অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত তিনজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা নির্বাচন বিলম্বিত করার এক নানামুখী কৌশলে লিপ্ত ছিলেন—এমন অভিযোগ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক ভাবনা থাকলেও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস।
সূত্র বলছে, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে অধ্যাপক ইউনূস স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা বিবেচনা করছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রয়োজন—এই যুক্তি সামনে আনা হয়। সমালোচকদের মতে, এসব সংস্কারের আড়ালে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়নের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল ছিল।
তিন উপদেষ্টার যুক্তি ছিল—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক, প্রশাসন অস্থিতিশীল, দ্রুত নির্বাচন দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তির পেছনে ছিল বিশেষ উদ্দেশ্য: সময়ক্ষেপণ করে নিজেদের পছন্দের শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করা।
একাধিক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও মব সন্ত্রাস পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব অস্থিরতা ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক পরিবেশ অনিশ্চিত রাখতে।
বিশেষ করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে অগ্নিসংযোগের ঘটনার দিন প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করে। কে বা কারা সেই নির্দেশ দিয়েছিল—তা এখনো অজানা।
অধ্যাপক ইউনূস পরে এক সিনিয়র সাংবাদিককে জানান, ঘটনার সময় তিনি অবগত ছিলেন না। এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি দ্রুত নির্বাচন চেয়েছিল। তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নেতৃত্বে পরিবর্তন নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক চাপ ও নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হন অধ্যাপক ইউনূস।
লন্ডন বৈঠক ছিল সেই প্রক্রিয়ার অংশ। তবে নির্বাচনবিরোধী উপদেষ্টারা বৈঠকের আগেই নানা অপপ্রচার চালান। তারা বিদেশি কূটনীতিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, নির্বাচন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সন্ধ্যাকালীন গোপন বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক শক্তির প্রভাব এবং প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা—সব মিলিয়ে এক সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অধ্যাপক ইউনূস কার্যত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু উপদেষ্টা বিদেশ সফরেও কূটকৌশলে যুক্ত ছিলেন। একজন উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে সফরকালে সাময়িকভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
আরেকটি অভিযোগ—জনমত জরিপকে ব্যবহার করা হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে। টেবিলে বসে তৈরি করা জরিপ বিদেশি দূতাবাসে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। সেখানে বলা হয়েছে, দ্রুত নির্বাচন হলে অপ্রত্যাশিত শক্তির উত্থান ঘটবে।
নির্বাচনের দিন পর্যন্ত কিছু উপদেষ্টার তৎপরতা ছিল নির্দিষ্ট কিছু আসনকেন্দ্রিক। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তারা ‘প্ল্যান ২’ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসেন বলে জানা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিকল্পনাটি ছিল—
নির্বাচন ভণ্ডুলের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, অথবা
প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে জরুরি অবস্থা সদৃশ কাঠামো জোরদার করা, অথবা
নেতৃত্বে পরিবর্তনের পথ সুগম করা।
তবে জনচাপ, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতা কি সত্যিই নিরপেক্ষ হাতে ছিল, নাকি আড়ালে চলছিল একাধিক শক্তির সমান্তরাল খেলা? নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভবিষ্যৎ গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বরিশালে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর যেন পাহাড়সম ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি)। পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে অতীতে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর এই চটে থাকা বলে জানা গেছে। বর্তমানে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় 'নির্বাচনী কার্ড' ইস্যু করাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। কার্ড ইস্যু নিয়ে চলছে টালবাহানা ভুক্তভোগী সংবাদকর্মীদের দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরেও কার্ড দিতে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে। মূলত ডিসির ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেই মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বরিশালের সাংবাদিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রভাব পেশাগত