সরকারের নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি “ফ্যামিলি কার্ড” কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এই কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।
গবেষণাটি বলছে, যদি এই ভাতা দেশের সব দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের কাছে পৌঁছানো যায়, তাহলে দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে কমে ১১.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ৭.৪ শতাংশ পয়েন্ট দারিদ্র্য হ্রাস পেতে পারে।
একই সঙ্গে চরম দারিদ্র্যের হারেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে যেখানে চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশ, সেখানে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে তা ২.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে, অর্থাৎ প্রায় ৩.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে।
এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)। গতকাল ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এই কর্মসূচি বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৩৩.৯ শতাংশ থেকে কমে ১৫.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা প্রায় ৮.৪ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ভাতার টাকা উপকারভোগীর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পাঠানো হবে। এতে উপকারভোগীরা ঘরে বসেই এই সহায়তা পেতে পারবেন।
সরকার ইতোমধ্যে এই কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প চালু করেছে। গত মঙ্গলবার এর উদ্বোধন করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ধাপে চার মাসের জন্য অন্তত ৪০ হাজার পরিবারকে এই ভাতা দেওয়া হবে।
র্যাপিডের হিসাব অনুযায়ী, এই কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে ৫৬ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে।
তবে কর্মসূচির সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে সঠিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করার ওপর। এম এ রাজ্জাক বলেন, যোগ্য পরিবার বাদ পড়ে যাওয়া কিংবা অযোগ্য পরিবার সুবিধা পাওয়া—এই দুই ধরনের ভুল কমাতে হলে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় সাধারণত রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হয়। তবে সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ সরকার ইতোমধ্যে জিডিপির ৩ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ধীরে ধীরে ২ কোটি পরিবারকে এই মাসিক সহায়তার আওতায় আনা হবে। ২০২৬ সালের ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নির্দেশিকায় এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই কর্মসূচি পুরোপুরি চালু হলে প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
রাজ্জাক সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৭ শতাংশের নিচে, ফলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বাড়ালে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
এই চাপ সামাল দিতে তিনি পরামর্শ দেন, বর্তমানে চালু থাকা কিছু ওভারল্যাপিং বা অপ্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ধীরে ধীরে বন্ধ করে সেই অর্থ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তার মতে, শক্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকলে এই কর্মসূচি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কারণেই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এই ২,৫০০ টাকা শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, এটি মানুষের প্রতি সরকারের আস্থারও প্রতিফলন। এতে মানুষ অনুভব করছে সরকার তাদের পাশে রয়েছে।”
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের সমন্বয় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নেই এবং এটি একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। মালিকানা পরিবর্তন, করপোরেট সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন, ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকটির প্রতি আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের আস্থাহীনতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার এবং অংশীজনদের একটি অংশ বলছে, আস্থা পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ। আস্থা পুনরুদ্ধারের দাবিতে মাঠে গ্রাহকরা ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বাভাবিক লেনদেন নিশ্চিত করার দাবিতে সক্রিয় হয়েছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। সংগঠনটি আগামী সোমবার (২২ জুন) বেলা ১১টায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক অভিমুখে মিছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে রবিবার (২১ জুন) ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সাত দফা দাবিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কেন তৈরি হয়েছে আস্থা সংকট? ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, ঋণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, করপোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ ব্যাংকটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে প্রশ্ন সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে তারল্য সহায়তা দিয়ে ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করেছে, তবুও আস্থার ঘাটতি পুরোপুরি দূর হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্রাহকদের সাত দফা দাবি কী? ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের মতে, সংকট নিরসনের প্রথম শর্ত হলো রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন। সংগঠনটির সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে— অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন; ২০১৭ সালের মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে বঞ্চিত শেয়ারহোল্ডারদের বৈধ মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া; ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন; অভিযুক্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা; ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধার ও সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা; বিতর্কিত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে বিরত থাকা; ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিতর্কিত বিধান সংশোধনের মাধ্যমে অভিযুক্ত গোষ্ঠীর পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ করা। বিশ্লেষকদের মতে, এসব দাবির কিছু বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের প্রতিও জনগণের আস্থা বাড়তে পারে। ‘দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে’ অবস্থান কর্মসূচিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সাত দফা দাবির পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে আসছে সংগঠনটি। তার ভাষ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক বলে মনে হলেও এখনও দৃশ্যমান ও কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয় অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি হওয়ায় এর স্থিতিশীলতা পুরো আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভাষ্য, কেবল তারল্য সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বরং করপোরেট সুশাসন জোরদার করা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার মতো কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামী ব্যাংকে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ অনুযায়ী বেরিয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা গেলে আমানতকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারে। আর সেই আস্থার পুনরুদ্ধারই হবে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। প্রশ্ন হলো—দীর্ঘদিনের বিতর্কের পর এবার কি সত্যিই কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটবে ইসলামী ব্যাংক, নাকি আস্থার সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে?
