Brand logo light
অনুসন্ধানী সংবাদ

দুর্নীতির পাহাড়,জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে আওয়ামী লীগপন্থী সিন্ডিকেট এখনো বহাল : দুর্নীতিবাজদের রক্ষায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান

নিজস্ব প্রতিবেদক নভেম্বর ৮, ২০২৬ 0

ইত্তেহাদ নিউজ, ঢাকা :

সরকার পরিবর্তন হয়েছে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এসেছে রদবদল। কিন্তু শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে এখনো বহাল রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের আলোচিত একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের বিরুদ্ধে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর নেতৃত্বে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছে। এই বলয়ে রয়েছেন বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম, চাঁদপুর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ,রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাহেদুল করীম এবং ঢাকা মেট্রোতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত  মো. সরোয়ার হোসেন। তাঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে  বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কমিটিতে দায়িত্ব পালন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই কর্মকর্তাদের একটি অংশ নিজেদের প্রশাসনিক প্রভাব ও ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক ধরে রেখেছেন। বিএনপি-সমর্থিত কয়েকজন ঠিকাদারকে সীমিতসংখ্যক কাজ দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ-সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী রাখতে অর্থ সরবরাহের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান ধরে রাখলেও বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীরা অনেক ক্ষেত্রে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে ক্ষমতার প্রভাব, অস্বচ্ছতা, দায়িত্বে অবহেলা, অদক্ষতা, দলাদলি, কোন্দল ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা পৃথক দুর্নীতির অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্তের নথি, ঠিকাদারদের লিখিত অভিযোগ এবং মানববন্ধনের ঘটনাও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সময়ে আবেদন ও অভিযোগ জমা পড়েছে। কয়েকটি অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত অভিযোগ ও তদন্তের পরও কীভাবে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অধিদপ্তরের  প্রভাবশালী বলয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?

কে এই আসাদুজ্জামান: দরপত্র থেকে বিল পরিশোধ—ডজনখানেক অভিযোগ

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের  তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে দরপত্র কারসাজি, প্রাক্কলিত ব্যয় ফাঁস, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধসহ প্রায় ডজনখানেক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একাধিকবার অভিযোগ ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রায় ৩২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ফাঁস করে ইলেকট্রো গ্লোব মিরন এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক যুবলীগ নেতা রাকিব হোসেন ৫ আগস্টের পর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: 

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর: অভিযোগের পাহাড়, তার পরও বহাল তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান

 

একইভাবে রূপগঞ্জের পূর্বাচল মাধ্যমিক সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রায় ৩৫ কোটি টাকার নির্মাণকাজ সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের শ্বশুরের প্রতিষ্ঠান নূরানি কনস্ট্রাকশনকে পাইয়ে দিতে প্রাক্কলিত ব্যয় কমিয়ে ফাঁস করার অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রকল্পের দরপত্র কমিটির সভাপতি ছিলেন আসাদুজ্জামান।

এ ছাড়া বিদায়ী প্রধান প্রকৌশলী আলতাফ হোসেনের দুর্নীতির অর্থ বণ্টনে আসাদুজ্জামান  ক্যাশিয়ারের ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার লিয়াকত শিকদারকে কোটি টাকার বিল দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।

দিনাজপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহ আলমের মালিকানাধীন মা এন্টারপ্রাইজকে বিভিন্ন জেলায় একচেটিয়া কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব লাইসেন্স অন্যদের ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এর বিনিময়ে দুই শতাংশ অর্থ আদায় করে।

এর আগে নাটোরে দায়িত্ব পালনকালে বিলমারিয়া দাখিল মাদ্রাসা, বিলমারি উচ্চ বিদ্যালয় ও বারঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকাংশ বিল পরিশোধের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

রংপুরে দায়িত্ব পালনকালে ২০২০ সালের জুলাইয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০ কোটি টাকার একটি কাজ ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট এক নেতাকে পাইয়ে দিতে দরপত্রে কারসাজির অভিযোগও রয়েছে।

এসব অভিযোগ তদন্তে গত বছরের ২৩ অক্টোবর আসাদুজ্জামানসহ পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং সুপারিশের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে গত বছরের মে মাসে তাঁর পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) নেতিবাচক থাকা সত্ত্বেও সেই তথ্য গোপন বা পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট এসিআর, পদোন্নতি কমিটির কার্যবিবরণী ও প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 

বরিশালের শহিদুল: চার প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও ৭ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ

বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্বে থেকে চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, সাবকন্ট্রাক্টে কাজ বণ্টন, বিল ছাড়ে কমিশন দাবি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বরিশালের মেসার্স মোমিন সিকদার, দিনাজপুরের মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, চট্টগ্রামের ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং খুলনার মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের নামে বিভিন্ন কাজ নিয়ে পরে অন্য ঠিকাদারদের কাছে সাবকন্ট্রাক্টে দেওয়া হয়। এতে মূল কাজের বরাদ্দ, বিল ও আর্থিক লেনদেনে শহিদুল ইসলামের প্রভাব বজায় থাকে বলে অভিযোগ। ঠিকাদারদের ভাষ্য, এ ব্যবস্থায় সাবকন্ট্রাক্টে কাজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বিল ছাড় ও ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

