মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল :
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় রাঙামাটি নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতুটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। সেতুটির নির্মাণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া এবং ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠে এসেছে। এই সেতুর উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে এক দীর্ঘ বিতর্কিত নির্মাণ ইতিহাস—যেখানে রয়েছে সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে এটি স্থানীয় জনগণের জন্য আশার প্রতীক হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এটি হয়ে উঠেছে প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবায়নের একটি উদাহরণ।
নির্মাণ ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি
প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ব্যয়: ২০১৭ সালে যখন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়, তখন এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা । তবে কাজ শেষ হতে হতে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, যা মূল বাজেটের চেয়ে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা বেশি ।
সময়ক্ষেপণ: ৩ বছরের মধ্যে (২০১৮-২০২১) কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এটি সম্পন্ন করতে প্রায় ৯ বছর সময় লেগেছে ।
সেতু নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ও জটিলতা :
ভুল নকশা ও উচ্চতা সংক্রান্ত জটিলতা: বিআইডব্লিউটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী সেতুর উচ্চতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় মাঝপথে দেড় বছর কাজ বন্ধ থাকে । পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন করে উচ্চতা বাড়াতে গিয়ে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় উভয়ই অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় ।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় রাঙ্গামাটি নদীর ওপর গোমা সেতু নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপ-এর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম গাফিলতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। মূলত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং নকশা পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কাজ দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
| বছর | পরিকল্পনা | বাস্তব অগ্রগতি |
|---|---|---|
| ২০১৭ | প্রকল্প অনুমোদন | প্রাথমিক ব্যয় ৫৭.৬২ কোটি টাকা |
| ২০১৮ | কাজ শুরু | ধীরগতির সূচনা |
| ২০২১ | নির্ধারিত সমাপ্তি | কাজ অসম্পূর্ণ |
| ২০২২–২০২৪ | সংশোধিত সময়সীমা | বারবার স্থগিত |
| ২০২৬ | প্রকল্প শেষ ও উদ্বোধন | চূড়ান্ত ব্যয় ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা |
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রাঙামাটি নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতু—যা ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে—শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং এটি এখন একটি বিতর্কিত উন্নয়ন মডেলের উদাহরণ।
সরকারি নথি, স্থানীয় সূত্র এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রকল্পটি শুরু থেকেই পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং তদারকির ক্ষেত্রে গুরুতর দুর্বলতায় ভুগেছে। এর ফল—সময় তিনগুণ, ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ, এবং জনভোগান্তি দীর্ঘমেয়াদি।
প্রাথমিক ব্যয়: ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা
চূড়ান্ত ব্যয়: ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা
বৃদ্ধি: প্রায় ৩৪ কোটি টাকা
নকশা পরিবর্তন
নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি
সময় বৃদ্ধি
নকশা পরিবর্তন কেন শুরুতেই শনাক্ত হয়নি?
বিলম্বজনিত অতিরিক্ত ব্যয় কি নিয়ন্ত্রিত ছিল?
প্রকল্প সংশোধনে কারা অনুমোদন দিয়েছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, “এই ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত প্রকল্প তদারকির দুর্বলতা বা ইচ্ছাকৃত অপচয়ের ইঙ্গিত দেয়।”
প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা ছিল সেতুর উচ্চতা নির্ধারণে ভুল।
নদীপথে চলাচলকারী নৌযানের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়নি
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়
প্রায় দেড় বছর কাজ বন্ধ থাকে
পুনরায় নকশা প্রণয়ন
অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয়
প্রকল্প বিলম্ব
প্রশ্ন উঠেছে—ডিজাইন যাচাই প্রক্রিয়ায় কোন সংস্থা দায়িত্বে ছিল এবং তারা কেন ব্যর্থ হলো?
স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী—
দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ বা আংশিক চালু ছিল
শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির উপস্থিতি অনিয়মিত ছিল
এটি ইচ্ছাকৃত বিলম্ব কিনা, তা তদন্তের দাবি রাখে।
প্রকল্পটি অন্তত কয়েক দফা সময় বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রশ্ন হলো—
প্রতিটি সময় বৃদ্ধি কি প্রকৃত অগ্রগতির ভিত্তিতে ছিল?
নাকি রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ ছিল?
