ইত্তেহাদ নিউজ : একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, যার বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। বাইরে থেকে সফল ও সুপ্রতিষ্ঠিত বলে মনে হলেও ভেতরে লুকিয়ে আছে জালিয়াতির জটিল নেটওয়ার্ক। প্রতিষ্ঠানটির হাতে রয়েছে ব্যয়বহুল আইনজীবী বাহিনী, বেসরকারি গোয়েন্দা, সাইবার হামলার সক্ষমতা এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাংবাদিক কীভাবে সত্য অনুসন্ধান করবেন?
এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দিয়েছেন লন্ডনভিত্তিক ফাইনান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ড্যান ম্যাকক্রাম। তিনি টানা ছয় বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে জার্মান পেমেন্ট প্রসেসিং প্রতিষ্ঠান অয়্যারকার্ডের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম বড় কর্পোরেট জালিয়াতি উন্মোচন করেন।
২০২০ সালে অয়্যারকার্ডের পতনের সময় প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। অনুসন্ধানের ফলে কোম্পানিটির একাধিক শীর্ষ নির্বাহী গ্রেপ্তার হন, জার্মানির দুটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করেন এবং ইউরোপীয় কর্পোরেট নজরদারি ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা সামনে আসে।
ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, বড় কর্পোরেট জালিয়াতি সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না।
“প্রতারকেরা শুরুতেই বিশাল জালিয়াতির পরিকল্পনা করে না। সাধারণত তারা কোনো আর্থিক সমস্যা সাময়িকভাবে আড়াল করতে ছোট একটি অনিয়ম করে। পরে সেই অনিয়ম ঢাকতে আরও বড় অনিয়ম করতে হয়, আর এভাবেই জালিয়াতি বিস্তৃত হতে থাকে।”
অয়্যারকার্ডের ক্ষেত্রেও তিনি এমন একটি কাঠামো খুঁজে পান, যেখানে শেল কোম্পানি, সন্দেহজনক অংশীদারত্ব, ভুয়া গ্রাহক, কৃত্রিম মুনাফা এবং অতিরঞ্জিত আয়-ব্যয়ের হিসাব ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন রাখা হয়েছিল।
২০১৫ সালে একজন অস্ট্রেলীয় শর্ট সেলার প্রথম ম্যাকক্রামকে অয়্যারকার্ড সম্পর্কে সতর্ক করেন। পরে আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির হিসাব জালিয়াতির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
তবে ম্যাকক্রাম শুরু থেকেই সতর্ক ছিলেন।
তার ভাষায়, শর্ট সেলারদের বক্তব্যকে সরাসরি সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ তাদেরও আর্থিক স্বার্থ থাকে। তিনি তাদের দেওয়া তথ্যকে কেবল সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং কোম্পানি রেজিস্ট্রি, আর্থিক নথি ও স্বাধীন উৎসের মাধ্যমে সেসব তথ্য যাচাই করেছেন।
অনুসন্ধানের শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেছিলেন ম্যাকক্রাম।
শর্ট সেলারদের সরবরাহ করা একটি ফাইলের ভিত্তিতে তিনি একটি ব্লগ পোস্টে অয়্যারকার্ড-সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের উল্লেখ করেন। এরপর কোম্পানিটির আইনজীবীরা অভিযোগ তোলেন, ওই তথ্য মানহানিকর হতে পারে এবং এর দায় ফাইনান্সিয়াল টাইমসের ওপর বর্তাবে।
ফলে আইনি জটিলতার কারণে তাঁর অনুসন্ধান প্রায় এক বছরের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে।
পরে তিনি স্বীকার করেন, কোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগে প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীদের পরামর্শ না নেওয়া ছিল বড় ভুল।
একই সঙ্গে অয়্যারকার্ডের জনসংযোগ দল প্রচারণা চালাতে থাকে যে তিনি হয় শর্ট সেলারদের সঙ্গে যোগসাজশ করেছেন, নয়তো তাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। এই প্রচারণাও অনুসন্ধানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ম্যাকক্রামের মতে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি ভালো স্টোরি পরবর্তী স্টোরির দরজা খুলে দেয়।
শুরুর দিকে তিনি সরাসরি “জালিয়াতি” শব্দ ব্যবহার করেননি। বরং অয়্যারকার্ডের ব্যবসায়িক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিষয়টিকে একটি “ধাঁধা” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
