দেশকে বৈষম্যমুক্ত ও নিরাপদ আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন রাজিব। স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা করলেও তার ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে চরম দুর্দশা। বর্তমানে তিনি একটি আলোচিত হত্যা মামলায় জড়িয়ে হয়ে পড়েছেন চরম হয়রানি ও অনিশ্চয়তার শিকার। আন্দোলন থেকে আসামির খাতায় জানা গেছে, পুরান ঢাকায় আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন রাজিব। আন্দোলনের সময় পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন তিনি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও তার দুর্ভোগ থামেনি। উত্তরায় একটি হত্যা মামলায় তাকে ৪৯ নম্বর আসামি করা হয়, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ২০০ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাজিবের দাবি, তিনি কখনো উত্তরা এলাকায় যাননি। তার বাসা বংশাল এলাকায় হলেও তাকে উত্তরা পশ্চিম থানার মামলায় আসামি করা হয়। ৬ মাস কারাভোগ ও আর্থিক ক্ষতি মামলায় গ্রেফতার হয়ে প্রায় ৬ মাস কারাভোগ করেন রাজিব। জামিন পেতে ব্যয় হয় প্রায় ২৫ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে তার ১৮টি দোকান (প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের) দখল হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক মর্যাদা ও সন্তানের শিক্ষাজীবন—সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। থানায় ডেকে হুমকি ও লকআপে আটকের অভিযোগ ২০২৫ সালের জুনে চকবাজার থানার এক এসআই তাকে থানায় ডেকে দোকানের চাবি দাবি করেন। চাবি না দিলে ডাকাতির মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রাজিব। তিনি সেই হুমকি রেকর্ড করলে তাকে লকআপে আটক রেখে রেকর্ড মুছে ফেলা হয় বলে দাবি করেন। পরে যুবলীগ পরিচয়ে হুমকি পেয়ে থানায় অভিযোগ জানালেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার। ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ উল্লেখ ২০২৫ সালের ২২ জুলাই আইনজীবী পরিচয়ে ডেকে তাকে আদালতপাড়ার একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রাজিব। পরে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রযুক্তিগত তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে একাধিক কর্মকর্তা মত দেন। এমনকি এক প্রতিবেদনে তাকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবুও তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পুলিশের প্রতিবেদনেই নির্দোষ ৩ জানুয়ারি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বংশাল থানা ও উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা উল্লেখ করেন— রিয়াজ উদ্দিন রাজিব কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন তার স্বভাব-চরিত্র ভালো নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি ৫ জানুয়ারি আদালতের এক আদেশে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ কমিশনার তার দোকান-সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করেছিলেন। এর জের ধরেই তাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। থানার ওসির বক্তব্য বিষয়টি জানতে চাইলে একে মাহফুজুল হক, অফিসার ইনচার্জ, বংশাল থানা বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর রিয়াজ উদ্দিন রাজিবকে থানায় ডাকা হয়নি। আগের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর কাছে হয়রানির বিষয়টি উল্লেখ করে ২৫ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাজিব। বর্তমানে তিনি গ্রেফতার আতঙ্কে বাসায় অবস্থান করতে পারছেন না। অনিশ্চয়তায় এক ‘জুলাই যোদ্ধা’ পুলিশের প্রতিবেদন তাকে নির্দোষ বললেও মামলা থেকে অব্যাহতি মিলছে না। ফলে একদিকে আইনি লড়াই, অন্যদিকে সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির ভার—দুইয়ের মাঝেই অসহায় সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন রিয়াজ উদ্দিন রাজিব। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একজন অংশগ্রহণকারী হয়েও আজ তিনি নিজ দেশে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। প্রশ্ন উঠছে—একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’ কবে মুক্তি পাবেন কল্পিত মামলার দায় থেকে?
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর সমাবেশে চালানো অভিযানের ঘটনায় তদন্ত শেষ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এর তদন্ত সংস্থা। তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে এই ঘটনার প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করে তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। একটি গণমাধ্যমের হাতে আসা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ অন্তত ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সরাসরি গণভবন থেকে অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কারা আছেন আসামির তালিকায় তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার পর যাদের নাম এসেছে তারা হলেন— সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। এছাড়া যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকার, লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর, পুলিশের সাবেক আইজি হাসান মাহমুদ খোন্দকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও পুলিশের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রয়েছে। অভিযানের বর্ণনা তদন্ত প্রতিবেদনে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে সারাদেশ থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের ঢাকায় আসতে দেওয়া হয়। দিনভর বিভিন্ন স্থানে তাদের বাধা ও হয়রানির অভিযোগ তুলে বলা হয়, গণমাধ্যমে ভাঙচুরের খবর প্রচারের মাধ্যমে সমাবেশকে বিতর্কিত করা হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাত ১০টার পর শাপলা চত্বরে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে লাইট নিভিয়ে একদিক খোলা রেখে সমন্বিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘ক্র্যাকডাউন’ শুরু করে। তবে মোট কতজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারেনি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নিহতদের নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমাবেশের পটভূমি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিল, ধর্ম অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সারাদেশ থেকে মাদরাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দিনভর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যদিও ওই সময় সরকারিভাবে বড় ধরনের প্রাণহানির অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল। তদন্তের প্রেক্ষাপট ও গ্রেপ্তার গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ ঘটনায় তদন্ত চেয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে হেফাজতে ইসলাম। জাতীয় নির্বাচনের আগেই তদন্ত সংস্থা তাদের অনুসন্ধান শেষ করেছে বলে জানা গেছে। এ মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন— সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম। আলোচিত এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর বিষয়ে 'বিশেষ নির্দেশনা' দিয়েছেন রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান। মঙ্গলবারের এই “বিশেষ নির্দেশনা” সংবলিত চিঠি পাঠানো হয়েছে রাজশাহী রেঞ্জের আওতায় থাকা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট এই আট জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে। "পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আদিষ্ট হয়ে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে" উল্লেখ করে চিঠিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত ফ্যাসিস্ট সংগঠন বা সংগঠনসমূহের যে নেতৃবৃন্দ এবং কর্মী জামিনে মুক্তির পর দলকে শক্তিশালী, সংগঠিতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে তৎপরতা প্রদর্শন করতে সক্ষম, তাদের জামিন হওয়ার পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে (শ্যোন অ্যারেস্ট) হবে”। "আর যারা ওই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়, তাদের জামিন হলে গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানোর প্রয়োজন আপাতত নেই" বলে ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহানের পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে। তবে, এই চিঠিতে "কার্যক্রম নিষিদ্ধ/স্থগিত ফ্যাসিস্ট সংগঠনের" কথা বলা হলেও আওয়ামী লীগ বা তাদের কোনো সহযোগী সংগঠনের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। একইসাথে “প্রটোকল ও প্রটেকশন প্রদানের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করতে হবে” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। মি. শাহজাহানের এই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ইতিপূর্বে এই বিষয়ে গ্রুপ মেসেজের মাধ্যমে পুলিশ সুপারদের অবহিত করা হয়েছে। বিষয়টি অনুসরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি মো. শাহজাহান 'ক্ষোভ' প্রকাশ করে বলেন, এই চিঠি সাংবাদিকদের কাছে যাওয়া "চরম দুর্বলতা আমি মনে করি, আপনাদের কাছে যাওয়া উচিত ছিল না। এটা একান্তই সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয়"। