সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নানারকম রাজনীতি হয়েছে। দল ত্যাগ, জোট গঠন ও এক পক্ষ ত্যাগ করে আরেক পক্ষে যোগ দেওয়াসহ বিভিন্ন খেলা দেশবাসী দেখেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যা আলোচিত হয়েছে তা হলো- নিজের দল বিলুপ্ত করে অন্যের ছাতার নিচে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা। এতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি দল। ২০২৫ সালে সর্বশেষ সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ তথা আরপিও অনুযায়ী জোট গঠন করলেও ভোটে লড়তে হবে নিজ দলের প্রতীক নিয়ে। যেখানে ছোট দলগুলোর বেধেছে বিপত্তি। পরাজিত হওয়ার আশঙ্কায় তারা দলই বিলুপ্ত করে ধানের শীষে নির্বাচন করার জন্য বিএনপিতে ভেড়েন। অর্ধ ডজনের বেশি রাজনৈতিক নেতা এবার সংসদে যাওয়ার আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। কিন্তু তাদের দলের অবস্থা ও জনপ্রিয়তা এর জন্য উপযোগী ছিল না। এক পর্যায়ে দল বিলুপ্ত বা বদল করে অন্য দলে যোগ দেন তারা। এরপরও তাদের অনেকের কপাল খোলেনি। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর জানা যায়, তাদের মধ্যে কয়েকজন নির্বাচনি বৈতরণী পাড় হতে পারেননি। যারা এবারের নির্বাচনে হেরেছেন তাদের কয়েকজনের বিবরণ দেওয়া হলো: সৈয়দ এহসানুল হুদা গত ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে নেতাকর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ যোগদান করেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ফুল দিয়ে সৈয়দ এহসানুল হুদাকে বরণ করে নেন। এহসানুল হুদা নির্বাচনের মাঠে নামার আগে ধানের শীষ প্রতীক পান। কিন্তু তিনি ভোটযুদ্ধে সুবিধা করতে পারেননি। হেরেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে। কিশোরগঞ্জ–৫ (বাজিতপুর ও নিকলী) আসনে হাঁস প্রতীকে শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৬০৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের এহসানুল হুদা পেয়েছেন ৬৬ হাজার ৪৫০ ভোট। ড. রেদোয়ান আহমেদ গত ২৪ ডিসেম্বর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. রেদোয়ান আহমেদ নিজ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের কথা ঘোষণা দেন তিনি। পরে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে লড়েন। কিন্তু বিএনপির বিদ্রোহী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম শাওনের কাছে পরাজিত হন। এ আসনে পাঁচবারের সাবেক এমপি ড. রেদোয়ান পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৯২৫ ভোট, অপরদিকে শাওন পেয়েছেন ৯০ হাজার ৮১৯ ভোট। রাশেদ খান গত ২৭ ডিসেম্বর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলটিতে যোগদানের ঘোষণা দেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান। এর আগে তিনি নিজ দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি ঝিনাইদহ-৪ (সদর ও কালীগঞ্জ) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। রাশেদ ঝিনাইদহ-৪ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা আবু তালেবের কাছে হেরেছেন। আবু তালেব পেয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৯ ভোট, আর রাশেদ তৃতীয় অবস্থানে থেকে পেয়েছেন ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট। ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ন্যাশনাল পিপলস পার্টির(এনপিপি) চেয়ারম্যান এ জেড এম ফরিদুজ্জামান ফরহাদ তার দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক পান। নড়াইল-২ আসনে (লোহাগড়া ও সদরের একাংশ) লড়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। এ নিয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো হারলেন। এ আসনে জেলা জামায়াতের আমির আতাউর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৪২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী কলস প্রতীক নিয়ে মনিরুল ইসলাম পেয়েছেন ৭৮ হাজার ৪৫৭ ভোট এবং ধানের শীষের প্রার্থী ফরিদুজ্জামান ফরহাদ পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৬৩ ভোট। রশীদ বিন ওয়াক্কাস দলের নিবন্ধন না থাকায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশের নেতা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু তারও কপাল পুড়েছে। যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে ত্রিমুখী লড়াই হয়েছে। এ আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী গাজী এনামুল হক বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৮৫৮। বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে এ আসনে নির্বাচন করা শহীদ মো. ইকবাল হোসেন দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন। তার প্রাপ্ত ভোট ৮৫ হাজার ৫১৭। তৃতীয় অবস্থানে আছেন বিএনপি জোট থেকে মনোনয়ন পাওয়া রশীদ বিন ওয়াক্কাস। তার প্রাপ্ত ভোট ৫৫ হাজার ৪১৯। কেউ কেউ আবার দলবদলের খেলায় সাফল্য পেয়েছেন। তারা ভোটযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি গত ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- বিএলডিপির (একাংশ) চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ও পান। ড. রেজা কিবরিয়া গত ১ ডিসেম্বর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর তাকে হবিগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ও পান। এছাড়া এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ তার দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন। পরে ধানের শীষ পেয়ে ঢাকা-১৩ আসনে নির্বাচন করে জয় পান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে ৩২ থেকে ৪২ সদস্যের একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করেছেন বলে জানা গেছে। সংবিধান অনুযায়ী, মোট মন্ত্রীর সর্বোচ্চ এক-দশমাংশ টেকনোক্র্যাট কোটায় নিয়োগ দেওয়া যাবে। টেকনোক্র্যাট কোটায় কারা আসছেন? দলীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং সেলিমা রহমান। তারা সংসদ সদস্য না হলেও দীর্ঘদিন ধরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয়। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় রয়েছেন— রুহুল কবির রিজভী, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, হুমায়ুন কবীর, মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, মাহদী আমিন, আমিনুল হক এবং ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। তাদের মধ্যে কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান না পেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদেও নিয়োগ পেতে পারেন বলে জানা গেছে। সংবিধান কী বলছে? বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৬(২) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন। শর্ত থাকে যে, অন্যূন নয়-দশমাংশ মন্ত্রী সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মনোনীত হতে পারবেন। সে হিসাবে ৪০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় সর্বোচ্চ চারজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হতে পারেন। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সম্ভাব্য মন্ত্রী সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন— অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জমির, আমানউল্লাহ আমান, হাবিবুর রশীদ, শেখ রবিউল আলম, আসাদুল হাবিব দুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, রকিবুল ইসলাম বকুল এবং মোহাম্মদ আলী আসগর লবি। এছাড়া আলোচনায় আছেন— নুরুল ইসলাম মনি, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মজিবর রহমান সরওয়ার, এবিএম মোশাররফ হোসেন, জহির উদ্দিন স্বপন, আব্দুস সালাম পিন্টু, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, শরীফুল আলম, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং আফরোজা খান রিতা। গুঞ্জনে রয়েছেন আরও— ফজলুল হক মিলন, খায়রুল কবির খোকন, শামা ওবায়েদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির চৌধুরী, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বরকতউল্লা বুলু, মো. শাজাহান, মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, ড. রেজা কিবরিয়া, মো. মোশাররফ হোসেন এবং সাঈদ আল নোমান। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মির্জা ফখরুল? দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন—এমন আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মিত্র দল থেকেও অন্তর্ভুক্তি মিত্র দলগুলোর মধ্য থেকে সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তির তালিকায় রয়েছেন— আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি এবং নুরুল হক নুর। এছাড়া নির্বাচনে পরাজিত হলেও টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় আছেন মাহমুদুর রহমান মান্না। দলীয় নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়েই টেকনোক্র্যাট কোটার চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। শপথ গ্রহণের দিনই নতুন মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—নতুন সরকারে কার হাতে উঠবে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, আর কতটা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে নবীন-প্রবীণের এই সমন্বয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলো নিয়ে হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন— দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন? দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। জোরালো হচ্ছে গুঞ্জন সূত্র জানায়, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এরপর থেকেই রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন জোরালো হয় যে, খুব শিগ্গিরই রাষ্ট্রপতি পদে তাকে মনোনয়নের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। দলীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ ও পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বের জন্য পরিচিত এই নেতা রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদের জন্য গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। শপথ ও সাংবিধানিক গুরুত্ব সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। একই দিন বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী ও নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিই মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করান। ফলে সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি নিয়োগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আপসহীন ভাবমূর্তি দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ দেশের রাজনীতিতে একটি প্রতীকী ও কৌশলগত বার্তা বহন করবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংক্ষিপ্ত জীবনী ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক উত্থান। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। পরবর্তীতে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি দলটির দীর্ঘমেয়াদি মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্ভাব্য মনোনয়ন এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে— এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
প্রচলিত রীতি ভেঙে বঙ্গভবনের বাইরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে বলে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন। এর আগে একই দিন সকালে একই স্থানে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন পর শনিবার থেকেই এ আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সংসদ সচিবালয়। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গণমাধ্যমকে জানান, মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্যদের এবং বিকেলে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের আয়োজন করা হচ্ছে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। তবে রাষ্ট্রপতি নিজেই শপথ পাঠ করাবেন কি না-এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। সাধারণত রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে নতুন সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করান। এবার স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই রীতিতে ব্যতিক্রম ঘটতে যাচ্ছে। তবে শপথের স্থান পরিবর্তনের কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই সুস্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি। বিএনপির তরফ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য আসেনি। এর আগে চব্বিশের আন্দোলনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নিয়েছিল। শপথ আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই শনিবার সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব আব্দুর রশীদকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিএনপি নতুন মন্ত্রিসভার কাঠামো প্রায় চূড়ান্ত করেছে। পুরোনো অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি নতুন ও তরুণ মুখ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টেকনোক্র্যাট কোটায় কয়েকজনকে যুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করা কয়েকজনকে আবার অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। স্পিকার হিসেবে ড. আব্দুল মঈন খান, সালাহউদ্দিন আহমদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনাধীন। এছাড়া, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে স্থায়ী কমিটি এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নাম বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন মন্ত্রিসভায় নয়া মুখ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে রুহুল কবির রিজভী (টেকনোক্র্যাট), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ইসমাইল জবিউল্লাহ (টেকনোক্র্যাট), হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানির নাম বিবেচনায় আছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দেশত্যাগ করেছেন। শনিবার সকাল ১০টার দিকে তিনি জার্মানির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, ইমিরেটস এয়ারলাইন্স–এর ফ্লাইট (ইকে ৫৮৩) যোগে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা দেন। তার সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। জানা গেছে, ফয়েজ আহমদ নেদারল্যান্ডের নাগরিক। বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান ভোডাফোন জিংগো–তে সিনিয়র সফটওয়্যার সলিউশন আর্কিটেক্ট হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি গঠনের জন্য ডাক, টেলিযোগযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ ইসলাম। এরপর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খালি হলে প্রায় এক বছর আগে অর্থাৎ সে বছরের ৫ মার্চ প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় এই মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান ফয়েজ আহমদ। এর আগে তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে ‘পলিসি এডভাইজার (সংস্কার ও সমন্বয়)’ পদে ছিলেন। ফয়েজ আহমদের আকস্মিক দেশত্যাগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। আকস্মিক দেশ ত্যাগের বিষয়ে জানতে দেশি-বিদেশি সব নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
শুধু দীর্ঘ কারাবাস নয়; প্রহসনের বিচারে রীতিমতো মৃত্যুদণ্ড। বলা যায়, মাথার উপরেই ঝুলছিল ফাঁসির দড়ি। কিন্তু নিয়তির পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। জুলাইয়ের রক্ত বন্যায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। এরপর আসে বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বৈরাচারের কারাগার থেকে বেরিয়ে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়ান নেতারা—এবং রায় দেন ভোটাররাই। বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু এবং জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। বাবর: ১৮ বছরের অন্ধকার শেষে আলোর পথে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ২০০৭ সালে গ্রেফতার হন। এরপর একদিনের জন্যও জামিন মেলেনি তার। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই কেটে যায় দীর্ঘ ১৮ বছর। পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে মলিন মুখে আদালতে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য ছিল চিরচেনা। অনেকেই মনে করতেন, বাবর আর কোনোদিন জেল থেকে মুক্তি পাবেন না। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনি প্রক্রিয়ায় সব মামলা থেকে খালাস পান তিনি। গত বছর ১৬ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে যান নিজের নির্বাচনি এলাকা নেত্রকোনায়। মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুরি নিয়ে গঠিত আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এক লাখ ২০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পিন্টু: মৃত্যুদণ্ড থেকে সংসদ ভবন বাবরের মতোই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু। দীর্ঘ ১৭ বছরের কারাজীবনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর। মুক্তির পর তিনি ফিরে যান জন্মস্থান টাঙ্গাইলে। স্থানীয় গোপালপুর-ভূঞাপুর আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন। ভোটযুদ্ধে প্রায় দুই লাখ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। দীর্ঘ কারাবাস ও মৃত্যুদণ্ডের রায় পেরিয়ে তার এই বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আজহার: ফাঁসির মঞ্চ থেকে ভোটের মঞ্চে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামও হয়েছেন সংসদ সদস্য। রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করেন তিনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক বছরের মধ্যে গ্রেফতার হন আজহার। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ২০১২ সাল থেকে দীর্ঘ এক যুগ কারাবন্দি ছিলেন তিনি। গত বছর ২৮ মে কারাগার থেকে মুক্তি পান। আর কিছুদিন গেলেই হয়তো তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হতো—এমন ধারণা ছিল রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু সেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেতাই আজ জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ এই তিন নেতার বিজয় শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘ কারাবাস, মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং বিতর্কিত বিচার প্রক্রিয়া—সবকিছুর পর জনগণের ভোটে তাদের জয় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলেই মনে করা হচ্ছে। জনতার রায়ে কারাগার পেরিয়ে সংসদ ভবনে—এই প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়লাভ করায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশন। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) এক বার্তায় এই শুভেচ্ছা জানানো হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ের জন্য তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে অভিনন্দন এবং বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করায় বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন। আরও জানানো হয়েছে, আমরা আমাদের অভিন্ন অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অভিবাসন, জলবায়ু এবং নিরাপত্তা নিয়ে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। ফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৯৭টির ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
