২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর সমাবেশে চালানো অভিযানের ঘটনায় তদন্ত শেষ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এর তদন্ত সংস্থা। তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে এই ঘটনার প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করে তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। একটি গণমাধ্যমের হাতে আসা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ অন্তত ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সরাসরি গণভবন থেকে অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কারা আছেন আসামির তালিকায় তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার পর যাদের নাম এসেছে তারা হলেন— সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। এছাড়া যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকার, লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর, পুলিশের সাবেক আইজি হাসান মাহমুদ খোন্দকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও পুলিশের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রয়েছে। অভিযানের বর্ণনা তদন্ত প্রতিবেদনে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে সারাদেশ থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের ঢাকায় আসতে দেওয়া হয়। দিনভর বিভিন্ন স্থানে তাদের বাধা ও হয়রানির অভিযোগ তুলে বলা হয়, গণমাধ্যমে ভাঙচুরের খবর প্রচারের মাধ্যমে সমাবেশকে বিতর্কিত করা হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাত ১০টার পর শাপলা চত্বরে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে লাইট নিভিয়ে একদিক খোলা রেখে সমন্বিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘ক্র্যাকডাউন’ শুরু করে। তবে মোট কতজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারেনি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নিহতদের নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমাবেশের পটভূমি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিল, ধর্ম অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সারাদেশ থেকে মাদরাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দিনভর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যদিও ওই সময় সরকারিভাবে বড় ধরনের প্রাণহানির অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল। তদন্তের প্রেক্ষাপট ও গ্রেপ্তার গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ ঘটনায় তদন্ত চেয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে হেফাজতে ইসলাম। জাতীয় নির্বাচনের আগেই তদন্ত সংস্থা তাদের অনুসন্ধান শেষ করেছে বলে জানা গেছে। এ মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন— সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম। আলোচিত এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকার গুলশান-২ এলাকায় অবৈধভাবে ফ্ল্যাট গ্রহণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক-এর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। দুদকের আবেদন এদিন দুদকের সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, টিউলিপ সিদ্দিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো অর্থ পরিশোধ না করেই অবৈধ পারিতোষিক হিসেবে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড-এর কাছ থেকে ফ্ল্যাট গ্রহণ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গুলশান-২ এলাকার রোড নং-৭১-এর বাড়ি নং-৫এ ও ৫বি (বর্তমানে ১১এ ও ১১বি), ফ্ল্যাট নং-বি/২০১ দলিলমূলে নিজের দখলে নেন তিনি। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ মামলার এজাহারে বলা হয়, ফ্ল্যাটটি গুরুতর অনিয়মের কারণে হস্তান্তরযোগ্য ছিল না। তা জানা সত্ত্বেও টিউলিপ সিদ্দিক তার খালা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র প্রভাব খাটিয়ে রাজউকের আইন কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে আমমোক্তার অনুমোদন এবং ফ্ল্যাট বিক্রয়ের অনুমোদন করিয়ে অবৈধ সুবিধা নেওয়া ও দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত হন তিনি। দেশত্যাগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দুদক জানায়, মামলা দায়েরের আগেই টিউলিপ সিদ্দিক দেশত্যাগ করেন এবং মামলার প্রমাণাদি বিনষ্টের চেষ্টা করছেন। এ কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি টিউলিপ সিদ্দিক ও রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা সরদার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৮ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে। মামলার পটভূমি গত বছরের ১৫ এপ্রিল গুলশানের ফ্ল্যাট সংক্রান্ত অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিক, রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ মো. খসরুজ্জামান এবং সরদার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো টাকা পরিশোধ না করেই ফ্ল্যাটটি দখল ও পরবর্তীতে রেজিস্ট্রি করেন। গত ১১ ডিসেম্বর দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৫(ক)/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারায় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় টিউলিপ সিদ্দিক ও সরদার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পূর্বাচল প্লট মামলা এর