বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং সমালোচনা।
কারণ, এই মন্ত্রিসভায় দেখা গেছে এক বড় ধরনের প্রজন্মগত পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে দলের কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং খালেদা জিয়ার শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা অনেক প্রবীণ নেতা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ এবং জোটের তরুণ নেতাদের ওপর আস্থা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু মন্ত্রিসভা গঠন নয়—এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় মোট সদস্য সংখ্যা ৪৯। এর মধ্যে প্রায় ৪০ জনই নতুন মুখ।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এই মন্ত্রিসভার বৈশিষ্ট্য হলো—
তরুণ নেতৃত্বের প্রাধান্য
জোটের কিছু নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি
টেকনোক্র্যাট নিয়োগ
প্রবীণদের আংশিক সাইডলাইন
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্ত্রিসভা বিএনপির ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব কাঠামোর তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের নাম মন্ত্রিসভায় না থাকা।
তাদের মধ্যে রয়েছেন:
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
ড. আব্দুল মঈন খান
এই তিনজনই অতীতে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং সেলিমা রহমানও মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির দুঃসময়ে দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে এই নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে তারেক রহমান বিদেশে নির্বাসনে এবং খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকার সময় দলকে সক্রিয় রাখতে তাদের ভূমিকা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে স্বীকৃত।
তবে পুরোপুরি বাদ পড়েননি দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা।
একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন,
“দলের প্রবীণদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। উপদেষ্টা পদ দিয়ে সেই অসন্তোষ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”
মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
তিনি বলেন,
“মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাওয়ার বিষয়টি দেখছেন দলের চেয়ারম্যান। এটা নিয়ে আমার মন্তব্য না করা ভালো।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযত প্রতিক্রিয়া দলীয় শৃঙ্খলার ইঙ্গিত দেয়।
তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় বিএনপির বাইরের কিছু রাজনৈতিক দল থেকেও নেতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন:
গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি
গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর
এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ
এই অন্তর্ভুক্তিকে অনেকেই জোট রাজনীতির নতুন বার্তা হিসেবে দেখছেন।
তবে সব জোটসঙ্গী সন্তুষ্ট নন।
যুগপৎ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অংশীদার কয়েকটি দলের নেতারা মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর নাম আলোচনায় থাকলেও তারা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ নিয়ে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন,
“প্রথমত এটি পুরোটাই বিএনপির সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের দুই-তিনজন থাকছেন। বিএনপি বাস্তবে যুগপৎ সঙ্গীদের বাদ দিয়েই হাঁটছে।”
তিনি আরও বলেন,
“কঠিন সময়ের সঙ্গীদের বাদ দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক অভিঘাত পরে বোঝা যাবে।”
এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে খলিলুর রহমানকে।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বিএনপির ভেতরে অনেক নেতাকর্মী তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন।
বিশেষ করে দুটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক ছিল—
বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা
রোহিঙ্গা করিডোর প্রস্তাব
তবুও এমপি না হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলের ভেতরে অনেকেই এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে আরও কয়েকজনের নাম মন্ত্রিসভায় আসতে পারে বলে আলোচনায় ছিল।
তাদের মধ্যে ছিলেন—
মীর নাছির
আলতাফ হোসেন চৌধুরী
বরকত উল্লাহ বুলু
লুৎফুজ্জামান বাবর
আমান উল্লাহ আমান
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কেউই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।
এছাড়া দলের দুঃসময়ের কান্ডারি হিসেবে পরিচিত যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় ছিল। তাকেও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে গুঞ্জন ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হয়নি।
বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“তারেক রহমান তার নিজের রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার এখতিয়ার।”
তিনি আরও বলেন,
