ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিরোধী শক্তিগুলোর অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে দেশের দুই প্রধান ইসলামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তি—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী—উভয়ই এক ধরনের রাজনৈতিক ‘ইনসিকিউরিটিতে’ ভুগছে। সোমবার (১ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, অতীত অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার রাজনীতির সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় থাকা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সতর্কবার্তা দেন। ‘লীগ প্রশ্নে দুই বড় দলের ইনসিকিউরিটি’ মাহফুজ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে বর্তমানে যে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অবস্থানগত প্রতিযোগিতা চলছে, তার মূল কারণ দুই বড় দলের অনিরাপত্তাবোধ। তিনি লেখেন, “লীগ প্রশ্নে এখন যা চলছে, তা হচ্ছে দুই বড় দলের ইনসিকিউরিটি। কৌন বনেগা লীগকা বাপ? ’৮৬ আর ’৯৬-এর স্মৃতি বিএনপি ভুলতে পারছে না, আর জামায়াত আছে আদর্শিক শত্রুতা ও সহিংসতার ভয়ে।” তার মতে, বিএনপির এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে জামায়াতের আশঙ্কার উৎস নব্বইয়ের দশকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্ক এবং অতীত রাজনৈতিক সহিংসতার স্মৃতি। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আশঙ্কা পোস্টে মাহফুজ আলম একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’-এর কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করবে। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী অপেক্ষাকৃত নীরব অবস্থান নিতে পারে। তার ভাষায়, “আগামীতে বিএনপি (আল্লাহ না করুক) ক্ষমতায় থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র করে নেবে আর জামায়াত চুপ মেরে গুপ্ত হয়ে যাবে।” এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রতিরোধে যুক্ত থাকা নতুন প্রজন্মের কর্মী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণরা বলে মন্তব্য করেন তিনি। ‘আসল বিপদ তরুণদের জন্য’ মাহফুজ আলমের মতে, আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী আন্দোলনে যারা সামনের সারিতে ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। তিনি দাবি করেন, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতার কারণে সেই ঝুঁকি আরও বেড়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের মধ্যে আন্দোলনকারী তরুণদের স্বার্থ প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। তরুণদের প্রতি আহ্বান: ‘রুটি বড় করুন’ নিজের পোস্টে তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে মাহফুজ আলম বলেন, তারা বর্তমানে সীমিত রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। তিনি লেখেন, “এ প্রজন্ম ব্যস্ত নিজেদের হাতের তালুর চেয়ে ছোট রুটি ভাগাভাগিতে। রুটিটা বড় করেন।” তরুণদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, তাদের মধ্যে এমন সক্ষমতা রয়েছে যা শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এ জন্য তিনি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সামাজিক প্রভাব বিস্তার, সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ‘আগের প্রজন্ম আপনাদের বাঁচাবে না’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের উদাহরণ টেনে মাহফুজ আলম বলেন, অতীতেও তরুণ প্রজন্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, “বড়রা হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে এ প্রজন্মকে। এভাবেই খেয়ে ফেলা হয় তরুণদের। সেটা ’৭০-এর দশকে, ’৯০-এর দশকেও ঘটেছে।” তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক সংগ্রাম মূলত প্রজন্মগত লড়াই এবং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্মাণ করতে হবে। ‘কিবলা রাখেন জুলাই আর অ্যান্টি-ফ্যাসিজম’ পোস্টের শেষাংশে তিনি রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও তরুণদের প্রতি ব্যক্তি আক্রমণ ও বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “নিজেদের মধ্যে ব্যক্তি আক্রমণ আর বিদ্বেষচর্চা বন্ধ করেন। কিবলা রাখেন জুলাই আর অ্যান্টি-ফ্যাসিজম।” মাহফুজ আলমের মতে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা নিশ্চিত ঝুঁকি ও প্রতিকূলতা জেনেও সংগ্রাম করেছেন। এখন সেই সাহসের সঙ্গে সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল যুক্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কাউন্সিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। এরপর কেটে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়। দলটির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা এবং সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন সম্ভব হয়নি। তবে এ সময়ে দলের কার্যক্রম সচল রাখতে বিভিন্ন পদে রদবদল, পদোন্নতি এবং সাংগঠনিক সমন্বয় করা হয়েছে। এখন দীর্ঘ বিরতির পর সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় বিএনপির অভ্যন্তরে নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই? দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, আসন্ন কাউন্সিলে চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কার্যত