ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: “আর পারা যাচ্ছে না। বাজারে শাক-সবজি থেকে শুরু করে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বাসভাড়া, ঘরভাড়া—সবকিছু যেভাবে বাড়ছে, তাতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।” ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যমসারির কর্মকর্তা আতিকুর রহমানের কথায় ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের বহু পরিবারের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা। তার ভাষ্য, কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তার তুলনায় আয় বেড়েছে সামান্যই। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে আগের সঞ্চয়ও প্রায় শেষের দিকে। “বেতনের টাকা দিয়ে মাস পার হচ্ছে না। এভাবে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার কীভাবে চালাব, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে দেব—সেটাই ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছি না,” বলেন তিনি। আতিকুরের এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এখন মিলছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক চিত্রও। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। শুধু গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। আর যারা এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রয়েছেন, তাদের মধ্যেও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন—একসময় দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে ‘বিশ্বের মডেল’ হিসেবে প্রশংসিত বাংলাদেশ আবার কোন পথে হাঁটছে? দারিদ্র্য কমার গল্প থেকে উল্টো পথে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সত্তরের দশকে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। এরপর সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে দারিদ্র্যের হার কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ দশকের মধ্যে দারিদ্র্যের হার কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বিশ্বের ‘মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল বিশ্বব্যাংক। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে দারিদ্র্যের হার আরও কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ানোর তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তখন দারিদ্র্য বিমোচনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাও জানিয়েছিলেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা। কিন্তু এরপর পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মোট দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, বর্তমানে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি বলে অনুমান করছে বিশ্বব্যাংক। কেন এই বিপরীত যাত্রা? বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব; উচ্চ মূল্যস্ফীতি; জ্বালানি সংকট; দুর্বল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান; রাজনৈতিক অস্থিরতা; করব্যবস্থার দুর্বলতা; সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যভিত্তিকতা না থাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মতো বিষয়গুলোও—যেগুলো অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে বলে অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য। প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থানও সংকটে করোনা মহামারির সময় অর্থনীতির বড় একটি অংশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। শিল্প-কারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় বহু মানুষ চাকরি হারান। কিছু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, মহামারির সময় যারা চাকরি হারিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই পরে আনুষ্ঠানিক খাতে আর ফিরতে পারেননি। সরকার তখন আশা করেছিল, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বরং লাগাতার অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের অভিযোগে ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফাহমিদা খাতুন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ, অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে আগের মতো প্রভাব ফেলছে না—এমন একটি বাস্তবতা সামনে এসেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে নাজুকতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব বিনিয়োগ পরিবেশেও পড়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনেকে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, একদিকে বিনিয়োগ কমছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায়। মূল্যস্ফীতি: আয় বাড়ার আগেই খরচ বাড়ছে বাংলাদেশে টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত দুই বছরে কিছুটা কমে মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ালেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটিকে এখনো সহনীয় পর্যায় বলা যায় না। সমস্যাটি শুধু মূল্যস্ফীতির হারেই নয়; দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। করোনার সময়ে চাকরি হারানো বা আয় কমে যাওয়ার পর অনেক পরিবার যখন আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ে। ঢাকার এক বাসিন্দা জানান, সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাকে জমি-জমাসহ মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে। “জায়গা-জমি বিক্রি করে কয়দিন চলা