ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : প্রায় ২৫ বছর ধরে কৃষি উৎপাদনে স্থবিরতা, জলাবদ্ধতা এবং সেচ সংকটে ভুগছিল বরিশালের চরকাউয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। একসময় যেসব খাল কৃষকের জীবনরেখা ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গিয়ে কৃষি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) গ্রহণ করে একটি ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প—সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক “স্বনির্ভর খাল খনন কর্মসূচি”। প্রকল্পের আওতায় ছিল প্রায় ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, একটি কালভার্ট নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার।
কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় কৃষক ও ভূমি মালিকদের অভিযোগ—এই উদ্যোগ সুফলের বদলে নতুন সংকট তৈরি করেছে। স্থানীয় কৃষকদের আশা ছিল দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি।কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই অভিযোগ উঠতে শুরু করে—ফলাফল উল্টো।
চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ শুধু জলাবদ্ধতা বা জমি ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাঠামো, ঠিকাদার নির্বাচন, সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক তদারকি—সবকিছু নিয়েই এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—বরং “ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার একটি উদাহরণ।”
চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা নকশাগত ত্রুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় কৃষকদের ভাষায়, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে—বিশেষ করে কৃষকের আয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার ওপর।
যে প্রকল্পকে ঘিরে আশা ছিল কৃষি পুনরুদ্ধারের, তা এখন অনেক পরিবারের কাছে “অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণ” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়—বরং কৃষি নির্ভর সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া একটি বাস্তবতা।
যেখানে উন্নয়নের লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বাড়ানো, সেখানে অনেক কৃষকের জন্য এটি এখন টিকে থাকার সংগ্রাম।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, চরকাউয়ার পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৮০০ একর কৃষিজমি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমন মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং বোরো মৌসুমে পানির অভাবে অনাবাদী থেকে যাচ্ছিল।
একসময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে সংযোগ খাল তৈরি করা হয়েছিল, যা পরে ভরাট হয়ে যায়। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই নতুন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার।
কিন্তু প্রকল্প শুরুর পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নকশা, বাস্তবায়ন এবং তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর জমিতে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কাওছার হোসেন বলেন,
“আগে যেমন তেমন ফসল হতো, এখন তাও হচ্ছে না। পানি জমে থাকে, জমিতে যাওয়া যায় না। ইরি ধান তুলতে কষ্ট হয়েছে, ফলনও কম।”
তার মতে, খাল খননের ফলে পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে উল্টো জমিতে পানি আটকে থাকার প্রবণতা বেড়েছে।

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, পূর্ব চরকাউয়ার প্রায় ৮০০ একর কৃষিজমি দীর্ঘদিন ধরে মৌসুমি জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এই জমিকে পুনরায় উৎপাদনশীল করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক কৃষকই বলছেন—
এক কৃষকের ভাষায়,
“আমরা উন্নয়ন আশা করেছিলাম, কিন্তু এখন আমাদের জমিই বোঝা হয়ে গেছে।”
স্থানীয় কৃষক কাওছার হোসেন বলেন,“খাল কেটে কোনো লাভ হয়নি। পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় জমিতে পানি জমে গেছে। এবার ইরি ধান তুলতে অনেক কষ্ট হয়েছে। ফলনও কমে গেছে।”তিনি আরও অভিযোগ করেন, খাল খননের পাশাপাশি দুই পাশে রাস্তা নির্মাণ করা হলেও পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
একই ধরনের অভিযোগ আরও অনেক কৃষকের।
শহিদুল ইসলামসহ একাধিক ভূমি মালিক অভিযোগ করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তাদের রেকর্ডীয় জমি কেটে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন,
“আমাদের জমি গেছে, ক্ষতিপূরণ পাইনি। এখন আবার জলাবদ্ধতা। এটা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, মানসিক চাপও।”
স্থানীয়দের মতে, জমি হারানোর বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দিচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণে অনেক কৃষক এখন বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন।মধ্যবিত্ত ভূমি মালিকদের একটি অংশ কৃষি থেকে সরে গিয়ে শহরমুখী বা অন্য পেশায় যুক্ত ।ফলে কৃষি নির্ভরতা কমে গেলেও, প্রান্তিক কৃষকরা এখনো সমস্যার মধ্যে রয়ে গেছেন।
