ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদায়ন কি প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়, নাকি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) দরপত্র, নিয়োগ ও নির্মাণকাজের অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? আর অধিদপ্তরের প্রধানের দায়িত্বই বা কতটা কার্যকর? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা একাধিক অভিযোগ এসব প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, দরপত্র অনুমোদনে কথিত পার্সেন্টেজ আদায়, ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তার এবং অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগে অনিয়ম এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বদলি ও পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তারেক আনোয়ার জাহেদী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় থেকেই বদলি ও পদায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি বদলি আদেশে কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি এবং কয়েকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ওই আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতার অভিযোগ সামনে আসে। সে সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেও এই গোষ্ঠী বদলি-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সুযোগে দ্রুতগতিতে বড় অঙ্কের বদলি-বাণিজ্য হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকা, তাঁদের আগের ও পরের কর্মস্থল, বদলির আবেদন, আদেশ জারির সময় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর দাবি, উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি এসব নথি পর্যালোচনা করলে বদলি ও পদায়ন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বদলি ও পদায়নের কারণে কর্মকর্তারা বিভিন্ন বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়ন ঘিরে প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলেও তাঁরা দাবি করেছেন। ওই নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে একই ধরনের প্রশ্ন বদলি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ২০২৫ সালের নভেম্বরেও সামনে আসে। সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি আদেশ বাস্তবায়নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে বাধা তৈরির অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তখন একটি বদলি-সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথা বলেছিল। ওই সময় তারেক আনোয়ার জাহেদীর সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বদলি ও পদায়ন ঘিরে বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, আদেশ বাস্তবায়নের নথি এবং কর্মকর্তাদের কর্মস্থল পরিবর্তনের পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। নিচের সারির কর্মীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরাসরি অর্থ গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে নিচের পর্যায়ের কর্মীদের ব্যবহার করে অর্থ আদায় করা হতো। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত জসিম নামের এক কর্মচারীকে ঘিরেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্ত্রীর নামে লাইসেন্স খুলে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা এবং নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁদের আরও দাবি, বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর নজরে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি এ ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগে অনিয়মের প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কারা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার ফল, নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন, অভিযোগের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নির্মাণকাজে বিলম্ব, নিম্নমানের উপকরণ ও অর্থ পরিশোধের অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যেসব প্রকল্পের কাজ নয় মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, সেগুলোর কোনো কোনোটি চার বছরেও শেষ হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই চিঠির জবাবে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও তাঁদের অভিযোগ। এসব দাবি যাচাইয়ের জন্য প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, কার্যাদেশ, নির্ধারিত সময়সীমা, ঠিকাদারকে দেওয়া বিল, কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন, গুণগত মান পরীক্ষার ফল এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠিপত্র পর্যালোচনা করা জরুরি। প্রকল্পের কাজ দেরিতে শেষ হওয়া কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা থেকেই দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না। তবে দীর্ঘদিন কাজ অসমাপ্ত থাকা এবং অগ্রগতির তুলনায় অর্থ পরিশোধের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। অধিদপ্তরের অতীতের নিয়োগ ও দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত একটি সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। অধীনস্থদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ: নথিতে যা আছে তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের নথিও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন চাওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অধিদপ্তরের অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের বিপরীতে অন্তত একটি ঘটনায় তাঁর স্বাক্ষরিত তদন্ত-নির্দেশের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ভিডিও, তদন্ত কমিটিতে প্রধান প্রকৌশলী ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের দপ্তরে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওতে টেবিলের ওপর টাকা রাখা দেখা যায় এবং একজনকে ‘স্যারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা রেখে যান’ বলতে শোনা যায়। হাসান শওকত অর্থগুলো ঠিকাদারদের বলে দাবি করেন এবং এ ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয় অতিরিক্ত সচিব ড. সরদার মো. কেরামত আলীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এবং উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানকে। অর্থাৎ, অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলীর দপ্তরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান সেই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, যাঁকে ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে তদন্তটি পক্ষপাতদুষ্ট—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও অবকাশ নেই। কমিটির কার্যপরিধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ভূমিকা এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। হাসান শওকতের দপ্তরের অর্থ লেনদেনের ভিডিও নিয়ে তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেছিলেন, ভিডিওটি তখনও তাঁর নজরে আসেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্রে ঘুষের অভিযোগ ২০২৬ সালের আগস্টে সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে বাড্ডার রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার উন্নয়নকাজের দরপত্র ঘিরে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রথম দরপত্রে ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স ২ কোটি ২ লাখ ৮ হাজার ৬১ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পায়। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী ঠিকাদারের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ঘটনায়ও তারেক আনোয়ার জাহেদী তদন্তের নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে। দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্র আহ্বান নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। এ জন্য দরপত্র বাতিলের লিখিত কারণ, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, পুনঃদরপত্রের শর্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। এই ঘটনাগুলো থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে তারেক আনোয়ার জাহেদীর নেওয়া তদন্তের নির্দেশগুলো কি কার্যকর অনুসন্ধান ও জবাবদিহিতে রূপ নিচ্ছে, নাকি অভিযোগগুলো তদন্তের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে?এর উত্তর পেতে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, গৃহীত ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ বা যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পদ নিয়ে অভিযোগ তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পদে বহাল থাকার চেষ্টা করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের পদ ধরে রাখতে তিনি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তদবির করেছেন। তাঁর নিজ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্যের বরাত দিয়ে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর পরিবার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল এবং ওই সময়ে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন। তাঁর নামে-বেনামে সম্পদ এবং বিদেশে সম্পদ থাকার দাবিও করেছেন অভিযোগকারীরা। আরেক কর্মকর্তার দাবি, তারেক আনোয়ার জাহেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি বা পদায়ন পেয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে প্রত্যাশা তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একজন দুদক কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। তারেক আনোয়ার জাহেদীর বিষয়েও অভিযোগ পাওয়া গেলে অনুসন্ধানের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। জবাবদিহির প্রশ্নে যে নথিগুলো জরুরি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়ন, নিয়োগ, দরপত্র ও নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তাই শুধু প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর মানও জড়িত। তারেক আনোয়ার জাহেদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে অন্তত কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: বদলি ও পদায়নের পূর্ণাঙ্গ নথি, কথিত অর্থ লেনদেনের আর্থিক প্রমাণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও লাইসেন্স, নিয়োগপ্রক্রিয়ার কাগজপত্র, প্রকল্পের অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের হিসাব এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এসব নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রশ্নটি তাই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহির: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ ও দরপত্রপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? অভিযোগের তদন্তগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? আর অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তরই নির্ধারণ করবে, অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অনিয়মের ইঙ্গিত।
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশলে দুর্নীতির অভিযোগ: নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য ও ভুয়া বিলের প্রশ্ন:২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ, মানববন্ধন ও টেন্ডার কারসাজির দাবি; প্রায় ৩২ কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্পে কমিশন লেনদেনের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) জেলার শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। জেলার স্কুল,কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সংস্কার, শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ, টয়লেট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজের দায়িত্ব এই দপ্তরের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই দপ্তর ঘিরে যে চিত্র উঠে আসছে, তা সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরের ভেতরে ঘুষ, অনিয়ম, দরপত্র কারসাজি ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ জমতে জমতে এখন পাহাড় হয়ে প্রকাশ্যে আসছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম। কে এই শহিদুল,আটকের দাবি শহিদুল ইসলাম ছাত্র জিবন থেকেই ছাত্রলীগের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত।বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার ঢেপুয়ারপাড় জামুয়া গ্রামে।তার পিতার নাম শেখ রুস্তুম আলী।পিমস আইডি নং ০০০৫৪৩।এন আই ডি নং- এনআইডি নং- ২৬৯০৪১৭১৫৪+++। ডুয়েটে থাকাকালীন সময়ে আবেদ আলী পিএসসি সনদ বানিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। বহুল আলোচিত কেলেঙ্কারি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী এবং পিএসসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাসহ একটি শক্তিশালী প্রশ্নফাঁস চক্রের সাথে প্রকৌশলী শহিদুল জড়িয়ে পড়েন। শহিদুলের নিয়োগেও রয়েছে বড় অনিয়ম।তিনি ও তার বন্ধুদের নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম ফাঁস হয়েছিল।বড় অংকের ঘুসের বিনিময়ে সেই অনিয়ম ধামাচাপা দেয়া হয়।শহিদুলকে আটক করে রিমান্ডে নেয়া হয়ে আবেদআলী পিএসসি প্রশ্নফাঁসে বহু তথ্য বেড়িয়ে আসবে। শহিদুলের গডফাদাররা কারাগারে থাকলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম তিনি সরকারি দ্বায়িত্বে নিয়োজিতই নন।তিনি এখনো বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখার সদস্যও। ডুয়েটে ছাত্র জিবনে কার্য্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন।২০০৯ ব্যাচের এই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের চতুরতায় বরিশাল,ঝালকাঠি ও পটুয়াখালীর অসংখ্য ঠিকাদারগন পথে বসেছে। শহিদুলের গডফাদার ঝালকাঠিতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ছিলেন আমির হোসেন আমু,বরিশালে তার গডফাদার ছিলেন জাহিদ ফারুক শামিম। আমু ও জাহিদ ফারুক শামিম কারাগারে অথচ প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম দুটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা বরিশাল ও বরগুনার দ্বায়িত্বে বহাল তবিয়তে ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন।শহিদুল ইসলামকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে সাধারন ঠিকাদারগন। ঠিকাদার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং দপ্তরের ভেতরের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রকল্পের ফাইল কার্যত এগোয় না-এমনটাই দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দপ্তরের ভেতরে এমন একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে অর্থ ছাড় পর্যন্ত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে কেউ তাঁর বিরাগভাজন হলে কিংবা তাঁর কথিত নির্দেশনা অনুসরণ না করলে ফাইল আটকে যাওয়াটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম যখন ঠিকাদার : বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম তিনি নিজ দপ্তরে বসেই চারটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রন করেন।এই চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নিয়ে সাব কন্ট্যাক্টে কাজ দেন বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।ফলে প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের নিকট জিম্মি থাকে সাব কন্টাক্টে কাজ নেয়া প্রতিষ্ঠানের লোকজন।শহিদুল ইসলাম যে চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রন করেন সেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বরিশালের মেসার্স মোমিন সিকদার,দিনাজপুরের মেসার্স মা এন্টার প্রাইজ,চট্রগ্রামের ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স,খুলনার মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্স। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্য ঠিকাদারদের কাছে সাবকন্ট্রাক্টে কাজ দেওয়া হয়। এতে মূল কাজের বরাদ্দ, বাস্তবায়ন এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রভাব বজায় থাকে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের আরও দাবি, সাবকন্ট্রাক্টে কাজ নেওয়া ঠিকাদারদের বিল, জামানত ও ভবিষ্যৎ কাজের সুযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে অনিয়মের প্রতিবাদ করা বা অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা তাঁদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। উল্লিখিত চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে তাদের আর্থিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট কাজের বরাদ্দ ও সাবকন্ট্রাক্টের বৈধতা যাচাই করতে দরপত্রের নথি, চুক্তিপত্র, মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য অনুসন্ধান চলছে। নিরাপত্তা জামানত নিয়েও প্রশ্ন: ঠিকাদারদের অভিযোগ, চারটি প্রতিষ্ঠানের নামে সম্পাদিত কাজের বিপরীতে নিরাপত্তা জামানত হিসেবে ৫ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হয়েছে, যেখানে তাঁদের দাবি অনুযায়ী প্রযোজ্য বিধিতে ১০ শতাংশ কর্তনের কথা রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এভাবে জামানত কর্তনের ক্ষেত্রে বিধি অনুসরণ না করা হলে সরকারের আর্থিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনুসন্ধানের শুরুটা হয় ঠিকাদারদের অসন্তোষ থেকে। বরিশাল জেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করেও একাধিক ঠিকাদার বিল না পাওয়ার অভিযোগ তুলতে থাকেন। কেউ কেউ জানান, কাজ শেষ হওয়ার পর মাসের পর মাস অফিসে ঘুরেও তারা বিল পাচ্ছেন না। আবার কোনো ক্ষেত্রে বিল আংশিক ছাড় করা হলেও বাকি অর্থ আটকে রাখা হচ্ছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে দেখা যায়, অধিকাংশ ফাইলের শেষ ধাপ গিয়ে থেমে থাকে নির্বাহী প্রকৌশলীর টেবিলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার জানান, এখানে কাজ করতে হলে শুধু নিয়ম মেনে কাজ করলেই হয় না, বাড়তি কিছু 'ম্যানেজ' করতে হয়। এক ঠিকাদারের ভাষায়, “এখানে কাজ করতে হলে দুইটা জিনিস লাগে-ধৈর্য আর টাকা। টাকা না দিলে ধৈর্য পরীক্ষা নেওয়া হয়।” তাঁর দাবি, অফিসে কেউ সরাসরি ঘুষের কথা বলে না, কিন্তু কথাবার্তার ইঙ্গিত থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রথমে বলা হয় ফাইলে একটু সমস্যা আছে, পরে নতুন কাগজ চাই, এরপর বলা হয় 'উপরে কথা বলতে হবে'। শহিদুলের যত সম্পদ: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল শেয়ারি বরিশাল ও ঢাকায় জমি ক্রয় করে ফ্ল্যাট ব্যবসা,উত্তরায় নিজস্ব ফ্ল্যাট,গাড়িসহ নামে বেনামে শত শত কোটি টাকাসহ সহায় সম্পদ গড়েছেন। ঘুষ,ঠিকাদারি,ঠিকাদারদের থেকে প্রতি বিলে ঘুষ,কমিশন,ঠিকাদারী কাজ বিক্রি, পার্টনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজের রিভাইজের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিল করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ,প্রতি লাইসেন্স থেকে দশ হাজার করে ঘুষ আদায়সহ অনৈতিক ভাবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।দুদক তদন্ত করলে বেড়িয়ে আসবে তার সম্পদের পাহাড়ের সকল তথ্য। নারী কেলেঙ্কারির যত অভিযোগ: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল নারীদের প্রতি খুবই দুর্বল।তাকে নারী সাপ্লাই দিত সাবেক এক হিসাব রক্ষক।বর্তমানে এক নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অভ্যান্তরে কানাঘুষা চলছে।এছাড়া তার নিজস্ব নিয়োগ দেয়া ব্যক্তিও তাকে সুন্দরী নারী সাপ্লাই দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।একটি নির্জন বাংলোতে নারীদের নিয়ে সময় কাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ বা সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার পর বিল ছাড় করাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিতে হয়-এমন অভিযোগ বহু ঠিকাদারের। প্রকল্পের আকার ও বাজেট অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ ভিন্ন হয়ে থাকে বলে তারা জানান। কাজ যত বড়, কথিত লেনদেনের অঙ্কও তত বেশি-এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয় বলে তারা দাবি করেন। প্রথমে মৌখিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়, পরে কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়, সবশেষে সরাসরি 'খরচের কথা' বলা হয়। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতেই থাকে। কখনো নতুন করে মাপজোপের কথা বলা হয়, কখনো আগের কাগজে ত্রুটি বের করা হয়। ফলে কাজ শেষ করেও তারা আর্থিক সংকটে পড়েন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু বিল আটকে থাকায় সেই ঋণ শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিল ছাড়ের পাশাপাশি দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারই সুবিধা পায়। প্রকৃত প্রতিযোগী ঠিকাদারদের দরপত্রে কৃত্রিম কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে বাতিল করা হয়-এমন অভিযোগও রয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে প্রভাব বিস্তার করে তার চারটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের বিরুদ্ধে।এক ঠিকাদার বলেন, "আগেই ঠিক করে দেওয়া থাকে কে কাজ পাবে। দরপত্র শুধু আনুষ্ঠানিকতা। আমরা কাগজ জমা দিলেও পরে বলা হয় টেকনিক্যাল সমস্যা আছে।” তাঁর দাবি, এসব সমস্যার কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না, বরং পছন্দের ঠিকাদারকে জায়গা করে দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এই অনিয়মের ফলে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। প্রতিযোগিতা না থাকায় কাজের মান কমে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অনুসন্ধানে জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও অর্ধসমাপ্ত ভবন পড়ে আছে, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, আবার কোথাও কাগজে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে ভবনের বিভিন্ন অংশ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ছাদ থেকে পানি পড়ে, দেয়ালে ফাটল। কিন্তু কাগজে নাকি সব ঠিক। আমাদের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে ক্লাস করছে।” অভিভাবকদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলায় শিক্ষার্থীদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। তারা বলছেন, শিক্ষা খাতে অনিয়ম মানে সরাসরি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দপ্তরের ভেতরে ও বাইরে একটি মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি লেনদেন এড়িয়ে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দপ্তরের কিছু কর্মচারী এবং বাইরের কয়েকজন ব্যক্তি এই যোগাযোগের কাজ করে থাকেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এর ফলে মূল অভিযুক্ত সবসময় সরাসরি সামনে না এসে আড়ালে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) বরিশাল কার্যালয় ঘিরে ঘুষ, দরপত্রে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, বিল আটকে রাখা এবং ঠিকাদারদের হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ২৪ জন ঠিকাদার। অভিযোগের প্রতিবাদে তাঁর অপসারণ ও তদন্তের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন ভুক্তভোগীরা। ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন, জামানত ফেরত এবং দরপত্রের মূল্যায়ন—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপেই একটি প্রভাবশালী বলয়ের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ নেওয়া, পরে অন্য ঠিকাদারের কাছে কাজ হস্তান্তর, নির্ধারিত হারে কমিশন আদায়, কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নথি তৈরি এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা। প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প ঘিরে কমিশন লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। এ ছাড়া বরিশাল নগরীর কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের দরপত্র, নিরাপত্তা জামানত কর্তন এবং ঠিকাদারদের বিল আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে, তা শুধু একটি সরকারি দপ্তরের প্রশাসনিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; বরং শিক্ষা অবকাঠামোর গুণগত মান, সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বিল ছাড়ে কমিশনের অভিযোগ: কাজ শেষ, তবু অপেক্ষা অনুসন্ধানের উপাদানে উঠে আসা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো কাজ সম্পন্ন করার পরও ঠিকাদারদের বিল আটকে রাখা এবং বিল ছাড়ের জন্য কমিশন দাবি করার অভিযোগ। ঠিকাদারদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, সংস্কার কিংবা সম্প্রসারণের কাজ শেষ করার পরও মাসের পর মাস তাঁদের দপ্তরে ঘুরতে হয়। কখনো বিলের একটি অংশ ছাড় করা হয়, আবার কখনো নতুন করে কাগজপত্র চাওয়া বা কাজের পরিমাপ নিয়ে আপত্তি তোলার কারণে ফাইল আটকে থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদারের অভিযোগ, “এখানে কাজ করতে হলে দুইটা জিনিস লাগে—ধৈর্য আর টাকা। টাকা না দিলে ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়।” ঠিকাদারদের দাবি, বিলের পরিমাণ ও প্রকল্পের আকার অনুযায়ী কথিত কমিশনের অঙ্ক নির্ধারিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে ফাইলে সমস্যা থাকার কথা বলা হয়, পরে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। আরেকটি অভিযোগ হলো, নিরাপত্তা জামানত ফেরত পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। তবে এসব লেনদেনের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ঠিকাদারদের বক্তব্য, বিল আটকে থাকায় তাঁদের ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের মজুরি ও নির্মাণসামগ্রীর বকেয়া পরিশোধে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপরও। দরপত্রে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয় ঘিরে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো দরপত্রের প্রতিযোগিতা প্রভাবিত করা। ঠিকাদারদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রের শর্ত ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারদের কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে বাদ দেওয়া এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এক ঠিকাদারের ভাষায়, “আগেই ঠিক করে দেওয়া থাকে কে কাজ পাবে। দরপত্র শুধু আনুষ্ঠানিকতা। আমরা কাগজ জমা দিলেও পরে বলা হয়, টেকনিক্যাল সমস্যা আছে।” অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সিদ্ধান্তের ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারও ব্যাহত হতে পারে। কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রকল্প বরিশাল নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে দরপত্র নিয়ে বিতর্কের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৯ সালের ১৯ জুন প্রকল্পটির জন্য প্রথম দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। সে সময় কোহিনূর এন্টারপ্রাইজ কাজটি পায়। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, মহানগর যুবলীগ নেতা ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক বিপ্লব এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাহিদ কাজটি শুরু করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটি পুনঃদরপত্রে যায় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। পরবর্তী দরপত্রে বিভিন্ন স্থান থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং প্রত্যেকেই ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে দরপত্র জমা দেয় বলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম পুনঃদরপত্রে অংশ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, যেটি জিয়াউল হক বিপ্লবের ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করা হয়েছে। ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, দরপত্র প্রক্রিয়া ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। অভিযোগকারীরা বিষয়টিকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, দরপত্রের শর্ত, মূল্যায়নের ফলাফল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণ প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। প্রায় ৩২ কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্প: কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাবুগঞ্জ ও আগৈলঝাড়ায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন প্রকল্প ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদারদের একাংশ। তাঁদের দাবি, প্রায় ৩২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ বসুন্ধরা হাউজিং (প্রা.) লিমিটেডের লাইসেন্স ব্যবহার করে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পরে প্রকল্পের কাজ ৭ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে অন্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের কার্যাদেশ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও প্রতিনিধিত্ব, চুক্তির শর্ত, কাজের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং অর্থ পরিশোধের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারি কাজের চুক্তি অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকলে সেটি অনুমোদিত সাবকন্ট্রাক্ট কি না, তা-ও যাচাই করতে হবে। ৩৫ লাখ টাকা ও কম্পিউটার অপারেটর রাশেদকে ঘিরে অভিযোগ টিএসসি প্রকল্পের কমিশন লেনদেন নিয়ে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রধান কার্যালয়ের প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বরিশালে আসার পর সার্কিট হাউসে ঠিকাদার প্রতিনিধিরা প্রকল্পের অগ্রিম কমিশন হিসেবে ৩৫ লাখ টাকা তাঁর দপ্তরের কম্পিউটার অপারেটর রাশেদের কাছে জমা দেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, টাকা গ্রহণের পর রাশেদকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে তাঁকে খুঁজতে নির্বাহী প্রকৌশলীর সরকারি গাড়িতে করে তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও ভাইকে বরিশালে আনা হয় এবং গভীর রাত পর্যন্ত তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে রাশেদের স্ত্রীর আপত্তির মুখে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।অভিযোগটি সত্য হলে তা সরকারি প্রকল্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও দপ্তরের জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলবে। এ কারণে ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। ছয় থেকে আট ঠিকাদারের সিন্ডিকেটের অভিযোগ ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর আশপাশে ছয় থেকে আটজন ঠিকাদারকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের বরাদ্দ, কার্যাদেশ, বিল ছাড় এবং জামানত ফেরতের মতো বিষয়ে এই বলয় বাড়তি সুবিধা পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার নামও এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বড় প্রকল্পের কাজ বণ্টন ও কমিশনভিত্তিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁকে নিয়মিত বরিশালের ইলিশ পাঠানোর অভিযোগও ঠিকাদারি মহলে আলোচিত বলে দাবি করা হয়েছে। ২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ: কী প্রতিকার চাওয়া হয়েছে? সচিবের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ২৪ জন ঠিকাদার নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতি, ভুয়া বিল উত্তোলন, দরপত্রে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের প্রধান বিষয়গুলো হলো— কমিশন দাবি: নির্ধারিত হারে কমিশন না দিলে সম্পন্ন কাজের বিল অনুমোদন না করার অভিযোগ। জামানত ফেরতে হয়রানি: নিরাপত্তা জামানত ফেরত পেতে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ। ভুয়া অগ্রগতির নথি: মাঠপর্যায়ে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও কাগজে অগ্রগতি দেখিয়ে বিল ছাড়ের অভিযোগ। দরপত্রে প্রভাব বিস্তার: নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। হুমকি ও অশালীন আচরণ: ঠিকাদারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ। কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি: কর্মদিবসে দপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ। সরকারি বিশ্রামাগারের ব্যবহার: দপ্তরের রেস্ট হাউস ব্যক্তিগত ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ঠিকাদারকে ফোনে হুমকির অভিযোগ, থানায় সাধারণ ডায়েরি নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঠিকাদার ফারুক হোসেনকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর এ ঘটনা ঘটে। পরদিন ৩০ নভেম্বর বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়, যার নম্বর ২০৭৬ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঠিকাদারদের আরও দাবি, প্রকাশ্যে অভিযোগ জানালে তাঁদের চলমান প্রকল্পের বিল আটকে দেওয়া হতে পারে কিংবা কাজের সাইটে নতুন করে ত্রুটি খোঁজা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকে পরিচয় গোপন রাখতে চান। ‘রাসেল’ ছদ্মনামে পরিচিত এক ঠিকাদারের দাবি, নির্ধারিত কমিশন না দিলে ফাইল স্বাক্ষর হয় না। ‘অয়ন’ ছদ্মনামে আরেক ঠিকাদার বলেন, মাঠপর্যায়ে কাজের নিরপেক্ষ পরিদর্শন ও নথি যাচাই করা হলে ভুয়া বিলের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন দরপত্র ও বিলসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনের উপাদানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্ধসমাপ্ত ভবন, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে অসন্তোষ এবং কাগজে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে কিছু অংশ অসম্পূর্ণ থাকার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক অভিযোগ করেন, ভবনের ছাদ থেকে পানি পড়ে এবং দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। অথচ নথিতে কাজ ঠিকঠাক সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। অভিভাবকদের উদ্বেগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তবে কোন বিদ্যালয়ের ভবনে কী ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে, কাজের চুক্তিমূল্য কত, নির্মাণকাজের দায়িত্বে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষায় কী ফল এসেছে—এসব তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষা অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে নির্মাণকাজের পরিমাপ, উপকরণের পরীক্ষার ফল, প্রকৌশলগত পরিদর্শন এবং ত্রুটি সংশোধনের নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত দায়িত্ব নিয়েও বিতর্ক শহিদুল ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখার সদস্য ছিলেন এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) শিক্ষাজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার ঢেপুয়ারপাড় জামুয়া গ্রামে এবং তাঁর পিতার নাম শেখ রুস্তুম আলী । অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনের সময় আমির হোসেন আমু এবং বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে জাহিদ ফারুক শামীমের রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও শহিদুল ইসলাম বরিশাল ও বরগুনার দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। পিএসসির প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দাবি শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নফাঁসসংক্রান্ত আলোচিত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ডুয়েটে শিক্ষাজীবনের সময় তিনি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদকে ঘিরে আলোচিত প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর নিয়োগ এবং একই সময় নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন বন্ধুর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ঘুষের বিনিময়ে এসব অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। পটুয়াখালীতেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে দাবি ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, পটুয়াখালীতে দায়িত্ব পালনকালেও শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। মানববন্ধনে অপসারণ ও শাস্তির দাবি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অধিদপ্তরের ভবনের সামনে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা বলে প্রতিবেদনের উপাদানে উল্লেখ রয়েছে। আয়োজকদের দাবি, সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট অনিয়মের প্রতিবাদ দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্বে বহাল রাখা তদন্তের স্বচ্ছতায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। প্রধান প্রকৌশলীর আশ্বাস, তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন বরিশাল কার্যালয় ঘিরে অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, “দুর্নীতি-অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে অভিযোগকারীদের দাবি, আশ্বাসের পরও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপের তথ্য তাঁরা পাননি। এ কারণে অভিযোগ তদন্তের অগ্রগতি, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না এবং কোনো অডিট বা বিভাগীয় অনুসন্ধান চলছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে। এ প্রতিবেদনের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বক্তব্য সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। প্রকৌশলী শহীদুলের অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। দুর্নীতি-অনিয়ম কোন ভাবেই বন্ধ হচ্ছে না বরিশাল শিক্ষা প্রোকৌশলী অধিদপ্তর। বিভিন্ন উপায়ে অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রকৌশলীদের অনৈতিক সুবিধা আদায়সহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, একাধিক ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল ও জামানতের চেক পরিশোধের ক্ষেত্রে গুনে গুনে বুঝে নেন কমিশন। ২৬ কোটি টাকার কাজ দুইটি ৭% কমিশনে অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রী করে দেন। অবশ্য তিনি বরিশালে যোগদানের পর থেকেই অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন এবং বাছাই করা উন্নয়ন কাজগুলো নিজেই বিভিন্ন কৌশলে ভাগিয়ে নিয়ে ঠিকাদারদের কাছে বিক্রী করে আসছেন। এখন প্রয়োজন নথিভিত্তিক, নিরপেক্ষ তদন্ত বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সচেতন নাগরিকদের একাংশ। প্রথমত, নির্বাহী প্রকৌশলী ও অভিযোগে উল্লিখিত চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রায় ৩২ কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্প এবং কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকার প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ ও বিলের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ, নিরাপত্তা জামানত কর্তনের হার, বিল আটকে রাখার কারণ এবং কথিত কমিশন লেনদেনের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত করা দরকার। চতুর্থত, ৩৫ লাখ টাকা হস্তান্তরের অভিযোগ, কম্পিউটার অপারেটর রাশেদের ভূমিকা এবং ঠিকাদার ফারুক হোসেনের জিডির তথ্য যাচাই করতে হবে। পঞ্চমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর নির্মাণমান পরীক্ষা করে ত্রুটি পাওয়া গেলে দায়ী ঠিকাদার ও তদারক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বিলম্ব, নথি গোপন রাখা কিংবা তদন্তের ফল প্রকাশ না করা হলে দপ্তরের ওপর আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে। মূল প্রশ্ন এখন একটাই: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি, নাকি ২৪ ঠিকাদারের অভিযোগ, দরপত্র বিতর্ক ও কমিশন বাণিজ্যের দাবিগুলোও প্রশাসনিক ফাইলের ভেতরেই আটকে থাকবে? অনুসন্ধান প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনিয়ম,দুর্নীতি, এবং নতুন অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।
ঢাকা মেডিকেল ও গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ দুই অর্থবছরে ৫ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ | একই ভবনে একই কাজের একাধিক প্যাকেজ, অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি বিল | কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারি ভবন, হাসপাতাল, পুলিশ ব্যারাক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার সংস্কারের নামে গণপূর্ত অধিদফতরের ঢাকার একাধিক বিভাগে সরকারি অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ কয়েকটি চিকিৎসা ও নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন সংস্কার এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এর আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার মেরামতকাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) আওতায় প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর আগে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ আগের অর্থবছরেও সংস্কারের নামে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়। দুই অর্থবছরে বিভাগ-৩-এর মোট ২২ কোটি টাকার ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি টাকার কাজ না করে বা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের। অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের আওতায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং দুটি নার্সিং কলেজ ও ছাত্রাবাসের সংস্কারে চার অর্থবছরে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে কয়েক কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে একই ভবনের একই তলায় একই ধরনের কাজ একাধিক প্যাকেজে ভাগ করা, অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে কার্যাদেশ ও বিল প্রস্তুত, দরজা-জানালা মেরামত এবং রং করার নামে কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো এবং ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত, কার্যাদেশ ও মাপবই যাচাই এবং সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই ভবনে একই কাজ, একাধিক প্যাকেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কয়েক বছর ধরে একই ধরনের সংস্কারকাজ পুনরাবৃত্তি হওয়া। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একই ভবনের একই ফ্লোরে একই ধরনের কাজ একাধিক ভাগে দেখিয়ে ব্যয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। দরজা-জানালা মেরামত, ভবনের বিভিন্ন অংশে রং করা এবং অন্যান্য নিয়মিত সংস্কারকাজের নামে প্রতি বছরই অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে কিছু কাজ বাস্তবে না করেই অথবা নামমাত্র কাজ করে সম্পূর্ণ কাজের বিল তোলা হয়েছে। সূত্রের দাবি, অধিকাংশ কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে অর্থবছরের শেষ দুই মাস—মে ও জুনে। অর্থবছরের বরাদ্দ শেষ করার তাগিদে জুন মাসে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একই ভবনের একই অংশে বারবার সংস্কারের প্রয়োজন কেন তৈরি হচ্ছে, কাজের পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আগের বছরের সংস্কারকাজের স্থায়িত্ব যাচাই করা হয়েছে কি না। ৩৫টি ছোট প্যাকেজে প্রায় এক কোটি টাকার কাজ ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এর ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এপিপি-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনার দাবি করে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিন লাখ টাকার মধ্যে ৩৫টি ছোট প্যাকেজে মোট প্রায় এক কোটি টাকার কাজ দেখানো হয়েছে। এসব কাজের মধ্যে কয়েকটির বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। প্যাকেজগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেস অফিস ও স্টাফ কোয়ার্টারের বিশেষ মেরামত, গণপূর্ত অফিস-সংলগ্ন কোয়ার্টারে ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে আগাছা কাটা, অপসারণ ও পরিষ্কার করা এবং ড্রেন পরিষ্কার ও নবায়ন। এ ছাড়া মিল ব্যারাক পুলিশ লাইন্সের মহিলা ব্যারাক ভবনের সিভিল ও স্যানিটারি মেরামত এবং ড্রেন পরিষ্কার, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের প্রেস ভবনের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের ছাদ মেরামত, ভূমি ভবন ও সেটেলমেন্ট প্রেসের বিভিন্ন ড্রেন সংস্কার এবং ম্যানহোলের ঢাকনা স্থাপনের কাজ তালিকাভুক্ত রয়েছে। তেজগাঁওয়ের ফরম ও প্রকাশনা অফিসের মোজাইক ফ্লোর পরিষ্কারসহ আনুষঙ্গিক মেরামত, বিজি প্রেস স্টাফ কোয়ার্টারের বিভিন্ন ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত ছাদ মেরামত, বিভিন্ন অংশে ম্যানহোলের ঢাকনা স্থাপন এবং ড্রেন পরিষ্কারের কাজও রয়েছে এসব প্যাকেজে। জাতীয় নাক, কান ও গলা হাসপাতালে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় জাতীয় হেড, নেক অ্যান্ড থাইরয়েড কংগ্রেস ২০২৫-এর জন্য জরুরি মেরামতকাজ এবং গভর্নমেন্ট প্রিন্টিং প্রেস স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার ড্রেন মেরামত ও পরিষ্কারের কাজও এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। অন্য প্যাকেজগুলোর মধ্যে রয়েছে সিদ্দিকবাজারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তিন নম্বর ভবনের সিভিল ও স্যানিটারি মেরামত এবং ড্রেন পরিষ্কার, বিজি প্রেসের অফসেট শাখার ভেতরে প্রসেস শাখা স্থাপনের জন্য সংস্কার এবং জাতীয় নাক, কান ও গলা হাসপাতালের অডিটোরিয়ামের ছাদ মেরামত। বিজি প্রেস স্টাফ কোয়ার্টারের এ ও ডি ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত ছাদ মেরামত এবং অফিস ও আবাসিক ভবনের বিভিন্ন অংশে বিশেষ মেরামতকাজও তালিকায় রয়েছে। মিল ব্যারাক পুলিশ লাইন্সের মহিলা ব্যারাক ভবনের মেরামত ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজও একই ধরনের প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে যোগসাজশের অভিযোগ ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আরেকটি অংশ টেন্ডার প্রক্রিয়া ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনকে ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, টেন্ডার ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে গোপনে দরপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ দিয়ে বাস্তবে কাজ না করে অথবা নামমাত্র কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের অনিয়মে নির্বাহী প্রকৌশলীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশ থাকতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম, দরপত্রের প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি, মালিকানা-সম্পর্ক এবং কার্যাদেশ ও বিলের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে নেই। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দরপত্রের নথি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং অর্থ পরিশোধের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি। অভিযোগকারীরা কার্যাদেশ, মাপবই, বিল-ভাউচার ও কাজ সমাপ্তির সনদ যাচাইয়ের পাশাপাশি সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কমিশন নেওয়ার অভিযোগ গণপূর্তের সংস্কারকাজে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের এপিপিভুক্ত কাজের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী দুই দফায় মোট ১০ শতাংশ কমিশন নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুয়া কাজের ক্ষেত্রে বিলের অর্ধেক অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সূত্রটি। এ ছাড়া গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে পাঁচ শতাংশ কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু দুটি বিভাগ নয়, আরও কয়েকটি বিভাগ নিয়ে অভিযোগ গণপূর্ত অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগের পরিধি শুধু মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগ ও ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ, মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগ, আরবরিকালচার বিভাগ, মিরপুর গণপূর্ত বিভাগ এবং সাভার গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধেও সংস্কারকাজে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। চার অর্থবছরে ৪৪ কোটি টাকা: নিরীক্ষার দাবি ঢাকা মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের আওতায় চারটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কারকাজে চার অর্থবছরে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানোর তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে কয়েক কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, কয়েক বছরের কাজের বিবরণ তুলনা করলে একই ধরনের সংস্কারকাজ বারবার করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এসব কাজের স্থায়িত্ব, প্রকৃত প্রয়োজন এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই না করে শুধু বিল ও কাজ সমাপ্তির সনদের ভিত্তিতে অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হলে অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: আগের সংস্কারকাজের পর একই স্থানে পুনরায় কাজের প্রয়োজন কেন হয়েছে, প্রতিটি প্যাকেজের ব্যয় নির্ধারণে কী প্রাক্কলন অনুসরণ করা হয়েছে, কাজের পরিমাপ কে যাচাই করেছেন এবং অর্থ পরিশোধের আগে বাস্তব কাজ পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে নিয়মিত সংস্কারকাজের আড়ালে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বা ভুয়া বিলের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সহজ হবে। কর্মকর্তাদের বক্তব্য কী অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী এবং মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কাজ না করে বিল দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং সব নিয়ম মেনেই সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যের বিপরীতে অভিযোগকারীরা নথি যাচাই ও সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র, প্রকৃত কাজের পরিমাণ এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে সরকারি অর্থে সংস্কারকাজের ক্ষেত্রে শুধু দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান কিংবা কাজ সমাপ্তির সনদ থাকলেই ব্যয়ের যথার্থতা নিশ্চিত হয় না। বরং প্রকৃত কাজের পরিমাণ, ব্যবহৃত উপকরণ, কাজের মান, নির্ধারিত ব্যয় এবং অর্থ পরিশোধের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে: ১. নথি যাচাই: প্রতিটি প্যাকেজের প্রাক্কলন, দরপত্র, কার্যাদেশ, মাপবই, বিল-ভাউচার ও কাজ সমাপ্তির সনদ পরীক্ষা। ২. সরেজমিন পরিদর্শন: যেসব ভবন, ছাদ, ড্রেন, ফ্লোর ও আবাসিক স্থাপনায় কাজ দেখানো হয়েছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং কাজের বাস্তব অস্তিত্ব যাচাই। ৩. একই কাজের পুনরাবৃত্তি পরীক্ষা: একাধিক অর্থবছরের কাজের বিবরণ মিলিয়ে একই স্থানে একই ধরনের সংস্কারের যৌক্তিকতা নির্ধারণ। ৪. দরপত্র ও স্বার্থের সংঘাত যাচাই: সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, দরপত্রে প্রতিযোগিতা এবং কার্যাদেশ প্রদানের প্রক্রিয়া পরীক্ষা। ৫. আর্থিক নিরীক্ষা: বিল অনুমোদন, অর্থ পরিশোধ এবং কমিশন লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি। সংস্কারের নামে ব্যয় দেখানো অর্থে বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, আর কতটুকু ব্যয়ের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে—তার উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে নথি যাচাই, সরেজমিন পরিদর্শন এবং স্বাধীন নিরীক্ষার ওপর।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ২০২৫–২৬ অর্থবছরের রাজস্ব বাজেটের আওতায় বিভিন্ন ভবনের মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের জন্য আহ্বান করা প্রায় দেড় কোটি টাকার একটি ই-জিপি টেন্ডারকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব দেওয়া একাধিক প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি দরদাতা একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সরকারের প্রায় ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ৩২ হাজার টাকা। টেন্ডারে মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ‘এম/এস যমুনা প্রকৌশলী’ প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ২৬ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯২ টাকা দরপ্রস্তাব দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতাদের মধ্যে ছিল। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম ১৪ জন সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে ১৫তম অবস্থানে থাকা ‘নিশিত বসু’ নামের প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এ সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের প্রায় ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। দ্রুত মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন টেন্ডার-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০২৬ সালের ২ জুন। দরপত্র দাখিল ও উন্মুক্ত করার নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৮ জুন। এরপর মাত্র ১২ দিনের মধ্যে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে মাত্র দুই কার্যদিবস হাতে রেখে এত বড় অঙ্কের টেন্ডার মূল্যায়ন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পিপিআর লঙ্ঘনের অভিযোগ অভিযোগে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০০৮ অনুসরণ না করে সর্বনিম্ন দরদাতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, ৫ শতাংশ অগ্রিম কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদ ইমাম ই-জিপি পোর্টালের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে নিজের হাতে রেখে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছেন। দায়িত্ব নিয়ে ভিন্নমত এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মোখলেসুর রহমান বলেন, ক্রয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তিনি হলেও পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদ ইমাম। অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদ ইমাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "নিয়ম মেনেই টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। এসএলটি অনুযায়ী ‘নিশিত বসু’ প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। অনলাইনে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।" তিনি আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জুন ক্লোজিংয়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে। বিল পরিশোধের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। প্রশাসনের ব্যাখ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবির বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজস্ব বাজেটের অর্থ ব্যয় করতে না পারলে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। আগের অভিযোগের প্রেক্ষাপট এর আগে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত এবং একাধিক মামলার ঘটনাও সামনে আসে। নতুন এই টেন্ডার-সংক্রান্ত অভিযোগ সেই প্রেক্ষাপটেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মুন্সীগঞ্জে বাস্তবায়নাধীন বিসিক কেমিক্যাল শিল্প পার্ক প্রকল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণকাজের টেন্ডারকে ঘিরে ঠিকাদার মহল ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এমন একটি সময়ে টেন্ডার আহ্বান করেছে, যখন ঈদুল আজহা উপলক্ষে দীর্ঘ সরকারি ছুটি থাকায় অধিকাংশ সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী কার্যত প্রস্তুতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। গত ১৮ মে ২০২৬ তারিখে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পোর্টালে বিসিক কেমিক্যাল শিল্প পার্ক, মুন্সীগঞ্জ (প্রকল্প আইডি-২২৪২৭৮৯০০) প্রকল্পের অধীনে দুটি পৃথক টেন্ডার আপলোড করা হয়। এর মধ্যে টেন্ডার আইডি-১২৭৮২৩০ (এপিপি আইডি-২১৮৩৫২, রি-টেন্ডার্ড আইডি-১২০৮১৪৬) এর মাধ্যমে "Construction of Jetty" এবং টেন্ডার আইডি-১২৭৮৩৩৭ (এপিপি আইডি-২১৮৩৫২, রি-টেন্ডার্ড আইডি-১২০৮১২০) এর মাধ্যমে "Construction of Dumping Yard and Incinerator" কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। উভয় টেন্ডারই প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মাদ হাফিজুর রহমানের নামে প্রকাশিত হয়। সময়সীমা নিয়ে আপত্তি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, পিপিআর অনুযায়ী ন্যূনতম সময়সীমা অনুসরণ করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় টেন্ডার প্রস্তুত ও জমাদানের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা হয়নি। তাদের দাবি, ১৮ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঈদুল আজহা উপলক্ষে দীর্ঘ সরকারি ছুটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ সময়ে সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ থাকার পাশাপাশি অধিকাংশ ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী ও ঠিকাদার পরিবার নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করেন। ফলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ, কারিগরি প্রস্তাব প্রস্তুত এবং আর্থিক প্রস্তাব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বাস্তব জটিলতা তৈরি হয়। কয়েকজন আগ্রহী ঠিকাদার অভিযোগ করেন, সময় নির্ধারণের ধরন এমন ছিল যে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থায় অসঙ্গতির অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে যে টেন্ডার নথিতে যোগাযোগের জন্য যে প্রকল্প কার্যালয়ের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে গিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, প্রকল্প পরিচালক মাঝে মধ্যে প্রকল্প এলাকায় এলেও স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন না। তবে এ দাবির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে টেন্ডার নথিতে যোগাযোগের জন্য উল্লেখিত ৯৫৬৭৮৯৪ নম্বরের টেলিফোনটি কার্যকর নয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে দরপত্রদাতাদের জন্য কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণের অন্যতম শর্ত। পুরনো অভিযোগের ছায়া প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মাদ হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অনিয়ম, প্রশাসনিক অসদাচরণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার। তাদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ভুয়া বিল-ভাউচার, ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং মাটি ভরাট কাজের আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও বিভাগীয় কার্যক্রম চলমান ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, বিসিক কর্তৃপক্ষ কিংবা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বক্তব্য নিতে ব্যর্থতা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মাদ হাফিজুর রহমানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ কল এবং খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, কেবল আইনগত ন্যূনতম সময়সীমা অনুসরণ করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়। তাদের মতে, যদি দীর্ঘ সরকারি ছুটি, অকার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা বা সীমিত অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো প্রকৃতপক্ষে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি পর্যালোচনা করা। এখন প্রশ্ন মুন্সীগঞ্জের বিসিক কেমিক্যাল শিল্প পার্ক দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। ফলে এর প্রতিটি ক্রয় কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ঈদের দীর্ঘ ছুটির মধ্যে টেন্ডার আহ্বান, যোগাযোগ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটির সাম্প্রতিক দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—এটি কি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো অনিয়ম রয়েছে? সেই উত্তর খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং তদারকি সংস্থাগুলোর।
বরিশাল অফিস : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঝালকাঠি জেলার শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার মূল্যায়ন নিয়ে অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী দোসর খ্যাত সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে পছন্দসই ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করা হয়েছে। যদিও তাকে সম্প্রতি বরিশাল এলজিইডিতে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে, তবে এখনো তিনি ঝালকাঠিতেই দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঝুলে থাকা ১২টি টেন্ডার ঝালকাঠি এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জেলার প্রায় ৩০টি গ্রুপের টেন্ডারের মধ্যে অধিকাংশের মূল্যায়ন শেষ হলেও এখনো ১২টি টেন্ডারের মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়নি। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে— আইবিআরপি প্রকল্পের গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ জেপি (ঝালকাঠি-পিরোজপুর) প্রকল্প ভিআরআরপি গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন বিডিআইআরডব্লিউএসপি প্রকল্প বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প সাইক্লোন আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প (সিএএফডিআরআইআরপি) প্রায় ১০০ কোটি টাকার এসব প্রকল্পের দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৬ জানুয়ারি ২০২৬। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যের কারণে তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এনওএ জারি, কার্যাদেশ আটকে এদিকে ১৮টি গ্রুপের টেন্ডারের মূল্যায়ন শেষে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) জারি করা হলেও এখনো কোনো কার্যাদেশে স্বাক্ষর করেননি ঝালকাঠি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম সাহাবুদ্দিন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনিকভাবে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। পিপিআর বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এলজিইডি সূত্র বলছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) বিধি ৪৮ অনুযায়ী প্রকিউরমেন্ট প্রসেসিং ও অনুমোদন কার্যক্রম চার সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু শিপলু কর্মকারের দায়িত্বে থাকা টেন্ডারগুলোতে সেই সময়সীমা বহু আগেই অতিক্রম করেছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ১২টি গার্ডার ব্রিজের টেন্ডারে অভিজ্ঞতার স্থানে অন্য ধরনের কাজের সনদ গ্রহণ করে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যদের বিভিন্ন অজুহাতে অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে শিপলু কর্মকার একক প্রভাব বিস্তার করছেন এবং পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। “কমিশন ছাড়া কাজ সম্ভব নয়” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, এনওএ জারি থেকে শুরু করে কার্যাদেশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কমিশন ছাড়া কাজ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদের ভাষ্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে কমিশন দিতে হবে—এমন কথা বলেও অর্থ দাবি করা হয়েছে। মূল্যায়নে বিলম্বের কারণে বেশ কয়েকটি প্যাকেজের টেন্ডারের কার্যকারিতা মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে ঝালকাঠিতে যোগদানের পর থেকেই শিপলু কর্মকার টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তিনি ছাড়া অন্য কাউকে কার্যত সম্পৃক্ত রাখা হয়নি। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ঝালকাঠির প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে আওয়ামী লীগের সময়কার প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন শিপলু কর্মকার। আগৈলঝাড়া ও ভোলায়ও ছিল বিতর্ক এলজিইডির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তিনি বিতর্কের মুখে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে অনুগত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো। পরবর্তীতে ভোলা সদর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানেও ঠিকাদার সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। “অদক্ষ ও অর্থলোভী কর্মকর্তা” এলজিইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, “শিপলু কর্মকারের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, কাজের তদারকিতে ঘাটতি এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়নের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।” তৎকালীন ভোলা জেলার দায়িত্বশীল এক প্রকৌশলীর ভাষ্য, “তিনি মূলত অদক্ষ ও অর্থলোভী কর্মকর্তা। ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থেকে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন।” এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের একজন প্রকল্প পরিচালকও অভিযোগের সুরে বলেন, “আওয়ামী সরকারের সময় গড়ে ওঠা বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।” আরেকজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “শিপলু কর্মকার একজন চরম বিতর্কিত প্রকৌশলী। ঠিকাদারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং কৌশলে অর্থ আদায়ই তার মূল লক্ষ্য।” বদলি নিয়েও প্রশ্ন সম্প্রতি বরিশাল বিভাগীয় শহরের নির্বাহী প্রকৌশল কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে তার পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বিতর্কিত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। শিপলু কর্মকার যা বললেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকার। তিনি বলেন, “এসব কাজের এস্টিমেট ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের। আমি যোগদানের পর টেন্ডারগুলো আহ্বান করায় একটি সিন্ডিকেটের আক্রোশের শিকার হয়েছি। তারা সমঝোতার মাধ্যমে ব্রিজের কাজ নিতে চেয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালের পিপিআর অনুযায়ী কাউকে কাজ দেওয়ার সুযোগ নেই। মূল্যায়নের সময়সীমা ১৫০ দিন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে কারিগরি আপত্তি থাকায় মূল্যায়নে বিলম্ব হয়েছে। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষ হবে।” বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, “শুনেছি আমাকে বরিশালে বদলি করা হয়েছে। তবে এখনো অফিসিয়াল চিঠি হাতে পাইনি। আমার বদলির সঙ্গে এই টেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই।” প্রশাসনের অবস্থান ঝালকাঠি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম সাহাবুদ্দিন বলেন, “মূল্যায়নের পুরো দায়িত্ব সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর। তিনি বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।” তিনি আরও জানান, “সমস্যা নিরসনে জেলা প্রশাসকের সহায়তা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে মিডিয়ার উপস্থিতিতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চিন্তাভাবনা চলছে, যাতে কোনো সন্দেহ বা দ্বিধা না থাকে।” অন্যদিকে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ঝালকাঠি জেলা থেকে ত্রুটিযুক্ত কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে পুনরায় প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকিউরমেন্ট ইউনিটের যাচাই শেষে তা আবার জেলায় ফেরত পাঠানো হবে। এ কারণেই কিছুটা সময় লাগছে বলে তিনি দাবি করেন। প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, ঝালকাঠির টেন্ডার প্রক্রিয়া ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা, মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : নেসকো’র নির্বাহী পরিচালকের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচি । বরাজশাহী ভিত্তিক বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসি (নেসকো)-এর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানব সম্পদ উন্নয়ন) আবু হায়াত মোঃ রহমতুল্লাহর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার কারসাজি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব এ. জে. এম. এরশাদ আহসান হাবিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা এক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নেসকোতে চলমান বিভিন্ন নিয়োগ ও বদলি কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের সাব-স্টেশন অ্যাটেনডেন্ট পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অর্থ লেনদেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, লিখিত পরীক্ষার মাত্র এক দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করে ২১৭ জনকে ভাইভার জন্য ডাকা হয়, যা নিয়ে নিয়োগপ্রত্যাশীদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রতি প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার চুক্তি করা হয়েছে। এছাড়াও বদলি বাণিজ্য, পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা এবং অপছন্দের কর্মকর্তাদের দূরবর্তী এলাকায় বদলির অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উৎকোচের বিনিময়ে পদায়ন ও বদলির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চালিয়ে আসছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাজ নিয়মিত দরপত্র ছাড়াই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার ঘনিষ্ঠজনদের ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। এছাড়া অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বলা হয়, রাজশাহীতে বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট ও জমিসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন আবু হায়াত মোঃ রহমতুল্লাহ। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প ও উন্নয়ন খাত থেকে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চলমান সাব-স্টেশন অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার দাবি জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে আবু হায়াত মোঃ রহমতুল্লাহর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় বিতরণ সংস্থা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড–এর একটি জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) প্রকল্পকে ঘিরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অনিয়ম, অতিমূল্য নির্ধারণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) মোরশেদ আলম খানের নাম। দুদক সূত্র বলছে, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব অনিয়মের পেছনে ডিপিডিসির ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। সেই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছে মোরশেদ আলম খানের নাম। দুদকের চিঠি ও নথি গোপনের অভিযোগ গত ২৩ এপ্রিল দুদক ডিপিডিসিকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জমা দিতে বলে। চিঠিতে বিদেশি ও দেশি ঠিকাদারদের সঙ্গে সম্পাদিত মূল ও সংশোধিত চুক্তিপত্র, টেন্ডার ডকুমেন্ট, আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, পেমেন্ট ভাউচার এবং ক্রয়সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিপিডিসি পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরবরাহ করেনি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা এটিকে তথ্য গোপনের সম্ভাব্য প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখছেন। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে টেন্ডার প্রক্রিয়া ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের পরিবর্তে পূর্বনির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, প্রকৌশল বিভাগে মোরশেদ আলম খানের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে আর কোনটি বাদ পড়বে—তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হতো তার সিদ্ধান্তে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের জন্য টেন্ডারের শর্তও বিশেষভাবে সাজানো হয়েছিল। বিনিময়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওভার ইনভয়েসিং ও অর্থ পাচারের সন্দেহ তদন্তে উঠে এসেছে, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দাম দেখানো হয়েছে। অনুসন্ধানকারীরা ধারণা করছেন, ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে। যেহেতু প্রকল্পটি জিটুজিভিত্তিক, তাই আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের সুযোগ ব্যবহার করে অর্থ পাচারের পথ সহজ করা হয়েছিল বলেও সন্দেহ করছে দুদক। তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পে যেসব সরঞ্জাম আমদানির দাবি করা হয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর পরিমাণ ছিল অনেক কম। আবার কিছু যন্ত্রপাতির মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অথচ বিল পরিশোধ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের পণ্যের দামে। মাঠপর্যায়ে মিলেনি প্রকল্পের কাজ দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। প্রকল্পের কিছু কাজ কাগজে শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মাঠপর্যায়ের তদন্তে কোথাও সাবস্টেশন নির্মাণ অসম্পূর্ণ, কোথাও বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন হয়নি, আবার কোথাও যন্ত্রপাতি স্থাপনের তথ্য থাকলেও বাস্তবে তা অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব কাজের বিপরীতে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, ভুয়া বিল-ভাউচার ও জাল নথিপত্র ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। “অদৃশ্য বলয়” ও ক্ষমতার নেটওয়ার্ক ডিপিডিসির একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করেছে, দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৌশল বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন মোরশেদ আলম খান। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে তার অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হতো না। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, ডিপিডিসিতে একটি “অদৃশ্য বলয়” তৈরি হয়েছিল, যেখানে কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও ঠিকাদার মিলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের ঘনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রিত হতো। ব্যক্তিগত সম্পদও তদন্তের আওতায় দুদক এখন শুধু প্রকল্প দুর্নীতিই নয়, মোরশেদ আলম খানের ব্যক্তিগত সম্পদের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীরা তার ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, বিদেশ সফর, পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করছেন। আয় ও সম্পদের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের লেনদেনকে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্পের বিল ছাড়ের সময়ের সঙ্গে কিছু আর্থিক লেনদেনের মিল পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা বিদ্যুৎ খাত বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সেবার মান সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি। বরং একই ধরনের প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ব্যয় দেখানোর অভিযোগ বহুদিনের। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, জিটুজি প্রকল্পে অনেক সময় স্বচ্ছতা কম থাকে। কারণ সরকার-টু-সরকার চুক্তির আড়ালে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার প্রক্রিয়া সীমিত হয়ে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। ডিপিডিসির প্রকল্পেও একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। “ভিন্নমত দমন” ও প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ ডিপিডিসির একাধিক সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললে কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক চাপ ও বদলির মুখে পড়তে হতো। ফলে অনেক কর্মকর্তা অনিয়ম দেখেও নীরব থাকতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কী বলছে দুদক দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডিপিডিসির বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে এবং তদন্ত শেষে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত আদালতে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্ত চলমান এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা বিশ্লেষকদের মতে, ডিপিডিসির ২১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে ওঠা অভিযোগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতের শাসনব্যবস্থা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ওপর বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তাদের মতে, শুধু তদন্ত করলেই হবে না—প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। নইলে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির এই চক্র থামানো কঠিন হবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) স্থাপন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার এই উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং প্রকল্পের সাবেক পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, অতিমূল্যে ফার্নিচার ক্রয়, দ্বৈত টিএ/ডিএ বিল উত্তোলন, কমিশন বাণিজ্য, অবৈধ অগ্রিম উত্তোলন এবং সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত বাসার আসবাব কেনাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যেভাবে শুরু হয় প্রকল্প “রাবিপ্রবি স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত)” প্রকল্পের আওতায় একটি একাডেমিক ভবন, একটি প্রশাসনিক ভবন এবং ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি তিনতলা আবাসিক হল নির্মাণকাজ চলছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান আবদুল গফুর। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। ফার্নিচার ক্রয়ে ‘অস্বাভাবিক’ ব্যয় প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফার্নিচার কেনার ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এ খাতে অন্তত ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে একটি টেবিলের প্রকৃত মূল্য প্রায় ৮০ হাজার টাকা হলেও বিল ভাউচারে সেটির দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একই ধরনের আসবাবপত্র স্থানীয় বাজারে যে দামে পাওয়া যায়, প্রকল্পে তার দ্বিগুণ-তিনগুণ মূল্য দেখানো হয়েছে।” টিএ/ডিএ বিলেও অনিয়মের অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টিএ/ডিএ বিল গ্রহণের পরও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সফরের নামে দ্বিতীয়বার অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। নথিপত্রে দেখা যায়, এভাবে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, একই সফরের জন্য একাধিক খাত দেখিয়ে বিল সমন্বয় করা হয়েছে। টেন্ডারে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ চারটি ভবনের নির্মাণ টেন্ডার অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে এক শতাংশ হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এভাবে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। কয়েকজন ঠিকাদার এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন বলেও জানা গেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক নির্মাণের নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৩৭ লাখ টাকা উত্তোলন এবং পরিকল্পিত বনায়নের নামে ছবি উপস্থাপন করে আরও ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা উত্তোলনের তথ্যও মিলেছে। সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত বাসার আসবাব? আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে নিজের বাসার জন্য আসবাবপত্র কেনা। অভিযোগে বলা হয়েছে, জয়নাল নামে এক ঠিকাদারের মাধ্যমে তার বাসার জন্য আলমিরা, ফাইল কেবিনেট, চেয়ার-টেবিল এবং খাটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কেনা হয়। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো রসিদ বা সরবরাহ নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অগ্রিম উত্তোলনে অনিয়ম প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে বড় অঙ্কের অগ্রিম টাকা উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে, যদিও প্রকল্প নীতিমালায় এ ধরনের অগ্রিম গ্রহণের বিধান নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী— মার্শাল চাকমার নামে উত্তোলন করা হয় ১৪ লাখ ৭ হাজার ৩২৮ টাকা নিশান চাকমার নামে ১২ লাখ ৯ হাজার টাকা সেকশন অফিসার আবদুল হকের নামে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫০ টাকা মঞ্জুরুল ইসলামের নামে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৮ টাকা এছাড়া আবদুল গফুর নিজের নামেও ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫২২ টাকা উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি নথিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি বলেও জানা গেছে। নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন ২০১৭ সালে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন আবদুল গফুর। তার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, বয়সসীমা অতিক্রম এবং নন-টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও তিনি ওই পদে নিয়োগ পান। এছাড়া তার শিক্ষাজীবনে দুটি তৃতীয় বিভাগ ছিল এবং এর আগে কোনো সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতাও ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, তৎকালীন রেজিস্ট্রার অঞ্জন কুমার চাকমার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করা হয়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ? অভিযোগ রয়েছে, এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পাহাড় কাটার অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় আসামিও হন আবদুল গফুর। সাময়িক বরখাস্ত ও পাল্টা অভিযোগ চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের জরুরি সভায় আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত আদেশে তার বিরুদ্ধে আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়। বরখাস্তের পরদিনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) চিঠি দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। ওই চিঠিতে তিনি নিজেকে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। পরে বরখাস্ত আদেশ স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করলেও আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। উপাচার্যের বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমান বলেন, “রাবিপ্রবি স্থাপন প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আবদুল গফুরকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সতর্ক না হয়ে বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করেন।” তিনি আরও বলেন, “বহিষ্কারের পরও আবদুল গফুর ব্যাংক থেকে প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবদুল গফুরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল এবং খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্পষ্ট হতে পারে।
শীর্ষনিউজ: আওয়ামী আমলে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেনাকাটায় কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। সে সময়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাইন্স হাউজের বিরুদ্ধে হাসপাতালের ১০৫ কোটি টাকার কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। তারপরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৭৬ কোটি টাকার আরেকটি কাজ এই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ছক সাজিয়েছিল একই দুর্নীতিবাজ চক্র। তবে কারসাজি করে সাইন্স হাউজকে কাজ দেওয়া হচ্ছেÑ এমন তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। একই লটে ৭০৩ ধরনের পণ্য বিএনপি আমলে এবার বাতিল হওয়া সেই দরপত্রের একই কারসাজিতে আবারও নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ক্রয় তালিকায় একই লটে অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে টেলিভিশন, ঘড়িসহ ৭০৩ ধরনের পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) পরিপন্থি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এই বিষয়ে প্রথমবার দরপত্র আহবান করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণির পণ্য একত্রে রাখার কারণে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। একাধিক প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগে নিম্নমানের স্পেসিফিকেশন, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেল উল্লেখ, মাত্র দুই বছরের ওয়ারেন্টি এবং উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বদলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন গ্রহণযোগ্য করার মতো শর্তের কথা বলা হয়। এই পটভূমিতে তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর দরপত্রটি বাতিলের সিদ্ধান্ত দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ নতুন আহ্বান করা দরপত্রে আগের একই ধরনের শর্ত বহাল রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত মাসের ৬ এপ্রিল দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল। এতে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। দরপত্রে নেই গুণগত মান, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত দরপত্রের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একই লটে তালিকায় সিসিইউ বেড, কার্ডিয়াক মনিটর, হিমোডায়ালাইসিস মেশিন, অ্যানেসথেশিয়া যন্ত্র, এক্স-রে ইউনিটের পাশাপাশি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, জেনারেটর, এমনকি টেলিভিশন ও ঘড়িও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এত বৈচিত্র্যময় পণ্য এক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে কোনো একক প্রতিষ্ঠান সব সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে না। এতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া দরপত্রে অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে গুণগত মান, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত নেই। ভারী ও সংবেদনশীল চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যেখানে সাধারণত পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি চাওয়া হয়, সেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র দুই বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত না থাকলে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সরবরাহ ও স্থাপনের পরপরই ওয়ারেন্টি কার্যকর হওয়ায় দক্ষ জনবল না থাকলে অনেক যন্ত্র ব্যবহার না করেই ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে পারে, যা সরকারি অর্থের অপচয়। অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, দরপত্রে কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, মডেল, উৎপত্তিস্থল ও কোড উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অন্যান্য যোগ্য সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হয়। দেশের অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেখানে পরীক্ষিত উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে কম পরিচিত ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক কেন, তা স্পষ্ট নয়। ‘পিপিআর’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ হাসপাতালের কারিগরি কমিটির দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিটির অদক্ষতা বা সীমাবদ্ধতার কারণে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনার পথ সুগম হয়েছে। ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেইন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের সহকারী প্রকৌশলী মাইনুর শুভ বলেন, এক লটে ৭০৩ ধরনের পণ্য কেনা পিপিআরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাতিল হওয়ার পর নতুন করে বিধি মেনে দরপত্র আহ্বান করা উচিত। এর আগে ব্লাড ব্যাংক ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি কেনায় প্রায় ৯৬ কোটি টাকার ৯টি দরপত্র আহবান করা হয়। সব কাজ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে পরে অভিযোগ ওঠে, নিম্নমানের পণ্যে বিদেশি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়া উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। এতে ভবিষ্যতে নিরীক্ষা আপত্তি ও দুর্নীতির মামলার ঝুঁকি রয়েছে। তাদের পরামর্শ, প্রয়োজনভিত্তিক আলাদা লটে বিভাজন করে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা না হলে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হবে। প্রকল্প পরিচালক এস এম কবির হোসেন বলেন, দরপত্র আহবান করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। বাতিল হওয়া দরপত্রের শর্তেই কেন নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলো- জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। হাসপাতালটিকে জিম্মি করে রেখেছে আওয়ামী দুর্নীতিবাজ চক্র পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পে আওয়ামী সরকারের আমলে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। ৯টি প্যাকেজে প্রায় ১০৫ কোটি টাকার কেনাকাটা হয়। নানা রকমের অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ৯টি প্যাকেজেরই কার্যাদেশ দেওয়া হয় বহুল আলোচিত, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজকে। কিন্তু দুই বছর আগে বিল পরিশোধ করলেও সেইসব মালামাল এখনো পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে, তাতে ইউরোপ-আমেরিকার স্টিকার ও সিল ব্যবহার করেছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই একই ঠিকাদারকে আবারও ৭৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছিল। টেন্ডারের শুরুতেই ভয়াবহ রকমের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। পিপিআর-এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা এক্ষেত্রে চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়। টেন্ডারের এসব গুরুতর অনিয়মকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ দেওয়া হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখিত নির্দেশও দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু তারপরও দুর্নীতিবাজচক্রের তৎপরতা থামেনি। এর কারণ হলো, তদন্তের পরে টেন্ডার বাতিল হলেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রত্যেকেই বহাল-তবিয়তে রয়ে গেছেন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের অন্যতম কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প পায়রা বন্দরে একটি মোবাইল হারবার ক্রেন (এমএইচসি) কেনাকে ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রশ্নে বিতর্কের মুখে পড়েছে। পটুয়াখালীতে অবস্থিত এই বন্দরের জন্য ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে মোবাইল হারবার ক্রেন উৎপাদনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং গত এক দশকে বিভিন্ন দেশে অন্তত ১০টি ক্রেন সরবরাহের প্রমাণ দেখাতে হতো। পাশাপাশি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের সন্তোষজনক সনদ এবং পারফরম্যান্স রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। তবে অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত চীনা কোম্পানি এক্সসিএমজি (XCMG)-এর ক্ষেত্রে এসব শর্ত যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়নি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাদের ওয়েবসাইটে এই ধরনের ক্রেন উৎপাদন বা আন্তর্জাতিক সরবরাহের উল্লেখযোগ্য রেকর্ড পাওয়া যায় না। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ‘এক্সসিএমজি-এইচপি’ নামের একটি জয়েন্ট ভেঞ্চারকে নির্বাচিত করা হয়। প্রস্তাবিত মডেল ‘XMHC 3840’-এর মূল্য ধরা হয়েছে ৩৪ লাখ ৪২ হাজার ৬২২ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪২ কোটি টাকা। স্থানীয় খরচ যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৪২ কোটি ১৯ লাখ টাকারও বেশি। বন্দর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছে। তাদের দাবি, দরপত্রের নথিপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হলে অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ঝুঁকির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পায়রা বন্দরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে ব্যবহৃত সরঞ্জামের নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞতাহীন বা কম সক্ষম কোম্পানি থেকে যন্ত্রপাতি কেনা হলে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং অপারেশনাল কার্যক্রমে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাপী এই ধরনের ক্রেন উৎপাদনে ইতালির Gottwald, জার্মানির Liebherr এবং চীনের ZPMC-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সুনাম থাকলেও তাদেরকে এই দরপত্রে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের আরেক চুক্তি এমএইচসি ক্রয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই আরও একটি বড় আর্থিক চুক্তির তথ্য সামনে এসেছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ‘এইচপি-এনজে’ জয়েন্ট ভেঞ্চারের সঙ্গে দুটি শিপ-টু-শোর (STS) ক্রেন সরবরাহের চুক্তি করেছে। প্রতিটি ক্রেনের মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ ডলার, যা মোট প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা। স্থানীয় ব্যয়সহ প্রকল্পটির মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৫৮ কোটি টাকার বেশি। এই ক্রয় প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কর্তৃপক্ষের নীরবতা অভিযোগের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংশ্লিষ্ট সদস্যরা দায়িত্ব এড়িয়ে প্রকল্প পরিচালকের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তবে অভিযুক্ত প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞ মত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “দরপত্রের শর্ত পূরণ না হলে কার্যাদেশ বাতিল করে পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।” তিনি আরও বলেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম বাড়তে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের সরকারি নির্মাণ খাতের অন্যতম সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মো. ফজলুল হক মধুকে ঘিরেও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল প্রদান এবং ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ভুয়া বিল উত্তোলন, কাজের অগ্রগতি ছাড়াই বিল প্রদান, এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কমিশন গ্রহণের মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। কিছু কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ছাড়াই বিল ছাড়ের ঘটনাও ঘটেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল প্রদানের অভিযোগও ওঠে। এছাড়া আগারগাঁওয়ে অবস্থিত একটি সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে, যেখানে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অতিরিক্ত বিল অনুমোদনের কথা বলা হয়। এই ঘটনাগুলো নিয়ে জনমাধ্যমে আলোচনা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং পরবর্তীতে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়। এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একসময় এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল বলে জানা গেলেও সেই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা বলছেন, এ ধরনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
বরিশাল অফিস : বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, আইটি অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদনে অন্তত ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে প্রায় ১০ জনের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেলের নাম। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো এবং ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কাজ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। দুদক এখনো কোনো মামলা দায়ের করেনি এবং অনুসন্ধান প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে এ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন দায়িত্ব গ্রহনের পরই সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষনা দিয়েছেন।তিনি বিসিসিতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য সোচ্চার রয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধান: কীভাবে শুরু হলো তদন্ত দুদক সূত্রে জানা যায়, বরিশাল সিটি করপোরেশনের কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়। তদন্তের আওতায় আনা হয় আইটি প্রকল্প, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা ব্যয়। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ৯ ও ১০ জুলাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তাদের সম্পদের বিবরণ, প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। আরও পড়ুন: বিসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রোমেল চাকুরির আড়ালে ঠিকাদারও দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “প্রাথমিক পর্যায়ে অনিয়ম পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আইটি ও ডিজিটাল প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।” তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, অনুসন্ধান এটি কেবলমাত্র পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করে। অভিযোগের কেন্দ্রে কে আহসান উদ্দিন রোমেল? বরিশাল সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেল দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। অভিযোগপত্র ও একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, তিনি একই সঙ্গে আইটি সংশ্লিষ্ট কিছু দায়িত্বে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং কিছু প্রকল্পে ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত থেকেছেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— * সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে প্রকৃত কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল দেখানো * অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থায় অনিয়ম ও বিলম্ব * বিভিন্ন আইটি প্রকল্পে বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো * ব্যক্তিগত আইটি প্রতিষ্ঠান পিপলো বিডি দিয়ে ব্যবহার করে প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার * সরকারি প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন ব্যয়ে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন এসব অভিযোগ বিভিন্ন অভিযোগকারী ও অভ্যন্তরীণ নথির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা যায়। আইটি প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ অভিযোগপত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের ডিজিটালাইজেশন প্রকল্পগুলোকে। সূত্রের দাবি অনুযায়ী, অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বা মাঝপথে ব্যাহত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বাস্তবায়নে যে প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত ছিল, তাদের কাজের বিল ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে অনিয়ম হয়েছে। একটি অভিযোগে বলা হয়, একটি স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করলেও যথাযথ বিল না পাওয়ার অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে, পরবর্তীতে সেই প্রকল্পে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে পুনরায় বাজেট প্রস্তাব করা হয় বলে দাবি করা হয়। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্পের বাস্তব ব্যয় এবং প্রস্তাবিত বাজেটের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। যেখানে বিশেষজ্ঞদের মতে কিছু কাজ তুলনামূলক কম খরচে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল, সেখানে কয়েক কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়। সিসিটিভি প্রকল্প: অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ সিটি করপোরেশনের সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সংখ্যক ক্যামেরা দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল তোলা হয়েছে এবং প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, প্রকল্পের কাজের পরিমাণ এবং বিলের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো মূল্যায়ন বা যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগ অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আহসান উদ্দিন রোমেলের একটি ব্যক্তিগত আইটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্পে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু প্রকল্পে ঠিকাদার নির্বাচন, বিল অনুমোদন এবং কাজের তদারকিতে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আদালতের রায় বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি। প্রচার-প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রম—যেমন ব্যানার, ফেস্টুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা—এসব খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব কাজের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিল দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, নির্দিষ্ট একটি প্রচারণা কাজে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বতন্ত্র আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত সূত্রগুলো বলছে, বিসিসির অভ্যন্তরে কিছু প্রকল্প ও বিল অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ছিল। কিছু প্রকল্পে একাধিক পক্ষের সম্পৃক্ততা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। একটি সূত্র দাবি করে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদন ও বিল আটকে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা পরবর্তীতে অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সূত্রগুলো আরও জানায়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে কিছু প্রকল্প স্থগিত এবং পরে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ এবং এর সঙ্গে সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ সম্পর্কিত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ছাত্র আন্দোলন ও জনমতের চাপ বরিশালে সম্প্রতি কিছু ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন দুর্নীতির অভিযোগে দাবি তুলেছে। তাদের প্রধান দাবি—অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একজন আন্দোলনকারী বলেন, “আমরা চাই স্বচ্ছ তদন্ত হোক। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।” তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপ কী? দুদক সূত্র বলছে, অনুসন্ধান প্রতিবেদন এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কমিশন অনুমোদন দিলে মামলা দায়ের হবে। অভিযুক্তদের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে আহসান উদ্দিন রোমেল বা সংশ্লিষ্ট অন্যদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাধারণত এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তদন্ত চলাকালে মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন । অভিযোগ বনাম প্রমাণ দুর্নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং অভিযোগপত্র প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য হিসেবে গণ্য হয়। এগুলোকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অডিট রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রয়োজন। একজন প্রশাসনিক বিশ্লেষক বলেন, “সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে, কিন্তু সব অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়া অপরিহার্য।” বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্প ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা এখনো তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান প্রতিবেদন এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি চূড়ান্ত রায় নয়। আহসান উদ্দিন রোমেলসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী আইনি তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর। ততক্ষণ পর্যন্ত এসব অভিযোগকে “অভিযোগ” হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে—যার সত্যতা বা অসত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন আইনি প্রক্রিয়ার হাতে।