নেই। ২০২৫ সালের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে তারেক রহমান পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি প্রায় আট বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের ভেতরে প্রচলিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে তারেক রহমানের বিকল্প নেতৃত্ব দৃশ্যমান নয়। ফলে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন নেতারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছে। সে কারণে শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: মহাসচিব থাকছেন কি মির্জা ফখরুল? চেয়ারম্যানের পর বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ মহাসচিব। বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দায়িত্ব পালন করছেন। দলের দুর্দিনে আন্দোলন, রাজনৈতিক সমঝোতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছেন। সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই জানান যে তিনি ক্লান্ত এবং কাউন্সিলের পর অবসর নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই মহাসচিব পদে সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দলের একটি অংশ মনে করে, সংকটময় সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতার কারণে দল এখনও তাকে ধরে রাখতে চাইতে পারে। মহাসচিব পদে আলোচনায় চার নেতা দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মির্জা ফখরুল সরে দাঁড়ালে অন্তত চারজন নেতা সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনায় থাকতে পারেন। ১. সালাহউদ্দিন আহমদ বর্তমানে স্থায়ী কমিটির সদস্য। নীতি নির্ধারণ, রাজনৈতিক কৌশল এবং সাংগঠনিক পরিকল্পনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে। ২. আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দলের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক নীতি এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতার কারণে তিনিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। ৩. রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন ধরে দলীয় দফতর, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। আন্দোলনের সময় দৃশ্যমান ভূমিকা তাকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ৪. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতা সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং দলীয় আনুগত্যের কারণে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন। স্থায়ী কমিটিতে আসছে নতুন মুখ? বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে কয়েকটি পদ কার্যত শূন্য রয়েছে। এছাড়া কিছু সদস্য অসুস্থ এবং কয়েকজন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এ পরিস্থিতিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো যাদের নাম সামনে আনছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন— রুহুল কবির রিজভী হাবিব উন নবী খান সোহেল শামসুজ্জামান দুদু সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বিশেষ করে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে রিজভীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার পরিকল্পনা বিএনপির শীর্ষ নেতারা ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নতুন কমিটিতে নবীন ও প্রবীণের সমন্বয় ঘটানো হবে। স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। দলটির একাধিক নেতা মনে করছেন, আগামী রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসম্পৃক্ততা এবং আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের জন্য নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। কাউন্সিল কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিএনপির ইতিহাসে কাউন্সিল কেবল নেতৃত্ব নির্বাচন নয়; এটি দলীয় দিকনির্দেশনা নির্ধারণেরও প্রধান মঞ্চ। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর দলটি মাত্র ছয়টি জাতীয় কাউন্সিল করেছে। প্রতিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক কৌশলের নতুন রূপরেখা নির্ধারিত হয়েছে। দীর্ঘ এক দশক পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সপ্তম কাউন্সিল তাই শুধু সাংগঠনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলারও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধারাবাহিকতার সঙ্গে পরিবর্তনের বার্তা? বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্ব প্রশ্নাতীত অবস্থানে থাকলেও মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে স্থায়ী কমিটি ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তরুণদের অন্তর্ভুক্তি দলটির দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল বিএনপির জন্য কেবল নেতৃত্ব নির্বাচনের অনুষ্ঠান নয়; বরং আগামী দশকের রাজনৈতিক কৌশল, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং উত্তরাধিকার রাজনীতির নতুন রূপরেখা নির্ধারণের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ঢাকার এক আদালত ভবন থেকে আরেক আদালতে ছুটে চলা—একসময় এটিই ছিল বিএনপি নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেলের রাজনৈতিক জীবনের নিত্যদিনের বাস্তবতা। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পাঁচ দিনই তাকে একাধিক মামলার শুনানির জন্য আদালতের বারান্দায় সময় কাটাতে হতো। দীর্ঘদেহী ও সুপরিচিত এই রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে আদালত চত্বরে প্রায়ই দেখা যেত দলের কর্মীদের উপস্থিতি ও স্লোগান। দীর্ঘ মামলার ভার ও আদালত-জীবন দলীয় সূত্র ও তার ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে ৬১৮টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলার বড় অংশই নাশকতা, পুলিশের কাজে বাধা এবং সহিংসতার অভিযোগে দায়ের করা। বিশেষ করে ২০১৫ এবং ২০১৮ সালের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও হরতাল-অবরোধের সময় তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা বাড়ে। একাধিক মামলায় তিনি বিভিন্ন সময় কারাবরণও করেন। তার নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় উঠে এসেছে, এমন সময়ও গেছে যখন দিনে চার থেকে পাঁচটি আদালতের শুনানিতে অংশ নিতে হয়েছে তাকে। আন্দোলন-সংগ্রামে দীর্ঘ উপস্থিতি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি—সব ক্ষেত্রেই তিনি মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলে দলীয় সূত্র জানায়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি সংগঠন পরিচালনা ও মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলীয় কর্মসূচিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। সাংগঠনিক ভূমিকা ও নেতৃত্ব দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, তিনি কেবল নির্দেশনা দিতেন না, বরং নিজে মাঠে উপস্থিত থেকে কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতেন। এর ফলে দলের তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর কাছে তিনি একটি পরিচিত ও আস্থার নাম হয়ে ওঠেন। ঢাকা মহানগরের এক স্থানীয় নেতা জানান, সংকটের সময়ে তার উপস্থিতি কর্মীদের মনোবল বাড়াত। মামলার প্রকৃতি ও রাজনৈতিক বিতর্ক পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। এক পরিবারের সদস্যের ভাষায়, রাজনৈতিকভাবে তাকে চাপে রাখতেই এসব মামলা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং সংগঠন ধরে রাখার ভূমিকা তাকে বিএনপির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকটকালীন সময়ে সংগঠন ধরে রাখা এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকা—এই দুই বৈশিষ্ট্য হাবিব উন নবী খান সোহেলকে দলীয় রাজনীতিতে একটি দৃশ্যমান অবস্থান দিয়েছে। তাদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ের সঙ্গে তার ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে উপস্থিতি তাকে দলের অভ্যন্তরে একটি স্থিতিশীল নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সার্বিক চিত্র দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মামলা, আদালত-সংগ্রাম, কারাবাস এবং আন্দোলনের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে হাবিব উন নবী খান সোহেলের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে মূলত রাজপথ-নির্ভর সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে। বর্তমানে তিনি আগের মতো আদালতের ধারাবাহিক দৌড়ঝাঁপে না থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার সক্রিয় উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার রাজনীতিতে একসময় আলোচিত ও সক্রিয় একটি নাম—সাইফুল আলম নীরব। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। সংগঠনিক দক্ষতা, রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয়তা এবং তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ—এই তিন উপাদান তাকে দ্রুতই রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতিতে পরিচিত মুখে পরিণত করে। যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং পরে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করে। মাঠকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতির কারণে তিনি দলীয় কর্মীদের কাছেও একটি নির্ভরতার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যদিও তিনি জয়ী হতে পারেননি, তবুও জাতীয় পর্যায়ে তার উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে এর পরবর্তী সময়টি তার জন্য ছিল কঠিন। একাধিক মামলা, কারাবাস, দলীয় দ্বন্দ্ব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা মিলিয়ে তার রাজনৈতিক গতিশীলতা কমতে থাকে। তার বিরুদ্ধে নাশকতা, পুলিশের কাজে বাধা, হামলা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মোট ৪৫৭টি মামলা রয়েছে বলে জানা যায়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর তেজগাঁও ও ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা পৃথক নাশকতার মামলায় তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি মামলায় তিনি দুই বছর ছয় মাসের দণ্ড পান। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সেতু ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। প্রায় ১৫ মাস কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান, তবে আইনি জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। এসব কারণে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ছন্দপতন দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে কিংবা দলীয় সমর্থনের বাইরে গিয়ে তিনি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় প্রতীক ও সাংগঠনিক সমর্থন ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় থাকার চেষ্টা করলেও আগের মতো কর্মীসমর্থন বা সাংগঠনিক শক্তি দৃশ্যমান ছিল না। ফলাফলও তার পক্ষে যায়নি। নির্বাচনে পরাজয়ের পাশাপাশি ভোটের ব্যবধান ও মাঠের বাস্তবতা দেখায়, দলীয় কাঠামোর বাইরে তার রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা স্বল্পমেয়াদে ব্যক্তিগত অবস্থান ধরে রাখার একটি কৌশল হতে পারে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দলীয় আস্থা ক্ষুণ্ন করে। যদিও রাজনীতিতে স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা খুব কমই দেখা যায়, তবুও এই ধরনের পদক্ষেপ নেতার ভবিষ্যৎ অবস্থানকে অনিশ্চিত করে তোলে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন—এটি ছিল তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা। দলীয় কর্মীদের মতে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রাজপথে সক্রিয় থাকা তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি কর্মীদের পাশে ছিলেন, যা তাকে তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। বর্তমানে তার অবস্থান কিছুটা অস্পষ্ট। বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে সক্রিয়ভাবে দেখা যাচ্ছে না, এবং প্রকাশ্য বক্তব্যও সীমিত। তবে স্থানীয় পর্যায়ে তার একটি নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ নীরবতা অনেক সময় রাজনীতিতে পুনর্গঠনের ইঙ্গিতও হতে পারে। ফলে তার বর্তমান অবস্থানকে সম্পূর্ণ অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাইফুল আলম নীরবের রাজনৈতিক পথচলা তাই একদিকে উত্থান-পতনের গল্প, অন্যদিকে বাংলাদেশের সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ভবিষ্যতে তিনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠবেন, নাকি নীরবতাই স্থায়ী হবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো সময়ের অপেক্ষায়।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন :দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে দলটি, যা রাজনৈতিকভাবে এক ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখা হয়েছিল। নির্বাচনে এই বিজয় ছিল কেবল একটি ক্ষমতার পালাবদল নয়—বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর জনগণের আস্থার প্রতিফলন। দলটির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল উচ্চাভিলাষী—জবাবদিহিমূলক শাসন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। কিন্তু ক্ষমতার মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রশ্ন উঠছে—সরকার কি সেই প্রত্যাশা পূরণের পথে এগোচ্ছে, নাকি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও পরিকল্পিত স্যাবোটাজে আটকে পড়ছে? বিরোধী রাজনীতি: পরিকল্পিত চাপ ও ‘আনপপুলারাইজেশন’ কৌশল সরকার গঠনের পর থেকেই রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিরোধী জোটগুলো। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে রাজপথে কর্মসূচি শুরু করেছে। তাদের দাবির তালিকায় রয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা সমসাময়িক ইস্যু। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল স্বাভাবিক বিরোধী রাজনীতি নয়—বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। লক্ষ্য: সরকারকে ধাপে ধাপে অজনপ্রিয় করা। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন। পরিকল্পনা অনুযায়ী— * বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল উসকে দেওয়া * বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয় করা * নির্বাচনী সংঘাতকে রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তর করা * এবং শেষ পর্যন্ত সরকারবিরোধী বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলা সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ হলেই এই চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৬০ দিনের সাফল্য: অর্জন আছে, কিন্তু প্রচার নেই দুই মাস পূর্তি উপলক্ষে সরকার ৬০টি পদক্ষেপ তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এসব উদ্যোগ জনমনে তেমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারেনি। যদিও বাস্তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল। যেমন— * গার্মেন্টস খাতে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস সময়মতো প্রদান * সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ * কৃষি সহায়তা উদ্যোগ বিশেষ করে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি কৃষি খাতে আধুনিকীকরণ ও সরাসরি সহায়তা প্রদানের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ([Reuters][3]) তবুও সমস্যা হলো—এই সাফল্যগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে জনমনে ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়নি। অন্যদিকে, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন বা কৃষক কার্ডের মতো বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত সমীক্ষা না হওয়ায় সন্দেহ ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। বিতর্কের শুরু প্রথম দিন থেকেই সরকারের যাত্রা শুরু থেকেই একাধিক অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছে। শপথ অনুষ্ঠান: ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। * তীব্র