এই এলাকার কৃষিতে বড় অংশই বর্গাচাষির ওপর নির্ভরশীল। তারা জমির মালিক না হয়েও উৎপাদনের দায়িত্ব নেন।কিন্তু প্রকল্প-পরবর্তী সময়ে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ।
এক বর্গাচাষি জানান,
“আমরা ঋণ করে চাষ করি। এবার পানি সমস্যায় ধান ঠিকমতো হয়নি। ঋণ শোধ কিভাবে করব বুঝতে পারছি না।”
এই পরিস্থিতি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে।
ভূমি মালিক শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন,“আমাদের রেকর্ডীয় জমি কেটে খাল করা হয়েছে। কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এখন জলাবদ্ধতা আগের চেয়েও বেশি।”তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এক ভূমি মালিকের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি বলেন,“আমাদের রেকর্ডীয় জমি কেটে খাল বানানো হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। জলাবদ্ধতা আগের চেয়েও ভয়াবহ।”
তিনি জানান, এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তাদের সম্মতি নেওয়া হয়নি বা যথাযথভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সঠিক না থাকলে যে কোনো খাল খনন প্রকল্প উল্টো ফল দিতে পারে।
চরকাউয়ার ক্ষেত্রে অভিযোগ অনুযায়ী—
ফলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় একাধিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে—
খালের পাড়ে প্রায় ১২ ফুট চওড়া রাস্তা নির্মাণ
কৃষিজমি সংকুচিত হওয়া
পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নালা বা কালভার্ট না থাকা
কিছু এলাকায় মাটি এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা
কৃষি জমিতে যাতায়াতের পথ সংকুচিত হওয়া
স্থানীয়দের মতে, এসব পরিবর্তন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
একজন স্থানীয় কৃষক বলেন,
“খাল খননের আগে সমস্যা ছিল, এখন খালই সমস্যা হয়ে গেছে।”
এই মন্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে প্রকল্প নিয়ে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তারই প্রতিফলন। অনেকেই বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প তাদের জীবনে স্থায়ী সংকট তৈরি করছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, খাল খননের আগে অনেক জায়গায় গাছ কাটানো হয়েছে, কিন্তু পরে সেখানে খনন কাজ হয়নি।
মধ্য চরকাউয়া এলাকায় কিছু অংশে খাল কাটার কথা বলে গাছ কাটা হলেও প্রকৃত কাজ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পের নামে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে কাজ হয়েছে।

কৃষকদের ভাষায়, খাল এখন সুবিধার বদলে সমস্যার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
একজন কৃষক বলেন,
“খাল খননের পর আমাদের উপকার হয়নি। বরং জলাবদ্ধতা বেড়েছে। এখন এই খালই আমাদের গলার কাটা।”
তিনি জানান, পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পের কাজ নিয়ে ঠিকাদারদের ভূমিকা নিয়েও একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদার খলিলুর রহমান বলেন,
“আমি সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়েছি। মূল কাজ স্থানীয় একজন করেছেন। খালের ভিতরের বাঁধের বিষয়ে আমি জানি না।”
অন্যদিকে আরেক ঠিকাদার আতিকুর রহমান বলেন,
“সব নিয়ন্ত্রণ করেছে স্থানীয় একজন ব্যক্তি। আমি ঠিকাদার হলেও বাস্তবায়নে তার প্রভাব বেশি ছিল।”
এই বক্তব্যগুলো প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দেয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করে মেসার্স রাজা এন্টারপ্রাইজ। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রকৃত মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল ভিন্ন।
ঠিকাদার খলিলুর রহমান নিজেই স্বীকার করেন যে, তিনি কাজটি সাব-কন্ট্রাক্টে দিয়েছেন স্থানীয় একজন ব্যক্তিকে।
“আমি ওখানের ঠিকাদার হলেও আমি সাব-কন্ট্রাক্টে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট দিয়েছি। ওনি নিজের মতো করে কাজ করেছে।”
এই বক্তব্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের “মাল্টি-লেভেল কন্ট্রোল” পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দায়িত্ব ও জবাবদিহির সীমারেখা অস্পষ্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক ব্যক্তি, যিনি প্রকল্পের বাস্তবায়নে প্রায় এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
আরেক ঠিকাদার আতিকুর রহমান বলেন,
“আমি ঠিকাদার হলেও সব নিয়ন্ত্রণ করেছে স্থানীয় একজন ব্যক্তি। খাল কাটা, রাস্তা নির্মাণ—সবই তিনি করেছেন।”
স্থানীয় কৃষকদের মতে, এই একক নিয়ন্ত্রণের কারণেই প্রকল্পের নকশা উপেক্ষিত হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় কৃষকের অভিযোগ, ঠিকাদারের বক্তব্য এবং প্রশাসনিক ব্যাখ্যার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটিই—এই প্রকল্প আসলে কার স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে?