ক্রমাগত প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে একের পর এক হুইসেলব্লোয়ার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন।
এক পর্যায়ে সিঙ্গাপুরে অয়্যারকার্ডের এক আইনজীবীর মা নিজেই ম্যাকক্রামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আগের প্রতিবেদনগুলো পড়ে ক্ষুব্ধ হন এবং ছেলেকে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহিত করেন।
পরে ওই আইনজীবী গুরুত্বপূর্ণ নথি সরবরাহ করেন, যা অনুসন্ধানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের সময় ম্যাকক্রাম ও তাঁর দল একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
এর মধ্যে ছিল—
তিনি সতর্ক করেন, অনেক আধুনিক প্রিন্টার মুদ্রিত কাগজে অদৃশ্য মাইক্রোডট রেখে যায়, যা নথি কোথায় ও কখন ছাপানো হয়েছে তা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ফাইনান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক স্টেফানিয়া পালমা ফিলিপাইনে যান।
অয়্যারকার্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদারের অফিসে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেখানে একই সঙ্গে একটি ট্যুর বাস কোম্পানির কার্যক্রম চলছে। অথচ নথিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি ডলারের ডিজিটাল লেনদেন পরিচালনা করছিল।
এই ধরনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত অয়্যারকার্ডের দাবিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহে সহায়তা করে।
ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, কর্পোরেট জালিয়াতি অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা উচিত।
মাত্র কয়েক হাজার ডলারের ভুয়া চালান বা ব্যাকডেটেড চুক্তি গুরুত্বহীন মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো বড় ধরনের প্রতারণার ইঙ্গিত হতে পারে।
অধিগ্রহণের আগে কোনো কোম্পানির ওয়েবসাইটে হঠাৎ বড় পরিবর্তন এসেছে কি না, তা যাচাই করতে ওয়েব্যাক মেশিন অত্যন্ত কার্যকর।
বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালালে সময়রেখা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিঙ্গাপুরের ACRA, যুক্তরাজ্যের Companies House এবং OpenCorporates-এর মতো ডেটাবেস গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ে সহায়ক।
কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে আয় করে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন ম্যাকক্রাম।
অয়্যারকার্ড অনুসন্ধানের সময় ম্যাকক্রাম ও তাঁর সহকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়েন।
তাদের ওপর বেসরকারি গোয়েন্দাদের নজরদারি চালানো হয়। অনলাইনে হয়রানি করা হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে সোর্সদের যোগাযোগের প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়।
এমনকি রাসায়নিক হামলার হুমকি ও ঘুষের প্রস্তাবও পাওয়া যায় বলে তিনি দাবি করেন।
এক পর্যায়ে তাঁরা ধারণা করেন, লন্ডনে প্রায় ৩০ জন প্রাইভেট গোয়েন্দা তাঁদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে সোর্সদের সঙ্গে দেখা করতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হতো।
ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, অয়্যারকার্ড কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো—এটি বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট জালিয়াতির বিষয়ে নতুন করে মনোযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দাবি এখনো যথেষ্ট যাচাইয়ের মুখোমুখি হয়নি।
তাঁর মতে, সাংবাদিকদের কাজ হলো সেই দাবিগুলোকে প্রশ্ন করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করা।
“অনেক প্রতিষ্ঠান দাবি করে তাদের কাছে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আছে। প্রশ্ন হলো—সেই সম্পদগুলো আসলে কোথায়?”
এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে পরবর্তী বড় অনুসন্ধান।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ : একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, যার বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। বাইরে থেকে সফল ও সুপ্রতিষ্ঠিত বলে মনে হলেও ভেতরে লুকিয়ে আছে জালিয়াতির জটিল নেটওয়ার্ক। প্রতিষ্ঠানটির হাতে রয়েছে ব্যয়বহুল আইনজীবী বাহিনী, বেসরকারি গোয়েন্দা, সাইবার হামলার সক্ষমতা এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাংবাদিক কীভাবে সত্য অনুসন্ধান করবেন? এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দিয়েছেন লন্ডনভিত্তিক ফাইনান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ড্যান ম্যাকক্রাম। তিনি টানা ছয় বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে জার্মান পেমেন্ট প্রসেসিং প্রতিষ্ঠান অয়্যারকার্ডের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম বড় কর্পোরেট জালিয়াতি উন্মোচন করেন। ২০২০ সালে অয়্যারকার্ডের পতনের সময় প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। অনুসন্ধানের ফলে কোম্পানিটির একাধিক শীর্ষ নির্বাহী গ্রেপ্তার হন, জার্মানির দুটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করেন এবং ইউরোপীয় কর্পোরেট নজরদারি ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা সামনে আসে। জালিয়াতির সূচনা কীভাবে হয়? ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, বড় কর্পোরেট জালিয়াতি সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। “প্রতারকেরা শুরুতেই বিশাল জালিয়াতির পরিকল্পনা করে না। সাধারণত তারা কোনো আর্থিক সমস্যা সাময়িকভাবে আড়াল করতে ছোট একটি অনিয়ম করে। পরে সেই অনিয়ম ঢাকতে আরও বড় অনিয়ম করতে হয়, আর এভাবেই জালিয়াতি বিস্তৃত হতে থাকে।” অয়্যারকার্ডের ক্ষেত্রেও তিনি এমন একটি কাঠামো খুঁজে পান, যেখানে শেল কোম্পানি, সন্দেহজনক অংশীদারত্ব, ভুয়া গ্রাহক, কৃত্রিম মুনাফা এবং অতিরঞ্জিত আয়-ব্যয়ের হিসাব ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন রাখা হয়েছিল। অনুসন্ধানের সূত্র এসেছিল শর্ট সেলারদের কাছ থেকে ২০১৫ সালে একজন অস্ট্রেলীয় শর্ট সেলার প্রথম ম্যাকক্রামকে অয়্যারকার্ড সম্পর্কে সতর্ক করেন। পরে আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির হিসাব জালিয়াতির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তবে ম্যাকক্রাম শুরু থেকেই সতর্ক ছিলেন। তার ভাষায়, শর্ট সেলারদের বক্তব্যকে সরাসরি সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ তাদেরও আর্থিক স্বার্থ থাকে। তিনি তাদের দেওয়া তথ্যকে কেবল সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং কোম্পানি রেজিস্ট্রি, আর্থিক নথি ও স্বাধীন উৎসের মাধ্যমে সেসব তথ্য যাচাই করেছেন। দুটি ভুল, যা অনুসন্ধানকে এক বছরের বেশি পিছিয়ে দেয় অনুসন্ধানের শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেছিলেন ম্যাকক্রাম। শর্ট সেলারদের সরবরাহ করা একটি ফাইলের ভিত্তিতে তিনি একটি ব্লগ পোস্টে অয়্যারকার্ড-সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের উল্লেখ করেন। এরপর কোম্পানিটির আইনজীবীরা অভিযোগ তোলেন, ওই তথ্য মানহানিকর হতে পারে এবং এর দায় ফাইনান্সিয়াল টাইমসের ওপর বর্তাবে। ফলে আইনি জটিলতার কারণে তাঁর অনুসন্ধান প্রায় এক বছরের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে। পরে তিনি স্বীকার করেন, কোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগে প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীদের পরামর্শ না নেওয়া ছিল বড় ভুল। একই সঙ্গে অয়্যারকার্ডের জনসংযোগ দল প্রচারণা চালাতে থাকে যে তিনি হয় শর্ট সেলারদের সঙ্গে যোগসাজশ করেছেন, নয়তো তাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। এই প্রচারণাও অনুসন্ধানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্টোরি থেকে স্টোরি, আর স্টোরি থেকেই আসে সোর্স ম্যাকক্রামের