ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রণালির আশপাশে থাকা ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিই পুনরায় সচল করেছে ইরান। শুধু তাই নয়, তেহরানের যুদ্ধপূর্ব অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনও অক্ষত রয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এখানকার যেকোনো সামরিক অস্থিতিশীলতা সরাসরি আঘাত হানতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। মার্কিন দাবির সঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের অসামঞ্জস্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৯০ শতাংশ পুনরায় সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে। এসব স্থাপনায় বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে গেলে মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে টমাহক ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এই তথ্য ট্রাম্প প্রশাসনের গত কয়েক সপ্তাহের বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের নৌবাহিনী “পুরোপুরি ধ্বংস” হয়ে গেছে। পরে তিনি আরও বলেন, ইরানের বিমানবাহিনী, রাডার ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানার বড় অংশ নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। একই সুরে বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীপিট হেগসেথ। তবে নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৩ হাজার হামলার পরও অক্ষত ইরানের বড় অংশের সামরিক সক্ষমতা মার্কিন ও মিত্র গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৫ দিনে ১৩ হাজারের বেশি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হলেও দেশটির ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনও টিকে আছে। এছাড়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের হাতে এখনও কয়েক হাজার ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ রয়েছে, যা তাদের মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী(আইআরজিসি)ও একই ধরনের দাবি করছে। বাহিনীটির এক মুখপাত্র সম্প্রতি বলেন, ইরান এখন পর্যন্ত তাদের “পুরোনো মজুদ” থেকেই মাত্র ৩ হাজার ৬০০ ড্রোন এবং ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইরানের এক সংসদ সদস্য তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি-কে বলেছেন, বিদ্যমান মজুদ দিয়েই “বছরের পর বছর যুদ্ধ চালানো সম্ভব”। হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির বড় অংশ এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০ থেকে ৭৫ ডলারের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা ১০০ থেকে ১১০ ডলারের ঘরে অবস্থান করছে। গত চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্তর। এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। ভারতের মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৯ শতাংশ আমদানি করতে হয়, যার ৪০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে আমদানির উৎস বহুমুখী করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কর কমিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা করছে সরকার। চলতি সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিi-এর সরকার দাবি করেছে, দেশে পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাস মজুদ রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ভাঙার আশঙ্কা তেহরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটন। ইরানের প্রস্তাবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকারের দাবি ছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, নতুবা ইরানকে “ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হবে”। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি বন্ধ না করলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না। ফলে পরিস্থিতি এখন দুটি সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে— এক. দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি অচলাবস্থা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে। দুই. নতুন করে সামরিক সংঘাত, যা আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুদ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ ট্রাম্প প্রশাসন যদিও ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের খবর অস্বীকার করছে, তবে একাধিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারও চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বাড়তি তৎপরতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, বেইজিং এই সংঘাত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করছে চীন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে অঞ্চলটিতে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে নতুন করে জ্বালানি, খাদ্য ও গোলাবারুদসহ প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চলমান অভিযান নির্বিঘ্ন রাখতে নৌবহরে নিয়মিত রসদ সরবরাহ জোরদার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক (ডিডিজি-১১৯)-এ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম তোলা হচ্ছে। জাহাজটি বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন (সিভিএন-৭২)ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে সহায়তা দিচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে পেন্টাগন-এর প্রধান পিট হেগসেথ সিনেটে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা বলছে, প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদারের এই পদক্ষেপ অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি সংকট যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ‘দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালী-এর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান এই নৌপথটি এখনও বন্ধ রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, ইরানের তেল রপ্তানিতে মার্কিন অবরোধের প্রতিবাদে তারা এই জলপথ অবরুদ্ধ রেখেছে। নতুন সামরিক পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক চাপ হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আলোচনায় আনতে নতুন সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিফিং করতে পারেন। এদিকে তেহরানে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার খবর জানিয়েছে মেহর নিউজ এজেন্সি। তাদের দাবি, ড্রোন