সরকারি নথিতে এটি একটি কৃষি পুনরুদ্ধার প্রকল্প। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, প্রকল্প ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক ক্ষমতার স্তর, যেখানে সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে একজন ব্যক্তি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—
এক কৃষকের ভাষায়,
“সব সিদ্ধান্ত একজন মানুষই নিয়েছে। আমরা শুধু ক্ষতি দেখেছি।”
বিএডিসি এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকল্প পরিদর্শনের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী—
এক স্থানীয় কৃষকের মন্তব্য,
“কাগজে প্রশাসন আছে, মাঠে নেই।”

স্থানীয় অভিযোগ অনুযায়ী খালের দুই পাশে প্রায় ১২ ফুট চওড়া রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যা নকশায় না থাকার দাবি রয়েছে।
এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—
এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা আসেনি।
প্রকল্পের মূল ঠিকাদার মেসার্স রাজা এন্টারপ্রাইজ হলেও স্থানীয়দের দাবি, মাঠপর্যায়ে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল ভিন্ন হাতে।
ঠিকাদার নিজেই স্বীকার করেছেন সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কাজ হস্তান্তর করা হয়েছে।
“আমি সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দিয়েছি। মূল বাস্তবায়ন স্থানীয় একজন করেছেন।”
এই বক্তব্য প্রকল্পের দায় নির্ধারণকে আরও জটিল করে তোলে।স্থানীয়দের মতে, এই কাঠামোই প্রকল্পকে “নিয়ন্ত্রণহীন বাস্তবায়ন ব্যবস্থায়” পরিণত করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সুবিধা কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি।
বরং অভিযোগ উঠেছে—
এক কৃষকের ভাষায়,
“আমরা ক্ষতিগ্রস্ত, কেউ কেউ লাভবান।”
বিএডিসির পক্ষ থেকে প্রকল্প তদারকির দায়িত্ব ছিল স্থানীয় পর্যায়ের প্রকৌশল ও মাঠ কর্মকর্তাদের ওপর। কিন্তু স্থানীয় অভিযোগ বলছে, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং হয়নি।
একজন স্থানীয় কৃষক বলেন,
“যদি নিয়মিত তদারকি থাকত, তাহলে এমন অবস্থা হতো না।”
বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী আতায়ে রাব্বী জানান, ভবিষ্যতে পাইপ স্থাপনের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। তবে তিনি অনিয়ম বা বাস্তবায়নের ত্রুটি বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রকল্পে একটি কালভার্ট থাকার কথা থাকলেও স্থানীয়রা বলছেন, সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। অনেক জায়গায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত।
ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।
এক কৃষকের ভাষায়,
“খাল আছে, কিন্তু পানি নামার পথ নেই—এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে একজন স্থানীয় ব্যক্তি এককভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন।একাধিক কৃষকের দাবি, তার সিদ্ধান্তেই খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ এবং গাছ কাটার মতো কাজ হয়েছে।
বিএডিসি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
কৃষকদের প্রশ্ন এখন একটাই—
“এই ক্ষতির দায় কে নেবে?”
এ ব্যাপারে বিএডিসির সহকারি প্রকৌশলী আতায়ে রাব্বী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে প্রতি কিলোমিটারে পাইপ স্থাপন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বর্তমান অভিযোগ—জলাবদ্ধতা, অনিয়ম, এবং পরিকল্পনাগত ত্রুটি—নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (সওকা) সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ জানিয়েছেন, তিনি শিগগিরই এলাকা পরিদর্শন করবেন এবং ত্রুটি থাকলে সমাধান করা হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক পক্ষ জড়িত—
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বহুপক্ষীয় কাঠামোর কারণে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
এক স্থানীয় পর্যবেক্ষকের ভাষায়,
“সবাই আছে, কিন্তু দায় কারও নেই।”
এই প্রকল্প ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো হলো—
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে, স্থানীয়দের মতে এই প্রকল্প “উন্নয়ন নয়, একটি ব্যর্থ পরীক্ষার উদাহরণ” হয়েই থাকবে।চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্পে অভিযোগ শুধু অনিয়ম নয়—বরং এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরছে, যেখানে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং তদারকির মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।
চরকাউয়ার এই খাল খনন প্রকল্প এখন স্থানীয়ভাবে এক প্রশ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে—
উন্নয়ন প্রকল্প কি সত্যিই কৃষকের জন্য?
নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতায় এটি নতুন সংকট তৈরি করছে?