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ বা তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে এই নির্দেশনা নয়। বরং "সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে এমন ব্যক্তিদের জন্য" এই বিশেষ নির্দেশনা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি যেন না হয় সেজন্য নিজেদের সদস্যদের আগাম বার্তা দেওয়ার অংশ এই নির্দেশনা। এটি রুটিন ওয়ার্ক নয়। "আমরা কোনো ব্যক্তি, কোনো সংগঠন বা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি যারা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত, তাদের কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন টার্গেট করি নাই। যারা নিষিদ্ধঘোষিত, যারা সমাজের অপরাধী, বিভিন্ন কারণে নিষিদ্ধ সংগঠন, সমাজের ভেতরে বিশৃঙ্খলা করতে পারে, তাদের বিষয়ে কনসার্ন আমাদের" বলেন মি. শাহজাহান। পুলিশের সদর দফতর থেকে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য কোনো নির্দেশ এসেছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "এটা সদর দফতরের না, এটা আমাদের একেবারেই ইন্টারনাল বিষয়। আমাদের সদস্যদেরকে অগ্রীম বার্তা দিয়ে রাখছি এটা"। চিঠির ভাষাগত কারণে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে উল্লেখ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "যেসব সংগঠন নিষিদ্ধ তাদের তৎপরতা যদি বেড়ে যায় তাহলে তাদের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। এইজন্য তাদেরকে আমরা বলছি আইনের আওতায় আনার জন্য। সিম্পল কথাটা আইনের আওতায় বললে এই শব্দগুলো আসতো না"।
বরিশালের অতিরিক্ত মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিনকে কেন্দ্র করে বিচারকের উপস্থিতিতেই হট্টগোল, ভাঙচুর ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, বিচার কার্যক্রম চলাকালে কয়েকজন আইনজীবী এজলাস কক্ষে প্রবেশ করে চেয়ার-টেবিল উল্টে দেন এবং বিচারকের দিকে আঙুল তুলে প্রতিবাদ জানান। ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার বরিশাল জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাদিকুর রহমান লিংকন-কে বুধবার দুপুরে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কী ঘটেছিল এজলাসে? মঙ্গলবার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ একটি মামলার শুনানি করছিলেন। এসময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন কোর্ট রেজিস্ট্রার ও কোর্ট পুলিশের সদস্যরাও। এজলাসে হঠাৎ কয়েকজন আইনজীবী প্রবেশ করে উত্তেজিত আচরণ শুরু করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তারা বিচারকের দিকে আঙুল তুলে উচ্চস্বরে কথা বলছেন। একপর্যায়ে আদালত কক্ষে থাকা অন্য আইনজীবীদের বের করে দেওয়া হয় এবং চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও ধমকাতে শোনা যায়। জামিন ইস্যু থেকেই উত্তেজনা জানা গেছে, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস-কে জামিন দেওয়াকে কেন্দ্র করেই উত্তেজনা তৈরি হয়। জেলা আইনজীবী সমিতির ডাকে সেদিন আদালত বর্জনের কর্মসূচিও চলছিল। অভিযুক্ত আইনজীবীরা দাবি করেন, জামিন অযোগ্য মামলায় অর্থের বিনিময়ে জামিন দেওয়া হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। গ্রেফতারের আগে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে সাদিকুর রহমান লিংকন বলেন, “যেসব মামলায় উচ্চ আদালত জামিন দেয়নি, সেসব মামলায়ও ম্যাজিস্ট্রেট জামিন বিবেচনা করছিলেন। আমরা আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই।” মামলা ও গ্রেফতার বিএনপিপন্থী ২০ আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।দ্রুত বিচার আইনে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) এ মামলা করেন বরিশালের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম জানান, আদালতের বেঞ্চ সহকারী বাদী হয়ে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় এজাহারভুক্ত ১২ জনসহ অজ্ঞাত আরও ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। নামধারী অন্যান্য আসামিরা হলেন- বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মির্জা রিয়াজুল ইসলাম, বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি আবুল কালাম আজাদ, মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক নাজিমউদ্দিন পান্না, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মহসিন মন্টু, মিজানুর রহমান, আব্দুল মালেক, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এপিপি সাঈদ চৌধুরী, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এপিপি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বাবলু, মহানগর দায়রা জজ আদালতের এপিপি ও বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি তারেক আল ইমরান, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ইমন এবং বসিরউদ্দিন সবুজ। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি মামলার আসামির জামিনকে কেন্দ্র করে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালের মুখ্য ও অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং বিচারকদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হয়। আসামিরা বিচারকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে আদালতে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেন এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেন। দুপুর আড়াইটার দিকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরিয়তুল্লাহর এজলাসে প্রবেশ করে তারা শুনানিরত আইনজীবীকে শুনানি করতে নিষেধ করেন এবং তাকে হুমকি দেন। এ সময় সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকন এজলাসে উপস্থিত আইনজীবীদের বের হয়ে যেতে নির্দেশ দেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, এক আইনজীবীকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। আইনজীবী মিজানুর রহমান বিচারককে এজলাস থেকে নেমে যেতে বলেন। এছাড়া জিআরও শম্ভু কাঞ্চি লাল ও কোর্ট পরিদর্শক তারক বিশ্বাসকে ধাক্কা দিয়ে এজলাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ সময় ডায়াসের মাইক্রোফোন ভাঙচুর, এজলাসের বেঞ্চ ও টেবিল ভাঙচুর এবং মামলার রেজিস্টার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এস এম সাদিকুর রহমান লিংকনকে পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। লিংকনকে গ্রেফতার করা হলে আদালত প্রাঙ্গণে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের একটি অংশ তার মুক্তির দাবিতে আদালত বর্জন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ঘটনাটি নিয়ে দেশের আইন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, আদালতের এজলাসে বিচারকের সামনেই যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবীরা মত দেন, কোনো আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে উচ্চতর আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জেলা জজ, হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ খোলা। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, আদালতের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ আদালত অবমাননার শামিল হতে পারে। কেউ আহত হয়ে থাকলে ফৌজদারি মামলাও হতে পারে। তিনি আরও বলেন, “মব ভায়োলেন্স বা দলীয় প্রভাব থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।” রাজনৈতিক প্রভাব ও আইন পেশা বিশ্লেষকদের মতে, আইন পেশাকে রাজনৈতিক সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে। এতে বিচার বিভাগ ও আইন পেশার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তারা বলছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বরিশাল আদালতের এ ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ভাঙচুরের ঘটনা নয়—এটি বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