আগে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির পৃথক তিন মামলায় টিউলিপ সিদ্দিকের দুই বছর করে মোট ছয় বছরের কারাদণ্ড হয়েছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদদের সম্মাননা এবং তৎকালীন শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে ঘোষিত সময়েও জাদুঘর উদ্বোধন সম্ভব হয়নি। এখনো চলছে নির্মাণকাজ—আর সেই কাজকে ঘিরেই বাড়ছে প্রশ্ন ও বিতর্ক। উদ্বোধন হয়নি, প্রবেশ নিষিদ্ধ গত বছরের ৫ আগস্ট উদ্বোধনের ঘোষণা থাকলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ১৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেয় প্রফেসর ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও জাদুঘর এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করছেন বিদায়ী সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। জাদুঘরে প্রবেশাধিকার এখনো সীমিত। সাংবাদিক পরিচয়েও ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলছে না। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুমতি ছাড়া প্রবেশ সম্ভব নয়। অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সহকারী রসায়নবিদ মো. আনিছুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব জানিয়েছেন, “এখন কাউকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। আগামী মাসে উন্মুক্ত করা হবে।” উল্লেখ্য, জাদুঘরটি প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর-এর সঙ্গে সংযুক্ত রাখা হয়েছে, যদিও আলাদা কোনো ওয়েবসাইট বা বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ১১১ কোটি টাকার প্রকল্প ও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি জাদুঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১১ কোটি ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা। শুরুতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইএম (ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল) অংশের কাজ পায় ‘শুভ্রা ট্রেডার্স’ এবং পূর্ত অংশের কাজ পায় ‘দি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’। পরে সমালোচনার মুখে গণপূর্ত বিভাগ পুনরায় দরপত্র আহ্বান করলেও শেষ পর্যন্ত একই প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সুযোগে অনিয়মের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিদায়ী উপদেষ্টার কমিটি গঠন নিয়ে প্রশ্ন দায়িত্ব ছাড়ার দুইদিন আগে নির্মাণকাজ তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার সভাপতি হন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজেই। পদত্যাগের পরও কমিটিতে নাম রেখে নিয়মিত জাদুঘরে যাতায়াত করছেন তিনি। এ বিষয়ে যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) মু. বিল্লাল হোসেন খান জানান, “কমিটিতে নাম থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেন।” তবে পদত্যাগের পরও কমিটিতে দায়িত্ব পালন করার আইনগত ভিত্তি নিয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ফারুকী দাবি করেন, “আমি শুধু কাজটি নির্বিঘ্নে শেষ করার সহায়তা করছি। পুরো কিউরেটোরিয়াল ডিজাইন আমার করা।” নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক জাদুঘর পরিচালনায় ৯৬ জন লোকবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই দ্রুত সময়ের মধ্যে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াও বিদায়ী উপদেষ্টার প্রভাবাধীন—এমন আলোচনা বিভিন্ন মহলে ছড়িয়েছে। যদিও ফারুকী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ৯৯ বছরের লিজ ও প্রশাসনিক কাঠামো গণভবনের সম্পূর্ণ জমি ও স্থাপনা ৯৯ বছরের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ নামে লিজ দেওয়া হয়েছে। জমির আয়তন ১৭.৪৬৭৯ একর। বার্ষিক খাজনা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার টাকা। লিজ দলিলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান স্বাক্ষর করেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে জাদুঘর পরিদর্শন করেন। যদিও তাঁর পুরো মেয়াদেও জাদুঘর উদ্বোধন সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন উঠছে—গণভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে কেন্দ্র করে নির্মাণাধীন এই জাদুঘরের কাজ কেন এত গোপনীয়তার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে? পদত্যাগের পরও বিদায়ী উপদেষ্টার সক্রিয় ভূমিকার আইনগত ভিত্তি কী? সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছে, অধিকাংশ কাজ শেষ। কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বাকি। দ্রুতই এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে ১১১ কোটি টাকার এই প্রকল্প ঘিরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’-এর স্মৃতি সংরক্ষণের এই উদ্যোগই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে যেতে পারে।
তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন দল দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় নিশ্চিত করে সরকার গঠনের অবস্থানে পৌঁছানোর পর প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন তিনি। শনিবার আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে দেশে ফেরানো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারসহ নানা ইস্যুতে প্রশ্নের জবাব দেন বিএনপি নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে সংক্ষিপ্ত লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তারেক রহমান। এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বেও বেশিরভাগ উত্তরে সংক্ষিপ্ত অবস্থান তুলে ধরা হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: “আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে” ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে “আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে”। এদিকে বিএনপি সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা অব্যাহত রাখবে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি। আইনশাসনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান দেশে আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে—এ বাস্তবতায় রাজনৈতিক মিটমাট বা সমাধানের পরিকল্পনা কী—এ প্রশ্নের উত্তরে তারেক রহমান বলেন, “আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে” সমস্যার সমাধান হবে। তিনি প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়ে থাকে, তা যেন সংঘাতে রূপ না নেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রসঙ্গে অবস্থান আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “এটি বিচার বিভাগের বিষয়।” বিচার বিভাগকে নির্বাহী ও আইনসভার কাজ থেকে পৃথক রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, আদালতসংক্রান্ত বিষয়ে সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: “সব দেশের জন্য একই বৈদেশিক নীতি” ভারতীয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তারেক রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় সব দেশের জন্য একই বৈদেশিক নীতি” অনুসরণ করা হবে। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যোগ করেন, এই সম্পর্ক হবে “পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক স্বার্থ, হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং কৌশলগত স্বশাসনের ভিত্তিতে।” চীনের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরা হয়—বাংলাদেশের মানুষ ও অর্থনীতির স্বার্থই হবে সিদ্ধান্তের মূল বিবেচ্য বিষয়। বিজয় মিছিল নয়, শান্ত উদযাপন নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় অর্জনের পরও সারাদেশে বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, “কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে, এজন্য... বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আল্লাহর দরবারের শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে আমরা বিজয় উৎসব পালন করেছি।” তিনি আরও বলেন, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড “বরদাশত করা হবে না”। ৩১ দফা ইশতেহার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার লিখিত বক্তব্যে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলা হয়, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রশ্নোত্তর পর্বে একাধিকবার বিএনপির ৩১ দফা পরিকল্পনা বা নির্বাচনী ইশতেহারের কথা উঠে আসে। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকার গঠন করলে ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোই বাস্তবায়নের ভিত্তি হবে। অর্থনীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ বিগত সরকারের সময় অর্থনীতিতে ‘লুটপাট’ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ইশতেহার অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারেক রহমান বলেন, “সবাই সবার যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাই সবার মতো করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। কোনো একটা বিশেষ মহলকে আমরা সুযোগ দিতে চাই না।” ক্রিকেট ও রাজনীতি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে একজন সাংবাদিক জানতে চান—ক্রিকেটকে রাজনীতির বাইরে রাখা হবে কি না। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বিএনপি নেতারা। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান ও বিএনপি নেতারা সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে আইনশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি ও ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক প্রতিশোধের পরিবর্তে স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তা দিয়েই শুরু হলো সম্ভাব্য নতুন সরকারের পথচলা।
এরশাদের পতনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় অনুষ্ঠিত প্রায় সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন। তবে সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না দলটি। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে দলীয় প্রতীক নৌকাও বাতিল করা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে— নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকলে তাদের বিপুল ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে এবং এর প্রভাবই বা কতটা পড়বে ফলাফলে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দলগুলোর চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে দলটির কার্যক্রম স্থগিত এবং একই দিনে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক পথ বন্ধ হয়ে যায়। ‘ভোট নেই, ব্যালট নেই’— শেখ হাসিনার নির্দেশ ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠকে নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে নিরুৎসাহিত করেছেন। পাশাপাশি ‘ব্যালট নেই, ভোট নেই’— এই