বরিশাল অফিস : ফর্মার ক্রিকেটার্স ক্লাব বরিশালের আয়োজনে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৩ মার্চ স্থানীয় নুরজাহান কনভেনশন সেন্টারে ইফতার ও দোয়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ক্রীড়াবিদ আনোয়ারুল হক তারিন,ও হকি কোচ আসাদুজ্জামান খসরু, জেলা সমাজসেবা কার্যালয় বরিশালের উপ- পরিচালক একেএম আকতারুজ্জামান তালুকদার,সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ, ফর্মার ক্রিকেটার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর মোর্শেদ সুমন প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি রমজানের পবিত্রতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একত্রিত হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে ধরা হয়। উপস্থিত অতিথিরা ইফতার শেষে বিশেষ দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন এবং দেশের শান্তি ও কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেন। জেলা সমাজসেবা কার্যালয় বরিশালের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা নয়, বরং সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও একতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।” ইফতার ও দোয়া মাহফিলটি স্থানীয় ক্রীড়াসংস্কৃতির সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি রমজানের মহিমা উদযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। রমজানের পবিত্রতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একত্রিত হয়ে সবাই ইফতার ও বিশেষ দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন।
রমজানের শেষ দশ রাত মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ। এ সময়টিকে ইবাদত, দোয়া ও নেক আমলে ভরিয়ে তুলতে পরিবারকেও সম্পৃক্ত করা জরুরি। কীভাবে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এই সময়কে আরও অর্থবহ করা যায়, সে বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরা হলো। রমজানের শেষ দশ রাত সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনে কাইয়্যিম বলেন, সব মাসের মধ্যে রমজান সর্বোত্তম এবং রমজানের রাতগুলোর মধ্যে শেষ দশ রাত সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। এই সময়ে বেশি বেশি নেক আমল করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। পাশাপাশি পরিবারকে নিয়ে এই সময় কাটালে সন্তানদের মধ্যেও ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে ওঠে এবং পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। নিচে পরিবারের জন্য শেষ দশ রাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরা হলো— নিয়ত ঠিক করা ইসলামে প্রতিটি কাজের আগে নিয়ত ঠিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রমজানের শেষ দশ রাত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত করা উচিত। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও দোয়া করতে হবে এবং সন্তানদেরও দোয়া করতে উৎসাহিত করতে হবে। পরিবারের সঙ্গে তাহাজ্জুদ তারাবি ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। চেষ্টা করা উচিত পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসব নামাজ আদায় করার। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বন্ধন তৈরি হয়। যদি সন্তানরা ছোট হয় তবে সপ্তাহান্তে তাদের মসজিদে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এতে তারা মসজিদের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হবে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শিখবে। একসঙ্গে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত রমজানজুড়ে প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। তবে শেষ দশ রাতে তা আরও বাড়ানো ভালো। পরিবারে একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে সবাই মিলে কোরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যরা পালা করে সুরা পড়তে পারেন। চাইলে এটিকে আনন্দময় করতে ছোট একটি প্রতিযোগিতাও রাখা যেতে পারে, যাতে দেখা যায় কে বেশি তিলাওয়াত করতে পারে। এতে শিশুদের কোরআনের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। দোয়ার তালিকা তৈরি করা রমজান রহমত ও বরকতের মাস। এ সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও বিভিন্ন কল্যাণ কামনার জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। শেষ দশ দিনে সন্তানদের সঙ্গে বসে একটি দোয়ার তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এতে তারা বুঝতে শিখবে যে আল্লাহ সব দোয়া শোনেন। সন্তানদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শেখানো একটি বিখ্যাত দোয়াও শেখানো যেতে পারে—হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন। বেশি বেশি সদকা করা সদকা শুধু অর্থ দানেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার মিলে রান্না করে আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের ইফতারে দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে। সন্তানদের তাদের অপ্রয়োজনীয় খেলনা বা ছোট হয়ে যাওয়া কাপড় গরিবদের দান করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। পরিবারের সবাই মিলে পার্কে গিয়ে পাখিদের খাবার দেওয়া বা আশপাশের বৃদ্ধ প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়াও সদকার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত। যদি সামর্থ্য থাকে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দান করা যেতে পারে। সন্তানদেরও তাদের হাতখরচের কিছু অংশ দান করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এতে তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও উদারতার মানসিকতা গড়ে উঠবে। পরিবারকে সময় দেওয়া রমজানের শেষ দশ রাতকে পরিবারকেন্দ্রিক সময় হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। সন্তানদের বোঝানো দরকার কেন এই রাতগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে বাবা-মা বা আত্মীয়দের সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার ও ইবাদতে সময় কাটানো যেতে পারে। এতে পরিবারে ভালোবাসা বাড়ে এবং সন্তানরা অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও সাহায্যের মানসিকতা শিখে। রমজান খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাই শেষ দশ রাতকে অবহেলায় কাটিয়ে না দিয়ে যতটা সম্ভব ইবাদত ও ভালো কাজে ব্যয় করা উচিত।