বরিশাল অফিস : বাবুগঞ্জ উপজেলা—দক্ষিণাঞ্চলের এই জনপদে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বাবুগঞ্জ এলজিইডি উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলীম। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নিম্নমানের কাজ, এমনকি কাজ না করেই বিল উত্তোলনের মতো অভিযোগ এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে—যেখানে উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশই সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি বলে অভিযোগ। বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের “অদৃশ্য দুর্নীতির কাঠামো”। সামান্য কাজ,বরাদ্দ ২ লাখ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে একটি প্রকল্পের সিপিসি (কমিউনিটি প্রকিউরমেন্ট কমিটি) হিসেবে স্থানীয় ইউপি সদস্য জিয়াদুলকে দায়িত্ব দেন উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলীম। ওই প্রকল্পের আওতায় দপ্তরের টয়লেট মেরামত ও আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য প্রায় ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে খুব সামান্য কাজ করেই পুরো বরাদ্দের টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন এদিকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব খাত থেকে উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এই বরাদ্দের আওতায় উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে ৮৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রকল্পেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত টেন্ডার প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে এসব কাজ বণ্টন করা হয়েছে। পুরনো কাজ দেখিয়েই বিল উত্তোলন অভিযোগের তালিকায় রয়েছে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের টাইলস মেরামতের একটি কাজও। প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার এই প্রকল্পটি টেন্ডারের মাধ্যমে ‘বিডি ইঞ্জিনিয়ারিং’নামের একটি প্রতিষ্ঠান পেলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ করতে না দিয়ে পুরনো কাজ দেখিয়েই বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, কেদারপুর এইচএস জামে মসজিদের ওজুখানা নির্মাণে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও যথাযথ কাজ সম্পন্ন না করেই ‘চৌধুরী কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে বিল প্রদান করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে অনিয়মের অভিযোগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রহমতপুর ইউনিয়নের একটি ছোট প্রকল্পকে ঘিরেই প্রথম অভিযোগের সূত্রপাত। সূত্র অনুযায়ী, ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সিপিসি (কমিউনিটি প্রকিউরমেন্ট কমিটি) গঠন করা হয়। ওই কমিটির দায়িত্ব পান স্থানীয় ইউপি সদস্য জিয়াদুল। প্রকল্পটির আওতায় উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের টয়লেট সংস্কার এবং কিছু আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য প্রায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে কাজের পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত—অথচ পুরো বরাদ্দের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কাজের নামে সামান্য রং করা আর কয়েকটা জিনিসপত্র আনা হয়েছে। কিন্তু বিল দেখানো হয়েছে পুরো প্রকল্পের। এটা চোখে পড়ার মতো বিষয়।” এই অভিযোগ শুধু একটি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটি বৃহত্তর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার প্রকল্প—প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবায়ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব খাত থেকে বাবুগঞ্জ উপজেলায় উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এই অর্থের আওতায় উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে মোট ৮৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। কাগজে-কলমে এসব প্রকল্পের তালিকা বিস্তৃত—গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, ছোটখাটো সংস্কার কাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, অফিস মেরামতসহ নানা উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ উঠেছে— * অধিকাংশ প্রকল্পেই কাজের মান নিম্নমানের * নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন হয়নি * কোথাও কোথাও কাজ আংশিক বা অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে * কিছু ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব প্রকল্পে টেন্ডার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন স্থানীয় ঠিকাদার বলেন, “অনেক কাজই ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে হয়নি। প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ঠিকাদারি বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়নি।” টেন্ডার প্রক্রিয়া উপেক্ষা—কারা লাভবান? সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো উন্মুক্ত টেন্ডার প্রক্রিয়া। কিন্তু বাবুগঞ্জের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে—এই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে— * প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় কাজের মান কমে গেছে * প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না হওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে * কিছু ক্ষেত্রে “কাগুজে কাজ” দেখিয়ে বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণ—কারণ উন্নয়নের সুফল তারা পায় না। ‘বিডি ইঞ্জিনিয়ারিং’ প্রকল্প: কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলনের অভিযোগ উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের টাইলস মেরামতের একটি প্রকল্পকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার এই প্রকল্পটি টেন্ডারের মাধ্যমে ‘বিডি ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পায়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী— * সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি * পুরনো কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে * প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ নেই এ বিষয়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা দেখেছি অফিসের পুরনো টাইলসই আছে। নতুন করে কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। কিন্তু বিল হয়ে গেছে—এটা রহস্যজনক।” ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও অনিয়ম? কেদারপুর এইচএস জামে মসজিদের ওজুখানা নির্মাণ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এই প্রকল্পের জন্য ১ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী— * কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ করা হয়নি * নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে * কাজের প্রকৃত অগ্রগতি ছাড়াই বিল প্রদান করা হয়েছে * ‘চৌধুরী কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিল পেয়েছে মসজিদ কমিটির এক সদস্য বলেন, “ওজুখানার কাজ ঠিকমতো হয়নি। আমরা বারবার বলেছি, কিন্তু কাজ শেষ না করেই বিল নিয়ে নেওয়া হয়েছে।” প্রশাসনিক শূন্যতা: অনিয়মের সুযোগ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাবুগঞ্জ উপজেলার কিছু ইউনিয়নে চেয়ারম্যান না থাকায় প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। স্থানীয়দের মতে, এই পরিস্থিতিই অনিয়মের অন্যতম প্রধান কারণ। এই সময়ে— * প্রকল্প তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ে * সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহিতা কমে যায় * স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয় ফলে কিছু অসাধু ব্যক্তি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম করার সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ। একজন সমাজকর্মী বলেন, “যেখানে তদারকি নেই, সেখানে দুর্নীতি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এখানে সেটাই হয়েছে।” অভিযোগ অস্বীকার প্রশাসনের অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলীম বলেন, “সব কাজই নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি। ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, বিস্তারিত জানতে চাইলে অফিসে এসে ফাইল পর্যালোচনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” স্থানীয়দের দাবি: নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এলাকাবাসীর প্রধান দাবি হলো— * নিরপেক্ষ তদন্ত * প্রকল্পভিত্তিক অডিট * দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা তাদের মতে, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে। একজন প্রবীণ নাগরিক বলেন, “সরকার টাকা দিচ্ছে উন্নয়নের জন্য। কিন্তু যদি সেই টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার না হয়, তাহলে উন্নয়নের কোনো অর্থ থাকে না।” বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: স্থানীয় উন্নয়নে স্বচ্ছতার সংকট বাবুগঞ্জের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং এটি বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিদ্যমান কিছু কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে— * দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা * রাজনৈতিক প্রভাব * স্বচ্ছতার অভাব * জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, সামাজিক অডিট এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে এই ধরনের অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ বাবুগঞ্জ উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ শুধু আর্থিক দুর্নীতির বিষয় নয়—এটি জনআস্থার সঙ্গেও জড়িত। উন্নয়নের নামে যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় কিন্তু তার সুফল জনগণের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— * অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত * স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা * দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। বাবুগঞ্জের মানুষ এখন অপেক্ষায়—তদন্তের ফলাফল কী আসে, এবং প্রশাসন কতটা কার্যকরভাবে এই অভিযোগগুলোর মোকাবিলা করতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সরকারি চাকরির কাঠামোতে “সহকারী প্রোগ্রামার” পদটি সাধারণত মাঝারি পর্যায়ের একটি প্রযুক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এই তুলনামূলক নিম্নপদস্থ অবস্থান থেকেই যদি কেউ বিশাল আর্থিক অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করার মতো গুরুতর অভিযোগের কেন্দ্রে চলে আসে, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়—কীভাবে এবং কার আশ্রয়ে? তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের (ডিওআইসিটি) সহকারী প্রোগ্রামার আনজুম রিয়াসাতকে ঘিরে ঠিক এমনই এক জটিল চিত্র সামনে এসেছে। প্রায় ২০০ কোটি টাকার আত্মসাত, টেন্ডার কারসাজি, তথ্য ফাঁস এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার—এসব অভিযোগে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছেন তিনি। কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব সত্ত্বেও, প্রশাসনিক বদলি আদেশ অমান্য করে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে অবস্থান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় বহাল তবিয়তে থাকার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। চাকরিজীবনের সূচনা ও পরিচয়ের কৌশল ২০১৯ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরে সহকারী প্রোগ্রামার পদে যোগ দেন আনজুম রিয়াসাত। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পর থেকেই নিজের পরিচয় নির্মাণে তিনি একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন—নিজেকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের এক শীর্ষ নেতার ‘ভাগিনা’ হিসেবে উপস্থাপন করা। যদিও বাস্তবে সেই সম্পর্ক ছিল দূরবর্তী—তার মা এবং ওই নেতার মধ্যে ছিল সহপাঠীর সম্পর্ক—তবুও এই “ভাগিনা” পরিচয় দ্রুতই তাকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে আলাদা সুবিধা এনে দেয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে সক্ষম হন। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে তিনি দ্রুত নিজের অবস্থান শক্তিশালী করে তোলেন। এতে করে চাকরির শুরুর দিকেই তিনি এমন কিছু দায়িত্ব ও সুযোগ পান, যা সাধারণত এই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিরল। প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের সূত্রপাত প্রাথমিক পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে করতেই আনজুম যুক্ত হন বিভিন্ন প্রকল্পে, বিশেষ করে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্পে অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর তার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই সময় থেকেই তিনি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা প্রদান এবং আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—টেন্ডার ডকুমেন্ট নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী তৈরি করা এবং গোপন দরপত্র তথ্য আগেই নির্দিষ্ট পক্ষকে সরবরাহ করা। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার লঙ্ঘন নয়, বরং সরাসরি দুর্নীতির আওতায় পড়ে। এই সময়েই তার বিরুদ্ধে প্রথম দফায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং তাকে মূল কর্মস্থল চাঁদপুর সদর উপজেলা কার্যালয়ে বদলি করা হয়। বদলি—কাগজে-কলমে, বাস্তবে নয় ২০২৩ সালের আগস্টে আনজুমকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও, বাস্তবে তিনি খুব বেশি দিন রাজধানীর বাইরে থাকেননি। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। একাধিক সূত্র জানায়, এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক তদবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও একই বছরের জুলাই মাসে আবারও তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়—দেশব্যাপী উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তার ঘাটতি পূরণের অংশ হিসেবে—তবুও সেই নির্দেশও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, আনজুম নিয়মিতভাবে বদলি আদেশ উপেক্ষা করে ঢাকাতেই অবস্থান করেছেন। মাঝে মাঝে কর্মস্থলে গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে ফিরে আসা—এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনিক নজরদারি এড়িয়ে গেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নতুন সুযোগ ২০২৪ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আনজুমের বিশ্ববিদ্যালয়-সংযোগের এক জুনিয়র গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত হন। এই সংযোগকে কাজে লাগিয়ে আনজুম আবারও ঢাকায় সংযুক্তিতে বদলি হন—এইবার জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে। এই পদায়নের মাধ্যমে তিনি আবারও রাজধানীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করেন। শুধু তাই নয়, তার ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকজন সহকর্মীকেও একইভাবে ঢাকায় আনার অভিযোগ রয়েছে। নেটওয়ার্ক গঠন ও প্রভাব বিস্তার ঢাকায় অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর আনজুম দ্রুতই একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ স্থাপন করে তিনি নিজেকে একটি “কেন্দ্রীয় ব্যক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজেকে বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের “মেন্টর” হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি আইসিটি অধিদপ্তরের বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো সামনে আসে, তার মধ্যে রয়েছে: টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া গোপন দরপত্র তথ্য ফাঁস প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এই কার্যক্রমগুলোতে তিনি একাধিক সহযোগীর সহায়তা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ ও দুদকের অনুসন্ধান ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আনজুম রিয়াসাতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়—তিনি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ২০০ কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাত করেছেন, পাশাপাশি তথ্য পাচার এবং সীমাহীন দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে ১২টি বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। তবে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সেই তথ্য এখনও দুদককে সরবরাহ করা হয়নি। এতে করে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক সুরক্ষা ও অভিযোগ ধামাচাপা এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো—আনজুমকে রক্ষা করতে অধিদপ্তরের ভেতর থেকেই চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে অর্থ ও প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী: দুদকের চিঠির জবাব বিলম্বিত করা প্রশাসনিক পদক্ষেপ স্থগিত রাখা বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা এই কর্মকাণ্ডগুলো শুধু একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বদলি এড়ানোর কৌশল দুদকের তদন্তের মুখে আনজুমকে আবার চাঁদপুরে বদলি করা হলেও, বাস্তবে তিনি সেখানে যোগ দেননি। বরং রাজধানীতেই অবস্থান করে বিভিন্ন মাধ্যমে আবার ঢাকায় স্থায়ীভাবে ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় বদলের কৌশলও গ্রহণ করেছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। এই প্রক্রিয়ায় তার সহযোগী হিসেবে কয়েকজন সহকর্মীর নামও উঠে এসেছে, যারা প্রশাসনিকভাবে তাকে সহায়তা করছেন। সামগ্রিক বিশ্লেষণ আনজুম রিয়াসাতের ঘটনাটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন—যেখানে প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক একত্রে কাজ করে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। এই ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: কীভাবে একটি মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তা এত বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মে জড়াতে পারেন? কেন বারবার বদলি আদেশ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি? প্রশাসনের ভেতরে কে বা কারা তাকে সুরক্ষা দিচ্ছেন? তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কী কারণ? দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য এবং প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক—এই তিনটি উপাদান একত্রে আনজুম রিয়াসাতকে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত করেছে। এই ঘটনা শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়—দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে এগোয়, এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হবে। আর যদি যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনাকাটাকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও বাজারদরের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বেশ কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্যের বহু গুণ বেশি দাম দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। অস্বাভাবিক দামের তালিকা অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার টাকার একটি ব্যাগের দাম ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা। একইভাবে ৩ হাজার টাকার একটি কার্ড রিডারের জন্য নেওয়া হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা। সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি দেখা গেছে ক্যামেরা সরঞ্জামে—৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার একটি ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা বডির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা। চারটি ক্যামেরা বডির জন্য মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ক্যামেরা সেট কেনায় সরকারের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা, যেখানে সংশ্লিষ্টদের দাবি—এসব পণ্যের প্রকৃত বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকারও কম। দ্রুত কেনাকাটা, প্রশ্ন তোলা সময়সীমা সংসদের অধিবেশন শুরুর প্রেক্ষাপটে এই কেনাকাটা সম্পন্ন করা হয় অস্বাভাবিক দ্রুততায়। ৩০ দিনের মধ্যে সরবরাহের নির্দেশনা থাকলেও মাত্র ১৯ দিনের মধ্যেই সব পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। ১২ মার্চ সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ২৫ মার্চ ক্রয়াদেশ দেওয়া হয় এবং ১৫ এপ্রিলের মধ্যেই সরবরাহ সম্পন্ন হয়। লেন্স, ফ্ল্যাশ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামে অসঙ্গতি ক্রয় তালিকায় থাকা লেন্সগুলোর ক্ষেত্রেও বড় ধরনের মূল্যবৈষম্য দেখা গেছে। যেমন: ২৪–৭০ মিমি লেন্সের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা, যেখানে বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা। ১৪–২৪ মিমি লেন্স কেনা হয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকায়, বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ১০০–৪০০ মিমি লেন্সের জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, যা বাজারদরের দ্বিগুণেরও বেশি। ছয়টি স্পিডলাইট (ফ্ল্যাশ) কেনা হয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকায়—প্রতিটির দাম ১ লাখের বেশি, যদিও বাজারমূল্য ১০–১৫ হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া মেমোরি কার্ড, ব্যাটারি ও কার্ড রিডারসহ অন্যান্য সরঞ্জামেও একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ সংসদ সচিবালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরবরাহ করা পণ্যের অনেকগুলোই নিম্নমানের। কিছু পণ্যে আলাদাভাবে লোগো লাগানো হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্র্যান্ডের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ কাগজে-কলমে উচ্চমানের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এক কর্মকর্তা দাবি করেন, কিছু পণ্য দেখে মনে হয়েছে রাজধানীর খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রতিক্রিয়া এই সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে ‘সেফ ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উচ্চমূল্যের কারণ হিসেবে ব্র্যান্ড, ভ্যাট ও ট্যাক্স দায়ী। প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, সরকারি কেনাকাটায় এ ধরনের মূল্য “অস্বাভাবিক নয়”। তবে বাজারমূল্যের সঙ্গে বড় ব্যবধান এবং ভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আর মন্তব্য করতে রাজি হননি। দায়িত্ব ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ক্রয়াদেশে স্বাক্ষরকারী এক কর্মকর্তা জানান, একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই কেনাকাটা সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি নতুন হওয়ায় প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সাবেক সচিবের তত্ত্বাবধানেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, যদিও কাগজে সব নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত পেশাদার ফটোগ্রাফারদের মতে, সংসদের মতো একটি সীমিত পরিসরের স্থানে ছবি তোলার জন্য ৪ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যামেরা সেট যথেষ্ট। তাদের ভাষায়, ৫৮ লাখ টাকার সরঞ্জাম কেনা “সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক”। তদন্তের দাবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে পুরো প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও সম্ভাব্য দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্তের ঘোষণা না এলেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল–৩-এর একটি বড় প্রকল্পে প্রায় ১৭ কোটি টাকার বিল অনুমোদনকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এই সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান। অভিযোগকারী ও অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অনুমোদিত বিলের অঙ্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদার আলদ্দিন ওয়াজেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। কী বলা হয়েছে অভিযোগে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে যে পরিমাণ বিল করা হয়েছে, তার বিপরীতে সমপরিমাণ কাজ বা সরঞ্জাম সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নথিতে দেখানো দামের সঙ্গে বাজারমূল্যেরও বড় ধরনের পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগে আরও বলা হয়— বিল অনুমোদনে নিয়মিত যাচাই-বাছাই করা হয়নি কিছু ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে ফাইল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে নথিপত্রে তারিখের অসঙ্গতি রয়েছে যাচাই ছাড়াই পেমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয় সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে। প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ই/এম সার্কেল–৩-এর টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন— নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার নিয়মিত কাজ পেয়ে থাকেন ক্রয় ও সরবরাহ প্রক্রিয়া পূর্বনির্ধারিতভাবে পরিচালিত হয় গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডারে একটি সীমিত গোষ্ঠীর প্রাধান্য দেখা যায় ঠিকাদার আলদ্দিন ওয়াজেদের ভাষ্য, “১৭ কোটি টাকার বিলটি এই প্রভাব বলয়ের আরেকটি উদাহরণ হতে পারে।” তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সরকারি সূত্র কী বলছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ ধরনের বড় অঙ্কের বিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে তা উদ্বেগজনক। অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।” তিনি আরও জানান, টেন্ডার ও বিল প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে, তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রয়োজন। দুদকের প্রতিক্রিয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি প্রকল্পে বড় অঙ্কের আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। তার ভাষায়, “নথিপত্রে বৈষম্য বা আর্থিক অস্বচ্ছতা পাওয়া গেলে তা অনুসন্ধানের আওতায় পড়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হতে পারে।” সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন এদিকে একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে তার সম্পদের পরিমাণের অসামঞ্জস্য রয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে— রাজধানীর মোহাম্মদপুরে প্রায় ৩৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় চারতলা ভবন বনশ্রী-আমুলিয়া এলাকায় জমি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে ঝুঁকির ইঙ্গিত সরকারি অডিট ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট এক বিশেষজ্ঞ বলেন, “তারিখের অসঙ্গতি, যাচাই ছাড়া পেমেন্ট এবং দ্রুত অনুমোদন—এসব উচ্চ ঝুঁকির সংকেত। এগুলো যদি সমন্বিতভাবে ঘটে, তাহলে তা বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।” অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এ ধরনের ঘটনা কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়, এটি প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত প্রয়োজন।” তদন্তের অপেক্ষা অভিযোগের গুরুত্ব এবং আর্থিক পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) অধীন বাস্তবায়নাধীন “বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প” ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে শতাধিক দরপত্র আহ্বান, সময়সীমা না বাড়ানো এবং বিশেষ ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। স্বল্প সময়ে বিপুল টেন্ডার আহ্বান গত ২৬ জানুয়ারি ই-জিপি পোর্টালে ১২৬টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর আগে ডিসেম্বর মাসে প্রায় ১০০টি টেন্ডার আহ্বান ও খোলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগমুহূর্তে অস্বাভাবিক দ্রুততায় এত বিপুলসংখ্যক টেন্ডার আহ্বান ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করে জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ৪ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ই-জিপি সিস্টেম আপগ্রেডেশনের কারণে কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধের কারণে প্রশাসনিক ও ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে কার্যত প্রায় ১০ কার্যদিবস নষ্ট হয়। একাধিক ঠিকাদার অন্তত তিন কার্যদিবস সময় বৃদ্ধির জন্য লিখিত আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্তের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, একযোগে বিপুলসংখ্যক টেন্ডার লাইভ থাকায় প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাস্তবসম্মত ছিল না। এতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের আওতায় মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ২০০ কোটি টাকারও বেশি দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনের আগেই দ্রুত টেন্ডার সম্পন্ন করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস পূর্ব পর্যন্ত চাকরির মেয়াদ থাকতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, ড. ইব্রাহিম খলিলের চাকরির মেয়াদ প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা ও প্রকিউরমেন্ট প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত আবশ্যকতার ক্ষেত্রেও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও তাকে পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র দাবি করেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী একটি চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই এই পদে নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। ঠিকাদারদের বক্তব্য মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটর মো. নেছার উদ্দিন বলেন, “বিএডিসির চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিতভাবে সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছি। কিন্তু সময় বাড়ানো হয়নি। বিপুল সংখ্যক দরপত্র একসাথে থাকায় প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়নি।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, ঘুষ ছাড়া কাজ পাওয়া কঠিন ছিল। তাদের দাবি, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের ব্যাংক হিসাব, স্থাবর সম্পত্তি ও সাম্প্রতিক আর্থিক লেনদেন তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তদন্তের দাবি ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন— দরপত্র মূল্যায়নের পূর্ণাঙ্গ অডিট ই-জিপি ডেটা বিশ্লেষণ দুর্নীতি দমন কমিশন-এর স্বাধীন তদন্ত তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সব অনিয়ম প্রকাশ পাবে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. ইব্রাহিম খলিলের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিগত সরকারের আমলে গণপূর্ত অধিদপ্তর–এ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বহুল আলোচিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন পর্যায়ের বহু প্রকৌশলী বরখাস্ত, বদলি ও শাস্তির মুখোমুখি হলেও অভিযোগ রয়েছে—কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে উঠে এসেছে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল–৩-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল আমিন মিয়ার নাম। টেন্ডার কারসাজি ও দুদকের অভিযান সরকারি একটি অফিস ভবন নির্মাণের প্রায় ১২০ কোটি টাকার প্রকল্পে দরপত্র (আইডি ১১২০৮৫৩) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাতিল হওয়া দরপত্র পুনরায় আহ্বান করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও সামনে আসে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযানে নামে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তদন্তে প্রাথমিক অনিয়মের ইঙ্গিত মিললেও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় দরপত্রটি বাতিল করে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই একই প্রকল্প নতুন আইডি (১২০৭৪৯৯) দিয়ে পুনরায় আহ্বান করা হয়—যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও সুপারিশ গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হয়ে নুরুল আমিন মিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছিল বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি বলেই দাবি সংশ্লিষ্টদের। গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তার বিরুদ্ধে বহুবার অভিযোগ হয়েছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য।” তাদের অভিযোগ—প্রভাব ও অর্থবল ব্যবহার করে অভিযোগগুলো ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। যদিও এই দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব ও পদোন্নতির প্রশ্ন অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি একাধিকবার পদোন্নতি পেয়েছেন। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও তাকে চিহ্নিত করেন অনেক কর্মকর্তা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অবৈধ সম্পদের অভিযোগ নুরুল আমিন মিয়ার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়— রাজধানীর সেগুনবাগিচায় উচ্চমূল্যের ভাড়া বাসায় বসবাস গুলশানে ফ্ল্যাট ক্রয় কুমিল্লায় ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ স্ত্রী ও সন্তানের নামে গাড়ি ও ব্যাংক আমানত সমালোচকদের দাবি, তার ঘোষিত বৈধ আয় ও জীবনযাপনের ব্যয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের চেষ্টা নুরুল আমিন মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে খুদে বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। প্রশ্নের মুখে জবাবদিহিতা সংশ্লিষ্টদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তর–এর সাম্প্রতিক ও পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলো নিরপেক্ষভাবে পুনঃতদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে—দুদকের তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ কতদূর এগোবে, এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।