নিরাপত্তা জামানত কর্তনের ক্ষেত্রেও বিধি অনুসরণ না করার অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদাররা। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি কাজ শেষ করার পরও বিল আটকে রাখা এবং বিল ছাড়ের বিপরীতে কমিশন দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। বাড়তি অর্থের ব্যবস্থা না করলে ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

 

আরও পড়ুন:

বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে  দুদকে অভিযোগ

বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল যখন ঠিকাদার: ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ

 

শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বরিশাল ও ঢাকায় জমি, ফ্ল্যাট ও গাড়িসহ বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। ঠিকাদারি কাজের কমিশন, কাজের বরাদ্দ এবং সংশোধিত প্রাক্কলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা ও অর্থের উৎস যাচাইয়ে দুদকের তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া ব্যক্তিগত অসদাচরণ ও নারীসংক্রান্ত নানা অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। 

শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ, ১৪৪টি পুনঃদরপত্র নিয়েও প্রশ্ন

শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সাকিল আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি দায়িত্বে থেকে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, বিল পাসের বিপরীতে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। মেসার্স মোমিন সিকদার, মা এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স ও রাফিদ ট্রেডার্সের মাধ্যমে কাজ বণ্টন ও ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ১৪৪টি কাজের পুনঃদরপত্র আহ্বানে অনিয়ম এবং বাতিল হওয়া দরপত্রের পারফরম্যান্স সিকিউরিটির পে-অর্ডার বিধি অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নগদায়নের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে।প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের দরপত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগপত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঢাকা ও বরিশালে জমি ও ফ্ল্যাট ব্যবসায় অস্বাভাবিক বিনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত অসদাচরণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত সৈয়দ আবেদ আলীর সঙ্গে শহিদুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

এত অভিযোগের মধ্যেই শহিদুল ইসলামকে বরিশালের পাশাপাশি বরগুনা জেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁকে বরিশাল থেকে প্রত্যাহার এবং অভিযোগ তদন্তের দাবিতে সাধারণ ঠিকাদারদের উদ্যোগে মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

চার প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, সাবকন্ট্রাক্টের বৈধতা, বিল অনুমোদন এবং নিরাপত্তা জামানতের হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

 

মোজাহিদুল আলিফ: বিভাগীয় তদন্তে অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধের তথ্য

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে অতীতে নির্মাণকাজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি।৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়। অথচ ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে কমিটি দেখতে পায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ অসম্পন্ন রেখেই বিল পরিশোধের তথ্য উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।এর আগে সাভার জোনে দায়িত্ব পালনকালে কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ঠিকাদারকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, আগারগাঁওয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন প্রধান কার্যালয় নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্রে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে ঢাকা মেট্রো জোনে পদায়ন করা হয়েছে।

তবে আগের বিভাগীয় তদন্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্টরা তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

জাহেদুল করীম: বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা, ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ

জাহেদুল করীম বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত ওই কমিটি ঘোষণার সময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে তিনি প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দরপত্রে অনিয়ম, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সরোয়ার হোসেন: রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোতে কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

২০২২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি ছিলেন।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই অনুমোদিত বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার ১৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির ১৪ নম্বর সদস্য ছিলেন সরোয়ার হোসেন। সে সময় তিনি ঢাকা মেট্রোর সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

 

আরও পড়ুন:

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর: বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা ও সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি সরোয়ার এখনো ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন

 

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেট্রোর বিভিন্ন উন্নয়নকাজে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি। এ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একাংশের প্রশ্ন, একই কমিটির কয়েকজন সদস্যকে ওএসডি এবং ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও সরোয়ার হোসেন এখনো ঢাকা মেট্রোতে বহাল রয়েছেন কেন?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনকে প্রভাবিত করে তিনি নিজের পদায়ন ধরে রেখেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

সরোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের সঙ্গে তাঁর ছবি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতায় উসকানি ও অর্থায়নের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণিত তথ্য সামনে আসেনি।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্তের অগ্রগতি বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের পাহাড়, কিন্তু প্রশাসনিক জবাবদিহি কোথায়?

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শুধু একটি নির্মাণ সংস্থা নয়; দেশের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন এ অধিদপ্তর প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি থেকে শুরু করে দরপত্র আহ্বান ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বও পালন করে।

ফলে এ প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক প্রভাব, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট কিংবা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে শিক্ষা অবকাঠামোর মান, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতার ওপর।

অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা ও পারস্পরিক কোন্দলের কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন প্রশাসনিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দেশের একটি শীর্ষ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে। তবে এ বিষয়ে সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের  সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তিতে কয়েকটি বিষয় সামনে আসা জরুরি।

প্রথমত, আসাদুজ্জামানসহ পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কী বলেছে এবং সুপারিশ অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

দ্বিতীয়ত, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, পূর্বাচল মাধ্যমিক সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলিত ব্যয় ফাঁস ও ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ কতটা সত্য?

তৃতীয়ত, বরিশালের চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা কার হাতে? সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন কি না?

চতুর্থত, ১৪৪টি পুনঃদরপত্র এবং বাতিল হওয়া দরপত্রের পারফরম্যান্স সিকিউরিটির পে-অর্ডার নিয়ে ওঠা অভিযোগের আর্থিক নিরীক্ষা হয়েছে কি না?

