ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট। বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার একটি কক্ষ। দরজার ওপাশে পড়ে আছেন ৭২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। মৃত্যু হয়েছে কয়েকদিন আগে। কিন্তু কেউ জানে না। কেউ খোঁজও নেয়নি। পুলিশ যখন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর ফোন পেয়ে সেখানে পৌঁছায়, তখন মরদেহে পচন ধরেছে। লাশে জন্ম নিয়েছে পোকা। ঘরজুড়ে দুর্গন্ধ। চারপাশে আবর্জনা। এমন এক দৃশ্য, যা শুধু একটি মৃত্যুর নয়—বরং সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়া এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্ন উঠছে—নূরজাহান বেগমের মৃত্যু কি স্বাভাবিক? নাকি এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, বিচ্ছিন্নতা ও দায়িত্বহীনতার পরিণতি? মৃত্যুর আগে কতদিন ছিলেন নিঃসঙ্গ? পল্লবী থানার তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুন রাতে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের একটি ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—একই ফ্ল্যাটে তার মেয়ে বসবাস করলেও তিনি ছিলেন আলাদা একটি কক্ষে। কয়েকদিন ধরে কোনো সাড়া না পেয়ে পরে একজন নার্সকে ডেকে আনা হয়। সেই নার্সই প্রথম বুঝতে পারেন, বৃদ্ধা অনেক আগেই মারা গেছেন। স্থানীয়দের দাবি, মৃত্যুর পর বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে নার্সের সন্দেহ হওয়ায় ৯৯৯-এ ফোন করা হয় এবং পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ হয়নি। ফলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। প্রতিষ্ঠিত সন্তান, কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ দায়িত্ববোধ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নূরজাহান বেগমের চার সন্তানই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে সরকারের একজন যুগ্ম সচিব, মেজ ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর শিক্ষক, ছোট ছেলে কানাডাপ্রবাসী এবং মেয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তাদের সামাজিক অবস্থান যতই উঁচু হোক, মায়ের শেষ জীবন নিয়ে এখন ততটাই কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন তারা। রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, পর্যাপ্ত খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসা না দিয়ে তাকে কার্যত অবহেলার মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি তাকে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। হাইকোর্টে রিট: অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে তদন্ত দাবি ঘটনার পর জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী, আইনজীবী মো. শরীফ সরকারের পক্ষে রিটটি দায়ের করেন। রিটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে— নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা; অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত; প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি; জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন; ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কেয়ারগিভার নিয়োগের নীতিমালা। আগামী সোমবার হাইকোর্টে এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে। সরকারি প্রতিক্রিয়া: যুগ্ম সচিবকে ওএসডি ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রতিক্রিয়াও নজর কাড়ছে। নূরজাহান বেগমের ছেলে এবং সরকারের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানকে ইতোমধ্যে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে পৃথকভাবে সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (রাখি) চার সন্তানের কাছে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। আইন কী বলে? বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, কোনো সন্তান যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া বাবা-মায়ের ভরণপোষণ না করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে বর্তমান ঘটনায় সেই আইন কতটা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে তার ওপর। শুধু একটি পরিবার নয়, বৃহত্তর সামাজিক সংকট? নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নটি হলো—শিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা কি মানুষের নৈতিক দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে পারে? কারণ এখানে অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এমন কিছু মানুষ, যারা সমাজের উচ্চপদে অবস্থান করেন। সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ, একক পরিবার ব্যবস্থা, বিদেশমুখী জীবনযাত্রা এবং পারিবারিক বন্ধনের পরিবর্তনের ফলে প্রবীণদের একাকিত্ব বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক যত্নের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। তদন্তের অপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো অজানা। তবে কয়েকটি