ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : অধিকৃত পশ্চিম তীরে শুক্রবার (৩১ জুলাই) একযোগে অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। একই দিনে নাবলুস, হেবরন, বেথলেহেম, রামাল্লাহ ও তুলকারমসহ একাধিক এলাকায় অভিযান এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো জানিয়েছে। ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ফিলিস্তিনের ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশন দাবি করেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা (সেটলার) ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার ৭৪টি হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলার মধ্যে সামরিক অভিযান, গ্রেফতার, জমি দখল, বসতি সম্প্রসারণ, নতুন চেকপয়েন্ট স্থাপন এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নাবলুসে নতুন উত্তেজনা স্থানীয় সূত্র জানায়, নাবলুসের দক্ষিণ-পশ্চিমে তেল গ্রামের আইন আল-মাজরাব এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের নিরাপত্তায় বিপুলসংখ্যক বসতি স্থাপনকারী প্রবেশ করেন। এর আগে বিভিন্ন বসতি স্থাপনকারী সংগঠন তেল গ্রামে গণমিছিলের ডাক দেয়। এর একদিন আগে ইসরায়েলি বাহিনী গ্রামের চারটি ফিলিস্তিনি বাড়ি অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। শুক্রবার সেনাবাহিনীর সহায়তায় বসতি স্থাপনকারীরা পাশের আল-জুনেইদ ও সুররা গ্রামে মিছিল করলে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট জানায়, সংঘর্ষে একজন যুবক গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া চার শিশুসহ আরও ১০ জন টিয়ার গ্যাসে আক্রান্ত হন। আগের হামলার রেশ গত সপ্তাহেও তেল গ্রাম বড় ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়। ফিলিস্তিনি সূত্রের দাবি, ইসরায়েলি বাহিনী ও সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় চার ফিলিস্তিনি নিহত হন। এ সময় বহু মানুষ আহত হন এবং বাড়িঘর, যানবাহন ও কৃষিজমিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের কার্যক্রম এবং সামরিক অভিযানের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। কোথায় কতজন আটক স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী— হেবরনের ইয়াত্তা এলাকা থেকে দুইজনকে আটক করা হয়। বেথলেহেম থেকে আটক করা হয় দুইজনকে। রামাল্লাহর উত্তরের আতারা সামরিক চেকপয়েন্ট থেকে একজনকে আটক করা হয়। তুলকারমের পূর্বাঞ্চলের আনাবতা এলাকা থেকে আরও একজনকে আটক করা হয়। এছাড়া রামাল্লাহ ও আল-বিরেহ এলাকায় অভিযান চলাকালে ফিলিস্তিন মেডিকেল কমপ্লেক্সের আশপাশে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছয় মাসে ১১ হাজারের বেশি হামলার দাবি ফিলিস্তিনের ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ১১ হাজার ৭৪টি হামলা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে— সামরিক অভিযান ব্যাপক গ্রেফতার জমি দখল নতুন বসতি সম্প্রসারণ অতিরিক্ত সামরিক চেকপয়েন্ট স্থাপন বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এই পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক উদ্বেগ চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ভূমি দখলের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। এর আগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারত্বকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলে মত দিয়েছিল। তবে ইসরায়েল আদালতের ওই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বন্দির সংখ্যা বাড়ছে ফিলিস্তিনি প্রিজনার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রায় ২৪ হাজার ৬০০ ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের মধ্যে রয়েছে— ১ হাজার ৯০০ শিশু ৭৮৫ নারী সংস্থাটির দাবি, বর্তমানে ইসরায়েলের কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে— ৯৪ জন নারী ৩৫০ জনের বেশি শিশু ৩ হাজার ২৪৪ জন প্রশাসনিক আটক, যাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে ১ হাজার ৩২০ জনকে 'অবৈধ যোদ্ধা' হিসেবে আটক রাখা হয়েছে বাড়ছে মানবাধিকার উদ্বেগ ফিলিস্তিনি বন্দি অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পশ্চিম তীরে চলমান গ্রেফতার অভিযান, সামরিক তৎপরতা এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা মিলিয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তির নীতি আরও জোরদার হচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েল বরাবরই বলে আসছে, পশ্চিম তীরে তাদের সামরিক অভিযান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সশস্ত্র হামলা প্রতিরোধের অংশ। পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও এই অঞ্চলকে নতুন অস্থিরতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, চলমান অভিযান, বসতি সম্প্রসারণ এবং গ্রেফতারের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে জুমার নামাজ ও খুতবা শেষ হওয়ার পর জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ মোহাম্মদ হুসেইনকে ইসরায়েলি বাহিনী আটক করেছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াফা । সংবাদ সংস্থাটির প্রতিবেদনে স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, শুক্রবার জুমার খুতবা প্রদান এবং নামাজের ইমামতি শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে ইসরায়েলি সেনাসদস্যরা তাকে হেফাজতে নেয়। আটকের কারণ এখনো স্পষ্ট নয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ মোহাম্মদ হুসেইনকে কী কারণে আটক করা হয়েছে বা তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি। এ কারণে আটকের কারণ এবং তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ক্ষোভ ও উত্তেজনার খবর ওয়াফা -এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ঘটনার পর আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঘটনাটির বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে আটকের কারণ, আইনি ভিত্তি এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : হামাসের লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান মুহাম্মদ দারবিশের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ইরানের