পরিকল্পনা, তদারকি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি কি পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ করেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অধরা।
চরকাউয়ার প্রকল্পকে ঘিরে অভিযোগগুলো একত্র করলে একটি চিত্র স্পষ্ট হয়—এটি শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো ব্যর্থতা নয়, বরং বাস্তবায়ন কাঠামো, প্রশাসনিক তদারকি এবং স্থানীয় প্রভাবের জটিল সমন্বয়ের ব্যর্থতা।
যেখানে কৃষকের জন্য উন্নয়ন আসার কথা ছিল, সেখানে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, ক্ষতি এবং অবিশ্বাস।
চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল কৃষি পুনরুদ্ধারের আশায়। কিন্তু স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ এবং বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, প্রকল্পটি এখনো তাদের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং জমি হারানো, জলাবদ্ধতা এবং পরিকল্পনাগত ত্রুটির অভিযোগে প্রকল্পটি এখন তদন্তের দাবি তুলেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : প্রায় ২৫ বছর ধরে কৃষি উৎপাদনে স্থবিরতা, জলাবদ্ধতা এবং সেচ সংকটে ভুগছিল বরিশালের চরকাউয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। একসময় যেসব খাল কৃষকের জীবনরেখা ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গিয়ে কৃষি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) গ্রহণ করে একটি ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প—সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক “স্বনির্ভর খাল খনন কর্মসূচি”। প্রকল্পের আওতায় ছিল প্রায় ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, একটি কালভার্ট নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় কৃষক ও ভূমি মালিকদের অভিযোগ—এই উদ্যোগ সুফলের বদলে নতুন সংকট তৈরি করেছে। স্থানীয় কৃষকদের আশা ছিল দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি।কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই অভিযোগ উঠতে শুরু করে—ফলাফল উল্টো। চরকাউয়ার খাল এখন শুধু একটি জলপথ নয়—এটি একটি প্রশ্নের নাম: “উন্নয়ন আসলে কার জন্য? চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ শুধু জলাবদ্ধতা বা জমি ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাঠামো, ঠিকাদার নির্বাচন, সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক তদারকি—সবকিছু নিয়েই এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—বরং “ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার একটি উদাহরণ।” চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা নকশাগত ত্রুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় কৃষকদের ভাষায়, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে—বিশেষ করে কৃষকের আয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার ওপর। যে প্রকল্পকে ঘিরে আশা ছিল কৃষি পুনরুদ্ধারের, তা এখন অনেক পরিবারের কাছে “অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণ” হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়—বরং কৃষি নির্ভর সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া একটি বাস্তবতা। যেখানে উন্নয়নের লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বাড়ানো, সেখানে অনেক কৃষকের জন্য এটি এখন টিকে থাকার সংগ্রাম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর খাল খনন শুরু, কিন্তু প্রশ্ন আগেই স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, চরকাউয়ার পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৮০০ একর কৃষিজমি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমন মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং বোরো মৌসুমে পানির অভাবে অনাবাদী থেকে যাচ্ছিল। একসময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে সংযোগ খাল তৈরি করা হয়েছিল, যা পরে ভরাট হয়ে যায়। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই নতুন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। কিন্তু প্রকল্প শুরুর পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নকশা, বাস্তবায়ন এবং তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। “ফসল নেই, আয় নেই”—কৃষকের বাস্তবতা স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর জমিতে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কাওছার হোসেন বলেন, “আগে যেমন তেমন ফসল হতো, এখন তাও হচ্ছে না। পানি জমে থাকে, জমিতে যাওয়া যায় না। ইরি ধান তুলতে কষ্ট হয়েছে, ফলনও কম।” তার মতে, খাল খননের ফলে পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে উল্টো জমিতে পানি আটকে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। ৮০০ একর জমির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, পূর্ব চরকাউয়ার প্রায় ৮০০ একর কৃষিজমি দীর্ঘদিন ধরে মৌসুমি জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এই জমিকে পুনরায় উৎপাদনশীল করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক কৃষকই বলছেন— জমি চাষের উপযোগিতা কমে গেছে সময়মতো বীজ রোপণ সম্ভব হচ্ছে না শ্রম খরচ বেড়েছে ফলন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এক কৃষকের ভাষায়, “আমরা উন্নয়ন আশা করেছিলাম, কিন্তু এখন আমাদের জমিই বোঝা হয়ে গেছে।” “সুফল নয়, ক্ষতি হয়েছে বেশি” — কৃষকদের অভিযোগ স্থানীয় কৃষক কাওছার হোসেন বলেন,“খাল কেটে কোনো লাভ হয়নি। পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় জমিতে পানি জমে গেছে। এবার ইরি ধান তুলতে অনেক কষ্ট হয়েছে। ফলনও কমে গেছে।”