ও নজরদারি বিমান প্রতিহত করতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ‘নৌ অবরোধ ব্যর্থ’—ইরানের দাবি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তথাকথিত নৌ অবরোধ ২০ দিনের মধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। আইআরজিসি গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, এই উদ্যোগ ছিল চীন, রাশিয়া ও ইউরোপকে প্রভাবিত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তবে শেষ পর্যন্ত এটি কার্যকর হয়নি এবং ইরান এখন ‘অস্থিতিশীলতাবিরোধী জোটের’ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। সংঘাতের পটভূমি ইরানের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিনা উসকানিতে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি-সহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়। একই দিনে মিনাবে একটি স্কুলে হামলায় ১৬৮ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এর জবাবে ৪০ দিনের মধ্যে প্রায় ১০০ দফা পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০–৫০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, যা ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কার্যকর হয়। পরে ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠকে বসে দুই দেশের প্রতিনিধি দল। ইরানের সরকারি তথ্যমতে, ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩,৩৭৫ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ২,৮৭৫ জন পুরুষ ও ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া আহত হয়েছেন শতাধিক চিকিৎসাকর্মী, নিহত হয়েছেন অন্তত ২৬ জন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব এতদিন সৌদি আরবের হাতে থাকলেও কখনো কখনো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। তবে সারা বিশ^কে অবাক করে দিয়ে উপসাগরীয় এলাকায় নতুন বস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান। পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছে ইসলামি দেশটির সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ নেতারা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে ইরান। জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালীতে কর্তৃত্ব ধরে রেখে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে ইসলামিক দেশটি, তেল-গ্যাসের সংকটে ইরানের কাছে নতজানু তাবৎ দুনিয়া। ন্যাটো এবং ইউরোপীয় বন্ধুদেশগুলোর সমর্থন না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র একা হয়ে পড়েছে রণাঙ্গনে, দখলদার ইসরায়েলের প্ররোচনোয় ইরান আক্রমণ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারিয়ে এখন একেকবার একেক কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা করে পাকিস্তান পক্ষ-প্রতিপক্ষ সব রাষ্ট্রের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ক’টনৈতিক চাপ, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কঠিন প্রতিরোধ আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয়েছে গণহত্যায় অভিযুক্ত ইসরায়েল। আর হরমুজ প্রণালীতে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নেতৃত্বে এখন ইরান। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে কারিগরি আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল সোমবার বা মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় বসার কথা। সূত্রগুলো বলছে, দুই পক্ষের কারিগরি দল ইসলামাবাদে মিলিত হবে। তাদের লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সপ্তাহব্যাপী চলা সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান চূড়ান্ত করা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তারা একবার চুক্তির খসড়া তৈরি করে ফেললে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধান চুক্তি সই করতে ইসলামাবাদে উড়ে আসবেন। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের পাশাপাশি আঞ্চলিক আরও কয়েকটি দেশের নেতারাও এই চুক্তি সই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। সূত্রগুলো আরও জানায়, ১১-১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে প্রথম দফার বৈঠকের পর থেকেই বিবদমান দুই পক্ষ ইসলামাবাদের মাধ্যমে একে অপরের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার আগেই তারা একটি ‘সর্বোচ্চ বোঝাপড়ায়’ পৌঁছাতে চাইছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী ইরানের হাতে কাগজে-কলমে বিশ্বেরর জ্বালানির ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হওয়ার তথ্য থাকলেও বাস্তবে এই প্রণালীর গুরুত্ব আরো বেশি। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত, ইরাক ছাড়াও ইরানের নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানি হয় এই পথ দিয়ে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশগুলো থেকে সার রপ্তানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ইরান থেকে অঘোষিতভাবে জ্বালানি এই পথ ধরে যায় চীনসহ অনেক গন্তব্যে। এই হরমুজ প্রণালী কর্তৃত্ব পুরো ইরানের হাতে। ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে হরমুজ অবরোধ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের আশপাশে ১৫টি যুদ্ধ জাহাজ এবং তিনটি বৃহৎ বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে। তারপরও ইরানের আধিপত্য ভাঙতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ইরান তার ইচ্ছামতো একবার হরমুজ খুলছে, একবার বন্ধ করছে। ইরানে মার্কিন হামলার শুরু পরেই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। বিপাকে পড়ে মার্কিন মিত্র সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাক। এসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে আটকে পড়ে বহু দেশের জাহাজ ও নাবিকরা। যুদ্ধের সময় এসব নাবিক ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারানোর শঙ্কায় ছিল। এইসব গুলো দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটির হাজার হাজার সেনাও মহাবিপদে পড়ে। অনেক হুমকি দিয়েও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী চালু করতে পারেনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রই হরমুজ অবরোধ করে বসে। এর মধ্যেই কিছু জাহাজ এই প্রণালী পার হয়। লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পরপরই হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান। তারপরও মার্কিন অবরোধ বন্ধ না হওয়ায় পরে শনিবার আবার এই