গরম * পানির অভাব * অতিথিদের দুর্ভোগ এই ঘটনা সরকারের প্রথম ইমপ্রেশনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। মন্ত্রিসভা গঠন: অভিজ্ঞতার ঘাটতি ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভার মধ্যে ৪১ জনই নতুন মুখ—যাদের অনেককেই দলীয় নেতাকর্মীরাও চেনেন না। একই সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এক ব্যক্তির হাতে দেওয়ার ফলে প্রশাসনে অচলাবস্থা তৈরি হয়। যদিও নির্বাচনের আগে মন্ত্রণালয় একীভূত করে দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ([The Business Standard][4]) প্রশাসনের ভেতরের ‘সিন্ডিকেট’: নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? সরকারের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—একটি শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বিতর্কিত নিয়োগ * প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ * অতীতে বিএনপি-বিরোধী ভূমিকা থাকা ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো * গোয়েন্দা রিপোর্ট উপেক্ষা করে পদায়ন এসব ঘটনায় প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে। সচিব পদে অস্বচ্ছতা ২৫ মার্চ একসঙ্গে একাধিক সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়, যার অধিকাংশই বিতর্কিত। কিছু নিয়োগ ইতোমধ্যে বাতিলও হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন নিয়ে ‘টাকা লেনদেন’ ও মাফিয়া সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, যা প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। আর্থিক খাত: সংস্কার না পুনর্বাসন? সরকারের আর্থিক নীতিতেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং সংকট অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, ব্যাংক ও বেসরকারি খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি রয়েছে, যা অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে বাধা। ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ এই আইন নিয়ে সমালোচনার মূল কারণ— * ঋণখেলাপীদের পুনর্বাসনের সুযোগ * বিচারহীনতার সংস্কৃতি জোরদার হওয়ার আশঙ্কা সমালোচকদের মতে, এটি আর্থিক খাতে সংস্কারের বদলে পুরনো সমস্যাকে নতুনভাবে বৈধতা দিতে পারে। নীতিনির্ধারণে বিশৃঙ্খলা: পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতা বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— * জবাবদিহিমূলক সরকার * প্রশাসনিক সংস্কার * দুর্নীতি দমন বাস্তবে তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির ফারাক স্পষ্ট। বিশেষ করে— * বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া * প্রশাসনিক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব * রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার অভিযোগ এসব কারণে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনমনের প্রতিক্রিয়া: ভালোবাসা থেকে অভিমান সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও বিএনপির প্রতি একটি আবেগী সমর্থন রয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো— * দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেই অসন্তোষ বেশি * সমালোচনা থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসছে না * সরকারের পক্ষে ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ দুর্বল এই অবস্থাকে অনেক বিশ্লেষক ‘অভিমানের পর্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। কারণ ইতিহাস বলে— ভালোবাসা থেকে যেমন সমর্থন জন্মায়, তেমনি হতাশা থেকে ক্ষোভও তৈরি হতে পারে। ‘অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব: বাস্তবতা নাকি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা? সরকারের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র চলছে—এমন অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী— * গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘গুপ্ত’ লোকজন বসানো হয়েছে * তারা পরিকল্পিতভাবে ভুল সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে * প্রশাসনিক স্যাবোটাজের মাধ্যমে সরকারকে ব্যর্থ করা হচ্ছে ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলা হচ্ছে, উপমহাদেশে বহুবার অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রই বড় রাজনৈতিক পতনের কারণ হয়েছে। তবে এই অভিযোগের বড় সমস্যা হলো— এটি প্রমাণ করা কঠিন, এবং অনেক সময় এটি রাজনৈতিক দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট: ১. প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা সিন্ডিকেট ভেঙে কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলা জরুরি। ২. জনআস্থা পুনর্গঠন শুধু প্রকল্প নয়—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. রাজনৈতিক মোকাবিলা বিরোধী চাপ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল একসঙ্গে সামাল দিতে হবে। সংকটের মধ্যেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে। কিন্তু মাত্র দুই মাসেই স্পষ্ট হয়ে গেছে—ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে তা ধরে রাখা অনেক কঠিন। সাফল্য আছে, কিন্তু তা দৃশ্যমান নয়। নীতি আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন দুর্বল। সমর্থন আছে, কিন্তু তা ক্ষয় হতে শুরু