন পেয়েছেন এবং এ জন্য ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এ অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আবু নাসের চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন দাবি করা হয়। ই-জিপি দরপত্রে পাঁচ শতাংশ কমিশন না দিলে টেকনিক্যাল অনুমোদন দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ অভিযোগের পক্ষে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪-এর কয়েকটি দরপত্রের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য এবং আবু নাসের চৌধুরীর ই-জিপি আইডিতে আটকে থাকা দরপত্রের কথা উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। সংশ্লিষ্ট ই-জিপি রেকর্ড, অনুমোদনপ্রক্রিয়া, দরপত্রের মূল্যায়ন এবং প্রত্যাখ্যানের কারণ যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। বগুড়ায় দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তনের অভিযোগ আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) কাজ লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের (এলটিএম) পরিবর্তে ওপেন টেন্ডারিং মেথডে (ওটিএম) আহ্বানের অনুমতি দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের কাজ এবং এপিপিভুক্ত কয়েকটি দরপত্রের ক্ষেত্রে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দিয়ে তিনি ১০ শতাংশ কমিশন নিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত অভিযোগে যেসব দরপত্র আইডি উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো: ১১১১৭৮১, ১১১৯৩১৬, ১১১৩০৭৯, ১১১১৫৬৩, ১১১১৫৫৮, ১১১১৫৫৯, ১১১১৫৬০, ১১১১৫৭০, ১১১১৫৬৭, ১১১১৫৬৯, ১১১১৫৬১, ১১১১৫৬৪, ১১১১৫৬৫, ১১১১৫৬৬, ১০৮১৫৪৬, ১১০০৭৯০, ১১০২০২৮, ১০৯১৯৭৩, ১০৯১৯৭৪, ১০৯১৯৭৫, ১০৯১৯৭৬, ১০৯১৯৭৭, ১০৯১৯৭৮, ১০৯১৯৭৯, ১০৮২১৫৯, ১০৮০২৩৫, ১০৮০২৩৬, ১০৬৯১৩১, ১০৭০৮৭৪, ১০৭০৮৭৫, ১০৭০৮৭৬, ১০৭১২৬৫, ১০৪৩২৪৮, ১০২৯৫৯৬ এবং ১০১৮১৫৯। এসব দরপত্রে পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রদানের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তন বা একাধিক দরপত্র আইডি উল্লেখ করাই কমিশন গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণ করে না। রাজিবুল ইসলাম ও রাশেদ আহসানের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন অভিযোগে রাজিবুল ইসলামের পদায়নের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবার একই বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, রাশেদ আহসান সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুর এবং পরে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে তাঁর পদায়নে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে বদলি নীতিমালা, আগের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ, পদায়নের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতার নথি পর্যালোচনা জরুরি। লটারিতে বৈষম্য ও ১২০ কোটি টাকার অভিযোগ লটারির আওতায় কোন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং কারা বাদ পড়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও একই পদমর্যাদার কয়েকজন কর্মকর্তার নাম লটারিতে না রাখার অভিযোগ রয়েছে। একই পর্যায়ের অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কারা লটারির আওতায় এসেছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন অভিযোগকারীরা। এদিকে, লটারি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের সিন্ডিকেট প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁদের নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের উৎসও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সুশাসন বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং মন্ত্রীদের বাসভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক থাকলে তা সরকার ও প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে যথাযথ খোঁজখবর নেওয়া এবং পদায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থাকলেও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তদন্তে যেসব নথি গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন: ১. নির্বাহী প্রকৌশলীদের পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করার লিখিত নীতিমালা ও অনুমোদনপত্র। ২. গ্রেডিং শিট, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং কর্মকর্তাদের এসিআর ও পেশাগত যোগ্যতার মূল্যায়ন। ৩. লটারিতে ব্যবহৃত বাক্স, নামের তালিকা, লটারির ভিডিও বা কার্যবিবরণী এবং চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ। ৪. ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে পদায়নের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদন এবং প্রযোজ্য নিরাপত্তা যাচাইয়ের নথি। ৫. অভিযোগে উল্লেখ করা ই-জিপি দরপত্রের মূল্যায়ন, টেকনিক্যাল অনুমোদন, প্রত্যাখ্যানের কারণ এবং প্রাক্কলন ও ভেরিয়েশন অনুমোদনের রেকর্ড। ৬. কথিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং অর্থের উৎস। ৭. নিয়োগ, বিশেষ বিসিএস, মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী পদায়নের বৈধতা-সংক্রান্ত নথি। জবাবদিহি ও নিরাপত্তা—দুই প্রশ্নেই স্বচ্ছতা জরুরি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ শুধু প্রকৌশলগত দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনিক জবাবদিহি, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও জড়িত। তাই পদায়ন নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা অতীতের কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিযোগকে এককভাবে অনিয়ম বা নিরাপত্তাঝুঁকির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রামাণ্য নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। রেজা তৈমুর মালিকসহ যেসব কর্মকর্তার পদায়ন, গ্রেডিং বা দরপত্রপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি পর্যালোচনা, আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকা নিয়ে ক্ষোভ; বদলি-বাণিজ্য, দরপত্রে অনিয়ম, অগ্রিম বিল পরিশোধ ও কমিশন