১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকায় যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর নেতৃত্বে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আত্মসমর্পণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক আত্মসমর্পণের ঘটনা। এই বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবন্দিকে প্রথমে বাংলাদেশে রাখা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ভারতে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে নানা কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে ১৯৭৩-৭৪ সালের মধ্যে তাদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু কেন তাদের ভারতে নেওয়া হয়েছিল? আর কেনইবা বিচার না করেই ফেরত দেওয়া হলো?—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই প্রতিবেদন। কারা ছিলেন এই যুদ্ধবন্দি? ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির মধ্যে প্রায় ৮০ হাজারই ছিলেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সদস্য। বাকি প্রায় ১৩ হাজার ছিলেন বেসামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারের সদস্য। উচ্চপদস্থদের মধ্যে ছিলেন: লে. জে. এ.এ.কে. নিয়াজী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরীফ এয়ার কমোডর ইনামুল হক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ কেন ভারতে নেওয়া হয়েছিল? আত্মসমর্পণের পর বাংলাদেশ সরকার শুরুতে যুদ্ধাপরাধীদের দেশে রেখেই বিচার করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ১. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সীমাবদ্ধতা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা—সবকিছুরই ঘাটতি ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ৯৩ হাজার বন্দির দায়িত্ব নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ২. নিরাপত্তা ঝুঁকি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও নির্যাতনের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল। ফলে বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ৩. আন্তর্জাতিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন আত্মসমর্পণের দলিল অনুযায়ী যুদ্ধবন্দিদের মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক ছিল। ভারত তুলনামূলকভাবে প্রস্তুত ও সক্ষম হওয়ায় বন্দিদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়। ৪. ভারতের সামরিক নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি সেনাদের কার্যত ভারতের হেফাজতেই ধরা হয়, তাই তাদের ভারতে নেওয়া ছিল কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কোথায় রাখা হয়েছিল? ভারতের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে তাদের রাখা হয়, যেমন: কলকাতা আগ্রা রাঁচি জব্বলপুর বিহারের বিভিন্ন এলাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা নিরাপত্তাবেষ্টিত ক্যাম্প ছিল। নিয়াজী নিজেও কলকাতা ও জব্বলপুরে বন্দি ছিলেন বলে তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ আছে। কেন বিচার হয়নি? বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চাইলেও কয়েকটি বড় কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ১. কূটনৈতিক চাপ পাকিস্তান শুরু থেকেই বন্দিদের ফেরত চেয়ে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে। ২. শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি বাংলাদেশ শর্ত দেয়—পাকিস্তানে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি না দিলে কোনো আলোচনা নয়। ফলে যুদ্ধবন্দিরা এক ধরনের কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ৩. আঞ্চলিক রাজনীতি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। সিমলা চুক্তি ও যুদ্ধবন্দি ইস্যু ১৯৭২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে স্বাক্ষরিত সিমলা চুক্তি ছিল একটি বড় মোড়। এই চুক্তিতে: ভারত যুদ্ধবন্দিদের ফেরত দিতে সম্মত হয় পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথ তৈরি হয় দিল্লি চুক্তি: ফেরার পথ ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় দিল্লি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মূল সিদ্ধান্ত: ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধ অভিযুক্ত বাদে বাকিদের ফেরত আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানো বিহারি জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমঝোতায় ওই ১৯৫ জনকেও ফেরত পাঠানো হয়। শেষ অধ্যায় ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে সর্বশেষ যুদ্ধবন্দি হিসেবে জেনারেল নিয়াজীকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধবন্দি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াগুলোর একটি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধবন্দিরা শুধু সামরিক পরাজয়ের প্রতীক ছিল না—তারা ছিল আঞ্চলিক রাজনীতি, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রগঠনের জটিল বাস্তবতার অংশ। বিচার না হলেও, এই ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