কাজে উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে এই জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়। সেই থেকে সাংবাদিকদের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ, এখন সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার হরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিশেষে বলা যায়, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ কাম্য নয়। নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক লিখেছেন, বৌ পেটানো নিউজ করার মাসুল দিচ্ছে বরিশালের সাংবাদিকরা। আরেক সাংবাদিক প্রশাসনের এই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে লিখেছেন, ডিসি তার ক্ষমতা দেখাইছে, এখন আমাদের বরিশালের সাংবাদিকদের উচিত সবাই এক হয়ে ক্ষমতা দেখানো। কার পাশা যাবে কার টেবিলে, খেলা যে চলছে কোন লেভেলের! নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্ড একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি। কিন্তু কার্ড পেতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, সঠিক কারণ ছাড়াই আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বরিশালের সংবাদকর্মী মহলে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন ‘ব্যক্তিগত রোষ’ এবং ‘ক্ষমতার দাপট’ রুখতে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো কঠোর কর্মসূচির কথা ভাবছে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অবিলম্বে সাংবাদিকদের কার্ড প্রদানের দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। কে এই ডিসি খাইরুল আলম সুমন যৌতুক সংক্রান্ত মামলায় কারাবাসের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে বিস্ময় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বরিশালের ডিসি খায়রুল আলম সুমন ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা, ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমিসংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করা—যেখানে ব্যক্তিগত সুনাম ও নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, যাদের ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, এমন কর্মকর্তাকে ডিসি পদে বসানো ইমেজ ও আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে। আদালত ও মামলার তথ্য সূত্র অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ওই মামলায় খায়রুল আলম সুমন ও তার মা খোদেজা বেগমকে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার এসআই শাহ আলম আদালতে তাদের হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন—উভয় আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবাসে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৫ জুন বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ রাতে ঢাকার ওয়ারী এলাকায় খায়রুলের বাসায় তার মায়ের মাধ্যমে গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হয় এবং এ সময় খায়রুল আলম সুমন ভুক্তভোগীর হাত চেপে ধরেন। পরদিন ওয়ারী থানায় মামলা করা হয়। বিভাগীয় মামলা ও পদোন্নতি স্ত্রীর করা মামলার পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ দেওয়া হলে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এর ফলে নিয়মিত পদোন্নতি ব্যাহত হয় বলে জানা গেছে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উপসচিব পদে তার পদোন্নতির আদেশ জারি হলেও সেখানে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ (ব্যাকডেটেড) পদোন্নতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজেকে পদোন্নতিতে বঞ্চিত দাবি করে তিনি ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিসির বক্তব্য খায়রুল আলম সুমনের ‘ব্যক্তিগত ডাটা শিটে’ (পিডিএস) বর্তমানে তাকে ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খায়রুল আলম সুমন বলেন, “এসব আমার ব্যক্তিগত তথ্য। আমার নামে বিভাগীয় মামলা ছিল—সবই কর্তৃপক্ষ জানে এবং জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মত জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা প্রশাসক পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়—এটি নৈতিক নেতৃত্বেরও প্রতীক। একজন ডিসির ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ থাকলে জেলার আইনশৃঙ্খলা ও ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশ্ন ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাদের ভাষ্য, “ডিসির সুনামটাই সবচেয়ে জরুরি।” সূত্র জানায়, খায়রুল আলম সুমন প্রবেশনার হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাকরি শুরু করেন। সে সময়ের ডিসি মো. আবদুল মান্নানের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম ডিসি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নাঙ্গলকোট, নিকলি ও বাজিতপুরে এসিল্যান্ড এবং ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশালের ডিসি হিসেবে তার নিয়োগ প্রশাসনে নৈতিকতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও অবস্থান প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে দায়িত্ব পালনের ১৮ মাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ঢাকার দৈনিক পত্রিকা দৈনিক কালের কণ্ঠ-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, তাকে অসাংবিধানিক উপায়ে অপসারণের একাধিক চেষ্টা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। “দেড় বছর আমাকে আড়ালে রাখা হয়েছিল” প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের পুরো সময়জুড়েই তাকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থেকে দূরে রাখা হয়। অথচ তার বিরুদ্ধে চলেছে নানা পরিকল্পনা ও পাঁয়তারা। তিনি বলেন, একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করার অপচেষ্টা চলছিল। তার দাবি—এক পর্যায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন হলেই তাকে অপসারণ করা হবে এবং মনোবল ভেঙে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে—এমন পরিকল্পনাও ছিল। গণঅভ্যুত্থানের চাপ ও রাজনৈতিক বিভাজন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অংশও সেই সুরে সুর মেলায়। তবে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দুইটি গ্রুপ তৈরি হয়। বিভিন্ন দল ও জোটের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। বিএনপির ভূমিকা ও তারেক রহমান সম্পর্কে মন্তব্য প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠিন সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিল। তারা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি আরও বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তার কৌতূহল ছিল। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, তারেক রহমান আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ। প্রেসিডেন্টের দাবি—বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের কারণেই অপসারণের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ড. ইউনূসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখেননি। তার বক্তব্য অনুযায়ী: বিদেশ সফর শেষে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অবহিত করার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। ১৪-১৫ বার বিদেশ সফরের পরও কোনো লিখিত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। তার আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হলেও এ বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়নি। দুইবার তার বিদেশ সফর আটকে দেওয়া হয়। বঙ্গভবনে প্রধান উপদেষ্টা কখনো যাননি। প্রেস উইং কার্যত অচল করে দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি একাধিকবার কেবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ও জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কার্যকর সাড়া পাননি। বিদেশি কূটনীতিকদের অবস্থান সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের বড় একটি অংশ তাকে অপসারণের বিপক্ষে ছিলেন এবং সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। “আমি সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম” প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন বলেন, সব চাপ ও চক্রান্তের মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তার মতে, সংবিধান বহির্ভূত কোনো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের উদ্যোগ দেশের জন্য বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করত। ১৮ মাসের দায়িত্বকাল নিয়ে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ভেতরের টানাপোড়েন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সাংবিধানিক সংকটের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। তার এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব কতদূর গড়ায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত তিনজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা নির্বাচন বিলম্বিত করার এক নানামুখী কৌশলে লিপ্ত ছিলেন—এমন অভিযোগ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক ভাবনা থাকলেও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। দ্রুত নির্বাচন থেকে সরে আসা: চাপ নাকি কৌশল? সূত্র বলছে, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে অধ্যাপক ইউনূস স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা বিবেচনা করছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রয়োজন—এই যুক্তি সামনে আনা হয়। সমালোচকদের মতে, এসব সংস্কারের আড়ালে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়নের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল ছিল। তিন উপদেষ্টার যুক্তি ছিল—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক, প্রশাসন অস্থিতিশীল, দ্রুত নির্বাচন দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তির পেছনে ছিল বিশেষ উদ্দেশ্য: সময়ক্ষেপণ করে নিজেদের পছন্দের শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করা। ‘মব