বার্তা সাধারণ ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেন তিনি। তার মতে, নৌকা প্রতীক ছাড়া ভোটে অংশ নেওয়া মানেই অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া। ভোটের সমীকরণ ও রাজনৈতিক কৌশল নৌকা প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টানতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল নানা কৌশল নিচ্ছে। কেউ নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে, কেউ সহানুভূতির ভাষায় কথা বলছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পাশে দাঁড়ানো তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের নেতারাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্যের পেছনে মূলত ভোটের অঙ্কই কাজ করছে। জরিপে কী উঠে এসেছে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে— আগে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাদের ৪৮.২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দিতে চান নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭.৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ২৭ শতাংশ বিএনপি, ১৭ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন ১৮.৬ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন এই জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটার অংশ নেন। বিশ্লেষকদের মত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। যারা যাবেন, তাদের ভোট বিভক্ত হতে পারে— কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াত কিংবা অন্য প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে পারেন। সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দনের মতে, আওয়ামী লীগের একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনে প্রভাব পড়বে কি? রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকলেও নির্বাচন স্বাভাবিক হবে। আবার কেউ মনে করছেন, দলটির অনুপস্থিতি ভোটের চরিত্র বদলে দিতে পারে। বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ভীতি না থাকলে আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক ভোট দিতে যাবেন। অন্যদিকে জামায়াত নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকলেও ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। সব মিলিয়ে, নৌকাবিহীন এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে— সেটিই এখন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে পলাতক থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে ভারতের কলকাতা ও দিল্লিতে আত্মগোপনে আছেন। দেশটির এই দুই শহরকে কেন্দ্র করেই দল পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের কৌশল নির্ধারণে ধারাবাহিক বৈঠক, যোগাযোগ ও সমন্বয় চালাচ্ছে তারা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য সামনে আসছে। নিষিদ্ধ দলটির নির্বাসিত নেতাকর্মীদের বিশ্বাস, পরিস্থিতি বদলে যাবে এবং খুব দ্রুতই তাদের নির্বাসনের সময় শেষ হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কলকাতার শপিং মলের ভিড়ঠাসা ফুড কোর্টে, কালো কফি আর ভারতীয় ফাস্টফুড খেতে খেতে, নির্বাসিত আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরা বসে নিজেদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন। প্রায় ১৬ মাস আগে বাংলাদেশের স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক গণঅভ্যুত্থান তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। তার পেছনে ফেলে যাওয়া রাজপথ ছিল রক্তাক্ত। জুলাইয়ের সেই আন্দোলন দমনে তার সরকারের শেষ দমন-পীড়নে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। এর পরপরই তার দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী দেশ ছাড়ে। তারা দলীয় শাসনামলের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে জনরোষ ও একের পর এক মামলার মুখে পড়েছিলেন। আওয়ামী লীগের অন্তত ৬০০ নেতা ভারতের সীমান্তঘেঁষা শহর কলকাতায় আশ্রয় নেন। যেখানে তারা তখন থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। দলীয় কার্যক্রম ও সংগঠন টিকিয়ে রাখতে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জনচাপের মুখে আওয়ামী লীগকে স্থগিত করে এবং সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। হত্যা ও দুর্নীতিসহ নানা অপরাধের অভিযোগে দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু হয়। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে—যা হাসিনার পতনের পর প্রথম নির্বাচন—দলটিকে অংশগ্রহণ ও প্রচারণা থেকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে হাসিনা তার রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে গেছে—এমনটা মানতে নারাজ। তিনি এই রায়কে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ভারত থেকে নিজের প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি আসন্ন নির্বাচন ভণ্ডুল করতে হাজার হাজার সমর্থককে সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত গোপন আশ্রয় থেকে হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় বৈঠক ও বাংলাদেশের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফোনালাপ করছেন। এসব রাজনৈতিক তৎপরতা হচ্ছে ভারত সরকারের নজরদারির মধ্যেই—যে সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধ উপেক্ষা করে চলেছে। গত এক বছরে সাবেক এমপি ও মন্ত্রীসহ শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে দলীয় কৌশল ঠিক করতে। তাদের একজন ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা সারাক্ষণ বাংলাদেশের নেতাকর্মী, তৃণমূল ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি আমাদের দলকে আসন্ন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করছেন। অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করেছে। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলা রয়েছে, যা তিনি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো তিনি (শেখ হাসিনা) দিনে ১৫–১৬ ঘণ্টা ফোনে কথা বলেন বা বৈঠক করেন। আমরা বিশ্বাস করি শেখ হাসিনা একজন নায়ক হিসেবে দেশে ফিরবেন।’ হাসিনার অধীনে গত দুইটি নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে গত এক দশকের মধ্যে প্রথম সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন। তবে আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলে গণতান্ত্রিক বৈধতার সব দাবিই ভেঙে পড়ে। তারা ইউনূসকে ‘প্রতিশোধপরায়ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। হাসিনার সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আমরা আমাদের কর্মীদের বলেছি এই ভুয়া নির্বাচনে অংশ না নিতে। ভোট বর্জন করতে এবং কোনো প্রচারণায় না যেতে। বাংলাদেশে যারা আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকে স্বৈরতন্ত্র ও লুটপাটের শাসন বলে মনে করেন, তাদের কাছে দলটির হঠাৎ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন :আমেরিকার কুখ্যাত যৌন অপরাধী ও মানবপাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘গোপন ফাইল’ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে। মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক অবমুক্ত করা প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার এই নথিতে নাম এসেছে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। নথিতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাথে এপস্টেইন চক্রের এক রহস্যময় ‘গোপন সমঝোতা’ ও ধোঁয়াশাপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কি আছে সেই গোপন ফাইলে? প্রকাশিত নথির তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর খুনি হাসিনা যখন ঢাকা-লন্ডন-নিউ ইয়র্ক সফরে ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই এপস্টেইন নেটওয়ার্কের সাথে তার এক বিশেষ যোগাযোগের সূত্রপাত হয়। এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী লেসলি গ্রফকে পাঠানো একটি ইমেইলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরওয়ের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোর্জ ব্রেন্ডের নেতৃত্বাধীন একটি দলের মাধ্যমে একটি ‘অপ্রকাশিত বিষয়ে’ সমঝোতায় পৌঁছেছেন। রেকর্ডে ‘bilat’ (দ্বিপাক্ষিক) শব্দের ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে, পর্দার অন্তরালে অত্যন্ত গোপনীয় কোনো বৈঠক বা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সেই সময়ে সরকারি সফরে থাকা হাসিনার পক্ষ থেকে নরওয়ের সাথে এমন কোনো চুক্তির কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি টাইম ল্যাপস নিউজ পোর্টালসহ কোনো দাপ্তরিক নথিতেও এর হদিস মেলেনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একজন আন্তর্জাতিক অপরাধী ও মানবপাচারকারীর সহকারীর কাছে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর গোপন সমঝোতার খবর কেন এবং কীভাবে পৌঁছালো? এপস্টেইনের রাডারে বাংলাদেশ নথিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এপস্টাইন ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশকে তাদের স্বার্থসিদ্ধির চারণভূমি বানাতে চেয়েছিল। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য খাতের আড়ালে বড় ধরনের বিনিয়োগের নামে অর্থ পাচার বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়ে খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে। এপস্টেনের ফাইলে আইসিডিডিআর, বি-কে ‘বিনিয়োগের উত্তম জায়গা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ২০১৪ সালের একটি মেইলে প্রোবায়োটিক প্রকল্পে ১০ বছরের জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেখা যায়, যেখানে ৩ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফার কথা উল্লেখ ছিল। স্বয়ং এপস্টাইন একটি আইমেসেজ সংলাপে স্বীকার করেছেন যে, তিনি বাংলাদেশে কলেরা সংক্রান্ত একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ‘চরম বিশৃঙ্খলা’ ও আর্থিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে ব্যর্থ হয়। এপস্টাইনের নথিতে বাংলাদেশের নামকরা এনজিও ‘ব্র্যাক’ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েস্ট কনসার্ন’-এর নামও পাওয়া গেছে। কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং এবং জলবায়ু অভিবাসীদের তথ্য সংগ্রহের নামে এপস্টাইন চক্র বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েছিল। বাংলাদেশি কর্মীর সংশ্লিষ্টতা এপস্টাইনের ম্যাসাজ পার্লার ও বাসভবনে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার তথ্যও এসেছে নথিতে। মামলার অন্যতম সাক্ষী আলফ্রেডো রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এপস্টাইনের ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় ‘বাংলাদেশি দম্পতি’ নিয়োজিত ছিলেন। যদিও তাদের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে, তবে