গত দেড় দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ও সফল নায়িকা মাহিয়া মাহি। রূপালি পর্দায় সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে বারবার শিরোনামে এসেছেন তিনি। তবে এবার খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে তার যুক্তরাষ্ট্র অধ্যায়। গ্রিনকার্ড জটিলতায় বিপাকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন মাহি। স্বামী-সন্তানসহ নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু সম্প্রতি কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতায় তার আবেদন বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও তিনি পুনরায় আবেদন করার চেষ্টা করছেন, তবুও প্রক্রিয়াটি তার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাচ্ছেন এই অভিনেত্রী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার স্বামী রকিব সরকার ও পুত্র অবস্থান করছেন ভারতে। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে সন্তানের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি মাহির। কাজী মারুফের বাসায় অবস্থান জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে তিনি থাকছেন চিত্রনায়ক কাজী মারুফ-এর বাসায়। সেখান থেকে মারুফের স্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত ছবি শেয়ার করতেও দেখা গেছে তাকে সামাজিক মাধ্যমে। সিনেমা থেকে রাজনীতি ২০১২ সালে জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত ‘ভালোবাসার রঙ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে মাহির। এরপর একই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে একাধিক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দেন। নায়ক বাপ্পীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়ালেও তা স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জনও শোনা যায়। দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে অন্য ব্যানারে কাজ শুরু করেন তিনি। বিয়ে, বিচ্ছেদ ও নতুন অধ্যায় ২০১৬ সালে মাহমুদ পারভেজ অপুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মাহি। তবে দাম্পত্যে অমিলের অভিযোগে ২০২১ সালে ডিভোর্স দেন। একই বছর গাজীপুরের আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা রকিব সরকারকে বিয়ে করেন তিনি। দুই বছর পর রাজনীতিতে সরব হন মাহি। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট-এর কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও পাননি দলীয় সমর্থন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেখানেই কার্যত ইতি ঘটে তার রাজনৈতিক অধ্যায়ের। আড়ালে যাওয়া ও কর্মহীনতা ২০২৫ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর অনেকটাই আড়ালে চলে যান মাহি। চলচ্চিত্রেও কাজ কমতে থাকে। একপ্রকার কর্মহীন অবস্থায় পড়েন তিনি। নির্বাচনের আগে রকিব সরকারের সঙ্গে বিচ্ছেদের ঘোষণা দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েই জানান মাহি। গত বছরের অক্টোবরে অনেকটা নীরবে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। অনিশ্চয়তার প্রহর যুক্তরাষ্ট্রে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, সবমিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মাহি। একদিকে গ্রিনকার্ড জটিলতা, অন্যদিকে স্বামী-সন্তান থেকে দূরত্ব—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন তিনি। আওয়ামী ট্যাগ থাকায় দেশে ফেরার বিষয়েও দ্বিধায় আছেন বলে জানা গেছে। রূপালি পর্দার ঝলমলে জীবন পেরিয়ে বাস্তবের চড়াই-উতরাই এখন যেন হার মানাচ্ছে সিনেমাকেও। সামনে কী অপেক্ষা করছে মাহিয়া মাহির জীবনে—সেই উত্তরই খুঁজছে তার ভক্ত-অনুরাগীরা।
মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে বরিশালে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সাবেক দুই সংসদ সদস্য। শুধু এই দুজনই নন, গত এক সপ্তাহে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতিসহ অন্তত তিনজন প্রভাবশালী নেতা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের আরও অন্তত ডজনখানেক নেতা জামিনে মুক্ত হয়েছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ইউনুসের জামিনে আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা সোমবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম শরিয়তউল্লাহর আদালতে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস। বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তিনি আসামি ছিলেন। মামলাটিতে আরও আসামি রয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীরসহ দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা। সরকার পতন ও মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক ছিলেন ইউনুস। হঠাৎ আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করায় আদালত প্রাঙ্গণে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। মহানগর ও জেলার দুই পাবলিক প্রসিকিউটর এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সম্পাদক আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিনের বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি ছিল—মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা রয়েছে এবং এটি ছিল আবেদনের প্রথম দিন। তবুও শুনানি শেষে আদালত তাকে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত জামিন দেন। ইউনুসের আইনজীবী কাইয়ুম খান কায়সার দাবি করেন, ২০১৮ সালের একটি তথাকথিত ঘটনার ভিত্তিতে ২০২৪ সালে দায়ের করা মামলাটি মিথ্যা। বিচারক সব দিক বিবেচনা করেই জামিন দিয়েছেন। অন্যদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সাদিকুর রহমান লিংকন বলেন, ইউনুসের বিরুদ্ধে মোট তিনটি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় জামিন পেলেও বাকি দুটি মামলার বিষয়ে পুলিশ আদালতকে তাৎক্ষণিক অবহিত করেনি বা গ্রেফতারের আবেদন করেনি। জেবুন্নেসা আফরোজসহ আরও তিনজনের জামিন ইউনুসের জামিনের মাত্র ছয় দিন আগে বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেসা আফরোজ আদালত থেকে জামিন পান। একইদিনে জামিন পান যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন এবং মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিমউদ্দিন। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন থানায় তিন থেকে সাতটি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। একের পর এক জামিন পাওয়ার পর ওইদিনই তারা কারাগার থেকে মুক্তি পান। পাবলিক প্রসিকিউটরদের আপত্তি বরিশালের মেট্রোপলিটন পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. নাজিমউদ্দিন আহম্মেদ পান্না অভিযোগ করেন, মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে নামঞ্জুর হওয়া জামিনও নিম্ন আদালত মঞ্জুর করেছেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে জেবুন্নেসা আফরোজ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর ভাতিজা মঈন আব্দুল্লাহর জামিনের প্রসঙ্গ তোলেন। তার মতে, উচ্চ আদালতের আদেশ অগ্রাহ্য করলে বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. হাফিজ আহম্মেদ বাবলু বলেন, ৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া মামলার বেশিরভাগ আসামিই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তাদের সহজে জামিন পাওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। বিএনপির প্রতিক্রিয়া বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাড. আবুল কালাম শাহিন বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পরও সবক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। তার অভিযোগ, একটি বিশেষ শ্রেণি সুযোগ নিয়ে জামিন অযোগ্য ধারার আসামিদের জামিন পাইয়ে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, এতে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে এবং জরুরি ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয়ের নজর দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক জামিনের ধারাবাহিকতা বরিশালের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। একদিকে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়া মেনেই জামিন দেওয়া হচ্ছে; অন্যদিকে বিএনপি ও সরকারপক্ষের আইন কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলাকালে বিএনপি প্রার্থীর এক কর্মীকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম-সহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজুর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বরিশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জহির উদ্দিন এ আদেশ দেন বলে বেঞ্চ সহকারী মো. আব্দুর রহমান জানিয়েছেন। অভিযুক্তরা কারা মামলায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও অভিযুক্ত করা হয়েছে— বরিশাল মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. রুহুল আমিন একাদশ সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান উপ-পুলিশ কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন ভুঁইয়া বন্দর থানার ওসি মোস্তফা কামাল হায়দার পরিদর্শক (তদন্ত) শাহ মো. ফয়সাল আহম্মেদ এসআই আব্দুল মালেক এএসআই সহিদুল ইসলাম এএসআই রাসেল মিয়া এএসআই এরফান হোসেন মিদুল এএসআই রফিকুল ইসলাম এএসআই মোহাম্মদ মিলন বিশ্বাস এএসআই মেহেদি হাসান মোল্লা কনস্টেবল ফয়জুল মামলার বাদী মো. মশিউল আলম খান পলাশ, বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগের বিবরণ বাদী পলাশের অভিযোগ, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সারাদেশে বিএনপি প্রার্থীরা স্বাভাবিকভাবে প্রচারণা চালাতে পারেননি। বরিশাল-৫ আসনেও একই পরিস্থিতি ছিল। বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার নেতাকর্মী নিয়ে প্রচারণায় যেতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন এলাকায় লিফলেট বিতরণের উদ্দেশ্যে প্রার্থীর সঙ্গে রওনা হলে তিন দিক থেকে স্পিডবোটে ধাওয়া করা হয়। বিশ্বাসের হাট এলাকায় পৌঁছালে নদীর মাঝখান থেকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ তাকে অপহরণ করে। পরে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়। পলাশের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তাকে হত্যা করা হয়নি। পরে বন্দর থানায় নিয়ে তার বিরুদ্ধে দুই-তিনটি ‘মিথ্যা মামলা’ দায়ের করা হয়। মামলার প্রক্রিয়া ও আদালতের নির্দেশ বাদী জানান, গত ৫ আগস্ট তিনি আদালতে মামলা দায়ের করেন। প্রথমে বন্দর থানার ওসিকে মামলা রুজুর নির্দেশ দেওয়া হলেও তদন্তে ঘটনাস্থল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। নদীর অবস্থান ফিতা দিয়ে পরিমাপ করে ঘটনাস্থল কোতয়ালী মডেল থানার আওতায় দেখিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। বাদী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দেন। এরপর কয়েক মাস প্রক্রিয়া চলার পর রোববার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোতয়ালী মডেল থানায় এফআইআর হিসেবে মামলা রুজুর নির্দেশ দেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া এ বিষয়ে এখনো অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক মহলে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা রুজুর পর তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: বরিশাল নগরীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বরিশাল জিলা স্কুল-এর প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াত হয়ে সর্বশেষ বিএনপির ছায়াতলে যাওয়ার অভিযোগে তাকে ঘিরে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। দলবদলের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, গত সতেরো বছর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি নিজেকে শেখ মুজিবুর রহমান-এর আদর্শের সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একাধিক বই রচনা করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি প্রকাশ্যে নিজেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বরিশাল সদর পাঁচ আসনে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার-এর বাসভবনে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে গেলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সরকারি প্রটোকল ভঙ্গের অভিযোগ বরিশালে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নবনির্বাচিত এমপিকে এভাবে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা জানাননি। অভিজ্ঞ মহলের মতে, শপথ গ্রহণের আগে এ ধরনের শুভেচ্ছা প্রটোকলবিরোধী। সমালোচকদের অভিযোগ, আগেভাগেই রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন নুরুল ইসলাম। অতীতের বিতর্ক বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জিলা স্কুল মাঠে বিএনপির সমাবেশ ঠেকাতে তিনি কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট অভিযোগটি করা হয়েছিল বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানা-য়। যদিও নুরুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, তিনি কখনো বিএনপির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষিত আছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। দুর্নীতি ও বদলির ইতিহাস স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে নিজেকে বঙ্গবন্ধুর অনুসারী পরিচয় দিয়ে বরিশাল জিলা স্কুলে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। পরবর্তীতে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে বদলি করে পাঠানো হয় ঝালকাঠি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়-এ। সেখানেও অনিয়ম ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুনরায় বরিশাল জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। জামায়াত ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ‘রেটিনা কোচিং সেন্টার’-কে জিলা স্কুলের কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দেন পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। বিষয়টি নিয়ে তখন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিএনপি নেতার বক্তব্য এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, “স্বৈরাচারি আমলে সুযোগ-সুবিধা নেওয়া কেউ যদি খোলস পাল্টে অবৈধ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে। এরা শিক্ষক রূপে ব্যবসার ধান্দা করে, না হলে সবসময় ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয় খুঁজত না।” আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতা, জামায়াত সমর্থন এবং সর্বশেষ বিএনপি নেতাকে ফুলেল শুভেচ্ছা—এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগে নুরুল ইসলাম এখন বরিশাল নগরীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার সুস্পষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সময়ে প্রশাসনিক ও শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা। কে এই বিতর্কিত প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বরিশালের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন বহুল সমালোচিত ও বিতর্কিত শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে জড়িত এই শিক্ষকের নিয়োগে শিক্ষার্থী-অভিভাবক মহলে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নারী কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির অভিযোগ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পরিবর্তে তিনি সবসময় সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ বাণিজ্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে তৎপর ছিলেন। ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় আলোচিত হয়ে পড়েন তিনি। এমনকি এক অভিজাত হোটেলে নারীসহ ধরা পড়ার ঘটনাও তাকে বদলির মুখে ঠেলে দেয়। ক্ষমতার প্রভাব খাটানো বিভিন্ন সময়ে তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় টিকে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, মাদারীপুরে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান ও ঝালকাঠিতে আমির হোসেন আমুর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নানা অনিয়ম আড়াল করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বই লিখে তিনি ‘মুজিববাদী প্রচারক’ হিসেবে পরিচিতি নিলেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ঘরানার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বরিশাল জিলা স্কুলে যোগদানের পরপরই তিনি তিনটি ক্লাস বন্ধ রেখে রোদে দাঁড় করিয়ে সংবর্ধনা নেন। অডিটরিয়াম থাকা সত্ত্বেও এমন আয়োজন করায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। এর আগে ঝালকাঠিতেও একইভাবে শিক্ষার্থীদের দিয়ে সংবর্ধনা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বরিশাল জিলা স্কুলে ছাত্রদের কাছ থেকে আইসিটি বাবদ মাসিক টাকা নেওয়ার পাশাপাশি এককালীন অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও স্কুল উন্নয়নের নামে ভুয়া বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার প্রমাণ মিলেছে। নিয়োগ পরীক্ষার সম্মানী আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার তৈরিসহ নানা অভিযোগে বারবার সমালোচিত হয়েছেন তিনি। আন্দোলন দমনে ভূমিকা ২০২৪ সালের আগস্টে যখন দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন চলছিল, তখন ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনরত নুরুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশ নিতে না দিতে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে জোর করে বিদ্যালয়ে আটকে রাখেন। সমালোচনার ঝড় বিগত আওয়ামী সরকারের দালাল খ্যাত নুরুল ইসলাম দলীয় প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিয়ম-নীতির কোনরুপ তোয়াক্কা না করে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খান এর সাথে গোপনে স্ব-পরিবারে হজ পালন করেন। এমনকি দেশের বাইরে অবস্থানকালীন সময়ে অর্ধ বেতন এর নিয়ম-নীতিকে লঙ্ঘন করে তুলেছেন পুরো মাসের বেতন। সরকারের অনুমতি ছাড়া হজ পালন করার বিষয়ে ইসলামের ধর্মীয় ব্যাখ্যা জানতে চাইলে জিলা স্কুলের পেশ ইমাম ও খতিব মুফতি আব্দুল কাদের কাশেমী বলেন, সরকারি চাকুরীজীবিরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিত হজ পালন করলে স্পষ্টতই গুনাহের কাজে শামিল হবেন। এমনকি হজের তথ্য গোপন করে বেতন-ভাতা উত্তোলন করলে সেই টাকাও হারাম বলে গন্য হবে। এদিকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর দূর্নীর্তির তথ্য রয়েছে নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বিনা টেন্ডারে বিক্রি করেছেন স্কুল কম্পাউন্ডের শতবর্ষী গাছ। এছাড়াও দেড় লক্ষ টাকার কম্পউিটার, অত্যাধুনিক টেলিভিশন আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নুরুল ইসলাম বলেন, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের সাথে দলীয় কার্যক্রমে অংশ গ্রহন করতে হয়। এছাড়া কতিপয় মানুষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে। উল্লেখ্য, জিলা স্কুলের নতুন ছয়তলা ভবন করার জন্য সীমানা নির্ধারনী সভা হয়। ওই সভায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনিতা রানি হালদার, সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুর রব, মিজানুর রহমান খান ও সিনিয়র শিক্ষক ফারুক আলম অভিযোগ করেন সাবেক প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম স্কুল কম্পাউন্ডের পিছনের শতবর্ষী ৩ টি রেইনট্রি গাছ বিনা টেন্ডারে বিক্রি করেন। জানা গেছে, ২০২৩ সালে রমজান মাসের ছুটি চলাকালীন সময়ে এক লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় ওই গাছ তিনটি বিক্রি করে দেন। এ বিষয়ে স্কুলের অফিস সহায়ক (নৈশ প্রহরী/দাড়োয়ান) আঃ জব্বার জানান, প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের সময়ে গাছগুলো কাঁটা হয়েছে। শুনেছি টেন্ডার ছাড়াই গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ২০২২ সালের জুলাই মাসে স্কুলের ফান্ড থেকে লাখ টাকা মূল্যের স্যামসাং ব্রান্ডের একটি টেলিভিশন ক্রয় করার কিছুদিন পর মেরামতের কথা বলে টিভিটি বাসায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্কুল থেকে বদলি হয়ে গেলেও টিভি আর ফেরত দেয়নি তিনি। এছাড়াও স্কুলের ফান্ড থেকে ১টি ল্যাপটপ কম্পিউটার, ১টি ডেক্সটপ কম্পিউটার ও একটি প্রিন্টার মোট একলাখ বায়ান্ন হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করে কিন্তু ল্যাপটপ ও ডেক্সটপ কম্পিউটার দুইটি আর স্কুলে জমা দেয়নি নুরুল ইসলাম। অন্যদিকে স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিফিন বাবদ খরচেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টিফিনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে কম দামে টিফিন সরবরাহ করা হতো এবং মাস শেষে নিজের ইচ্ছামত বাড়িয়ে টিফিনের বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাত করারও অভিযোগ রয়েছে। প্রসঙ্গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ঝালকাঠি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল তাকে। এর আগে ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখানেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি নারী কেলেঙ্কারির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ঝালকাঠীর এক অভিজাত হোটেলে নারীসহ ধরা পড়লে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পালিয়ে এসে বরিশাল জেলা শিক্ষা অফিসে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। পরে তাকে বরগুনা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু বরগুনাতেও তিনি একই ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে তাকে দুই দিন অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হয়েছিল। বরগুনাতে নানা অঘটনের জন্ম দিয়ে কয়েক মাস পরই বদলি হন মাদারীপুর ইউনাইটেড সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। মাদারীপুরে অবস্থানকালে, নুরুল ইসলামের দুর্নীতি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা শাজাহান খানের সাথে পারিবারিক সখ্যতা গড়ে তুলে নাম ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন। তবে তার এই অনিয়ম ও দুর্নীতি স্থানীয় জনগণের চোখ এড়াতে পারেনি। তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে তাকে বরিশালে বদলি করা হয়। এরপর ২০২১ সালে বরিশাল জিলা স্কুলে যোগদান করেন। বরিশাল জিলা স্কুলে যোগদানের পর সুচতুর নুরুল ইসলাম সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ও সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর জাহিদ ফারুকের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। এরপরই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নানা অনিয়য়ে জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষকসহ সিন্ডিকেট করে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু করেন। স্কুলের ছাত্রদের কাছ থেকে প্রতি মাসে আইসিটি বাবদ ২০ টাকা করে আদায় করার পরেও এককালীন ছাত্র প্রতি ২৪০ টাকা আদায় করতেন যা সম্পূর্ণরূপে আইন পরিপন্থী এবং এই টাকার হিসাব কোন শিক্ষকই তখন জানতেন না। এছাড়াও ভুয়া বিল করে স্কুলের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন ফান্ডের লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাত করেছেন তিনি। সরকারি বিধি অনুযায়ী খরচ করার বিধান থাকলেও তিনি ওই বিধানের তোয়াক্কা না করে লোক দেখানো কিছু কাজ করে বেশিরভাগ টাকা পকেটস্থ করেছিলেন এবং শিক্ষকদের জোরপূর্বক ভাউচারে স্বাক্ষর নিয়েছিলেন। স্কুলের ক্রীড়া ফান্ড থেকে নিজের ও পরিবারের জন্য মোটা অংকের টাকাও হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এমনকি বেসরকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের কারনে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ২০২৩ সালের মাসে বরিশাল-২ আসনের (উজিরপুর-বানারীপাড়া) সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহে আলম তালুকদারের নির্দেশে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত রাখায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন তিনি। যা বিভিন্ন পত্রিকায় খবরের শিরোনাম হয়েছিল। এছাড়াও বেসরকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অসংখ্য অভিযোগও রয়েছে নুরুল ইসলমের বিরদ্ধে । এছাড়াও স্কুলে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বেসরকারী স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী না রেখে তাদের সম্মানী নিজেই আত্মসাত করতেন। এসব অপকর্ম আড়াল করতে নিজের ফেসবুক আইডিতে হরহামেসাই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের গুনকীর্তন চালিয়ে যেতেন এই শিক্ষক। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নামে কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালে ‘চেনায় মুক্তিযুদ্ধ অন্তরে বঙ্গবন্ধু’ ও ‘মার্চের চেতনা জন্ম-ভাসন স্বধীনতা’ নামে দুটি বই লিখে বরিশাল জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাদারীপুর ইউনাইটেড সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে নিজ খরচায় শেখ মুজিবের মুরাল নির্মান করেন। এছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকায় ৭ মার্চের ভাষন, ১৫ আগষ্ট, শেখ মুজিবের জন্মদিনে নিয়মীত কলামও লিখেতেন এই শিক্ষক। শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলছেন, দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত একজন শিক্ষককে বরিশাল জিলা স্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক করা দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তার পদোন্নতি ও পুনঃনিয়োগ নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে। শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি বরিশাল জিলা স্কুলের মূল ফটকে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম কারো সাথে আলোচনা না করেই ওই ছবির ওপরে নিজের স্বাক্ষর দিয়ে রেখেছেন। এর বিরোধিতা করলে তিনি সকলের সাথে খারাপ আচরন করেছেন।বঙ্গবন্ধুর ছবিতে সই করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জিলা স্কুলে আমিই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়েছি। এজন্য বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে একটি সই করেছি।
বরিশালের পরিবহন সেক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও, চাঁদাবাজির দৃশ্যপট অপরিবর্তিত। দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নথুল্লাবাদ ও রুপাতলী বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন ঘাট এখন স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কবজায়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন এসব খাত থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। নথুল্লাবাদে মোশাররফ গ্রুপের রাজত্ব দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদ এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন বরিশাল সদর -৫ আসনের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ারের ভাই মোশাররফ হোসেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন কয়েকশো বাস থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। মোশাররফ হোসেন অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি নিয়ম মেনেই কমিটির সদস্য হয়েছেন এবং কোনো চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত নন। তবু সাধারণ মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। রুপাতলীতে জিয়াউদ্দিন সিকদারের বলয় মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার রুপাতলী বাসস্ট্যান্ডের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ আছে, তিন বছরের মেয়াদি কমিটি ভেঙে তিনি নিজের পছন্দের লোক দিয়ে নতুন বলয় গঠন করেছেন। এখান থেকে প্রতিদিন অর্ধ লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় হয়। মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাছরিনও অভিযোগ করেছেন, জিয়াউদ্দিন সিকদার পোর্ট রোড ও স্পিড বোট ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে দখল বাণিজ্য চালাচ্ছেন। শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ দলের শীর্ষ নেতাদের দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির কারণে বিএনপির সাধারণ কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র। তারা মনে করছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালীরা তা তোয়াক্কা করছেন না। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে দলের ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছে। মালিক সমিতির অবস্থান মালিক সমিতির সভাপতি জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, “টার্মিনালে যারা কাজ করে, যেমন কাউন্টার কর্মচারী, বাসের সিরিয়াল ঠিক রাখাসহ অন্যান্য স্টাফদের বেতন দেওয়ার জন্য মালিকরা নির্দিষ্ট অর্থ দেন। তার সব হিসাব অফিসেই আছে। এর বাইরে যদি কেউ প্রমাণ দিতে পারে যে অবৈধভাবে চাঁদা নেওয়া হয়েছে, আমি পদত্যাগ করব।” অব্যাহত চাঁদাবাজি স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দুই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন চাঁদা বাবদ প্রায় দুই লাখ টাকা আদায় হয়। এছাড়া পর্দার আড়ালে বিভিন্ন পদ্ধতিতে চাঁদাবাজি চলছেই। এর পরিমাণ বছরে কোটি টাকারও বেশি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন, “সরকার বদলায়, ক্ষমতার হাতবদল হয়, কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্য বদলায় না। শুধু চাঁদা আদায়ের মুখগুলো পরিবর্তিত হয়।” এই অব্যাহত চক্র সাধারণ মানুষ ও বাসযাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। কেউ কেউ বলছেন, সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই অবৈধ অর্থের চক্র বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ-এর স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে বড় ধরনের দুর্যোগের মুখে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, জনবল সংকট ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দুর্নীতির অভিযোগ: কেনাকাটা থেকে পদোন্নতি স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে কেনাকাটা, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে—এমন অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। তাদের দাবি, বিগত সময়ে এসব ক্ষেত্রে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে খালি বাক্সের বিপরীতেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কেনা যন্ত্রপাতির বড় অংশ স্টোরে বাক্সবন্দি পড়ে আছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব অনিয়মের সুবিধাভোগী হয়েছেন বলে দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত সরকার, বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমানে ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারে এলে এই সংকট মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সরকারি সেবায় সীমিত কাভারেজ, বেসরকারিতে নির্ভরতা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ সরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পান। বাকি ৮৫ শতাংশ মানুষকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে সেবা নিতে হয়। চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পকেট থেকে খরচের হার বাংলাদেশে প্রায় ৭৪ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ভুটানে ১৩ শতাংশ, ভারতে ৬৩ শতাংশ, মালদ্বীপে ২১ শতাংশ, নেপালে ৫১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৫১ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জনবল সংকট ও বৈষম্যপূর্ণ বণ্টন কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ডা. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য মানুষের আয়ু ও কর্মক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবে সেবার মান ও কাভারেজ—দুটিই সন্তোষজনক নয়। তার ভাষায়, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই, আর যাঁরা আছেন তাঁদের বণ্টন অসম। অধিকাংশ চিকিৎসক শহরকেন্দ্রিক; গ্রামে গেলেও অনেক সময় থাকেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট—অপথালমোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, নেফ্রোলজিস্ট ও ডায়াবেটোলজিস্টের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, বিশেষ করে পেরিফেরি পর্যায়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম এলাকায় ডাক্তার-নার্স রাখতে হলে ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ভাতা দিতে হবে। WHO মানদণ্ডে ঘাটতি World Health Organization (WHO)-এর সুপারিশ অনুযায়ী ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিকের অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩:৫। বর্তমানে দেশে প্রায় ৯০ হাজার চিকিৎসক থাকলেও নার্স রয়েছেন প্রায় ১ লাখ। অথচ এই সংখ্যায় নার্স থাকার কথা ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার এবং প্যারামেডিক সাড়ে ৪ লাখ। সরকারি হিসাবে প্যারামেডিক রয়েছেন মাত্র ২০ হাজার। ডাক্তারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং নার্স ও প্যারামেডিকের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য। এসব পদ দ্রুত পূরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করলে সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি পর্যায়ে চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মেডিকেল শিক্ষার মান তলানিতে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, মেডিকেল শিক্ষা হচ্ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু এই ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে গেছে। মানহীন ডাক্তার, নার্স ও টেকনোলজিস্ট তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতে বড় সংকট ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার করতে হলে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন আনতে হবে। বাজেট সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৭৪ শতাংশ, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৫ শতাংশ। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দ কম এবং তার একটি বড় অংশ দুর্নীতিতে নষ্ট হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার মান নিম্নমুখী। করণীয়: সমন্বিত পরিকল্পনা ও রোগপ্রতিরোধে গুরুত্ব জনস্বাস্থ্যবিদ রাশেদ রাব্বি বলেন, দেশের জনসংখ্যা, ঘনবসতি ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। চিকিৎসার চেয়ে রোগপ্রতিরোধ ও সুস্থতা নিশ্চিতকরণে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— দলীয় বিবেচনা বাদ দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি প্রাথমিক থেকে টারশিয়ারি পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেবার মূল্য নির্ধারণ ও মান নিয়ন্ত্রণ পৃথক স্বাস্থ্য প্রশাসন ও বেতন কাঠামো সময়োপযোগী ও জনমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছরে স্বাস্থ্যখাতে যে লুটপাট ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না করলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন বড় ধরনের ধাক্কার মুখে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, দক্ষ জনবল নিয়োগ, বাজেট বৃদ্ধি, প্রাথমিক সেবা জোরদার এবং স্বাস্থ্যনীতি সংস্কার—সব ক্ষেত্রেই একযোগে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় স্বাস্থ্যখাতের এই সংকট আরও গভীর হয়ে বৃহত্তর মানবিক দুর্যোগে রূপ নিতে পারে।
বরিশাল, ১৯ ফেব্রুয়ারি: বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নে দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী নামের এক বিএনপি কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার রাতে স্থানীয় বৌসেরহাট বাজারের অদূরে বাদামতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর বিমানবন্দর থানা পুলিশ রাতেই লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী বৌসেরহাট বাজারে ইজারা উত্তোলনের কাজ করতেন। তারাবির নামাজ চলাকালে তিনি বাইসাইকেলে করে বাসায় ফিরছিলেন। পথে বাদামতলা এলাকায় পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। পরে তার মরদেহ রাস্তার পাশে হাঁটুসমান পানিতে ফেলে রেখে যায়। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মরদেহের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। রাত ১টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) মর্গে পাঠায়। এদিকে, রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়ন বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন চৌধুরী ও তার ছোট ভাই কবির চৌধুরীর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। জমি সংক্রান্ত সেই বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে তাদের দাবি। ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আজাদী হাসানাত ফিরোজ বলেন, “দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে চাচাতো ভাইয়ের সন্তান আওয়ামী লীগ নেতা জাকির চৌধুরীর জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই বিরোধের জেরেই তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।” তবে এ হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত—তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে থানা কর্তৃপক্ষ। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), সিআইডি এবং বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের শিবপাশা গ্রামের বাদামতলা এলাকায় বসুরহাট-কাশিপুর বাজার সড়কের উত্তর পাশে একটি গোলপাতার ক্ষেতে বৃদ্ধ দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, দুর্বৃত্তরা বৃদ্ধের মাথার বাম পাশে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। পরে সুরতহাল শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীরা।
দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-৩ আসন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা দলটির দখলেই ছিল আসনটি। কখনও কোনো নির্বাচনে এখানে জয় পায়নি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ইতিহাস বদলে গেছে। এই প্রথমবারের মতো আসনটি দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি সমর্থিত জোট। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও জোট প্রার্থী নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। যদিও তিনি সরাসরি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেননি, তবুও জোট সমঝোতার মাধ্যমে আসনটি বিএনপির ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটের ফলাফল এবারের নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে ৯৬ হাজার ৭৬৬ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। ঘোড়া প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৭৬ ভোট। আসনটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অতীত নির্বাচনের ইতিহাস পটুয়াখালী-৩ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আনওয়ার হোসেন হাওলাদার এবং ১৯৮৮ সালে একই দল থেকে মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে একে এম জাহাঙ্গীর হোসাইন বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন গোলাম মাওলা রনি। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন এস এম শাহজাদা। তবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি থেকে শাহজাহান খান জয়ী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচন আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই আসনে এবার পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় ইস্যু, জোট সমঝোতা এবং তরুণ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নুরুল হক নুরের বিজয়ের মাধ্যমে শুধু একটি আসন পরিবর্তন হয়নি, বরং দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনের এ ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে বিএনপি সমর্থিত জোটের এই বিজয় আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশলে প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এরশাদের পতনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় অনুষ্ঠিত প্রায় সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন। তবে সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না দলটি। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে দলীয় প্রতীক নৌকাও বাতিল করা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে— নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকলে তাদের বিপুল ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে এবং এর প্রভাবই বা কতটা পড়বে ফলাফলে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দলগুলোর চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে দলটির কার্যক্রম স্থগিত এবং একই দিনে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক পথ বন্ধ হয়ে যায়। ‘ভোট নেই, ব্যালট নেই’— শেখ হাসিনার নির্দেশ ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠকে নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে নিরুৎসাহিত করেছেন। পাশাপাশি ‘ব্যালট নেই, ভোট নেই’— এই বার্তা সাধারণ ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেন তিনি। তার মতে, নৌকা প্রতীক ছাড়া ভোটে অংশ নেওয়া মানেই অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া। ভোটের সমীকরণ ও রাজনৈতিক কৌশল নৌকা প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টানতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল নানা কৌশল নিচ্ছে। কেউ নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে, কেউ সহানুভূতির ভাষায় কথা বলছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পাশে দাঁড়ানো তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের নেতারাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্যের পেছনে মূলত ভোটের অঙ্কই কাজ করছে। জরিপে কী উঠে এসেছে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে— আগে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাদের ৪৮.