যায়? এখন প্রত্যেক মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকার বেশি দেনা থাকি,” বলেন তিনি। খুলনার বাসিন্দা বিলকিস আকতারও বলছেন একই ধরনের কথা। “সঞ্চয় রাখব কীভাবে? সংসার চালাতেই তো হিমশিম খাচ্ছি।” এ ধরনের পরিস্থিতিতে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালানো, সম্পদ বিক্রি কিংবা ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া—দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সবচেয়ে বড় সংকট: দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না সহায়তা বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সামাজিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে। সংস্থাটির হিসাবে, দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। অন্যদিকে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যে প্রায় ৩৮ শতাংশ এসব কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন, তারাও ধনীদের তুলনায় কম সুবিধা পাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সমাজের নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী মানুষরা বছরে গড়ে ১০ হাজার ৪৭২ টাকা সুবিধা পাচ্ছেন। এখানেই সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার লক্ষ্যভিত্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। ভর্তুকির সুফল কারা বেশি পাচ্ছে? বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্যের কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের সঙ্গে ভর্তুকির সুবিধা বাড়ে। ফলে যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ভর্তুকি পান। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সমাজের ওপরের ২০ শতাংশ ধনী মানুষের জন্য বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কর্মসূচি নেওয়া হলে এর সুফল বেশি কার্যকরভাবে তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। করব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় সমস্যা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের করব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। দুর্বল কর প্রশাসন এবং কর পরিপালনের হার কম থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ শতাংশ থেকে আনুমানিক ৮ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। রাজস্ব আয় কম হলে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়ানোর সক্ষমতাও সীমিত থাকে। এ কারণে করনীতি নির্ধারণ ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার পাশাপাশি অধিকতর ডিজিটাল ব্যবস্থা, করদাতাদের সমন্বিত ডেটাবেস এবং শনাক্তকরণ নম্বর চালুর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। ফ্যামিলি কার্ড কি ঘুরিয়ে দিতে পারবে পরিস্থিতি? দারিদ্র্য মোকাবিলায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। বিশ্বব্যাংকের মতে, যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মার হিসাবে, বিদ্যমান পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবেন। তবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে কার্ড দেওয়া গেলে বছরে প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন বলে মনে করছে সংস্থাটি। অর্থাৎ, কর্মসূচি থাকা যথেষ্ট নয়—কারা প্রকৃত সুবিধাভোগী, সেটি সঠিকভাবে শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের বক্তব্য কী? সরকার বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের বড় একটি অংশ তারা আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে’ পেয়েছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সমস্যাগুলো বহিঃস্থ কারণ অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। তার ভাষায়, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কারসংক্রান্ত সুপারিশগুলোও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাহলে সামনে পথ কোনটি? বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমানোর গত কয়েক দশকের সাফল্য ছিল ধারাবাহিক। কিন্তু সাম্প্রতিক হিসাব সেই ধারায় বড় ধরনের ছেদ দেখাচ্ছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল। জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি করছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতির ভিত দুর্বল করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে লক্ষ্যভিত্তিকতার ঘাটতি। ফলে দারিদ্র্য কমানোর বদলে আবারও মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো—শুধু ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে দরিদ্র নয়; নিম্ন মধ্যবিত্তের আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। অর্থাৎ, এটি কেবল দরিদ্র মানুষের সমস্যা নয়। অর্থনীতির একটি বড় অংশের মানুষের জীবনযাত্রা এখন এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে, যেখানে আয় সামান্য কমে যাওয়া কিংবা ব্যয় সামান্য বেড়ে যাওয়াই একটি পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশ যে একসময় দারিদ্র্য বিমোচনের ‘মডেল’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল, সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাড়ানো নয়—কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, করব্যবস্থার সংস্কার এবং দরিদ্র মানুষের কাছে সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া—এই পাঁচটি জায়গায় একসঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বাসস: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশে জুলাই আগস্ট মাসে যে আন্দোলন হয়েছিল তা সম্পূর্ণভাবে ছিল জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে। জনগণ যখন সম্পূর্ণভাবে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছে, তখনই আন্দোলন সফল হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের অবস্থান থেকে পরিষ্কারভাবে সাফ বলে দিয়েছি এই জুলাই আন্দোলনের সফলতার ক্রেডিট এই দেশের সর্বস্তরের জনগণের। এর কৃতিত্ব কোন একক ব্যক্তি, একক কোন রাজনৈতিক দলের এটি কোন ক্রেডিট নয়। বিগত ১৭ বছর এই দেশের মানুষ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মী, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আরও অনেকগুলো রাজনৈতিক দল সবাই ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল। মাঠ ছেড়ে আমরা কখনো চলে যাইনি। আমরা কখনোই জনগণকে একা ফেলে মাঠ ছেড়ে চলে যাইনি।’ আজ মঙ্গলবার বিকেলে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ-এ (কেআইবি) ‘গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের অনিবার সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম কথা হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে- এখন সময় হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন করার। এখন সময় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এখন সময় হচ্ছে যারা ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের ব্যাপারে ধৈর্য সহকারে ঠান্ডা মাথায় তাদের ষড়যন্ত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। জনগণকে সতর্ক করা এবং ঠিক একইভাবে আমরা যেই পরিকল্পনা জনগণের সামনে দিয়েছি, আমরা জনগণের জন্য যা করতে চাইছি, দেশকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা যা করতে চাইছি, সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা। জনগণের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করা।’ বিএনপি জনগণের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা নিয়ে এগিয়ে চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপিই প্রথম দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশের মানুষের সামনে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেছিল, যা পরবর্তীতে রাজপথের মিত্র দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ৩১ দফায় রূপ নেয়। গত সাধারণ নির্বাচনে দেশের জনগণ এই ৩১ দফায় পূর্ণ আস্থা ও ম্যান্ডেট দিয়েছে। ফলে এটি আর কেবল বিএনপির একক রূপরেখা নয়, বরং এটি দেশের সমগ্র জনগণের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে।’ সরকার পরিচালনার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ’১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখা গেছে স্বৈরাচারী শাসনামলের বিগত ১৭ বছরে দেশের প্রতিটি খাতকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছিল। বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বিভাজিত প্রশাসনের মধ্য দিয়েই বর্তমান সরকার কাজ শুরু করেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার তাতক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখনো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।’ জ্বালানি সংকটের সাময়িক কষ্ট স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার ‘পেট্রোনাস’ কোম্পানির সাথে আলোচনা চুড়ান্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কনটেইনারের মাধ্যমে এলএনজি গ্যাস দেশে আনা হবে। এর ফলে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করে দ্রুততম সময়ে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশীয় শক্তি বৃদ্ধি করতে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অকার্যকর রাখা ‘বাপেক্স’-কে পুনরুজ্জীবিত করে দুটি নতুন রিগ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে বিশাল এলাকায় নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ চলছে, যেখানে চীনা ও কোরিয়ান বিনিয়োগ আসবে। পাশাপাশি বিটিএমসি-র বন্ধ পড়ে থাকা প্রায় ৫০টি মিল-কারখানা বেসরকারি খাতে চালু করে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ ফান্ড চালু করা হয়েছে।’ স্বাস্থ্যখাতের আমূল পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সকল উপজেলা হাসপাতালে ন্যূনতম ১০ শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট চালু করা হবে। ইতিমধ্যেই জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ডায়ালিসিস সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এছাড়া বাজেটে ডিউটি ও ট্যাক্স কমিয়ে হার্টের রিং (স্টেন্টিং), ডায়ালিসিস, চোখের লেন্স এবং আইটি উপকরণের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা হয়েছে।’ শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শিক্ষা কার্যক্রমকে আনন্দের মাধ্যমে শিখন (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস) ধারণায় ঢেলে সাজাতে চাই। আমাদের সন্তানরা কী চায়, তা বুঝতে হবে এবং তাদের জন্য সঠিক পথ তৈরি করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সর্বদা দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেছেন; সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও জনগণের সেবায় নিবেদিত।’ তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সম্প্রতি প্রাইমারি স্কুল পর্যায়ে ২২ লক্ষ শিশুর ফুটবল প্রতিযোগিতা এবং ১২-১৪ বছর বয়সীদের জন্য নতুন গতি স্পোর্টস প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। তরুণদের মেধা ও শক্তি বিকাশে সঠিক পথ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।’ জনগণের মৌলিক চাহিদার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সাধারণ মানুষ রাজপথে শান্তি চায়, সন্তানের শিক্ষার সুব্যবস্থা চায়, উন্নত চিকিৎসা চায়, নিরাপত্তা চায় এবং নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ চায়। একই সাথে নাগরিকরা সময়মতো তাদের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে চায়। জনগণের এই চাওয়াগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও অসংখ্য অরাজনৈতিক সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকার এবং দলের সাধ্যমতো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছি এবং থাকব।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন তাদের সুচিকিৎসা এবং যাদের কর্মসংস্থান প্রয়োজন তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।’ পরিশেষে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিগত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পাশাপাশি দেশের শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। বিএনপি’র মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টি কাজী জাফর এর সভাপতি মোস্তফা জামান হায়দার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি,গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক নূর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ডক্টর ফরিদুজ্জামান ফরহাদ,জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এর মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন, ভাসানি জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, যুবদল, সেচ্ছাসেবকদল,কৃষকদল ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা বলা হয় তৈরি পোশাক শিল্পকে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু গত কয়েক মাসে গাজীপুর, সাভার ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধ এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত কি গভীর সংকটে পড়েছে? অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতা একমাত্রিক নয়। একদিকে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। অন্যদিকে একই সময়ে নতুন কারখানা চালু হয়েছে, নতুন বিনিয়োগ এসেছে এবং রপ্তানি আয়ও বেড়েছে। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু সংকটের নয়; বরং শিল্পটির কাঠামোগত রূপান্তরও কি ঘটছে? ঈদের পর নতুন করে আলোচনায় কারখানা বন্ধ কোরবানির ঈদের পর পোশাক শিল্পাঞ্চলে ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে এসে তারা জানতে পারেন তাদের চাকরি নেই। অন্যদিকে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক ও কর্মচারী একসঙ্গে কর্মহীন হয়েছেন। শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাকরি হারানোর পর তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সংসার চালানো, সন্তানদের শিক্ষাব্যয় এবং বাসাভাড়া পরিশোধ নিয়ে। তিন বছরে বন্ধ প্রায় ৪০০ কারখানা বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, অনেক কারখানা এখনও আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। কারখানা মালিকদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন কমলেও ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, ভাড়া এবং প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে নিয়মিত। ফলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন কারখানাও আসছে সংকটের এই আলোচনার মাঝেই ভিন্ন এক চিত্র উঠে এসেছে। বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে সংগঠনটির নতুন সদস্য হয়েছে ১২৮টি কারখানা। একই সময়ে বন্ধ হয়েছে ১১৩টি কারখানা। নতুন কারখানাগুলোতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষের। অন্যদিকে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর কারণে চাকরি হারিয়েছেন ৯৬ হাজার ১০৪ শ্রমিক। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের হিসাবে এখনও প্রায় ২২ হাজার মানুষের নিট কর্মসংস্থান ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান আরেকটি বাস্তবতাও তুলে ধরে—শিল্পটি পুরোপুরি সংকুচিত হচ্ছে না; বরং পুরোনো ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানের জায়গায় নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন ধরনের উৎপাদন কাঠামো গড়ে উঠছে। কেন বন্ধ হচ্ছে কারখানা? খাত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে চারটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে। ১. আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্রয়াদেশের প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই। ২. উৎপাদন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ডলারের অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ উৎপাদন ব্যয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ৩. শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি নতুন মজুরি কাঠামো এবং নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট শ্রমিকদের জন্য ইতিবাচক হলেও উৎপাদনশীলতা সমান হারে না বাড়ায় দুর্বল কারখানাগুলো অতিরিক্ত চাপ অনুভব করছে। ৪. ঋণ ও তারল্য সংকট অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে রয়েছে। ফলে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তারা উৎপাদন কমাচ্ছে অথবা পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে। বেক্সিমকো থেকে কেয়া: বড় গ্রুপও চাপের মুখে সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের ২৪টি, কেয়া গ্রুপের ৪টি এবং টিএনজেড গ্রুপের ৪টি প্রতিষ্ঠান। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে বেক্সিমকো শিল্পপার্কের ১৪টি কারখানা বন্ধের ঘটনা। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৩ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে সংকট কেবল ছোট কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকেও আর্থিক ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ কোথায় যাচ্ছে? অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগের ধারা বলছে, উদ্যোক্তারা এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নতুন সদস্য হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে একেএইচ আউটওয়্যার, এজেড কম্পোজিট, নেক্সটন, এলএসএ অ্যাপারেলস, সিটেক ফ্যাশন, সুপ্রিম আউটফিট এবং স্প্যারো গ্রিনটেক। তবে নতুন ১২৮ কারখানার মধ্যে মাত্র ১৮টিতে শ্রমিক সংখ্যা এক হাজারের বেশি। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগের বড় অংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে একই পরিমাণ উৎপাদনের জন্য তুলনামূলক কম শ্রমিকের প্রয়োজন হতে পারে। রপ্তানি আয় কিন্তু বাড়ছে কারখানা বন্ধের খবরের বিপরীতে রপ্তানি আয়ের চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ২৫ কোটি ডলার। এটি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ কর্মসংস্থান ও কারখানা সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা পুরোপুরি কমে যায়নি। ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা: বাস্তবায়ন কোথায়? বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা তারল্য সংকট। তিনি মনে করেন, রুগ্ন ও বন্ধপ্রায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা তহবিল এখনও কার্যকর না হওয়ায় অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তা দেওয়া না হলে আগামী মাসগুলোতে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংকট, নাকি শিল্পের পুনর্গঠন? তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে শ্রমিক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ, ঋণ সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ রয়েছে। অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও দেখা যাচ্ছে। ফলে বিষয়টি শুধু শিল্প সংকটের নয়; বরং শিল্পের পুনর্গঠন এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি পর্যায়ও হতে পারে। তবে এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন শ্রমিকরাই। কারণ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ থাকলেও চাকরি হারানো হাজার হাজার শ্রমিকের জন্য বর্তমান বাস্তবতা হলো অনিশ্চয়তা, আয়হীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শিল্পের এই রূপান্তর কি কর্মসংস্থান রক্ষা করে এগোবে, নাকি আরও হাজারো শ্রমিককে কর্মহীন করে নতুন ভারসাম্য খুঁজবে? সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের আগামী পথচলা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তৃতীয় কর্মদিবসে প্রথমবারের মতো রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস করেছেন তারেক রহমান। এদিন তিনি নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা প্রদানের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সরকারের লক্ষ্য, আসন্ন ঈদের আগেই পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম শুরু করা। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এ তথ্য জানান। ভিআইপি সংস্কৃতি পরিহার করে কার্যালয়ে আগমন ড. মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি পরিহার করে তিনি ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে এবং যানজটে অপেক্ষা করেই অফিসে পৌঁছান। কার্যালয়ে প্রবেশের আগে তিনি একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। বিশেষ করে যারা তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-র সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের নাম ধরে ডেকে কথা বলেন। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী: গঠন হলো টেকনিক্যাল কমিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা প্রদানের বিষয়ে ড. মাহদী আমিন বলেন, খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের আর্থিক সম্মাননা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি টেকনিক্যাল ও আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। কত টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই অর্থের পরিমাণ চূড়ান্ত করা হবে। সরকার আশা করছে, আসন্ন ঈদের আগেই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্থানে সম্মানী প্রদান কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলোচনা সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সংস্কার—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, সারা দেশে মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবরা মতামত দেন। পরিকল্পনা ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বা ডিরেগুলেশন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, দ্রুত সময়ের মধ্যে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। ড. মাহদী আমিন আশাবাদ ব্যক্ত করেন, জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করবে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।