ইত্তেহাদ নিউজ : একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, যার বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। বাইরে থেকে সফল ও সুপ্রতিষ্ঠিত বলে মনে হলেও ভেতরে লুকিয়ে আছে জালিয়াতির জটিল নেটওয়ার্ক। প্রতিষ্ঠানটির হাতে রয়েছে ব্যয়বহুল আইনজীবী বাহিনী, বেসরকারি গোয়েন্দা, সাইবার হামলার সক্ষমতা এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাংবাদিক কীভাবে সত্য অনুসন্ধান করবেন?
এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দিয়েছেন লন্ডনভিত্তিক ফাইনান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ড্যান ম্যাকক্রাম। তিনি টানা ছয় বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে জার্মান পেমেন্ট প্রসেসিং প্রতিষ্ঠান অয়্যারকার্ডের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম বড় কর্পোরেট জালিয়াতি উন্মোচন করেন।
২০২০ সালে অয়্যারকার্ডের পতনের সময় প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। অনুসন্ধানের ফলে কোম্পানিটির একাধিক শীর্ষ নির্বাহী গ্রেপ্তার হন, জার্মানির দুটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করেন এবং ইউরোপীয় কর্পোরেট নজরদারি ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা সামনে আসে।
ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, বড় কর্পোরেট জালিয়াতি সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না।
“প্রতারকেরা শুরুতেই বিশাল জালিয়াতির পরিকল্পনা করে না। সাধারণত তারা কোনো আর্থিক সমস্যা সাময়িকভাবে আড়াল করতে ছোট একটি অনিয়ম করে। পরে সেই অনিয়ম ঢাকতে আরও বড় অনিয়ম করতে হয়, আর এভাবেই জালিয়াতি বিস্তৃত হতে থাকে।”
অয়্যারকার্ডের ক্ষেত্রেও তিনি এমন একটি কাঠামো খুঁজে পান, যেখানে শেল কোম্পানি, সন্দেহজনক অংশীদারত্ব, ভুয়া গ্রাহক, কৃত্রিম মুনাফা এবং অতিরঞ্জিত আয়-ব্যয়ের হিসাব ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন রাখা হয়েছিল।
২০১৫ সালে একজন অস্ট্রেলীয় শর্ট সেলার প্রথম ম্যাকক্রামকে অয়্যারকার্ড সম্পর্কে সতর্ক করেন। পরে আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির হিসাব জালিয়াতির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
তবে ম্যাকক্রাম শুরু থেকেই সতর্ক ছিলেন।
তার ভাষায়, শর্ট সেলারদের বক্তব্যকে সরাসরি সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ তাদেরও আর্থিক স্বার্থ থাকে। তিনি তাদের দেওয়া তথ্যকে কেবল সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং কোম্পানি রেজিস্ট্রি, আর্থিক নথি ও স্বাধীন উৎসের মাধ্যমে সেসব তথ্য যাচাই করেছেন।
অনুসন্ধানের শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেছিলেন ম্যাকক্রাম।
শর্ট সেলারদের সরবরাহ করা একটি ফাইলের ভিত্তিতে তিনি একটি ব্লগ পোস্টে অয়্যারকার্ড-সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের উল্লেখ করেন। এরপর কোম্পানিটির আইনজীবীরা অভিযোগ তোলেন, ওই তথ্য মানহানিকর হতে পারে এবং এর দায় ফাইনান্সিয়াল টাইমসের ওপর বর্তাবে।
ফলে আইনি জটিলতার কারণে তাঁর অনুসন্ধান প্রায় এক বছরের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে।
পরে তিনি স্বীকার করেন, কোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগে প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীদের পরামর্শ না নেওয়া ছিল বড় ভুল।
একই সঙ্গে অয়্যারকার্ডের জনসংযোগ দল প্রচারণা চালাতে থাকে যে তিনি হয় শর্ট সেলারদের সঙ্গে যোগসাজশ করেছেন, নয়তো তাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। এই প্রচারণাও অনুসন্ধানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ম্যাকক্রামের মতে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি ভালো স্টোরি পরবর্তী স্টোরির দরজা খুলে দেয়।
শুরুর দিকে তিনি সরাসরি “জালিয়াতি” শব্দ ব্যবহার করেননি। বরং অয়্যারকার্ডের ব্যবসায়িক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিষয়টিকে একটি “ধাঁধা” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