মুন্সীগঞ্জে নির্বাচন-পরবর্তী সহিসতায় একজন নিহত হয়েছেন। সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আব্দুল্লাহ গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে সংর্ঘের ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম জসিম নায়েব (৩৫), মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার বোন জামাই দিদার। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইমেন অ্যান্ড অপারেশনস) মো. ফিরোজ কবির জানান, এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর তারা শুনেছেন। সত্যতা যাচাইয়ে কাজ করছে পুলিশ। রাত ৯টায় এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত ওই গ্রামে থেমে থেকে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলমান। এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তাৎক্ষণিক তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। স্থানীয়রা জানায়, চর আব্দুল্লাহ গ্রামে নির্বাচনের আগে থেকে ধানের শীষের সমর্থক নাসির ডাক্তার ও শওকত আলী সরকারের সঙ্গে স্থানীয় মাফিক নায়েবের বিরোধ চলে আসছিলে। নির্বাচনের ফল নিয়ে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির জের ধর ধরে সংঘর্ষ শুরু হয়। বিকেলে মাফিক নায়েবের বাড়িতে হামলা করা হয়। এ সময় উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে কুপিয়ে জখম করা হয় জসিম উদ্দিনকে। জসিমকে উদ্ধার করে প্রথমে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢামেকে নেওয়ার পথেই জসিমের মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছেন তার বোন জামাই মো. দিদার। মৃত জসিম চর আব্দুল্লাহ গ্রামের মাফিক নায়েবের ছেলে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইমেন অ্যান্ড অপারেশনস) মো. ফিরোজ কবির বলেন, ‘মৃত্যুর সংবাদ আমরা শুনেছি, সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বের কথা শুনেছে পরে সংঘর্ষের ঘটনা কেউ জানায়নি।
ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেঘনা আলম পেয়েছেন ৬০৮ ভোট। আসনটিতে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়েছেন। শুক্রবার (১৩ফেব্রুয়ারি) ভোররাত পৌনে ৪টায় ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার (রিটার্নিং কর্মকর্তা) শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী চৌধুরী এ ফল ঘোষণা করেন। ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির মোহাম্মদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ১০৮টি কেন্দ্রে পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫৭২ ভোট। এর সঙ্গে তিনি পোস্টাল ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৫৫৫টি। মোট ৫৪ হাজার ১২৭টি ভোট পান তিনি। এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী কেফায়েত উল্লা হাতপাখা মার্কায় মোট ১ হাজার ৪৩৬ ভোট এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের মেঘনা আলম ৬০৮ ভোট পেয়েছেন। ঢাকা-৮ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৪ জন। এর মধ্যে ভোট পড়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৮৪টি। বাতিল হয় ২ হাজার ৮১৭টি। বৈধ ভোট হয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৬৭টি। এ আসনে পোস্টাল ভোটার ছিলেন ৮ হাজার ৯৯২ জন। এর মধ্যে ভোট পড়ে ৬ হাজার ১২টি। বাতিল হয় ৩২০টি।
ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন আমজনতা দলের সদস্য সচিব মো. তারেক রহমান। প্রজাপতি প্রতীকে মাত্র ১ হাজার ৪৪ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে ভোট বাতিল হয়েছে ২ হাজার ৪৪৪টি। ফলে বাতিল হওয়া ভোটের সমানও ভোট পাননি তারেক। এই আসনে মোট বৈধ ভোট পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৮টি বা ৩৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। প্রকাশিত ফলাফল থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক (কোদাল প্রতীক) পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। অপরদিকে, ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৯ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৮ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট থেকে তিনজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতে ভোট গণনা শেষে জেলা রিটানিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে এ ফলাফল ঘোষণা করেন। বিজয়ী প্রার্থীরা জোটগত সমঝোতার ভিত্তিতে ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে শরিক দলের প্রার্থীরা জয় লাভ করেন। তারা হলেন— ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬: গণসংহতি আন্দোলন-এর প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ভোলা-১: বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-র চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ পটুয়াখালী-৩: গণঅধিকার পরিষদ-এর সভাপতি নুরুল হক নুর জোট সূত্রে জানা গেছে, আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপি তাদের শরিক দলগুলোর জন্য মোট আটটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। তবে সমর্থন থাকা সত্ত্বেও বাকি পাঁচটি আসনে জয় পেতে ব্যর্থ হন শরিক প্রার্থীরা। যেসব আসনে পরাজয় নির্বাচনে পরাজিত উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি-র সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সিলেট-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর সভাপতি মওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে দলটির সহসভাপতি মওলানা জুনায়েদ আল হাবিব নীলফামারী-১ আসনে মহাসচিব মওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি মনির হোসেন কাসেমী বিদ্রোহী প্রার্থী ও সমন্বয় সংকট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কয়েকটি আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক না পেয়ে বিএনপির কিছু নেতা বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। ফলে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জোটগত সমঝোতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ শরিক দলের প্রার্থীদের প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় জোট রাজনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে সামগ্রিক ফলাফলে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় ভবিষ্যতে জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই ফলাফল দেশের জোটভিত্তিক রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু। বেসরকারি ফলাফলে তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে জয় নিশ্চিত করেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টার দিকে এ আসনের ১১৭টি ভোটকেন্দ্রের সবগুলোর ফলাফল পাওয়া যায়। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৯০৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আল্লামা শাহ আকরাম আলী পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। ফলে শামা ওবায়েদ ৩২ হাজার ৯৫৩ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিজয় নিশ্চিত করেন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩২ হাজার ৪১ জন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল সংগ্রহ করে এ ফল ঘোষণা করা হয়। ফলাফল ঘোষণার পর শামা ওবায়েদের সমর্থক ও নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে তারা বিজয়ের উল্লাস প্রকাশ করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বিজয়ের মাধ্যমে ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির শক্ত অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, আগামী ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অর্থাৎ রমজান মাস শুরুর আগেই নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। রাজধানীর ঢাকা-৮ আসনের রমনা থানার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান শেষে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। আইন উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের বহু প্রজন্মকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে এই ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। তিনি এ ভোটকে সাধারণ কোনো ভোট নয় বলে মন্তব্য করেন। আসিফ নজরুল বলেন, জুলাইয়ে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার মতোই এই ভোট। নির্বাচন পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ চলছে। তবে বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনাকে ভোটের সংস্কৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস জানিয়েছেন যে, িআজ দুপুর পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্দীপনা ও প্রাণের সঞ্চার লক্ষ্য করা গেছে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সকালের মতো বিকেলের শেষ সময় পর্যন্ত ভোটারদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং উৎসাহের ধারা অব্যাহত থাকবে। ইজাবস উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের নাগরিকরা ভোটাধিকার প্রয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী এবং একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই শীর্ষ পর্যবেক্ষক জোর দিয়ে বলেন যে, ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে এবং তারা কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ নন। বর্তমানে সারাদেশে তাদের পর্যবেক্ষকরা ছড়িয়ে রয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অনলাইন প্রতিবেদন ও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইভার্স ইজাবস আরও জানান যে, এই তথ্যগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে যাতে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়। তিনি মনে করেন, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে জনগণের এই ব্যাপক উপস্থিতির গুরুত্ব অপরিসীম। নির্বাচন পরিচালনার গুণমান এবং সার্বিক প্রক্রিয়া নিয়ে ইইউ মিশন খুব শীঘ্রই তাদের মূল্যায়ন প্রকাশ করবে। ইভার্স ইজাবস জানিয়েছেন যে, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে, যেখানে এই নির্বাচনটি ঠিক কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ের চিত্র কেমন ছিল তার বিস্তারিত বিবরণ থাকবে। তিনি বলেন যে, তাদের কাজ মূলত পর্যবেক্ষণ করা এবং তথ্য সংগ্রহ করা, যাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা যায়। কার্জন হল কেন্দ্র পরিদর্শনকালে ইইউ মিশনের অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা কেন্দ্রের বুথগুলোতে ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ভোটগ্রহণের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতিই এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার বড় মাপকাঠি হয়ে থাকবে বলে তারা মনে করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের পরবর্তী গণতান্ত্রিক যাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থী মারা যাওয়ায় স্থগিত ওই ভোটের তফসিল পরে দেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, টানা চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এদের মধ্যে ১০ লাখের বেশি প্রবাসী ভোটার ও ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কয়েদিরা প্রথমবারের মতো আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ভোটে কত দল, কত প্রার্থী নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ভোটে অংশ নিয়েছে ৫০টি দল। ২৯৯ আসনের ভোটে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশগ্রহণ করছে। দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন। স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। এরমধ্যে দলীয় প্রার্থীর সংখ্যা ৬৩ জন। বাকি ২০ জন হচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ভোটের পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৯২ জন দলীয় প্রার্থী। পুরুষদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫৩ জন। শেরপুর-৩ আসনে একজন বৈধ প্রার্থী মারা যাওয়ায় আসনটিতে পরে নতুন তফসিলের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা হবে। ২৯০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে এই দলের। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রয়েছে ২২৭ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৭ জন, জাতীয় পার্টির (জাপা) ২০০ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ জন, গণঅধিকার পরিষদের ৯৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছে। ভোটের আগের সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সব দল ও প্রার্থীদের জয় পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি আহবান; শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার্থে সকলে দায়িত্বশীল ও যত্নবান হবেন। আমরা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাই। যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা মোকাবিলায় নির্বাচনী কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করুন। গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে মূখ্য ভূমিকা পালন করবেন ৪ কোটি ৯০ লাখ তরুণ ভোটার। ইসি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ৩৫ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা এবার ৪ কোটি ৯০ লাখ ৪৩ হাজার ৫৬১ জন। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ২ কোটি ১২ লাখ ৪২ হাজার ৫৩১ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ কোটি ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৯০২ জন। নারী ভোটার ৯৪ লাখ ৯০ হাজার ২২১ জন। আর হিজড়া ভোটার ৪০৮ জন। অন্যদিকে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটার রয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ১ হাজার ৩০ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ কোটি ৪১ লাখ ১ হাজার ৯০ জন। নারী ভোটার ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬২ জন। আর হিজড়া ভোটার ৫৬৭ জন। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এবার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন। নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। আর হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।
সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। আগামীকাল অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে দেশবাসীকে ‘শুভেচ্ছা’ জানিয়ে বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ভাষণে সিইসি নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও কমিশনের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। ভাষণে সিইসি যেকোনো সংঘাত এড়িয়ে এবং জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের কেন্দ্রে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান। এছাড়া ভাষণে তিনি ভোটদানকে কেবল নাগরিক অধিকার নয়, বরং একটি দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। ভাষণের শুরুতেই সিইসি গভীর শ্রদ্ধার সাথে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করেন। একইসাথে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ গণতান্ত্রিক উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি, আমি তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।’ তিনি একই সাথে আহত জুলাই যোদ্ধাদের দ্রুত আরোগ্য ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য দোয়া করেন। সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনে ভোটদান আমাদের শুধু নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের ভোটাররা সচেতনভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভিন্নমত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ।’ এই বিষয়টি মাথায় রেখে উৎসবমুখর পরিবেশে কেন্দ্রে এসে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা ও নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে জয়-পরাজয়কে সবাইকে সহজভাবে মেনে নিতে হবে। তিনি ব্যক্তিগত কষ্ট বা সীমাবদ্ধতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে জাতীয় নির্বাচনের এই মহতি কর্মযজ্ঞকে সফল করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে সিইসি বলেন, যেকোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচনী কর্মকর্তা, বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে। তিনি সকলকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান। সিইসি আশা প্রকাশ করে বলেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশবাসী একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সাক্ষী হতে পারবে। উল্লেখ্য, আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারাদেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে এই ভোটগ্রহণ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শঙ্কামুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘সম্পূর্ণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’ বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পাশাপাশি এই ভোট যেন তরুণসহ সব ভোটারদের কাছে উৎসবমুখর গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার বলেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।