মেঘনা গুহ ঠাকুরতা: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ—বাংলার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় কালরাত। এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে চালায় বর্বরোচিত গণহত্যা। তাদের লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। কিন্তু সেই রক্তাক্ত রাতই উল্টো বাঙালিকে স্বাধীনতার পথে আরও দৃঢ় করে তোলে। সেই রাতের ভয়াবহতার শিকার হন অসংখ্য নিরীহ মানুষ, শিক্ষক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী। তাদেরই একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা। সেদিন রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন তিনি। সেদিনের ভয়াবহতার কিছু স্মৃতি তুলে ধরেছেন তার একমাত্র মেয়ে অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা। 🔥 গণহত্যার বিভীষিকা ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা হঠাৎ করেই হামলা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায়। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)-সহ বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই নির্মম হত্যাযজ্ঞে শুধু ঢাকাতেই হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বন্ধ করে দেওয়া হয় টেলিফোন, রেডিও ও টেলিগ্রাম ব্যবস্থা। 🏠 ৩৪ নম্বর ভবনের সেই রাত অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা থাকতেন শহীদ মিনার আবাসিক এলাকার ৩৪ নম্বর ভবনে। তার মেয়ে মেঘনা গুহ ঠাকুরতা সেই রাতের স্মৃতি তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ২৫ মার্চ রাত প্রায় ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাসায় হানা দেয়। এক কর্মকর্তা ও দুই সৈনিক এসে জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতাকে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে অন্য ফ্ল্যাটগুলোতে তল্লাশি চালায়। এক পর্যায়ে শিক্ষক মনিরুজ্জামান এবং তার সঙ্গে থাকা তিনজন তরুণকে টেনে-হিঁচড়ে এনে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। 💔 “আপনার হাজবেন্ডকেও হয়তো মেরেছে” মনিরুজ্জামানের স্ত্রী এসে মেঘনার মাকে জানান—“আপনার হাজবেন্ডকেও হয়তো মেরেছে।” আতঙ্কিত পরিবার দ্রুত বাইরে গিয়ে দেখতে পায়, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন। মেঘনা জানান, সেনারা তার বাবার নাম ও ধর্ম জিজ্ঞেস করার পর গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঘরে এনে রাখা হয়, কারণ তখন কারফিউ চলছিল। 🏥 মৃত্যুপুরীতে পরিণত ঢাকা মেডিক্যাল ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। মেঘনার ভাষায়, হাসপাতালের করিডর, মেঝে—সব জায়গা লাশ ও আহত মানুষের ভিড়ে পূর্ণ ছিল। চারদিকে রক্তের গন্ধ, আর্তনাদ আর মৃত্যুর মিছিল। চিকিৎসকরা জানান, তাকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। অবশেষে ৩০ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 🕯️ ইতিহাসের এক অমোচনীয় ক্ষত ২৫ মার্চের সেই কালরাত শুধু একটি হত্যাযজ্ঞ নয়—এটি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক নির্মম অধ্যায়। এই রাতেই শুরু হয় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা সহ অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ বাঙালির ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।
আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সারা দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর হামলার পরপরই ২৬ মার্চের প্রভাতে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় স্বাধীনতা। দিবসটি উপলক্ষে আজ দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, স্বাধীনতা জাতি হিসেবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের। পাশাপাশি তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তমসহ সব বীর মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতিত মা-বোন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজ, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে স্বাধীনতার অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেমের ওপর গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, স্বাধীনতা দিবস আমাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করে। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়ন ধারাকে এগিয়ে নিতে জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা ও দেশপ্রেমের চেতনাকে ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। দিবসটি উপলক্ষে সরকার দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তোপধ্বনির মাধ্যমে দিনের সূচনা হয়। সরকারি-বেসরকারি সব ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রদ্ধা জানান। সকাল ৯টায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ ও ফ্লাই পাস্ট অনুষ্ঠিত হয়, যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া বঙ্গভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কুচকাওয়াজ, রচনা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, নৌবাহিনীর জাহাজ পরিদর্শন, সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ দিনব্যাপী নানা আয়োজন করা হয়েছে। বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করছে। জাদুঘরগুলো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং জেলা-উপজেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সকাল থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সন্ধ্যায় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
একটা অনির্বাচিত সরকারের হাত থেকে দেশকে গণতন্ত্রায়নের পথে নিয়ে যেতে সশস্ত্রবাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) সদস্যরা যে ভূমিকা রেখেছেন তা ইতিহাসে অবস্মরণীয় হয়ে থাকবে, বলছেন দেশের আপামর সচেতন মানুষ। সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসায় ভাসছেন এখন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তাঁর বিশেষ প্রচেষ্টায় এবং নেতৃত্বেই ঐতিহাসিক এক অকল্পনীয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, দেশে ফিরে এলো গণতন্ত্র। প্রতিটি সাধারণ-সচেতন মানুষ এমন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশংসা করছেন। ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে মানুষ সুশাসন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং পরিবর্তনের যে স্বপ্ন দেখেছিল তা ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মানুষেকে হতাশ করেছেন। যে কারণে মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখছিল অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে নতুন একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশের। কিন্তু ড. ইউনূস ক্ষমতা ছাড়াতও কোনো ক্রমেই রাজি হচ্ছিলেন না। রাজনৈতিক দলগুলোর রোডম্যাপের দাবিকে তিনি বার বারই এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানই প্রথম এক বক্তৃতায় ঘোষণা করেন, ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনে সেনাবাহিনী সরকারকে সহযোগিতা করবে। তাক্ষণিকভাবে সরকারের তরফ থেকে সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়। কিন্ত জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর লক্ষ্যে অটল থাকেন। অনেকে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এও গুজব ছড়িয়েছে, ‘আর্মি ক্ষমতা টেকওভার করছে।’ কোনো কোনো মহল থেকে এ ব্যাপারে নেপথ্যে উস্কানিও দেওয়া হয়েছে। এত কিছু সত্ত্বেও ওয়াকার উজ জামান অত্যন্ত ধৈর্য্যরে সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। গণতন্ত্রায়নের পথে ছিলেন অবিচল। গত বছরের মে মাসে সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে তিন বাহিনীর প্রধানরা যমুনায় ড. ইউনূসের সাক্ষাত করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর দাবি জানান। এসবের কারণেই মূলতঃ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাধ্য হন লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক ও নির্বাচন আয়োজনের সমঝোতায় যেতে। কিন্তু লন্ডন বৈঠকের সমঝোতায়ও ড. ইউনূস পরবর্তীতে ঠিক থাকতে চাননি। একেক সময় একেক কথা বলেছেন। জামায়াত-এনসিপির নির্বাচন বিরোধী ভূমিকায় নেপথ্য থেকে তা দিয়েছেন। নানামুখী চাপে পড়ে অবশেষে ৫ আগস্ট, ২০২৫ বাধ্য হয়ে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্ধারণের কথা ঘোষণা করেন। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশ ও পরবর্তীতে তফসিল ঘোষণা হয়। তবে বরাবরই এমনকি নির্বাচন হয়ে যাওয়ার মুহূর্তেও দফায় দফায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে নির্বাচন নিয়ে। অনিশ্চয়তা, গুজব ও নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করা হয়েছে। এতসব বাধা অতিক্রম করে কল্পনাতীত অবাধ, সুষ্ঠু-নিরপক্ষে পরিবেশে নির্বাচন হয়ে গেলো। ‘কল্পনাতীত’ বলা হচ্ছে এ কারণে যে, তফসিল ঘোষণার পরদিনই ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। তখনই মনে করা হয়েছিল, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কত ঘটনা যে ঘটবে এর ইয়ত্তা নেই। বিশেষ করে নির্বাচনের দিনকে সামনে রেখে সর্বমহলেরই বড় আশংকা ছিল। সব আশংকা এবং জল্পনা-কল্পনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশের মধ্য দিয়ে এক ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়ে গেছে। এত বাধা-বিঘ্ন দূর করে দেশকে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রধান কৃতিত্ব জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানেরই। বিশ্বে এবং বাংলাদেশেও অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকে গণতন্ত্র বিরোধী। নিজেদের কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা গ্রহণের প্রতি আগ্রহ থাকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান নেতৃত্বের এ ক্ষেত্রে নতুন নজির স্থাপন করলো। বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান (মাঝে) এবং নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসানেরও এতে ভূমিকা রয়েছে। সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান হিসেবে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানের আন্তরিকতা, উদ্যোগ ও একাগ্রতা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। নির্বাচনের পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রশংসায় ভাসছেন। অনেকে বলছেন, এই মানুষটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। সম্ভাব্য এক গৃহযুদ্ধের দুঃস্বপ্ন থেকে দেশকে রক্ষা করার কৃতিত্ব তাঁরই। ইতিহাস রচনা করে গেলেন তিনি। সেনাপ্রধানসহ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের প্রতি স্যালুট জানাচ্ছে মানুষ।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ সুগন্ধা ও কীর্তনখোলার মোহনায় অবৈধ দখল ও দূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী “অপসোনিন”নদীর তীর ও মোহনার বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ফেলা,জমি দখল,পরিবেশ ধ্বংস এবং জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে,যার ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।মোহনা এখন আর শুধু প্রাকৃতিক জলপথ নয়—এটি পরিণত হয়েছে দখল, দূষণ ও অপসোনিনের আধিপত্যের এক জটিল সংঘাতে। দখলের বিস্তার ও কৌশল: স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে নদীর তীর ঘেঁষে মাটি ভরাট, স্থায়ী বিশাল কংক্রিট দেয়াল নির্মাণ ভরাট করে স্থাপনের মাধ্যমে দখল প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। শুরুতে ছোট পরিসরে কাজ হলেও বর্তমানে তা বড় শিল্পকারখানার সম্প্রসারণে রূপ নিয়েছে।সুগন্ধা ও কীর্তনখোলার মোহনায় বিশাল এই স্থাপনা যেন বাংলাদেশের লাগামহীন নদী দখলের এক ভয়াবহ নিদর্শন। একজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে এই জায়গায় আমরা জাল ফেলতাম। এখন সেখানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে, ফলে নদী এখন ভুমিতে পরিনত করেছে অপসোনিন।” স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথমে কারখানাটি ছোট্ট একটি জায়গায় গড়ে ওঠে। কিন্তু প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে বালু ফেলে ধীরে ধীরে তারা জায়গা বাড়াতে থাকে। রাতের আঁধারেও সেই কাজ চলত।ফলে নদীপথে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করছে, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ১. নদীর বুক চিরে ‘শিল্প সাম্রাজ্য’ স্থানীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠির দপদপিয়া ও তিমিরকাঠী সংলগ্ন এলাকায় সুগন্ধা ও বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর ভেতরে ৫০ একরের বেশি এলাকা ভরাট করে শিল্প স্থাপনা সম্প্রসারণের অভিযোগ রয়েছে। নদীতে কংক্রিট ব্লক ফেলে ধীরে ধীরে চর সৃষ্টি করে সেই চর পরে কোম্পানির জমির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। ২. ‘সিকিস্তি জমি’দখলের অভিযোগ নদীভাঙনে বিলীন হওয়া জমি পরে জেগে উঠলে তা পূর্ব মালিকদের পাওয়ার কথা থাকলেও— অভিযোগ আছে, সেই জমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে. শতাধিক পরিবার তাদের জমি ফিরে পায়নি।দখল ঠেকাতে গেলে হামলা-হুমকির অভিযোগও রয়েছে এটি শুধু নদী দখল নয়—ভূমি অধিকার সংকটেও রূপ নিয়েছে। ৩. পরিকল্পিত ভরাট ও তীর দখল পরিবেশকর্মীদের মতে— নদীর ভেতরে বালু ভরাট করা হয়েছে। তীর ঘেঁষে গাইড ওয়াল ও শিল্প অবকাঠামো তৈরি হয়েছে।