ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সরকার পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও বদলায়। কিন্তু পাসপোর্ট করতে দালালকে টাকা দেওয়া, জমির নামজারি দ্রুত করাতে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা তদন্ত এগিয়ে নিতে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন—এসব যেন বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা।
প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও কেন সেবা খাতের ঘুষ-দুর্নীতির ধরন বদলায় না?
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ প্রকাশের পর বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। জরিপ বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি সেবা খাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আগের জরিপের তুলনায় যা ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে অন্তত একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৩ সালের জরিপে এ হার ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি কেন কমেনি। আবার অনেকে জানতে চাইছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে পরিস্থিতির আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না।
তবে তথ্য বলছে, এই দুই প্রশ্নের উত্তর এক নয়।
টিআইবির জরিপ মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার এক বছরের সেবা খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে।
জরিপ অনুযায়ী, শুধু ঘুষের মোট অঙ্কই বাড়েনি, বেড়েছে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের সংখ্যাও।
২০২৩ সালে যেখানে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা নিতে ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল, সর্বশেষ জরিপে তা বেড়ে হয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ সেবার তালিকায় রয়েছে—
পাসপোর্ট সেবা নিতে যাওয়া ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
বিআরটিএ সেবায় দুর্নীতির অভিজ্ঞতার হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ।
জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো, ঘুষ দেওয়া পরিবারগুলোর ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া সম্ভব হতো না কিংবা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তো।
অর্থাৎ, বহু ক্ষেত্রে ঘুষ এখন বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং নাগরিকের কাছে কার্যত সেবা পাওয়ার অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে।
পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় নেমে এলেও টিআইবি বলছে, এটিকে দুর্নীতি কমার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যাবে না।
কারণ, ব্যক্তি প্রতি ঘুষের অঙ্ক কমলেও আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির বিস্তার বেড়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপস্থিত হয়ে সরকারি সেবা নিয়েছেন।
অন্যদিকে অনলাইনে সেবা নিয়েছেন মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যোগাযোগের এই উচ্চ হার দালাল চক্র, ফাইল আটকে রাখা, দ্রুত সেবা দেওয়ার নামে অর্থ আদায় এবং কর্মকর্তা-সেবাগ্রহীতার অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগ বহাল রেখেছে।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য রয়েছে।
বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয় ১৭ ফেব্রুয়ারি।
অন্যদিকে টিআইবির প্রকাশিত জাতীয় জরিপটি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা।
ফলে পরিসংখ্যানগতভাবে এখনই বলা সম্ভব নয়, বর্তমান সরকারের সময়ে সেবা খাতের ঘুষ কমেছে, বেড়েছে নাকি একই অবস্থায় রয়েছে।
তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে টিআইবি।
সেখানে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তিগত বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সংস্থাটি বলেছে, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য এখনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, বিচারব্যবস্থা ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দুর্নীতি দমনে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
কিন্তু বর্তমান সরকারের শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকটে পড়ে।
গত মার্চে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার একযোগে পদত্যাগ করার পর প্রায় সাড়ে তিন মাস কমিশনের অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন, চার্জশিট, সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেফতারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সরকার ইতোমধ্যে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন করেছে এবং আবেদনও আহ্বান করেছে।
তবে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব না পাওয়া পর্যন্ত কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের পর জাতীয় সংসদেও বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সরকারি দলের সদস্যরা ১২ হাজার কোটি টাকার ঘুষের হিসাব তুলে ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেন।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের হিসাব নয়।
বরং নাগরিকরা সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যে ঘুষ দিয়েছেন, তার সামগ্রিক অর্থমূল্য।
ফলে এই অর্থকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত দুর্নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে সেবা খাতের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট সরকারের ওপর বর্তায় বলে সরকারি বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দুর্নীতি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এর কোনো তামাদি নেই। অভিযোগ যে সময়েরই হোক, দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে এবং করা উচিত। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা থাকবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মাসুদ কামালের মতে, সেবা খাতের দুর্নীতি বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা তুলনামূলকভাবে বেড়েছিল।
