সরকারি চাকরি জীবনের ইতি টেনেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়া ছাড়তে পারেননি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন। বরাবরই নিজেকে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করতেন, চাকরি জীবনের প্রথমদিকে মোটামুটি রয়েসয়ে চলতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে অধঃপতন ঘটে তথাকথিত এই সৎ কর্মকর্তার। এক নাগাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। এই মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব পদের পাশাপাশি প্রভাব খাটিয়ে একটি বড় প্রকল্পেরও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখে দেন। এই সময় তলে তলে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। গুরুতর অনিয়ম-অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবেও এই অনিয়মের ধারা অব্যাহত থাকে তার। এই সময় এক নারী ঠিকাদারের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গণপূর্তের সচিব হওয়ার পরে এক পর্যায়ে ওই নারী ঠিকাদারকে বিয়েও করেন। তাকে নিয়ে উঠেন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন বেইলী রোডের একটি বিশেষ বাংলোয়। নিয়ম অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া ৫০ হাজার টাকা তার বেতন থেকে কেটে রাখার কথা। কিন্তু এর পরিবর্তে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মাত্র চার হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা করেন তিনি পূর্ত সচিব পদে থেকে। শুধু তাই নয়, ওয়াছি উদ্দিনের পিআরএল শেষ হয়েছে ৯ মার্চ, ২০২৫। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারি ওই বাংলোটি দখলে রেখেছেন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না তার বিরুদ্ধে। যদিও ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দের মামলায় কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলায়। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে মূলতঃ এটিই ছিল ওয়াছি উদ্দিনের খুঁঁটির জোর। এই পরিচয়েই তিনি ২০২০ সালের আগস্টে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে পদায়ন পান। ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তাকে গণপূর্ত সচিব করা হয়। চাকরির বয়স শেষে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও ভোগ করেন। গণপূর্তের সচিব পদে থাকাকালে শেখ সেলিম, ঢাকার পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ গোপালগঞ্জের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালীর সমন্বয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সিন্ডিকেটের হয়ে সরকারি বাড়ি দখল, প্লট বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ-বদলি, অনিয়ম, চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। তার সময়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়কেন্দ্রীক নতুন একটি দালাল শ্রেণিও গড়ে উঠে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সচিবের দপ্তর থেকেই ভুয়া এক ডিজিএফআই কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ব্যক্তি আদতে ছিল সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের দালাল। ওয়াছি উদ্দিনের নানাবিধ এসব অনিয়ম-অপকর্মের তথ্য বিস্তারিতভাবে পরবর্তীতে তুলে ধরা হবে। সরকারি বাংলোয় নামেমাত্র ভাড়া পরিশোধ এবং এখনও অবৈধ দখলে রেখে সরকারের যে বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি করেছেন চলতি প্রতিবেদনে এ তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের পিআরএল শুরু হয়েছে ২০২৪ এর ১০ মার্চ। ফলে নিয়ম অনুযায়ী ২০২৫ এর ৯ মার্চ পর্যন্ত তিনি সরকারি বাসায় থাকতে পারবেন। এরপরেও অতিরিক্ত দুই মাস এবং বিশেষ বিবেচনায় সর্বোচ্চ আরও চার মাস পর্যন্ত থাকা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোন ক্ষমতার বলে সরকারি এ বাংলোটি দখল করে রেখেছেন, পূর্ত মন্ত্রণালয়ও তাকে কোন বিবেচনায় এ অবৈধ সুযোগ দিচ্ছে- সংশ্লিষ্টরা জবাব দিতে পারছেন না।
উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, কাজী ওয়াছি উদ্দিন রাজধানীর বেইলী রোডের মিনিস্টার্স এপার্টমেন্ট-৩ সংলগ্ন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত সরকারি ভবনটি ছাড়েননি। সরকারি নথিতে এটি একটি সাব-স্টেশন ভবন হিসেবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে ডুপ্লেক্স বাংলোতে রূপান্তর করা হয়েছে। কাজী ওয়াছি উদ্দিন এই বাংলোটিতে সরকারের বিপুল অংকের অর্থ খরচ করেছেন শুধু নিজে থাকার সুবিধার জন্যই। বর্তমানে ভবনটি ‘বেইলী রোড মন্ত্রীপাড়া ৪০ নম্বর বাড়ি’ হিসেবেই পরিচিত।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ার একটি ডুপ্লেক্স বাংলোর জন্য তিনি মাত্র ৪ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করছেন। বরাদ্দ নেওয়ার সময় নিজের প্রভাব খাটিয়ে বাসাটিকে ‘সাব-স্টেশন ভবন’ হিসেবে দেখিয়ে মূল বেতনের মাত্র ৭.৫ শতাংশ হারে ভাড়া নির্ধারণ করান তিনি।