সন্ত্রাস’ কৌশলের হাতিয়ার? একাধিক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও মব সন্ত্রাস পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব অস্থিরতা ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক পরিবেশ অনিশ্চিত রাখতে। বিশেষ করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে অগ্নিসংযোগের ঘটনার দিন প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করে। কে বা কারা সেই নির্দেশ দিয়েছিল—তা এখনো অজানা। অধ্যাপক ইউনূস পরে এক সিনিয়র সাংবাদিককে জানান, ঘটনার সময় তিনি অবগত ছিলেন না। এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। আঞ্চলিক শক্তির চাপ ও ‘লন্ডন বৈঠক’ রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি দ্রুত নির্বাচন চেয়েছিল। তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নেতৃত্বে পরিবর্তন নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক চাপ ও নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হন অধ্যাপক ইউনূস। লন্ডন বৈঠক ছিল সেই প্রক্রিয়ার অংশ। তবে নির্বাচনবিরোধী উপদেষ্টারা বৈঠকের আগেই নানা অপপ্রচার চালান। তারা বিদেশি কূটনীতিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, নির্বাচন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রশাসন কবজায় নেওয়ার চেষ্টা সন্ধ্যাকালীন গোপন বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক শক্তির প্রভাব এবং প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা—সব মিলিয়ে এক সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অধ্যাপক ইউনূস কার্যত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু উপদেষ্টা বিদেশ সফরেও কূটকৌশলে যুক্ত ছিলেন। একজন উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে সফরকালে সাময়িকভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। ফরমায়েশি জনমত জরিপ? আরেকটি অভিযোগ—জনমত জরিপকে ব্যবহার করা হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে। টেবিলে বসে তৈরি করা জরিপ বিদেশি দূতাবাসে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। সেখানে বলা হয়েছে, দ্রুত নির্বাচন হলে অপ্রত্যাশিত শক্তির উত্থান ঘটবে। পরিকল্পনা ‘প্ল্যান ২’ কী ছিল? নির্বাচনের দিন পর্যন্ত কিছু উপদেষ্টার তৎপরতা ছিল নির্দিষ্ট কিছু আসনকেন্দ্রিক। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তারা ‘প্ল্যান ২’ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসেন বলে জানা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিকল্পনাটি ছিল— নির্বাচন ভণ্ডুলের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, অথবা প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে জরুরি অবস্থা সদৃশ কাঠামো জোরদার করা, অথবা নেতৃত্বে পরিবর্তনের পথ সুগম করা। তবে জনচাপ, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতা কি সত্যিই নিরপেক্ষ হাতে ছিল, নাকি আড়ালে চলছিল একাধিক শক্তির সমান্তরাল খেলা? নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভবিষ্যৎ গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে যত আসন পেয়েছে, তা আগে আর কখনোই পায়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতা করা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির নেতাদের পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হিসেবে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জড়িত থাকারও অভিযোগ রয়েছে। সেই ইতিহাসকে সাথে নিয়েই এবার বাংলাদেশের সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজধানী ঢাকায় কোনো আসন পেতে সক্ষম হলো। এবার তারা রাজধানী ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনে জয় পেয়েছে, যার একটিতে জিতেছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা জেলার ২০টি আসনে তার জয় সাতটিতে।অবশ্য খুলনায় নিজের আসনে হেরে গেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। কিন্তু সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এককভাবে ৬৮টি সংসদীয় আসনে জয় পেয়েছে এবং এগুলোসহ জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসন নিয়ে এবার প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনের ফলই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে জামায়াতের এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাদের মতে, নির্বাচনকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিকূল পরিবেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার দক্ষতার পাশাপাশি অনেক আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে দলটি আগের তুলনায় এবার অনেক বেশি আসন পেয়েছে। একই সঙ্গে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের না থাকাটাও কোনো কোনো জায়গায় জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তবে জামায়াত নেতাদের দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একজন