এই অন্ধকার সাম্রাজ্যে বাংলাদেশি যোগসূত্র থাকার বিষয়টি এখন স্পষ্ট। ড. ইউনূস ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নথিতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও এসেছে, তবে তা নেতিবাচক কোনো প্রসঙ্গে নয়। বরং বিখ্যাত কার্টুন সিরিজ ‘দ্য সিম্পসনস’-এ তার উপস্থিতি এবং কার্টুনিস্ট ম্যাট গ্রোনিং-এর সাথে পরিচয়ের বিষয়টি সেখানে উঠে এসেছে। এছাড়া রাজনৈতিক অনুদান তালিকায় ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নাম থাকলেও তার সাথে এপস্টাইনের সরাসরি কোনো সম্পর্কের প্রমাণ মেলেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিদেশি লবিস্ট নিয়োগ এবং অন্ধকার জগতের প্রভাবশালীদের সাথে সখ্যের যে অভিযোগ দীর্ঘদিনের, এপস্টাইন ফাইল তার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। খুনি হাসিনার এই তথাকথিত ‘গোপন সমঝোতা’র স্বরূপ উন্মোচন এখন সময়ের দাবি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশন এর নির্বাচন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্রগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরেই বরিশাল নগরজুড়ে এখন এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদী তীরের আড্ডা—সবখানেই আলোচনা একটাই: আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী? দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি করপোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি বরিশালের রাজনৈতিক স্পন্দনের কেন্দ্র। আর তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা–কল্পনা, হিসাব–নিকাশ আর ভেতরের নীরব লবিং। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র অবস্থান ও কৌশল রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় যারা : বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ্ব কে এম শহিদুল্লাহ,বরিশাল মহানগর বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডঃ মীর জাহিদুল কবির জাহিদ,মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক,বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ,বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন,বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান ও বরিশাল জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড.নজরুল ইসলাম খান রাজন। এছাড়া বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ- সভাপতি ও বি এম কলেজ এর সাবেক জি এস এ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম আলোচনায় রয়েছেন। অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী: দলীয় সূত্র বলছে, এবার প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা। নির্দিষ্ট কেউকে ঘিরেই আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জনসম্পৃক্ততা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এবার বিএনপিকে এমন প্রার্থী দিতে হবে যিনি সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টিও রাজনৈতিক সমীকরণে বিবেচনায় রাখতে হবে। দলীয় কৌশল ও চ্যালেঞ্জ : বিএনপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে প্রার্থী নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে— *ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা, *জেল জুলম,মামলা হামলা নির্যাতন, *রাজনৈতিক অবস্থান। এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নির্বাচনে বিভক্তি বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। ভোটারদের প্রত্যাশা : বরিশাল নগরবাসীর প্রধান দাবি— * জলাবদ্ধতা নিরসন, * সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, * পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা, * কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, মেয়র প্রার্থীদের জন্য এসব ইস্যু হবে নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ও দলীয় কৌশলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী ঘোষণার পর নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বরিশালের রাজনীতির বাতাসে ইতিমধ্যেই নির্বাচনী সুর। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিলে নগর রাজনীতিতে জমে উঠতে পারে লড়াই।এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে। কে হবেন বিএনপির ‘নগর সেনাপতি’তার উত্তর মিললেই বরিশাল সিটির নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য,বরিশাল সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল।২০১৮ সালে আলহাজ্ব মজিবর রহমান সরোয়ার দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন।ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হোন সাদিক আব্দুল্লাহ। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বরিশালে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর যেন পাহাড়সম ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি)। পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে অতীতে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর এই চটে থাকা বলে জানা গেছে। বর্তমানে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় 'নির্বাচনী কার্ড' ইস্যু করাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। কার্ড ইস্যু নিয়ে চলছে টালবাহানা ভুক্তভোগী সংবাদকর্মীদের দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরেও কার্ড দিতে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে। মূলত ডিসির ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেই মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বরিশালের সাংবাদিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রভাব পেশাগত কাজে উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে এই জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়। সেই থেকে সাংবাদিকদের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ, এখন সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার হরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিশেষে বলা যায়, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ কাম্য নয়। নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক লিখেছেন, বৌ পেটানো নিউজ করার মাসুল দিচ্ছে বরিশালের সাংবাদিকরা। আরেক সাংবাদিক প্রশাসনের এই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে লিখেছেন, ডিসি তার ক্ষমতা দেখাইছে, এখন আমাদের বরিশালের সাংবাদিকদের উচিত সবাই এক হয়ে ক্ষমতা দেখানো। কার পাশা যাবে কার টেবিলে, খেলা যে চলছে কোন লেভেলের! নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্ড একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি। কিন্তু কার্ড পেতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, সঠিক কারণ ছাড়াই আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বরিশালের সংবাদকর্মী মহলে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন ‘ব্যক্তিগত রোষ’ এবং ‘ক্ষমতার দাপট’ রুখতে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো কঠোর কর্মসূচির কথা ভাবছে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অবিলম্বে সাংবাদিকদের কার্ড প্রদানের দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। কে এই ডিসি খাইরুল আলম সুমন যৌতুক সংক্রান্ত মামলায় কারাবাসের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে বিস্ময় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বরিশালের ডিসি খায়রুল আলম সুমন ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা, ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমিসংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করা—যেখানে ব্যক্তিগত সুনাম ও নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, যাদের ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, এমন কর্মকর্তাকে ডিসি পদে বসানো ইমেজ ও আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে। আদালত ও মামলার তথ্য সূত্র অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ওই মামলায় খায়রুল আলম সুমন ও তার মা খোদেজা বেগমকে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার এসআই শাহ আলম আদালতে তাদের হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন—উভয় আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবাসে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৫ জুন বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ রাতে ঢাকার ওয়ারী এলাকায় খায়রুলের বাসায় তার মায়ের মাধ্যমে গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হয় এবং এ সময় খায়রুল আলম সুমন ভুক্তভোগীর হাত চেপে ধরেন। পরদিন ওয়ারী থানায় মামলা করা হয়। বিভাগীয় মামলা ও পদোন্নতি স্ত্রীর করা মামলার পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ দেওয়া হলে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এর ফলে নিয়মিত পদোন্নতি ব্যাহত হয় বলে জানা গেছে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উপসচিব পদে তার পদোন্নতির আদেশ জারি হলেও সেখানে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ (ব্যাকডেটেড) পদোন্নতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজেকে পদোন্নতিতে বঞ্চিত দাবি করে তিনি ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিসির বক্তব্য খায়রুল আলম সুমনের ‘ব্যক্তিগত ডাটা শিটে’ (পিডিএস) বর্তমানে তাকে ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খায়রুল আলম সুমন বলেন, “এসব আমার ব্যক্তিগত তথ্য। আমার নামে বিভাগীয় মামলা ছিল—সবই কর্তৃপক্ষ জানে এবং জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মত জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা প্রশাসক পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়—এটি নৈতিক নেতৃত্বেরও প্রতীক। একজন ডিসির ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ থাকলে জেলার আইনশৃঙ্খলা ও ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশ্ন ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাদের ভাষ্য, “ডিসির সুনামটাই সবচেয়ে জরুরি।” সূত্র জানায়, খায়রুল আলম সুমন প্রবেশনার হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাকরি শুরু করেন। সে সময়ের ডিসি মো. আবদুল মান্নানের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম ডিসি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নাঙ্গলকোট, নিকলি ও বাজিতপুরে এসিল্যান্ড এবং ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশালের ডিসি হিসেবে তার নিয়োগ প্রশাসনে নৈতিকতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও অবস্থান প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।