পিরোজপুরে এলজিইডি প্রকল্পে ‘কাজহীন’ ৬ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পরিচালিত হাজার হাজার উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এনেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তার দাবি, জেলার অনুমোদিত ২ হাজার ৪৬০টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৬১০টিতে বাস্তবে কোনো কাজ না করেই প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। টেন্ডার ও বিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শনিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী জানান, অভিযোগগুলোর তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও এক যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন পেয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সরকারি অনুসন্ধানে সাবেক সংসদ সদস্য, এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনা কমিশনের এক সাবেক সচিবসহ একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনিয়মের ধরন ছিল সুসংগঠিত। প্রকল্প অনুমোদনের পর টেন্ডার আহ্বান ও কার্যাদেশ দেওয়া হলেও পরে অনেক ক্ষেত্রেই কোনো নির্মাণকাজ হয়নি। কিন্তু ট্রেজারি থেকে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে পূর্ণাঙ্গ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ঠিকাদাররা টাকা তুলে বিদেশে চলে গেছেন। দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।” ১৮ মাস বন্ধ উন্নয়নকাজ পিরোজপুরে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর উন্নয়নকাজ স্থবির থাকার বিষয়টিকেও “ভয়াবহ” হিসেবে উল্লেখ করেন মীর শাহে আলম। তার মতে, সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, হাটবাজার নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প থেমে যাওয়ায় জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বহু সড়ক অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় স্থানীয় মানুষের চলাচল দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় মৌখিক নির্দেশে অনেক উন্নয়নকাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা ছিল না। ২৪ ঘণ্টায় ডিপিপি অনুমোদনের অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ার অভিযোগ। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিন বছরের প্রকল্পে প্রথম বছরেই পুরো বরাদ্দ তুলে নেওয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ধরনের অভিযোগ সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা, তদারকি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। “ব্রিজ আছে, সংযোগ সড়ক নেই” প্রকল্প পরিকল্পনায় সমন্বয়হীনতার উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ হলেও সেখানে সংযোগ সড়ক তৈরি হয়নি। তিনি ফেনীর ছাগলনাইয়ার একটি সেতুর উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুতে এখনো মানুষ মই ব্যবহার করে ওঠানামা করছে, কারণ সংযোগ সড়কের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তার মতে, এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, পরিকল্পনাগত ব্যর্থতারও প্রতীক। নতুন তদন্ত কমিটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। গত ১২ মে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে কমিটিকে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার প্রকল্প কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হবে। মীর শাহে আলম বলেন, যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাবে, সেখানে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা পাঠানো হবে। সীমিত পরিসরে ফের শুরু হতে পারে কাজ প্রতিমন্ত্রী জানান, পিরোজপুরের তিন সংসদ সদস্য ও এক প্রতিমন্ত্রীর আবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেন। কমিটি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে দুদকের তদন্তাধীন প্রকল্প বাদ দিয়ে অন্যান্য অসমাপ্ত প্রকল্প সীমিত পরিসরে পুনরায় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঈদের পর একটি প্রতিনিধিদল পিরোজপুর সফর করবে এবং সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে উন্নয়নকাজ আংশিকভাবে পুনরায় শুরু করা হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ইজিবাইক নিবন্ধন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন নির্বাচন আগে হবে, তা সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও বাজেট পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। এছাড়া ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অনুরূপ যানবাহন নিবন্ধনের জন্য নতুন আইন আনার কথাও জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বুয়েট অনুমোদিত নকশার যানবাহন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে, যা স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব আয় বাড়াতেও সহায়ক হবে।
মামুনুর রশীদ নোমানী : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পিরোজপুর জেলা কার্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এক বিশাল দুর্নীতি সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে জেলার ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তত ১,৬৪৭ কোটি টাকার অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। এই মহোৎসবের অন্যতম প্রধান কুশীলব হিসেবে নাম এসেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষক আনোয়ারুল ইসলামের । কাগজেই শেষ ১,০০০ প্রকল্পের কাজ অনুসন্ধানে জানা যায়, পিরোজপুর জেলায় হাতে নেওয়া ১,৮১০টি প্যাকেজের (রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট) মধ্যে ১,০০০টিরও বেশি প্রকল্পের কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে, যেগুলোর সময়সীমা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে [১.৫.৬]। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সংসদ সদস্য শ ম রেজাউল করিম ও মহিউদ্দিন মহারাজের রাজনৈতিক প্রভাবে এবং এলজিইডি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কাজ না করেই শত শত কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। আরও পড়ুন: এলজিইডির শতকোটি টাকার হিসাবরক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম এখনও বহাল তবিয়তে আনোয়ারুল ইসলামের ‘আলাদিনের চেরাগ’ দুদকের প্রাথমিক তদন্ত ও বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিসাবরক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম পিরোজপুর প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার বিরুদ্ধে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে পুনরায় কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তার ওপর দেশত্যাগে কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তদন্তে উঠে আসা ভয়াবহ চিত্র: বিনা কাজে বিল পরিশোধ: ৩৭০টি স্কিমের নথি গায়েব করে দেওয়া হয়েছে এবং কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারদের বিল দেওয়া হয়েছে । ডাবল পেমেন্ট: একই প্রকল্পের নাম ভাঙিয়ে দুই থেকে চারবার পর্যন্ত বিল তুলে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি । গ্রেপ্তার ও বরখাস্ত: এই দুর্নীতির দায়ে ইতিমধ্যে জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসিন এবং এলজিইডির হিসাব কর্মকর্তা এ কে এম মোজাম্মেল হক খানসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ৩ জন প্রকৌশলীসহ মোট ৫ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে । বর্তমান অবস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে এই দুর্নীতির ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে ৮টি পৃথক মামলা দায়ের করেছে । পিরোজপুর এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাত্তারের ওপরও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে । স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, এই লুণ্ঠনের সাথে জড়িত রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে । পিরোজপুরের সাধারণ মানুষ এখন এই বিশাল অর্থ আত্মসাতের সুষ্ঠু বিচার এবং অসমাপ্ত প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার দাবি জানাচ্ছেন। পিরোজপুর এলজিইডির বহুল আলোচিত এই দুর্নীতির ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কর্মকাণ্ড। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় আরও কিছু সুনির্দিষ্ট এবং গভীর তথ্য নিচে দেওয়া হলো: ১. দুর্নীতির ধরন ও কৌশলের বিস্তারিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্রটি মূলত তিনটি স্তরে কাজ করত : ভূতুড়ে বিলিং: কোনো কাজ শুরু হওয়ার আগেই ১০০% বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পিরোজপুরের নাজিপুর-বৈঠাকাঠা এবং নাজিপুর-চর রঘুনাথপুর সড়কে কোনো কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে । নথি গায়েব ও জালিয়াতি: তদন্তে দেখা গেছে, ৩৭০টি স্কিমের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা সঠিক ফাইল নেই । হিসাবরক্ষক এবং প্রকৌশলীরা যোগসাজশ করে একই কাজের বিপরীতে বারবার (ডাবল পেমেন্ট) বিল ইস্যু করেছেন । রাজনৈতিক ছত্রছায়া: সাবেক এমপি মহিউদ্দিন মহারাজের পরিবারের মালিকানাধীন আটটি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রায় ১,০৭৯ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়া হয় । ২. অভিযুক্তদের তালিকা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে ২৩ থেকে ২৭ জন সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা করেছে । গ্রেপ্তারকৃতরা (১৫ এপ্রিল ২০২৫): জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসিন, সাবেক কর্মকর্তা আলমগীর হাসান,এসএএস সুপার মাসুম হাওলাদার ও নজরুল ইসলাম এবং এলজিইডির হিসাব কর্মকর্তা এ কে এম মোজাম্মেল হক খান । চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫): দুর্নীতির দায়ে ৫ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সদর, নাজিরপুর ও ভাণ্ডারিয়ার সাবেক প্রকৌশলী মোর্শেদ সরকার,জাকির হোসেন মিয়া এবং বদরুল আলম । দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা: সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাত্তার এবং পিরোজপুর প্রজেক্টের হিসাবরক্ষক আনোয়ারুল ইসলামসহ ১৩ জনের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে । ৩. অর্থের অংক ও প্রকল্পের পরিমাণ মোট অনিয়ম: প্রাথমিক তদন্তে ১,১০০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও ১৭টি বড় প্রকল্পে সব মিলিয়ে অনিয়মের পরিমাণ প্রায় ১,৬৪৭ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে । অসমাপ্ত কাজ: পিরোজপুর এলজিইডির অধীনে ১,৮১০টি প্যাকেজের মধ্যে ১,০০০টিরও বেশি কাজ বন্ধ হয়ে আছে, যার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ । ৪. আনোয়ারুল ইসলামের ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ হিসাবরক্ষক আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে যে, তিনি পিরোজপুর প্রকল্পের ফান্ডের রক্ষক হয়েও ভক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর উত্তরায় বহুতল ভবন, সাভারে জমি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বেনামে বড় অংকের এফডিআর (FDR) থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। আনোয়ারুল ইসলামের সম্পদের তালিকা দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন সাধারণ হিসাবরক্ষক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ও তার পরিবারের নামে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে । তার অর্জিত সম্পদের মধ্যে রয়েছে: স্থাবর সম্পত্তি: রাজধানীর উত্তরা ও সাভারে একাধিক বহুতল ভবন এবং ফ্ল্যাট। নিজ এলাকায় এবং ঢাকার আশেপাশে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক ও কৃষিজমি। অস্থাবর সম্পত্তি: বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে নিজের এবং স্বজনদের নামে বড় অংকের এফডিআর (FDR) ও সঞ্চয়পত্র। বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ। অর্থ পাচার: অনুসন্ধানে তার অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাচারের বিষয়েও তথ্য যাচাই করছে দুদক [১.২.৩]। দায়েরকৃত মামলার আইনি ধারা ও অভিযোগসমূহ দুদক ইতিমধ্যে পিরোজপুর এলজিইডি দুর্নীতিতে ২৩ থেকে ২৭ জনকে আসামি করে ৮টি পৃথক মামলা করেছে । আনোয়ারুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সাধারণত নিচের ধারাগুলোতে মামলা সাজানো হয়েছে: ১. দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা: ২৬(২) ধারা: সম্পদের তথ্য গোপন করা বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করা। ২৭(১) ধারা: জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং তা ভোগদখলে রাখা । ২. দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা: ৪০৯ ধারা: সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ (বিপুল অংকের অর্থ আত্মসাৎ)। ৪২০ ধারা: প্রতারণা ও জালিয়াতি। ৪৬৭ ও ৪৭১ ধারা: ভুয়া বিল-ভাউচার এবং জাল নথি তৈরি করে তা আসল হিসেবে ব্যবহার করা । ৩. দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা: সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বা অন্য কারো জন্য অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ। ৪. মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২: অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ স্থানান্তর বা রূপান্তরের মাধ্যমে বৈধ করার চেষ্টা করা । বর্তমান অবস্থা: পিরোজপুর এলজিইডির অপর হিসাবরক্ষক এ কে এম মোজাম্মেল হক খান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকাকালীন মারা গেলেও আনোয়ারুল ইসলাম এবং তার সহযোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্যাপক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বর্তমানে তার ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে যেন তিনি বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে পালাতে না পারেন ।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।