মতে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি ভালো স্টোরি পরবর্তী স্টোরির দরজা খুলে দেয়। শুরুর দিকে তিনি সরাসরি “জালিয়াতি” শব্দ ব্যবহার করেননি। বরং অয়্যারকার্ডের ব্যবসায়িক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিষয়টিকে একটি “ধাঁধা” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ক্রমাগত প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে একের পর এক হুইসেলব্লোয়ার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে সিঙ্গাপুরে অয়্যারকার্ডের এক আইনজীবীর মা নিজেই ম্যাকক্রামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আগের প্রতিবেদনগুলো পড়ে ক্ষুব্ধ হন এবং ছেলেকে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহিত করেন। পরে ওই আইনজীবী গুরুত্বপূর্ণ নথি সরবরাহ করেন, যা অনুসন্ধানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। হুইসেলব্লোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের সময় ম্যাকক্রাম ও তাঁর দল একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ছিল— প্রিপেইড বার্নার ফোন ব্যবহার; ইন্টারনেটবিচ্ছিন্ন (এয়ার-গ্যাপড) ল্যাপটপে নথি সংরক্ষণ; সংবেদনশীল তথ্যের জন্য এনক্রিপশন ব্যবহার; শুধুমাত্র সিগন্যাল অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ; অফিসে বিশেষ নিরাপদ কক্ষে তথ্য বিশ্লেষণ; আধুনিক রঙিন প্রিন্টারের পরিবর্তে পুরোনো সাদা-কালো লেজার প্রিন্টার ব্যবহার। তিনি সতর্ক করেন, অনেক আধুনিক প্রিন্টার মুদ্রিত কাগজে অদৃশ্য মাইক্রোডট রেখে যায়, যা নথি কোথায় ও কখন ছাপানো হয়েছে তা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। অকাট্য প্রমাণের সন্ধান অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ফাইনান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক স্টেফানিয়া পালমা ফিলিপাইনে যান। অয়্যারকার্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদারের অফিসে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেখানে একই সঙ্গে একটি ট্যুর বাস কোম্পানির কার্যক্রম চলছে। অথচ নথিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি ডলারের ডিজিটাল লেনদেন পরিচালনা করছিল। এই ধরনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত অয়্যারকার্ডের দাবিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহে সহায়তা করে। সাংবাদিকদের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, কর্পোরেট জালিয়াতি অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা উচিত। ১. ছোট জালিয়াতিকেও গুরুত্ব দিন মাত্র কয়েক হাজার ডলারের ভুয়া চালান বা ব্যাকডেটেড চুক্তি গুরুত্বহীন মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো বড় ধরনের প্রতারণার ইঙ্গিত হতে পারে। ২. ওয়েব্যাক মেশিন ব্যবহার করুন অধিগ্রহণের আগে কোনো কোম্পানির ওয়েবসাইটে হঠাৎ বড় পরিবর্তন এসেছে কি না, তা যাচাই করতে ওয়েব্যাক মেশিন অত্যন্ত কার্যকর। ৩. সাক্ষাৎকারের তারিখ সংরক্ষণ করুন বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালালে সময়রেখা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৪. কোম্পানি রেজিস্ট্রি ব্যবহার করুন সিঙ্গাপুরের ACRA, যুক্তরাজ্যের Companies House এবং OpenCorporates-এর মতো ডেটাবেস গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ে সহায়ক। ৫. ব্যবসার মডেল না বুঝলে আরও গভীরে যান কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে আয় করে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন ম্যাকক্রাম। নজরদারি, হুমকি ও প্রতিরোধ অয়্যারকার্ড অনুসন্ধানের সময় ম্যাকক্রাম ও তাঁর সহকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়েন। তাদের ওপর বেসরকারি গোয়েন্দাদের নজরদারি চালানো হয়। অনলাইনে হয়রানি করা হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে সোর্সদের যোগাযোগের প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। এমনকি রাসায়নিক হামলার হুমকি ও ঘুষের প্রস্তাবও পাওয়া যায় বলে তিনি দাবি করেন। এক পর্যায়ে তাঁরা ধারণা করেন, লন্ডনে প্রায় ৩০ জন প্রাইভেট গোয়েন্দা তাঁদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে সোর্সদের সঙ্গে দেখা করতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হতো। কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অনুসন্ধান? ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, অয়্যারকার্ড কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো—এটি বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট জালিয়াতির বিষয়ে নতুন করে মনোযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দাবি এখনো যথেষ্ট যাচাইয়ের মুখোমুখি হয়নি। তাঁর মতে, সাংবাদিকদের কাজ হলো সেই দাবিগুলোকে প্রশ্ন করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করা। “অনেক প্রতিষ্ঠান দাবি করে তাদের কাছে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আছে। প্রশ্ন হলো—সেই সম্পদগুলো আসলে কোথায়?” এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে পরবর্তী বড় অনুসন্ধান।
অনলাইন নিউজের উত্থান ও জনপ্রিয়তার পেছনের কারণগুলো - দ্রুততা, প্রযুক্তি ও পাঠক অংশগ্রহণে নতুন যুগের সংবাদমাধ্যম। বর্তমান সময়ে অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্মগুলো দ্রুতগতিতে মানুষের প্রধান তথ্যসূত্রে পরিণত হচ্ছে। প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের তুলনায় অনলাইন মাধ্যমের দ্রুততা, সহজলভ্যতা এবং বহুমাত্রিক কনটেন্ট উপস্থাপনার কারণে এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাপী অনলাইন সংবাদপত্রের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে বাংলাদেশসহ প্রায় সব দেশেই সংবাদমাধ্যমগুলোর ডিজিটাল সংস্করণ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদপত্রগুলোও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। প্রায় সব প্রধান সংবাদমাধ্যমই এখন অনলাইন সংস্করণে সক্রিয়, যেখানে পাঠকরা মুহূর্তের মধ্যে সর্বশেষ খবর জানতে পারছেন। তাৎক্ষণিক আপডেট ও সহজলভ্যতা অনলাইন সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দ্রুত তথ্য সরবরাহের সক্ষমতা। ব্রেকিং নিউজ, ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি আপডেট এবং লাইভ রিপোর্টিংয়ের কারণে প্রিন্ট মিডিয়ার তুলনায় অনলাইন মাধ্যম অনেক বেশি গতিশীল। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে যেকোনো স্থান থেকে, যেকোনো সময় সংবাদ পড়া সম্ভব হচ্ছে। অধিকাংশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিনামূল্যে কনটেন্ট সরবরাহ করে, যা পাঠকদের জন্য এটিকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে। প্রযুক্তি ও এআইয়ের প্রভাব বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্ট ডেলিভারি অনলাইন নিউজকে আরও উন্নত করেছে। ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে সংবাদ উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা পাঠকের জন্য কনটেন্টকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। আস্থা ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্ভুলতা ও বস্তুনিষ্ঠতার চ্যালেঞ্জ। তথ্যের উৎসের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় গুজব বা ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে সংবাদ যাচাই, মনিটরিং এবং স্বচ্ছ সম্পাদকীয় প্রক্রিয়া এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট অনলাইন সংবাদপত্র এখন শুধু লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভিডিও, অডিও, লাইভ স্ট্রিমিং এবং ইনফোগ্রাফিক্সের মাধ্যমে সংবাদ উপস্থাপন পাঠকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া পাঠকরা এখন সরাসরি মন্তব্য, ভোটিং এবং মতামত প্রদানের সুযোগ পাচ্ছেন, যা সংবাদমাধ্যম ও পাঠকের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম অনলাইন সংবাদ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব মাধ্যমে সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহৎ পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর নিবন্ধন ও নীতিমালা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো সংবাদ পরিবেশনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তির অগ্রগতি, দ্রুত তথ্যপ্রবাহ, সহজলভ্যতা এবং পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই সব মিলিয়ে অনলাইন নিউজ আজ আধুনিক সংবাদ জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই মাধ্যম আরও বিস্তৃত ও প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।
