বাংলাদেশে হঠাৎ করে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, রেশনিং করে তেল সরবরাহ এবং অতিরিক্ত তেল মজুতের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
অনেক জায়গায় গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ তেল না পেয়ে গণপরিবহনে অফিসে যাওয়া শুরু করেছেন।
এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে শিগগিরই জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি কি সত্যিই এতটা সংকটপূর্ণ?
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
তবে বিপিসির সর্বশেষ মজুত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—বিভিন্ন জ্বালানি তেলের সরবরাহ সক্ষমতা ১৩ দিন থেকে ৭১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—এই মজুত কতটা নিরাপদ?
ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরে গত কয়েকদিন ধরে পেট্রোল পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা যাচ্ছে।
অনেক পাম্পে তেল রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে।
পাম্প মালিকদের একটি অংশ বলছেন, গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত তেল কিনে সংরক্ষণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
একজন পাম্প ব্যবস্থাপক জানান,
“সাধারণত একজন গ্রাহক যে পরিমাণ তেল নেন এখন তার চেয়ে বেশি নিচ্ছেন। অনেকেই ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছেন।”
এই প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কজনিত কেনাকাটা বা panic buying শুরু হলে বাজারে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি হতে পারে।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।
তাদের মতে, পরিস্থিতি মূলত গুজব ও আতঙ্কের কারণে জটিল হয়ে উঠছে।
একজন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তা জানান,
“আগামী মাস পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন কার্গো ইতিমধ্যেই দেশে আসছে।”
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সোমবার সকালে জ্বালানিবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। একই দিনে রাতে আরও একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে।
বিপিসির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের মজুত নিম্নরূপ:
ডিজেল
দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি হলো ডিজেল।
বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায়
১ লাখ ৫৮ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন
এতে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এই মজুত তুলনামূলকভাবে কম।
অকটেন
অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায়
২৬ হাজার ২৫১ মেট্রিক টন
এতে প্রায় ২৫ দিনের সরবরাহ দেওয়া সম্ভব।
পেট্রোল
পেট্রোলের মজুত রয়েছে প্রায়
২০ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন
এতে প্রায় ১৭ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে।
ফার্নেস অয়েল
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে প্রায়
৬৭ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন
এতে প্রায় ৪৫ দিন সরবরাহ চালানো সম্ভব।
জেট ফুয়েল
বিমান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে
৬০ হাজার ৬৯৮ মেট্রিক টন
এতে প্রায় ৪২ দিন সরবরাহ দেওয়া যাবে।
কেরোসিন
কেরোসিনের মজুত রয়েছে প্রায়
১৪ হাজার ৭৩ মেট্রিক টন
এতে প্রায় ৭১ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
মেরিন ফুয়েল
মেরিন ফুয়েলের মজুত রয়েছে
৫ হাজার ৪ মেট্রিক টন
এতে প্রায় ১৯ দিন সরবরাহ দেওয়া সম্ভব।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে মোট ১৪টি জ্বালানি কার্গো আসার কথা ছিল।
এর মধ্যে বেশিরভাগ ইতিমধ্যেই দেশে পৌঁছেছে এবং কয়েকটি পথে রয়েছে।
আগামী মাসে ১৫টি কার্গোর মধ্যে ১৩টি নিশ্চিত হয়েছে।
বাকি দুটি কার্গো মে মাসে পাঠানো হবে বলে সরবরাহকারী দেশগুলো জানিয়েছে।
এছাড়া বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও তেল আমদানি করা হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন রুট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।
বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চীনা জাহাজগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা না থাকায় বাংলাদেশের তেল পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী মাস পর্যন্ত প্রায়
২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি চূড়ান্ত হয়েছে।
এর বড় অংশ ইতিমধ্যেই দেশে আসতে শুরু করেছে।
এছাড়া আরও প্রায়
১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
এই তেল ভারত, ব্রুনাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাতে সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অর্থনীতিবিদ বলেন,
“যখন মানুষ মনে করে কোনো পণ্য সংকট হতে পারে, তখন তারা বেশি করে কিনতে শুরু করে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।”