রূহ আফজা: রমজানের জনপ্রিয় পানীয়ের এক শতাব্দীর ইতিহাস রমজান মাস এলেই মুসলিম সমাজে বদলে যায় প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। সেহরি ও ইফতারকে ঘিরে শুরু হয় নানা প্রস্তুতি, বাজারে বাড়ে বিশেষ খাবার ও পানীয়ের চাহিদা। পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা-মুড়ি কিংবা খেজুরের পাশাপাশি ইফতার টেবিলে আরেকটি পরিচিত নাম হলো লাল রঙের শরবত—রূহ আফজা। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে রমজানের সময় এই পানীয়ের জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে অনেক পরিবারের মাসিক বাজারের তালিকায় এটি প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই পানীয় শুধু একটি শরবত নয়; এটি উপমহাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লির একটি ছোট ইউনানি ক্লিনিক থেকে শুরু হওয়া এই পানীয় আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লির গলি থেকে শুরু ১৯০৬ সালের গরমের এক দিনে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজধানী দিল্লির পুরনো এলাকা লাল কুয়ান বাজারে একটি ক্লিনিকের সামনে অস্বাভাবিক ভিড় জমে। স্থানীয় মানুষজন বাতাসে ভেসে আসা গোলাপের সুবাসে আকৃষ্ট হয়ে জানতে পারেন, একজন ইউনানি চিকিৎসক একটি বিশেষ পানীয় তৈরি করেছেন। লাল রঙের সেই পানীয়ের স্বাদ নিতে ভিড় বাড়তেই থাকে। দিনের শেষে তৈরি প্রথম ব্যাচ শেষ হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই অনেকে রূহ আফজার জন্মমুহূর্ত বলে মনে করেন। এই পানীয়ের উদ্ভাবক ছিলেন ইউনানি চিকিৎসক হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ। পুরনো দিল্লিতে তার ক্লিনিকের নাম ছিল হামদর্দ দাওয়াখানা। ‘হামদর্দ’ শব্দটির অর্থ—দুঃখ কষ্টের সময়ের সঙ্গী। ১৯০৭ সালের দিকে এই ক্লিনিক থেকেই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয় এই অ্যালকোহলমুক্ত ভেষজ পানীয়ের। কেন তৈরি হয়েছিল রূহ আফজা শুরুর দিকে এটি তৈরি করা হয়েছিল মূলত চিকিৎসা উদ্দেশ্যে। দিল্লির প্রচণ্ড গরমে অনেক মানুষ ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যায় ভুগতেন। রোগীদের সতেজতা ফিরিয়ে দিতে গোলাপ, ভেষজ উপাদান ও ফলের নির্যাস দিয়ে এই পানীয় তৈরি করেন হাকিম মজিদ। গোলাপের সুবাস এবং সতেজ স্বাদের কারণে দ্রুতই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর তিনি এই পানীয়ের নাম দেন রূহ আফজা। উর্দু ভাষায় “রূহ” অর্থ আত্মা বা প্রাণ এবং “আফজা” অর্থ সতেজ করে এমন কিছু। অর্থাৎ নামের অর্থ দাঁড়ায়—“যা আত্মাকে সতেজ করে।” নামের পেছনের গল্প ইতিহাস বিষয়ক ম্যাগাজিন হেরিটেজ টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, এই নামের অনুপ্রেরণা আসে একটি উর্দু কাব্যগ্রন্থ থেকে। উর্দু কবি পণ্ডিত দয়া শঙ্কর নাসিমের বিখ্যাত কাব্য “মসনবি গুলজার-ই-নাসিম”-এ রূহ আফজা নামে এক রাজকন্যার চরিত্র ছিল। সেখান থেকেই এই নাম গ্রহণ করেন হাকিম মজিদ। হাতে তৈরি বোতল থেকে শিল্প উৎপাদন প্রথমদিকে রূহ আফজা হাতে তৈরি করা হতো। ১৯২০ সালের মধ্যে কাঁচের বোতলে হাতে করে শরবত ভরা হতো এবং লেবেলও লাগানো হতো হাতে। দিল্লির শিল্পী মির্জা নূর আহমদ তৈরি করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী লেবেল ডিজাইন, যা এখনো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। চাহিদা বাড়তে থাকলে দিল্লির বাইরে গাজিয়াবাদে একটি কারখানায় এর বড় আকারে উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যু ও নতুন অধ্যায় ১৯২২ সালে হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের মৃত্যু হয়। তখন তার বড় ছেলে আবদুল হামিদ মাত্র ১৪ বছর বয়সে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বে হামদর্দ ধীরে ধীরে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং রূহ আফজার উৎপাদন ও বাজার বিস্তৃত হতে থাকে। ভারত ভাগ ও তিন দেশের ব্র্যান্ড ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর হামদর্দও বিভক্ত হয়ে যায়। বড় ছেলে আবদুল হামিদ ভারতে থেকে যান ছোট ছেলে হাকিম মোহাম্মদ সৈয়দ পাকিস্তানে চলে যান এর ফলে প্রতিষ্ঠিত হয় দুইটি প্রতিষ্ঠান: হামদর্দ ইন্ডিয়া হামদর্দ পাকিস্তান দুই দেশেই রূহ আফজার উৎপাদন অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশে রূহ আফজার যাত্রা ১৯৫০-এর দশকে হামদর্দ পাকিস্তান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) তাদের কার্যক্রম শুরু করে। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিক্রয় কেন্দ্র খোলা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ নামে কার্যক্রম চালিয়ে যায়। পরে ইউসূফ হারুন ভুঁইয়া নামের এক উদ্যোক্তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে রূহ আফজার উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণ শুরু হয়। রমজানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূহ আফজা শুধু পানীয় নয়, রমজানের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। অনেক পরিবারে ইফতার মানেই রূহ আফজার শরবত। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একসময় একটি জনপ্রিয় মন্তব্য ছিল— “ছোটবেলায় মনে করতাম রূহ আফজা শরবত খেলে সওয়াব হয়।” এটি অনেকটাই মজার মন্তব্য হলেও এটি দেখায় যে পানীয়টির সঙ্গে মানুষের আবেগ কতটা গভীর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাকিস্তানি লেখক আজির হাসান রিজভী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, রমজানে এশীয় মুসলমানদের কাছে রূহ আফজার গুরুত্ব ঠিক যেমনটা কার্টুন চরিত্র পোপাই-এর কাছে পালং শাকের। অন্যদিকে মারিয়া সারতাজ নামের এক ব্যবহারকারী বলেন, রমজান ও রূহ আফজা একে অপরের পরিপূরক। দুধ না পানি—চলমান বিতর্ক রূহ আফজা কীভাবে খাওয়া উচিত তা নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেন এটি দুধের সঙ্গে খেলে স্বাদ সবচেয়ে ভালো। অন্যরা বলেন ঠান্ডা পানির সঙ্গে মিশিয়েই আসল স্বাদ পাওয়া যায়। কেউ কেউ আবার ফল, বেসিল সিড বা আইসক্রিম মিশিয়ে নিজস্ব রেসিপি তৈরি করেন। স্বাস্থ্য নিয়ে সমালোচনা তবে সবাই যে এই পানীয়ের ভক্ত তা নয়। সমালোচকদের মতে এতে চিনির মাত্রা বেশি। এছাড়া রঙ ও প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, ঘরে তৈরি শরবত বা ফলের জুস বেশি স্বাস্থ্যকর। যুদ্ধ ও সংকটের সাক্ষী একটি পানীয় যে এত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে পারে, সেটি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। ভারত ভাগ, পাকিস্তান সৃষ্টি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই টিকে আছে এই ব্র্যান্ড। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় আফগান শরণার্থীদের ত্রাণ হিসেবে রূহ আফজা পাঠানো হয়েছিল। পরে দেখা যায়, অনেক শরণার্থী এটি পানি বা দুধ ছাড়াই সরাসরি পান করতেন। ২০১৯ সালের সংকট ২০১৯ সালে ভারতে হঠাৎ করেই বাজারে রূহ আফজা সংকট দেখা দেয়। কোম্পানি জানায়, কিছু ভেষজ উপাদান সহজলভ্য না হওয়ায় উৎপাদন কমে গিয়েছিল। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেক ভারতীয় ব্যবহারকারী হতাশা প্রকাশ করেন। পাকিস্তানি ব্যবহারকারীরা মজা করে ভারতকে রূহ আফজা পাঠানোর প্রস্তাবও দেন। আদালত পর্যন্ত গড়ানো বিতর্ক ২০২২ সালে দিল্লি হাই কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজনকে পাকিস্তানে তৈরি রূহ আফজা ভারতের বাজারে বিক্রি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভারতীয় প্রস্তুতকারকেরা অভিযোগ করেছিলেন, পাকিস্তানি সংস্করণ অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশে জরিমানা বিতর্ক বাংলাদেশেও একবার আইনি জটিলতায় পড়েছিল এই ব্র্যান্ড। ২০১৮ সালে ঢাকার একটি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত অননুমোদিত উপাদান ব্যবহারের অভিযোগে হামদর্দকে চার লাখ টাকা জরিমানা করে। পরে আপিলের মাধ্যমে সেই রায় বাতিল হয়ে যায়। শতাব্দীর পানীয় আজ রূহ আফজা শুধু উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার এশীয় দোকানেও এটি পাওয়া যায়। অনেক প্রবাসী মুসলিমের জন্য এটি রমজানের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পানীয়। স্বাদ, স্বাস্থ্য বা বিতর্ক—সবকিছুর বাইরে রূহ আফজা এখন এক শতাব্দীর ইতিহাসের অংশ। একটি লাল শরবত, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রমজানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সমালোচনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন মামুনুর রশীদ নোমানী: ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র মাস মাহে রমজান। এই মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ জাগতিক ভোগ-বিলাস থেকে নিজেকে সংযত রাখার শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। রমজানকে সহনশীলতা, সংযম ও মানবিকতার মাস হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এই মাসে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে ইফতার ও ইবাদতের মাধ্যমে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। অর্থবান মানুষরা নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা পান। কিন্তু এমন একটি সময়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের আয়োজিত একটি ইফতার মাহফিল নিয়ে উঠেছে বৈষম্যের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ইফতারের মেন্যুতেই ধনী ও গরিব তথা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের একাধিক সূত্র এবং ইফতার মাহফিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা জানান, গত ৪ মার্চ বুধবার শহীদ মিনার সংলগ্ন সিটি করপোরেশনের অডিটোরিয়ামে পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের জন্য পরিবেশন করা হয় ডাবের পানি, শরবত, মাম পানি, মাছ ফ্রাই, মুরগির টিক্কা, জুস, কাচ্চি বিরিয়ানি, খেজুর, বুট, পিয়াজু, বেগুনি ও মুড়িসহ নানা ধরনের খাবার। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ইফতারের মেন্যুতে দেওয়া হয় শুধু একটি এসএমসি জুসের প্যাকেট, একটি বোতল মাম পানি, কিছু খেজুর এবং একটি তেহারির প্যাকেট। আরও অভিযোগ উঠেছে, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ইফতার মাহফিলে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। এ ঘটনায় সিটি করপোরেশনের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “ইফতারের মতো একটি পবিত্র আয়োজনেও এ ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অস্বস্তি ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।” আরেক কর্মকর্তা বলেন, “তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য যে মেন্যু দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এ বিষয়ে আসলে বলার মতো ভাষা নেই।” রমজান মাসে সামাজিক সমতা ও সহমর্মিতার যে শিক্ষা দেওয়া হয়, তার পরিপন্থী এমন আয়োজন নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকেই। “ইফতারে ভাঙি রোজা, ভাঙি বৈষম্য”—এই স্লোগানের কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ। সমালোচকদের মতে, সুবিধাপ্রাপ্ত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ না কমিয়ে বরং আলাদা মেন্যুর মাধ্যমে শ্রেণি বিভেদকে আরও প্রকট করে তুলেছে বরিশাল সিটি করপোরেশন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