আদায়ের অভিযোগ। প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরেও প্রশ্ন, তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ কর্মকর্তাদের- ইত্তেহাদ নিউজ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। অথচ এই অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা, বদলি ও পদায়ন, সরকারি দরপত্র, নিয়োগ এবং নির্মাণকাজের বিল পরিশোধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের কয়েকজন, এমনকি অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, লিখিত অভিযোগ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করার পরও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, কমিশন বাণিজ্য, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ —সব মিলিয়ে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরেও বদলি-বাণিজ্য, পদায়নে অর্থ লেনদেন, দরপত্রে প্রভাব বিস্তার এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি অর্থে পরিচালিত শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আর্থিক জবাবদিহি কতটা কার্যকর? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরও এর বাইরে নয়। অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় দীর্ঘদিনের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, অগ্রিম বিল পরিশোধ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ, জাহেদুল করীম, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবুল হাসেম সরদার এবং সরোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। মোজাহিদুল আলিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে কী উঠে এসেছিল? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয় মোজাহিদুল ইসলাম আলিফকে। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হিসেবে পরিচিত। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁর নাম উঠে আসে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবনের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন পরিদর্শনে তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তখন চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন না করেই অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।অর্থাৎ, অভিযোগটি কেবল নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং কাজের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বিল পরিশোধের সামঞ্জস্য ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।এর আগে সাভার জোনে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনের সময় কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও আলিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, আগারগাঁওয়ে নতুন প্রধান কার্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের সময় একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে ঢাকা মেট্রো জোনে পদায়ন করা হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তে শাস্তির সুপারিশ করা হয়ে থাকলে তার পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেই তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের নিষ্পত্তি ও গৃহীত ব্যবস্থার নথি প্রকাশ না হলে একই কর্মকর্তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রধান প্রকৌশলীর পদ নিয়ে আলোচনায় জাহেদুল করীম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদ পেতে তৎপর বলে আলোচনায় রয়েছেন জাহেদুল করীম। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত ওই কমিটি ঘোষণার সময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। আরও পড়ুন: ইইডির শীর্ষ পদ দখলের দৌড়: পদোন্নতি, সিন্ডিকেট ও বিতর্কের অভিযোগে অস্থিরতা অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাঁকে প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে রেখেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল পরিশোধের মতো অভিযোগও রয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি গোপন রেখে পদায়ন করা যেমন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, তেমনি তদন্ত ছাড়াই অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়সংগত নয়। বরিশালে শহিদুল ইসলাম: দুদকে অভিযোগ, বরগুনায় অতিরিক্ত দায়িত্ব বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামকে ঘিরে অভিযোগ আরও বিস্তৃত। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার নির্বাহী সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন সাকিল আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি । অভিযোগে সরকারি দায়িত্বে থেকে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, বিল পাসের বিপরীতে কমিশন দাবি, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং দরপত্রপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগে মেসার্স মোমিন সিকদার, মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের মাধ্যমে কাজ বণ্টন, সাবকন্ট্রাক্ট ও ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদানের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া এবং বিল পাসের বিপরীতে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করার ঘটনা ঘটেছে। আরও পড়ুন: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল যখন ঠিকাদার: ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, ১৪৪টি কাজের পুনঃদরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হয়েছে। বাতিল হওয়া দরপত্রের কার্যসম্পাদন জামানত বা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি পে-অর্ডার আকারে জমা নেওয়ার পর সেগুলো বিধি অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত বা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নগদায়নের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এভাবে সরকারি অর্থের বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে। তবে কতটি পে-অর্ডার