“মর্নিং শোজ দ্য ডে—এখন দেখার বিষয় এই মন্ত্রিসভা কতটা কার্যকর হয়।”
তবে সব প্রবীণ নেতা বাদ পড়েননি।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন—
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী
সালাহউদ্দিন আহমদ
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু
ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন
হাফিজ উদ্দিন খান
এদের অন্তর্ভুক্তি দলীয় অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই মন্ত্রিসভা তিনটি বার্তা দেয়।
প্রথমত, বিএনপি নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট ও জোট রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা থাকতে পারে।
তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রবীণ নেতাদের একটি বড় অংশ যদি নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন, তাহলে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে এই মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা।
যদি সরকার সফলভাবে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তারেক রহমানের এই ‘নতুন নেতৃত্বের পরীক্ষা’ সফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কিন্তু যদি দলীয় অসন্তোষ বাড়ে, তাহলে তা সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
একজন বিশ্লেষকের ভাষায়,
“এই মন্ত্রিসভা শুধু সরকার গঠনের ঘটনা নয়, এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখারও ইঙ্গিত।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং সমালোচনা। কারণ, এই মন্ত্রিসভায় দেখা গেছে এক বড় ধরনের প্রজন্মগত পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে দলের কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং খালেদা জিয়ার শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা অনেক প্রবীণ নেতা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ এবং জোটের তরুণ নেতাদের ওপর আস্থা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু মন্ত্রিসভা গঠন নয়—এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। নতুন মন্ত্রিসভায় বড় পরিবর্তন তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় মোট সদস্য সংখ্যা ৪৯। এর মধ্যে প্রায় ৪০ জনই নতুন মুখ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই মন্ত্রিসভার বৈশিষ্ট্য হলো— তরুণ নেতৃত্বের প্রাধান্য জোটের কিছু নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি টেকনোক্র্যাট নিয়োগ প্রবীণদের আংশিক সাইডলাইন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্ত্রিসভা বিএনপির ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব কাঠামোর তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। বাদ পড়া হেভিওয়েট নেতারা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের নাম মন্ত্রিসভায় না থাকা। তাদের মধ্যে রয়েছেন: ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ড. আব্দুল মঈন খান এই তিনজনই অতীতে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং সেলিমা রহমানও মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির দুঃসময়ে দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে এই নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তারেক রহমান বিদেশে নির্বাসনে এবং খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকার সময় দলকে সক্রিয় রাখতে তাদের ভূমিকা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে স্বীকৃত। উপদেষ্টা পদে ‘সমঝোতা’? তবে পুরোপুরি বাদ পড়েননি দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা। মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, “দলের প্রবীণদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। উপদেষ্টা পদ দিয়ে সেই অসন্তোষ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।” মঈন খানের প্রতিক্রিয়া মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাওয়ার বিষয়টি দেখছেন দলের চেয়ারম্যান। এটা নিয়ে আমার মন্তব্য না করা ভালো।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযত প্রতিক্রিয়া দলীয় শৃঙ্খলার ইঙ্গিত দেয়। জোট রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় বিএনপির বাইরের কিছু রাজনৈতিক দল থেকেও নেতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন: গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ এই অন্তর্ভুক্তিকে অনেকেই জোট রাজনীতির নতুন বার্তা হিসেবে দেখছেন। যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের ক্ষোভ তবে সব জোটসঙ্গী সন্তুষ্ট নন। যুগপৎ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অংশীদার কয়েকটি দলের নেতারা মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর নাম আলোচনায় থাকলেও তারা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ নিয়ে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “প্রথমত এটি পুরোটাই বিএনপির সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের দুই-তিনজন