প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও সেসবে অবস্থানকারী নাবিকরা আবারো বিপদে পড়লো, মধ্যপ্রাচ্যের ৭টি দেশে অবস্থানকারী ৫০ হাজার মার্কিন সেনাও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকটের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়। একটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। দুটি গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, গানবোটগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ‘সম্পৃক্ত’। অর্থাৎ হরমুজের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে। এই শনিবারই ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকায় ক্ষুব্ধ তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘আগের অবস্থায়’ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইরানের এ ঘোষণায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ এক বিবৃতিতে মার্কিন এ অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ কারণেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এখন থেকে এই কৌশলগত নৌপথটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হলেও হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ইরান। ছোট নৌযান ও দ্রুতগামী বোট ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে চাপে রাখছে তেহরান। উপকূলের গোপন কোনো স্থান বা এসব নৌকা থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে আইআরজিসি। এগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্রণালীর কোথাও কোথাও ইরান মাইন পুঁতে রেখেছে বলে খবর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো। জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এজেন্সি জানায়, যুদ্ধ চলাকালীন অন্তত ২০টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছিল। গার্ডস নৌবাহিনী এই হামলাগুলোর দায় খুব কমই স্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলাগুলো সম্ভবত স্থলভাগ থেকে ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে ছোড়া ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল, যা শনাক্ত করা কঠিন। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, বোটগুলো প্রায়শই এতটাই ছোট যে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায় না এবং এগুলো পাথুরে উপকূল বরাবর খনন করা গভীর গুহার ভেতরের জেটিতে নোঙর করা থাকে। এগুলো মিনিটের মধ্যে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তাদের অস্ত্রশস্ত্র উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য একটি বড় হুমকি। ইরান আক্রমণকারী নৌকার জন্য কমপক্ষে ১০টি অত্যন্ত গোপন ও সুরক্ষিত ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। শীর্ষ সব নেতাদের হারানোর পরও আজ ইরান এক আত্মবিশ্বাসী দেশ, সব হারানোর প্রস্তুতি নিয়ে দেশটি মার্কিন আধিপত্য ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসতেও ইরান এখনো রাজি হয়নি। বিশ্বের পরাক্রমশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তারা বলছে, শর্তের পর শর্ত দিয়ে কোনো আলোচনা সফল হবে না, শুধুই সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশি কথা বলেন বলে অভিযোগ করে ইরান জানিয়েছে, অন্তত সাত বার তিনি মিথ্যা বলেছেন। সারা বিশে^র নজর এখন পাকিস্তানের দিকে ইরান সভ্যতা ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েও ৮ এপ্রিল ইরানের ওপর পূর্বঘোষিত বড় ধরনের ‘বোমাবর্ষণ ও হামলা’ অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে রাজি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য তিনি স্থগিতে রাজি হন। ট্রাম্পের এই নাটকীয় ঘোষণার পেছনে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতা বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবশ্য যুদ্ধবিরতির তিন দিনের মাথায় ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কোনও সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। ২১ ঘণ্টা ধরে চলা প্রথম দফার আলোচনায় কোনো সাফল্য না এলেও দুপক্ষের মধ্যে অনেকটা অস্বস্তি কেটেছে। পাকিস্তান প্রবল প্রচেষ্টা চালানোর কারণেই আবারও নতুন বৈঠক হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদে। একদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সফর করেন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে। আর দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির ছুটে যান ইরানে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারসহ পাকিস্তানের সামরিক- বেসামরিক প্রশাসনের আপ্রাণ চেষ্টার ফলেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি বৈঠক হতে যাচ্ছে। প্রথম দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান আলী আকবর আহমাদিয়ান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুল নাসের হেমমাতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। দ্বিতীয় দফা আলোচনার মধ্য দিয়ে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা করতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ঝটিকা সফরে যান সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্কে। ইরানে গিয়ে আসিম মুনিরও অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন দ্বিতীয় দফার আলোচনা। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে গত ১১ এপ্রিল শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আসা ইরানি কূটনীতিক দলকে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী নিরাপত্তা পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দিয়েছিল। সেদিন ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়া মার্কিন কূটনীতিক দল একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলন শেষে দ্রুত ইসলামাবাদ ছাড়ে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যর্থ আলোচনার পর ইরানের কূটনীতিকদের আশঙ্কা ছিল, দেশে ফেরার পথে ইসরায়েল তাদের হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। এরপর পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর একটি বড় বহর ইরানি কূটনীতিকদের বহন করা উড়োজাহাজটিকে পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুদের না পেলেও ইরানের পাশে ছিলো চীন-রাশিয়া ইরান গোপনে একটি চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট সংগ্রহ করেছে। এটি সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে শক্তিশালী সক্ষমতা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক অনুসন্ধানে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাত দিয়ে এফটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, টিইই-০১বি নামের এই স্যাটেলাইট ২০২৪ সালের শেষের দিকে চীন থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। সময়, স্থানাঙ্ক তালিকা, স্যাটেলাইট চিত্র ও কক্ষপথ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, ইরানি সামরিক কমান্ডাররা পরবর্তী সময়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারি করতে এই স্যাটেলাইট কাজে লাগিয়েছিলেন। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে ওই সব জায়গার ছবি তোলা হয়েছিল। সিআইএর চীনবিষয়ক সাবেক প্রধান ডেনিস ওয়াইল্ডার বলেন, চীন ঐতিহাসিকভাবেই ইরানকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করে আসছে। বর্তমানে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানকে চীনের দেওয়া অন্যান্য সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা, যেমন কাঁধে রেখে চালানো যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও উদ্বিগ্ন। কাঁধে রেখে চালানো যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সম্প্রতি একটি মার্কিন এফ-১৬ বিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো চীনা কোম্পানি এভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পারে না। চীন ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। তবে নিজেদের সম্পৃক্ততা লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। আবার রাশিয়া নিয়মিতভাবেই ইরানে ড্রোন সরবরাহ করছে বলে খবর রয়েছে, যেমনটা রাশিয়ার ইউক্রেন হামলায় ইরান বিপুল সংখ্যাক শাহেদ ড্রোন পাঠিয়ে গেছে কয়েক বছর। সেই শাহেদ ড্রোনের আরো উন্নত সংস্করণ রাশিয়া এখন ইরানকে দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, মার্কিন চাপেও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ইরান যুদ্ধে সামিল হয়নি, যেমনটা তারা যুক্ত হয়েছিল ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমনে। অথচ ইউরোপে মাত্র ছয় সপ্তাহের জেট জ্বালানি মজুত আছে। স্পেন তো সরাসরি ইরানে মার্কিন হামলার বিরোধীতা করেছে। ইতালি ইসরায়েলের সঙ্গে করা সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করেছে। যুক্তরাজ্য থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র পরিবহন করার সময় একটি ফ্লাইট আটকে দিয়েছে বেলজিয়াম। জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া যুদ্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছে, যারা বহু বছর ধরে মার্কিন সেনা ও অস্ত্রে সুরক্ষিত হয়ে আসছে। যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছিলেন এবং অন্যদিকে দাবি করছিলেন, তেহরান নিজেই বাঁচার জন্য শান্তিচুক্তি ভিক্ষা চাচ্ছে। কিন্তু পর্দার আড়ালের হোয়াইট হাউসই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের ওপর চাপ দিচ্ছিল, যাতে তারা ইরানকে বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর ব্যবস্থা করে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ এবং প্রতিবেশী হওয়ার কারণে ওয়াশিংটন মনে করেছিল, তাদের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠালে ইরান সেটা সহজে মেনে নেবে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এই গোপন তৎপরতা চালান। যার ফলে ৮ এপ্রিল রাতে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। আসলে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এ ছাড়া ইরান যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তা-ও তাঁকে অবাক করে দিয়েছিল। ২১ মার্চ থেকেই ট্রাম্প মনে মনে যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন। আরো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘আমি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে চমৎকার আলোচনা করেছি। তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।’ এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ‘স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচেষ্টার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান লেবাননের প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও; আর ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ঘোষণা দিয়েছেন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম মুসাবি। লেবাননে নির্বিচার মানুষ হত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল। এখন পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে বহু জনপদ, হাজার হাজার ভবন। ইসরায়েল একাধারে জল-স্থল ও আকাশ থেকে আক্রমন চালিয়ে মেরে ফেলেছে দুই হাজারের বেশি মানুষ। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি নারী ও শিশুরাও। ইসরায়েলের আক্রমণে প্রাণ গেছে লেবানিজ সেনাসদস্য, এমনকি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদেরও। ইন্দোনেশিয়ার শান্তিরক্ষীরা মারা গেছে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের মধ্যে আর গত শনিবার যুদ্ধবিরতি মাঝে ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ফ্রান্সের একজন শান্তিরক্ষী। এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই প্রতিরোধ চালাচ্ছে ইরানপন্থি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তারা লেবানন দখলকারী সেনাদের ওপর যেমন হামলা চালাচ্ছে, তেমনি রকেট ছুড়ছে ইসরায়েলের ভূখন্ডেও। ট্রাম্প লেবানন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর লেবানিজরা তাদের বাড়ি-ঘরে ফিরতে শুরু করে সেদিনই। ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতেই তারা ফিরছে, কারণ সেটাই তাদের দেশ, জন্মভূমি। এমনকি লেবাননের সেনাবাহিনীর সতর্ক বার্তাও তাদের থামাতে পারেনি। লেবানন দখলকারী ইসরায়েলকে যেমন গুনায় ধরছে লেবানিজরা, তেমনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল- লেবানন যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলকে ডাকা হয়নি। দুটিই ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যে কারণে দেশের ভেতরেই রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। আঞ্চলিক নেতৃত্বের পরিবর্তন? বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট: ইরান সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে সীমাবদ্ধতা অনুভব করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান নতুন কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।