পত্রিকায় প্রকাশের উপযোগী প্রতিবেদন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন বা সাধারণ প্রতিবেদন কিভাবে লিখতে হয় তা নিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা কিংবা দ্বিধা-দ্বন্দের শেষ নেই। এই দুই ধরণের প্রতিবেদন লেখার কলা-কৌশল নিয়ে আজকে আমরা খুব সহযে আলোচনা করব। ইংরেজি ‘Report writing’-এর পারিভাষিক রূপ ‘প্রতিবেদন লিখন’। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা, বিষয় বা প্রসঙ্গ সম্পর্কে নির্মোহ, নিরপেক্ষভাবে তথ্যমূলক বিবৃতি লিখনকেই বলে প্রতিবেদন লিখন। বিষয় ও বৈচিত্র্য অনুসারে প্রতিবেদন বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। মূলত সাধারণ প্রতিবেদন বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন এবং সংবাদ প্রতিবেদন লেখার দরকার হয়। ক. প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন সাধারণত আমরা যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকি, সেই প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা, বিষয় বা প্রসঙ্গ সম্পর্কে যে প্রতিবেদন লিখতে হয়, সেটিই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন বা সাধারণ প্রতিবেদন। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে, যেমন বার্ষিক বিজ্ঞানমেলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বিতর্ক উৎসব, নবীনবরণ, বর্ষবরণ, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদ্যাপন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিদায় অনুষ্ঠান, মিলাদ মাহফিল, বইমেলা ইত্যাদি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ অধ্যক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদনই সাধারণ প্রতিবেদন বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন। ১. সাধারণ প্রতিবেদন লেখার জন্য প্রথমে কর্তৃপক্ষের কাছে একটি সাধারণ আবেদনপত্র লিখতে হয়। ২. আবেদনপত্রের ওপরের বাঁ দিকে তারিখ, এরপর কর্তৃপক্ষের পদবি-ঠিকানা, এরপর বিষয় ও সূত্র বা স্মারক নম্বর লিখতে হয়। (কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত চিঠির নম্বরই সূত্র বা স্মারক নম্বর)। ৩. আবেদনপত্রের শেষে নিচের বাঁ দিকে শিক্ষার্থীর নাম–ঠিকানা (প্রশ্নপত্রে উল্লেখিত নাম-ঠিকানা) লিখতে হয়। ৪. পরে শিরোনামসহ মূল প্রতিবেদন লিখতে হয়। ৫. মূল প্রতিবেদনের প্রথম অনুচ্ছেদটি 5W + 1H সূত্র ব্যবহার করে লিখতে হয়। অর্থাৎ • W= What (কী ঘটছে/ঘটেছে) • W= Where (কোথায় ঘটছে/ঘটেছে) • W= When (কখন ঘটছে/ঘটেছে) • W= Who (কারা এর সঙ্গে জড়িত/সংশ্লিষ্ট) • W= Why (কেন ঘটছে/ঘটেছে) • H= How (কীভাবে ঘটছে/ঘটেছে) এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একত্র করে শিক্ষার্থী প্রথম অনুচ্ছেদটি লিখবে। ৬. প্রথম অনুচ্ছেদের পর একাধিক অনুচ্ছেদে ধারাবাহিকভাবে পুরো বিষয়টি বর্ণনা করতে হবে। ৭. মূল প্রতিবেদন লেখা শেষে বিনীত নিবেদক, ইতি, প্রতিবেদক এই কথাগুলো লেখা যাবে না। ৮. সাধারণ প্রতিবেদন বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখায় কোনো খাম দিতে হয় না। তবে প্রতিবেদন লেখা শেষে প্রতিবেদক ও প্রতিবেদন–সম্পর্কিত একটি তথ্য-ছক দেওয়া যেতে পারে। খ. সংবাদ প্রতিবেদন অন্যদিকে নাগরিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যা, কোথাও ঘটে যাওয়া জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা, দুর্ঘটনা বা বিষয় প্রসঙ্গ সম্পর্কে তথ্যমূলক বিবৃতি তুলে ধরে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই সংবাদ প্রতিবেদনের লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে আমরা হয়ে যাই কোনো পত্রিকার সাংবাদিক অর্থাৎ নিজস্ব সংবাদদাতা বা স্টাফ রিপোর্টার বা নিজস্ব প্রতিবেদক বা কোনো জেলা বা থানা প্রতিনিধি। একজন রিপোর্টার হিসেবে সংবাদপত্রে প্রকাশ উপযোগী করে এ ধরনের প্রতিবেদন লিখতে হয়। ১. সংবাদ প্রতিবেদন লিখতে সম্পাদক বা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনপত্র লিখতে হয় না। ২. শিরোনাম (হেডলাইন) দিয়ে প্রতিবেদন লেখা শুরু করতে হয়। হেডলাইন লেখার কতগুলো রীতি আছে। যেমন হেডলাইনের ফন্ট সাইজ সাধারণ লেখার ফন্ট সাইজ থেকে একটু বড় হয়, মূল প্রতিবেদনের ওপরে মাঝখান বরাবর লিখতে হয়। এ ক্ষেত্রে অন্য রঙের কালি ব্যবহার করলে ভালো। ৩. এরপর ডেটলাইন লিখতে হয়। প্রতিবেদকের নাম বা পদবি, প্রতিবেদন লেখার স্থান এবং প্রতিবেদন লেখার তারিখ—এই তিন তথ্যকে একত্রে ডেটলাইন বলে। ৪. ডেটলাইনের পর ইন্ট্রো বা প্রথম পরিচ্ছেদ লিখতে হয়। 5W + 1H সূত্র ব্যবহার করে দারুণভাবে প্রথম অনুচ্ছেদটি লেখা যায়। ৫. প্রথম অনুচ্ছেদের পর একাধিক অনুচ্ছেদে ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি বর্ণনা করতে হবে। ৬. মূল প্রতিবেদন লেখা শেষে প্রতিবেদকের নাম, পদবি, বিনীত নিবেদক, ইতি— লেখা যাবে না। ৭. প্রতিবেদন লেখা শেষে খাম দিতে হবে না। ৮. সংবাদ প্রতিবেদন লিখনে প্রতিবেদককে অবশ্যই নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক হতে হবে। সংবাদ প্রতিবেদনে ভালো করতে হলে গাইড বই ছেড়ে দৈনিক কোনো পত্রিকার রিপোর্ট মনোযোগ দিয়ে পড়বে। প্রতিবেদন লেখার নিয়ম নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে প্রতিবেদন লেখার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ ও সচেতনতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক ও সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম জানা এখন শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজিত কর্মশালা ও ক্লাসে প্রতিবেদন লেখার কৌশল শেখানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা জানান, আগে প্রতিবেদন লেখাকে কঠিন মনে হলেও এখন 5W + 1H সূত্র জানার ফলে বিষয়টি অনেক সহজ হয়েছে। শিক্ষকদের মতে, একটি ভালো প্রতিবেদন হতে হলে তা অবশ্যই নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও সুসংগঠিত হতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনে সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অনুষ্ঠান যেমন বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বর্ণনা দেওয়া হয়। অন্যদিকে সংবাদ প্রতিবেদন লেখা হয় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ঘটনা তুলে ধরার জন্য। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিবেদনের প্রথম অনুচ্ছেদে কী, কোথায়, কখন, কে, কেন এবং কীভাবে—এই ছয়টি প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি। এতে পাঠক খুব সহজেই পুরো ঘটনার সারাংশ বুঝতে পারেন। এদিকে, নতুন প্রজন্মের অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লেখালেখির দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সংবাদ প্রতিবেদন লেখার দক্ষতা অর্জন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, নিয়মিত সংবাদপত্র পড়া এবং চর্চার মাধ্যমে খুব সহজেই দক্ষ প্রতিবেদক হয়ে উঠতে পারে। লেখার ধাপ: আবেদনপত্র প্রয়োজন হয় না আকর্ষণীয় শিরোনাম (হেডলাইন) দিয়ে শুরু করতে হয় এরপর ডেটলাইন (স্থান, তারিখ, প্রতিবেদকের পরিচয়) লিখতে হয় প্রথম অনুচ্ছেদে 5W + 1H সূত্র ব্যবহার করতে হয় পরবর্তী অংশে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও বর্ণনা দিতে হয় প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত মতামত পরিহার করতে হয় 5W + 1H সূত্রের গুরুত্ব একটি ভালো প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি হলো 5W + 1H: What (কি ঘটেছে) Where (কোথায় ঘটেছে) When (কখন ঘটেছে) Who (কারা জড়িত) Why (কেন ঘটেছে) How (কীভাবে ঘটেছে) এই ছয়টি প্রশ্নের উত্তরই একটি প্রতিবেদনের প্রথম অনুচ্ছেদকে শক্তিশালী করে।