পঞ্চমত, মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধের যে তথ্য উঠে এসেছিল, সে ঘটনায় সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না?

ষষ্ঠত, একই রাজনৈতিক সংগঠনের কমিটিতে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যরা বহাল থাকার কারণ কী?

 

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিই হওয়া উচিত দায়িত্ব পালনের প্রধান মানদণ্ড। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে তাঁদের অবস্থানও পরিষ্কার করা জরুরি।

অভিযোগের পর অভিযোগ, তদন্তের পর তদন্ত—তারপরও যদি জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর কি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়েছে, নাকি শুধু ক্ষমতার বলয় বদলেছে?

Popular post
বাংলাদেশে ঐতিহাসিক নির্বাচন: বিএনপি এগিয়ে, জামায়াতের উত্থান ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ফারুকীর সম্পদ কমেছে, তিশার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি: সম্পদ বিবরণী ঘিরে আলোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

গাজায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ।  ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী।    ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে,  স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ  বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”

সংসার সামলাতে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন রোজিনা

বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।

কুড়িগ্রামের তাজু ভাই ২.০: ‘সরকারি রেটে জিলাপি’ প্রশ্নে ভাইরাল এক নির্মাণশ্রমিকের গল্প

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে।  কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে।  কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।  কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি।  মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।

নিজস্ব প্রতিবেদক

অনুসন্ধানী সংবাদ

View more
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে আওয়ামী লীগপন্থী সিন্ডিকেট এখনো বহাল : দুর্নীতিবাজদের রক্ষায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান

ইত্তেহাদ নিউজ, ঢাকা : সরকার পরিবর্তন হয়েছে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এসেছে রদবদল। কিন্তু শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে এখনো বহাল রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের আলোচিত একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের বিরুদ্ধে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর নেতৃত্বে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছে। এই বলয়ে রয়েছেন বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম, চাঁদপুর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ,রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাহেদুল করীম এবং ঢাকা মেট্রোতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত  মো. সরোয়ার হোসেন। তাঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে  বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কমিটিতে দায়িত্ব পালন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই কর্মকর্তাদের একটি অংশ নিজেদের প্রশাসনিক প্রভাব ও ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক ধরে রেখেছেন। বিএনপি-সমর্থিত কয়েকজন ঠিকাদারকে সীমিতসংখ্যক কাজ দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ-সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী রাখতে অর্থ সরবরাহের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান ধরে রাখলেও বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীরা অনেক ক্ষেত্রে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে ক্ষমতার প্রভাব, অস্বচ্ছতা, দায়িত্বে অবহেলা, অদক্ষতা, দলাদলি, কোন্দল ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা পৃথক দুর্নীতির অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্তের নথি, ঠিকাদারদের লিখিত অভিযোগ এবং মানববন্ধনের ঘটনাও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সময়ে আবেদন ও অভিযোগ জমা পড়েছে। কয়েকটি অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত অভিযোগ ও তদন্তের পরও কীভাবে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অধিদপ্তরের  প্রভাবশালী বলয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? কে এই আসাদুজ্জামান: দরপত্র থেকে বিল পরিশোধ—ডজনখানেক অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের  তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে দরপত্র কারসাজি, প্রাক্কলিত ব্যয় ফাঁস, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধসহ প্রায় ডজনখানেক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একাধিকবার অভিযোগ ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রায় ৩২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ফাঁস করে ইলেকট্রো গ্লোব মিরন এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক যুবলীগ নেতা রাকিব হোসেন ৫ আগস্টের পর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আরও পড়ুন:  শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর: অভিযোগের পাহাড়, তার পরও বহাল তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান   একইভাবে রূপগঞ্জের পূর্বাচল মাধ্যমিক সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রায় ৩৫ কোটি টাকার নির্মাণকাজ সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের শ্বশুরের প্রতিষ্ঠান নূরানি কনস্ট্রাকশনকে পাইয়ে দিতে প্রাক্কলিত ব্যয় কমিয়ে ফাঁস করার অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রকল্পের দরপত্র কমিটির সভাপতি ছিলেন আসাদুজ্জামান। এ ছাড়া বিদায়ী প্রধান প্রকৌশলী আলতাফ হোসেনের দুর্নীতির অর্থ বণ্টনে আসাদুজ্জামান  ক্যাশিয়ারের ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার লিয়াকত শিকদারকে কোটি টাকার বিল দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি। দিনাজপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহ আলমের মালিকানাধীন মা এন্টারপ্রাইজকে বিভিন্ন জেলায় একচেটিয়া কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব লাইসেন্স অন্যদের ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এর বিনিময়ে দুই শতাংশ অর্থ আদায় করে। এর আগে নাটোরে দায়িত্ব পালনকালে বিলমারিয়া দাখিল মাদ্রাসা, বিলমারি উচ্চ বিদ্যালয় ও বারঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকাংশ বিল পরিশোধের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। রংপুরে দায়িত্ব পালনকালে ২০২০ সালের জুলাইয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০ কোটি টাকার একটি কাজ ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট এক নেতাকে পাইয়ে দিতে দরপত্রে কারসাজির অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তে গত বছরের ২৩ অক্টোবর আসাদুজ্জামানসহ পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং সুপারিশের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। এদিকে গত বছরের মে মাসে তাঁর পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) নেতিবাচক থাকা সত্ত্বেও সেই তথ্য গোপন বা পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট এসিআর, পদোন্নতি কমিটির কার্যবিবরণী ও প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।   বরিশালের শহিদুল: চার প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও ৭ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্বে থেকে চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, সাবকন্ট্রাক্টে কাজ বণ্টন, বিল ছাড়ে কমিশন দাবি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বরিশালের মেসার্স মোমিন সিকদার, দিনাজপুরের মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, চট্টগ্রামের ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং খুলনার মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের নামে বিভিন্ন কাজ নিয়ে পরে অন্য ঠিকাদারদের কাছে সাবকন্ট্রাক্টে দেওয়া হয়। এতে মূল কাজের বরাদ্দ, বিল ও আর্থিক লেনদেনে শহিদুল ইসলামের প্রভাব বজায় থাকে বলে অভিযোগ। ঠিকাদারদের ভাষ্য, এ ব্যবস্থায় সাবকন্ট্রাক্টে কাজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বিল ছাড় ও ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা জামানত কর্তনের ক্ষেত্রেও বিধি অনুসরণ না করার অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদাররা। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি কাজ শেষ করার পরও বিল আটকে রাখা এবং বিল ছাড়ের বিপরীতে কমিশন দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। বাড়তি অর্থের ব্যবস্থা না করলে ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।   আরও পড়ুন: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে  দুদকে অভিযোগ বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল যখন ঠিকাদার: ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ   শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বরিশাল ও ঢাকায় জমি, ফ্ল্যাট ও গাড়িসহ বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। ঠিকাদারি কাজের কমিশন, কাজের বরাদ্দ এবং সংশোধিত প্রাক্কলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা ও অর্থের উৎস যাচাইয়ে দুদকের তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া ব্যক্তিগত অসদাচরণ ও নারীসংক্রান্ত নানা অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে।  শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ, ১৪৪টি পুনঃদরপত্র নিয়েও প্রশ্ন শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সাকিল আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি দায়িত্বে থেকে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, বিল পাসের বিপরীতে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। মেসার্স মোমিন সিকদার, মা এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স ও রাফিদ ট্রেডার্সের মাধ্যমে কাজ বণ্টন ও ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া ১৪৪টি কাজের পুনঃদরপত্র আহ্বানে অনিয়ম এবং বাতিল হওয়া দরপত্রের পারফরম্যান্স সিকিউরিটির পে-অর্ডার বিধি অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নগদায়নের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে।প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের দরপত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঢাকা ও বরিশালে জমি ও ফ্ল্যাট ব্যবসায় অস্বাভাবিক বিনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত অসদাচরণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত সৈয়দ আবেদ আলীর সঙ্গে শহিদুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এত অভিযোগের মধ্যেই শহিদুল ইসলামকে বরিশালের পাশাপাশি বরগুনা জেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁকে বরিশাল থেকে প্রত্যাহার এবং অভিযোগ তদন্তের দাবিতে সাধারণ ঠিকাদারদের উদ্যোগে মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, সাবকন্ট্রাক্টের বৈধতা, বিল অনুমোদন এবং নিরাপত্তা জামানতের হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।   মোজাহিদুল আলিফ: বিভাগীয় তদন্তে অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধের তথ্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে অতীতে নির্মাণকাজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি।৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়। অথচ ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে কমিটি দেখতে পায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ অসম্পন্ন রেখেই বিল পরিশোধের তথ্য উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।এর আগে সাভার জোনে দায়িত্ব পালনকালে কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ঠিকাদারকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, আগারগাঁওয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন প্রধান কার্যালয় নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্রে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে ঢাকা মেট্রো জোনে পদায়ন করা হয়েছে। তবে আগের বিভাগীয় তদন্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্টরা তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। জাহেদুল করীম: বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা, ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ জাহেদুল করীম বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত ওই কমিটি ঘোষণার সময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে তিনি প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দরপত্রে অনিয়ম, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সরোয়ার হোসেন: রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোতে কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০২২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি ছিলেন। প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই অনুমোদিত বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ইইডি শাখার ১৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির ১৪ নম্বর সদস্য ছিলেন সরোয়ার হোসেন। সে সময় তিনি ঢাকা মেট্রোর সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।   আরও পড়ুন: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর: বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা ও সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি সরোয়ার এখনো ঢাকা মেট্রোতে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন   অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেট্রোর বিভিন্ন উন্নয়নকাজে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি। এ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একাংশের প্রশ্ন, একই কমিটির কয়েকজন সদস্যকে ওএসডি এবং ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও সরোয়ার হোসেন এখনো ঢাকা মেট্রোতে বহাল রয়েছেন কেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনকে প্রভাবিত করে তিনি নিজের পদায়ন ধরে রেখেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। সরোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের সঙ্গে তাঁর ছবি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতায় উসকানি ও অর্থায়নের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণিত তথ্য সামনে আসেনি। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্তের অগ্রগতি বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের পাহাড়, কিন্তু প্রশাসনিক জবাবদিহি কোথায়? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শুধু একটি নির্মাণ সংস্থা নয়; দেশের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন এ অধিদপ্তর প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি থেকে শুরু করে দরপত্র আহ্বান ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বও পালন করে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক প্রভাব, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট কিংবা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে শিক্ষা অবকাঠামোর মান, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতার ওপর। অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা ও পারস্পরিক কোন্দলের কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন প্রশাসনিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দেশের একটি শীর্ষ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে। তবে এ বিষয়ে সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের  সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তিতে কয়েকটি বিষয় সামনে আসা জরুরি। প্রথমত, আসাদুজ্জামানসহ পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কী বলেছে এবং সুপারিশ অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? দ্বিতীয়ত, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, পূর্বাচল মাধ্যমিক সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলিত ব্যয় ফাঁস ও ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ কতটা সত্য? তৃতীয়ত, বরিশালের চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা কার হাতে? সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন কি না? চতুর্থত, ১৪৪টি পুনঃদরপত্র এবং বাতিল হওয়া দরপত্রের পারফরম্যান্স সিকিউরিটির পে-অর্ডার নিয়ে ওঠা অভিযোগের আর্থিক নিরীক্ষা হয়েছে কি না? পঞ্চমত, মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধের যে তথ্য উঠে এসেছিল, সে ঘটনায় সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না? ষষ্ঠত, একই রাজনৈতিক সংগঠনের কমিটিতে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যরা বহাল থাকার কারণ কী?   শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিই হওয়া উচিত দায়িত্ব পালনের প্রধান মানদণ্ড। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে তাঁদের অবস্থানও পরিষ্কার করা জরুরি। অভিযোগের পর অভিযোগ, তদন্তের পর তদন্ত—তারপরও যদি জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর কি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়েছে, নাকি শুধু ক্ষমতার বলয় বদলেছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক নভেম্বর ৮, ২০২৬ 0