নগদায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর মোট মূল্য কত এবং অর্থ কোথায় গেছে—তা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাংক নথি, সরকারি হিসাব, দরপত্র বাতিলের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি পরীক্ষা করা জরুরি। প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজের দরপত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তাঁর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অতীতের অনিয়ম এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ঢাকা ও বরিশালে অংশীদারত্বে জমি কেনা, ফ্ল্যাট ব্যবসা এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অসদাচরণসংক্রান্ত অভিযোগও তোলা হয়েছে। এত অভিযোগের মধ্যে শহিদুল ইসলামকে বরিশালের পাশাপাশি বরগুনা জেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁকে প্রত্যাহার ও তদন্তের দাবিতে বরিশালে মানববন্ধন হয়েছে ।এছাড়া তার বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারীরও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, লিখিত অভিযোগ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পরও কেন তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপের তথ্য সামনে আসছে না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা, তদন্তের অগ্রগতি এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি স্পষ্ট করা। আবুল হাসেম সরদার: ২০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার তৎকালীন সদস্যসচিব ও সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল হাসেম সরদারের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। সরোয়ার হোসেনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেনও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। আরও পড়ুন: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর: বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা ও সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি সরোয়ার এখনো ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীতের সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটি প্রমাণসহ যাচাই করা প্রয়োজন। অধিদপ্তরসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোও তদন্তের দাবি রাখে। তাঁর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের বিনিময়ে অর্থ লেনদেন, দরপত্রে কথিত কমিশন আদায় এবং ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কয়েকজন। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি বদলি আদেশে কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি এবং কয়েকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় তারেক আনোয়ার জাহেদী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়ন ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেও এই গোষ্ঠী বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। আরও পড়ুন: ইইডির প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে অভিযোগের স্তূপ, বদলি-বাণিজ্য ও টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সুযোগে দ্রুতগতিতে বড় অঙ্কের বদলি-বাণিজ্য হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।২০২৫ সালের নভেম্বরেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা ও একটি বদলি-সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ সামনে এসেছিল। একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসায় বদলি ও পদায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আদেশ বাস্তবায়নের নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে। অধস্তন কর্মীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, সরাসরি অর্থ গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে অধস্তন কর্মীদের ব্যবহার করা হতো। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত জসিম নামের এক কর্মচারীকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্ত্রীর নামে লাইসেন্স খুলে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা এবং নামে-বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর নজরে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার ঘটনা তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার ফল, মেধাতালিকা, নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা জরুরি। নির্মাণকাজে বিলম্ব, নিম্নমানের উপকরণ ও অগ্রিম বিল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নয় মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা এমন কোনো কোনো প্রকল্প চার বছরেও শেষ হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পে বরাদ্দের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে যথাযথ জবাব দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। কাজের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ হয়ে থাকলে কিংবা নির্মাণের মান নিয়ে পরীক্ষায় গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। পাঁচ লাখ টাকার ভিডিও: তদন্ত কমিটিতে প্রধান প্রকৌশলী ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের দপ্তরে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওতে টেবিলের ওপর টাকা রাখা দেখা যায় এবং একজনকে ‘স্যারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা রেখে যান’ বলতে শোনা যায়। হাসান শওকত দাবি করেন, টাকাগুলো ঠিকাদারদের এবং এ ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয় অতিরিক্ত সচিব ড. সরদার মো. কেরামত আলীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এবং উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানকে। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়: অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তার দপ্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের কমিটিতে একই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে সদস্য করা হলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে? হাসান শওকতের দপ্তরের ভিডিও সম্পর্কে তারেক আনোয়ার জাহেদী জানিয়েছিলেন, ভিডিওটি তখনও তাঁর নজরে আসেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। একই সংগঠনের সদস্যদের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত? অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একই কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এই পার্থক্য নিয়ে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক প্রভাবের পরিবর্তে অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং তদন্তের ফলের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্য হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, তদন্তের অবস্থা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণ এবং পদায়নের নথি পাশাপাশি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষা সচিবের কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস যোগাযোগ করা হলে শিক্ষা সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা চলতে দেওয়া হবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তাঁদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে না।এই বক্তব্যের পর অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের সুনাম ও শিক্ষার অবকাঠামো—দুই ক্ষেত্রেই জবাবদিহির প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো। ফলে এখানে দরপত্রে অনিয়ম, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন কিংবা প্রকল্পের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ কেবল প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারযোগ্যতা এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারের ওপর। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অধিদপ্তরের ভেতরে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে কোনো কোনো কর্মকর্তা চাপের মুখে পড়েন। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত, প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তিতে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন। প্রথমত, মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে শাস্তির সুপারিশ করা হয়ে থাকলে তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী ছিল? দ্বিতীয়ত, বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদক ও অধিদপ্তরে দেওয়া অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? বরিশালের পাশাপাশি বরগুনার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি কী? তৃতীয়ত, জাহেদুল করীম, আবুল হাসেম সরদার ও সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো বিভাগীয় বা দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত চলছে কি না, চললে তার অগ্রগতি কতদূর? চতুর্থত, প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্য, পদায়নে অর্থ লেনদেন ও দরপত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হয়েছে কি না? অধস্তন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাঁর দেওয়া তদন্তের নির্দেশগুলোর চূড়ান্ত ফল কী? পঞ্চমত, নির্মাণ প্রকল্পে অগ্রিম বিল পরিশোধ, অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে অর্থ ছাড় এবং পুনঃদরপত্রে অনিয়মের অভিযোগগুলো যাচাই করতে প্রকল্পভিত্তিক নিরীক্ষা করা হয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে বোঝা যাবে, অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেবল তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, নাকি অভিযোগের নিষ্পত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর প্রক্রিয়াও চালু রয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি—তবে সেই নিষ্পত্তি হতে হবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকা এই সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, জমি দখল, বিপুল সম্পদ অর্জন এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগ—গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারকে ঘিরে সামনে এসেছে এমন একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের দায়িত্বে থাকার সময় তিনি রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখল ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলাও হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় দেওয়া আবুল বাশার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত হতে শুরু করেন। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি তোলা এবং অর্থায়নের মাধ্যমে নিজের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ধানমন্ডি ৩২-এ প্রায় এক দশকের দায়িত্ব প্রাপ্ত তথ্য ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আবুল বাশার ২০১৫ সালের শুরুর দিক থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল জাদুঘর ও সংশ্লিষ্ট সুদাসদনের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুবাদে তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই পরিচয়কে কেন্দ্র করে নিজ এলাকা বরিশালের বাকেরগঞ্জেও তাঁর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর কবাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কথা অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল, সমাবেশ ও জনসভায় তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ সহায়তা দিতেন এবং এলাকায় দলটির একজন অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরকারি দায়িত্বে অনুপস্থিতি ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের নথি আবুল বাশারকে ঘিরে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তাঁর কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অভিযোগ। একটি দাপ্তরিক চিঠির বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ২ নম্বর বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম আবুল