এই প্রকল্পে অন্তত চারটি স্তরে জবাবদিহিতার প্রশ্ন ওঠে—
১. পরিকল্পনা সংস্থা – নকশা অনুমোদনে ব্যর্থতা
২. বাস্তবায়ন সংস্থা – তদারকির ঘাটতি
৩. ঠিকাদার – কাজের গতি ও মান
৪. প্রশাসন – সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপের প্রধান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ:
মেয়াদ বাড়ানো: প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপ কাজ ফেলে রাখে । পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাবে কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
ব্যয় বৃদ্ধি: কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় এবং নতুন নতুন অজুহাতে বাজেট সংশোধনের মাধ্যমে প্রাথমিক ব্যয় ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা করা হয় । অভিযোগ রয়েছে যে, এই অতিরিক্ত বরাদ্দের একটি বড় অংশই অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
২. ভুল নকশায় কাজ শুরু
ভুল উচ্চতা: সেতুটির উচ্চতা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-এর আপত্তির পরও ভুল নকশায় কাজ শুরু করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয় । এই জটিলতার কারণে মাঝপথে কাজ বন্ধ থাকায় কয়েক লাখ মানুষ বছরের পর বছর ফেরি,ট্রলার ও নৌকায় পারাপার হতে বাধ্য হয়েছে ।
অর্ধসমাপ্ত কাজ: সেতুর মূল কাঠামো অনেক আগেই দাঁড়িয়ে গেলেও সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর গড়িমসি করেছে ।যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় ।
৩. অন্যান্য অভিযোগ
কালো তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা: সরকারি বিভিন্ন কাজে এম খান গ্রুপের মালিক মাহফুজ খানের বিরুদ্ধে গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অতীতেও তাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে ।
শ্রমিক ও স্থানীয়দের পাওনা: কাজ চলাকালীন সময়ে স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরি ও মালামাল সরবরাহকারীদের টাকা বকেয়া রাখার অভিযোগ রয়েছে ।
এম খান গ্রুপের মালিক মাহফুজ খান তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এই প্রকল্পের বাজেট বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণ করেছেন। বর্তমানে সেতুটি চালু হলেও এই দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি: স্থানীয়দের অভিযোগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপ-এর মালিক মাহফুজ খান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছেন । অভিযোগ রয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং নিম্নমানের কাজের বিষয়েও বিভিন্ন সময়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ।
সংযোগ সড়কের অভাব: সেতুর মূল কাজ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) না থাকায় সাধারণ মানুষকে মই বা সিঁড়ি বেয়ে সেতুতে উঠতে হয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে ।
বরিশালের রাঙ্গামাটিয়া নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতুর কাজ শেষ হয়েছে প্রায় নয় বছর পর। মঙ্গলবার ( ১৭ মার্চ) দুপুরের দিকে উদ্বোধনের পর সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ সেতুর উদ্ধোধন করেন।
সেতু নির্মাণে লেগেছে ৯ বছর:
সেতু নির্মাণে লেগেছে ৯ বছর।২০১৭ সালে প্রায় ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্প হিসেবে সেতুটি অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। শুরুতেই উচ্চতা নিয়ে আপত্তি তোলে বিআইডব্লিউটিএ। তাদের দাবি ছিল, নদীপথ সচল রাখতে সেতুর উচ্চতা আরও বাড়াতে হবে। প্রথম নকশায় সেতুর মাঝ বরাবর সর্বোচ্চ জোয়ারের সময় উচ্চতা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬২ মিটার। পরে তা বাড়িয়ে ১২ দশমিক ২০ মিটার করা হয়। এই পরিবর্তনের কারণে পুরো নকশাই সংশোধন করতে হয়। নতুন নকশায় সেতুর মাঝখানে স্টিল ট্রাস স্প্যান যুক্ত করা হয়।
পাঁচবার বাড়ানো হয় সময়সীমা, বেড়ে যায় ব্যয়ও:
নকশা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ ও নদী শাসনের কাজ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটির সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়। ব্যয়ও বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। সংশোধিত প্রকল্পে সেতুর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, যা প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
সেতুটির দৈর্ঘ্য ২৮৩ দশমিক ১৮৮ মিটার এবং প্রস্থ ১০ দশমিক ২৫ মিটার। দুই লেনের এই সেতুতে পিসি গার্ডারের পাশাপাশি স্টিল ট্রাস ব্যবহার করা হয়েছে, যা দক্ষিণাঞ্চলে এ ধরনের প্রথম সেতু বলে জানিয়েছেন সওজের প্রকৌশলীরা। সেতুটির ঠিকাদার মো. মাহফুজ খান সাংবাদিকদের বলেন, উচ্চতা বৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন এবং নদী শাসনের কাজ বাড়ার কারণেই সময় ও ব্যয় দুইই বেড়েছে।
বরিশাল সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নদীর ধারা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ এবং সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বারবার নকশা সংশোধন করতে হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরের দিকে উদ্বোধনের পরই সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
গোমা সেতু এখন চালু—এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক।
তবে এর নির্মাণ ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কি যথাযথ পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত।
নয়তো গোমা সেতুর মতো প্রকল্প ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি হবে—
আর উন্নয়ন হবে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
প্রকল্পটি একাধিকবার সময় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
প্রতিবার মেয়াদ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কী ছিল?
কোনো দায় নির্ধারণ করা হয়েছিল কি?
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সময় বৃদ্ধি ঠিকাদারকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দেয়।
এই প্রকল্পে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত—
নকশা ত্রুটির জন্য দায়ী কে?
ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে?