নদীর অংশ নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে ।ফলে নদীর প্রাকৃতিক সীমানা প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ৪. দূষণের ভয়াবহ চিত্র সুগন্ধা ও কীর্তনখোলা নদী এখন বহুমুখী দূষণের শিকার— প্রধান দূষণের উৎস: অপসোনিন কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, ময়লা,প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে, যা পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে।ফলে পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।মাছ ও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে ও নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। ৫. সুগন্ধা নদীর সংকট: ভাঙন ও চাপ শুধু কীর্তনখোলা নয়, পাশের সুগন্ধা নদীতেও সংকট বাড়ছে । অপসোনিন দুটি নদীরই অংশ দখল করে নিয়েছে। যার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে নদীগুলোর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও পরিবেশ ব্যবস্থায়। প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। তীব্র ভাঙনে গ্রাম, রাস্তা, প্রতিষ্ঠান বিলীন,নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হুমকির মুখে । মোহনা অঞ্চলে কৃত্রিম বাধা ও দখল দপদপিয়া ও তিমিরকাঠি মৌজার অংশ এই ভাঙনকে আরও ত্বরান্বিত করছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা । এছাড়া দপদপিয়া -নলছিটি সড়কটি এখন ভাঙনের মুখে। ৬. প্রশাসনিক দুর্বলতা ও প্রভাবশালী চক্র অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে দখল শুধু ঘটছে না, বরং দীর্ঘদিন ধরে তা টিকে আছে। কারণগুলো: প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাব।আইনের দুর্বল প্রয়োগ।উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতার অভাব। যদিও প্রশাসন জানিয়েছে, নদী দখল ও দূষণ রোধে পরিকল্পনা রয়েছে। ৭. দখলদার অপসোনিন, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কীর্তনখোলা ও সুগন্ধা নদী দখলে অপসোসিনের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে।এ দুটি নদী দখলের প্রতিযোগীতায় অপসোনিন এগিয়ে।নদীতে ব্লক ফেলে নদী দখল করেছে এ অঞ্চলে একমাত্র অপসোনিন। সাবেক এমপি ও আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতা আমির হোসেন আমুর প্রভাবকে তারা কাজে লাগিয়ে নদী দখল করেছে বলে স্থানীয়রা জানান। অর্থাৎ, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়-একটি সংগঠিত দখল প্রক্রিয়া। ৮. সামাজিক: ও অর্থনীতির উপর প্রভাব অর্থনৈতিক: জেলেদের আয় কমে গেছে,নৌ চলাচলে বাধা ও নদীভিত্তিক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত। সামাজিক: ভূমিহীনতা বৃদ্ধি-স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা।নদীর অংশও দখলের আওতায় চলে গেছে। ৯. বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা পরিবেশবিদদের মতে— নদীকে “জীবন্ত সত্তা” হিসেবে আইনি স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবে তা রক্ষা হচ্ছে না দ্রুত দখলমুক্ত না করলে নদী হারানোর ঝুঁকি রয়েছে । পরিবেশগত ক্ষতি: বিশেষজ্ঞদের মতে, মোহনা অঞ্চল নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বাধা সৃষ্টি হলে— নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, নৌ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিবেশকর্মীরা জানান, শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে পানির রং ও গন্ধ পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক এলাকায় তেলজাতীয় পদার্থ ভাসতে দেখা গেছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, দখলের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলেও কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। নদী রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও প্রকট। একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “নদী দখল ঠেকাতে আইনি কাঠামো আছে, কিন্তু প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে অনেক সময় অভিযান থেমে যায়।” আমুর প্রভাবে ১৮ একর জমি দখলের : আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ক্ষমতার দাপটে জাল জালিয়াতির মাধ্যে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিন ফার্মাসিটিক্যাল লিমিটেড কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা মিসকেস সাজিয়ে আমির হোসেন আমুর ক্ষমতার প্রভাবে ১৮ একর ১৫ শতাংশ জমি আত্মসাত করেছেন।