Brand logo light
ব্রেকিং

এইচএসসি ফল বিপর্যয়: শিক্ষার্থী, শিক্ষক নাকি শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা?

নিজস্ব প্রতিবেদক নভেম্বর ৩, ২০২৬ 0

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন:

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ শতাংশের ঘরে নেমে আসার পর ফল বিপর্যয়ের দায় নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, মোবাইল আসক্তি ও অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণহীনতাই এর প্রধান কারণ। আবার শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, নিয়মিত ক্লাস না করা, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলার অভাব এবং পড়াশোনার প্রতি অনীহা ফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ।

তবে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পক্ষ প্রশ্ন তুলছে, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় কি এককভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়? যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, যেখানে নিয়মিত ক্লাস হয় না, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট রয়েছে, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে প্রত্যাশিত ফলাফল না হওয়ার দায় কার?

শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, শিক্ষকদের পাঠদানের মান, কলেজ প্রশাসনের তদারকি, অভিভাবকদের দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই সংকট। ফলে এবারের ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা কিংবা পরিশ্রমের মূল্যায়ন নয়; বরং দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

 

৬০ শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে বোঝে মাত্র ৭-৮ জন!

মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান—এমন একজন শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের উদ্বেগজনক চিত্র।

তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৬০ জন শিক্ষার্থীর একটি শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক প্রত্যাশা হতে পারে, ৪০ জন পাঠ বুঝবে, ১০ জন মাঝারি মানের অগ্রগতি করবে এবং বাকি ১০ জন হয়তো পিছিয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র এর উল্টো।

৬০ জনের মধ্যে নিয়মিত পাঠ বুঝতে পারে মাত্র ৭-৮ জন। প্রায় ২০ জন পাঠের বিষয়বস্তু শুনলেও আগের ও পরের পাঠের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। আরও ১০ জনের উপস্থিতি অনিয়মিত। কোনো দিন ক্লাসে থাকলেও পরদিন তাদের দেখা যায় না।

অথচ এসব শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ নিয়মিত প্রাইভেট ও কোচিং করে। প্রশ্ন উঠেছে, এত সময় ও অর্থ ব্যয় করার পরও শ্রেণিকক্ষের পাঠ গ্রহণের মান কেন বাড়ছে না?

ওই শিক্ষকের ভাষ্য, শেষ পর্যন্ত ৮-১০ জন নিয়মিত ও মনোযোগী শিক্ষার্থীই কোনোভাবে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে। বাকিদের একটি বড় অংশ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে শাসন করতে গেলেও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে শিক্ষকদের চাপে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। এতে শিক্ষকেরা স্বাভাবিকভাবে পাঠদান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সমস্যায় পড়েন।

তবে শিক্ষার্থীদের আচরণসংক্রান্ত এসব অভিজ্ঞতা সর্বজনীন চিত্র নয়। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আনে।

শিক্ষার্থীদের দায় কতটুকু?

শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, যারা নিয়মিত পড়াশোনা করেছে, ক্লাস করেছে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, তাদের ফলাফল সাধারণত ভালো হয়েছে। ফলে যেসব শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় পড়াশোনায় অমনোযোগী ছিল, নিয়মিত ক্লাস করেনি কিংবা পরীক্ষার আগে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়নি, তাদের ব্যর্থতার দায় অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনা জরুরি।

মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারকেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।

তবে শুধু মোবাইলকে দায়ী করেও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সন্তান কখন বাইরে যাচ্ছে, কতক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, পড়াশোনায় কতটা সময় দিচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি ও পারিবারিক শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষক সংকট: শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সুযোগই নেই কোথাও কোথাও

ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট এক শিক্ষকের উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন উপজেলার সরকারি কলেজে চার-পাঁচ-ছয়টি বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। রামগড় সরকারি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কোনো কলেজে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একজন শিক্ষকও পাওয়া যায় না।

আইসিটি শিক্ষকের সংকটও রয়েছে বলে দাবি তাঁর।

অন্যদিকে, কোনো কোনো কলেজে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকদের একটি অংশের নিজেদের ভাষাগত দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ইংরেজি পড়ানো হলেও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ভাষাগত দক্ষতা কতটা তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিষয়ে শিক্ষক নেই, সেখানে শিক্ষার্থীরা কীভাবে নির্ধারিত পাঠ্যসূচি শেষ করবে? আবার শিক্ষক থাকলেও যদি তাঁর পাঠদানের দক্ষতা পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কতটা উপকৃত হবে?

সিনিয়র শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের ক্লাসে অনুপস্থিতির অভিযোগ

কলেজ পর্যায়ে পাঠদানের আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের একটি অংশ নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। অথচ তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

এমনকি অনেক কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষও নিয়মিত ক্লাস নেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের দাবি, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদেরও পাঠদানের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যাঁরা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নেতৃত্ব দেন, তাঁদের শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে?

কোথাও শিক্ষক বেশি, কোথাও শিক্ষক নেই: বণ্টন ব্যবস্থায় অসংগতি

দেশের কলেজগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বণ্টনেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে।

কোনো কলেজে একটি বিষয়ে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ শিক্ষক রয়েছেন, আবার অন্য কোনো কলেজে একই বিষয়ে প্রয়োজনীয় দুজন শিক্ষকও নেই।

এমন পরিস্থিতিতে একদিকে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি অর্থে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের দক্ষতা ও কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না।

এটি শুধু শিক্ষক সংকট নয়; বরং শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, পদায়ন ও জনবল পরিকল্পনার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কাছে কি কলেজভিত্তিক বিষয়ওয়ারি শিক্ষক চাহিদা এবং বিদ্যমান জনবলের হালনাগাদ তথ্যভান্ডার রয়েছে? থাকলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষক বণ্টন ও পদায়ন কেন আরও কার্যকর করা হচ্ছে না?