প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া প্রকল্পটির পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গোমা সেতু প্রকল্পে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই
ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য শিক্ষা
সেতুটি নির্মাণ হওয়ার মাধ্যমে বরিশাল জেলা সদরের সাথে বাকেরগঞ্জের পূর্বাঞ্চল কবাই, নলুয়া, দুধল সহ পটুয়াখালীর বাউফল ও দুমকী উপজেলার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজ দ্বার উন্মোচিত হলো।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল : বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় রাঙামাটি নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতুটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। সেতুটির নির্মাণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া এবং ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠে এসেছে। এই সেতুর উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে এক দীর্ঘ বিতর্কিত নির্মাণ ইতিহাস—যেখানে রয়েছে সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে এটি স্থানীয় জনগণের জন্য আশার প্রতীক হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এটি হয়ে উঠেছে প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবায়নের একটি উদাহরণ। নির্মাণ ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ব্যয়: ২০১৭ সালে যখন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়, তখন এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা । তবে কাজ শেষ হতে হতে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, যা মূল বাজেটের চেয়ে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা বেশি । সময়ক্ষেপণ: ৩ বছরের মধ্যে (২০১৮-২০২১) কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এটি সম্পন্ন করতে প্রায় ৯ বছর সময় লেগেছে । সেতু নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ও জটিলতা : ভুল নকশা ও উচ্চতা সংক্রান্ত জটিলতা: বিআইডব্লিউটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী সেতুর উচ্চতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় মাঝপথে দেড় বছর কাজ বন্ধ থাকে । পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন করে উচ্চতা বাড়াতে গিয়ে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় উভয়ই অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় । বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় রাঙ্গামাটি নদীর ওপর গোমা সেতু নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপ-এর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম গাফিলতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। মূলত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং নকশা পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কাজ দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। টাইমলাইন: কাগজে পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতা বছর পরিকল্পনা বাস্তব অগ্রগতি ২০১৭ প্রকল্প অনুমোদন প্রাথমিক ব্যয় ৫৭.৬২ কোটি টাকা ২০১৮ কাজ শুরু ধীরগতির সূচনা ২০২১ নির্ধারিত সমাপ্তি কাজ অসম্পূর্ণ ২০২২–২০২৪ সংশোধিত সময়সীমা বারবার স্থগিত ২০২৬ প্রকল্প শেষ ও উদ্বোধন চূড়ান্ত ব্যয় ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা অনুসন্ধান: একটি সেতু, বহু প্রশ্ন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রাঙামাটি নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতু—যা ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে—শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং এটি এখন একটি বিতর্কিত উন্নয়ন মডেলের উদাহরণ। সরকারি নথি, স্থানীয় সূত্র এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রকল্পটি শুরু থেকেই পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং তদারকির ক্ষেত্রে গুরুতর দুর্বলতায় ভুগেছে। এর ফল—সময় তিনগুণ, ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ, এবং জনভোগান্তি দীর্ঘমেয়াদি। ব্যয় বিশ্লেষণ: কোথায় গেল অতিরিক্ত ৩৪ কোটি? প্রাথমিক ব্যয়: ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা চূড়ান্ত ব্যয়: ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা বৃদ্ধি: প্রায় ৩৪ কোটি টাকা সম্ভাব্য কারণ (সরকারি যুক্তি অনুযায়ী): নকশা পরিবর্তন নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি সময় বৃদ্ধি অনুসন্ধানে উঠে আসা প্রশ্ন: নকশা পরিবর্তন কেন শুরুতেই শনাক্ত হয়নি? বিলম্বজনিত অতিরিক্ত ব্যয় কি নিয়ন্ত্রিত ছিল? প্রকল্প সংশোধনে কারা অনুমোদন দিয়েছে? অর্থনীতিবিদদের মতে, “এই ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত প্রকল্প তদারকির দুর্বলতা বা ইচ্ছাকৃত অপচয়ের ইঙ্গিত দেয়।” নকশাগত ত্রুটি: পরিকল্পনার কেন্দ্রে ব্যর্থতা প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা ছিল সেতুর উচ্চতা নির্ধারণে ভুল। কী ঘটেছিল? নদীপথে চলাচলকারী নৌযানের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায় প্রায় দেড় বছর কাজ বন্ধ থাকে ফলাফল: পুনরায় নকশা প্রণয়ন অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয় প্রকল্প বিলম্ব প্রশ্ন উঠেছে—ডিজাইন যাচাই প্রক্রিয়ায় কোন সংস্থা দায়িত্বে ছিল এবং তারা কেন ব্যর্থ হলো? ধীরগতির নির্মাণ: কৌশল নাকি ব্যর্থতা? স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী— দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ বা আংশিক চালু ছিল শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির উপস্থিতি অনিয়মিত ছিল এটি ইচ্ছাকৃত বিলম্ব কিনা, তা তদন্তের দাবি রাখে। প্রকল্প মেয়াদ বাড়ানো: প্রশাসনিক দুর্বলতা? প্রকল্পটি অন্তত কয়েক দফা সময় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশ্ন হলো— প্রতিটি সময় বৃদ্ধি কি প্রকৃত অগ্রগতির ভিত্তিতে ছিল? নাকি রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ ছিল? দায় কার? এই প্রকল্পে অন্তত চারটি স্তরে জবাবদিহিতার প্রশ্ন ওঠে— ১. পরিকল্পনা সংস্থা – নকশা অনুমোদনে