তার ভাষায়, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের মধ্যে শাস্তির ভয় দুর্বল হয়ে পড়ায় ঘুষের প্রবণতাও বেড়েছে।
তিনি বলেন,
"দুর্নীতি বন্ধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের সমান প্রয়োগ। কেউ যদি বিশ্বাস করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার বিচার হবে না, তাহলে দুর্নীতি কখনও কমবে না।"
আরও বলেন,
"দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবণতা চলতেই থাকবে। সরকার আওয়ামী লীগের হোক, অন্তর্বর্তী সরকারের হোক কিংবা বিএনপির—প্রশাসনের একই লোকজন যদি শাস্তির ভয় না পায়, তাহলে সেবা খাতের ঘুষও বন্ধ হবে না।"
টিআইবির জরিপ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেবা খাতের দুর্নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না।
কারণ, ঘুষের সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাঠামো, জবাবদিহির দুর্বলতা, সীমিত ডিজিটাল সেবা, দালালনির্ভর প্রক্রিয়া এবং শাস্তিহীনতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে পাসপোর্ট অফিস, ভূমি কার্যালয়, থানা, বিআরটিএ, আদালত কিংবা ব্যাংকে সাধারণ মানুষ বাস্তবে ঘুষ ছাড়াই সেবা পেতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের সফলতা পরিমাপ হবে নাগরিকের অভিজ্ঞতায়—প্রতিশ্রুতিতে নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সরকার পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও বদলায়। কিন্তু পাসপোর্ট করতে দালালকে টাকা দেওয়া, জমির নামজারি দ্রুত করাতে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা তদন্ত এগিয়ে নিতে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন—এসব যেন বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও কেন সেবা খাতের ঘুষ-দুর্নীতির ধরন বদলায় না? সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ প্রকাশের পর বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। জরিপ বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি সেবা খাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আগের জরিপের তুলনায় যা ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে অন্তত একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৩ সালের জরিপে এ হার ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি কেন কমেনি। আবার অনেকে জানতে চাইছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে পরিস্থিতির আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না। তবে তথ্য বলছে, এই দুই প্রশ্নের উত্তর এক নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার এক বছরের চিত্র টিআইবির জরিপ মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার এক বছরের সেবা খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। জরিপ অনুযায়ী, শুধু ঘুষের মোট অঙ্কই বাড়েনি, বেড়েছে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের সংখ্যাও। ২০২৩ সালে যেখানে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা নিতে ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল, সর্বশেষ জরিপে তা বেড়ে হয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ সেবার তালিকায় রয়েছে— পাসপোর্ট বিআরটিএ বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ভূমি অফিস পাসপোর্ট সেবা নিতে যাওয়া ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। বিআরটিএ সেবায় দুর্নীতির অভিজ্ঞতার হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ। "ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া কঠিন" জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো, ঘুষ দেওয়া পরিবারগুলোর ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া সম্ভব হতো না কিংবা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তো। অর্থাৎ, বহু ক্ষেত্রে ঘুষ এখন বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং নাগরিকের কাছে কার্যত সেবা পাওয়ার অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে। পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় নেমে এলেও টিআইবি বলছে, এটিকে দুর্নীতি কমার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ, ব্যক্তি প্রতি ঘুষের অঙ্ক কমলেও আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির বিস্তার বেড়েছে। ডিজিটাল সেবা এখনও সীমিত জরিপে দেখা গেছে, ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপস্থিত হয়ে সরকারি সেবা নিয়েছেন। অন্যদিকে অনলাইনে সেবা নিয়েছেন মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যোগাযোগের এই উচ্চ হার দালাল চক্র, ফাইল আটকে রাখা, দ্রুত সেবা দেওয়ার নামে অর্থ আদায় এবং কর্মকর্তা-সেবাগ্রহীতার অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগ বহাল রেখেছে। বর্তমান সরকারের সময় পরিস্থিতি কি বদলেছে? এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য রয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। অন্যদিকে টিআইবির প্রকাশিত জাতীয় জরিপটি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা। ফলে পরিসংখ্যানগতভাবে এখনই বলা সম্ভব নয়, বর্তমান সরকারের সময়ে সেবা খাতের ঘুষ কমেছে, বেড়েছে নাকি একই অবস্থায় রয়েছে। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে টিআইবি। সেখানে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তিগত বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলেছে, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য এখনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, বিচারব্যবস্থা ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। দুদকের নেতৃত্বে দীর্ঘ শূন্যতা দুর্নীতি দমনে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু বর্তমান সরকারের শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকটে পড়ে। গত মার্চে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার একযোগে পদত্যাগ করার পর প্রায় সাড়ে তিন মাস কমিশনের অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন, চার্জশিট, সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেফতারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সরকার ইতোমধ্যে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন করেছে এবং আবেদনও আহ্বান করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব না পাওয়া পর্যন্ত কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সংসদে রাজনৈতিক বিতর্ক টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের পর জাতীয় সংসদেও বিষয়টি আলোচনায় আসে। সরকারি দলের সদস্যরা ১২ হাজার কোটি টাকার ঘুষের হিসাব তুলে ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের হিসাব নয়। বরং নাগরিকরা সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যে ঘুষ দিয়েছেন, তার সামগ্রিক অর্থমূল্য। ফলে এই অর্থকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত দুর্নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে সেবা খাতের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট সরকারের ওপর বর্তায় বলে সরকারি বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দুর্নীতি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এর কোনো তামাদি নেই। অভিযোগ যে সময়েরই হোক, দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে এবং করা উচিত। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা থাকবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষজ্ঞ কী বলছেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মাসুদ কামালের মতে, সেবা খাতের দুর্নীতি বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা তুলনামূলকভাবে বেড়েছিল। তার ভাষায়, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের মধ্যে শাস্তির ভয় দুর্বল হয়ে পড়ায় ঘুষের প্রবণতাও বেড়েছে। তিনি বলেন, "দুর্নীতি বন্ধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের সমান প্রয়োগ। কেউ যদি বিশ্বাস করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার বিচার হবে না, তাহলে দুর্নীতি কখনও কমবে না।" আরও বলেন, "দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবণতা চলতেই থাকবে। সরকার আওয়ামী লীগের হোক, অন্তর্বর্তী সরকারের হোক কিংবা বিএনপির—প্রশাসনের একই লোকজন যদি শাস্তির ভয় না পায়, তাহলে সেবা খাতের ঘুষও বন্ধ হবে না।" অনুসন্ধানের সারকথা টিআইবির জরিপ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেবা খাতের দুর্নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না। কারণ, ঘুষের সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাঠামো, জবাবদিহির দুর্বলতা, সীমিত ডিজিটাল সেবা, দালালনির্ভর প্রক্রিয়া এবং শাস্তিহীনতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে পাসপোর্ট অফিস, ভূমি কার্যালয়, থানা, বিআরটিএ, আদালত কিংবা ব্যাংকে সাধারণ মানুষ বাস্তবে ঘুষ ছাড়াই সেবা পেতে পারেন। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের সফলতা পরিমাপ হবে নাগরিকের অভিজ্ঞতায়—প্রতিশ্রুতিতে নয়।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন বেনজীর আহমেদ। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাবের মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা একসময় দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিই এখন দুর্নীতি, অর্থপাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন, জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একাধিক মামলার আসামি। দুবাইয়ে তার গ্রেফতারের খবর প্রকাশের পর নতুন করে সামনে এসেছে প্রশ্ন—কীভাবে রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী কর্মকর্তা এমন অবস্থায় পৌঁছালেন, এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা কতটা সম্ভব? অভিযোগ থেকে অনুসন্ধান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পদ, পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ সঞ্চয় এবং প্রভাব খাটিয়ে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ প্রকাশিত হচ্ছিল। তবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এসব অভিযোগ কখনও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মুখ দেখেনি। পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল। সেদিন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার সম্পদ অনুসন্ধানে একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল গঠন করে। এরপর ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত বদলাতে থাকে। দেশত্যাগের সেই রাত দুদকের অনুসন্ধান শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, ২০২৪ সালের ৪ মে রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দুবাইয়ের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ। বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সহায়তায় তিনি দ্রুত ইমিগ্রেশনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। এরপর প্রায় দুই বছর তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করেন। দুবাইয়ে গ্রেফতার: নতুন অধ্যায়ের সূচনা দুদকের মামলার ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে ইন্টারপোলের সহায়তায় আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি প্রক্রিয়া শুরু হয়। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আদালত তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। অবশেষে ১২ জুন দুবাইয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি অবহিত করেন। বাংলাদেশ পুলিশের একাধিক সূত্র এবং দুদক কর্মকর্তারাও গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে গ্রেফতার হওয়া মানেই দ্রুত দেশে ফেরত আসা নয়। এখন শুরু হতে পারে দীর্ঘ আইনি, কূটনৈতিক ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া। সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মোট প্রায় ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী— বেনজীর আহমেদ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। বড় মেয়ে ফারিহা রিশতা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনা হয়েছে। ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, তার নামে গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, তিনটি বিও হিসাব এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। অর্থপাচারের সন্দেহ তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। দুদকের তথ্যমতে, বেনজীর আহমেদ প্রায় ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করলেও সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কতগুলো মামলার মুখোমুখি? বর্তমানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগের মধ্যে রয়েছে— অবৈধ সম্পদ অর্জন সম্পদের তথ্য গোপন অর্থপাচার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া কয়েকটি মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়েছে। শাপলা চত্বর থেকে টিএফআই সেল ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেনজীর আহমেদ অভিযুক্ত। সেই সময়ে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন। এছাড়া র্যাবের টিএফআই সেলে গুম ও গোপন আটকের অভিযোগসংক্রান্ত মামলাতেও তার নাম রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। বিতর্কিত পাসপোর্ট ইস্যু বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আরেকটি আলোচিত অভিযোগ সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে দেখিয়ে পাসপোর্ট গ্রহণ। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে র্যাবের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় পাসপোর্ট নবায়নের আবেদনে আপত্তি জানিয়েছিল পাসপোর্ট অধিদপ্তর। পরে র্যাব সদর দপ্তরের বিশেষ অনুরোধে দ্রুত তার পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। এমনকি তার বাসভবনে গিয়ে ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। জমি, রিসোর্ট এবং স্থানীয়দের অভিযোগ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার প্রভাবের কারণে অনেক ভূমির মালিক—বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা—জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল এলাকায় ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর গড়ে ওঠা সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কও তদন্তের আওতায় আসে। আদালতের নির্দেশে রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা জব্দ করে জেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তার পরিবারের মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল স্থাপনা নিয়েও তদন্ত চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্তদের তালিকায় ছিলেন বেনজীর আহমেদও। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় র্যাবের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দেশে ফিরিয়ে আনা কতটা সহজ? সাধারণভাবে অনেকেই মনে করেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হলেই কোনো আসামিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। ইন্টারপোলের নিজস্ব কোনো গ্রেফতারকারী বাহিনী নেই। তারা মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বয় করে। কোনো ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন হয়— সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের অনুমোদন স্থানীয় আইনি প্রক্রিয়া প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত কূটনৈতিক সমন্বয় বাংলাদেশ অতীতে কয়েকজন আলোচিত আসামিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে সফল হয়েছে। তবে পি কে হালদার কিংবা আরাভ খানের মতো মামলাগুলো দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘ ও জটিল হতে পারে। একটি ক্ষমতার পতন বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিচারিক সত্যতা এখনও আদালতেই নির্ধারিত হবে। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যে স্পষ্ট—একসময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন কর্মকর্তা আজ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি। দুবাইয়ে তার গ্রেফতার শুধু একটি ব্যক্তিগত বা আইনি ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, ক্ষমতার ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানগত দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন সাবেক পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক গ্রেফতার নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর বহু বছর ধরেই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এক ভিন্ন বাস্তবতার জনপদ হিসেবে। প্রশাসনের ভাষায় এটি “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা”, আর স্থানীয়দের কাছে—“দেশের ভেতর আরেক দেশ”। রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসন কিংবা সরকারি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে এখানে দীর্ঘদিন বেশি কার্যকর ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি, প্লট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রনির্ভর আধিপত্যের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এক জটিল অপরাধ অর্থনীতি। গত জানুয়ারিতে র্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনার পর বড় ধরনের অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তখন দাবি করা হয়েছিল, জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ “রাষ্ট্রের হাতে ফিরে এসেছে”। কিন্তু রবিবার মধ্যরাতে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা সেই দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মধ্যরাতের হামলা: দুই ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি রাত প্রায় ১টা। সীতাকুণ্ডের আলীনগর স্কুলে স্থাপিত যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিল র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যরা। হঠাৎ পাশের পাহাড়ি এলাকার কয়েকটি টিনের ঘর থেকে শুরু হয় গুলিবর্ষণ। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, টিনের দেয়াল ও চালে আগে থেকেই ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি করে পরিকল্পিতভাবে ফায়ারিং পজিশন তৈরি করা হয়েছিল। আকস্মিক এই হামলার পর পাল্টা অবস্থান নেয় যৌথ বাহিনী। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গোলাগুলিতে পুরো এলাকা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। একই সময় সন্ত্রাসীদের আরেকটি দল পাশেই নির্মাণাধীন যৌথ বাহিনীর নতুন ক্যাম্পে হামলা চালায়। সেখানে থাকা একটি এক্সকাভেটর ব্যবহার করে ভবনের বিভিন্ন অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, ক্যাম্পটির প্রায় ৯০ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সেটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল। হামলার পুনরাবৃত্তি কেন? জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা নতুন নয়। গত ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গিয়ে সশস্ত্র হামলার মুখে পড়ে র্যাবের একটি দল। ওই ঘটনায় নিহত হন র্যাব কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব। আহত হন আরও তিন সদস্য। এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বড়ইতলা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। আহত হন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন। স্থানীয়দের মতে, প্রতিবারই প্রশাসন অভিযান চালালেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে যায়। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ‘অপরাধ অর্থনীতি’ জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান বাস্তবতা মূলত পাহাড় দখল ও জমি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন ৩৪টি পাহাড় কেটে প্রায় ৫৮৬ একর সরকারি জমিতে প্রায় ১৪ হাজার প্লট তৈরি করেছে। অন্যদিকে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’ আরও তিনটি পাহাড় কেটে ২৩৬ একর জমিতে আড়াই হাজারের বেশি প্লট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্লট ৫ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এলাকাজুড়ে চালু রয়েছে কথিত “টোকেন সিস্টেম”। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে টোকেন সংগ্রহের মাধ্যমে পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর সেই জমি বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ভূমি অফিসের জরিপে অন্তত ৩৭টি পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কীভাবে গড়ে উঠল ‘অন্য এক শাসনব্যবস্থা’? স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গম পাহাড়ি অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরেই জঙ্গল সলিমপুর অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নব্বইয়ের দশকে ভূমিদস্যু আলী আক্কাসের হাত ধরে শুরু হয় পাহাড় দখল ও অবৈধ নিয়ন্ত্রণের বিস্তার। ২০১০ সালে র্যাবের অভিযানে আলী আক্কাস নিহত হওয়ার পর তার অনুসারীরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। বর্তমানে রোকন মেম্বার, মশিউর, ইয়াছিন, ফারুক, গাজী সাদেক, গফুর মেম্বার, রিপন ও আল আমিন সাগরসহ একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের নাম স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এসব গ্রুপের মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইয়াছিন: শ্রমিক থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, রবিবারের হামলার পেছনে ছিল ইয়াছিন গ্রুপ। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। শুরুতে একটি জুট মিলে চাকরি করলেও পরে জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের ভয় আছে—এমন অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব সশস্ত্র নেটওয়ার্ক। পরবর্তীতে সেটিই রূপ নেয় একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীতে। নিয়ন্ত্রণ” কতটা বাস্তব? র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, হামলায় ২০০ থেকে ৩০০ সশস্ত্র ব্যক্তি অংশ নেয়। তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেছেন, “যেই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র অভিযান দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। কারণ এখানে অপরাধ শুধু অস্ত্রের নয়—ভূমি, অবৈধ বসতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দখল অর্থনীতি এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা এবং নির্মাণাধীন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে—জঙ্গল সলিমপুরে সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। রাষ্ট্র সেখানে উপস্থিত হলেও, নিয়ন্ত্রণের লড়াই এখনও চলছে ছায়ার আড়ালে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাহাড়, জমি এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থনীতি।