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর: অভিযোগের পাহাড়, তার পরও বহাল তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান

ঘুষের টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন প্রকৌশলী হাসান শওকত, দুর্নীতির অভিযোগ

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়

গণপূর্তে লটারির পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

কুয়াকাটায়মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল রিসোর্টের অনুমোদন না থাকায় নির্মাণকাজ বন্ধ করল প্রশাসন

মামুনুর রশীদ নোমানী | ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকা এবং কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যানে প্রকল্পের জমি রেলওয়ের স্থাপনার জন্য বরাদ্দ থাকার বিষয়টি সামনে এনে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে নির্মাণকাজ বন্ধের ঘটনাটি কেবল অনুমোদনের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পের জমির পরিমাণ, মালিকানা, বায়না দলিল, বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পটির প্রচারণায় ৩০ বিঘা জমির ওপর হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে তোলার কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হোটেল নির্মাণের জন্য কুয়াকাটা পৌরসভা থেকে প্রাথমিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল প্রায় ছয় বিঘা জমির বিপরীতে। অন্যদিকে, জমির একটি অংশ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। কিছু জমির বায়না দলিলের ক্ষেত্রে জমি হস্তান্তরের আগে বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদনের শর্তও রয়েছে। প্রকল্পটির সঙ্গে পিরোজপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর নাম যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে তাঁকে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিনিয়োগের প্রচারণায় প্রকল্পটিকে ‘হালাল ট্যুরিজম’ হিসেবে তুলে ধরে পাঁচ লাখ টাকা থেকে শেয়ার কেনার সুযোগের কথাও বলা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, জমির মালিকানা ও অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা নিষ্পত্তির আগেই কীভাবে প্রকল্পের বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরে শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে? আর প্রকল্পের জমি নিয়ে চলমান বিরোধের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে?   অনুমোদন না থাকায় নির্মাণকাজ বন্ধ মঙ্গলবার দুপুরে কুয়াকাটা পৌরসভা ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। পরে নির্মাণস্থলে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত একটি ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়। ব্যানারে উল্লেখ করা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ করায় নির্দেশক্রমে এর কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক।পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ করা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তা ছাড়া কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যানে ওই জমি রেলওয়ের স্থাপনার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। এসব কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিএস জরিপ অনুযায়ী জায়গাটি কুয়াকাটা পৌরসভার আওতাধীন। ছয় বিঘার অনুমোদন, প্রচারণায় ৩০ বিঘার প্রকল্প ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের প্রকল্পের আয়তন নিয়ে অনুসন্ধানে অসংগতি পাওয়া গেছে।নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, হোটেল নির্মাণের জন্য কুয়াকাটা পৌরসভায় জমা দেওয়া তফসিলে প্রকল্পের জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১ দশমিক ৯২ একর, যা প্রায় ৫ দশমিক ৭৪ বিঘার সমান। গত ৭ জানুয়ারি পৌরসভা থেকে এ জমির বিপরীতে প্রাথমিক অনুমোদন নেওয়া হয়। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণায় ৩০ বিঘা জমির ওপর প্রকল্প গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার ছয় মাস আগেই ৩০ বিঘার প্রকল্পের কথা বলে শেয়ার বিক্রি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত জমির বাইরে আরও কিছু জমি কেনার জন্য বায়না করা হয়েছে। তবে বায়না করা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং হস্তান্তরে আইনি শর্ত থাকায় প্রকল্পের জমির প্রকৃত পরিমাণ ও মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের প্রকল্পের জন্য ২১ বিঘা জমি কেনা হয়েছে এবং বাকি নয় বিঘার বায়না করা হয়েছে। তবে এ দাবির সমর্থনে জমির দলিল দেখতে চাওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা তা দেখাতে পারেননি বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।   ৪৩ হাজার ৬০০ শেয়ার, ২৬ হাজার প্যাকেজের পরিকল্পনা প্রকল্পের জমি কেনা ও অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়গুলো পুরোপুরি নিষ্পত্তির আগেই ৩০ বিঘা জমির হিসাব ধরে শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটিকে ৪৩ হাজার ৬০০ শেয়ারে ভাগ করা হয়েছে। এসব শেয়ার বিক্রির জন্য ২৬ হাজার প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রায় ১০ হাজার প্যাকেজে অন্তত ২২ হাজার শেয়ার ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে।এই হিসাবের ভিত্তিতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পের জমির পরিমাণ ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকা অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকল্পের সম্পূর্ণ পরিসর কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।   দলিল দেখাতে পারেননি বিক্রয় কর্মকর্তা ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হলে ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মো. রাকিবুল ইসলাম দাবি করেন, ২১ বিঘা জমি কেনা হয়েছে এবং বাকি নয় বিঘা জমির বায়না করা হয়েছে। তবে এ-সংক্রান্ত দলিল দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।রাকিবুল ইসলাম বলেন, “কয়টি শেয়ার কিনবেন? এক-দুটি শেয়ার কিনলে জমি বায়নার কাগজপত্র দেখাতে পারব না। যারা নিচ্ছে বিশ্বাস করেই বুকিং মানি ও ডাউনপেমেন্ট দিচ্ছে।” প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিনও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তাঁর ভাষ্য, বিনিয়োগকারীদের কেউই পূর্ণাঙ্গ দলিলপত্র কিংবা অনুমোদন দেখতে চান না; বরং প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর বক্তব্যে বিশ্বাস করে তাঁরা বিনিয়োগ করছেন। তবে বিনিয়োগকারীরা নথিপত্র দেখতে চাইছেন কি না, সেটি জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন কিংবা বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার বিকল্প হতে পারে না। বিশেষ করে প্রকল্পের আয়তন ও মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। বায়না করা জমির হস্তান্তরে শর্ত অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক কুয়াকাটায় ১৬ জনের কাছ থেকে ১৭ দশমিক ৫৫৯ বিঘা জমির বায়না দলিল করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।