ব্যর্থতা ২. বাস্তবায়ন সংস্থা – তদারকির ঘাটতি ৩. ঠিকাদার – কাজের গতি ও মান ৪. প্রশাসন – সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপের প্রধান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ: মেয়াদ বাড়ানো: প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপ কাজ ফেলে রাখে । পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাবে কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ব্যয় বৃদ্ধি: কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় এবং নতুন নতুন অজুহাতে বাজেট সংশোধনের মাধ্যমে প্রাথমিক ব্যয় ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা করা হয় । অভিযোগ রয়েছে যে, এই অতিরিক্ত বরাদ্দের একটি বড় অংশই অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২. ভুল নকশায় কাজ শুরু ভুল উচ্চতা: সেতুটির উচ্চতা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-এর আপত্তির পরও ভুল নকশায় কাজ শুরু করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয় । এই জটিলতার কারণে মাঝপথে কাজ বন্ধ থাকায় কয়েক লাখ মানুষ বছরের পর বছর ফেরি,ট্রলার ও নৌকায় পারাপার হতে বাধ্য হয়েছে । অর্ধসমাপ্ত কাজ: সেতুর মূল কাঠামো অনেক আগেই দাঁড়িয়ে গেলেও সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর গড়িমসি করেছে ।যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় । ৩. অন্যান্য অভিযোগ কালো তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা: সরকারি বিভিন্ন কাজে এম খান গ্রুপের মালিক মাহফুজ খানের বিরুদ্ধে গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অতীতেও তাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে । শ্রমিক ও স্থানীয়দের পাওনা: কাজ চলাকালীন সময়ে স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরি ও মালামাল সরবরাহকারীদের টাকা বকেয়া রাখার অভিযোগ রয়েছে । এম খান গ্রুপের মালিক মাহফুজ খান তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এই প্রকল্পের বাজেট বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণ করেছেন। বর্তমানে সেতুটি চালু হলেও এই দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি: স্থানীয়দের অভিযোগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম খান গ্রুপ-এর মালিক মাহফুজ খান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছেন । অভিযোগ রয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং নিম্নমানের কাজের বিষয়েও বিভিন্ন সময়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন । সংযোগ সড়কের অভাব: সেতুর মূল কাজ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) না থাকায় সাধারণ মানুষকে মই বা সিঁড়ি বেয়ে সেতুতে উঠতে হয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে । বরিশালের রাঙ্গামাটিয়া নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতুর কাজ শেষ হয়েছে প্রায় নয় বছর পর। মঙ্গলবার ( ১৭ মার্চ) দুপুরের দিকে উদ্বোধনের পর সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ সেতুর উদ্ধোধন করেন। সেতু নির্মাণে লেগেছে ৯ বছর: সেতু নির্মাণে লেগেছে ৯ বছর।২০১৭ সালে প্রায় ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্প হিসেবে সেতুটি অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। শুরুতেই উচ্চতা নিয়ে আপত্তি তোলে বিআইডব্লিউটিএ। তাদের দাবি ছিল, নদীপথ সচল রাখতে সেতুর উচ্চতা আরও বাড়াতে হবে। প্রথম নকশায় সেতুর মাঝ বরাবর সর্বোচ্চ জোয়ারের সময় উচ্চতা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬২ মিটার। পরে তা বাড়িয়ে ১২ দশমিক ২০ মিটার করা হয়। এই পরিবর্তনের কারণে পুরো নকশাই সংশোধন করতে হয়। নতুন নকশায় সেতুর মাঝখানে স্টিল ট্রাস স্প্যান যুক্ত করা হয়। পাঁচবার বাড়ানো হয় সময়সীমা, বেড়ে যায় ব্যয়ও: নকশা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ ও নদী শাসনের কাজ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটির সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়। ব্যয়ও বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। সংশোধিত প্রকল্পে সেতুর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, যা প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। সেতুটির দৈর্ঘ্য ২৮৩ দশমিক ১৮৮ মিটার এবং প্রস্থ ১০ দশমিক ২৫ মিটার। দুই লেনের এই সেতুতে পিসি গার্ডারের পাশাপাশি স্টিল ট্রাস ব্যবহার করা হয়েছে, যা দক্ষিণাঞ্চলে এ ধরনের প্রথম সেতু বলে জানিয়েছেন সওজের প্রকৌশলীরা। সেতুটির ঠিকাদার মো. মাহফুজ খান সাংবাদিকদের বলেন, উচ্চতা বৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন এবং নদী শাসনের কাজ বাড়ার কারণেই সময় ও ব্যয় দুইই বেড়েছে। বরিশাল সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নদীর ধারা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ এবং সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বারবার নকশা সংশোধন করতে হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরের দিকে উদ্বোধনের পরই সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। উন্নয়ন না অপচয়? গোমা সেতু এখন চালু—এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে এর নির্মাণ ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে— বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কি যথাযথ পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত। নয়তো গোমা সেতুর মতো প্রকল্প ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি হবে— আর উন্নয়ন হবে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। মেয়াদ বৃদ্ধি: নিয়ম না ব্যতিক্রম? প্রকল্পটি একাধিকবার সময় বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: প্রতিবার মেয়াদ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কী ছিল? কোনো দায় নির্ধারণ করা হয়েছিল কি? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সময় বৃদ্ধি ঠিকাদারকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দেয়। জবাবদিহিতা: অমীমাংসিত প্রশ্ন এই প্রকল্পে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত— নকশা ত্রুটির জন্য দায়ী কে? ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে? প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া প্রকল্পটির পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তদন্তের প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষকদের মতে, গোমা সেতু প্রকল্পে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কেন তদন্ত প্রয়োজন? ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য শিক্ষা সেতুটি নির্মাণ হওয়ার মাধ্যমে বরিশাল জেলা সদরের সাথে বাকেরগঞ্জের পূর্বাঞ্চল কবাই, নলুয়া, দুধল সহ পটুয়াখালীর বাউফল ও দুমকী উপজেলার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজ দ্বার উন্মোচিত হলো।