নেতা বলেছেন, দলীয় বৈঠকে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। এবার নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে থেকেই জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ক্ষমতায় যাওয়ার আলোচনা সামনে নিয়ে আসেন এবং সেটিই পুরো নির্বাচনী প্রচারে দল ও জোটের মুখ থেকে উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে সবসময়ই সমালোচনার শিকার হওয়া জামায়াতে ইসলামী এর আগে বিএনপির সঙ্গে মিলে ক্ষমতার অংশীদার হলেও এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা দলটির নেতাদের মুখে এভাবে আগে কখনোই শোনা যায়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায় এবং পুরনো মিত্র বিএনপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করে দলটি। শেষ পর্যন্ত অনলাইন ও অফলাইনে দলটির নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা এমন প্রচার শুরু করে যে, দলটি ক্ষমতায়ও আসতে পারে। এক পর্যায়ে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিসহ ১০টি দল নিয়ে জোট গঠন করে দলটি। পরে নির্বাচনী প্রচারের সময় জনসভায় কয়েকজনকে মন্ত্রী করা হবে বলেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার পর তিনি সরকার গঠন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন। দল ক্ষমতায় গেলে কী কী করবেন- গত ২০শে জুন তাও তুলে ধরেছিলেন শফিকুর রহমান। বিশেষ করে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে 'জামায়াত ক্ষমতায় যাচ্ছে' এমন একটি প্রচার গড়ে তোলা হয় নির্বাচনের আগে থেকেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি বাস্তবে পরিণত হয়নি। তবে এবারের ভোটে দলটি ৬৮টি আসনে জয় পেয়ে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল করেছে। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই এককভাবে অংশ নিয়ে ১৮টি আসন পেয়েছিল জামায়াত। জামায়াতের রাজনীতির একজন পর্যবেক্ষক ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলছেন, জামায়াতের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাই এতো আসনে জয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি। "এর কৃতিত্ব হলো জামায়াত আমিরের। তিনি জামায়াতকে নবজন্ম দিয়েছেন এবং সব ধর্ম ও পেশার মানুষদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছেন। দীর্ঘদিন বৈরি পরিবেশে থেকেও দলটি নির্বাচনে ভালো করার মূল ভিত্তি হলো তাদের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। মি. বাবর বলেন, এবারই ঢাকায় প্রথম আসন জেতা এবং ঢাকার এলিট এলাকা বলে পরিচিত জায়গাগুলোতে জামায়াতের শক্ত অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে এই নির্বাচনে। প্রসঙ্গত, গুলশান-বনানীকে অনেকে এলিট বা অভিজাত এলাকা বলে থাকেন। এই এলাকায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসনে পাঁচ হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীকে পরাজিত করতে পেরেছেন। জামায়াত ৩০টি আসনের ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছে। দলটির দাবি, ভোট পুনর্গণনা হলে ঢাকা-১৭সহ অনেক আসনের ফল পাল্টে যাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, জামায়াতের সাংগঠনিক কাজ ও এর মাধ্যমে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেও তরুণদের মধ্যে ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারার বিষয় নির্বাচনে আসন বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। "আওয়ামী লীগ নেই। ফলে তাদের সমর্থকরা হয়তো কোথাও কোথাও বিকল্প হিসেবে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। তবে জামায়াত সারাদেশেই সংগঠনকে সক্রিয় করতে পেরেছে। তরুণদের মধ্যে তাদের অবস্থানও নির্বাচনে ভালো ফল করতে সহায়তা করেছে," বলেছেন তিনি। নিষিদ্ধ থেকে সংসদে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অস্তিত্ব দৃশ্যত স্বাধীন বাংলাদেশে বিলীন হয়ে যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে তখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এ অবস্থায় দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অনেকে তখনকার ক্রিয়াশীল কিছু রাজনৈতিক দলে ভিড়ে যান। দলটির বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের লতিফুর রহমানসহ অনেকেই তখন জাসদ ছাত্রলীগ কিংবা জাসদের রাজনীতিতে মিশে যান। দলটির ওয়েবসাইটে বলা আছে যে, এখনকার আমির শফিকুর রহমান নিজেও জাসদ ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর জামায়াতের জন্য পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ১৯৭৬ সালের তেসরা মে তখনকার রাষ্ট্রপতি এ. এস. এম সায়েম একটি অধ্যাদেশ জারি করেন, যার মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরেও মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধ ও স্বাধীনতার বিরোধিতার ইস্যুতে জনমনে তীব্র ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দলটির গোপনে সক্রিয় থাকা নেতারা তখনো জামায়াত নামে দলের কার্যক্রম না শুরু করে ভিন্ন নামে দল গঠন করে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নেন। এর ধারাবাহিকতা ১৯৭৬ সালেই আরও কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আই.