ক্লাস মনিটরিং নেই, জবাবদিহিও দুর্বল

শিক্ষার মান উন্নয়নে নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কলেজ পর্যায়ে এ ধরনের কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কোন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন, কে কতটুকু সিলেবাস শেষ করেছেন, শিক্ষার্থীরা পাঠ কতটা বুঝছে—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা অনেক প্রতিষ্ঠানে দুর্বল।

বিশেষ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রম তদারকির জন্য যথাযথ কর্তৃত্ব, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক।

শুধু হাজিরা খাতা কিংবা দাপ্তরিক প্রতিবেদন দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান যাচাই সম্ভব নয়। প্রয়োজন শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পরিমাপ এবং ফলাফলের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

শিক্ষা উপকরণ ও অবকাঠামোগত ঘাটতি

কলেজের পাঠদান কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো কলেজে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় বই নেই। কোথাও পর্যাপ্ত পাঠাগার, বইয়ের র‍্যাক কিংবা ব্যবহারিক শিক্ষার উপকরণের ঘাটতি রয়েছে।

আইসিটি, বিজ্ঞান ও অন্যান্য ব্যবহারিক বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ না থাকলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

শুধু পাঠ্যবই নির্ধারণ করলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। সেই পাঠ্যসূচি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, বই, পরীক্ষাগার ও প্রযুক্তিগত সুবিধাও প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণে বৈষম্য, নেই দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা

শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশিক্ষণ বণ্টনে পরিকল্পনাহীনতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

একজন শিক্ষক বারবার বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ দীর্ঘ চাকরিজীবনেও বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রশিক্ষণ পাননি।

এক শিক্ষকের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কোনো কোনো শিক্ষক বছরে চার-পাঁচ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে অনেক শিক্ষক পুরো চাকরিজীবনেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না।

তাঁর অভিযোগ, কোন শিক্ষক কোন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, ভবিষ্যতে কাকে কোন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী কাকে কীভাবে দক্ষ করে তোলা হবে—এমন সমন্বিত ক্যারিয়ার পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।

অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষককে নিজ উদ্যোগে আবেদন করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। প্রশিক্ষণ প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হলো, সেটিই যেন অগ্রগতির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেখার মান কতটা বাড়ল, সেই আউটপুট ও আউটকাম মূল্যায়নের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব নেই বলে অভিযোগ।

শিক্ষক উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

একই কলেজে ১০-২০ বছর: বদলি ব্যবস্থায় প্রশ্ন

সরকারি কলেজে শিক্ষক বদলি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক শিক্ষক আবেদন না করলে একই কলেজে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কর্মরত থাকতে পারেন। দীর্ঘদিন একই জায়গায় অবস্থানের ফলে কেউ কেউ একাডেমিক দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত ও অন্যান্য কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কেউ ক্লাস, কেউ কোচিং, কেউ ব্যবসা কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত—এমন অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক।

তবে দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকার সব ক্ষেত্রকে অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন স্বচ্ছ, নীতিনির্ভর ও প্রয়োজনভিত্তিক বদলি ব্যবস্থা, যাতে শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা দুটিই বিবেচনায় থাকে।

ভর্তি হওয়ার পর ক্লাসে আসে না, তবু ফরম পূরণ!

শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংকটও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নিয়মিত ক্লাসে আসে না। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থেকেও পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ পেয়ে যায়।

অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের পাঠ গ্রহণ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হতো।

শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের কার্যকর ভূমিকা না থাকলে পরীক্ষার আগে হঠাৎ প্রস্তুতি নিয়ে ভালো ফল আশা করা কঠিন।

সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা ৩০: শিক্ষকতার কর্মঘণ্টা নিয়েও প্রশ্ন

কলেজের শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা ও উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন একজন শিক্ষক।

তাঁর ভাষ্য, কোনো কোনো কলেজে শিক্ষকরা সকাল ১০টার দিকে আসেন এবং দুপুর ১টা ৩০ মিনিট বা ২টার মধ্যে চলে যান। ফলে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পাঠদান ও একাডেমিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কলেজভিত্তিক উপস্থিতির রেকর্ড, ক্লাস রুটিন, পাঠদান কার্যক্রম এবং সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন।

৫২ শতাংশ পাস—ব্যর্থতা, নাকি বাস্তবতার প্রতিফলন?

এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।

এই ফলাফলকে কেউ শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন, কেউ শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন মনে করছেন।

একজন কলেজশিক্ষক নিজের প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ৮১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাত্র পাঁচজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। পাসের হার ৬৫ শতাংশ।

তারপরও তিনি ফলাফলে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যে পরিবেশে শিক্ষক সংকট, অনিয়মিত ক্লাস, দুর্বল তদারকি ও শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির মতো সমস্যা রয়েছে, সেখানে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়ার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যায় না।

তিনি নিজের দায় স্বীকার করে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য অন্যকে দায়ী করার আগে শিক্ষক হিসেবে নিজের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।

তাঁর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যাঁরা শিক্ষার্থীদের তৈরি করবেন, তাঁদের নিজেদের দায়িত্ব ও ব্যর্থতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

ফল বিপর্যয়ের পেছনে সম্ভাব্য ১০টি কারণ

শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কারণ সামনে আসে।

1. শিক্ষকদের পাঠদানের দুর্বলতা: নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, পাঠ বুঝিয়ে পড়ানোর ঘাটতি এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার অভাব।

2. কলেজ কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব: শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, সিলেবাস সম্পন্ন করা এবং পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণে দুর্বলতা।

3. নিয়মিত ক্লাস না হওয়া: নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করতে না পারা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা।

4. শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা: মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে পড়াশোনায় মনোযোগ কম দেওয়া।

5. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকা: পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে অতিরিক্ত ক্লাস, মডেল টেস্ট ও বিশেষ পরিচর্যার ব্যবস্থা না করা।

6. অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দুর্বলতা: নির্বাচনী, টেস্ট ও ক্লাস পরীক্ষায় যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রস্তুতি যাচাই না হওয়া।

7. অভিভাবকদের অসচেতনতা: সন্তানদের পড়াশোনা, উপস্থিতি ও প্রস্তুতির বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর না রাখা।

8. শিক্ষক সংকট ও দক্ষতার অভাব: প্রয়োজনীয় বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা এবং বিদ্যমান শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে ঘাটতি।

9. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব: শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান ও কলেজ প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা।

10. শিক্ষার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, নিয়মিত পরীক্ষা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের অভাব।

দায় কার, সমাধান কোথায়?

এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়কে শুধু শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা কিংবা শুধু শিক্ষকদের ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না।

একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস না করলে তার দায় রয়েছে। অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ না রাখলে তাঁদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষক যথাযথভাবে পাঠদান না করলে তাঁকেও জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। একইভাবে কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রশাসনকে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বণ্টন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, বদলি নীতির সংস্কার এবং কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ জরুরি:

  • কলেজভিত্তিক শিক্ষক সংকট নিরূপণ করে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পদায়ন।

  • নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ ও পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা।

  • অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের পাঠদানের দায়িত্ব বাস্তবায়ন।

  • শিক্ষকদের জন্য সমন্বিত প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা।

  • শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।

  • পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদান ও পরামর্শ কার্যক্রম।

  • কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

  • অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় তৈরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর দায়ী ব্যক্তি খোঁজার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা কেন শিখতে পারছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।

কারণ, একটি শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা শুধু তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেটি পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ব্যর্থতারও প্রতিফলন।

এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, তথ্যভিত্তিক তদন্ত এবং কার্যকর সংস্কার। শিক্ষার্থীকে দায়ী করে শিক্ষক দায়মুক্তি পাবেন না, আবার শিক্ষককে দায়ী করে শিক্ষার্থীর দায়িত্বও অস্বীকার করা যাবে না।

এইচএসসির ফল বিপর্যয় তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—আমরা কি শুধু পরীক্ষায় পাস করাতে চাই, নাকি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই?

 
Popular post
বাংলাদেশে ঐতিহাসিক নির্বাচন: বিএনপি এগিয়ে, জামায়াতের উত্থান ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ফারুকীর সম্পদ কমেছে, তিশার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি: সম্পদ বিবরণী ঘিরে আলোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

গাজায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ।  ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী।    ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে,  স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ  বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”

সংসার সামলাতে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন রোজিনা

বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।

কুড়িগ্রামের তাজু ভাই ২.০: ‘সরকারি রেটে জিলাপি’ প্রশ্নে ভাইরাল এক নির্মাণশ্রমিকের গল্প

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে।  কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে।  কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।  কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি।  মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্রেকিং

View more
এইচএসসি ফল বিপর্যয়: শিক্ষার্থী, শিক্ষক নাকি শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা?

ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ শতাংশের ঘরে নেমে আসার পর ফল বিপর্যয়ের দায় নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, মোবাইল আসক্তি ও অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণহীনতাই এর প্রধান কারণ। আবার শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, নিয়মিত ক্লাস না করা, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলার অভাব এবং পড়াশোনার প্রতি অনীহা ফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ। তবে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পক্ষ প্রশ্ন তুলছে, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় কি এককভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়? যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, যেখানে নিয়মিত ক্লাস হয় না, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট রয়েছে, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে প্রত্যাশিত ফলাফল না হওয়ার দায় কার? শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, শিক্ষকদের পাঠদানের মান, কলেজ প্রশাসনের তদারকি, অভিভাবকদের দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই সংকট। ফলে এবারের ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা কিংবা পরিশ্রমের মূল্যায়ন নয়; বরং দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।   ৬০ শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে বোঝে মাত্র ৭-৮ জন! মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান—এমন একজন শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের উদ্বেগজনক চিত্র। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৬০ জন শিক্ষার্থীর একটি শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক প্রত্যাশা হতে পারে, ৪০ জন পাঠ বুঝবে, ১০ জন মাঝারি মানের অগ্রগতি করবে এবং বাকি ১০ জন হয়তো পিছিয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র এর উল্টো। ৬০ জনের মধ্যে নিয়মিত পাঠ বুঝতে পারে মাত্র ৭-৮ জন। প্রায় ২০ জন পাঠের বিষয়বস্তু শুনলেও আগের ও পরের পাঠের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। আরও ১০ জনের উপস্থিতি অনিয়মিত। কোনো দিন ক্লাসে থাকলেও পরদিন তাদের দেখা যায় না। অথচ এসব শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ নিয়মিত প্রাইভেট ও কোচিং করে। প্রশ্ন উঠেছে, এত সময় ও অর্থ ব্যয় করার পরও শ্রেণিকক্ষের পাঠ গ্রহণের মান কেন বাড়ছে না? ওই শিক্ষকের ভাষ্য, শেষ পর্যন্ত ৮-১০ জন নিয়মিত ও মনোযোগী শিক্ষার্থীই কোনোভাবে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে। বাকিদের একটি বড় অংশ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে শাসন করতে গেলেও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে শিক্ষকদের চাপে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। এতে শিক্ষকেরা স্বাভাবিকভাবে পাঠদান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সমস্যায় পড়েন। তবে শিক্ষার্থীদের আচরণসংক্রান্ত এসব অভিজ্ঞতা সর্বজনীন চিত্র নয়। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আনে। শিক্ষার্থীদের দায় কতটুকু? শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, যারা নিয়মিত পড়াশোনা করেছে, ক্লাস করেছে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, তাদের ফলাফল সাধারণত ভালো হয়েছে। ফলে যেসব শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় পড়াশোনায় অমনোযোগী ছিল, নিয়মিত ক্লাস করেনি কিংবা পরীক্ষার আগে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়নি, তাদের ব্যর্থতার দায় অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনা জরুরি। মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারকেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা। তবে শুধু মোবাইলকে দায়ী করেও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সন্তান কখন বাইরে যাচ্ছে, কতক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, পড়াশোনায় কতটা সময় দিচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি ও পারিবারিক শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক সংকট: শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সুযোগই নেই কোথাও কোথাও ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট এক শিক্ষকের উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন উপজেলার সরকারি কলেজে চার-পাঁচ-ছয়টি বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। রামগড় সরকারি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কোনো কলেজে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একজন শিক্ষকও পাওয়া যায় না। আইসিটি শিক্ষকের সংকটও রয়েছে বলে দাবি তাঁর। অন্যদিকে, কোনো কোনো কলেজে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকদের একটি অংশের নিজেদের ভাষাগত দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ইংরেজি পড়ানো হলেও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ভাষাগত দক্ষতা কতটা তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিষয়ে শিক্ষক নেই, সেখানে শিক্ষার্থীরা কীভাবে নির্ধারিত পাঠ্যসূচি শেষ করবে? আবার শিক্ষক থাকলেও যদি তাঁর পাঠদানের দক্ষতা পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কতটা উপকৃত হবে? সিনিয়র শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের ক্লাসে অনুপস্থিতির অভিযোগ কলেজ পর্যায়ে পাঠদানের আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের একটি অংশ নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। অথচ তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। এমনকি অনেক কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষও নিয়মিত ক্লাস নেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের দাবি, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদেরও পাঠদানের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যাঁরা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নেতৃত্ব দেন, তাঁদের শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে? কোথাও শিক্ষক বেশি, কোথাও শিক্ষক নেই: বণ্টন ব্যবস্থায় অসংগতি দেশের কলেজগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বণ্টনেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কলেজে একটি বিষয়ে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ শিক্ষক রয়েছেন, আবার অন্য কোনো কলেজে একই বিষয়ে প্রয়োজনীয় দুজন শিক্ষকও নেই। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি অর্থে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের দক্ষতা ও কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। এটি শুধু শিক্ষক সংকট নয়; বরং শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, পদায়ন ও জনবল পরিকল্পনার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কাছে কি কলেজভিত্তিক বিষয়ওয়ারি শিক্ষক চাহিদা এবং বিদ্যমান জনবলের হালনাগাদ তথ্যভান্ডার রয়েছে? থাকলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষক বণ্টন ও পদায়ন কেন আরও কার্যকর করা হচ্ছে না? ক্লাস মনিটরিং নেই, জবাবদিহিও দুর্বল শিক্ষার মান উন্নয়নে নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কলেজ পর্যায়ে এ ধরনের কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কোন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন, কে কতটুকু সিলেবাস শেষ করেছেন, শিক্ষার্থীরা পাঠ কতটা বুঝছে—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা অনেক প্রতিষ্ঠানে দুর্বল। বিশেষ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রম তদারকির জন্য যথাযথ কর্তৃত্ব, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক। শুধু হাজিরা খাতা কিংবা দাপ্তরিক প্রতিবেদন দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান যাচাই সম্ভব নয়। প্রয়োজন শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পরিমাপ এবং ফলাফলের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শিক্ষা উপকরণ ও অবকাঠামোগত ঘাটতি কলেজের পাঠদান কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো কলেজে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় বই নেই। কোথাও পর্যাপ্ত পাঠাগার, বইয়ের র‍্যাক কিংবা ব্যবহারিক শিক্ষার উপকরণের ঘাটতি রয়েছে। আইসিটি, বিজ্ঞান ও অন্যান্য ব্যবহারিক বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ না থাকলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। শুধু পাঠ্যবই নির্ধারণ করলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। সেই পাঠ্যসূচি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, বই, পরীক্ষাগার ও প্রযুক্তিগত সুবিধাও প্রয়োজন। প্রশিক্ষণে বৈষম্য, নেই দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশিক্ষণ বণ্টনে পরিকল্পনাহীনতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন শিক্ষক বারবার বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ দীর্ঘ চাকরিজীবনেও বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। এক শিক্ষকের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কোনো কোনো শিক্ষক বছরে চার-পাঁচ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে অনেক শিক্ষক পুরো চাকরিজীবনেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না। তাঁর অভিযোগ, কোন শিক্ষক কোন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, ভবিষ্যতে কাকে কোন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী কাকে কীভাবে দক্ষ করে তোলা হবে—এমন সমন্বিত ক্যারিয়ার পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষককে নিজ উদ্যোগে আবেদন করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। প্রশিক্ষণ প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হলো, সেটিই যেন অগ্রগতির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেখার মান কতটা বাড়ল, সেই আউটপুট ও আউটকাম মূল্যায়নের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব নেই বলে অভিযোগ। শিক্ষক উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনার দাবি উঠেছে। একই কলেজে ১০-২০ বছর: বদলি ব্যবস্থায় প্রশ্ন সরকারি কলেজে শিক্ষক বদলি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক শিক্ষক আবেদন না করলে একই কলেজে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কর্মরত থাকতে পারেন। দীর্ঘদিন একই জায়গায় অবস্থানের ফলে কেউ কেউ একাডেমিক দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত ও অন্যান্য কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ ক্লাস, কেউ কোচিং, কেউ ব্যবসা কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত—এমন অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক। তবে দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকার সব ক্ষেত্রকে অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন স্বচ্ছ, নীতিনির্ভর ও প্রয়োজনভিত্তিক বদলি ব্যবস্থা, যাতে শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা দুটিই বিবেচনায় থাকে। ভর্তি হওয়ার পর ক্লাসে আসে না, তবু ফরম পূরণ! শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংকটও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নিয়মিত ক্লাসে আসে না। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থেকেও পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ পেয়ে যায়। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের পাঠ গ্রহণ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হতো। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের কার্যকর ভূমিকা না থাকলে পরীক্ষার আগে হঠাৎ প্রস্তুতি নিয়ে ভালো ফল আশা করা কঠিন। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা ৩০: শিক্ষকতার কর্মঘণ্টা নিয়েও প্রশ্ন কলেজের শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা ও উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন একজন শিক্ষক। তাঁর ভাষ্য, কোনো কোনো কলেজে শিক্ষকরা সকাল ১০টার দিকে আসেন এবং দুপুর ১টা ৩০ মিনিট বা ২টার মধ্যে চলে যান। ফলে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পাঠদান ও একাডেমিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কলেজভিত্তিক উপস্থিতির রেকর্ড, ক্লাস রুটিন, পাঠদান কার্যক্রম এবং সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন। ৫২ শতাংশ পাস—ব্যর্থতা, নাকি বাস্তবতার প্রতিফলন? এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এই ফলাফলকে কেউ শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন, কেউ শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন মনে করছেন। একজন কলেজশিক্ষক নিজের প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ৮১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাত্র পাঁচজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। পাসের হার ৬৫ শতাংশ। তারপরও তিনি ফলাফলে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যে পরিবেশে শিক্ষক সংকট, অনিয়মিত ক্লাস, দুর্বল তদারকি ও শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির মতো সমস্যা রয়েছে, সেখানে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়ার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যায় না। তিনি নিজের দায় স্বীকার করে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য অন্যকে দায়ী করার আগে শিক্ষক হিসেবে নিজের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যাঁরা শিক্ষার্থীদের তৈরি করবেন, তাঁদের নিজেদের দায়িত্ব ও ব্যর্থতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? ফল বিপর্যয়ের পেছনে সম্ভাব্য ১০টি কারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কারণ সামনে আসে। 1. শিক্ষকদের পাঠদানের দুর্বলতা: নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, পাঠ বুঝিয়ে পড়ানোর ঘাটতি এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার অভাব। 2. কলেজ কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব: শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, সিলেবাস সম্পন্ন করা এবং পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণে দুর্বলতা। 3. নিয়মিত ক্লাস না হওয়া: নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করতে না পারা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা। 4. শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা: মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে পড়াশোনায় মনোযোগ কম দেওয়া। 5. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকা: পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে অতিরিক্ত ক্লাস, মডেল টেস্ট ও বিশেষ পরিচর্যার ব্যবস্থা না করা। 6. অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দুর্বলতা: নির্বাচনী, টেস্ট ও ক্লাস পরীক্ষায় যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রস্তুতি যাচাই না হওয়া। 7. অভিভাবকদের অসচেতনতা: সন্তানদের পড়াশোনা, উপস্থিতি ও প্রস্তুতির বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর না রাখা। 8. শিক্ষক সংকট ও দক্ষতার অভাব: প্রয়োজনীয় বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা এবং বিদ্যমান শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে ঘাটতি। 9. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব: শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান ও কলেজ প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা। 10. শিক্ষার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, নিয়মিত পরীক্ষা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের অভাব। দায় কার, সমাধান কোথায়? এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়কে শুধু শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা কিংবা শুধু শিক্ষকদের ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না। একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস না করলে তার দায় রয়েছে। অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ না রাখলে তাঁদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষক যথাযথভাবে পাঠদান না করলে তাঁকেও জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। একইভাবে কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রশাসনকে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বণ্টন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, বদলি নীতির সংস্কার এবং কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ জরুরি: কলেজভিত্তিক শিক্ষক সংকট নিরূপণ করে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পদায়ন। নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ ও পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা। অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের পাঠদানের দায়িত্ব বাস্তবায়ন। শিক্ষকদের জন্য সমন্বিত প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদান ও পরামর্শ কার্যক্রম। কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় তৈরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর দায়ী ব্যক্তি খোঁজার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা কেন শিখতে পারছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। কারণ, একটি শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা শুধু তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেটি পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ব্যর্থতারও প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, তথ্যভিত্তিক তদন্ত এবং কার্যকর সংস্কার। শিক্ষার্থীকে দায়ী করে শিক্ষক দায়মুক্তি পাবেন না, আবার শিক্ষককে দায়ী করে শিক্ষার্থীর দায়িত্বও অস্বীকার করা যাবে না। এইচএসসির ফল বিপর্যয় তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—আমরা কি শুধু পরীক্ষায় পাস করাতে চাই, নাকি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই?  