এটিকে অর্থনীতিতে বলা হয় self-fulfilling crisis।
অর্থাৎ সংকটের ভয়ই শেষ পর্যন্ত সংকট তৈরি করে।
বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় পুরোটা বিদেশ থেকে আমদানি করে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়া বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দ্রুত ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
১. কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানো
২. বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ
৩. নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বিস্তার
৪. সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করা
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী দেশে জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক সংকট নেই।
তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
নিয়মিত আমদানি
বাজারে আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ
সরবরাহ ব্যবস্থাপনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি হঠাৎ অবনতি না ঘটে এবং আমদানি পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে দীর্ঘ লাইনের পেছনে থাকা আতঙ্ক যদি কমানো না যায়, তাহলে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত বর্তমানে ১৩ থেকে ৭১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ—যা পরিস্থিতি অনুযায়ী যথেষ্ট হলেও খুব বেশি নিরাপদ বলা যায় না।
তাই বাস্তব সংকটের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো—স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
কারণ জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে তথ্যের অভাবই অনেক সময় বাস্তব সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা তৈরি করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশে হঠাৎ করে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, রেশনিং করে তেল সরবরাহ এবং অতিরিক্ত তেল মজুতের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ তেল না পেয়ে গণপরিবহনে অফিসে যাওয়া শুরু করেছেন। এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে শিগগিরই জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি কি সত্যিই এতটা সংকটপূর্ণ? সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। তবে বিপিসির সর্বশেষ মজুত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—বিভিন্ন জ্বালানি তেলের সরবরাহ সক্ষমতা ১৩ দিন থেকে ৭১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে প্রশ্ন উঠেছে—এই মজুত কতটা নিরাপদ? পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন: আতঙ্ক না বাস্তবতা ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরে গত কয়েকদিন ধরে পেট্রোল পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনেক পাম্পে তেল রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে। পাম্প মালিকদের একটি অংশ বলছেন, গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত তেল কিনে সংরক্ষণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একজন পাম্প ব্যবস্থাপক জানান, “সাধারণত একজন গ্রাহক যে পরিমাণ তেল নেন এখন তার চেয়ে বেশি নিচ্ছেন। অনেকেই ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছেন।” এই প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কজনিত কেনাকাটা বা panic buying শুরু হলে বাজারে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি হতে পারে। বিপিসির দাবি: সংকট নেই বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তাদের মতে, পরিস্থিতি মূলত গুজব ও আতঙ্কের কারণে জটিল হয়ে উঠছে। একজন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তা জানান, “আগামী মাস পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন কার্গো ইতিমধ্যেই দেশে আসছে।” জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সোমবার সকালে জ্বালানিবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। একই দিনে রাতে আরও একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। কতদিন চলবে জ্বালানি মজুত বিপিসির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের মজুত নিম্নরূপ: ডিজেল দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি হলো ডিজেল। বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন এতে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এই মজুত তুলনামূলকভাবে কম। অকটেন অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ২৫১ মেট্রিক টন এতে প্রায় ২৫ দিনের সরবরাহ দেওয়া সম্ভব। পেট্রোল পেট্রোলের মজুত রয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন এতে প্রায় ১৭ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে। ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে প্রায় ৬৭ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন এতে প্রায় ৪৫ দিন সরবরাহ চালানো সম্ভব। জেট ফুয়েল বিমান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৬০ হাজার ৬৯৮ মেট্রিক টন এতে প্রায় ৪২ দিন সরবরাহ দেওয়া যাবে। কেরোসিন কেরোসিনের মজুত রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৭৩ মেট্রিক টন এতে প্রায় ৭১ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। মেরিন ফুয়েল মেরিন ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৫ হাজার ৪ মেট্রিক টন এতে প্রায় ১৯ দিন সরবরাহ দেওয়া সম্ভব। আমদানি পরিস্থিতি কী জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে মোট ১৪টি জ্বালানি কার্গো আসার কথা ছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগ ইতিমধ্যেই দেশে পৌঁছেছে এবং কয়েকটি পথে রয়েছে। আগামী মাসে ১৫টি কার্গোর মধ্যে ১৩টি নিশ্চিত হয়েছে। বাকি দুটি কার্গো মে মাসে পাঠানো হবে বলে সরবরাহকারী দেশগুলো জানিয়েছে। এছাড়া বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও তেল আমদানি করা হতে পারে। হরমুজ প্রণালী সংকট কতটা প্রভাব ফেলতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন রুট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চীনা জাহাজগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা না থাকায় বাংলাদেশের তেল পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম। অতিরিক্ত আমদানির পরিকল্পনা জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী মাস পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি চূড়ান্ত হয়েছে। এর বড় অংশ ইতিমধ্যেই দেশে আসতে শুরু করেছে। এছাড়া আরও প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। এই তেল ভারত, ব্রুনাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আতঙ্কের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাতে সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অর্থনীতিবিদ বলেন, “যখন মানুষ মনে করে কোনো পণ্য সংকট হতে পারে, তখন তারা বেশি করে কিনতে শুরু করে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।” এটিকে অর্থনীতিতে বলা হয় self-fulfilling crisis। অর্থাৎ সংকটের ভয়ই শেষ পর্যন্ত সংকট তৈরি করে। বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় পুরোটা বিদেশ থেকে আমদানি করে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়া বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দ্রুত ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি— ১. কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানো ২. বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ ৩. নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বিস্তার ৪. সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করা সামনে কী হতে পারে বর্তমান তথ্য অনুযায়ী দেশে জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক সংকট নেই। তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: নিয়মিত আমদানি বাজারে আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি হঠাৎ অবনতি না ঘটে এবং আমদানি পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘ লাইনের পেছনে থাকা আতঙ্ক যদি কমানো না যায়, তাহলে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত বর্তমানে ১৩ থেকে ৭১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ—যা পরিস্থিতি অনুযায়ী যথেষ্ট হলেও খুব বেশি নিরাপদ বলা যায় না। তাই বাস্তব সংকটের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো—স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে তথ্যের অভাবই অনেক সময় বাস্তব সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা তৈরি করে।
চা-বাগান মানেই চোখ জুড়ানো সবুজ, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি ঢাল, সারি সারি চা-গাছ আর সেই গাছের ফাঁকে ফাঁকে নীরবে নুয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষ গজিয়ে ওঠা সবুজ কচি পাতা তুলছে। কি অপূর্ব এক দৃশ্য। এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসÑ যেখানে চা-শ্রমিকদের জীবন আজও অচল হয়ে এক জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অবহেলা ও বৈষম্যের প্রতীক হয়ে। আমাদের দেশের চা-চাষের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ এবং পুরাতন। ১৮৫৪ সালে সিলেটে যখন ব্রিটিশরা চায়ের বাগান তৈরি করে চা উৎপাদন শুরু করে তখন সিংহভাগের দখলে ছিল ব্রিটিশ বণিকরা। মাইলের পর মাইল বিশাল এই চা-বাগানে কাজ করবার জন্য দরকার ছিল বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কর্মহীন, শিক্ষাহীন, ভিন্ন ভাষাভাষী ও শ্রমিকশ্রেণির হিন্দু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনকে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চা-বাগান এলাকাগুলোতে নিয়ে আসা হয়। বাগানের মাঝে ছোট মাটির ঘরে চা-শ্রমিকদের বসবাস শুরু হয়। প্রতিশ্রুতি ছিল কাজ, বাসস্থান ও নিরাপদ জীবনের। বাস্তবে তারা পেয়েছে শোষণ, বন্দিত্ব আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা দরিদ্রতা। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু চা-শ্রমিকদের ভাগ্য কার্যত বদলায়নি। তাদের ঘরে রাত্রে ঘুমানোর খাট নাই, তাদের থাকার ঘরে বৃষ্টির রাতে তিন-চারবার ঘুমের স্থান বদলাতে হয়, কারণ বৃষ্টি বেশি হলে ওপরের ছাদ থেকে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় পানি পড়ে। এই হচ্ছে তাদের নিয়তি। চা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত চা-বাগানের সংখ্যা ১৭১টি। এই বাগানগুলোর মালিক হচ্ছে জেমস ফিনলে, ডানকান ব্রাদারস, নেশনেল টি কোম্পানি, দেউন্দি টি কোম্পানি, এম আহমদ টি অ্যান্ড ল্যান্ড। তার মধ্যে প্রায় ১০টি চা-বাগান সম্পূর্ণ অসুস্থ। এই বাগানগুলোতে চা-পাতা তোলা হয় না কর্মচারী/বাবুগণ বিগত ৪৮ মাস যাবৎ কোনো বেতন পান না। সবাই বাগানে থেকেই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে জীবন চালাচ্ছেন। বাগানের শ্রমিকরা দৈনিক ভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন, কেউবা তাদের বাগানের কাছে অবস্থিত খাসিয়াপুঞ্জিতে খাসিয়া মেয়েদের সঙ্গে পানগাছ থেকে পান তুলতে সাহায্য করেন। আবার অনেক বেকার শ্রমিক পাশের শহরে রিকশা, ঠেলাগাড়ি চালান অথবা দিনমজুরের কাজ করে থাকেন। এই বাগানগুলো মূলত সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড় ও রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত। সবচেয়ে বেশি চা-বাগান রয়েছে মৌলভীবাজারে ৯৬টি। বাগানগুলোতে শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। তবে, পরিবারসহ চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ বা তার বেশি। যাদের বেশিরভাগ নারী। জানা গেছে, প্রায় ৬৪ শতাংশই নারী, যাদের প্রায় সবাই খুব ছোটবেলা থেকেই চা-বাগানে কাজ করতে বাধ্য হন। মৌলভীবাজার তথা পুরো সিলেটের চায়ের রাজ্যে আমার নিজের পর্যবেক্ষণের আলোকে বলছি, দেশে যখন শহুরে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি যেন রাষ্ট্রীয় বিবেকের কাছে অদৃশ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দোলনের পর মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা এখনও ন্যূনতম মানবিক জীবনের জন্য যথেষ্ট নয়। দৈনিক কয়েকশ টাকায়Ñ যেখানে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক সবই জোগাড় করতে হয় সেখানে চা-শ্রমিক পরিবারগুলো দিনের পর দিন অপুষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। আসলে একজন চা-শ্রমিকের কাজ শুধু চা-পাতা তোলা নয়। পাহাড়ি ঢালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করা, নির্দিষ্ট কোটা অর্থাৎ জনপ্রতি আড়াই কেজি কাঁচাপাতা প্রতিদিন বিকাল ৫টার মধ্যে তোলা পূরণ না হলে মজুরি কাটা যায়, সব মিলিয়ে এ এক কঠিন শ্রমযাপন। অথচ সেই শ্রমের ন্যায্যমূল্য তারা পান না। বেশিরভাগ চা-শ্রমিক আজও বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া কুঁড়েঘরে বসবাস করেন। জরাজীর্ণ ঘর, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশনের ভয়াবহ অবস্থাÑ এসব যেন চা-বাগানের নিত্যচিত্র। আধুনিক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতির গল্প চা-শ্রমিকদের ছুঁতে পারেনি। ৭ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরে পুরো পরিবারের বাস, শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে সুযোগই নেই। উপরন্তু দ্রব্যমূল্য পাল্লা দিয়ে বাড়লেও তাদের বেতন সেভাবে বাড়ে না। এভাবে নানা বঞ্চনা নিয়ে দুর্দশার জীবন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের চা-শ্রমিকরা। দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন হলেও চা-বাগান যেন এখনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এখানে পৌঁছে না আধুনিকতার আলো, মেলে না জীবনধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। দেশের চা-বাগানের মধ্যে ৯৬টির অবস্থান মৌলভীবাজারে। আর এখানকার চা-শ্রমিকদের বিশেষ করে নারীদের দুর্দশা-বঞ্চনা আর ক্রীতদাসের মতো জীবনের যেন শেষ নেই। চা-বাগানের নিজস্ব হাসপাতাল বা ডিসপেনসারিগুলোতে চিকিৎসা সীমিত। গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে শহরে যাওয়ার সামর্থ্য অনেকের নেই। মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টিÑ সব মিলিয়ে চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠী আজও এক প্রান্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। বাংলাদেশের কোনো শিল্পাঞ্চলে কোনো মদের দোকান নেই শুধু ব্যতিক্রম চা-বাগান। প্রতিটি চা-বাগানে একাধিক মদের দোকান আছে। স্থানীয় ভাষায় মদের পাটটা বলে। প্রায় সব চা-শ্রমিকই মদপানে আসক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত আছে ৮৪টি মদের পাটটা। আধো আলো আর আধো ছায়ার মধ্যে চা-বাগানগুলো তাদের উপস্থিতি