মাহে রমজান রহমত, বরকত ও ক্ষমার মাস। এটি জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস, ধৈর্য ও সহমর্মিতার মাস এবং নেক আমলে প্রতিযোগিতার মাস। রমজান হলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম সময়। এ মাসে রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি। যে ব্যক্তি রমজানকে যথাযথভাবে কাজে লাগায়, সে সত্যিকার অর্থেই সফল। তাই আমাদের উচিত এই মহিমান্বিত মাসকে অবহেলা না করে ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে আলোকিত করা। 🌙 রোজার মূল উদ্দেশ্য: তাকওয়া অর্জন রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং আত্মসংযমের মাধ্যমে আল্লাহভীতি অর্জন করা। তাকওয়া মানে হলো নিজের ইচ্ছা-প্রবৃত্তির ওপর স্রষ্টার বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকা। একজন সচেতন মুসলমানের জন্য প্রয়োজন— নিজের ফরজ দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা হারাম বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীনের নির্দেশনা অনুসরণ করা ⚠️ রোজাদারের জন্য যেসব কাজ মাকরূহ ও নাজায়েজ রমজানে রোজা অবস্থায় কিছু কাজ রয়েছে যা সরাসরি গুনাহ, আবার কিছু কাজ রোজাকে মাকরূহ করে দেয়। নিচে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো— গুনাহ ও নাজায়েজ কাজ রোজাদারের জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য— মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া গীবত ও চুগলখুরী করা মিথ্যা কসম খাওয়া অশ্লীল কাজ ও অশালীন কথাবার্তা জুলুম করা ও শত্রুতা পোষণ করা বেগানা নারী-পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা সিনেমা দেখা বা মোবাইলে অশালীন ছবি দেখা এসব কাজ করলে রোজা ভঙ্গ না হলেও রোজা মাকরূহ হয়ে যায় এবং সওয়াব কমে যায়। অপ্রয়োজনে কিছু চিবানো বা চেখে দেখা রোজা অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে কিছু চিবানো বা স্বাদ গ্রহণ করা মাকরূহ। তবে পারিবারিক বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন—স্বামীর কঠোরতার আশঙ্কা) খাদ্য জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে চেখে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিলে অবকাশ রয়েছে। পবিত্রতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ততা পায়খানার রাস্তা অতিরিক্ত পানি দ্বারা ধৌত করা, যাতে ভিতরে পানি প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে—এটি মাকরূহ। ওজুর সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার নাকে অতিরিক্ত পানি টানা কুলি করার সময় গড়গড়া করা এসবের ফলে পানি কণ্ঠনালীতে চলে যেতে পারে, তাই রোজা অবস্থায় সতর্ক থাকা জরুরি। কামভাবসহ দাম্পত্য আচরণ রোজা অবস্থায় কামভাব নিয়ে স্ত্রীকে চুম্বন বা আলিঙ্গন করা মাকরূহ। তবে কামভাব না থাকলে তা মাকরূহ নয়। সুবহে সাদেকের পর গোসল রাতে সহবাসের পর সুবহে সাদেকের পূর্বে গোসল না করে পরে গোসল করলে রোজা নষ্ট হয় না এবং মাকরূহও নয়। তবে পূর্বেই গোসল সম্পন্ন করা উত্তম। দুর্বল মুসাফিরের রোজা যদি সফর অবস্থায় রোজা রাখলে অতিরিক্ত কষ্ট হয়, তবে রোজা রাখা তার জন্য মাকরূহ হতে পারে। চুল বা নখ কাটা রোজা অবস্থায় চুল বা নখ কাটলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। সফরে নিয়ত করে মুকিম হওয়া কোনো ব্যক্তি সফর অবস্থায় রোজার নিয়ত করে এবং সেদিনই মুকিম হয়ে গেলে, তার জন্য ওই দিনের রোজা ভাঙা জায়েজ নয়। চোখে সুরমা বা ঔষধ ব্যবহার চোখে সুরমা লাগানো বা ঔষধ প্রয়োগ করলে রোজা ভাঙে না এবং মাকরূহও হয় না। 🌟 রমজানকে সফলতার সোপান বানাই রমজান আমাদের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। এই মাসে ধৈর্য, সহমর্মিতা ও নেক আমলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারি। আসুন, রমজানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করি, গুনাহ থেকে দূরে থাকি এবং তাকওয়ার আলোয় জীবনকে আলোকিত করি। তাহলেই এই মহিমান্বিত মাস আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই সফলতার বার্তা বয়ে আনবে।
পবিত্র মাহে রমজানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইফতার। সারাদিন সংযম, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির পর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর নির্দেশে রোজা ভাঙাই হলো ইফতার। এটি কেবল খাবার গ্রহণের বিষয় নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং প্রিয়নবী (সা.)-এর সুন্নত। ইফতারের ফজিলত, সময় এবং আদব সম্পর্কে বহু হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। নিচে ইফতার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হাদিস তুলে ধরা হলো— ১. রোজাদারকে ইফতার করানোর ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ (তিরমিজি ৮০৭, বায়হাকি) ২. সামান্য খাবারেও পূর্ণ সওয়াব সামান্য খাবার দিয়েও ইফতার করালে সওয়াব পাওয়া যায়। দীর্ঘ এক হাদিসে এসেছে— عَنْ سَلْمَانَ الْفَارِسِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي آخِرِ يَوْمٍ مِنْ شَعْبَانَ، فَقَالَ «يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ مُبَارَكٌ، شَهْرٌ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، جَعَلَ اللَّهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ، وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ، وَشَهْرٌ يُزَادُ فِيهِ رِزْقُ الْمُؤْمِنِ، مَنْ فَطَّرَ فِيهِ صَائِمًا كَانَ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ، وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ، وَكَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْءٌ» قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَيْسَ كُلُّنَا يَجِدُ مَا يُفَطِّرُ الصَّائِمَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «يُعْطِي اللَّهُ هَذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا عَلَى تَمْرَةٍ، أَوْ شَرْبَةِ مَاءٍ، أَوْ مَذْقَةِ لَبَنٍ» সাহাবি সালমান ফারসি (রা.) বলেন, শাবান মাসের শেষ দিনে রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বললেন— ‘হে মানুষ! তোমাদের কাছে একটি মহান ও বরকতময় মাস উপস্থিত হয়েছে। এই মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন এবং রাতের নামাজ নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নেক কাজ করে, সে অন্য সময় একটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব পায়। আর যে ব্যক্তি একটি ফরজ আদায় করে, সে অন্য সময় সত্তরটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব পায়। এ মাস ধৈর্যের মাস এবং ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত। এটি সহমর্মিতার মাস এবং এ মাসে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়। যে ব্যক্তি এই মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তার গুনাহ মাফ করা হয়, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পায়, অথচ রোজাদারের সওয়াব কমানো হয় না। আমরা বললাম— হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের সবার পক্ষে তো ইফতার করানো সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন— ‘আল্লাহ এই সওয়াব সেই ব্যক্তিকেও দান করেন, যে একটি খেজুর, এক চুমুক পানি অথবা সামান্য দুধ দিয়েও রোজাদারকে ইফতার করায়।’ (ইবনে মাজাহ ১৬৪২, ইবনে খুযাইমা ১৮৮৭, বায়হাকি) ৩. দ্রুত ইফতার করার ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ ‘মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।’ (বুখারি ১৯৫৭, মুসলিম ১০৯৮) ৪. সময়মতো ইফতার আল্লাহর কাছে প্রিয় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّ أَحَبَّ عِبَادِي إِلَيَّ أَعْجَلُهُمْ فِطْرًا ‘আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই বান্দা, যে দ্রুত ইফতার করে।’ (তিরমিজি ৭০০) ৫. সূর্যাস্ত হলেই ইফতার রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْلُ مِنْ هَا هُنَا وَأَدْبَرَ النَّهَارُ مِنْ هَا هُنَا وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ ‘যখন পূর্ব দিক থেকে রাত আসে, পশ্চিম দিক থেকে দিন চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন রোজাদার ইফতার করবে।’ (বুখারি ১৯৫৪, মুসলিম ১১০০) ৬. খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِذَا أَفْطَرَ أَحَدُكُمْ فَلْيُفْطِرْ عَلَى تَمْرٍ فَإِنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَى مَاءٍ فَإِنَّهُ طَهُورٌ ‘তোমাদের কেউ ইফতার করলে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। তা না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে, কারণ পানি পবিত্র।’ (তিরমিজি ৬৯৪, আবু দাউদ ২৩৫৫) ৭. ইফতারের সময় রোজাদারের আনন্দ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে— একটি ইফতারের সময় এবং অন্যটি তার প্রভুর সাক্ষাতের সময়।’ (বুখারি ১৯০৪) ৮. ইফতারের সময় দোয়া কবুল রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ دَعْوَةً لَا تُرَدُّ ‘রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় এমন একটি দোয়া রয়েছে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।’ (ইবনে মাজাহ ১৭৫৩, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব) ৯. রোজাদারের দোয়া কবুল হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ لَا تُرَدُّ: دَعْوَةُ الصَّائِمِ وَدَعْوَةُ الْإِمَامِ الْعَادِلِ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না— রোজাদারের দোয়া, ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া।’ (ইবনে মাজাহ ১৭৫২) ১০. রোজাদারকে পানি পান করানোর ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে পানি পান করায়, আল্লাহ তাকে জান্নাতে এমন পানীয় পান করাবেন যার পর সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।’ (কানযুল উম্মাল ২৩৬৬০) ইফতারের দোয়া ইফতারের আগে বা পরে এ দোয়া পড়া মুস্তাহাব— اللَّهُمَّ إِنِّي لَكَ صُمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্য রোজা রেখেছি, আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনার ওপর ভরসা করেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়েই ইফতার করছি।’ রমজানে ইফতার শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক সুন্দর নিদর্শন। সময়মতো ইফতার করা এবং অন্যকে ইফতার করানো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আমাদের উচিত সুন্নত অনুযায়ী ইফতার করা, বেশি বেশি দোয়া করা এবং অসহায় ও রোজাদারদের ইফতার করিয়ে রমজানের বরকত লাভ করা।
রমজান মাস আত্মসংযম, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস। রোজা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং দৃষ্টি, চিন্তা ও আচরণ সংযত রাখাও রোজার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—রোজা রেখে হস্তমৈথুন, স্বপ্নদোষ বা অশ্লীল চিন্তা ও দৃশ্য দেখার কারণে বীর্যপাত হলে রোজার ওপর কী প্রভাব পড়ে? ইসলামি শরিয়তের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিধান নিচে তুলে ধরা হলো। রোজা অবস্থায় হস্তমৈথুন করলে কী হবে? রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুন করে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে যায়। এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো— রমজানের পর ওই রোজার কাজা আদায় করতে হবে তবে কাফফারা দিতে হবে না কারণ এটি ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত কাজ, যা রোজার সংযমের পরিপন্থী। স্বপ্নদোষ হলে রোজার বিধান রোজা অবস্থায় ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নে যৌন কর্মকাণ্ড দেখার ফলে বীর্যপাত হলে, অথবা কোনো স্বপ্ন মনে না থাকলেও ঘুমের মধ্যে বীর্যপাত ঘটলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ: এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অতএব, স্বপ্নদোষের কারণে রোজা ভাঙবে না। শুধু ফরজ গোসল আদায় করে স্বাভাবিকভাবে রোজা পালন করতে হবে। অশ্লীল চিন্তা বা দৃশ্য দেখলে বীর্যপাতের বিধান রোজা অবস্থায় যদি কেউ— ✔ হস্তমৈথুনসহ বীর্যপাত ঘটায় তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা আদায় করতে হবে। ✔ শুধু অশ্লীল চিন্তা বা দৃশ্য দেখার কারণে বীর্যপাত ঘটে তাহলে রোজা ভাঙবে না। তবে মনে রাখতে হবে, অশ্লীল দৃশ্য দেখা বা কামভাব লালন করা ইসলামি শরিয়তে গুনাহের কাজ। রোজা অবস্থায় এ ধরনের কাজ আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এসব থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। সাহাবি-তাবেঈ যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি মতামত তাবেঈ আলেম জাবের ইবনে জায়েদ (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল— কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর দিকে কামভাব নিয়ে তাকানোর ফলে যদি বীর্যপাত ঘটে, তাহলে তার রোজা কি ভেঙে যাবে? তিনি বলেন: يُتِمُّ صَوْمَهُ “সে তার রোজা পূর্ণ করবে।” অর্থাৎ, শুধু তাকানোর কারণে বীর্যপাত হলে রোজা ভাঙবে না। (সূত্র: মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদিস: ৬২৫৯) কুরআনের নির্দেশনা: রোজার মূল লক্ষ্য রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন ও আত্মসংযম। মহান আল্লাহ বলেন— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” — (আল-কুরআন, সুরা আল-বাকারা: ১৮৩) রোজার পূর্ণ সওয়াব পেতে যা করণীয় রোজা শুধু শারীরিক ইবাদত নয়; এটি নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধিরও প্রশিক্ষণ। তাই— দৃষ্টি সংযত রাখা অশ্লীল চিন্তা থেকে বিরত থাকা গুনাহ থেকে দূরে থাকা অন্তরকে পবিত্র রাখা প্রত্যেক রোজাদারের জন্য অপরিহার্য। রমজান মাস আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ। তাই রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় সংযম বজায় রাখাই একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব।
রমজান কেবল একটি মাস নয়, এটি মানুষের অন্তর্জগতের বিপ্লবের নাম। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক ঋতু, যখন আত্মা তার উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়। ব্যস্ততা ও ভোগের ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাওয়া মানুষ এই মাসে আবার নিজের প্রকৃত পরিচয় আবিষ্কার করে। পৃথিবীর অনবরত প্রতিযোগিতা, প্রাপ্তির মোহ ও অর্জনের অন্ধ দৌড়ে মানুষ যখন ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত, তখন রমজান তার কাঁধে হাত রেখে স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ কেবল দেহ নয়, সে আত্মাও; কেবল ভোগের জন্য নয়, ইবাদতের জন্য সৃষ্ট। 📖 রোজার উদ্দেশ্য: তাকওয়া অর্জন মহান আল্লাহ বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” — (সূরা আল-বাকারা) এই আয়াতেই রমজানের মূল দর্শন নিহিত। তাকওয়া মানে কেবল ভয় নয়; এটি আল্লাহ-সচেতনতা, নৈতিক সতর্কতা ও অন্তরের জাগ্রত অবস্থান। রোজা মানুষকে শেখায় নির্জনতায়ও স্রষ্টার উপস্থিতি অনুভব করতে। যখন কেউ তৃষ্ণার্ত হয়েও পানির গ্লাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তখন তার অন্তরে জন্ম নেয় সেই অদৃশ্য শক্তি—তাকওয়া—যা তাকে পাপ থেকে রক্ষা করে এবং ন্যায়ের পথে অবিচল রাখে। 🕊️ রোজা: অনাহার নয়, চরিত্র গঠনের সাধনা সহিহ আল-বুখারি-তে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও অসৎকর্ম পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” এ হাদিস স্পষ্ট করে দেয়—রোজা কেবল অনাহারের নাম নয়; এটি চরিত্রের পরিশুদ্ধি, ভাষার সংযম ও আচরণের উৎকর্ষের সাধনা। রমজান আমাদের চোখকে হারাম থেকে ফিরিয়ে নিতে, জিহ্বাকে কটুবাক্য ও পরনিন্দা থেকে বিরত রাখতে এবং অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত করতে শিক্ষা দেয়। 📘 রমজান ও কুরআনের সম্পর্ক আল্লাহ বলেন: “রমজান সেই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন—মানুষের জন্য হেদায়াত, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।” — (সূরা আল-বাকারা) অতএব, রমজান মানেই কুরআনের দিকে প্রত্যাবর্তন। কুরআন কেবল তিলাওয়াতের জন্য নয়; এটি মানবজীবনের নৈতিক সংবিধান। রমজানে কুরআনের সাথে সম্পর্ক নবায়ন মানে শুধু খতম নয়, বরং তার বাণী হৃদয়ে ধারণ ও জীবনে প্রয়োগ করা। 🌙 আধ্যাত্মিক সুযোগের দ্বার উন্মোচন সহিহ মুসলিম-এ বর্ণিত আছে: “যখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।” এ ঘোষণা মানুষের জন্য এক বিশাল আধ্যাত্মিক সুযোগ। এ মাসে তাওবার পথ সহজ হয়, হৃদয় কোমল হয় এবং নতুন করে শুরু করার সাহস জন্মায়। 🌌 লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়েও উত্তম আল্লাহ বলেন: “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” — (সূরা আল-কদর) সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম-এ বর্ণিত হয়েছে: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” এক রাত, যার ইবাদত তিরাশি বছরেরও অধিক সময়ের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ—এ এক অসীম করুণার দান। 🤝 সামাজিক সংহতি ও মানবিকতা রমজান কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়; এটি সামাজিক ন্যায় ও মানবিক সংহতিরও মাস। সারাদিনের অনাহার মানুষকে দরিদ্রের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। যাকাত ও সদকার মাধ্যমে সম্পদের পবিত্রতা অর্জন এবং সমাজের অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো রমজানের চেতনার অংশ। জামে আত-তিরমিজি-তে এসেছে: “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।” ইফতারের সময় একটি খেজুর ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি হয়, তা মানবসমাজকে আরও সংহত করে। রমজান আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক পুনর্গঠনের মাস। এটি অভ্যাস পরিবর্তনের সময়—অসৎ প্রবৃত্তি থেকে সরে এসে সৎপথে অবিচল থাকার দৃঢ় অঙ্গীকারের সময়। রমজান যেন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি অধ্যায় না হয়; বরং আমাদের জীবনের দিশারী হয়ে ওঠে। আমরা যেন এ মাস শেষে আরও বিনয়ী, সংযত, নৈতিক ও মানবিক হয়ে উঠি—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পবিত্র রমজানের প্রকৃত চেতনা অনুধাবন করার, কুরআন-হাদিসের আলোকে জীবন গড়ার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