নিজস্ব প্রতিবেদক নভেম্বর ৩, ২০২৬ 0

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, জিপিএ ৪.২১ পেয়ে স্বপ্নপূরণ শেফালীর

২৪২ পদের নিয়োগে শতকোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ, ফাঁকা ওএমআর দিয়েও পাসের দাবি:প্রশ্নফাঁস থেকে ফল জালিয়াতির অভিযোগ

থামছে না মব: ৫৩৭ ঘটনায় ২৫৬ মৃত্যু, নেপথ্যে কী?

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর
যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস: সাতজন গ্রেপ্তার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস ও মূল হোতা এখনও অজানা

প্রশ্নের ছবি, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ও লাখ লাখ টাকার চুক্তি—তদন্তে উঠে আসছে নিয়োগ জালিয়াতির কৌশল; সরকারি তিন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার দাবি এসআরবির ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১৬০টির বেশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, প্রবেশপত্র, মূল সনদপত্র, ব্যাংকের চেক, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এসআরবির দাবি, চক্রটি সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির মাধ্যমে প্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করত। কিন্তু সাতজনকে গ্রেপ্তারের পরও তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর মেলেনি—যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নপত্রটি তাঁদের কাছে পৌঁছাল কীভাবে? প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে? নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি কি এর সঙ্গে জড়িত, নাকি অন্য কোনো মাধ্যমে প্রশ্নপত্র তাঁদের হাতে এসেছে? এসআরবির দেওয়া তথ্যে, গ্রেপ্তার সাতজনের কেউই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মচারী নন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মচারী। বাকি দুজন চাকরিপ্রত্যাশী। ফলে প্রশ্নপত্রের ছবি সংগ্রহ, সেটি স্পষ্ট করা, উত্তর তৈরি এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁরা কীভাবে যুক্ত ছিলেন, সেই সঙ্গে প্রশ্নপত্রের মূল উৎসের পরিচয়—সবই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির এসআরবি-৩-এর আর্টিলারি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন গ্রেপ্তার ও প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় চক্রটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরেন। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস ও চক্রের মূল হোতাকে শনাক্ত করা যায়নি বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত চলছে বলে জানানো হয়েছে। ভোর সাড়ে ৪টায় প্রশ্নের ছবি, সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে পাঠানো হয় অন্যজনকে এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগ পরীক্ষার দিন ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ একটি প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে তিনি ছবিটি এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠান। জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর নূর মোহাম্মদ উত্তর তৈরি করেন। এরপর বিতরণকারীদের মাধ্যমে সেগুলো পরীক্ষার্থীদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে এসআরবি। এই বর্ণনায় প্রশ্নপত্রের ছবি পাওয়া থেকে শুরু করে উত্তর তৈরি ও বিতরণের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে। কিন্তু অস্পষ্ট ছবিটি নূর মোহাম্মদ কোথা থেকে পেয়েছিলেন, কে তাঁকে সেটি পাঠিয়েছিলেন এবং জাহাঙ্গীর কীভাবে স্পষ্ট প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন—এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস শনাক্ত করতে এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রশ্নপত্রের ছবি পাওয়া বা সেটি অন্যের কাছে পাঠানোর তথ্য একাই প্রমাণ করে না, প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে ফাঁস হয়েছিল কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভেতরে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না। সরকারি তিন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারী, বাকি দুজন চাকরিপ্রত্যাশী সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার সাতজনের পরিচয় প্রকাশ করে এসআরবি। তাঁরা হলেন— ১. মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। ২. এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর। ৩. নূর মোহাম্মদ (৩০), এনবিআরের অফিস সহায়ক। ৪. জাহাঙ্গীর (৩৮), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর। ৫. আসাদুল ইসলাম (৩৩), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক। ৬. মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), চাকরিপ্রত্যাশী। ৭. মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), চাকরিপ্রত্যাশী। এসআরবির দাবি, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে এই চক্রের সদস্যরা গত তিন থেকে চার বছর ধরে জড়িত ছিলেন। তবে কোন কোন নিয়োগ পরীক্ষায় তাঁরা জালিয়াতি করেছেন, কতজন প্রার্থী তাঁদের কাছ থেকে প্রশ্ন বা উত্তর নিয়েছেন এবং এ ঘটনায় আর কারা জড়িত—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এখানে তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারি তিনটি দপ্তরের কর্মচারীদের মধ্যে কার কী ভূমিকা ছিল। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, কে প্রশ্ন সংগ্রহ করেছেন, কে উত্তর তৈরি করেছেন এবং কে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বা অর্থ লেনদেন করেছেন—এসব পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।   প্রশ্নের জন্য ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ২০ লাখ পর্যন্ত এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহের চুক্তি করত। তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির জন্য প্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হতো বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। চুক্তির শর্ত নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হতো নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেক। জামানত হিসেবে প্রার্থীদের মূল শিক্ষাগত সনদপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রেখে দেওয়া হতো বলে জানিয়েছে এসআরবি। অভিযোগ অনুযায়ী, পরীক্ষার হলে উত্তর সরবরাহের জন্য পরীক্ষার্থীদের কানে অথবা চুলের মধ্যে সূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক ডিভাইস লুকিয়ে দেওয়া হতো। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তর পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১৬০টির বেশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ১৯টি প্রবেশপত্র, ১০টি মূল সনদপত্র, ব্যাংকের চেক, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা জব্দের কথা জানিয়েছে এসআরবি।   পাঁচ এলাকায় অভিযান, কিন্তু মূল উৎসের সন্ধান মেলেনি এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিল, উত্তরখান, মিরপুর, সাভার ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রবেশপত্র, সনদপত্র, স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেক চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। বিশেষ করে, এসব নথিতে থাকা নাম, পরীক্ষার বিবরণ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং মোবাইল ফোনের যোগাযোগের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস শনাক্ত না হওয়ায় তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। প্রশ্নপত্র প্রথম কার হাতে ছিল, কীভাবে সেটির ছবি তৈরি হলো, হোয়াটসঅ্যাপে কারা সেটি আদান-প্রদান করেছেন এবং পরীক্ষার আগে উত্তর কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল—এসব তথ্যের সমন্বিত ব্যাখ্যা ছাড়া পুরো চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। এসআরবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত চলছে। ১০ অক্টোবরের পরীক্ষা স্থগিত, নতুন পরীক্ষাতেও আস্থার সংকট যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে এর আগেও উত্তেজনা তৈরি হয়। গত ১০ অক্টোবর পরীক্ষার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে ওই দিনই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। পরিবর্তিত তারিখ অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং নিয়োগ পরীক্ষার ওপর আস্থার সংকটের কারণে অনেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ শুধু পরীক্ষার স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না; এর প্রভাব পড়ে যোগ্য প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ, সরকারি নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ওপরও। বিশেষ করে, চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা আর্থিক প্রতারণার পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগের নীতির জন্যও গুরুতর হুমকি। এ কারণে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। তদন্তে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে? নূর মোহাম্মদ ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যে অস্পষ্ট ছবি পেয়েছিলেন, সেটি কে পাঠিয়েছিলেন এবং মূল প্রশ্নপত্র কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল? জাহাঙ্গীর কীভাবে প্রশ্নপত্র স্পষ্ট করলেন? তাঁর কাছে থাকা প্রশ্নপত্রের উৎস কী ছিল এবং সেটি মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে কীভাবে মিলে গেল? যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভেতরে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি? গ্রেপ্তার সাতজনের কেউ এই অধিদপ্তরের কর্মচারী নন বলে জানানো হয়েছে। তাহলে প্রশ্নপত্র তাঁদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাব্য পথ কী ছিল? কতজন প্রার্থী অর্থ দিয়েছেন? ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তার পক্ষে কী ধরনের আর্থিক নথি, যোগাযোগের রেকর্ড বা সাক্ষ্য রয়েছে? আগের তিন থেকে চার বছরের জালিয়াতির অভিযোগ কতটা বিস্তৃত? চক্রটি অন্য কোন কোন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় জড়িত ছিল এবং সেসব ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত হয়েছে কি না? নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে? প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর পরীক্ষা, ফলাফল ও পরবর্তী নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে শুধু সাতজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগই নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেটওয়ার্কের পরিধি এবং নিয়োগব্যবস্থার সম্ভাব্য দুর্বলতাও স্পষ্ট হতে পারে। সামনে এখন উৎস শনাক্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু গ্রেপ্তারই তদন্তের শেষ ধাপ নয়। প্রশ্নপত্রের উৎস, অর্থ লেনদেনের প্রকৃত চিত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসআরবি জানিয়েছে, মূল উৎস ও অন্য জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। সেই তদন্তে প্রশ্নপত্রের ডিজিটাল উৎস, হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ, উদ্ধার হওয়া নথি এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে পরীক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও মূল উৎস অজানা থেকে গেলে পুরো নেটওয়ার্কের জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার সাতজনের বাইরে আর কারা জড়িত, আর সরকারি নিয়োগের প্রশ্নপত্র তাঁদের হাতে পৌঁছাল কীভাবে? তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতিতেই মিলতে পারে সেই উত্তর।

নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ১৭, ২০২৬ 0
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগে ৭০ কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ, প্রশ্ন ফাঁসের পরও বহাল নিয়োগ কমিটি

যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই বন্দুক হামলা

যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই বন্দুক হামলা, নিহত ১৪

মহানবীকে কটূক্তির অভিযোগে সৌদিতে শ্রীলংকান তরুণ মৃত্যুদণ্ডের মুখে—শেষ আশায় পরিবার

পুরোনো ছবি
৩০ ডলারে কেনা পুরোনো ছবি, নিলামে দাম উঠল ১৩ লাখ ৫২ হাজার ডলার

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মাত্র ৩০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এই সামান্য অর্থে কেনা একটি পুরোনো ছবি কয়েক দশক পর নিলামে বিক্রি হলো ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ ডলারে—বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা। শুধু বিপুল দামের কারণেই নয়, ছবিটির দীর্ঘদিনের অজানা ইতিহাসও একে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। শিকাগোর প্রখ্যাত শিল্পী গের্ট্রুড অ্যাবারক্রম্বি ১৯৫১ সালে ছবিটি এঁকেছিলেন। এরপর প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার পর সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি কার্যত লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। শেষ পর্যন্ত মিশিগানের কালামাজুর একটি এস্টেট সেলে ছবিটির সন্ধান মেলে। সেখানে একজন সংগ্রাহক পুরোনো ভিনাইল রেকর্ড খুঁজতে গিয়ে ছবিটি দেখতে পান। পেছনে শিল্পীর নাম লেখা দেখে মাত্র ৩০ ডলারে সেটি কিনে নেন তিনি। এরপর বিশেষজ্ঞদের যাচাই, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের পর ছবিটি পৌঁছে যায় নিউইয়র্কের নিলামঘরে। সেখানেই তৈরি হয় অ্যাবারক্রম্বির কাজের জন্য নতুন বিশ্ব নিলাম রেকর্ড। যে ছবির মূল্য কেউ বুঝতে পারেনি ছবিটির নাম ‘অল্ডারম্যান মেরিয়ামস শেলস’। অ্যাবারক্রম্বি এটি আঁকেন ১৯৫১ সালে। ছবিটির গল্প অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও পরে। ১৯৫২ সালে মিশিগানের কালামাজুর চিকিৎসক ডা. জন টি. রেনল্ডসের হাতে ছবিটি যায়। জানা গেছে, চিকিৎসা সেবার বিনিময়ে অ্যাবারক্রম্বি তাকে ছবিটি দিয়েছিলেন। পরবর্তী দুই বছরে ছবিটি নিউইয়র্ক, শিকাগো, মিলওয়াকি ও ইভান্সটনে প্রদর্শিত হয়। অর্থাৎ সৃষ্টির পরপরই ছবিটি শিল্পবোদ্ধাদের নজরে এসেছিল। কিন্তু প্রদর্শনীর সেই পর্বের পর ছবিটির যেন আর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। দশকের পর দশক এটি রয়ে যায় রেনল্ডস পরিবারের সম্পত্তির অংশ হিসেবে। সময়ের সঙ্গে ছবিটির শিল্পমূল্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বও যেন হারিয়ে যায় পরিবারের দৈনন্দিন সম্পদের আড়ালে। ৭০ বছর পর এস্টেট সেলে ফিরে এল শিল্পকর্মটি সাত দশকেরও বেশি সময় পর কালামাজুর একটি এস্টেট সেলে যান এক সংগ্রাহক। তার উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ভিনাইল রেকর্ড খোঁজা। সেখানেই হঠাৎ তার চোখে পড়ে একটি পুরোনো ছবি। ছবিটি উল্টে দেখার পর তিনি দেখতে পান পেছনে লেখা রয়েছে গের্ট্রুড অ্যাবারক্রম্বির নাম। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে তিনি ছবিটি মাত্র ৩০ ডলারে কিনে নেন। পরে জানা যায়, ছবিটি ডা. জন টি. রেনল্ডসের সম্পত্তিরই অংশ ছিল। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে এটি একই পরিবারের কাছে সংরক্ষিত ছিল, কিন্তু এর প্রকৃত শিল্পমূল্য সম্পর্কে সবাই যে অবগত ছিলেন—তা নয়। এক অর্থে, একটি এস্টেট সেলের সাধারণ জিনিসপত্রের ভিড়েই সাত দশকের বেশি সময় ধরে লুকিয়ে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম। কালো পটভূমিতে ঝিনুক, আর অ্যাবারক্রম্বির স্বপ্নের জগৎ ‘অল্ডারম্যান মেরিয়ামস শেলস’ ছবিতে দেখা যায় কয়েকটি ঝিনুক। এর পটভূমির বড় অংশজুড়ে রয়েছে গাঢ় কালো রং। একটি ঝিনুককে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সেটি প্রায় সম্পূর্ণ কালো এক পরিসরের মধ্যে ভেসে আছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ছবির অস্বাভাবিক আলো, গাঢ় আবহ এবং স্বপ্নের মতো দৃশ্য অ্যাবারক্রম্বির শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে তুলে ধরে। আরও একটি বিষয় ছবিটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এতে দেখা যায় ফাটা ঝিনুকের একটি নকশা, যা অ্যাবারক্রম্বির কাজে এর আগে দেখা যায়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে একই ধরনের নকশা তার শিল্পকর্মে বারবার ফিরে আসে। ফলে ছবিটি শুধু একটি আলাদা শিল্পকর্ম নয়; অ্যাবারক্রম্বির শিল্পভাষার বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার—তারপর সব হিসাব বদলে গেল নিলামে তোলার আগে ছবিটির সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজ করা হয় শিকাগোর বাউমগার্টনার ফাইন আর্ট রেস্টোরেশন-এ। নিলামের আগে ছবিটির আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। কিন্তু নিলামে সেই পূর্বাভাস একেবারেই ছাড়িয়ে যায় ছবিটির দাম। ক্রেতার প্রিমিয়ামসহ শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ ডলার। অর্থাৎ ৩০ ডলারে কেনা ছবিটির নিলামমূল্য দাঁড়ায় প্রাথমিক ক্রয়মূল্যের প্রায় ৪৫ হাজার গুণ। ফ্রিম্যানস নিলামঘর জানিয়েছে, অ্যাবারক্রম্বির কোনো কাজের ক্ষেত্রে এটাই প্রথমবারের মতো ১০ লাখ ডলারের সীমা অতিক্রমের ঘটনা। কে ছিলেন গের্ট্রুড অ্যাবারক্রম্বি? গের্ট্রুড অ্যাবারক্রম্বি ছিলেন শিকাগোর শিল্প ও সংগীতজগতের গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু চিত্রশিল্পী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না; শিকাগোর জ্যাজ সংগীতের সঙ্গেও তার ছিল গভীর যোগাযোগ। তিনি শহরের হাইড পার্ক এলাকায় বসবাস করতেন এবং শিকাগোর শিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও তার শিল্পকর্মের গুরুত্ব ধীরে ধীরে নতুন করে মূল্যায়িত হয়েছে। আর কালামাজুর সেই এস্টেট সেলে পাওয়া ‘অল্ডারম্যান মেরিয়ামস শেলস’ যেন তার শিল্পজীবনের সেই পুনর্মূল্যায়নের একটি অসাধারণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ৩০ ডলারের ছবির ভেতরে লুকিয়ে ছিল কোটি টাকার ইতিহাস একটি এস্টেট সেল। পুরোনো জিনিসপত্রের স্তূপ। একজন সংগ্রাহক। আর মাত্র ৩০ ডলারের একটি ছবি। সেখান থেকেই শুরু হয় এমন এক আবিষ্কারের গল্প, যার শেষ হয় ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ ডলারের নিলামমূল্যে। তবে অর্থের অঙ্কের বাইরেও ঘটনাটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। সাত দশকের বেশি সময় ধরে একটি পরিবারের সম্পত্তির অংশ হয়ে থাকা ছবিটি কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিল জনপরিচিতি থেকে, কীভাবে আবার একজন সংগ্রাহকের চোখে পড়ে সেটি শনাক্ত হলো—সেই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, শিল্পের মূল্য অনেক সময় তার তাৎক্ষণিক বাজারদামে ধরা পড়ে না। কখনো কখনো একটি পুরোনো ছবির আসল পরিচয় ফিরে পেতে অপেক্ষা করতে হয় কয়েক দশক। আর সেই পুনরাবিষ্কারের মুহূর্তেই ৩০ ডলারের একটি অচেনা ছবি পরিণত হয় ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ ডলারের ঐতিহাসিক শিল্পকর্মে।

নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ৬, ২০২৬ 0
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেখানে অবস্থানরত হাজারো বাংলাদেশি পর্যটক

কলকাতার নিউমার্কেটে ভয়াবহ আগুনের পর অভিযান, দুই দিনে বন্ধ ২২১ হোটেল : বিপাকে পড়েছেন হাজারো বাংলাদেশি পর্যটক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন সন্ধিক্ষণে: হাসিনার ফেরার ঘোষণা কি বদলে দেবে কূটনৈতিক সমীকরণ?

গণপ্রতিরোধের মুখে চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনার স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ

অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংক,

ইসলামী ব্যাংকে আস্থা সংকট কেন কাটছে না?: দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২২, ২০২৬ 0




অপরাধ

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে ৩০ বিলিয়ন ডলার জালিয়াতি ও অর্থপাচার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0




কৃষি ও জলবায়ু

ধান

শেরপুরে বোরো ধানের দাম কমে লোকসানে কৃষকরা, উৎপাদন খরচও উঠছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৬, ২০২৬ 0