বরাদ্দের আগে একই বাসায় বসবাস করতেন নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) তরিকুল ইসলাম। তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী তার বেতন থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া পরিশোধ করতেন। অথচ কাজী ওয়াছি উদ্দিন সেই একই বাসায় বসবাস করা সত্ত্বেও এমনকি ইতিমধ্যে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করে বাসাটির উন্নয়ন সত্ত্বেও মাত্র চার হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কাজী ওয়াছি উদ্দিন অত্যন্ত কৌশলে সাব-স্টেশন উল্লেখপূর্বক ভবনটি বরাদ্দ নেন এবং পরবর্তীতে সাব-স্টেশন কার্যক্রম পাশ কাটিয়ে পুরো ভবনটিকে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাংলোতে রূপান্তর করেন। নিচতলা ও দোতলা মিলিয়ে প্রায় ৮টি কক্ষবিশিষ্ট এই বাংলোটি আধুনিক রিনোভেশন ও দামী ফার্নিচারে সাজানো হয়।
সূত্র বলছে, ভবনটির সংস্কার ও আসবাবপত্র কেনায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সরকারি অর্থের এমন অপ্রয়োজনীয় বিপুল ব্যয় কীভাবে এবং কোন বিধিবলে করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
ডলারের দাম বাড়ার ফলে বাংলাদেশে আমদানি ও রপ্তানি খাতে দেখা দিচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে আমদানিকারকরা পড়ছেন চাপের মুখে, অন্যদিকে রপ্তানিকারীরা কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন। আমদানি খাতে ডলারের দর বাড়ায় বিদেশ থেকে পণ্য আনতে খরচ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি, ভোজ্যতেল, কাঁচামাল, ওষুধের উপাদান এবং প্রযুক্তিপণ্য—এসব আমদানিতে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ডলার সংকটে ভুগছে, ফলে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার ক্ষেত্রে বিলম্ব হচ্ছে এবং অনেক সময় ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাজারে — পণ্যের দাম বাড়ছে, মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, রপ্তানির ক্ষেত্রে ডলার মূল্য বৃদ্ধির ফলে রপ্তানিকারকরা প্রতি ডলারে বেশি টাকা পাচ্ছেন। এতে তাদের আয় কিছুটা বাড়ছে, যা রপ্তানি খাতকে কিছুটা চাঙ্গা রাখতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ডলারের দরবৃদ্ধি একটি প্রণোদনার মতো কাজ করছে। তবে এর একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে — আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অনেক সময় অর্ডারের মূল্য সমন্বয় করে দেয়, ফলে অতিরিক্ত লাভ সবসময় নিশ্চিত হয় না। রেমিট্যান্স প্রেরকদের জন্যও ডলারের দাম বাড়া স্বস্তির খবর। প্রবাসীরা এখন প্রতি ডলারে বেশি টাকা পাচ্ছেন, ফলে ব্যাংক চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহী হচ্ছেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে, যদিও আমদানি ব্যয় এখনও বেশি থাকায় চাপে রয়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সকে উৎসাহ দিচ্ছে, অন্যদিকে আমদানির চাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে নানা নীতিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার ব্যবস্থা বা managed floating system এর মাধ্যমে ডলারের বাজারে ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। আমদানিকারকদের উচিত দীর্ঘমেয়াদি মূল্য চুক্তি ও বিকল্প উৎস নির্ধারণ করা। রপ্তানিকারকদের বাজার বৈচিত্র্য ও উৎপাদন দক্ষতায় নজর দেওয়া দরকার। একইসাথে সরকারের উচিত ডলার সংকট মোকাবিলায় কাঠামোগত সংস্কার ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আমদানিনির্ভর শিল্প ও সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা, সুচিন্তিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্সকে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে টেকসই করা।
বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্ময়কর হারে বাড়ছে। তবে এর বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা বিভ্রান্তি, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে এবং নীতিমালার আওতায় আনতে বিশেষজ্ঞরা এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত "এআই অ্যান্ড সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট" শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তারা বলেন, অতি দ্রুত এই প্রযুক্তির প্রসার ঘটলেও এর যথাযথ ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা এখনও প্রয়োজনীয় মাত্রায় পৌঁছায়নি। ভুয়া তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে তৈরি করা ভুয়া ভিডিও (ডিপফেইক), অটোমেটেড ভুয়া সংবাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিমূলক কনটেন্ট ইতিমধ্যেই সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক বলেন, "অনেকেই এখন বিশ্বাস করছে না কোন ছবি বা ভিডিও আসল। এর ফলে সত্য-মিথ্যার সীমা মুছে যাচ্ছে। রাজনীতি, আইন ও সামাজিক সম্প্রীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।" চাকরির বাজারে শঙ্কা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে অনেক শ্রমনির্ভর ও মধ্যম স্তরের পেশা অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হতে পারে। বিশেষ করে কল সেন্টার, কনটেন্ট লেখক, গ্রাফিক ডিজাইনার এবং হিসাবরক্ষণ পেশায় ঝুঁকি বাড়ছে। নীতিমালার ঘাটতি বাংলাদেশে এখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন বা জাতীয় নীতিমালা নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকলেও তা এআই-নির্ভর প্রযুক্তির গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন প্রযুক্তিবিদরা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তারা বলছেন, এখনই উচিত শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক মহলে এআই ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা। নৈতিক ও নিরাপদ এআই উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপদেরও একসঙ্গে কাজ করা জরুরি।
ঢাকা, ২৫ জুন ২০২৫ – জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দিন দিন বেড়ে চলেছে খাদ্য নিরাপত্তা সংকট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বিস্তার, অনিয়মিত বৃষ্টি ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষিজ উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, ২০২৪ সালে উপকূলীয় ১২টি জেলার মধ্যে অন্তত ৭টিতে ধানের উৎপাদন কমেছে ২০ শতাংশের বেশি। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ভোলা ও খুলনার কিছু অঞ্চলে একাধিক মৌসুমে চাষ সম্ভব হচ্ছে না। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফারজানা রহমান বলেন, “উপকূলীয় মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ গুণ বেড়ে গেছে। এতে ধান, পাট, সবজি এমনকি মাছের চাষেও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ফলস্বরূপ এলাকার মানুষ বিকল্প জীবিকার সন্ধানে স্থানান্তর হচ্ছে।” স্থানীয় চাষিরা বলছেন, আগে যেখানে বছরে তিনবার ফসল হতো, এখন একবারও সঠিকভাবে ফসল ঘরে তোলা যাচ্ছে না। অনেকেই জমি ফেলে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা উপকূলীয় মানুষের জীবনে নতুন করে আঘাত হানে। ২০২৫ সালের মে মাসেই ঘূর্ণিঝড় ‘নির্মল’-এর আঘাতে বরগুনা ও পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে বহু কৃষিজমি জলমগ্ন হয়ে পড়ে এবং মিষ্টি পানির পুকুরে লবণাক্ত পানি ঢুকে যায়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ২০২৫–৩০ সময়কালের জন্য একটি ‘জলবায়ু সহনশীল কৃষি কর্মপরিকল্পনা’ তৈরি করেছে, যার আওতায় উপকূলীয় কৃষকদের লবণসহিষ্ণু ফসল চাষে উৎসাহিত করা হবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড উপকূলবর্তী এলাকায় নতুন করে বাঁধ নির্মাণ ও পুরাতন বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু করেছে, যাতে জোয়ারের পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ না করতে পারে। তবে গবেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগগুলো কার্যকর করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরণের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, যদি জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজ উৎপাদন আরও ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তব ও প্রতিদিনকার চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব-২ গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর নামে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাগুলোতে তার বিরুদ্ধে ১৫০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। সোমবার (১৩ জানুয়ারি) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকাু১ এ সংস্থাটির উপপরিচালক মো. আহসানুর কবীর পলাশ বাদী হয়ে দুইটি, সহকারী পরিচালক মো. রাকিবলু হায়াত বাদী হয়ে একটি ও উপসহকারী পরিচালক মো. মনজুরুল ইসলামা মিন্টু বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় লিকুর স্ত্রী, ভাই, ভগ্নিপতি ও কেয়ারটেকারসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাগুলোতে লিকু ও তার স্বজনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ৩৮ কোটি ৫৭ লাখ ১২ হাজার ৯৬ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। চার মামলার মধ্যে লিকুকে প্রধান আসামি করে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ৫৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৮০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অপর মামলায় তার বিরুদ্ধে ৩৩টি ব্যাংক হিসাবে ১৪৪ কোটি টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। লিকুসহ এই মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেনু লিকুর স্ত্রী রহিমা আক্তার, ভগ্নিপতি শেখ মো. ইকরাম, লিকুর ভাইু গাজী মুস্তাফিজুর রহমান (দিপু), ভাগিনা তানভীর আহম্মেদ, ব্যবসায়িক অংশীদার মো. লিয়াকত হোসেন সবুজ ও মো. কালু সেখ, লিকুর বাসার কেয়ারটেকার হামিম শেখ, তার ম্যানেজার মিন্টু রহমান ও মো. আরাফাত হোসেন। মামলাগুলোর এজাহারসূত্রে জানা যায়, স্ত্রী রহিমা আক্তার তার ৯টি ব্যাংক হিসাবে ১২ কোটি ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৪৬ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেন। একইভাবে শেখ মো. ইকরাম তার ব্যক্তিগত ও যৌথ নামে পরিচালিত ৩টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনকভাবে ২১ কোটি ৫ লাখ ৭৩ হাজার ২৯৭টাকা, গাজী মুস্তাফিজুর রহমান (দিপু) তার ব্যক্তিগত ও যৌথ নামে পরিচালিত ৪টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনকভাবে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৯৬৩ টাকা, তানভীর আহম্মেদ ১৯ কোটি ৮৮ রাখ ৭৯ হাজার ৩৫৪ টাকা, মো. লিয়াকত হোসেন (সবুজ) ৩ কোটি ৪৪ লাখভ ৬০ হাজার ২৬৩ টাকা, আসামি মো. কালু সেখ তার ব্যক্তিগত ও যৌথ নামে পরিচালিত ৩টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনকভাবে ৫৬ কোটি ৫২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৪৯ ও লিকুর কেয়ারটেকার হামিম শেখ ৪টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৩০ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৭ টাকা লেনদেন করেন। এ ছাড়া, গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর স্ত্রী রহিমা আক্তারের বিরুদ্ধে ২৩ কোটি ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৮ টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলায় লিকুকেও আসামি করা হয়েছে। লিকুর ভগ্নিপতি শেখ মো. ইকরামের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অন্য একটি মামলায় তাকেও আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় ইকরামের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ৩৪৮ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
‘ঢাকায় টাকা উড়ে’-এমন প্রবাদ বাক্য গ্রামেগঞ্জের। তবে উড়তে না দেখা গেলেও রাজধানীতে ব্যাংক টু ব্যাংক বা বস্তায় লেনদেনের ঘটনা আছে। তেমনই লেনদেন ঘটেছে আগারগাঁও টু সচিবালয়ে। এ লেনদেন কাজ না করেই বিল পরিশোধ এবং পদায়নে ঘুষ হিসেবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ঢাকা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাচ্চুর নিয়ন্ত্রণে এ ঘটনার প্রমাণও মিলেছে। চাউর আছে, ওই পদ বাগাতে তিনি বিনিয়োগ করেছেন ৫ কোটি টাকা। আর ঢাকা জেলার এক্সেনের পদে বসেই স্বল্প সময়ে পকেটস্থ করেছেন সাড়ে ২২ কোটি টাকা। পানি যখন যে পাত্রে রাখা হয় তখন সে পাত্রের রং ধারণ করেন। বাচ্চুর গায়ের রং সাদা তবে চরিত্র পানির মতোই। যখন যে দল শাসন-শোষণ করেছে সে দলের জার্সি পড়ে ইউএনও, নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। রাতারাতি বদলি কিংবা নিজহাতে মারধর করার নজির স্থাপন করেছেন। শুধু ভুয়া বিল, বাউচার তৈরিই নয় মন্ত্রীর কণ্ঠস্বরও নকল করার সক্ষমতা আছে প্রকৌশলী বাচ্চুর। পতিত আওয়ামী লীগের অর্থ জোগানদাতা বাচ্চু বর্তমান সরকারের জন্য বিষফোড়া বলে খোদ তার বিভাগেরই কর্মকর্তাদের মন্তব্য। কর্মচারীদের টাকা আত্মসাৎকারী প্রকৌশলী বাচ্চুর স্ত্রী গৃহিণী আসমা পারভীনের নামে বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট, জমি এবং নগদ টাকার অঙ্ক কপালে চোখ উঠার মতো। এসব খতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছে দুদক, সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে টিম। টেকনিক্যাল বিষয়ে দুদক তাদের সহযোগিতা নিচ্ছে। এর আগে অভিযান পরিচালনা করেছে দুদক। নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। ঘুষের রেট ফাইলভেদে ৬-৪০% প্রকৌশল সেক্টরে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না-এ কথা নতুন নয়। তবে কালে-পাত্রে বদল হয়েছে ঘুষের রেট। দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত থাকাকালে এ অপকর্ম করেছেন প্রকৌশলী বাচ্চু। এলজিইডির একাধিক ঠিকাদার এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, এলজিইডি ভবন ঘুষের আঁতুড়ঘর। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতন ও প্রকৌশলী বাচ্চু যোগদানের পর চিত্র পাল্টেছে। ঘুষের নতুন রেট নির্ধারণ করেছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা। নিরাপত্তার স্বার্থে ঠিকাদারের নাম প্রকাশ করছি না। তারা অভিযোগ করেন, সঠিক ও স্বাভাবিকভাবে কাজ করার পর বিল উত্তোলনের জন্য পিসি দিতে হতো ৫%, এখন হয়েছে ৬%। কাজ না করেই অগ্রিম বিল উত্তোলনে গুনতে হয় ৪০%। মূল টাকার ১৫% চার্জ বাদে বাকি টাকার ওপর পিসি বসান প্রকৌশলী বাচ্চু গংরা। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে মিলেছে, ৬৫ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দিয়েছেন বাচ্চু মিয়া। ঠিকাদারদের অভিযোগ সঠিক হলে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন ২২ কোটি টাকা। এছাড়াও ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের মোবাইল মেইনটেনেন্সের কাজ না করেই ৫০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরিবারের সম্পত্তি: অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, বাচ্চু মিয়া ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরা, সেক্টর-১১-এ স্ত্রী আসমা পারভীনের নামে কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট, গাজীপুর সদর নিশাদনগরে এবং জয়দেবপুরে বাড়ি, পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় একটি প্লট এবং ২০২২ সালে আসমা পারভীনের নামে (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৫-২৯৫২) একটি মূল্যবান গাড়ি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বেনামি গাড়ি ও বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা রয়েছে। অগ্রিম বিল ও দুদকের অভিযান রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিল্ডিংয়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ ও ঢাকার নবাবগঞ্জে ইছামতী নদীর ওপর ২৭০ মিটার ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১০ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে দুদকের একটি দল ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর (এলজিইডি) কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় অভিযানে এলজিইডি ঢাকা জেলা কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে দুদক। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহর ও পূর্বাচলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পসহ (দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প) স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন- নামীয় প্রকল্পের আওতাধীন একটি প্রকল্প। এটির অফিসিয়াল নাম-ঢাকার মিরপুরে গাবতলী জিপিএস-এর ৬ তলা ভিত্তিসহ ৬ তলা ভবন নির্মাণ। এর আওতায় নির্মিতব্য ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। এ টিমে ছিলেন, দুদকের সহকারী পরিচালক-স্বপন কুমার রায়সহ তিনজন। সরেজমিন পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে দুদক কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির দুইটি ফ্লোরের কাজ সমাপ্ত হলেও চারটি ফ্লোরের নির্মাণ বিল ঠিকাদারকে প্রদান করা হয়েছে। আংশিক রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অনিয়ম/দুর্নীতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের নিমিত্ত অবশিষ্ট রেকর্ডপত্রের জন্য চাহিদাপত্র প্রদান করে দুদক টিম। এ নিয়ে যাচাই করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করবে দুদক। এছাড়াও আরেক অভিযানে ঢাকার নবাবগঞ্জে ইছামতী নদীর ওপর ২৭০ মিটার ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে পৃথক এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম প্রথমে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, এলজিইডি, ঢাকা, আগারগাঁও অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে। পরবর্তীতে নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট ব্রিজ নির্মাণ এলাকা ঘুরে দেখে। পরিদর্শনে দেখা যায়, বর্ণিত ব্রিজের ৯টি স্প্যানের মধ্যে ৮টি স্প্যানের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও ব্রিজের মাঝখানে দুই পাশের সংযোগ হিসেবে আর্চ স্প্যানের কাজ বাকী রয়েছে। তবে, অফিসে সংরক্ষিত ব্রিজের অগ্রগতি সংক্রান্ত নথিতে কাজের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ দেখিয়ে সর্বমোট প্রায় ৫০ কোটি ৮৪ লাখ ২৯ হাজার ৭৭ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সার্বিকভাবে টিমের পর্যালোচনায় সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ না হয়েও বিল পরিশোধ করায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায় দুদক। অভিযোগ রয়েছে প্রকৌশলী বাচ্চু গত জুন মাসে কাজ শেষ না করেই দৃষ্টিনন্দন স্কুল প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকা, কেরানীগঞ্জ প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকা এবং বান্দুরা ব্রিজে ৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল প্রদান করেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল মেইনটেনেন্সের কাজ না করেই ৫০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই প্রকৌশলী। সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিম দুদকের অভিযানের পর রেকর্ডপত্র যাচাই ও টেকনিক্যাল বিষয়াদি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিমের আহবায়ক করা হয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী (সেতু) মো. ইউসূফ হারুনকে, সদস্য সচিব করা হয়েছে-একই বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মোসা. তাসলিমা খাতুনকে। অপর সদস্য হলেন- বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী (সড়ক) মো. বুলবুল আহমেদ। টিম সদস্যরা ইছামতির ওপর সেতুর কাজের অগ্রগতি বিষয়ে প্রতিবেদন দিবেন। সরকারি চাকুরে কাম দলীয় ক্যাডার জন্মস্থান গাজীপুরের টঙ্গিতে। বাচ্চু লেখাপড়া শেষ করেছেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার মা ছিলেন জাতীয় পার্টির নেত্রী। জোট শরিক হওয়ায় আর আওয়ামী লীগ শোষণ আমলের পুরোটাই ভোগ ও প্রভাব বিস্তার করেছেন। মাঝে বিএনপি আমলে পরিচয় দিতেন বিএনপি কর্মী হিসেবে। ফের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুরো দস্তুর আওয়ামী লীগার। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদে নাম লিখিয়েছেন। শোক, সভা-সমাবেশের ডোনারের ভূমিকা পালন করেছেন। বদৌলতে নিয়েছেন সুবিধা। নিজ জেলা গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় (এলসিএস) মহিলা শ্রমিকদের বেতনের টাকা আত্মসাৎ ও ভুয়া প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কাজে বাধা সৃষ্টি করেন। ক্ষমতার প্রভাবে ওই কর্মকর্তাকেই বদলি করে দিয়েছিলেন বাচ্চু মিয়া। ময়মনসিংহ জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিত করার নজির স্থাপন করেছেন তিনি। এছাড়াও কিশোরগঞ্জ, পাবনায় তার অপকর্মের ছোঁয়ায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। যেখানেই তিনি চাকরি করেছেন সেখানেই বাচ্চু মিয়া ভুয়া বিল, এলসিএস কর্মীদের অর্থ আত্মসাৎ, সহকর্মীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেছেন। এসব নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি পার পেয়ে গেছেন। প্রশ্ন ছিল-এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে ঢাকা জেলার মত খুবই গুরত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন কেনো? জবাবে জানা গেছে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেনের এ পদে বসতে মাত্র পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন ডুয়েটিয়ান বাচ্চু। বাধা উপেক্ষা করেই বিদায় বেলায় বদলির প্রস্তাব প্রেরণ করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জন। বিভাগীয় ব্যবস্থাতেও দমেনি বাচ্চু গত বছর নেত্রকোনায় কর্মরত অবস্থায় বাচ্চু মিয়া এক মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করে বিভিন্ন দফতরে তদবির বাণিজ্য করতেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই একটি দৈনিক পত্রিকায় ৩০০ প্রকৌশলীর তালিকা উঠে আসে। তদন্ত করে যে তালিকা করেছিল এনবিআর। বিস্তর অভিযোগে যথাযথ প্রমাণ দিয়ে গত ৬ আগস্ট মোহাম্মদ খাজা মহিউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে মো. শিকদার হোসেন নামের আরেক ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে, বাচ্চু মিয়া ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি কাজে প্রভাব খাটাতেন। এ প্রসঙ্গে অভিযান পরিচালনাকারী দুদকের সহকারী পরিচালক স্বপন কুমার রায় জানান, নথিপত্র আংশিক সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও চাওয়া হয়েছে। টিমের সকলে মিলে একসঙ্গে বসে কমিশনে প্রাথমিক রিপোর্ট দিব। কমিশনের যেভাবে অনুমোদন দিবেন সেভাবেই পরবর্তী রিপোর্ট দেয়া হবে। প্রকৌশলী বাচ্চুর বক্তব্য অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়াকে মোবাইলে কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি। পরে হোয়াট্স অ্যাপে অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। তিনি ফোন ব্যাক করে বলেন, আপনার প্রশ্নগুলো দেখেছি। আমার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে তাই কোনো বক্তব্য দিব না। তিনি বলেন, সঠিক খবর হলে আমার আপত্তি নেই।