তিনি আরও অভিযোগ করেন, খাল খননের পাশাপাশি দুই পাশে রাস্তা নির্মাণ করা হলেও পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। একই ধরনের অভিযোগ আরও অনেক কৃষকের। জমি হারানো ও মানসিক চাপ শহিদুল ইসলামসহ একাধিক ভূমি মালিক অভিযোগ করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তাদের রেকর্ডীয় জমি কেটে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের জমি গেছে, ক্ষতিপূরণ পাইনি। এখন আবার জলাবদ্ধতা। এটা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, মানসিক চাপও।” স্থানীয়দের মতে, জমি হারানোর বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দিচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণে অনেক কৃষক এখন বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন।মধ্যবিত্ত ভূমি মালিকদের একটি অংশ কৃষি থেকে সরে গিয়ে শহরমুখী বা অন্য পেশায় যুক্ত ।ফলে কৃষি নির্ভরতা কমে গেলেও, প্রান্তিক কৃষকরা এখনো সমস্যার মধ্যে রয়ে গেছেন। বর্গাচাষিদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি এই এলাকার কৃষিতে বড় অংশই বর্গাচাষির ওপর নির্ভরশীল। তারা জমির মালিক না হয়েও উৎপাদনের দায়িত্ব নেন।কিন্তু প্রকল্প-পরবর্তী সময়ে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ। এক বর্গাচাষি জানান, “আমরা ঋণ করে চাষ করি। এবার পানি সমস্যায় ধান ঠিকমতো হয়নি। ঋণ শোধ কিভাবে করব বুঝতে পারছি না।” এই পরিস্থিতি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। জমি হারানো ও ক্ষতিপূরণ বিতর্ক ভূমি মালিক শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন,“আমাদের রেকর্ডীয় জমি কেটে খাল করা হয়েছে। কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এখন জলাবদ্ধতা আগের চেয়েও বেশি।”তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। “প্রকল্প না, যেন নতুন সংকট” এক ভূমি মালিকের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি বলেন,“আমাদের রেকর্ডীয় জমি কেটে খাল বানানো হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। জলাবদ্ধতা আগের চেয়েও ভয়াবহ।” তিনি জানান, এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তাদের সম্মতি নেওয়া হয়নি বা যথাযথভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। কৃষি উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সঠিক না থাকলে যে কোনো খাল খনন প্রকল্প উল্টো ফল দিতে পারে। চরকাউয়ার ক্ষেত্রে অভিযোগ অনুযায়ী— পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত জমিতে দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা চাষাবাদের সময়সূচি ব্যাহত মাটির উর্বরতা কমার ঝুঁকি ফলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশাগত ত্রুটির অভিযোগ স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় একাধিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে— খালের পাড়ে প্রায় ১২ ফুট চওড়া রাস্তা নির্মাণ কৃষিজমি সংকুচিত হওয়া পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নালা বা কালভার্ট না থাকা কিছু এলাকায় মাটি এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা কৃষি জমিতে যাতায়াতের পথ সংকুচিত হওয়া স্থানীয়দের মতে, এসব পরিবর্তন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। “খাল এখন সমস্যা”—কৃষকের অনুভূতি একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, “খাল খননের আগে সমস্যা ছিল, এখন খালই সমস্যা হয়ে গেছে।” এই মন্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে প্রকল্প নিয়ে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তারই প্রতিফলন। অনেকেই বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প তাদের জীবনে স্থায়ী সংকট তৈরি করছে। গাছ কাটা, জমি দখল ও পরিকল্পনাহীন কাজের অভিযোগ একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, খাল খননের আগে অনেক জায়গায় গাছ কাটানো হয়েছে, কিন্তু পরে সেখানে খনন কাজ হয়নি। মধ্য চরকাউয়া এলাকায় কিছু অংশে খাল কাটার কথা বলে গাছ কাটা হলেও প্রকৃত কাজ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পের নামে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে কাজ হয়েছে। “খাল এখন গলার কাটা” — কৃষকদের তীব্র হতাশা কৃষকদের ভাষায়, খাল এখন সুবিধার বদলে সমস্যার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একজন কৃষক বলেন, “খাল খননের পর আমাদের উপকার হয়নি। বরং জলাবদ্ধতা বেড়েছে। এখন এই খালই আমাদের গলার কাটা।” তিনি জানান, পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ঠিকাদার ও সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকল্পের কাজ নিয়ে ঠিকাদারদের ভূমিকা নিয়েও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদার খলিলুর রহমান বলেন, “আমি সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়েছি। মূল কাজ স্থানীয় একজন করেছেন। খালের ভিতরের বাঁধের বিষয়ে আমি জানি না।” অন্যদিকে আরেক ঠিকাদার আতিকুর রহমান বলেন, “সব নিয়ন্ত্রণ করেছে স্থানীয় একজন ব্যক্তি। আমি ঠিকাদার হলেও বাস্তবায়নে তার প্রভাব বেশি ছিল।” এই বক্তব্যগুলো প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দেয়। “এক প্রকল্প, একাধিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র” প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করে মেসার্স রাজা এন্টারপ্রাইজ। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রকৃত মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল ভিন্ন। ঠিকাদার খলিলুর রহমান নিজেই স্বীকার করেন যে, তিনি কাজটি সাব-কন্ট্রাক্টে দিয়েছেন স্থানীয় একজন ব্যক্তিকে। “আমি ওখানের ঠিকাদার হলেও আমি সাব-কন্ট্রাক্টে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট দিয়েছি। ওনি নিজের মতো করে কাজ করেছে।” এই বক্তব্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের “মাল্টি-লেভেল কন্ট্রোল” পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দায়িত্ব ও জবাবদিহির সীমারেখা অস্পষ্ট। সাব-কন্ট্রাক্টরের একক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ স্থানীয়দের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক ব্যক্তি, যিনি প্রকল্পের বাস্তবায়নে প্রায় এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। আরেক ঠিকাদার আতিকুর রহমান বলেন, “আমি ঠিকাদার হলেও সব নিয়ন্ত্রণ করেছে স্থানীয় একজন ব্যক্তি। খাল কাটা, রাস্তা নির্মাণ—সবই তিনি করেছেন।” স্থানীয় কৃষকদের মতে, এই একক নিয়ন্ত্রণের কারণেই প্রকল্পের নকশা উপেক্ষিত হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্প প্রকল্প আসলে কার স্বার্থে চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় কৃষকের অভিযোগ, ঠিকাদারের বক্তব্য এবং প্রশাসনিক ব্যাখ্যার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটিই—এই প্রকল্প আসলে কার স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে? সরকারি নথিতে এটি একটি কৃষি পুনরুদ্ধার প্রকল্প। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, প্রকল্প ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক ক্ষমতার স্তর, যেখানে সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একক প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে একজন ব্যক্তি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ— খাল খননের দিক নির্ধারণ রাস্তা নির্মাণের সিদ্ধান্ত গাছ কাটার অনুমোদন জমির ব্যবহারের পরিবর্তন এক কৃষকের ভাষায়, “সব সিদ্ধান্ত একজন মানুষই নিয়েছে। আমরা শুধু ক্ষতি দেখেছি।” প্রশাসনিক তদারকি: “উপস্থিতি ছিল, নিয়ন্ত্রণ ছিল না” বিএডিসি এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকল্প পরিদর্শনের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী— নিয়মিত মনিটরিং হয়নি নকশা অনুযায়ী কাজ হয়নি পরিবর্তিত বাস্তবায়নে হস্তক্ষেপ হয়নি এক স্থানীয় কৃষকের মন্তব্য, “কাগজে প্রশাসন আছে, মাঠে নেই।” “চওড়া রাস্তা কার জন্য?”—অতিরিক্ত অবকাঠামো প্রশ্ন স্থানীয় অভিযোগ অনুযায়ী খালের দুই পাশে প্রায় ১২ ফুট চওড়া রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যা নকশায় না থাকার দাবি রয়েছে। এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে— এটি কি কৃষকের স্বার্থে? নাকি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবহারের জন্য? নাকি প্রকল্প ব্যয়ের কাঠামো বাড়ানোর অংশ? এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা আসেনি। “উন্নয়ন প্রকল্প নাকি নিয়ন্ত্রণহীন বাস্তবায়ন কাঠামো?” প্রকল্পের মূল ঠিকাদার মেসার্স রাজা এন্টারপ্রাইজ হলেও স্থানীয়দের দাবি, মাঠপর্যায়ে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল ভিন্ন হাতে। ঠিকাদার নিজেই স্বীকার করেছেন সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কাজ হস্তান্তর করা হয়েছে। “আমি সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দিয়েছি। মূল বাস্তবায়ন স্থানীয় একজন করেছেন।” এই বক্তব্য প্রকল্পের দায় নির্ধারণকে আরও জটিল করে তোলে।স্থানীয়দের মতে, এই কাঠামোই প্রকল্পকে “নিয়ন্ত্রণহীন বাস্তবায়ন ব্যবস্থায়” পরিণত করেছে। প্রকল্পের সুবিধাভোগী কারা? স্থানীয়দের অভিযোগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সুবিধা কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে— স্থানীয় ব্যক্তি অবকাঠামোগত সুবিধা পেয়েছে নির্দিষ্ট ঘের - জমির জন্য পরিবর্তন করা হয়েছে পানি ব্যবস্থাপনা উপেক্ষিত হয়েছে এক কৃষকের ভাষায়, “আমরা ক্ষতিগ্রস্ত, কেউ কেউ লাভবান।” প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতি বিএডিসির পক্ষ থেকে প্রকল্প তদারকির দায়িত্ব ছিল স্থানীয় পর্যায়ের প্রকৌশল ও মাঠ কর্মকর্তাদের ওপর। কিন্তু স্থানীয় অভিযোগ বলছে, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং হয়নি। একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, “যদি নিয়মিত তদারকি থাকত, তাহলে এমন অবস্থা হতো না।” বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী আতায়ে রাব্বী জানান, ভবিষ্যতে পাইপ স্থাপনের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। তবে তিনি অনিয়ম বা বাস্তবায়নের ত্রুটি বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। কালভার্ট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ব্যর্থতা প্রকল্পে একটি কালভার্ট থাকার কথা থাকলেও স্থানীয়রা বলছেন, সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। অনেক জায়গায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। এক কৃষকের ভাষায়, “খাল আছে, কিন্তু পানি নামার পথ নেই—এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।” স্থানীয় প্রভাব ও অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে একজন স্থানীয় ব্যক্তি এককভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন।একাধিক কৃষকের দাবি, তার সিদ্ধান্তেই খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ এবং গাছ কাটার মতো কাজ হয়েছে। প্রশাসনের নীরবতা ও কৃষকের অপেক্ষা বিএডিসি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। কৃষকদের প্রশ্ন এখন একটাই— “এই ক্ষতির দায় কে নেবে?” বিএডিসির প্রতিক্রিয়া এ ব্যাপারে বিএডিসির সহকারি প্রকৌশলী আতায়ে রাব্বী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে প্রতি কিলোমিটারে পাইপ স্থাপন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বর্তমান অভিযোগ—জলাবদ্ধতা, অনিয়ম, এবং পরিকল্পনাগত ত্রুটি—নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়ে যান। অন্যদিকে বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (সওকা) সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ জানিয়েছেন, তিনি শিগগিরই এলাকা পরিদর্শন করবেন এবং ত্রুটি থাকলে সমাধান করা হবে। “দায় এড়ানোর সংস্কৃতি” নিয়ে প্রশ্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক পক্ষ জড়িত— বিএডিসি (প্রকল্প কর্তৃপক্ষ) ঠিকাদার সাব-কন্ট্রাক্টর স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনিক তদারকি সংস্থা কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বহুপক্ষীয় কাঠামোর কারণে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। এক স্থানীয় পর্যবেক্ষকের ভাষায়, “সবাই আছে, কিন্তু দায় কারও নেই।” প্রকল্প ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই প্রকল্প ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো হলো— ঠিকাদার নির্বাচন কি স্বচ্ছ ছিল? সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থায় কতটা নজরদারি ছিল? স্থানীয় প্রভাবশালীরা কি প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে? প্রশাসনিক তদারকি কেন ব্যর্থ হলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে, স্থানীয়দের মতে এই প্রকল্প “উন্নয়ন নয়, একটি ব্যর্থ পরীক্ষার উদাহরণ” হয়েই থাকবে।চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্পে অভিযোগ শুধু অনিয়ম নয়—বরং এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরছে, যেখানে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং তদারকির মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। একটি প্রকল্প, বহু প্রশ্ন চরকাউয়ার এই খাল খনন প্রকল্প এখন স্থানীয়ভাবে এক প্রশ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে— উন্নয়ন প্রকল্প কি সত্যিই কৃষকের জন্য? নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতায় এটি নতুন সংকট তৈরি করছে? পরিকল্পনা, তদারকি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি কি পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ করেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অধরা। প্রশাসনের নীরবতা ও দায় এড়ানোর প্রশ্ন স্থানীয় প্রভাবের অভিযোগ জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বিতর্ক প্রকল্প ব্যর্থতার প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব “কার স্বার্থে এই প্রকল্প?” চরকাউয়ার প্রকল্পকে ঘিরে অভিযোগগুলো একত্র করলে একটি চিত্র স্পষ্ট হয়—এটি শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো ব্যর্থতা নয়, বরং বাস্তবায়ন কাঠামো, প্রশাসনিক তদারকি এবং স্থানীয় প্রভাবের জটিল সমন্বয়ের ব্যর্থতা। যেখানে কৃষকের জন্য উন্নয়ন আসার কথা ছিল, সেখানে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, ক্ষতি এবং অবিশ্বাস। চরকাউয়ার খাল খনন প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল কৃষি পুনরুদ্ধারের আশায়। কিন্তু স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ এবং বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, প্রকল্পটি এখনো তাদের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং জমি হারানো, জলাবদ্ধতা এবং পরিকল্পনাগত ত্রুটির অভিযোগে প্রকল্পটি এখন তদন্তের দাবি তুলেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার এক সময়ের আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের সন্তান থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বরগুনা সমবায় ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সুজনের বিরুদ্ধে। তার আয়-ব্যয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের অসামঞ্জস্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, নলছিটি উপজেলার নাঙ্গুলি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল ওহাব মল্লিক ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন। তার ছেলে নাজমুল ইসলাম সুজন কয়েক বছর আগে সমবায় ব্যাংকে চাকরি পান। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের মাধ্যমে তিনি চাকরিটি লাভ করেন। গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে আসা বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই সুজনের আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সমবায় ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালে সুজন তার নানা বাড়ির পাশেই বাবার নামে প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের একটি বাড়ি ক্রয় করেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর ফাঁকি দিতে দলিলে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া ২০২১ সালে একই এলাকায় আরও একটি জমি কেনার পর সেখানে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, বরিশাল, ঢাকা ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সুজনের নামে-বেনামে আরও সম্পদ থাকার গুঞ্জন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি নথি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। এদিকে পারিবারিক বিরোধ নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুজনের মায়ের দায়ের করা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে, যা স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একজন সরকারি সমবায় ব্যাংক কর্মকর্তার স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদের উৎস এবং ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাজমুল ইসলাম সুজন। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ ভিত্তিহীন। জমি কিনেছে আমার বাবা। এছাড়া জমি ক্রয়ের সময় ঋণ নেওয়া হয়েছে।”