এমন অভিযোগ তুলে আমির হোসেন আমু ও অপসোনিন ফার্মাসিটিক্যাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে ভূক্তভোগিরা। ভূক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বোরহান উদ্দিন মিলন। তিনি বলেন, ফ্যাসিষ্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দোসর সাবেক খাদ্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু অপসোনিন ফার্মাসিটিক্যাল লিমিটেডের অংশীদার। এছাড়া রাকিব খান ও রউফ খান পরস্পর মামাতো-ফুফাতো ভাই। তাঁরা আওয়ামী লীগের আমলে আমির হোসেন আমুর ক্ষমতার অপব্যবহার করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভূয়া মিস কেস ২৩০/৬৫-৬৬ নম্বর বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাদের ৭ পরিবারের প্রায় ১৮ একর ১৫ শতাংশ ভূমি আত্মাসাত করে নেয়। মিলন আরও বলেন, নলছিটি এসিল্যান্ড অফিসের ১২ নম্বর রেজিস্টার বইতে মিস কেস ২৩০/৬৫-৬৬ এর কোন অস্তিত্ব নেই। বরং ওই রেজিস্টারে তিনটি বন্দোবস্ত কেস দায়ের রয়েছে। কিন্তু নলছিটি জেএল নম্বর ১২৭ পশ্চিম চর দপদপিয়ার জমি অপসোনিন কোম্পানির মালিক রাকিব খানের নামে ৪৩১৯/১৯ দলিল এবং ৩৮২৮/২০০০ নম্বর দলিল বরিশাল সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে রেজিস্ট্রি হয়, যা ১৯৬৬ সালে আইনে সম্পূর্ণ অবৈধ। যত দলিল অপসোনিন কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে। এর মূল মালিকানা স্বত্ব ২৩০/৬৫-৬৬ মিস বন্দোবস্ত কেসটি দলিলে উল্লেখ্য নাই। এসকল দলিলে জাগুয়া ইউনিয়ন জেএল ১২৭ নম্বর উল্লেখ্য করেছে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জাগুয়া ইউনিয়ন জেএল নম্বর ৫৪। সকল দলিল জাল জালিয়াতি মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া এই রাকিব খান ও রউফ খান কীর্তনখোলা নদীর স্রোত গতি পরিবর্তন করে, নদী ভরাট ও দখল করে পরিবেশের ভারসম্যের ব্যাঘাত ঘঠিয়ে শিল্প কারখানা গড়ে তুলেছেন। শত শত অসহায় গরীব মানুষের জমি এবং সরকারের খাস জমি অবৈধভাবে জবর দখল করেছে। এর সব কিছুর নেপথ্যে আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, এ নিয়ে ঝালকাঠি আদালতে মামলা করেছেন ভূক্তভোগীরা। মামলায় ২৩ বছর তারা কোর্টে হাজির না হয়ে, কোর্ট অবমাননা করেছেন। তারা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে আইন কানুন আদালতকে তোয়াক্কা না করায়, তাদের বিরুদ্ধে আদালত জি আর মামলা নং ৩১/২৫ এবং সি আর ১৪৭/২৫ নং মামলায় গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে। আমির হোসেন আমুর অবৈধ ক্ষমতার দাপটে বহু অসহায় গরীব মানুষের ভূমি জবর দখল করে নিয়েছে। জাল-জালিয়াতির মূল হোতা অপসোনিন ফার্মার অসাধু কর্মকর্তা মো. পারভেজ আহমেদ, রফিক আহম্মেদ, জসিম উদ্দিন, ফিরোজ আহমেদ বলে উল্লেখ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- ভূক্তভোগী জালাল আহমেদ খান, জাহাঙ্গীর খান, সিরাজুল ইসলাম গাজী, সাইফুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট সাইফুল। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, 'হাইকোর্ট নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন। এর মানে স্থানীয় প্রশাসনের এখতিয়ার রয়েছে অবিলম্বে দখলদারদের উচ্ছেদ করার।'তিনি বলেন, 'আমি বুঝতে পারছি না কেন তারা এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অপসোনিনের বক্তব্য : অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান “অপসোনিন”-এর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, তারা কোনো অবৈধ দখলে জড়িত নয়। তাদের দাবি, সব স্থাপনা বৈধ অনুমোদনের ভিত্তিতেই নির্মিত এবং পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি সেই দাবির সঙ্গে মিলছে না। করণীয় ও সুপারিশ: বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন— নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে দ্রুত অভিযান, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা। সুগন্ধা ও কীর্তনখোলার মোহনা শুধু নদীপথ নয়, বরং এ অঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকা ও পরিবেশের প্রাণকেন্দ্র। দখল ও দূষণের এই চক্র অব্যাহত থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই নদীগুলোকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সুগন্ধা ও কীর্তনখোলার মোহনায় যা ঘটছে তা শুধু একটি নদী দখলের ঘটনা নয়— এটি পরিবেশ, অর্থনীতি, ভূমি অধিকার ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্মিলিত সংকট। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে— নদীর নাব্যতা হারাবে,জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে,হাজারো মানুষের জীবিকা বিপন্ন হবে, নদী রক্ষার লড়াই এখন সময়ের দাবি।