টিকিয়ে রাখে। জানা গেছে, সেখানে চা-চাষে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ভূমির পরিমাণ ১,১৪,০১৪ হেক্টর কিন্তু বাস্তবে চাষ হচ্ছে ৫০,৪৭০ হেক্টরে। চা-বাগানে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হচ্ছে, তাই বন্যপ্রাণীও চা-বাগান এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়কর সত্য হলো চাশিল্প ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান, সেখানে চা-শ্রমিকের উপস্থিতি নেই। শিক্ষাই পারে দারিদ্র্যের শিকল ভাঙতেÑ এই সত্যটি চা-শ্রমিকদের জীবনে বারবার প্রমাণিত হয়নি। বাগানের ভেতরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা আর ঝরে পড়ার হার অত্যন্ত বেশি। শিশুরা অল্প বয়সেই কাজে নেমে পড়েÑ কারণ পরিবার চালাতে অতিরিক্ত আয়ের দরকার। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-শ্রমিক হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে। একজন চা-শ্রমিকের সন্তান চা-শ্রমিক ছাড়া অন্য কিছু হতে পারবেÑ এই স্বপ্ন এখনও অনেকের কাছে বিলাসিতা। চা-শ্রমিকদের বড় একটি অংশ আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা সামাজিকভাবেও বৈষম্যের শিকার। জাতীয় মূলধারার রাজনীতি, প্রশাসন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ভোটের সময় তারা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভোটের পরে তাদের দাবিদাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া হয়। নাগরিক অধিকার থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা-শ্রমিকদের আন্দোলন দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছে। মজুরি বৃদ্ধি, রেশন সুবিধা, চিকিৎসা ও শিক্ষা উন্নয়নের দাবি তুলেছেন তারা। সরকার ও মালিকপক্ষ আলোচনায় বসেছে, কিছু প্রতিশ্রুতিও এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের গতি ধীর, অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ। এ কথা সত্য যে, বিগত সরকারের আমলে চা-শ্রমিকদের বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তাদের দুর্দশাকে রাষ্ট্রীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। যদিও এসব উদ্যোগ প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত। সবচেয়ে আলোচিত অবদান ছিল চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি। দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২২ সালে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। সরকারের মধ্যস্থতায় মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত আসে। এতে চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের একটি তাৎক্ষণিক সুরাহা হলেও মজুরি এখনও ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে। তৎকালীন সরকার চা-শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা কিছুটা অর্থ বাড়ায়। ভিজিডি, ভিজিএফ, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিতে চা-শ্রমিক পরিবারের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি চা-বাগানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র উন্নয়ন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকার ‘চা-শ্রমিক উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রণয়নের কথা বললেও তার পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই এসব দায়িত্ব মালিকপক্ষের ওপরই ন্যস্ত রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকার চা-শ্রমিকদের সমস্যা স্বীকার করছে, তবে কাঠামোগত বৈষম্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর সংস্কার দরকার ছিল, তা এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে। আমি মনে করি, চা-শ্রমিকদের জন্য দয়া নয়, প্রয়োজন অধিকারভিত্তিক নীতি। তাই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মানবিক জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবাকে বাগান কর্তৃপক্ষের দয়ার ওপর না রেখে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। তাদের নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। চায়ের কাপ হাতে আমরা যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, তখন খুব কমই মনে রাখি এই চায়ের পেছনে রয়েছে নিঃস্ব মানুষের ঘাম, ক্লান্তি আর অদৃশ্য কান্না। বাংলাদেশের চা-শিল্প টিকে আছে চা-শ্রমিকদের শ্রমে। অথচ তারাই আজ সবচেয়ে অবহেলিত। মনে রাখতে হবে, চা-শ্রমিকদের উন্নয়ন মানে কেবল একটি শ্রমগোষ্ঠীর উন্নয়ন নয়Ñ এটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার এক অপরিহার্য শর্ত। আমি বলতে চাই, সবুজ চা-বাগানের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই সবুজের ভেতর থাকা মানুষগুলোর জীবনেও সবুজতা ফিরে আসবে। মতি লাল দেব রায় কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম এবং দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ দুই নেত্রীকে (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) ছাড়া