রাজধানী তেহরান সফর করেছে। সফরের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া। সফরকালে হামাস প্রতিনিধিদল ইরানকে যুদ্ধক্ষেত্র ও আলোচনার টেবিলে ‘বড় ধরনের জয়’ অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানায়। সংগঠনটি এই অর্জনকে গোটা ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ বা প্রতিরোধ অক্ষ এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর বিজয় বলে উল্লেখ করেছে। খামেনির প্রতি শোক ও অবস্থানের প্রশংসা হামাসের প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের শাহাদাতের ঘটনায় ইরানের নেতা, সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানায়। একই সঙ্গে মুহাম্মদ দারবিশ বলেন, ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সমর্থন এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বৈধ প্রতিরোধের পক্ষে খামেনির নীতিগত ও সাহসী অবস্থান হামাসের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি তুলে ধরে হামাস সফরের সময় হামাস প্রতিনিধিদল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে তারা গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘চরম অমানবিক পরিস্থিতি’ এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলের চলমান অভিযানের বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরে। হামাসের দাবি, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার মুখে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা ‘বিপর্যয়কর’। প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইসরাইলের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানায়। ইরানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে ধন্যবাদ জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আল-কুদস (জেরুজালেম)কে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতি ইরানের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। এ অবস্থানকে তেহরানের নীতিগত অবস্থান হিসেবেও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। প্রেক্ষাপট হামাস ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তেহরান নিজেকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম সমর্থক হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র এবং কয়েকটি পশ্চিমা দেশ হামাসকে সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে এবং ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে। এই প্রেক্ষাপটে তেহরানে হামাস প্রতিনিধিদলের সফর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আরেকটি প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতগুলোতে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘বিস্ফোরক অস্ত্র পর্যবেক্ষণ’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে বিস্ফোরক অস্ত্রের হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের মৃত্যুর জন্য ইসরাইল দায়ী। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে এমন বিস্ফোরক হামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। এসব ঘটনার প্রায় ৯০ শতাংশই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নথিভুক্ত হয়েছে। বেসামরিক জনগণই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা। বেসামরিক হতাহতের হার গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপক সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার একটি বিপজ্জনক প্রবণতায় পরিণত হচ্ছে। তার ভাষায়, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি চলতে থাকলে এটি বৈশ্বিক সংঘাতের একটি ‘স্বাভাবিক বাস্তবতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক আইন কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। যুদ্ধের অভিঘাত পৌঁছেছে ইউরোপের অর্থনীতিতেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশটির অর্থনীতি ০.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এর আগে মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ০.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস বলেন, সংঘাত শুরুর আগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল এবং মূল্যস্ফীতি কমছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব যুক্তরাজ্যের ওপরও পড়বে বলে তিনি স্বীকার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ভোক্তা উভয়ই চাপে পড়েছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে। স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এদিকে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলমান সংঘাতের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের অন্তত ৫০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সদরদফতর, বিমানঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র এবং নৌবাহিনীর বিভিন্ন অবকাঠামো। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একাধিক সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলায় ইরানের যুদ্ধবিমান, নৌযান এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধবিরতি, কিন্তু উত্তেজনা বহাল সাম্প্রতিক সময়ে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইসরাইল ও ইরানও একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায়। যদিও এক মাসের বেশি সময় ধরে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও আঞ্চলিক উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে ইরানকে পরাজিত করেছে। তবে বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ বলছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির টানেল প্রবেশপথ পুনর্নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্যাটেলাইট তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা। বিশ্লেষকদের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর অঞ্চলটির স্যাটেলাইট চিত্রের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্চ মাসে পেন্টাগন স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেটকে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলাকার নতুন ছবি প্রকাশ সীমিত করার অনুরোধ জানায়। প্ল্যানেটের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল যাতে স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে কোনো প্রতিপক্ষ শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বা ন্যাটো অংশীদারদের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে না পারে। সামনে কী অপেক্ষা করছে? সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট এখনো শেষ হয়নি। বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি, ইরানের সামরিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এই সংঘাতের প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : উত্তর গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। হামলায় আরও অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। বুধবার গভীর রাতে গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে এই হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সূত্র বলছে, হামলার সময় আশপাশের একটি পার্কে কয়েকজন শিশু খেলছিল। বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ইসরাইল প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পরিবারগুলো সন্তানদের নিয়ে ঘর কিংবা অস্থায়ী তাঁবু ছেড়ে বাইরে বের হতেও আতঙ্ক বোধ করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera জানিয়েছে, উত্তর গাজাজুড়ে এখনো অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। হামাস নেতার জানাজার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হামলা এই বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই গাজায় হামাসের সশস্ত্র শাখার প্রধান মোহাম্মদ ওদেহের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার ইসরাইলি হামলায় তিনি নিহত হন। জানাজায় শত শত ফিলিস্তিনি অংশ নেন। ইসরাইল জানিয়েছে, হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করেই তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গাজা সিটিতে চালানো হামলায় মোহাম্মদ ওদেহের স্ত্রী ও ছেলেও নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu দাবি করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার সময় ওদেহ হামাসের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। গত সপ্তাহে ইসরাইলি হামলায় নিহত ইজ আল-দিন আল-হাদ্দাদের পর তাকে হামাসের সশস্ত্র শাখার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ‘যুদ্ধ থামেনি, শুধু নাম বদলেছে’ ওদেহের স্বজন আবু আল-আব্দ ওদেহ সংবাদ সংস্থা Reuters-কে বলেন, গাজার বাস্তবতা এখনো ভয়াবহ। তার ভাষায়, “যুদ্ধ থেমে গেছে— এমন কথা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য যুদ্ধের কোনো বিরতি নেই। জীবনযাত্রার অবস্থারও কোনো উন্নতি হয়নি।” স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরাইল ৩ হাজারের বেশি বার লঙ্ঘন করেছে। ত্রাণ প্রবেশ নিয়েও বাড়ছে অভিযোগ গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় যে পরিমাণ ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা ছিল, বাস্তবে তার অল্প অংশ প্রবেশ করতে পেরেছে। বুধবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, গত ২২৭ দিনে যুদ্ধবিরতির ৩,০০৫টি গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে গাজায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে প্রবেশ করেছে মাত্র ৪৯ হাজার ৯৭৩টি। অর্থাৎ চুক্তি বাস্তবায়নের হার ৩৬ শতাংশেরও কম। নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের শঙ্কা ইসরাইল ও হামাস— উভয়পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ইসরাইল বলছে, হামাস অস্ত্র সমর্পণে রাজি না হওয়ায় সমঝোতা এগোচ্ছে না। অন্যদিকে হামাসের দাবি, ইসরাইল নিয়মিত হামলা চালানো এবং মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করায় আলোচনা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে বহাল থাকলেও গাজার বাস্তবতা এখনো যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই রয়ে গেছে। নিহতের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় সংকটও ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র সৌদি আরব স্পষ্ট করে দিয়েছে—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না রিয়াদ। ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি আরব তাদের পুরোনো অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি। বরং চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতা, ইরান ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার বাস্তবতায় রিয়াদ এখন আরও সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্পের আহ্বান, সৌদির ‘না’ সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে একটি বৃহৎ সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মুসলিম দেশ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে পারে। তবে সেই বক্তব্যের পরপরই সৌদি আরবের অবস্থান নতুন করে আলোচনায় আসে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অন্যতম কূটনৈতিক লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে আনা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে এক বৈঠকে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। জবাবে সৌদি যুবরাজ স্পষ্ট ভাষায় জানান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া রিয়াদ কোনো চুক্তিতে যাবে না। সৌদি যুবরাজ ওই আলোচনাকে “গঠনমূলক” বলে উল্লেখ করলেও তিনি পরিষ্কার করেন, দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের রূপরেখা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্নই আসে না। পাকিস্তানের কড়া অবস্থান সৌদি আরবের পাশাপাশি পাকিস্তানও ট্রাম্পের উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামা টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মুসলিম-প্রধান দেশগুলোকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত করার মার্কিন প্রচেষ্টা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ইসলামাবাদ কখনোই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না। পাকিস্তান