বুধবার নির্বাচন উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে ইউনূস বলেন, এ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে যে, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ নাগরিক এবারই প্রথম তাদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে পূর্ণবয়স্ক অনেক নাগরিকও দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত অর্থে ভোট প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তাই এ গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন প্রতিটি ভোটারের কাছে একটি আনন্দময়, শঙ্কামুক্ত, বিশ্বাসযোগ্য ও উৎসবমুখর গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়-তা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পূর্ণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি এ নির্বাচনকে ‘দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত’ জাতির জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমর্যাদার ঘোষণা দিয়েছিল সে ‘আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত’ ও ‘প্রাতিষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবেও দাবি করেন।জনগণের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি আশা করি, গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করবেন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য, দায়বদ্ধ ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এভাবে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে অংশীদার হবেন। তিনি নির্বাচন উপলক্ষে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এ যুগান্তকারী গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি শুধু একটি নির্বাচন বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক ধারা ও জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
ভোট কেনার অভিযোগে রাজধানী ঢাকার সূত্রাপুরে থানা জামায়াতে নায়েবে আমির মো. হাবিবকে টাকাসহ আটক করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে দুই দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মতিউর রহমান এ তথ্য সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর সূত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টার ভোটকেন্দ্রের সামনে ভোটারদের কাছে টাকা দিয়ে ভোট কেনার সময় স্থানীয় জনগণ হাবিবকে আটক করে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সূত্রাপুরের ৪৪ নং ওয়ার্ডের একটি চালের দোকানে বসে মো. হাবিব ভোটারদের টাকা দিচ্ছিলেন। এ সময় এলাকাবাসী তাকে ধরে ফেলে। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে এসে যাচাই-বাছাই শেষে হাবিবকে দুই দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেন। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে ভোট কেনাবেচার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
ভোটের দিন রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে দেখা গেছে একেবারেই ভিন্ন চিত্র। নেই চিরচেনা যানজট, নেই ট্রাফিক সিগন্যালের দীর্ঘ অপেক্ষা। ঈদের দিনেও যে ধরনের যানবাহনের চাপ থাকে, বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর রামপুরা, খিলগাঁও, চৌধুরীপাড়া ঘুরে তার চেয়েও বেশি সড়ক শূন্যতার দৃশ্য চোখে পড়ে। কখনো সখনো দু’একটি অটোরিকশা বা একটি প্রাইভেটকার চলাচল করতে দেখা গেলেও দীর্ঘ সময় সড়কে তাকিয়ে থাকলেও তেমন কোনো যানবাহনের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। এমনকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালে ট্রাফিক পুলিশ বা সিগন্যাল ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি। রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মনসুর আলী বলেন, “ঢাকা শহরে এমন যানবাহনের শূন্যতা ঈদের দিনেও দেখা যায়নি। নির্বাচন নিয়ে শুধু উৎসবের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে আতঙ্কও কাজ করছে। কী হবে, কী হতে চলেছে—এ নিয়ে সবাই চিন্তিত।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচন উৎসবমুখর হবে—এমন কথার পাশাপাশি মানুষের ভেতরের এই উদ্বেগের দিকটিও তুলে ধরা জরুরি। একই সুরে কথা বলেন রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, “ভোট দেওয়ার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি মানুষের মনে আতঙ্কও ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকে খোঁজখবর নিচ্ছেন, পরিস্থিতি বুঝতে চাইছেন। তবে সবার একটাই আশা—নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। মানুষ শান্তি চায়।” এদিকে, অ্যাডিশনাল কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান জানান, “নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ভোট দিতে নিজ নিজ গ্রামে চলে গেছেন। এ কারণেই ঢাকায় স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যানবাহন চলাচল অনেক কম।” তিনি জানান, দূরপাল্লার কিছু বাস সীমিত আকারে চলাচল করছে, তবে মহানগর এলাকায় সড়ককে কার্যত ফাঁকাই বলা যায়। সড়কে যানবাহনের স্বল্পতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কমলাপুর রেলস্টেশনে। ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জয়নাল আবেদিন বলেন, “সড়কে যানবাহন কম থাকায় মানুষ ট্রেনের ওপর নির্ভর করছে। ফলে কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে।” স্টেশন সূত্র জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় ট্রেনের ছাদে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। ভেতরের বগিগুলোতেও যাত্রীদের গাদাগাদি অবস্থা ছিল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, বুধবার সকাল থেকে রাজধানীতে যানবাহনের চলাচল খুবই সীমিত। কিছু অটোরিকশা ও হাতে গোনা কয়েকটি প্রাইভেটকার ছাড়া সড়কে উল্লেখযোগ্য যান চলাচল নেই। ডিএমপি সূত্র জানায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে, আবার সন্ধ্যার দিকে আরও কমে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটের দিনে ঢাকার এই নীরবতা একদিকে যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি মানুষের মনে চলমান উদ্বেগ ও প্রত্যাশার প্রতিফলনও বটে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে মাঠ প্রশাসন থেকে পাওয়া অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কন্ট্রোল রুম খুলেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শরিফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রত্যেক দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ও ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারীরা কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করবেন। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রাপ্ত অভিযোগ বা তথ্যাদিন বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বরিশালে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর যেন পাহাড়সম ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি)। পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে অতীতে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর এই চটে থাকা বলে জানা গেছে। বর্তমানে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় 'নির্বাচনী কার্ড' ইস্যু করাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। কার্ড ইস্যু নিয়ে চলছে টালবাহানা ভুক্তভোগী সংবাদকর্মীদের দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরেও কার্ড দিতে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে। মূলত ডিসির ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেই মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বরিশালের সাংবাদিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রভাব পেশাগত কাজে উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে এই জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়। সেই থেকে সাংবাদিকদের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ, এখন সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার হরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিশেষে বলা যায়, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ কাম্য নয়। নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক লিখেছেন, বৌ পেটানো নিউজ করার মাসুল দিচ্ছে বরিশালের সাংবাদিকরা। আরেক সাংবাদিক প্রশাসনের এই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে লিখেছেন, ডিসি তার ক্ষমতা দেখাইছে, এখন আমাদের বরিশালের সাংবাদিকদের উচিত সবাই এক হয়ে ক্ষমতা দেখানো। কার পাশা যাবে কার টেবিলে, খেলা যে চলছে কোন লেভেলের! নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্ড একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি। কিন্তু কার্ড পেতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, সঠিক কারণ ছাড়াই আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বরিশালের সংবাদকর্মী মহলে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন ‘ব্যক্তিগত রোষ’ এবং ‘ক্ষমতার দাপট’ রুখতে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো কঠোর কর্মসূচির কথা ভাবছে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অবিলম্বে সাংবাদিকদের কার্ড প্রদানের দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। কে এই ডিসি খাইরুল আলম সুমন যৌতুক সংক্রান্ত মামলায় কারাবাসের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে বিস্ময় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বরিশালের ডিসি খায়রুল আলম সুমন ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা, ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমিসংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করা—যেখানে ব্যক্তিগত সুনাম ও নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, যাদের ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, এমন কর্মকর্তাকে ডিসি পদে বসানো ইমেজ ও আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে। আদালত ও মামলার তথ্য সূত্র অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ওই মামলায় খায়রুল আলম সুমন ও তার মা খোদেজা বেগমকে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার এসআই শাহ আলম আদালতে তাদের হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন—উভয় আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবাসে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৫ জুন বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ রাতে ঢাকার ওয়ারী এলাকায় খায়রুলের বাসায় তার মায়ের মাধ্যমে গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হয় এবং এ সময় খায়রুল আলম সুমন ভুক্তভোগীর হাত চেপে ধরেন। পরদিন ওয়ারী থানায় মামলা করা হয়। বিভাগীয় মামলা ও পদোন্নতি স্ত্রীর করা মামলার পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ দেওয়া হলে খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এর ফলে নিয়মিত পদোন্নতি ব্যাহত হয় বলে জানা গেছে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উপসচিব পদে তার পদোন্নতির আদেশ জারি হলেও সেখানে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ (ব্যাকডেটেড) পদোন্নতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজেকে পদোন্নতিতে বঞ্চিত দাবি করে তিনি ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিসির বক্তব্য খায়রুল আলম সুমনের ‘ব্যক্তিগত ডাটা শিটে’ (পিডিএস) বর্তমানে তাকে ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খায়রুল আলম সুমন বলেন, “এসব আমার ব্যক্তিগত তথ্য। আমার নামে বিভাগীয় মামলা ছিল—সবই কর্তৃপক্ষ জানে এবং জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মত জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা প্রশাসক পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়—এটি নৈতিক নেতৃত্বেরও প্রতীক। একজন ডিসির ব্যক্তিগত জীবনে গুরুতর অভিযোগ থাকলে জেলার আইনশৃঙ্খলা ও ম্যাজিস্ট্রেসি কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশ্ন ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাদের ভাষ্য, “ডিসির সুনামটাই সবচেয়ে জরুরি।” সূত্র জানায়, খায়রুল আলম সুমন প্রবেশনার হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাকরি শুরু করেন। সে সময়ের ডিসি মো. আবদুল মান্নানের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম ডিসি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নাঙ্গলকোট, নিকলি ও বাজিতপুরে এসিল্যান্ড এবং ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশালের ডিসি হিসেবে তার নিয়োগ প্রশাসনে নৈতিকতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও অবস্থান প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।