প্রথম নির্বাচন—যেটি ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে বলে একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস—সেই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। আপনি যখন লেখাটি পড়ছেন, ততক্ষণে অনেকেই ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামীকাল অর্থাৎ শুক্রবার দুপুরের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়া যাবে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও আধুনিক অটোমেশন সিস্টেম ও একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। যদিও দুর্গম কিছু এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে ফলাফল পেতে সামান্য বিলম্ব হতে পারে, তবে কোনোভাবেই তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনি পরিবেশ অনেক বেশি চমৎকার ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে। একই দিনে দুই ভোট এবারের নির্বাচনে ফলাফল হবে দুটি। কারণ এবার একই দিনে দুটি নির্বাচন হচ্ছে। একটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্যটি জুলাই সনদ প্রশ্নে গণভোট। ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে। একটিতে তিনি জাতীয় নির্বাচনে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। আরেকটি জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় তার সম্মতি আছে কিনা, সেই প্রশ্নে হ্যাঁ বা না সিল মারবেন। যদিও এই গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ও সংশয়ের অন্ত নেই। এমনকি বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য সরকারের তরফে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া কাঙ্ক্ষিত ছিল, তাও চোখে পড়েনি। বরং ব্যালট পেপারে হ্যাঁ ও না দুটি অপশন থাকলেও সরকার শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রধান উপদেষ্টা নিজে এবং তার উপদেষ্টাগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর সাফাই গেয়েছেন, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের হ্যাঁ বা না ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোকে আইনত দণ্ডনীয় বলেছে। তার মানে হ্যাঁ-না ভোটের প্রশ্নে সরকারের মধ্যেই দ্বিধা ও বিভ্রান্তি ছিল, আছে। বাংলাদেশে অতীতের তিনটি গণভোটের অভিজ্ঞতা বলছে, গণভোটের ফলাফল আসলে পূর্বনির্ধারিতই থাকে। অর্থাৎ হ্যাঁ না ভোটে সাধারণত হ্যাঁ জয়ী হয়। কারণ ‘হ্যাঁ’ জিতলেই কেবল সরকার তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারে বা নিজের কর্মকাণ্ডে জনগণের বৈধতা বা সম্মতি আদায় করতে পারে। তবে এবারের গণভোট যেহেতু হচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এবং একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, সুতরাং এবার গণভোটের ফলাফল নির্ধারিত নয় বা গণভোটের জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে, এটিই প্রত্যাশিত। যেসব প্রশ্নে গণভোট হচ্ছে, আশা করা যায় দেশের অধিকাংশ মানুষই সেসব সংস্কারের পক্ষে। সংস্কার মানে যদি হয় ইতিবাচক পরিবর্তন, তাহলে সেই পরিবর্তন কে না চায়? কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই সংস্কারের পক্ষে জনগণের মতামত নেওয়া হচ্ছে সেটি ত্রুটিপূর্ণ। অথচ এই ত্রুটি এড়িয়ে আগে নির্বাচন, তারপর সংসদে সংস্কার প্রস্তাবগুলো পাস করে গণভোটে দিলে এই বিতর্ক এড়ানো যেতো। তার আগে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে জনগণকে সুস্পষ্টভাবে জানানো এবং এগুলো যে সত্যিই দেশের কল্যাণের জন্য করা হচ্ছে, সেই বিশ্বাস জনমনে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত ছিল। কেননা অধিকাংশ মানুষের কাছেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো পরিষ্কার নয়। উপরন্তু এই ধারণাও জনমনে আছে যে, জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য মুক্তিযেুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানকে পাল্টে দেওয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। জুলাইযোদ্ধাদেরকে মুক্তিযাদ্ধাদের সমান করে তোলার চেষ্টা ইত্যাদি। সেইসাথে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ফ্যাক্টগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা গত দেড় বছর ধরে চলছে, সেটির আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোট নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণাও জনমনে আছে। কিন্তু সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে জুলাই সনদ বা গণভোটের ব্যাপারে মানুষের মনে পরিষ্কার ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এটা ধারণা করাই যায় যে, বিপুল সংখ্যক মানুষ না বুঝেই গণভোটে হ্যাঁ বা না দেবেন। অনেকে পরিচিতজনের কথায় হ্যাঁ বা না দেবেন। অর্থাৎ সেখানে তার নিজের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে না। অনেকে হয়তো জটিলতা এড়ানোর জন্য গণভোটে অংশই নেবেন না। কেবল জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটে সিল দেবেন। এবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট নেওয়ার পেছনে সরকারের হয়তো এরকম একটি উদ্দেশ্য ছিল যে, জাতীয় নির্বাচনের পরে আবার একটি গণভোটে খুব বেশি মানুষ সাড়া দেবে না। তাই যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের মানুষ ভোট দিতেই যাবে অতএব একই দিনে গণভোটের ব্যপারেও তাদের মতামত নেওয়া যায়। কিন্তু কাজটা সহজ করতে গিয়ে একটা বড় ধরনের ত্রুটি জিইয়ে রাখা হলো যা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে। তারপরও দেশ ও মানুষের কল্যাণেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে—এই বিশ্বাস থেকে প্রত্যাশা করা যায় যে, প্রধান উপদেষ্টার ভাষায় এবার ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ না হলেও অন্তত একটা ভালো নির্বাচন হবে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ভবনে উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য আয়োজিত ব্রিফিং শেষে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলারও বলেছিলেন, ‘এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন।’ ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন বলতে আসলে কী বুঝায়—সেটি অনেক বড় তর্ক। সেই তর্কে না গিয়েও এটা বলা যায় যে, ভালো নির্বাচন মানে হলো তফসিল ঘোষণার পর আগ্রহী সব প্রার্থী নির্বিঘ্নে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা রাজনৈতিক কারণ বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত হবেন না। প্রতীক বরাদ্দের পরে প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে প্রচার-প্রচারণা চালাবেন এবং সেখানে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে যা নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন। কোনও প্রার্থীকে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে সরকারের কোনও বাহিনী চাপ প্রয়োগ করবে না। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোটের একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে। ভোটের দিন ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্ভয়ে ফিরবেন। জাল ভোট, কেন্দ্রদখল বা সহিংসতা হবে না। ভোট গণনায় কোনও ধরনের কারচুপি হবে না। কোনও নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জয়ী করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা উৎসাহ দেখাবেন না বা এ বিষয়ে তাদের ওপর কোনও ধরনের রাষ্ট্রীয় চাপ থাকবে না। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী সেটি মেনে নেবেন। অনেক সময় ভোট সুষ্ঠু বা শান্তিপূর্ণ হলেও সেখানেও কারচুপি হতে পারে। ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। সুতরাং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন মানেই সেটি গ্রহণযোগ্য ভোট নাও হতে পারে। একটি নির্বাচনকে তখনই ভালো নির্বাচন বলা যায় যখন সেটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে বিগত দিনে হওয়া ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া আর কোনও নির্বাচনই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। ওই তিনটি নির্বাচন নিয়েও পরাজিত দলের পক্ষ থেকে কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু ভালো নির্বাচনের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেগুলো ছিল গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। গত তিনটি নির্বাচনে যে মানুষেরা ভোট দিতে পারেনি বা ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি, তারা এবার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে কোনও ধরনের ভয়-ভীতি ও চাপমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারলেই খুশি হবে। কেননা সংবিধান যে জনগণকে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক বলে ঘোষণা করেছে, সেই মালিকানা প্রয়োগের প্রধান উপায় যে ভোট—সেই ভোট দিতে না পারার ক্ষোভও যে আওয়ামী লীগের পতনের পেছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। অতএব এবারও যদি মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারে বা এবারও যদি সরকার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে এবং কোনও একটি দল বা জোটকে জিতিয়ে আনার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে—তাহলে দেশ যে সংকটের ভেতরে ছিল, তার চেয়ে বড় সংকটে পতিত হবে। নির্বাচন কমিশন যতই নিরপেক্ষ থাকুক, নির্বাচন কেমন হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে ডিসি-এসপিদের ওপরেই। বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব কিনা—সেটি অনেক পুরনো তর্ক। কেননা নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতই দলনিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী ও যোগ্য হোন না কেন; মাঠ প্রশাসন যদি না চায়, তাহলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভোট কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে যে সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে; তারা কেমন ভোট চায়, তার ওপর। মাঠ প্রশাসন যেহেতু সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের অধীন এবং নির্বাচন কমিশনের কথা না শুনলে যেহেতু তাদের কোনও শাস্তির ভয় নেই কিংবা শাস্তি হলেও নির্বাহী বিভাগ থেকে তার ‘সুরক্ষা’ ব্যবস্থার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে; মাঠ প্রশাসন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশের বাইরে যাবে না। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কী নির্দেশনা দিল, তার চেয়ে বড় কথা- সরকার বা নির্বাহী বিভাগ তাকে কী বলছে? নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। ভোট পরিচালনায় যে বিপুল সংখ্যক জনবল দরকার, সে পরিমাণ লোক তার নেই। ফলে তাকে পুরো নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্ভর করতে হয় নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের ওপর। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ বলছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ভোট পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে যে সহায়তা চাইবে, সরকার সেটি দিতে বাধ্য। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কর্মী নন। বরং তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োজিত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিরা যা বলবেন, যে নির্দেশনা দেবেন, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে ভয়-ভীতি ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন, তার ওপর নির্ভর নির্বাচনটি কেমন হবে। অর্থাৎ মাঠ প্রশাসন যদি ইসিকে সহায়তা না করে; তারা যদি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর মতো আচরণ করে; মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ না থাকে বা থাকতে না পারে— তাহলে খুব ভালো নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ধরা যাক, সিইসি ও কমিশনার হিসেবে দেশের সবচেয়ে মেধাবী, যোগ্য, সৎ ও সাহসী মানুষেরাই নিয়োগ পেলেন। কিন্তু একটি নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। পুরো সিস্টেম যদি ভালো নির্বাচনের সহায়ক না হয়, তাহলে একজন সিইসি এবং চারজন কমিশনারের পক্ষে কিছুই করার নেই। তাদের নিয়ত যদি ‘সহিহ’ হোক না কেন, পুরো সিস্টেম যদি তাদেরকে সহযোগিতা না করে তাহলে তাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়। যদি সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি সহযোগিতা না দেয়; যদি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে শুধুমাত্র পুলিশিং বা বিচার করে নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব নয়। বিগত তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত খারাপ নির্বাচন হয়েছে, এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। কিন্তু এই খারাপ নির্বাচনের দায় শুধু ওই তিন সিইসির নয়। এটা পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার ত্রুটি। মনে রাখতে হবে, পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ হওয়ার পরও সেই ভোট গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। যেমন- একটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফল ঘোষণা পর্যন্ত কোনও হানাহানি হলো না, কোনও প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়া হলো না, কাউকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হলো না; কিন্তু দেখা গেলো মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি বা ভোটার উপস্থিতি খুবই কম। যেহেতু সংবিধানে ন্যূনতম ভোটের বিধান নেই, অর্থাৎ নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পেতে হবে এবং প্রাপ্ত ভোটের কত শতাংশ না পেলে জয়ী বলা যাবে না—এমন কোনও বিধান যেহেতু সংবিধানে বা নির্বাচনি আইনে (আরপিও) নেই, ফলে অনেক সময় দেখা গেছে ১০ শতাংশ ভোট পেয়েও অনেকে এমপি বা মেয়র নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটিকে সুষ্ঠু ভোট বলা হলেও কোনও অর্থেই ভালো নির্বাচন বলা যায় না। আবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলে সেখানে কোনও ভোটই হয় না। ভোট না হলে সেখানো কোনও সংঘাত হয় না। তাতে ওই ভোটটি শান্তিপূর্ণ বা সংঘাতমুক্ত হলো বটে, কিন্তু এটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নয়। পরিশেষে, ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন প্রয়োজন নেই, বরং অন্তর্বর্তী সরকার যদি নির্বাচনে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে বা করতে না পারে; সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করে—তাহলেই একটা ভালো নির্বাচন করা সম্ভব এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ যাদেরকে চাইবে তারা যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে দেশ ও জাতির জন্য বিরাট পাওয়া। লেখক: সাংবাদিক