ডি.এল) নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামী তৎপরতা শুরু করে। দৃশ্যত এই নির্বাচনের মাধ্যমেই জামায়াতে ইসলামীর নেতারা ভিন্ন পরিচয়ে হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে প্রথমবারের মতো আসতে সক্ষম হন। জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আইডিএল- এর ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর ছয় জন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। গোপন থেকে স্বনামে প্রকাশ্যে আইডিএল এর ব্যানারে জামায়াত নেতাদের সংসদে যাওয়ার পর ১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতে ইসলামীর নামেই একটি কনভেনশন আহ্বান করা হয় দলটির তখনকার একজন নেতা আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে। সেই কনভেনশনেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমের একটি ভাষণ পড়ে শোনানো হয়। এই কনভেনশনে একটি নতুন গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয় এবং তার ভিত্তিতে ১৯৭৯ সালের ২৭শে মে চার দফা কর্মসূচী নিয়ে জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের প্রকাশ্য কর্মতৎপরতা শুরু করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির ছিলেন গোলাম আযম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে ২২শে নভেম্বর ঢাকা ছেড়ে পাকিস্তান চলে যান তিনি। পরে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে অসুস্থ মাকে দেখার কথা বলে ঢাকায় এসে তিনি আর ফিরে যাননি। তবে গোলাম আযম স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮১ সালে প্রথম জনসমক্ষে আসেন। যদিও এর আগে ১৯৭৯ সালে জামায়াত সক্রিয় হওয়ার পর থেকে তার নির্দেশনাতেই দলটি পরিচালিত হয়েছে বলে দলটির নেতারা পরবর্তীতে প্রকাশ করেছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত এক নেতা একেএম নাজির আহমেদের বই 'রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী' তে বলা হয়েছে, "১৯৭৮ সনে দেশে ফেরার পর থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম বারবার আমিরে জামায়াত নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। তার নাগরিকত্ব ছিল না বিধায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ভূমিকা পালন করতেন ভারপ্রাপ্ত আমির জনাব আব্বাস আলী খান"। এর মধ্যে ১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় আসেন আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। একপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে তাতে সামিল হয় জামায়াতে ইসলামীও। আন্দোলন সামাল দেওয়ার জন্য এরশাদ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যখন আলোচনায় বসেন, তখন জামায়াতে ইসলামীকেও ডাকা হয়েছিল। এরশাদ সরকারের অধীনে প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। জামায়াতের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, দলটি সেই নির্বাচনে দলটির ১০ জন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত অংশ নেয়নি। সরকার গঠনে ভূমিকা জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। তখন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি এবং মূলত এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে দলটি। তখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা হয় তাতে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ছিল বলে পরে জানা যায়। কিন্তু এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তীব্র গণআন্দোলন তৈরি হলে ৯২ সালের মার্চ মাসে গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে 'বিদেশি নাগরিক হয়ে দেশের একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল'। তখন নাগরিকত্বের প্রশ্নে হাইকোর্টে জামায়াত রিট মামলা করে এর পক্ষে রায় পেয়েছিল। কিন্তু তখন সরকার হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গিয়েছিল। এরপর সুপ্রিমকোর্টে আপিল বিভাগ থেকে নাগরিকত্ব ফিরে পেয়ে ১৬ মাস জেল খাটার পর মুক্তি পেয়েছিলেন গোলাম আযম। কিন্তু এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দল আন্দোলন গড়ে তুললে তাতেও আলাদা থেকেই সামিল হয় জামায়াত। তখন বিএনপি সরকারের সময়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ আন্দোলনরত দলগুলো। এক পর্যায়ে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাশ করে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তখনকার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের জুনে হওয়া নির্বাচনে জামায়াত মাত্র তিনটি আসনে জয় পেতে সক্ষম হয়। পরে আবার বিএনপির সাথে মিলে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনেও সামিল ছিল জামায়াতে ইসলামী এবং এক পর্যায়ে বিএনপির জোটে জামায়াত সরাসরি যোগ দেয়। তাদের চারদলীয় জোট ২০০১ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল জয় পেলে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায় জামায়াত। দলটির তখনকার দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ খালেদা জিয়ার নেতৃ্ত্বাধীন সরকারে মন্ত্রীত্ব পান। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল তাদের মধ্যেই ওই দুজনও ছিলেন। সংকট ও বিপাকে পড়ে নাম বদল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন- সেই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট সহিংসতায় রূপ নিলে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে হওয়া নির্বাচনে জামায়াত মাত্র দুটি আসনে জয় পায়। ওই বছর নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পাওয়ার জন্য 'জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ' নাম পরিবর্তন করে 'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী' করা হয়। ওই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জামায়াতে ইসলামী। অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য কিংবা নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে এলেও ১৯৭৯ সালে সক্রিয় হওয়ার ৪০ বছর পর এসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে চরম কোণঠাসা হয়ে পড়ে দলটি এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে নিবন্ধন হারিয়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় দলের নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়। এর আগে থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সময় দলটির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা আটক হলে বেশ চাপের মুখে পড়ে দলটি। ওই বছরেই সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পরে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে দলটি। এরপর তিনটি নির্বাচনে জামায়াত আর অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালের বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলেও জামায়াত নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজা খাটা অবস্থায় ২০১৪ সালের অক্টোবরে মারা যান গোলাম আজম। একই ধরনের মামলায় ২০১৫ সালে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের এবং ২০১৬ সালে আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হলে চরম বিপাকে পড়ে দলটি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিবন্ধন অবৈধ বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে দলটির আপিল আবেদন খারিজ করে দেয়। এর ফলে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ই বহাল থাকে। পরে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদালতের নির্দেশে আবার দলটি নিবন্ধন ফিরে পায়। চারবার নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের ৩১শে জুলাই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে দলটি দ্বিতীয়বারের মতো নিষিদ্ধ হয়। এর আগে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। এর আগে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয়েছিলো মূলত ব্রিটিশ আমলে। সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী ১৯৪১ সালের ২৬শে অগাস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে পরের বছরেই এর সদর দপ্তর লাহোর থেকে নেওয়া হয় ভারতের পাঠানকোটে। ধর্মের কথা বলা হলেও অনেকেই মনে করেন মূলত ভারতের কমিউনিজম বিরোধী শক্তি হিসেবেই এ সংগঠনটির জন্ম হয়েছিল এবং তখনকার ব্রিটিশ শাসকদের আনুকূল্যও তারা পেয়েছিলো। ১৯৪৫ সালে এর প্রথম কনভেনশন হয় অবিভক্ত ভারতে এবং এর দু'বছর পর দেশভাগের আগ পর্যন্ত এই সংগঠনটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলো। ইসলামি সংবিধানের দাবিতে ১৯৪৮ সালে প্রচারণা শুরু করলে পাকিস্তান সরকার জননিরাপত্তা আইনে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীকে গ্রেফতার করে। তবে ওই বছর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও জামায়াতের কার্যক্রম শুরু হয়। দু'বছর পর মি. মওদুদী জেল থেকে ছাড়া পান। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ১৯৫৮ সালে অন্য সব দলের সাথে জামায়াতের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেন তখনকার সেনা শাসক আইয়ুব খান। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে জামায়াতকে আবার নিষিদ্ধ করা হয়। মওদুদী ও গোলাম আজমসহ অনেককে আটক করা হয়। সে বছরের শেষ দিকে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ১৫১টি আসনে প্রার্থী দিয়ে চারটি আসন পায় দলটি। এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় দলটি। তখন পাকিস্তানি শাসকদের সহযোগিতায় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। এই দলটির নেতৃত্বেই রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনী হয়েছিলো যারা ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ যুদ্ধকালীন গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য তীব্রভাবে সমালোচিত।