স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইসরায়েল ভ্রমণও আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। ইরান যুদ্ধ বদলে দিয়েছে হিসাব আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত ও তার অর্থনৈতিক-নিরাপত্তাগত প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতায় ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের ধাক্কায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত নয়। বরং সংকটকালে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার ইসরায়েলকেই রক্ষা করা। লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগ করলেও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় ওয়াশিংটনের আচরণ তাদের হতবাক করেছে। তার ভাষায়, “আমরা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের শেষ সময় দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।” নতুন শান্তি উদ্যোগে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও নতুন সমঝোতার রূপরেখা তৈরিতে পাকিস্তান ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। গত সপ্তাহে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান ও বাহরাইনের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রথমবারের মতো সমন্বিতভাবে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটি আঞ্চলিক শান্তি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। টাইমস অব ইসরায়েল–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়, “ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে ইরান যুদ্ধ শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাইডলাইনে বসে যুদ্ধের সমাপ্তি দেখছে।” আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এখন চাপের মুখে ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এই উদ্যোগই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ নামে পরিচিত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। সূত্র বলছে, সম্প্রতি ট্রাম্প যখন আরও দেশকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, তখন অংশগ্রহণকারী নেতাদের অনেকেই নীরব থাকেন। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা সংকট, ইরান যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার কারণে এখন আরব বিশ্বে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো কূটনৈতিক সমীকরণ দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘মুসলিম ন্যাটো’ বনাম নতুন জোট রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের আলোচনা ইতোমধ্যে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরির আলোচনা চলছে, যেখানে তুরস্ক, কাতার ও মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ একে “মুসলিম ন্যাটো” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে গড়ে উঠছে আরেকটি কৌশলগত জোট, যা ‘I2U2’ নামে পরিচিত। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো এইচ এ হেলিয়ার মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে—তেহরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তার মতে, “উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এমন এক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের পাশে নাও থাকতে পারে।” বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্ন নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। তবে একটি বিষয় এখনো অপরিবর্তিত—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের অবস্থান। আর এই অবস্থানই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : বছরের এই সময়টাতে গাজার খামারগুলোতে থাকার কথা ছিল ঈদুল আজহার ব্যস্ততা। কোরবানির পশুর হাঁকডাক, পশু কেনাবেচা, বাজারের ভিড়—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু এখন সেই গাজায় নেই কোরবানির পশু, নেই উৎসবের আমেজও। যুদ্ধ, অবরোধ ও খাদ্য সংকটে টানা তৃতীয় বছরের মতো কার্যত থমকে গেছে ঈদুল আজহার প্রধান ধর্মীয় অনুষঙ্গ কোরবানি। গাজার পরিচিত পশু খামারি মাজেন আল-জেরজাউই একসময় ঈদের আগে শত শত ভেড়া ও গরু বিক্রি করতেন। এখন তিনি একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেখানে পরিবেশিত খাবারের জন্যও তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে সীমিত পরিমাণে প্রবেশ করা হিমায়িত মাংসের ওপর। গাজা সিটির বাসিন্দা জেরজাউই বলেন, “এই সময়ে আমি প্রায় ২০০টি ভেড়া ও গরু বিক্রি করতাম। এখন আমার কাছে একটি পশুও নেই। গাজায় জীবন্ত পশু ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না।” তার ভাষায়, ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণ গাজার মানুষকে এমন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। যুদ্ধের আগে বছরে আসত ৬০ হাজার পশু ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের আগে প্রতি বছর গাজায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি হতো। স্থানীয় খামারগুলোও ছিল সক্রিয়। কোরবানির পশুকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বড় একটি অর্থনৈতিক চক্র। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ও অবরোধ পরিস্থিতি পুরো খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, গবাদিপশু খাতের ৯০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। শুধু খামার নয়, ধ্বংস হয়েছে গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম, পশু চিকিৎসা কেন্দ্র এবং কৃষিভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা। আকাশছোঁয়া পশুর দাম যুদ্ধের আগে গাজায় একটি ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলারের মধ্যে। বর্তমানে হাতে গোনা যে কয়েকটি পশু টিকে আছে, সেগুলোর দাম পৌঁছেছে প্রায় ৭ হাজার ডলারে। এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রবাসী ফিলিস্তিনি এখনও গাজায় থাকা স্বজনদের নামে কোরবানি দিতে চাইছেন। তবে জেরজাউই তাদের নিরুৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, “একটি ভেড়ার পেছনে ২০ হাজার শেকেল খরচ করার চেয়ে সেই অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের বিয়ের খরচ চালানো সম্ভব। এখন ৫০ কেজি হিমায়িত মাংস কিনে মানুষকে খাওয়ানোই বেশি বাস্তবসম্মত।” নিশ্চিহ্নের পথে গবাদিপশু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরের মধ্যেই গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে বা হত্যা করা হয়েছে। গাজার কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধের আগে যেখানে উপত্যকাটিতে প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩ হাজারে। গরু ও বাছুর প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া বলেন, “যে অল্পসংখ্যক পশু বেঁচে আছে, সেগুলো যাযাবর রাখালদের কাছে রয়েছে এবং ঈদের বাজারে আনার মতো পরিস্থিতি নেই।” তার মতে, পানির সংকট ও কৃষি অবকাঠামোর ধ্বংস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে এই খাত পুনরুদ্ধারের বাস্তব সম্ভাবনাও প্রায় নেই। বোমা হামলায় মারা গেছে পশু জেরজাউই জানান, যুদ্ধের মধ্যে পশু বাঁচিয়ে রাখাই হয়ে উঠেছিল অসম্ভব। তিনি বলেন, “পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা পাস্তা পর্যন্ত খাইয়েছি। কিন্তু পাশের বাড়িতে বোমা হামলার পর আমার অনেক ভেড়া মারা যায়।” শুধু বোমা হামলাই নয়, বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাও গবাদিপশু খাতকে চূড়ান্ত ধসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালানোর সময় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে কম দামে পশু বিক্রি বা জবাই করে দেয়। জেরজাউই বলেন, “প্রতিটি উচ্ছেদ আদেশের সঙ্গে সঙ্গে গাজায় গবাদিপশুর সংখ্যা কমে গেছে। শেষ পর্যন্ত মানুষ পরিবারকে বাঁচাবে, নাকি পশুর যত্ন নেবে—এই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছে সবাই।” ‘কোরবানি ছাড়া ঈদ নেই’ গাজার সাধারণ মানুষের কাছেও ঈদের অনুভূতি এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবু রিয়ালা বলেন, “মনে হচ্ছে আমরা তিন বছর ধরে ঈদই উদযাপন করছি না। কোরবানির আনন্দ, ভাগাভাগি করার অনুভূতি—সবকিছু হারিয়ে গেছে।” তিনি জানান, সংকট শুধু পশুর অভাবেই সীমাবদ্ধ নয়। বহু পরিবার এখন দৈনিক খাবার জোগাড় করতেই সংগ্রাম করছে। তার ভাষায়, “অনেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হিমায়িত মাংসও খেতে পারেনি। গাজায় কী ঢুকবে, তা পুরোপুরি সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ফলে বাজারে জিনিসপত্রের দামও অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।” খাদ্য সংকটে ১৬ লাখ মানুষ জাতিসংঘ সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে কড়াকড়ি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ হয়ে গেলে বাজার থেকে খাদ্যপণ্য প্রায় উধাও হয়ে যায়। ধসে পড়ছে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞদের মতে, গবাদিপশু খাত ধ্বংস হওয়ায় শুধু কোরবানির ঐতিহ্যই নয়, গাজার একটি বড় অর্থনৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়ছে। মুহাম্মদ আবু রিয়ালা বলেন, “গবাদিপশু প্রবেশের অনুমতি থাকলে পশু চিকিৎসক, খামারি, কৃষক, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা সবাই উপকৃত হতেন। কিন্তু পুরো সমাজকে অকার্যকর করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।” গাজার বাস্তবতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ঈদ মানে আর উৎসব নয়; বরং বেঁচে থাকার সংগ্রামের আরেকটি দিন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে, নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এর সামনে জড়ো হয়েছিলেন কয়েকজন বিক্ষোভকারী। গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শীত উপেক্ষা করে তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন গাজায় যুদ্ধ চলছিল প্রায় ১০০ দিন ধরে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির দাবিতে তীব্র চাপ, আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ সত্ত্বেও ইসরাইল সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত, ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ গাজায় নিহত হন ৭০ হাজারের বেশি মানুষ এবং আহত হন অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজার। এই সময়ের মধ্যেই ইসরাইলে অব্যাহতভাবে প্রবেশ করেছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আইসিজে গণহত্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা জারি করার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে ইসরাইলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। আইসিজের রায়ের পর বেড়েছে অস্ত্র আমদানি ইসরাইলের কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্য, শুল্ক নথি এবং তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সংগৃহীত রেকর্ড বিশ্লেষণ করে আল-জাজিরা জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরাইলে মোট ২ হাজার ৬০৩টি সামরিক সরঞ্জামের চালান পৌঁছেছে। এসব চালানের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৩.২২ বিলিয়ন ইসরাইলি শেকেল, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ৮৮৫ মিলিয়ন ডলারের সমান। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো—এই চালানের ৯১ শতাংশই এসেছে আইসিজের রায়ের পরবর্তী সময়ে। অধিকাংশ সরঞ্জাম ছিল গোলাবারুদ, বিস্ফোরক এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত সামরিক উপকরণ। তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। মোট সামরিক আমদানির ৪২ শতাংশের বেশি এসেছে দেশটি থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ভারত, যার অংশ প্রায় ২৬ শতাংশ। শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারীর তালিকায় আরও রয়েছে রোমানিয়া, তাইওয়ান ও চেক প্রজাতন্ত্র। প্রকাশ্য সমালোচনা, আড়ালে সরবরাহ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেসব দেশ প্রকাশ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে বা যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাদের অনেকেই বাস্তবে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করেনি। চীন আইসিজের রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু শুল্ক তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালেও দেশটি থেকে সামরিক চালান গেছে ইসরাইলে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরাইলের কঠোর সমালোচনা করলেও, বাণিজ্য নথিতে দেখা যায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। একইভাবে ব্রাজিলও আইসিজের পদক্ষেপকে “বাধ্যতামূলক” বলে উল্লেখ করেছিল। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশটি থেকেও কিছু সামরিক সরঞ্জাম ইসরাইলে গেছে। ‘গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব আগে থেকেই শুরু হয়’ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণহত্যার আশঙ্কা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস এবং ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্প বলেছেন, গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব কেবল চূড়ান্ত রায়ের পর শুরু হয় না; ঝুঁকির ইঙ্গিত দেখা দেওয়ার মুহূর্ত থেকেই রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কার্যকর হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, “ইসরাইল একা এত বড় পরিসরের বোমাবর্ষণ পরিচালনা করতে পারত না। এর পেছনে বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের বড় ভূমিকা রয়েছে।” বৈশ্বিক নীরবতার বাইরে সক্রিয় সহায়তা আল-জাজিরার অনুসন্ধান এমন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আদালতের সতর্কতা, মানবাধিকার উদ্বেগ এবং গণহত্যার অভিযোগের পরও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়নি। বরং বহু দেশ প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমালোচনা করলেও বাস্তবে সামরিক সহায়তা চালিয়ে গেছে। গাজা যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংঘাত নয়—এই অনুসন্ধান দেখাচ্ছে, এটি একটি বৈশ্বিক অস্ত্র নেটওয়ার্কেরও প্রতিচ্ছবি; যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও বহু রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বের মানুষের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা দেশ ইসরাইল। এর পরেই রয়েছে উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরান। বিপরীতে সবচেয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তির দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ড, কানাডা, জাপান, সুইডেন ও ইতালির নাম। গণতন্ত্র ও বৈশ্বিক জনমত নিয়ে পরিচালিত নতুন আন্তর্জাতিক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ শীর্ষক এই সমীক্ষা পরিচালনা করেছে বৈশ্বিক জরিপ সংস্থা Nira Data। জরিপে বিশ্বের ১২৯টি দেশ ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নিয়ে ৪৬ হাজার ৬৬৭ জন উত্তরদাতা মতামত দিয়েছেন। একইসঙ্গে সংস্থাটির ‘গ্লোবাল ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ জরিপে ৯৮টি দেশের ৯৪ হাজার ১৪৬ জন নাগরিক নিজ নিজ দেশে গণতন্ত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। গাজা যুদ্ধের প্রভাব জরিপ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান, ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা, খাদ্য ও মানবিক সহায়তায় অবরোধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরাইলের ভাবমূর্তি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আদালতগুলোও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধ আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা অভিযানের পর বিশ্ব জনমতের পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান হয়। এতে বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, গাজার অধিকাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত অবস্থায় পড়েছে। জাতিসংঘের একাধিক বিশেষজ্ঞ ও গণহত্যা গবেষক পরিস্থিতিকে “গণহত্যাসদৃশ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতেও বড় পতন সমীক্ষায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার নাটকীয় অবনতি। জরিপ অনুযায়ী, বৈশ্বিক জনমতের বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা পাঁচ দেশের একটি। এমনকি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সূচকে দেশটি রাশিয়া ও চীনেরও নিচে অবস্থান করছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেট ইতিবাচক ধারণার স্কোর ছিল +২২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে -১৬ শতাংশে। মাত্র দুই বছরে ৩৮ পয়েন্ট পতনকে গবেষকেরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর পররাষ্ট্রনীতি, ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা, আগ্রাসী শুল্কনীতি, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে বিতর্কিত অবস্থান, ইউক্রেনকে সহায়তা কমানো এবং ইরানকে ঘিরে মার্কিন-ইসরাইল জোটের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া বহু উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে এখন “বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি” হিসেবে দেখছেন। এ তালিকায় রাশিয়া ও ইসরাইলের পরই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান উঠে এসেছে। ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ অভিযোগ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘে ইসরাইলকে জবাবদিহি থেকে রক্ষা করা, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং মানবাধিকার প্রশ্নে নির্বাচিত অবস্থান নেওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে মার্কিন নীতিকে “দ্বৈত মানদণ্ড” হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে অনেকের চোখে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শুধু একটি বৈশ্বিক শক্তি নয়; বরং আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত রাজনীতিরও প্রতীক হয়ে উঠছে। গণতন্ত্র মূল্যায়নের নতুন ধারা ‘গ্লোবাল ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক গণতন্ত্র জরিপ হিসেবে দাবি করেছে। বিশেষজ্ঞভিত্তিক রেটিংয়ের পরিবর্তে এই জরিপে সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গণতন্ত্রের মান মূল্যায়ন করা হয়। জরিপে যেসব সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নাগরিক শিক্ষা ক্ষমতার ভারসাম্য আইনের শাসন সরকারের স্বচ্ছতা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ এবং মানবাধিকার সংকট এখন শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; বরং দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : গাজা উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপের নগরী। স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের দাবি, ইসরাইলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের নিচে এখনো অন্তত ৮ হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ চাপা পড়ে আছে। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি না থাকায় সেসব মরদেহ বের করা সম্ভব হচ্ছে না। আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল বলেন, তাদের হাতে থাকা উদ্ধার সরঞ্জাম “পুরোনো ও অকার্যকর”। ব্যাপক ধ্বংসস্তূপ সরানোর মতো সক্ষমতা বর্তমানে তাদের নেই। তার ভাষায়, “ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। প্রতিদিন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।” ধ্বংসস্তূপে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাড়ছে ইঁদুরের উপদ্রব গাজার মানবিক সংকট এখন শুধু খাদ্য ও চিকিৎসা ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নেই। সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসস্তূপ পড়ে থাকায় সেখানে ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণীর বিস্তার ঘটছে, যা নতুন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। মাহমুদ বাসসালের অভিযোগ, ভারী উদ্ধারযন্ত্র গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে ইঁদুরনাশক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে ৬ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ জমে আছে। এর মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। ৮১ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত দীর্ঘ সামরিক অভিযান, বিমান হামলা ও বিস্ফোরণে গাজার অবকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী— ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে আরও প্রায় ৭৫ হাজার ভবন আংশিক বা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত গাজার মোট অবকাঠামোর প্রায় ৮১ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুরো গাজা পরিষ্কার ও পুনর্গঠনে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় হতে পারে। নিহত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিহতদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। পশ্চিম তীরে সহিংসতা: ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পথে ইইউ এদিকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে সহিংস ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, হাঙ্গেরির নতুন সরকার এ বিষয়ে আর বাধা দেবে না বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নিষেধাজ্ঞা অনুমোদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এই উদ্যোগ আটকে রেখেছিলেন। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগিয়ারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অবস্থানে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। কাজা কালাস বলেন, “সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।” ইউরোপে বাড়ছে কঠোর অবস্থানের চাপ ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভাল্টোনেন পশ্চিম তীরে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেনডসেন আরও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এসব ঘটনায় কার্যত দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ জন এবং আটক হয়েছেন প্রায় ২২ হাজার মানুষ।
গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ঈদের দিন সন্তানকে কাঁধে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হওয়া এক তরুণকে আটক করার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে তার ২১ মাস বয়সী শিশুকে পরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—যার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিখোঁজ ওই তরুণের নাম ওসামা আবু নাসের (২৫)। তার শিশুপুত্র জাওয়াদ আবু নাসারকে গত ১৯ মার্চ গাজার কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে বাবার সঙ্গে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের বাড়ি, জীবিকা ও নিরাপত্তা হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন ওসামা। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তিনি সকাল ১০টার দিকে শিশুকে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হন। ওসামার বাবা মুহাম্মদ হুসনি আবু নাসার জানান, প্রতিবেশীরা ফোন করে তাকে জানান, তার ছেলে শিশুকে কাঁধে নিয়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছে—যেখানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে। গাজার মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের কাছে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক সীমারেখা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই এলাকায় পৌঁছানোর পর ইসরাইলি বাহিনী সরাসরি গুলি না চালিয়ে তার আশেপাশে গুলি ছোড়ে। এতে বিভ্রান্ত হলেও ওসামা থামেননি। পরে একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন তার কাছে এসে ভেসে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এরপর তাকে শিশুকে নামিয়ে রেখে সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে এবং কাপড় খুলে ফেলতে বলা হয়। ওসামার বাবা বলেন, “সে শুধু অন্তর্বাস পরে ছিল এবং শান্ত ছিল, কোনো আক্রমণাত্মক আচরণ করেনি।” ওসামা আটক হওয়ার পর তার বাবা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিতে থাকেন এবং আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নিজের যোগাযোগ নম্বর দিয়ে আসেন। প্রায় ১০ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়, তার নাতিকে তারা পেয়েছে। পরে মাঘাজি বাজার এলাকায় আইসিআরসি কর্মকর্তারা শিশুটিকে পরিবারের হাতে তুলে দেন। শিশুটিকে কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় ফেরত দেওয়া হয়। কম্বল খুলে তার প্যান্টে রক্তের