করেছে। সবচেয়ে বড় কথা—সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বিরোধীদল নয়, বরং নিজের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতা। এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই: সরকার কি নিজস্ব ভেতরের সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে, নাকি সেই সংকটই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির পদটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিতর্ক, ক্ষমতার পালাবদল, এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে: মো. সাহাবুদ্দিন কি তাঁর পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবেন, নাকি পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে রাষ্ট্রপতি ভবন? পটপরিবর্তনের পর চাপ ও টিকে থাকা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ একাধিক রাজনৈতিক শক্তি তাঁকে অপসারণের দাবি তোলে। তাঁকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভও হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে এ দাবি নাকচ করে। গুরুত্বপূর্ণভাবে, দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তখন এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেনি। ফলে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই রাষ্ট্রপতির অধীনেই শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টা পরিষদ। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সীমিত হয়ে আসে তাঁর জন্য। এমনকি জাতীয় দিবস বা ধর্মীয় বড় আয়োজনেও তাঁর উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত ছিল—যা রাষ্ট্রপতির পদটির প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নতুন সরকার, নতুন সমীকরণ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। বর্তমানে সরকারপ্রধান তারেক রহমান-এর সঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে। এতে অন্তত আপাতদৃষ্টিতে দ্বন্দ্বের বদলে একটি কার্যকর সমঝোতার ইঙ্গিত মিলছে। তবুও রাজনৈতিক অন্দরে প্রশ্ন থামেনি—এই সহাবস্থান কতদিন? সম্ভাব্য উত্তরসূরি: দলের ভেতরের চার নাম বিএনপির ভেতরে আলোচনায় রয়েছে কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতা, যাদের ‘ক্লিন ইমেজ’ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সবচেয়ে আলোচিত নাম: * মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর — বর্তমান মহাসচিব ও মন্ত্রী, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে দলের আস্থাভাজন। এছাড়া আরও তিনজন: * খন্দকার মোশাররফ হোসেন * জমিরউদ্দিন সরকার * আব্দুল মঈন খান বিশেষত জমিরউদ্দিন সরকার অতীতে স্পিকার ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাঁকে এই আলোচনায় আলাদা গুরুত্ব দেয়। দলীয় সূত্র বলছে, সরকারে সরাসরি না থাকলেও এই নেতাদের “রিজার্ভ” হিসেবে রাখা হয়েছে—যা ভবিষ্যৎ বড় পদে ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। সংবিধান কী বলছে? বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন সরাসরি ভোটে হয় না। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর থেকে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী: * রাষ্ট্রপতির মেয়াদ: ৫ বছর * সর্বোচ্চ: দুই মেয়াদ * যোগ্যতা: ন্যূনতম ৩৫ বছর বয়স ও সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে: * মৃত্যু * পদত্যাগ * অভিশংসন * শারীরিক অক্ষমতা * সংবিধান লঙ্ঘন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত স্পিকার দায়িত্ব পালন করেন। মেয়াদ পূর্ণ করবেন, নাকি বিদায়? ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালে। তবে তিনি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্বাচনের পর সরে দাঁড়াতে পারেন—কারণ অন্তর্বর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য “অপমানজনক” ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা খোলা রয়েছে: পূর্ণ মেয়াদ শেষ করা — যদি সরকার তাঁকে রাখতে চায় সমঝোতার ভিত্তিতে পদত্যাগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অপসারণ (সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায়) একজন বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যানের ভাষায়, “পূর্ণ মেয়াদে থাকার সম্ভাবনা কম”—যদিও এটি আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। পদটি প্রতীকী, তবু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও, রাজনৈতিক সংকটকালে এই পদটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বা সাংবিধানিক জটিলতায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নির্ধারক হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি এখনো উন্মুক্ত: রাষ্ট্রপতি কি কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার প্রতীক হয়ে থাকবেন, নাকি আবারও রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসবেন?এখন দেখার বিষয়—বর্তমান রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকবেন, নাকি নতুন কোনো মুখের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ভবনে শুরু হবে নতুন অধ্যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং সমালোচনা। কারণ, এই মন্ত্রিসভায় দেখা গেছে এক বড় ধরনের প্রজন্মগত পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে দলের কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং খালেদা জিয়ার শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা অনেক প্রবীণ নেতা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ এবং জোটের তরুণ নেতাদের ওপর আস্থা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু মন্ত্রিসভা গঠন নয়—এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। নতুন মন্ত্রিসভায় বড় পরিবর্তন তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় মোট সদস্য সংখ্যা ৪৯। এর মধ্যে প্রায় ৪০ জনই নতুন মুখ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই মন্ত্রিসভার বৈশিষ্ট্য হলো— তরুণ নেতৃত্বের প্রাধান্য জোটের কিছু নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি টেকনোক্র্যাট নিয়োগ প্রবীণদের আংশিক সাইডলাইন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্ত্রিসভা বিএনপির ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব কাঠামোর তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। বাদ পড়া হেভিওয়েট নেতারা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের নাম মন্ত্রিসভায় না থাকা। তাদের মধ্যে রয়েছেন: ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ড. আব্দুল মঈন খান এই তিনজনই অতীতে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং সেলিমা রহমানও মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির দুঃসময়ে দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে এই নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তারেক রহমান বিদেশে নির্বাসনে এবং খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকার সময় দলকে সক্রিয় রাখতে তাদের ভূমিকা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে স্বীকৃত। উপদেষ্টা পদে ‘সমঝোতা’? তবে পুরোপুরি বাদ পড়েননি দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা। মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, “দলের প্রবীণদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। উপদেষ্টা পদ দিয়ে সেই অসন্তোষ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।” মঈন খানের প্রতিক্রিয়া মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাওয়ার বিষয়টি দেখছেন দলের চেয়ারম্যান। এটা নিয়ে আমার মন্তব্য না করা ভালো।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযত প্রতিক্রিয়া দলীয় শৃঙ্খলার ইঙ্গিত দেয়। জোট রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় বিএনপির বাইরের কিছু রাজনৈতিক দল থেকেও নেতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন: গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ এই অন্তর্ভুক্তিকে অনেকেই জোট রাজনীতির নতুন বার্তা হিসেবে দেখছেন। যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের ক্ষোভ তবে সব জোটসঙ্গী সন্তুষ্ট নন। যুগপৎ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অংশীদার কয়েকটি দলের নেতারা মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর নাম আলোচনায় থাকলেও তারা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ নিয়ে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “প্রথমত এটি পুরোটাই বিএনপির সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের দুই-তিনজন থাকছেন। বিএনপি বাস্তবে যুগপৎ সঙ্গীদের বাদ দিয়েই হাঁটছে।” তিনি আরও বলেন, “কঠিন সময়ের সঙ্গীদের বাদ দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক অভিঘাত পরে বোঝা যাবে।” সবচেয়ে বড় চমক: খলিলুর রহমান এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে খলিলুর রহমানকে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিএনপির ভেতরে অনেক নেতাকর্মী তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। বিশেষ করে দুটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক ছিল— বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা রোহিঙ্গা করিডোর প্রস্তাব তবুও এমপি না হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের ভেতরে অনেকেই এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। যাদের কপাল খুলল না সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে আরও কয়েকজনের নাম মন্ত্রিসভায় আসতে পারে বলে আলোচনায় ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন— মীর নাছির আলতাফ হোসেন চৌধুরী বরকত উল্লাহ বুলু লুৎফুজ্জামান বাবর আমান উল্লাহ আমান কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কেউই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। এছাড়া দলের দুঃসময়ের কান্ডারি হিসেবে পরিচিত যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় ছিল। তাকেও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে গুঞ্জন ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হয়নি। নেতৃত্বের নতুন কৌশল? বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তারেক রহমান তার নিজের রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার এখতিয়ার।” তিনি আরও বলেন, “মর্নিং শোজ দ্য ডে—এখন দেখার বিষয় এই মন্ত্রিসভা কতটা কার্যকর হয়।” যারা অবস্থান ধরে রেখেছেন তবে সব প্রবীণ নেতা বাদ পড়েননি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সালাহউদ্দিন আহমদ ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন হাফিজ উদ্দিন খান এদের অন্তর্ভুক্তি দলীয় অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই মন্ত্রিসভা তিনটি বার্তা দেয়। প্রথমত, বিএনপি নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট ও জোট রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা থাকতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। প্রবীণ নেতাদের একটি বড় অংশ যদি নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন, তাহলে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সামনে কী হতে পারে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে এই মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা। যদি সরকার সফলভাবে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তারেক রহমানের এই ‘নতুন নেতৃত্বের পরীক্ষা’ সফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যদি দলীয় অসন্তোষ বাড়ে, তাহলে তা সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, “এই মন্ত্রিসভা শুধু সরকার গঠনের ঘটনা নয়, এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখারও ইঙ্গিত।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর এবার দল পুনর্গঠনে মনোযোগী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রমজান ও আসন্ন ঈদের পর জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। প্রায় এক দশক পর হতে যাচ্ছে দলটির জাতীয় কাউন্সিল, যা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ বিরতির পর কাউন্সিল বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এরপর নানা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আর কাউন্সিল আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দলীয় চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়া, পরে অসুস্থতা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর দেশের বাইরে অবস্থান এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলার কারণে দল সাংগঠনিক কার্যক্রমে চাপে ছিল। দলীয় সূত্র মতে, বর্তমান অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশে এবার পূর্ণাঙ্গ ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বেই সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। দলীয় নেতাকর্মীরা আশা করছেন, তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় কাউন্সিল হবে অধিকতর সফল ও কার্যকর। জানা গেছে, এবারের কাউন্সিলে দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে দলকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত পুনর্গঠন জাতীয় কাউন্সিলের আগে সারাদেশে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো দ্রুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও অন্যান্য ইউনিট পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন কার্যক্রম তদারকি করবেন সিনিয়র নেতা ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও এই কার্যক্রমের সার্বিক তদারকি করবেন বলে জানা গেছে। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী— আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয়দের পরিবর্তে তরুণ ও সক্রিয় নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ত্যাগী নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে পুরনো কমিটি, শূন্য পদ ও পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বর্তমানে ৫৯২ সদস্যের পুরনো কেন্দ্রীয় কমিটি দিয়েই চলছে দলীয় কার্যক্রম। এতে অর্ধশতাধিক পদ শূন্য রয়েছে এবং শতাধিক নেতা নিষ্ক্রিয় বলে জানা গেছে। জাতীয় কাউন্সিল হলে অন্তত দেড়শতাধিক নেতা নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে কেন্দ্রীয় কমিটির পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে এখন থেকেই ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিটে কাউন্সিলর হওয়ার প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাংগঠনিক বাধ্যবাধকতা ও বাস্তবতা দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কাউন্সিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকেও নির্দিষ্ট সময় পরপর কাউন্সিল আয়োজন করতে হয়। বিএনপি বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনকে পরিস্থিতির কথা জানিয়ে সময় বাড়িয়ে নিয়েছিল। প্রস্তুতি কমিটি গঠন শিগগিরই ঈদের পর সিনিয়র ও মধ্যম সারির নেতাদের নিয়ে একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হবে। তারা সারাদেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাউন্সিলের সকল প্রস্তুতি এগিয়ে নেবে। সুবিধাজনক সময়ে অনুষ্ঠিতব্য কাউন্সিলেই গঠন করা হবে নতুন নির্বাহী কমিটি। দলীয় সূত্রের দাবি, এবারের জাতীয় কাউন্সিল আগের ছয়টি কাউন্সিলের চেয়েও বেশি জাঁকজমকপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে। নির্বাচনী বিজয়ের পর বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা। প্রায় এক দশক পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন সেই প্রক্রিয়ারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দল নতুন নেতৃত্ব ও কৌশল নির্ধারণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।