এসব জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। এ কারণে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিস বায়না দলিলের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করেছে।শর্ত অনুযায়ী, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে অনুমতি পাওয়ার পর জমি হস্তান্তর করা যাবে। অন্যথায় বায়না চুক্তির মেয়াদ বাড়বে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জমির বায়না দলিল হওয়া এবং জমির চূড়ান্ত মালিকানা আইনগতভাবে হস্তান্তরিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে বায়না করা জমিকে প্রকল্পের নিশ্চিত মালিকানাধীন জমি হিসেবে উপস্থাপনের আগে দলিলের শর্ত, আদালতের আদেশ এবং হস্তান্তরের অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।   জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের দাবি ইস্তানবুল হোটেল প্রকল্পের জমি নিয়ে একাধিক পক্ষ মালিকানা দাবি করেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিকানা দাবি করে পটুয়াখালীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করেছেন স্থানীয় চার বাসিন্দা—কাজলী বেগম, নাজমুন নাহার, মো. আসলাম ও মো. লিটন মিয়া। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির ওপর তাঁদের উত্তরাধিকারসূত্রে অধিকার রয়েছে। এ ছাড়া কুয়াকাটার বালিয়াতলীর হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লির বাসিন্দারাও জমির মালিকানা দাবি করেছেন। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল কুয়াকাটা কলাপাড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে রাখাইন সম্প্রদায়ের পক্ষে জমির মালিকানা দাবি করেন বোচান। তাঁর অভিযোগ, ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের জন্য নির্ধারিত জমির রেকর্ড সিএস, আরএস ও এসএ খতিয়ানে তাঁদের পূর্বপুরুষদের নামে ছিল। কিন্তু সেখানে প্রভাবশালীরা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছেন। জমির অধিকার ফিরে পেতে রাখাইন সম্প্রদায়ের পক্ষে বোচান ২০২৪ সালের নভেম্বরে পটুয়াখালীর যুগ্ম জেলা জজ আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলায় আব্দুল জব্বার হাওলাদারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তিনি নিজেকে জমির দাতা দাবি করে ইস্তানবুল হোটেলের সঙ্গে ১৭ দশমিক ৫৫৯ বিঘা জমি বিক্রির বায়না করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলায় মোট ৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে, হোটেল কর্তৃপক্ষ রাখাইন সম্প্রদায়ের মালিকানা দাবি নাকচ করেছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: ‘আমরা ১৯ একর জমি কিনেছি’ জমি নিয়ে বিরোধ ও প্রকল্পের আয়তন সম্পর্কে জানতে চাইলে ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক বলেন, “আমরা এ পর্যন্ত ১৯ একর জমি কিনেছি। তার মধ্যে অধিকাংশ সাবকবলা মূলে দলিল হয়েছে। কিছু আছে বায়না রেজিস্ট্রি।” ছয় বিঘার জমির বিপরীতে প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে আরও বেশি জমির কথা বলে প্রকল্প পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা প্রথমে ১০ একরের ওপর পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন সেটি এক্সটেনশন (বর্ধিত) হবে। এজন্য ২১ একর জমি নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।” রাখাইন সম্প্রদায়ের মালিকানা দাবির বিষয়ে এমদাদুল হক বলেন, “এটি একদম ভুয়া, ভিত্তিহীন। তার কাছে ডকুমেন্ট চান, আমি চ্যালেঞ্জ করছি সে আপনাকে দিতে পারবে না। কারণ বিএস, আরএস, এসএ কোনোটাই তাদের কাছে নেই।” প্রকল্পের সঙ্গে মাসুদ সাঈদীর সংশ্লিষ্টতা ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে পিরোজপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি জামায়াতের প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটেও চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ সাঈদীর নাম ও ছবি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সেখানে একে বাংলাদেশের ‘হালাল ট্যুরিজম’ প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে শেয়ারের মালিক হওয়ার সুযোগের কথা বলা হয়। তবে প্রকল্পের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা থাকলেই কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। একইভাবে, প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য জমির মালিকানা, অনুমোদন ও বিনিয়োগসংক্রান্ত নথির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে মাসুদ সাঈদীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এখন সামনে যেসব প্রশ্ন প্রশাসনের নির্মাণকাজ বন্ধের সিদ্ধান্তের পর ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের অনুমোদন, জমির মালিকানা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রথমত, পৌরসভার প্রাথমিক অনুমোদনের শর্তগুলো পূরণ করা হয়েছে কি না এবং মাস্টারপ্ল্যানে রেলওয়ের স্থাপনার জন্য বরাদ্দ জমিতে প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়ার আইনগত সুযোগ আছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের জন্য কেনা জমির দলিল, বায়না করা জমির অবস্থা, আদালতে চলমান মামলাগুলো এবং বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদনসংক্রান্ত শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ৩০ বিঘা জমির প্রকল্প হিসেবে শেয়ার ও প্যাকেজ বিক্রির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের কী তথ্য দেওয়া হয়েছে, কত অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং শেয়ারগুলোর বিপরীতে কী ধরনের আইনগত অধিকার সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রকাশ করা জরুরি। চতুর্থত, জমির মালিকানা নিয়ে দাবিদার পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং হোটেল কর্তৃপক্ষের পাল্টা বক্তব্য নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করে বিরোধের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কুয়াকাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। সেখানে বড় বিনিয়োগের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনগত অনুমোদন, জমির মালিকানা ও বিনিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব নয়; এটি বিনিয়োগকারী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং জনস্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ও জমির বিরোধের নিষ্পত্তি, আইনগত শর্ত পূরণ এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতার ওপর।

নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ২৮, ২০২৬ 0

বিএডিসির ২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, নিম্নমানের হারভেস্টারে ক্ষতিগ্রস্ত বীজ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: নগর পরিকল্পনা বিভাগে সনদ জালিয়াতির অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে নিয়োগপ্রক্রিয়া

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট : বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকা নিয়ে ক্ষোভ

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর barisal
দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতুর টোল :বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন :  বরিশালের দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় বা ‘খাস কালেকশন’ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই সেতু থেকে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা টোল আদায় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে ৪২ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্কের পার্থক্য ৫৩ কোটি টাকা।  অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম। তাঁর নির্দেশে দৈনিক প্রকৃত টোল আদায়ের তুলনায় কম অর্থ সরকারি হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।  ইজারার মেয়াদ শেষ, শুরু হয় খাস কালেকশন সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কের ১৪৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দোয়ারিকা সেতু এবং ১৪৬তম কিলোমিটারে অবস্থিত মেজর এম এ জলিল শিকারপুর সেতুর আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন। এরপর তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে ‘চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস’কে নতুন ইজারাদার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল । কিন্তু নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সওজ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির জামানত বাজেয়াপ্ত করে। এরপর নতুন করে ইজারা কার্যকর না করে সওজের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু হয়, যা ‘খাস কালেকশন’ নামে পরিচিত। সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় পদ্ধতিতে প্রতিদিন কত টাকা আদায় হয়েছে, কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্যের স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় টোল আদায়ের হিসাব ও সরকারি জমার অঙ্কের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। দৈনিক আদায় ১৩ লাখ টাকা, জমা ৫ লাখ ৭৬ হাজার? অভিযোগে বলা হয়েছে, খাস কালেকশন চলাকালে দুই সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি টোল আদায় হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি কোষাগারে দৈনিক গড়ে ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উত্থাপিত হিসাব অনুযায়ী— মোট টোল আদায়: প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। সরকারি কোষাগারে জমা: প্রায় ৪২ কোটি টাকা। দুই অঙ্কের পার্থক্য: ৫৩ কোটি টাকা। এই হিসাব সঠিক হলে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি জমার হিসাবে প্রতিফলিত হয়নি। কিন্তু এই পার্থক্যকে সরাসরি আত্মসাৎ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে টোল আদায়ের রসিদ, ব্যাংক জমার চালান, দৈনিক হিসাববই, ট্রাফিকের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে, ৯৫ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৪২ কোটি টাকা জমার তথ্য কোন সময়সীমা ও কোন সরকারি হিসাব থেকে নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। এসব নথি ছাড়া ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্যের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়। সওজের চিঠিতে ইজারা মূল্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন করে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সওজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠিতে উল্লেখিত রাজস্বের হিসাব। প্রতিবেদনটির জন্য সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সর্বোচ্চ দরদাতা ‘আতিক কনস্ট্রাকশন’-এর অনুকূলে তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। ওই চিঠিতে খাস কালেকশনের ভিত্তিতে তিন বছরে সরকারি আয় ৬৩ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ৮৫ কোটি টাকার ইজারা মূল্য এই হিসাবের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে ৮৫ কোটি টাকা, ৬৩ কোটি টাকার চেয়ে প্রায় ৩৫.৩৯ শতাংশ বেশি।  তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তিন বছরের সম্ভাব্য খাস কালেকশনের আয় এবং তিন বছরের ইজারা মূল্য সরাসরি তুলনা করে রাজস্বের সম্ভাব্য ব্যবধান বোঝা গেলেও, সেই ব্যবধানের পুরোটাই নিশ্চিত সরকারি ক্ষতি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ইজারার শর্ত, আদায়ব্যয়, অনুমোদনের সময়, অর্থ জমার নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। তবু সরকারি নথিতে উল্লিখিত এই তুলনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইজারা কার্যকর হতে দেরি হলে তার আর্থিক প্রভাব কী ছিল এবং এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? ৫৩ কোটি টাকার অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে সম্ভব? দুই সেতুর টোল আদায় নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয়ে নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিনের টোল আদায়ের রেজিস্টার, টিকিটের হিসাব এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার চালান সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো ৪২ কোটি টাকার হিসাবের সঙ্গে সওজের হিসাববই এবং ব্যাংক বিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টোল আদায়ের অর্থ পরিবহন, কর্মীদের পারিশ্রমিক বা অন্য অনুমোদিত খাতে ব্যয় হয়ে থাকলে তার নথিও পরীক্ষা করা দরকার। তৃতীয়ত, ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আগের ইজারা অনুমোদন, প্রথম কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা, জামানত বাজেয়াপ্তকরণ এবং পরবর্তী ইজারা প্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। চতুর্থত, ২০২৬ সালের ১২ মার্চের চিঠিতে উল্লেখিত ৬৩ কোটি টাকার হিসাব এবং আতিক কনস্ট্রাকশনের ৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাবের ভিত্তি যাচাই করতে হবে। এতে খাস কালেকশন ও ইজারা ব্যবস্থার মধ্যে রাজস্বের প্রকৃত পার্থক্য নির্ণয় করা সহজ হবে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতু দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কের অংশ। সেতু দুটির টোল থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে টোল আদায় ও জমার হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁর বক্তব্য, দায়িত্ব বণ্টন, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি এবং আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা ও টোল আদায়ের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্য একটি গুরুতর আর্থিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। কিন্তু সেই অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কারা দায়ী এবং কীভাবে তা ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রামাণ্য নথি ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে। সরকারি রাজস্বের সুরক্ষা এবং জনগণের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো: দুই সেতুর টোল আদায়, ব্যাংকে জমা এবং ইজারা-সংক্রান্ত সব হিসাব প্রকাশ করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের ওপর অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু এবং মেজর এম এ জলিল সেতু দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর ওপর ৩৯০ মিটার দীর্ঘ দোয়ারিকা সেতু এবং উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ শিকারপুর সেতু মিলে প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন হওয়া এই সেতু দুটির নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুই বীরের স্মরণে। প্রতিদিন এই দুই সেতু দিয়ে চলাচল করে দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং পণ্যবাহী যানবাহন।সেতু দুটির টোল ইজারার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ছিয়ানব্বই দিনের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় সেতু দুটির টোল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই সেতু দুটির টোল আয় প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়। সে সময় প্রতিদিন ন্যূনতম ৯ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত টোল আদায় হওয়ার তথ্য প্রকাশ পায়। ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ইজারার জন্য মূল্যায়ন ছাড়া আগের মূল্যের সঙ্গে মাত্র সাত শতাংশ যোগ করে তা অনুমোদনের চেষ্টা হলে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর শঙ্কার কথা তখনই উঠেছিল।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার অধীনে মামলা হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের হাতে ন্যস্ত। ফলে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অভিযোগকারীকে তা প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশন বা সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ আকারে উপস্থাপনের আইনি পথও রয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ২০, ২০২৬ 0

বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ

ঢাকা জেলা প্রশাসকের এলএ শাখা-২: সার্ভেয়ার আফজাল হোসেনের ঘুষ বাণিজ্যে জিম্মি জনগণ

উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার

ধানমন্ডি ৩২ থেকে ভোলা গণপূর্ত: আবুল বাশারের সম্পদ, রাজনৈতিক পরিচয় ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংক,

ইসলামী ব্যাংকে আস্থা সংকট কেন কাটছে না?: দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ২২, ২০২৬ 0




অপরাধ

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে ৩০ বিলিয়ন ডলার জালিয়াতি ও অর্থপাচার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ২৪, ২০২৬ 0




কৃষি ও জলবায়ু

ধান

শেরপুরে বোরো ধানের দাম কমে লোকসানে কৃষকরা, উৎপাদন খরচও উঠছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৬, ২০২৬ 0