দাগ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। আইসিআরসি জানায়, তারা শিশুটিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে শিশুটির শারীরিক বা মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। পরিবারের দাবি, বাড়িতে আনার পর শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হাঁটুর চারপাশে পোড়া দাগ এবং ধারালো বস্তু দিয়ে করা গভীর ক্ষত ছিল। শিশুটি সারারাত ব্যথা ও আতঙ্কে কেঁদেছে এবং ঘুমাতে পারেনি। পরদিন হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, এসব আঘাত গোলাবারুদের কারণে নয়—বরং নির্যাতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটির হাঁটু ফুলে গেছে এবং সেখানে সিগারেটের দাগের মতো ক্ষত রয়েছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হামাসের প্রচারণার অংশ। এদিকে, আটক হওয়ার পর থেকে ওসামা আবু নাসারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনীর (আইএসএফ) জন্য সেনা পাঠানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ৫টি দেশ। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত পরিষদ ‘বোর্ড অব পিস’র বৈঠকে এ তথ্য জানিয়েছেন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফার্স। যে কয়েকজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা আইএসএফের সার্বিক নির্বাহী দায়িত্বে আছেন, তাদের মধ্যে মেজর জেনারেল জেফার্স অন্যতম। জেনারেল জেফারস বলেন, প্রথম পাঁচটি দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কাজাখস্তান, কসোভো এবং আলবেনিয়া এই আন্তর্জাতিক বাহিনীতে (আইএসএফ) সেনা পাঠাতে সম্মত হয়েছে। তাছাড়া, মিশর ও জর্ডান পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জেফারস জানান, আন্তর্জাতিক এই বাহিনী মোতায়েন শুরু হবে দক্ষিণ গাজার রাফাহ অঞ্চল থেকে। সেখানে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু হবে এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পুরো গাজার বিভিন্ন সেক্টরে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। জেনারেল জেফারস আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বাহিনীতে মোট ২০ হাজার আন্তর্জাতিক সেনা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একইসঙ্গে গাজার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ১২ হাজার স্থানীয় পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের আওতায় গাজা পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এই নিরাপত্তা বাহিনীকে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
ইসরায়েলি কারাগারের একটি কক্ষ। সেখানে টানা পাঁচ দিন চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আহমেদ আবদেল আলকে। বিবস্ত্র করে চলত প্রহার। কানের কাছে প্রচণ্ড শব্দে বাজানো হতো হিব্রু ও ইংরেজি গান। যন্ত্রণায় যখনই জ্ঞান হারাতেন, তখনই বৈদ্যুতিক শক বা লাঠির আঘাতে তাকে জাগিয়ে তোলা হতো। আহমেদ আবদেল আল একা নন, তার মতো অন্তত ৫৯ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইসরায়েলি কারাগারে কাটানো দিনগুলোকে ‘নরক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) গত ৪ অক্টোবর ২০২৩ থেকে মুক্তি পাওয়া সাংবাদিকদের ওপর একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান চালিয়ে এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাংবাদিকদের ওপর চালানো অমানবিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের চিত্র। Read more: Palestinian journalists recount torture in Israeli prisons নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক জানান, বন্দিরা নির্দিষ্ট কিছু কক্ষকে ‘ডিসকো রুম’ বলে ডাকতেন। সেখানে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে তাদের ঘুমাতে দেওয়া হতো না। এমনকি জিপ-টাই দিয়ে তার জননাঙ্গ বেঁধে মারধর করা হয়, যার ফলে পরে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বের হতো। সেনারা তাকে বলেছিল, ‘তুমি আর পুরুষ থাকবে না।’ সিপিজে বলছে, অন্তত ১৭ জন সাংবাদিক তাদের ওপর যৌন সহিংসতার কথা জানিয়েছেন এবং ১৯ জন অবমাননাকর নগ্ন করে তল্লাশির শিকার হয়েছেন। ৫৯ জন সাংবাদিকের মধ্যে ৫৮ জনই জানিয়েছেন যে তারা নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৬ জন জানিয়েছেন তাদের পাঁজরের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছে বা মেরুদণ্ডে আঘাত করা হয়েছছে। বন্দিদের ওজন গড়ে ২৩.৫ কেজি পর্যন্ত কমে গেছে। সাংবাদিক আহমেদ শাকুরা ১৪ মাসে ৫৪ কেজি ওজন হারিয়েছেন। ক্ষতস্থানে পচন ধরলেও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এক সাংবাদিকের চোখের দৃষ্টি সাময়িকভাবে চলে গিয়েছিল। সিপিজের তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে অন্তত ৯৪ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে ৩০ জন এখনও কারাগারে আছেন। মুক্তিপ্রাপ্তদের অধিকাংশকেই (৪৮ জন) কোনও অভিযোগ ছাড়াই ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন’-এর আওতায় আটকে রাখা হয়েছিল। কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় অনেককে হুমকি দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক মোহাম্মদ আল-আত্রাশকে বলা হয়েছিল, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় যদি শুভ সকাল-ও লেখো, আমরা তোমাকে খুঁজে বের করব।’ আল জাজিরার সাংবাদিক আমিন বারাকাকে তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং কারা কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনও জবাব দেয়নি। তারা দাবি করেছে, বন্দিদের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাখা হয়। তবে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম এই ডিটেনশন সেন্টারগুলোকে ‘নির্যাতন ক্যাম্পের নেটওয়ার্ক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটি (সিএটি) ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই ‘পদ্ধতিগত ও ব্যাপক’ নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সিপিজের আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, ‘এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের খবর বাইরে আসা বন্ধ করতে এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।