বাশারের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন। এর জবাবে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দেওয়া একটি লিখিত ব্যাখ্যায় আবুল বাশার নির্বাচনী কার্যক্রমে নিজের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন বলে সরবরাহ করা তথ্যে দাবি করা হয়েছে। ওই চিঠিতে তাঁর বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি-সংক্রান্ত নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে তিনি নিজ এলাকায় ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। নির্বাচনের পর বিজয়ী প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুল হাফিজ মল্লিকের বিজয় সংবর্ধনা ও বিজয় র্যালিসহ একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থাকার কথাও তিনি লিখেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন আবুল বাশারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তাঁর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর জুরাইনে পাঁচতলা বাড়ি, নিউ মার্কেট এলাকায় স্বর্ণের দোকান, বরিশাল শহরে বাড়ি, বাকেরগঞ্জের হানুয়া গ্রামে ইটভাটা এবং কয়েকশ বিঘা জমিসহ তাঁর বিপুল সম্পদ রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ এসব সম্পদের সম্মিলিত মূল্য অর্ধশত কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করেছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর আয়কর নথি, বার্ষিক সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরির আয় ও ঘোষিত সম্পদের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয় হতে পারে। আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি—রাজনৈতিক অবস্থান বদলের অভিযোগ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবুল বাশারের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ সহায়তা দেওয়া আবুল বাশার পরবর্তী সময়ে বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উপস্থিত হতে শুরু করেন। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, বিএনপির কিছু নেতার সঙ্গে ছবি তুলে এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ সহায়তা দিয়ে তিনি নিজেকে বিএনপির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করতে তিনি কিছু সাংবাদিককে অর্থ দিয়ে নিজের পক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুদকের চিঠি: অনুসন্ধানের নথি কোথায় দাঁড়িয়ে? আবুল বাশারের সম্পদ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যোগাযোগের কথাও সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে দুদক তাঁর বিষয়ে তথ্য চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি চিঠি পাঠায়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহাবুব হাসান আবুল বাশারের জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, পাসপোর্ট, টিআইএন, চাকরির বেতন ও অন্যান্য সুবিধা, চাকরির বিবরণী এবং ঝিগাতলা অফিসার্স কোয়ার্টার নির্মাণ প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এই তথ্য থেকে দুদক তাঁর বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল বলে অভিযোগের একটি দিক সামনে আসে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অর্থের বিনিময়ে দুদকের অনুসন্ধান প্রভাবিত বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেনের প্রমাণ বা কমিশনের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি সরবরাহ করা হয়নি। ফলে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। জমি দখলের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন ও মামলা ২০২৫ সালের মার্চে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আবুল বাশারের বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে লিখিত বক্তব্যে কুদ্দুস মিয়া নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আবুল বাশার তাঁর এবং তাঁর বোনের ৭০ শতাংশ জমি ও অন্য প্রতিবেশীদের জমি অবৈধভাবে দখল করেছেন। কুদ্দুস মিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় তিনি গত ১২ মার্চ বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালত তথা স্পেশাল জজ আদালতে আবুল বাশারসহ চারজনকে বিবাদী করে মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়া হানুয়া গ্রামের বাসিন্দা খালেক মিয়ার ছেলে জামাল হোসেন মিয়া গত জানুয়ারিতে বরিশাল অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবুল বাশারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। ইটভাটা ও বেনামি ব্যবসার অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে কুদ্দুস মিয়ার বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, আবুল বাশার তাঁর বাবার নামে বাকেরগঞ্জের হানুয়া গ্রামে একটি ইটভাটা চালু করেন। প্রতিষ্ঠানটি আগে সূর্য ইটভাটা নামে পরিচিত ছিল এবং বর্তমানে এএইচ ব্রিকস নামে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, সুদে টাকা বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রয়োজন নথিভিত্তিক জবাবদিহি আবুল বাশারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী ছিল? নির্বাচনী সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে দপ্তরের ব্যবস্থা কী? তাঁর ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না? জমি নিয়ে দায়ের করা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? আর দুদক তাঁর বিষয়ে তথ্য চাওয়ার পর অনুসন্ধান কোন পর্যায়ে রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি কিংবা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সরকারি চাকরির নথি, সম্পদ বিবরণী, ভূমি রেকর্ড, ব্যবসায়িক মালিকানা, ব্যাংক লেনদেন এবং আদালত ও দুদকের নথির সমন্বিত যাচাই। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসতে পারে। আর অভিযোগ অসত্য বা অতিরঞ্জিত হলে সেটিও নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। জনস্বার্থে অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশই হতে পারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর পথ।