বিএনপি নেত্রী ও ব্রিটিশ নাগরিক জেবা আমিনা আহমেদকে ঘিরে বর্তমানে এক নজিরবিহীন স্ক্যান্ডাল ও আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগটি হলো—বিদেশে থাকাকালীন প্রথম স্বামীকে আইনত তালাক না দিয়েই ২০০৫ সালে বাংলাদেশে এসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হওয়া। ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী যা সম্পূর্ণ ‘হারাম’ এবং ব্যভিচারের শামিল। শুধু ধর্মীয় বিধানই নয়, দেশের প্রচলিত আইন ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী এটি ৪৯৪ ধারার অধীনে একটি গুরুতর অপরাধ। যেহেতু প্রথম বিবাহটি ব্রিটেনে আইনিভাবে নিবন্ধিত ছিল, তাই এর বিচ্ছেদও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু জেবা আমিনা সেই আইনি তোয়াক্কা না করেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ না ঘটানোয় মুসলিম শরীয়াহ আইনের চরম লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে এলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন বিএনপি নেত্রী জেবা আমিনা আহমেদ। এই সামাজিক ও ধর্মীয় চাপের মুখে অবশেষে দুই বছর পর ২০০৭ সালে প্রথম স্বামী নিয়াজ বিন করিমের সাথে তার আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আইনত ও ধর্মীয়ভাবে চরম নীতিহীনতার পরিচয় দিয়ে যুগপৎ দুই স্বামীর ঘর করেছেন। তবে কেবল এই অবৈধ বিবাহই নয়, লন্ডনে অবস্থানকালেও তিনি জড়িয়েছিলেন বহুমুখী অনৈতিক ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। বিলেতের মাটিতে দেউলিয়া ঘোষিত এই নেত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক প্রতারণা ও ঋণখেলাপির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে বিএনপির এই নেত্রীর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন নীতিহীন কর্মকাণ্ড ও চরম স্বার্থসংঘাতের জেরে বিএনপির এই নেত্রীর ঢাকার দ্বিতীয় সংসারটিও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। আবাসন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক সভাপতি মোকাররম হোসেন খানের সাথেও তার দাম্পত্য জীবনে চরম তিক্ততার সৃষ্টি হয়, যার পরিণতি ঘটে ২০১৭ সালের বিচ্ছেদের মাধ্যমে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অর্থলিপ্সা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসভঙ্গের মতো গুরুতর সব অভিযোগে এই সংসারটি ভেঙে যায়। এ বিষয়ে চাঞ্চল্যকর সব নথি ও দালিলিক প্রমাণ বর্তমানে প্রতিবেদকের হাতে এসেছে, যা এই রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত জীবনের নৈতিক স্খলন ও স্বার্থান্বেষী আচরণের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করে। অনুসন্ধানের গভীরতর তথ্যে উন্মোচিত হয়েছে এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণার চিত্র। ব্রিটিশ বৈবাহিক আইন অনুযায়ী, নিয়াজ বিন করিম ও জেবা আমিনা আহমেদ ১৯৮৩ সালের ১৫ জুলাই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন এবং নথিপত্র অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের সেই দাম্পত্য জীবন কাগজে-কলমে অটুট ছিল। অথচ চরম অনৈতিকতা ও আইনের তোয়াক্কা না করে, প্রথম স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ছাড়াই ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এসে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ দুই বছর যাবৎ আইনত দুই স্বামীর স্ত্রী হিসেবে অবস্থান করা কেবল ধর্মীয় ও সামাজিক বিধানের চরম অবমাননাই নয়, বরং এটি একটি দণ্ডনীয় জালিয়াতি। উল্লেখ্য, এখানে তার একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। গভীর অনুসন্ধানে ব্রিটিশ সরকারের দাপ্তরিক ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, জেবা আমিনা আহমেদ জন্মসূত্রে বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী। লন্ডনে অবস্থানকালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ‘চিলড্রেন প্যারাডাইস (ইউকে)’ (কোম্পানি নংঃ ০৩৭৭২২৩৮) নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তবে অতি দ্রুতই সেই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নানাবিধ অনৈতিক ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল অংকের ঋণে নিমজ্জিত হয়ে পড়লে এবং ব্যবসায়িক সততা লঙ্ঘিত হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে তার এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চিরতরে বন্ধ করে দেয়। জেবা আমিনার এই নজিরবিহীন আর্থিক জালিয়াতি ও নীতিহীন ব্যবসায়িক অপতৎপরতা এতটাই প্রকট ছিল যে, ২০০৫ সালে বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’ তাকে নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিলেতের মাটিতে ঋণের পাহাড় আর প্রথম স্বামীর সঙ্গে চরম তিক্ততার জেরে সব হারিয়ে অনেকটা নিঃস্ব অবস্থায় বাংলাদেশে পাড়ি জমান জেবা আমিনা। দেশে ফিরেই তিনি চতুরতার আশ্রয় নিয়ে দেশের শীর্ষ আবাসন ব্যবসায়ী ও তৎকালীন কনকর্ডের পরিচালক মোকাররম হোসেন খানের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সম্পর্কের নেপথ্যে থাকা ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র ফুটে ওঠে রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি মোকাররম হোসেন খানের জবানবন্দিতে। তিনি জানান, প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ২০০৫ সালে তিনি জেবা আমিনাকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় জেবা তার প্রথম স্বামী থেকে বিচ্ছেদের দাবি করলেও কোনো দালিলিক প্রমাণ দেখাতে পারেননি। পরবর্তীকালে বেরিয়ে আসে এক বিস্ফোরক তথ্য—বিয়ের সময় নয়, বরং এর দুই বছর পর ২০০৭ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়। এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে মোকাররম হোসেন খান ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নংঃ ৩৪৬/১৭)। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, জেবা আমিনা দ্বিমুখী প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন। একদিকে বাংলাদেশে তিনি ২০০৫ সাল থেকে মোকাররম হোসেনের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে ২০০৭ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ দেখিয়ে লন্ডনের আদালতে সম্পদের ভাগ চেয়ে মামলা ঠুকে দেন। আইনের চোখে ধুলো দিয়ে এবং চরম নীতিহীনতার পরিচয় দিয়ে তিনি প্রথম স্বামীর বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানাও হাসিল করে নেন, যা তার সীমাহীন ধূর্ততা ও অর্থলিপ্সারই বহিঃপ্রকাশ। প্রথম স্বামীকে আইনত তালাক না দিয়ে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে কঠোর আইনি ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা মেট্রো বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগর দায়রা জজের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, ‘বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মৌখিক দাবি বা অস্পষ্টতার সুযোগ নেই। যেহেতু আগের বিবাহটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত (রেজিস্ট্রি) ছিল, তাই তার বিচ্ছেদও অবশ্যই আইনি রেজিস্ট্রির মাধ্যমেই সম্পন্ন হতে হবে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, প্রথম স্বামী বর্তমান থাকা অবস্থায় এবং বৈধ বিচ্ছেদ ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কেবল দেশের প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ ‘হারাম’ এবং ব্যভিচারের শামিল। জেবা আমিনা আহমেদের এই কর্মকাণ্ডকে একটি গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, আইনের চোখে এমন জালিয়াতি ও চারিত্রিক স্খলনের কোনো ক্ষমা নেই। বিচ্ছেদের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে মোকাররম হোসেন খান এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, জেবা আমিনা যখন লন্ডন থেকে ফিরে তাকে বিয়ে করেন, তখন জেবা ছিল আকণ্ঠ দেনায় নিমজ্জিত—যা বিয়ের আগে সুকৌশলে গোপন রাখা হয়েছিল। বিয়ের পর থেকেই জেবার আসল রূপ প্রকাশ পেতে থাকে; মিথ্যা তথ্য ও সুনিপুণ প্রতারণার জালে জড়িয়ে তিনি মোকাররম হোসেনের মালিকানাধীন কোম্পানি থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেন, যা পরবর্তীকালে আর ফেরত দেননি। তার এই চরম অর্থলোভ ও উগ্র আচরণের প্রভাব পড়ে পারিবারিক জীবনেও। মোকাররম হোসেনের সন্তানদের সাথে অমানবিক আচরণ এবং তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার ক্রমাগত চেষ্টার ফলে দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছায়। এই অস্থির সময়ের মধ্যেই জেবা আমিনা বিএনপিতে যোগ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, কৌশলে মোকাররম হোসেনের কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার নিজের নামে লিখে নিলেও তার বিপরীতে কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি, যার অকাট্য প্রমাণ কোম্পানির অডিট রিপোর্টে বিদ্যমান। প্রতারণার এখানেই শেষ নয়; বিচ্ছেদের পর তিনি উল্টো কোম্পানি কোর্টে মামলা ঠুকে দিয়ে এবং ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) আদেশের সুযোগ নিয়ে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এলাকার একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট অবৈধভাবে দখল করে আছেন। নিজের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি মোকাররম হোসেনের স্বাক্ষর জালিয়াতি (ফটোপেস্ট) করে একটি ভুয়া চুক্তিপত্র আদালতে দাখিল করেন। এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে পরবর্তীতে থানায় একটি জিআর মামলা (মামলা নম্বরঃ ৩০(৮)১৭) দায়ের করা হয়, যা এই নেত্রীর সীমাহীন ধূর্ততা ও জালিয়াতির এক জীবন্ত দলিল। মোকাররম হোসেন খান জেবা আমিনার বিরুদ্ধে এক লোমহর্ষক ও দুর্ধর্ষ হামলার অভিযোগ এনে বলেন, ‘আমি এক অত্যন্ত গুরুতর ও বর্বরোচিত ঘটনার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ২০২৫ সালের ২৭ শে জুন, ঈদুল আজহার ছুটিতে আমি যখন সপরিবারে দেশের বাইরে ছিলাম, ঠিক সেই সুযোগে জেবা আমিনার প্রত্যক্ষ কমান্ডে হিজরাসহ ১০-১৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও গুন্ডাবাহিনী আমার ভবনে তাণ্ডব চালায়। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে বারিধারার বাসভবনে প্রবেশ করে আমার মূল বাসভবন (অ্যাপার্টমেন্ট ২০১) এবং আমার সন্তান মাহিরা হোসেন খান ও মেরাজ হোসেন খানের পরিবারসহ বসবাসের স্থান (অ্যাপার্টমেন্ট ৪০১)-এ জোরপূর্বক হানা দেয়। তারা পুরো ভবন দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়, যার সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। এবং তারা আলমারি ও লকার ভেঙে আমার বেশ কিছু দামি ঘড়ি, ল্যাপটপ, মোবাইল, স্বর্ণালঙ্কার, ক্যাশ টাকা ও আরও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে আমি বিদেশ থেকে ফিরে এসে একটা সংবাদ সম্মেলন করি এবং বিভিন্ন পেপার-পত্রিকা বিষয়টি ফলাও করে ছাপাও হয় এবং বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এরিয়াতে যারা বসবাস করে এবং বারিধারা সোসাইটিও বিষয়টি অবগত এবং ওই সময় আমি দেশে না থাকায় তারা আমাকে নানাভাবে সাহায্যও করেছিল। তিনি আরও জানান, এই সহিংসতা জেবা আমিনার জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও ২০১৮ সালে তিনি একইভাবে অ্যাপার্টমেন্ট দুটি দখলের অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে গুলশান থানায় একটি মামলা (নং ১৩(১২)১৮) দায়ের করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক এই সশস্ত্র অনুপ্রবেশ ও হামলার ঘটনায় মোকাররম হোসেন খান কেবল থানায় সাধারণ ডায়েরিই করেননি, বরং ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি সুনির্দিষ্ট সিআর মামলাও (নং ৩৫১৬/২৫) দায়ের করেছেন, যার পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে। বিদেশের