ক্রমাগত প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে একের পর এক হুইসেলব্লোয়ার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন।
এক পর্যায়ে সিঙ্গাপুরে অয়্যারকার্ডের এক আইনজীবীর মা নিজেই ম্যাকক্রামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আগের প্রতিবেদনগুলো পড়ে ক্ষুব্ধ হন এবং ছেলেকে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহিত করেন।
পরে ওই আইনজীবী গুরুত্বপূর্ণ নথি সরবরাহ করেন, যা অনুসন্ধানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের সময় ম্যাকক্রাম ও তাঁর দল একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
এর মধ্যে ছিল—
তিনি সতর্ক করেন, অনেক আধুনিক প্রিন্টার মুদ্রিত কাগজে অদৃশ্য মাইক্রোডট রেখে যায়, যা নথি কোথায় ও কখন ছাপানো হয়েছে তা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ফাইনান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক স্টেফানিয়া পালমা ফিলিপাইনে যান।
অয়্যারকার্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদারের অফিসে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেখানে একই সঙ্গে একটি ট্যুর বাস কোম্পানির কার্যক্রম চলছে। অথচ নথিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি কোটি কোটি ডলারের ডিজিটাল লেনদেন পরিচালনা করছিল।
এই ধরনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত অয়্যারকার্ডের দাবিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহে সহায়তা করে।
ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, কর্পোরেট জালিয়াতি অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা উচিত।
মাত্র কয়েক হাজার ডলারের ভুয়া চালান বা ব্যাকডেটেড চুক্তি গুরুত্বহীন মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো বড় ধরনের প্রতারণার ইঙ্গিত হতে পারে।
অধিগ্রহণের আগে কোনো কোম্পানির ওয়েবসাইটে হঠাৎ বড় পরিবর্তন এসেছে কি না, তা যাচাই করতে ওয়েব্যাক মেশিন অত্যন্ত কার্যকর।
বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালালে সময়রেখা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিঙ্গাপুরের ACRA, যুক্তরাজ্যের Companies House এবং OpenCorporates-এর মতো ডেটাবেস গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ে সহায়ক।
কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে আয় করে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন ম্যাকক্রাম।
অয়্যারকার্ড অনুসন্ধানের সময় ম্যাকক্রাম ও তাঁর সহকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়েন।
তাদের ওপর বেসরকারি গোয়েন্দাদের নজরদারি চালানো হয়। অনলাইনে হয়রানি করা হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে সোর্সদের যোগাযোগের প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়।
এমনকি রাসায়নিক হামলার হুমকি ও ঘুষের প্রস্তাবও পাওয়া যায় বলে তিনি দাবি করেন।
এক পর্যায়ে তাঁরা ধারণা করেন, লন্ডনে প্রায় ৩০ জন প্রাইভেট গোয়েন্দা তাঁদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে সোর্সদের সঙ্গে দেখা করতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হতো।
ড্যান ম্যাকক্রামের মতে, অয়্যারকার্ড কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো—এটি বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট জালিয়াতির বিষয়ে নতুন করে মনোযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দাবি এখনো যথেষ্ট যাচাইয়ের মুখোমুখি হয়নি।
তাঁর মতে, সাংবাদিকদের কাজ হলো সেই দাবিগুলোকে প্রশ্ন করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করা।
“অনেক প্রতিষ্ঠান দাবি করে তাদের কাছে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আছে। প্রশ্ন হলো—সেই সম্পদগুলো আসলে কোথায়?”
এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে পরবর্তী বড় অনুসন্ধান।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
মামুনুর রশীদ নোমানী | বরিশাল অফিস: বরিশাল নগরীকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীর সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পরিষ্কার, সুপেয় পানির সংকট নিরসন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং তরুণদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত বরিশালকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নিতে তাঁর এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাধারন মানুষ, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাঁদের মতে, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি এসেছে। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। সে হিসাবে অক্টোবরের মাঝামাঝি তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কাল সাত মাসের কাছাকাছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীর উন্নয়ন উদ্যোগ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েছেন। দখলমুক্ত ফুটপাত ও সড়ক: স্বস্তি ফেরানোর উদ্যোগ: বরিশাল নগরীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও ফুটপাত দখল, যানজট এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করছে সিটি করপোরেশন। হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধ স্থাপনা অপসারণের কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানের লক্ষ্য শুধু ফুটপাত খালি করা নয়; পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, যানবাহনের গতি স্বাভাবিক রাখা এবং নগরীর বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ: বরিশালের নাগরিক দুর্ভোগের অন্যতম কারণ জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত না হওয়া, ড্রেনের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং খাল ও জলাশয়ের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তি তৈরি হয়। এই সমস্যা মোকাবিলায় নগরীর খাল এবং গুচ্ছগ্রাম এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খাল, জলাশয় ও ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। প্রশাসক শিরিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নগরীর ২২টি প্রাকৃতিক খাল সংস্কার ও খনন, সীমানা নির্ধারণ এবং খালের দুই পাড় সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে। সুপেয় পানির সংকট নিরসন'র উদ্যোগ নগরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসন প্রশাসক শিরিনের উন্নয়ন পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে প্রায় আট কোটি টাকা বরাদ্দে একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট মেরামত ও সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।পানি শোধনাগারটি চালু করা হলে নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে। কীর্তনখোলা নদীর তীরের সড়ক ও নগর অবকাঠামো বরিশালের যোগাযোগব্যবস্থা ও নগর সৌন্দর্য বাড়াতে কীর্তনখোলা নদীর তীরসংলগ্ন অসম্পূর্ণ সড়কের কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন সড়ক নির্মাণ, বিদ্যমান রাস্তা প্রশস্ত করা এবং বিভিন্ন সংযোগ সড়কের উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সহজ হবে। এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। নগর উন্নয়নের সুফল টেকসই করতে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সড়ক, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনপরিসরের উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে করে যাচ্ছেন শিরিন। কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন: নগর উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার উদ্যোগের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসক শিরিনের উদ্যোগের মধ্যে হকারদের পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত স্টল নির্মাণ, নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ এবং নাগরিক চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ ও পরিকল্পিত ব্যবসার স্থান তৈরি করা গেলে তা নগরীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হবে। তরুণদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড: নগরীর তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে ‘বিসিসি প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউসেপ স্কুল মাঠ পরিষ্কার করে শিশুদের খেলাধুলার উপযোগী করা হয়েছে। খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো তরুণদের সুস্থ বিনোদন, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং শারীরিক সক্ষমতা বিকাশে ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে নগরীর যেসব এলাকায় শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, সেখানে বিদ্যমান মাঠ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সম্মান: প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে নতুন বার্তা: প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর মধ্য দিয়ে নগর পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে যুক্ত কর্মীদের অবদানকে সম্মান জানানোর একটি প্রতীকী বার্তা দেওয়া হয়েছে। নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মীদের ওপর। তাঁদের কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, নিয়মিত বেতন-ভাতা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে কাজ করে যাচ্ছেন প্রশাসক শিরিন। তাই সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি কর্মীদের বাস্তব কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন তিনি। প্রশাসক শিরিনের রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয়: অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । বরিশালে জন্ম নেওয়া শিরিনের বাবা নাসির আহমেদ এবং মা জাহানারা বেগম। তিনি বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ব্রজমোহন কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং বরিশাল ল' কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন আইনজীবী। পাশাপাশি বরিশাল সিটি কলেজে প্রায় ১০ বছর অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন । ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত শিরিন ১৯৮৭ সালে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক এবং ১৯৯০ সালে সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পান। ১৯৯৬ সালে বরিশাল জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হন এবং ২০১১ সালে বিএনপির বরিশাল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর সংসদ সদস্যপদের মেয়াদ ছিল ১ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন । বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে শিরিন হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মতে, তাঁর নেতৃত্বে বরিশালে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য আরও জোরদার হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সমর্থন ও সাংগঠনিক অবস্থানের বাইরে নগর প্রশাসক হিসেবে তাঁর সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি নাগরিক সেবার মান, উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। আধুনিক নগরীর পরিকল্পনা: সামনে পাঁচটি বড় লক্ষ্য প্রশাসক শিরিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বরিশালকে পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও নাগরিকবান্ধব নগরীতে রূপান্তরে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন তিনি।। এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নগরীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ১. ২২টি খালের সংস্কার ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান: নগরীর প্রাকৃতিক খালগুলো চিহ্নিত করা, সীমানা নির্ধারণ, খনন এবং দুই পাড় সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়বে। ২. যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কব্যবস্থার আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কীর্তনখোলা নদীর তীরসংলগ্ন সড়কসহ সংযোগ সড়কগুলোর কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য যানবাহন চলাচল, পথচারী নিরাপত্তা ও পার্কিং ব্যবস্থাকেও পরিকল্পনার আওতায় আসবে। ৩. শতভাগ নিরাপদ পানি ও উন্নত ড্রেনেজ প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিশোধিত পানি সরবরাহ এবং নতুন ও বর্ধিত এলাকাগুলোতে উন্নত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪. আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব পার্ক কীর্তনখোলা নদী ও নগরীর পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্য শোধনব্যবস্থা আধুনিকায়ন, ময়লা ফেলার স্থান উন্নত করা এবং নদীর তীর ঘেঁষে পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র ও পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হবে। ৫. ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও জবাবদিহি ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিকদের ভোগান্তি কমবে। বরিশাল নগরীর উন্নয়নে প্রশাসক শিরিনের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে নাগরিক সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত দখলমুক্ত করা, খাল ও ড্রেন পরিষ্কার, সুপেয় পানির সংকট নিরসন এবং সড়ক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পুরন হবে। বরিশালকে আধুনিক নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসক শিরিনের সামনে তাই একদিকে রয়েছে চলমান উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাগরিক প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার একটি লাউক্ষেত এখন স্থানীয় কৃষক, কৃষি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের মানুষেরও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারণ, সেখানে প্রচলিত জাত নয়, চাষ করা হয়েছে উচ্চ ফলনশীল ‘সুপার গ্রিন’ জাতের লাউ। আর এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন পাকেরহাট গ্রামের ৩২ বছর বয়সী যুবক মিজানুর রহমান। রোববার ক্ষেতটি পরিদর্শন করেন দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, আধুনিক ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত এই লাউ ইতোমধ্যে বাজারে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। কম খরচে বেশি লাভের সম্ভাবনা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও নতুন আগ্রহ তৈরি করছে। ২১ শতকের প্রদর্শনী থেকে এক একরের বাণিজ্যিক সাফল্য কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের জৈব সার ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা হচ্ছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে মিজানুর রহমান ২১ শতক জমিতে একটি জৈব সবজি উৎপাদন প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করেন। তবে তার উদ্যোগ কেবল প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। চলতি মৌসুমে তিনি মোট এক একর বা ১০০ শতক জমিতে সুপার গ্রিন জাতের লাউ চাষ করেছেন। এর মধ্যে ২১ শতক জমিতে কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে জৈব পদ্ধতির প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিনিয়োগ ৪৮ হাজার, আয় ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মিজানুর রহমান জানান, বীজ, মাচা নির্মাণ, জৈব সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ তার মোট উৎপাদন ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা। তার দাবি, এখন পর্যন্ত ক্ষেত থেকে লাউ বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আয় করেছেন। জমিতে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লাউ রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মৌসুম শেষে মোট আয় ২ থেকে ৩ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। অর্থাৎ, হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি আয় করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কেন আলাদা এই লাউ? মিজানুরের ভাষ্য অনুযায়ী, সুপার গ্রিন জাতের লাউ আকারে বড়, দেখতে আকর্ষণীয় এবং ওজন বেশি হওয়ায় বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী জৈব সার এবং পরিবেশবান্ধব বালাই দমন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরাপদ সবজি উৎপাদনও সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ লাউয়ের তুলনায় এই জাতের লাউ ক্রেতাদের নজর বেশি কাড়ছে। পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্ষেত থেকে লাউ কিনে নিচ্ছেন। ফলে পরিবহন ব্যয় কমছে এবং কৃষকও তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন। কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ মিজানুর রহমানের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকার কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কৃষক ফজলে হক বলেন, মিজানুরের ফলন ও বাজারমূল্য দেখে অনেকেই আগামী মৌসুমে সুপার গ্রিন জাতের লাউসহ অন্যান্য সবজি চাষের পরিকল্পনা করছেন। আরেক কৃষক আফতাব হোসেন বলেন, “অল্প খরচে যদি এত লাভ হয়, তাহলে লাউ চাষ অবশ্যই লাভজনক। কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে আমরাও আগামী মৌসুমে এই জাতের লাউ চাষ করব।” কৃষি বিভাগের মূল্যায়ন খানসামা উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মো. নাসিব আহমেদ খাঁন জানান, দিনাজপুর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় বেশ কয়েকজন যুবক উন্নত জাতের সুপার গ্রিন লাউ চাষে ইতোমধ্যে সফল হয়েছেন। মাঠ কর্মকর্তা সবুজ আহমেদের মতে, পরিকল্পিত চাষাবাদ, জৈব পদ্ধতির ব্যবহার এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অল্প জমিতেও কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন। অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, সুপার গ্রিন একটি উচ্চ ফলনশীল লাউয়ের জাত। তুলনামূলক কম রোগ-বালাই হওয়ায় এর উৎপাদন ঝুঁকিও কম। তার ভাষায়, “সঠিক সময়ে চাষ এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে অল্প জমিতেও ভালো লাভ করা সম্ভব।” এটি কি স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত? কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কৃষিতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভজনকতা বাড়ানো। সেই বাস্তবতায় দিনাজপুরের খানসামায় মিজানুর রহমানের এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জৈব সার ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব বালাই দমন ব্যবস্থা এবং বাজারমুখী উচ্চ ফলনশীল জাতের সমন্বয় যদি ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা যায়, তাহলে শুধু লাউ নয়, অন্যান্য সবজি উৎপাদনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে মিজানুর রহমানের ক্ষেতটি তাই কেবল একটি সফল খামার নয়; বরং গ্রামীণ কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের একটি বাস্তব মডেল হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ : একটি শক্তিশালী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির পেছনে থাকে অসংখ্য নথি, তথ্য, বিশ্লেষণ এবং সূত্রের সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগ। তবে এসব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—সাক্ষাৎকার। তথ্য ফাঁসের সত্যতা যাচাই, ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট বোঝা, অভিযোগের ভিত্তি খতিয়ে দেখা কিংবা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানী সাংবাদিককে নির্ভর করতে হয় সাক্ষাৎকারের ওপর। তাই একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাছে সাক্ষাৎকার কেবল প্রশ্নোত্তর নয়; এটি সত্য উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কেন সাক্ষাৎকার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল হাতিয়ার? সাধারণ সংবাদ প্রতিবেদনের তুলনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সাক্ষাৎকারের ভূমিকা অনেক বেশি গভীর ও জটিল। এখানে একটি প্রশ্নের উত্তর নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, একটি সূত্র আরেকটি সূত্রের সন্ধান দেয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি হলো—কোনো তথ্য বা বক্তব্য যাচাইয়ের আগে তাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। ফলে সাক্ষাৎকার কেবল তথ্য সংগ্রহের মাধ্যম নয়; এটি তথ্য যাচাই, অসঙ্গতি শনাক্ত এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের একটি পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া আইনগত বা ফরেনসিক সাক্ষাৎকারের মতো মনে হতে পারে। যদিও সাংবাদিক ও তদন্ত কর্মকর্তার কাজ আলাদা, উভয়ের লক্ষ্যই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ঘটনার বাস্তব চিত্র বের করে আনা। সাক্ষাৎকারের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার্স অ্যান্ড এডিটরস (IRE)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার সাধারণত তিনটি উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়— ১. তথ্য সংগ্রহ ঘটনার সত্যতা যাচাই, নতুন তথ্য সংগ্রহ এবং অনুসন্ধানের দিক নির্ধারণের জন্য। ২. মানবিক ও আবেগীয় দিক বোঝা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও প্রভাব সম্পর্কে জানার জন্য। ৩. জবাবদিহি নিশ্চিত করা ক্ষমতাবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অভিযুক্তদের সামনে অভিযোগ ও তথ্য উপস্থাপন করে তাদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য। বাস্তবে একটি সাক্ষাৎকারে এই তিনটি উদ্দেশ্যই একসঙ্গে পূরণ হতে পারে। ভালো সাক্ষাৎকারের প্রথম শর্ত: প্রস্তুতি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রস্তুতি। কারণ তিনি সাধারণত এমন বিষয় নিয়ে কাজ করেন যা সংবেদনশীল, বিতর্কিত এবং অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়। ফলে সাক্ষাৎকারে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ঘটনার বিষয়ে যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। প্রস্তুতির মধ্যে থাকতে পারে— পূর্ববর্তী বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা অভিযোগ বা বিতর্ক সম্পর্কে জানা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ সামাজিক ও পেশাগত প্রেক্ষাপট বোঝা সম্ভাব্য প্রশ্নের তালিকা তৈরি যত বেশি তথ্য থাকবে, সাক্ষাৎকারে তত বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে সাংবাদিকের হাতে। গবেষণা ছাড়া সাক্ষাৎকার নয় ভালো অনুসন্ধানী সাংবাদিক মানেই ভালো গবেষক। যার সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে, তার অতীত অবস্থান, পেশাগত ইতিহাস, জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্য, সামাজিক সম্পর্ক—এসব বিষয়ে আগাম ধারণা থাকা জরুরি। অনেক সময় ব্যক্তির শখ, আগ্রহ বা ব্যক্তিগত আগ্রহের বিষয়ও সাক্ষাৎকারের শুরুতে সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করে। ফলে কঠিন প্রশ্নে যাওয়ার আগে একটি স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করা সহজ হয়। অন্যদিকে পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া সাক্ষাৎকারে গেলে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে সাক্ষাৎকারদাতার হাতে। রেকর্ডার ও নোটবুক: দুটোই প্রয়োজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য সাক্ষাৎকারে যাওয়ার সময় রেকর্ডিং ডিভাইস ও নোটবুক দুটোই সঙ্গে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রেকর্ডার ধরে রাখে প্রতিটি শব্দ। নোটবুক ধরে রাখে— দেহভঙ্গি মুখের অভিব্যক্তি পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ অনুস্মারক পরবর্তী প্রশ্নের সূত্র এছাড়া প্রযুক্তিগত ত্রুটির ঝুঁকিও কমে যায়। তবে অনেক দেশে সাক্ষাৎকার রেকর্ড করার আগে সাক্ষাৎকারদাতার সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে স্থানীয় আইন সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। অন-দ্য-রেকর্ড বনাম অফ-দ্য-রেকর্ড অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানে অফ-দ্য-রেকর্ড সাক্ষাৎকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেসব ক্ষেত্রে সূত্রের পরিচয় প্রকাশ করলে তার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, সেখানে সাংবাদিক অফ-দ্য-রেকর্ড আলোচনায় সম্মত হতে পারেন। তবে একবার কোনো তথ্য অফ-দ্য-রেকর্ড হিসেবে গ্রহণ করা হলে, পরবর্তী সম্মতি ছাড়া সেটি সরাসরি প্রকাশ করা যায় না। কার সাক্ষাৎকার আগে নেবেন? একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের সূত্র থাকে। সাধারণভাবে এগুলো চার ভাগে বিভক্ত করা যায়। সাক্ষী ও হুইসেলব্লোয়ার অনুসন্ধানের শুরুতে। উদ্দেশ্য: ফাঁস হওয়া তথ্য যাচাই প্রাথমিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা অনুসন্ধানের সম্ভাবনা মূল্যায়ন তবে হুইসেলব্লোয়ার ও সাক্ষী এক নয়। হুইসেলব্লোয়ারের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে, কিন্তু সাক্ষী সাধারণত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তথ্য দেন। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুসন্ধানের মূল পর্যায়ে। উদ্দেশ্য: সম্পৃক্ততা যাচাই অভিযোগের ব্যাখ্যা নেওয়া নতুন সূত্র শনাক্ত করা অনেক সময় একই ব্যক্তির একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞ যখন বিষয়টি প্রযুক্তিগত বা জটিল। বিশেষজ্ঞ হতে পারেন— আইনজীবী চিকিৎসক বিজ্ঞানী অর্থনীতিবিদ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তাদের কাজ হলো জটিল তথ্যকে সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য করে তোলা। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নির্বাহী সাধারণত অনুসন্ধানের শেষ দিকে। উদ্দেশ্য: জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান জানা অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নেওয়া অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা সাধারণত পর্যাপ্ত তথ্য হাতে পাওয়ার আগে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। কারণ আগাম সতর্ক হয়ে গেলে তারা অনুসন্ধানের গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। প্রথম সাক্ষাৎকার কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? প্রথম সাক্ষাৎকার অনেক সময় পুরো অনুসন্ধানের ভিত্তি তৈরি করে। ফাঁস হওয়া তথ্যের ক্ষেত্রে প্রথম সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া তথ্য— অনুসন্ধানের কাঠামো নির্ধারণ করে নতুন সূত্রের সন্ধান দেয় প্রাথমিক অভিযোগ যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সাক্ষাৎকার সাধারণত তথ্য নিশ্চিতকরণ এবং মুখোমুখি প্রশ্ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। সাক্ষাৎকারের সময় কীভাবে প্রশ্ন করবেন? অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারে সাধারণত সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা হয়। এর উদ্দেশ্য: আস্থা তৈরি করা জড়তা কমানো আলাপের স্বাভাবিক প্রবাহ সৃষ্টি করা এরপর ধীরে ধীরে কঠিন ও স্পর্শকাতর প্রশ্নে যেতে হয়। আগাম প্রশ্ন তালিকা থাকা জরুরি। তবে তালিকার বাইরে গিয়ে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন করার সক্ষমতাও থাকতে হবে। ভালো সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী আগে ভালো শ্রোতা বিশ্বখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক Gabriel García Márquez একবার বলেছিলেন, সাক্ষাৎকারে শুধু শব্দ নয়, মানুষের অভিব্যক্তিও শুনতে হয়। একজন দক্ষ অনুসন্ধানী সাংবাদিক— মনোযোগ দিয়ে শোনেন দেহভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করেন অসম্পূর্ণ বাক্যের তাৎপর্য ধরতে পারেন দ্বিধা ও অস্বস্তির মুহূর্তগুলো লক্ষ্য করেন অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শব্দে নয়, বরং বিরতি, অস্বস্তি বা চোখের ভাষায় ধরা পড়ে। ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন কেন কার্যকর? অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারে সাধারণত ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন বেশি কার্যকর। যেমন: ❌ “আপনি কি সেখানে ছিলেন?” ✔️ “সেদিন ঘটনাস্থলে কী ঘটেছিল?” এ ধরনের প্রশ্ন সাক্ষাৎকারদাতাকে বিস্তারিত বলার সুযোগ দেয় এবং নতুন তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা বাড়ায়। তবে প্রয়োজন হলে সরাসরি ও নির্দিষ্ট প্রশ্নও করতে হয়। কিন্তু সেগুলো সাধারণত সাক্ষাৎকারের শুরুতে না করাই ভালো। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সাক্ষাৎকার কেবল তথ্য সংগ্রহের একটি ধাপ নয়; এটি সত্য অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়া। সফল সাক্ষাৎকারের জন্য প্রয়োজন— গভীর গবেষণা সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি মনোযোগী শ্রবণ সঠিক প্রশ্ন করার দক্ষতা মানবিক আচরণ ও মনস্তাত্ত্বিক বোধ এসব দক্ষতা বই পড়ে পুরোপুরি আয়ত্ত করা যায় না। মাঠে কাজ করতে করতে, অভিজ্ঞ সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখে এবং প্রতিটি সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেই একজন সাংবাদিক ধীরে ধীরে দক্ষ অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীতে পরিণত হন।