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত এই মেগা প্রকল্পের আবাসন খাত ‘গ্রিন সিটি’ এখন দুর্নীতির অভিযোগে বারবার আলোচনায়। সরকারি নিরীক্ষা, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে উঠে এসেছে অস্বাভাবিক ব্যয়, প্রশ্নবিদ্ধ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং অতিরিক্ত বিলের বিস্ময়কর তথ্য। আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রে ঘুরেফিরে এসেছে সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. শওকত আকবরের নাম। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা একজন প্রকল্প পরিচালকের অগোচরে এমন ব্যয়ের অসঙ্গতি দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রায় অসম্ভব। ড্রেসিং টেবিলে ‘অস্বাভাবিক’ ব্যয় মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার ৫০০ টাকা এমন একটি ড্রেসিং টেবিল সরকারি নথিতে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে মোট ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিল কেনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে একই ধরনের পণ্যের দামে বিশাল পার্থক্য নিয়ে। কোথাও একটি ড্রেসিং টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে ৫৫ হাজার টাকা, কোথাও ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, আবার কোথাও সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এমন ব্যয়ের অনুমোদন প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরের বাইরে সম্ভব নয়। কারণ ক্রয় অনুমোদন, বিল যাচাই এবং অর্থ ছাড়—সবই শেষ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালকের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। ‘বালিশ কাণ্ড’ যেভাবে প্রতীকে পরিণত হয় রূপপুর প্রকল্প নিয়ে জনমনে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে তথাকথিত ‘বালিশ কাণ্ড’। সিএজির অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি বালিশ কেনা ও বহনের জন্য সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং এটি সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়। পরে একে একে সামনে আসে বিছানার চাদর, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ। সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহৎ আর্থিক অনিয়মের ধারাবাহিক অংশ। ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গ্রিন সিটি প্রকল্পে আসবাবপত্র কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অস্বচ্ছ। অভিযোগ রয়েছে, বাজার যাচাই ছাড়াই নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বণ্টন এবং পরে অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। সিএজির প্রতিবেদনে সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রশ্নের মুখে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা রূপপুর প্রকল্পে একের পর এক অনিয়মের সময় প্রকল্প পরিচালক ছিলেন মো. শওকত আকবর। প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিক ও নিয়মসম্মত কি না তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল তাঁর দপ্তরের। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, তাঁর দায়িত্বকালেই বালিশ, ড্রেসিং টেবিলসহ বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য সামনে এসেছে। গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ প্রকাশের পরও দীর্ঘ সময় দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠেছে—উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক সুরক্ষা ছাড়া এত বড় আর্থিক অনিয়ম কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? যদিও অভিযোগের বিষয়ে মো. শওকত আকবরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত প্রকাশ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, প্রকল্পের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায় এড়ানোর সুযোগ তাঁর নেই। দুদকের তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ দুদক সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে একাধিক অনুসন্ধান চলছে। বালিশ-কাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে গণপূর্ত বিভাগের ২৯ জন প্রকৌশলীকে তলব করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—এত নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও অনুসন্ধান সত্ত্বেও মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা কেন দেখা যাচ্ছে না? বিদেশ সফর ও বিলাসী ব্যয়ের অভিযোগ শুধু আসবাবপত্র নয়, বিদেশ সফর ও আবাসন ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য বাসা ভাড়া দেখানো হলেও তাঁরা অবস্থান করেছেন বিলাসবহুল হোটেলে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সময়েও প্রকল্পের প্রশাসনিক নেতৃত্বে ছিলেন মো. শওকত আকবর। বৃহত্তর প্রশ্ন: কতটা নিরাপদ মেগা প্রকল্পের অর্থ? সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুর প্রকল্পের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। তাঁদের যুক্তি, যদি একটি প্রকল্পে বালিশ, ড্রেসিং টেবিল ও আসবাব কেনাতেই কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়, তাহলে মূল অবকাঠামোগত কাজগুলোতে কী পরিমাণ অর্থ অপচয় বা আত্মসাৎ হয়েছে—সেটি নিয়েও জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে। এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আদালতে করা আবেদনে রূপপুর প্রকল্প থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। এমনকি ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ লোপাটের অভিযোগ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়েরের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। জবাবদিহির প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রূপপুর প্রকল্পে অনিয়মের ঘটনায় কয়েকজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনো স্পষ্ট নয়। দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে পরিচালিত একটি প্রকল্পে যদি অনিয়মের অভিযোগের পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতের মেগা প্রকল্পগুলোও একই ঝুঁকিতে পড়বে। বর্তমানে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চলমান থাকলেও জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—এত অভিযোগ, এত নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং এত তথ্য প্রকাশের পরও কেন মূল দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার দেখা যাচ্ছে না? আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম—মো. শওকত আকবর।