মাটিতে দেউলিয়া এবং দেশে দখলদারিত্বের এমন ভয়ানক মিশেল এই নেত্রীর উগ্র ও অপরাধপ্রবণ মানসিকতাকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মোকাররম হোসেন খান জানান, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সম্পূর্ণ ভবনে তার নামে কোনো অ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা না থাকলেও তিনি গায়ের জোরে একটি ফ্ল্যাট দখল করে আছেন। মূলত, একটি ‘কোম্পানি স্যুট’-এর আইনি মারপ্যাঁচে হাইকোর্ট থেকে প্রাপ্ত স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) আদেশের আড়ালে জেবা আমিনা এই দখলদারিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। আইনি এই জটিলতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি প্রকৃত মালিকের অধিকার খর্ব করছেন। বর্তমানে মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকলেও, মালিকানা ছাড়াই ফ্ল্যাটটি আঁকড়ে রাখার এই প্রবণতা তার দখলদারী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ বলে তিনি দাবি করেন। মোকাররম হোসেন খান বলেন, বিএনপি সর্বদা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে। তাই জেবা আমিনা আহমেদের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড, আইনি জালিয়াতি ও অপকর্মের আদ্যোপান্ত তুলে ধরে আমি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং ন্যায়ের স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুতর অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। জেবা আমিনার সীমাহীন লোভ ও অনৈতিকতার শিকার হতে হয়েছে তার নিজ পরিবারকেও। গুলশান ২ নম্বরের ১০৮ নম্বর রোডে অবস্থিত ১৭ নম্বর প্লটটি ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া পৈত্রিক সম্পত্তি, যা কনকর্ড আতিয়া নামে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে যে, প্লটটি ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে বহুতল ভবন নির্মাণের পর গত ১৫ বছর ধরে জেবা আমিনা ক্ষমতার দাপটে পুরো ভবনের মালিকানা এককভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। শরীয়াহ এবং উত্তরাধিকার আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি তার আপন তিন বোন—লাবিবা আহমেদ, দিবা আহমেদ ও আরবা আহমেদ এবং তার প্রয়াত ভাইয়ের দুই নাবালক সন্তান হেশাম ও হাসানের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া তাদের ন্যায্য ফ্ল্যাটগুলো অবৈধভাবে দখল করে রাখা শুধু নয়, বরং সেই ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দিয়ে প্রাপ্ত বিপুল অর্থ তিনি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে একাই ভোগ করে আসছেন। প্রতারণার এই জাল পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপরও বিস্তৃত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জেবা আমিনা একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দুইজন পৃথক ব্যক্তির কাছে সুকৌশলে বিক্রি করেছেন এবং উভয় ক্রেতার কাছ থেকেই বিক্রয়মূল্যের মোটা অংকের টাকা গ্রহণ করে আত্মসাৎ করেছেন। শুধু আর্থিক জালিয়াতিই নয়, মোকাররম হোসেন খান তার বিরুদ্ধে এক চরম অমানবিক ও হৃদয়বিদারক অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের সংসারে একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যার বাবা আমি। কিন্তু জেবা আমিনা এতটাই নিষ্ঠুর যে, আমার সেই অসুস্থ মেয়েটির সঙ্গে আমাকে এবং ভাইবোনদের দেখাও করতে দেয় না।’ একজন গর্ভধারিণী মায়ের এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ এবং আপনজনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ঘটনাটি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক চরম দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযুক্ত জেবা আমিনা খান ওরফে জেবা আলগাজীর জীবনকাহিনি যেন এক সুনিপুণ জালিয়াতি ও নৈতিক স্খলনের উপাখ্যান। অর্থের প্রতি তার মোহ তাকে এক নীতিহীন প্রতারকে পরিণত করেছে। সাহায্যের নামে মানুষের বিশ্বাস পুঁজি করে তিনি যে ঋণের পাহাড় গড়েন, যা শোধ করার কোনো সদিচ্ছা তার নেই। বরং অন্যের টাকায় বিলাসি জীবনযাপন করাই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তার জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে প্রতারণার ছাপ। তার এ ধরনের ভয়াবহ জালিয়াতি ও বাড়ি দখলের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হওয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। একজন রাজনৈতিক নেত্রীর এমন দ্বিমুখী জীবন ও নীতিহীনতা এখন জনমুখে আলোচনার প্রধান খোরাক। উল্লিখিত একাধিক অভিযোগের বিষয়ে মহিলা দলের সহ-সভাপতি জেবা আমিনা আহমেদ ওরফে জেবা আমিনা আলগাজী বলেন, ‘প্রথম স্বামীর সঙ্গে মৌখিক তালাকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ইসলামী শরীআ অনুসারে কোনো নারীর তিন ইদ্দ্যত পার হলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন- ইসলাম তাই বলে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে মৌখিকভাবে তালাক হলেও পরবর্তীতে ২০০৭ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে লন্ডনে আদালতের মাধ্যমে ডিভোর্স হয়। এরপর সম্পদের অংশ পেতে মামলা করি। সেটিও নিষ্পন্ন হয়েছে।’ লন্ডনে কোম্পানি দেউলিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে জেবা আমিনা আহমেদ বলেন, ‘দেউলিয়া নয়; লিকুয়েডেশন করে ব্রিটিশ সরকার’। আর অন্যান্য অভিযোগকে তিনি মিথ্যা দাবি করেন। প্রথম বিয়ে ও বিচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক নথিপত্র অনুযায়ী, জেবা আমিনা আহমেদ ১৯৮৩ সালের ১৫ জুলাই যুক্তরাজ্যে নিয়াজ বিন করিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অভিযোগে বলা হয়, তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল ছিল। অন্যদিকে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, এর মধ্যেই ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশে এসে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় প্রথম বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জেবা আমিনা আহমেদ বলেন, প্রথম স্বামীর সঙ্গে তার মৌখিক তালাক হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, “ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে মৌখিক তালাকের পর ইদ্দত পার হলে দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়। পরে ২০০৭ সালে লন্ডনে আদালতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স সম্পন্ন হয়।” দ্বিতীয় সংসার ও আইনি বিরোধ জেবা আমিনা আহমেদের দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ী ও রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক সভাপতি মোকাররম হোসেন খান। তার অভিযোগ, বিয়ের সময় জেবা আমিনা প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের দাবি করলেও কোনো দালিলিক প্রমাণ দেখাতে পারেননি। মোকাররম হোসেন খান ঢাকার সিএমএম আদালতে এ বিষয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। তার দাবি, পরে জানা যায় যে বিয়ের সময় প্রথম স্বামীর সঙ্গে আইনগত বিচ্ছেদ হয়নি। সম্পত্তি ও আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ মোকাররম হোসেন খানের অভিযোগ অনুযায়ী, জেবা আমিনা আহমেদ তার মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়েছেন এবং কিছু শেয়ার নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট দখল নিয়ে তাদের মধ্যে আইনি বিরোধ চলছে বলে তিনি দাবি করেন। মোকাররম হোসেনের অভিযোগ, ওই ফ্ল্যাটের মালিকানা না থাকলেও আদালতের একটি ‘স্থিতাবস্থা’ আদেশের সুযোগ নিয়ে জেবা আমিনা সেখানে অবস্থান করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এ সংক্রান্ত মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। সহিংসতা ও দখলচেষ্টার অভিযোগ মোকাররম হোসেন খান আরও অভিযোগ করেছেন, ২০২৫ সালের ২৭ জুন ঈদুল আজহার ছুটির সময় তিনি দেশের বাইরে থাকাকালে তার বারিধারার বাসভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। তার দাবি, ১০-১৫ জনের একটি দল ভবনে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তিনি এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি এবং আদালতে একটি মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন। পারিবারিক সম্পত্তি নিয়েও বিরোধ জেবা আমিনা আহমেদের বিরুদ্ধে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গুলশান এলাকার একটি পৈত্রিক সম্পত্তিতে তার বোন ও ভাতিজাদের অংশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তা এককভাবে ব্যবহার করছেন। তবে এসব অভিযোগকেও তিনি মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। যুক্তরাজ্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে জেবা আমিনা আহমেদ তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে ‘চিলড্রেন প্যারাডাইস (ইউকে)’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন, যা পরে বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “দেউলিয়া হয়নি, বরং কোম্পানিটি লিকুইডেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বন্ধ হয়েছে।” রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জেবা আমিনা আহমেদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। অন্যদিকে জেবা আমিনা আহমেদ দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অধিকাংশ অভিযোগই ভিত্তিহীন এবং আদালতেই এর সত্যতা প্রমাণ হবে।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল : বরিশালের সিটি করপোরেশনে সিসিটিভি ক্যামেরা কেলেঙ্কারি ফাসঁ। স্থাপনের চেয়ে অতিরিক্ত সংখ্যা ও প্রকৃত মূল্য থেকে অতিরিক্ত বিল করে অর্থ আত্মসাৎ।অভিযোগের তীর জনসংযোগ কর্মকর্তা ও আইটি কর্মকর্তা (চঃদাঃ) আহসান উদ্দিন রোমেলের দিকে।রোমেলের কারনে অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স কার্য্যক্রম ভেস্তে গেছে।এছাড়া রোমেল চাকুরির আড়ালে ঠিকাদারী কাজও করেন। সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ এই রোমেলকে দুর্নীতির কারনে চাকুরীচ্যুত করেছিল। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে কে এই দুর্নীতিবাজ রোমেল : বরিশালে একটি আইটি প্রতিষ্ঠান এর তৈরি ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স এর কাজ শেষ হলেও উদ্ভোধনের দিনক্ষন নির্ধারিত হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে ঐ আইটি প্রতিষ্ঠানের কাজকে এড়িয়ে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ আমলে আর্থিক ক্ষতিসহ ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করায় চতুর্থ পরিষদের নবম সাধারণ সভায় চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধমুলক কর্মকান্ডের জন্য চাকুরী হারানো আহসিন উদ্দিন রোমেল । গোপনে তার নিজের প্রতিষ্ঠান পিপলো বিডি দিয়ে সিটি কর্পোরেশনের আইটিসহ বিভিন্ন বিভাগের সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছে। রোমেলের নিজ প্রতিষ্ঠান পিপলো বিডির করা প্রজেক্টের কাজ ও বিল আটকে দেয় সচিব মাসুমা আক্তার।পরে রোমেল ও সচিব মাসুমা অর্থ ভাগাভাগি করে অর্থ আত্মসাৎ করে। এর সাথে কমিশন সম্পর্ক থাকায় রোমেল জনসংযোগ কর্মকর্তার পাশাপাশি আইটি বিভাগের কর্মকর্তার পদটি বাগিয়ে নেয়।আইটি কর্মকর্তা হিসেবে নামে বে নামে বিল ও ভাউচার করতো এ ছাড়া মেয়রের, ঈদ শুভেচ্ছার ব্যানার, সাইনবোর্ড, ফেসবুকে মেয়রের ব্যক্তিগত প্রচারণা (বুষ্টিং )চালানোর নামে অতিরিক্ত বিল আদায়ের অভিযোগ রোমেলের নামে। নেটওয়ার্কের জন্য ২ লাখ নিয়ে ৭৬ হাজার টাকার কাজ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছে রোমেল। এছাড়া রোমেলের বিরুদ্ধে সাবেক মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের ঈদ শুভেচ্ছার ব্যানার সাইনবোর্ড ও ফেস্টুন বাবদ ১৩ লাখ নিলেও ৭ লাখ টাকার ব্যানার ও ফেস্টুন লাগিয়ে ৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে এই দুর্নীতিবাজ আহসান উদ্দিন রোমেল। এছাড়া নামে মাত্র বুষ্টিংয়ের কাজ করে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৩৭ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই দুর্নীতিবাজ রোমেল। রোমেলের অপকর্মের তথ্য চেয়ে সম্প্রতি তরিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়ে আবেদন করেছেন। সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে সেই আন্দোলনের অন্যতম দাবী ছিল দুর্নীতিবাজ ও সরকারি টাকা আত্মসাৎকারী আহসান উদ্দিন রোমেলকে চাকুরী থেকে বরখাস্তসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করার।