থাকছেন। বিএনপি বাস্তবে যুগপৎ সঙ্গীদের বাদ দিয়েই হাঁটছে।” তিনি আরও বলেন, “কঠিন সময়ের সঙ্গীদের বাদ দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক অভিঘাত পরে বোঝা যাবে।” সবচেয়ে বড় চমক: খলিলুর রহমান এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে খলিলুর রহমানকে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিএনপির ভেতরে অনেক নেতাকর্মী তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। বিশেষ করে দুটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক ছিল— বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা রোহিঙ্গা করিডোর প্রস্তাব তবুও এমপি না হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের ভেতরে অনেকেই এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। যাদের কপাল খুলল না সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে আরও কয়েকজনের নাম মন্ত্রিসভায় আসতে পারে বলে আলোচনায় ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন— মীর নাছির আলতাফ হোসেন চৌধুরী বরকত উল্লাহ বুলু লুৎফুজ্জামান বাবর আমান উল্লাহ আমান কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কেউই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। এছাড়া দলের দুঃসময়ের কান্ডারি হিসেবে পরিচিত যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় ছিল। তাকেও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে গুঞ্জন ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হয়নি। নেতৃত্বের নতুন কৌশল? বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তারেক রহমান তার নিজের রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার এখতিয়ার।” তিনি আরও বলেন, “মর্নিং শোজ দ্য ডে—এখন দেখার বিষয় এই মন্ত্রিসভা কতটা কার্যকর হয়।” যারা অবস্থান ধরে রেখেছেন তবে সব প্রবীণ নেতা বাদ পড়েননি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সালাহউদ্দিন আহমদ ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন হাফিজ উদ্দিন খান এদের অন্তর্ভুক্তি দলীয় অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই মন্ত্রিসভা তিনটি বার্তা দেয়। প্রথমত, বিএনপি নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট ও জোট রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা থাকতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। প্রবীণ নেতাদের একটি বড় অংশ যদি নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন, তাহলে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সামনে কী হতে পারে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে এই মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা। যদি সরকার সফলভাবে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তারেক রহমানের এই ‘নতুন নেতৃত্বের পরীক্ষা’ সফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যদি দলীয় অসন্তোষ বাড়ে, তাহলে তা সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, “এই মন্ত্রিসভা শুধু সরকার গঠনের ঘটনা নয়, এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখারও ইঙ্গিত।”
ফারজানা আক্তার: আত্মহত্যা একটি নীরব মানসিক ব্যাধি। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, এর পিছনে লুকিয়ে আছে হাজারো নীরব আর্তনাদের বাস্তবতা। একটি অল্পবয়সী জীবন, যার বয়সটা রঙিন ফানুশের ওড়ানোর সময়, হাজার স্বপ্নের জাল বোনার কথা সেই মানুষটাই সাদাকালো পৃষ্ঠার মলাটে নিজেকে চিরবিদায় জানানোর ঘোর নেশায় মত্ত। প্রতিদিন নানা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়া আত্মহত্যার বার্তা যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এই নীরব আত্মঘাতক হাহাকার একটি নক্ষত্রের আলোকে অন্ধকারে ধাবিত করে। মানুষটি বুঝে ওঠার আগেই জীবনের ধ্বংসাত্মক খেলার কাছে হার মানে। আর পৃথিবীকে বিনিময়ে দিয়ে যায় তার নিথর সমাধি। আত্মহত্যার পিছনে সবচেয়ে দায়ী ভূমিকা রাখে মানসিক যত্নের অবহেলা তথা আত্মসচেতনতার অভাব। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে আমরা যেন ভুলতে চললাম মানসিক যত্নের গুরুত্ব কতটুকু! আমরা মানসিক যত্ন নিয়ে ততটা তৎপর নই, অথচ মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখাটা সহজ নয়। নেতিবাচকতা একজন মানুষকে নীরবে আত্মহত্যার মতো সর্বনিকৃষ্ট কাজের সম্মুখীন করে। ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তি বোঝার পূর্বেই জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়। তাই মনের যত্নের বিকল্প নেই। মনের যত্ন নেওয়ার অর্থ হলো শারীরিক যত্নের ন্যায় মানসিকভাবে নিজেকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা। আত্মহত্যার কারণ বহুবিধ এবং জটিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্রতিরোধযোগ্য। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে প্রায় ১৩ হাজার ৪৯১ জন। গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ জনে। ডিসেম্বর মাসের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনও প্রস্তুত না হওয়ায় সর্বশেষ চিত্র পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপ (২০২২-২৩) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছেন ২০ হাজার ৫০৫ জন। পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯২০ জন। আত্মহত্যা ব্যক্তিগত, পারবারিক, সামাজিক নানা কারণে হয়ে থাকে। WHO অনুমান করে যে ২০% মানুষ আত্মহত্যা করে তারা কীটনাশক বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশের বিবরণীতে ফাঁস, বিষপান, গায়ে আগুন, রেললাইনে ঝাঁপ ও অন্যান্যÑ এই পাঁচভাবে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা। এরপর ব্যবহৃত পদ্ধতি বিষপান। কেবল ব্যক্তির জীবনই নিঃশেষ করে না, বরং সেই ব্যক্তির পরিবারেও আজীবনের কুপ্রভাব পড়ে। তা ছাড়াও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষরা আত্মহত্যা করা ব্যক্তিকে অনুসরণ করে। এর ঝুঁকি বর্তমান সমাজে বেড়েছে। ফলে এই বিষয়ে উদ্দীপনা হয় এমন বিষয়গুলোর প্রতি সচেতন হতে হবে। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস একটি সচেতনতামূলক দিন, যেটি বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দেশে ২০০৩ সাল থেকে পালন করা হয়। এই দিবসটি পালন করতে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন একসঙ্গে কাজ করে। ২০১১ সালে অনুমনিক ৪০টি দেশ এই দিবসটি উদ্যাপন করে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করা মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের নিম্ন আয়ের কোনো দেশেই আত্মহত্যা প্রতিরোধে কোন কৌশল বা কর্মপন্থা ঠিক করা নেই, যেখানে নিম্ন মধ্য-আয়ের দেশসমূহের ১০% এবং উচ্চ আয়ের সব দেশেই এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করা হয়। তবে তা যেন বাস্তবায়িত হয় সে বিষয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি যেন তৎপর চলতে থাকে। মনে রাখতে হবে মানসিক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ। এটি নিরাময়ে আমাদের তাদের প্রতি সহনশীল, বন্ধুত্বপরায়ণ হতে হবে। আমরা যদি সকলে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নির্মম তিক্ততা অনুধাবন করে সহনশীল হই এবং সরকার মানসিক ব্যাধির প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পেইন ও নানা সৃজনশীল পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হই, তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে। সামষ্টিক সচেতনতা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আত্মহত্যার প্রবণতা ও হার তুলনামূলক হ্রাস পাবে। ফারজানা আক্তার শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ: একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জনস্বাস্থ্যের টেকসই উন্নয়ন। বর্তমানে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যখন সরগরম, তখন অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয়—নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH)— নির্বাচনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসা অপরিহার্য ছিল। সম্প্রতি ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস’ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাদের ৮ দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে। ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (MICS) অনুযায়ী, দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ বেসিক স্যানিটেশনের আওতায় এলেও গুণগত মান, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও বৈষম্যহীন প্রাপ্যতা এখনও একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও মানবিক পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা। সরাসরি ‘ওয়াশ’ শব্দটির কারিগরি ব্যবহার এখানে কম হলেও, এর সংস্কার প্রস্তাবগুলো পানি ও স্যানিটেশন অধিকার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। সনদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার কথা (পয়েন্ট ১৮ ও ১৯) বলা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) বা ওয়াসার মতো সংস্থাগুলোর মাঠ পর্যায়ের কাজ যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অধীনে থাকে, তবে বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আসবে। গবেষণায় দেখা যায়, ‘বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে’ (World Bank, 2021)। সনদে মৌলিক অধিকারের তালিকা সংশোধন ও সম্প্রসারণের কথা ((পয়েন্ট ৯) বলা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে যদি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে এটি রাষ্ট্রের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে। নেটওয়ার্কের অন্যতম দাবি ছিল জাতীয় বাজেটে ওয়াশ খাতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ভৌগোলিক বৈষম্য কমাতে একটি ‘WASH Equity Index’ তৈরি করা। বিএনপি তাদের ইশতেহারে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য উন্নত পানি ও স্যানিটেশনের কথা বলেছে। এবি পার্টি প্রান্তিক পর্যায়ে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে জুলাই সনদের মূল সুর —বৈষম্যহীন সাম্য— অনুসরণ করে কোনও দলই সুনির্দিষ্ট ‘ইক্যুইটি ইনডেক্স’ বা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন জিডিপির ১ শতাংশ) ওয়াশ খাতের জন্য বরাদ্দের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ এসডিজি ৬ অর্জনে বাংলাদেশের জন্য বর্ধিত বিনিয়োগ অপরিহার্য। নেটওয়ার্ক আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও বন্যারোধী টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সনদে (পয়েন্ট ৬.১) জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করেছে। জামায়াতে ইসলামী উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি প্রবেশ রোধে শক্তিশালী টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কথা বলেছে, যা ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে। এটি ‘ওয়াটার স্ট্রেস’ মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নেটওয়ার্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারী ও কিশোরীদের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্মত মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী নিশ্চিত করা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান দলগুলোর ইশতেহারে এই বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি কেবল একটি নারী স্বাস্থ্য ইস্যু নয়, এটি কিশোরীদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রায় ৪১ শতাংশ কিশোরী মাসিকের সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে (World Bank, 2018)। এই ‘পিরিয়ড পভার্টি’ নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা হতাশাজনক। নেটওয়ার্ক ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছিল। বিএনপি ‘সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ প্রবর্তন এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও সার উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সিপিবি শহরগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য করতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সকল শিল্পকারখানায় ইটিপিস্থাপন বাধ্যতামূলক করার অঙ্গীকার করেছে। এটি জলাশয়ের দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ একটি উচ্চফলনশীল পদক্ষেপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ওয়াশ পরিষেবাগুলিতে বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে স্বাস্থ্য খরচ হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ৪.৩ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক লাভ ফিরে আসে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে এই অর্থনৈতিক লাভজনক দিকটি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ওয়াশকে কেবল একটি ‘সামাজিক সেবা’ হিসেবে দেখেছে, যা আদতে একটি ‘অর্থনৈতিক বিনিয়োগ’। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর মূল চেতনা হলো বৈষম্যহীনতা। বাংলাদেশে বর্তমানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার বিশাল ফারাক বিদ্যমান। জুলাই সনদের ৯ নম্বর পয়েন্টের আলোকে যদি ‘নিরাপদ পানির অধিকার’ মৌলিক অধিকারে উন্নীত হয়, যা ইতোমধ্যেই হাইকোর্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে, তবে রাষ্ট্র এই বৈষম্য দূর করতে বাধ্য থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও জুলাই সনদের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, দলগুলো ভৌত অবকাঠামো (নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ) নিয়ে যতটা সচেতন, গুণগত মান ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা (মাসিক স্বাস্থ্যবিধি, ইক্যুইটি ইনডেক্স) নিয়ে ততটাই উদাসীন। জুলাই সনদের সংস্কার অনুযায়ী স্থানীয় সরকারকে ওয়াশ বাজেটের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে। পিরিয়ড পভার্টি দূর করতে করছাড় ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় অংশ উপকূলীয় ওয়াশ অবকাঠামোতে বরাদ্দ করতে হবে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (WASH) সবার মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হবে এবং শহর–গ্রাম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে কথা দিয়েছে এনসিপি তাদের ইশতেহারে। তারা আরও বলেছে যে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য জেন্ডার–সংবেদনশীল WASH ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হবে। আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের উচিত হবে জুলাই সনদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রার্থীদের প্রশ্ন করা—আপনার উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমার নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা কোথায়? রাজনৈতিক অঙ্গীকার যখন কেবল কাগজের ইশতেহার থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই কেবল আমরা একটি প্রকৃত ‘মানবিক রাষ্ট্র’ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো। লেখক: আইনজীবী এবং উন্নয়নকর্মী