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের জীবন বিমা খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এখন ভয়াবহ আর্থিক সংকট, বকেয়া বিমা দাবি এবং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চাপে রয়েছে। একদিকে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে লাগামহীন খরচ—এই দুই বিপরীতমুখী বাস্তবতা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়া দাবির প্রায় ৭০ শতাংশই ফারইস্ট ইসলামী লাইফের একক দায়। একই সময়ে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচের তালিকাতেও শীর্ষে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ৫ লাখের বেশি গ্রাহক পাননি বিমার টাকা ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে পরিপক্ক বিমা দাবির অর্থ না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটির কাছে মোট ৩ হাজার ৪৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপন করেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৯২ জন গ্রাহক। কিন্তু এর বিপরীতে কোম্পানিটি পরিশোধ করেছে মাত্র ২১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা পেয়েছেন ৫৮ হাজার ২১৫ জন গ্রাহক। অর্থাৎ, ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৭ জন গ্রাহকের ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে। বকেয়া দাবির হার প্রায় ৯৪ শতাংশ। বিমা আইন অনুযায়ী, পলিসি পরিপক্ক হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে গ্রাহককে দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বহু গ্রাহক অভিযোগ করছেন, বছরের পর বছর ঘুরেও তারা অর্থ পাচ্ছেন না। সুমাইয়া নামে এক গ্রাহক বলেন, তার পলিসি পরিপক্ক হয়েছে ২০২১ সালে। প্রায় পাঁচ বছর পার হলেও তিনি এখনো বিমার টাকা পাননি। পরে আইডিআরএ’তে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি বলে জানান তিনি। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হওয়া আরও কয়েকজন গ্রাহক জানান, তাদের অনেকের পলিসিই ৫ থেকে ৬ বছর আগে পরিপক্ক হয়েছে। তারল্য সংকটের মধ্যেও ‘অতিরিক্ত’ ব্যয় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের আর্থিক অবস্থার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো এর ব্যবস্থাপনা ব্যয়। আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। কিন্তু কোম্পানিটি ব্যয় করেছে ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এমন সময়ে এই ব্যয় হয়েছে, যখন কোম্পানিটি হাজার হাজার কোটি টাকার বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ এবং ভয়াবহ তারল্য সংকটে রয়েছে। বিমা খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, আর্থিকভাবে দুর্বল একটি প্রতিষ্ঠানের এমন ব্যয় কাঠামো স্বাভাবিক নয় এবং এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও গভীর তদন্ত দাবি করে। ঋণাত্মক লাইফ ফান্ড, বাড়ছে শঙ্কা ফারইস্ট ইসলামী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে এর ‘লাইফ ফান্ড’ বা বিমা তহবিলে। বর্তমানে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক ৮৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সাধারণত গ্রাহকদের জমা দেওয়া প্রিমিয়াম থেকে এই তহবিল গড়ে ওঠে এবং ভবিষ্যৎ বিমা দাবি পরিশোধে তা ব্যবহার করা হয়। ফলে কোনো বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে পড়া গুরুতর আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ১৬২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং বিনিয়োগ রয়েছে ১ হাজার ৮৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে বিপুল বকেয়া দাবি এবং ঋণাত্মক তহবিলের কারণে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। সরকার পরিবর্তনের পরও বদলায়নি পরিস্থিতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফারইস্ট ইসলামী লাইফের দায়িত্ব নেন বিএনপি নেতা ফখরুল ইসলাম। পরে তিনি নোয়াখালী-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কোম্পানির ২৫তম বোর্ড সভায় তাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। তবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১৮ মাস পার হলেও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং আর্থিক অব্যবস্থাপনার প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ‘লুটপাট ও জালিয়াতির’ অভিযোগ ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমাহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে গভীর তারল্য সংকটে পড়ে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে আইডিআরএ’র পরিসংখ্যান কোম্পানিটির আর্থিক দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট করছে। কোম্পানির ব্যাখ্যা কী ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহিম ভূইয়া বলেন, ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণে ম্যাচিউরিটি বা পরিপক্ক দাবির চাপ বেড়েছে। তিনি বলেন, “লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মূল থিম হলো ব্যবসা। ব্যবসা কমে গেলে ব্যয় বেড়ে যায়। কোম্পানির খরচ কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।” তার দাবি, কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নতুন ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে এসব পদক্ষেপের বাস্তব প্রভাব এখনো গ্রাহকদের কাছে দৃশ্যমান হয়নি। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে যেসব কোম্পানি আলোচনায় আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ২০টি জীবন বিমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খাতে আইন নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ১৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পর অতিরিক্ত ব্যয়ে রয়েছে: শান্তা লাইফ — ১৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা প্রোগ্রেসিভ লাইফ — ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা এনআরবি ইসলামী লাইফ — ৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা প্রোটেক্টিভ লাইফ — ৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা চার্টার্ড লাইফ — ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা জেনিথ ইসলামী লাইফ — ৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা সান লাইফ — ৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা স্বদেশ লাইফ — ৬ কোটি ৫ লাখ টাকা হোমল্যান্ড লাইফ — ৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা এছাড়া আরও কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা এসব অভিযোগ ও পরিসংখ্যান নিয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, কোম্পানির চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামও ফোনে সাড়া দেননি। আস্থার সংকটে বিমা খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, জীবন বিমা খাতের মূল ভিত্তি হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা। কিন্তু বছরের পর বছর দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা, আর্থিক অনিয়ম এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে সেই আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক বাস্তবতা দ্রুত স্বচ্ছ তদন্তের আওতায় না আনলে পুরো বিমা খাতেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন :বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বহুল আলোচিত একীভূত উদ্যোগ—‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’—গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা না আসা, কার্যক্রমে ধীরগতি এবং অংশীদার ব্যাংকগুলোর সরে দাঁড়ানোর আগ্রহ এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একীভূত উদ্যোগ: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক গত বছরের ২১ ডিসেম্বর পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—একত্রিত করে নতুন এই কাঠামো গঠন করা হয়। লক্ষ্য ছিল তারল্য সংকট মোকাবিলা, আর্থিক পুনর্গঠন এবং গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, সেই লক্ষ্য এখনও অনেক দূরে। ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া ধীর, এবং গ্রাহকদের আস্থার সংকট রয়ে গেছে। অংশীদারদের সরে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে অংশীদারদের সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত। ইতোমধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে এই কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছে। একই পথে হাঁটার বিষয়ে আলোচনা করছে এক্সিম ব্যাংকও। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একীভূত কাঠামোর ভেতরে আস্থাহীনতা ও সমন্বয় সংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অন্য ব্যাংকগুলোও কি একই সিদ্ধান্ত নেবে? দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো উদ্যোগ একীভূত হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করে শুধু একীভূতকরণ টেকসই সমাধান দিতে পারে না। সরকারি সহায়তা ও বিতর্ক ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এমনকি টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এত কিছুর পরও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় নীতিগত কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নতুন আইন ও জটিলতা নতুন ব্যাংক রেজ্যুলেশন কাঠামোতে লিকুইডেশন, ব্রিজ ব্যাংক, নতুন বিনিয়োগকারী আনা এবং সাবেক মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ার পর সাবেক মালিকদের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ বিতর্ক তৈরি করেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—যদি পুরোনো মালিকানায় ফিরে যাওয়া হয়, তাহলে কি অতীতের অনিয়ম আবার ফিরে আসবে? আস্থার সংকটে গ্রাহক বর্তমানে এই ব্যাংকে প্রায় ৯১ লাখের বেশি হিসাব রয়েছে এবং কর্মী সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো— নতুন আমানত কমছে টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা গ্রাহক উপস্থিতি কমে যাচ্ছে একজন গ্রাহক বলেন, “টাকা রাখতে ভয় লাগে, তুলতেও সমস্যা—এ অবস্থায় ব্যাংকের ওপর কীভাবে ভরসা করব?” ভেতরে অনিশ্চয়তা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যেও অস্থিরতা রয়েছে। তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা থাকলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করা সম্ভব। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে—ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ চলছে এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। সরকারের সিদ্ধান্তই নির্ধারক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। পরিস্থিতি উন্নত হলে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসআইবিএল-এর প্রস্তাব: কতটা বাস্তবসম্মত? সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক তাদের আবেদনে পৃথকভাবে পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— খেলাপি ঋণ ২৫ শতাংশে নামানো মূলধন শক্তিশালী করা সরকারি হিসাব পুনরায় চালু করা ১১ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন এবং এর জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। মূল প্রশ্ন একীভূত উদ্যোগ কি টেকসই হবে? অংশীদাররা সরে গেলে কাঠামো টিকবে কীভাবে? পুরোনো মালিক ফিরলে কি পুরোনো সমস্যা ফিরে আসবে? গ্রাহকের আস্থা কীভাবে ফিরবে? সরকারের চূড়ান্ত কৌশল কী? সামনে যে তিনটি চ্যালেঞ্জ ১. নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ২. সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ৩. খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। এটি টিকে থাকবে, নাকি ব্যর্থ উদ্যোগ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে—তা নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্ত, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তব সংস্কারের ওপর।