২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দিতে চান নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭.৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ২৭ শতাংশ বিএনপি, ১৭ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন ১৮.৬ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন এই জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটার অংশ নেন। বিশ্লেষকদের মত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। যারা যাবেন, তাদের ভোট বিভক্ত হতে পারে— কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াত কিংবা অন্য প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে পারেন। সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দনের মতে, আওয়ামী লীগের একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনে প্রভাব পড়বে কি? রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকলেও নির্বাচন স্বাভাবিক হবে। আবার কেউ মনে করছেন, দলটির অনুপস্থিতি ভোটের চরিত্র বদলে দিতে পারে। বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ভীতি না থাকলে আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক ভোট দিতে যাবেন। অন্যদিকে জামায়াত নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকলেও ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। সব মিলিয়ে, নৌকাবিহীন এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে— সেটিই এখন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
বরিশালে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর যেন পাহাড়সম ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি)। পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে অতীতে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর এই চটে থাকা বলে জানা গেছে। বর্তমানে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় 'নির্বাচনী কার্ড' ইস্যু করাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। কার্ড ইস্যু নিয়ে চলছে টালবাহানা ভুক্তভোগী সংবাদকর্মীদের দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরেও কার্ড দিতে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে। মূলত ডিসির ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেই মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বরিশালের সাংবাদিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রভাব পেশাগত কাজে উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে এই জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়। সেই থেকে সাংবাদিকদের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ, এখন সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার হরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিশেষে বলা যায়, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ কাম্য নয়। নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক লিখেছেন, বৌ পেটানো নিউজ করার মাসুল দিচ্ছে বরিশালের সাংবাদিকরা। আরেক সাংবাদিক প্রশাসনের এই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে লিখেছেন, ডিসি তার ক্ষমতা দেখাইছে, এখন আমাদের বরিশালের সাংবাদিকদের উচিত সবাই এক হয়ে ক্ষমতা দেখানো। কার পাশা যাবে কার টেবিলে, খেলা যে চলছে কোন লেভেলের! নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্ড একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি। কিন্তু কার্ড পেতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, সঠিক কারণ ছাড়াই আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বরিশালের সংবাদকর্মী মহলে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন ‘ব্যক্তিগত রোষ’ এবং ‘ক্ষমতার দাপট’ রুখতে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো কঠোর কর্মসূচির কথা ভাবছে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অবিলম্বে সাংবাদিকদের কার্ড প্রদানের দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। কে এই ডিসি খাইরুল আলম সুমন যৌতুক সংক্রান্ত মামলায় কারাবাসের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে বিস্ময় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বরিশালের ডিসি খায়রুল আলম সুমন ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা, ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমিসংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করা—যেখানে ব্যক্তিগত সুনাম ও নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, যাদের ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, এমন কর্মকর্তাকে ডিসি পদে বসানো ইমেজ ও আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে। আদালত ও মামলার তথ্য সূত্র অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ওই মামলায় খায়রুল আলম সুমন ও তার মা খোদেজা বেগমকে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার এসআই শাহ আলম আদালতে তাদের হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন—উভয় আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবাসে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৫ জুন বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ রাতে ঢাকার ওয়ারী এলাকায় খায়রুলের বাসায় তার মায়ের মাধ্যমে গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হয় এবং এ সময় খায়রুল আলম সুমন ভুক্তভোগীর হাত চেপে ধরেন। পরদিন ওয়ারী থানায় মামলা করা হয়। বিভাগীয় মামলা ও পদোন্নতি স্ত্রীর করা মামলার পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ দেওয়া হলে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এর ফলে নিয়মিত পদোন্নতি ব্যাহত হয় বলে জানা গেছে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উপসচিব পদে তার পদোন্নতির আদেশ জারি হলেও সেখানে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ (ব্যাকডেটেড) পদোন্নতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজেকে পদোন্নতিতে বঞ্চিত দাবি করে তিনি ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিসির বক্তব্য খায়রুল আলম সুমনের ‘ব্যক্তিগত ডাটা শিটে’ (পিডিএস) বর্তমানে তাকে ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খায়রুল আলম সুমন বলেন, “এসব আমার ব্যক্তিগত তথ্য। আমার নামে বিভাগীয় মামলা ছিল—সবই কর্তৃপক্ষ জানে এবং জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মত জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা প্রশাসক পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়—এটি নৈতিক নেতৃত্বেরও প্রতীক। একজন ডিসির ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ থাকলে জেলার আইনশৃঙ্খলা ও ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশ্ন ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাদের ভাষ্য, “ডিসির সুনামটাই সবচেয়ে জরুরি।” সূত্র জানায়, খায়রুল আলম সুমন প্রবেশনার হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাকরি শুরু করেন। সে সময়ের ডিসি মো. আবদুল মান্নানের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম ডিসি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নাঙ্গলকোট, নিকলি ও বাজিতপুরে এসিল্যান্ড এবং ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশালের ডিসি হিসেবে তার নিয়োগ প্রশাসনে নৈতিকতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও অবস্থান প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।