রমজান মাস আত্মসংযম, তাকওয়া ও ইবাদতের মাস। এই মাসে মুসলমানরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থেকে রোজা পালন করেন। রোজা আল্লাহর ফরজ বিধান, তবে ইসলামে মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব আরোপ করা হয়নি। তাই দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু কাজ বা পরিস্থিতি আছে, যেগুলো সংঘটিত হলেও রোজা ভাঙে না। এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকায় অনেকেই অযথা দুশ্চিন্তায় ভোগেন বা বিভ্রান্ত হন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ‘আল্লাহ কারো ওপর এমন কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যাতীত।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৮৬) নিম্নে যেসব কারণে রোজা ভাঙে না সেগুলো উল্লেখ করা হলো— > ভুলে পানাহার বা স্ত্রীসম্ভোগ করলে রোজা ভাঙে না। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৫) তবে ওই ভুলকারী ব্যক্তির রোজা রাখার শক্তি থাকলে তাকে রোজার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত। আর যদি রোজা রাখার শক্তি না থাকে তাহলে স্মরণ না করানোই উত্তম। (আল-ওয়াল ওয়ালিযিয়্যাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০২) > অনিচ্ছাবশত গলার মধ্যে ধোঁয়া, ধুলাবালি, মশা বা মাছি চলে গেলে রোজা ভাঙে না। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৬) > স্বপ্নদোষ হলেও রোজা ভাঙে না। হাদিসে এসেছে— ثَلَاثٌ لَا يُفَطِّرْنَ الصَّائِمَ: الْحِجَامَةُ وَالْقَيْءُ وَالِاحْتِلَامُ ‘তিনটি কারণে রোজাদারের রোজা ভঙ্গ হয় না—শিঙা লাগানো, অনিচ্ছাকৃত বমি এবং স্বপ্নদোষ।’ (তিরমিজি ৭১৯) > তেল, সুরমা বা শিঙা লাগালে রোজা ভাঙে না। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৬) > কাঠি দিয়ে কান খোঁচানোর ফলে কোনো ময়লা বের হলে তারপর ময়লাযুক্ত কাঠি বারবার কানে প্রবেশ করালেও রোজা ভাঙে না। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৭) > মেসওয়াক করলে রোজা ভাঙে না—তা কাঁচা হোক কিংবা শুষ্ক। (আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৯৯) > দাঁত থেকে অল্প রক্ত বের হয়ে যদি গলার ভেতর চলে যায়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। তবে থুতুর তুলনায় রক্তের পরিমাণ বেশি হলে রোজা ভেঙে যাবে। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৮) > চানা বুটের চেয়ে ছোট বস্তু দাঁতের ফাঁকে আটকে গিয়ে গলার ভেতর চলে গেলে বা খেয়ে ফেললে রোজা ভাঙে না। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৭) > শরীর, মাথা, দাড়ি বা গোঁফে তেল লাগালে রোজা ভাঙে না। (আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৯৯) > ফুল বা মৃগনাভির ঘ্রাণ নিলে রোজা ভাঙে না। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৯) > ইচ্ছাকৃতভাবে নাকের শ্লেষ্মা মুখে নিয়ে গিলে ফেললেও রোজা ভাঙে না। (বিনায়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯৪) > মুখের থুতু গিলে ফেললে রোজা ভাঙে না। (নাওয়াজিল, পৃষ্ঠা ১৫০) > তিল পরিমাণ কোনো বস্তু বাইরে থেকে মুখে নিয়ে অস্তিত্বহীন করে দিলে এবং গলায় স্বাদ অনুভূত না হলে রোজা ভাঙে না। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৪) > কপালের ঘাম বা চোখের দু-এক ফোঁটা অশ্রু কণ্ঠনালিতে পৌঁছলে রোজা ভাঙে না। তবে পরিমাণ বেশি হয়ে গলায় স্বাদ অনুভূত হলে রোজা ভেঙে যাবে। (বিনায়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯৪) > রোজা অবস্থায় সাধারণ ইনজেকশন, ইনসুলিন বা টিকা নেওয়া বৈধ। তবে এমন ইনজেকশন বা টিকা নেওয়া মাকরুহ, যেগুলো দ্বারা রোজার কষ্ট বা দুর্বলতা দূর হয়। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৯) > ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্ত বের করলে রোজা নষ্ট হবে না। দুর্বলতার আশঙ্কা না থাকলে তা মাকরুহও নয়। > সাপ বা বিচ্ছু দংশন করলে রোজা ভাঙে না। (আল-ফিকহুল হানাফি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪১৪; মাহমুদিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৯) > পান খাওয়ার পর ভালোভাবে কুলি করার পরও যদি থুতুতে লাল আভা থেকে যায়, তাহলে রোজা মাকরুহ হবে না। (এমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩১) > ভেজা কাপড় শরীরে দেওয়া, ঠাণ্ডার জন্য কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া বা গোসল করা মাকরুহ নয়। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৪; দারুল উলুম, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪০৫) > স্বপ্নে বা সহবাসে গোসল ফরজ হলে সুবহে সাদিকের আগে গোসল না করে রোজার নিয়ত করলে রোজা সহিহ হবে। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮০) > গরমের কারণে দীর্ঘ সময় পানিতে অবস্থান করা মাকরুহ নয়। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৯) > গলা খাঁকারি দিয়ে কাশি মুখে এনে আবার গিলে ফেললে রোজা মাকরুহ হয় না (তবে না করাই উত্তম)। (শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৭৩) > রোজা অবস্থায় মাথা বা চোখে ওষুধ ব্যবহার করা মাকরুহ নয়। (এমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৭) > হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ঘ্রাণ নেওয়া মাকরুহ নয়। (মাহমুদিয়া, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ১৮০) > রোজা অবস্থায় পাইপ দ্বারা মুখে হাওয়া নিলে রোজা মাকরুহ হয় না। (মাহমুদিয়া, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ১৮০) > রোজা অবস্থায় নাকে ওষুধ ব্যবহার করে তা ব্রেনে না পৌঁছলে রোজা মাকরুহ হয় না। (মাহমুদিয়া, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ১৬৯) > শরীরের ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বা রক্ত বের হলে বা রক্ত বের করলে রোজা নষ্ট হয় না। তবে অপ্রয়োজনে রক্ত বের করা মাকরুহ। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮) > চিকিৎসার প্রয়োজনে ডাক্তার শুকনো কোনো যন্ত্র পেটে প্রবেশ করিয়ে বের করলে রোজা নষ্ট হবে না। (আল-ফিকহুল হানাফি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭১২) > পানিতে ডুব দিলে কানের ভেতর পানি গেলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে পানি দিলেও রোজা মাকরুহ নয়। (বিনায়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯৪; আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৪; শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৭) > জৈবিক উত্তেজনার কারণে শুধু দৃষ্টিপাতের ফলে বীর্যপাত হলেও রোজা নষ্ট হবে না। (আহকামে জিন্দেগি, পৃষ্ঠা ২৪৯) রোজা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অজ্ঞতার কারণে মানুষ এমন বিষয়কে রোজা ভঙ্গের কারণ মনে করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, যা প্রকৃতপক্ষে রোজা নষ্ট করে না। তাই কুরআন-হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ফিকহগ্রন্থের আলোকে রোজার বিধান জানা থাকলে ইবাদত আরও সঠিক ও নিশ্চিন্তভাবে আদায় করা সম্ভব হবে।
শোবিজ অঙ্গনের তারকাদের গ্ল্যামার আর স্লিম ফিগার দেখে মুগ্ধ হন অসংখ্য ভক্ত। আলোঝলমলে এই দুনিয়ায় নিজেকে ফিট ও আকর্ষণীয় রাখতে তারকাদের খাবারদাবারেও থাকে বিশেষ সতর্কতা। তবে পছন্দের খাবার সামনে পেলে লোভ সামলানো সবার পক্ষেই কঠিন—গ্ল্যামার কন্যারাও এর ব্যতিক্রম নন। ঢাকাই সিনেমার আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমণি আগেই জানিয়েছেন, দুধ দিয়ে তৈরি যেকোনো খাবার তার ভীষণ প্রিয়। বিশেষ করে দুধের পায়েস তার অন্যতম পছন্দের। তিনি স্মরণ করেন, তার নানী ও বড় খালার হাতের রান্না ছিল অত্যন্ত প্রিয়—যদিও তারা এখন আর বেঁচে নেই। রমজানে সাদামাটা সেহরি চলছে পবিত্র রমজান মাস। সম্প্রতি এক শোরুম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরীমণি জানান, সেহরিতে খুব ভারী কিছু খান না তিনি। তার ভাষায়, “দুধ-কলা আর ভাত বেশি পছন্দ করি, ওটাতেই চলে যায়।” সহজপাচ্য ও হালকা খাবারেই সেহরি সেরে ফেলেন এই চিত্রনায়িকা। ইফতারে ভাজাপোড়া নয় ইফতারের সময়ও খুব বেশি ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার খান না পরীমণি। তিনি জানান, নিজের জন্যের চেয়ে সবার জন্য আয়োজন করতেই তার বেশি ভালো লাগে। “আমি শরবত, খেজুর দিয়ে ইফতারি করে ফেলি,”—বলেছেন তিনি। রমজানের একটি মজার অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেন এই নায়িকা। একবার শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকার সময় ভুলে পানি খেয়ে ফেলেছিলেন তিনি। মুক্তির অপেক্ষায় একাধিক সিনেমা অভিনয়ের দিক থেকেও ব্যস্ত সময় পার করছেন পরীমণি। তার অভিনীত বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সম্প্রতি ‘গোলাপ’ নামের নতুন একটি সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। এতে তার সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করবেন নিরব। জানা গেছে, খুব শিগগিরই সিনেমাটির শুটিং শুরু হবে। গ্ল্যামারের ঝলকানির আড়ালে সাদামাটা জীবনযাপন আর সাধারণ খাবারেই ভরসা রাখেন পরীমণি—এমন খোলামেলা স্বীকারোক্তি ভক্তদের মাঝে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। রমজানের এই সময়ে তার খাদ্যাভ্যাস ও নতুন সিনেমার খবর শোবিজ অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুল্ক ছাড়ের পর মানুষের আশা ছিল খেজুরের দাম এবার নাগালের মধ্যে থাকবে। কিন্তু শুল্ক ছাড়ের পর খেজুর কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। এমনকি গত বছরের থেকেও এবার খেজুরের দাম বাড়তির দিকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতি থাকায় জাহাজ বার্থিং পেতে বিলম্ব হয়েছে, যা সাপ্লাই চেইনকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম আসার পথে থাইল্যান্ড উপকূলে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ইরাকি খেজুরসহ একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কয়েক দিন আগে ইরাকি খেজুর ১৫০ টাকা কেজি দরে পাইকারি বিক্রি হতো, বর্তমানে সেই খেজুর ১৮০-১৮৫ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। ১০ কেজির কার্টন পাইকারি ২ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা হয়েছে। দেশের মানুষের সুবিধার জন্য সরকার খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করেছে, যা ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে শুল্ক কমানোর কারণে দাম কমার কথা থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে তার প্রতিফলন বাজারে নেই। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খেজুর আমদানিকারক ও বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, থাইল্যান্ড উপকূলে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ইরাকি খেজুরবাহী একটি জাহাজ ডুবে গেছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরে চার দিনের কর্মবিরতির ফলে সৃষ্ট জাহাজ জটে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ইরাকি খেজুরের সরবরাহ কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে। তিনি বলেন, বিক্রেতাদের অধিক মুনাফা করার প্রবণতাই দাম বাড়ার পেছনে বড় কারণ। তবে আমদানিকৃত খেজুরের পরিমাণ চাহিদার চেয়ে বেশি হলে রমজান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বাজার দ্রুতই স্থিতিশীল হয়ে আসবে। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারে খেজুরের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সৌদি আরব, তিউনিসিয়া বা আরব আমিরাতের মতো বড় উৎসগুলো থেকে আসা খেজুরের দাম বাড়েনি। বাজারে বর্তমানে বস্তা খেজুর (বাংলা খেজুর) কেজি ২২০ থেকে ২৪০ টাকা। জাহিদি খেজুর ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, দাবাস ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, বরই ৪৮০ থেকে ৬৫০ টাকা, কালমি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।