প্রশ্ন ইতোমধ্যে সামনে এসেছে— মৃত্যু ঠিক কবে হয়েছিল? একই বাসায় থেকেও কেন দ্রুত বিষয়টি শনাক্ত হয়নি? বৃদ্ধার চিকিৎসা ও পরিচর্যার বাস্তব অবস্থা কী ছিল? তিনি কি দীর্ঘদিন অবহেলার শিকার ছিলেন? পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন এখানে কতটা প্রযোজ্য? রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবীণ সুরক্ষায় নতুন নীতিমালা প্রয়োজন কি না? ময়নাতদন্ত, পুলিশি তদন্ত এবং সম্ভাব্য আদালতীয় শুনানির মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। কিন্তু এরই মধ্যে পল্লবীর সেই ফ্ল্যাট থেকে উঠে আসা দুর্গন্ধ যেন বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে—যেখানে একজন মা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময়টিতে কতটা একা হয়ে যেতে পারেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুরো দেশ।
জাহিদ ইকবাল : মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটে যখন পুলিশ ঢুকল, তখন ঘরজুড়ে শুধু পচনের গন্ধ আর এক ধরনের ভয়াবহ নীরবতা। যে নীরবতা সাধারণ নীরবতা নয়; যে নীরবতা মানুষের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সমাজের মুখোশ খুলে দেয় এবং আমাদের তথাকথিত সভ্যতার সামনে একটি নির্মম আয়না তুলে ধরে। বিছানায় পড়ে ছিলেন নুরজাহান বেগম। বয়স বাহাত্তর। শরীরে পচন ধরেছে। মৃত্যুর সাত থেকে আট দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে কেউ জানতে পারেনি তিনি আর বেঁচে নেই। কেউ তাঁর খোঁজ নেয়নি। কেউ দরজায় কড়া নাড়েনি। কেউ একবারও জানতে চায়নি—“মা, আপনি কেমন আছেন?” এই দৃশ্য কেবল একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক সামাজিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি। কারণ এখানে শুধু একজন বৃদ্ধা মারা যাননি, এখানে মারা গেছে পারিবারিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্পর্কের সেই পবিত্র বন্ধন, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি জাতি গড়ে ওঠে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নুরজাহান বেগম কোনো অসহায়, নিঃসন্তান বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ ছিলেন না। তাঁর সন্তানরা সমাজের চোখে প্রতিষ্ঠিত। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, আরেকজন দেশের অন্যতম সেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আরেকজন বিদেশে বসবাস করেন। সমাজের প্রচলিত মানদণ্ডে এটি একটি সফল পরিবারের গল্প। এমন পরিবারকে আমরা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরি। এমন সন্তানদের নিয়ে গর্ব করি। আত্মীয়স্বজনদের আড্ডায় তাঁদের সাফল্যের গল্প বলা হয়। কিন্তু আজ একটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে তাড়া করে ফিরছে— যে সন্তান জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেও নিজের মায়ের নিঃসঙ্গতা দেখতে পায় না, সে কি সত্যিই সফল? আমরা সন্তানদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কত কিছুই না করি। ছোটবেলা থেকে কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, ভালো স্কুল, ভালো কলেজ, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়—সবকিছুর পেছনে ছুটি। আমরা চাই আমাদের সন্তান ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক, সচিব হোক, অধ্যাপক হোক, বিদেশে যাক, বড় চাকরি করুক। কিন্তু এই দৌড়ের মধ্যে আমরা একটি বিষয় ক্রমাগত ভুলে যাচ্ছি—মানুষ হওয়ার শিক্ষা। আমরা পেশাজীবী তৈরি করছি, কিন্তু মানুষ তৈরি করতে পারছি না। আমরা মেধাবী তৈরি করছি, কিন্তু হৃদয়বান মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। যে মা একদিন নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জ্বরের রাতে মাথায় পানি ঢেলেছেন, যে মা নিজের নতুন কাপড় না কিনে সন্তানের বই কিনে দিয়েছেন, যে মা নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের প্লেটে খাবার তুলে দিয়েছেন, সেই মা যদি জীবনের শেষ সময়ে একটি ঘরের ভেতরে একা পড়ে থাকেন, তাহলে আমাদের সব অর্জন, সব শিক্ষা, সব উন্নয়ন আসলে কীসের জন্য? জানা গেছে, নুরজাহান বেগম তাঁর মেয়ের বাসায় থাকতেন। একই ছাদের নিচে মা ও মেয়ে বাস করতেন, কিন্তু আলাদা ঘরে। একজন মানুষ কীভাবে একই বাড়িতে থেকেও এতটা একা হয়ে যেতে পারেন? কীভাবে একজন মা এমন এক অবস্থায় পৌঁছান, যেখানে সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাঁর ঘরে কেউ ঢোকে না? কীভাবে সম্ভব, পাশের ঘরে মানুষ রয়েছে অথচ একজন বৃদ্ধার মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরের পচন কারও নজরে আসে না? এ প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়। এ প্রশ্ন আমাদের পুরো সমাজের। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে যোগাযোগের প্রযুক্তি সবচেয়ে উন্নত, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সবচেয়ে দুর্বল। আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সেকেন্ডে কথা বলতে পারি, কিন্তু একই বাড়ির একটি ঘরে থাকা বৃদ্ধ মায়ের খোঁজ নিতে পারি না। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ছবি পোস্ট করি, অসংখ্য স্ট্যাটাস দিই, কিন্তু বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসে দশ মিনিট সময় কাটানোর ফুরসত পাই না। আর যখন নুরজাহান বেগমের সেই শেষ ছবিটির দিকে তাকাই, তখন বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে আসে। সেখানে দেখা যায় এক বৃদ্ধা নারী নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। মুখে আর কোনো অভিযোগ নেই। কোনো অভিমান নেই। কোনো প্রত্যাশাও নেই। যেন জীবনের সমস্ত অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটেছে। একসময় যে মুখ সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগে ভরে থাকত, যে চোখ সন্তানের পথ চেয়ে জানালার পাশে বসে থাকত, আজ সেই চোখ চিরতরে বন্ধ। ছবিটি দেখে মনে হয় না এটি শুধু একজন মৃত মানুষের ছবি। এটি যেন আমাদের সমাজের বিবেকের ছবি। এই মুখে আমি হাজারো অবহেলিত মায়ের মুখ দেখতে পাই। দেখতে পাই সেইসব নারীদের, যারা সারাজীবন সন্তানদের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, অথচ শেষ বয়সে এসে নিঃসঙ্গতার কাছে পরাজিত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে এই ভেবে যে, মৃত্যুর আগে হয়তো এই মানুষটিও কারও পদধ্বনি শুনতে চেয়েছিলেন। হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলেন, কেউ আসবে। হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর সন্তানরা তাঁকে ভুলে যায়নি। হয়তো তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে এক নিঃসঙ্গ মৃত্যুতে। পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় দৃশ্য সম্ভবত সেটিই—যখন একজন মা অপেক্ষা করেন, আর কেউ আসে না। ছবিটির দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয় এটি একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ব্যর্থতার দলিল। এটি আমাদের শেখায়, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়; সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য হলো ভালোবাসার অভাব। সবচেয়ে বড় নিঃস্বতা হলো আপনজনদের উপস্থিতি না থাকা। এই ছবিটি তাই শুধু একটি মৃত্যুর ছবি নয়। এটি একটি প্রশ্নচিহ্ন। একটি নীরব আর্তনাদ। একটি অব্যক্ত অভিযোগ। এটি যেন আমাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করছে—“তোমাদের এত ব্যস্ততার পৃথিবীতে, একজন মায়ের জন্য কি সত্যিই একটু সময় ছিল না?” আজ বাংলাদেশের শহরগুলোতে হাজার হাজার নুরজাহান বেগম রয়েছেন। তাঁরা হয়তো অর্থকষ্টে নেই। তাঁদের জন্য ওষুধ কেনা হয়, বাজার করা হয়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু মানুষ কি শুধু ওষুধ আর খাবার দিয়ে বাঁচে? একজন বৃদ্ধ মানুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো সঙ্গ, কথা, ভালোবাসা এবং আপনজনের উপস্থিতি। যে মা সারাজীবন সন্তানদের নিয়ে বেঁচেছেন, তিনি বৃদ্ধ বয়সে সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেন সন্তানের কণ্ঠ শোনার জন্য, সন্তানের মুখ দেখার জন্য। অথচ আমরা সেই মানুষগুলোকেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে বেশি একা করে দিচ্ছি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্ত হবে, আইনি প্রশ্ন উঠবে, বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসবে। কিন্তু আইনের বাইরেও একটি নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা কি সত্যিই এমন সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা কেবল দায়িত্বের একটি অংশ? যেখানে তাঁদের জন্য একটি আলাদা ঘর, কিছু টাকা এবং একজন কাজের মানুষ রাখলেই দায়িত্ব শেষ বলে মনে করা হয়? যেখানে ভালোবাসার জায়গা দখল করে নিচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা? আমরা আজকাল সন্তানদের ইংরেজি শেখাই, কম্পিউটার শেখাই, প্রযুক্তি শেখাই, বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখাই। কিন্তু আমরা কি শেখাই বৃদ্ধ মানুষকে সম্মান করতে? আমরা কি শেখাই মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে? আমরা কি শেখাই বাবার নীরব কষ্ট বুঝতে? আমরা কি শেখাই যে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদবি নয়, বরং এমন একজন মানুষ হওয়া, যার উপস্থিতিতে বাবা-মা নিরাপদ বোধ করেন? সত্যি বলতে, নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই মৃত্যু কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা কখনোই মানবিকতার বিকল্প হতে পারে না। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন সেই সমাজের বৃদ্ধ মানুষগুলো সম্মান, যত্ন এবং ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে পারেন। আজ যারা নিজেদের বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময় পান না, তাঁদেরও মনে রাখা উচিত—জীবন একটি চক্র। আজ আপনি সন্তান, কাল আপনি বাবা-মা হবেন। আজ যেভাবে আপনি আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণ করছেন, আপনার সন্তানরাও একদিন সেই আচরণ থেকেই শিক্ষা নেবে। আপনি যদি আপনার সন্তানকে দেখান যে বৃদ্ধ বাবা-মা গুরুত্বপূর্ণ নন, তাহলে একদিন সেই সন্তানও আপনাকে গুরুত্বহীন মনে করবে। কারণ মানবিকতা যেমন উত্তরাধিকারসূত্রে যায়, অবহেলাও তেমনি উত্তরাধিকারসূত্রে যায়। নুরজাহান বেগম আর ফিরে আসবেন না। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেমন কেটেছে, শেষ মুহূর্তে তিনি কাকে মনে করেছিলেন, কাকে ডাকতে চেয়েছিলেন, সেই উত্তর আমরা কোনোদিন জানব না। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে গেছে। সেই আয়নায় আমরা নিজেদেরই মুখ দেখতে পাচ্ছি। তাই মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটের ঘটনা যেন কেবল একটি সংবাদ হয়ে না থাকে। এটি যেন আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। এটি যেন আমাদের বাধ্য করে নিজেদের দিকে তাকাতে। আজ যদি আপনার মা বেঁচে থাকেন, তাঁর ঘরে যান। তাঁর পাশে কিছুক্ষণ বসুন। তাঁর হাতটা ধরুন। জিজ্ঞেস করুন তিনি কেমন আছেন। আজ যদি আপনার বাবা বেঁচে থাকেন, তাঁকে একটি ফোন করুন। তাঁর কণ্ঠটা শুনুন। কারণ পৃথিবীর সব সাফল্য, সব পদমর্যাদা, সব অর্থবিত্ত একদিন অর্থহীন হয়ে যাবে। কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য দেওয়া সময়, তাঁদের মুখে ফোটানো একটি হাসি, তাঁদের মনে দেওয়া নিরাপত্তা—সেটিই শেষ পর্যন্ত আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকবে। সচিব হওয়া, অধ্যাপক হওয়া কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু একজন মায়ের শেষ জীবনে তাঁকে একা না রাখা—তার চেয়েও বড় মানবিক অর্জন আর কিছু নেই। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে অসংখ্য সফল মানুষের নাম হারিয়ে গেছে, কিন্তু একজন মায়ের চোখের জল কখনো হারায় না। আর একজন মায়ের দীর্ঘশ্বাস—সেটি নীরব হলেও, তার প্রতিধ্বনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলে। জাহিদ ইকবাল জামতলা,নিকুঞ্জ-০২ খিলক্ষেত, ঢাকা।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে সাম্প্রতিক হামলা ও সংঘর্ষ নতুন করে সামনে এনেছে বাংলাদেশের মাজারকেন্দ্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের পুরোনো বাস্তবতা। ঘটনাটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। এক পক্ষের দাবি, মাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা মাদক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ বলছে, ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ ছিল মূলত প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দখলের কৌশল। বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি কেবল আইনশৃঙ্খলা বা ধর্মীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে ওয়াকফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য, অনুসারী নিয়ন্ত্রণ এবং মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তারের বহুমাত্রিক সংঘাত। আধ্যাত্মিক কেন্দ্র থেকে অর্থনৈতিক বলয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে মাজার শুধু ধর্মীয় উপাসনাকেন্দ্র নয়; বরং এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত। মাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজার ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। ভক্তদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছেও এসব স্থান সামাজিক মর্যাদা ও ঐতিহ্যের অংশ। মাজারপন্থিদের বিশ্বাস, শরিয়তের অনুশীলনের মধ্য দিয়েই সুফিরা আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ অর্জন করেন। জিকির, ধ্যান ও আত্মসংযম আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু মাজারে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, শিরকচর্চা এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব বিস্তার করেছে। এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব বহু সময় সহিংস রূপও নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও মাজারের প্রভাব দৃশ্যমান। বহু রাজনৈতিক নেতা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির আগে মাজার জিয়ারত করেন। ফলে মাজারকে ঘিরে বিরোধ এখন আর কেবল ধর্মীয় নয়; বরং তা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। মাজারকেন্দ্রিক অপরাধ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, কিছু মাজার এলাকায় মাদক গ্রহণ ও খুচরা মাদক বিক্রি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিপুল মানুষের সমাগম হওয়ায় বহিরাগতদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযানের খবর পেলেই সংশ্লিষ্টরা দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ পায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মাজার এলাকা সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের গোপন যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অবৈধ অস্ত্র গোপন রাখা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, নতুন সদস্য সংগ্রহ কিংবা চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এর পাশাপাশি তাবিজ-কবজ, অলৌকিক চিকিৎসা কিংবা সমস্যা সমাধানের নামে প্রতারণার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। জনসমাগমপূর্ণ পরিবেশের সুযোগে ছিনতাই, পকেটমার ও শিশু নিখোঁজের ঘটনাও মাঝে মধ্যে সামনে আসে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অপরাধের দায় পুরো সুফি ঐতিহ্য বা সব মাজারের ওপর চাপানোও বাস্তবসম্মত নয়। হাজার কোটি টাকার সম্পদ ঘিরে দ্বন্দ্ব শাহ আলী মাজারকে ঘিরে বিরোধের বড় একটি কারণ এর বিপুল সম্পদ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাজারের মোট জমির পরিমাণ ৩২ দশমিক ১৪ একর বা প্রায় ৯৭ দশমিক ৪০ বিঘা। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ বিঘা ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত। এই সম্পত্তির ওপর গড়ে উঠেছে কাঁচামালের আড়ত, দোকান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দ, ভোগদখল ও তদারকিতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মাজারকেন্দ্রিক এই অর্থনৈতিক বলয়কে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং সন্ত্রাসী চক্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্যের প্রতিযোগিতা চলছে। ২০২২ সালে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট হওয়াও এই দ্বন্দ্বের গভীরতা নির্দেশ করে। ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ের আড়ালে কারা? মাজারে হামলার ঘটনাগুলোতে বারবার উঠে আসছে ‘তৌহিদী জনতা’ শব্দবন্ধ। বিশ্লেষকদের একটি অংশের দাবি, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সংগঠিত হামলাকে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করতে এই পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে। সুন্নি মতাদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব স উ ম আবদুস সামাদ বলেন, সরকার পরিবর্তনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে মাজারে হামলার ঘটনা সামনে আসে। তার প্রশ্ন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো? তার দাবি, একটি সংগঠিত গোষ্ঠী নিজেদের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয় ব্যবহার করছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে ঘটনাগুলোকে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরা যায়। মাদকবিরোধী অভিযানের যুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কেন আইন হাতে তুলে নেবে— সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। ধর্মীয় মতাদর্শ বনাম প্রশাসনিক দায় ইসলামিক বুদ্ধিজীবী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান শাহসুফি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হান্নান আল হাদীও মাজারে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তার মতে, কোথাও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের সহায়তায় তা বন্ধ করা উচিত; হামলা বা সহিংসতা কখনও সমাধান হতে পারে না। তিনি বলেন, কিছু স্থানে গাঁজা সেবন বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও সেগুলো দমনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একইসঙ্গে মাজারে শায়িত অলি-আউলিয়াদের প্রতি সম্মান বজায় রাখাও জরুরি। জামায়াতের অস্বীকার, প্রশ্ন রয়ে গেছে শাহ আলী মাজারে হামলার ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তা অস্বীকার করেছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ঘটনার সঙ্গে জামায়াতের কোনও সম্পৃক্ততা নেই এবং একটি মহলউদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, কেবল অস্বীকার যথেষ্ট নয়। তার মতে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিষয়ে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দুই বছরে ৬৮ মাজারে হামলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ৬৮টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময়ে মাজারকেন্দ্রিক হুমকি নিয়ে ৪০টি সাধারণ ডায়েরি এবং ২৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, ছয়টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এবং ১২টি মামলা এখনও তদন্তাধীন। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, শাহ আলী মাজার হামলার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। হামলার কারণ এবং সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই চলছে। সংঘাতের কেন্দ্রে মাজার, সম্পদ ও প্রভাব স্থানীয়দের মতে, শাহ আলী মাজারের ঘটনাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় উগ্রবাদ বা মাদকবিরোধী অভিযানের ফল হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। এখানে জড়িয়ে আছে বিপুল ওয়াকফ সম্পত্তি, স্থানীয় অর্থনীতি, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় মতাদর্শ এবং সামাজিক প্রভাবের জটিল সমীকরণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে— মাজারকে ঘিরে চলমান এই সংঘাত কি কেবল ধর্মীয় মতভেদের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর গভীরে রয়েছে অর্থনৈতিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের বৃহত্তর লড়াই?
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।